১৯/২/২০২০
আমরা বন্ধুরা ভোপাল থেকে ভীমবেটকা হয়ে কাল রাতে পাচমারীতে এসে আমাদের হোটেলে উঠেছি। মধ্যপ্রদেশের অনেক দর্শনীয় জায়গার মধ্যে পাচমারীর খুব সুনাম। জঙ্গল সাফারী তো আছেই, তার ওপরে সামনেই শিবরাত্রি সেই উপলক্ষ্যে এখানে শহরের উপকন্ঠে বিশাল মেলা বসেছে, কাল রাত্রে গাড়ীতে আসতে আসতে তার একটা আভাস পেয়েছি। নর্মদা নদীর ধারে মহাদেব এখানে সর্ব্বত্র ভক্তিভরে পূজিত।
আমাদের হোটেল টা বিশাল বড় একটা কম্পাউন্ডের মধ্যে, কাল রাত্রে ঠিক বোঝা যায়নি কত বড় আজ সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গে উঠে জানলার বাইরে তাকিয়ে মন ভরে গেল। কি সুন্দর জায়গাটা। চারিদিক শান্ত চুপচাপ, বাগানে অজস্র ফুল ফুটে আছে, চারিদিকে ছায়া ছড়ানো বড় বড় গাছ, সেখান থেকে কেবল পাখীদের কলকাকলি কানে আসে। মনটা একটা অদ্ভুত প্রশান্তি তে ভরে উঠলো।
হোটেলের ঘরেই চা তৈরী করার সব বন্দোবস্ত আছে, সুভদ্রা আর আমি মুখ ধুয়ে চায়ের পেয়ালা হাতে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চায়ের সাথে খাবার জন্যে বিস্কুটও আমাদের ঘরে রাখা আছে, বিস্কুট ছাড়া চা ঠিক জমেনা।
আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে টানা বারান্দা। সেই বারান্দার পাশে লাইন দিয়ে পর পর আমাদের বন্ধুদের ঘর। আর সেই বারান্দায় মাঝে মাঝে বসার জন্যে বেতের চেয়ার আর টেবিল রাখা।
একটু দূরে সিদ্ধার্থ সুমিতা আর দেবাশীষ টিংকুদের ঘর। তাদের ঘরের পাশে অনেক বেতের চেয়ার আর টেবিল পাতা। ডাকাডাকি করতেই ওরা চারজন বেরিয়ে এলো। সবাই মিলে বেতের চেয়ারে আরাম করে বসে চা হাতে আড্ডা শুরু করে দিলাম।
হোটেলটা কত ভাল তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
এখানে খোলা জায়গা বলে প্রচন্ড হাওয়া তাই দু’টো করে পুরু কাঠের ভারী দরজা প্রতি ঘরে। সেই দরজা খুলে রাখার জন্যে প্রতি পাল্লার পাশে একটা কাঠের ছোট টুকরো লাগানো, সেই টুকরোটা একটু ঘুরিয়ে দিলে সেটা দরজাকে খোলা রাখবে, জোরে হাওয়া এলে দুম করে দরজা বন্ধ হয়ে যাবেনা।
আমাদের ছোটবেলায় মনোহরপুকুরের বাড়ীতে এই জিনিষটা প্রতি দরজার পাল্লার পাশে থাকতো, নিয়মিত ব্যবহার করে এসেছি আমি।
কিন্তু এই কাঠের টুকরোর নাম কি কিছুতেই কারুর মনে পড়ছেনা। আমাদের আলোচনাটা এইখানে এসে আটকে গেল।
কি নাম? কি নাম?
ছিটকিনি, খিল, কব্জা, এই রকম নানা নাম মনে আসছে, কিন্তু ওই নাম আর মনে আসেনা।
বেশ কিছুক্ষন পরে হঠাৎ সিদ্ধার্থ বলে উঠলো ওটার নাম হলো ব্যাং।
ব্যাং?
ঠিক ঠিক, আমাদের ও সবার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল। ওই কাঠের টুকরোর নাম হলো ব্যাং।
ওই কাঠের টুকরো ব্যাং ও আজকাল আর কোন বাড়ীতে দরজা খোলা রাখার জন্যে ব্যাং ব্যবহার করা হয়না। আজকাল অনেক নতুন ধরণের সৌখীন door stopper বেরিয়েছে।
বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো আমার মনে, কবি বলেছেন। পাচমারীতে সেই সুন্দর সকালে হোটেলের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে আমাদের মনেও বহুযুগের ওপার হতে সেই দরজা খোলা রাখার ব্যাং ফিরে এলো।
আর তার সাথে এলো থপথপ করে লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়া কোলাব্যাং।
আমাদের ছোটবেলায় বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়লে বা কোথাও জল জমলে আমরা সেই ব্যাং দের ঐকতান শুনতাম। তাদের সেই মহানন্দে এক সাথে গ্যাঙর গ্যাঙ্গর গ্যাং ডাকের আওয়াজ এখনো কানে বাজে। কিন্তু আজকাল সেই ঐকতান আর শোনা যায়না।
“আট বছর আগের এক দিন” কবিতায় জীবনানন্দ পশুপাখীদের বেঁচে থাকার আকাঙ্খা নিয়ে লিখেছিলেনঃ
“তবুও তো প্যাঁচা জাগে, গলিত স্থবির ব্যাং আরও দুই মুহূর্ত্তের ভিক্ষা মাগে/
আর একটি প্রভাতের অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে/”
কিন্তু এত বেঁচে থাকার আকাঙ্খা থাকা সত্ত্বেও ব্যাং প্রাণীটি কি এখন বিলুপ্ত? কি জানি, হবেও বা।
যাই হোক, ব্যাং কথাটা সেদিন আমার মনে অনেক ছোটবেলার স্মৃতি ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলো।
জীবনের পথে চলতে চলতে এরকম কত কি আমরা ফেলে আসি, ভুলে যাই, হারিয়ে ফেলি। খেয়াল ও করিনা, কেবল এরকম হঠাৎ কোন এক মায়াবী মূহুর্ত্তে সেই সব হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, ভুলে যাওয়া এক সময়ের প্রিয় মানুষ, ফেলে আসা দিন গুলো হঠাৎ জানান না দিয়ে ফিরে আসে আমাদের মনে।