আমরা বন্ধুরা ভোপাল থেকে ভীমবেটকা হয়ে কাল রাতে পাচমারীতে এসে আমাদের হোটেলে উঠেছি। মধ্যপ্রদেশের অনেক দর্শনীয় জায়গার মধ্যে পাচমারীর খুব সুনাম। জঙ্গল সাফারী তো আছেই, তার ওপরে সামনেই শিবরাত্রি সেই উপলক্ষ্যে এখানে শহরের উপকন্ঠে বিশাল মেলা বসেছে, কাল রাত্রে গাড়ীতে আসতে আসতে তার একটা আভাস পেয়েছি। নর্মদা নদীর ধারে মহাদেব এখানে সর্ব্বত্র ভক্তিভরে পূজিত।
আমাদের হোটেল টা বিশাল বড় একটা কম্পাউন্ডের মধ্যে, কাল রাত্রে ঠিক বোঝা যায়নি কত বড় আজ সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গে উঠে জানলার বাইরে তাকিয়ে মন ভরে গেল। কি সুন্দর জায়গাটা। চারিদিক শান্ত চুপচাপ, বাগানে অজস্র ফুল ফুটে আছে, চারিদিকে ছায়া ছড়ানো বড় বড় গাছ, সেখান থেকে কেবল পাখীদের কলকাকলি কানে আসে। মনটা একটা অদ্ভুত প্রশান্তি তে ভরে উঠলো।
হোটেলের ঘরেই চা তৈরী করার সব বন্দোবস্ত আছে, সুভদ্রা আর আমি মুখ ধুয়ে চায়ের পেয়ালা হাতে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চায়ের সাথে খাবার জন্যে বিস্কুটও আমাদের ঘরে রাখা আছে, বিস্কুট ছাড়া চা ঠিক জমেনা।
আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে টানা বারান্দা। সেই বারান্দার পাশে লাইন দিয়ে পর পর আমাদের বন্ধুদের ঘর। আর সেই বারান্দায় মাঝে মাঝে বসার জন্যে বেতের চেয়ার আর টেবিল রাখা।
একটু দূরে সিদ্ধার্থ সুমিতা আর দেবাশীষ টিংকুদের ঘর। তাদের ঘরের পাশে অনেক বেতের চেয়ার আর টেবিল পাতা। ডাকাডাকি করতেই ওরা চারজন বেরিয়ে এলো। সবাই মিলে বেতের চেয়ারে আরাম করে বসে চা হাতে আড্ডা শুরু করে দিলাম।
হোটেলটা কত ভাল তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
এখানে খোলা জায়গা বলে প্রচন্ড হাওয়া তাই দু’টো করে পুরু কাঠের ভারী দরজা প্রতি ঘরে। সেই দরজা খুলে রাখার জন্যে প্রতি পাল্লার পাশে একটা কাঠের ছোট টুকরো লাগানো, সেই টুকরোটা একটু ঘুরিয়ে দিলে সেটা দরজাকে খোলা রাখবে, জোরে হাওয়া এলে দুম করে দরজা বন্ধ হয়ে যাবেনা।
আমাদের ছোটবেলায় মনোহরপুকুরের বাড়ীতে এই জিনিষটা প্রতি দরজার পাল্লার পাশে থাকতো, নিয়মিত ব্যবহার করে এসেছি আমি।
কিন্তু এই কাঠের টুকরোর নাম কি কিছুতেই কারুর মনে পড়ছেনা। আমাদের আলোচনাটা এইখানে এসে আটকে গেল।
কি নাম? কি নাম?
ছিটকিনি, খিল, কব্জা, এই রকম নানা নাম মনে আসছে, কিন্তু ওই নাম আর মনে আসেনা।
বেশ কিছুক্ষন পরে হঠাৎ সিদ্ধার্থ বলে উঠলো ওটার নাম হলো ব্যাং।
ব্যাং?
ঠিক ঠিক, আমাদের ও সবার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল। ওই কাঠের টুকরোর নাম হলো ব্যাং।
ওই কাঠের টুকরো ব্যাং ও আজকাল আর কোন বাড়ীতে দরজা খোলা রাখার জন্যে ব্যাং ব্যবহার করা হয়না। আজকাল অনেক নতুন ধরণের সৌখীন door stopper বেরিয়েছে।
বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো আমার মনে, কবি বলেছেন। পাচমারীতে সেই সুন্দর সকালে হোটেলের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে আমাদের মনেও বহুযুগের ওপার হতে সেই দরজা খোলা রাখার ব্যাং ফিরে এলো।
আর তার সাথে এলো থপথপ করে লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়া কোলাব্যাং।
আমাদের ছোটবেলায় বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়লে বা কোথাও জল জমলে আমরা সেই ব্যাং দের ঐকতান শুনতাম। তাদের সেই মহানন্দে এক সাথে গ্যাঙর গ্যাঙ্গর গ্যাং ডাকের আওয়াজ এখনো কানে বাজে। কিন্তু আজকাল সেই ঐকতান আর শোনা যায়না।
“আট বছর আগের এক দিন” কবিতায় জীবনানন্দ পশুপাখীদের বেঁচে থাকার আকাঙ্খা নিয়ে লিখেছিলেনঃ
“তবুও তো প্যাঁচা জাগে, গলিত স্থবির ব্যাং আরও দুই মুহূর্ত্তের ভিক্ষা মাগে/
আর একটি প্রভাতের অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে/”
কিন্তু এত বেঁচে থাকার আকাঙ্খা থাকা সত্ত্বেও ব্যাং প্রাণীটি কি এখন বিলুপ্ত? কি জানি, হবেও বা।
যাই হোক, ব্যাং কথাটা সেদিন আমার মনে অনেক ছোটবেলার স্মৃতি ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলো।
জীবনের পথে চলতে চলতে এরকম কত কি আমরা ফেলে আসি, ভুলে যাই, হারিয়ে ফেলি। খেয়াল ও করিনা, কেবল এরকম হঠাৎ কোন এক মায়াবী মূহুর্ত্তে সেই সব হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, ভুলে যাওয়া এক সময়ের প্রিয় মানুষ, ফেলে আসা দিন গুলো হঠাৎ জানান না দিয়ে ফিরে আসে আমাদের মনে।
কাজ থেকে অবসর নিয়ে আজকাল লন্ডনে আমার মেয়ে (পুপু) জামাই (দীপ) আর দুই নাতনীর সাথে মাস তিনেক কাটাই। ওদের বাড়ী East London এ South Woodford নামে একটি শান্ত নির্জ্জন এক সম্ভ্রান্ত শহরতলীতে।
প্রবাস বাসের নানা অভিজ্ঞতা আর খবর আমি নিয়মিত দেশের বন্ধুদের ইমেলে লিখে পাঠাই। সেই সব ইমেলের নাম দিয়েছি “লন্ডনের চিঠি”।
আমরা বন্ধুরা সবাই এখন বয়সে প্রবীণ, তাই আমাদের মধ্যে পুরনো দিন নিয়ে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। একদিন সেই আলোচনায় ছোটবেলার নাপিতদের কাছে চুল কাটা নিয়ে কথা হচ্ছিল। খুব কমবয়সে যখন স্কুলে পড়ি, তখন আমাদের পাড়ায় বেশ কয়েকজন নাপিত ছিল, তারা হাতে একটা কাঠের বাক্স নিয়ে রাস্তা দিয়ে খদ্দেরের আশায় হেঁটে যেত।
চুল কাটা ছাড়াও আমাদের হিন্দুদের নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে নাপিতদের দরকার পড়ত। জন্মের পরে শিশুর হাতের নখে ক্ষুর ছোঁয়ানো, পৈতের সময় কান ফুটো করা, এমন কি বিয়ের সময় শুভদৃষ্টির কাজেও নাপিতের ডাক পড়ে। আমার জন্যে এই সব কাজ করেছিল একটি লোক।
তবে সে ছাড়াও আরও অনেক নাপিত ছিল পাড়ায়। বাড়ীতে যৌথ পরিবারে আমরা বেশ কয়েকজন পিঠোপিঠি ভাই, এক দিন সবাই মিলে চুল কাটা হত।
নাপিত দের কাছে চুল কাটা কয়ে অনেকে রসিকতা করে ইটালীয়ান সেলুন বলতো। ইটালীয়ান কেন? না ইঁট পেতে বসে চুল কাটা, তাই। আমরা অবশ্য ইঁট নয়, আমাদের সদর দরজার সিঁড়ির নীচের ধাপে বসতাম। নাপিত এসে বসতো আমাদের সদর দরজার সিঁড়িতে, আমরা তার এক ধাপ ওপরে বসে তার সামনে মাথা নীচু করে বসতাম। তখন অবশ্য চুল কাটার কোন স্টাইল ছিলনা, মাথার চুল মোটামুটি হাল্কা করে দিলেই চলতো।
তার পরে একটু বড় হলে সেলুনে যেতে শুরু করলাম। আমাদের বাড়ীর কাছে হাজরা রোডে প্রিন্স নামে একটা দামী নামী এয়ার কন্ডিশনড্ সেলুন ছিল, সেটা বেশ নাম করেছিল। যেখানে অন্যান্য ছোট সেলুনে এক টাকা লাগতো, প্রিন্স নিতো দুই টাকা। প্রিন্সে গেলে মাঝে মাঝে কোন চিত্রতারকার দেখাও পেতাম। অনিল চ্যাটার্জ্জি আর দিলীপ মুখার্জ্জীকে দেখার কথা মনে পড়ে।
IBM এ কাজ করার সময় একটু জাতে উঠেছিলাম, এক দিন অফিসের কাছে পার্ক স্ট্রীটে A N John নামে একটা সেলুনে গিয়ে চুল কেটে দশ টাকা গচ্চা দিয়ে বেশ গায়ে লেগেছিল মনে পড়ে। সেই প্রথম আর সেই শেষ। ঘরের ছেলে আবার ঘরে – মানে প্রিন্স সেলুনে ।
যাই হোক তার পরে তো কত দিন কেটে গেছে, দেশে বিদেশে কত সেলুনে কত নাপিতের (পোষাকী নাম হেয়ারড্রেসার) কাছে মাথা নীচু করেছি।
ইমেলে এক বন্ধু জানতে চাইলো লন্ডনে কোথায় চুল কাটি, এখানে কোন বাঙ্গালী পরামাণিক (নাপিত) আছে কিনা। আছে নিশ্চয়, বাংলাদেশী তো আছেই। East London এ Whitechapel নামে একটা জায়গা আছে, যেখানে Bric Lane নামে রাস্তা নিয়ে মণিকা আলির একটি বিখ্যাত – বুকার পাওয়া – উপন্যাস আছে। সেখানে হাজার হাজার বাংলাদেশী, রাস্তার নাম বাংলায় লেখা, বাঙ্গালী খাবারের দোকান চারিদিকে। সেখানে গেলে মনেই হয়না লন্ডনে আছি। মনে হয় এটা বাংলাদেশের কোন শহর।
যাই হোক, দীপ বললো ওখানে অনেক বাংলাদেশী চুল কাটার সেলুন আছে। তাদের রেট পাঁচ পাউণ্ড। মানে পাঁচশো টাকা। আমি কলকাতায় লেক মার্কেটে হাবিবস্ এ চুল কাটাই। ওখানেও পাঁচশো টাকা মত নেয়। East London এর মধ্যে Bethnal Green, Leytonstone, Walthamstow এই সব জায়গা গুলো তে প্রচুর মুসলমান থাকে (Turkish, North African, Bangladeshi)। আমরা মাঝে মাঝে গাড়ী নিয়ে Stratford Olympic city যাই, তখন পথে এই সব জায়গা পড়ে, সেখানে অনেক মসজিদ। মাইকে আজানের আওয়াজ ভেসে আসে। রাস্তার পাশে ভারতীয় তুর্কী ইত্যাদি সেলুনের সাইনবোর্ড ও চোখে পড়ে।
কিন্তু দাম কম বলে তো বেশী দূরে গিয়ে সেই সব সেলুনে গিয়ে চুল কাটা সম্ভব নয়।
কাল আমাদের বাড়ীর কাছে South Woodford এ প্রথম চুল কাটলাম। এখানে আমার জামাই দীপ চুল কাটায়। দোকানটা বাড়ী থেকে বেশি দূরে নয়, হাঁটা পথ। এখানে হাঁটতে বেশ লাগে, একে তো ঠাণ্ডা আবহাওয়া, আর একটু ভেতরের দিকে জনমানবহীন ফাঁকা রাস্তা, তার ওপর রাস্তার দু’দিকে প্রত্যেক বাড়ীর সামনে বাগান, সেখানে অজস্র রং বেরঙ এর ফুল ফুটে থাকে।
সকাল সকাল বাড়ির কাছে এক সেলুনে দীপের সাথে গিয়ে হাজির হলাম। রাস্তার ওপরে বেশ সাজানো গোছানো পরিস্কার দোকান, অত সকালে কোন ভীড় নেই। এক ভদ্রলোক দেখি খবরের কাগজ নিয়ে ক্রসওয়ার্ড করছেন। মধ্যবয়েসী, বেশ সুন্দর সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত চেহারা, মাথায় অল্প টাক, চোখে চশমা। ভদ্রলোকের নাম জন্।
ইনি আমার চুল কাটবেন নাকি? এঁকে দেখে তো প্রফেসর বা ডাক্তার বলে মনে হচ্ছে।
দীপের সাথে ওনার বেশ অনেকদিনের আলাপ মনে হলো। নামী ডাক্তার বলে দীপকে চেনাশোনা অনেকেই বেশ সমীহ করে। জন্ ও দেখলাম বয়সে অনেক ছোট দীপের সাথে বেশ অন্তরঙ্গ ভঙ্গীতে কথা বলছে। কিছুক্ষন খোশগল্প করার পর আমার সাথে জনের আলাপ করিয়ে দিয়ে দীপ চলে গেল। কাছেই South Woodford Tube station, সেখান থেকে সে ট্রেণ ধরে কাজে যাবে।
সাবেক যন্ত্রপাতি, তেমন কিছু আহামরি খেলোয়াড়ী চুল কাটা নয়, কিন্তু বেশ যত্ন করে আমার চুল কাটলেন জন্, এবং কাজ করতে করতে আমার সাথে তাঁর অনেক গল্পও হলো। ভদ্রলোকের কথাবার্ত্তা চমৎকার, অনেক খবর রাখেন, কাজ করতে করতেই মার্জিত নীচু গলায়, clipped British উচ্চারণে তিনি আমার সাথে অনেক কথা বলে গেলেন।
বারো পাউন্ড খরচ হল, যার মানে বারোশো টাকা । কুয়েতে ভারতীয় সেলুনে দুই দিনার খরচ হতো টিপ নিয়ে, যার মানে চারশো টাকা।
দিনে দশ জন কাস্টমার আর মাসে পঁচিশ দিন কাজ করলে তাঁর আয় হিসেব করে দেখলাম মাসে ৩০০০ পাউন্ড মত হয়। তাঁর মধ্যে সব খরচ বাদ দিয়ে কত থাকে? ধরা যাক ৫০%, অর্থাৎ মাসে ১৫০০ পাউন্ড।
ওই টাকায় সংসার চলে?
দীপ বললো ওনার বৌ নাকি কোন Supermarket এ Till এ কাজ করেন, তাঁর আয় মাসে ১০০০ পাউন্ড।
দু’জনে মিলে দাঁড়ালো মাসে ২,৫০০ পাউণ্ড, বছরে ৩০,০০০ পাউণ্ড। এ দেশে এটা ভাল ভাবে থাকার জন্যে ভালোই আয়, বিশেষ করে বাড়ীর মর্টগেজ শেষ হয়ে গেলে। এই ভদ্রলোক অনেক দিন আগে Forestgate এ বাড়ী কিনেছেন, এঁর মর্টগেজ শেষ হয়ে যাবার কথা। ছেলে মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে।
১৯৬১-৬২ সালে বাবা কলকাতায় থাকাকালীন নিজের জীবনস্মৃতি লিখতে শুরু করেন। একটা ফুলস্ক্যাপ কাগজের বাঁধানো খাতায় অফিস থেকে ফিরে রাত্রের দিকে আমাদের মনোহরপুকুরের ঘরে আমার পড়ার টেবিলে বসে তিনি নিয়ম করে লিখতেন। কালো ফ্রেমের চশমা পরে তিনি মন দিয়ে লিখে চলেছেন, মাঝে মাঝে আমায় পড়িয়ে শোনাচ্ছেন কিছু মজার কাহিনী বা খেলাধূলার কথা, এই দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসে।
বইটির নাম তিনি দিয়েছিলেন “পূর্ব্বাচল”।
নিজের বাল্য, কৈশোর আর যৌবনের নানা ঘটনা তিনি এই স্মৃতিকথায় সযত্নে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এই স্মৃতিকথা তিনি লিখেছেন নিজের জীবনের উন্মেষের দিন গুলো থেকে শুরু করে যৌবনে তাঁর কলেজ জীবনের দিন পর্য্যন্ত। সময়ের ক্রম অনুসারে তিনি তাঁর লেখা পরিচ্ছেদে ভাগ করে গুছিয়ে সাজিয়েছেন, যা থেকে মনে হয় তাঁর এই স্মৃতিকথা তিনি বই হিসেবে ছাপানোর কথা ভেবেছিলেন, যদিও শেষ পর্য্যন্ত তাঁর জীবৎকালে তা সম্ভব হয়নি। তবে ১৯৬৩ সালের শে্ষে বিশাখাপত্তনমে বদলী হবার আগে তিনি লেখাটা শেষ করেছিলেন।
বাবা পূর্বাচল শুরু করেছেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটি লাইন দিয়ে।
“পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়, পথের দু’পাশে আছে মোর দেবালয়।”
অর্থাৎ তাঁর কাছে গন্তব্য নয়, জীবনের যাত্রাটাই আসল, এবং সেই যাত্রায় তিনি যাঁদের কাছে পেয়েছেন, তাঁরাই তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছেন।
এই দুটি লাইনের মধ্যে বাবার সাহিত্যবোধ আর রবীন্দ্রনাথের লেখার সাথে পরিচিতি আর অনুরাগের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বাবার এই স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে তাঁর চারিপাশের যৌথ পরিবারের অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, এবং বন্ধুবান্ধব। বাবা পূর্ব্বাচল না লিখলে এঁদের মধ্যে অনেকেই চিরতরে আমাদের অপরিচিত থেকে যেতেন। আমাদের পূর্ব্বপুরুষদের জীবনের তথ্যভান্ডার হিসেবে পূর্ব্বাচল তাই আমাদের পরিবারের জন্যে একটি মহামূল্য সম্পদ।
ফেলে আসা জীবানের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় – কত ছোটখাটো এবং আপাত কিঞ্চিৎকর ঘটনা পরিণত বয়েসেও তাঁর স্মরণে ছিল ভাবলে অবাক হতে হয়। স্কুলের সহপাঠী বন্ধুর অচল আধুলি ভাঙিয়ে দেওয়া, পুকুরে সাঁতার শেখা, মিথ্যে কথা বলে বাবার কাছে বেতের বাড়ী খাওয়া, আড়িয়াল খাঁ নদীতে নৌকা ভেসে যাওয়া, ইত্যাদি এই সব গল্প তিনি আমাদের মুখে মুখেও অনেকবার শুনিয়েছেন। তাছাড়া পূর্ব্বাচলে আছে তাঁর খেলোয়াড় জীবনের অসংখ্য কাহিনী। এবং অবিভক্ত বাংলাদেশের কথা – ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, বাঁকুড়া, খুলনা, দিনাজপুর, রংপুর, রাজসাহী এই সব নানা শহর আর মফঃস্বল ছবির মত উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।
মাদারীপুর, ১৯১৯ সাল, আড়িয়াল খাঁ নদীতে বাবা ও ভজা জ্যেঠুর কান্ডকারখানা
২
বিশাখাপত্তনমে যাবার আগে সেই বাঁধানো খাতাটি তিনি মা’র কছে রেখে যান্। সেই পান্ডুলিপি পড়লে পাঠক হিসেবে যে কথাটি প্রথমেই মনে হয় তা হলো যে রুল টানা খাতায় পাতার পর পাতা লেখা হয়েছে, সেই লেখার ভাষা ঝরঝরে, হাতের লেখা চমৎকার, আর সারা পান্ডুলিপি তে একটাও কাটাকুটি নেই। মনে হবে হয়তো আগে ড্রাফট লিখে কাটাকুটি করে পরে আবার পরিস্কার করে লেখা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি বাবা একবারেই পুরো লেখাটা লিখেছিলেন, সমস্ত লেখাটাই তাঁর মনের মধ্যে ছবির মত ধরা ছিল।
আমার কাছে এ এক অসামান্য ক্ষমতা।
অবশ্য আমরা জানি যে সাহিত্যে বাবার ঝোঁক ছিল। ইংরেজী ও বাংলা দুই ভাষাতেই তাঁর অনায়াস দক্ষতা ছিল। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা নিয়মিত পড়তেন। বাবার লেখা নানা ছোটগল্প ও কবিতা ত্রিশ দশকে পূর্বাশা ও শনিবারের চিঠি এবং অন্যান্য নামী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া কলেজ জীবন থেকেই তাঁর বাংলায় আর ইংরেজী দুই ভাষাতেই দিনলিপি লেখার অভ্যেস ছিল। তাছাড়া জীবনের অনেকটা সমইয় কাজে কলকাতা থেকে বাইরে থাকার জন্যে তিনি নিয়মিত আমাদের পোস্টকার্ড বা ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি লিখতেন। আমার কাছে এখনো তাঁর অনেক ডায়েরী আর চিঠি জমানো আছে।
পূর্বাচল বইটি তাঁর এই লেখার অভ্যসের ফলশ্রুতি।
বিশাখাপত্তনমে বাবার শরীর ক্রমশঃ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রমোশন পেয়ে মাদ্রাজে Customs Collector হিসেবে কাজে যোগ দেন, এবং সেখানে অল্প কিছুদিন পরে তাঁর শরীরে দুরারোগ্য ক্যান্সার (মাইলোমা) ধরা পড়ে। তাঁকে চিকিৎসার জন্যে কলকাতায় আনানো হয়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
১৯৬৫ সালের ২৮শে জুলাই তিনি মাত্র ৫৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।
মা’কে বই উপহার আমাকে চিঠিতে কবিতায় উপদেশ
পূর্ব্বাচল শেষ পর্য্যন্ত ছাপা হয় প্রায় কুড়ি বছর পরে ১৯৮১ সালে। বেঁচে থাকলে বাবার তখন বয়েস হতো সত্তর বছর।
IIT খড়্গপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে আমি ১৯৭১ সালে কলকাতায় IBM এ কাজে যোগ দিই। কিন্তু সেখানে দশ বছর কাজ করার পরে দেশে ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ নিয়ে ভারত সরকারের সাথে বনিবনা না হওয়ায় IBM দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। তার ফলে আমার এবং আমার সহকর্ম্মী দের সবার চাকরী চলে যায়। আমরা সকলে নতুন কাজ খুঁজতে শুরু করি।
১৯৮১ সালে আমার কুয়েতে একটা নতুন কাজে যোগ দেবার সুযোগ আসে।
দেশ ছেড়ে যাবার সময় আমার গাড়ীটা বিক্রী করে আমি কিছু টাকা পাইএবং সেই টাকার কিছুটা অংশ দিয়ে আমি পূর্ব্বাচল ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিই।
বিখ্যাত কবি তারাপদ দা’ (রায়) হলেন বাবাদের আপন পিসতুতো ভাই এর ছেলে। সেই সুবাদে তখন আমার সাথে তাঁর বেশ ভাল আলাপ। মাঝে মাঝেই তাঁর পন্ডিতিয়া রোডের বাড়ীতে গিয়ে আমি আর সুভদ্রা তাঁর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে আসি। তিনি তখন “কয়েকজন” নামে একটি লিটল্ ম্যাগাজিন ছাপান, কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে কলেজ স্ট্রীটের পাবলিশারদের সাথে তাঁর অনেক জানাশোনা।
তারাপদ দা’ কে পূর্ব্বাচল ছাপানোর কথা বলাতে তিনি আমায় নিয়ে একদিন কলেজ স্ট্রীটে অধুনা নামে একটি প্রেসের মালিকের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। আমি পূর্বাচলের পান্ডুলিপি – সেই বাঁধানো খাতাটা – ওনাকে দেখানোর জন্যে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুদিনের মধ্যেই কুয়েত চলে যাবো, তাই সেদিনই টাকপায়সা, প্রুফ দেখা, কত কপি ছাপা হবে, কত দিন লাগবে এই সব কথা হলো। আমি খোকনকে সেদিন সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি কুয়েত চলে যাবার পরে সে আর সুভদ্রা অধুনা প্রেসের মালিকের সাথে যোগাযোগ রাখতো।
তারপরে তো আমি কুয়েত চলে গেলাম।
সুভদ্রা বইটার প্রুফ দেখেছিল যত্ন করে তাই সারা বইতে ছাপার একটাও ভুল নেই। সেই কৃতিত্বের জন্যে অধুনা প্রেসের মালিক ও কর্ম্মচারীদেরও অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্য।
বই ছাপা হবার আগে কুয়েত থেকেই আমি একটা মুখবন্ধ লিখে পাঠিয়েছিলাম। তাছাড়া সুভদ্রাকে বলেছিলাম বই ছাপার আগে একটা draft copy তারাপদ দা’কে দেখাতে এবং তাকে পিছনের পাতায় একটা ব্লার্ব লিখে দিতে অনুরোধ করতে।
বইটি নিয়ে ছোট একটা ব্লার্ব লেখার শেষে তিনি লিখেছিলেনঃ
“এরকম দুঃখহীন, ঈর্ষাহীন স্মরণমালা কেবল একজন খেলোয়াড়ের পক্ষেই লেখা সম্ভব।”
বইটির সামনের কভারে তারাপদ দা’র পরামর্শে পান্ডুলিপির এক পাতার ছবি রাখা হলো। বাবার হাতের লেখা খুব ভাল ছিল, যদিও এক ফুটবল ম্যাচে একবার হেড করতে গিয়ে পড়ে তাঁর ডান হাতের কব্জির হাড় জখম হয়। তার পর থেকে লেখার সময় তিনি বুড়ো আঙুল ব্যবহার করতে কষ্ট পেতেন, কলমটা আলতো করে ধরে লিখতে হতো।
পিছনের কভারে ছাপা হলো বাবার একটি ছবি আর তারাপদ দা’র লেখা সেই ব্লার্ব।
বোধ হ্য় ২০০ মতো কপি ছাপা হয়েছিল। কুয়েত থেকে ছুটিতে কলকাতায় ফিরে আমি দেখি সব বই আমাদের ঘরে খাটের তলায় দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে, আর মা তাই নিয়ে রাগে অগ্নিশর্মা।
যতোটা সম্ভব আমি আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বইগুলো বিলিয়ে দিয়েছিলাম।
একবার উত্তরপাড়ায় মাধবকাকার বাড়ীতে গিয়ে ওঁদের বই এর আলমারীতে পূর্ব্বাচলের এক কপি সযত্নে রাখা আছে দেখে খুব ভাল লেগেছিল। কিছুদিন আগে সোনু লিখেছে পাটনা কালীবাড়ীতেও নাকি এক কপি পূর্ব্বাচল রাখা আছে সে দেখেছে। হয়তো বড়জ্যেঠু বা রাঙাকাকা রেখে থাকবেন। অন্যান্য অনেক আত্মীয় স্বজনের কাছে বইটি এখনো রাখা আছে হয়তো।
তবু বেশ কিছু বই খাটের তলায় থেকেই যায়। মানোহরপুকুরের বাড়ী বিক্রী হবার আগেই মা উইয়ে খাওয়া বইগুলো জঞ্জাল মনে করে ফেলে দিয়েছিলেন। আমার কাছে এখনো দুই কপি পূর্ব্বাচল পড়ে আছে। দুটো বইয়ের অবস্থাই ভাল নয়। মলাট খুলে এসেছে, পাতা উইয়ে কাটা, বাঁধনি ও আলগা।
এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, মা’ই ঠিক ছিলেন। পুরনো দিনের এই সব স্মৃতি, বিশেষ করে আমাদের মত একটি সাধারণ যৌথ পরিবারের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা কোন ইতিহাস তৈরীতে কাজে লাগবেনা, এবং আমাদের পরের প্রজন্মের কাছে তো জঞ্জালই মনে হবে।
সেটা কিছু আশ্চর্য্যের হবেনা, কেননা আগেকার সেই যৌথ পরিবার তো ভেঙে গেছে, পরিবারের আমরা ভাইবোনেরা সবাই ক্রমশঃ দূরে চলে গিয়ে নিজের মত সংসার তৈরী করে নিয়েছি।
কবি লিখেছেন “জীর্ণ পুরাতন যাক্ ভেসে যাক্!”
তবু বার্ধক্যে পৌঁছে আমরা সবাই ফিরে যেতে চাই আমাদের ছোটবেলায়। অতীতের প্রতি আমাদের মনের এই আকর্ষন কেমন যেন অমোঘ মনে হয়। আমার বাবাও হয়তো কিছুটা সেই তাগিদেই তাঁর বাল্যের স্মৃতিকথা তাঁর উত্তরসূরীদের জন্যে লিখে রেখে গেছেন। ১৯৬১-৬২ সালে তিনি যখন পূর্ব্বাচল লেখেন তখন তিনি জানতেন না যে আর মাত্র তিন বছর পরে তিনি পরলোকগমন করবেন। আমাদের সৌভাগ্য যে তিনি যত্ন করে লেখাটি যাবার আগে শেষ করে গেছেন।
তাঁর এই লেখাটির জন্যে পরিবারের সকলের হয়ে তাঁকে আমাদের অন্তরের কৃতজ্ঞতা ও প্রণাম জানাই।
সত্যি কথা বলতে কি এবার লন্ডনে আসার খুব একটা ইচ্ছে আমার ছিলনা। প্রায় দুই বছর কোভিডের সংক্রমণ থেকে খুব সাবধানে নিজেকে বাঁচিয়ে পূর্ণদাস রোডের বাড়ীতে আমি আর সুভদ্রা সকাল থেকে রাত পর্য্যন্ত একটা নিয়মিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সুতরাং মনের মধ্যে একটা স্থবিরতা শিকড় গেড়ে জমিয়ে বসেছিল।
নিউটনের ভাষায় যাকে বলে ইনার্শিয়া অফ রেস্ট।
এখনো সংক্রমণ কমার কোন চিহ্ন নেই, এদেশেও নয়, লন্ডনেও নয়। তাহলে এখন ওখানে গিয়ে আমাদের কিছু হলে মেয়ে জামাই নাতনীদের জন্যে সেটা কি খুব ভাল হবে? মেয়েরা জোর করাতে শেষ পর্য্যন্ত অবশ্য রাজী হতেই হলো। এখন আমাদের জীবনের সব সিদ্ধান্ত ওদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি।
যাবার আগে অনেক হ্যাপা। RTPCR test, Travel insurance এর জন্যে medical test, টিকিট কাটা। Vaccine certificate, Subidha form এবং আরও নানারকম কাগজপত্র তৈরী করা। কোন ভুল হলেই প্লেনে উঠতে দেবেনা।
পুপু সাথে থাকায় খুব সুবিধে হয়েছিল অবশ্যই। এয়ারপোর্টে আর প্লেনে সমস্ত কাগজপত্র দেখানোর কাজ ওই একা সামলেছে, তার ওপরে আমাদের দু’জনের দেখাশোনা, মালপত্র সামলানো।
তবু প্লেনে ওঠার পর হঠাৎ শরীর টা বেশ খারাপ লাগতে শুরু করলো। মাথাটা বেশ শূন্য শূণ্য লাগছিল, তাছাড়া প্রচন্ড শারীরিক অস্থিরতা, অক্ষিদে। সুন্দরী বিমানসেবিকাদের দেওয়া শ্যাম্পেন ছুঁলামনা, এবং সারা দিন কিছু মুখেও দিইনি। গত ক’দিনের এত টেনশন বোধহয় শরীর আর নিতে পারেনি।
যাই হোক, এখানে এসে দশ দিন বাড়ীতে কোয়ারান্টাইনে কাটানোর পর ওমিপ্রাজোল এর একটা কোর্স খেয়ে কিছুটা সামলালেও অক্ষিদে আর গ্যাসটা যাচ্ছিলোনা কিছুতেই। তার ওপর এখানে এসে খাবার দাবারের অনেকটা পরিবর্ত্তন হয়েছে, রোজ ভাত ডাল রুটি তরকারী এখানে কে রান্না করবে? কিন্তু দিনের পর দিন পাস্তা,স্যান্ডউইচ আর ফ্রেঞ্চ টোস্ট খেয়েই বা আর কত দিন থাকা যায়?
পুপু কাজে, একদিন বিকেলে আমি একাই বাড়ীর কাছে Ocean ফার্মেসী তে গিয়ে কাউন্টারের এক বয়স্ক ভদ্রমহিলার কাছে antacid tablet চাইলাম।
তিনি বেশ আন্তরিক ভাবে জিজ্ঞেস করলেন আমার কি হয়েছে?
এ আবার কি প্রশ্ন? Antacid তো over the counter drug, প্রেসক্রিপশনের তো প্রয়োজন নেই? তাহলে এত কৌতুহল কেন? একটু বিরক্ত বোধ করলেও একে নতুন জায়গা তার ওপরে ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক, তাই বলতেই হলো বদহজম, পেটে একটা ঘিনঘিনে ব্যথা। এই সব কথা বাংলায় যত সহজে বোঝানো যায়, ইংরেজীতে কাজটা তত সহজ নয়।
যাই হোক, কোনমতে বোঝানো তো গেল।
ভদ্রমহিলা আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব উদবেগের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কোন জি পির সাথে পরামর্শ করেছেন?
আমি অল্প হেসে বললাম হ্যাঁ আমার মেয়ে একজন জি পি, তাকে জানিয়েছি।
তিনি র্যাক থেকে আমার জন্যে রেনী ট্যাবলেটের প্যাকেট দিয়ে বললেন “জি পির সাথে পরামর্শ করতে কিন্তু কোনমতেই ভুলবেন না~”
আমি ভদ্রভাবে একটু হাসলাম। বার বার এক কথা বলার কি দরকার? একটু বাড়াবাড়ি মনে হলো।
তারপরে টাকা নিয়ে ক্যাশ মেশিন থেকে রিসিট বের করার সময় মহিলা কিছুটা করুণ গলায় আমায় বললেন, “আমার স্বামীরও এরকম রিফ্লাক্স আর পেটে ব্যথা হত। কিন্তু তিনি অনেক বলা সত্ত্বেও কোনদিন জিপির কাছে যাননি। শেষ পর্য্যন্ত তিনি মারা গেলেন!”
“হে ভগবান,” সমবেদনায় গলা কিছুটা ভারী হয়ে এলো আমার। “কি হয়েছিল ওনার? পেটে আলসার?”
ভদ্রমহিলা বললেন, “না ওনার হার্টের সমস্যা ছিল, জি পি র কাছে গেলে ধরা পড়তো। কিন্তু গেলেন না কিছুতেই। আপনি কিন্তু গিয়ে একবার পরীক্ষা করিয়ে নেবেন।“
ওষূধের প্যাকেট আর টাকার চেঞ্জ টা নিয়ে বেরিয়ে আসছি, দরজার কাছে পিছন থেকে ভদ্রমহিলা আবার কিছুটা অনুনয়ের গালায় বলে উঠলেন, “Promise me you will go and see a GP”!
ফার্মেসীতে গিয়ে ওষুধ কেনার সময় এরকম আন্তরিক সমবেদনা তো পাইনি কোনদিন, তাই সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা আজও ভুলতে পারিনি। বাড়ী ফেরার পথে কেমন যেন একটু আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম, সে কথা মনে পড়ে।
লন্ডনে আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে গ্রীনিচ (Greenwich) জায়গাটা খুব বেশী দূরে নয়। লন্ডনে এলে এখনো দুই একবার গ্রীনিচে যাই, কেননা জায়গাটা বড় সুন্দর, খোলা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, প্রচুর বড় বড় গাছ সেখানে ছড়িয়ে আছে। আর আছে ফুলের বাগান সেখানে ছোট লেকে সাদা হাঁসেরা ভেসে বেড়ায়। তাছাড়া আছে কফি শপ, রেস্টুরেন্ট।
গ্রীনিচ অবশ্যই গ্রীনিচ মীন টাইম এর জন্যে বিখ্যাত, এখান দিয়েই চলে গেছে মেরিডিয়ান লাইন (zero ডিগ্রী longitude )। কিন্তু সেখানে Time keeping আর Astronomy সম্পর্কিত আরও অনেক প্রাচীন এবং বৈজ্ঞানিক আকর্ষণ আছে বিশেষ করে Royal Astronomical Observatory , Naval Museum, Planetarium, Cutty Sark, ইত্যাদি। সেগুলো আছে একটা টিলার ওপরে অনেকটা জায়গা নিয়ে। তার মধ্যে একটা বিশাল চত্বর, সেখানে মেরিডিয়ান লাইন আঁকা আর সেই লাইনের দুই পাশে নানা শহরের নাম (আর তাদের longitude ডিগ্রী – কতটা পূবে আর কতটা পশ্চিমে)।
গ্রীনিচে একটা hilltop viewing point আছে, যেখানে দাঁড়ালে দূরে নীচে দেখা যায় লন্ডন শহরের স্কাইলাইন, এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া টেম্স্ নদী আর তার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া Emirates রোপওয়ে আর তার পাশে O2 Mall এর বিশাল তাঁবুর মত সাদা hemispheric ছাউনী।
টিলার ওপর থেকে নীচে গ্রীনিচ শহরে যাবার রাস্তা আর সিঁড়ি নেমে গেছে। নীচে একটা বড় flea market বসে, তাছাড়া শহর টা বেশ ছবির মত নিরিবিলি আর সুন্দর। সেখানেও মাঝে মাঝে যাওয়া হয়।
গ্রীনিচ একদিনের ফ্যামিলি পিকনিকের পক্ষে আদর্শ জায়গা।
The Meridian Line
গ্রীনিচ এর ছবি
এই গল্পটা অবশ্য গ্রীনিচ বরোতে O2 মল নিয়ে। সেটা Observatory আর Museum থেকে কিছুটা দূরে।
O2 নামে এই দেশে একটা মোবাইল টেলিফোন নেটওয়ার্ক কোম্পানী আছে, এই মলটা তাদের নামে তৈরী। সেই মলের তাঁবুর মত hemispheric ছাউনীতে সিঁড়ি বেয়ে অনেক লোক ওপরে চলে যায়, নীচ থেকে তাদের দেখতে বেশ পিঁপড়ের মত লাগে। কম বয়েস হলে আমিও অনায়াসে ওপরে দৌড়ে উঠে যেতাম, কিন্তু এখন বয়েসটা বাদ সাধে।
O2 Mall এ অনেক কোম্পানীর ফ্যাকটরী আউটলেট আছে, যেখানে জামাকাপড় জুতো ইত্যাদি অনেক জিনিষপত্রের দাম অবিশ্বাস্য কম, এবার একদিন আমরা সস্তায় কেনাকাটা করার জন্যে সেখানে গিয়েছিলাম।
O2 mall এ গাড়ীতে গেলে নদী পার হবার জন্যে Blackwell Tunnel আছে, আর টিউবে গেলে জুবিলী লাইনে North Greenwich স্টেশনে নেমে নদীর ওপরে Emirates রোপওয়ে ধরে চলে যাওয়া যায়। রোপওয়ে তে আগে চড়া হয়েছে, এবার তাই নদীর নীচে টানেল পেরিয়ে গাড়ীতেই যাওয়া হলো।
কেনাকাটা সারা হলে মলের ভিতরে একটা ইটালিয়ায়ন রেস্টুরেন্ট – Frankie and Benny’s- এ খেতে ঢুকলাম আমরা। সেটা ছিল ২০২১ সাল, কোভিড এর জন্যে দোকান সব খোলা হলেও মল বেশ ফাঁকা, রেস্টুরেন্টও খালি।
আমাদের ওয়েটার ছেলেটি খুব প্রিয়দর্শন। ফর্সা, একমাথা কালো চুল, একটু গাবদু চেহারা হলেও তার চলাফেরায় বেশ একটা ক্ষিপ্র, চটপটে ভাব আছে। পরনে সাদা সার্টের ওপরে লাল রং এর একটা apron, কোম্পানীর ইউনিফর্ম হবে, ফর্সা রং এর সাথে তা দিব্বি মানিয়েছে। ছেলেটি বেশ হাসিখুসী, কথাবার্ত্তা বেশ ভদ্র, আর ইংরেজী ভাল বললেও তার কথাবার্তায় সেরকম কোন ব্রিটিশ accent নেই, চেহারা দেখে ইউরোপের কোন দেশের বলে মনে হয়। স্পেন বা ইটালী?
