Category Archives: পারিবারিক

টয়লেট টা কোনদিকে ভাই?

১) রাণীগঞ্জে আমার প্রথম চাকরী

১৯৬৮ সালে খড়্গপুর থেকে ইঞ্জীনিয়ারিং পাশ করার পরে আমি রাণীগঞ্জে বেঙ্গল পেপার মিলে বছর খানেক কাজ করেছিলাম। সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চাকরী। তখন আমার বাইশ বছর বয়েস।

বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে ১৯৬৫ সালে, তখন আমার খড়গপুরে থার্ড ইয়ার। তাঁর দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে মা’র প্রায় সমস্ত সঞ্চয় নিঃশেষিত। জমি বিক্রী করে প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে ধার করে তিনি সেই খরচের ধাক্কা সামলেছেন। তার ওপরে ছিল আমার কলেজে টিউশন আর হোস্টেলে থাকার খরচ।  মা আমায় এই খরচ নিয়ে কিছু বুঝতে না দিলেও আমাদের আর্থিক অবস্থা যে বেশ শোচনীয় তা বোঝার মত বয়েস আমার হয়েছিল।

তাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে একটা চাকরী পেয়ে উপার্জ্জন শুরু করে মা’র পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর ভার লাঘব করাই আমার তখন প্রধান কাজ। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের পিতৃহীন, বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে – ভাল চাকরী পাবার জন্যে আমার কোন খুঁটির জোর ছিলনা। কেবল ছিল আমার আই আই টি খড়্গপুর থেকে পাওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এর একটা ডিগ্রী।

তার ওপর চাকরী পাবার পক্ষে ১৯৬৮ সালটা খুব একটা অনুকূল ছিলনা। 

১৯৬৬ সাল থেকে দেশের অর্থনীতি ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি সামলাতে টাকার মূল্য কমানো u হলো। এর মধ্যে ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টরা ভোটে জিতে বাংলা কংগ্রেস এর সাথে যুক্তফ্রণ্ট তৈরী করে ক্ষমতায় এসেছে। অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী, জ্যোতি বসু উপ মুখ্যমন্ত্রী।

বড় বড় সব কারখানা তে নানা দাবী দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। এক এক করে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার ওপরে নকশালবাড়ীতে কৃষক আন্দোলন নিয়ে মার্ক্সিস্ট কম্যুনিস্ট পার্টি দুই ভাগ হয়ে গেছে, মার্ক্সসিস্ট লেনিনিস্ট পার্টি নামে একটা নতুন রাজনৈতিক দল গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের পক্ষ নিয়ে চীনের মাও সে তুং এর   সাংষ্কৃতিক বিপ্লবের আদর্শে কৃষিবিপ্লবের ডাক দিয়েছে। তার ওপর ভিয়েতনামের যুদ্ধ চলছে, আমেরিকার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে সবাই সোচ্চার।

কলকাতার রাস্তায় তখন এই ধরণের দেয়াল লিখন দেখা যায়।

“তোমার নাম, আমার নাম, ভিয়েতনাম”। “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান”। “বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।” ইত্যাদি।  সারা দেশে একটা অশান্তি মারামারি খুনোখুনি আর নৈরাজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে ক্রমশঃ।  

যাই হোক, এর মধ্যেই ইন্টারভিউ দিয়ে আমরা দুই ক্লাসমেট রমাপদ ত্রিপাঠী আর  আমি  চাকরী নিয়ে রাণীগঞ্জে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। মাইনে মাত্র তিনশো টাকা ছিল। তার মানে আমরা দুজনেই সেভাবে টাকার কথা ভাবিনি। ওই অশান্ত সময়ে একটা চাকরী পেয়ে কাজ শেখাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে কাজের অভিজ্ঞতাটা দরকার, মাইনে কম হতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতা অমূল্য।     

আমরা দু’জনেই কিছু দিনের মধ্যে চাকরী ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই। সামান্য যা উপার্জ্জন করতাম সেটা বোধহয় নতুন কোন ভালো চাকরী খোঁজার পিছনেই খরচ হতো। তাছাড়া মাইনে থেকে কিছুটা হাত খরচ বাঁচতো, যেটা খড়গপুরে সেভাবে হাতে আসতোনা। 

রাণীগঞ্জের সেই দিন গুলো বেশ ছিল। বয়েস্ও কম ছিল, যতদিন ছিলাম, খুব উপভোগ করেছি।

বেশ ভাল একটা ফ্ল্যাট পেয়েছিলাম, চার বেলা মেসে খাবারের ব্যবস্থাও ছিল।  মিলের পাশেই দামোদর নদ, গরমে হাঁটু জল, নদীর ওপারে বাঁকুড়া জেলা, সেখান থেকে জলের মধ্যে দল বেঁধে হেঁটে শ্রমিকেরা কাজে আসে, বিকেলে বাড়ী যায়, সে এক সুন্দর দৃশ্য।

বেশ কিছু সমবয়েসী বন্ধূও জুটে গেছে, স্থানীয় ক্লাবে গিয়ে টেবিল টেনিস খেলি, ফুটবলও পেটাই মাঝে মাঝে। নদীর ধারে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে সেখানে ঘুরে ঘুরে বেলুন ফাটাই, জিলিপি খাই। ক্লাবের লনে টেনিস খেলি। অনেকে মিলে উইকেন্ডে রাণীগঞ্জ শহরে গিয়ে সিনেমা দেখি, আসানসোলে গিয়ে রেস্টুরেন্টে বিয়ার খাই। পূজোর পর দুর্গাপুরে জলসা শুনতে গিয়েছিলাম এক দিন বাসের মাথায় চড়ে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনবো বলে। তাছাড়া ছিল কাছের গ্রামে যাত্রাপালা, আমার সেই প্রথম যাত্রা দেখা।

মামা মামীমা থাকতেন আসানসোলে, কোর্ট রোডে মামার বিশাল বাংলো। সেখানে  সুযোগ পেলেই চলে যেতাম। মামাতো মাসতুতো ভাই বোনদের সাথে খুব হুটোপাটি হতো। আম গাছে চড়তাম, তাছাড়া ছিল বারান্দায় বসে ক্যারম বা ব্যাডমিন্টন খেলা।

সব মিলিয়ে বেশ ছিল সেই রাণীগঞ্জের দিনগুলো আমার জন্যে।    

নোপুর গ্রাম

বেঙ্গল পেপার মিলে আমি কাজ শুরু করলাম ওয়ার্কশপে, সেখানে মিলের নানা মেশিন যেমন পাম্প ইত্যাদি বিকল হইয়ে গেলে সারানোর জন্যে আসে। সেখানে লেদ মিলিং প্লেনিং ইত্যাদি নানা মেশিন,  এবং বেশ কিছু ফিটার আর মেশিনিস্ট কাজ করে, এরা সবাই কাছাকাছি গ্রামের ছেলে। রমাপদ কজ পেলো পাওয়ার প্ল্যাণ্টে, তার কাজ টার্ব্বাইন নিয়ে।

আমাদের ওয়ার্কশপের ম্যানেজার চৌধুরী সাহেব বেশ মাইডিয়ার লোক। আর যারা সেখানে কাজ করে তাদের কাছ থেকে কত নতুন কিছু জানা যায়, যা আমি কলেজে শিখিনি।  তাদের অনেকের সাথেই কয়েক মাসের মধ্যেই আমার বেশ ভাব হয়ে গেল।  চৌধুরী সাহেবের ভাই মহাদেব চৌধুরী একজন সিনিয়র ফিটার, বয়স্ক এবং কাজের লোক, স্বাস্থ্যবান বলিষ্ঠ সুঠাম শরীর, ফর্সা এক মাথা কালো চুল, চুপচাপ, অমায়িক, সবসময় তাঁর মুখে হাসি। কিন্তু ইদানীং তাঁর শরীর খারাপ হয়েছে, নিয়মিত কাজে আসেননা, ক্রমশঃ বেশ রোগাও হয়ে যাচ্ছেন, চেহারায় একটা ক্লান্তির ভাব, চোখের তলায় কালি। 

ভাই কে নিয়ে চৌধুরী সাহেব বেশ চিন্তিত।  তিনি ভাইয়ের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করছেন।  মুস্কিল হলো চৌধুরী সাহেব থাকেন মিলের কলোনীতে তাঁর ম্যানেজারের বাংলোতে, আর তাঁর ভাই মহাদেব থাকেন কাছেই নোপুর নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে ভালো ডাক্তার বা হাসপাতাল নেই।

বেঙ্গল পেপার মিলের  ওয়ার্কশপে  কার্ত্তিক বারিক নামে একটি ছেলে ছিল, তার কাজ ছিল নানা দরকারী জিনিষ পত্র জোগাড় করার। খুব কাজের ছেলে ছিল কার্ত্তিক, আর খুব ফুর্ত্তিবাজ। আমার আর রমার সাথে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।

তো একদিন কার্ত্তিক রমা আর আমায় নিয়ে একদিন সাইকেলে চেপে ওদের গ্রাম  (নোপুর) দেখাতে নিয়ে গেল। আমাদের মিল টা ছিল  রানীগঞ্জ থেকে কিছুটা দূরে বল্লভপুর নামে একটা জায়গায়, দামোদরের তীরে। সেখান থেকে নোপুর গ্রাম ক্রোশ খানেকের পথ, সাইকেলে যেতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগে।  

আমাদের সাই্কেল ছিলোনা, কার্ত্তিক কোথা থেকে দু’টো সাইকেল জোগাড় করে নিয়ে আসে।  

পড়ন্ত বিকেলে আলপথে সাইকেলে চেপে  যেতে পাশে সবুজ ধানক্ষেত।  কার্ত্তিক আবার একটু কবিতাপ্রেমী, সে রবীন্দ্রনাথের “গগনে গরজে মেঘ” এর সাথে “রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হলো সারা” এই লাইন দুটি নিয়ে তার আপত্তি ব্যক্ত করেছিল। ওর মতে আষাঢ় শ্রাবণে ধান কাটা হয়না। 

রমার সাথে (সেও গ্রামের না হলেও শহরতলী হাওড়ার ছেলে) তার এই নিয়ে সেদিন  তর্ক বেঁধে যায়। সেই তর্কে আমন আর আউষ ধানের কথা উঠে এসেছিল। আমি তো শহরের ছেলে, এ সব ব্যাপারে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত, আমি কোন তর্কের ভিতরে না গিয়ে চারিদিকের অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মন দিচ্ছিলাম।

পরে শুনেছি কার্ত্তিকের কথাই ঠিক। আউষ ধান বর্ষাকালে ধানের চারা পোঁতা (রোপন)হয়, সেই ধান অগ্রহায়নে কাটা হয়। আর আমন ধান পোঁতা হয় শীতকালে, কাটা হয় চৈত্রে। বর্ষাকালে ধান কাটা নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল সোনার তরী কবিতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

নোপুর গ্রাম থেকে মিলে অনেকে কাজ করতে আসে, তাদের অনেকের বাড়ীতে কার্ত্তিক আমাদের নিয়ে গিয়েছিল সেদিন। মাটির বাড়ী, ধুলোর রাস্তা,  পানাপুকুর, নারকেল গাছের সারি, বাংলার  গ্রামের  সেই ধূলিমলিন  চেহারা এখনো বেশ মনে পড়ে। 

মহাদেবের বাড়ীতেও আমরা গিয়েছিলাম সেদিন। অপ্রত্যাশিত ভাবে আমাদের পেয়ে মহাদেব খুব খুসী হয়েছিলেন মনে আছে। সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী মহাদেবকে দেখে সেদিন কিছুটা ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। কিন্তু মহাদেব নিজের শরীর খারাপ নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, “না না আমি তো ঠিক আছি, ও কিছু নয়”, স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন “এরা আমার জন্যে অযথা চিন্তা করে।”

বাইরে বেরিয়ে কার্ত্তিক বেশ চিন্তিত মুখে আমাদের বলেছিল, “বৌদি বলছিলেন মহাদেবদা’ কে একবার বর্দ্ধমান জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। চৌধুরীবাবুর সাথে এই নিয়ে কথা বলতে হবে। উনি নিজের ভাইয়ের চিকিৎসার বন্দোবস্তর ভার নেবেন আমায় বলেছেন।”

তারপরে সেদিন কার্ত্তিক আমাদের তার বাড়ীতে নিয়ে গিয়েছিল। কার্ত্তিকের বাড়ীর সামনে বিশাল মাঠ, আর তাদের নিজেদের অনেক খেজুর গাছ। সেদিন কার্ত্তিক আমাদের জিরেন গাছের খেজুর রস খাইয়েছিল।

“আপনাদের জন্যে তিন দিন জিরেন রেখেছি” বলেছিল কার্ত্তিক।

আমার এখনো মনে আছে যে ঢকঢক করে সেই মিষ্টি রস বেশ কয়েক গেলাস খেয়ে ফেলে আমার বেশ একটু নেশা হয়েছিল, আমি কার্ত্তিক কে কিছুটা জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করেছিলাম “টয়লেট টা কোন দিকে ভাই?”

কার্ত্তিক কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “টয়লেট ? আপনার সামনে দিব্বি ফাঁকা মাঠ পড়ে আছে…যেখানে ইচ্ছে চলে যান…”

  নামটা  যেন কি? ইস্‌ মনে পড়ছেনা, এই বল্‌না…

গত শনিবার ১৪/৬/২৫ আমাদের বাড়ীতে ভাই বোনদের আড্ডা বসেছিল। খোকন, মিঠু,ঝুনকু, ভান্টুলি,ঝুন্টু আর কৌশিকী আর আমরা দু’জন। সব মিলিয়ে আমরা আট জন। যখন কাজ করতাম তখন শনি আর রবিবার ছিল ছুটির দিন। কিন্তু এখন কাজ থেকে অবসর নেবার পরে তো রোজই ছুটি,যে কোন একদিন বসলেই হয়।  তবু কেন জানিনা শনি আর রবিবারের ছুটির আমেজ টা আজও মন থেকে মুছে যায়নি।

এই দুই দিনের মধ্যে শনিবারটা ছুটি হিসেবে রবিবারের থেকেও ভাল কেননা যখন কাজ করতাম তখন রবিবার কেটে গেলে সন্ধ্যা থেকে পরের দিন আবার কাজে যেতে হবে ভেবে মন খারাপ হয়ে থাকতো শনিবার সন্ধ্যায় মন খারাপ হতোনা, পরের দিনটাও তো ছুটি।   কুয়েতে প্রথম গিয়ে শুনি শুক্রবার ওদের জুম্মাবার, সেদিনই ওদের সপ্তাহান্তের ছুটি। রবিবার কাজ করতে যেতে কি যে খারাপ লাগতো। যাক, জীবনের সেই চ্যাপ্টার এখন শেষ।

সবাই বেলা বারোটার মধ্যে কথামতো চলে এলো। আমি আর খোকন সিঙ্গল মল্ট্‌ নিয়ে বসলাম, বাকিরা সবাই পেপসি আর কোক। সুভদ্রা সাথে চিপ্‌স্‌ আর কাঠবাদাম (Almonds) প্লেটে সাজিয়ে এনে দিলো।

আড্ডা ক্রমশঃ জমে উঠলো।

খোকন মিঠুর সাথে আমরা কিছুদিন আগে অমৃতসর ডালহাউসী আর ধর্মশালা ঘুরে এসেছি। আমরা দিল্লী হয়ে গেছি, খোকনরা গেছে কলকাতা থেকে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সাথে অপারেশন সিঁদুরের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, অমৃতসর শহরটা পাকিস্তান বর্ডারের খুব কাছে, কিছুদিন আগে ওখানে বোমা পড়েছে, ব্ল্যাক আউটও ছিল। ওয়াগা আতারী বর্ডার বন্ধ। এই সময়ে ওই জায়গায় যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে?

দিল্লীতে মুকুর সাথে কথা হলো। অমৃতসরের কাছে গুরদাসপুরে মুকু অনেকদিন পোস্টেড ছিল। ওই জায়গাটা তার খুব পরিচিত। তার মত হলো এখন ওইসব জায়গায় না যাওয়াই ভালো। কিন্তু টিকিট কাটা হয়ে গেছে, গাড়ী হোটেল ইত্যাদি সব কিছু বন্দোবস্ত হয়ে গেছে, তা ছাড়া যুদ্ধ তো শেষ। Cease Fire declare করা হয়েছে,এখন পিছিয়ে আসা মুস্কিল।

আমার কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে মুকু খোকন কে ফোন করেছিল। খোকন আমাদের সেই ফোন কল টা অভিনয় করে দেখালো। সে বেশ ভাল অভিনয় করে। তার গলার modulation ও দারুণ, কানের কাছে হাত রেখে অনেকটা যেন টেলিফোনে কথা বলছে সেই ভাবে মুকুর গলাটা যথাসম্ভব গম্ভীর আর ভারী (মুকু দা’ কথা বলে কর্ণেল সাহেবের মতো বেশ আদেশের ভঙ্গীতে) করে আর নিজের গলাটা কিছুটা নরম আর মিনমিনে করে সে তাদের কথোপকথন হুবহু বলে গেল।    

মুকুঃ হ্যালো, খোকন?

খোকনঃ মুকুদা’, বলো?

মুকুঃ মান্টুর কাছে শুনলাম তোরা নাকি অমৃতসর যাচ্ছিস?

খোকন (আমতা আমতা করে) – হ্যাঁ, সেরকমই তো ঠিক আছে।

মুকুঃ না না এখন যাস, না। আমি মান্টুকেও বলেছি।

খোকনের স্টকে মুকুর সাথে এইরকম অনেক টেলিফোন কথোপকথন রয়েছে।  খোকন সেই গুলো ও আমাদের শোনালো।

প্রথম টা জন্মদিন নিয়েঃ

মুকুঃ হ্যালো, খোকন?

খোকনঃ মুকুদা’ , বলো?

মুকুঃ  Happy birthday!

খোকন (আমতা আমতা করে) – আজ তো আমার জন্মদিন নয়?

মুকুঃ (খুব অবাক হয়ে) সে কি? তাহলে আজ কা’র জন্মদিন?

আর এটা হলো বাড়ীর ঠিকানা নিয়েঃ

মুকুঃ হ্যালো, খোকন?

খোকনঃ মুকুদা’ আমি দিল্লী এসেছি। তোমার সাথে দেখা করতে আসবো।

মুকুঃ  চলে আয়!

খোকন (আমতা আমতা করে) –  তোমার বাড়ীর ঠিকানা টা দেবে?

মুকুঃ ঠিকানা? দাঁড়া দিচ্ছি।

বেশ কিছুক্ষণ পর~

মুকুঃ খোকন, খুঁজে পাচ্ছিনা রে।

খোকন – কি খুঁজে পাচ্ছোনা?

মুকুঃ আমার চশমাটা! কোথায় যে রাখলাম!

এই গল্পটা শুনে ভান্টুলী অবাক হয়ে বললো মুকুদা’  U 18 এর ঠিকানা  ভুলে গেছে? আমার তো এখনো U 18 এর ফোন নাম্বারও মনে আছে।

ন’কাকা কাকীমা অনেক দিন দিল্লীতে জ্যেঠুর বাড়ীতে গ্যারেজের ওপরে একটা ঘর নিয়ে থাকতেন। ভান্টূলি বললো রাস্তার উল্টোদিকে বিপুমামার বাড়ী ছিল V 16  Green Park Extension । বিপুমামা  মুম্বাই তে  ফিল্ম  প্রোডিউসার ছিলেন, মাঝে মাঝে ওনার বাড়ীতে  বলিউডের ফিল্ম স্টার রা এসে থাকতো।  ওই বাড়ীতে ফোন ছিলনা, ফোন করার দরকার পড়লে তাদের বলা ছিল U 18 এ গিয়ে ফোন করতে।

একবার নাকি বিখ্যাত ফিল্মস্টার জিতেন্দ্র ফোন করতে এসেছিলেন। জ্যেঠু  তখন বাড়ীতে খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে মুগুর ভাঁজছেন। বাড়ীতে ছিল শিখা তার তখনো বিয়ে হয়নি, সে তো সামনা সামনি জিতেন্দ্র কে দেখে কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা। জিতেন্দ্র যখন বললো আমি কি একটা ফোন করতে পারি, শিখা ছূটে নাকি জ্যেঠুকে বলেছিল বাবা বাবা জিতেন্দ্র এসেছে ফোন করতে…

জ্যেঠু নাকি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন জিতেন্দ্রটা আবার কে?

শিখা নাকি জ্যেঠুকে এক ধমক  দিয়ে  বলেছিল,তুমি জিতেন্দ্রর নাম শোনোনি? আশ্চর্য্য! যাও তাড়াতাড়ি পাজামা পাঞ্জাবি পরে এসো।

সেখান থেকে জিতেন্দ্র  কে নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হয়ে গেল। জিতেন্দ্রর প্রথম ছবিটা যেন কি? কারুর ঠিক মনে পড়ছেনা।

সুভদ্রা বললো জীনে কি রাহ!

কৌশিকীর পুরনো ছবি তে বেশ ভাল ফান্ডা – সে বললো  না না, ওর প্রথম ছবি হলো ফর্জ্‌।

আজকাল আমাদের কিছু মনে থাকেনা, স্মৃতি ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, এখন আমাদের গুগলই ভরসা। ঝুনকু ফোন খুলে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখে বললো, হ্যাঁ ফর্জ ই ওর প্রথম ছবি।

সুভদ্রার ও হিন্দী সিনেমার ফাণ্ডা বেশ ভাল। সে বললো ইস্‌, ফর্জের গান গুলো কি দারুণ, – মস্ত বাহারো কা ম্যায় হুঁ আশিক – আহা – ঝুন্টু তোর মনে আছে আমরা কিরকম হিন্দী ছবি দেখেছি এক সময়। তুই টিকিট কেটে আনতি।

সুভদ্রা এখনো হিন্দী গান বেশ ভালই গায়, সে দুই হাত ছড়িয়ে নাচের ভঙ্গীতে গেয়ে উঠলোঃ সারা জাঁহা হ্যায় মেরে লিয়ে ~

আমাদের সকলের যে বয়েস হচ্ছে, তা এখন আমাদের কথাবার্ত্তা থেকেই  বোঝা যায়। কিছুদিন আগেও আমাদের এই আড্ডায় খুব হাসি ঠাট্টা হতো, আমরা বেড়াতে যাবার কথা বলতাম। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনীরা আমাদের আলোচনায় আসতো। এবার দেখলাম  আমরা বেশীর ভাগ সময়ে কথা বলছি আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের জীবনে ক্রমশঃ একটা ছায়া নেমে আসছে। ভাই বোনেরা অনেকেই বিদায় নিয়েছে, আমরা যারা আছি, তারাও একটা বাধ্যতামূলক একা হয়ে যাওয়া আর পরাধীনতার দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধছে, আমরা হয়তো জানিওনা। আমরা কেউ কেউ যারা কানে কম শুনছি তাদের সাথে বেশ জোরে বা কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। খোকন বললো সে কিছুদিন আগে স্নেহদিয়া নামে রাজারহাটে একটা Old age home এ গিয়ে কথা বলে খোঁজখবর করে এসেছে।

এই নিয়ে কিছুদিন আগে প্রচেত গুপ্ত রবিবাসরীয় আনন্দবাজারে একটা প্রবন্ধ লিখেছেন, তার নাম “এ বড় সুখের সময় নয়!”

