

১
১৯৬১-৬২ সালে বাবা কলকাতায় থাকাকালীন নিজের জীবনস্মৃতি লিখতে শুরু করেন। একটা ফুলস্ক্যাপ কাগজের বাঁধানো খাতায় অফিস থেকে ফিরে রাত্রের দিকে আমাদের মনোহরপুকুরের ঘরে আমার পড়ার টেবিলে বসে তিনি নিয়ম করে লিখতেন। কালো ফ্রেমের চশমা পরে তিনি মন দিয়ে লিখে চলেছেন, মাঝে মাঝে আমায় পড়িয়ে শোনাচ্ছেন কিছু মজার কাহিনী বা খেলাধূলার কথা, এই দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসে।
বইটির নাম তিনি দিয়েছিলেন “পূর্ব্বাচল”।
নিজের বাল্য, কৈশোর আর যৌবনের নানা ঘটনা তিনি এই স্মৃতিকথায় সযত্নে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এই স্মৃতিকথা তিনি লিখেছেন নিজের জীবনের উন্মেষের দিন গুলো থেকে শুরু করে যৌবনে তাঁর কলেজ জীবনের দিন পর্য্যন্ত। সময়ের ক্রম অনুসারে তিনি তাঁর লেখা পরিচ্ছেদে ভাগ করে গুছিয়ে সাজিয়েছেন, যা থেকে মনে হয় তাঁর এই স্মৃতিকথা তিনি বই হিসেবে ছাপানোর কথা ভেবেছিলেন, যদিও শেষ পর্য্যন্ত তাঁর জীবৎকালে তা সম্ভব হয়নি। তবে ১৯৬৩ সালের শে্ষে বিশাখাপত্তনমে বদলী হবার আগে তিনি লেখাটা শেষ করেছিলেন।
বাবা পূর্বাচল শুরু করেছেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটি লাইন দিয়ে।
“পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়, পথের দু’পাশে আছে মোর দেবালয়।”
অর্থাৎ তাঁর কাছে গন্তব্য নয়, জীবনের যাত্রাটাই আসল, এবং সেই যাত্রায় তিনি যাঁদের কাছে পেয়েছেন, তাঁরাই তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছেন।
এই দুটি লাইনের মধ্যে বাবার সাহিত্যবোধ আর রবীন্দ্রনাথের লেখার সাথে পরিচিতি আর অনুরাগের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বাবার এই স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে তাঁর চারিপাশের যৌথ পরিবারের অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, এবং বন্ধুবান্ধব। বাবা পূর্ব্বাচল না লিখলে এঁদের মধ্যে অনেকেই চিরতরে আমাদের অপরিচিত থেকে যেতেন। আমাদের পূর্ব্বপুরুষদের জীবনের তথ্যভান্ডার হিসেবে পূর্ব্বাচল তাই আমাদের পরিবারের জন্যে একটি মহামূল্য সম্পদ।
ফেলে আসা জীবানের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় – কত ছোটখাটো এবং আপাত কিঞ্চিৎকর ঘটনা পরিণত বয়েসেও তাঁর স্মরণে ছিল ভাবলে অবাক হতে হয়। স্কুলের সহপাঠী বন্ধুর অচল আধুলি ভাঙিয়ে দেওয়া, পুকুরে সাঁতার শেখা, মিথ্যে কথা বলে বাবার কাছে বেতের বাড়ী খাওয়া, আড়িয়াল খাঁ নদীতে নৌকা ভেসে যাওয়া, ইত্যাদি এই সব গল্প তিনি আমাদের মুখে মুখেও অনেকবার শুনিয়েছেন। তাছাড়া পূর্ব্বাচলে আছে তাঁর খেলোয়াড় জীবনের অসংখ্য কাহিনী। এবং অবিভক্ত বাংলাদেশের কথা – ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, বাঁকুড়া, খুলনা, দিনাজপুর, রংপুর, রাজসাহী এই সব নানা শহর আর মফঃস্বল ছবির মত উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।


মাদারীপুর, ১৯১৯ সাল, আড়িয়াল খাঁ নদীতে বাবা ও ভজা জ্যেঠুর কান্ডকারখানা
২
বিশাখাপত্তনমে যাবার আগে সেই বাঁধানো খাতাটি তিনি মা’র কছে রেখে যান্। সেই পান্ডুলিপি পড়লে পাঠক হিসেবে যে কথাটি প্রথমেই মনে হয় তা হলো যে রুল টানা খাতায় পাতার পর পাতা লেখা হয়েছে, সেই লেখার ভাষা ঝরঝরে, হাতের লেখা চমৎকার, আর সারা পান্ডুলিপি তে একটাও কাটাকুটি নেই। মনে হবে হয়তো আগে ড্রাফট লিখে কাটাকুটি করে পরে আবার পরিস্কার করে লেখা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি বাবা একবারেই পুরো লেখাটা লিখেছিলেন, সমস্ত লেখাটাই তাঁর মনের মধ্যে ছবির মত ধরা ছিল।