যাই হোক, খাবার অর্ডার দিয়ে আমরা নানা গল্প করে যাচ্ছি, ছেলেটি সব খাবার এক এক করে নিয়ে এসে নিখুঁত ভাবে আমাদের টেবিলে পরিবেশন করে গেলো।
তারপর হঠাৎ আমাদের অবাক করে সে বললো, “Please don’t mind my asking, but are you speaking in Bengali?”
অ্যাঁ , বলে কি?
একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে সে ইংরেজীতে বললো, “তোমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলে তো তাই শুনে মনে হলো~”
তুমি বাংলা জানো? ইংরেজীতেই জিজ্ঞেস করলাম আমি।
এবার সে একগাল হেসে বললো “একটু একটু!”
তারপরে তো অনেক গল্প হলো তার সাথে। ইংরেজীতেই।
সে নাকি কলকাতায় ও গিয়েছে বেশ কয়েকবার তার মামার কাছে। মামা ছিলেন তার মা’র আপন দাদা, বোন আর ভাগ্নে কে তিনি খুব ভালবাসতেন। তিনি ভাল বেহালা বাজাতেন, মুম্বাই থেকে কলকাতায় বেহালা বাজাতে কয়েকবার গিয়ে কলকাতা তাঁর এত ভাল লেগে যায় যে তিনি শেষ পর্য্যন্ত সেখানে থেকে যান। তোমরা হয়তো তাঁর নাম শুনেও থাকতে পারো।
ভি জি জোগের নাম জানবোনা? আমি তো হৈ হৈ করে উঠলাম। ওনার মত এত বড় শিল্পী, পদ্মভূষণ, সঙ্গীত নাটক আকাদেমী ইত্যাদি কত খেতাব আর পুরস্কার পেয়েছেন, তার ওপরে কলকাতার সাথে তাঁর গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক তো সবাই জানে। কলকাতা আর বাঙালী কে ভালবাসার সূত্রে তিনি তো আমাদেরও আত্মীয়।
ছেলেটির সাথে তারপর বেশ কিছুক্ষণ আলাপ জমে গেল আমাদের। ওর মা থাকেন পুণাতে। মারা যাবার আগে পর্য্যন্ত বোনের কাছে মামা আসতেন মাঝে মাঝে, মুম্বাই তে কাজে এলেই। ও নিজে কোন গান বাজনা জানেনা, তবে লতা মাসী আর আশা মাসীর গান ওর খুব ভালো লাগে, ওঁরা ওদের পুণার বাড়ীতে প্রায়ই আসতেন ওর ছোটবেলায়।
নদীর ধারে কাছেই গ্রীনিচের এক এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সে একাই থাকে। তবে একা হলেও লন্ডনে তার থাকতে ভালোই লাগছে, কয়েক বছর হলো তার মা আর বাবাও গত হয়েছেন, তাই দেশে ফেরার টান তার আর নেই।
বিল মিটিয়ে ছেলেটিকে অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম।।
লন্ডনের সাথে কলকাতার এই আশ্চর্য্য যোগাযোগের জন্যে গ্রীনিচের সেই দুপুরটার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
১৯৯৭ সালে আমি কুয়েতে বি সি এসের সভাপতি হয়েছিলাম। তার আগে আমি কোনদিন বি সি এসের কোন কমিটি তে আসিনি, গায়ে ফুঁ লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। একেবারে প্রথমেই এক লাফে সভাপতি! মানে আনকোরা নতুন, এবং আনাড়ী – ইংরেজীতে যাকে বলে rookie । অবশ্য আমার কমিটিতে সহ সভাপতি রঞ্জন গুহ রায়, সেক্রেটারী তপন ঘোষ এবং অন্যান্য সবাই বেশ অভিজ্ঞ, এবং কাজে পোক্ত। আমার পক্ষে সেটা একটা বাঁচোয়া ছিল।
আর হবি তো হ’, সেই বছরটা (১৯৯৭) ছিল দারুণ ঘটনাবহুল – আমাদের দেশের স্বাধীনতার স্বর্ণজয়ন্তী র উদযাপন উৎসবের বছর, তাছাড়া সে বছর নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জন্মশতবার্ষিকী। কুয়েতে বিসি এসের নাম উজ্জ্বল করতে গেলে এ বছর দারুণ কিছু তো একটা কিছু করতে হবে?
কিন্তু কি করা যায়?
কুয়েতে বি সি এসের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের উৎকর্ষতা নিয়ে খুব সুনাম। আমাদের member দের মধ্যে অনেক talent, কিন্তু আমাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তাই বছরে আমরা একটা স্যুভেনির ছাপাই, এবং তাতে যে বিজ্ঞাপন পাই তার টাকা এবং সদস্যদের চাঁদা এই নিয়ে বছরে আমাদের ৪০০০ দিনার মত আয় হয়। টাকাটা খুব একটা কম নয়, তা দিয়ে বছরে আমরা কিছু বাঁধাধরা অনুষ্ঠান করি। তার মধ্যে একটা পূর্ণাঙ্গ নাটক, একটা রবীন্দ্রনাথের গান বা নৃত্যনাট্য, একটা ছোটদের অনুষ্ঠান। তাছাড়া পিকনিক, আর বিজয়া সন্মিলনী। এতেই আমাদের সব টাকা খরচ হয়ে যায়, যার মধ্যে খাওয়া দাওয়া হলো একটা বড় খরচ, অন্ততঃ ৬০%। পরের কমিটি কে দিয়ে যাবার মত খুব অল্প টাকাই অবশিষ্ট থাকে।
সভাপতি হবার পর এই সব দেখে শুনে আমি প্রথমেই অনুভব করেছিলাম যে কলকাতার সাংষ্কৃতিক জগতের সাথে আমাদের যোগাযোগ তৈরী করতে গেলে অর্থাৎ দেশ থেকে নামী শিল্পীদের কুয়েতে এনে তাদের দিয়ে জমকালো কিছু অনুষ্ঠান করার জন্যে যে পরিমাণ অর্থ আমাদের দরকার, তা যোগাড় করতে গেলে Sponsored program করা ছাড়া গতি নেই।
প্রধানতঃ সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz ১৯৯৭ থেকেই আমরা শুরু করি।
বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz ১৯৯৭ অনুষ্ঠান করে আমাদের তহবিলে যে উ্দবৃত্ত অর্থ জমেছিল, তাই দিয়ে আমরা সে বছর প্রমিতা মল্লিক আর সুগত বসুকে কুয়েতে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম।
প্রমিতা “দেশমাতৃকা” নামে একটি চমৎকার দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠান আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। সুগত (নেতাজী সুভাষের ভ্রাতুস্পুত্র শিশির কুমার বসুর ছেলে) প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ও স্কলার, তিনি আমাদের নেতাজীর জীবন এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান নিয়ে একটি অনবদ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ লেকচার দিয়েছিলেন, পরে তাঁর সাথে আমাদের একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব ও আলোচনাও হয়। সেই অনুষ্ঠানের নাম আমরা দিয়েছিলাম “লহ প্রণাম!”
সুখের এবং গর্ব্বের কথা যে সেই sponsored অনুষ্ঠানের ট্র্যাডিশন বি সি এসে এখনও চলেছে। তার পর থেকে কুয়েতে প্রায় প্রতি বছর দেশ থেকে আমরা নিয়ে এসেছি নানা নামী দামী শিল্পী, সঙ্গীত এবং নাটকের দলকে। সেই সাথে কুয়েতে উচ্চমানের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে বি সি এসের সুনাম ক্রমশঃ বেড়েছে।
Sponsored program না করলে এসব সম্ভব হতোনা।
কিন্তু নতুন কিছু করতে গেলে কিছু প্রশ্ন, কিছু অভিযোগ তো আসবেই।
আমাদের অনেক সদস্যদের কাছ থেকে তখন শুনতে হয়েছিল আমরা নাকি বি সি এস কে “commercialise” করছি। ভাবটা যেন কি দরকার আমাদের অতো টাকার? আমরা হলাম একটি Non-Profit association আমাদের তো যা পাচ্ছি তাই নিয়েই দিব্বি চলে যাচ্ছে! বেশী লাভের লোভ কি ভালো? ইত্যাদি। আবার এমন কি এ কথাও আমার কানে এলো যে লাভের বদলে সেই অনুষ্ঠান করলে যদি আর্থিক ক্ষতি হয়, কেউ কেউ বলছে তাহলে তার ভার কে নেবে?
বলা বাহুল্য এই সব অভিযোগ যারা করছিল তারা সংখ্যায় খুবই কম।
আমি তখন একটা GBM ডেকে সবাইকে বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz নিয়ে খুব উৎসাহব্যঞ্জক একটা presentation দিয়েছিলাম মনে আছে। তাতে উল্লেখ করেছিলাম ওই অনুষ্ঠান করলে কুয়েতের বৃহত্তর সমাজে আমাদের recognition – সুনাম এবং সন্মান – কতোটা বাড়বে। এও বলেছিলাম যে ওই অনুষ্ঠান করতে আর্থিক ক্ষতি হবার যদিও কোন সম্ভাবনাই নেই, তবু যদি তা হয়, তাহলে আমি এবং আমার কমিটির সব সদস্য সেই ক্ষতি মিটিয়ে দেবো।
সবার সন্মতি পাবার পর আমরা হৈ হৈ করে স্পনসরের খোঁজে নেমে পড়েছিলাম।
সেবার Pepsi আমাদের main sponsor হয়েছিল, আর তার সাথে co-sponsor হতে এগিয়ে এসেছিলেন অনেক ভারতীয় উদ্যোগপতিরা। তাদের মধ্যে ছিলেন Caesars এর মিস্টার লরে্নস, Mailem এর মিস্টার লাম্বা, Toyotar মিস্টার সানি ম্যাথিউস, KITCO র ধীরাজ ওবেরয়। এ ছাড়াও আমাদের সাহায্য করতে হাত বাড়িয়েছিল অনেকে ভারতীয় কোম্পানী- Book sellers, Travel agents, Jewellers, Restaurants এবং আরও অনেকে। আমাদের মেম্বাররা সবাই এগিয়ে এসে সাহায্য করেছিল এই সব স্পনসর যোগাড় করতে।
শ’খানেক কিংবা আরো বেশী স্পনসর পেয়েছিলাম আমরা সেবার।
কি যে আশাতীত সাড়া পেয়েছিলাম আমরা সবার কাছ থেকে সেই প্রথম বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz অনুষ্ঠানে এখনো ভাবলে বেশ একটা গর্ব আর আনন্দের অনুভূতি হয়। ইংরেজীতে যাকে বলে pride and joy..
যাই হোক, সেই বোর্ণ ভিটা Quiz এর অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যেই আমি বি সি এসের একটা লোগো design করার পরিকল্পনা করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে অনেক ভারতীয় এবং বিদেশীরা আমাদের অতিথি হয়ে আসবেন, তাঁদের মনে আমাদের সম্বন্ধে একটা ভাল impression তৈরী করার জন্যে বি সি এসের নিজস্ব একটা Brand Identity দরকার বলে আমার মনে হয়েছিল।
তাই সেবার গরমের ছুটিতে কলকাতায় গিয়ে একটা Design Consultant কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমায় তিনটে লোগো ডিজাইন করে দেয়। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। পঞ্চাশ দিনার মতো।
কুয়েতে ফিরে এসে একটা GBM এ আমরা মেম্বার দের কাছে সেই তিনটে লোগোর মধ্যে কোনটা সবাই চায় তাই নিয়ে একটা ভোট করালাম। আশি শতাংশর বেশী ভোট পড়েছিল আমাদের এখনকার লোগো ডিজাইনে।
যাকে বলে Hands down winner!
বোর্ণ ভিটা Quiz এর অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে আমরা প্রত্যেক পোস্টার, প্রত্যেক বিজ্ঞাপন প্রত্যেক চিঠি এবং আমাদের অন্যান্য সব official কাগজপত্রে ওই লোগো ব্যবহার করা শুরু করি।
সেই প্রথম Inter-school Quiz এর ফাইনালে প্রতিযোগী ছাত্র ছাত্রীদের জন্যে ছয়টা সাদা রং এর কাঠের টেবিল তৈরী করা হয়েছিল। সাথে ছিল buzzer আর সেটা টিপলে জ্বলে ওঠা আলো। স্টেজে সেই সাদা টেবিলগুলোর প্রত্যেকটার সামনে বি সি এসের লোগো জ্বলজ্বল করতে দেখে কি যে ভাল লেগেছিল! সেদিন অন্যান্য Community থেকে নানা স্কুলের ছাত্র ছাত্রী দের সাথে তাদের মা বাবারা এসেছিলেন, হল ভর্ত্তি লোক, তাদের মনের মধ্যে Quiz program এর quality র সাথে এই লোগোর মধ্যে দিয়ে বি সি এস সম্বন্ধে সবারএকটা ভাল impression হয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সেই থেকে এই লোগো যেখানেই দেখি মনে বেশ একটা আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। ভাবতে ভাল লাগে যে আমি যখন কুয়েতে থাকবোনা, তখন এই লোগো থাকবে আমার legacy হয়ে।
মনোহরপুকুরের বাড়ীতে ছোটবেলার একটা সন্ধ্যার কথা খুব মনে পড়ে।
বড় বারান্দায় সিঁড়ির কাছে আমাদের ধোপা এক বিরাট বান্ডিল কাপড় জামা নিয়ে এসে বসেছে, মা জ্যেঠিমা কাকীমারা তার সাথে কাপড়ের হিসেব করছেন, এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে ছোটকাকা উঠে এলেন। বারান্দায় উঠে আসতেই চার বৌদি ঘিরে ধরলেন তাঁকে।
“অশোক, আজ নাইট শো তে আমাদের হারানো সুর দেখাতে নিয়ে চলো।”
ছোটকাকার তখনো বিয়ে হয়নি, তিনি বৌদিদের একমাত্র অবিবাহিত দ্যাওর। আর খুব pampered..
ছোটকাকার বরাবরই একটু মজা করার অভ্যেস, আর প্রতি কথার শেষে অ্যাঁ? বলা তার একটা মুদ্রাদোষ ছিল। হীরকের রাজা যেমন “ঠিক কি না?” বলতেন, অনেকটা সেরকম।
ছোটকাকা সেদিন গম্ভীর আর উদাস মুখ করে বলেছিলেন, “যে সুর হারিয়ে গেছে তাকে আর দেখতে গিয়ে কি হবে, অ্যাঁ?”
