ফেলে এসেছি ঘরবাড়ী মোরা

আগস্ট মাস এলেই ১৯৯০ সালের সেই ইরাকের কুয়েত আক্রমণের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।

সেই সময়ে আমরা বেশ কয়েকজন বাঙালী কুয়েতে আটকে পড়ি।  মাস খানেক পরে ১৯৯০র সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি আমরা প্রায় সবাই কুয়েত ছেড়ে দেশে আমাদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে গিয়েছিলাম। 

এখন এত দিন পরে জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবলে মনের মধ্যে সেই সময়ের নানা স্মৃতি ভেসে আসে।  সে ছিল আমাদের জন্যে এক অস্থির সময়,  অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কার কালো মেঘ আমদের সকলের জীবনে ঘনিয়ে এসেছিল।

আমাদের প্রায় সবার বৌ আর ছেলেমেয়েরা স্কুল ছুটি হবার কারণে দেশে চলে গেছে, এটা একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমাদের ও অনেকের দেশে যাবার টিকিট কাটা ছিল, কিন্তু এখন এয়ারপোর্ট বন্ধ এখন আমরা এ দেশে বন্দী।  কবে দেশে ফেরা যাবে জানিনা। আমাদের সবার মনের ভিতরে এই অনিশ্চয়তা আর বিষাদের ভাবটা আমরা লুকিয়ে রাখি। এই স্থায়ী চাকরী, এই সুখের জীবন ছেড়ে সব কিছু ফেলে দিয়ে এই মধ্যবয়সে আবার নতুন করে কোথাও শুরু করতে হবে? 

এদিকে কুয়েতের রাস্তায় বন্দুক হাতে ইরাকী সৈন্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, জায়গায় জায়গায় কুয়েতীরা  প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, মাঝে মাঝেই গুলি বোমার আওয়াজ কানে আসে।  কুয়েতের রাস্তায় ইরাকী ট্যাঙ্ক চলছে, আকাশে জেট প্লেনের আওয়াজ শোনা যায়।  যুদ্ধ শুরু হলে সাদ্দাম হুসেন কি কুয়েতে কেমিকাল গ্যাস এর মিসাইল ছুঁড়বে?

আমরা ভয়ে ভয়ে থাকি।

এই দুর্দিনেও কিন্তু আমাদের বন্ধুদের আড্ডার শেষ নেই।  মাঝে মাঝেই কারুর না কারুর বাড়ীতে আমরা একসাথে বসি, নানা ব্যাপারে আলোচনা হয়।      

এত বিপদের মধ্যেও আমাদের সত্য (নারায়ণ, চক্রবর্ত্তী)  বিন্দাস। তার মুখে সবসময় এক হাজার ওয়াটের হাসি। তার হাতে এখন অঢেল সময়, তাই বাড়ীতে একা একা সময় কাটাতে সে এখন মজার মজার parody গান তৈরী করে। আর আমাদের আড্ডায় সত্য থাকলে সেই সব গান খুব দরদ দিয়ে সে গেয়ে শোনায় আমাদের।  

সত্যর দুটি গানের কথা এখনো মনে আছে।  দুটো গানই কুয়েতের  আমীর শেখ জাবের এর গলায়।

প্রথম গানে তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধু ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন কে বলছেন,

“কেন এলে মোর ঘরে আগে নাহি বলিয়া/

এসেছো কি তুমি ওগো তব পথ ভুলিয়া?/”

দ্বিতীয় গানে দুশ্চিন্তায় তাঁর রাত্রে ঘুম আসছেনা, তিনি নিজের মনেই গাইছেন~ 

“জাগরণে যায় বিভাবরী, আঁখি হতে ঘুম নিলো হরি/

সাদ্দাম নিলো হরি। কি যে করি, কি যে করি ই ই ই ই ?/

অত্যন্ত আবেগের সাথে চোখ বুঁজে দুই হাত নেড়ে সত্য যখন তার এই সব গান একের পর এক গেয়ে যায়, আমরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ি।  

