তারাপদ দা’  

১ – মুখবন্ধ

কবি তারাপদ রায়  আমার সম্পর্কে দাদা হতেন। একটু লতায় পাতায় অবশ্য, উনি হলেন বাবার পিসতুতো ভাইয়ের ছেলে।

আমার ঠাকুর্দারা দুই ভাই এবং এক বোন ছিলেন, বাবাদের সেই একমাত্র পিসীর বিয়ে হয় ময়মনসিংহে, দেশভাগের পরে তাঁরা ভারতে আসেননি।  পিসেমশায় ডাক্তার ছিলেন, ময়মনসিংহে তাঁর সম্পন্ন পরিবার, কাজে সুনাম আর পসার ভাল ছিল ধরে নেওয়া যায়। সে সব ফেলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের  কথা মাথায় রেখে তাঁরা পূর্ব্ব বাংলায় থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন্‌।  তাঁদের দুই ছেলে পূর্ণ আর সুশীলও এদেশে আসেননি।      

পূর্ণ জ্যাঠামশায়ের কোন সন্তান ছিলনা, ষাটের দশকে তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রীর পক্ষে  একা ওদেশে থাকা সম্ভব ছিলনা, তিনি তখন ভারতে চলে আসেন।  আমাদের সেই  ময়মনসিংহের জ্যেঠিমাকে নিয়ে আমি এখানে আগে লিখেছি, হয়তো  তোমাদের কারুর কারুর মনে থাকবে।,

ছোটভাই সুশীল  ছিলেন উকিল, তিনি টাঙ্গাইল শহরে ওকালতি করতেন।   তবে দেশভাগের সময়  তিনি এবং তাঁর স্ত্রী নিজেরা টাঙ্গাইলে থেকে গেলেও তাঁদের  দুই ছেলে তারাপদ আর বিজন কে ভারতে কলেজে পড়তে পাঠিয়ে দেন্‌।  স্ত্রীর মৃত্যুর পরেও সুশীল একাই টাঙ্গাইল শহরে থেকে যান।  সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

যাই হোক, বাবাদের এই পিসতুতো ভাইদের পরিবারের অনেকেই ভারতে এসে থাকতে শুরু করেন।  আমাদের বাঙালদের লতায় পাতায় পারিবারিক সম্পর্ক আর network এর সুবাদে  এঁদের সাথে আমাদের পরিচয় ছিল।  সেই সূত্রেই তারাপদদা’র সাথে আমার প্রথম আলাপ।  তখন আমি স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি,  বঙ্কিমচন্দ্র শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ মোটামুটি পড়ে ফেলে  ক্রমশঃ আধুনিক বাংলা  সাহিত্যের দিকে ঝুঁকছি।    

সেই ষাটের দশকে কল্লোল  যুগ  তখন অতিক্রান্ত,  কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠীর সুনাম ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছে।   

তারাপদ দা’ সেই  কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠীর একজন প্রধান সদস্য ছিলেন, নিঃসন্দেহে সেই সময়ের একজন প্রথম সারির কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। বুদ্ধদেব বসু মারা যাবার পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, এবং শরৎ মুখোপাধ্যায়ের সাথে তিনিও একজন শববাহক হয়েছিলেন।

তাঁর এই কবিখ্যাতি আমার কৈশোরে তাঁর প্রতি আকর্ষণ জন্মাবার একটি প্রধান কারণ ছিল। তাছাড়া তিনি খুব মজলিসী আর আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন, তাঁর স্টকে অনেক মজার গল্প, আর সেই সব মজার গল্প বলার তাঁর একটা অননুকরণীয় স্টাইল ছিল, যেটা আমার খুব ভাল লাগত। হেঁড়ে গলায় সামান্য বাঙ্গাল উচ্চারণে উনি নানা গল্প করে যেতেন একের পর এক, আর এই সব গল্প বলার সময় তারাপদ দা’ প্রায় প্রতি বাক্যের মধ্যেই একবার “বুঝতে পেরেছো তুমি?” বলতেন। ওটা তাঁর একটা মুদ্রাদোষ ছিল।