এখন জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে সেই জীবনের নানা হারানো সুর হঠাৎ আচমকা ফিরে আসে।
যেমন গতকাল ছিল বিশ্বকর্ম্মা পূজো।
ছোটবেলায় বিশ্বকর্ম্মা পূজো আমাদের জন্যে ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর season এর শেষ দিন। তার আগের দিন গুলো ঘুড়ি ওড়ালেও ওই দিনটা বলতে গেলে ছিল ঘুড়ি উৎসব এর দিন। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত “ভোকাট্টা”…
বাবলু আর আমি আমাদের বাড়ীর ছাত থেকে খুব ঘুড়ি উড়িয়েছি একসময়।
মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীর ছাদে আমরা বেশ কিছুদিন আগে থেকে ওই দিনটার জন্যে prepare করতাম। সুতো লাটাই ঘুড়ি কেনা হতো সতীশ মুখার্জ্জী রোডে “মাণিক লাল দত্তের” দোকান থেকে। সিকি তেল, আধ তেল, এক তেল। কত রকম ঘুড়ির design ছিল তখন, আর তাদের কতরকম নাম ছিল – ঘয়েলা, ময়ূরপঙ্খী, মোমবাতি, চৌরঙ্গী…তারপরে সেই ঘুড়িতে ব্যালান্স করে সুতোর কার্ণিক লাগানো ছিল একটা কঠিন কাজ।
আর মাঞ্জা দেবার জন্যে কিনতাম এরারুট, কাঁচগুড়ো আর রং। এক ছুটির দিন দুপুরে আমি আর বাবলু ছাদে সুতোয় মাঞ্জা দিতাম। সাদা সুতো কিনে মাঞ্জা দেওয়া হতো ছাতে। অ্যারারুট, কাঁচগুড়ো আর রং জল মিশিয়ে মন্ড তৈরী করে সুতোর ওপরে কয়েকবার লাগাতে হতো, রোদ্দুরে শুকোবার পরে সুতোয় এমন ধার হত যে আঙুল কেটে যেতো অসাবধান হলেই।
বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন সকাল থেকেই আকাশ ভরে উঠতো লাল নীল ঘুড়িতে। প্যাঁচ খেলে কোন ঘুড়ি কে কাটলে চারিদিক থেকে উল্লসিত আওয়াজ উঠতো – ভোকা…আ…আ…ট্টা…। সেই আওয়াজ এখনো আমার কানে ভাসে। আর কারুর ঘুড়ি কাটতে পারলে যে মনের মধ্যে একটা গর্ব্ব আর আনন্দের অনুভূতি হতো সেটাও এখনো ভুলিনি।
বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন বাবলুর স্কুল ছুটি কিন্তু আমার মিশনারী স্কুলে ছুটি নেই। ইচ্ছে না থাকলেও আমায় স্কুলে যেতেই হতো। মা’কে বলে লাভ হতোনা। She was too strict…
বাবলু এদিকে সকাল থেকে ছাদে।
সেদিন স্কুলে লাস্ট পিরিয়ডটা যেন কাটতেই চাইতোনা। বিকেলে ছুটির ঘন্টা বাজলেই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটতাম মনে পড়ে। বাড়ী পৌঁছেই দুড্ডাড় করে ছাতে চলে যেতাম, তারপর সন্ধ্যা নামা পর্য্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো।
ঘুন্টু সেলিমপুরের বাড়ীতে উঠে যাবার পর প্রায় প্রতি বছর বিকেলে মনোহরপুকুরে ঘুড়ি ওড়াতে চলে আসতো। হাজরা মোড়ে সাধনদাদুর কারখানায় বেশ বড় করে বিশ্বকর্ম্মা পূজো হতো। আমি ঘুন্টু আর বাবলু সন্ধ্যাবেলা সেখানে গিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসতাম।
ঘুড়ি ওড়ানো এখন অনেকদিন বন্ধ, তবে এখন লকডাউনের এই ঘরবন্দী জীবনে রোজ সন্ধ্যায় আমাদের পূর্ণ দাস রোডের বাড়ীর ছাতে হাঁটার সময় ইদানীং মাথার ওপরে খোলা আকাশে শনশন আওয়াজ পাই, দেখি ঘুড়ি উড়ছে চারিদিকে। গতকাল বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন দেখলাম আকাশে অনেক ঘুড়ি, খুব প্যাঁচ লড়া চলছে, কয়েকটা ঘুড়ি কাটা পড়ে ভাসতে ভাসতে নীচে নেমে আসছে, একটা কাটা ঘুড়ি আমাদের ছাতে এসে পড়লো।
১৯৬৮ সালে খড়্গপুর থেকে ইঞ্জীনিয়ারিং পাশ করার পরে আমি রাণীগঞ্জে বেঙ্গল পেপার মিলে বছর খানেক কাজ করেছিলাম। সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চাকরী। তখন আমার বাইশ বছর বয়েস।
বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে ১৯৬৫ সালে, তখন আমার খড়গপুরে থার্ড ইয়ার। তাঁর দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে মা’র প্রায় সমস্ত সঞ্চয় নিঃশেষিত। জমি বিক্রী করে প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে ধার করে তিনি সেই খরচের ধাক্কা সামলেছেন। তার ওপরে ছিল আমার কলেজে টিউশন আর হোস্টেলে থাকার খরচ। মা আমায় এই খরচ নিয়ে কিছু বুঝতে না দিলেও আমাদের আর্থিক অবস্থা যে বেশ শোচনীয় তা বোঝার মত বয়েস আমার হয়েছিল।
তাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে একটা চাকরী পেয়ে উপার্জ্জন শুরু করে মা’র পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর ভার লাঘব করাই আমার তখন প্রধান কাজ। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের পিতৃহীন, বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে – ভাল চাকরী পাবার জন্যে আমার কোন খুঁটির জোর ছিলনা। কেবল ছিল আমার আই আই টি খড়্গপুর থেকে পাওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এর একটা ডিগ্রী।
তার ওপর চাকরী পাবার পক্ষে ১৯৬৮ সালটা খুব একটা অনুকূল ছিলনা।
১৯৬৬ সাল থেকে দেশের অর্থনীতি ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি সামলাতে টাকার মূল্য কমানো u হলো। এর মধ্যে ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টরা ভোটে জিতে বাংলা কংগ্রেস এর সাথে যুক্তফ্রণ্ট তৈরী করে ক্ষমতায় এসেছে। অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী, জ্যোতি বসু উপ মুখ্যমন্ত্রী।
বড় বড় সব কারখানা তে নানা দাবী দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। এক এক করে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার ওপরে নকশালবাড়ীতে কৃষক আন্দোলন নিয়ে মার্ক্সিস্ট কম্যুনিস্ট পার্টি দুই ভাগ হয়ে গেছে, মার্ক্সসিস্ট লেনিনিস্ট পার্টি নামে একটা নতুন রাজনৈতিক দল গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের পক্ষ নিয়ে চীনের মাও সে তুং এর সাংষ্কৃতিক বিপ্লবের আদর্শে কৃষিবিপ্লবের ডাক দিয়েছে। তার ওপর ভিয়েতনামের যুদ্ধ চলছে, আমেরিকার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে সবাই সোচ্চার।
কলকাতার রাস্তায় তখন এই ধরণের দেয়াল লিখন দেখা যায়।
“তোমার নাম, আমার নাম, ভিয়েতনাম”। “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান”। “বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।” ইত্যাদি। সারা দেশে একটা অশান্তি মারামারি খুনোখুনি আর নৈরাজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে ক্রমশঃ।
যাই হোক, এর মধ্যেই ইন্টারভিউ দিয়ে আমরা দুই ক্লাসমেট রমাপদ ত্রিপাঠী আর আমি চাকরী নিয়ে রাণীগঞ্জে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। মাইনে মাত্র তিনশো টাকা ছিল। তার মানে আমরা দুজনেই সেভাবে টাকার কথা ভাবিনি। ওই অশান্ত সময়ে একটা চাকরী পেয়ে কাজ শেখাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে কাজের অভিজ্ঞতাটা দরকার, মাইনে কম হতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতা অমূল্য।
আমরা দু’জনেই কিছু দিনের মধ্যে চাকরী ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই। সামান্য যা উপার্জ্জন করতাম সেটা বোধহয় নতুন কোন ভালো চাকরী খোঁজার পিছনেই খরচ হতো। তাছাড়া মাইনে থেকে কিছুটা হাত খরচ বাঁচতো, যেটা খড়গপুরে সেভাবে হাতে আসতোনা।
রাণীগঞ্জের সেই দিন গুলো বেশ ছিল। বয়েস্ও কম ছিল, যতদিন ছিলাম, খুব উপভোগ করেছি।
বেশ ভাল একটা ফ্ল্যাট পেয়েছিলাম, চার বেলা মেসে খাবারের ব্যবস্থাও ছিল। মিলের পাশেই দামোদর নদ, গরমে হাঁটু জল, নদীর ওপারে বাঁকুড়া জেলা, সেখান থেকে জলের মধ্যে দল বেঁধে হেঁটে শ্রমিকেরা কাজে আসে, বিকেলে বাড়ী যায়, সে এক সুন্দর দৃশ্য।
বেশ কিছু সমবয়েসী বন্ধূও জুটে গেছে, স্থানীয় ক্লাবে গিয়ে টেবিল টেনিস খেলি, ফুটবলও পেটাই মাঝে মাঝে। নদীর ধারে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে সেখানে ঘুরে ঘুরে বেলুন ফাটাই, জিলিপি খাই। ক্লাবের লনে টেনিস খেলি। অনেকে মিলে উইকেন্ডে রাণীগঞ্জ শহরে গিয়ে সিনেমা দেখি, আসানসোলে গিয়ে রেস্টুরেন্টে বিয়ার খাই। পূজোর পর দুর্গাপুরে জলসা শুনতে গিয়েছিলাম এক দিন বাসের মাথায় চড়ে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনবো বলে। তাছাড়া ছিল কাছের গ্রামে যাত্রাপালা, আমার সেই প্রথম যাত্রা দেখা।
মামা মামীমা থাকতেন আসানসোলে, কোর্ট রোডে মামার বিশাল বাংলো। সেখানে সুযোগ পেলেই চলে যেতাম। মামাতো মাসতুতো ভাই বোনদের সাথে খুব হুটোপাটি হতো। আম গাছে চড়তাম, তাছাড়া ছিল বারান্দায় বসে ক্যারম বা ব্যাডমিন্টন খেলা।
সব মিলিয়ে বেশ ছিল সেই রাণীগঞ্জের দিনগুলো আমার জন্যে।
২ নোপুর গ্রাম
বেঙ্গল পেপার মিলে আমি কাজ শুরু করলাম ওয়ার্কশপে, সেখানে মিলের নানা মেশিন যেমন পাম্প ইত্যাদি বিকল হইয়ে গেলে সারানোর জন্যে আসে। সেখানে লেদ মিলিং প্লেনিং ইত্যাদি নানা মেশিন, এবং বেশ কিছু ফিটার আর মেশিনিস্ট কাজ করে, এরা সবাই কাছাকাছি গ্রামের ছেলে। রমাপদ কজ পেলো পাওয়ার প্ল্যাণ্টে, তার কাজ টার্ব্বাইন নিয়ে।
আমাদের ওয়ার্কশপের ম্যানেজার চৌধুরী সাহেব বেশ মাইডিয়ার লোক। আর যারা সেখানে কাজ করে তাদের কাছ থেকে কত নতুন কিছু জানা যায়, যা আমি কলেজে শিখিনি। তাদের অনেকের সাথেই কয়েক মাসের মধ্যেই আমার বেশ ভাব হয়ে গেল। চৌধুরী সাহেবের ভাই মহাদেব চৌধুরী একজন সিনিয়র ফিটার, বয়স্ক এবং কাজের লোক, স্বাস্থ্যবান বলিষ্ঠ সুঠাম শরীর, ফর্সা এক মাথা কালো চুল, চুপচাপ, অমায়িক, সবসময় তাঁর মুখে হাসি। কিন্তু ইদানীং তাঁর শরীর খারাপ হয়েছে, নিয়মিত কাজে আসেননা, ক্রমশঃ বেশ রোগাও হয়ে যাচ্ছেন, চেহারায় একটা ক্লান্তির ভাব, চোখের তলায় কালি।
ভাই কে নিয়ে চৌধুরী সাহেব বেশ চিন্তিত। তিনি ভাইয়ের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করছেন। মুস্কিল হলো চৌধুরী সাহেব থাকেন মিলের কলোনীতে তাঁর ম্যানেজারের বাংলোতে, আর তাঁর ভাই মহাদেব থাকেন কাছেই নোপুর নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে ভালো ডাক্তার বা হাসপাতাল নেই।
বেঙ্গল পেপার মিলের ওয়ার্কশপে কার্ত্তিক বারিক নামে একটি ছেলে ছিল, তার কাজ ছিল নানা দরকারী জিনিষ পত্র জোগাড় করার। খুব কাজের ছেলে ছিল কার্ত্তিক, আর খুব ফুর্ত্তিবাজ। আমার আর রমার সাথে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।
তো একদিন কার্ত্তিক রমা আর আমায় নিয়ে একদিন সাইকেলে চেপে ওদের গ্রাম (নোপুর) দেখাতে নিয়ে গেল। আমাদের মিল টা ছিল রানীগঞ্জ থেকে কিছুটা দূরে বল্লভপুর নামে একটা জায়গায়, দামোদরের তীরে। সেখান থেকে নোপুর গ্রাম ক্রোশ খানেকের পথ, সাইকেলে যেতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগে।
আমাদের সাই্কেল ছিলোনা, কার্ত্তিক কোথা থেকে দু’টো সাইকেল জোগাড় করে নিয়ে আসে।
পড়ন্ত বিকেলে আলপথে সাইকেলে চেপে যেতে পাশে সবুজ ধানক্ষেত। কার্ত্তিক আবার একটু কবিতাপ্রেমী, সে রবীন্দ্রনাথের “গগনে গরজে মেঘ” এর সাথে “রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হলো সারা” এই লাইন দুটি নিয়ে তার আপত্তি ব্যক্ত করেছিল। ওর মতে আষাঢ় শ্রাবণে ধান কাটা হয়না।
রমার সাথে (সেও গ্রামের না হলেও শহরতলী হাওড়ার ছেলে) তার এই নিয়ে সেদিন তর্ক বেঁধে যায়। সেই তর্কে আমন আর আউষ ধানের কথা উঠে এসেছিল। আমি তো শহরের ছেলে, এ সব ব্যাপারে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত, আমি কোন তর্কের ভিতরে না গিয়ে চারিদিকের অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মন দিচ্ছিলাম।
পরে শুনেছি কার্ত্তিকের কথাই ঠিক। আউষ ধান বর্ষাকালে ধানের চারা পোঁতা (রোপন)হয়, সেই ধান অগ্রহায়নে কাটা হয়। আর আমন ধান পোঁতা হয় শীতকালে, কাটা হয় চৈত্রে। বর্ষাকালে ধান কাটা নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল সোনার তরী কবিতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
নোপুর গ্রাম থেকে মিলে অনেকে কাজ করতে আসে, তাদের অনেকের বাড়ীতে কার্ত্তিক আমাদের নিয়ে গিয়েছিল সেদিন। মাটির বাড়ী, ধুলোর রাস্তা, পানাপুকুর, নারকেল গাছের সারি, বাংলার গ্রামের সেই ধূলিমলিন চেহারা এখনো বেশ মনে পড়ে।
মহাদেবের বাড়ীতেও আমরা গিয়েছিলাম সেদিন। অপ্রত্যাশিত ভাবে আমাদের পেয়ে মহাদেব খুব খুসী হয়েছিলেন মনে আছে। সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী মহাদেবকে দেখে সেদিন কিছুটা ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। কিন্তু মহাদেব নিজের শরীর খারাপ নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, “না না আমি তো ঠিক আছি, ও কিছু নয়”, স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন “এরা আমার জন্যে অযথা চিন্তা করে।”
বাইরে বেরিয়ে কার্ত্তিক বেশ চিন্তিত মুখে আমাদের বলেছিল, “বৌদি বলছিলেন মহাদেবদা’ কে একবার বর্দ্ধমান জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। চৌধুরীবাবুর সাথে এই নিয়ে কথা বলতে হবে। উনি নিজের ভাইয়ের চিকিৎসার বন্দোবস্তর ভার নেবেন আমায় বলেছেন।”
তারপরে সেদিন কার্ত্তিক আমাদের তার বাড়ীতে নিয়ে গিয়েছিল। কার্ত্তিকের বাড়ীর সামনে বিশাল মাঠ, আর তাদের নিজেদের অনেক খেজুর গাছ। সেদিন কার্ত্তিক আমাদের জিরেন গাছের খেজুর রস খাইয়েছিল।
“আপনাদের জন্যে তিন দিন জিরেন রেখেছি” বলেছিল কার্ত্তিক।
আমার এখনো মনে আছে যে ঢকঢক করে সেই মিষ্টি রস বেশ কয়েক গেলাস খেয়ে ফেলে আমার বেশ একটু নেশা হয়েছিল, আমি কার্ত্তিক কে কিছুটা জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করেছিলাম “টয়লেট টা কোন দিকে ভাই?”
কার্ত্তিক কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “টয়লেট ? আপনার সামনে দিব্বি ফাঁকা মাঠ পড়ে আছে…যেখানে ইচ্ছে চলে যান…”
কথায় আছে বাবা বিশ্বনাথ না ডাকলে কাশী যাওয়া হয়না।
ছোটবেলায় মা’র সাথে প্রতি বছর দিদার কাছে কাশী আসতাম। শেষ এসেছিলাম ১৯৬৫ সালে বাবার মৃত্যুর পরে, তখন খড়্গপুরে কলেজে পড়ি, গরমের ছুটিতে। তার পর অনেক বছর কেটে গেছে। বাবা বিশ্বনাথ আমায় ডাকেননি, আমারও আর কাশী আসা হয়নি।
২০১৯ সালে আমার শ্বাশুড়ী আর মা পর পর জানুয়ারী আর ফেব্রুয়ারী মাসে চলে গেলেন। তাঁদের দু’জনের বাৎসরিক কাজ করার কথা এক বছর পরে ২০২০ সালে, সেই কাজ ঠাকুরমশায়কে ডেকে বাড়ীতে করানো হলো। তখন কোভিড অতিমারী চলছে, লকডাউনের সময়ে তাঁদের আত্মাকে পিন্ডদান করতে গয়া বা কাশী যেতে পারিনি।
এবার ২০২৪ সালের মার্চ মাসে শেষ পর্য্যন্ত বাবা বিশ্বনাথের ডাক এলো।
আমরা আমার শ্বাশুড়ী আর মা’র পিন্ডদান করতে কাশী এসেছি। আমাদের সাথে এসেছে আমাদের বড় মেয়ে পুপু। সে লন্ডনে ডাক্তার। ঠাম্মা আর দিদিভাইকে সে খুব ভালোবাসতো, তাই সে ছুটি নিয়ে আমাদের সাথে তাঁদের আত্মাকে পিন্ডদান করা দেখতে কাশী এসেছে, এই সুযোগে তার কাশী দেখা হয়ে যাবে। বাবা বিশ্বনাথ আমাদের সাথে তাকেও ডেকে নিয়েছেন।
ভারত সেবাশ্রম সংঘে পিন্ডদান হবে, আগে থেকেই ফোন করে সব বন্দোবস্ত করা হয়ে গেছে। পুরোহিত মশাইয়ের নাম ছোটু মহারাজ, তিনি সব জিনিষ যোগাড় করে রাখবেন, আমাদের কেবল এসে পুজোর কাজটা করতে হবে। আমি মা’র কাজ করবো, সুভদ্রা করবে আমার শ্বাশুড়ীর কাজ।
১৯৬৫ সালের পরে ২০২৪, অর্থাৎ প্রায় ষাট বছর I পরে আমি কাশী এলাম।
এই ষাট বছরে কাশী অনেক পালটে গেছে, আর আমিও এখন সেই আগেকার শিশু বা কিশোর নই। আমার নতুন চোখে এই নতুন কাশীকে কেমন দেখবো, তাই নিয়ে মনে মনে প্রথম থেকেই আমি বেশ একটা আগ্রহ অনুভব করছিলাম।
তখন তরুণ ছিল অরুণ আলো, পথটি ছিল কুসুমকীর্ণ/
বসন্ত সে রঙ্গীন বেশে ধরায় তখন অবতীর্ণ।
আর এখন আমার অবস্থা হলো “বসন্ত সে কবেই গেছে, শরীর এখন জরাজীর্ণ।”
কাশী কিছুটা আমার সেই বাল্য কৈশোর আর আজকের বার্ধক্যের মধ্যে একটা সেতুর মতো।
এটা হলো সেই সেতুবন্ধের গল্প।
২) ষাট বছর পর প্রথম কাশী দর্শন
এই প্রথম প্লেনে কাশী এলাম। পুপু এলো দিল্লী থেকে। ওর ফ্লাইট কিছুক্ষন আগে এসেছে, আমাদের জন্যে সে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছিল।
ছোটবেলায় তো প্লেনে ওঠার সামর্থ্য আমাদের ছিলনা, মা’র সাথে ট্রেণে কাশী আসতাম। ট্রেণে কাশী যাবার একটা প্রধান স্মৃতি ছিল বেনারস স্টেশনের ঠিক আগে গঙ্গার ওপরে লম্বা ব্রীজ। সেই ব্রীজের ওপর দিয়ে ট্রেণ যাবার সময়, ট্রেণের ভিতর থেকে একটা সমবেত কন্ঠে “গঙ্গা মাইকি জয়” রব উঠতো। তাছাড়া প্রায় সবাই তাদের গঙ্গা মাই কে প্রণামী হিসেব নদীর জলে পয়সা ছুঁড়তেন, এবং সেগুলো ব্রীজের গার্ডারে লেগে ঝনঝন একটা শব্দ হতো, সেই শব্দ এখনো কানে বাজে।
ট্রেণের জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম বহু দূরে কাশীর গঙ্গার তীরের ইঁট রং এর উঁচু উঁচু বাড়ীগুলো, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, তাদের সামনে সিঁড়ি নেমে গেছে নদীতে। দৃশ্যটা এত সুন্দর যে ভোলা প্রায় অসম্ভব। সত্যজিৎ রায় তাঁর “অপরাজিত” সিনেমার শুরুতেই ব্রীজের ওপর ট্রেণ থেকে দেখা কাশীর ঘাটের ওই দৃশ্যটা ব্যবহার করেছেন।
স্টেশন থেকে নেমে আমরা সাইকেল রিক্সা অথবা ঘোড়ায় টানা গাড়ী (টাঙ্গা) চড়ে দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে দিদার বাড়ীতে পৌঁছে যেতাম। পথে শহরের নানা দৃশ্য চোখে পড়তো। সেই সব দৃশ্য এখন সাদা কালো ছবির মতো শুধু আমার মনে।
ষাট বছর পরের এই শহর এখন কেমন লাগবে আমার চোখে?
