হারানো সুর    

মনোহরপুকুরের বাড়ীতে ছোটবেলার একটা সন্ধ্যার কথা খুব মনে পড়ে।

বড় বারান্দায় সিঁড়ির কাছে আমাদের ধোপা এক বিরাট বান্ডিল কাপড় জামা নিয়ে এসে বসেছে, মা জ্যেঠিমা কাকীমারা তার সাথে কাপড়ের হিসেব করছেন, এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে ছোটকাকা উঠে এলেন।   বারান্দায় উঠে আসতেই চার বৌদি ঘিরে ধরলেন তাঁকে।   

“অশোক, আজ নাইট শো তে আমাদের হারানো সুর দেখাতে নিয়ে চলো।”

ছোটকাকার তখনো বিয়ে হয়নি, তিনি বৌদিদের একমাত্র অবিবাহিত দ্যাওর। আর খুব pampered..

ছোটকাকার বরাবরই একটু মজা করার অভ্যেস, আর প্রতি কথার শেষে অ্যাঁ? বলা তার একটা মুদ্রাদোষ ছিল। হীরকের রাজা যেমন “ঠিক কি না?” বলতেন, অনেকটা সেরকম।

ছোটকাকা সেদিন গম্ভীর আর উদাস মুখ করে বলেছিলেন, “যে সুর হারিয়ে গেছে তাকে আর দেখতে গিয়ে কি হবে, অ্যাঁ?”

এখন জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে সেই জীবনের নানা হারানো সুর হঠাৎ আচমকা ফিরে আসে।

যেমন গতকাল ছিল বিশ্বকর্ম্মা পূজো।

ছোটবেলায় বিশ্বকর্ম্মা পূজো আমাদের জন্যে ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর season এর শেষ দিন। তার আগের দিন গুলো ঘুড়ি ওড়ালেও ওই দিনটা বলতে গেলে ছিল ঘুড়ি উৎসব এর দিন। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত “ভোকাট্টা”…

বাবলু আর আমি আমাদের বাড়ীর ছাত থেকে খুব ঘুড়ি উড়িয়েছি একসময়।

মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীর ছাদে আমরা বেশ কিছুদিন আগে থেকে ওই দিনটার জন্যে prepare করতাম। সুতো লাটাই ঘুড়ি কেনা হতো সতীশ মুখার্জ্জী রোডে “মাণিক লাল দত্তের” দোকান থেকে। সিকি তেল, আধ তেল, এক তেল। কত রকম ঘুড়ির design ছিল তখন, আর তাদের কতরকম নাম ছিল – ঘয়েলা, ময়ূরপঙ্খী, মোমবাতি, চৌরঙ্গী…তারপরে সেই ঘুড়িতে ব্যালান্স করে সুতোর কার্ণিক লাগানো ছিল একটা কঠিন কাজ।

আর মাঞ্জা দেবার জন্যে কিনতাম এরারুট, কাঁচগুড়ো আর রং। এক ছুটির দিন দুপুরে আমি আর বাবলু ছাদে সুতোয় মাঞ্জা দিতাম। সাদা সুতো কিনে মাঞ্জা দেওয়া হতো ছাতে। অ্যারারুট, কাঁচগুড়ো আর রং জল মিশিয়ে মন্ড তৈরী করে সুতোর ওপরে কয়েকবার লাগাতে হতো, রোদ্দুরে শুকোবার পরে সুতোয় এমন ধার হত যে আঙুল কেটে যেতো অসাবধান হলেই। 

বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন সকাল থেকেই আকাশ ভরে উঠতো লাল নীল ঘুড়িতে। প্যাঁচ খেলে কোন ঘুড়ি কে কাটলে চারিদিক থেকে উল্লসিত আওয়াজ উঠতো – ভোকা…আ…আ…ট্টা…। সেই আওয়াজ এখনো আমার কানে ভাসে। আর কারুর ঘুড়ি কাটতে পারলে যে মনের মধ্যে একটা গর্ব্ব আর আনন্দের অনুভূতি হতো সেটাও এখনো ভুলিনি।

বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন বাবলুর স্কুল ছুটি কিন্তু আমার মিশনারী স্কুলে ছুটি নেই। ইচ্ছে না থাকলেও আমায় স্কুলে যেতেই হতো। মা’কে বলে লাভ হতোনা। She was too strict…

বাবলু এদিকে সকাল থেকে ছাদে।

সেদিন স্কুলে লাস্ট পিরিয়ডটা যেন কাটতেই চাইতোনা। বিকেলে ছুটির ঘন্টা বাজলেই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটতাম মনে পড়ে। বাড়ী পৌঁছেই দুড্ডাড় করে ছাতে চলে যেতাম, তারপর সন্ধ্যা নামা পর্য্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো।  

ঘুন্টু সেলিমপুরের বাড়ীতে উঠে যাবার পর প্রায় প্রতি বছর বিকেলে মনোহরপুকুরে ঘুড়ি ওড়াতে চলে আসতো। হাজরা মোড়ে সাধনদাদুর কারখানায় বেশ বড় করে বিশ্বকর্ম্মা পূজো হতো। আমি ঘুন্টু আর বাবলু সন্ধ্যাবেলা সেখানে গিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসতাম।

ঘুড়ি ওড়ানো এখন অনেকদিন বন্ধ, তবে এখন লকডাউনের এই ঘরবন্দী জীবনে রোজ সন্ধ্যায় আমাদের পূর্ণ দাস রোডের বাড়ীর ছাতে হাঁটার সময় ইদানীং মাথার ওপরে খোলা আকাশে শনশন আওয়াজ পাই, দেখি ঘুড়ি উড়ছে চারিদিকে। গতকাল বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন দেখলাম আকাশে অনেক ঘুড়ি, খুব প্যাঁচ লড়া চলছে, কয়েকটা ঘুড়ি কাটা পড়ে ভাসতে ভাসতে নীচে নেমে আসছে, একটা কাটা ঘুড়ি আমাদের ছাতে এসে পড়লো।   

অলস ভঙ্গী তে বাতাসে দোল খেতে খেতে দুলকি চালে নেমে আসা কাটা ঘুড়ির নেমে আসা বড় সুন্দর দৃশ্য।      

দেখলেই জীবনের সেই সব হারানো সুর মনের মধ্যে বেজে ওঠে।