ছোটবেলার খেলার মাঠের বন্ধুরা

সকালবেলার কেয়াতলা রোড

১) স্বরাজ

 ২০২০ সালের আগস্ট মাস।

কোভিডের প্রকোপ কিছুটা কমেছে।  আমরা দু’টো ভ্যাক্সিন নিয়েছি, মুখে মাস্ক পরে মাঝে মাঝে বাড়ীর বাইরে বেরোই।  বিদেশ ভ্রমণের বাধানিষেধ কমেছে, লন্ডন থেকে পুপু এসেছে আমাদের দেখতে।

আমি  আর পুপু রোজ সকালে বাড়ীর কাছে ঢাকুরিয়া লেকে একটু হেঁটে আসি।

একদিন পুপুর সাথে লেকে হাঁটার পর  কেয়াতলা রোড দিয়ে  বাড়ী ফিরছি।  দক্ষিণ কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালী পাড়া, একদিকে নানা রং এর একতলা দো’তলা বাড়ী, তাদের সামনে এক চিলতে বারান্দা, আর মাঝে মাঝে  বস্তীতে টালির চালের বাড়ী । ওই সকালে রাস্তার ধারে জলের কলের সামনে কিছু মেয়েরা বাসন মাজছে।  কিছু  লোক গামছা পরে ঘটির জল দিয়ে স্নান করছে।  কেউ কেউ নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজছে,  এই সবের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম  সামনে উল্টো দিক থেকে এক ভদ্রলোক আমাদের দিকে হেঁটে আসছেন,  এবং মনে হলো তিনি যেন আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন।  

ইনি কি আমার পরিচিত কেউ?   আমার মতোই হাইট, ভারী চেহারা।  দু’জনেরই মুখে মাস্ক বলে চিনতে পারছিনা।  

আমাদের কাছে এসে ভদ্রলোক একটু হেসে  বললেন “মাস্ক টা একটু খুলবেন প্লীজ?”

এই কোভিডের সময় অপরিচিত কারুর কাছ থেকে এই ধরণের অনুরোধ আসলে একটু অস্বস্তি হয়। আমি অবশ্য ভদ্রতা করে মুখ থেকে মাস্ক টা খুলতেই যাচ্ছিলাম, কেননা মনে  হচ্ছিল ভদ্রলোক আমায় চেনেন।

কিন্তু  পুপু ডাক্তার, সে সোজা বলে দিলো “না বাবা”। ওর মা’র মতোই ও ও বেশ যাকে ইংরেজীতে বলে aggressive…

ভদ্রলোক এবং আমি দুজনেই একটু অপ্রস্তুত।

উনি বললেন,  “মান্টু না?”   

আমি ভাবলাম এই রে, ঠিক যা ভেবেছি। ইনি আমায় চেনেন। একটু বিব্রত হয়ে আমতা আমতা করে বললাম, “হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে মানে আমি তো ঠিক…

ভদ্রলোক বললেন ছোটবেলায় আমরা একসাথে কত খেলাধুলা করেছি। আমার সব মনে আছে, শ্যামল দা’,বাবলু, বাপ্পা, মনা, শঙ্কর, বাবু,  অলক, বিকাশ …

আমি খুব লজ্জা পেয়ে বললাম আপনার নামটা কি?

উনি বললেন, “আবার আপনি কেন? আমি হলাম স্বরাজ।  তুমি আমায় চিনতে পারছোনা? কালীঘাট পার্কে আমরা  কত ফুটবল খেলেছি একসাথে. আমার চেহারাটা পালটে গেছে, তাই তুমি চিনতে পারছোনা, কিন্তু তোমায়  দ্যাখো আমি চিনতে পেরে গেলাম, আমার বেশ গর্ব্ববোধ হচ্ছে,…  ”

স্বরাজ কে আমি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম, ষাট বছর পরে দেখা,সময়টা তো কম নয়।  আর তার ওপরে স্বরাজের চেহারা একেবারেই পালটে গেছে। আগে ছিল ছিপছিপে লম্বা, এখন চেহারাটা বেশ মুশকো হয়েছে।  কিন্তু যেই বললো কালীঘাট পার্কে ফুটবল খেলেছি এক সাথে, অমনি  এক মূহুর্ত্তের মধ্যে ছবির মত ওকে মনে পড়ে গেল। ওরা থাকতো হাজরা রোডে অন্য পাড়ায়। ওদের ক্লাব ছিল উদয়ন সঙ্ঘ, আর আমাদের ক্লাব ছিল মনোহরপুকুর বৈশাখী সঙ্ঘ। আমাদের দুই ক্লাবের ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হতো কালীঘাট পার্কে।

অসাধারণ বল কন্ট্রোল ছিল স্বরাজের।  তাছাড়া ছিল স্পীড আর দুর্দ্ধর্ষ ড্রিবলিং স্কিল।  এখনো মনে আছে একবার আমার মাথার ওপর দিয়ে বল ট্যাপ করে পাশ কাটিয়ে তীরবেগে আমাদের গোলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল সে।

আমিও ফুটবলটা ভালোই খেলতাম। তাই হয়তো স্বরাজের ও আমার কথা এতদিন পরেও মনে আছে।  ছোটবেলার খেলার মাঠের সেই বন্ধুত্ব কি কোন দিনই ভোলা যায়?  

