১
আমাদের ছোট বেলায় মনোহরপুকুরের বাড়ী তে মাঝে মাঝে মাখনবাবু নামে এক ভদ্রলোক আসতেন। তাঁর ছিল গয়নার ব্যবসা, লেক মার্কেটের কাছে রাসবিহারী এভিনিউ এর ওপরে লক্ষ্মী জুয়েলার্স নামে তার একটা ছোট দোকান ও ছিল।
মাখনবাবু মনোহরপুকুরের বড় বারান্দার গোল টেবিলে বসে তাঁর গয়নার বাক্স খুলে মা জ্যেঠিমা কাকিমাদের নানা গয়নার sample দেখাতেন। তাছাড়া তাঁর কাছে গয়নার design এর catalogue থাকতো, সেই বই খুলে তিনি মা’দের নানা রকম গয়নার design দেখাতেন। তাঁকে ভীড় করে ঘিরে মা জ্যেঠিমা কাকীমাদের সেই উৎসাহ, আর তাঁদের উৎসুক দৃষ্টি মেলে গয়না দেখা বেশ মনে পড়ে।
মাখনবাবু সার্থকনামা লোক ছিলেন। ধুতি পাঞ্জাবী পরে আসতেন, পাতা করে চুল আঁচড়ানো, পায়ে পাম শু, সবসময় মুখে হাসি, অতি বিনয়ী, মিষ্টি মিষ্টি কথা, যাকে বলে perfect salesman! Smooth operator, মানে যাকে বাংলায় বলে “পুরো মাখন!”
আর ওনার business model ও বেশ effective, গৃহিণী রা দোকানে আসার অপেক্ষায় না থেকে সোজা তাদের বাড়ীতে চলে যাওয়া। Competition এর যেখানে কোন সম্ভাবনাই নেই।
আমার তখন দশ এগারো বছর বয়স, তার মানে আমার মা’র তখন তেত্রিশ বছর, কাকীমাদের ত্রিশ বছরের নীচে। ওই বয়সে গয়নার প্রতি মেয়েদের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা তো তেমন স্বচ্ছল ছিলামনা, আমাদের ছিল মধ্যবিত্ত পরিবার, প্রাচুর্য্যের মধ্যে আমরা মানুষ হইনি। তাই বেশী গয়না কেনার সামর্থ্য মা দের ছিল না ধরে নেওয়া যায়।
মা কে জিজ্ঞেস করলাম তখন সোনার ভরি কত টাকা ছিল? মা’র মনে নেই। তবু এখনকার তুলনায় তখন সোনার দাম অনেক কম হলেও মাদের নাগালের বেশ কিছুটা বাইরেই ছিল নিশ্চয়। পরিবারের উপার্জন যা ছিল তার বেশীর ভাগটাই চলে যেত সংসারের খরচে।
তবু সামাজিক কারণেও তো গয়নার দরকার পড়ে। কারুর বিয়ে, কারুর মুখে ভাতে উপহার দিতে হয়, তখন নতুন গয়না কেনার টাকা না থাকলে পুরনো গয়না ভাঙিয়ে কাজ সারতে হয়। মা কাকীমা রাও তাই করতেন। দরদাম হতো। মাখনবাবু কিন্তু বেশী দরাদরি তে যেতেন না, তাঁর মুখে শুধু হাসি। মা’রা মাখনবাবুর সাথে দরাদরি তে খুব একটা পেরে উঠতেন বলে মনে হয়না।
খুব এলেমদার salesman ছিলেন মাখন বাবু, ব্যবসা টা ভালো ই বুঝতেন। মাদের মাথায় হাত বুলিয়ে প্রতিবার এসেই বেশ কিছু অর্ডার নিয়ে যেতেন।
২
মাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম মাখনবাবু র সাথে তোমাদের যোগাযোগ হলো কি করে? শুনলাম উনি নাকি বাংলাদেশের (তখন East Bengal) গাইবান্ধার কাছের শহর কুড়িগ্রামের লোক, মা মাসী দের ছোটমামীমা র বাপের বাড়ী সেখানে। সেই সূত্রেই চেনাশোনা এবং যাতায়াত। মাসীদের বাড়িতেও মাখনবাবুকে মাঝে মাঝে দেখেছি। আমার মাসতুতো ভাই রঞ্জু ও তাঁকে বেশ ভালোই চিনতো।
বাঙ্গালদের এই লতায় পাতায় আত্মীয়তা আর সম্পর্কের ব্যাপারটা আমার বেশ লাগে। চেনাশোনা সবাই কে কাছে টেনে নেওয়া আর সাহায্য করা বাঙ্গালদের সহজাত। আজকের পৃথিবী তে যৌথ পরিবারের অবলুপ্তির সাথে সাথে এই দুঃস্থ বিপন্ন আত্মীয় অনাত্মীয় কে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার অভ্যেস ক্রমশঃ যেন কমে আসছে। এখন হল Take your বস্তা, see your রাস্তা র যুগ।
রাসবিহারী রোডের দোকান টা ছেড়ে দিয়ে মাখনবাবু গড়িয়াহাটের বাজারের কাছে আলেয়া সিনেমার পাশে বড়ো একটা দোকান করেছিলেন, সেখানে পরে কয়েকবার গেছি। ক্রমশঃ মাখনবাবুর বয়স বেড়েছে, তাঁর ছেলের বিয়ে দেবার সময় আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন, বিয়ের পর ওনার দোকানে একবার সেই বিয়ের এলবামও দেখিয়েছিলেন আমাকে আর মাকে।
প্রায় পরিবারের একজনই হয়ে গিয়েছিলেন মাখনবাবু।
শেষ গড়িয়াহাটের লক্ষ্মী জুয়েলার্স এ যাই আমার মাসতুতো ভাই রঞ্জুর সাথে। নব্বই এর দশকের শেষে। গিয়ে দেখি Counter এ বসে একটি অল্পবয়েসী ছেলে, মাখনবাবুর কথা জিজ্ঞেস করাতে সে বললো “বাবা আর নেই~”
তাকিয়ে দেখি তার পিছনে দেয়ালে মাখনবাবুর ছবি। ফ্রেমের ভেতর থেকে মাখনবাবু হাসি হাসি মুখ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।