বেনারস এয়ারপোর্টটা বেশ বড় আর সাজানো গোছানো। সিঁড়ি দিয়ে হলে নেমে আসতেই দেখি সামনে পুপু আমাদের জন্যে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। আমাদের মালপত্র নিয়ে আমরা বেরোলাম। বাইরে তখন বিকেলের উজ্জ্বল আলো।
হোটেলের ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে এসেছে, বেশ আরামাদায়ক বড় গাড়ী (SUV), আমরা সেই গাড়ীতে উঠে হোটেলের দিকে চললাম।
আমাদের ড্রাইভার এর নাম ভোলা। কাশীতে সবার নামই মহাদেব এর নামে হবে তাতে আর অবাক হবার কি আছে? ভোলা ফোনে কার সাথে কথা বলছে, ভোজপুরী ভাষায় নাকি? জিজ্ঞাসা করাতে সে বললো কাশী শহর বিহার এর বর্ডার এর খুব কাছে। আর বর্ডারের ওপারেই ভোজপুর জেলা, তাই কাশীতে ভোজপুরী ভাষা খুব প্রচলিত, এই ভাষায় এখানে অনেকেই কথা বলে।
কাশী শহর এয়ারপোর্ট থেকে অনেকটা দূর, যেতে সময় লাগলো ঘন্টা খানেক। যেতে যেতে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম – তখন বিকেলের রোদ এসে পড়েছে দু’দিকের ছোট ছোট বাড়ীতে, চারিদিকে খোলামেলা সবুজ, দেখে মনে হয় বেশ বর্দ্ধিষ্ণু জায়গা। কিন্তু ক্রমশঃ যত শহর কাছে আসতে লাগলো ততো ঘড়বাড়ী দোকানপাট আর সাইকেল অটো আর মানুষের ভীড় বাড়তে লাগল।
সেই পড়ন্ত বিকেলে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দিকে যেতে যেতে বেনারস শহরের ব্যস্ত রাস্তা দেখছিলাম, নানা দৃশ্য চোখে পড়ছিল, রাস্তার দুই পাশে বেনারসী শাড়ীর দোকান, চারিদিকে হিন্দী সাইনবোর্ড, অটো রিকশা আর পথচারীদের ভীড়। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে কাশীর বিখ্যাত সরু সরু গলি। কালো বোরখা পরা কিছু কিশোরী দলবেঁধে হেসে কথা বলতে বলতে যাচ্ছে, হয়তো তারা স্কুল থেকে ফিরছে।
দেখতে দেখতে ভাবছিলাম কত প্রাচীন এই বারাণসী শহর, হিন্দুদের পরম পবিত্র তীর্থ। স্বয়ং শিব এখানে এসে ভিক্ষা নিয়েছিলেন অন্নপূর্ণার কাছ থেকে। এই শহর মুসলমানদের অধীনেও থেকেছে, মন্দিরের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে মসজিদ। ফলে এখানে হিন্দু ও মুসলমান নারী পুরুষ যত্রতত্র দেখা যায়।
সারা বিশ্বে আমাদের হিন্দুদের মোট সাতটি পবিত্র ভূমি রয়েছে, যেখানে গেলে মানুষ মোক্ষ লাভ করতে পারে। অযোধ্যা, মথুরা, গয়া, কাশী, কাঞ্চী, অবন্তিকা ও দ্বারবতী – এই সাতটি শহরকে একত্রে বলা হয় সপ্তপুরী। কাশী এই সপ্তপুরীর অন্যতম পবিত্র ভূমি। পাশাপাশি এই শহরটি গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এবং গঙ্গা নদীতে স্নান করা হিন্দু ধর্মমতে বিশেষ পুণ্যের কাজ।
কাশীর গঙ্গায় স্নান করে বিশ্বনাথ দর্শন করলে পার্থিব জীবনের যত জ্বালা আর যন্ত্রণা থেকে চিরকালের জন্যে নিশ্চিত মুক্তি এই বিশ্বাস থেকে দলে দলে হিন্দুরা যুগে যুগে সারা দেশ থেকে মন্দিরে শিবের দর্শন করতে ও পূজো দিতে আসেন।
এই বিশ্বাস থেকে আমার দিদিমা ও তাঁর শেষ জীবনে বেশ কয়েক বছর কাশীতে একা একা থেকেছেন। মা মামা মাসীরা অবশ্য তাঁকে মৃত্যুর কয়েক বছর আগে শারীরিক অসুস্থতা জনিত কারণে নিজেদের কাছে নিয়ে এসে রাখেন।
আমার বার্ধক্যে আমি অবশ্য নিজের জন্যে কোন পুণ্য অর্জ্জন করার জন্যে কাশী আসিনি। আমি এসেছি আমার মা’র পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্যে। আমার মা রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে বড় হয়েছেন, সারা জীবন নিষ্ঠার সাথে পুজো আর্চা এবং শিবরাত্রি বা কালীপূজোতে নির্জলা উপোস এই সব করেছেন। আমার বাবার মৃত্যুর পরে তিনি আমায় নিয়ে গয়া গিয়েছিলেন, সেখানে আমরা তাঁর পারলৌকিক আত্মার শান্তির জন্যে তাঁকে পিন্ডদান করেছিলাম।
সুতরাং তিনি নিশ্চয় চেয়েছিলেন যে তাঁর একমাত্র সন্তান তাঁর মৃত্যুর পরে পিন্ডদান করে তাঁর আত্মাকে মুক্তি দেবে। সেই কাজ করতেই আমার কাশী আসা। মা’র প্রতি সন্তানের কর্ত্তব্য পালন করাও অবশ্যই একটা পুণ্যের কাজ। তাছাড়া গঙ্গায় স্নান না করলেও বিশ্বনাথের দর্শন তো অন্ততঃ হবে।
প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল মা পরলোকে যাত্রা করেছেন, ঠিক এক বছর পরে ২০২০ সালে কোভিড অতিমারীর মধ্যে বাড়ীতে পূজো করে তাঁকে পিন্ডদান করা হয়েছে, কিন্তু হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী গয়া কাশী হরিদ্বার এর মত তীর্থক্ষেত্র থেকে পিন্ডদান না করলে প্রেতাত্মা বৈতরণী নদীর ঘাটে অপেক্ষায় থাকেন, যতক্ষন না সন্তান পিন্ডদান করে ততদিন সেই নদী পেরিয়ে তাঁর প্রেতাত্মার স্বর্গে প্রবেশ করার অনুমতি নেই।
এই সব ভাবতে ভাবতে আমাদের গাড়ী এক জায়গায় এসে একটা সরু গলির মুখে এসে দাঁড়ালো।
আমাদের হোটেলটা একটু ভেতরে নদীর ধারে, সেখানে গাড়ী যাবেনা , তাই হোটেলের দুই জন ইউনিফর্ম পরা লোক এসেছে তারা আমাদের মালপত্র নিয়ে হোটেলে পৌঁছে দেবে। হেঁটে মাত্র দুই বা তিন মিনিটের রাস্তা, একটু এগোতেই হোটেলে পৌঁছে গেলাম। পাশেই শিবালা ঘাট, নদীর দর্শন পেলাম। নিজের মনে বয়ে চলেছে পুণ্যসলিলা গঙ্গা। এখানে জলের রং নীল, কলকাতার মত পলিমাটিতে ভরা হলুদ রং নয়। দেখে মনটা বেশ ভাল হয়ে গেল।
আমাদের হোটেলের নাম সূর্যোদয় হাভেলি, এই হোটেলটি আগে রাজস্থানের কোন মহারাজের বাড়ী ছিল শুনলাম। বেশ দামী হোটেল, শাকাহারী, অর্থাৎ এখানে সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয়।
শুনেছি আধুনিক বারাণসীর বেশির ভাগটাই রাজপুত ও মারাঠা রাজাদের হাতে তৈরি। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে তৈরী এই শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাড়ীর বেশিরভাগই তাই। সেই সব রাজা রাজড়ারা বলা বাহুল্য শিবের ভক্ত ছিলেন। এবং তাঁদের তৈরী এই সব হাভেলিতে তাঁরা সপরিবারে এসে থাকতেন। কাশীতে গঙ্গার ধারে প্রাসাদোপম হাভেলি থাকা একরকমের আভিজাত্যের প্রকাশ, তাছাড়া পুণ্যও হয়।
এখন এই সব হাভেলির অনেকগুলোই হোটেল হিসেবে চালানো হয়। ছোটবেলায় যখন আসতাম, তখন কাশীতে এত হোটেল ছিলনা।
৩) কাশী আর বেনারস
কাশী আর বেনারস দুটো আলাদা রেলস্টেশন হলেও আসলে কিন্তু ওরা একই শহরের দুই নাম। পরে শুনেছি ওখানে দুই উপনদী বরুণা আর অসি গঙ্গায় মিশেছে তাই সেখান থেকেই সন্ধি করে শহরের নাম হয়েছে বারাণসী। সেখান থেকে বেনারস।
অনেকে বলে কাশী হলো বাঙালীর, আর বেনারস হলো সারা ভারতের।
একই শহরের ভিতর দুই আলাদা শহর, তাদের আলাদা রূপ, আলাদা পরিচয়। আমার এক বন্ধু সিদ্ধার্থ পাঁচ বছর কাশীতে থেকে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিল। তার মতে কাশী ও বেনারস দু’টো সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ।
কাশীতে বাঙালীর প্রতিপত্তি বেশী, বিধবাশ্রম, ভাতের হোটেল, আনন্দময়ী মা, গঙ্গার ঘাট আর সিঁড়ি, হরিহর সর্ব্বজয়া আর ছোট্ট অপু। বাংলা সাহিত্যের অনেক কালজয়ী উপন্যাসের নায়িকারা নির্বাসিত হয়ে কাশীবাসিনী হয়েছেন। সেই সব উপন্যাসের মধ্যে আছে প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতক, বিভূতিভুষনের দ্রবময়ীর কাশীবাস, শরৎচন্দ্রের পল্লীসমাজ। এমনকি রবীন্দ্রনাথও চোখের বালির বিনোদিনী কে কাশী পাঠিয়েছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর উনবিংশ শতাব্দী নিয়ে লেখা “সেই সময়” উপন্যাসে বালবিধবা বিন্দুবাসিনীকে তখনকার সমাজের রীতি অনুযায়ী কাশী পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কাশীর একটা গোটা এলাকাই বাঙালির। যার নাম বাঙালিটোলা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দিব্যি বাংলা বলে চলেছেন প্রবাসীরা। এখানে তিন হাজারের বেশি দুর্গাপুজো হয়। এককালে সংস্কৃত শেখার জন্য বহু বাঙালি পাড়ি দিতেন কাশী। একটা সময় ছিল যখন কাশীতে রীতিমতো শাসন করতেন বাঙালি সংস্কৃত পণ্ডিতরা।
অন্যদিকে বেনারস হলো ভারতীয় সংষ্কৃতি আর আধ্যাত্মিকতার এক বিশেষ পীঠস্থান। বেনারসী শাড়ী, রাবড়ী, জর্দ্দা পান, কচুরী, মুজরা, বাইজী দের নাচ গান, কবি সন্মেলন, বিসমিল্লা খাঁর অষ্টপ্রহর সানাই, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বেনারেস ঘরানা। অপরাধ জগতের মগনলাল মেঘরাজেরাও বেনারসের অতি ঘোর বাস্তব। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় উপন্যাসে গঙ্গানারায়ন তার ছেলেবেলার বান্ধবী এবং বালবিধবা কাশীতে নির্বাসিতা বিন্দুবাসিনী কে কাশীতে এসে হন্যে হয়ে খুঁজেছিল। শেষ পর্য্যন্ত সে বিন্দুকে যখন সে খুঁজে পায়, সে তখন এইরকম একজন অপরাধ জগতের মানুষের রক্ষিতা। সে গঙ্গার কাছে ফিরে যেতে রাজী হয়না, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।
বারাণসীকে ভারতের প্রাচীনতম শহর বলে মনে করা হয়।
এই শহর হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র শহর হলেও বারাণসী বৌদ্ধ, জৈন আর শিখ ধর্মেরও অন্যতম পীঠস্থান।
৫২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বারাণসীর কাছে সারনাথে বুদ্ধ প্রথম বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তন করেন। বুদ্ধগয়ায় বোধিসত্ত্ব লাভ করার পর গৌতম বুদ্ধ তা প্রচার করার জন্য পঞ্চভার্গব ভিক্ষুর সন্ধানে প্রথম এসে পৌঁছেছিলেন সারনাথে। পরে সম্রাট অশোক সারনাথের একটি মৃগদাবে একটি বুদ্ধমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। কাশী এলে সারনাথে সেই মন্দির দর্শন করতে পর্য্যটকরা দল বেঁধে যান্। মা মাসীদের সাথে ছোটবেলায় আমিও বেশ কয়েকবার গেছি।
৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে চীনা পর্যটক ফাহিয়েন এবং পরে হিউয়েন সাং বারাণসীতে এসেছিলেন। তাঁদের রচনা থেকে এই শহরের ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডের পরিচয় পাওয়া যায়।
ভক্তিবাদী আন্দোলনের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কবীর। কবীরকে “পঞ্চদশ শতাব্দীর ভারতের শ্রেষ্ঠ ভক্তিবাদী সন্ত কবি ও অতিন্দ্রীয়বাদী” বলা হয়। ১৫০৭ সালের শিবরাত্রি উৎসবের সময় গুরু নানক এই শহরে আসেন। তার এই বারাণসী সফর শিখধর্ম্ম প্রচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
কিন্তু শুধু ধর্ম দিয়ে বারাণসী কে চেনা যাবেনা।
এই শহর শত শত বছর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতি, শিল্প ও শিক্ষার উল্লেখযোগ্য পীঠস্থান হিসেবে তার পরিচয় বজায় রেখেছে।
তুলসীদাস তাঁর জীবনের সিংহভাগ এই শহরে কাটিয়েছেন। রামায়ণের ওপর লেখা তাঁর বিখ্যাত কাব্য রামচরিতমানস তিনি এখানেই রচনা করেন। তাঁর মৃত্যুও হয় এই শহরে।
কিছুদিন আগে গৌতম চক্রবর্ত্তী আনন্দবাজারে বারাণসীর ছেলে মুনসী প্রেমচন্দের ১৯১৮ সালে প্রকাশিত সাড়া জাগানো উপন্যাস “সেবাসদন” নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেই আলোচনায় উঠে এসেছে বিংশ শতাব্দীর (প্রাক স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার পর) কাশীর সাংষ্কৃতিক পরিবেশ। সেবাসদন উপন্যাসের নায়িকা ব্রাম্ভনের মেয়ে সুমন। বিয়ের আগে পিতৃগৃহে সে নাচ আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখেছে।
বৃদ্ধ স্বামী কে ছেড়ে সে কাশীর মন্দিরে সাধু সন্তদের সামনে গান গায়, নাচে।
গৌতম লিখেছেন~
——————
নাচনেওয়ালী? মন্দিরের চাতালে সাধুসন্ত ও দর্শনার্থী দের ভীড়ে শিবলিঙ্গের সামনে নাচছে গল্পের নায়িকা সুমন। সে যদি খারাপ মেয়ে হয়, তাহলে সে মন্দিরে কি ভাবে নাচে? সাধু সন্তরা তার নাচ দেখে এত ধন্য ধন্য করে কেন?
————–
ঊর্দ্দু থেকে ইংরেজীতে সম্প্রতি অনূদিত হবার আগে কেউ জানতোনা সাধুদের আশ্রমে মন্দিরে উচ্চাঙ্গ নাচ গানের এই সংষ্কৃতির কথা। নানা অনুষ্ঠানে সরস্বতী পূজোর দিন, বাইজী, মুজরো গায়িকা এমন কি বহুবল্লভারা (ঊর্দ্দুতে “তওয়াইফ”রা) বিনা পারিশ্রমিকে দশাশ্বমেধ ঘাটে নাচ গান করতে আসতেন।
বারাণসীর ইমামবাদী বাইজীর কাছ থেকে গান শিখে প্রথম বাংলা টপ্পা গানের প্রচলন করেন নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য। অঘোর চক্রবর্ত্তীর ধ্রুপদ বা মহেশচন্দ্র সরকারের মত বীণা বাদকের শিক্ষাও এই শহরে। কথক নাচ ও ছয় মাত্রার দাদরা তালের ও বিকাশ ঘটেছিল এই শহরে। আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম সঙ্গীতকার তানসেনের বংশধরেরা অনেকেই বারাণসীকে তাদের বাসভূমি বলে বেছে নেন। তৈরী হয় বেনারস ঘরানা।
এঁদের কারুর মধ্যে ছিলনা ধর্ম বা জাত পাতের বিভেদ। কোন নোংরামীও ছিলনা, তবু স্বাধীনতার পরে সরকারের উদ্যোগে কাশীর ডালমন্ডির বাইজী মহল্লা তুলে দেওয়া হয়। যেহেতু এই তওয়াইফেরা অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান, তাই এই নিয়ে তখন খুব হৈ চৈ এবং সাম্প্রদায়িক অশান্তি শুরু হয়, কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত জয় হয় পুরুষতন্ত্রেরই।
ডালমন্ডীর বাইজী প্রেমচন্দের উপন্যাসের নায়িকা সুমন বাইজী বা তওয়াইফ হলেও সে তার শরীরী সতীত্ব হারায়নি। উপন্যাসের শেষে তার স্বামীর সাথেও তার দেখা হয়।
৪) প্রথম সন্ধ্যা – দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গারতি
আমাদের ঘরটা বেশ বড়, পুপুর জন্যে একটা আলাদা বিছানার বন্দোবস্ত করতে অসুবিধে হইয়নি। বিকেল পাঁচটার সময় আমাদের জন্যে একটা নৌকা বুক করা আছে, চেক ইন করে ঘরে মালপত্র রেখে আমরা সোজা ঘাটে গিয়ে নৌকায় উঠে বসলাম।
হোটেলটি তিনতলা। আমাদের ঘর এক তলায় হলেও নদী আরো অনেকটাই নীচে। ঘাটে যেতে সিঁড়ি বেয়ে তাই অনেকটা নামতে হলো। পাঁচটা বাজে কিন্তু তখনও বেশ আলো। দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গারতি দেখবো, সেখানে নৌকায় করে যেতে যেতে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছিলা। একের পর এক ঘাট পেরিয়ে যেতে থাকলাম, আর অনেকদিন পরে চোখে পড়লো কাশীর সেই পরিচিত দৃশ্য। সারি সারি উঁচু ইট রঙ এর বাড়ী আর জলে নেমে আসা সিঁড়ি।
ছোটবেলায় বাবা যখন কাশী আসতেন, তখন সবাই মিলে বিকেলে গঙ্গায় নৌকায় চড়ে অনেক দূরে চলে যেতাম। মাথার ওপরে নীল আকাশ, চারিদিকে নদীর নীল জল, মাঝির দাঁড়ের আওয়াজে জলে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ আসছে, আমি চলন্ত নৌকা থেকে জলে হাত নামিয়ে দিয়ে দেখতাম কেমন ঠাণ্ডা। মণিকর্ণিকা ঘাট এলে মা বলতেন এখানে চিতার আগুণ কখনো নেবেনা। কাশীতে অনেক মরণোন্মুখ মানুষ মারা যেতে আসেন, এই ঘাটে দাহ করলে মোক্ষলাভ হয়, আর পুনর্জন্ম হয়না।
এখন অবশ্য সবই ডিজেলে চালানো মটরবোট। চারিদিকে নদীতে মটরবোটের ছড়াছড়ি। এখানে আসার আগে আমাদের সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল, কাশীর মশাদের কামড়ে নাকি ডেঙ্গু বা চিকনগুনিয়া হয়। আমরা প্রতিষেধক ক্রীম গায়ে আর জামায় মেখে নিলাম। সাবধানের মার নেই।
গঙ্গারতি নদী থেকেই দেখা হলো। দশাশ্বমেধ ঘাট তো লোকে লোকারণ্য, সামনে নদীতেও সারি সারি নৌকা, বড় বড় স্টীমার। তাতে ভর্ত্তি দর্শনার্থী ভক্তের দল। ক্রমশঃ অন্ধকার নেমে এলো, তার মধ্যে চারিদিকে জ্বলজ্বল করছে আলোর মালা। তার সাথে মাইকে শোনা যাচ্ছে ভজন আর স্তোত্রপাঠ। বেশ জমজমাট ব্যাপার।
গঙ্গারতি এখন গঙ্গার তীরে নানা শহরে হয়। এমন কি কলকাতায়ও। এক বছর আগে সুভদ্রা আর আমি হরিদ্বারে দেখেছি।
৪) দ্বিতীয় দিন
গতকাল আসা আর আগামীকাল ফেরার মাঝখানে আজ আমাদের কাশীতে একমাত্র দিন। সুতরাং এই দিনটিতে আমাদের প্রধান দুটি কাজ সারতে হবে, এক হলো মা’দের দু’জনের বাৎসরিক কাজ করা আর দুই হলো বিশ্বনাথ দর্শন। তারপরে বাকি সময়টা আমরা যতটা পারি কাশী শহরের অন্যান্য নানা দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়াবো।
ভোরে ব্যালকনি থেকে সূর্য্যোদয়
আমাদের ঘরের পাশে বাইরে একটা ছোট ব্যালকনি আছে, পরের দিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সেখানে তিন জনে চা খেতে খেতে সূর্য্যোদয় দেখা হলো। মন ভাল করা দৃশ্য। সেই ভোরেই ঘাটে লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে।
ব্যালকনি তে তিন জনে চা খেতে খেতে নদী দেখতে দেখতে আমার মন চলে যাচ্ছিলো সেই ছোটবেলার কাশীতে। রাণা মহলের বাড়ীর ছাতে গেলেই নীচে নদী দেখা যেতো, এখনকার মত তখনো পাশে চরে গাছগাছালি গজিয়ে উঠেছে। একটা ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে দুলতে দুলতে ভেসে জলে গিয়ে পড়ছে। দূরে ব্রীজের ওপর দিয়ে গুম গুম আওয়াজ করে ট্রেণ চলে যাচ্ছে। এই সব নানা স্মৃতি।
আজও সেই একই দৃশ্য। কিছুই যেন বদলায়নি। দূরে চর, কাছে ঘাটে লোকে স্নান করছে, নদীর জলে এদিক থেকে ওদিক বোট আর নৌকারা ভেসে চলেছে, তাদের পিছনে পিছনে মাছের লোভে উড়ে যাচ্ছে অসংখ্য পাখীর ঝাঁক।
স্নান সেরে তৈরী হয়ে সকাল সকাল হোটেলেই ব্রেকফাস্ট। এখানে নিরামিষ খাবার খুবই সুস্বাদু। গতকাল কাল ডিনার ও এখানে করেছি। কাশীর কচুরী নাকি খুব বিখ্যাত, কিন্তু তা’ নাকি সকাল দশটার পরে আর কোন দোকানে পাওয়া যায়না। অদ্ভুত নিয়ম। আমাদের তাই আর কচুরী খাওয়া হলোনা।
কাশীতে ঘুরে বেড়াবার জন্যে গাড়ীর বদলে অটোই ভাল, কেননা সরু গলির মধ্যে গাড়ী ঢোকেনা অনেক দূরে পার্ক করে হাঁটতে হয়। হোটেল থেকেই একটি গাইড ছেলে কে কাল বলে রেখেছি, সে আজ সারাদিনের জন্যে একটা অটো ভাড়া করে নিয়ে এসেছে। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
কাশী বিশ্বনাথ মন্দির – ভাঙা আর গড়ার ইতিহাস
আমাদের প্রথম কাজ হলো বিশ্বনাথ দর্শন।
হিন্দুদের জন্যে কাশীর একটি প্রধান আকর্ষন হল কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। মন্দিরের ১৫.৫ মিটার উঁচু চূড়াটি সোনায় মোড়া। তাই মন্দিরটিকে স্বর্ণমন্দিরও বলা হয়ে থাকে।
যাই হোক, এই মন্দিরটি কবে প্রথম তৈরী হয়েছিল, তা নিয়ে নানা মতামত আছে। বারাণসীতে যে সবচেয়ে পুরনো পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, তার থেকে অনুমিত হয় গাঙ্গেয় উপত্যকায় এই শহরে জনবসতি শুরু হয়েছিল খৃস্টপূর্ব একাদশ কিংবা দ্বাদশ শতাব্দীতে। এই জন্য বারাণসীকে বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলির একটি মনে করা হয়।
এই মন্দিরের নাম ছিল আদি বিশ্বেশ্বর মন্দির।
সেই মধ্যযূগ থেকে আমাদের দেশে পশ্চিম আর উত্তর থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত বহিরাগত মুসলমান আক্রমণ হয়েছে। সেই সব আক্রমণকারীরা কেউ এসেছে সোনা দানা লুট করতে, আবার কেউ এসেছে আমাদের দেশে তাদের শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে। আমাদের ইতিহাস বইয়ের পাতায় খুললেই পড়া যায় শুধুসেই সব যুদ্ধের কাহিনী – সেখানে শুধু তলোয়ারের ঝনঝনানি, ঘোড়াদের হ্রেষা ধ্বনি, আর যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকা হাজার হাজার রক্তাক্ত মৃতদেহ। এক দিকে আল্লা হু আকবর আর অন্যদিকে হর হর মহাদেব চিৎকার!
