মনোহরপুকুরের বাড়ী ছেড়ে দেবার পরে জ্যেঠিমা দিদিভাই এর কাছে থাকতেন। আমি দেশে গেলে নিয়ম করে তাঁর সাথে দেখা করতে যেতাম। জ্যেঠিমা থাকতেন দিদিভাইদের বাড়ির এক তলার একটা ঘরে। জ্যেঠিমা তখন বিছানায় শয্যাশায়ী। উঠে বসতে পারতেন না। আমায় দেখে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। অনেক পুরনো দিনের কথা হতো আমাদের।
দিদিভাই এর বাড়ীতে অনেক কাজের লোক, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে জ্যেঠিমাকে দেখাশোনা করার জন্যে। আমরা জ্যেঠিমা কে দেখতে গেলে সেই কাজের লোকেরা আমাদের খুব দেখভাল করে। চা করে নিয়ে আসে, আর আমাদের গল্প করার সময় চুপ করে পাশে বসে থেকে খুব উৎসাহ নিয়ে আমাদের কথা শোনে।
তো একবার আমি আর সুভদ্রা গেছি জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে। দিদিভাই গেছে ওপরে আমাদের জন্যে চা নিয়ে আসতে। আর জ্যেঠিমার দু’জন কাজের লোক পাশে বসে আমাদের কথা শুনছে। তাদের মধ্যে একজনের গলা একটু ফ্যাঁসফ্যাঁসে,ভাঙা।
আমাদের সেদিন বোধহয় একটু তাড়া ছিল কোথাও যাবার, দেরী হয়ে গিয়েছিল তাই সুভদ্রা বেশ কয়েক বার “এবার আমরা উঠি” বলে তাড়া দিচ্ছিল।
সুভদ্রা যেই বলে “এবার আমরা উঠি”, ওমনি ওই ফ্যাঁসফ্যাঁসে,ভাঙা গলার মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “না গো,এখন যেউনি, একটু বোসো গো বৌদি, দিদি এই চা করে নিয়ে এলো বলে!”
এই রকম বার তিনেক হবার পরে, যেই ওই মেয়েটি আবার বলেছে “নাঁ গোঁ বৌঁদি, যেঁওনাকো”, সুভদ্রার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বোধ হয় অনেকক্ষণ থেকেই তার মেজাজ টা চড়ছিলা, আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। সুভদ্রা হঠাৎ দুম করে রেগে গিয়ে মেয়েটাকে এক ধমক দিয়ে বললো, “তুমি চুপ করো! তখন থেকে খ্যাঁকখ্যাঁকে গলায় চেঁচিয়ে যাচ্ছো!”
সেই ধমক খাবার পর থেকে যতক্ষণ ছিলাম, মেয়েটা চুপ করে বসে ছিল, একটা কথাও বলেনি।
পরের বার যখন জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে গেলাম, শুনলাম সেই মেয়েটি নাকি চাকরী ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেছে।