Category Archives: কুয়েত

ডিস্ম্যান্টেলেবল্‌

কুয়েতে প্রথম দিকে একদিন সিদ্ধার্থ আর নীহার (সেন) দা’ গেছেন ফার্নিচার কিনতে। দুজনেই কুয়েতে নতুন, তাই দুজনেরি নতুন বাড়ীতে খাট চেয়ার টেবিল এই সব দরকার।

হাওয়ালীর বেইরুট স্ট্রীট আর টিউনিস স্ট্রীট অঞ্চলে সারি সারি ফার্ণিচারের দোকান। সেখানে দোকানদাররা সবাই আরব, তাদের মধ্যে প্যালেস্টিনিয়ানই বেশী।

আলমারী টেবিল সোফা সব বেশ ভারী, এই সব বাড়ী নিয়ে যেতে গেলে একটা বড় ভ্যান ভাড়া করতে হবে, গাড়ীতে করে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। এগুলো খুলে নিয়ে বাড়ীতে assemble করা যায়না?

নীহার দা’ দোকানদার কে ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করলেন Are these dismantalable?

Dismantalable?

নীহারদার এই শক্ত ইংরেজী শুনে প্যালিস্টিনিয়ান দোকানদারের তো প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো অবস্থা। তার চোখ গোল গোল হয়ে গেল, কিছুক্ষণ সে কোন কথাই বলতে পারেনি।

আমাদের বাংলায় অবিশ্বাস বিপন্নতা বা বিস্ময় বোঝাবার জন্যে যেমন অনেক expression আছে যেমন যাঃ সে কি, তার মানে? কি যে বলেন, না না হতেই পারেনা, ইত্যাদি, আরবদের ওই একটাই কথা ওয়াল্লা – যা কিনা তারা universally ব্যবহার করে।   

কয়েক মূহুর্ত পরে সংবিত ফিরে পেয়ে দোকানদারটি বললো, “ওয়াল্লা, হোয়াত ইস দ্যাত্‌?”

নীহার দা’ বুঝলেন ইংরেজীটা একটু বেশী কঠিন হয়ে গেছে, একটু সোজা করে বোঝানোর জন্যে তিনি বললেন, “Can we break them and take them home?”

ব্রেক কথাটা শুনে লোকটি হাঁ হাঁ করে উঠে কিছুটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ করে বলেছিল, “ওয়াল্লা, নো নো, নো ব্রেক, দিস ভেরী স্ত্রং…”

পিয়া মিলন কো যানা

কবি বলেছেন একাকী গায়কের নহেকো গান, গাহিতে হবে দুই জনে। গায়কের সাথে শ্রোতার যে একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে, এ কথা অস্বীকার করা যায়না।

রাজসভায় সবাই কাশীনাথের গান শুনে ধন্য ধন্য করছে কিন্তু বুড়ো রাজার সেই গান শুনে মন ভরেনা, তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধু  বরজলালের গান শুনতে চান। এদিকে বরজলালের বয়স হয়েছে, তার গলা কেঁপে যাচ্ছে, সুরও ঠিক ধরছেনা, সভাসদ দের তার গান একেবারেই পছন্দ নয়। কিন্তু রাজা কেবল বরজলালের গানই শুনবেন।

একেই বোধ হয় বলে জেনারেশন গ্যাপ!

আমার শ্বশুর মশায় সুভদ্রা কে বলতেন কি এমন গান গায় তোমাদের লতা মঙ্গেশকার, মা? সে গাইতো আমাদের কাননবালা…

এদিকে সুভদ্রা কিছুতেই তার বাবার কথা মানবেনা। সে বেশ কয়েকবার কাননবালা দেবীর গান শুনেছে, তার মোটেই ভাল লাগেনি। কোথায় লতা মঙ্গেশকার আর কোথায় কাননবালা!

এই নিয়ে সুভদ্রার সাথে তার বাবার তর্ক লেগেই থাকতো।

১৯৮০ র দশকে আসামে “বাঙ্গাল খেদা” আন্দোলনের ফলে  দুলিয়াজান এর Assam Oil Company থেকে   আসাম থেকে অনেক বাঙালী  Geologist, Drilling Engineer, আর Petroleum Engineer কুয়েতে কাজ নিয়ে চলে আসেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন Senior ম্যানেজার ও ছিলেন। আমার বন্ধু সিদ্ধার্থ, তখন যুবক, সেও দুলিয়াজান থেকে কাজ নিয়ে ওই সিনিয়রদের সাথে কুয়েতে আসে। এই সব সিনিয়র দের কেউ তার চন্দদা’, কেউ ওয়াদ্দেদার দা’, কেউ সেনদা’, কেউ চ্যাটার্জ্জী দা’।

এদের মধ্যে চ্যাটার্জী (তপোব্রত) দা’ ছিলেন একজন সঙ্গীতরসিক মানুষ, নিজে ভাল গান গাইতেন, আর গান শুনতে ভালবাসতেন। আর তাঁর প্রিয় গায়ক ছিলেন পঙ্কজ মল্লিক।  

