কবি বলেছেন একাকী গায়কের নহেকো গান, গাহিতে হবে দুই জনে। গায়কের সাথে শ্রোতার যে একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে, এ কথা অস্বীকার করা যায়না।
রাজসভায় সবাই কাশীনাথের গান শুনে ধন্য ধন্য করছে কিন্তু বুড়ো রাজার সেই গান শুনে মন ভরেনা, তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধু বরজলালের গান শুনতে চান। এদিকে বরজলালের বয়স হয়েছে, তার গলা কেঁপে যাচ্ছে, সুরও ঠিক ধরছেনা, সভাসদ দের তার গান একেবারেই পছন্দ নয়। কিন্তু রাজা কেবল বরজলালের গানই শুনবেন।
একেই বোধ হয় বলে জেনারেশন গ্যাপ!
আমার শ্বশুর মশায় সুভদ্রা কে বলতেন কি এমন গান গায় তোমাদের লতা মঙ্গেশকার, মা? সে গাইতো আমাদের কাননবালা…
এদিকে সুভদ্রা কিছুতেই তার বাবার কথা মানবেনা। সে বেশ কয়েকবার কাননবালা দেবীর গান শুনেছে, তার মোটেই ভাল লাগেনি। কোথায় লতা মঙ্গেশকার আর কোথায় কাননবালা!
এই নিয়ে সুভদ্রার সাথে তার বাবার তর্ক লেগেই থাকতো।
১৯৮০ র দশকে আসামে “বাঙ্গাল খেদা” আন্দোলনের ফলে দুলিয়াজান এর Assam Oil Company থেকে আসাম থেকে অনেক বাঙালী Geologist, Drilling Engineer, আর Petroleum Engineer কুয়েতে কাজ নিয়ে চলে আসেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন Senior ম্যানেজার ও ছিলেন। আমার বন্ধু সিদ্ধার্থ, তখন যুবক, সেও দুলিয়াজান থেকে কাজ নিয়ে ওই সিনিয়রদের সাথে কুয়েতে আসে। এই সব সিনিয়র দের কেউ তার চন্দদা’, কেউ ওয়াদ্দেদার দা’, কেউ সেনদা’, কেউ চ্যাটার্জ্জী দা’।
এদের মধ্যে চ্যাটার্জী (তপোব্রত) দা’ ছিলেন একজন সঙ্গীতরসিক মানুষ, নিজে ভাল গান গাইতেন, আর গান শুনতে ভালবাসতেন। আর তাঁর প্রিয় গায়ক ছিলেন পঙ্কজ মল্লিক।
Kuwait Oil Company তে দুপুরে এক ঘন্টার লাঞ্চ ব্রেক। সিদ্ধার্থ রোজ চ্যাটার্জীদা’র গাড়ীতে বাড়িতে লাঞ্চ খেতে যায়। আর সারাটা পথ চ্যাটার্জ্জীদা’র গাড়িতে ক্যাসেটে পঙ্কজ মল্লিকের গান বাজে। এদিকে সিদ্ধার্থর প্রিয় গায়ক হলেন কিশোর কুমার। রোজ রোজ গাড়িতে যেতে যেতে পঙ্কজ মল্লিকের নাকি গলায় গান শুনতে তার একেবারেই ভাল লাগেনা। আর বার বার চ্যাটার্জ্জী দা’ তাঁর একটা বিশেষ প্রিয় গান বাজাবেন ই।
পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা/
আঁ আঁ আঁ আঁ/
পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা/
ওই এক গান বার বার শোনা সিদ্ধার্থর কাছে এক বিরাট যন্ত্রণা।
তো রোজ রোজ ওই একই গান শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে সিদ্ধার্থ এক দিন চ্যাটার্জ্জী দা’ কে বলল চ্যাটার্জ্জী দা’, রোজ রোজ আপনার গাড়িতে আমি লাঞ্চ খেতে যাচ্ছি, আজ বরং আপনি আমার গাড়িতে চলুন।
চ্যাটার্জ্জী দা’ স্মিত হেসে বললেন “বেশ, চলো”!
সিদ্ধার্থর গাড়িতে উঠে বসে সীট বেল্ট বেঁধে হঠাৎ চ্যাটার্জ্জীদা’র কি যেন মনে পড়ে গেল। তিনি বললেন একটূ দাঁড়াও তো সিদ্ধার্থ, একটা জিনিষ নিয়ে আসি।
কি জিনিষ?
একটু পরে চ্যাটার্জীদা’ ফিরে এসে সিদ্ধার্থ কে একটা ক্যাসেট দিয়ে বললেন নাও, এটা চালিয়ে দাও, রাস্তায় যেতে যেতে একটু গান শোনা যাক ~
সব্বোনাশ!
আবার সারা রাস্তা ধরে সেই পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা…
সিদ্ধার্থ সেদিন তার বৌ সুমিতাকে বললো কাল থেকে আমায় লাঞ্চ দিয়ে দিও, আমি অফিসেই খেয়ে নেবো।