
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের “মনোজ দের অদ্ভুত বাড়ী” বই তে একটা দৃশ্য ছিল, যেখানে মনোজ দের গৃহশিক্ষক দুঃখ বাবু মনের দুঃখে আত্মহত্যা করবেন বলে গোয়াল থেকে এক দুর্দ্ধর্ষ গোরুর দড়ি খুলে নিয়েছেন। পিসীমা গোয়ালে গোবর নিতে গিয়ে ছাড়া গোরু তাঁকে তাড়া করে গুঁতিয়ে দেয়, তিনি গোবরে পড়ে আর উঠতে পারছেন না। এদিকে বাড়ীর ঝি কিরমিরিয়া কথায় কথায় কেঁদে ভাসায়, সে তারস্বরে চেঁচিয়ে কেঁদে যাচ্ছে, “ও মা আমার কি হবে গো, পিসীমা গোবরে পড়ে গেছে গো…”
চারিদিকে অনেক লোক জমে যাচ্ছে কিন্তু কেউ পিসীমা কে তোলার নাম করছেনা। ওই লোকেদের মধ্যে একজন ভুলোমন লোক বললো বাংলায় গোবর নিয়ে তিনটে কথা আছে, তার মধ্যে প্রথমটা কি যেন, কি যেন… দ্বিতীয় টা এই মুহুর্ত্তে আমার ঠিক মনে পড়ছেনা, আর তৃতীয়টা আমি একেবারেই ভুলে গেছি।
ওই লোকটির মত আমার স্মৃতিশক্তির অবস্থাও খুবই শোচনীয়। আজকাল সবই ভুলে যাচ্ছি, বিশেষ করে কারুর নাম মনে থাকেনা একেবারেই। সে এক মহা যন্ত্রনা।
কুয়েতে থাকাকালীন একবার শিব কুমার শর্মার সন্তুর শুনে এসে একজনকে সে কথা বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের পদবীটা আর মনেই এলনা। শিব কথাটা মনে এলেই মাথাটা ভুল পথে চলে যায়। শিবশংকর মিত্র, শিবপ্রসাদ সমাদ্দার, শিবলাল যাদব, শিবকুমার খান্না এইরকম সব নাম কোথা থেকে ভীড় করে আসে, কিন্তু শর্মার কোন পাত্তা নেই।
কবির ভাষায় “গোলেমালে ফাঁক তালে পালিয়েছি কেমন, শর্মা ওদিকে আর নন।”
শেষ পর্য্যন্ত “শিবজী” বলে পার পেলাম। ভদ্রলোক হয়তো ভাবলেন আমি ওনার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ, কিংবা classical music এর এক বিরাট বোদ্ধা। এক দিক দিয়ে ভালোই হল অবশ্য।
যখন মোবাইল ফোন ছিলনা তখন টেলিফোন নম্বর মনে রাখাও কিছু কম কষ্টকর ছিলনা। তবে নম্বর মনে রাখার জন্যে আমি একটা সাংকেতিক গাণিতিক পদ্ধতি অবলম্বন করতাম।
একবার ১৯৯০ সালে – ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার পরে আমি তখন UAE র আবুধাবী শহরে কাজ করি – আমার বন্ধু এবং সহকর্ম্মী অরবিন্দ ঘোষ অফিসের কাজে সেখান দুবাই যাচ্ছিলেন, তিনি আমাদের হার্ডওয়ার ম্যানেজার। ওনাকে Lift এ তুলে দিতে এসে আমি বললাম “দুবাই তে আমার ভাই উদয় আছে, ওকে কোন দরকার পড়লে একটা ফোন করতে পারেন।”
Lift এখুনি চলে আসবে, নম্বর লিখে দেবার সময় নেই, আমি অরবিন্দকে বললাম, “নম্বরটা মনে রাখা খুবই সহজ, ৫১২৭৯২। আপনি তো হার্ডওয়ার এর লোক, ৫১২ মনে রাখা আপনার কাছে কিছুই না, হাফ এ মেগাবাইট মনে রাখলেই হলো। আর তার পর ওই ৫১২ র তিনটে নম্বর পাঁচ এক আর দুই যোগ করলে আট (৫+১+২=৮)। ব্যাস, তার পর আটশো মাইনাস আট হলো ৮০০-৮ =৭৯২ !
মনে রাখা কি সহজ না?
Lift এর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে অরবিন্দ আমার দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি হেসেছিলেন। সেই হাসিটা আজও ভুলিনি।
তারপর কুয়েতে একদিন সালমিয়াতে আম্মান ভেলপুরী Shop এ মসালা দোসা আর পানি পুরী খাচ্ছি, পাশের টেবিলে একটি বাঙালী ছেলের সাথে আলাপ হলো। সে কুয়েতে নতুন এসেছে। তখনো তার family আসেনি। আমি তাকে বললাম একা feel করলে আমাদের বাড়িতে চলে এসো একটা ফোন করে। আমার ফোন নম্বর মনে রাখা খুব সহজ। এই দ্যাখোনা, পাঁচ আর দুইয়ে সাত, সাত দুগুনে চৌদ্দ…
কিছুদিন পরে শুনলাম ছেলেটি নাকি কুয়েত ছেড়ে চলে গেছে।
যে শহরে এই ধরনের সব পাগল থাকে, সেখানে বেশী দিন থাকা বিপজ্জনক, এই ভেবেই কি না কে জানে!