সব চেয়ে বেশী যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হল আমাদের স্মৃতিশক্তি খুব দুর্ব্বল হয়ে যাচ্ছে। Dementia বা Alzheimers এখনও হয়নি কারুরই, কিন্তু কোন জায়গা বা কোন সিনেমা বা কারুর নাম  বলতে গেলে কোথাও আটকে যাই, প্রানপণ চেষ্টা করেও কোন নাম  কিছুতেই মনে করতে পারিনা। মাথার ভিতরে memory cell গুলো কোন অদৃশ্য পোকা কুরে কুরে খেয়ে চলেছে।

বিশেষ করে নাম ভুলে যাওয়া টাই সব চেয়ে বেশী। ঝুন্টু বললো ও নাকি Proper noun মনে রাখতে পারেনা। 

বহুদিন আগে, তখন কুয়েতে উইকেন্ডে বন্ধুদের বাড়ীতে আড্ডা বসত। সেই রকম কোন এক আড্ডায় একবার আমাদের এক বন্ধু সিদ্ধার্থ সাহেব বিবি গোলাম সিনেমাটার নাম কিছুতেই মনে করতে পারছিলোনা। তার সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটা এখনো মনে পড়ে। যাতে আমাদের কারুর মনে পড়ে সেই জন্যে আমাদের নানা clue দিয়ে যাচ্ছিল।   আরে বিমল মিত্রের লেখা বিখ্যাত  উপন্যাস।  আরে সেই যে এক জমিদারের সুন্দরী বৌ সুমিত্রা দেবী একা একা মদ খেতে শুরু করলো! আরে উত্তম কুমার ও ছিলো একটা ছোট রোলে! মনে পড়ছেনা?   

আমি লেখালেখি করি। লিখতে গিয়ে প্রায়ই কোন একটা বিশেষ শব্দ ব্যবহার করতে চাই, সেই শব্দটা আমার জানা, কিন্তু কিছুতেই সেই শব্দটা মনে পড়েনা।  মাথার ভিতরে কোন এক অতল অন্ধকার জায়গায় সে লুকিয়ে থাকে, সেখান থেকে তাকে অনেক চেষ্টা করেও বের করে আনতে পারিনা। গভীর জলের তলায় যেন ডুবে থাকা মণি মুক্তোর মতই লাগে তাদের, ডুবুরী লাগিয়েও যাদের খুঁজে পাওয়া সোজা কাজ নয়। তখন খুব অসহায় লাগে।

আমি ঝুন্টু কে বললাম আমার তো Common noun ও মনে আসেনা রে।

শরীর আমাদের এই সব ছোট ছোট সাবধানবাণী শোনাচ্ছে – যাকে বলে early signal – বিদায়ের সময় আগত ভাই সব! প্রস্তুতি শুরু করো।

ঝুন্টু কৌশিকী কে বললো, “আমরা মান্টুদা’ কে আজ কি একটা ্জিজ্ঞেস করবো ভেবেছিলাম না?” কৌশিকী বলল, “সত্যি, একদম মনে পড়ছেনা।“

আরো অনেক কিছুই এরকম মনে থাকেনা।

যাই হোক, জিতেন্দ্র থেকে আমরা চলে গেলেম নায়িকাদের দিকে। ফর্জে জিতেন্দ্রর নায়িকা কে ছিল? কারুর মনে নেই। সাধনা, নূতন, রেহানা সুলতানা?

আমাদের গুগল বিশেষজ্ঞ ঝুনকু আবার ভুরু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ববিতা”…

ববিতা নামে যে একজন নায়িকা ছিল তা আমরা ভুলেই গেছি।

আমি বললাম ওফ, সেই সময়ের সিনেমায় নায়ক আর নায়িকারা কি নাচানাচি আর ছোটাছুটিই না করত, মাঠে ঘাটে ,রাস্তা ঘাটে পাহাড়ে গাছের মধ্যে যেখানে হোক, ধেই ধেই করে নেচে প্রেম নিবেদন।

তারাপদদা’র কবিতায় একটা লাইন ছিল~

ভালবাসাবাসি ছাড়া আর কোন কাজ নেই সোমত্থ যুবক যুবতীর।

আমাদের কমবয়েসে শাম্মী কাপুর আর  জিতেন্দ্র এই দু’জন ছিল নাচানাচি তে ওস্তাদ।

কে বেশী সুন্দরী ছিল,নূতন না সাধনা?

এই নিয়ে বেশ কিছু মতভেদ দেখা  গেল। সাধনা কে নিয়ে আমি আমার জীবনের একটা গল্প বললাম।

মার্চ্চ, ১৯৬৩। হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার প্রথম দিন। বাবা একটা গাড়ী বলেছেন আমায় পরীক্ষার সেন্টারে নামিয়ে দেবে। আমি মনোহরপুকুরের বাড়ীর  ছোট বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ীটা আসতে এত দেরী করছে কেন? গত তিন মাস খুব খেটেছি, কিন্তু এখন যেন কিছুই মনে পড়ছেনা, বেশ নার্ভাস লাগছে, ভয়ে বুক দুরদুর করছে।  কি প্রশ্ন আসতে পারে তাই নিয়ে ভেবে যাচ্ছি।

হঠাৎ দেখি রাস্তা দিয়ে একদল ছেলে যাচ্ছে, তারা নিজেদের মধ্যে বেশ চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে  শুনে বুঝলাম তারাও হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে, কাছেই কোন স্কুলে তাদের সীট পড়েছে। তাদের সকলেরি হাসি মুখ, চিন্তার লেশমাত্র আছে বলে মনে হলোনা। একজন শুনলাম বলছে “saলা, আমি তো saধনার মুখ টা মনে করে যা খুসী লিখে আসবো মাইরী।“

সাধনা খুব একটা তেমন সুন্দরী না হলেও তখন খুব জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন। কিন্তু সুভদ্রার ভাল লাগতো নূতন কে।

সেই রাজকাপুর আর নূতনের সিনেমাটা যেন কি? দারুন সব গান ছিল মুকেশ আর লতার…

আমি বললাম “আনাড়ী?”

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলে সুভদ্রা গেয়ে উঠলো , “ও চাঁদ খিলা,ও তারে হসে, ও রাত অজব মতওয়ারী হ্যায় – সমঝনে ওয়ালে সমঝ গয়ে হ্যায় – না সমঝে ও আনাড়ী হ্যায়”। হিন্দী গানে সুভদ্রা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী যাকে বলে second to none..

এই সব গল্প হতে হতে বেলা দু’টো বেজে গেছে , এবার লাঞ্চ। 

আজকের মেনু হলো খাঁটি বাড়ীর খাবার।  ভাত, ডাল, লাউচিংড়ী, ধোকার ডালনা,  পার্শে মাছ ভাজা,  রুই মাছের ঝোল, কাঁচা আমের চাটনি।  শেষপাতে  মিষ্টি, কৌশিকী এনেছে লাল দই, আর মিঠু এনেছে রাজভোগ আর হিমসাগর আম।

খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে আবার আড্ডা, সেই আড্ডায় এলো অনেক পুরনো দিনের মনোহরপকুরের বাড়ীর পারিবারিক স্মৃতি। আমাদের পিতামহ ব্রজবন্ধু ভৌমিকের লেখা তাঁর বাবা দীনবন্ধু ভৌমিকের সংক্ষিপ্ত জীবনী “পিতৃতর্পন” নিয়ে আলোচনা হলো। আমি বললাম আমাদের ভৌমিক পরিবারের ইতিহাস এবং বংশ তালিকা নিয়ে আমার একটা বই লেখার পরিকল্পনার কথা। সকলে খুব উৎসাহ দিলো আমায়। কিন্তু শুধু মুখের উৎসাহ দিলে তো হবেনা। আমায় তথ্য দিতে হবে। আমি এটা খসড়া করে সবাইকে পাঠাবো বললাম, কোন তথ্য না থাকলে বা তাতে কোন ভুলচুক হলে যেন সবাই যার যার মত করে সেগুলো আমায় সংশোধন করে দেয়।

এদিকে কলকাতায় খুব বাঁদরের উৎপাত শুরু হয়েছে। অনেক জায়গাতেই খবর পাচ্ছি কলকাতায় বাঁদরদের উপদ্রব বাড়ছে। ঝুনকু বললো ওদের পাটুলীর বাড়ীতে নাকি একটা বাঁদর ছানা এসে বাড়ীর ভিতর থেকে কিছু খাবার নিয়ে ছাদে গিয়ে বসে খাচ্ছিল। খবর পেয়ে ঝুনকু নাকি ছাদে গিয়ে বাঁদর ছানা টাকে বাংলায় তুমুল বকেছে। “আর এক বার যদি এরকম বাঁদরামি করিস  তাহলে ঠাসঠাস করে দুই গালে দুই চড় খাবি।“

ঝুন্টু বললো কি আশ্চর্য্য, বাঁদররা তো বাঁদরামি ই করবে।

ঝুনকু বললো না রে, আমার বকুনী খেয়ে বাঁদরবাচ্চা টা ঠিক মানুষের বাচ্চার মত ভয় পেয়ে মুখ লুকিয়ে ফেললো।

খোকন বললো সাবধান ওদের বেশী কাছে যাস্‌না। বাচ্চাটার মা এসে “আমার ছেলে কে কেন বকছো বলে তোকেই দুটো ঠাস ঠাস করে কষিয়ে দুটো চড় মেরে দেবে।‘  

বাঁদর দের নিয়ে একটা বিখ্যাত জোক আছে, সেটা অনেকেই জানে, কিন্তু তা সত্ত্বেও বার বার শুনেও সবাই হো হো করে হাসে।  যেন এই প্রথম শুনলো।

———–

চিড়িয়াখানায় খাঁচার ভিতর থেকে একটি বাঁদর এক ভদ্রলোকের চশমা কেড়ে নেয়।

কি করে এটা সম্ভব হলো?

আসলে হয়েছে কি, খাঁচার সামনে একটা নোটিস টাঙ্গানো ছিল। ভদ্রলোক কৌতূহলী হয়ে খাঁচার খুব কাছে গিয়ে ঝুঁকে নোটিসটা পড়তে গিয়েছিলেন, তাতেই এই বিপত্তি।

নোটিসে লেখা ছিল “সাবধান!! বাঁদরেরা চশমা কাড়িয়া লয়!”

এই গল্পটা শুনে একটি মেয়ে নাকি একটুও না হেসে বলেছিল “সত্যি বাঁদরগুলো যা অসভ্য!”

———–

এবার ও খুব একচোট হাসাহাসি হলো।

বিকেলে কফির সাথে সুভদ্রার তৈরী Banana ব্রেড।

দিনটা বেশ কাটলো।

মুকু আর সোনুর সাথে দিল্লীতে কিছুক্ষণ

সোমবার, ৩০/৯/২০২৪

সুভদ্রা আর আমি দিল্লীতে এসেছি বুড়ীর কাছে দিন দশেকের জন্যে।

দিল্লীতে এলে মুকুর সাথে একবার দেখা হবেই।  সাধারণতঃ ও আমায় ওদের Army Officers Club এ নিয়ে যায়, সেখানে খানাপিনা আর আড্ডা হয়। এবার আমরা সোনুকেও ডেকে নিলাম।

কথামতো সকালে সোনু চলে এলো আমায় তুলতে। দিল্লীর সব রাস্তাঘাট ওর মোটামুটি চেনা। যদিও এখন অনেকদিন গুরগাঁও তে থাকার জন্যে দিল্লী তার কাছে কিছুটা অপরিচিত, তার একটা প্রধান কারণ হলো দিল্লী শহরটাও এতগুলো বছরে অনেকটাই পালটে গেছে।

আমিও এক সময় দিল্লীতে প্রায়ই আসতাম। ন’কাকা দেরাদুন থেকে দিল্লীতে এসে প্রথমে রামকৃষ্ণপুরম ও পরে নৌরজী নগরে থাকতেন। জ্যেঠুর  U18 গ্রীন পার্ক এক্সটেন্সনের বাড়ীতে ও কতবার গেছি। তখন বাসে স্কুটারে বা ভটভটিয়াতে সফদরজং হাসপাতালের পাশে  ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে  নেমে ইউসুফসরাই এর গলি দিয়ে সোজা চলে যেতাম। এখন ওই সব জায়গা একেবারেই অচেনা মনে হয়। দিল্লী আর আমার চেনা সেই আগের দিল্লী নেই।

বুড়ীরা আগে থাকতো নিজামুদ্দীন ইস্টে, এখন তারা পঞ্চশীল পার্কে চলে এসেছে। S Block এ ওদের বাড়ী। সোনুকে ঠিকানা দিয়ে রেখেছিলাম। পঞ্চশীল পার্কের ওই জায়গাটা অনেকটা খাঁচার মত,সেখানে ঢোকার আর বেরোবার জন্যে আবার তিনটে গেট। এক নম্বর গেট মাসের ১-১০ তারিখ খোলা, দুই নম্বর গেট খোলা মাসের ১১-২০ তারিখ, আর ২১ থেকে ৩০ তারিখ তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢোকা বেরোনো। সেদিন ছিল ৩০ তারিখ, তাই তিন নম্বর গেটের এই মাসে সেটাই শেষ দিন।

খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কমনে আসে যায়…

সোনুর আসতে একটু দেরী হলো। সে বললো আমি তো পঞ্চশীল পার্কের বি ব্লক দিয়ে ঢুকলাম, জানি সোজা রাস্তা। ওমা, কিছুদূর গিয়ে দেখি গেট বন্ধ তালা ঝুলছে। কি আর করি আবার বেরিয়ে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হলো।

খাঁচা থেকে বেরোতে গিয়ে আবার এক ঝামেলা। গেটে তালা লাগানো।

যারা বাইরে থাকে তারা এসব জানবে কি করে?সোনু বেচারা কে দোষ দেওয়া যায়না।

এই তারিখ নিয়ে একটা মজার গল্প আছে।

——————–

এক ভদ্রলোক বর্দ্ধমান থেকে ট্রেণে ব্যান্ডেল যাচ্ছেন, সেখন থেকে তিনি কর্ড লাইনের লোকাল ধরবেন, সেটা ছাড়ে বেলা দুটোয়। তাঁর হাতে ঘড়ি নেই, সহযাত্রী এক ভদ্রলোকের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি দেখছেন দুটো প্রায় বাজে, তার মানে ব্যাণ্ডেল এর ওই ট্রেণ তাঁর মিস হয়ে যাবে। মরিয়া হয়ে তিনি সেই সহযাত্রীকে প্রশ্ন করলেন, “আপনার ঘড়িতে ক’টা বাজে দাদা? আমার একটা দুটোর ট্রেণ ধরতে হবে ব্যান্ডেল থেকে…”

তিনি উত্তরে জিজ্ঞেস করলেন আজ কত তারিখ?

তারিখ? ভদ্রলোক তো অবাক! সময়ের সাথে তারিখের কি সম্পর্ক?

“আজ তো কুড়ি তারিখ” তিনি বললেন।

“আমার ঘড়িটা দিনে দুই মিনিট করে ফাস্ট হয়ে যায় বুঝলেন, আমি মাসে একবার করে ঠিক করে নিই। আজ যদি কুড়ি তারিখ হয়, তার মানে আমার ঘড়ি এখন চল্লিশ মিনিট ফাস্ট, তার মানে দু’টো বাজতে এখনো অনেক দেরী। ব্যাণ্ডেলে ট্রেণ আপনি পেয়ে যাবেন চিন্তা নেই।“

তাই শুনে ভদ্রলোক একটা স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেছিলেন।

—————–

যাই হোক অনেক দিন পরে সোনুর সাথে দেখা, আমরা গাড়ীতেই যেতে যেতে গল্প শুরু করে দিলাম। সম্প্রতি তনুজ আর সুদীপ্তার ছেলে হয়েছে, পাটনার দিকে আমাদের বংশের পঞ্চম প্রজন্মের প্রথম সন্তান। পাটনার দাদু  জগদবন্ধুকে প্রথম প্রজন্ম ধরলে সোনাকাকা দ্বিতীয়, সোনু তৃতীয়, অনুজ হলো চতুর্থ প্রজন্ম।

আমাদের বাবা কাকারা যৌথ পরিবারে এক সাথে বড় হয়েছিলেন, আমাদের ভাই বোনেরাও মোটামুটি তাই। সেই জন্যে আমাদের মধ্যে এখনো যথেষ্ট আলাপ পরিচয় বন্ধুত্ব আর যোগাযোগ আছে, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেটা আশা করা যায়না।  এই নবজাতক সোনুর নাতি যখন বড় হবে তখন আমাদের প্রজন্মের কেউ থাকবোনা, এবং আমাদের এখনকার পারিবারিক সম্পর্কগুলোও অনেকটা আলগা হয়ে আসবে। আবার নানা নতুন সম্পর্কের সূচনা হবে।

সেটাই স্বাভাবিক।

সোনু বললো সুদীপ্তার মা এখন কিছুদিন ওদের কাছে আছেন, বাচ্চার দেখাশোনা করার জন্যে। বাচ্চার এখন এক মাস বয়েস। সোনু ফোনে ছবি দেখালো, খুব সুন্দর দেখতে হয়েছে তাকে।

এই সব গল্প করতে করতে সোনু বেশ কয়েকবার ভুল রাস্তা ধরেছে।  আর বার বার কপাল চাপড়ে বলছে, “আরে আমি কি করছি? এর পরের ডান দিকের এক্সিট টা নিতে হতো। আবার কিছুটা ঘুরতে হবে।“

সোনু আবার ওদের বাঙালী পূজোর কমিটির এক চাঁই। এবছর পূজো তে ওরা পরশুরামের “ভূষন্ডির মাঠে” নাটক করবে। বিখ্যাত মজার নাটক। তাতে সোনুর একটা ছোট রোল আছে। পুরোদমে নাটকের রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে।

এ ছাড়া পূজোর নানা কাজ। বেশ কিছু ফোন এলো গাড়ীতেই। কেউ জানতে চাইছে দাদা পুলিশের ক্লিয়ারেনসটা কবে পাওয়া যাবে, কেউ বলছে দাদা নাটকের প্রপ গুলো কে দেখছে,? সোনু গাড়ী চালাতে চালাতে এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আবার ভুল করে এক জায়গায় বাঁ দিকে না গিয়ে সোজা চলে গেল। “ও হো, এটা আমি কি করলাম”, কপাল চাপড়ে বললো সোনু, “দ্যাখো বাঁ দিকে না ঢুকে সোজা ইউসুফসরাই চলে এসেছি।“

আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম এটা ইয়ুসুফসরাই নাকি? সেই পুরনো দিনের ইয়ুসুফসরাই বলে চেনাই যাচ্ছেনা। ওই গলির ভিতের একটা হনুমানের মন্দির ছিল না?

যাই হোক, আবার ইউ টার্ণ।

এর মধ্যে দুই বার মুকুর ফোন এসেছে। কি রে তোদের কি হলো?

শেষ পর্য্যন্ত ইউ ১৮এ তো পৌঁছলাম। বাড়ীর পাশে অনেক নতুন বাড়ী উঠেছে, জায়গাটা আর চেনা যায়না। পাশে একটা বড় মাঠ ছিল আগে, সেখানে একটা কবরস্থান ছিল, সেই মাঠের মধ্যে দিয়ে ন’কাকা দের নওরোজী নগরের বাড়ীতে যাবার একটা সর্টকাট ছিল। হাতে সময় থাকলে আমরা হেঁটে চলে যেতাম। “কমল” নামে একটা সিনেমা হল ও ছিল কাছেই। সোনু বলল সেটা আর নেই। ভেঙে শপিং মল করা হয়েছে নাকি।

মুকু বাড়ীর বাইরেই দাঁড়িয়েছিল। ওর গাড়ীতেই বেরোলাম আমরা।

মুকু আমাদের নিয়ে গেল ওদের Dhaulakia Officers’ club এ – রাস্তাটা ওর ভালোই চেনা, কেননা সেখানে সে অরুণা বৌদি আর মনিকাকে নিয়ে প্রায়ই যায়। সাধারণতঃ ওখানে ওরা বিকেলে পুলে সাঁতার কেটে সন্ধ্যায় কিছু খেয়ে বাড়ী ফিরে আসে।

সোনুর তুলনায় দেখলাম মুকু দিল্লীর রাস্তাঘাট অনেক ভাল চেনে। বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখালো তাকে, দুই এক বার আমাদের “দ্যাখ্‌, একটা অন্য রাস্তা দিয়ে তোদের নিয়ে যাচ্ছি” বলে সে দুম্‌ করে একটা no entry দিয়ে একটা মিলিটারী টাউনশিপে ঢুকে পড়লো।

সোনু মুকুকে মাঝে মাঝে “কর্ণেল সাহাব” বলে ডাকে, সে বললো পুলিস আমাদের কর্ণেল সাহাব কে কিছু বলবেনা।

যাই হোক ওই টাউনশিপের মধ্যে দিয়ে আমরা মুকুদের ক্লাবে পিছন দিক দিয়ে একটা এন্ট্রি নিলাম। গেটে যারা পাহারা দিচ্ছিল, তারা সবাই দেখলাম মুকুকে ভালই চেনে। জায়গাটা বেশ সুন্দর, প্রচুর গাছপালা। সোমবার সকাল, ভীড় ও তেমন নেই।

আমরা একটা বার কাম রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে বসলাম। মুকু আমাদের দু’জনের জন্যে বীয়ার অর্ডার দিল, সোনু চাইলো জিন আর সোডা। সাথে আলু ভাজা আর ফ্রাইড চিকেন।

আমাদের গল্প শুরু হলো। নানা ধরনের গল্প। তবে প্রধানতঃ পুরনো দিনের পারিবারিক স্মৃতি। 

এদিকে রেস্তোঁরার  টিভি তে ক্রিকেট দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের সাথে আমাদের টেস্ট ম্যাচ। আমি আজকাল ক্রিকেটের কোন খবর রাখিনা, কিন্তু সোনুর খুব উৎসাহ। সে নিজে কমবয়সে ভাল ক্রিকেট খেলতো – পেস বোলার ছিল। কিন্তু জোরে বল করতে গিয়ে তার মাস্‌ল্‌ এ স্ট্রেন হওয়ায় পরে সে স্পিনে চলে যায়।

“তখন তো আমাদের ভাল Physio আর কোচ ছিলনা”, দুঃখ করে বললো সে।

বাংলাদেশের সাথে এই টেস্ট ম্যাচে প্রথম তিন দিন বৃষ্টি হওয়াতে আজ চতুর্থ দিন প্রথম খেলা। মীমাংসা হবার কোন চান্স নেই, ড্র হবেই। যাই হোক, বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হবার পরে আমাদের রবীন্দ্র জাডেজা ৩০০০ রান আর তিনশোটা উইকেট পেয়েছে জানা গেল। এই সব দেখতে দেখতে মুকু তার এক CO (Commanding Officer) র কথা বললো, তিনি নাকি সব কথার মধ্যে ক্রিকেটের ভাষায় কথা বলতেন। যেমন – “That was a googly”, “I played him with a straight bat” কিংবা, “I sent him to the boundary” – এইরকম আর কি।

তো একদিন মুকু সেই CO ভদ্রলোকের সামনে বসে আছে, একজন আর্দ্দালী এসে বললো “স্যার আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন, নাম বলছেন না, কিন্তু দেখা করা খুব নাকি আর্জেন্ট।“ CO ভদ্রলোক তাকে বললেন “LBW”!