এই সব আক্রমণকারীদের নামের লম্বা লিস্ট। মহম্মদ ঘোরী থেকে শুরু করে ইলতুৎমিস, ফিরোজ শা তুঘলক, কুতুবউদ্দিন আইবক্ …
হিন্দু রাজাদের যুদ্ধে পরাজিত করার পর তাদের সৈন্যরা সারা দেশ জুড়ে একের পর এক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে তার জায়গায় মসজিদ স্থাপন করে গেছে। কিন্তু তার মধ্যেও সেই সব মন্দিরের পুনর্নিমাণ হয়েছে, ধনী এবং ধর্ম্মভীরু হিন্দু রাজা বা বণিক বা জমিদাররা সু্যোগ পেলেই সেই কাজ করেছেন।
এই ভাবেই যুগে যুগে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরেরও ভাঙা গড়া চলে এসেছে।
ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল ছিল বারাণসীর সাংস্কৃতিক নবজাগরণের যুগ। আকবর শহরটিকে সাজিয়ে তোলেন। ১৫৮৫ সালে সম্রাট আকবর কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং শিব ও বিষ্ণুর দুটি বিশাল মন্দির নির্মাণ করিয়ে দেন। পুণের রাজা সেই সময় অন্নপূর্ণা মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময় শের শাহ কলকাতা থেকে পেশোয়ার গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ করার পরে এই অঞ্চলের পরিবহন পরিকাঠামোরও উন্নতি ঘটেছিল। ষোড়শ শতাব্দী থেকে পর্যটকেরা আবার এই শহরে আসা শুরু করেন।
আবার ১৬৬৯ সালে আওরংজেব সম্রাট হবার পরেই পুনরায় মন্দিরটি ধ্বংস করে সেখানে জ্ঞানবাপী মসজিদ তৈরি করান। এই মসজিদটি আজও মন্দিরের পাশে অবস্থিত। ১৭০১ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য ক্রমশঃ ভেঙে পড়ে, এবং ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলের শাসনভার হিন্দু সামন্ত রাজাদের হাতে চলে যায়। আধুনিক বারাণসীর বেশিরভাগটাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজপুত ও মারাঠা রাজাদের হাতে তৈরি।
১৭৩৭ সালে মুঘল সম্রাট কাশী রাজ্যকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। পরে ব্রিটিশ যুগে কাশীর রাজাই এখানকার মুখ্য শাসক হয়ে ওঠেন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাশীর রাজবংশ বারাণসী শাসন করেছিল।
এর পরে আসে মারাঠা ও ব্রিটিশ আমল।
বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮০ সালে মালহার রাও হোলকার এর পুত্রবধূ তথা হোলকার (আজকের ইন্দোর) রাজ্যের মহারানি অহল্যাবাই নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। ভক্তিমতী ও সুশাসক হিসেবে রাণী অহল্যাবাই এর খুব সুনাম ছিল, তাঁর আমলে যুদ্ধ বিগ্রহ হয়নি, প্রজারা শান্তিতে বসবাস করতো। তিনি বহু জনহিতকর কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন।
১৮৩৫ সালে পাঞ্জাবের শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিংহ মন্দিরের চূড়াটি ১০০০ কিলোগ্রাম সোনা দিয়ে মুড়ে দেন।
আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর ভিতর কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির একটি বহু আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
পশ্চিম এশিয়াতে জেরুসালেম এও মধ্যযুগে ধর্ম্মযুদ্ধে (crusade) ক্রীশ্চান আর মুসলমানদের এই গীর্জ্জা আর মসজিদ ভাঙা গড়া হয়েছে। ২০১৩ সালে যখন আমি জেরুসালেমে গিয়েছিলাম, তখন সেই ভাঙা গড়ার নিদর্শন আমি দেখেছি। সেখানে উনবিংশ শতাব্দীতে অটোমানদের রাজত্বের সময় (১৮৫০) একটা “ফিরমান” জারী করা হয়, তাতে দুই পক্ষই রাজী হয় যে এর পর থেকে আর কোন ভাঙা গড়া নয়, জেরুসালেম ও বেথেলহেমের সব গীর্জ্জা আর মসজিদই এখন যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থাতেই থাকবে। এই ফিরমানের নাম ছিল “Status Quo”~
আমাদের দেশে অবশ্য এরকম কোন ফিরমান জারীর কোন প্রশ্ন ছিলনা, কেননা এখানে মুসলমান শাসকেরা এক তরফা হিন্দুদের মন্দির ধ্বংস করে গেছে। শোনা যায় যে কাশী শহরেই প্রায় ৩০,০০০ মন্দির ধ্বংস করা হয়, তার মধ্যে আদি বিশ্বেশ্বর মন্দির চত্বরে চল্লিশটি মন্দির ছিল।
মূল মন্দিরের উত্তর দিকে একটি পবিত্র কূপ আছে । প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে আক্রমণকারীদের হাত থেকে জ্যোতির্লিঙ্গ কে বাঁচাবার জন্যে এক পুরোহিত নাকি মূর্ত্তি নিয়ে এই কূপটিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।
তবে ফিরমান না থাকলেও ব্রিটিশ আমল থেকেই আইন করে মন্দির মসজিদ ধ্বংস করার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। দেশ স্বাধীন হবার পরে আমাদের নিজেদের সংবিধান তৈরী হয়, যেখানে পরিস্কার লেখা আছে যে আমরা একটি ধর্ম্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক (secular, democratic) দেশ – সুতরাং এখন আর কারুর মন্দির বা মসজিদ ধ্বংস করার কোন অধিকার নেই।
২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির (বি জে পি) হিন্দুত্ববাদী সরকার। তাদের উদ্যোগে যে সব হিন্দু মন্দির বহিরাগত মুসলমান শাসকেরা বিশেষ করে আওরঙ্গজেব – ভেঙে বা নিষ্ক্রিয় করে তার জায়গায় মসজিদ তৈরী করেছিলেন, সেই সব মসজিদ গুলো সব এক এক করে ভেঙে বা সরিয়ে তাদের জায়গায় ধ্বংস হওয়া মন্দিরগুলো আবার নতুন সাজে গড়ে উঠছে। প্রথমে অযোধ্যায় রামজন্মভূমি তে বাবরী মসজিদ ভেঙে রামলালা (শিশু রামের) সরযু নদীর তীরে বিশাল বর্ণাঢ্য মন্দির তৈরী হলো, আর তার পরে সম্প্রতি কাশীতে জ্ঞানব্যাপী মসজিদ বন্ধ করে দিয়ে নতুন বিশ্বনাথ এর মন্দির চালু হয়েছে। এর জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বি জে পি কে, সুপ্রিম কোর্ট থেকে অনুমতিও পেতে হয়েছে। বিশ্বনাথ মন্দিরের আশেপাশে চল্লিশটিরও বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত, শতাব্দী প্রাচীন মন্দির পাওয়া গেছে এবং তার প্রত্যেকটিই পুনর্নির্মিত হয়েছে।
জ্ঞানবাপী মসজিদ কে দূরে কোথাও সরিয়ে দেওয়া হবে আদালত থেকে এই নির্দ্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর পরে মথুরায় বিষ্ণু মন্দির নতুন করে তৈরী করবার জন্যে আদালতের নির্দেশের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
বিশ্বনাথ দর্শন।
আজ সকাল দশটায় কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে আমাদের টিকিট কাটা আছে। তাই বিশ্বনাথ দর্শন আজকে আমাদের প্রথম কাজ।
আমার ছোটবেলায় কাশী বিশ্বনাথের মন্দিরে যাবার জন্যে একটা সরু গলি ছিল, তার নাম ছিল বিশ্বনাথের গলি। তার দুই পাশে দোকান আর নানা ছোট মন্দির ছিল, আর ছিল গিজগিজে ভীড়। নদী থেকে মন্দিরে প্রবেশ করার কোন ঘাট বা রাস্তা ছিলনা।
জায়গাটা ২০২২ সালের পরে আমূল পাল্টে গেছে।
আগের সেই বিশ্বনাথের সরু গলি আর নেই। ঠাসাঠাসি ভীড় ও নেই। সেখানে এখন বেশ চওড়া একটি রাস্তা। এখন মন্দিরের চত্বরটি বিশাল করা হয়েছে, সেই চত্বর এখন পরিস্কার ঝকঝকে সেখানে মার্বেলের সাদা মেঝে। ভীড় কমানোর জন্যে ইন্টারনেটে আগে থেকে টিকিট কেনার বন্দোবস্ত হয়েছে।
এখন Internet এ আগে থেকে পাস নিতে হয়, আমাদের তিন জনের পাস আজ সকাল দশটায়। এখন গলি দিয়ে না গিয়ে নদীর ঘাট থেকেও মন্দিরে ঢোকার বন্দোবস্ত হয়েছে। আমরা আগে বড় রাস্তার ধারে একটা দোকানে প্রসাদ আর পূজোর জিনিষ পত্র কিনে সেখানে চটি রেখে মন্দিরে ঢুকলাম।
বিশ্বনাথ মন্দিরের ভেতরে ঢুকে তাজ্জব হয়ে যেতে হয়। মার্বেল পাথরে বাঁধানো ঝকঝকে পরিস্কার বিশাল প্রাঙ্গন। সেই চত্বরে দেখা যায় অনেক ছোট ছোট মন্দির। মাঝখানে বিশ্বনাথের মন্দির, মাথার ওপরে সোনার চূড়া। সামনে ঢোকার জন্যে ছোট সুশৃঙ্খল লাইন। সময় অনুযায়ী ব্যাচে ভাগ করাতে কোনরকম বিশৃঙ্খলা নেই, আমাদের লাইনে মাত্র কুড়ি ত্রিশ জন পুরুষ নারী ও শিশু, প্রতেকের হাতে টিকিট। সেই টিকিট দেখার জন্যে একজন গার্ড মন্দিরের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছে।
সব মিলিয়ে অতি সুন্দর বন্দোবস্ত। ভাল ভাবে দর্শন আর পূজো হলো। তার পরে গেলাম অন্নপূর্ণার মন্দির, এবং এক এক করে আরো অনেক মন্দির যা ওই বিশাল পাথরে বাঁধানো পরিস্কার চত্বরে ছড়িয়ে আছে।
মা’র কথা ভাবছিলাম। ভীড়ের মধ্যে কত কষ্ট করে দর্শন করতেন মা। খুব শিবে ভক্তি ছিল তাঁর।
শুধু মন্দির নয়। চত্বরের ভিতরে চারিপাশে লাইব্রেরী, ভি আই পি লাউঞ্জ, মিউজিয়াম, কনফারেন্স রুম, আরও কত কি! এলাহী ব্যাপার।
বেরোবার সময় দেখি আগাপাস্তলা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা জ্ঞানব্যাপী মসজিদ। কোন লোক নেই সেখানে, এখানে এখন আর কোন নমাজ পড়া হয়না। কিছু সিকিউরিটির লোক পাহারা দিচ্ছে যাতে কোন গোলমাল না হয়। হয়তো কিছুদিন পরে এই মসজিদ ভেঙে ফেলা হবে।
কালভৈরবের মন্দির
বিশ্বনাথ দর্শনের পর কিছুটা দূরে গিয়ে কালভৈরবের মন্দির। সরু গলির ভিতরে ঢুকতে হবে, তাই আমাদের অটো দূরে পার্ক করে রেখে আমরা কিছুটা হেঁটে দর্শন করে এলাম। তখন বেলা বারোটা হবে, গলিতে বেশ ভীড়, সবাই মন্দিরেই যাচ্ছে, গলির দুই পাশে অনেক দোকান, সেখানে কালভৈরবের ছবি সহ নানা পূজোর সামগ্রী বিক্রী হচ্ছে।
আমি কালভৈরবের মন্দিরে আগে আসিনি, এই প্রথম।
তবে বহু দিন আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “প্রথম আলো” উপন্যাস পড়ার সময় তাঁর নাম জেনেছিলাম। সেই উপন্যাসে এক জায়গায় ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্রমানিক্য তাঁর সঙ্গী শশীভূষনের সাথে জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে এক জায়গায় গিয়ে একটি ভাঙ্গা মন্দির এবং তার পিছনে পাহাড়ের গায়ে একটি ছবি দেখতে পান্, তিনটি চোখ, আর পাশে একটি ত্রিশুল!
বীরচন্দ্র অবাক বিষ্ময়ে বলে ওঠেন – “কালভৈরব!”
জায়গাটার নাম উনকোটি অর্থাৎ এক কোটি থেকে এক কম। সেখানে নির্জন জঙ্গলে পাহাড়ের গায়ে নাকি শত সহস্র হিন্দু দেবদেবীর ছবি আর মূর্ত্তি রাখা আছে।
শুনলাম যেএই কাল ভৈরবের মন্দির কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আর কাশী এলে কালভৈরবকে একবার সব ভক্তই দর্শন করে পূজো দিয়ে যান্। আমরাও তাই করলাম।
এই কালভৈরব কিসের দেবতা?
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, কাল ভৈরবের মন্দিরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন শিবের রুদ্র রূপের এক মূর্তি। এই মন্দিরের প্রধান দেবতা, ভগবান কাল ভৈরব, ভগবান শিবের ভয়ঙ্কর প্রকাশ বলে বিশ্বাস করা হয়। কাল ভৈরব হলেন শক্তির আধার। শিবের জ্বলন্ত প্রচণ্ড রূপকেই কাল ভৈরব হিসেবে ধরা হয়। তাঁকে বলা হয় কাশীর কোতওয়াল বা কাশীর রক্ষাকর্তা। হিন্দুদের বিশ্বাস, কালভৈরব প্রাচীন শহর বারাণসী ও শহরবাসীদেরও রক্ষা করেন।
হিন্দু পুরাণে বাবা কাল ভৈরবকে ঘিরে নানা কাহিনির উল্লেখ আছে। মনে করা হয়, তিনি হলেন মহাদেবেরই আর এক রূপ। কাল ভৈরবের মন্দিরে দর্শন করলে জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস।
আমার মনে পড়ে ১৯৬২ সালে, তখন আমি স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি, চীনের সাথে আমাদের যুদ্ধ শুরু হবার পরে জনসাধারণ কে অনুপ্রাণিত করার জন্যে রেডিওতে রবীন্দ্রনাথের একটি গান প্রায়ই বাজানো হতো – “হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত পানে চাহো…”
ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে পিন্ডদান
কালভৈরব মন্দির থেকে বেরিয়ে আমাদের আসল কাজ। ভারত সেবাশ্রমের মন্দিরে মা আর আমার শ্বাশুড়ীর পিণ্ডদান। বেলা বারোটায় সময় দেওয়া আছে, তার একটু আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম।
শহরের অপেক্ষাকৃত পরিস্কার জায়গায় বেশ চওড়া বড় রাস্তার ওপরেই ভারত সেবাশ্রমের মন্দির, আর থাকার জন্যে ধর্মশালা। গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখলাম বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে একটি বড় মন্দির, এবং ডান দিকে একটি তিনতলা বাড়ী, সেখানে মনে হলো একটি হোটেল বা ধর্ম্মশালা আছে, বেশ কিছু পরিবারকে সেখানে দেখলাম, কাশীতে এলে অনেকেই এখানে এসে ওঠেন। বিশেষ করে বাঙালীদের জন্যে এই ধর্ম্মশালা খুব জনপ্রিয়, বোধহয় শুদ্ধ নিরামিষ বাঙালী খাবার, পরিস্কার থাকার জায়গা, আর সস্তা বলেই।
আমাদের পুরোহিত ছোটু মহারাজ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। দুজনে একসাথে পিন্ডদানের পুজো করলাম। পুরোহিত ভদ্রলোক সব কেনাকাটা এবং অন্যান্য বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন।
বেশ নিষ্ঠার সাথে তিনি পূজো করলেন, মনে হলো এই কাজে তাঁর অনেক অভিজ্ঞতা। এক ঘন্টার মধ্যে আমাদের কাজ হয়ে গেল।
আমার মা আর আমার শ্বাশুড়ীর আত্মার শান্তি হোক। ওঁদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হলো পিন্ড পেতে। এক বছরের মধ্যে পিন্ড দেবার কথা, কিন্তু অবশ্য বাৎসরিক কাজ বাড়িতে করেছি এক বছর পরে। কিন্তু এখন তাঁদের আত্মার সদগতি হল, তাঁরা এখন নিশ্চিন্তে বৈতরনী পার করে স্বর্গে চলে গেছেন। সেখানে তাঁদের এখন অপার শান্তি।
মনে মনে একটা দৃশ্য কল্পনা করছিলাম, মা’র অশরীরী প্রেতাত্মা বৈতরণী পার হতেই দেখছেন, দিদা মামা মাসী বাবা এবং তাঁর অন্যান্য প্রিয়জনেদের প্রেতাত্মারা তার জন্যে নদীর ওপারে অপেক্ষা করছেন। কত দিন পরে আবার তাঁদের সাথে মা মিলিত হলেন।
ছোটু মহারাজ কে বিদায় জানাবার আগে তাঁর সাথে একটা ছবি তোলা হলো।
বাটি চোখা
এর পরে ছেলেটি আমাদের নিয়ে গেল “বাটি চোখা” নামে একটি দামী রেস্তোরাঁয়। কাশীতে এই রেস্তোঁরাটি নাকি খুব বিখ্যাত।
ডাইনিং রুম টা দোতলায়। ঢোকার পথে নীচে দেখি বেশ কিছু মহিলা ঘোমটা পরে ময়দা বেলছেন আর তরকারী কাটছেন। বেশ বড় রেস্তোরাঁ, আর বেশ ভীড় । মেনু হলো মোটা মোটা রুটির সাথে ডাল আর পাঁচমিশেলী তরকারী। গাইড ছেলেটিও খেলো আমাদের সাথে।
এই খাবারটা নাকি এখানে প্রচন্ড জনপ্রিয়। আমার অবশ্য খাবারটা তেমন কিছু ভাল লাগলোনা। বেশ অখাদ্যই বলা যায়। এত মোটা রুটি আর ডাল তার সাথে কিছুটা বিস্বাদ তরকারী – অন্ততঃ আমার কাছে – কে আর ভালবেসে খায়?
