কুমারেশ ও ট্যাক্সি ড্রাইভার

কুমারেশ আমার কুয়েতের বন্ধু, কয়েক বছর আগে দুরারোগ্য রোগে তার মৃত্যু হয়। 

তাকে নিয়ে এই গল্পটা।

আমাদের বন্ধুদের কোন জমায়েতে কুমারেশ থাকলে এই গল্পটা তার কাছ থেকে আমরা বার বার শুনেছি। আর কুমারেশ এমন মজা করে বলতো যে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়তাম।

——————————————————

কুমারেশ কিছুদিন হল কুয়েতে এসেছে, আরবী ভাষাটা তার তখনো ভাল করে রপ্ত হয়নি। কিছু কিছু কথা কেবল শিখে রেখেছে, যেমন আমি আরবি জানিনা, মা আরিফ আরবী।

তো হয়েছে কি, একদিন কি একটা কাজে কুমারেশ কে Indian Embassy যেতে হবে। গাড়ি নেই, অতএব ট্যাক্সি নিতে হল। সে এক বিরাট ট্যাক্সি, GM এর Caprice Classic…ছয় সিলিন্ডার চার লিটার এর ভি ইঞ্জিন, কোন ঝাঁকানী নেই, কোন আওয়াজ নেই।  বাইরে প্রচন্ড গরম, কিন্তু ভিতরে এয়ার কন্ডিশনিং এর  ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া।  আমাদের দেশের  এম্বাসাডর গাড়ীর সাথে এই গাড়ীর কোন তুলনাই হয়না।

কুমারেশ জেনে নিয়েছে Indian Embassy আরবী তে হল সাফারা হিন্দী। ড্রাইভার কে সে কথা বলে সে Air conditioned গাড়ির পিছনের সীটের নরম গদিতে গা ডুবিয়ে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে।

আবু হালিফা থেকে ইস্তিকলাল স্ট্রীট দূর কম নয়, গাড়ী চলেছে, ড্রাইভার লোকটা বেশ গম্ভীর, তার মুখে কোন কথা নেই, কুমারেশও কিছু বলছেনা। আর তারা কথা  বলবেই বা কি করে, ড্রাইভার ইংরেজী জানেনা, আর কুমারেশ আরবী জানেনা।

বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কুমারেশ ভাবলো আরে এই লোকটা আমায় Indian Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে তো? তার বদলে ভুলভাল কোন জায়গায় নিয়ে গেলেই তো সর্ব্বনাশ!

কুমারেশ ট্যাক্সিচালক কে জিজ্ঞেস করবে “কি ভাই তুমি ঠিক Indian Embassy তেই যাচ্ছো তো?” কিন্তু tension এর জন্যে Embassy কথাটার আরবী যে সাফারা তা সে বেমালুম ভুলে গেছে। তার কেন জানিনা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে Embassy আরবী তে হল সাইয়ারা। ওকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায়না, স্বীকার করতেই হবে যে দুটো কথার মধ্যে বেশ মিল আছে।

এদিকে আরবীতে সাইয়ারা হলো গাড়ী।

কুমারেশ ট্যাক্সি চালক কে জিজ্ঞেস করলো, “আন্‌তা সাইয়ারা হিন্দী?”

সে লোকটা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “লা, সাইয়ারা আমরিকী।”

কুমারেশ ভাবল এই রে, যা ভেবেছি তাই। এই গাধাটা এত করে বলা সত্ত্বেও আমায় US Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে!

সে তখন বেশ রেগে গিয়ে বলল “লা লা, সাইয়ারা হিন্দী।”

লোকটা এইবার ভীষণ রেগে গেল। এত বড় অপমান? আমার এই সাধের Caprice Classic কে ব্যাটা বলে কিনা Indian গাড়ী?

এই রকম বেশ কিছুক্ষন চলল।

কুমারেশ বলে সাইয়ারা হিন্দী আর ট্যাক্সিচালক বলে লা সাইয়ারা আমরিকী।

শেষ পর্য্যন্ত রেগেমেগে  “ট্যাক্সি থেকে বেরোও” বলে কুমারেশ কে রাস্তার মাঝখানে নামিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। এত অপমান তার সহ্য হয়নি।

————————————                       

২০০২ সালে কুয়েতে আমরা রবীন্দ্রনাথের শেষরক্ষা নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলাম । সেই নাটকে দাপুটে ডাক্তার শিবচরণের ভূমিকায় দারুণ অভিনয় করেছিল কুমারেশ। তার লম্বা চওড়া চেহারা, পরণে ধুতি আর কালো কোট, হাতে একটা ছাতা, গলায় স্টেথোস্কোপ, চরিত্রের সাথে তাকে দিব্বি মানিয়ে গিয়েছিল। 

এই সাথে সেই নাটকের দুটি ছবি।

——————————

প্রথমটি ছেলে গদাই এর সাথে বাগবাজারের কাদম্বিনী চৌধুরীর বাড়ির সামনে।

শিবচরণঃ বাপু হে, মেডিকাল কালেজ টা কোন দিকে একটু দেখিয়ে দাও তো।

গদাইঃ  (কি সর্ব্বনাশ, এ যে বাবা!)। 

দ্বিতীয়টি শিবচরনের ছেলে গদাই ও বন্ধু নিবারণের মেয়ে ইন্দুমতীর বিয়ের অনুষ্ঠানে ।

শিবচরণঃ  লুচিটা যেন কিছু কম পড়বে মনে হচ্ছে নিবারণ!

নিবারণঃ তাহলে কি হবে শিবু?

শিবচরণঃ  ভয় নেই। আমি সব বন্দোবস্ত করছি! ওরে কে কোথায় আছিস?

————————

কুমারেশের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি।