
সত্তরের দশকে IBM Sales এর কাজে আমায় নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো।
কলকাতার কাছাকাছি কোথাও যেতে হলে নিজের গাড়ী নিয়েই যেতাম, কিন্তু কলকাতার বাইরে কোথাও গেলে লোকাল ট্রেণ ধরে যেতেই আমার ভাল লাগতো।
সেই সব লোকাল ট্রেণে ভীড় আর চাপাচাপির মধ্যে কোনমতে জায়গা করে মাথার ওপরে হাতল ধরে ট্রেণের চাকার ঝাঁকানীর শব্দ শুনে, আর দুলুনী তে দুলতে দুলতে চারিপাশের মানুষজন কে দেখে বেশ সময় কেটে যেত মনে পড়ে।
ডেলি প্যাসেঞ্জারদের এক একটা গ্রুপ থাকতো। রোজ দেখা হবার ফলে তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী হয়েছে, তাদের আড্ডা, হাসিঠাট্টা আর রসিকতা আমরা বাকি যাত্রীরাও বেশ উপভোগ করি। আবার কিছু যাত্রীর হলো তাসের নেশা, একটা চাদর পেতে তারা টোয়েন্টি নাইন (ষোল আছি সতেরো আছি) কিংবা ব্রীজ (ওয়ান স্পেড টু হার্ট )শুরু করে দেয়। এই চলন্ত ট্রেণে বসে তাস খেলায় তাদের মনোযোগ আর মগ্নতা দেখলে মনে হবে তারা বিশ্বসংসার ভুলতে বসেছে।
আর থাকতো ফেরীওয়ালারা। অল্পবয়েসী কিশোর থেকে যুবক, মধ্যবয়েসী, এবং অনেক প্রৌঢ় মানুষ নানা ধরণের জিনিষ বিক্রী করার জন্যে এক কম্পার্টমেন্ট থেকে আর এক কম্পার্টমেন্টে ঘুরে বেড়াতেন। কেউ কলম, কেউ লেবু লজেন্স, কেউ ঝালমুড়ি। বিক্রী তেমন কিছু হতো বলে মনে হয়না, তবু তারা প্রাণপণ চেষ্টা করে যেতেন। সকাল থেকে রাত পর্য্যন্ত এক ট্রেন থেকে আর এক ট্রেন, জীবিকা উপার্জ্জনের বাধ্যবাধকতার তাগিদে তাদের সেই ক্লান্তি হীন, বিরামহীন ছুটে চলা দেখে মনের মধ্যে একটা বিষাদ অনুভব করতাম।
আর থাকতো গানওয়ালারা।
নানা ধরণের গান – ভক্তিগীতি, বাংলা আধুনিক, হিন্দী ফিল্মের গান – গেয়ে যাত্রীদের মনোরঞ্জন করে তারা তাদের পয়সার কৌটো ঝনঝন শব্দে এগিয়ে দিতো। কিন্তু প্রায় সব যাত্রীই মুখ ঘুরিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতো, গান শুনে ভিক্ষা দেবার মত পকেটে রেস্ত তাদের কারুরই নেই। মানসিকতাও নেই হয়তো।
ষাটের দশকের শেষে তখন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় দেশে ধারাবাহিক “পারাপার” লিখছেন, সেই উপন্যাসে মাঝে মাঝেই ভীড়ের ট্রেণের কথা উঠে আসে। গাদাগাদি ভীড়ের মধ্যে কোনমতে গাড়ীর পাদানিতে পা আর সারা শরীর বাইরে রেখে ঝুলে থাকা একটি মানুষ জানেওনা তার দিকে উলটো দিক থেকে ঘন্টায় ষাট মাইল বেগে ছুটে আসছে প্রাণঘাতী টেলিগ্রাফের পোস্ট।
শীর্ষেন্দু লিখেছিলেন – “অন্ধকারে ছুটে যায় জন্মান্ধ মানুষ। ”
সেইরকম একটি জন্মান্ধ কিশোরকে দেখেছিলাম একদিন ট্রেণে। নিষ্পাপ সুকুমার মুখ, দুটো চোখ বোঁজা, বোঝাই যায় যে তার পৃথিবী অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু তার রিনরিনে মিষ্টি গলায় বেশ সুর আছে, দুই হাতে দুটো ইঁটের চাকতি কে খঞ্জনির মতো টকাটক করে বাজিয়ে তাল রেখে সে সেই সময়ের শ্যমল মিত্রের একটি জনপ্রিয় গান গেয়েছিল।
কে জানে, কে জানে ?/
কবে আবার দেখবো পৃথিবীটাকে/
এই ফুল, এই আলো আর হাসিটিকে/
তার কাছের লোকেরা তাকে দিয়ে এই অল্প বয়েসে ট্রেণে ট্রেণে ঘুরে গান গেয়ে উপার্জ্জন করতে পাঠিয়েছে ভেবে সেদিনা আমার মন বেশ খারাপ হয়েছিল, তার ছোট হাত দুটো ধরে আমি কিছু টাকা গুঁজে দিয়েছিলাম।
সেই ফুটফুটে কিশোরটিকে এখনো ভুলতে পারিনি।
আর একটি বিকেলের কথা মনে পড়ে।
বৈদ্যবাটীতে একটা জুট মিলে কাজ সেরে বিকেলের ট্রেন ধরে কলকাতা ফিরছি।
অফিস ফেরত লোকেদের ভীড়ে ঠাসা কামরা, কোনমতে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। শেওড়াফুলি স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতেই দেখলাম আমাদের কামরার সামনে প্ল্যাটফর্মে একটা জটলা, আর কার একজনের গলায় গান ভেসে আসছে।
মান্না দের “সেই তো আবার কাছে এলে”~
আহা, বেশ সুন্দর গাইছে তো ছেলেটা? মিষ্টি গলা, গায়কীটাও পরিণত।
কৌতূহল হলো, বাইরে তাকিয়ে জটলার মধ্যে দেখি একটি যুবক দাঁড়িয়ে, দেখে একটু অপ্রকৃতিস্থ মনে হয়, পরনে সার্ট আর পাজামা, মুখে অনেকদিনের না কামানো দাড়ি, চুল উস্কোখুস্কো, আত্মমগ্ন হয়ে আপন মনে গান গেয়ে যাচ্ছে। আর তার চারিপাশে শ্রোতার দল মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে চুপ করে তার গান শুনছে।
ছেলেটি কি পাগল? অথবা ব্যর্থ প্রেমিক? সন্ধ্যাবেলা শেওড়াফুলি স্টেশনের ব্যস্ত ভীড় আর কোলাহল কে সে তার আশ্চর্য্য গানের যাদু দিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছে। সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য।
সে পরের গান ধরলো। “আমি নিরালায় বসে বেঁধেছি~”
আবার মান্না দে?
ট্রেন থেকে নেমে পড়ে ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেলাম। একের পর এক মান্না দে’র গান গেয়ে গেল ছেলেটি, যেন সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে, পরিপার্শ্বের কোন খেয়াল নেই। আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার গান শুনে গেলাম।
তারপর দুটো ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিলাম সেদিন।
পরে ওই লাইনে ছেলেটিকে আর দেখিনি কোনদিন। কিন্তু তার পর থেকে মান্না দে’র কোন গান শুনলেই শেওড়াফুলি স্টেশনের সেই বিকেল আর সেই ছেলেটার কথা আমার মনে পড়ে যায়।

Excellent
LikeLike
Thanks
LikeLike