শেষ পাতে অবশ্য উত্তর ভারতের মিষ্টি – বরফি, লাড্ডু, কালাকাঁদ, ইত্যাদি ছিল, সাথে মিষ্টি লস্যি।
বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি
লাঞ্চের পরে আমরা গেলাম BHU ক্যাম্পাস দেখতে। তখন বেলা প্রায় তিনটে।
একটা তো মাত্র দিন তার মধ্যে যতোটা পারি ঘুরে দেখা।
বেশ বড় আর সুন্দর সবুজ গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা সুন্দর BHU ক্যাম্পাস, এখন তার একটা ভাগ IIT হয়েছে। কিন্তু যেহেতু একবারে শহরের মাঝখানে, তাই ক্যাম্পাসের ভিতর যেন শান্তি ও নীরবতার কিছুটা অভাব। সাইকেল রিক্সা আর বাস চলছে ক্যাম্পাসের রাস্তা দিয়ে। বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে কিছু লোক।
ছাত্রাবাসগুলো রাস্তার ধারে।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে ব্রিটিশ বাহিনী এখানে একদল বিদ্রোহী ভারতীয় সেনাকে হত্যা করে। থিওসফির প্রচারে অ্যানি বেসান্ত এখানে এসেছিলেন। “সকল ধর্মের মানুষকে একই ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করতে এবং ভারতীয় সংস্কৃতির মূল্যবোধের প্রচার ভারতবাসীর মন থেকে সকল কুপ্রথা দূর করতে” তিনি এখানে সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ স্থাপন করেন। ১৯১৬ সালে এই কলেজটি কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
আমাদের দেশের এটি একটি প্রধান এবং স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়, এখান থেকে আমার মামা স্বর্গীয় ধ্রুবনারায়াণ বাগচী ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করেছিলেন। পরে আমার মামাতো ভাই ভাস্বর ও তার বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এখান থেকেই ইঞ্জিনীয়ারিং এ গ্রাজুয়েশন করে। আমার বন্ধুদের মধ্যেও অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে।
সঙ্কটমোচন মন্দির
ক্যাম্পাসে ঘুরে আমরা গেলাম সঙ্কটমোচন – হনুমানের মন্দিরে।
ভারত ও ভারতের বাইরে হনুমান মন্দির আছে অসংখ্য, তবে কাশীধামের এই সংকটমোচন মন্দিরটি সবচেয়ে জাগ্রত বলে পরিচিত। হনুমানজী কাশীর এই মন্দিরে অবস্থান করে ভক্তদের জীবনের নানা সঙ্কট থেকে মুক্ত করেন।
অনেকটা জায়গা নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গনের ভিতরে অনেক বড় বড় গাছ, ঢুকতেই বাঁ পাশে সংকটমোচন, আর ডানদিকে শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির। মন্দির দু’টি মুখোমুখি। ভাবটা এমন, রাম ছাড়া হনুমান চলবে না। হনুমান ছাড়া রামের এক পা যাওয়ার জো নেই।
হনুমানজীর মন্দিরে হনুমান থাকবেনা তা তো আর হয়না। দেখি প্রকান্ড ল্যাজ ঝুলিয়ে ডালে ডালে বসে আছে অনেক মুখপোড়া হনুমান। কাউকে প্রসাদ দিতে দেখলই তারা দল বেঁধে গাছ থেকে নেমে আসে। তাদের বেশ আগ্রাসী মনোভাব।
সংকটমোচন মন্দিরে সিঁদুর রাঙানো হনুমানজি ছাড়াও আছে বিশ্বনাথ মহাদেবের একটি লিঙ্গ বিগ্রহ। বিপরীতে শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে সীতা ও লক্ষ্মীজির সুসজ্জিত বিগ্রহ।
মন্দিরের সামনে ভীড় আর লম্বা লাইন। মাঝে মাঝেই ভক্তদের জোর গলায় আওয়াজ ভেসে আসছে “ভারত মাতা কি জয়!”
বেনারসী শাড়ী
এর পরে বেনারসী শাড়ী কেনা।
গাইড ছেলেটি আমাদের নিয়ে গেল একটি গলির মধ্যে এক বিরাট শাড়ীর আড়তে। সেখানে দোতলায় মাটিতে বসে চারিদিকে শাড়ী বিছিয়ে আমাদের শাড়ী দেখালেন এক মধ্যবয়েসী ভদ্রলোক – তাঁর চোখে মুখে কথা। চমৎকার ব্যক্তিত্ব, রসিক মানুষ, খদ্দের কে বাগে আনার অসীম ক্ষমতা। তিনি দোকানের ম্যানেজার না মালিক ঠিক বোঝা গেলনা। কিন্তু সেলসম্যান হিসেবে দুর্দ্দান্ত। এঁর কাছে এসে কিছু না কিনে ফেরা প্রায় অসম্ভব।
তিন খানা দামী শাড়ী তিনি অবলীলায় গছিয়ে দিলেন আমাদের।
অবশ্য আমাদের তো তিনটেই দরকার ছিল। দুই মেয়ে আর সুভদ্রা। ভালোই হলো ওরা পছন্দ করে কিনলো। সামনে আমাদের বিয়ের সুবর্ণবার্ষিকী, সেই অনুষ্ঠানে মেয়েরা দু’জন এই বেনারসী শাড়ী পরবে।
আমার ছোটবেলায় বিশ্বনাথের গলির মোড়ে অনেক বেনারসী শাড়ীর দোকান ছিল, আমার মনে পড়ে একবার ছোড়দাদুর (দিদার ছোট ভাই দূর্গাপ্রসন্ন আচার্য্য, মা’র ছোটমামা) বড় মেয়ে রমা মাসীর বিয়ের বেনারসী কেনার ভার পড়েছিল মা’র ওপর। অনেক দোকান ঘুরে অনেক বাছাবাছি করে মা একটা বেশ দামী লাল বেনারসী পছন্দ করেছিলেন।
আমার ছোটবেলার কাশীর স্মৃতির মধ্যে বিশ্বনাথের গলিতে বেনারসী শাড়ীর দোকানে এক গাদা শাড়ীর পাহাড়, তার মধ্যে মা শাড়ী বেছে যাচ্ছেন, আমি পাশে বসে, আমার বয়েসী খুব মিষ্টি দেখতে একটি ছোট্ট মেয়ে – সম্ভবতঃ দোকানদারের মেয়ে – বিনুনী করে পরিপাটি চুল বাঁধা, একটা লাল ডুরে শাড়ি পরে এক পাশে বসে চুপ করে মা’র শাড়ী বাছা দেখতো, তাকেও ভুলিনি।
রাবড়ী, পান, আর সান্ধ্য নৌকাভ্রমণ
শাড়ী কিনে হোটেল ফেরার পথে বেনারসের বিখ্যাত রাবড়ী আর পান না খেলে কি করে হয়?
শেষে হোটেলে যখন পৌছলাম, তখনও বাইরে দিনের আলো। ঘরের পাশে বারান্দায় সামনে নদী দেখতে দেখতে চা খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আজও একটা নৌকা ভ্রমণ হলো। প্রায় রেল ব্রীজ পর্য্যন্ত চলে গেলাম আজ। তার পর মণিকর্ণিকা আর হরিশচন্দ্র ঘাটের শ্মশান দেখে অসি ঘাট পর্য্যন্ত গিয়ে ফিরলাম।
আজও রাত্রে দশাশ্বমেধ ঘাটে আর অসি ঘাটে গঙ্গারতি হচ্ছে দেখলাম, নদীর জলে আর ঢেউতে সেই আরতির আলোর ছায়া কাঁপছে।
দেখতে বেশ লাগছিল।
এবার মাত্র এক দিনের জন্যে কাশী এসেছিলাম আমরা। বড্ডই কম সময়। আর একটা দিন বেশী থাকলে আমরা সারনাথ আর রামনগরে কাশীর রাজার (নরেশ) প্রাসাদ আর দূর্গ দেখে আসতে পারতাম। কিন্তু এই ভাবেই এই ট্রিপ টা প্ল্যান করেছিলাম, তাই এখন আর কিছু করার নেই। পুপুকেও লন্ডনে ফিরতে হবে, তার ছুটি কম, ফেরার টিকিট ও কাটা হয়ে গেছে। কালকে দুপুরে আমাদের কলকাতার ফ্লাইট, পুপু আর আমি ঠিক করলাম যে ভোরবেলা দু’জনে মিলে নদীর ধার ধরে দশাশ্বমেধ ঘাট পর্য্যন্ত হাঁটবো।
৫) তৃতীয় এবং শেষ দিন
আজ আমাদের ফেরা। ব্রেকফাস্টের পরে হোটেল থেকে চেক আউট করে এয়ারপোর্ট।
তার আগে কথামতো ভোরবেলা আমি আর পুপু ঘুম থেকে উঠে একটু নীচে নদীর ধারে হেঁটে এলাম। একটার পর একটা ঘাট পেরিয়ে যাচ্ছি, নদীর ধারে লোকের ভীড় বাড়ছে, কিছু কিছু জায়গায় পূজোয় বসেছে পুরোহিতেরা, তাদের যজমানেরা তাদের ঘিরে গোল হয়ে বসেছে। অনেকের খালি গায়ে পৈতে, অনেকের মাথা ন্যাড়া। সবাই ধর্ম্মপ্রাণ হিন্দু। নদীর পাড়ে প্রায়ই চোখে পড়ছে লাল রং এর শিব মন্দির, আর মন্দিরের পাশে বট বা অশ্বথ গাছ, তাদের ডালে বাঁদরের দল।
“নৌকা চড়বেন বাবু?” বলে অনেক বোটের চালকরা এসে আমাদের ধরছে। নদীতে অনেক মাছধরা নৌকা। মাছের লোভে তাদের পিছন পিছন উড়ে যাচ্ছে সাদা সারস পাখীরা।
অনেকটা দূর হেঁটেছিলাম আমরা দু’জন সেদিন।
হরিশ্চন্দ্র আর মণিকর্ণিকা ঘাটে চিতাকাঠের স্তুপ রাখা। জ্বলন্ত চিতার ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস কিছুটা বন্ধ হয়ে আসে। মৃতের আত্মীয়রা এবং প্রিয়জনেরা মুখ ম্লান করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
ঘাটের পাশে উঁচু উঁচু লাল রং এর সব বড় বড় বাড়ী। অনেক দূরে কিছুটা ছায়ায় ঢাকা রেল ব্রীজ। নদীর ওপারে চর, সেখানে গাছপালার মাঝে কিছু ঘরও চোখে পড়ে। ওই চরেও মানুষ বাস করে? কি জানি, হবেও বা।
সেদিন সকালে পুপুর সাথে কাশীর ঘাটে অনির্দিষ্ট ভাবে ঘুরে বেড়ানোর সময় মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলায় আমি আর আমার সমবয়েসী মাসতুতো ভাই রঞ্জু এরকম সারাদিন কাশীর ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াতাম।
একবার ছিলাম শুধু আমি আর মা। সেদিন বোধহয় মাসীরা সবাই ফিরে গেছেন, বাড়ীতে শুধু আমি আর মা। আমরাও পরের দিন ট্রেণ ধরে ফিরে যাবো। তাই আমাদের মন খারাপ।
মা বললেন চল্ মান্টু আমরা দু’জন নদীর ধারে একটু বেড়িয়ে আসি। সাধারণতঃ কাশীতে গেলে আমি মা’কে কখনো একা পেতামনা। আশে পাশে অনেকে থাকতো, দিদা, মাসীরা। তাছাড়া মা’র মধ্যে ভালবাসার প্রকাশ তেমন ছিলনা। জড়িয়ে ধরা বা মাথায় হাত বোলানো, বা আদর করা, এই সব মা’র স্বভাবে ছিলনা। বরং কারণে অকারণে তাঁর শাসনেই আমি বেশী অভ্যস্ত ছিলাম।
এখনো মা’র সঙ্গে কাটানো সেই পড়ন্ত সন্ধ্যয় কাশীর গঙ্গার ঘাটে হাঁটার কথা মনে পড়ে। বোধ হয় চৌষট্টি ঘাট থেকে দশাশ্বমেধ ঘাট পর্য্যন্ত হেঁটেছিলাম আমরা দু’জন। কিছু কি কথা হচ্ছিল আমাদের মা আর ছেলের মধ্যে? দুজনের পৃথিবী আলাদা, দুজনেই হয়তো নিজের নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিলাম।
সেদিন আমার জন্যে একটা অপ্রত্যাশিত আনন্দ অপেক্ষা করে ছিল।
ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একটি লোক গুড় আর বাদামের মিষ্টি চাকতি বিক্রী করছিল। আমার বোধ হয় একটু লোভ হয়ে থাকবে, কিন্তু আমি না চাইতেও মা আমায় একটা চাকতি কিনে দিয়েছিলেন। কি জানি হয়তো লোভী চোখে তাকিয়েছিলাম, মা লক্ষ্য করে থাকবেন। বেশী দাম ছিলনা, এক আনা বা দুই আনা হবে, কিন্তু সেই যুগে হয়তো অনেক। ছোটবেলায় ওই সব খাবার খুব প্রিয় হয়, নিজে কিনে খাবার তো সুযোগ ছিলনা, সেই জন্যেই হয়তো।
খুব ভাল লেগেছিল মনে পড়ে। আবার একটু হালকা অস্বস্তিও হয়েছিল, কেননা ওই বয়সেও আমি জানতাম আমরা গরীব, জীবিকার জন্যে মা’কে চাকরী করতে হয়, মা’র কাছে হয়তো এটা একটা বাজে খরচ, তাছাড়া রাস্তার জিনিষ কিনে খাওয়াও তো মা পছন্দ করেননা।
কিন্তু আজ নিজে থেকেই …
মা’র কাছ থেকে তাঁর এরকম অপ্রকাশ্য অন্তঃসলিলা ভালবাসা পাবার আরও অনেক অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, কিন্তু কাশীর ঘাটে সেই সন্ধ্যায় আমায় বাদামের চাকতি কিনে দেবার ঘটনাটা এই জন্যে এখানে লিখলাম যে এতদিন পরে বার্দ্ধক্যে পৌঁছে কাশীর ঘাটে এখন আমি আর আমার মেয়ে পুপু। সে এখন আমার জীবনে আমার মা’র জায়গাটা নিয়ে ফেলেছে। আমার মা’র মতোই আমার প্রতি তার অকৃত্রিম আর শর্ত্তহীন ভালবাসা। তবে সেই ভালবাসা আর তার দুশ্চিন্তা অবশ্য অনেক বেশী প্রকাশ্য।
যাই হোক, দু’জনে মিলে অনেকটা হাঁটলাম সেদিন ভোরে। হোটেলে ফিরে এসে স্নান সেরে মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে চেক আউট করে বেরিয়ে পড়লাম।
হোটেলের লোকেরা আমাদের মাল পৌঁছে দিল বড় রাস্তায়, সেখানে তার গাড়ী নিয়ে অপেক্ষা করছিল ভোলা। সে আমাদের পোঁছে দিল কাশী এয়ারপোর্টে।
হোটেলের দুই কর্মচারী আর ড্রাইভার ভোলার সাথে ফেরার দিন
আমরা কুয়েতের বন্ধুরা শ্রীলঙ্কা বেড়াতে এসেছি। কুয়েত থেকে রাতের ফ্লাইট ধরে ভোর চারটে তে আমরা কলম্বো তে land করলাম। কলম্বো এয়ারপোর্ট টা বেশ ভালই লাগল, অত ভোরে ভীড় ও কম, ভিসা আগে থেকেই করা ছিল, তাই ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার করে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে আসতে বেশী সময় লাগলোনা আমাদের কারুর। সবাই এক এক করে বেরিয়ে এসে একটা বিরাট হলঘরে জড়ো হলাম, সেখানে আমাদের জন্যে একটা বোর্ড হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আমাদের ট্র্যাভেল এজেন্ট Jet Wing Travel থেকে আসা একটি যুবক। বোর্ডে লেখা “Mr. Prodosh Mitra and Party”!
ছেলেটির নাম সুভাষ। বেশ চেনা বাঙালী নাম। তবে সে অবশ্য তামিল। এই ট্রিপে সে আমাদের গাইড। সুভাষ কে আমাদের বেশ ভাল লেগে গেল, সে বেশ প্রিয়দর্শন এবং আলাপী , তার কথাবার্ত্তা বেশ ভদ্র। অত সকালেও এয়ারপোর্টে দোকানপাট সব খোলা, ওখানকার স্থানীয় টাকা তোলা, টেলিফোনের সিম কার্ড কেনা ইত্যাদি নানা কাজে প্রথম থেকেই সুভাষ এই সব নানা কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো।
তারপর বাইরে গিয়ে বাসে ওঠা। বেশ বড় বাস। আমরা যে যার মতো যে যেখানে পারি সীট নিয়ে বসে পড়লাম।
আজ আমরা ক্যান্ডি যাবো। সারা রাত প্লেনে ঘুম হয়নি, চোখ জ্বালা করছে, সুভাষ বললো তোমাদের কাছেই নিগম্বো নামে একটা শহরে আমাদের একটা হোটেলে নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে তোমরা স্নান করে ব্রেকফাস্ট সেরে নাও। তারপর আমরা ক্যান্ডি রওনা হব।
বাসের জানলা দিয়ে ঘুম চোখে বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম, কলম্বো শহর ছাড়িয়ে এসেছি, জায়গাটা বেশ লাগছে, পরিস্কার রাস্তা, পাশে সুন্দর ছিমছাম বাড়ি, প্রায় সব বাড়ীর সামনে গেটের পাশে বুগনভিলিয়ার ঝাড় লালে লাল হয়ে ফুটে আছে। দক্ষিণ ভারতের (কেরালা, তামিলনাডু) সাথে মিল আছে আমার মনে হলো, যেন আমরা মাদুরাই বা কোয়েমবাটোরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি।
এদিকে সুভাষ একটা মাইক হাতে নিয়ে তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। প্রথমে নিজের সম্বন্ধে কিছু কথা, তার দুই মেয়ে, তাদের মধ্যে একজনের আবার আজই জন্মদিন! মেয়ের জন্মদিনে সে থাকতে পারছেনা, আমরা সমবেদনা জানালাম।
তার পরে শ্রীলঙ্কার ইতিহাস। সেই বুদ্ধদেবের সময় থেকে শুরু।
শুনতে শুনতে ঘুম পেয়ে যাচ্ছিল, মাঝে মাঝে রামায়ণের যুগের কথা ভাবছিলাম। ছোটবেলায় আমার রামায়ণের বইতে দুটো ছবির কথা আমার খুব মনে পড়ে। এক হলো হনুমান তার ল্যাজে আগুণ লাগিয়ে লঙ্কা শহরে এক বাড়ির ছাদ থেকে আর এক বাড়ির ছাদে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর অন্য ছবিটা অশোকবনে সীতা, একটা গাছের তলায় বেদীতে বসে। তার চারিপাশে অনেক মহিলা, তারা সবাই মানুষের মতোই দেখতে, তাদের রাক্ষুসী বলে মনেই হয়না। একজন তো বেশ সুন্দরী, তিনি নিশ্চয় বিভীষণের বৌ সরমা।
এই অশোকবনটা কোথায়? সেখানে একবার গেলে হয় না?
