Category Archives: খেলা

দুই অর্জ্জুনের সাথে একদিন

১) প্রথম অর্জ্জুন – দীপু ঘোষ

বিখ্যাত ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় দীপু ঘোষের সাথে কলেজের বন্ধু তপন রায়ের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সূত্রে বেশ কয়েক বছর আগে আমার ইমেলে যোগাযোগ হয়। তখন তিনি আর তাঁর স্ত্রী শ্যামলী বৌদি আইসল্যান্ডে থাকতেন। সেই দেশে তিনি অনেক বছর আগে ব্যাডমিন্টন কোচ হয়ে গিয়েছিলেন, এবং সেই দেশের সরকারের আনুকুল্যে তিনি সেখানেই থেকে যান। সম্প্রতি তাঁরা আইসল্যান্ড ছেড়ে সিঙ্গাপুরে তাঁদের একমাত্র ছেলের কাছে এসে আছেন।

তিনি আমাদের থেকে বয়সে বেশ কিছুটা বড়, তপন তাঁকে দীপুদা’ বলে ডাকে, তাই তিনি আমারও দীপুদা’ হয়ে গেলেন চট করে। ২০২১ সালে প্রথম আলাপের সময় দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদি  আইসল্যান্ডে রামকৃষ্ণ মিশনের নানা কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাঁর ইমেলের বেশীর ভাগই ঠাকুর রামকৃষ্ণ আর স্বামী বিবেকানন্দের নানা বাণী এবং রামকৃষ্ণ চরিতামৃত থেকে উদ্ধৃতি থাকে, সেই সব মেল থেকে তাঁকে একজন ধার্ম্মিক এবং আধ্যাত্মিক লোক বলে মনে হয়, ব্যাডমিন্টন খেলার সাথে তাঁর এখন আর কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয়না।              

আমাদের ছোটবেলায় – ষাটের দশকে – আমাদের দেশে নন্দু নাটেকার, সুরেশ গোয়েল, দীনেশ খান্নার মতো ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও দীপুদা’ পর পর ছয়বার ব্যাডমিন্টন জাতীয় প্রতি্যোগিতার ফাইনালে উঠেছিলেন, তার থেকে বোঝা যায় কত উঁচুদরের খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। অবশ্য তার মধ্যে তিনি মাত্র একবার (১৯৬৯) জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন্‌, বাকি পাঁচবার সেই সময়ের অন্য বিখ্যাত খেলোয়াড়দের কাছে ফাইনালে হেরে যান।

সেই একবার তাঁর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়াও একটা গল্প।

দীপুদা’ South Eastern Railway তে চাকরী করতেন, একদিন গার্ডেনরীচে প্র্যাকটিস করতে যাবার সময় একটি ট্রাক তাঁর স্কুটার কে ধাক্কা মারায় তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় সাতমাস রেল হাসপাতালে ভর্ত্তি ছিলেন। তাঁর ডাক্তাররা তিনি আবার ফিরে এসে খেলতে পারবেন এই আশা দিতে পারেননি, কিন্তু তাঁদের অবাক করে তিনি ফিরে এসে ১৯৬৯ সালে সেমি ফাইনালে দীনেশ খান্না আর ফাইনালে সুরেশ গোয়েল কে হারিয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন্‌।   

আমি তখন স্কুলে পড়ি, ইডেন ইন্ডোর স্টেডিয়াম এ National Badminton championship এর খেলা হচ্ছিল, বাবার সাথে আমি সেখানে সেমি ফাইনাল আর ফাইনালে দীপুদা’র খেলা দেখি। সেমি ফাইনালে দীপুদা’ ত্রিলোক নাথ শেঠ কে হারিয়ে ফাইনালে শেষে নন্দু নাটেকারের কাছে হেরে যান্‌। ফাইনাল খেলাটা হয়েছিল সমানে সমানে – যে কেউ জিততে পারতেন, নন্দু শেষ পর্য্যন্ত জিতলেও দীপুদা’কে হারানো তাঁর পক্ষে সোজা হয়নি।

সেই বয়সে ওই দু’জনের মধ্যে দীপু ঘোষ কেই আমার বেশী ভাল লেগেছিল মানে পড়ে, উনি হেরে যাওয়াতে আমার যে মন খারাপ হয়েছিল সেটাও পরিস্কার মনে পড়ে। উনি বাঙালী ছিলেন বলেই হয়তো আমার দিক থেকে একটু পক্ষপাতিত্ব ছিল।।তাছাড়া ওই ছোটখাটো ছিপছিপে তরুণটি অসাধারণ খেলেছিলেন সেদিন, সারা কোর্ট জুড়ে তাঁর আধিপত্য, তাঁর ওভারহেড স্ম্যাশ, নিখুঁত ড্রপ শট, নেট প্লে, এই সব দেখে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম, নন্দু নাটেকারের মত দুর্দ্ধর্ষ খেলোয়াড়ও ওনার কাছে বেশ বিপর্য্যস্ত হয়েছিলেন সেদিন।

