
লন্ডনে আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে গ্রীনিচ (Greenwich) জায়গাটা খুব বেশী দূরে নয়। লন্ডনে এলে এখনো দুই একবার গ্রীনিচে যাই, কেননা জায়গাটা বড় সুন্দর, খোলা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, প্রচুর বড় বড় গাছ সেখানে ছড়িয়ে আছে। আর আছে ফুলের বাগান সেখানে ছোট লেকে সাদা হাঁসেরা ভেসে বেড়ায়। তাছাড়া আছে কফি শপ, রেস্টুরেন্ট।
গ্রীনিচ অবশ্যই গ্রীনিচ মীন টাইম এর জন্যে বিখ্যাত, এখান দিয়েই চলে গেছে মেরিডিয়ান লাইন (zero ডিগ্রী longitude )। কিন্তু সেখানে Time keeping আর Astronomy সম্পর্কিত আরও অনেক প্রাচীন এবং বৈজ্ঞানিক আকর্ষণ আছে বিশেষ করে Royal Astronomical Observatory , Naval Museum, Planetarium, Cutty Sark, ইত্যাদি। সেগুলো আছে একটা টিলার ওপরে অনেকটা জায়গা নিয়ে। তার মধ্যে একটা বিশাল চত্বর, সেখানে মেরিডিয়ান লাইন আঁকা আর সেই লাইনের দুই পাশে নানা শহরের নাম (আর তাদের longitude ডিগ্রী – কতটা পূবে আর কতটা পশ্চিমে)।
গ্রীনিচে একটা hilltop viewing point আছে, যেখানে দাঁড়ালে দূরে নীচে দেখা যায় লন্ডন শহরের স্কাইলাইন, এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া টেম্স্ নদী আর তার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া Emirates রোপওয়ে আর তার পাশে O2 Mall এর বিশাল তাঁবুর মত সাদা hemispheric ছাউনী।
টিলার ওপর থেকে নীচে গ্রীনিচ শহরে যাবার রাস্তা আর সিঁড়ি নেমে গেছে। নীচে একটা বড় flea market বসে, তাছাড়া শহর টা বেশ ছবির মত নিরিবিলি আর সুন্দর। সেখানেও মাঝে মাঝে যাওয়া হয়।
গ্রীনিচ একদিনের ফ্যামিলি পিকনিকের পক্ষে আদর্শ জায়গা।










গ্রীনিচ এর ছবি
এই গল্পটা অবশ্য গ্রীনিচ বরোতে O2 মল নিয়ে। সেটা Observatory আর Museum থেকে কিছুটা দূরে।
O2 নামে এই দেশে একটা মোবাইল টেলিফোন নেটওয়ার্ক কোম্পানী আছে, এই মলটা তাদের নামে তৈরী। সেই মলের তাঁবুর মত hemispheric ছাউনীতে সিঁড়ি বেয়ে অনেক লোক ওপরে চলে যায়, নীচ থেকে তাদের দেখতে বেশ পিঁপড়ের মত লাগে। কম বয়েস হলে আমিও অনায়াসে ওপরে দৌড়ে উঠে যেতাম, কিন্তু এখন বয়েসটা বাদ সাধে।
O2 Mall এ অনেক কোম্পানীর ফ্যাকটরী আউটলেট আছে, যেখানে জামাকাপড় জুতো ইত্যাদি অনেক জিনিষপত্রের দাম অবিশ্বাস্য কম, এবার একদিন আমরা সস্তায় কেনাকাটা করার জন্যে সেখানে গিয়েছিলাম।
O2 mall এ গাড়ীতে গেলে নদী পার হবার জন্যে Blackwell Tunnel আছে, আর টিউবে গেলে জুবিলী লাইনে North Greenwich স্টেশনে নেমে নদীর ওপরে Emirates রোপওয়ে ধরে চলে যাওয়া যায়। রোপওয়ে তে আগে চড়া হয়েছে, এবার তাই নদীর নীচে টানেল পেরিয়ে গাড়ীতেই যাওয়া হলো।
কেনাকাটা সারা হলে মলের ভিতরে একটা ইটালিয়ায়ন রেস্টুরেন্ট – Frankie and Benny’s- এ খেতে ঢুকলাম আমরা। সেটা ছিল ২০২১ সাল, কোভিড এর জন্যে দোকান সব খোলা হলেও মল বেশ ফাঁকা, রেস্টুরেন্টও খালি।

আমাদের ওয়েটার ছেলেটি খুব প্রিয়দর্শন। ফর্সা, একমাথা কালো চুল, একটু গাবদু চেহারা হলেও তার চলাফেরায় বেশ একটা ক্ষিপ্র, চটপটে ভাব আছে। পরনে সাদা সার্টের ওপরে লাল রং এর একটা apron, কোম্পানীর ইউনিফর্ম হবে, ফর্সা রং এর সাথে তা দিব্বি মানিয়েছে। ছেলেটি বেশ হাসিখুসী, কথাবার্ত্তা বেশ ভদ্র, আর ইংরেজী ভাল বললেও তার কথাবার্তায় সেরকম কোন ব্রিটিশ accent নেই, চেহারা দেখে ইউরোপের কোন দেশের বলে মনে হয়। স্পেন বা ইটালী?
