Category Archives: কুয়েত

ফুটি সাই, আপা? ভাল ফুটি আসে…

কুয়েতে এসেছি প্রায় এক বছর হলো। এই মরুভূমির শহরে যে এত বাঙালী পরিবার বাস করে তা আসার আগে জানা ছিলোনা। তাছাড়া রাস্তায় ঘাটে দোকানে বাজারে বাংলাদেশী লোকেরাও বাংলায় কথা বলছে, শুনলেই বেশ মনটা ভাল হয়ে যায়।

এর মধ্যে অভীক (দাশগুপ্ত) আর তার বৌ পাপিয়ার সাথে আমাদের বেশ আলাপ আর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অভীক নিউ ইয়র্ক এর Citibank থেকে কুয়েতে কিছুদিনের জন্যে কুয়েতের Commercial Bank এ assignment নিয়ে এসেছে। USA তে থাকলেও ওরা দুজনেই originally কলকাতার, তার ওপর বেরিয়ে গেল যে পাপিয়া আর সিদ্ধার্থর স্ত্রী সুমিতা আশুতোষ কলেজে ক্লাসমেট ছিল, এবং দুজনে একসাথে গীতবিতানে গান শিখেছে।

আমাদের সান্ধ্য আড্ডায় প্রায়ই কলকাতার কথা উঠে আসে। কুয়েতে বসে লেক মার্কেট, রাসবিহারী এভিনিউ, দেশপ্রিয় পার্ক, ল্যান্সডাউন রোড এই সব নামগুলো শুনলেই গা টা’ কেমন শিরশির করে ওঠে…

তো যাই হোক, একদিন সুভদ্রা গেছে অভীকদের সাথে কুয়েত শহরে কর্ণফুলী স্টোর্সে। দোকান টা নতুন খুলেছে, সেখানে নাকি খুব ভালো বাংলাদেশী তরীতরকারী, ফলমূল আর মাছ পাওয়া যায়, ইদানীং অভীকরা ওখান থেকেই বাজার করে।

দোকানে গিয়ে সুভদ্রা এটা ওটা দেখছে এমন সময় দোকানদার একটি ছেলে সুভদ্রাকে বললো ফুটি সাই আপা? ভাল ফুটি আসে…

ফুটি?

ফুটি কথাটা শুনলে সুভদ্রার মনে যে ছবি ফুটে ওঠে তা হলো তরমুজ জাতীয় একটি রসালো ফলের। কিন্তু ফুটি কিনবার ইচ্ছে তখন সুভদ্রার একেবারেই নেই, সে এসেছে মাছ কিনতে।

সুভদ্রা বললো, ফুটি? না না, ফুটি চাইনা।

অভীক বরিশালের ছেলে, সে সুভদ্রাকে বলল তুমি যে ফুটি ভাবছো এ সে ফুটি নয়। এ হলো পুঁটি মাছ…

দোকানদার ছেলেটি খুব উৎসাহিত হয়ে সুভদ্রাকে বললো সরষে বাটা দিয়া ফাক কইরা দেখুন আপা, চমৎকার স্বাদ হইবো…

অভীক ছেলেটিকে বলেছিল কারে কি কন্‌, দ্যাকসেন না পাঁড় ঘটি, আমাগো বাঙালদের খাওন দাওন ঘটিরা কি বোঝবো, কয়েন?

কুমারেশ ও ট্যাক্সি ড্রাইভার

কুমারেশ আমার কুয়েতের বন্ধু, কয়েক বছর আগে দুরারোগ্য রোগে তার মৃত্যু হয়। 

তাকে নিয়ে এই গল্পটা।

আমাদের বন্ধুদের কোন জমায়েতে কুমারেশ থাকলে এই গল্পটা তার কাছ থেকে আমরা বার বার শুনেছি। আর কুমারেশ এমন মজা করে বলতো যে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়তাম।

——————————————————

কুমারেশ কিছুদিন হল কুয়েতে এসেছে, আরবী ভাষাটা তার তখনো ভাল করে রপ্ত হয়নি। কিছু কিছু কথা কেবল শিখে রেখেছে, যেমন আমি আরবি জানিনা, মা আরিফ আরবী।

তো হয়েছে কি, একদিন কি একটা কাজে কুমারেশ কে Indian Embassy যেতে হবে। গাড়ি নেই, অতএব ট্যাক্সি নিতে হল। সে এক বিরাট ট্যাক্সি, GM এর Caprice Classic…ছয় সিলিন্ডার চার লিটার এর ভি ইঞ্জিন, কোন ঝাঁকানী নেই, কোন আওয়াজ নেই।  বাইরে প্রচন্ড গরম, কিন্তু ভিতরে এয়ার কন্ডিশনিং এর  ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া।  আমাদের দেশের  এম্বাসাডর গাড়ীর সাথে এই গাড়ীর কোন তুলনাই হয়না।

কুমারেশ জেনে নিয়েছে Indian Embassy আরবী তে হল সাফারা হিন্দী। ড্রাইভার কে সে কথা বলে সে Air conditioned গাড়ির পিছনের সীটের নরম গদিতে গা ডুবিয়ে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে।

আবু হালিফা থেকে ইস্তিকলাল স্ট্রীট দূর কম নয়, গাড়ী চলেছে, ড্রাইভার লোকটা বেশ গম্ভীর, তার মুখে কোন কথা নেই, কুমারেশও কিছু বলছেনা। আর তারা কথা  বলবেই বা কি করে, ড্রাইভার ইংরেজী জানেনা, আর কুমারেশ আরবী জানেনা।

বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কুমারেশ ভাবলো আরে এই লোকটা আমায় Indian Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে তো? তার বদলে ভুলভাল কোন জায়গায় নিয়ে গেলেই তো সর্ব্বনাশ!

কুমারেশ ট্যাক্সিচালক কে জিজ্ঞেস করবে “কি ভাই তুমি ঠিক Indian Embassy তেই যাচ্ছো তো?” কিন্তু tension এর জন্যে Embassy কথাটার আরবী যে সাফারা তা সে বেমালুম ভুলে গেছে। তার কেন জানিনা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে Embassy আরবী তে হল সাইয়ারা। ওকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায়না, স্বীকার করতেই হবে যে দুটো কথার মধ্যে বেশ মিল আছে।

এদিকে আরবীতে সাইয়ারা হলো গাড়ী।

কুমারেশ ট্যাক্সি চালক কে জিজ্ঞেস করলো, “আন্‌তা সাইয়ারা হিন্দী?”

সে লোকটা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “লা, সাইয়ারা আমরিকী।”

কুমারেশ ভাবল এই রে, যা ভেবেছি তাই। এই গাধাটা এত করে বলা সত্ত্বেও আমায় US Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে!

সে তখন বেশ রেগে গিয়ে বলল “লা লা, সাইয়ারা হিন্দী।”

লোকটা এইবার ভীষণ রেগে গেল। এত বড় অপমান? আমার এই সাধের Caprice Classic কে ব্যাটা বলে কিনা Indian গাড়ী?

এই রকম বেশ কিছুক্ষন চলল।

কুমারেশ বলে সাইয়ারা হিন্দী আর ট্যাক্সিচালক বলে লা সাইয়ারা আমরিকী।

শেষ পর্য্যন্ত রেগেমেগে  “ট্যাক্সি থেকে বেরোও” বলে কুমারেশ কে রাস্তার মাঝখানে নামিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। এত অপমান তার সহ্য হয়নি।

————————————                       

২০০২ সালে কুয়েতে আমরা রবীন্দ্রনাথের শেষরক্ষা নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলাম । সেই নাটকে দাপুটে ডাক্তার শিবচরণের ভূমিকায় দারুণ অভিনয় করেছিল কুমারেশ। তার লম্বা চওড়া চেহারা, পরণে ধুতি আর কালো কোট, হাতে একটা ছাতা, গলায় স্টেথোস্কোপ, চরিত্রের সাথে তাকে দিব্বি মানিয়ে গিয়েছিল। 

এই সাথে সেই নাটকের দুটি ছবি।

——————————

প্রথমটি ছেলে গদাই এর সাথে বাগবাজারের কাদম্বিনী চৌধুরীর বাড়ির সামনে।

শিবচরণঃ বাপু হে, মেডিকাল কালেজ টা কোন দিকে একটু দেখিয়ে দাও তো।

গদাইঃ  (কি সর্ব্বনাশ, এ যে বাবা!)। 

দ্বিতীয়টি শিবচরনের ছেলে গদাই ও বন্ধু নিবারণের মেয়ে ইন্দুমতীর বিয়ের অনুষ্ঠানে ।

শিবচরণঃ  লুচিটা যেন কিছু কম পড়বে মনে হচ্ছে নিবারণ!

নিবারণঃ তাহলে কি হবে শিবু?

শিবচরণঃ  ভয় নেই। আমি সব বন্দোবস্ত করছি! ওরে কে কোথায় আছিস?

————————

কুমারেশের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি।

ওয়েন সিরি?

কুয়েতে পাসপোর্টে তিনটে নাম ছিল বাধ্যতামূলক। আরবদের রীতি অনুযায়ী প্রথম নাম হলো নিজের, দ্বিতীয় নাম বাবার, আর তৃতীয় নাম পরিবারের ও হতে পারে গ্রামের বা জন্মস্থানের ও হতে পারে, কিছু একটা হলেই হলো।  

মোটমাট তিনটে নাম থাকতেই হবে।

আমাদের বন্ধু ধ্রুব মুখার্জী র পাসপোর্টে নাম ছিল SHRI DHRUBA MUKHERJEE.

সুতরাং কুয়েতে officially তাঁর নাম হয়ে গেল শ্রী।  সিভিল আই ডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি সব সরকারী কাগজপত্রে আরবী ভাষায় তাঁর সেই প্রথম নামটাই লেখা থাকতো, এবং সেই নামের পরে নামের বাকি দু’টো অংশ ধ্রুব আর মুখার্জ্জি।], যেগুলো তেমন ধর্ত্তব্যের মধ্যে নয়।   

প্রথমে এ ব্যাপারটা ধ্রুব ঠিক বুঝতে পারেন নি।       

কিন্তু এই নিয়ে তাঁর একবার একটা “বিশ্রী” অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

একবার জাবরিয়াতে ট্র্যাফিক ডিপার্টমেন্টের  অফিসে  তিনি তাঁর  driving license  renew করতে গেছেন।  অনেকক্ষণ হয়ে গেছে,  ধ্রুব বসে আছেন। কাগজপত্র সব দেওয়া হয়ে গেছে, এখন তাঁর নাম ডাকার অপেক্ষা।

কিন্তু তাঁর নাম আর ডাকেনা। ধ্রুব বসে আছেন তো আছেন ই। ইতিমধ্যে হলঘর প্রায় খালি হয়ে আসছে,  যাদের নাম ডাকা হচ্ছে তারা কাউন্টারে গিয়ে তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে চলে যাচ্ছে।  

নানা নাম ডাকা হচ্ছে, তার মধ্যে বেশ ব্যগ্র ভাবে ডাকা একটা নাম শোনা যাচ্ছে বার বার – “সিরি” – , কিন্তু ধ্রুব জানেন না যে তাঁকেই ডাকা হচ্ছে, তাই তিনি চুপ করে ধৈর্য্য ধরে লক্ষ্মী ছেলের মতো বসে আছেন।

কিন্তু এত দেরী হচ্ছে কেন? ধ্রুব মনে মনে একটু বিরক্ত আর অধৈর্য্য হয়ে পড়ছেন।

যে লোকটি তাঁর নাম ডাকছে, তারও ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থা। বেশ রাগী গলায় সে ডাকছে ওই অদ্ভুত নাম ধরে।

ওয়েন সিরি? ওয়েন সিরি? 

আরবী ভাষায় ওয়েন মানে হলো কোথায়।   

শেষে হল ফাঁকা হয়ে গেল, কেউ নেই, ধ্রুব একা বসে আছেন। ধ্রুব  কাউন্টারে খোঁজ করতে যেতেই লোকটা রাগে ফেটে পড়লো।

আন্তা সিরি?  (তুমি শ্রী? )

এতক্ষণে ধ্রুব বুঝতে পেরেছেন তাঁর ভুলটা কোথায় হয়েছে।

তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে লোকটার একটানা অশ্রাব্য গালাগালি শুনতে হলো তাঁকে! একবিন্দু আরবী না জানলেও লোকটি যে কি বলছে  তা বোঝা তাঁর পক্ষে খুব একটা কঠিন নয়।

বাংলায় তার গূঢ়ার্থ হচ্ছেঃ

ফাজলামী করার আর জায়গা পাওনি? আমার সাথে ইয়ার্কি হচ্ছে? এতক্ষণ ধরে তোমার নাম ডাকছি, কথা কানেই যাচ্ছেনা? বলি কানের মাথাটা কি খেয়েছো নাকি?

আরবদের দেশে এক ভৌমিক

আমার এক IBM এর সহকর্ম্মী বন্ধু প্রবীর কুমার সেনগুপ্ত আর আমি একসাথে কুয়েতে আসি। প্রবীরকে সবাই আমরা পিকে বলে ডাকতাম, ওটাই ওর নাম হয়ে গেছে, আমাদের সবার কাছে ও হলো universal পিকে।

কুয়েতে আসার পর প্রথম ঝামেলা হলো নাম নিয়ে। আরবী ভাষায় প বলে কোন শব্দ নেই! আশ্চর্য্য ব্যাপার। এত মহান একটা ভাষা, এত লোকে এই ভাষায় কথা বলে, অথচ প নেই? পিকে কে সবাই বিকে বলে ডাকতে শুরু করলো। আরবদের নিয়ে এক মুস্কিল হলো যে তারা কিছুতেই ভুল স্বীকার করতে চায়না, পিকে যত বলে “আরে, বিকে নয়, আমায় পিকে বলে ডাকো”, তারা বলে “আমরা তো বিকে ই বলছি”।

এই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পিকে এক বছরের মধ্যেই কুয়েত ছেড়ে দেশে ফিরে গেল।

এদিকে আমার ও ঝঞ্ঝাট কম নয়। প এর সাথে সাথে আরবী তে ভ ও নেই। তিন রকমের শ আছে, চার রকমের হ, কিন্তু প ও নেই, ভ ও নেই।

কোন মানে হয়?

আমার নাম ভৌমিক থেকে হয়ে গেল বোমিক। Driving License, Civil id, ইত্যাদি সব দরকারী সরকারী document এ আমি হয়ে গেলাম বোমিক। Birthday card এ আমায় বন্ধুরা ভালোবেসে লেখে, “Happy Birthday, Bombom!”

এসব কি হচ্ছে টা কি? 

এদিকে আবার কিছু উচ্চারণ বিশারদ লোক আছে, যাদের উচ্চারণ  (শিব্রামের ভাষায় উশ্চারণ) নিয়ে প্রচন্ড মাথাব্যথা, যেন উচ্চারণ ঠিক না হলে তাদের রাত্রে ঘুম হয়না। তারা অনেক চেষ্টা, অনেক কসরত, অনেক পরিশ্রম করে আমার নামটা উচ্চারণ করে “বোহোমিক”।

তার পর “কি, এবার ঠিক হলো তো” ধরণের একটা দেঁতো হাসি হাসে, যা দেখে আমার গা জ্বলে যায়।

আমি ওদের বোঝাই আরে না না, বোহোমিক নয়, ভৌমিক! বোহো নয়, ভৌ, ভৌ! দু তিন বার এরকম ভৌ ভৌ করার পর একটু লজ্জাই করে, আমি বানান করে বোঝাই।  B, H, O,W, বুঝেছো? Baby, Honey, Oscar, William…

কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা।

কিছুদিন পরে সেই উচ্চারণ বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা হলে  তিনি আবার বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলেন, “কি খবর, কেমন আছো বোহোমিক?”