ভাই রমেন ঘোষের সাথে ডাবলস খেলে দীপুদা’ ১৯৬৩-৭০ এই সময়ের মধ্যে প্রতি বছর জাতীয় ফাইনালে ওঠেন, এবং পাঁচ বার ডাবলস্‌ চ্যাম্পিয়ন হন্‌। এটা বোধ হয় একটা জাতীয় রেকর্ড।

দেশের হয়ে Thomas Cup এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও দীপুদা’ তাঁর খেলোয়াড় জীবনে অনেক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, দেশের জন্যে তাঁর এই অবদানের জন্যে ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে অর্জ্জুন পুরস্কার প্রদান করেন।

গত বছর ২০২২ সালে দীপুদা’ আমাদের লিখলেন তিনি আর বৌদি সিঙ্গাপুর থেকে পূজোয় মাস খানেকের জন্যে কলকাতা আসছেন। অনেক বছর পরে এখানে আসা, অনেক কাজ, অনেকের সাথে দেখাশোনা, এন্টালীর ফ্ল্যাটটা ময়লা হয়ে পড়ে আছে ওটা পরিস্কার করতে হবে, এই সব – কিন্তু তার মধ্যে সময় করে একদিন দেখা করা গেলে তাঁদের খুব ভাল লাগবে।

সুভদ্রাদের হাওড়ার রামরাজাতলার বাড়ীতে দুর্গা পূজো হয়। সপ্তমীর দিন সেখানে দুপুরে সব জ্ঞাতিদের নিমন্ত্রণ থাকে, আমি দীপুদা’ কে সেদিন সেখানে বাড়ীর পূজোতে আসতে অনুরোধ করলাম, এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলেন। আমি তাঁর কাছে অচেনা মানুষ, আমার শ্বশুরবাড়ীতে অত লোক সেদিন আসবে, তারাও সবাই তাঁর অচেনা, কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো দীপুদার সে ব্যাপারে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।বরং বাড়ীর পূজো কাছ থেকে দেখার সু্যোগ করে দেবার জন্যে তিনি বার বার তাঁর কৃতজ্ঞতা আর আনন্দের কথা আমায় বলে যাচ্ছেন। 

কলকাতায় ওঁরা এসে কিছুদিনের জন্যে উঠলেন গোলপার্কে রামকৃষ্ণ মিশনের গেস্ট হাউসে, আমাদের পূর্ণ দাস রোডের বাড়ী থেকে খুব কাছে। কথা হলো সপ্তমীর দিন সকালে ওঁরা সেখান থেকে চেক আউট করবেন, আমি আমার গাড়ীতে ওদের তুলে সাঁতরাগাছি নিয়ে যাবো, ওঁদের মালপত্র – দুটো স্যুটকেস – থাকবে আমার গাড়ীর বুটে, বিকেল বেলা বাড়ী ফেরার পথে আমরা ওঁদের এন্টালীর ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিয়ে যাবো।        

কথামতো সপ্তমীর সকালে গোলপার্কে সুভদ্রা আর আমি দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদিকে আমাদের গাড়ীতে তুলে নিলাম। প্রথম দর্শনে দীপুদা’কে আরো ছোটখাটো লাগলো, তবে আশির ওপরে বয়েস হলেও সোজা হয়ে হাঁটেন, মুখে একটা স্মিত হাসি, হাত বাড়িয়ে এসে আমার হাত ধরলেন, আমি যেন কতদিনের চেনা।  

হাওড়ায় পৌঁছতে আজকাল সেকেন্ড হাওড়া ব্রীজ আর কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ধরলে আধঘন্টা লাগে, রাস্তায় দীপুদা’ আর বৌদির সাথে আমাদের একটা প্রাথমিক আলাপ হয়ে গেল। দীপুদা’র কাছ থেকে তাঁর ব্যাডমিন্টন খেলার জীবনের অনেক গল্প জানার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু দেখছিলাম তিনি খেলা এবং তাঁর অতীতের খেলোয়াড় জীবন নিয়ে কোন আলোচনাতেই যেতে চান্‌না, একটু হেসে এড়িয়ে যান্‌। আমাদের আলাপ হলো মামুলী আটপৌরে কথা দিয়ে।

কলকাতায় এতবছর পরে এসে ওঁরা দুজনেই খুব উত্তেজিত। শ্যামলী বৌদি নবমীর দিন একটা বাসে করে পুরনো বাড়ীর পূজা পরিক্রমা ট্যুর বুক করেছেন। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী দীপা ভাল ব্যাডমিন্টন খেলতেন, সেই সূত্রে ওঁদের সাথে দীপুদা’ দের অন্তরঙ্গ আলাপ ছিল, সম্প্রতি সৌমিত্র গত হয়েছেন, তাই এবার আর তাঁদের সাথে আগের মত আড্ডা দিতে যাওয়া হবেনা, তবে দীপার সাথে একবার তো দেখা করতে যাবেনই। ভাই রমেন উনি আসাতে তাঁর বাড়ীতে আত্মীয়স্বজনের সাথে একদিন একসাথে কাটাবার আয়োজন করেছেন। এই সব কথা।   

রামজাতলায় সুভদ্রাদের দুর্গাবাড়ীর পূজোর দালানে সেদিন আত্মীয়স্বজন আর জ্ঞাতিদের বেশ ভীড়, তার মধ্যে দীপুদা’ আর বৌদির সহজেই মিশে গেলেন, তাঁদের মধ্যে কোন জড়তা নেই। সুভদ্রার দাদারা দীপুদা’র পরিচয় পেয়ে অনেকেই তাঁকে ঘিরে ধরলেন, তাঁর খেলার প্রশ্ংসায় সবাই পঞ্চমুখ, “আপনি একবার আমাদের বাণী নিকেতন ক্লাবে খেলতে এসেছিলেন, আমরা আপনার খেলা দেখেছি” ইত্যাদি অনেক প্রশস্তি শুনে দীপুদা’র মুখে শুধু সেই স্মিত হাসি, কোন কথা নেই, যেন সেই হাসিটুকু দিয়ে তিনি তাঁদের প্রশংসার জন্যে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।

মনে মনে আমি সেদিনের সেই ক্ষিপ্র তরুণ খেলোয়াড়টির সাথে আজকের দীপুদা’ কে মেলানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলামনা। আজকের দীপুদা’ একজন অন্য মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। তিনি এখন শান্ত ধীর স্থির আর অমায়িক, আদ্যোপান্ত বিনয়ী ও ভদ্রলোক, স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত তাঁর জীবন।

খুব ভক্তিভরে পূজো দেখলেন দু’জনে, পুষ্পাঞ্জলি দিলেন, শান্তিজল মাথায় নিলেন, আর বার বার আমাদের এই বাড়ীর পূজো দেখার সু্যোগ করে দেবার জন্যে ধন্যবাদ জানালেন।

সারা সকাল আমি তাঁদের সঙ্গ দিলাম সেদিন, পূজোর দালানে সুভদ্রার আত্মীয়স্বজনের ভীড়ের মধ্যে এক কোণে চেয়ার টেনে বসে আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। কথায় কথায় জানলাম শ্যামলী বৌদির বাপের বাড়ী হাওড়ায় শিবপুরে সুতরাং হাওড়ার এই সব অঞ্চল তাঁর খুব চেনা। বাড়ীর পূজো দেখার সু্যোগ করে দেবার জন্যে দীপুদা’ বার বার তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন, তাঁর মত এক প্রবাদপ্রতিম দিকপাল খেলোয়াড়ের কাছ থেকে এরকম বিনয়ী আর আন্তরিক ব্যবহার পেয়ে আমি অভিভূত হয়েছিলাম, অবশ্য এটাও ঠিক যে আইসল্যান্ড থেকে পাঠানো  তাঁর ইমেল থেকে তাঁর এই চারিত্রিক বিনয়ের কিছুটা আন্দাজ আমার ছিল।     

ইতিমধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে দেউড়িতে একটু জল কাদা জমেছে, আমরাও একটু পরে বেরোব বলে কাছেই দাঁড়িয়ে আছি, সুভদ্রার এক বৃদ্ধা আত্মীয়া ভাল করে হাঁটতে পারেননা, তাঁকে ধরে ধরে গাড়ীতে তোলা হচ্ছে, দীপুদা’ হঠাৎ দেখি সামনে এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধার জন্যে গাড়ীর দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন। দৃশ্যটা এখনো ভুলতে পারিনি। বৌদি বললেন, “দীপুর এটা একটা স্বভাব, কোথাও কারুর বিপদ দেখলে ও সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে যায়।”

২) দ্বিতীয় অর্জ্জুন – অরুণ ঘোষ  

ষাটের দশকের প্রখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় অরুণ ঘোষ হাওড়ার ব্যাতড়ে থাকেন, দীপুদা’ আর তিনি দু’জনে একসাথে South Eastern Railway তে একসময় কাজ করেছেন, তখন দু’জনের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। দীপুদা’ খুব সঙ্কোচের সাথে আমায় বললেন “অনেকদিন অরুণদা’র সাথে দেখা নেই, এখন বয়েস হয়েছে, শুনেছিলাম ওঁর শরীর ভাল যাচ্ছেনা। এত কাছে যখন এলাম, ফেরার পথে কিছুক্ষণের জন্যে কি একবার ওনার বাড়ীতে গিয়ে দেখা করা যায়?”

“অবশ্যই যায়”, আমি বললাম, “কিন্তু অরুণদা’ কোথায় থাকেন সেটা কি করে জানা যাবে?”

শ্যামলী বৌদি বললেন “ব্যাতড়ে আমার এক মামা থাকে, আমরা সমবয়েসী, আমি ওকে ফোন করেছিলাম, ও অরুণদা’র বাড়ীটা চেনে।” ঠিক হলো খাওয়া দাওয়া শেষ হলে আমরা বেরিয়ে পড়বো, ব্যাতড়ে বৌদি তাঁর মামার সাথে কথা বলে নিলেন, তিনি আমাদের জন্যে পথে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। 

অরুণ ঘোষ ছিলেন বাংলার ফুটবলে এক প্রবাদপ্রতিম স্টপার। ষাটের দশকে কলকাতার ময়দানে কখনো ইস্টবেঙ্গল কখনো মোহনবাগান কখনো বি এন আর এর হয়ে খেলে মাঝমাঠে রাজত্ব করে গেছেন অরুণ।   আমি তাঁকে অনেকবার খেলতে দেখেছি, তাঁর সেই লম্বা চওড়া চেহারা সুঠাম স্বাস্থ্যবান চেহারাটা এখনো চোখের সামনে ভাসে। রক্ষণে তিনি থাকলে তাঁকে ভেদ করে যাওয়া ফরোয়ার্ডদের পক্ষে সহজ কাজ ছিলনা।    

১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিক, ১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমস্‌, ১৯৬৪ সালে মাড়ডেকা এবং AFC Cup এ ইত্যাদি নানা প্রতিযোগিতায় তিনি ভারতীয় দলে থেকে দেশের হয়ে অনেক পদক জিতেছেন। পরে কিছুদিনের জন্যে তিনি ভারতীয় দলের কোচ ও ছিলেন।

তাছাড়া বংলাও তাঁর অধিনায়কত্বে সন্তোষ ট্রফি জিতেছে বেশ কয়েকবার। 

১৯৬৭ সালে অসাধারণ ফুটবলার হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে অর্জুন পুরস্কার প্রদান করেন।    

যাই হোক, শেষ পর্য্যন্ত ব্যাতড়ে গিয়ে বৌদির মামার দেখা পাওয়া গেল, তিনি আমাদের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁকে আমরা গাড়ীতে তুলে নিলাম। দেখলাম বৌদি আর তাঁর মামা নিজেদের মধ্যে তুই তুই করে কথা বলছেন, ওঁরা দু’জন ছেলেবেলার বন্ধু।

সপ্তমীর দুপুর, জায়গাটা নির্জন, কাছাকাছি কোন বারোয়ারী পূজো নেই, তাই এই জায়গাটা ভীড় আর ঢাকের আওয়াজ নেই। একটা গলির ভিতর দু’দিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ী, ঢুকে একটু এগিয়েই একটা   তিন তলা বাড়ীতে দোতলার একটা ফ্ল্যাটে অরুণদা’ থাকেন। বৌদির মামাকে অনুসরণ করে আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরজায় বেল বাজালাম। একটি কমবয়েসী মেয়ে দরজা খুলে দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদিকে চিনতে পেরে আপ্যায়ণ করে আমাদের ভিতরে ডেকে নিলো।

পরে আলাপ হয়ে জেনেছিলাম সে অরুণদা’র বড় মেয়ে। তার মুখের সাথে অরুণদা’র মুখের অদ্ভুত সাদৃশ্য – সে কথা বলতে মেয়েটি হেসে বলেছিল, “হ্যাঁ, জানি, সবাই তাই বলে।”   

দরজা দিয়ে ঢুকেই ছোট একটা বসার ঘর, সেখানে একটা সোফায় দেখি এক ভদ্রলোক লম্বা পা ছড়িয়ে বসে আছেন, তাঁকে দেখে অতীতের অরুণদা’ বলে চেনা যায়, আগের সেই সুস্বাস্থ্য আর নেই, তবু শরীরের কাঠামোটা এখনো মজবুত, দীপুদা’ তাঁকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে গিয়ে “অরুণদা’ কত দিন পরে দেখা হলো”, বলে জড়িয়ে ধরলেন।

আমরা না জানিয়ে হঠাৎ এসেছি, কিন্তু তাতে দরজা খুলে দেওয়া মেয়েটির মুখে কোন বিরূপতা নেই, বরং দীপুদা’ আর বৌদিকে এরকম ভাবে হঠাৎ পেয়ে তাকে বেশ খুসীই মনে হচ্ছে।

পুরনো বন্ধুর সাথে অনেক বছর পরে দেখা হয়ে দীপুদা’ ছেলেমানুষের মত খুসী হয়েছিলেন, তাঁকে দেখেই তা বোঝা যাচ্ছিল, দুই বন্ধু ওঁদের পুরনো জীবনের অনেক ঘটনার স্মৃতিরোমন্থন করলেন। গার্ডেনরীচ থেকে নৌকা করে নদী পার হয়ে দু’জনে হাওড়া আসতেন, সেই গল্পও হলো। অরুণদা’র মেয়ের কাছে যখন তিনি শুনলেন অরুণদা’র জন্ম ১৯৪১ সালে, তিনি খুব অবাক হয়ে কিছুটা অনুশোচনার ভঙ্গীতে বলেছিলেন,“১৯৪১?সে কি? তাহলে তো আমি অরুণদা’র থেকে দুই বছরের বড় হলাম। অরুণদা’, দ্যাখো বয়েসে বড় হয়েও এতগুলো বছর আমি তোমায় দাদা বলে ডেকে এসেছি!”