আমাদের ছোটবেলায় Ceylon Radio খুব জনপ্রিয় ছিল, শ্রীলংকার নাম ছিল সিংহল।
আমাদের মধ্যে অমিতাভর ইতিহাস এর জ্ঞান সবচেয়ে বেশী, সে বলল সিংহল নামটা এসেছে বাংলার রাজা বিজয় সিংহের নাম থেকে। এই নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের বিখ্যাত কবিতা আছে।
অমিতাভর প্রায় পুরো কবিতা টা মুখস্থ, সে গড়গড় করে আবৃত্তি শুরু করে দিলঃ
আমাদের ছেলে বিজয় সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়/
সিংহল নামে রেখে গেল নিজ শৌর্য্যের পরিচয়/ ইত্যাদি।
এই সব হতে হতে আমরা নিগম্বো পৌঁছে গেলাম। সমুদ্রের তীরে Jet Wing Group এর বিরাট হোটেল।
আমি তুতু কে বললাম বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে তার সাথে নিগম্বোর খুব মিল, বলো তো কি? আমাদের সকলের শরীরে ওই জিনিষটা আছে।
তুতু ঝঙ্কার দিয়ে উঠে আমায় এক ধমক দিয়ে বলে উঠলো জানি জানি, তোমাকে আর বলতে হবেনা।
এ কি রে? দিল্লীর মেয়ে হয়ে তুতু বাংলা এত ভাল জানলো কি করে?
২) মানবিক আর পাশবিক
নিগম্বোর হোটেল টা বেশ লাগলো আমাদের, স্নান টান সেরে রাতজাগার ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে ব্রেকফাস্ট করতে নেমে এলাম সবাই রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টের বিরাট কাঁচের জানলা দিয়ে দেখা যায় পাশেই বিরাট সমুদ্রসৈকত, ধূ ধূ বালি, তার মধ্যে জেলেরা তাদের জাল শুকোচ্ছে, কিছু নৌকা ও সেই বালির মধ্যে দেখা গেল।
আজকে আমরা ক্যান্ডি যাবো । রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত শহর।
ক্যান্ডি যাবার পথে অনেক গুলো স্টপ্ যার মধ্যে প্রথম হল পিনাওয়ালা হস্তী অনাথ আশ্রম (Elephant Orphanage), United Nations এর হেরিটেজ সাইট্, পৃথিবীর বৃহত্তম Elephant reserve, এবং পর্য্যটকদের জন্যে শ্রীলঙ্কার একটি অন্যতম বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান।
নিগম্বো থেকে পিনাওয়ালা খুব বেশী দূর নয়, ঘণ্টা দেড়েকের পথ। এঁকেবেঁকে রাস্তা চলে গেছে, গ্রামাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে, দু’দিকে সবুজ পাহাড়, মাঝে মাঝে পথের পাশে চালাঘর আর দোকান, কিছু হোর্ডিং ও চোখে পড়লো, তাতে শাড়ি আর গয়নার বিজ্ঞাপন, শ্রীলঙ্কার সুন্দরী মেয়েরা সেজেগুজে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের চোখে তাদের আহামরি কিছু সুন্দর লাগছেনা যদিও। মাহিলা জয়বর্ধন আর কুমার সঙ্গকারার কিছু ছবি ভেবেছিলাম দেখবো, কিন্তু না, আমাদের দেশের মত এখানে ক্রিকেটাররা মডেলিং এ আসেনি, তারা মন দিয়ে তাদের খেলাটাই খেলছে।
হাতি দের নিয়ে মানুষের মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি আছে, তার প্রধান কারণ বোধহয় তাদের ওদের বিরাট শারীরিক আয়তন। পৃথিবীর অন্যান্য জীবজন্তুর সাথে তুলনা করলে হাতিদের কেমন যেন আলাদা বলে মনে হয়, অতবড় শরীর, লম্বা শুঁড়, তারা যেন সেই আদিম ডাইনোসরদের বংশধর, মানুষের বহু আগে থেকে তারা এই পৃথিবীতে বাস করছে। ফলে মানুষদের থেকে আরো লম্বা সময় ধরে তাদের বিবর্তন (evolution) হয়েছে ধরে নেওয়া যায়।
আমাদের এই পৃথিবীতে মানুষের সাথে বসবাস করছে অসংখ্য জীব জন্তু, পতঙ্গ, পাখী, জলচর প্রাণী, মানুষের মতই তারাও লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পেরিয়ে এসেছে বিবর্তনের নানা ধাপ। আমরা সাধারণ মানুষেরা তাদের সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানিনা, চিড়িয়াখানায় তাদের খাঁচায় বন্দী অবস্থায় অথবা জঙ্গল সাফারীতে জীপে চড়ে অভয়ারণ্যে প্রকৃতির কোলে তাদের নিজেদের স্বাধীন পরিবেশে দেখি। একই পৃথিবীতে মানুষের সাথে এদের বাস, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তাদের কোন ভূমিকা নেই।
আমরা সভ্য মানুষেরা আমাদের মন অনূভূতি আর মস্তিষ্ক আছে বলে গর্ব্ব করি, পৃথিবীর জীবজগত কে আমাদের সমকক্ষ বলে মনে করিনা। আমাদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল যে আমরা হলাম বুদ্ধিমান আর মানবিক, আর ওরা হলো বুদ্ধিহীন, পাশবিক, হিংস্র। প্রকৃতি এবং বিবর্ত্তন ওদের আমাদের সমতুল্য করে তৈরী করেনি।
প্রানীবিজ্ঞানীরা কিন্তু আমাদের চারিপাশের জীবজগতের নানাবিধ কান্ডকারখানা দেখে একান্তভাবেই বিস্মিত এবং অভিভূত।
পরিযায়ী পাখিরা অথবা কিছু জাতের প্রজাপতি কি আশ্চর্য্য দক্ষতায় লক্ষ লক্ষ মাইল আকাশে পরিক্রমা করে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যায়। অলিভ রিডলি কচ্ছপেরা বছরের পর বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসে ডিম পেড়ে সমুদ্রে ফিরে যায়। ফুলেরা ঠিক এক সময়ে সকালে অথবা বিকেলে নিয়ম করে ফুটে ওঠে প্রজাপতিদের আকর্ষন করার জন্যে।
এসব কি করে হচ্ছে? এর থেকে কি প্রমাণ হয়না যে প্রাণীদের মধ্যেও মানুষের মতই সময় আর দিক নির্নয় করার ক্ষমতা আছে, নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক ভাব প্রকাশ ও বিনিময়ের একটা ভাষাও তাদের মত করে আছে?
বন্য প্রাণীদের নিয়ে জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞানে এখন অনেক গবেষনা হচ্ছে, এবং নানা জায়গায় বিজ্ঞানীরা এই তথাকথিত “মনুষ্যেতর” প্রাণীদের মধ্যে এক অদ্ভুত ও সূক্ষ্ম “মানবিক” ব্যবহার দেখতে পাচ্ছেন। অনেক জীবের মধ্যেই তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন ভালবাসা, মাতৃপ্রেম, সহানুভূতি, সংবেদনশীলতা, পরোপকার এমনকি আত্মদান, যা আমরা আমাদের নিজেদের একচেটিয়া বলেই এতদিন ভেবে এসেছি।
পাশবিক কথাটা এসেছে পশু থেকে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাশবিকতা ক্রুরতা হিংসা ইত্যাদি নানা বিশ্রী দোষ পশুদের তুলনায় মানুষের মধ্যে অনেক বেশী।
হাতিদের নিয়ে ও অনেক গবেষনা হয়ে চলেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে হাতি একটি অতি মহান, বুদ্ধিমান এবং সামাজিক প্রাণী। অতবড় শরীর সত্ত্বেও তারা প্রচন্ড agile, উঁচু পাহাড়ে তারা দরকার পড়লে তরতর করে উঠে যেতে পারে। তাদের ওই দুলকি চালে হাঁটা দেখে মনে হয় তারা বেশ নিরীহ প্রাণী। সহজেই তাদের পোষ মানানো যায়। আমাদের ছোটবেলায় কলকাতা চিড়িয়াখানায় হাতির পিঠে চড়া হতো। একটা কনক্রীটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে একটা প্ল্যাটফর্মে উঠে আমরা ছোটরা হাতির পিঠে উঠে সারা চিড়িয়াখানা ঘুরে বেড়াতাম। এখন বোধ হয় হাতির পিঠে চড়া বন্ধ হয়ে গেছে।
জয়পুরে অম্বর প্যালেসেও হাতির পিঠে চড়ে ওপরে ওঠার আর নীচে নামার বন্দোবস্ত আছে। সেখানেও ভয় করেনি, বরং দুলুনী টা বেশ ভাল ই লেগেছে। দক্ষিণ ভারতে – কেরালা বা তামিলনাডূতে তো মন্দিরে, পথে ঘাটে অনেক পোষমানা হাতি চোখে পড়ে। আমাদের দেশে সার্কাসে ও অনেক হাতির খেলা দেখেছি। ব্যাঙ্ককে একবার হাতিদের ফুটবল খেলতে দেখেছিলাম।
কিন্তু বন্য হাতি দের একটু ভয় পেতেই হয়, এমনিতে শান্ত হলে কি হবে তারা হঠাৎ কোন কারণে একবার রেগে গেলে খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তখন তারা মানুষকে পায়ের তলায় পিষে মেরে ফেলে, শুঁড় দিয়ে তুলে মাটিতে আছাড় মারে। “মদমত্ত হস্তী” কথাটা সেখান থেকেই এসেছে। মদ ঠিক রাগ নয় যদিও, মদ হলো ক্ষমতার অহঙ্কার, তবু একটা রিপুই তো। সব প্রাণীদের মত হাতিরাও রিপুর শিকার। বাংলার পুরুলিয়া বাঁকুড়া জেলা আর ঝাড়খণ্ড ওডিশার বর্ডারে দলমা বলে একটা জায়গায় জঙ্গল থেকে অনেক হাতি মাঝে মাঝে লোকালয়ে চলে আসে। তখন মানুষের সাথে তাদের নানা ভাবে সংঘাত শুরু হয়, শস্যের ক্ষেত লন্ডভন্ড করে তারা চলে যায়, রেল লাইনে কাটা পড়ে মারা যায় কিছু হাতি। খবরের কাগজে সেই ছবি দেখি।
আমাদের বাংলার হাতি বিশারদ ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী আমাদের দেশের হাতিদের নিয়ে বিশদে গবেষনা করেছেন। তাঁঢ় লেখা গবেষনা পত্র ও বইতে তিনি হাতিদের স্বভাব, জীবনযাত্রা, এবং ব্যবহার সম্পর্কে এমন সব অনেক অজানা তথ্য জানিয়েছেন, যা অবাক করার মত।
তাঁর লেখা পড়ে জানা যায় যে হাতিদের মনে এমন একটা সহানুভূতি আর কোমল দিক আছে, যা কেবল মাত্র মানুষদের সাথে তুলনীয় বলে অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন। সম্প্রতি একটি লেখা পড়ে জানলাম যে প্লেনে করে হাতিদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে যাবার সময় তাদের মাঝখানে নাকি অনেক মুরগীর ছানা রেখে দেওয়া হয়।
কেন?
কারণ হাতিরা নাকি যাতে তাদের ভারী পায়ের চাপে সেই সব মুরগীর ছানারা চাপা পড়ে মারা না যায়, সেই ভয়ে সারাটা সময় তারা নাকি একেবারে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু ও নড়াচড়া করেনা। যার ফলে প্লেন আকাশে উঠলেও কোন কাঁপন বা ঝাঁকুনী অনুভূত হয়না।
ছোট ছোট মুরগী ছানাদের প্রতি হাতিদের এই আচরণ মানবিক ছাড়া আর কিই বা বলা যায়?
বিজ্ঞানীরা হাতির ব্রেণে এমন সব নিউরন পেয়েছেন, যা কিনা মানূষের ব্রেণের নিউরণের সমতুল্য।
Fascinated by their noble nature, scientists have studied the elephant’s brain and discovered spindle cells—rare neurons also found in humans.These are associated with self-awareness, empathy, and complex social perception.
In other words, an elephant is not only physically huge; it’s an emotional giant, too। It feels, understands, and acts with a silent wisdom.
কিন্তু হাতিদের নিয়ে যে কথাটা আমাদের সবাইকে বিস্নিত করে, তা হলো এই যে যখন হাতিরা বুঝতে পারে যে তাদের মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, তখন তারা দল ছেড়ে বিজন কোন জায়গায় চলে যায়, যেখানে তারা একাকী মৃত্যুবরণ করে।
কেন?
বিজ্ঞানীরা বলেন যাতে ছোটরা তাদের মৃত্যু দেখে কষ্ট না পায়।
তাদের মনে এত সমবেদনা, এত সহমর্ম্মিতা? এ তো আমাদের মানুষদের মতোই, কিংবা হয়তো আরো বেশী।
মানুষ এবং জীবজগতে অন্যান্য অনেক প্রাণীর মত হাতিরাও সমাজবদ্ধ জীব, তারা দলবদ্ধ হয়ে থাকে, এবং যেখানেই যায় দলপতিকে অনুসরণ করে যায়। আমি কেনিয়ার তৃণভূমি (সাভানা) আর দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কে দলবদ্ধ হাতির গজেন্দ্রগমন প্রত্যক্ষ করেছি। সে এক অভাবনীয় সুন্দর দৃশ্য।
৩) পিনাওয়ালা হস্তী অনাথাশ্রম – হাতিদের স্নান
আমাদের বাস পিনাওয়ালা তে এসে দাঁড়ালো।
১৯৭৮ সালে পাঁচটি অনাথ (orphan) বাচ্চা হাতি কে নিয়ে পিনাওয়ালার এই অনাথ আশ্রমের কাহিনীর শুরু, এখন হাতিদের সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আশি। প্রতি বছর এখান থেকে কিছু হাতি মন্দির বা চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় পঞ্চাশ জন মাহুত ওই হাতিদের দেখাশোনা করে।
শ্রীলঙ্কার জঙ্গলে এক সময় তিন হাজারের ও বেশী হাতি ছিল, প্রধানতঃ Poaching এর জন্যে তা ক্রমশঃ কমতে থাকে। অনাথ শিশু হাতিদের দেখভাল করা তো বটেই, তা ছাড়াও এই Orphanage তৈরী করার পিছনে একটা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হাতিদের বংশরক্ষা, প্রতিপালন আর বংশবৃদ্ধি (conservation আর breeding), সেই উদ্দেশ্য এখন স্পষ্টতই সফল।
ধৃতিকান্ত লাহিড়ী মশায় লিখেছেন একটি বাচ্চা হাতি নাকি কোনভাবে একবার দলছুট হয়ে লোকালয়ে এসে গিয়েছিল, তাকে গ্রামবাসীরা বিপন্ন অবস্থায় দেখে দুধ টুধ খাইয়ে আবার তাকে দলের কাছে ফিরিয়ে দিতে গিয়েছিল, কিন্তু সেই দলে তাকে আর ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি। তার গায়ে নাকি মানুষের গন্ধ লেগে গিয়েছিল!
এই খবরটা পড়ে সেই শিশু হাতিটির জন্যে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল মনে আছে, আর তার মা’র জন্যেও। হাতিদের যূতবদ্ধ দলীয় বা পারিবারিক জীবনে নানা অলিখিত নিয়ম আছে, যা পরিবারের বা দলের সবাই কে মেনে চলতে হয়। ওই মা’কেও তাই সেই নিয়ম মেনে তার শিশুটিকে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।আহা রে!
বেচারা!
পিনাওয়ালার শুরুটাই অনাথ শিশু হাতিদের নিয়ে, তাদের সবার গায়েই মানুষের গন্ধ লেগে গেছে, তারা আর কোন দিন বনে ফিরে যেতে পারবেনা।
চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা ছোট গ্রাম পিনাওয়ালা, সেই গ্রামে দশ hectare মত জায়গা নিয়ে একটা নারকেলের plantation, তার ভেতরে গড়ে উঠেছে এই বিখ্যাত হস্তী অনাথআলয়।
মেন বাস রাস্তা থেকে দেখলাম একটা গলি ঢুকে গেছে ভেতরে, সেখানে সারি সারি দোকান, টুরিস্ট দের ভীড়, ফেরিওয়ালা রা “এটা নেবেন স্যার, ওটা নেবেন স্যার” বলে চারিদিকে ঘোরাঘুরি করছে। সুভাষ বলল ওই গলি দিয়ে একশো মিটার মত এগোলেই Maha Oya, ওয়া নদী, সেখানে রোজ সকালে বিকেলে হাতির দল কে স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাস্তা ক্রস করে দল বেঁধে আমরা গলিতে ঢুকে পড়লাম। দু’পাশে দোকান, তাতে প্রায় সব জিনিষেই হাতির মোটিফ আঁকা। সে শাড়ি হোক কি গয়না, কি ঘর সাজাবার জিনিষ। হস্তীশিল্প যাকে বলে।
হাতির dropping (বাংলায় হাগু) শুকিয়ে chemically treat করে তাই দিয়েও নানা জিনিষ তৈরী করে বিক্রী করছে লোকে। একটা দোকানের সাইনবোর্ডে দেখি একটা বাচ্চা হাতির ছবি, সে একটা কমোডের ওপর বসে পটি করছে। নন্দাকে সেই সাইনবোর্ড টা দেখাতেই সে “উঁ হুঁ! ইন্দ্রজিৎ!”, বলে নাকে শাড়ির আঁচল দিয়ে Vibration mode এ চলে গেল। নন্দার একটু শুচিবাই আছে, নোংরা কিছু দেখলে বা শুনলে গা ঘিনঘিন করে, সে তখন Vibration mode এ চলে যায়, সেটা দেখার জন্যে আমরা প্রায়ই মজা করে তার সামনে নানা গা ঘিনঘিন করা কথা বলি।
গলির শেষে এসে দেখি বেশ খোলা একটা জায়গা, পাথরের টিলার মধ্যে দিয়ে ওয়া নদী বয়ে যাচ্ছে, জল বেশী গভীর নয়, এক পাল হাতি সেই ওয়া নদীর জলে গা ডুবিয়ে স্নান করছে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য।
হাতিদের সম্বন্ধে ইউরোপের রেনেসাঁস যুগের বিখ্যাত শিল্পী বিজ্ঞানী ও দার্শনিক লিওনার্ডো দা ভিঞ্চি এর স্মরনীয় উক্তি ছিলঃ
The elephant embodies righteousness, reason, and temperance. The elephant enters the river and bathes with a certain dignity, as if wishing to purify itself from all evil.
লিওনার্ডো বর্ণিত হাতিদের সেই পুণ্য স্নান আমরা দু’চোখ ভরে দেখলাম অনেকক্ষণ ধরে। বিশেষ করে ভাল লাগলো বেশ কিছু শিশু হাতিকে দেখে। তারা তাদের মা’দের পিছনে কিছুটা মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছোট শুঁড় দিয়ে জল ছিটিয়ে আরাম করে স্নান করছে।
আধঘণ্টা মত থাকার পরে হঠাৎ মাইকে ঘোষনা করে সবাইকে জানানো হলো, এবার স্নান শেষ , রাস্তা দিয়ে হাতিদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, তাই রাস্তা খালি করুন। ওদের পথ ছেড়ে দিন।
সরু গলি, দু’পাশে দোকান আর মানুষজন, তার মধ্যে দিয়ে লাইন বেঁধে ওই বিশাল হাতিরা হেলতে দুলতে মাহুত দের পিছনে বাধ্য ছেলের মত ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, কোন বিশৃঙ্খলা নেই, কোন হুড়োহুড়ি নেই, কেমন যেন একটা অবিশ্বাস্য surreal দৃশ্য বলে আমার মনে হলো।
স্বপ্নের মত অনেকটা।
মেন রাস্তা ক্রস করে হাতির দল রাস্তার ওপাশে নারকেল গাছের বনে ঢুকে গেল, সেখানেই ওদের আস্তানা বোধ হয়, আমরা তাদের পিছন পিছন বেরিয়ে এসে আমাদের বাসে ওঠার আগে পাশে একটা দোকানে ঢুকে কিছু কেনাকাটা করে শেষে জমিয়ে ডাবের জল খেলাম ঢকঢক করে।