মুকু তো অবাক! তার মানে কি?

ভদ্রলোক হেসে বললেন, “বুঝলেনা তো?” ওর মানে হচ্ছে “Let the bugger wait!”

আমাদের ছোটবেলায় জহর রায়ের একটা হাসির গল্প ছিল – ইডেন গার্ডেনে ম্যাচ দেখতে গিয়ে একজন দর্শক নাকি গ্যালারীতে মাল খেয়ে out হয়ে গিয়ে টলমল করে হাঁটছিলেন, জহর রায় তাঁকে LBW out বলেছিলেন। সে ক্ষেত্রে অবশ্য তার মানে ছিল “Loaded belly with wine!”

মুকুর আর একটা গল্প আমার বাবা (তার সেজকাকা) কে  নিয়ে। একবার,মুকু তখন খুব ছোট, ব্যাঙ্গালোরের কাছে জালাহালি নামে একটা জায়গায় জ্যেঠু পোস্টেড।

“গাড়ী করে সবাই মিলে কোথাও যাওয়া হচ্ছে, গাড়ীর সামনে সেজকাকা, পাশে বাবা গাড়ী চালাচ্ছেন। পিছনে মা আর আমরা তিন ভাই বোন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, একটা গাছে দেখলাম একটা বোর্ড টাঙানো, তাতে লেখা আছে “Block Development Officer”।আমি সেজকাকাকে জিজ্ঞেস করলাম “What does a Block Development officer do?” এক মূহুর্ত্ত দেরী না করে সেজকাকা হেসে বললেন “কি আবার? He blocks development!”

আমি হেসে বললাম “এটা তো বাবা একটা ওভারবাউন্ডারী হাঁকালেন!”

মুকু খবর দিলো ঝর্ণা দি মারা গেছেন কয়েক দিন আগে। তোমরা যারা ঝর্ণা দি’কে চেনোনা, তাদের জানাই যে তিনি মুকুদের বদুমামার স্ত্রী ছিলেন। মুকুর মামাদের মধ্যে বদুমামা আর নিতুমামা দুই ভাই সব চেয়ে ছোট ছিলেন, নিতু মামা বিয়ে করেননি, বদু মামার বিয়ে হয়েছিল আমাদের উষাপিসীর মেয়ে ঝর্ণাদি’র সাথে,ওঁদের দু’জনের কোন সন্তান ছিলনা।  বামুনপাড়ায় শেষের দিকে যখন ওঁদের সাথে দেখা করতে যেতাম, তখন বদু মামা আর নিতু মামা চলে গেছেন, সেই বিশাল বাড়ীতে শুধু থাকতেন ঝর্ণা দি আর রাদুমামার স্ত্রী। দুজনেই শয্যাশায়ী। তাদের দেখা শোনা করতো বড়মামার মেয়ে কেয়া – সেও বিয়ে করেনি।

রাদুমামীমা আর ঝর্ণাদি দু’জনেই  চলে যাবার ফলে এখন কেয়া একা হয়ে গেল।  বড়মামার ছেলে ঢুন্ডি কাছেই থাকে। তার ছেলের বিয়েতে মুকুরা সামনের নভেম্বরে কলকাতায় আসবে, তখন ওরা সবাই মিলে বাড়ীটা নিয়ে কি করবে তার সিদ্ধান্ত নেবে।

মনোহরপুকুরের বাড়ীটার মত বামুনপাড়ার বাড়ীটাও হয়তো হাতবদল হবে, সেখানে নতুন একটা বিশাল বাড়ী তৈরী হবে। ওই বাড়ীটার সাথে আমার ও অনেক স্মৃতি জড়িত, বাড়ীর সামনে একটা গলি, তার শেষে একটা গেট আর গেট দিয়ে ঢুকে এক চিলতে জমি। সেই জমিতে আমার কম বয়সে নিতু মামা বদুমামারা কালীপূজোয় বাড়ীতে তৈরী বসন তুবড়ী জ্বালাতো, তার ফুলকি উঠে যেতো তিন তলার ছাদ ছাড়িয়ে অনেক ওপরে। 

মনোহরপকুরের বাড়ীর মত ওই বাড়ীতেও এক সময় খুব হৈ হুল্লোড় হয়েছে।

সোনুদের গুরগাঁওতে সম্প্রতি হরিয়ানার Assembly election হয়ে গেল। এবং জম্মু কাশ্মীরেও পরে পরেই। সোনু রাজনীতির অনেক খবর রাখে, সে বললো হরিয়ানায় এবার কংগ্রেস জিতবে।  কাশ্মীরেও NC কংগ্রেস জোটের জেতার সম্ভাবনা। বি জে পির সময়টা গত লোকসভার পর থেকে ভাল যাচ্ছেনা। মোদী ম্যাজিক ভ্যানিশ। ভালোই, মাঝে মাঝে সরকার পালটানো দরকার। কেউই অপরিহার্য্য নয়।

এর মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড বিয়ার আর জিন এসে গেছে। আমাদের ছোটবেলায় বাবা কাকারা বাড়িতে কোনদিন ড্রিঙ্ক করেননি। ব্যাপার টা সেই যুগে ভদ্রসমাজে ভাল চোখে দেখা হতোনা।

সোনু গল্প করলো, একবার অনেক দিন আগে, সোনা কাকা তখন সিমলার কাছে চেল নামে একটা জায়গায় পোস্টেড। শীতকাল, প্রচন্ড ঠান্ডা, চারিদিকে বরফ পড়ছে, বাড়ীর ভিতরে সোনাকাকার কিছু সহকর্ম্মী Army officer এসেছেন, সবাই মিলে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে গা গরম করার জন্যে ব্র্যান্ডি আর হুইস্কী পান চলছে, এমন সময় হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে কাঁপা কাঁপা মেয়েলী গলায় কে যেন”সোঁনাকাঁকু,সোঁনাকাঁকু” বলে ডেকে উঠলো। ডাকটা সোনু বেশ সুন্দর নকল করে শোনালো আমাদের সেদিন, সে অভিনয়টা বেশ ভালই করে বুঝলাম।

এই ভর সন্ধ্যে বেলা যাদের নাম করতে নেই, সেই সব অশরীরী আত্মারা কেউ নাকি? “বাবার একটু ভূতের ভয় ছিল  বেশ কয়েকবার ওই খনখনে কাঁপা কাঁপা গলায় ”সোঁনাকাঁকু,সোঁনাকাঁকু”ডাক শোনার পরে বাবা আমায় বললো, “সোনু যা তো দরজা টা একটু ফাঁক করে দ্যাখ্‌ তো কে আমায় ডাকছে?”

যাই হোক, দরজা খুলে দেখা গেল, শিখা আর শঙ্কর। কিছুদিন আগে ওদের বিয়ে হয়েছে, বোধহয় হানিমুন করতেই ওদের সিমলায় আসা। কিন্তু এই বরফ পড়ায় ওরা কিছুটা বিপদে পড়ে গেছে।

ওরা দুজন সোনাকাকীমার দেওয়া শুকনো জামাকাপড় পরে নেবার পরে সবাই মিলে গল্প করছে, সোনাকাকা সোনু কে বললেন “নতুন জামাই কে তো আমি হুইস্কি অফার করতে পারিনা, তুই বরং ওদের দু’জনকে এই Glenfiddich এর নতুন বোতলটা দিয়ে আয়। আমাদের বুড়োদের সাথে তোরা ছোটরাও একটু গা গরম করে নে।“

সোনাকাকা এরকমই দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন।

শঙ্কর নাকি কিছুতেই নতুন শ্বশুরের সামনে হুইস্কি খাবেনা, তার নাকি ভীষন লজ্জা করবে…সোনু এবার শঙ্করের সেই লজ্জিত ভঙ্গীর পার্ট টাও নিখুঁত অভিনয় করে দেখালো আমাদের।

শেষ পর্য্যন্ত সেদিন ওরা নাকি বোতলটা প্রায় শেষ করে দিয়েছিল।

বেলা প্রায় দু’টো বাজে, আমাদের ড্রিঙ্ক শেষ, মুকু আমাদের পাশে একটা সাজানো গোছানো রেস্তোঁরা তে লাঞ্চে নিয়ে গেল। সেখানে তিন জনে বসে খেতে খেতে মুকু বললো “কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় আমরা সাঁতার কেটে এখানে খেতে বসেছি, এমন সময় হঠাৎ চৈতীর ছেলে সুমন – ও অন্য একটা টেবিলে কারুর সাথে খাচ্ছিল – আমাদের কাছে এসে বলল “মুকুমামা আমায় চিনতে পারছো?”

“চিনতে পারবোনা কেন? কবে দিল্লী এসেছিস? বাড়ীতে আয় একদিন!” ওকে বলেছিল মুকু। আমাদের বারেন্দ্র দের যৌথ পরিবারের লতায় পাতায় এই সব কিছুটা দূরের সম্পর্কের মধ্যেও কিরকম গভীর আত্মীয়তার টান থেকে যায়!

সুমন কাজে মাঝে মাঝে অল্প দিনের জন্যে দিল্লী আসে, এবার হঠাৎ মুকুমামার সাথে দেখা হয়ে যাওয়াতে সে খুব খুসী।

সোনু বললো “সুমনের মত ভাল ছেলে চট করে দেখা যায়না, he is a gem…”

বেশ কয়েকবছর আগে মঙ্গল আর রুণার বড় ছেলে মটরবাইক কিনে একাই সেই নতুন বাইকে চেপে ব্যাঙ্গালোর থেকে তিরুপতি যাচ্ছিল। পথে একটা ট্রাকের ধাক্কায় সে অনেক দূরে ছিটকে পড়ে শেষ পর্য্যন্ত মারা যায়। মঙ্গল আর রুমা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানিপত্‌ থেকে দিল্লী আসে। সোনুর ছেলে তনুজ তখন ব্যাঙ্গালোরে, তার কাছ থেকে খবর পেয়ে সুমন – তখন সে কোন এক এয়ারলাইনে কাজ করতো – Spicejet কিংবা Go Air ঠিক মনে নেই – তাদের সাথে কথা বলে দু’জন  passenger কে offload করে ওদের ব্যাঙ্গালোর নিয়ে আসে, এবং শুধু তাই নয়, সেই এয়ারলাইনের গাড়িতে করে এয়ারপোর্ট থেকে মঙ্গল আর রুণা কে প্রথমে accident site ও পরে হাসপাতালে পৌঁছে দেবার বন্দোবস্তও করে।

প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন সম্ভাবনাময় তরুণ সন্তানের এরকম অকাল্মৃত্যু মঙ্গল আর রুণার মনে কতটা আঘাত হেনেছিল তা সহজেই কল্পনা করা যায়। পাঞ্জাবের পানিপত্‌ শহরে চলে যাবার পরে ওরা এমনিতেই পরিবারের বাকি সবার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল,এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পরে এখন তারা আরও অনেক বেশী চুপচাপ হয়ে গেছে।

তবে মুকু আর সোনু দু’জনেই বললো মঙ্গল আর রুণা পানিপতে এখন তাদের নিজেদের হার্ট এর হাসপাতাল খুলেছে, এবং সেই হাসপাতাল নাকি খুব ভাল চলছে সেখানে। মুকু ওকে পাটনায় নিজেদের বাড়ীতে ক্লিনিক খোলার কথা বলেছিল, কিন্তু কোন কারণে সে আর পাটনায় আসতে চায়না।

ছোটবেলায় যখন পাটনায় যেতাম, ভাইদের মধ্যে রাঙাকাকাই তখন একমাত্র পাটনায় থাকতেন, তাই কৃষ্ণা শুক্লা বন্টু মঙ্গল এদের সাথেই বাগানে খুব হুটোপাটি করেছি তখন। রাঙাকাকার তিন মেয়ের পরে এক ছেলে হওয়াতে মঙ্গল দাদু আর দিদার খুব ফেভারিট নাতি ছিল মনে পড়ে। তার আদরের শেষ ছিলনা।  ভোজপুরী ভাষায় তাকে সবাই ডাকতো “মঙ্গলওয়া”।

এখন সে সবার কাছ থেকে দূরে থাকে স্বেচ্ছা নির্ব্বাসনে।  

পাটনার অন্যান্য ভাই বোনেদেরও খবরাখবর নিলাম, বিশেষ করে যাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বহুদিন। বড় জ্যেঠুর ছেলে মেয়েরা – দীপা গুণু খোকন যেমন। সবাই নিজের নিজের  মত ভাল আছে জেনে ভাল লাগলো। বড়জ্যেঠুর ছোট ছেলে আমাদের সব চেয়ে ছোট ভাই  লাল্টুর সাথে অবশ্য সম্প্রতি আমার দেখা হয়েছে, মাঝে মাঝে সে আমায় ফোন ও করে আজকাল। লাল্টুর সাথে মনোহরপকুরের ঝুন্টু ভান্টুলী আর টুবলির বেশ ভাল যোগাযোগ আছে, এবং সে দূরে ব্যাঙ্গালোরে থাকলেও আমাদের অনেকেরই বেশ ভাল খোঁজ রাখে।

আমাদের পরের প্রজন্মের কেউ তো কাউকে চিনবেনা। সম্পর্কে ভাই বোন হলেও তারা পরস্পরের কাছে অচেনা অজানাই থেকে যাবে। সেটাই স্বাভাবিক। এটা নিয়ে ভাবনার কোন কারণ নেই।

খাওয়া শেষ, এবার বাড়ী ফেরার পালা।

সোনুর তুলনায় মুকু দেখলাম দিল্লীর রাস্তাঘাট অনেক ভাল চেনে। সে নানা রাস্তা আর ওভারব্রীজের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ী চালিয়ে নিয়ে গেল। তার homing instinct এর প্রশংসা করতেই হয়। বহুদিন ধরে দিল্লীতে গাড়ী চালাচ্ছে সে।

প্রানী জগতে নানা জীব জন্তুর এরকম অসাধারণ homing instinct দেখা যায়। Monarch butterfly রা মহাসমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে বহুদূর গন্তব্যে পৌঁছে যায়। Olive Ridley কচ্ছপেরা প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা নির্দিষ্ট সমুদ্র উপকূলে এসে ডিম পেড়ে বালি দিয়ে ঢেকে সমুদ্রে ফিরে চলে যায়। আর সেই ডিম ফেটে যে বাচ্চারা জন্মায় তারা সমুদ্রে ফিরে যায়, কিন্তু এক বছর পরে ঠিক সময়ে নিজেদের ডিম পাড়তে আবার তারা তাদের জন্মস্থানে ফিরে আসে।

আমাদের গৃহপালিত বেড়ালদের ও নাকি নিজের জায়গায় চিনে ফিরে আসার একটা আশ্চর্য্য ক্ষমতা আছে। এই নিয়ে শিবরাম চক্রবর্ত্তির একটা বিখ্যাত গল্প আছে, যারা পড়োনি তাদের জন্যে এখানে লিখে রাখি।

————-

শিবরাম এর বাড়ীতে একটা বেড়াল আছে, তিনি সেটাকে মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে ফেলে রেখে আসেন, কিন্তু সে দুই তিন দিনের মধ্যেই আবার তার কাছে ফিরে আসে।

একবার তিনি বেড়ালটাকে একটা বস্তার মধ্যে বন্দী করে ট্রেণে করে অনেক দূরে গিয়ে একটা জায়গায় ফেলে দিয়ে আসেন। কিন্তু মুস্কিল হলো এবার তিনি নিজেই রাস্তা গুলিয়ে ফেলে আর নিজের বাড়ী ফিরতে পারছেন না। অগত্যা শেষ পর্য্যন্ত সেই বেড়াল টাকে follow করেই তিনি নিজের বাড়ী ফিরেছিলেন।

কিন্তু বেড়াল তো আর সোজা পথে বাড়ী ফেরেনা। তারা গেরস্থের বাড়ীর দেয়াল টপকায়, বাড়ীর দেয়ালে জলের পাইপ বেয়ে ছাদে ওঠে, এক বাড়ীর ছাদ থেকে পাশের বাড়ীর ছাদে লাফ দিয়ে চলে যায়।  

শিবরাম যখন বাড়ী ফিরলেন, তখন তাঁর জামাকাপড়ে ধুলো ময়লার কালো দাগ, হাতে কালশিরে পড়েছে, পাঞ্জাবীর হাতা ছিঁড়ে গেছে, হাঁটু ছড়ে রক্ত বেরোচ্ছে, চুল এলোমেলো, তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর মাথার ওপর দিয়ে একটা ঝড় চলে গেছে।

তাঁর প্রতিবেশীরা তো তাঁকে দেখে অবাক। এ কি চেহারা হয়েছে আপনার?

শিবরাম একটু কাষ্ঠহাসি হেসে তাদের বলেছিলেন, “আর বলবেননা, বেড়াল কে অনুসরণ করে বাড়ী ফেরা যে কি কঠিন কাজ, কি বলবো?”  

—————-

মুকু সেই বেড়ালটার মতোই বেশ সাবলীল ভঙ্গী তে পঞ্চশীল পার্কে আমাদের নিয়ে এলো। আমি বললাম, “আজ কিন্তু ৩০ তারিখ, মনে রাখিস তিন নম্বর গেট।“ কুছ পরোয়া নেই ভঙ্গীতে মুকু ঠিক তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে পড়লো।

আমায় নামিয়ে ওরা দু’জন ওপরে উঠে সুভদ্রা আর বুড়ী সৌগত আর ওদের বাচ্চা দের  সাথে দেখা করে এলো। সুভদ্রা বললো “তোমরা আমাদের বৌদের না নিয়ে নিজেরা গিয়ে গল্প করে আসো কেন?কি এত গল্প তোমাদের যা আমাদের বলা যায়না?”

সোনু বললো,”বৌদি, আজ আমরা যে সময়ের কথা বললাম, সেই সময়ে তো তোমরা কেউ ছিলেনা, তাই ওইসব গল্প শুনে তোমাদের ভীষণ বোরিং লাগতো।“

ভেবে দেখলে কথাটা কিন্তু ঠিকই বলেছে সোনু। সারাদিন তিন জনে মিলে কত বোরিং কথা বলে হাসাহাসি করলাম আমরা। আমাদের সাথে মঙ্গলটা থাকলে আরো ভাল হতো, ওর কাছ থেকে আরও এইরকম বেশ কিছু বোরিং গল্প শোনা যেতো।

কিন্তু তা আর হবার নয়। মঙ্গলের সাথে দেখা করতে গেলে আমাদের পানিপত্‌ যেতে হবে।

নালন্দা ট্রিপ, ১৯৮৯, সামনে মঙ্গল বসে , পাশে বুড়ী

বিজয়া দশমী   

তোমাদের মধ্যে যাদের আমার কাছাকাছি বয়েস, তাদের মনে থাকতে পারে আমাদের ছোটবেলায় বিজয়া দশমী এলে পূজো শেষ হয়ে গেল ভেবে মনটা বেশ খারাপ হত ঠিকই, কিন্তু একই সাথে বিজয়ায় অনেক আত্মীয়স্বজন বাড়ীতে দেখা করতে আসতেন এবং তাঁদের জন্যে মা জ্যেঠিমা কাকীমারা অনেক খাবার তৈরি করে রাখতেন। আর আমরা ছোটরা সেই সব খাবারের ভাগ পেতাম।

কিন্তু বিজয়ার প্রধান downside ছিল দু’টো।

এক হলো গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা। আজকাল এই নিয়মটা কি উঠে গেছে? বোধ হয় না।

এখন আমি নিজে একজন গুরুজন হয়ে গেছি, কেউ আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে আমার একটু অস্বস্তি হয়। কিছুদিন আগে গায়ত্রীমাসীর নাতি ঋদ্ধির (মুনিয়া আর দেবাশীষের ছেলে) বিয়েতে গিয়েছিলাম, সেখানে ছোটরা অনেকে ছিল। ঋদ্ধি আর তার নববধূ শীতল তো বটেই্‌, তা ছাড়া গার্গীর ছেলে শুভ আর তার বৌ সোহিনী, উদয়ের মেয়ে রমিতা, রঞ্জুর মেয়ে তু্তুন, আর তার স্বামী রোহন। এরকম আরো অনেকে সবাই আমায় আর সুভদ্রাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো, আমি বাধা দিতে গেলে তারা আমার কথা শোনেনি।

বড়দের শ্রদ্ধা জানানোর এই পুরনো প্রথা আজকের তরুণ ছেলে মেয়েরাও চালু রেখেছে দেখে আমার ভাল লেগেছে।  

মনোহরপুকুরে আমাদের ও তখন এই রকম পাইকারী হারে গুরুজন দের প্রণাম করার প্রথা ছিল। আমাদের বাড়ী তখন গুরুজনে একেবার টইটম্বুর ভর্ত্তি, তার ওপর আবার যাঁরা দেখা করতে আসতেন তাঁদেরও প্রণাম করা নিয়ম ছিল। নো ছাড়ান ছুড়ন…    

——–

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় তাঁর বরযাত্রী বই তে এক জায়গায় লিখছেন, গণশা বলিল, “পরশু মাসীর বাড়ী গেছলাম। মা মাসী ডেকে ডেকে তেইশজন কে পায়ে হাত দিয়ে পেরনাম করালে, তার মধ্যে তিন জন ফাউ। সেখানে অত গুরুজন আছে জানলে ওদিক মাড়াতামনা। কোমরের ফিক ব্যাথাটা এসা আউড়ে উঠেছে!”

ত্রিলোচন প্রশ্ন করিল, “ফাউ মানে?”

“তিনটে তাদের মধ্যে কাজের লোক ছিল, ঘাড় তুলে তাকাবার তো আর ফুরসত ছিলনা!”

————

বিজয়াতে ছেলেদের মধ্যে কোলাকুলির চল অবশ্য এখনো আছে। এখানে ছোট বড়র কোন প্রভেদ নেই, ছোটরাও গুরুজনদের সাথে  কোলাকুলি করতে পারে্‌।

এই নিয়ে একটা গল্প শুনেছিলাম।

———–

একবার বিজয়ার পর ভীড় বাসে দুই বন্ধুর দেখা, কিন্তু তাদের মাঝখানে অনেক সহযাত্রী, তাদের শরীরের মধ্যে কয়েক স্কোয়ার ইঞ্চি  ফাঁক, সেই ফাঁক দিয়ে তারা পরস্পর কে হেসে শুভ বিজয়া জানাচ্ছে।  

কিন্তু এই ভীড় বাসে দূর থেকে নমস্কার বা কোলাকুলি করা অসম্ভব। একে তো দূরত্ব, তার ওপরে দুই হাত দিয়ে ওপরে বাসের হ্যান্ডেল ধরা। নমস্কার যে করবেন তারও উপায় নেই, হ্যান্ডেল থেকে হাত ছাড়লেই  উল্টে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা।

দু’জনে তাই যতটা সম্ভব তাদের হাত দুটো ওপরে রেখেই দুই কাঁধ সামনে পিছনে একটু আন্দোলিত করলেন, কোলাকুলি বোঝাতে।   

বোঝো কান্ড।

———— 

দ্বিতীয় downside ছিল বিজয়ার চিঠি লেখা। উঃ, এখন ভাবলে মনে হয় সে ছিল এক বিভীষিকা।

আর যে সব গুরুজনরা বাইরে থাকতেন – তাঁদের সংখ্যাও কিছু কম নয় – তাঁদের নিয়ম করে চিঠিতে বিজয়ার প্রণাম জানাতে হতো। সে আর এক যন্ত্রণা। আজ যেরকম গ্রুপ মেলে বা Whatsapp এ একবার লিখেই সবাইকে একসাথে সবাই কে পাঠিয়ে দেওয়া যায়, তখন তো আর তা ছিলনা। তখন প্রতিটি চিঠি আলাদা আলাদা লিখতে হতো, আর তাও শুধু ন্য়, একটা পোস্টকার্ডে বা ইনল্যান্ডে বেশ কয়েকজন প্রণাম আশীর্ব্বাদ ইত্যাদি জানাচ্ছেন, লেখার জায়গা ক্রমশঃ কমে আসছে, কিন্তু তার মধ্যেই কোনমতে জায়গা করে নিয়ে কখনো মার্জিনে কিছুটা, শেষে কিছুটা, এই ভাবে ভেঙে ভেঙে লিখতে হতো, মাঝে মাঝে নাম ঠিকানার জায়গাতেও প্রণাম জানিয়েছি, প্রায়ই অক্ষর গুলো এত ছোট হয়ে যেত আর হাতের লেখা এত বিশ্রী, যে কেউ সেই লেখা পড়তে পারতো কিনা বলা মুস্কিল।

কেবল একটাই যা সান্ত্বনা ছিল, যে পড়তে না পারলেও কোন অসুবিধে ছিলানা, কেননা কি লেখা আছে তা তো সবারই জানা।

“তুমি আমার বিজয়ার প্রণাম নিও, ছোটদের ভালবাসা জানিও।” ব্যাস, এই তো?  

এই একই বাক্য আমাদের সারা দিন ধরে শ’ খানেক চিঠিতে রোবোটের মত লিখে যেতে হতো।

এটা একটা শাস্তি নয়? 

বিজয়া দশমী এলেই সেই মিষ্টি খাবার আনন্দের পাশাপাশি ওই শাস্তির কথাটাও এখনো মনে পড়ে।

নট্‌ কাশি খুকখুক

১) স্মৃতির শহর  – কাশী

আমার জন্ম ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে।  আমার যখন চার মাস বয়েস তখন জুলাই মাসে কলকাতায় The great Calcutta Killing এর দাঙ্গা হয় , তার আগে বাবা আমায় আর মা’কে কাশীতে দিদার কাছে রেখে দিয়ে আসেন।

আমার দিদা তখন তাঁর বাবার (মা’র দাদু) সাথে কাশীতে দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে রাণামহল নামে একটা বাড়ীতে থাকতেন।

সুতরাং জন্মের পর থেকেই বলতে গেলে কাশীর সাথে আমার পরিচয়।

তার পরে শৈশবে এবং কৈশোরে আমি মা’র সাথে অনেকবার দিদার কাছে কাশীতে গেছি। কাশী তাই আমার কাছে এক স্মৃতির শহর।  যতদূর মনে পড়ে ১৯৬৫ সালে পূজোর ছুটিতে, তখন আমার খড়্গপুরে থার্ড ইয়ার , বাবা সেই বছরই জুলাই মাসে মারা গেছেন, শেষ কাশী গিয়েছিলাম।

তার পরে পরেই দিদা’র শরীর খারাপ হতে শুরু করে, মা মাসীরা আর মামা ওনাকে আর কাশীতে একা থাকতে না দিয়ে নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন।

প্রথমে কিছুদিন মামার কাছে আসানসোলে থাকার পরে দিদা কে কলকাতায় চিকিৎসার সুবিধের জন্যে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে তিনি এন্টালীতে খ্রীস্টোফার রোডে মাসীর বাড়ীতে থাকতেন।  ১৯৬৯ সালের জানুয়ারী মাসে  ৭৮ বছর বয়েসে দিদা আমাদের ছেড়ে চলে যান্‌।

আমার সেই বাল্য আর কৈশোরের কাশীর স্মৃতি প্রায় সবটাই দিদাকে ঘিরে।

দাদু – উপেন্দ্র নারায়ণ বাগচী দিদা – নির্মলা দেবী

২) আমাদের দিদা

  

দিদা (নির্মলা দেবী) অল্প বয়েসে বিধবা হয়েছিলেন, নদীয়া জমশেরপুরের সম্পন্ন এবং সুখ্যাত বাগচী পরিবারের বৌ হলেও স্বামী মারা যাবার পরে তিনি শ্বশুরবাড়ীতে পাঁচ ছেলেমেয়েদের নিয়ে আশ্রিতা হয়ে থাকতে চান্‌নি।

দিদার স্বামী (আমাদের দাদু – উপেন্দ্রনারায়ণ বাগচী)  খুব অল্প বয়েসে মারা যান, বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে সবে, মা মাসীরা তখন স্কুলে পড়েন, মামা সবে কলেজে ভর্ত্তি হয়েছেন। দিদার নিজের আর্থিক সামর্থ্য বেশী না থাকলেও সেই সময়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর বাবা ও দুই ভাই।      

আমার দিদা প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারী ছিলেন, তাঁর চরিত্রের নানা দিক ছিল।

তার মধ্যে প্রধান  ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক দিকটি, কঠোর এবং রক্ষণশীল ধার্মিক অনুশাসনের মধ্যে তিনি তাঁর সন্তানদের মানুষ করেছিলেন।  তিনি আনন্দময়ী মা’র একজন প্রধান শিষ্যা ছিলেন, তাঁর খুব কাছে থাকার জন্যে ছেলে মেয়েদের সবার  বিয়ে এবং নিজের নিজের সংসার হবার পরে তিনি কাশীতে একা এসে থাকতে শুরু করেন।

দ্বিতীয় দিকটি ছিল তাঁর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ। অল্প বয়েসে রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হবার ফলে তিনি প্রথাগত শিক্ষা  তেমন ভাবে না পেলেও, রবীন্দ্রনাথের লেখার সাথে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ছিল। তাঁর নানা কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল, বিশেষ করে কবির ঈশ্বর প্রেমের কবিতা এবং যেখানে তিনি মানুষের আত্মার উন্নতির জন্যে আবেদন করেছেন সেই সব কবিতা তাঁর প্রিয় ছিল।

“তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি”, “অন্যায় যে করে আর অন্য্যায় যে সহে”, “কিসের তরে অশ্রু ঝরে, কিসের তরে দীর্ঘশ্বাস” ইত্যাদি কবিতা তিনি বই না দেখে মন থেকে ঝরঝর করে আবৃত্তি করতেন।  আমরা ছোটবেলায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর সেই আবৃত্তি শুনেছি।

দিদা নিজেও অনেক কবিতা লিখে গেছেন, তাছাড়া তাঁর লেখা ছোটদের রামায়ণ মহাভারতের গল্প আমার মা বই হিসেবে ছাপিয়েছিলেন। সেই লেখার আঙ্গিকটা সে যুগে বেশ নতুন ছিল। এক দিদিমা যেন তাঁর নাতি নাতনীদের গল্প বলছেন, তারা নানা প্রশ্ন করছে এবং তিনি হাসিমুখে তাঁদের সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।  সেই   প্রশ্নোত্তর এর মধ্যে দিয়ে রামায়ণ মহাভারত এর গল্প গুলো জানা হয়ে যাচ্ছে তাদের। 

আর তৃতীয় দিক টি ছিল দিদার স্নেহময়ী স্বভাব। বিশেষ করে আমরা তাঁর নাতি নাতনীরা তাঁর তাঁর অকুন্ঠ স্নেহ আর ভালবাসা পেয়েছি।

আমার চিঠি লেখার অভ্যাস অনেক ছোটবেলা থেকে। দিদা কাশী থেকে আমায় মাঝে মাঝে চিঠি লিখতেন। আমিও উত্তর দিতাম। দিদার লেখা কিছু চিঠি আমার কাছে এখনো জমানো আছে। শুরু করতেন “পরমকল্যাণবরেষু স্নেহের মান্টু্ভাই” দিয়ে। চমৎকার ঝরঝরে লেখা।  তাছাড়া সুন্দর হাতের লেখা, একটু ও কাটাকুটি নেই। এখনো মাঝে মাঝে পড়তে বেশ লাগে। দিদার স্নেহের পরশ লেগে আছে সেই সব চিঠিতে।

২) শৈশবের কাশী

আমার হাতে খড়ি হয়েছি্লো কাশীতে। রামকৃষ্ণ মঠ থেকে এক সন্ন্যাসী বাড়ীতে এসে আমায় স্লেটে অ আ ক খ লেখা শিখিয়েছিলেন। আমার সেই সব চটপট লিখে ফেলা দেখে তাঁর নাকি তাক লেগে গিয়েছিল। আমার অক্ষরজ্ঞান দেখে ঐ সন্ন্যাসী ভদ্রলোক নাকি আমার খুব প্রশংসা করেছিলেন। এদিকে আমার মা যে বেশ কয়েকদিন ধরেই স্লেট কিনে এনে আমায় অ আ ক খ লেখা প্র্যাকটিস করিয়েছেন, তা তো আর তিনি জানেন না। সুতরাং সেই সন্ন্যাসীর প্রশংসা আমার মা’র ই প্রাপ্য ছিল।    

আমার ছোটবেলার কাশীর আর একটা গল্প মা খুব বলতেন, এটা ছিল ওঁর খুব প্রিয় একটা গল্প।

তখন আমি খুব ছোট চার বা পাঁচ বছর বয়েস হবে। এই ঘটনা টা আমার স্মৃতিতে নেই, মা’র কাছেই শোনা।

মা র কাশীতে  অর্শের অপারেশন হয়েছে, তিনি হাসপাতালে আছেন বেশ কিছুদিন। বাবা এসেছেন দিল্লী থেকে মা’র পাশে থাকতে। রোজ বিকেলে ভিজিটিং আওয়ারে বাবা চলে যান  মা’কে দেখতে হাসপাতালে।  এদিকে আমায় নিয়ে দিদা আর গায়ত্রী মাসী রোজ বিকেলে চলে যান্‌ আনন্দময়ী মা’র কাছে। কাশীতে তিনি থাকেন দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে নদীর ধারে কোন এক রাজার বিশাল বাড়ীতে। ত্রোজ বিকেলে তাঁর সভা বসে সেই বাড়ীর এক বিরাট হলঘরে।

স্মৃতি খুব ঝাপসা হলেও তাঁকে আমার কিছুটা মনে পড়ে। আমি গায়ত্রীমাসীর সাথে বসতাম বিশাল – মেঝে থেকে সিলিং পর্য্যন্ত –  কাঁচের জানলার পাশে। সামনে একটা ছোট মঞ্চের ওপর আনন্দময়ী মা এসে বসতেন, প্রিয় শিষ্যা হিসেবে দিদা বসতেন তাঁর পাশেই মঞ্চের ওপরে।

আনন্দময়ী মা’কে দেখে মনে হতো তাঁর ভিতরে একটা জ্যোতি ফুটে বেরোচ্ছে। অসাধারণ দিব্য রূপ ছিল তাঁর এবং এমন একটা ব্যক্তিত্ব যা  চারিপাশের সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো। খুব আস্তে কথা বলতেন, নরম গলায়। আমি তো কিছু বুঝতাম না, কিন্তু মনে আছে অত বড় হলে সবাই চুপ করে তাঁর কথা শুনতো। কোন শব্দ বা আওয়াজ হতোনা। 

আমি জানলার বাইরে নীচে নদী আর ঘাটের লোকজনের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাতাম। মন পড়ে থাকতো মা’র কাছে।

তো একদিন বিকেলে বাবা যাচ্ছেন হাসপাতালে মা’র কাছে, আমি নাকি তাঁর সাথে যাবো বলে জেদ করে বলেছিলাম ,”আজ আর আনন্দময়ী মা নয়, আজ আমার মা।”

এটা ছিল আমায় নিয়ে মা’র অন্যতম প্রিয় আর গর্ব্বের গল্প।

৩) কৈশোরের কাশী

একটু বড় হবার পরে মা আমাকে নিয়ে প্রতি বছর গরমের বা পূজোর ছুটিতে কাশীতে গিয়ে দিদার কাছে চলে যেতেন। এক দেড় মাস কাটিয়ে আসতাম। মাসীরাও আসতেন। দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে রাণা মহল নামে একটা বাড়ীতে দোতলায় দিদা থাকতেন।

ট্রেণে কাশী যাবার একটা প্রধান স্মৃতি ছিল বেনারস স্টেশনের ঠিক আগে গঙ্গার ওপরে লম্বা ব্রীজ। সেই ব্রীজের ওপর দিয়ে ট্রেণ যাবার সময়, ট্রেণের ভিতর থেকে একটা সমবেত কন্ঠে “জয় গঙ্গা মাইকি জয়” রব উঠতো। তাছাড়া কামরার প্রায় সবাই তাদের গঙ্গা মাই কে প্রণামী হিসেব নদীর জলে coin ছুঁড়তো, এবং সেগুলো ব্রীজের গার্ডার এ লেগে ঝনঝন একটা শব্দ হতো, সেই শব্দ এখনো কানে বাজে।

ট্রেণের জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম বহু দূরে কাশীর গঙ্গার তীরের উঁচু বাড়ীগুলো, আর পাশ দিয়ে জলে নেমে যাওয়া ঘাটের সিঁড়ি। দৃশ্যটা এত সুন্দর যে ভোলা প্রায় অসম্ভব। সত্যজিৎ রায় তাঁর “অপরাজিত” সিনেমায় কাশীর অনেক দৃশ্যের মধ্যে ব্রীজের ওপর ট্রেণ থেকে দেখা ওই দৃশ্য টা ব্যবহার করেছেন। 

রাণামহলের বাড়ীতে আমার সমবয়েসী মাসতুতো ভাই রঞ্জু আর আমি অনেক হুটোপাটি করেছি এক সময়। ওই বাড়ীতে একটা বড় ছাত ছিল, ওই ছাত থেকে নদী আর নদীর চর দেখা যেত। আর দেখা যেত দূরে কুয়াশায় ঢাকা রেল ব্রীজ, ট্রেণ গেলে একটা গুমগুম শব্দও কানে আসতো। সেই রেল ব্রীজের ওপর দিয়ে গুম গুম আওয়াজ করে ট্রেণ চলে যেতো,যতক্ষন দেখা যায়, আমরা তাকিয়ে থাকতাম।

কাশীতে খুব ঘুড়ি ওড়ানোর চল ছিল, কাটা ঘুড়ি দুলতে দুলতে নদীর জলে গিয়ে পড়ছে এই দৃশ্যটা দেখতে আমার খুব ভাল লাগতো। একটা ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে দুলতে দুলতে ভেসে জলে গিয়ে পড়ছে, এই দৃশ্য যে কতোটা মনোমুগ্ধকর হতে পারে তা বর্ণনা করা যাবেনা।  

আর ছিল বাঁদরের উৎপাত।  কিছু কিছু বাঁদর বেশ ভয়ঙ্কর ছিল, আমার এখনো মনে পড়ে যে একবার শিবুমামা (মা’র বড় মামা দিদার ভাই শ্রী মঙ্গল আচার্য্যর বড় ছেলে) কাশীতে এসেছেন। রঞ্জ আর আমি ওনার সাথে একদিন বাড়ীর ছাতে গল্প করছি এমন সময় একটা গোদা বাঁদর হঠাৎ কোন কারণে রেগে গিয়ে আমাদের দু’জনকে তাড়া করে এলো। শিবু মামা আমাকে আর রঞ্জুকে ওই দুর্দ্ধর্ষ বাঁদরের সামনে ফেলে  প্রাণপনে সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় করে দৌড়ে নেমে বাড়ীর ভিতরে  চলে গেলেন।  পরে শিবুমামা কে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের ফেলে পালালে কেন?

শিবুমামা বললেন, দুর্‌ ফেলে পালাবো কেন, আসলে বাঁদরটা তো আমাকেই…আর আমি তো তোদের থেকে অনেক বেশী জোরে দৌড়োই, দেখলি তো?”

একটা সময় রঞ্জু আর আমি দু’জনে দশাশ্বমেধ আর চৌষট্টি ঘাটের চারিপাশের রাস্তা ঘাট গলি সব চষে বেড়িয়েছি। দশাশ্বমেধের গলির মুখে বেশ কয়েকটা মিষ্টির দোকান ছিল, তার মধ্যে প্রথম দোকানে একটা ফর্সা গোলগাল কমবয়েসী হাসিখুসী লোক বসতো। কেন জানিনা এতদিন পরেও লোকটার চেহারা আমার মনে রয়ে গেছে। মিষ্টি কিনতে আমরা দু’জন ওই দোকানে প্রায় রোজই যেতাম। সারি সারি রং বেরং এর মিষ্টি রাখা থাকতো, সেই মন্ডা মিঠাইদের মধ্যে আমার প্রিয় ছিল রসগোল্লা, পান্তুয়া, ক্ষীরকদম্ব আর চমচম। 

আর দশাশ্বমেধের গলি আটকে বসে থাকা বিশাল কিছু ষাঁড়ের কথা এখনো মনে পড়ে।  বেশ সাবধানে তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা যেতাম। কেউ ওদের বিরক্ত করার সাহস পেতামনা। শিবের শহরে ষাঁড়দের অবাধ গতিবিধি।

সেই সব দিনের কথা ভাবলে দিদার কথা খুব মনে পড়ে। তাঁর ফর্সা লম্বা চেহারা মাথায় কদমছাঁট চুল, পরণে সাদা থান, কেরোসিনের স্টোভের সামনে বসে রান্না করছেন, তাঁর এই ছবিটাই চোখে ভাসে, আর তার সাথে মনের মধ্যে ভেসে আসে কেরোসিনের গন্ধ।  একটাও দাঁত নেই, তাই তাঁর গাল দুটো তোবড়ানো, কথা বলার সময় দিদার জিভটা বার বার গালের মধ্যে বোধ হয় দাঁত খুঁজে ঘুরে বেড়াতো। মা আর মাসীর সাথে গল্প করার সময় তাঁর মুখের মধ্যে জিভের ওই অবিশ্রান্ত ঘোরাফেরার জন্যে তাঁর ঠোঁটে একটা অদ্ভুত ওঠানামা হতো, যার জন্যে  বেশ শিশুসুলভ ত ত  করে কথা বলতেন তিনি, সেকথাও মনে পড়ে।

যৌবনে যিনি অসামান্যা সুন্দরী ছিলেন, বার্দ্ধক্যে তাঁর চেহারার এই পরিবর্ত্তন হলো প্রকৃতির নিয়ম, এর থেকে কারুর রেহাই নেই।

৪) প্রফুল্ল দিদা

আর মনে আছে প্রফুল্ল দিদার কথা।

দিদার মত তিনিও আনন্দময়ী মা’র শিষ্যা ছিলেন।  দিদাকে “দিদি” বলে ডাকতেন, দিদাও তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। মা’ মাসীরা ওনাকে প্রফুল্লমাসী বলে ডাকতেন।

আমাদের ছোটবেলায় পঞ্চাশের দশকে প্রফুল্লদিদার তখন বেশী বয়স নয়, মা’দের থেকে সামান্যই বড় হবেন।  ছোটখাটো, ইংরেজী তে যাকে বলে petite, ফর্সা, ফুটফুটে সুন্দরী, আর মুখে সবসময় হাসি।  

তাঁর পরণে সাদা থান, মাথায় ঘোমটা দিতেন, দিদার জন্যে মাঝে মাঝেই দরকার মতো বাজার করে আনতেন। আর রোদের মধ্যে হেঁটে আসার জন্যে তাঁর মাথায় ঘোমটা থাকতো, আর ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে থাকতো।

প্রফুল্লদিদা ছিলেন বালবিধবা। মা মাসীদের কাছে শুনেছিলাম স্বামী মারা যাবার পর প্রফুল্ল দিদারও বাপের বাড়ী বা শ্বশুর বাড়ীতে জায়গা হয়নি, খুব অল্প বয়েসে সেই আত্মীয়রা তাঁকে টিকিট কেটে ট্রেণে উঠিয়ে কাশী পাঠিয়ে দেয়।

যে সব বাঙালী বিধবাদের তাদের পরিবারে থাকার জায়গা হতোনা, তাদের মধ্যে অনেকেই তখন কাশী তে চলে আসতেন। এই সব বিধবাদের মধ্যে যারা অল্পবয়েসী এবং সুন্দরী ছিলেন কাশীতে এসে তাঁদের অনেকেরই এখানকার পুরুষদের কামনার শিকার হওয়া থেকে বাঁচার উপায় ছিলনা।

প্রেমাঙ্কুর আতর্থী তাঁর মহাস্থবির জাতক বইতে (প্রথম খন্ডে) এই হতভাগিনী  বাঙালী বিধবাদের কথা লিখে গেছেন। অনেক পরে পরিণত বয়সে সেই বই পড়ার সময় অবধারিত ভাবে আমার প্রফুল্লদিদা’র কথা মনে পড়েছিল।

প্রফুল্ল দিদা’র সেই হাসিখুশী সুন্দর চেহারাটা এখনো আমি ভুলতে পারিনা। তখন তো মেয়েদের প্রতি আলাদা আকর্ষন অনুভব করার বয়েস আমার নয়, তবু তাঁর প্রতি একটা অষ্পষ্ট ভাল লাগা মনের মধ্যে তৈরী হয়েছিল সেটা এখনো মনে পড়ে।  

একাকিনী কাশীতে এসে প্রফুল্ল দিদার জীবন কেমন ছিল, তাঁর পরিবার থেকে তিনি কোন অর্থসাহায্য পেতেন কিনা, কামার্ত পুরুষদের কু’নজর তাঁর ওপর পড়েছিল কিনা এসব কিছুই আমার জানা নেই। তবে ধরে নিতে পারি যে তাদের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে প্রফুল্ল দিদা আনন্দময়ী মা’র কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

দিদার মত তিনিও তাঁর মাথাও সন্ন্যাসিনীদের মত ন্যাড়া রাখতেন। বাড়ীর বাইরে বেরোলে তাঁর মাথায় ঘোমটা থাকতো কিন্তু বাড়ীর ভিতরে তিনি ঘোমটা খুলে থাকতেন। মাথায় চুল না থাকলেও তাঁর স্বাভাবিক হাসিখুসী স্বভাবের জন্যে আমার চোখে তাঁর সৌন্দর্য্য একটুও ক্ষুণ্ণ হয়নি।

আমার মা দিদাকে নিয়মিত মানি অর্ডার করে টাকা পাঠাতেন, সেই সাথে তিনি প্রফুল্ল দিদাকেও টাকা পাঠাতেন। সেই মানি অর্ডার এর receipt ফিরে আসতো , সেখানে প্রফুল্লদিদার হাতের লেখায় মুক্তোর মত গোটা গোটা মেয়েলী অক্ষরে লেখা থাকতো “দশ টাকা পাইলাম।”

৫) মেয়ে, অতএব দোষী    

আমার ভাবতে অবাক লাগে উনবিংশ শতাব্দীর আলোকপ্রাপ্ত, নবজাগরণে উদ্ভাসিত বাংলায় এই অসহায় বাঙালী বালবিধবাদের ঠাঁই হয়নি।

বাঙালী বিধবাদের কাশীতে নির্ব্বাসন নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও তাঁর সাথে যাঁরা বিধবা বিবাহ নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন, তাঁরা তৎকালীন “আদ্যোপান্ত পাঁকে ডোবা”  হিন্দু বাঙালী সমাজের কতোটা বিরুদ্ধতার সন্মুখীন হয়েছিলেন, তা এই সব লেখা পড়লে বোঝা যায়।  

যেমন তাঁর ‘পিঞ্জরে বসিয়া’ বইতে কল্যাণী দত্ত তাঁর মেজপিসিমা শিবকালীর ছোট জা’ ইন্দুমতীর কথা লিখেছেন। তিনি বিধবা হবার পরে তাঁর ভাশুর চাইতেন না তিনি শ্বশুরবাড়ি থাকুন। সবাই একজোট হয়ে কাশী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আর তাঁর জন্য মাসোহারা ঠিক হল একশো টাকা। ছ’মাস যেতে না যেতেই মাসোহারা কমতে থাকে।  বড় ঘর ছেড়ে এক টাকার ভাড়ার বাড়িতে ঠাঁই হল। চব্বিশ ঘণ্টা তসরের কাপড় পরে, কমণ্ডলু হাতে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা পরে ঘোরা সেই ইন্দুমতী কাশীর ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়িয়ে মরলেন শেষকালে। কল্যাণী দত্ত লিখছেন, “আট ভাশুরপো মিলে পিসিমাকে সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে। শেষে পাগল হয়ে ঠাঁই হয় মিশনের সেবাশ্রমে। পিসিমার খবর পেয়ে এক দিন কাশী গিয়ে দেখলেন, সম্পূর্ণ বিবসনা নগ্ন উন্মাদ ইন্দুমতী ‘মুখপোড়া ভগবানকে গালমন্দ করছেন।”

দেশ থেকে পাঠানো মাসোহারা কমে এলে অনেকে পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করত, কেউ বা আত্মঘাতী হত। নিমাই ভট্টাচার্যর ‘গোধুলিয়া’ তে গল্পের নায়ক প্রদীপ কাশীতে বিধবা পিসির বাড়িতে থাকার সময় মণিপিসি, সুধাপিসি, সারদাপিসির কথা শুনতে গিয়ে জানল, দু’পাঁচ-দশ টাকা মানি অর্ডারে কোনও রকমে এই বিধবারা বেঁচে আছেন। বিধবারা অনেক কাল ধরে এ ভাবেই বাবা বিশ্বনাথ আর মা অন্নপূর্ণার ভরসায় দিন গুজরান করতেন।

কিন্তু কাশীতে কেন?

