১৯৫৩ সাল, আমার সাত বছর বয়েস, মা’র সাথে বাবার কাছে দিল্লীতে গিয়েছি। সেই প্রথম আমার দিল্লী যাওয়া।
নিখিল জ্যেঠু (আমরা বলতাম দিল্লীর জ্যেঠু) তখন দিল্লীতে পোস্টেড, সফদরজং এনক্লেভে ওঁর বিরাট বাগানওয়ালা বিশাল কোয়ার্টার, সেখানে গিয়ে প্রথম মুকুর সাথে আমার দেখা।
মুকু সেই ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত আর দামাল, সব সময় দুদ্দাড় করে ছুটে বেড়াচ্ছে, সেই তুলনায় আমি শান্ত, লাজুক আর ভীতু, বিশেষ করে নতুন জায়গায় নতুন লোকজনেদের সাথে একেবারেই মিশতে পারিনা, ফলে ওনাদের বাড়ী গেলে শুমা আর জ্যেঠু আমায় অনেক আদর করা সত্ত্বেও আমি মা’র আঁচলের পিছনে লুকিয়ে থাকি।
তার ওপরে মুকুদের বাড়িতে একটা বিরাট অ্যালশেসিয়ান কুকুর আছে, তার নাম তোজো, তাকে আমি ভীষণ ভয় পাই। সব মিলিয়ে মুকুদের বাড়িতে যেতে আমার মোটেই ভাল লাগেনা।
যাই হোক, এক ছুটির দিন সবাই মিলে কুতব মিনার যাওয়া হবে, জ্যেঠুর গাড়ীতে পিছনের সীটে বসে আছি মুকু আর শিখার সাথে, শিখা তখন ছোট্ট মেয়ে, চার কি পাঁচ বছর বয়েস, পুটপুট করে দুই ভাই বোনে ইংরেজীতে কি যে কথা বলে যাচ্ছে, আমার মাথায় কিছুই ছাই ঢুকছেনা, আমি চুপ করে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি।
Feeling quite left out and ignored যাকে বলে!
কিছুক্ষণ পরে মুকু আর শিখা হঠাৎ “কুতব মিনার কুতব মিনার” বলে চ্যাঁচাতে শুরু করলো।
ব্যাপারটা কি ?
আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি গাঢ় লাল রং এর বেশ উঁচু একটা টাওয়ার, তলাটা মোটা, খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা দেয়াল, লম্বা হয়ে ছোট হতে হতে ওপরে উঠে গেছে, মাঝে মাঝে কিছু গোল বারান্দা, তাতে বেশ কিছু লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে নীচ থেকে দেখা যায়।
এটাই কুতব মিনার নাকি ?
লোক গুলো ওই ওপরের বারান্দায় উঠল কেমন করে ? হাঁচোড় পাঁচোড় করে ওই খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা দেয়াল বেয়ে নাকি ?
সব্বোনাশ! আমার দ্বারা ও কাজ জীবনেও হবেনা।
জ্যেঠু বললেন, “কে কে কুতব মিনারে চড়বে, হাত তোলো।” মুকু তো সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে ready, ওদিকে ছোট্ট শিখাও দেখি হাসিমুখে হাত তুলে বসে আছে।
আমি তো অবাক, এ কি রে ? এইটুকু মেয়ে, সে কিনা ওই লম্বা টাওয়ারের গা বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠবে? সাহস তো কম নয় ? জ্যেঠু আর শুমার ও তো তাই নিয়ে কোন চিন্তা আছে বলে মনে হচ্ছেনা!
আমি মনে মনে কল্পনা করলাম দুরন্ত মুকু হাঁই পাঁই করে লাফিয়ে লাফিয়ে ওই দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে, আর তার পিছন পিছন হামাগুড়ি দিয়ে শিখা…
আমি আর হাত তুলছিনা, চুপ করে বসে আছি! তোমরা যত ইচ্ছে ওঠো বাবা, আমি ওতে নেই । শুমা বললেন “মান্টুবাবুর কি হলো ? তুমি কুতব মিনারে চড়বেনা ?”
আমি চুপ।
কিন্তু পরে সামনে গিয়ে দেখি ও হরি, ভেতরে তো দিব্বি ওপরে ওঠার সিঁড়ি!
তখন আর আমায় পায় কে ? মুকুর সাথে আমিও দুদ্দাড় করে ওপরে উঠে গেলাম। তখন ভেতরটা বেশ অন্ধকার, সরু, ঘুলঘুলি দিয়ে অল্প আলো আসছে, উত্তাল স্রোতের মত ওই একই সিঁড়ি দিয়ে লোক উঠছে আর নামছে তার মধ্যে দিয়েই আমরা দুজন প্রায় দৌড়ে উঠছি, এ যেন বেশ একটা মজার খেলা! তখন তো আর এখনকার মতো হাঁটু কনকন আর কোমর টনটন নেই, শরীরের কলকব্জা সব brand new, ফুসফুসে অফুরন্ত দম!
একেবারে ওপরের বারান্দায় উঠে গিয়েছিলাম আমরা দু’জনে। সেখান থেকে নীচটা খুব সুন্দর দেখায়, সাজানো বাগান, প্রচুর ফুল ফুটে আছে।
আর দূরে যতদূর চোখ যায় দেখা যায় দিল্লী শহরের ঘরবাড়ী, আর দিকচক্রবালে সবুজ বনানী।
সেই বিকেল টা এখনো খুব মনে পড়ে।
মুকুর সাথে সেই দিন থেকে আমার ভাব।