Tag Archives: নাপিত

লণ্ডনের নাপিত

কাজ থেকে অবসর নিয়ে আজকাল লন্ডনে আমার মেয়ে (পুপু) জামাই (দীপ) আর দুই নাতনীর সাথে মাস তিনেক কাটাই। ওদের বাড়ী East London এ South Woodford নামে একটি শান্ত নির্জ্জন এক সম্ভ্রান্ত শহরতলীতে। 

প্রবাস বাসের নানা অভিজ্ঞতা আর খবর আমি নিয়মিত দেশের বন্ধুদের ইমেলে লিখে পাঠাই। সেই সব ইমেলের নাম দিয়েছি “লন্ডনের চিঠি”। 

আমরা বন্ধুরা সবাই এখন বয়সে প্রবীণ, তাই আমাদের মধ্যে পুরনো দিন নিয়ে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। একদিন সেই আলোচনায় ছোটবেলার নাপিতদের কাছে চুল কাটা নিয়ে কথা হচ্ছিল। খুব কমবয়সে যখন স্কুলে পড়ি, তখন আমাদের পাড়ায় বেশ কয়েকজন নাপিত ছিল, তারা হাতে একটা কাঠের বাক্স নিয়ে রাস্তা দিয়ে খদ্দেরের আশায় হেঁটে যেত। 

চুল কাটা ছাড়াও আমাদের হিন্দুদের নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে নাপিতদের দরকার পড়ত। জন্মের পরে শিশুর হাতের নখে ক্ষুর ছোঁয়ানো,  পৈতের সময় কান ফুটো করা, এমন কি বিয়ের সময় শুভদৃষ্টির কাজেও নাপিতের ডাক পড়ে। আমার জন্যে এই সব কাজ করেছিল একটি লোক।

তবে সে ছাড়াও আরও অনেক নাপিত ছিল পাড়ায়। বাড়ীতে যৌথ পরিবারে আমরা বেশ কয়েকজন পিঠোপিঠি ভাই, এক দিন সবাই মিলে চুল কাটা হত।

নাপিত দের কাছে চুল কাটা কয়ে অনেকে রসিকতা করে ইটালীয়ান সেলুন বলতো। ইটালীয়ান কেন? না ইঁট পেতে বসে চুল কাটা, তাই। আমরা অবশ্য ইঁট নয়, আমাদের সদর দরজার সিঁড়ির নীচের ধাপে বসতাম।  নাপিত এসে বসতো আমাদের সদর দরজার সিঁড়িতে, আমরা তার এক ধাপ ওপরে বসে তার সামনে মাথা নীচু করে বসতাম। তখন অবশ্য চুল কাটার কোন স্টাইল ছিলনা, মাথার চুল মোটামুটি হাল্কা করে দিলেই চলতো।

তার পরে একটু বড় হলে সেলুনে যেতে শুরু করলাম। আমাদের বাড়ীর কাছে হাজরা রোডে প্রিন্স নামে একটা দামী নামী এয়ার কন্ডিশনড্‌ সেলুন ছিল, সেটা বেশ নাম করেছিল। যেখানে অন্যান্য ছোট সেলুনে এক টাকা লাগতো, প্রিন্স নিতো দুই টাকা। প্রিন্সে গেলে মাঝে মাঝে কোন চিত্রতারকার দেখাও পেতাম। অনিল চ্যাটার্জ্জি আর দিলীপ মুখার্জ্জীকে  দেখার কথা মনে পড়ে। 

IBM এ কাজ করার সময় একটু জাতে উঠেছিলাম, এক দিন অফিসের কাছে পার্ক স্ট্রীটে A N John নামে একটা সেলুনে গিয়ে চুল কেটে দশ টাকা গচ্চা দিয়ে বেশ গায়ে লেগেছিল মনে পড়ে। সেই প্রথম আর সেই শেষ। ঘরের ছেলে আবার ঘরে – মানে প্রিন্স সেলুনে ।

যাই হোক তার পরে তো কত দিন কেটে গেছে, দেশে বিদেশে কত সেলুনে কত নাপিতের (পোষাকী নাম হেয়ারড্রেসার) কাছে মাথা নীচু করেছি।

ইমেলে এক বন্ধু জানতে চাইলো লন্ডনে কোথায় চুল কাটি, এখানে কোন বাঙ্গালী পরামাণিক (নাপিত) আছে কিনা। আছে নিশ্চয়, বাংলাদেশী তো আছেই। East London এ Whitechapel নামে একটা জায়গা আছে, যেখানে Bric Lane নামে রাস্তা নিয়ে মণিকা আলির একটি বিখ্যাত – বুকার পাওয়া – উপন্যাস আছে। সেখানে হাজার হাজার বাংলাদেশী, রাস্তার নাম বাংলায় লেখা, বাঙ্গালী খাবারের দোকান চারিদিকে।  সেখানে গেলে মনেই হয়না লন্ডনে আছি। মনে হয় এটা বাংলাদেশের কোন শহর।  