Kuwait Oil Company তে দুপুরে এক ঘন্টার লাঞ্চ ব্রেক। সিদ্ধার্থ রোজ চ্যাটার্জীদা’র গাড়ীতে বাড়িতে লাঞ্চ খেতে যায়। আর সারাটা পথ চ্যাটার্জ্জীদা’র গাড়িতে ক্যাসেটে পঙ্কজ মল্লিকের গান বাজে। এদিকে সিদ্ধার্থর প্রিয় গায়ক হলেন কিশোর কুমার। রোজ রোজ গাড়িতে যেতে যেতে পঙ্কজ মল্লিকের নাকি গলায় গান শুনতে তার একেবারেই ভাল লাগেনা। আর বার বার চ্যাটার্জ্জী দা’ তাঁর একটা বিশেষ প্রিয় গান বাজাবেন ই।

পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা/

আঁ আঁ আঁ আঁ/

পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা/

ওই এক গান বার বার শোনা সিদ্ধার্থর কাছে এক বিরাট যন্ত্রণা।

তো রোজ রোজ ওই একই গান শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে সিদ্ধার্থ এক দিন চ্যাটার্জ্জী দা’ কে বলল চ্যাটার্জ্জী দা’, রোজ রোজ আপনার গাড়িতে আমি লাঞ্চ খেতে যাচ্ছি, আজ বরং আপনি আমার গাড়িতে চলুন।

চ্যাটার্জ্জী দা’ স্মিত হেসে বললেন “বেশ, চলো”!

সিদ্ধার্থর গাড়িতে উঠে বসে সীট বেল্ট বেঁধে হঠাৎ চ্যাটার্জ্জীদা’র কি যেন মনে পড়ে গেল। তিনি বললেন একটূ দাঁড়াও তো সিদ্ধার্থ, একটা জিনিষ নিয়ে আসি।

কি জিনিষ?

একটু পরে চ্যাটার্জীদা’ ফিরে এসে সিদ্ধার্থ কে একটা ক্যাসেট দিয়ে বললেন নাও, এটা চালিয়ে দাও, রাস্তায় যেতে যেতে একটু গান শোনা যাক ~

সব্বোনাশ!

আবার সারা রাস্তা ধরে সেই পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা…

সিদ্ধার্থ সেদিন তার বৌ সুমিতাকে বললো কাল থেকে আমায় লাঞ্চ দিয়ে দিও, আমি অফিসেই খেয়ে নেবো।

বুঝতে পেরেছেন তো আমি কি বলছি

ভালকাকা কোন কথার মধ্যে প্রায়ই বলতেন “বুঝলি তো” তাই কাউকে “বুঝলি তো” বলতে শুনলেই অবধারিত ভালকাকার কথা মনে পড়ে।

তারাপদ দা’ বলতেন “বুঝতে পেরেছো তুমি?” ওটা তাঁর একটা মুদ্রাদোষ ছিল। ওনার পন্ডিতিয়া রোডের বাড়ীতে প্রায়ই আমি আর সুভদ্রা গিয়ে আড্ডা মেরে আসতাম। নানা গল্প হত। আর তারাপদ দা’র সব গল্পেই বার বার ওই কথাটা ফিরে আসবেই।

আমার এক কুয়েতের বন্ধু ধ্রুব আবার বলেন “বুঝতে পেরেছেন তো আমি কি বলছি?”

কিছু দিন আগে আমাদের কাম্বোডিয়া আর ভিয়েতনাম বেড়ানো নিয়ে আলোচনা করতে ধ্রুব আর আমি হাজরা রোড এ Altair Travel এর অফিসে গিয়েছি। Altair Travel এর মালিক উপানীতা সেন কে ধ্রুব  চেনেন ভাল করে। ধ্রুব্র যাবতীয় travel এর বন্দোবস্ত উপানীতাই করেন।

গাড়ীতে আসতে আসতে ট্রিপ নিয়ে নানা কথা হচ্ছে, ধ্রুব হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা ইন্দ্রজিৎ আপনি কি জানেন এই সব দেশে হোটেলে বাথরুমে commode shower থাকে কি না?”

Commode  আর shower? আমি বললাম, “থাকবেনা কেন? সব হোটেলেই আজকাল কমোড আর স্নান করার শাওয়ার থাকে।”

ধ্রুব একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “আরে না না, Commode  আর shower নয়, আমি বলছি Bidet Shower এর কথা।  আপনি বুঝতে পেরেছেন তো আমি কি বলছি?

ও হরি, বুঝলাম, কোন শাওয়ারের কথা ধ্রুব বলছেন। মানে বাঁ হাতের কাজের জন্যে।

ঠিক হলো উপানীতা কে জিজ্ঞেস করা হবে।

হাজরা রোডে মহারাষ্ট্র নিবাসের উল্টোদিকে একটা বাড়ীর দোতলায় একটা ফ্ল্যাটে Altair Travel এর অফিস। উপা্নিতা একটা ঘরে বসে আছেন। বাইরে হলে বেশ কিছু মেয়ে তাদের টেবিলে PC র স্ক্রিনে চোখ রেখে একমনে কাজ করে যাচ্ছে।

আমাদের দেখে উপানীতা আসুন আসুন বলে তাঁর ঘরে ডেকে নিলেন।  

সব কথা যখন প্রায় শেষ, তখন ধ্রুব তাঁর favourite  bidet shower এর কথাটা তুললেন।

“আচ্ছা এইসব দেশের হোটেলে কি  বাথরুমে bidet shower পাওয়া যাবে?”

তার পরে আমি যেরকম প্রথমে বুঝতে পারিনি সেরকম উপানীতা ও বুঝতে পেরেছেন কিনা তা সম্বন্ধে সন্দেহ থাকায় ধ্রুব তাঁকে বললেন, “বুঝতে পেরেছেন তো আমি কি বলছি?”