আমার কাছে এ এক অসামান্য ক্ষমতা।
অবশ্য আমরা জানি যে সাহিত্যে বাবার ঝোঁক ছিল। ইংরেজী ও বাংলা দুই ভাষাতেই তাঁর অনায়াস দক্ষতা ছিল। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা নিয়মিত পড়তেন। বাবার লেখা নানা ছোটগল্প ও কবিতা ত্রিশ দশকে পূর্বাশা ও শনিবারের চিঠি এবং অন্যান্য নামী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া কলেজ জীবন থেকেই তাঁর বাংলায় আর ইংরেজী দুই ভাষাতেই দিনলিপি লেখার অভ্যেস ছিল। তাছাড়া জীবনের অনেকটা সমইয় কাজে কলকাতা থেকে বাইরে থাকার জন্যে তিনি নিয়মিত আমাদের পোস্টকার্ড বা ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি লিখতেন। আমার কাছে এখনো তাঁর অনেক ডায়েরী আর চিঠি জমানো আছে।
পূর্বাচল বইটি তাঁর এই লেখার অভ্যসের ফলশ্রুতি।
বিশাখাপত্তনমে বাবার শরীর ক্রমশঃ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রমোশন পেয়ে মাদ্রাজে Customs Collector হিসেবে কাজে যোগ দেন, এবং সেখানে অল্প কিছুদিন পরে তাঁর শরীরে দুরারোগ্য ক্যান্সার (মাইলোমা) ধরা পড়ে। তাঁকে চিকিৎসার জন্যে কলকাতায় আনানো হয়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
১৯৬৫ সালের ২৮শে জুলাই তিনি মাত্র ৫৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।


মা’কে বই উপহার আমাকে চিঠিতে কবিতায় উপদেশ
পূর্ব্বাচল শেষ পর্য্যন্ত ছাপা হয় প্রায় কুড়ি বছর পরে ১৯৮১ সালে। বেঁচে থাকলে বাবার তখন বয়েস হতো সত্তর বছর।
IIT খড়্গপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে আমি ১৯৭১ সালে কলকাতায় IBM এ কাজে যোগ দিই। কিন্তু সেখানে দশ বছর কাজ করার পরে দেশে ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ নিয়ে ভারত সরকারের সাথে বনিবনা না হওয়ায় IBM দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। তার ফলে আমার এবং আমার সহকর্ম্মী দের সবার চাকরী চলে যায়। আমরা সকলে নতুন কাজ খুঁজতে শুরু করি।
১৯৮১ সালে আমার কুয়েতে একটা নতুন কাজে যোগ দেবার সুযোগ আসে।
দেশ ছেড়ে যাবার সময় আমার গাড়ীটা বিক্রী করে আমি কিছু টাকা পাইএবং সেই টাকার কিছুটা অংশ দিয়ে আমি পূর্ব্বাচল ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিই।
বিখ্যাত কবি তারাপদ দা’ (রায়) হলেন বাবাদের আপন পিসতুতো ভাই এর ছেলে। সেই সুবাদে তখন আমার সাথে তাঁর বেশ ভাল আলাপ। মাঝে মাঝেই তাঁর পন্ডিতিয়া রোডের বাড়ীতে গিয়ে আমি আর সুভদ্রা তাঁর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে আসি। তিনি তখন “কয়েকজন” নামে একটি লিটল্ ম্যাগাজিন ছাপান, কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে কলেজ স্ট্রীটের পাবলিশারদের সাথে তাঁর অনেক জানাশোনা।
তারাপদ দা’ কে পূর্ব্বাচল ছাপানোর কথা বলাতে তিনি আমায় নিয়ে একদিন কলেজ স্ট্রীটে অধুনা নামে একটি প্রেসের মালিকের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। আমি পূর্বাচলের পান্ডুলিপি – সেই বাঁধানো খাতাটা – ওনাকে দেখানোর জন্যে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুদিনের মধ্যেই কুয়েত চলে যাবো, তাই সেদিনই টাকপায়সা, প্রুফ দেখা, কত কপি ছাপা হবে, কত দিন লাগবে এই সব কথা হলো। আমি খোকনকে সেদিন সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি কুয়েত চলে যাবার পরে সে আর সুভদ্রা অধুনা প্রেসের মালিকের সাথে যোগাযোগ রাখতো।