যে সোফায় অরুণদা’ পা এলিয়ে বসেছিলেন, সেই সোফার পিছনে দেয়ালে টাঙানো তাঁর খেলোয়াড় জীবনের অনেক ছবি মন দিয়ে দেখলাম। তার মধ্যে দেশের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অর্জ্জুন পুরস্কার নেবার ছবিও ছিল। 

আমি ষাটের দশকে কলকাতার ময়দানে অরুণদা’ র খেলা অনেক দেখেছি। চমৎকার সুঠাম স্বাস্থ্য ছিল অরুণদা’র, প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের ঢেউয়ের মত আক্রমণের বিরুদ্ধে শালপ্রাংশুর মতো তিনি ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন, তাঁর ট্যাকলিং, পাসিং, শুটিং এর কথা এখনো পরিস্কার মনে পড়ে।      

নিজের নিজের খেলায় এঁরা দুজনেই যৌবনে অসাধারণ দক্ষতা আর পারদর্শিতার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তার ওপরেও তাঁদের যা ছিল, তা হলো ইস্পাতকঠিন হার না মানা মানসিকতা, জেতার অদম্য ইচ্ছা, পরিশ্রম করার ক্ষমতা, এবং প্রখর আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস। চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে শুধু ভাল খেললেই হয়না, তার সাথে চাই জেতার ক্ষিদে। এই দু’জনের মধ্যে যা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল।  

অরুণদা’র বাড়ী থেকে বেরিয়ে, বৌদির মামা কে কাছেই তাঁর বাড়ীতে নামিয়ে পার্ক সার্কাসের কাছে দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদি কে তাঁদের এণ্টালীর ফ্ল্যাট বাড়ীতে নামিয়ে আমরা বাড়ী ফিরলাম। 

দেশের মধ্যে এক সময়ের শ্রেষ্ঠতম এই দুই খেলোয়াড়ের সান্নিধ্য পেয়ে সেদিন নিজেকে খুব ভাগ্যবান আর ধন্য মনে হয়েছিল। গত বছরের (২০২২) পূজোর সপ্তমীর দিনটা তাই আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে।        

পেনাল্টি মিস্‌

কয়েক বছর আগে  আগে USA র বিরুদ্ধে কোপা সেমিফাইনালে তিরিশ গজ দূর থেকে মেসির ফ্রিকিক এ দুর্দ্ধর্ষ গোল দেখার পর মেসি কে সবাই দেবতা ভেবে আকাশে তুলে নাচছিল।  তার মাত্র কিছুদিন পরে স্প্যানিশ লীগের ম্যাচে বার্সিলোনার হয়ে খেলার সময় পেনাল্টি মিসের পর বেচারার মুখটা দেখে দুঃখই হচ্ছিল। কাল কাগজে তাকে নিয়ে কি লেখা হবে কে জানে।

আকাশ থেকে সোজা মাটিতে। দেবতা থেকে আবার একজন সাধারণ মানুষ?

সালা হুইমসিকাল পাব্লিক!

গত বছর (২০২২) কাতারের বিশ্বকাপে অনেক পেনাল্টি মিস দেখলাম । ফুল টাইমের মধ্যে খেলার মীমাংসা না হলে পেনাল্টি শুটআউটে জয় পরাজয় ঠিক হয়, অনেক সময় কোন টীম ১২০ মিনিট ভাল খেলেও পেনাল্টি মিসের জন্যে হেরে গেলে বেশ খারাপ লাগে। কাতারে আর্জেন্টিনা আর ফ্রান্সের ফাইনালে যা হলো। স্বস্তির কথা সেখানে অবশ্য মেসি বা এমব্যাপে দুজনেই পেনল্টি মিস করেনি।

কিন্তু ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে ইটালী ব্রাজিলের কাছে হারে। ইটালীর নামী ফরোয়ার্ড বাজিও সেবার পেনাল্টি মিস করে। তার পর মাঠে বেচারার দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্নার ছবি এখনো আমার চোখে ভাসে।

দেশের হয়ে খেলার সময়  এই সব নামী দামী খেলোয়াড়দের  মনের ওপরে কি ধরণের expectation এর চাপ থাকে তা আমাদের পক্ষে অনুমান করাও কঠিন।   

সুতরাং পেনাল্টি মিস হলে অবাক হবার তেমন কিছু নেই। হতেই পারে। মেসি রোনাল্ডো এবং আরও অনেক নামকরা খেলোয়াড় বহু বার পেনাল্টি মিস করেছে, ওই ম্যাচটাতে মেসিরও সেটা  প্রথম পেনাল্টি মিস ছিলনা!

২০০৬ সালে জার্মানীর বিশ্বকাপ Quarter Final এ পর্তুগালের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড এর বেকহ্যাম, জেরার্ড আর ল্যাম্পার্ড তিন জনেই পেনাল্টি মিস করে, এবং ইংল্যান্ড হেরে যায়। সেই সময়ে ইংল্যান্ডে Immigrant দের জন্যে Britishness course চালু করা হয়েছিল। যাতে তাদের মধ্যে ব্রিটিশদের মূল্যবোধ চারিত হয় আর তারা ভাল ভাবে ব্রিটিশ সমাজে মিশে যেতে পারে।

তো তার পরের দিন গার্ডিয়ানে একটা কার্টুন বেরিয়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে আলখাল্লা আর পাগড়ী  পরা এক মুখ দাড়িওয়ালা তিন জন লোক এরকম একটা Britishness course এর ক্যাম্প থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছে,তাদের একজন রিপোর্টার জিজ্ঞেস করছেঃWhat did you learn today?

উত্তরে তারা একগাল হেসে  বলছেঃ Today we learnt how to miss penalty kicks…

ইংল্যান্ডের এই পেনাল্টি মিস করে ম্যাচ হারা এখন একটা রসিকতার পর্য্যায়ে চলে গেছে।  

আমার বাবা (প্রাণবন্ধু, বাদল) তিরিশের দশকে কলকাতা ময়দানে ফার্স্ট ডিভিসনে ফুটবল খেলতেন। স্কটিশ চার্চ কলেজের হয়ে এলিয়ট শীল্ডে খেলার সময় তিনি এরিয়ানের দুখীরাম মজুমদারের নজরে পড়েন। দুখীরাম তাঁকে এরিয়ানে ডেকে নেন।

আমার মাসতুতো দাদা (বড়মাসীর ছেলে, রতন দা’) বাবার কাছ থেকে  পাস নিয়ে ময়দানে খেলা দেখতে যেতেন। রতনদা’র কাছে শুনেছি, “উঃ, মেসোমশায়ের দুই পায়ে সে কি দুর্দ্দান্ত  কিক!”

বাবা গল্প করতেন যে তিনি নাকি এমন কর্ণার কিক করতেন যে বল হামেশাই swerve করে সেকেণ্ড পোস্ট দিয়ে গোলে ঢুকে যেত।  Bend it like Beckham এর মত। তখন অবশ্য বেকহ্যাম এর জন্ম হয়নি। কথাটা হওয়া উচিত ছিল Bend it like Bhowmick!

তাই যে কোন খেলায় কর্ণার বা পেনাল্টি অবধারিত বাবাই নিতেন।

একবার কোন এক ম্যাচে বাবা নাকি পেনাল্টি মিস্‌ করেন। বল বারের সামান্য দুই ইঞ্চি ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

পরের দিন স্টেটসম্যান কাগজে সেই ম্যাচ রিপোর্টের হেডলাইন ছিলঃ

BHOWMICK MISSES PENALTY KICK!


পড়লে মনে হবে সেটা যেন পৃথিবীর একটা অন্যতম আশ্চর্য্য ঘটনা~

এই হেডলাইন টা বাবার খুব গর্ব্বের আর আত্মশ্লাঘার কারণ ছিল বলে আমার মনে হয়, কেননা এই গল্পটা তাঁর মুখে আমি অনেকবার শুনেছি। পেনাল্টি মিস করে যে দুঃখ বাবার হয়েছিল, আমার ধারণা স্টেটসম্যান এর মত বড় এবং নামকরা কাগজে বাবার নামে ওই হেডলাইন সেই দুঃখ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।

ছোটবেলার খেলার মাঠের বন্ধুরা

সকালবেলার কেয়াতলা রোড

১) স্বরাজ

 ২০২০ সালের আগস্ট মাস।

কোভিডের প্রকোপ কিছুটা কমেছে।  আমরা দু’টো ভ্যাক্সিন নিয়েছি, মুখে মাস্ক পরে মাঝে মাঝে বাড়ীর বাইরে বেরোই।  বিদেশ ভ্রমণের বাধানিষেধ কমেছে, লন্ডন থেকে পুপু এসেছে আমাদের দেখতে।

আমি  আর পুপু রোজ সকালে বাড়ীর কাছে ঢাকুরিয়া লেকে একটু হেঁটে আসি।

একদিন পুপুর সাথে লেকে হাঁটার পর  কেয়াতলা রোড দিয়ে  বাড়ী ফিরছি।  দক্ষিণ কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালী পাড়া, একদিকে নানা রং এর একতলা দো’তলা বাড়ী, তাদের সামনে এক চিলতে বারান্দা, আর মাঝে মাঝে  বস্তীতে টালির চালের বাড়ী । ওই সকালে রাস্তার ধারে জলের কলের সামনে কিছু মেয়েরা বাসন মাজছে।  কিছু  লোক গামছা পরে ঘটির জল দিয়ে স্নান করছে।  কেউ কেউ নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজছে,  এই সবের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম  সামনে উল্টো দিক থেকে এক ভদ্রলোক আমাদের দিকে হেঁটে আসছেন,  এবং মনে হলো তিনি যেন আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন।  

ইনি কি আমার পরিচিত কেউ?   আমার মতোই হাইট, ভারী চেহারা।  দু’জনেরই মুখে মাস্ক বলে চিনতে পারছিনা।  

আমাদের কাছে এসে ভদ্রলোক একটু হেসে  বললেন “মাস্ক টা একটু খুলবেন প্লীজ?”

