ছোটকাকার বিয়ে হয় ১৯৫৬ সালে, তখন আমার ক্লাস ফাইভ, এগারো বছর বয়স।
পাটনার কাছে দানাপুরে ছোটকাকীমার বাপের বাড়ি, বিয়েটা পাটনা থেকেই দেওয়া হয়। কিন্তু বৌভাত হয়েছিল মনোহরপুকুরে। পাটনা থেকে সবাই এসেছিলেন। দিদা, রাঙ্গাকাকা, সোনাকাকা, বড়মা, রাঙ্গাকাকীমা, সোনাকাকীমা, কৃষ্ণা, শুক্লা এবং আরো অনেকে। সারা বাড়ি আনন্দ উত্তেজনায় কয়েকদিন বেশ সরগরম হয়েছিল।
বৌভাতের পর ফুলশয্যা যেদিন হবে সেদিন সকাল থেকে বাড়িতে বিশাল হৈ হৈ। বিশেষ করে ভালোকাকা আর সোনাকাকার উৎসাহ সবচেয়ে বেশী। লেক মার্কেট থেকে প্রচুর ফুল কিনে আনা হয়েছে, সেই ফুল দিয়ে দুই ভাই মাঝের ঘরের খাট সাজাতে বসে গেছেন।
এদিকে ছোটকাকা কিছুটা লজ্জা লজ্জা মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কাকীমারা সবাই তাঁর সাথে নানারকম মজা করে কথা বলছেন, সবচেয়ে বেশী পিছনে লাগছেন বড়মা। আর ওদিকে ছোটকাকীমা নতুন বৌ, তিনি ঘোমটার আড়ালে প্রায় সারা মুখ ঢেকে এক কোণে বসে আছেন। আমরা ছোটরা নতুন কাকীমার সাথে কখন আলাপ হবে সেই আশায় বসে আছি। নতুন অতিথি কে নিয়ে আমাদের মনে প্রচন্ড কৌতূহল। কিন্তু আমরা তেমন পাত্তা পাচ্ছিনা।
ফুলশয্যা ব্যাপারটা যে কি সে বিষয়ে আমার কোন ধারণা নেই, কেবল বুঝতে পারছি যে ব্যাপারটা বেশ ধুমধাড়াক্কা কিছু হবে, একটা বেশ জমকালো পারিবারিক উৎসব, ছাতে উঠে তুবড়ী আর বাজী পোড়ানো হতে পারে, বাতাসা ছুঁড়ে বারান্দায় হরির লুঠ হতে পারে, গান বাজনার অনুষ্ঠান হতে পারে। মোটমাট যাই হোক না কেন, এটা ঠিক ই বুঝতে পারছি যে ফুলশয্যা কিছুতেই মিস করা চলবেনা।
এদিকে হয়েছে কি, সারা সকাল ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হয়ে দুপুরে খাবার পর বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম যখন ভাঙলো তখন সন্ধ্যা, বাইরে ক্রমশঃ অন্ধকার নেমে আসছে।
ঘুম থেকে উঠেই মনে হল এই রে, নির্ঘাত ঘুমিয়ে ফুলশয্যা টা মিস করে ফেললাম! ইস্, কোন মানে হয়?
আমি মাকে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করেছিলাম “মা, ফুলশয্যা কি হয়ে গেছে?”
আমার সেই কথা শুনে সারা বাড়ীর লোক নাকি খুব হাসাহাসি করেছিল।
শোনা যায় যে বড়মা নাকি রাত্রে মাঝের ঘরে খাটের তলায় লুকিয়ে বসেছিলেন, কিন্তু ছোটকাকা ঠিক তাঁকে ধরে ফেলেন। অবশ্য ছোটকাকা তাঁকে ধরে ফেলেন না বড়মা লজ্জা পেয়ে নিজে থেকেই ধরা দেন, তা আর এখন জানা সম্ভব নয়।