উপানীতা কিছুক্ষণ ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে থেকে খুব নির্ব্বিকার গলায় বললেন, “You mean bum shower?”

Bum shower?

আমি আর ধ্রুব  ভদ্রমহিলার কাছ থেকে bum কথাটা শুনে বেশ ব্যোমকেই গেলাম।

ধ্রুব একটু আমতা আমতা করে বললেন হ্যাঁ হ্যাঁ…

যেন কিছুই নয় এইরকম একটা ভাব করে উপানীতা ফোন টা তুলে বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলতে লাগলেন, তাঁর কথার মধ্যে বার বার  Bum shower শুনে বুঝলাম উনি খোঁজ খবর নিচ্ছেন ওই জিনিষ টা আছে কিনা কাম্বোডিয়ার কোন হোটেলে।

Bum, bum bum…

ভদ্রমহিলা  Bum নিয়ে ফোনে তাঁর প্রশ্নবাণ চালিয়ে যাচ্ছেন, আমি আর ধ্রুব কিছুটা লজ্জায় মাথা নীচু করে চুপ করে বসে আছি।

কি করবো আমরা দু’জনেই তো পুরুষ মানুষ, আমাদের তো যাকে বলে one track mind…bum কথাটা শুনলেই আমাদের মনে অদ্ভুত অদ্ভুত যত সব অসভ্য ছবি ফুটে ওঠে।  

উপানীতা র কাছে অবশ্য এসব কোন ব্যাপার নয়। ফোন শেষ হয়ে গেলে তিনি বেশ matter of fact গলায় আমাদের বললেন, “না, ওদেশের কোন হোটেলে কোন bum shower নেই।”

বেরিয়ে এসে গাড়ীতে উঠে আমি ধ্রুবকে বললাম No problem, আমরা একটা করে ঘটি নিয়ে  যাবো সাথে করে।

সিলিং মেথড

কোন Whatsapp গ্রুপে থাকলে একটা problem হলো যে সেখানে রোজই হাজার হাজার ভিডিও ছবি আর জোক আসে। সেগুলো নিয়ম করে delete করাই একটা বড় কাজ।

সেদিন একটা হিন্দী জোক পেলাম পাসওয়ার্ড  নিয়ে। তোমরাও সবাই পেয়েছো নিশ্চয়। সান্টার লম্বা পাসওয়ার্ড ~  রাম সীতা লক্ষ্মণ হনুমান দিল্লী কেজরীওয়াল। বান্টা জিজ্ঞেস করলো তোর এত লম্বা পাসওয়ার্ড কেন রে? সান্টা বললো কি করবো ভাই, পাঁচটা character, আর একটা capital দরকার যে। বান্টা বললো সে তো বুঝলাম, কিন্তু কেজরীওয়াল কেন? সান্টার উত্তর – “এক special character ভি চাহিয়ে থী ইয়ার~”

পাসওয়ার্ড ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই হাসি আর মজার নয়। আমাদের সর্ব্বস্ব (Identity) চুরি করে নেবার জন্যে অদৃশ্য চোরেরা আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, একটু অন্যমনস্ক হয়েছো কিংবা গাফিলতি করেছো কি মরেছো।

এখন আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক পাসওয়ার্ড মনে রাখতে হয়। ব্যাঙ্কের এ টি এম আর  ক্রেডিট কার্ড তো আছেই, তাছাড়া  মোবাইল ফোন, ই মেল account, ওয়েবসাইট access,  ইত্যাদি কত যে secret নম্বর!

কুয়েতে Oil Sector এ  যেমন KOC বা KNPC তে যাদের email account আছে তারা জানো যে সেখানে পাসওয়ার্ড নিয়ে বিরাট কড়াকড়ি। পনেরো দিন অন্তর  অন্তর পাসওয়ার্ড পাল্টাতে হবে, সেই পাসওয়ার্ড আবার অন্ততঃ দশ অক্ষর হওয়া চাই, পুরোন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা চলবেনা ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারটা নিয়ম।

আমার কিছুদিন KOC তে একটা mail account  ছিল, আমি তো তার পাসওয়ার্ড বানাতে বানাতে জেরবার হয়ে গেলাম। প্রতি পনেরো দিন অন্তর নতুন পাসওয়ার্ড বানানো সোজা কথা নাকি?

হিমসিম অবস্থা!

প্রথমে তো আমার নাম, মা বাবার নাম, বৌ আর মেয়েদের নাম, নাতনীদের নাম দিয়ে কিছুদিন চললো। তারপর নাতনীদের আদর করে যে সব নামে ডাকি যেমন বুজু বুজু গুজু কিংবা পুসু কুসু মুসু এইসব।

সে লিস্ট ফুরিয়ে যাবার পরে মহাপুরুষদের নাম ধরলাম। রবীন্দ্রনাথ, স্বামী বিবেকনন্দ, নেতাজী সুভাষ সবাই কোন না কোন সময়ে আমার পাসওয়ার্ড হয়েছেন। তার পরে ধরলাম সাহিত্যিকদের। বিভূতিভুষণ, তারাশঙ্কর, শৈলজারঞ্জন এঁরাও সব বেশ ভাল পাসওয়ার্ড। সেই লিস্ট শেষ হলে তারপর এলেন গায়করা।   হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, যত বেশী কঠিন নাম, তত তাঁরা পাসওয়ার্ড হিসেবে সরেস, কেননা তাঁরা পাসওয়ার্ড চোরদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

শেষ পর্য্যন্ত যখন আর কোন যুৎসই নাম মনে পড়ছেনা তখন হতাশ হয়ে ধরলাম গানের কথা। বললে বিশ্বাস করবেনা, KOC তে আমার শেষ পাসওয়ার্ড ছিল ধিতাং ধিতাং।

Password generation এর একটা ভাল এবং খুব সহজ আর কাজের উপায় হলো Ceiling method, এই জগদবিখ্যাত proven and trusted data collection method সম্পর্কে তোমরা কিছু জানো নাকি?