তারপরে তো আমি কুয়েত চলে গেলাম।
সুভদ্রা বইটার প্রুফ দেখেছিল যত্ন করে তাই সারা বইতে ছাপার একটাও ভুল নেই। সেই কৃতিত্বের জন্যে অধুনা প্রেসের মালিক ও কর্ম্মচারীদেরও অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্য।
বই ছাপা হবার আগে কুয়েত থেকেই আমি একটা মুখবন্ধ লিখে পাঠিয়েছিলাম। তাছাড়া সুভদ্রাকে বলেছিলাম বই ছাপার আগে একটা draft copy তারাপদ দা’কে দেখাতে এবং তাকে পিছনের পাতায় একটা ব্লার্ব লিখে দিতে অনুরোধ করতে।
বইটি নিয়ে ছোট একটা ব্লার্ব লেখার শেষে তিনি লিখেছিলেনঃ
“এরকম দুঃখহীন, ঈর্ষাহীন স্মরণমালা কেবল একজন খেলোয়াড়ের পক্ষেই লেখা সম্ভব।”
বইটির সামনের কভারে তারাপদ দা’র পরামর্শে পান্ডুলিপির এক পাতার ছবি রাখা হলো। বাবার হাতের লেখা খুব ভাল ছিল, যদিও এক ফুটবল ম্যাচে একবার হেড করতে গিয়ে পড়ে তাঁর ডান হাতের কব্জির হাড় জখম হয়। তার পর থেকে লেখার সময় তিনি বুড়ো আঙুল ব্যবহার করতে কষ্ট পেতেন, কলমটা আলতো করে ধরে লিখতে হতো।
পিছনের কভারে ছাপা হলো বাবার একটি ছবি আর তারাপদ দা’র লেখা সেই ব্লার্ব।
বোধ হ্য় ২০০ মতো কপি ছাপা হয়েছিল। কুয়েত থেকে ছুটিতে কলকাতায় ফিরে আমি দেখি সব বই আমাদের ঘরে খাটের তলায় দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে, আর মা তাই নিয়ে রাগে অগ্নিশর্মা।
যতোটা সম্ভব আমি আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বইগুলো বিলিয়ে দিয়েছিলাম।
একবার উত্তরপাড়ায় মাধবকাকার বাড়ীতে গিয়ে ওঁদের বই এর আলমারীতে পূর্ব্বাচলের এক কপি সযত্নে রাখা আছে দেখে খুব ভাল লেগেছিল। কিছুদিন আগে সোনু লিখেছে পাটনা কালীবাড়ীতেও নাকি এক কপি পূর্ব্বাচল রাখা আছে সে দেখেছে। হয়তো বড়জ্যেঠু বা রাঙাকাকা রেখে থাকবেন। অন্যান্য অনেক আত্মীয় স্বজনের কাছে বইটি এখনো রাখা আছে হয়তো।
তবু বেশ কিছু বই খাটের তলায় থেকেই যায়। মানোহরপুকুরের বাড়ী বিক্রী হবার আগেই মা উইয়ে খাওয়া বইগুলো জঞ্জাল মনে করে ফেলে দিয়েছিলেন। আমার কাছে এখনো দুই কপি পূর্ব্বাচল পড়ে আছে। দুটো বইয়ের অবস্থাই ভাল নয়। মলাট খুলে এসেছে, পাতা উইয়ে কাটা, বাঁধনি ও আলগা।
এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, মা’ই ঠিক ছিলেন। পুরনো দিনের এই সব স্মৃতি, বিশেষ করে আমাদের মত একটি সাধারণ যৌথ পরিবারের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা কোন ইতিহাস তৈরীতে কাজে লাগবেনা, এবং আমাদের পরের প্রজন্মের কাছে তো জঞ্জালই মনে হবে।
সেটা কিছু আশ্চর্য্যের হবেনা, কেননা আগেকার সেই যৌথ পরিবার তো ভেঙে গেছে, পরিবারের আমরা ভাইবোনেরা সবাই ক্রমশঃ দূরে চলে গিয়ে নিজের মত সংসার তৈরী করে নিয়েছি।
কবি লিখেছেন “জীর্ণ পুরাতন যাক্ ভেসে যাক্!”
তবু বার্ধক্যে পৌঁছে আমরা সবাই ফিরে যেতে চাই আমাদের ছোটবেলায়। অতীতের প্রতি আমাদের মনের এই আকর্ষন কেমন যেন অমোঘ মনে হয়। আমার বাবাও হয়তো কিছুটা সেই তাগিদেই তাঁর বাল্যের স্মৃতিকথা তাঁর উত্তরসূরীদের জন্যে লিখে রেখে গেছেন। ১৯৬১-৬২ সালে তিনি যখন পূর্ব্বাচল লেখেন তখন তিনি জানতেন না যে আর মাত্র তিন বছর পরে তিনি পরলোকগমন করবেন। আমাদের সৌভাগ্য যে তিনি যত্ন করে লেখাটি যাবার আগে শেষ করে গেছেন।
তাঁর এই লেখাটির জন্যে পরিবারের সকলের হয়ে তাঁকে আমাদের অন্তরের কৃতজ্ঞতা ও প্রণাম জানাই।


নিজের মৃত্যুসংবাদ