পন্ডিতিয়া রোড টা ক্যালকাটা কেমিকালের পরে যেখানে বেঁকে হাজরা রোডের দিকে চলে গেছে ঠিক সেই জায়গায় একটা ছোট ভাড়া বাড়ীর একতলায় থাকতেন তারাপদ দা’, মিনতি বৌদি আর তাঁদের ছেলে তাতাই (কৃত্তিবাস)। আমি থাকতাম মনোহরপুকুর রোডে, ত্রিধারার পাশ দিয়ে শর্টকাট করে চলে যেতাম, খুব বেশী দূর নয়, হেঁটে মিনিট পনেরো লাগতো। ওনার সেই পন্ডিতিয়া রোডের বাড়ীতে প্রায়ই আমি আর সুভদ্রা গিয়ে আড্ডা মেরে আসতাম। নানা গল্প হত। আর তারাপদ দা’র সব গল্পেই বার বার ওই কথাটা ফিরে আসবেই।    

ধরা যাক তারাপদ দা’ কে কেউ এক জন একটা Rubic Cube উপহার দিয়েছে। তারাপদ দা’র ছেলে তাতাই সেটা নিয়ে অনায়াসে সব লাল এক দিকে, সব নীল এক দিকে, আর সব হলদে এক দিকে করে দেয়, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেটা তারাপদ দা’ কিছুতেই পারছেন না।

এই ব্যাপার টা বলতে হলে তারাপদ দা’ বলবেন “সবাই শুয়ে পড়লে, বুঝতে পেরেছো তুমি, আমি ওটা নিয়ে অনেক রাত পর্য্যন্ত নাড়াচাড়া করি, কিন্তু কিছুতেই রং গুলো এক জায়গায় আনতে পারিনা, বুঝতে পেরেছো তুমি, অথচ তাতাই কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পেরেছো তুমি, ওই জিনিষটা তে যদি কেউ ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়, তাহলে দেখবে শুধু আমারই হাতের ছাপ, বুঝতে পেরেছো তুমি…”

তারাপদ দা’র বসার ঘর রাস্তার ওপরেই, দরজা সব সময় খোলা থাকত। ছোট ঘর, একটা টেবিল, বই পত্রে ঠাসা, কিছু চেয়ার আর একটা সোফা।  

সেই সময়ে নিজের খরচে তারাপদ দা একটা লিটল ম্যাগাজিন ছাপাতেন, তার নাম ছিল  “কয়েকজন”। সেই ম্যাগাজিনে ওঁর বন্ধুরা – যেমন নবনীতা দেব সেন, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, হিমানীশ গোস্বামী, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত ইত্যাদিরা লিখতেন।  রাইটার্সে ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন তারাপদ দা, সেই সরকারী কাজ সেরে লেখা যোগাড় করা, প্রেসে যাওয়া, প্রুফ দেখা, কয়েকজনের জন্যে বিজ্ঞাপন আনা, বিজ্ঞাপনের টাকার তাগাদা দেওয়া সব কাজ তাঁকে একাই করতে হতো। তবু ওটা একটা নেশার মতোই ছিল ওঁর কাছে।  

পন্ডিতিয়া রোডে তারাপদ দার সাথে কাটানো সেই সন্ধ্যাগুলো এখনো বেশ পরিস্কার মনে পড়ে। সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা হত, বিশেষ করে কবিতা নিয়ে। সেই আলোচনায় সমর সেন, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র দের ঘিরে নানা টক ঝাল মিষ্টি গসিপ উঠে আসত, আর সেই সাথে অবশ্যই আসত তারাপদ দার ওই  “বুঝতে পেরেছো তুমি” দিয়ে punctuate করা অজস্র সরস গল্প।

