Category Archives: জন্মদিন

ইন্দ্রজিৎ নাম হলো, ইন্দ্রে নাহি জিতে

১) আমার জন্ম    

তিন বছর আগে মা’র প্রথম সন্তান কাশীতে চিকিৎসার গাফিলতিতে মারা যায়। তাই আমার জন্মের সময় বাবা আর কোন রিস্ক নেন্‌নি, তিনি মা’কে কাশীতে দিদিমার কাছে না পাঠিয়ে কলকাতায় আমাদের মনোহরপুকু্রের বাড়ীতে রেখেছিলেন, এবং তখনকার সময়ের একজন নামকরা ডাক্তার ডঃ স্বদেশ বোস মা’কে দেখেছিলেন।    

সেই মনোহরপুকুরের বাড়ীতেই ১৯৪৬ সালে দোলপূর্ণিমার দিন ১৭ই মার্চ (রবিবার) বিকেলে আমি জন্ম নিই।

আমার জন্মের সময় মা’র নিজের শ্বশুর শ্বাশুড়ি ছিলেননা, তাঁরা তখন দুজনেই মারা গেছেন, পাটনা থেকে তাঁর খুড়শ্বাশুড়ী –  বাবাদের কাকীমা, আমাদের পাটনার দিদা – আর মা’র আপন দিদি ভগবতী – সবার ভাগুদি –  এসে ছিলেন মা’র পাশে।

বাবার ডায়েরী লেখার অভ্যেস ছিল, তাঁর একটা ছোট ডায়েরীতে ১৭/৩/৪৬ তারিখের পাতায় আমার জন্ম নিয়ে লেখা ছিল “Khoka born to Saraswati at 3.15pm”!  

আমি নাকি জন্মাবার পরে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদিনি। সেটা ডাক্তার স্বদেশ বোসের কাছে একটা বিপদের কারণ ছিল, কেননা শিশু জন্মাবার পরে না কাঁদলে তার ফুসফুসে বাতাস না যাবার ফলে তার মৃত্যু হবার সম্ভাবনা। তিনি নাকি ক্রমাগত আমায় উলটে ধরে আমার পিছনে অনবরত চাপড় মেরেছিলেন। বেশ কয়েকবার সেই চাপড় খেয়ে শেষ পর্য্যন্ত আমি কেঁদে উঠি। এবং তার পরে আমার কান্না থামেনি, আমি নাকি সারা রাত কেঁদেছিলাম।

কিন্তু আমার কান্না আমার মা’র জন্যে ছিল খুব আনন্দের কারণ। অবশেষে তিনি মা হয়েছেন। সেই মাতৃত্বের আনন্দের সাথে কোন আনন্দেরই বোধহয় কোন তুলনা হয়না। 

স্বদেশ বাবু নাকি সেদিন পরে কোন এক বন্ধুর বাড়ীতে গিয়ে বলেছিলেন, “আজ একটা difficult case ছিল। বাচ্চাটা প্রায় যায় যায় অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু যায়নি, বেঁচে গেছে।” 

আমি এই পৃথিবীতে আমার প্রথম রাতের কান্নার কথা ভাবি মাঝে মাঝে। আমার জীবনের কান্নার কোটা সেদিনই অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে, এটাই যা সুখবর।    

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরে পৃথিবীর বুকে একটা শান্তির বাতাবরণ নেমে আসে। ওই সময় (১৯৪৬-১৯৬৪) সারা পৃথিবীতে জন্মের হার হঠাৎ বেড়ে যায়, শুধু ১৯৪৬ সালেই প্রায় ৭৫ লক্ষ শিশুর জন্ম হয়। যুদ্ধ পরবর্ত্তী এই Population explosion কে baby boom বলা হয়, এবং সেই অনুযায়ী আমাদের এই প্রজন্মের নাম হলো Baby boomers!

এই লেখা লিখবার সময় (২০২১ সালে) আমাদের প্রজন্মের সবার পৃথিবী ছেড়ে যাবার সময় হয়ে এসেছে, আমাদের Baby boomer দের বয়স এখন পঁচাত্তরের কাছাকাছি। কিন্তু একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে প্রজন্ম হিসেবে আমরা আগের প্রজন্মের লোকেদের থেকে বেশী শিক্ষিত, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, কর্ত্তব্যপরায়ণ, দায়িত্বশীল, কর্মঠ আর পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ।

যুদ্ধ পরবর্ত্তী শান্তির পৃথিবীতে যখন জীবনের নানা ক্ষেত্রে একটা বিশাল পরিবর্ত্তনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল, সেই সময় জন্মাবার জন্যে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান বলেই মনে হয়। 

২) The great Calcutta killing – আগস্ট ১৬, ১৯৪৬   

আমার জন্মের আগে থেকেই ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশনের সাথে দুটো রাজনৈতিক দলের – কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ – দেশের স্বাধীনতা এবং দেশভাগ নিয়ে আলোচনা চলছে। মুসলিম লীগ ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমান দের জন্যে আলাদা দেশ চায়। কিন্তু আলোচনায় কোন ফল হচ্ছেনা।

মুসলিম লীগের নেতা মহম্মদ জিন্না সাহেব ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবিত প্ল্যান নাকচ করে ১৬ই আগস্ট Direct Action Day হবে ঘোষনা করলেন।

বাংলায় তখন মুসলীম লীগের সরকার, মুখ্যমন্ত্রী হুসেন শহীদ সুরাবর্দ্দী। ঠিক হলো কলকাতায় মনুমেন্টের পাশে ময়দানে মুসলমানদের বিক্ষোভ সভা হবে।

আবহাওয়া ক্রমশঃ উত্তপ্ত হচ্ছে,  হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হবে ধরে নিয়ে অনেকেই কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমার এক মাস বয়েসে – এপ্রিল ১৯৪৬ – পাটনার দিদা মা আর আমাকে নিয়ে পাটনায় নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। একমাস পরে মে মাসে বাবা এসে আমাদের কলকাতা নিয়ে এলেন, কিন্তু তখন কলকাতার অবস্থা ক্রমশঃ খারাপের দিকে এগোচ্ছে। অনেকেই আর কলকাতায় থাকতে সাহস পাচ্ছেনা।

বাবা তখন আমায় আর মা’কে নিয়ে দিদিমার কাছে কাশীতে রেখে এসেছিলেন।  

তার কিছুদিন পরে ১৬ ই আগস্টে Direct Action day তে মনুমেন্টের ওই বিক্ষোভ সভার পরে সারা শহরে দাঙ্গা আর মারামারি খুনোখুনি শুরু হয়েছিল। পরে শোনা যায় যে মুসলমান গুন্ডারা আগে থেকেই হিন্দুদের মারার জন্যে প্রস্তুত হয়ে এসেছিল।  

প্রথমে মার খেয়ে কিছুদিন পর থেকে হিন্দুরাও নৃশংস ভাবে মুসলমান দের হত্যা করতে শুরু করে।

মাসী (মা’র ভাগুদি’) আর মেসোমশায় তখন থাকতেন মৌলালীর কাছে তাঁদের সার্পেন্টাইন লেনের বাড়ীতে। সেই জায়গাটা মুসলমান পাড়া, তাই বাবা পুলিসের গাড়ী নিয়ে সেখানে গিয়ে তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করে আনেন।

৩) আমার মুখে ভাত আর নামকরণ

দাঙ্গা শেষ হবার পরে বাবা মা’কে আর আমাকে কাশী থেকে কলকাতা নিয়ে এলেন। আমার মুখে ভাত অনুষ্ঠান হলো মনোহরপুকুর রোডের বাড়ীতে। অনেকে এসেছিলেন, বাবার বন্ধুরা – বাণীবাবু, ভাষিবাবু, বীরেনদা’ । তাছাড়া অনেক আত্মীয়স্বজন, পাটনা থেকেও অনেকে।

মামা আমায় ভাত খাইয়েছিলেন।

সেই অনুষ্ঠানে আমার নামকরণ হয়েছিল। সেটা একটা বেশ মজার গল্প।

বাবার ডায়েরীতে এই নিয়ে লেখা আছে~

——————

মান্টুর অন্নপ্রাশনের সময় ওর নাম রাখার কথা হওয়াতে আমার শান্তিনিকেতনের বন্ধু ক্ষিতীশ রায় (বাণী) প্রস্তাব করলো যে লটারী করা হোক্‌।

ছোট ছোট কাগজের টুকরোতে যার যেরকম ইচ্ছে নাম লেখা ঠিক হলো। দু’টো করে নাম প্রত্যেকে লিখবে ঠিক হলো। কাগজগুলো মুড়ে একটা বাটিতে রেখে মান্টুর সামনে রাখা হলো। ছোট ছোট হাতে মান্টু খপ্‌ করে তার মধ্যে থেকে একটা কাগজ তুলে নিলো।

সেটাই অঞ্জুর রাখা নাম – “ইন্দ্রজিৎ”~

অঞ্জু (অঞ্জনা) হল আমার জ্যাঠতুতো দিদি (দিদিভাই) –  তখন তার আট বছর বয়েস।

———————-
মা গল্প করতেন যে সবার নাম লেখা কাগজ যখন বাটিতে রাখা হয়ে গেছে, তখন  দিদিভাই  নাকি ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে “আমিও একটা নাম দেবো” বলে ছুটতে ছুটতে নেমে আসে।

তাই দিদিভাইয়ের দেওয়া কাগজটা বোধ হয় সবচেয়ে পরে আসায় সবচেয়ে ওপরে ছিল। তাই সেটাই আমি তুলে নিই। কিংবা এমনও হতে পারে আমি হয়তো ওই নামটা তুলিনি, কিন্তু মা’র হয়তো ওই নামটাই ভাল লেগেছিল?  সে যাই হোক্‌, ইন্দ্রজিৎ নামটাই আমার সাথে সারা জীবনের মত সেঁটে গেল। আমার অন্য কোন নামের কথা আর ভাবতেই পারিনা।

এই নিয়ে বাবা একটা ছোট্ট কবিতাও লিখেছিলেন।

 ———
নামযশ যত কিছু/ ওঠে লটারীতে/

ইন্দ্রজিৎ হলো নাম/ইন্দ্রে নাহি জিতে/

———

জন্মদিন

ছোটবেলায় জন্মদিন গুলো ছিল নিখাদ আনন্দের দিন।

খুব ভোরে উঠতে হত, মা আর জ্যেঠিমা র সাথে প্রতি বছর জন্মদিনে নিয়ম করে কালীঘাটে মায়ের মন্দির যেতাম।  পথে মহিম হালদার স্ট্রীটে নকুলেশ্বর শিবের মন্দির পড়ত। মা আর জ্যেঠিমার সাথে আমিও শিবলিঙ্গের  মাথায় জল ঢালতাম।

আমার জন্মদিনের সাথে ভোরবেলার কালীঘাটের মন্দির আর সিঁদুর লাগানো প্যাঁড়ার ঠোঙ্গার তাই অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক।

সারাদিন কাটতো গভীর আনন্দে, ওই দিনটা যেন শুধু আমার।

বিকেলে মনোহরপুকুরের বাড়ীতে  অনেকে আত্মীয় স্বজন আসতেন, আমরা ছোটরা সারা বিকেল আর সন্ধ্যা হৈ হৈ করে হুটোপাটি করতাম। এখনকার মত কেক কাটা আর গান গাওয়া অবশ্য তখন হতোনা, বেলুন দিয়ে বাড়ী  সাজানোর প্রথাও তখন বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারে শুরু হয়নি।  কিন্তু খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হত বেশ বড় করে। আর পায়েস তো হতোই।  সাথে লুচি বা পোলাও আর মাংস।

একটু রাত হলে সবাই চলে যাবার পর আমি বসতাম উপহার পাওয়া বই নিয়ে। সে যুগে বই উপহার দেবারই চল ছিল। ছোট বেলা থেকেই আমি ছিলাম বইয়ের পোকা, নতুন বইয়ের মলাট খুলে যে গন্ধ টা পেতাম তার মজাই আলাদা।

জয়ন্ত মাণিক আর বিমল কুমার দের নিয়ে হেমেন্দ্র কুমার রায়ের গোয়েন্দা কাহিনী তো ছিলই, তা ছাড়া কত বিদেশী বই য়ের বাংলা  সংস্করণ, Hunchback of Notre Dame, Count of Monti Christo, Three Musketeers, Last days of Pompei, এবং এই রকম আর ও কত বই তখন জন্মদিনে উপহার পেয়ে গোগ্রাসে গিলেছি। আর একটু বড় হবার পরে  পেতাম শরৎচন্দ্র বঙ্কিম চন্দ্র…

আমার দশ বছরের জন্মদিন আমার মা মনোহরপুকুরের বাড়ীতে খুব বড় করে celebrate করেছিলেন মনে আছে, এই সাথে সেই দিনের দু’টো ছবি। সেদিন আমায় মা ধুতি পাঞ্জাবী পরিয়েছিলেন, আমার একেবারেই ভাল লাগেনি, ধুতি পরে কি সারা ছাতময় ভাই বোন দের সাথে দৌড়াদৌড়ি করা যায়? কিন্তু সেই বয়সে মা’র কথাই শেষ কথা। কি আর করা যাবে? ছবিতে দেখা যাচ্ছে আমার পাঞ্জাবীটা বেশ stylish, মাঝখানে নয়, ডান দিকে বোতাম।

কত দিন হয়ে গেল, তবু সেই দিনটার কিছু স্মৃতি এখনো আমার বেশ মনে থেকে গেছে।

দুপুরে তিন তলায় রান্নাঘরের পাশে মেঝেতে আসন পেতে আমি খেতে বসেছি, আমার থালার চারিদিকে বাটি সাজানো , আর আমার মাস্তুতো দাদা রতন দা আমার সামনে ক্যামেরা নিয়ে  সমানে বলে যাচ্ছে মুখ তোল্‌,  একটু হাস্‌…

কিংবা বিকেলেবেলা ছাদে প্রচুর ভীড়, তার মধ্যে মা আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন রতন আমাদের দু’জনের একটা ছবি তুলে দে তো। ছবিতে দেখছি আমার ভুরু কোঁচকানো, বেশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমায় ছবি তুলতে হচ্ছে, তোলা হয়ে গেলেই মা’র হাত ছাড়িয়ে আমি ছুট মারবো ভাই বোনদের সাথে খেলতে।

সেদিন আমায় কে যেন একটা গ্যাস বেলুন দিয়েছিলো, সেটা আকাশে উড়িয়ে আমি শক্ত করে সুতোটা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় কেউ একজন, বোধহয় ছোটকাকা, আমায় এসে “ মান্টু, একটা মজা দেখবি” বলে আমার হাত থেকে সুতো টা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি অসহায় হয়ে দেখলাম বেলুনটা  ভাসতে ভাসতে আকাশে হারিয়ে গেল।

সেই হারানো বেলুনটার জন্যে সেদিন খুব দুঃখ হয়েছিল।

আমার ছোটবেলার জন্মদিন গুলোও সেই বেলুনটার মতই বহুদিন হারিয়ে গেছে।