শেষ পর্য্যন্ত অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমরা জর্ডানের ভিসা জোগাড় করে কুয়েত থেকে বাগদাদ হয়ে আম্মানে এসে পৌঁছেছি।  এয়ার ইন্ডিয়া কুয়েতের সব ভারতীয়দের সেখান থেকে ভারতে নিয়ে যাবে।  এই মহানিষ্ক্রমণের কথা গিনেস বুকে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

আম্মান এয়ারপোর্টের ভেতরেই আমরা বন্ধুরা সবাই মাটিতে বসে আড্ডা আর হাসি গল্পে মশগুল হয়ে সময় কাটালাম সারা রাত।  এই গত দেড় মাসের অনিশ্চয়তা আর উৎকন্ঠার হাত থেকে এখন আমরা মুক্তি পেয়েছি।

দেশে ফেরার পরে আমরা কি করবো?  সত্য বললো আমরা বন্ধুরা একটা বড় চাদর নিয়ে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো, আমাদের সামনে একটা বড় পোস্টারে লেখা থাকবে “কুয়েত প্রত্যাগত দুর্গত মানুষদের সাহায্য করুন ” বা ওই ধরনের কিছু।  সামনে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে থাকবেন অরবিন্দ, তাঁর রোগা পাতলা চেহারায় তাঁকে বন্যাবিদ্ধ্বস্ত বা দুর্ভিক্ষনিপীড়িতদের মত দুঃখী মানুষ  বলে সহজেই মানিয়ে যাবে। তিনি প্যাঁপোঁ করে হারমোনিয়াম বাজাবেন আর তাঁর পিছনে খঞ্জনী বাজিয়ে আমরা গান গাইবো। আর রাস্তার পাশে বাড়ীর বারান্দা থেকে লোকেরা কৌতূহলী চোখে আমাদের দেখবে আর কেউ কেউ আমাদের চাদরের ওপরে ছুঁড়ে দেবে কলাটা মূলোটা, আর সাথে কিছু সিকি আর আধুলিও।   

“ফেঁলে এঁসেছি ঘঁরবাঁড়ী মোঁরা –  ফেঁলে এঁসেছি সঁবকিছু – প্যাঁ পোঁ প্যাঁ পোঁ”, আম্মান এয়ারপোর্টের ব্যস্ত পরিবেশে মাঝরাতে এক কোণে আমাদের আড্ডায় বেশ দরদ দিয়ে খোলা গলায় গান গাইছে সত্য, হারমোনিয়াম এর আওয়াজ শুদ্ধ।

এই ছবিটা ওই দিনগুলোর কথা ভাবলেই মনে পড়ে।

এদিকে প্রায় ঘন্টায় ঘন্টায় আসছে একটা করে Air India র প্লেন, আর ঝাঁকে ঝাঁকে ভারতীয় দের নিয়ে মুম্বাই চলে যাচ্ছে তারা। সারা রাত ধরে Air India র  কর্ম্মকর্ত্তারা evacuee দের চেক ইন করতে আর বোর্ডিং পাস দিতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন।  

আমরা সবাই ভোরের দিকে আমাদের বোর্ডিং পাস পেলাম।  সেই মুম্বাই যাত্রার জন্যে আমাদের কোন টাকা পয়সা দিতে হয়নি, কেবল পাসপোর্টে একটা স্ট্যাম্প মারা হয়েছিল।  পরে অবশ্য আমরা সেই দেনা মিটিয়ে দিয়েছিলাম। 

মঙ্গলবার ১৮/৯/৯০ তারিখে  আম্মান থেকে আমাদের প্লেন ছাড়লো দুপুর দুটোয়। মনে আছে নিজের সীটে বসে একটা খুব তৃপ্তি আর আনন্দের দীর্ঘনিঃশ্বাস নিয়েছিলাম।  প্লেন আকাশে ওড়ার পরে  air hostess মেয়েটি দুই হাত জোড় করে মিষ্টি হেসে বলেছিল Welcome home!  সে কথাটা কোনদিন ভুলবোনা।  জীবনের অনেক অবিস্মরনীয় মুহূর্ত্তের মধ্যে সেটি ছিল একটি অন্যতম মুহূর্ত্ত।

2 thoughts on “ফেলে এসেছি ঘরবাড়ী মোরা

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে।