কোয়েলিয়া গান থামা এবার

আজকাল সুভদ্রা আর আমি মাঝে মাঝে দিল্লী যাই।  সেখানে আমাদের ছোট মেয়ে বুড়ী থাকে, আমরা মেয়ে জামাই আর নাতি নাতনীদের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে আসি। দিল্লী গেলেই মুকুর সাথে দেখা হয়, আর আমরা নিয়ম করে একদিন কিছুক্ষণ একসাথে কাটাই।

মুকু আমাকে ওর গাড়ীতে তাদের Army Officers Golf Club এ নিয়ে যায়। রাস্তায় গাড়ী চালাতে চালাতে মুকু অনর্গল কথা বলে যায়। তার অনেক গল্প। আর সেই কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে মুকু মাঝে মাঝে বেশ কিছু গানের দুই এক কলি নিজের মনেই গেয়ে ওঠে।

মুকু সম্বন্ধে কিছু লিখতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে সে একজন সঙ্গীতরসিক, এমন কি ভাল বাংলায় তাকে সঙ্গীতপিপাসু ও বলা যায়। একটু সুযোগ পেলেই সে কিছু গান গুণগুণ করে গাইবেই। আর একটা আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো যে জীবনটা প্রায় সবটাই বাংলার বাইরে কাটালেও তার প্রিয় গান গুলো সবই বাংলা গান। স্কুলের উঁচু ক্লাসে (ক্লাস নাইন থেকে ইলেভেন ১৯৬০-৬৩) পড়ার সময়ে সে তিন বছর কলকাতায় ছিল। সেটা ছিল বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। সেই সময়ের বহু বাংলা গান মুকুর এখনো বেশ মনে আছে, গত বছর সে গাড়ী চালাতে চালাতে স্টিয়ারিং এ তবলা বাজাতে বাজাতে গাইছিল মান্না দে’র আমি যামিনী তুমি শশী হে…

এবার তার গলায় শুনলাম দুই ভাই সিনেমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত সুপারহিট গান “তারে বলে দিও সে যেন আসেনা আমার দ্বারে”…ওই গানের একটা interlude আছে গানের মাঝখানে বিশ্বজিৎ (রাধাকান্ত নন্দী) হঠাৎ তবলা বাজানো বন্ধ করবে আর উত্তমকুমার (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) বলবে “কি রে থামলি কেন, বাজা?”

ট্র্যাফিক জ্যামে গাড়ী আটকে গেলে বা ট্র্যাফিক লাইটে গাড়ী থামলেই মুকু আনমনে গান থামিয়ে বলে উঠছে, “কি রে থামলি কেন, বাজা?”

এই গান গাওয়া নিয়ে মুকুর একটি গল্প আছে, এর থেকে তার self mocking  আর self deprecating persona সম্বন্ধে একটা ধারণা করা যাবে।

————-

একবার বহুদিন আগে পঞ্চাশের দশকে (মুকুর বয়েস তখন সাত কি আট বছর) জ্যেঠুরা তখন পান্ডারা রোডে থাকেন, সবাই মিলে টাঙ্গা চড়ে বিপু মামার বাড়ীতে যাওয়া হচ্ছে। গাড়ীতে জ্যেঠিমা (মুকুর মেজমা) ও আছেন।

মুকুর সব গল্প শুনলেই সেগুলো মনের মধ্যে একটা ছবির মত ফুটে ওঠে। ওর গল্প বলার মধ্যে একটা স্বাভাবিক দক্ষতা আছে।

আমি শুনছিলাম আর মনে মনে কল্পনা করে নিচ্ছিলাম সেই সময়কার পান্ডারা রোড, নির্জ্জন, গাছের ছায়ায় ঢাকা, তার মধ্যে টাঙ্গা চলছে, ঘোড়ার খুরের খট্‌খট্‌ আর গাড়োয়ানের জিভ দিয়ে তোলা টক্‌টক্‌ আওয়াজ শোনা যায়, তার সাথে মাঝে মাঝে স্পীড বাড়ানোর জন্যে ঘোড়ার পিঠে আলতো করে মারা চাবুকের সপ্‌সপ্‌ শব্দ।

ছোটবেলায় এক সময়ে কত টাঙ্গায় চড়েছি, দিল্লী পাটনা লক্ষ্ণৌ কাশী এই সব শহরে। এখন আর কোথাও টাঙ্গা চলেনা, তার জায়গায় এখন অটো আর রিক্সা।

যাই হোক, টাঙ্গায় যেতে যেতে মুকু – সে সেই অল্পবয়েস থেকেই সঙ্গীতপিপাসু –    জ্যেঠিমা কে বললো, “মেজমা তুমি একটা গান গাও না!”

জ্যেঠিমা বললেন, “আমি তো গান গাইতে পারিনা মুকু, বরং তুই একটা গান গা’ না”।

এখন মুকু হচ্ছে এমন একজন ছেলে যাকে গান গাইতে বলার দরকার হয়না, সে এমনিতেই নিজের উৎসাহেই গান গেয়ে যায়। সুতরাং বলা বাহুল্য জ্যেঠিমা বলার সাথে সাথে সে একটা গান গাইতে শুরু করে দিলো।

“কি গান গাইলি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

কিছু দিন আগে শুমার কাছ থেকে শুনে এই গানের সুরটা তার খুব ভালো লেগেছে। সে গাইতে শুরু করে দিলো “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো…”

মুকু আমায় বললো , “আমি বেশ ভালোই গান টা শুরু করেছিলাম, বুঝলি, কিন্তু দুই লাইন গাইবার পরেই আমার মাথায় এক বিরাট চাঁটি ”…

চাঁটি? আমি বললাম “সে কি রে, কে মারলো?”

মুকু বললো, “কে আবার? বাবা…”

মুকুর পাশে বসেছিলেন জ্যেঠু, তিনি নাকি মুকুর মাথায় এক চাঁটি মেরে বলেছিলেন, “এই ভর দুপুরে চাঁদের আলো! যত্ত সব ইয়ার্কি, হুঁঃ! তোকে আর গান গাইতে হবেনা, ঢের হয়েছে, থামা তোর গান। ”

———————