কেননা কাশী মানেই মুক্তি, এ কথা চাউর হয়েছে অনেক কাল। ‘মহাস্থবির জাতক’-এ প্রেমাঙ্কুর আতর্থী লিখেছিলেন, “প্রতি সকালে বিধবা বঙ্গবালারা গঙ্গাতীরে কপালে হাত ঠেকিয়ে কী চান? তাঁরা তো কাশী এসেইছিলেন মরবেন বলে। কারণ এখানে মরলে আর জন্মাতে হয় না, ওই নরকের জীবনে বিতৃষ্ণ হয়ে আর জন্মাতে চান না। তার জন্যও কাশীবাস। আসলে কাশী যেন এক কালে বাঙালির শেষ আশ্রয়।”

গালিব থেকে রামপ্রসাদ— সবাই একই বার্তা দিচ্ছেন। গালিব তো এ কথাও লিখেছিলেন, যে বান্দা কাশীতে দেহত্যাগ করে, বিশ্বাসীরা মানে, মোক্ষলাভও হয় তাঁর, আত্মা মুক্তি পায় দেহ থেকে, জন্ম-মৃত্যু চক্র থেকে ছুটি মেলে কাশী-মহিমায়।   এই আকর্ষণেই তো আবহমান কাল ধরে বাঙালির কাশীযাত্রা আর কাশীবাস।

কিন্তু মুক্তি পাওয়া ছাড়াও বাঙ্গালী বিধবাদের কাশীতে পাঠিয়ে দেওয়ার অন্য একটা বিশেষ কারণ ছিল।

সেই কারণ ছিল পাপের বিদায়।

এই হতভাগিনী নারীদের মধ্যে অনেকেই কাছের আত্মীয় পুরুষদের কামের শিকার হয়ে  গর্ভবতী হলে রক্ষনশীল হিন্দু সমাজে তাদেরই পাপী বলে ধরা হতো। এবং সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যে তাঁদের কাশী পাঠিয়ে দেওয়া হতো।  

দুর্গাচরণ রায় তাঁর ‘দেবগণের মর্ত্ত্যে আগমন’ বইতে লিখেছেন, “দেবতারা এক দিন ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছলেন কাশীতে। দেখলেন, কয়েকটা বাচ্চা বাবার কথা জিজ্ঞেস করছে, মা-কে। পরিচয় জানতে চাইলে ইন্দ্রদেব বরুণদেবকে উত্তর দিচ্ছেন, “এদের এই অবস্থার কারণ— এরা বিয়ের দু’-এক বছরের মধ্যেই বিধবা হয়। বঙ্গদেশে যে হেতু তখনও বিধবাবিবাহ চালু হয়নি, তাই এরা স্বামী-সহবাসের সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে সংযম-শিক্ষার অভাবে রিপুদমনে অসমর্থতা হেতু পরপুরুষ সহবাসে গর্ভবতী হয়। এদের মা-বাবা লোক সমাজের ভয়ে এবং ভ্রূণহত্যা মহাপাপ মনে করে তীর্থযাত্রার নামে তাদের বারাণসী তীর্থে বনবাস দিয়া গিয়াছেন। কারও বাড়ি থেকে কখন কখনও কিছু খরচ আসে, অনেকের তাও জোটে না। আস্তে আস্তে এই কাশী সব ‘পাপীদের’ আখড়াতে পরিণত হতে লাগল।” 

প্রায়শ্চিত্ত করবেন কোথায়? জায়গা একটাই— কাশী।  এ শহরে গঙ্গায় স্নান করে বিশ্বনাথ দর্শন করলেই সব পাপ ধুয়ে মুছে সাফ।

বিধবাদের এই আসার হিড়িক দেখে ‘দেবগণের মর্ত্ত্যে আগমন’-এ ইন্দ্রদেব তো বরুণদেব কে বলেই বসলেন, “কাশীতেই তুলসীদাসের আশ্রম এবং রামানন্দের মঠ ছিল। আর এখন সেই কাশী কিনা বাঙ্গালী বালবিধবাদিগের আন্দামান।”

আস্তে আস্তে এ ভাবেই যেন কাশী ‘খারাপ মেয়েদের’ও আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করল। রেল হওয়ার পরে কাশীবাসী বাঙালি বিধবাদের সংখ্যা অনেকটা বেড়েছিল। কলকাতা থেকে ট্রেনে করে পৌঁছোনো সব বয়সের পরিবার-পরিত্যক্ত বাঙালি হিন্দু বিধবাদের আশ্রয় দিল কাশী।   

নারী নরকের দ্বার – বাঙ্গালী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই কথাটি সমধিক প্রচলিত।

কিন্তু প্রফুল্লদিদার সাথে যখন এ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা তো উনবিংশ শতাব্দী নয়। সেটা বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। দেশ স্বাধীন হবার পরেও তখন বছর দশেক কেটে গেছে।

আজ এই লেখা লেখার সময় মেয়েদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে সন্দেহ নেই, বিশেষ করে শহরের মেয়েরা এখন বেশীর ভাগই শিক্ষিতা এবং স্বাবলম্বী। কিন্তু এখনো যৌন আক্রমণ বা যৌন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটলে সাধারনতঃ মেয়েদের দিকেই আঙুল তোলা হয়। সব দোষ মেয়েদের। কেন রাতে একা গিয়েছিলে, কেন ওই পোষাক পরেছিলে? ইত্যাদি।

এখনো আগের মতোই আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক রয়ে গেছে। প্রফুল্ল দিদারা এখনো সেই সমাজে পুরুষদের হাতে অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছেন।

এই নিয়ে কবি রণজিৎ দাশের “পুরুষ” কবিতার একটা অংশ নীচে দিলাম।

———————–

মনে রেখো, এ জীবন অশুভের, অদৃশ্য হিংসার/

মনে রেখো, এ জীবন আকাশের, শুভকামনার/

মনে রেখো, তোমার জীবনে আছে অন্ততঃ একজন/

অতন্দ্র প্রহরী – এক শুভাকাঙ্খী নারী/

যে তোমার মঙ্গলকামনায় মন্দিরে গিয়ে পূজো দেয়/

ফিরে এসে প্রসাদী ফুল তোমার মাথায় ছোঁয়ায়/

পরিবর্তে, তুমি কি নিজে কখনো, মন্দিরে নয়/

তোমার মানমন্দিরে গিয়ে, দূরবীনে চোখ রেখে, রাত্রির আকাশে/

অনন্ত শোভাময় নক্ষত্রলোকের কাছে প্রার্থনা করেছো/

এই নারীর মঙ্গলকামনায়?/

অন্ততঃ একবার এই পুরুষ জীবনে এই প্রার্থনার সৌন্দর্য্যটুকু অর্জন করো/

রাত্রির নক্ষত্রলোক জেগে আছে তোমারই আশায়/

৬ ) বাবা

বাবা মাঝে মাঝে দিল্লী থেকে এসে আমাদের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে যেতেন। তাঁকে স্টেশন থেকে তুলতে আমি আর মা যেতাম। বাবাকে নিয়ে স্টেশন থেকে বাড়ী যাবার পথে কাশীর রাস্তা ঘাট, দোকানপাট আর  সাইনবোর্ড, সাইকেল রিক্সা, ঘোড়ায় টানা গাড়ী, পথচারীদের ভীড়, ল্যাম্প পোস্টে সিনেমার পোস্টারে রাজ কাপুর দেব আনন্দ নার্গিস আর মধুবালার ছবি – এই সব চোখে পড়তো।  

ভারতবর্ষের প্রায় সব শহরের রাস্তাঘাটের ওই একই চেহারা।

বাবা কাশীতে এলে আমাদের দিনগুলো বড় ভাল কাটতো। 

কয়েক দিন অনেকে মিলে বেড়ানো হত, নদীতে নৌকা চড়া হতো।

নদী থেকে তীরের লাল রং এর বাড়ী গুলো আর ঘাটের সিঁড়ি দেখতাম, ওপরে খোলা আকাশ, মাঝির দাঁড়ের আওয়াজে জলে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ আসছে, আমি চলন্ত নৌকা থেকে জলে হাত নামিয়ে দিয়ে দেখছি কেমন ঠাণ্ডা। মণিকর্ণিকা বা হরিশচন্দ্র ঘাট এলে মা বলতেন জানো তো এখানে চিতার আগুণ কখনো নেবেনা। কাশীতে অনেক মরণন্মুখ মানুষ মারা যেতে আসেন, এই দুই ঘাটে দাহ করলে আর পুনর্জন্ম হয়না।  

সারনাথের বৌদ্ধ স্তুপ আর মন্দির কাশী থেকে কাছেই, সেখানেও গিয়েছি মা বাবার সাথে।    

ভোরবেলা মা আর বাবার সাথে সাইকল রিক্সায় চেপে বিশ্বনাথের মন্দিরে যাবার কথা মনে পড়ে।  ভোরবেলা স্নান সেরে গরদ পরে মা পুজো দিতে যেতেন। অল্প দিনের জন্যে বাবাকে কাছে পেয়ে তিনি সে খুসী সেটা তাঁকে দেখেই বোঝা যেতো। স্বামী আর একমাত্র সন্তান কে নিয়ে তিনি যাচ্ছেন তাঁর প্রিয় দেবতা বিশ্বনাথের দর্শন করে তাঁর আশীর্ব্বাদ চাইতে। ভোরবেলা মন্দিরে যাবার পথে রিক্সায় মা’র ওই ঝলমলে সুখী চেহারাটা এখনো আমার চোখে ভাসে।

মা শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন, যতদিন পেরেছেন শিবরাত্রি তে নির্জলা উপোস করেছেন। আর প্রায় সর্বক্ষন গুনগুন করে শিবস্তোত্র গাইতেন, যার মাধ্যে তাঁর গলায় “প্রণমামি শিবং শিব কল্পতরুং” কলি টা এখনো কানে বাজে।

বাড়ীর ছাদে বাবা আমায় পড়াতে বসতেন, হোমওয়ার্ক দেখে নিতেন। সতরঞ্চি পেতে আমরা বসতাম মনে পড়ে।

একদিন বাবার সাথে ইংরেজী ট্র্যানস্লেশন করছি। “সে ঘাসের উপর শুইয়া আছে” র ইংরেজী কি হবে?  এখনো মনে আছে বাবা আমায় “He lay sprawling on the grass” বলার পরে বলেছিলেন, “মান্টু, তুমি কি sprawl কথাটা পেয়েছো আগে?”

তারপর থেকে আমি জীবনে যতবার ওই কথাটা কোথাও পড়েছি বা লিখেছি, কাশীর বাড়ীর ছাদে বাবার সাথে ইংরেজী পড়ার সকালটা আমার পরিস্কার মনে পড়ে গেছে। ছবির মতোন।

আর এক দিন বাবার সাথে ইংরেজী গ্রামারে Preposition শেখাতে গিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “Pull up মানে কি বলো তো?”

পুল্‌ আপ? এ তো সোজা প্রশ্ন।  

আমি আমার সীমিত ইংরেজী ভাষার জ্ঞান নিয়ে বেশ বিজ্ঞের মত বলেছিলাম “পুল্‌ আপ মানে হলো টেনে তোলা।”

বাবা বলেছিলেন, “না, এটা একটা idiomatic use তার মানে বকুনী বা ধমক দেওয়া। যেমন The teacher pulled up his student for making a mistake.”

বাবা আর একটা কথা খুব বলতেন। যে সব নতুন শব্দ শিখছো সেগুলো নিজের লেখায় যতোটা পারো ব্যবহার করো। তাহলে শব্দ গুলো আর কোন দিন ভুলবেনা।

আর মনে আছে খুব গরম বলে মাঝে মাঝে আমি মা আর বাবার সাথে রাত্রে ছাদে খাটিয়া পেতে শুতাম। ঘুম আসার আগে পর্য্যন্ত মাথার ওপর তারাভরা আকাশে বাবা আমায় সপ্তর্ষি মন্ডল ধ্রুবতারা আর কালপুরুষ চেনাতেন। রাতের আকাশে তারারা কি পরিস্কার ঝিলমিল করে জ্বলতো তখন, আজকের মত ধুলো আর কুয়াশার আস্তরনে ঢাকা পড়ে থাকতোনা। বিশ্বনাথের গলির মোড়ে অনেক বেনারসী শাড়ীর দোকান ছিল, আমার মনে পড়ে একবার ছোড়দাদুর (দিদার ছোট ভাই দূর্গাপ্রসন্ন আচার্য্য, মা’র ছোটমামা) বড় মেয়ে রমা মাসীর বিয়ের বেনারসী কেনার ভার পড়েছিল মা’র ওপর। অনেক দোকান ঘুরে অনেক বাছাবাছি করে মা একটা বেশ দামী লাল বেনারসী পছন্দ করেছিলেন। মিষ্টি দেখতে একটি ছোট্ট মেয়ে  আমারই বয়েসী– সম্ভবতঃ দোকানদারের মেয়ে –  বিনুনী করে পরিপাটি চুল বাঁধা, একটা লাল ডুরে শাড়ি পরে এক পাশে বসে মা’র শাড়ী বাছা দেখতো, তাকেও ভুলিনি।

৭) ইমাদি’

দশাশ্বমেধ  থেকে কাছেই গোধূলিয়াতে থাকতেন ইমাদি’ ও তাঁর স্বামী ডাক্তার সুশীল চৌধুরী। ইমাদি’ হলেন মা’দের হাজদি’র (হাজারী) বড় মেয়ে।  তাঁর সংসারে বাড়ীভর্ত্তি লোকজন, সম্পন্ন যৌথ পরিবা্র।     

ইমাদি’রা কাশীতে অনেক দিন আছেন,  তাঁর স্বামী সুশীল বাবু খুব হাসিখুসী আলাপী লোক, চট করে সবার সাথে জমিয়ে নিতে পারেন, আর খুব উঁচু পর্দ্দায় কথা বলতে ভালবাসেন। তুলনায় ইমাদি’ তাঁর ঠিক উল্টো। ছোটখাটো মানুষ, কাটা কাটা সুন্দর মুখ, গায়ের রং একটু ময়লা, কিন্তু তাঁর চেহারায় একটা লালিত্য ছিল। এমনিতে তিনি খুব নরম, আস্তে আস্তে কথা বলেন।  কিন্তু কম কথা বললেও তিনি যে সংসারের কত্রী সেটা তাঁর ব্যক্তিত্ব থেকে বোঝা যায়।

বেশ কয়েকবার আমরা ইমাদি’র বাড়ীতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছি। ওঁদের বাড়ীটা তিনতলা, বেশ বড়ো,  ছাদে একটা বিশাল টবের গাছের বাগান।  মাথার ওপরে খোলা আকাশ, আর বাঁদরদের উৎপাত থেকে জন্যে  খোলা জায়গাটা  লোহার জাল দিয়ে ঢাকা। ইমাদি’ অনেক আয়োজন করতেন, আর নিজে খাবার পরিবেশন করতেন। ছাদেই বাগানের পাশে মাদুর পেতে খাওয়া হতো। আমার মনে আছে এত বেশী খাবার আমি খেতে পারতামনা, কিন্তু ইমাদি’ তাঁর মিষ্টি গলায় এমন ভাবে আমায় আরো খেতে বলতেন, যে আমি না বলতে পারতামনা।

৮) পরিশিষ্ট

তারপরে তো অনেক দিন কেটে গেছে।

যে সব মানুষদের কথা এই স্মৃতিচারণে উল্লেখ করলাম, তাঁরা কেউই আর আমাদের সাথে নেই। দিদা চলে গেছেন, বাবা আর মা আর নেই, আমার খেলার সাথী রঞ্জুও বিদায় নিয়েছে।

কাশী অবশ্য এখনো আছে, এবং কাশীর গঙ্গা এখনো আগের মতই বয়ে যাচ্ছে। 

ভূপেন হাজারিকা যা নিয়ে তাঁর বহুল প্রচারিত বিখ্যাত এই গান গেয়েছিলেন~

বিস্তীর্ণ দু’পারে, অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও/

নিস্তব্ধে নীরবে  গঙ্গা, ও গঙ্গা,  তুমি বইছ কেন?/

সাথে সাথে এখনো রয়ে গেছে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের ওপর নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতা।

আর রয়ে গেছে আমার মনের ভিতরে কোথাও ছবির মত লুকিয়ে রাখা এই ছোটবেলার কাশীর নানা স্মৃতি যার কথা এখানে লিখে রাখলাম।  হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে অলস ভঙ্গী তে দুলতে দুলতে ঘুড়ি আকাশ থেকে নেমে আসে নদীর জলে। ছাতে উঠলে দেখা যায় দূরে নদীর ওপর ব্রীজে গুম গুম আওয়াজ করে ট্রেণ চলে যায়। দশাশ্বমেধ এর গলি আটকে শুয়ে থাকে বিশাল ষাঁড়, আমি আর রঞ্জু সাবধানে তার পাশ কাটিয়ে চলে যাই। গাছে গাছে কিচিরমিচির করে এক পাল বাঁদর।  মিষ্টির দোকানে থরে থরে সাজানো থাকে চমচম, পান্তুয়া। বিশ্বনাথের গলির মোড়ে বেনারসী শাড়ীর দোকানে মা শাড়ী পছন্দ করেন, আর একটি মিষ্টি মেয়ে চুপ করে পাশে বসে থাকে।

এই সব ছবি আমার মনের মধ্যে একটা কোলাজ হয়ে জমে আছে এখনও।

সেই ১৯৬৫ সালের পর থেকে আর কাশী আসা হয়নি। বাবা বিশ্বনাথ না ডাকলে নাকি কাশী যাওয়া যায়না।  সেই ডাকের অপেক্ষায় এতদিন বসে থেকে এবার এই ২০২৪ সালে শেষ পর্য্যন্ত ডাক এলো।  মা আর আমার শ্বাশুড়ীর মৃত্যুর পরে তাঁদের আত্মাকে পিন্ডদান করতে আমরা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে কাশী  ঘুরে এলাম।

কিন্তু সে এক অন্য গল্প।   

৯) উপসংহার

এই লেখার নাম দিয়েছি “নট্‌ কাশি খুকখুক”। 

এই বাক্যবন্ধ টি সত্যজিৎ রায়ের ষাটের দশকের ছবি “মহাপুরুষ” থেকে নেওয়া। সংলাপটি ছিল কৌতুকাভিনেতা হরিধন মুখোপাধ্যায়ের মুখে। যাকে বলছেন তিনি যাতে কাশী শহর আর খুকখুকে কাশি এই দুটি গুলিয়ে না ফেলেন তাই তাঁর এই প্রাঞ্জল ব্যাখা।

আর এই পোস্টের রঙীন ছবি গুলি আমাদের এপ্রিল মাসে কাশী বেড়ানোর সময়ে তোলা।     

রঞ্জু ও নকশালবাড়ী আন্দোলন

ছোটবেলায় রঞ্জু

১) সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বীজ রোপন

রঞ্জু আর আমি ছিলাম পিঠোপিঠি ভাই। আপন ভাই না, আমরা ছিলাম মাসতুতো ভাই, কিন্তু আপন এর থেকেও বেশী আপন। যাকে বলে অভিন্নহৃদয়,  মাণিকজোড়, হরিহরাত্মা।

মা’রা ছিলেন পাঁচ বোন। এদের মধ্যে মা (সরস্বতী) আর মাসী (ভগবতী) কলকাতায় থাকতেন। গায়ত্রী মাসী থাকতেন পাটনায় আর ছোটমাসী (পার্ব্বতী)  থাকতেন মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে, পরে ভোপালে।

কলকাতায় থাকার দরুণ মা আর মাসীর মধ্যে একটা গভীর ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাসী যেহেতু মা’র থেকে প্রায় আট বছরের বড়, মা’র প্রতি তাঁর একটা স্নেহের ভাব ও ছিল।  মা’ও তাঁর ভাগু দি’কে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিলেন।

দুই বোন ই তাদের প্রথম সন্তান কে হারিয়ে পরের সন্তান কে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাসী রঞ্জুকে, মা আমাকে। আমরা দু’জনেই আমাদের মা’দের একমাত্র সন্তান। তাছাড়া তাঁরা দুজনেই তাঁদের স্বামীদের (মেসোমশায় ১৯৬১, বাবা ১৯৬৫) কয়েক বছরের মধ্যে বিধবা  হন্‌।  দুই বোনের ভিতরে bonding এটাও একটা বড় কারণ ছিল।