ব্যাপারটা আসলে কিছুই নয়। তোমায় যদি কোন data collect করার কাজ দেওয়া হয়, তুমি সেটা ঘরে বসেই করতে পারো। Simply বিছানায় শুয়ে ছাদের কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকো, দেখবে আপনা থেকেই  সিলিং থেকে Data টপটপ করে তোমার কোলে এসে পড়ছে।

এই পাসওয়ার্ড এর কথাই ধরা যাক।

মনে করো বি সি এসের সরস্বতী পূজোর অঞ্জলি দিয়ে বাড়ী ফিরেছো। সারা জীবন সরস্বতী পুজোর অনেক অঞ্জলি দিয়েছ, সব মন্ত্র তোমার মুখস্থ। কিন্তু আজ বি সি এসের পুরুত মশাই অং বং চং করে কি যে সব মন্ত্র পড়লেন, তুমি জীবনেও আগে শোনোনি। তোমার মাথাটা ঝিম ঝিম করছে, তুমি ব্যোম হয়ে বাড়িতে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছো।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো দুটো কথা তোমার মাথায় এল।

যস্মরেৎ পুন্ডরীকাক্ষং!

ব্যাস, না চাইতেই টপটপ করে দুখানা পাসওয়ার্ড পেয়ে গেলে। আর কি অপূর্ব্ব পাসওয়ার্ড! আমি দেখেছি অনুস্বর যোগ করলে কথা গুলো বেশ সংস্কৃত ভাষার মত শোনায়।

পাসওয়ার্ড চোরেরা কি সংস্কৃত জানে নাকি?

Most probably না।

ধরা যাক আর একবার ছাদের দিকে তাকিয়ে তোমার মাথায় এলো আরো দুটি কথা।

গোদাবরী তীরে শাল্মলী তরু!

এবার দরকার মতো অনুস্বর যোগ করে দাও।

দাঁড়ালো ~ গোদাবরীং তীরেং শাল্মলীং তরুং!

বাঃ, আরো দুটো চমৎকার পাসওয়ার্ড। বেশ মজা না? অনেকটা যেন মেঘ না চাইতেই জল!

আর যদি মনে করো, একটা Outside chance,  যে এখানকার পাসওয়ার্ড চোরেরা সংস্কৃত জানে, এমন কি কালিদাসও পড়েছে, তাহলে তাদের একটু ব্যোমকে দেবার জন্যে একটু ঘুরিয়ে ওটা করে দাও ~

শাল্মলীং তীরেং গোদাবরীং তরুং!

আর এর মধ্যে ভগবানের আশীর্ব্বাদ পাবার জন্যে গোটাকয়েক ওঁ ও দিয়ে দিতে পারো। তাহলে পাসওয়ার্ড টা আরো জম্পেশ হবে।

তাহলে দাঁড়ালো~

ওঁ শাল্মলীং তীরেং গোদাবরী তরুং ওঁ!

চোরেদের চৌদ্দপুরুষ এলেও এ জিনিষ খুঁজে পাবেনা।

কি সোজা না?

ওঁ নীলাচলেং মহাপ্রভুং জলবত্তরলং ওঁ!

মেজমাসী

আমার বন্ধু সিদ্ধার্থর মেজমাসীর একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল, luck ও বলা যায়, তাঁর সাথে celebrity  দের পথে ঘাটে দেখা হয়ে যেত। এবং তাদের সাথে দেখা হলেই চেনা নেই শোনা নেই তবু মেজমাসী খুব smartly  তাদের সাথে গিয়ে আলাপ জুড়ে দিতে পারতেন। এবং আলাপ করে বাড়ি এসেই তিনি তাঁর বোনদের সবাই কে ফোন করে বলতেন কার সাথে দেখা হল, তিনি কাকে কি বললেন, তারা কি বললো ইত্যাদি।

একবার নিউ মার্কেটে মাধবী মুখার্জ্জীর সাথে মেজমাসীর দেখা। মেজমাসী বললেন এ কী মাধবী, তোমার মুখটা এত শুকনো লাগছে কেন? শরীর খারাপ নাকি? মাধবী একটু সংকোচের সাথে বললেন আমি তো মাসীমা আপনাকে ঠিক…

মেজমাসী বললেন আমায় চিনতে পারছোনা তো? কি করে চিনবে? তুমি তো আমায় কোনদিন দ্যাখোইনি।

এই নিয়ে মাসীমা মানে সিদ্ধার্থর মা’র একটা inferiority complex ছিল, কেননা তাঁর সাথে কোনদিন কোন  celebrity র দেখা হয়না।

তো একবার মাসীমা ছেলের কাছে কুয়েতে বেড়াতে এসেছেন। মাস তিনেক থাকার পরে সিদ্ধার্থ তাঁকে নিয়ে কলকাতা যাচ্ছে। দুবাই তে Stop over, সেখানে সিদ্ধার্থ দ্যাখে মৃণাল সেন লাউঞ্জে একটু দূরে বসে আছেন। মাসীমাও দেখেছেন।