যাই হোক, দীপ বললো ওখানে অনেক বাংলাদেশী চুল কাটার সেলুন আছে। তাদের রেট পাঁচ পাউণ্ড। মানে পাঁচশো টাকা। আমি কলকাতায় লেক মার্কেটে হাবিবস্‌ এ চুল কাটাই। ওখানেও পাঁচশো টাকা মত নেয়। East London  এর মধ্যে  Bethnal Green, Leytonstone, Walthamstow  এই সব জায়গা গুলো তে প্রচুর মুসলমান থাকে  (Turkish, North African, Bangladeshi)। আমরা মাঝে  মাঝে গাড়ী নিয়ে  Stratford Olympic city যাই, তখন পথে এই সব জায়গা পড়ে, সেখানে অনেক মসজিদ। মাইকে আজানের আওয়াজ ভেসে আসে। রাস্তার পাশে ভারতীয় তুর্কী ইত্যাদি সেলুনের সাইনবোর্ড ও চোখে পড়ে। 

কিন্তু দাম কম বলে তো বেশী দূরে গিয়ে সেই সব সেলুনে গিয়ে চুল কাটা সম্ভব নয়।

কাল আমাদের বাড়ীর কাছে South Woodford এ প্রথম চুল কাটলাম। এখানে আমার জামাই দীপ চুল কাটায়। দোকানটা বাড়ী থেকে বেশি দূরে নয়, হাঁটা পথ।  এখানে  হাঁটতে  বেশ লাগে,  একে তো ঠাণ্ডা আবহাওয়া,  আর একটু ভেতরের দিকে জনমানবহীন ফাঁকা রাস্তা, তার ওপর রাস্তার দু’দিকে প্রত্যেক বাড়ীর সামনে বাগান, সেখানে অজস্র রং বেরঙ এর ফুল ফুটে থাকে।  

সকাল সকাল বাড়ির কাছে এক সেলুনে দীপের সাথে গিয়ে হাজির হলাম।  রাস্তার ওপরে বেশ সাজানো গোছানো পরিস্কার দোকান, অত সকালে কোন ভীড় নেই। এক ভদ্রলোক দেখি খবরের কাগজ নিয়ে ক্রসওয়ার্ড করছেন। মধ্যবয়েসী,  বেশ সুন্দর  সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত চেহারা,  মাথায় অল্প টাক, চোখে চশমা। ভদ্রলোকের নাম জন্‌।  

ইনি আমার চুল কাটবেন নাকি? এঁকে দেখে তো প্রফেসর বা ডাক্তার বলে মনে হচ্ছে।

দীপের সাথে ওনার বেশ অনেকদিনের আলাপ মনে হলো। নামী ডাক্তার বলে দীপকে চেনাশোনা অনেকেই  বেশ সমীহ করে। জন্‌ ও দেখলাম বয়সে অনেক ছোট দীপের সাথে বেশ অন্তরঙ্গ ভঙ্গীতে কথা বলছে। কিছুক্ষন খোশগল্প করার পর আমার সাথে জনের আলাপ করিয়ে দিয়ে দীপ চলে গেল। কাছেই South Woodford Tube station, সেখান থেকে সে ট্রেণ ধরে কাজে যাবে।

সাবেক যন্ত্রপাতি, তেমন কিছু আহামরি  খেলোয়াড়ী চুল কাটা নয়, কিন্তু বেশ যত্ন করে আমার চুল কাটলেন জন্‌, এবং কাজ করতে করতে আমার সাথে তাঁর অনেক গল্পও হলো। ভদ্রলোকের কথাবার্ত্তা চমৎকার, অনেক খবর রাখেন, কাজ করতে করতেই মার্জিত নীচু গলায়, clipped British উচ্চারণে তিনি আমার সাথে অনেক কথা বলে গেলেন।

বারো পাউন্ড খরচ হল, যার মানে  বারোশো টাকা । কুয়েতে ভারতীয় সেলুনে  দুই দিনার খরচ হতো টিপ নিয়ে, যার মানে চারশো টাকা।

দিনে দশ জন কাস্টমার আর মাসে পঁচিশ দিন কাজ করলে তাঁর আয় হিসেব করে দেখলাম মাসে ৩০০০ পাউন্ড মত হয়।  তাঁর মধ্যে সব খরচ বাদ দিয়ে কত থাকে? ধরা যাক ৫০%,  অর্থাৎ  মাসে  ১৫০০ পাউন্ড।

ওই টাকায় সংসার চলে?

দীপ বললো ওনার বৌ নাকি কোন Supermarket এ  Till এ কাজ করেন, তাঁর আয় মাসে ১০০০ পাউন্ড।

দু’জনে মিলে দাঁড়ালো মাসে ২,৫০০ পাউণ্ড, বছরে ৩০,০০০ পাউণ্ড। এ দেশে এটা ভাল ভাবে থাকার জন্যে ভালোই আয়, বিশেষ করে বাড়ীর মর্টগেজ শেষ হয়ে গেলে। এই ভদ্রলোক অনেক দিন আগে Forestgate এ বাড়ী কিনেছেন, এঁর মর্টগেজ শেষ হয়ে যাবার কথা। ছেলে মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে।

ভালোই আছেন, চুল কাটেন আর অবসর সময়ে ক্রসওয়ার্ড।