এই কোভিডের সময় অপরিচিত কারুর কাছ থেকে এই ধরণের অনুরোধ আসলে একটু অস্বস্তি হয়। আমি অবশ্য ভদ্রতা করে মুখ থেকে মাস্ক টা খুলতেই যাচ্ছিলাম, কেননা মনে  হচ্ছিল ভদ্রলোক আমায় চেনেন।

কিন্তু  পুপু ডাক্তার, সে সোজা বলে দিলো “না বাবা”। ওর মা’র মতোই ও ও বেশ যাকে ইংরেজীতে বলে aggressive…

ভদ্রলোক এবং আমি দুজনেই একটু অপ্রস্তুত।

উনি বললেন,  “মান্টু না?”   

আমি ভাবলাম এই রে, ঠিক যা ভেবেছি। ইনি আমায় চেনেন। একটু বিব্রত হয়ে আমতা আমতা করে বললাম, “হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে মানে আমি তো ঠিক…

ভদ্রলোক বললেন ছোটবেলায় আমরা একসাথে কত খেলাধুলা করেছি। আমার সব মনে আছে, শ্যামল দা’,বাবলু, বাপ্পা, মনা, শঙ্কর, বাবু,  অলক, বিকাশ …

আমি খুব লজ্জা পেয়ে বললাম আপনার নামটা কি?

উনি বললেন, “আবার আপনি কেন? আমি হলাম স্বরাজ।  তুমি আমায় চিনতে পারছোনা? কালীঘাট পার্কে আমরা  কত ফুটবল খেলেছি একসাথে. আমার চেহারাটা পালটে গেছে, তাই তুমি চিনতে পারছোনা, কিন্তু তোমায়  দ্যাখো আমি চিনতে পেরে গেলাম, আমার বেশ গর্ব্ববোধ হচ্ছে,…  ”

স্বরাজ কে আমি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম, ষাট বছর পরে দেখা,সময়টা তো কম নয়।  আর তার ওপরে স্বরাজের চেহারা একেবারেই পালটে গেছে। আগে ছিল ছিপছিপে লম্বা, এখন চেহারাটা বেশ মুশকো হয়েছে।  কিন্তু যেই বললো কালীঘাট পার্কে ফুটবল খেলেছি এক সাথে, অমনি  এক মূহুর্ত্তের মধ্যে ছবির মত ওকে মনে পড়ে গেল। ওরা থাকতো হাজরা রোডে অন্য পাড়ায়। ওদের ক্লাব ছিল উদয়ন সঙ্ঘ, আর আমাদের ক্লাব ছিল মনোহরপুকুর বৈশাখী সঙ্ঘ। আমাদের দুই ক্লাবের ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হতো কালীঘাট পার্কে।

অসাধারণ বল কন্ট্রোল ছিল স্বরাজের।  তাছাড়া ছিল স্পীড আর দুর্দ্ধর্ষ ড্রিবলিং স্কিল।  এখনো মনে আছে একবার আমার মাথার ওপর দিয়ে বল ট্যাপ করে পাশ কাটিয়ে তীরবেগে আমাদের গোলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল সে।

আমিও ফুটবলটা ভালোই খেলতাম। তাই হয়তো স্বরাজের ও আমার কথা এতদিন পরেও মনে আছে।  ছোটবেলার খেলার মাঠের সেই বন্ধুত্ব কি কোন দিনই ভোলা যায়?  

সেই বন্ধুত্ব চিরকালীন।

তারপরে কিছু মামুলী কথাবার্ত্তার পর আমরা বিদায় নিলাম।  কেউই কাউকে ঠিকানা বা ফোন নাম্বার দিলামনা। 

২) কিরণ

কিরণকে কি কারুর মনে আছে? কিরণ সিনহা।

ফুটবলটা বেশ ভাল খেলত। উঁচু ক্লাসে উঠে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল বোধহয়। থাকতো বালীগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে। কোয়ালিটির পাশে একটা ছোট পার্কে ওকে পাড়ার ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলতে দেখেছি মাঝে মাঝে।

আমাদের সেন্ট লরেন্স স্কুলে ছিল বিশাল খেলার মাঠ,  সেই মাঠ ছোট ছোট ভাগ করে লাঞ্চ ব্রেকে আমরা চুটিয়ে ফুটবল খেলতাম। এখনো মনে পড়ে  স্কুলের পিছন দিকে বাঁধাকপির ক্ষেত আর পুকুরের দিকে এক চিলতে মাঠে ক্লাস ফোর ফাইভে খেলতাম আমরা। আর সেই সময় কিরণ ছিল আমাদের স্টার প্লেয়ার। এমনিতে পড়াশোনায় কিরণ তেমন ভাল ছিলনা,  ক্লাসে  মাথা নীচু করে চুপ করেই থাকতো বেশীর ভাগ সময়, খুব লাজুক ছিল কিরণ।

