আমাদের বাড়ীটা ছিল মনোহরপুকুর রোডের ঠিক ওপরে, সেখানে দোতলায় উত্তর দিকে রাস্তার দিকে মুখ করা একটা ছোট বারান্দা ছিল, সেখানে দাঁড়ালে নীচে রাস্তায় একটা চলমান জীবন চোখে পড়তো। সেই বারান্দাকে আমরা উত্তরের বারান্দা বলতাম।
বিশেষ করে বর্ষা কালে তুমুল বৃষ্টি হলে বাড়ী থেকে বেরোতে পারতামনা, আর আমাদের বাড়ীর ঠিক সামনে চট করে জল জমে যেতো। বর্ষা ভেজা সেই বিকেলগুলো আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে জমা জলের মধ্যে ছাতা মাথায় হাঁটু পর্য্যন্ত কাপড় তুলে লোকজনের যাতায়াত আর ঘন্টি বাজানো হাতে টানা রিক্সা দেখতাম।
পূজোর পরে কাছাকাছি পাড়ার যত বিসর্জ্জনের ঠাকুর ট্রাকে করে আমাদের বাড়ীর সামনে দিয়ে চলে যেতো, সেই সব আলো ঝলমলে ট্রাকের আগে আর পিছনে বহু লোক নাচতে নাচতে যেতো। তাদের সাথে থাকতো প্রচন্ড আওয়াজের প্যাঁ পোঁ ব্যান্ড পার্টি। খুব আস্তে আস্তে অনেকক্ষণ ধরে যেত তারা, আমাদের বারন্দায় বাড়ীর সকলে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। একের পর এক ঠাকুর যেতো, দূর থেকে তাদের প্যাঁ পোঁ আওয়াজ পেলেই ভাই বোনদের মধ্যে কেউ আমাদের সবাই কে ডাকতো “ঠাকুর আসছে ঠাকুর আসছে…” আর তাই শুনে আমরা সব কাজ ফেলে হুড়মুড় করে ছুটে উত্তরের বারান্দায় চলে যেতাম।
আর মনে পড়ে দিবারাত্র সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতার কথা।
আমাদের ছোটবেলায় পাড়ার ক্লাব সাথী সংঘের পরিচালনায় দিবারাত্র সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা হতো । কে সব চেয়ে বেশী দিন অবিরাম সাইকেল চালাতে পারে। যে সব থেকে বেশী দিন সাইকেল এর ওপর থাকবে তার জন্যে বোধ হয় পাঁচশো টাকা পুরস্কার ছিল। পাঁচশো টাকা সেই সময় অনেক টাকা।
সেই সাইকেল চালানোর রুট টা সাথী সঙ্ঘ থেকে শুরু হয়ে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গিয়ে সতীশ মুখার্জ্জী রোড, রাসবিহারী এভিনিউ, লেক মার্কেট হয়ে দেশপ্রিয় পার্ক দিয়ে ল্যান্সডাউন ধরে আবার সাথী সঙ্ঘের পাশ দিয়ে মনোহরপুকুর রোড ধরত।
প্রথম চব্বিশ ঘন্টা সবাই বেশ চটপট তাড়াতাড়ি সাইকেল চালাত, তাদের তখন প্রচুর এনার্জি। কিন্তু আটচল্লিশ ঘন্টা হয়ে গেলে ক্রমশঃ সবাইকে বেশ ক্লান্ত আর নির্জীব দেখাত, বাড়ির সামনে দিয়ে তারা যাবার সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা বেশ উৎসাহের সাথে তাদের দেখতাম।
প্রত্যেকের জামায় কাগজে একটা করে নাম্বার লাগানো থাকতো। নয় নম্বর যার, সেই লোকটা ছিল আমার ফেভারিট। মধ্যবয়েসী, কিছুটা ভারী চেহারা, গায়ের রং কালো, কেন জানিনা আমার ইচ্ছে ছিল সেই জিতুক।
তিন চার দিন এর পর থেকে অনেকেই আর পারতোনা, যে দুই তিন জন তখনো ধুঁকতে ধুঁকতে কোনমতে সাইকেল চালাত, তাদের জামায় এক টাকা দু’ টাকার বেশ কিছু নোট পিন দিয়ে আটকানো থাকত। কারুর কারুর জামায় পাঁচ দশ টাকাও শেষের দিকে আটকানো দেখেছি। তাদের সাথে একদল লোক হাতে জলের বোতল নিয়ে পাশে পাশে হেঁটে যেতো, সাইকেলে বসেই তারা এক হাতে বোতল ধরে ঢকঢক করে জল খেত।
রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসা পর্য্যন্ত আমি ওদের কথা ভাবতাম। ওরা কি রাতেও সাইকেল চালাচ্ছে? ওদের কি ঘুম পায়না? খাওয়া, বাথরুম যাওয়া এই সব কখন কি করে করে ওরা? ক্লাবের লোকেরা কি ওদের পিছন পিছন ঘুরে ঘুরে দেখে ওরা সাইকেল চালাচ্ছে না সাইকেল থেকে নেমে বিশ্রাম নিচ্ছে?