যাই হোক, খাবার অর্ডার দিয়ে আমরা নানা গল্প করে যাচ্ছি, ছেলেটি সব খাবার এক এক করে নিয়ে এসে নিখুঁত ভাবে আমাদের টেবিলে পরিবেশন করে গেলো।
তারপর হঠাৎ আমাদের অবাক করে সে বললো, “Please don’t mind my asking, but are you speaking in Bengali?”
অ্যাঁ , বলে কি?
একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে সে ইংরেজীতে বললো, “তোমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলে তো তাই শুনে মনে হলো~”
তুমি বাংলা জানো? ইংরেজীতেই জিজ্ঞেস করলাম আমি।
এবার সে একগাল হেসে বললো “একটু একটু!”
তারপরে তো অনেক গল্প হলো তার সাথে। ইংরেজীতেই।
সে নাকি কলকাতায় ও গিয়েছে বেশ কয়েকবার তার মামার কাছে। মামা ছিলেন তার মা’র আপন দাদা, বোন আর ভাগ্নে কে তিনি খুব ভালবাসতেন। তিনি ভাল বেহালা বাজাতেন, মুম্বাই থেকে কলকাতায় বেহালা বাজাতে কয়েকবার গিয়ে কলকাতা তাঁর এত ভাল লেগে যায় যে তিনি শেষ পর্য্যন্ত সেখানে থেকে যান। তোমরা হয়তো তাঁর নাম শুনেও থাকতে পারো।
কি নাম ? জিজ্ঞেস করলাম আমরা।
ছেলেটি একটু কুন্ঠিত ভঙ্গী তে বলল, “আমার মামার নাম ভি জি জোগ্! ”
ভি জি জোগের নাম জানবোনা? আমি তো হৈ হৈ করে উঠলাম। ওনার মত এত বড় শিল্পী, পদ্মভূষণ, সঙ্গীত নাটক আকাদেমী ইত্যাদি কত খেতাব আর পুরস্কার পেয়েছেন, তার ওপরে কলকাতার সাথে তাঁর গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক তো সবাই জানে। কলকাতা আর বাঙালী কে ভালবাসার সূত্রে তিনি তো আমাদেরও আত্মীয়।
ছেলেটির সাথে তারপর বেশ কিছুক্ষণ আলাপ জমে গেল আমাদের। ওর মা থাকেন পুণাতে। মারা যাবার আগে পর্য্যন্ত বোনের কাছে মামা আসতেন মাঝে মাঝে, মুম্বাই তে কাজে এলেই। ও নিজে কোন গান বাজনা জানেনা, তবে লতা মাসী আর আশা মাসীর গান ওর খুব ভালো লাগে, ওঁরা ওদের পুণার বাড়ীতে প্রায়ই আসতেন ওর ছোটবেলায়।
নদীর ধারে কাছেই গ্রীনিচের এক এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সে একাই থাকে। তবে একা হলেও লন্ডনে তার থাকতে ভালোই লাগছে, কয়েক বছর হলো তার মা আর বাবাও গত হয়েছেন, তাই দেশে ফেরার টান তার আর নেই।
বিল মিটিয়ে ছেলেটিকে অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম।।
লন্ডনের সাথে কলকাতার এই আশ্চর্য্য যোগাযোগের জন্যে গ্রীনিচের সেই দুপুরটার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
