১
কে বলে মেথর তুমি অস্পৃশ্য অশুচি/
তুমি আছো গৃহবাসে তাই আছে রুচি/ ~ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
ছোটবেলায় আমাদের মনোহরপুকুর রোডের বাড়ীতে কর্পোরেশন থেকে প্রতিদিন সকালে বাথরুম ধুতে একটি ছেলে আসতো, তাকে সবাই জমাদার বলে ডাকতাম।
ছেলেটি বিহার থেকে এসেছে এই কাজ নিয়ে, খুবই অল্প বয়েস, কুড়ি ও হবে কিনা সন্দেহ। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতো, কুচকুচে কালো গায়ের রং, কিন্তু দাঁত গুলো ধবধবে সাদা, আর হাসিটা খুব মিষ্টি।হাঁটু পর্য্যন্ত গোটানো মালকোচা মারা ধুতি, গায়ে একটা ফতুয়া, আর হাতে একটা ঝাঁটা, তার ওই চেহারাটা এখনো স্পষ্ট চোখে ভাসে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে বড়ো বারান্দায় ঢুকে সে “মেজমা” বলে একটা হাঁক দিয়ে নিজের উপস্থিতি সকলকে জানান দিতো। সঙ্গে সঙ্গে মা জ্যেঠিমা কাকীমা রা বলে উঠতেন “ওরে, বাথরুম থেকে জামাকাপড় বালতি ঘটি সব সরিয়ে রাখ্, জমাদারএসেছে।”,
মাঝে মাঝে কেউ না থাকলে সে আমাকেও বলতো,“বাথরুম থেকে কাপড় জামা আর বালতি টা সরিয়ে লিবেন দাদাবাবু!”
আমরা বাথরুম থেকে কাপড়জামা ঘটি সব না সরানো পর্য্যন্ত সে হাসিমুখে চুপ করে ঝাঁটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। তাকে ছুঁলে বা তার ছায়া মাড়ালে আমাদের জাত যাবে এ কথা ভাবতে তার কোন অপমানবোধ হতো না?
কি জানি!
তার হাসিমুখ দেখে আমার মনে হতো আমাদের অসুবিধের মধ্যে ফেলে সে বেশ মজাই পাচ্ছে। আমাদের এই অপমান সে গায়ে মাখছেনা, এই ব্যবস্থাযেন সে মেনেই নিয়েছে মনে মনে, যেন আমাদের কাছ থেকে এরকম ব্যবহার ই তার প্রাপ্য, তার বেশী কিছু সে চায়ও না।
২
অনেক দিন হয়ে গেছে, সেই জমাদার আর আসেনা, তার জায়গায় এখন অন্য লোক আসে, সেই original জমাদার কে আমরা সবাই ভুলেই গেছি।
সে কিন্তু আমাদের ভোলেনি!
শুনেছি অনেক বছর পর (আমি তখন বোধহয় খড়্গপুরে কলেজে পড়ি) একদিনহঠাৎ কোট প্যান্ট টুপি পরা একটি লোক সিঁড়ি দিয়ে বড়ো বারান্দায়উঠে এসে “বড়মা” বলে হাঁক দিয়েছিল।
এ আবার কে রে বাবা?
কে আবার? আমাদের সেই জমাদার।সে নাকি কর্পোরেশনের কাজ ছেড়ে দুবাই চলে গিয়েছিল, সেখান থেকে কিছুদিনের জন্যে দেশে ফিরেছে। মেজমা আর সেজমা (আমার মা) কে সে অনেক দিন দেখেনি, তাই সে দেখা করতে চলে এসেছে।
যাকে বলে প্রাণের টান!
আমি মা কে বললাম “তোমরা কি করলে তখন?”
মা বললেন,“কি আর করবো? চেয়ারে বসতে দিলাম। অনেক বাবা বাছা করলাম, এমন কি এক কাপ চা আর বিস্কুটও খেতে দিলাম। এত দূর থেকে দেখা করতে এসেছে!”
আমি বললাম, “তার পর ওই কাপ আর প্লেট এর কি হলো?”
মা বললেন “কি আবার হবে? মেজদি ফেলে দিল। ওই কাপে আর কাউকে চা দেওয়া যায় নাকি?”