সিদ্ধার্থ মাসীমাকে বলল মা আমি একটু বাথরুমে যাচ্ছি, তুমি কিন্তু একদম ওনার সাথে গিয়ে কথা বলবেনা।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে সিদ্ধার্থ দ্যাখে যা ভয় পেয়েছিল তাই, মাসীমা মৃণাল বাবুর পাশে বসে দিব্বি আলাপ করে যাচ্ছেন। সিদ্ধার্থ কাছে আসতে মাসীমা বললেন এই হল আমার ছেলে, কুয়েতে থাকে। মৃণাল বাবু বেশ গপ্পে লোক, তিনি বললেন আমিও কুয়েতে গিয়েছিলাম একবার বেশ কিছুদিন আগে…

দমদম থেকে যাদবপুরে বাড়িতে ঢুকেই মাসীমার ফোন মেজমাসীকে।

মেজদি, জানিস আজ কার সাথে দেখা হলো?

ঋত্বিক ঘটক!

রজনীগন্ধা

টিঙ্কু আর দেবাশীষ কলকাতায় ফিরে আসার পর, তাদের ড্রাইভার সুভাষ ওদের প্রায় বাড়ীর লোক হয়ে গেছে।    গাড়ী চালানো ছাড়া সে ওদের বাজার দোকান ইত্যাদি অনেক কাজ হাসিমুখে করে দেয়। সে একাধারে বিশ্বাসী আর করিতকর্ম্মা ছেলে।      

তো একদিন টিঙ্কু সুভাষ কে বললো, “আমার জন্যে বারোটা বারোটা করে দুই গোছা চব্বিশটা রজনীগন্ধা নিয়ে আসিস তো। কাটতে হবেনা, আমি কেটে নেবো।”

কিছুক্ষণ পরে সুভাষ রজনীগন্ধা নিয়ে এসে হাজির। টিঙ্কু বলল, “নিয়ে এসেছিস, ঠিক আছে ফ্রিজে রেখে দে।”

বিকেলে টিঙ্কু ফ্রিজ খুলে কোথাও ফুল না দেখে সুভাষ কে বললো, “কি রে রজনীগন্ধা কোথায় রাখলি? ফ্রিজে তো দেখছিনা?”

“কেন, ওখানেই তো আছে”, বলে সুভাষ দুই তাড়া রজনীগন্ধা পান মসালার প্যাকেট নিয়ে এসে টিঙ্কু কে দিলো!

টিঙ্কুর তো তাই দেখে চক্ষু চড়কগাছ!

টিঙ্কুর বকুনী খেয়ে সুভাষ বলেছিল, “তাই দোকানের লোকটা বলছিল এগুলো তো এক প্যাকেটে দশটা করে থাকে, বারোটা তো হবেনা, দুটো আলাদা নিয়ে যান!”

সত্যি পান মসালার নাম রজনীগন্ধা হলে সুভাষ কি করবে?

কিন্তু টিঙ্কুরই বা কি দোষ?

পুলি পিঠে

কুয়েতে সুভদ্রা ALICO তে লাইফ ইন্সুরেন্স বিক্রী করতো  আর তার খদ্দেরদের কাছে যাবার জন্যে সে তার সাধের বিশাল Mitsubishi Pajero (SUV) গাড়ী চড়ে সারা কুয়েত শহর চষে বেড়াতো।

তার গাড়ীর গ্যারেজ ছিলো  Sharq এ  Fisheries বিল্ডিং এর উল্টোদিকে। গাড়ীতে কোন গন্ডগোল হলে সে নিজেই সেখানে গাড়ী নিয়ে চলে যেতো। সেই গ্যারেজের মেকানিকরা সবাই ভারতীয়। তাদের যে লীডার তার নাম মওলা, সে অন্ধ্রের লোক। ভাঙা ভাঙা হিন্দী তে কথা বলে।

তো একবার সুভদ্রার গাড়ীর ফ্যান বেল্ট ছিঁড়ে খুলে গেছে। আমি সুভদ্রা কে বললাম পুলি থেকে বেল্টটা খুলে গেছে, মওলা কে বললেই ও বুঝে যাবে।

সুভদ্রা ফ্যান বেল্ট কথাটা ভুলে গেছে, তার শুধু মনে আছে পুলি।

সে গ্যারেজে গিয়ে মওলা কে বললো “দেখো তো পিঠে মে কুছ হুয়া…”

পিঠে?

মওলা তো অবাক!  

“পিঠে কেয়া হ্যায় ম্যাডাম?”

