
১৯৯৭ সালে আমি কুয়েতে বি সি এসের সভাপতি হয়েছিলাম। তার আগে আমি কোনদিন বি সি এসের কোন কমিটি তে আসিনি, গায়ে ফুঁ লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। একেবারে প্রথমেই এক লাফে সভাপতি! মানে আনকোরা নতুন, এবং আনাড়ী – ইংরেজীতে যাকে বলে rookie । অবশ্য আমার কমিটিতে সহ সভাপতি রঞ্জন গুহ রায়, সেক্রেটারী তপন ঘোষ এবং অন্যান্য সবাই বেশ অভিজ্ঞ, এবং কাজে পোক্ত। আমার পক্ষে সেটা একটা বাঁচোয়া ছিল।
আর হবি তো হ’, সেই বছরটা (১৯৯৭) ছিল দারুণ ঘটনাবহুল – আমাদের দেশের স্বাধীনতার স্বর্ণজয়ন্তী র উদযাপন উৎসবের বছর, তাছাড়া সে বছর নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জন্মশতবার্ষিকী। কুয়েতে বিসি এসের নাম উজ্জ্বল করতে গেলে এ বছর দারুণ কিছু তো একটা কিছু করতে হবে?
কিন্তু কি করা যায়?
কুয়েতে বি সি এসের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের উৎকর্ষতা নিয়ে খুব সুনাম। আমাদের member দের মধ্যে অনেক talent, কিন্তু আমাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তাই বছরে আমরা একটা স্যুভেনির ছাপাই, এবং তাতে যে বিজ্ঞাপন পাই তার টাকা এবং সদস্যদের চাঁদা এই নিয়ে বছরে আমাদের ৪০০০ দিনার মত আয় হয়। টাকাটা খুব একটা কম নয়, তা দিয়ে বছরে আমরা কিছু বাঁধাধরা অনুষ্ঠান করি। তার মধ্যে একটা পূর্ণাঙ্গ নাটক, একটা রবীন্দ্রনাথের গান বা নৃত্যনাট্য, একটা ছোটদের অনুষ্ঠান। তাছাড়া পিকনিক, আর বিজয়া সন্মিলনী। এতেই আমাদের সব টাকা খরচ হয়ে যায়, যার মধ্যে খাওয়া দাওয়া হলো একটা বড় খরচ, অন্ততঃ ৬০%। পরের কমিটি কে দিয়ে যাবার মত খুব অল্প টাকাই অবশিষ্ট থাকে।
সভাপতি হবার পর এই সব দেখে শুনে আমি প্রথমেই অনুভব করেছিলাম যে কলকাতার সাংষ্কৃতিক জগতের সাথে আমাদের যোগাযোগ তৈরী করতে গেলে অর্থাৎ দেশ থেকে নামী শিল্পীদের কুয়েতে এনে তাদের দিয়ে জমকালো কিছু অনুষ্ঠান করার জন্যে যে পরিমাণ অর্থ আমাদের দরকার, তা যোগাড় করতে গেলে Sponsored program করা ছাড়া গতি নেই।
প্রধানতঃ সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz ১৯৯৭ থেকেই আমরা শুরু করি।
বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz ১৯৯৭ অনুষ্ঠান করে আমাদের তহবিলে যে উ্দবৃত্ত অর্থ জমেছিল, তাই দিয়ে আমরা সে বছর প্রমিতা মল্লিক আর সুগত বসুকে কুয়েতে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম।
প্রমিতা “দেশমাতৃকা” নামে একটি চমৎকার দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠান আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। সুগত (নেতাজী সুভাষের ভ্রাতুস্পুত্র শিশির কুমার বসুর ছেলে) প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ও স্কলার, তিনি আমাদের নেতাজীর জীবন এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান নিয়ে একটি অনবদ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ লেকচার দিয়েছিলেন, পরে তাঁর সাথে আমাদের একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব ও আলোচনাও হয়। সেই অনুষ্ঠানের নাম আমরা দিয়েছিলাম “লহ প্রণাম!”
সুখের এবং গর্ব্বের কথা যে সেই sponsored অনুষ্ঠানের ট্র্যাডিশন বি সি এসে এখনও চলেছে। তার পর থেকে কুয়েতে প্রায় প্রতি বছর দেশ থেকে আমরা নিয়ে এসেছি নানা নামী দামী শিল্পী, সঙ্গীত এবং নাটকের দলকে। সেই সাথে কুয়েতে উচ্চমানের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে বি সি এসের সুনাম ক্রমশঃ বেড়েছে।
Sponsored program না করলে এসব সম্ভব হতোনা।
কিন্তু নতুন কিছু করতে গেলে কিছু প্রশ্ন, কিছু অভিযোগ তো আসবেই।
আমাদের অনেক সদস্যদের কাছ থেকে তখন শুনতে হয়েছিল আমরা নাকি বি সি এস কে “commercialise” করছি। ভাবটা যেন কি দরকার আমাদের অতো টাকার? আমরা হলাম একটি Non-Profit association আমাদের তো যা পাচ্ছি তাই নিয়েই দিব্বি চলে যাচ্ছে! বেশী লাভের লোভ কি ভালো? ইত্যাদি। আবার এমন কি এ কথাও আমার কানে এলো যে লাভের বদলে সেই অনুষ্ঠান করলে যদি আর্থিক ক্ষতি হয়, কেউ কেউ বলছে তাহলে তার ভার কে নেবে?