নয় নম্বর সেবার জিততে পারেনি, সে দ্বিতীয় হয়েছিল। আট নম্বর তাকে হারিয়ে প্রথম হয়েছিল মনে আছে। আট নম্বর ছেলেটার বয়স কম, পেটানো চেহারা, তার চোখে মুখে প্রত্যয় আর আত্মবিশ্বাস। তাকে হারানো নয় নম্বরের মতো একজন মাঝ বয়েসী লোকের কম্মো নয়। তবু নয় নম্বর দ্বিতীয় হলেও সে আমার হিরো ই থেকে গিয়েছিল কোন কারণে।
ওদের দুজনকে মালা পরিয়ে কাঁধে চাপিয়ে হৈ হৈ করে খুব ঘোরানো হয়েছিল মনে পড়ে।
বেশ কিছুদিন পরে আমি মা’র সাথে কোথায় যেন যাচ্ছি, হঠাৎ মনোহরপুকুর ল্যান্সডাউনের মোড়ে রাস্তায় সেই নয় নম্বর ভদ্রলোক এর সাথে দেখা। তার পরনে তখন সাধারণ পাজামা পাঞ্জাবী, চটি পরে এক বন্ধুর সাথে কথা বলতে বলতে তিনি হাঁটছেন।
আমি তাকে চিনতে পেরে উত্তেজিত হয়ে মা’কে বলতে যাচ্ছিলাম, “মা দ্যাখো, দ্যাখো – নয় নম্বর!”
কিন্তু ভেবে দেখলাম না বলাই ভালো।
সেই দশ বারো বছর বয়েসে আমি তখন মা’র আঁচলের তলা থেকে ক্রমশঃ আস্তে আস্তে বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে আসছি। স্কুলে যাই, পাড়ায় বন্ধুদের সাথে গলিতে মাঠে পার্কে ক্রিকেট ফুটবল খেলি। পাড়ার পূজোয় ভলন্টিয়ারের ব্যাজ পরে ঘুরে বেড়াই, এই সব আর কি। তখন থেকেই ক্রমশঃ বুঝতে পারছি যে মা’র ভাল লাগা আর আমার ভাল লাগার হামেশাই মিল হচ্ছেনা। দু’জনের জগত যেন কেমন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
আমার জগতে গ্যারী সোবার্স, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, চূণী গোস্বামী আর মা’র জগতে সত্যনারায়ণ, নীলষষ্ঠী আর শিবরাত্রির উপোস, কোষাকুষি, গঙ্গাজল, ফুল বেলপাতা, সিন্নী আর পায়েস।
সাইকেল প্রতিযোগিতা সম্বন্ধে মা কোন খবর রাখেননা, কে জিতলো কে হারল তা জানবার বিন্দুমাত্র উৎসাহ ও মা’র নেই।
নয় নম্বর শুনে তাঁর মনে হতে পারে ছেলে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলছে, ব্যাপার কি? মাথাটা খারাপ হয়ে গেল নাকি? তারপর জোর করে আমায় চেপ্পে ধরে কোন মাথার ডাক্তারকে দেখাতে নিয়ে যাবেন হয়তো, সেই বয়সে শরীরে সামান্য জ্বরজারি হলেই ডাক্তার দেখানো বাধ্যতামূলক ছিল আমার জন্যে।
এই সব ভেবে তাই চুপ করেই রইলাম।
আমার পাশ দিয়ে সেই নয় নম্বর সাইকেল চালক ভদ্রলোক তাঁর বন্ধুর সাথে গল্প করতে করতে চলে গেলেন। আমি সতৃষ্ণ নয়নে আমার সেই ট্র্যাজিক হিরোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। হিরোসুলভ চেহারা তাঁর একেবারেই নয়, বরং উল্টোটাই। গায়ের রং মিশমিশে কালো, তার ওপরে বেশ মেদবহুল শরীর, সামান্য ভুঁড়ি। কিন্তু কি করে যে তাঁর প্রতি আমার মনে এক আশ্চর্য্য ভাল লাগা তৈরী হয়েছিল তা এখনো ভাবলে অবাক লাগে।
আরও আশ্চর্য্য এই যে এতগুলো বছর কেটে গেলেও সেই নয় নম্বরের স্মৃতি আমার মনে এখনো অমলিন।