সেই বন্ধুত্ব চিরকালীন।

তারপরে কিছু মামুলী কথাবার্ত্তার পর আমরা বিদায় নিলাম।  কেউই কাউকে ঠিকানা বা ফোন নাম্বার দিলামনা। 

২) কিরণ

কিরণকে কি কারুর মনে আছে? কিরণ সিনহা।

ফুটবলটা বেশ ভাল খেলত। উঁচু ক্লাসে উঠে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল বোধহয়। থাকতো বালীগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে। কোয়ালিটির পাশে একটা ছোট পার্কে ওকে পাড়ার ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলতে দেখেছি মাঝে মাঝে।

আমাদের সেন্ট লরেন্স স্কুলে ছিল বিশাল খেলার মাঠ,  সেই মাঠ ছোট ছোট ভাগ করে লাঞ্চ ব্রেকে আমরা চুটিয়ে ফুটবল খেলতাম। এখনো মনে পড়ে  স্কুলের পিছন দিকে বাঁধাকপির ক্ষেত আর পুকুরের দিকে এক চিলতে মাঠে ক্লাস ফোর ফাইভে খেলতাম আমরা। আর সেই সময় কিরণ ছিল আমাদের স্টার প্লেয়ার। এমনিতে পড়াশোনায় কিরণ তেমন ভাল ছিলনা,  ক্লাসে  মাথা নীচু করে চুপ করেই থাকতো বেশীর ভাগ সময়, খুব লাজুক ছিল কিরণ।

কিন্তু খেলার মাঠে বল পায়ে তার অন্য রূপ।  ফুটবল মাঠে সে একচ্ছত্র সম্রাট।  

বেশ কয়েক বছর আগে একবার বালীগঞ্জ ফাঁড়ির উল্টো দিকে পেট্রোল পাম্পের পাশে The Wardrobe নামে একটা লন্ড্রীতে কাপড় কাচাতে নিয়ে গেছি। ঢুকেই দেখি কাউন্টারে আমাদের কিরণ বসে।

অনেকদিন পর দেখা, কিন্তু আমি চিনলাম সহজেই, চেহারাটা অনেকটা আগের মতোই আছে, বেশ শক্তপোক্ত খেলোয়াড় সুলভ। মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করা, কপালের সামনে একটু পাতলা হয়েছে, বেশ ভারিক্কী হয়েছে কিরণ, দোকান টা ওরই  franchise  নেওয়া বুঝলাম, কেননা চারপাশের কর্ন্মচারীদের সাথে সে বেশ হুকুমের ভঙ্গী তে কথা বলছিল।

কিরণ ও আমায় চিনেছে ঠিক। ছোটবেলার ফুটবল মাঠের বন্ধুদের  সহজে ভোলা যায়না।

“এখনও খেলো নাকি?” কিছুটা লাজুক গলায় কিরণ জিজ্ঞেস করলো আমায়।

“কোথায় আর?” বললাম আমি।

তারপর বেশ কিছু খুচরো কথা হলো।

আমার বিলটা সই করার আগে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে পুরনো বন্ধুকে ২০% ডিসকাউন্ট লিখে দিল কিরণ।

কি মুস্কিল, এসব আবার কেন, বললাম আমি।

তার পরে আর কোনদিন কিরণের দোকানে কাপড় কাচাতে নিয়ে যাইনি।

বন্ধুদের এইরকম ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে ডিসকাউন্ট দিতে গিয়ে ওর দোকানটা শেষে উঠে যাক আর কি?

কি দরকার?

৩) পৃথ্বীশ

পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে যখন স্কুলে পড়ি, তখন কলকাতার দুই ফুটবল ক্লাব  মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল ছিল দুই  প্রবল পরান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বী, আর তাদের সমর্ত্থক দের মধ্যেও ছিল দারুণ রেষারেষি।

স্কুলে আমাদের নিজেদের মধ্যে খেলার জন্যে দুই ফুটবল টীম করার সময় প্রায়ই মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার দের নিয়ে টীম তৈরি  হতো।  আমি ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান কোন দলের সমর্থক ছিলামনা,  কিন্তু আমায় সবসময় ইস্টবেঙ্গলের টীমে খেলতে হতো।  আসলে আমাদের সহপাঠী খেলোয়াড়দের মধ্যে মোহনবাগানের সমর্থক অনেক বেশী থাকতো, তুলনায় ইস্টবেঙ্গলে অনেক কম।  তাই ইস্টবেঙ্গলের টীমে যথেষ্ট প্লেয়ার পাওয়া যেতোনা।  তাই আমায় ইস্টবেঙ্গলের টীমে খেলতে হতো।  সেই সব খেলা অবশ্য এলেবেলে খেলা, তাই কোন একটা দল হলেই হলো।

কিন্তু  ইস্টবেঙ্গলের দলে বাঁধা খেলোয়াড় ছিল পৃথ্বীশ। পৃথ্বীশ  চ্যাটার্জ্জী।

সে ছিল ইস্টবেঙ্গলের পাঁড় সমর্থক। তাকে ইস্টবেঙ্গল কেমন খেলেছে এই প্রশ্ন করা হলে তার তিনটে সম্ভাব্য উত্তর ছিলঃ

১) দারুণ খেলেছে

২) দুর্দ্দান্ত খেলেছে

৩) দুর্দ্ধর্ষ খেলেছে

ইস্টবেঙ্গল কখনো খারাপ খেলেছে, এ কথা সে ভাবতেই পারতোনা।

তো একবার কলকাতা লীগের খেলায় (বোধ হয় ১৯৫৭ কি ১৯৫৮ সালে) এরিয়ান ক্লাবের কাছে ইস্টবেঙ্গল ০-৪ হেরে যায়। পরের দিন স্কুলে আমি পৃথ্বীশ কে বললাম “কী রে, কাল তোদের কী হল?”

পৃথ্বীশ গোমড়া মুখ করে বললো, “অস্বীকার করছি, কাল ইস্টবেঙ্গল ভালো খেলেছে!”

ঢাকুরিয়া লেক