মাসীরা থাকতেন এন্টালীতে ক্রীস্টোফার রোডে  CIT Buildings এ। একটা সময় ছিল যখন প্রায় প্রতি রবিবার মা আর আমি ৩৩ নম্বর বাসে চেপে হাজরা মোড় থেকে পদ্মপুকুর স্টপে নেমে কাছেই হাঁটাপথে মাসীর বাড়ীতে এসে সারাদিন কাটাতাম। ওখানেই খাওয়া হতো। তারপর সারা দুপুর আর বিকেল মা’রা দুই বোন বিছানায় বসে গল্প করতেন,আমি আর রঞ্জু বাইরে ওর বন্ধুদের সাথে খেলতাম, অথবা দু’জনে বাড়ীতে বসে একসাথে কোন বই পড়তাম, অথবা ক্যারম খেলতাম।

এই ভাবেই আমাদের ছোটবেলায় দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গতা তৈরী হয়। মা আর মাসীর মধ্যে যে ভালবাসা ছিল সেটাই মনে হয় আমাদের দু’জনের এক অপর কে ভাল লাগা এবং ভালাবাসার কারণ।

স্কুলের পালা শেষ করে আমরা কলেজে ভর্ত্তি হলাম ১৯৬৩ সালে। আমি গেলাম খড়্গপুরে। রঞ্জু ভর্ত্তি হলো কলকাতার সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের কাছে ওয়েলেসলি  স্ট্রীটে মৌলানা আবদুল কালাম কলেজে।

কলেজে যাবার পর থেকে আমাদের পথ ক্রমশঃ আলাদা হতে শুরু করলো। দু’জনের মধ্যে অন্তরঙ্গতা না কমলেও জীবনের নানা বাধ্যবাধকতা কে মেনে নিয়ে আমরা ক্রমশঃ এক অপরের থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যেতে লাগলাম।    

এই সময় থেকে রঞ্জু বাম রাজনীতির দিকে ক্রমশঃ আকৃষ্ট হতে থাকে।  বাড়ী ছেড়ে  ইডেন হিন্দু হোস্টেলে গিয়ে থাকার পর থেকেই তার মার্ক্সিস্ট আদর্শে হাতে খড়ি। অনেক পোড় খাওয়া বাম আদর্শে অনুপ্রাণিত radical ছাত্র তখন প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়াশোনা করে, এবং তাদের সাথে অন্তরঙ্গ ভাবে মেশার ফলে রঞ্জু ক্রমশঃ বাম আদর্শের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।   

আমি যখন খড়্গপুর থেকে ছুটিছাটাতে কলকাতায় আসতাম তখন থেকেই আমি তার এই পরিবর্ত্তনটা লক্ষ্য করি। তার মুখে তখন শুধু দ্বন্দ্বমূলক সমাজবাদের  (Dialectical Materialism) কথা, আমায় বেশ কিছু Marx আর Engels বইও সে তখন দিয়েছিল পড়তে। খুব উৎসাহ নিয়ে সে আমায় মার্ক্সীয় তত্ত্ব বোঝাতো। সেই সব কঠিন তত্ত্ব আমার মাথায় না ঢুকলেও আমি হুঁ হাঁ করে শুনে যেতাম। ওর উৎসাহে জল ঢালতে ইচ্ছে করতোনা।

ব্যাপারটা যে কোন দিকে গড়াবে তখন আমি আন্দাজ করতে পারিনি।   

তবে এটা বুঝেছিলাম যে রঞ্জুর মনের মধ্যে সমাজের অসাম্য একটা বিপুল এবং গভীর প্রভাব ফেলছে। তার ইডেন হিন্দু হোস্টেলের বন্ধুরাই তার মাথায় এই সব চিন্তা রোপন করছে কিনা তা তখন জানতামনা।

তবে আমাদের আলোচনার মধ্যে প্রায়ই এই সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তার রাগ আর অসহিষ্ণুতা আমি দেখতে পেতাম। এই যে একজন গরীব লোক রিক্সা টানছে, আর একজন দামী গাড়ী চড়ছে, এই যে একজন শীতের রাত রাস্তায় শুয়ে কাটায় আর একজন শোয় দুগ্ধফেননিভ শয্যায় তার বিলাসবহুল প্রাসাদে, কেন এরকম হবে?   ফুটপাতে শীতের রাতে ঠান্ডায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকে, পথের শিশু রা খেতে না পেয়ে কাঁদে, এই সব দৃশ্য রঞ্জুর মনে তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করতো।  

সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্যে তার সহানুভূতি আর তার এই প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী স্বভাবটি রঞ্জু পেয়েছিল তাঁর বাবা – আমার মেসোমশায়ের কাছ থেকে। মেসোমশায় তাঁর যৌবনে ব্রিটিশ দের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, এমন কি তিনি অনুশীলন সমিতির ও সভ্য ছিলেন শুনেছি। বেশ কয়েক বছর ব্রিটিশ আমলে তিনি জেলেও ছিলেন, এবং জেল থেকেই তিনি ইংরেজি আর ফিলসফিতে কৃতিত্বের সাথে MA পরীক্ষায় পাশ করেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে মানুষের ওপরে মানুষের অন্যায় এবং অত্যাচার হয়ে এসেছে, এবং একই সাথে সেই অত্যাচারের প্রতিবাদ এবং বিদ্রোহ করে এসেছে আরও একদল প্রতিবাদী মানুষ।

সবাই প্রতিবাদ করেনা, অনেকে এই সব অত্যাচার মাথা নীচু করে মেনে নেয়। কিন্তু রঞ্জু সেই দলে ছিলনা।

কবি বলেছেন~ “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা দোঁহে যেন তৃণ সম দহে।”

রঞ্জু অন্যায় সহ্য করেনি। সে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে প্রত্যক্ষ ভাবে যোগ দিয়েছিল।

যৌবনে রঞ্জু

২) বাংলায় ভূমি সংস্কার আন্দোলন  

আমাদের দেশে কৃষকদের ওপর অত্যাচারের দীর্ঘ ইতিহাস। সেই মোগল দের সময় থেকেই জমিদার এবং মুসলমান শাসকদের কাছে খাজনা দিতে গিয়ে গরীব চাষীদের জীবন দুর্বিষহ হয়েছে। এর ওপরে ছিল ভূমিহীন চাষী দের করুণ অবস্থা। তারা সামান্য অর্থের বিনিময়ে অন্যের জমিতে ফসল ফলাতো। এক ভূমিহীন bonded labour কে নিয়ে প্রেমচন্দের সেই বিখ্যাত গল্প সদগতি নিয়ে সত্যজিৎ রায় একটা সিনেমা তৈরী করেছিলেন।    

মোগলদের পরে এলো ব্রিটিশরা। তাদের শাসন ছিল আরও ভয়ঙ্কর। উনবিংশ শতাব্দীতে নীলচাষীদের ওপর তাদের অত্যাচার এবং নীলবিদ্রোহ নিয়ে দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ উপন্যাস সমাজে খুব সাড়া ফেলেছিল। 

দেশ স্বাধীন হবার ঠিক আগে ১৯৪৬-৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলনের কথাও আমরা ভুলিনি। না ভোলার প্রধান কারণ ছিল গ্রামে ও শহরে সেই আন্দোলনের পক্ষে জনসাধারণের অসাধারণ সমর্থন পাওয়া যায়।  বাংলা সাহিত্যে ও গণসঙ্গীতে তার প্রভাব পড়ে। কিছুদিন আগে আমরা  তেভাগা আন্দোলনের ওপর মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর গল্প অবলম্বনে “হারানের নাতজামাই” নাটকটি দেখলাম। তেভাগাও কৃষকদের জমির অধিকার ও উৎপন্ন ফসলের দুই তৃতীয়াংশ অধিকার পাবার আন্দোলন ছিল।

তেভাগা আন্দোলন নিয়ে রচিত সলিল চৌধুরীর কালজয়ী গান এখনো লোকের মুখে মুখে ফেরে।

হেই সামালো হেই সামালো/

হেই সামালো ধান হো, কাস্তে টা দাও শান হো/

ধান কবুল আর মান কবুল/

আর দেবোনা আর দেবোনা/ রক্তে রাঙা ধান মোদের প্রাণ হো/

তারপরে তো ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলো। পরাধীনতার হাত থেকে উদ্ধার পাবার পরে কুড়ি বছর পর তখন কেটে গেছে। পাঞ্জাব আর হরিয়ানায় সবুজ বিপ্লব শুরু হয়েছে, সেখানে সবাই ধনী কৃষক, তাদের বিশাল বিশাল জমি, তাছাড়া সরকারের প্রচুর অনুদান, ক্যানালে সেচের জল, বিদ্যুৎ এর পয়সা আর ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়না, ভালো বীজ দেওয়া হয়, তাদের ফসল সরকার ন্যায্য দামে (MSP – Minimum Sales price) কিনে নেয়।  প্রত্যেকের দামী গাড়ী, ট্র্যাক্টর।

আমাদের বাংলায় অবশ্য এসব  কিছুই হয়নি।  আমাদের অসুবিধে ছিল অনেক কৃষক এবং সবার ছোট ছোট জমি। অনেক ভূমিহীন চাষী আর তার ওপরে আছে জমিদার আর জোতদার (যারা ধনী আর ক্ষমতাশালী কৃষক) দের অত্যাচার। 

ষাটের দশকের শেষে (১৯৬৭) যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে  সেই সরকার এর দুই নেতা মন্ত্রী  হরেকৃষ্ণ কোনার  ও বিনয় চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কারের কাজ শুরু করেন।

তাঁরা বড় জমির মালিকদের হাতে থাকা ভূমি সিলিং আইনের অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত জমি এবং বেনামি জমি রাষ্ট্রের কাছে অর্পণ করেছিলেন। এইভাবে অর্পিত ভাল কৃষি জমি পরবর্তীকালে ২৪ লক্ষ ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকের মধ্যে জমি বিতরণ করা হয়।

এ ছাড়াও তাঁরা অপারেশন বর্গা শুরু করেছিলেন, যার মধ্যে দিয়ে ধনী কৃষক রা তাদের জমির কিছু অংশ বর্গাদার দের নিজের খরচে চাষ করার জন্যে দেন এবং বিনিময়ে উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ বর্গাদারের কাছ থেকে পান্‌। যুক্তফ্রন্ট সরকারের এই উদ্বৃত্ত ভূমি বন্টন আর অপারেশন বর্গা বাংলায় অসাধারণ সাফল্য লাভ করে।

কিন্তু ইতিমধ্যে ষাটের দশকের শেষের দিকে (১৯৬৯ সালে) চারু মজুমদারের নেতৃত্বে শুরু হয় নকশাল আন্দোলন এবং এক ঝাঁক মেধাবী এবং বাম আদর্শে অনুপ্রাণিত যুবক সেই নকশাল আন্দোলনে যোগ দেয়। উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ী থেকে প্রধানতঃ এই কৃষি আন্দোলন এর উৎপত্তি। গ্রামের গরীব কৃষক দের ওপর ধনী জোতদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদ থেকেই সেই আন্দোলনের শুরু। 

রঞ্জু এই নকশাল আন্দোলনে সামিল হয়।

এর পরেই শুরু হয়ে যায় যুক্তফ্রন্টের কম্যুনিস্ট শাসকদের সাথে নকশালদের বিরোধ।  দুই দলই কম্যুনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী, এবং দুই দলেরই লক্ষ্য জমি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কৃষকদের ওপর জোতদার আর ধনী কৃষক দের অন্যায় অত্যাচার দূরীকরণ, জমিহীন দের জমি বন্টন, ফসলের সুসংহত ভাগ ইত্যাদি। যুক্তফ্রন্টের প্রধান দল  সি পি এম – কম্যুনিষ্ট পার্টি  (মার্ক্সিস্ট) যারা তখন  সরকারে।  আর নকশাল দের নেতা চারু মজুমদার আর কানু সান্যালরা তাদের পার্টির নাম দিলেন কম্যুনিস্ট পার্টি (মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট) –  সি পি এম এল।  অর্থাৎ তাঁরা হলেন সি পি এম এর থেকেও বেশী জনদরদী।  এবং তাঁদের আন্দোলন হলো চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং এর অনুগামী।  আর সেই আন্দোলন হলো সশস্ত্র, হিংসাত্মক।

একজন বাম, আর একজন অতি বাম।

এই দুই দলে অনেক আলোচনা হলো কিন্তু একসাথে এগোবার কোন সূত্র পাওয়া গেলনা।

আসানসোলে মামাবাড়ীর বাগানে রঞ্জু আর ভাস্বর – সাথে বোনেরা

৩) নকশালবাড়ী  আন্দোলন

নকশাল আন্দোলনের নেতাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমাজের দুই শ্রেণীর অর্থাৎ এক দিকে ধনী  কৃষক ও জোতদার এবং অন্যদিকে দরিদ্র এবং ভূমিহীন চাষীদের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে একটা সাম্যের পরিবেশ তৈরী করা যেখানে কোন শ্রেণী বৈষম্য থাকবেনা।

কিন্তু প্রথম থেকেই নকশাল আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। গ্রামে গ্রামে জোতদারদের ঘর বাড়ী তে আগুণ লাগিয়ে দেওয়া, তাদের ক্ষেতের ফসল কেটে নেওয়া, এবং শেষে ধনী জমিদার এবং বড় কৃষকদের নৃশংস ভাবে খুন করা শুরু হয়। তারপরে ক্রমশঃ সেই অনিয়ন্ত্রিত অরাজকতা গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। 

চারু মজুমদার নকশালদের এই হত্যালীলার নাম দিয়েছিলেন “শ্রেণী শত্রু খতম।” 

কলকাতার রাস্তা ঘাটে দেয়ালে তখন লেনিন আর মাও সে তুং এর ছবি তে ছয়লাপ।  আর হাজার হাজার পোস্টারে লেখা “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান!” “সত্তরের দশক মুক্তির দশক” ইত্যাদি। কে বা কারা তাদের এই সব কাজের জন্যে টাকা জোগাতো জানিনা।

কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতের পথে গিয়ে নকশালবাড়ী আন্দোলন রাষ্ট্রের রোষের মুখে পড়ল। নকশালদের এই আইনের শাসন কে তোয়াক্কা না করা আন্দোলন কে তারা মানবে কেন? তারা সেই আন্দোলন কে রাষ্ট্রবিরোধী ঘোষণা করে পুলিশ দিয়ে তাদের দমন করতে শুরু করলো। এর ফলে নকশালরা রাস্তা ঘাটে পুলিশ দেখলেই তাদের নির্ব্বিচারে মারতে শুরু করে। এর ফল হয় আরো মারাত্মক।

এবার পুলিশও নির্ম্মম হতে শুরু করে, তারা একতরফা মার খাবে কেন? ধরপাকড় শুরু হলো, জেলে নিয়ে গিয়ে বহু তরুণ বিদ্রোহীর ওপর অকথ্য অত্যাচার শুরু হলো। Encounter এর নাম দিয়ে অনেক বন্দী যুবক কে ছেড়ে দিয়ে তাদের পিছন থেকে পুলিশ গুলি করে মারে।  

আমাদের মাসতুতো দাদা রতন দা’ তখন লালবাজারে পুলিশের সার্জেন্ট। তাঁকে কাজে রাস্তা ঘাটে ডিউটি করতে হয়। বেচারা রতন দা’র অবস্থা তখন বেশ খারাপ। রাস্তায় বেরোলে তিনি সব সময় পকেটে পিস্তলে হাত রেখে ঘোরেন। কিন্তু  কেউ পিছন থেকে এসে ছুরি মারলে পিস্তলে কোন কাজ হবেনা। তাই রতনদা’ বাইরে বেরোলে বেশ ভয়ে ভয়ে থাকেন। 

রতনদা’ আমাদের বড়মাসীর ছেলে, তিনি আমাদের ছোটমাসী পার্ব্বতীর বয়সী। সুতরাং আমার আর রঞ্জুর থেকে তিনি বয়সে অনেকটাই বড়। আমাকে আর রঞ্জুকে তিনি খুবই স্নেহ করেন, সুতরাং তাঁর পক্ষে রঞ্জুকে পুলিশে ধরিয়ে দেবার তো কোন প্রশ্নই নেই।   

সেই দিনগুলোতে রতন দা’ পড়ে গিয়েছিলেন এক উভয়সঙ্কটে।  

এই সময় ১৯৬৯ সালে আমি Indian Oil Corporation এ কাজে join করে প্রথমে মুম্বাই ও পরে উত্তর প্রদেশের নানা শহরে কাজ নিয়ে চলে যাই। শুনেছি সেই সময় রঞ্জু পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্যে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতো, পালা করে করে  চেনা শোনাদের বাড়ীতে  রাত কাটাতো। মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীতেও সে বেশ কয়েক রাত কাটিয়েছে।

একবার নাকি মাঝ রাতে আমাদের বাড়ীতেও রঞ্জুকে খুঁজতে এসেছিল পুলিশ।

রঞ্জু ধরা পড়লে পুলিশের হাতে তার কি অবস্থা হবে সেই ভেবে রঞ্জুর জন্যে মাসী আর মা ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতেন।

নকশাল আন্দোলন এর উদ্দেশ্য যে ঠিক কি ছিল, তা বোঝা মুস্কিল। বিশাল দেশের একটা ছোট প্রদেশে কিছু লোক মেরে আর ক্ষেতে বাড়ীতে আগুণ লাগিয়ে কি বিপ্লব তারা আনবে ভেবেছিল আমি জানিনা। রঞ্জুর মত অনেক  শিক্ষিত বুদ্ধিমান এবং আদর্শবাদী যুবক কোন বিপ্লবের আশায় চারু মজুমদারের এই মারণ যজ্ঞে যোগ দিয়েছিল তাই বা কে জানে। ওরা কি ভারতবর্ষে ফরাসী বা রুশ বিপ্লবের মত কিছু করবে আশা করেছিল?

রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সাফল্য লাভ করার জন্যে যে বিশাল জন আন্দোলন দরকার, নকশাল আন্দোলন ততটা জনসমর্থন পায়নি। শেষের দিকে বরং গ্রামে কিছুটা সমর্থন থাকলেও শহরে তারা অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।  ১৯৪৬/৪৭ সালের তেভাগা কৃষক আন্দোলনের  সময় বাংলা সাহিত্য নাটক সঙ্গীতে যেরকম সাড়া জেগেছিল, নকশাল আন্দোলনে সেরকম কোন উন্মাদনা চোখে পড়েনি। ওই আন্দোলন নিয়ে যে লেখালেখি হয়েছে, সবই তাত্ত্বিক মতাদর্শের কচকচি। পন্ডিতি ফলানো ছাড়া যার আর কোন উদ্দেশ্য ছিলনা।  মাও সে তুং এর পথই নাকি তাদের পথ। সেই পথেই নাকি মুক্তি।  মাও তাঁর দেশের অধ্যাপক, ডাক্তার, শিক্ষক, শিল্পী সবাই কে গ্রামে ক্ষেতের কাজ করতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। 

কি লাভ হয়েছিলো তাতে ?

মাওয়ের সময় থেকেই চীনে এক (কম্যুনিস্ট) পার্টির শাসন, অর্থাৎ সেখানে গণতন্ত্র কোনদিনই ছিলনা,আজও নেই। আজ সেখানে পুঁজিবাদ রমরম করে চলছে সেখানে অনেক ধনী বিলিওনেয়ার। কিন্তু সেখানে আজও গণতন্ত্র নেই।  

আমাদের ভারতবর্ষ হলো গণতান্ত্রিক দেশ এবং আমাদের সংবিধানে তা পরিস্কার বলা আছে। নকশালরা কি আশা করেছিল যে তারা ভারতবর্ষে গণতন্ত্র মুছে দিয়ে এক পার্টির স্বৈরতন্ত্র আনবে?

জানিনা।

তবে এটা জানা যে বহু তত্ত্বের কচকচি দিয়েও এই আশা পূরণ করা প্রথম থেকেই অসম্ভব ছিল।    

এই আন্দোলনে সামিল হয়ে রঞ্জু তার ব্যক্তিগত জীবনে তার আদর্শের জন্যে অনেক আত্মত্যাগ করেছে। নিজের কথা ভাবেনি। দেশের কথা ভেবেছে, গরীব মানুষদের জীবনে পরিবর্ত্তন আনার কথা ভেবেছে। নিজের চাকরী যায় যাক, নিয়মিত কাজে কামাই করে গেছে রঞ্জু। মাসীর কথাও ভাবেনি সে।  পালিয়ে পালিয়ে লুকিয়ে কোথায় না থেকেছে সে তখন। কখনো কলকাতায় কোন বস্তীতে কখনো কোন গ্রামে কোন চাষীর বাড়ীতে।

তার তখন পাখীর চোখ বিপ্লব। কিন্তু সে যে একটা বিরাট মগজধোলাই এর চক্রান্তের শিকার হয়েছে, সেটা সে শেষ পর্য্যন্ত বুঝতে পেরেছিল কিনা আমি জানিনা। 

রতনদা’, মাসী, মাসীমণি আর মা

৪ ) রঞ্জুর পুলিশের হাতে ধরা পড়া

শেষ পর্য্যন্ত ১৯৭২ সালে চারু মজুমদার ধরা পড়েন। কাছাকাছি সময়ে রঞ্জু কেও পুলিশ ধরে হাজতে নিয়ে যায়। আমি তখন IBM এ কাজ নিয়ে দিল্লীতে ট্রেণিং এ। 

মা আর মাসী খবর পেয়ে পাগলের মত লালবাজারে রঞ্জুকে দেখতে বার বার ছুটে যান্‌। রতনদা’ মা আর মাসীকে লালবাজারে পুলিশ কমিশনার এর সাথে দেখা করাতে নিয়ে যান্‌। তা ছাড়া রতনদা’ হাজতে রঞ্জুর জন্যে মা আর মাসীর আনা খাবার ও পৌঁছে দেবার বন্দোবস্ত করেছিলেন বলে শুনেছি।

অচিস্মান ঘটক নামে একজন পুলিশের বড়কর্ত্তা – বোধ হয় ডি এস পি  ছিলেন – মা’দের যমশেরপুরের এক জ্যাঠতুতো  দিদির (রাঙাজ্যাঠা – শ্রী দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচীর মেয়ে ঊষারাণী দি’) ছেলে ছিলেন। মা আর মাসী তাঁর হাজরা রোডের বাড়ীতে গিয়ে তাঁকে রঞ্জুর ওপর হাজতে যেন কোন শারীরিক অত্যাচার না করা হয় তা’র জন্যে অনুরোধ করেছিলেন।

এ ছাড়া যিনি রঞ্জুর সবচেয়ে বড় পরিত্রাতা হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন, তিনি হলেন আমাদের মনোহরপুকুরের বড় জামাই, শ্রী রমাবিলাস গোস্বামী – আমাদের সকলের জামাইবাবু। রঞ্জু কে তিনি খুব ভাল চিনতেন, কেননা রঞ্জু প্রায় মনোহরপুকুরের বাড়ীর ছেলের মতোই হয়ে গিয়েছিল।

জামাইবাবু তখন ছিলেন ব্যাঙ্কশাল কোর্টের জজসাহেব। পুলিশের অনেক বড়  ছোট কর্ত্তার সাথে তাঁর দহরম মহরম ছিল। বিশেষ করে পুলিশের এক কুখ্যাত অফিসার – রণদেব (রুণু) গুহ নিয়োগী – কয়েদীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করার জন্যে যাঁর দুর্নাম ছিল – তাঁর সাথে জামাইবাবুর খুব ভাল সম্পর্ক ছিল।

জামাইবাবুর জন্যেই রঞ্জুর ওপরে পুলিশ কোন অত্যাচার করেনি।

তার আরো একটা কারণ ছিল এই যে পুলিশ জেনেছিল যে রঞ্জু নিজে ওদের দলের কোন উঁচু নেতা ছিলনা, এবং কোন খুনোখুনির ঘটনায় ও সে জড়িত ছিলনা।

সে ছিল শুধুমাত্র একজন আদর্শবাদী যুবক, নকশাল আন্দোলনের প্রতি যার   মতাদর্শের মিল ছিল, এবং সে ছিল পার্টির এক নীচুতলার কর্ম্মী, সে তার পার্টির জন্যে ছোটখাটো কাজ করতো, কোন নৃশংস হত্যাকান্ড বা অন্য কোন সেই জাতীয় অপরাধের সাথে তার কোন যোগ ছিলনা। 

যাই হোক, এর পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। পুলিশের হাত থেকে অল্পদিনের মধ্যেই রঞ্জু ছাড়া পেয়ে আবার তার পুরনো জীবনে ফিরে আসে।

বিয়ের পরে দেবযানী আর রঞ্জু

সুভদ্রা আর আমি আইরনসাইড রোডের বাড়ীতে রঞ্জু গার্গী আর দেবযানীর সাথে

আইরনসাইড রোডের বাড়ীতে মা আর মাসীর সাথে আমি আর রঞ্জু

৫ ) আবার সে এসেছে ফিরিয়া

WBCS পরীক্ষা দিয়ে সে Sales Tax এর অফিসার হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বহুদিন কাজে না যাওয়ায় তার মাইনে আটকে তাকে শো কজ করা হয়েছিল, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সেই কাজ সে ফিরে পায়, এবং অফিসার হিসেবে তার কাজে সুনাম হয়। পরে সে Sales Tax Officers’ Association এর সেক্রেটারীও হয়েছিল। একবার কোন কারণে ওর সাথে দেখা করতে বেলেঘাটাতে ওদের অফিসে গিয়েছিলাম, সেখানে তার প্রতিপত্তি দেখে খুব ভাল লেগেছিল। বহু লোক ওর সাথে দেখা করে ওর কাছ থেকে নানা আদেশ ও পরামর্শ নিচ্ছিল, বোঝাই যাচ্ছিল যে ওখানে তার যথেষ্ট সন্মান, খোদ কমিশনার সাহেবও ওর কাজে খুব সন্তুষ্ট।  

আবার সে আমাদের সাথে হেসে খেলে দিন কাটায়। আমরা ভাইবোনেরা  একসাথে কলকাতার কাছে বেড়াতে যাই, রঞ্জু আমাদের মধ্যে থাকে মধ্যমণি হয়ে। কখনো ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ, কখনো ব্যান্ডেল কখনো মায়াপুর, কখনো বোটানিকাল গার্ডেন্স।

মনোহরপকুরে সবাই মিলে তাস আর ক্যারম খেলা জমে ওঠে।

কিছু পরে আমাদের দু’জনেরই বিয়ে আর সন্তান হয়, আমরা নিজের নিজের সংসারে প্রবেশ করি।  নিজেদের আলাদা বৃত্ত তৈরী করে নিই। নানা ব্যস্ততার মধ্যে আমাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরী হতে থাকে।

তারপর ঘটনাচক্রে জীবিকার তাগিদে আমি বিদেশ চলে যাই।    

মায়াপুরে রঞ্জু আর দেবযানীর সাথে সুভদ্রা আমি আর খোকন

পিকনিকে প্যাডল বোটে রঞ্জু

রঞ্জু আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু আমাদের মনে  নানা  স্মৃতির মধ্যে সে এখনো উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে।  তার দুষ্টুমি ভরা হাসি আর সব সময় সবার পিছনে লাগার কথা এখনো মনে পড়ে।

সুভদ্রা গল্প করে যে একবার অনেকে মিলে দক্ষিণেশ্বর যাওয়া হয়েছে। মন্দিরে দর্শন সেরে ফেরার সময় সুভদ্রা দেখে তার একটা চটি নেই।  কোথায় গেল? অনেক খোঁজা খুঁজি করে যখন কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছেনা, হঠাৎ সুভদ্রার খেয়াল হলো এটা নিশ্চয় রঞ্জুর কাজ।

“এই রঞ্জু, কোথায় লুকিয়ে রেখেছো আমার চটি?”

রঞ্জু “আমি কি জানি” বলে তার দুষ্টু হাসিটা হেসে শেষ পর্য্যন্ত বের করে দিয়েছিল সুভদ্রার চটি।

এই বার্ধক্যে পৌঁছে রঞ্জু কে খুব মনে পড়ে।  আর তাকে মনে পড়লে অবধারিত মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের “হতভাগ্যের গান” কবিতার এই লাইন গুলো।

আমরা সুখের স্ফীত বুকের ছায়ার তলে নাহি চরি/

আমরা দুখের বক্র মুখের চক্র দেখে ভয় না করি/

ভগ্ন ঢাকে যথাসাধ্য, বাজিয়ে যাবো জয়বাদ্য/

ছিন্ন আশার ধ্বজা তুলে ভিন্ন করব নীল আকাশ/

হাস্যমুখে অদৃষ্টের করবো মোরা পরিহাস/

ভগবানের কাছে রঞ্জুর আত্মার শান্তি  প্রার্থনা করি।

রঞ্জু আর অলিম্পিক    

অলিম্পিক এলেই আমার রঞ্জুর কথা মনে পড়ে।

রঞ্জু আমার মেজমাসীর ছেলে, ছোটবেলা থেকেই আমরা ছিলাম যাকে বলে অভিন্নহৃদয়, হরিহরাত্মা। মা আর আমার মেজমাসী পিঠোপিঠি বোন ছিলেন, মাসী মা’র থেকে প্রায় আট বছরের বড় হলেও তাঁদের দুই বোনের মধ্যে দুর্দ্দান্ত bonding ছিল, মা আমায় নিয়ে ছুটির দিনে প্রায়ই হাজরা মোড় থেকে তেত্রিশ নম্বর বাসে চেপে এন্টালী তে মাসীর বাড়ীতে চলে যেতেন। খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে মা আর মাসী দু’জনে বিছানায় মুখোমুখি বসে গল্প করতেন, আমি আর রঞ্জু বাড়ীতে কিংবা বাড়ীর বাইরে সারা দুপুর বিকেল খেলা করে বেড়াতাম। রঞ্জু ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত, সেই তুলনায় আমি শান্ত আর চুপচাপ ছিলাম, আমাদের দু’জনের গভীর বন্ধুত্ব হবার সেটাও একটা কারণ হতে পারে।

এই ২০২৪ সালে এখন প্যারিসে অলিম্পিক চলছে, আমার মনে পড়ে যাচ্ছে চৌষট্টি বছর আগে ১৯৬০ সালের টোকিও  অলিম্পিকের কথা। তখনই আমাদের প্রথম অলিম্পিক নিয়ে উৎসাহ শুরু হয়। আমরা সব পুরনো এবং সমসাময়িক  অলিম্পিক hero দের সম্পর্কে পড়াশোনা করে নানা তথ্য আহরণ করতে শুরু করে দিলাম। এমিল জ্যাটোপেক, পাভো নুরমি, জেসি ওয়েন্স, বব্‌ বিমন, আবেবে বিকিলা, কিপজোগ কিনো, সারজি বুবকা, এদের সবার কীর্ত্তিকলাপ জানার জন্যে আমরা মাঝে মাঝে থিয়েটার রোডের ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরীতে চলে যেতাম। সেখানে World Sports পত্রিকার পাতায় পাতায় এইসব কিংবদন্তীদের নিয়ে অনেক খবর।

আসলে আমাদের ওই বয়সে মনের জানলা গুলো ক্রমশঃ খুলছে, তাই অলিম্পিকের আদর্শ, সারা পৃথিবীর দেশের athlete আর sportsman মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যাপারটা সেই ১৯৬০ সালে আমাদের মনকে খুব উদ্বুদ্ধ আর অনুপ্রাণিত করেছিল মনে পড়ে। আমরা নিজেদের মধ্যে প্রায় “অলিম্পিক অলিম্পিক” খেলেছি, কখনো আমি জাপান, রঞ্জু চীন, কিংবা আমি East Germany, রঞ্জু Russia , অথবা আমি USA, রঞ্জু England !  রঞ্জুদের বাড়ীর একতলার সিঁড়িতে রবারের বল kick করে  ওপরে পাঠিয়ে বলটা ক’বার drop করে নীচে নামলো, কিংবা দৌড়ে ওপরের তিন নম্বর ফ্ল্যাটের দরজা ছুঁয়ে কে আগে নেমে আসতে পারে এই সব হিসেব করে পয়েন্ট count করে আমরা নিজেদের সোনা রূপো ব্রোঞ্জ মেডেল দিতাম। ওই দেশগুলোর হয়ে আমরা অনেক মেডেল জিতেছি সেই সময়!

খেলাধূলার ব্যাপারে ক্রমশঃ রঞ্জুর উৎসাহ আর উদ্দীপনা বাড়তে থাকে, খেলাধূলা সংক্রান্ত যাবতীয় খবর – Sports statistics –   সমস্ত অলিম্পিক আর world রেকর্ড, বিশেষ করে track and field event এর, তাছাড়া দেশের এবং বিদেশের  ক্রিকেট টেনিস আর ফুটবল এর  কত খবর যে সে রাখতো ভাবলে বেশ অবাক লাগে। তখন তো আর এখনকার মত Google search বা Wikipedia ছিলনা, যে কোন Sports related information পেতে গেলে রঞ্জুই ছিল আমাদের প্রধান source…

২   

শঙ্করীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ক্রিকেট নিয়ে দুটি বই লিখেছিলেন, “ইডেনে শীতের দুপুর” আর “বল পড়ে ব্যাট নড়ে”। এই দুটো বই  ক্রিকেট এর ইতিহাস নিয়ে নানা ঘটনা আর তথ্যে সমৃদ্ধ ছিল, বিশেষ করে আদি যুগের ক্রিকেট, W G Grace থেকে Don Bradman পর্য্যন্ত ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বিশেষ করে বডিলাইন সিরিজ নিয়ে সেখানে অনেক লেখা ছিল। রঞ্জুর কাছে  ওই বই দুটো ছিল, মাসীর বাড়ীতে খেয়ে দেয়ে উঠে সারা দুপুর প্রায়ই রঞ্জু ওই বই থেকে আমায় পড়ে শোনাতো। পড়তে পড়তে রঞ্জু উত্তেজিত হয়ে উঠতো, মনে হত ও যেন সেই সব দিনে গিয়ে ফিরে গেছে, তার চোখের সামনে খেলা হচ্ছে আর সে তার live ধারা বিবরণী দিচ্ছে। শঙ্করীপ্রসাদের লেখার গুণে আর রঞ্জুর সেই উত্তেজিত ভঙ্গী তে পড়া দুই এ মিলিয়ে সেই দুপুর গুলো দারুণ উপভোগ্য হয়ে উঠতো আমার কাছে।

সব চেয়ে বেশী মনে পড়ে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টাই টেস্টের কথা। ফ্র্যাঙ্ক ওরেল এর ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর রিচি বেনোর  অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ব্রিসবেন এ খেলাটা হয়েছিল ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে। শঙ্করীপ্রসাদ তাঁর বই তে সেই টেস্ট ম্যাচ নিয়ে পুরো একটা chapter  লিখেছিলেন, যার মধ্যে টানটান রোমাঞ্চে ভরা বিখ্যাত শেষ ওভার নিয়েই বেশ কয়েক পাতা লেখা হয়েছিল। সেই chapter টা রঞ্জু যে কতবার পড়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। পড়তে পড়তে তার ওই শেষ ওভারটা পুরোটা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, পরের দিকে বই দরকার হত না, রঞ্জু গড় গড় করে তার ওই উত্তেজিত গলায় verbatim বলে যেত, আর আমরা যারা শুনতাম তারা রঞ্জুর সাথে সাথে উত্তেজিত আর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতাম।

রঞ্জু পড়ছে, তার গলা কাঁপছে উত্তেজনায়, চার নম্বর বল, মেকিফ যা থাকে কপালে বলে ধুমধাড়াক্কা ব্যাট চালালো। যাকে বলে তাড়ু। দুই রান হয়ে গেছে, দুই দলের এখন সমান সমান রান, এখন জেতার জন্যে আর এক রান দরকার। কিন্তু তৃতীয় রান নিতে গিয়ে কনরাড হান্টের অব্যর্থ থ্রো সোজা আলেক্সান্ডার এর হাতে। মেকিফ রান আউট।

রান সমান সমান। জিততে এক রান, হাতে দুই বল, এক উইকেট। সারা মাঠে তুমুল উত্তেজনা। কি হয়, কি হয়!

লাস্ট ব্যাটসম্যান লিন্ডসে ক্লাইন। এসেই সে সাত নম্বর বলে রান নেবার জন্যে ব্যাট হাঁকড়ালো। ব্যাটে বলে হলেও রান নেওয়া যায়না, বল গেছে সলোমনের হাতে। তা সত্ত্বেও রান নেবার জন্যে মরিয়া হয়ে আম্পায়ারের দিক থেকে মেকিফ ছুটলো উইকেট ছেড়ে, আর প্রায় বারো মিটার দূর থেকে সলোমনের থ্রো মেকিফের উইকেট ছিটকে দিল।

ম্যাচ টাই।

সারা বিশ্বের ক্রিকেট ইতিহাসে সেই প্রথম টাই ম্যাচ!

১৯৬০ সালের সেই ঐতিহাসিক প্রথম টাই টেস্টের পরে টেস্ট, লিমিটেড ওভার‌ আর টি টোয়েন্টি ম্যাচে নেকবার টাই  হয়েছে,  কিন্তু  প্রথম বারের মত সেই উর্ধশ্বাস উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ বোধ হয় আর কোন ম্যাচে হয়নি।  

এখন তো ইউটিউব গুগল এই সব থেকে সেই ম্যাচটা চাইলেই দেখা যায়, সেই ম্যাচ নিয়ে বহু আলোচনা analysis ইত্যাদি সব এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় তো সেসব ছিলনা, আমাদের ছিলেন শঙ্করীপ্রসাদ, আর ছিল রঞ্জু।

শঙ্করীপ্রসাদের লেখনীর গুণে আর রঞ্জুর  অননুকরণীয় পড়ার সুবাদে মাসীর বাড়ীতে কাটানো সেই দুপুরগুলো আমার কাছে এখনও স্মরনীয় হয়ে আছে।      

৩   

রঞ্জু আর আমি খুব একসাথে কলকাতার রাস্তায় হেঁটেছি এক সময়। গল্প করতে করতে কতবার আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ী থেকে পার্ক সার্কাস হয়ে এন্টালীর সুন্দরীমোহন এভিনিউর কাছে ক্রিস্টোফার রোডে সি আই টি বিল্ডিং এ মাসীর বাড়ী (দুই নম্বর ব্রীজের পাশে) হেঁটে গেছি, উত্তর কলকাতা ভাল চিনিনা বলে দু’জনে শিয়ালদা’ থেকে শ্যামবাজার চষে বেড়িয়েছি।

দু’জনে পাশাপাশি হাঁটার সময়ে আমাদের অনেক গল্প হত।  রঞ্জু তার জীবনের নানা গল্প করতো, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে পড়ার সময় হোস্টেলের বন্ধুদের গল্প, মিশনের মহারাজদের গল্প, আর সবচেয়ে বেশী করতো খেলাধূলার জগতে তার নিজের ব্যক্তিগত নানা উজ্জ্বল সাফল্যের গল্প। আমি শুনতাম।

একবার ময়দানে ঘেরামাঠে ফুটবল ম্যাচ দেখে দু’জনে ফিরছি। ইস্টবেঙ্গল পুলিশ কে ২-০ হারিয়েছে, তাই রঞ্জু খুব খুসী। এস এন ব্যানার্জ্জী রোডে অনাদির দোকানে মোগলাই পরোটা খেয়ে আমরা ধর্ম্মতলা স্ট্রীট  ধরে মৌলালীর দিকে হাঁটছি। অফিস পাড়ায়,  ডালহাউসী এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে সন্ধ্যা নামছে, কর্ম্মক্লান্ত দিনের শেষে সবাই ঘরে ফিরছে, বাসে বাদুড়ঝোলা লোক, রাস্তায় জনস্রোত।

সেই ক্রমশঃ নেমে আসা সন্ধ্যার অন্ধকারে ভীড়ের রাস্তায় আমরা দুজনে পাশাপাশি হাঁটছি। রঞ্জু শুরু করলো নরেন্দ্রপুরে স্কুলের Sports এর গল্প। Middle Distance (৫০০০ মিটার) এর  final, রঞ্জুর প্রধান opponent যে ছেলেটি সে হলো স্কুলের চ্যাম্পিয়ন দৌড়বাজ, তাকে গত কয়েকবছর কেউ হারাতে পারেনি, তার যেমন দম, তেমনই স্পীড। রঞ্জু মনে মনে ঠিক করেছে তাকে এবার হারাতেই হবে।

প্রত্যেক খেলাতেই জেতার জন্যে একটা mental preparation দরকার, যাকে বলে game plan বা strategy, middle বা long distance run এর strategy হল কিভাবে প্রথম থেকে শেষ পর্য্যন্ত দম ধরে রেখে দৌড়বে, প্রথম থেকেই pace set করে এগিয়ে যাবে না Mo Farahর মত প্রথমে দম conserve করে পিছিয়ে থাকবে, শেষ রাউন্ডে গিয়ে accelerate করে এগিয়ে যাবে।

রঞ্জু ঠিক করেছে সে Mo Farah র strategy adopt করে প্রথমে পিছনে থাকবে, তারপর আস্তে আস্তে স্পীড বাড়িয়ে এগোবে।  

রেস শুরু হয়ে গেছে, আমরা হাঁটছি। মাঠটা বারো পাক দিতে হবে। শুরুর দুই রাউন্ড পরে রঞ্জু একদম শেষে, প্রধান প্রতিপক্ষ ছেলেটি একদম আগে এগিয়ে গেছে, মাঝখানে এক ঝাঁক ছেলে। রঞ্জু হাঁটতে হাঁটতে তার স্বভাবোচিত উত্তেজিত গলায় রেসের minute to minute পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে যাচ্ছে।

ওয়েলিংটন স্কোয়ার যখন পৌঁছলাম তখন বেশ অন্ধকার, রাস্তার আলো সব জ্বলে উঠেছে, ঢং ঢং করে ঘন্টি বাজিয়ে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে ট্রাম। বাদুড়ঝোলা প্রাইভেট বাসের কন্ডাকটর রা “মৌলালী, শিয়ালদা’, বৌবাজার” বলে ডাক দিচ্ছে।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত সন্ধ্যা নামে/ ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে নেয় চিল/

পৃথিবীর সব আলো নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জ্বোনাকীর রঙে ঝিলমিল/

সব পাখী ঘরে ফেরে, সব নদী…

ধর্ম্মতলা থেকে তালতলা হয়ে আমরা এস এন ব্যানার্জ্জী রোডে পড়ে ভেতরের গলি দিয়ে মৌলালীর দিকে এগোচ্ছি। এইসব  রাস্তা অলি গলি রঞ্জুর সব চেনা।

এদিকে ছয় পাক ঘোরা হয়ে গেছে, রঞ্জু এখন স্পীড বাড়াতে শুরু করেছে, সে এখন মাঝামাঝি, লীডার ছেলেটি তবুও অনেকটা সামনে।

আমরা যখন মৌলালী পৌছলাম তখন দশ পাক ঘোরা হয়ে গেছে, আর দুটো পাক বাকী, রঞ্জু এই বার  accelerate করতে শুরু করলো। সার্কুলার রোড পেরিয়ে ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা, আনন্দ পালিতের পার্কে যখন পৌঁছলাম, তখন একেবারে শেষ রাউণ্ড।

রঞ্জুর গলায় উর্দ্ধশ্বাস উত্তেজনা ফুটে বেরোচ্ছে, লীডারের সাথে তার gap ক্রমশঃ কমে আসছে, তারা এখন প্রায় সমান সমান। কিন্তু আরো কয়েকজন রঞ্জুর পিছনে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, রঞ্জু মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে তাদের দেখছে। এদের মধ্যে কেউ তাকে ছাড়িয়ে যাবে নাকি? তাহলে তো সর্ব্বনাশ। পক্ষীরাজের মত হাওয়ায় ভর দিয়ে ছুটে চলেছে রঞ্জু, সেই সত্যেন দত্তের রানারের মতঃ

রঞ্জু সবেগে হরিণের মত ধায়…  

আনন্দ পালিত  পার্কে পোঁছে আমি রঞ্জুকে বললাম চল্‌ পার্কে একটু বসে চীনেবাদাম খাই, পা ব্যথা করছে।

রেসে শেষ পর্য্যন্ত কি হয়েছিল তা আর মনে নেই, কিন্তু সেই পার্কে দু’জনে পাশাপাশি বসে চীনেবাদাম খাওয়াটা বেশ  মনে আছে।

৪   

আর একবার, তখন আমরা কলেজে পড়ি, আমি খড়গপুরে, রঞ্জু কলকাতায় মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজে। একদিন বিকেলে দু’জনে পার্ক সার্কাস ময়দানে হাঁটছি। রঞ্জু শুরু করল তার কলেজের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতার ফাইনাল এর গল্প। ফাইনালে রঞ্জুর প্রতিপক্ষ কলেজের ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন। সে state level এ খেলে, ব্যাডমিন্টনে তার দুর্দ্দান্ত stamina আর skill, তাকে হারানো প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু রঞ্জুর ডিকশনারী তে অসম্ভব বলে কোন শব্দ নেই। সে জানে যে কোন খেলায় জিততে গেলে যেটা সবচেয়ে বেশী দরকার তা হলো জেতার অদম্য ইচ্ছে, একটা লড়াকু মনোভাব, ইংরেজী তে যাকে বলে mental fortitude, আমি জিততে পারি এই আত্মবিশ্বাস। আর যেটা দরকার তা হলো court coverage, anticipation – opponent এর strategy বুঝে মনে মনে একটা game plan তৈরী করা এবং খেলার সময় সেই game plan কাজ না করলে Plan B কিংবা Plan C আগে থেকে তৈরী করে রাখা। যে কোন খেলাই ultimately একটা mind game, তাই ওই ছেলেটির মত stamina আর skill রঞ্জুর হয়তো নেই, কিন্তু mind game জেতার জন্যে তার আছে মগজাস্ত্র।     