তারপর গাড়ীর বনেট খুলে অবশ্য মওলা বুঝে যায় প্রবলেমটা কি।

গল্পটা শুনে সিদ্ধার্থ বললো তুমি ওকে বললেনা কেন “পাটিসাপটা কো জরা দেখনা, উসমে কুছ গড়বড় হুয়া হোগা…”

দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে

আল বাহার আই ক্লিনিক, কুয়েত

বাদল সরকারের এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকে একটা অফিসের দৃশ্য ছিল, সেখানে অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎ কাজ করে। সেই অফিসে হরিশ নামে একটি বেয়ারার চরিত্র ছিল, যার কাজ ছিল বাবুদের ফাই ফরমাস খাটা, দরকার মতো চা, সিগারে্ট,‌  ফাইল এই সব এনে দেওয়া। অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎরা তাকে নানা সুরে “হরিশ ! হরিশ!!” বলে ডাকলেই সে তাদের কাছে “বলুন স্যার” বলে গিয়ে হাজির হতো।

হরিশের জন্যে কোন আলাদা অভিনেতা নেই, সেই নাটকের প্রধান চরিত্র হলো লেখক, সেই লেখকই দরকার মত কাঁধে একটা কাপড় নিয়ে হরিশের ভূমিকায় অভিনয় করতো।

মাঝে মাঝে সেই হরিশ আবার সেই অফিসের ম্যানেজার হয়ে গিয়ে সেক্রেটারী মিস মালহোত্রা কে ডেকে চিঠি dictate করতো। তখন তার কাঁধে আর টেবিল পরিস্কার করার কাপড় নেই, তার চালচলনে তখন রাশভারী ব্যক্তিত্ব। অমল বিমল কমলরা তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে Good morning sir বলে।

স্টেজে অভিনেতাদের এক রোল থেকে আর এক রোলে এই  seamless transformation টা দর্শকদের কাছে বেশ উপভোগ্য ছিল।   

কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকের দু’টি দৃশ্য

একই লোকের এই transformation নাটকের বাইরে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও কি হয়না?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর একটা লেখায় তিনি Writers Building একজন Class Four staff এর কথা লিখেছিলেন। রাইটার্সে তাকে দেখে চুপচাপ বশংবদ ব্যক্তিত্বহীন বলে মনে হতো, সে নীরবে মাথা নীচু করে চা সার্ভ করতো, টেবিলে টেবিলে ফাইল দিয়ে যেতো, অফিসারদের নানা ফাইফরমাস খাটতো – ঠিক ওই নাটকের হরিশের মতোই। একবার সুনীল ওই লোকটির গ্রামের বাড়ীতে যান, সেখানে গিয়ে দেখেন তার অন্য রূপ। সেখানে সেই একই লোক তার গ্রামের একজন নেতা, তার বাড়ীতে লোকেরা এসে নানা ব্যাপারে তার পরামর্শ  আর সাহায্য চায়, তার সাথে সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধার সাথে কথা বলে।

এরকম একটি transformation চাক্ষুস করেছিলাম আমিও।

এক বছর আগে আমার চোখে একটা infection হয়েছিল, আমার এক বন্ধু সত্যজিৎ (তারও চোখের সমস্যা) আমায় Shuwaikh এর Al Bahar Eye Clinic এর Dr. Seemant নামে একজন নামকরা eye specialist এর সাথে appointment  করে দিয়েছিল। সকাল সকাল সেখানে চলে গিয়ে ফাইল খুলে নাম্বার নিয়ে waiting hall এ বসে আছি, ওই সাত সকালেও ক্লিনিকে বেশ ভীড়, ডঃ সীমন্তের রোগীই সব চেয়ে বেশী, আমার নাম্বার বেশ পিছনে। মাঝে মাঝে  ডাক্তারের চেম্বারের দরজায় গিয়ে দেখে আসছি কতটা এগোল।

দু’ দিকে সারি সারি চেম্বার, মাঝখানে লম্বা সরু করিডর, সেখানে অনেকে ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভীড়ের মধ্যে এক ভদ্রলোক কে দেখে আমার চোখ আটকে গেল।

খুব চেনা চেনা লাগছে,  কে ইনি, এঁকে আগে কোথায় দেখেছি?

দোহারা চেহারা, পরিস্কার পাটভাঙা ডার্ক সার্ট আর হাল্কা রং এর ট্রাউজার্সে দারুণ স্মার্ট লাগছে, চুলটা পরিপাটি করে ব্যাকব্রাশ করা, মাথার সামনেটা চুল একটু পাতলা হয়ে এসে ভদ্রলোকের চেহারায় যেন একটু বেশী ব্যক্তিত্ব যোগ হয়েছে, স্টাইলিশ ভঙ্গী তে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।  তাকে দেখে কোন হিন্দী ছবির নামকরা পার্শচরিত্রাভিনেতা বলে মনে হতেই পারে।

Sales and Marketing এর কাজে এতগুলো বছরে কত লোকের  সাথে রোজ দেখা হয়েছে।  তাদের অনেকের সাথে আলাপ আর বন্ধুত্ব হয়, কেউ কেউ থেকে যায় মনের ভিতরে। আবার অনেককে ভুলেও যাই। এঁকে ভুলিনি কিন্তু কোথায় যে দেখেছি কিছুতেই মনে পড়ছেনা।

ইনি কি কুয়েত ইউনিভার্সিটির কোন প্রফেসর, কিংবা  KNPC তে Planning Engineer,  অথবা KOC IT তে কাজ করেন?

সুভদ্রা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করতে সে ভদ্রলোকের দিকে এক মিনিট তাকিয়ে দেখেই যেন কিছুই না এই ভাবে বললো, “ও এই লোকটা তো সালমিয়া ইডি স্টোর্সে তরকারী ফল আর আনাজ ওজন করে দামের স্টিকার লাগায়। ”

অ্যাঁ , বলে কি?