সেই সব গল্প থেকে দুটো গল্প এই সাথে।  

  ২ – Radish with molasses

বাঙ্গালী সংষ্কৃতি এবং সাহিত্য নিয়ে খুব উৎসাহী এক আমেরিকান দম্পতি কলকাতায় এসেছেন। প্রায় এক মাস কলকাতায় থেকে তাঁরা খুব কাছ থেকে বাঙ্গালীদের জীবনের নানা দিক – বাঙ্গালীর পূজো আর্চ্চা, বাঙ্গালীর রান্না, বাঙ্গালীর আড্ডা, বাঙ্গালীর রাজনীতি– এই সব খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখেছেন। দেশে ফিরে যাবার কিছুদিন আগে তাঁরা দুজনে একদিন কোন এক মন্ত্রীর সাথে দেখা করতে রাইটার্সে এসে হাজির।

তারাপদ দা’ বিখ্যাত কবি, মন্ত্রী মশাই ওনাদের তারাপদ দা’র কাছে নিয়ে এসে আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, “তারাপদ, তুমি তো কালীঘাটে থাকো, এনারা কালীঘাটের মন্দিরে গিয়ে মা কে দর্শন করতে চান, তুমি একটু ওঁদের নিয়ে গিয়ে দর্শন করিয়ে দেবে?”

সেদিন শনিবার, হাফ ছুটি। তারাপদ দা’ তখন থাকেন কালীঘাটে মহিম হালদার স্ট্রীটে, ওঁর বাড়ি থেকে মন্দির কাছেই, হাঁটাপথ। মা’র দর্শন হয়ে গেলে তিনি দুজন কে নিয়ে বাসায় গিয়ে দেখেন মিনতি বৌদি বাড়ি নেই, বাড়ি ফাঁকা। সকালে একটু বৌদির সাথে বাদানুবাদ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাই বলে বৌদি বাড়ী ছেড়ে চলে যাবেন এটা তারাপদ দা ভাবেন নি।

সর্ব্বনাশ! এখন এই দুই অতিথির খাওয়ার বন্দোবস্ত কি হবে? বিকেল প্রায় চারটে বাজে, এখন তো আর বাইরেও কোথাও যাওয়া যাবেনা। তার ওপর খিদেও পেয়েছে প্রচন্ড।

তারাপদ দা’ রান্নাঘরে গিয়ে দেখেন বৌদি কোন রান্নাই করে রেখে যান নি। শুধু এক কোণে পড়ে আছে কয়েকটা মূলো আর একটু ঝোলা গুড়।

নিরুপায় হয়ে তারাপদ দা ওই বিদেশী অতিথিদের প্লেটে করে কিছু মূলো আর গুড় দিয়ে বললেন এটা খান, এই পদটার  নাম Radish with molasses, এটা হলো বাঙ্গালীদের একটা স্পেশাল খাবার। যাকে বলে ডেলিকেসী।

এর পরে অনেকদিন কেটে গেছে।

হঠাৎ একদিন নিউ ইয়র্ক থেকে এয়ার মেলে তারাপদ দা’র নামে এক চিঠি এল। সেই দম্পতি তারাপদ দা’ কে তাঁর সেদিনের আতিথেয়তার জন্যে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠির শেষে লিখেছেন, আপনি জেনে খুশী হবেন যে আমরা নিউ ইয়র্কে একটা রেস্তোরাঁ খুলেছি, আর আমাদের মেনু তে লাউ চিংড়ি, মোচার চপ, আলু পোস্ত, চালতার টক, ইত্যাদি অনেক বাঙ্গালী পদ রেখেছি।

কিন্তু সব চেয়ে বেশী লোকের কি পছন্দ জানেন? আপনার দেওয়া রেসিপি দিয়ে তৈরী Radish with molasses, যা কিনা হু হু করে বিক্রী হচ্ছে!

বুঝতে পেরেছো তুমি?

