ইন্দোর  হইতে বিদায়, ২০১৭

সুচরিতা উদয় আর সুভদ্রার সাথে মাসীমণি

সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কিছুদিন আগে ইন্দোর গিয়েছিলাম, মাসীমণির সাথে দেখা করতে। মাসীমণি আমার ছোটমাসী, মা’দের  পাঁচ বোনের মধ্যে সব চেয়ে ছোট বোন, মেসোমশায় চলে যাবার পরে উনি একাই ইন্দোরে থাকতেন, ওঁদের একমাত্র ছেলে উদয় থাকে কানাডায়।

ইন্দোরে একটা নামকরা মেয়েদের স্কুলে ডাকসাইটে  প্রিন্সিপাল হিসেবে মাসীমণির খুব নামডাক ছিল, রিপাবলিক ডে তে রাষ্ট্রপতি শংকরদয়াল শর্মার হাত থেকে  তিনি পুরস্কার নিচ্ছেন সেই ছবি এখনো তাঁদের বাইরের ঘরের দেওয়ালে টাঙানো আছে।

মাসীমণি বরাবরই   ইংরেজী তে যাকে বলে fiercely independent, কিন্তু ইদানীং তাঁর শরীর আর মন ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে, একা একা থাকা আর সম্ভব হচ্ছেনা। তাই উদয় মা’কে নিজের কাছে কানাডায় নিয়ে যেতে এসেছে। 

মাসীমণি র সাথে আবার কবে দেখা হবে কে জানে, এই ভেবে সুভদ্রা আর আমি ইন্দোরে গেলাম কয়েকদিনের জন্যে।

পাকাপাকি কানাডা যাবার আগে  উদয়ের অনেক কাজ। আমি যত টা পারি ওর সাথে সাথে থাকছি।  একদিন দু’জনে মিলে গেলাম ওদের বাড়ির কাছে স্টেট ব্যাঙ্কের একটা ব্রাঞ্চে।   

ইন্দোর শহরে স্টেট ব্যাঙ্কের এই ব্রাঞ্চ টা খুব একটা ছোট নয়, অনেক লোকজন কাজ করছে, ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও ব্যাঙ্কের ম্যানেজার আমাদের অনেকটা সময় দিলেন, তারপরে সব শুনে আমাদের পাঠালেন Assistant  ম্যানেজারের কাছে। সেই ভদ্রলোকের বৌ আবার মাসীমণির ছাত্রী ছিলেন, তাই তিনি তো উদয়কে দেখে একেবারে বিগলিত, কি করে উদয়কে খাতির করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। কেমন আছেন স্যার, ম্যাডাম কেমন আছেন স্যার, ওনাকে নিয়ে কানাডা নিয়ে যাচ্ছেন শুনলাম স্যার, উনি কবে ফিরবেন স্যার, আমি আর আমার বৌ যাবার আগে একবার দেখা করতে আসবো স্যার,  ইত্যাদি তিনি বলেই চললেন, তাঁর কথা আর ফুরোয় না।  তার ওপর কি খাবেন স্যার, বলে  চায়ের বন্দোবস্তও করে ফেললেন চট করে। চা খাওয়ার পর অনেকক্ষন খেজুরে গল্প হলো আমাদের, তার পরে তিনি আমাদের পাঠালেন এক মহিলার কাছে, আর যতক্ষণ না সেখানে আমাদের কাজ শেষ হয়, বেশ কয়েকবার এসে খোঁজ করে গেলেন, কি সব ঠিক আছে তো স্যার! সেই মহিলারও দেখলাম মাসীমণির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, বার বার বলছিলেন ম্যাডাম কানাডা চলে যাবেন জেনে কি খারাপ যে লাগছে।

আমি তো এই সব দেখে যাকে বলে থ~

আমি তো কলকাতার স্টেট ব্যাঙ্ক দেখে অভ্যস্ত। সেখানে এই আন্তরিকতা কোথায়?  চেক বই ফুরিয়ে গেলে সেখানে কাউন্টারে গিয়ে নতুন চেক বই চাইতেও ভয় করে। এমন ভাবে তাকাবে যেন ভীষন অপরাধ করে ফেলেছি। “এত তাড়াতাড়ি চেক বই কেন ফুরিয়ে যায় মশাই? কাল আসুন, আজ আমার সময় নেই। ” কিংবা “যিনি নতুন চেক বই ইস্যু করেন তিনি এক সপ্তাহ ছুটিতে আছেন। দশ দিন পরে আসুন।”

উদয়ের  পাশে বসে এই সব দেখে আমার মনে হচ্ছিল, এ কি রে, আমি কি ব্যাঙ্কে কোন কাজ নিয়ে এসেছি না কোন আত্মীয় কিংবা বন্ধুর বাড়ীতে দেখা করতে এসেছি?

কাজ হয়ে গেলে সবাই কে হাত নেড়ে  বিদায় জানিয়ে দরজার বাইরে গিয়ে দেখি ইউনিফর্ম পরা একজন সিপাই একটা বিশাল ভারী গাদা বন্দুক নিয়ে ব্যাজার মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি  উদয় কে বললাম দ্যাখ্‌ এই লোকটার বন্দুকটা, মনে হচ্ছে এটা শেষ বার সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। এটা দিয়ে আজ কি আর গুলি চলে?

আমার কথা শুনে  উদয়  সেই দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করে বসলো, “আচ্ছা ভাই তোমার এই বন্দুকটা  কি কোন কাজে লাগে, না স্রেফ লোক কে ভয় দেখাবার জন্যে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো?”

উদয়ের এই প্রশ্ন শুনে লোকটি খুব hurt হয়েছিল মনে আছে।

“কেয়া বাত করতেঁ হ্যায় সাহাব?”, খুবই ক্ষুণ্ণ হয়ে সে বলেছিল মনে আছে।   

তার কাছ থেকে জানা গেল যে অল্প কিছুদিন আগে এই বন্দুক দিয়ে গুলি ছুঁড়ে সে এক ব্যাঙ্ক ডাকাতি থামিয়ে সরকারের কাছ থেকে ইনাম পেয়েছে। তাছাড়া self-defence এর অজুহাতে তার নাকি মানুষ মারার লাইসেন্স ও আছে, কোন ব্যাঙ্ক ডাকাত কে মেরে ফেললেও তার কোন শাস্তি হবেনা।