আবার ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তাই। সেই লোকটাই।

একে বলে connecting the dots, সুভদ্রার এই ক্ষমতাটা অসাধারণ।

কুয়েতের ভারতীয়রা যারা সালমিয়াতে ইডি স্টোর্সে বাজার করে তারা সবাই নিশ্চয় ওই লোকটাকে চেনে।  তরকারী আর ফলের র‍্যাকের পাশে এক কোণে ছোট এক জায়গায় বসে সে কাস্টমার দের তরকারী ফল আর আনাজ ওজন করে আর প্লাস্টিকের ব্যাগে দামের স্টিকার লাগায়। সকাল থেকে রাত প্রতিদিন ওই তার কাজ। তার বেশবাস একান্ত আটপৌরে, অনেক সময়ে গায়ে সার্ট ও নেই, শুধু গেঞ্জী। চুল অর্ধেক দিন ভাল ভাবে আঁচড়ানো হয়না।  তার মুখেও কোন কথা  কিংবা হাসি নেই, তাকে দেখে একজন ব্যক্তিত্বহীন, মাথা নীচু করা, হেরে যাওয়া লোক বলেই মনে হয়।             

সেদিন আল বাহার আই ক্লিনিকে আমি যে স্টাইলিশ ভদ্রলোক কে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, তিনি কি ওই একই লোক?

ইডি স্টোর্স, সালমিয়া, কুয়েত

বেসিকালী

কুয়েতে আমার কাজ ছিল IT Solutions sell করা। নানা জায়গায় যাই sales call এ, নানা লোকের সাথে  দেখা হয়, কথা হয়।  তো একবার কুয়েতের Ministry of Electricity   তে জালালুদ্দিন আহমেদ নামে এক   ইঞ্জিনীয়ার ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।

জালালুদ্দিন সাহেব অল্পবয়েসী হলেও খুব চৌখস এবং জ্ঞানী লোক, তাঁর চোখে মুখে কথা। আমাদের কথা শোনার বদলে তিনি নিজেই আমাদের তাঁর জ্ঞান বিতরণ শুরু করে দিলেন। তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ শুনেই বোঝা গেল তিনি “আমাগো দ্যাশের” লোক, পরিস্কার বাংলায় ইংরেজী বলে যাচ্ছেন। আর তাঁর মুদ্রাদোষ হলো প্রতি বাক্যের ভেতর বেশ কয়েকবার “basically” বলা।

Basically, basically, basically….

কিছুক্ষন পরে ঘরের ভেতর যেন basically র ঝড় বইতে শুরু করল।

বাক্যের প্রথমে basically,  বাক্যের মাঝখানে basically, বাক্যের শেষে basically। শেষে এমন হলো যে আমি আর ভদ্রলোকের কথাই শুনছিলাম না, হয়তো একটি বাক্য শুরু করেছেন, এখনো basically বলেন নি, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে basically র জন্যে অপেক্ষা করছি।

সেই একটা গল্প ছিলনা, এক ভদ্রলোক অফিস থেকে ফিরে দুম দুম আওয়াজ করে তাঁর জুতো জোড়া খুলে মেঝেতে রাখতেন। আর তাঁর নীচের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক রোজ সন্ধ্যায় সেই দুই বার জুতো পড়ার আওয়াজ শুনে বিরক্ত হয়ে একদিন ওপরে গিয়ে তাঁকে বললেন এটা কি হচ্ছে মশাই? আস্তে, আওয়াজ না করে, জুতো খুলে রাখতে পারেন না?

তো পরের দিন ভদ্রলোক তো যথারীতি প্রথম জুতোটা দুম করে খুলে রেখেছেন, তার পরেই তাঁর মনে পড়েছে এই রে, কাল নীচের ভদ্রলোক এসে বকুনী দিয়ে গেছেন। পরের জুতোটা তিনি তাই আস্তে করে খুব সন্তর্পনে মেঝেতে রাখলেন।

এদিকে নীচের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক তো প্রথম জুতোর আওয়াজ পেয়ে পরের জুতোর আওয়াজের জন্যে বসে আছেন।সেই দ্বিতীয় জুতোর আওয়াজ আর আসেনা। ভদ্রলোক দুই কান চেপে বসে আছেন কখন আবার সেই আওয়াজ হবে।বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে আওয়াজ আর আসেনা, তিনি আবার ওপরে উঠে গিয়ে দরজায় বেল দিলেন।

কি হলো মশাই, সেকেন্ড জুতোটা ফেলুন, কতক্ষণ ওয়েট করাবেন?  

আমিও গল্পের ওই ভদ্রলোকের মত বসে আছি, কখন আবার  ম্যাজিশিয়ান এর টূপির ভেতর থেকে খরগোস বা কাঠবিড়ালীর মতো একটা basically বেরিয়ে আসে। আর basically একটা বেরিয়ে এলেই একটা গভীর স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস নিচ্ছি।

একটি ছেলে মরুভূমির ওপর রচনা লিখতে গিয়ে লিখেছিল, “মরুভূমি তে শুধু বালি। এদিকে বালি, ওদিকে বালি। ডাইনে বালি, বাঁয়ে বালি। উত্তরে বালি, দক্ষিণে বালি, পূবে বালি, পশ্চিমে বালি। যেদিকে তাকাও শুধু বালি আর বালি।” এই ভাবেই চার পাতা লিখে গিয়েছিল সে।

জালালুদ্দিন বাবুর ওপর রচনা লিখতে দিলে আমিও ওইভাবেই লিখতাম।

এক সময় জালালুদ্দিন সাহেবের খেয়াল হলো যে তাঁর আর হাতে আর সময় নেই, অন্য একটা মিটিং এ যেতে হবে, তিনি আমাদের বললেন “আপনারা এবার আসুন তাহলে, basically…”

স্মৃতিশক্তি

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের “মনোজ দের অদ্ভুত বাড়ী” বই তে একটা দৃশ্য ছিল, যেখানে মনোজ দের গৃহশিক্ষক দুঃখ বাবু মনের দুঃখে আত্মহত্যা করবেন বলে গোয়াল থেকে এক দুর্দ্ধর্ষ গোরুর দড়ি খুলে নিয়েছেন। পিসীমা গোয়ালে গোবর নিতে গিয়ে ছাড়া গোরু তাঁকে তাড়া করে গুঁতিয়ে দেয়, তিনি গোবরে পড়ে আর উঠতে পারছেন না। এদিকে বাড়ীর ঝি কিরমিরিয়া কথায় কথায় কেঁদে ভাসায়, সে তারস্বরে চেঁচিয়ে কেঁদে যাচ্ছে, “ও মা আমার কি হবে গো, পিসীমা গোবরে পড়ে গেছে গো…”

চারিদিকে অনেক লোক জমে যাচ্ছে কিন্তু কেউ পিসীমা কে তোলার নাম করছেনা। ওই লোকেদের মধ্যে একজন ভুলোমন লোক বললো বাংলায় গোবর নিয়ে তিনটে কথা আছে, তার মধ্যে প্রথমটা কি যেন, কি যেন… দ্বিতীয় টা এই মুহুর্ত্তে আমার ঠিক মনে পড়ছেনা, আর তৃতীয়টা আমি একেবারেই ভুলে গেছি।

ওই লোকটির মত আমার স্মৃতিশক্তির অবস্থাও খুবই শোচনীয়। আজকাল সবই ভুলে যাচ্ছি, বিশেষ করে কারুর নাম মনে থাকেনা একেবারেই। সে এক মহা যন্ত্রনা।

কুয়েতে থাকাকালীন একবার শিব কুমার শর্মার সন্তুর শুনে এসে একজনকে সে কথা বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের পদবীটা আর মনেই এলনা। শিব কথাটা মনে এলেই মাথাটা ভুল পথে চলে যায়। শিবশংকর মিত্র, শিবপ্রসাদ সমাদ্দার, শিবলাল যাদব, শিবকুমার খান্না এইরকম সব নাম কোথা থেকে ভীড় করে আসে, কিন্তু শর্মার কোন পাত্তা নেই।

কবির ভাষায় “গোলেমালে ফাঁক তালে পালিয়েছি কেমন, শর্মা ওদিকে আর নন।”

শেষ পর্য্যন্ত “শিবজী” বলে পার পেলাম। ভদ্রলোক হয়তো ভাবলেন আমি ওনার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ, কিংবা classical music এর এক বিরাট বোদ্ধা। এক দিক দিয়ে ভালোই হল অবশ্য।

যখন মোবাইল ফোন ছিলনা তখন টেলিফোন নম্বর মনে রাখাও কিছু কম কষ্টকর ছিলনা। তবে নম্বর মনে রাখার জন্যে আমি একটা সাংকেতিক গাণিতিক পদ্ধতি অবলম্বন করতাম।

একবার ১৯৯০ সালে  – ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার পরে আমি তখন UAE র আবুধাবী শহরে কাজ করি – আমার বন্ধু এবং সহকর্ম্মী অরবিন্দ ঘোষ অফিসের কাজে সেখান দুবাই যাচ্ছিলেন, তিনি আমাদের হার্ডওয়ার ম্যানেজার। ওনাকে Lift এ তুলে দিতে এসে আমি বললাম “দুবাই তে আমার ভাই উদয় আছে, ওকে কোন দরকার পড়লে একটা ফোন করতে পারেন।”

Lift এখুনি চলে আসবে, নম্বর লিখে দেবার সময় নেই, আমি অরবিন্দকে বললাম, “নম্বরটা মনে রাখা খুবই সহজ, ৫১২৭৯২। আপনি তো হার্ডওয়ার এর লোক, ৫১২ মনে রাখা আপনার কাছে কিছুই না, হাফ এ মেগাবাইট মনে রাখলেই হলো। আর তার পর ওই ৫১২ র তিনটে নম্বর পাঁচ এক আর দুই   যোগ করলে আট (৫+১+২=৮)। ব্যাস, তার পর আটশো মাইনাস আট হলো ৮০০-৮ =৭৯২ !

মনে রাখা কি সহজ না?

Lift এর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে অরবিন্দ আমার দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি হেসেছিলেন। সেই হাসিটা আজও ভুলিনি।

তারপর কুয়েতে একদিন সালমিয়াতে আম্মান ভেলপুরী Shop এ মসালা দোসা আর পানি পুরী খাচ্ছি, পাশের টেবিলে একটি বাঙালী ছেলের সাথে আলাপ হলো। সে কুয়েতে নতুন এসেছে। তখনো তার family আসেনি। আমি তাকে বললাম একা feel করলে আমাদের বাড়িতে চলে এসো একটা ফোন করে। আমার ফোন নম্বর মনে রাখা খুব সহজ। এই দ্যাখোনা, পাঁচ আর দুইয়ে সাত, সাত দুগুনে চৌদ্দ…

কিছুদিন পরে শুনলাম ছেলেটি নাকি কুয়েত ছেড়ে চলে গেছে।

যে শহরে এই ধরনের সব পাগল থাকে, সেখানে বেশী দিন থাকা বিপজ্জনক, এই ভেবেই কি না কে জানে!