 ৩ – গৃহপালিত গন্ডার

সারা পৃথিবীতে কত গৃহপালিত জন্তু আছে তাই নিয়ে ইউনাইটেড নেশনের এক সমীক্ষা হবে। তার ফর্ম ছাপিয়ে পাঠানো হয়েছে পৃথিবীর নানা শহরে আর গ্রামে।

এই ধরনের সমীক্ষায় সাধারনতঃ Statistical sampling  technique ব্যবহার করা হয়, সারা পৃথিবী থেকে তো আর information  জোগাড় করা সম্ভব নয়, তাই কিছু selected  representative জায়গা থেকে data collection  করে তার পর Computer software দিয়ে data extrapolation করে সারা পৃথিবী সম্বন্ধে একটা ধারণা করে নেওয়া হয়।

তো ইউনাইটেড নেশনের সেই সমীক্ষার ফর্ম এসে পৌঁছলো বাংলাদেশের এক  প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই গ্রামে ইংরেজী জানা কোন লোক নেই, পোস্টমাস্টার মশাই ক্লাস ফাইভ পর্য্যন্ত পড়েছেন, একমাত্র তিনি কিছুটা ইংরেজী জানেন, এবং তাই নিয়ে তাঁর আবার একটু গোপন অহংকার ও আছে।

এদিকে গ্রামের পাঠশালার মাস্টার মশায়ের এক ভাইপো ঢাকায় স্কুলে পড়ে, তার বয়েস বছর দশ এগারো হবে, সে ছুটিতে কাকার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। সে ভালই ইংরেজি জানে, তাছাড়া সে বেশ উৎসাহী আর কাজের ছেলে, তাই তার উপরেই ভার পড়ল সারা গ্রামে  কত গৃহপালিত জন্তু আছে তার একটা হিসেব করে ফর্ম ফিল আপ করার।

ছেলেটি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ক’দিনের মধ্যেই একটা লিস্ট তৈরী করে ফেললো। তার পর ইংরেজী তে ফর্ম ফিল আপ করার পালা।

ছেলেটি গোটা গোটা ইংরেজী হরফে ফর্মে লিখলোঃ

Cow 20, Goat 45, Pig 28, Sheep 32, Rooster 50, Hen 55, Gander 12, Geese 15, Cat 62, Dog 45 ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেই ফর্ম শেষ পর্য্যন্ত পৌঁছলো পোস্টমাস্টারের কাছে। তিনি সেই ফর্ম খামে ভরে পাঠিয়ে দেবেন সঠিক জায়গায়।

পোস্টমাস্টার মশায় ফর্ম টা দেখে কৌতূহলী হয়ে ভাবলেন দেখি তো ছোঁড়া কিরকম ইংরেজী লিখেছে। পড়তে পড়তে হঠাৎ গ্যান্ডার এ এসে তাঁর চোখ আটকে গেল।

গ্যান্ডার?   

“ছোঁড়া গন্ডারের ইংরেজী লিখেছে গ্যান্ডার! ছি ছি! কিস্যু ইংরেজি শেখেনি বোঝাই যাচ্ছে” মনে মনে এই কথা বলে তিনি ফর্মে গ্যান্ডার -১২  কেটে লাল কালি দিয়ে লিখে দিলেন রাইনোসেরাস – ১২।

নানা দেশ ঘুরে সেই ফর্ম শেষ পর্য্যন্ত পৌঁছলো ইউনাইটেড নেশনের হেড কোয়ার্টারে। সেখানে কারুর চোখে কোন অসঙ্গতি ধরা পড়লোনা, Computer software দিয়ে সেই data extrapolate  করে  বড় একটা রিপোর্ট তৈরী হলো, সেখানে দেখা গেল সারা পৃথিবীতে গৃহপালিত গন্ডারের সংখ্যা হল দুই লক্ষ ছাব্বিশ হাজার!

বুঝতে পেরেছো তুমি?