কিন্তু খেলার মাঠে বল পায়ে তার অন্য রূপ।  ফুটবল মাঠে সে একচ্ছত্র সম্রাট।  

বেশ কয়েক বছর আগে একবার বালীগঞ্জ ফাঁড়ির উল্টো দিকে পেট্রোল পাম্পের পাশে The Wardrobe নামে একটা লন্ড্রীতে কাপড় কাচাতে নিয়ে গেছি। ঢুকেই দেখি কাউন্টারে আমাদের কিরণ বসে।

অনেকদিন পর দেখা, কিন্তু আমি চিনলাম সহজেই, চেহারাটা অনেকটা আগের মতোই আছে, বেশ শক্তপোক্ত খেলোয়াড় সুলভ। মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করা, কপালের সামনে একটু পাতলা হয়েছে, বেশ ভারিক্কী হয়েছে কিরণ, দোকান টা ওরই  franchise  নেওয়া বুঝলাম, কেননা চারপাশের কর্ন্মচারীদের সাথে সে বেশ হুকুমের ভঙ্গী তে কথা বলছিল।

কিরণ ও আমায় চিনেছে ঠিক। ছোটবেলার ফুটবল মাঠের বন্ধুদের  সহজে ভোলা যায়না।

“এখনও খেলো নাকি?” কিছুটা লাজুক গলায় কিরণ জিজ্ঞেস করলো আমায়।

“কোথায় আর?” বললাম আমি।

তারপর বেশ কিছু খুচরো কথা হলো।

আমার বিলটা সই করার আগে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে পুরনো বন্ধুকে ২০% ডিসকাউন্ট লিখে দিল কিরণ।

কি মুস্কিল, এসব আবার কেন, বললাম আমি।

তার পরে আর কোনদিন কিরণের দোকানে কাপড় কাচাতে নিয়ে যাইনি।

বন্ধুদের এইরকম ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে ডিসকাউন্ট দিতে গিয়ে ওর দোকানটা শেষে উঠে যাক আর কি?

কি দরকার?

৩) পৃথ্বীশ

পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে যখন স্কুলে পড়ি, তখন কলকাতার দুই ফুটবল ক্লাব  মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল ছিল দুই  প্রবল পরান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বী, আর তাদের সমর্ত্থক দের মধ্যেও ছিল দারুণ রেষারেষি।

স্কুলে আমাদের নিজেদের মধ্যে খেলার জন্যে দুই ফুটবল টীম করার সময় প্রায়ই মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার দের নিয়ে টীম তৈরি  হতো।  আমি ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান কোন দলের সমর্থক ছিলামনা,  কিন্তু আমায় সবসময় ইস্টবেঙ্গলের টীমে খেলতে হতো।  আসলে আমাদের সহপাঠী খেলোয়াড়দের মধ্যে মোহনবাগানের সমর্থক অনেক বেশী থাকতো, তুলনায় ইস্টবেঙ্গলে অনেক কম।  তাই ইস্টবেঙ্গলের টীমে যথেষ্ট প্লেয়ার পাওয়া যেতোনা।  তাই আমায় ইস্টবেঙ্গলের টীমে খেলতে হতো।  সেই সব খেলা অবশ্য এলেবেলে খেলা, তাই কোন একটা দল হলেই হলো।

কিন্তু  ইস্টবেঙ্গলের দলে বাঁধা খেলোয়াড় ছিল পৃথ্বীশ। পৃথ্বীশ  চ্যাটার্জ্জী।

সে ছিল ইস্টবেঙ্গলের পাঁড় সমর্থক। তাকে ইস্টবেঙ্গল কেমন খেলেছে এই প্রশ্ন করা হলে তার তিনটে সম্ভাব্য উত্তর ছিলঃ

১) দারুণ খেলেছে

২) দুর্দ্দান্ত খেলেছে

৩) দুর্দ্ধর্ষ খেলেছে

ইস্টবেঙ্গল কখনো খারাপ খেলেছে, এ কথা সে ভাবতেই পারতোনা।

তো একবার কলকাতা লীগের খেলায় (বোধ হয় ১৯৫৭ কি ১৯৫৮ সালে) এরিয়ান ক্লাবের কাছে ইস্টবেঙ্গল ০-৪ হেরে যায়। পরের দিন স্কুলে আমি পৃথ্বীশ কে বললাম “কী রে, কাল তোদের কী হল?”

পৃথ্বীশ গোমড়া মুখ করে বললো, “অস্বীকার করছি, কাল ইস্টবেঙ্গল ভালো খেলেছে!”

ঢাকুরিয়া লেক