বলা বাহুল্য এই সব অভিযোগ যারা করছিল তারা সংখ্যায় খুবই কম।
আমি তখন একটা GBM ডেকে সবাইকে বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz নিয়ে খুব উৎসাহব্যঞ্জক একটা presentation দিয়েছিলাম মনে আছে। তাতে উল্লেখ করেছিলাম ওই অনুষ্ঠান করলে কুয়েতের বৃহত্তর সমাজে আমাদের recognition – সুনাম এবং সন্মান – কতোটা বাড়বে। এও বলেছিলাম যে ওই অনুষ্ঠান করতে আর্থিক ক্ষতি হবার যদিও কোন সম্ভাবনাই নেই, তবু যদি তা হয়, তাহলে আমি এবং আমার কমিটির সব সদস্য সেই ক্ষতি মিটিয়ে দেবো।
সবার সন্মতি পাবার পর আমরা হৈ হৈ করে স্পনসরের খোঁজে নেমে পড়েছিলাম।
সেবার Pepsi আমাদের main sponsor হয়েছিল, আর তার সাথে co-sponsor হতে এগিয়ে এসেছিলেন অনেক ভারতীয় উদ্যোগপতিরা। তাদের মধ্যে ছিলেন Caesars এর মিস্টার লরে্নস, Mailem এর মিস্টার লাম্বা, Toyotar মিস্টার সানি ম্যাথিউস, KITCO র ধীরাজ ওবেরয়। এ ছাড়াও আমাদের সাহায্য করতে হাত বাড়িয়েছিল অনেকে ভারতীয় কোম্পানী- Book sellers, Travel agents, Jewellers, Restaurants এবং আরও অনেকে। আমাদের মেম্বাররা সবাই এগিয়ে এসে সাহায্য করেছিল এই সব স্পনসর যোগাড় করতে।
শ’খানেক কিংবা আরো বেশী স্পনসর পেয়েছিলাম আমরা সেবার।
কি যে আশাতীত সাড়া পেয়েছিলাম আমরা সবার কাছ থেকে সেই প্রথম বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz অনুষ্ঠানে এখনো ভাবলে বেশ একটা গর্ব আর আনন্দের অনুভূতি হয়। ইংরেজীতে যাকে বলে pride and joy..
যাই হোক, সেই বোর্ণ ভিটা Quiz এর অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যেই আমি বি সি এসের একটা লোগো design করার পরিকল্পনা করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে অনেক ভারতীয় এবং বিদেশীরা আমাদের অতিথি হয়ে আসবেন, তাঁদের মনে আমাদের সম্বন্ধে একটা ভাল impression তৈরী করার জন্যে বি সি এসের নিজস্ব একটা Brand Identity দরকার বলে আমার মনে হয়েছিল।
তাই সেবার গরমের ছুটিতে কলকাতায় গিয়ে একটা Design Consultant কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমায় তিনটে লোগো ডিজাইন করে দেয়। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। পঞ্চাশ দিনার মতো।
কুয়েতে ফিরে এসে একটা GBM এ আমরা মেম্বার দের কাছে সেই তিনটে লোগোর মধ্যে কোনটা সবাই চায় তাই নিয়ে একটা ভোট করালাম। আশি শতাংশর বেশী ভোট পড়েছিল আমাদের এখনকার লোগো ডিজাইনে।
যাকে বলে Hands down winner!
বোর্ণ ভিটা Quiz এর অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে আমরা প্রত্যেক পোস্টার, প্রত্যেক বিজ্ঞাপন প্রত্যেক চিঠি এবং আমাদের অন্যান্য সব official কাগজপত্রে ওই লোগো ব্যবহার করা শুরু করি।
সেই প্রথম Inter-school Quiz এর ফাইনালে প্রতিযোগী ছাত্র ছাত্রীদের জন্যে ছয়টা সাদা রং এর কাঠের টেবিল তৈরী করা হয়েছিল। সাথে ছিল buzzer আর সেটা টিপলে জ্বলে ওঠা আলো। স্টেজে সেই সাদা টেবিলগুলোর প্রত্যেকটার সামনে বি সি এসের লোগো জ্বলজ্বল করতে দেখে কি যে ভাল লেগেছিল! সেদিন অন্যান্য Community থেকে নানা স্কুলের ছাত্র ছাত্রী দের সাথে তাদের মা বাবারা এসেছিলেন, হল ভর্ত্তি লোক, তাদের মনের মধ্যে Quiz program এর quality র সাথে এই লোগোর মধ্যে দিয়ে বি সি এস সম্বন্ধে সবারএকটা ভাল impression হয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সেই থেকে এই লোগো যেখানেই দেখি মনে বেশ একটা আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। ভাবতে ভাল লাগে যে আমি যখন কুয়েতে থাকবোনা, তখন এই লোগো থাকবে আমার legacy হয়ে।
লালুদার কবিতা থেকে ধার নিয়ে বলা যায় ~
যতদিন বি সি এসে রহিবে এ লোগো/
ততদিন মোরে কেউ ভুলিওনা ওগো/

যে তিনটি লোগো থেকে আমরা একটা বেছে নিয়েছিলাম
Excellent lekhhata,mone holo purono diner kotha
LikeLike
Thanks Tanima. Mucche jaoa dinguli..
LikeLike