খেলা শুরু হয়ে গেছে, আমরা হাঁটছি, রঞ্জু শট বাই শট ধারাবিবরণী শুরু করে দিয়েছে। “ও একটা দারুণ overhead smash করলো, আমি কোনমতে তুলে দিলাম, আমি একটা ব্যাকহ্যান্ড ড্রপ শট মারলাম একেবারে নেট ঘেঁষে”, ইত্যাদি।

তিন রাউন্ড হাঁটার পর প্রথম গেমটা শেষ হলো। রঞ্জু হেরে গেল ১৫-২১। কোর্টের পাশে দাঁড়িয়ে তার বন্ধুরা খুব উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে, রঞ্জু যে ওই চ্যাম্পিয়ন ছেলেটিকে এরকম fight দেবে তারা আশাই করেনি।

দ্বিতীয় গেম শুরু হলো।

প্রথম থেকেই এই গেমে রঞ্জু দুর্দ্ধর্ষ খেলছে, অপোনেন্টের smash আর drop shot সে দুর্দ্দান্ত anticipate করে ঠিক জায়গায় পোঁছে গিয়ে return করে দিচ্ছে, রঞ্জু নিজেই জানেনা কি করে সে এত ভাল খেলছে, প্রমথ চৌধুরীর মন্ত্রশক্তি গল্পের মত তাকে মনে হয় কোন অদৃশ্য শক্তি ঘাড় ধরে খেলাচ্ছে। তার প্রতিপক্ষ কিছুটা ব্যাকফুটে, তার আত্মবিশ্বাস যেন কিছুটা হলেও কমছে, এদিকে রঞ্জু একটা করে পয়েন্ট পাচ্ছে আর দর্শকদের মধ্যে রঞ্জুর বন্ধুরা উল্লাসে ফেটে পড়ছে।

দ্বিতীয় গেমটা রঞ্জু শেষ পর্য্যন্ত যখন জিতলো তখন আমাদের পার্ক সার্কাস ময়দানের বিশাল মাঠে আরো তিন রাউন্ড হাঁটা হয়ে গেছে। আমি রঞ্জুকে বললাম চল্‌ এবার বাড়ী ফেরা যাক, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাকিটা বাড়ী যেতে যেতে যেতে শুনবো।

বাড়ী ফিরতে ফিরতে তৃতীয় গেম শুরু হল। সে এক হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ, লম্বা লম্বা rally, কেউ কাউকে ছাড়বেনা। ১০-১০, ১২-১২, ১৫-১৫, ১৮-১৮… কোর্টে যেন আগুণ লেগে গেছে~ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুরা সবাই রঞ্জুর জন্যে গলা ফাটাচ্ছে।  

Dangerous smashes, delectable flicks, deadly drop shots…

বাড়ী পর্য্যন্ত যখন এসেছি, তখন ২০-২০। একেবারে চূড়ান্ত সাসপেন্স।

রঞ্জু বলল মান্টুদা, চলো আর একটু এগিয়ে যাই।

সেদিন ম্যাচ এর রেজাল্ট কি হয়েছিল আমার আর মনে নেই, কেবল এটুকু মনে আছে যে মৌলালীতে গিয়ে ম্যাচ শেষ হয়েছিল।

আজ রঞ্জু আর নেই। আমি কাজ থেকে অবসর নিয়ে কলকাতা ফিরে এসেছি।

মনে হয় রঞ্জূটা আজ থাকলে বেশ হত, দু’জনে মিলে আবার আগের মত কলকাতার রাস্তায়, ঢাকুরিয়া লেকে কিংবা পার্ক সার্কাস ময়দানে গল্প করতে করতে হাঁটতাম।

ছোটবেলার মত এখন আবার হাতে অফুরন্ত সময়।

খেলার জগতে ওর সাথে আলোচনা করার মত আরও কত ঘটনা ঘটে গেছে ও চলে যাবার পর। ২০১০ সালের Soccer World Cup এ Ghanar বিরুদ্ধে Uruguyar Suarez এর হাত দিয়ে অবধারিত গোল বাঁচানো, শ্রীলঙ্কার মুরলী কে New Zealand এর Wicket keeper captain ব্রেন্ডন ম্যাকালাম এর unsporting রান আউট, ২০০৯ সালের Andy Roddick আর Roger Federer এর অবিশ্বাস্য লম্বা Wimbledon Final… 

তাছাড়া ইউসেন বোল্ট কিংবা মাইকেল ফেল্পস কে নিয়ে আলোচনা করেই রঞ্জুর সাথে পুরো একটা দিন কাটিয়ে দেওয়া যেত অনায়াসে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় তা আর সম্ভব নয়। 

অলিম্পিক এলেই খুব রঞ্জুর কথা মনে পড়ে।

ইন্দোর  হইতে বিদায়, ২০১৭

সুচরিতা উদয় আর সুভদ্রার সাথে মাসীমণি

সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কিছুদিন আগে ইন্দোর গিয়েছিলাম, মাসীমণির সাথে দেখা করতে। মাসীমণি আমার ছোটমাসী, মা’দের  পাঁচ বোনের মধ্যে সব চেয়ে ছোট বোন, মেসোমশায় চলে যাবার পরে উনি একাই ইন্দোরে থাকতেন, ওঁদের একমাত্র ছেলে উদয় থাকে কানাডায়।

ইন্দোরে একটা নামকরা মেয়েদের স্কুলে ডাকসাইটে  প্রিন্সিপাল হিসেবে মাসীমণির খুব নামডাক ছিল, রিপাবলিক ডে তে রাষ্ট্রপতি শংকরদয়াল শর্মার হাত থেকে  তিনি পুরস্কার নিচ্ছেন সেই ছবি এখনো তাঁদের বাইরের ঘরের দেওয়ালে টাঙানো আছে।

মাসীমণি বরাবরই   ইংরেজী তে যাকে বলে fiercely independent, কিন্তু ইদানীং তাঁর শরীর আর মন ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে, একা একা থাকা আর সম্ভব হচ্ছেনা। তাই উদয় মা’কে নিজের কাছে কানাডায় নিয়ে যেতে এসেছে। 

মাসীমণি র সাথে আবার কবে দেখা হবে কে জানে, এই ভেবে সুভদ্রা আর আমি ইন্দোরে গেলাম কয়েকদিনের জন্যে।

পাকাপাকি কানাডা যাবার আগে  উদয়ের অনেক কাজ। আমি যত টা পারি ওর সাথে সাথে থাকছি।  একদিন দু’জনে মিলে গেলাম ওদের বাড়ির কাছে স্টেট ব্যাঙ্কের একটা ব্রাঞ্চে।   

ইন্দোর শহরে স্টেট ব্যাঙ্কের এই ব্রাঞ্চ টা খুব একটা ছোট নয়, অনেক লোকজন কাজ করছে, ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও ব্যাঙ্কের ম্যানেজার আমাদের অনেকটা সময় দিলেন, তারপরে সব শুনে আমাদের পাঠালেন Assistant  ম্যানেজারের কাছে। সেই ভদ্রলোকের বৌ আবার মাসীমণির ছাত্রী ছিলেন, তাই তিনি তো উদয়কে দেখে একেবারে বিগলিত, কি করে উদয়কে খাতির করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। কেমন আছেন স্যার, ম্যাডাম কেমন আছেন স্যার, ওনাকে নিয়ে কানাডা নিয়ে যাচ্ছেন শুনলাম স্যার, উনি কবে ফিরবেন স্যার, আমি আর আমার বৌ যাবার আগে একবার দেখা করতে আসবো স্যার,  ইত্যাদি তিনি বলেই চললেন, তাঁর কথা আর ফুরোয় না।  তার ওপর কি খাবেন স্যার, বলে  চায়ের বন্দোবস্তও করে ফেললেন চট করে। চা খাওয়ার পর অনেকক্ষন খেজুরে গল্প হলো আমাদের, তার পরে তিনি আমাদের পাঠালেন এক মহিলার কাছে, আর যতক্ষণ না সেখানে আমাদের কাজ শেষ হয়, বেশ কয়েকবার এসে খোঁজ করে গেলেন, কি সব ঠিক আছে তো স্যার! সেই মহিলারও দেখলাম মাসীমণির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, বার বার বলছিলেন ম্যাডাম কানাডা চলে যাবেন জেনে কি খারাপ যে লাগছে।

আমি তো এই সব দেখে যাকে বলে থ~

আমি তো কলকাতার স্টেট ব্যাঙ্ক দেখে অভ্যস্ত। সেখানে এই আন্তরিকতা কোথায়?  চেক বই ফুরিয়ে গেলে সেখানে কাউন্টারে গিয়ে নতুন চেক বই চাইতেও ভয় করে। এমন ভাবে তাকাবে যেন ভীষন অপরাধ করে ফেলেছি। “এত তাড়াতাড়ি চেক বই কেন ফুরিয়ে যায় মশাই? কাল আসুন, আজ আমার সময় নেই। ” কিংবা “যিনি নতুন চেক বই ইস্যু করেন তিনি এক সপ্তাহ ছুটিতে আছেন। দশ দিন পরে আসুন।”

উদয়ের  পাশে বসে এই সব দেখে আমার মনে হচ্ছিল, এ কি রে, আমি কি ব্যাঙ্কে কোন কাজ নিয়ে এসেছি না কোন আত্মীয় কিংবা বন্ধুর বাড়ীতে দেখা করতে এসেছি?

কাজ হয়ে গেলে সবাই কে হাত নেড়ে  বিদায় জানিয়ে দরজার বাইরে গিয়ে দেখি ইউনিফর্ম পরা একজন সিপাই একটা বিশাল ভারী গাদা বন্দুক নিয়ে ব্যাজার মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি  উদয় কে বললাম দ্যাখ্‌ এই লোকটার বন্দুকটা, মনে হচ্ছে এটা শেষ বার সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। এটা দিয়ে আজ কি আর গুলি চলে?

আমার কথা শুনে  উদয়  সেই দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করে বসলো, “আচ্ছা ভাই তোমার এই বন্দুকটা  কি কোন কাজে লাগে, না স্রেফ লোক কে ভয় দেখাবার জন্যে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো?”

উদয়ের এই প্রশ্ন শুনে লোকটি খুব hurt হয়েছিল মনে আছে।

“কেয়া বাত করতেঁ হ্যায় সাহাব?”, খুবই ক্ষুণ্ণ হয়ে সে বলেছিল মনে আছে।   

তার কাছ থেকে জানা গেল যে অল্প কিছুদিন আগে এই বন্দুক দিয়ে গুলি ছুঁড়ে সে এক ব্যাঙ্ক ডাকাতি থামিয়ে সরকারের কাছ থেকে ইনাম পেয়েছে। তাছাড়া self-defence এর অজুহাতে তার নাকি মানুষ মারার লাইসেন্স ও আছে, কোন ব্যাঙ্ক ডাকাত কে মেরে ফেললেও তার কোন শাস্তি হবেনা।

আমের বদলে স্ট্যাম্প

মামা বাড়ীর বাগানে রঞ্জু ভাস্বর আর চার বোন

আমার চার মামাতো ভাই বোন, ঝুমুদি, রুমি, ভাস্বর আর মিনি। এছাড়া ছিলাম আমি আর আমার মেজমাসীর ছেলে রঞ্জু। আমরা সবাই পিঠোপিঠি ভাই বোন বলে একসাথে হলে খুব হৈ হৈ করতাম। আর হৈ হৈ করার জন্যে আসানসোলে মামার কোর্ট রোডের  বিশাল বাগানবাড়ীটা ছিল যাকে ইংরেজীতে বলে আইডিয়াল। স্কুলে পড়ার সময় মাস দুয়েক গরমের ছুটির  সময় মা আর মাসীর সাথে আমি আর রঞ্জু আসানসোলে মামা বাড়ীতে কিছুদিন কাটিয়ে আসতাম।  

ভাস্বরের সাথে এখন দেখা হলে ছোটবেলার এই সব ছুটির দিনগুলোর গল্প হয়। সেই সব দিনের নানা ছোটখাটো মজার ঘটনার কথা ভাস্বরের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল। আর ভাস্বরের গল্প বলার একটা নিজস্ব স্টাইল আছে। প্রথমতঃ সেই সব ছোটবেলার গল্প সবই হাসি আর মজার। আর দ্বিতীয়তঃ গল্প বলার সময় কোন সেই সব মজার জায়গায় এলে ভাস্বর প্রাণ খুলে গলা কাঁপিয়ে হা হা হো হো করে হাসে, সেই হাসি দেখে তখন যে গল্প শুনছে তার ও হাসি পেয়ে যাবেই। তৃতীয়তঃ ভাস্বরের গলা কাঁপানো হাসিটা আবার ললিত বা বেহাগ রাগের খেয়ালের মত, যা কিনা আলাপ থেকে ঝালার মত ধীরে ধীরে ক্রমশঃ নীচু থেকে উঁচুতে স্পীড বাড়িয়ে উঠতে থাকে এবং গলার সাথে সাথে ভাস্বরের সারা শরীর ও কেঁপে কেঁপে ওঠে।  আর চতুর্থতঃ ভাস্বর এই সব গল্প বলার মধ্যে মাঝে মাঝেই সে “মান্টু দা’, একবার চিন্তা করে দেখো অবস্থাটা”, কিংবা “মান্টুদা’ দৃশ্যটা একবার কল্পনা করো” বলে  শ্রোতাকে (এ ক্ষেত্রে আমাকে) একেবারে গল্পের পরিবেশে নিয়ে যায়, যেন আমি পুরো ঘটনাটা চোখের সামনে ছবির মত দেখতে পাই।

সব মিলিয়ে ভাস্বরের মুখে কোন গল্প শোনা একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা।      

এই গল্পটা ভাস্বরের মুখে সম্প্রতি শুনলাম। এই গল্পে মূল চরিত্র হলো ভাস্বর আর রঞ্জু। আর পার্শ্বচরিত্রে মামা আর মামীমা।

গরমের ছুটিতে রঞ্জুকে মাসী আসানসোলে মামার বাড়ীতে রেখে এসেছেন। ভাস্বর আর রঞ্জু ছুটির দিনগুলো কোর্ট রোডের বাড়ীর বিশাল বাগানে হুটোপাটি ছুটোছুটি আর দৌরাত্ম্য করে বেড়াচ্ছে।

ওদের দু’জনের আবার দেশ বিদেশের স্ট্যাম্প জমানোর অভ্যেস, সেই সব স্ট্যাম্প আদান প্রদান হয় দু’জনের মধ্যে।  রঞ্জুর কাছে একটা ইউরোপের কোন এক দেশের রং বেরং এর সুন্দর ছবি আঁকা একটা বড় স্ট্যাম্প আছে। ভাস্বরের ওই স্ট্যাম্পের ওপর খুব লোভ। কিন্তু রঞ্জু কিছুতেই সেই স্ট্যাম্প তাকে দিতে রাজী হচ্ছেনা।

একদিন সকালে দুই ভাই বাড়ীর বাগানে একটা বিশাল ডালপালাওয়ালা আমগাছে চড়ে গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করছে, এমন সময় রঞ্জু হঠাৎ দ্যাখে টুকটুকে লাল একটা পাকা আম সরু একটা ডালের ওপর ঝুলছে। সেই সরু ডালে গিয়ে রঞ্জুর পক্ষে ওই আম পাড়া সম্ভব নয়, কিন্তু ভাস্বরের শরীর হাল্কা আর নমনীয়, সে অনায়াসে ওই আমটা পেড়ে আনতে পারে।

রঞ্জু ভাস্বর কে বললো, “তুই যদি আমায় ওই আমটা পেড়ে এনে দিস, তাহলে ওই স্ট্যাম্পটা আমি তোকে দেবো।”

আমি ভাস্বর কে বললাম, “এতো সেই নাকের বদলে নরুণ পাবার গল্প হয়ে গেল!”

ভাস্বর তার শরীর আর গলা কাঁপানো হাসিটা হেসে বললো, “ঠিক বলেছো মান্টুদা’, আমের বদলে স্ট্যাম্প পেলাম, টাক ডুমা ডুম ডুম!”

ছোটবেলায় এই ধরণের barter বা দেয়া নেয়া বেশ স্বাভাবিক ছিল।

তো ভাস্বর সেই সরু ডাল বেয়ে প্রায় আমের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, হাত বাড়িয়ে আমটা পাড়তে যাবে, এমন সময় হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে ডালটা আচমকা দুলে উঠলো, আর ভাস্বর টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে যেতে কোনমতে দুই হাতে ডালটা ধরে ঝুলে রইলো।

এদিকে তাই দেখে রঞ্জু তো প্রাণপনে চ্যাঁচাতে শুরু করে দিয়েছে। বাড়ীতে অনেক কাজের লোক, কিন্তু কেউ রঞ্জুর চ্যাঁচানী শুনতে পাচ্ছেনা, তাই বেশ কিছুক্ষন ভাস্বর ডাল ধরে ঝুলে আছে, এদিকে হাওয়া দিচ্ছে বেশ জোরে, ডালটাও দুলছে, আর কতক্ষন ভাস্বর ঝুলে থাকতে পারবে বলা কঠিন।

গাছের তলায় কিছু লোহার রড আর ইঁটের টুকরো জড়ো করা ছিল, সেই জন্যে ভাস্বর মাটিতে পড়লে বেশ চোট পাবে, হাত পা ভেঙেও যেতে পারে।

এই রকম সময় রঞ্জুর আর্ত্তনাদ কানে আসায় কিছু একটা হয়েছে ভেবে মামা আর মামীমা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো দু’জনে কেমন যেন চিত্রার্পিত হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন, কাজের লোকদের ডাকছেন না, গাছের তলায় গিয়ে ভাস্বর কে উদ্ধার করার ও কোন চেষ্টা করার লক্ষণ দেখাচ্ছেন না।

ভাস্বর তার ললিত রাগে গলা কাঁপানো হাসি হেসে বললো “মান্টুদা’ দৃশ্যটা একবার কল্পনা করো…”

আমি দৃশ্যটা কল্পনায় পরিস্কার দেখলাম। একেবারে ছবির মতো। অল্প হাওয়ায় গাছের ডাল দুলছে,  এবং সেই ডাল ধরে ভাস্বর ঝুলছে। আর ওদিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মামা আর মামীমা স্থানুর মত দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের মুখে কোন কথা নেই।

হঠাৎ মামীমা মামাকে বলে উঠলেন, “গাড়ীটা গ্যারেজ থেকে বের করো~”

মামীমার এই কথা শুনে মামা বেশ অবাক হয়ে গেছেন, তিনি বললেন, “গাড়ী? গাড়ী বের করবো কেন?”

মামীমা বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “কি আশ্চর্য্য, তোমার ছেলে তো এখুনি গাছ থেকে পড়ে হাত পা কিছু একটা ভাঙবে, তখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবেনা?”

খুব উচ্চস্বরে বেহাগ রাগে তার শরীর কাঁপানো হাসি হেসে ভাস্বর বললো, “চিন্তা করে দ্যাখো মান্টুদা, কিরকম মা বাবা, ছেলে গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছে, কোথায় এসে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে, তা না…”  

গল্পের শেষে অবশ্য কিছু কাজের লোক এসে ভাস্বরকে ডাল থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে। তার হাত পা কিছুই ভাঙ্গেনি, গাড়ীও বের করতে হয়নি। হাসপাতালেও যেতে হয়নি।

সব ভাল যার শেষ ভালো। তবে ওই স্ট্যাম্পটা ভাস্বরের কপালে ছিলোনা। 

ভাস্বরের বৌ মালা একদিন কথায় কথায় আমায় বলেছিল, “জানেন মান্টুদা’, ও না মাঝে মাঝে একা ঘরে বসে এই সব পুরনো দিনের কথা ভেবে নিজের মনেই হাসে। আমার বেশ ভয় করে। আমি ওকে বলি “ওগো, তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছো”, কিন্তু ও আমার কোন কথা কানেই নেয়না, বলে “এসব তুমি বুঝবেনা…”

মামাবাড়ী ভারী মজা

আমার মামা (ধ্রুবনারায়ণ বাগচী) ছিলেন একজন বর্ণময় চরিত্র।

দীর্ঘদেহী, ছয় ফিটের ওপর লম্বা, ঘষা কাঁচের হাই পাওয়ারের চশমার ভিতরে চোখে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, উঁচু গলায় কথা বলেন, নানা বিষয়ে বিশেষ করে ইঞ্জিনীয়ারিং সংক্রান্ত যে কোন ব্যাপারে প্রগাঢ় জ্ঞান, অঙ্কে দুর্দ্দান্ত মাথা, আমাদের ভাই বোনদের প্রতি স্নেহপরায়ণ, মামা ছিলেন আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একজন কাছের মানুষ।

মা’রা পাঁচ বোন, এক ভাই। ফলে আমাদের মাসতুতো ভাইবোনদের একমাত্র একজনই মামা। কৃতী ছাত্র ছিলেন, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে শেষ জীবনে Directorate General of Mines Safety (DGMS) তে Joint Director হয়েছিলেন, যেমন উঁচু পদ সেরকম কঠিন দায়িত্ব। কয়লা খনির মালিক রা তাদের শ্রমিক দের কাজের পরিবেশে, বিশেষ করে Underground mine গুলোতে, সব রকম সাবধানতা অবলম্বন করছে কিনা তা দেখার জন্যে প্রায় প্রতিদিন সকালে মামা গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। তাঁর কাজের পরিধি ছিল রাণীগঞ্জ, আসানসোল, সীতারামপুর আর ধানবাদের কয়লাখনি অঞ্চলে।

আমি মামার সাথে বেশ কয়েকবার খনি পরিদর্শনে গিয়েছি।

আমাদের ছোটবেলায় মামা থাকতেন আসানসোলে কোর্ট রোডে পাঁচিল ঘেরা এক বিশাল বাংলোতে। জি টি রোডের ওপরে বি এন আর ব্রীজের পাশে যে রাস্তাটা  ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট হয়ে বার্ণপুর রোডে গিয়ে পড়েছে, সেই রাস্তায় একটু এগিয়ে গেলে ডান দিকে হলুদ রং এর করবী ফুলের ঝাড় দিয়ে ঘেরা একটা কাঠের গেট। সেই গেট দিয়ে একটা লাল কাঁকরের রাস্তা এঁকেবেঁকে বাড়ীর সামনে চলে এসেছে। সাহেবী আমলের বাংলো, ঘাসের জমি থেকে তিন চার step সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসতে হয়। বাড়ীর সামনে sloping টালির ছাদ দিয়ে ঢাকা লম্বা টানা বারান্দা। বাংলোতে অনেকগুলো ঘর, বড় বড় সেগুন কাঠের জানলা দরজা, সব ঘরে উঁচু সীলিং,  সেখান থেকে লম্বা রড দিয়ে ঝোলানো সিলিং ফ্যান, গরমকালে সেগুলো চালালে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ হয়।

বাড়ীর চারিদিকে অন্ততঃ বিঘা দুয়েক জমি, সেই জমিতে মালীদের কেয়ারী করা ফুলের বাগান, আর প্রচুর গাছপালা। ওই বাড়ী ঘিরে আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি।    

নরাণাং মাতুলং ক্রমঃ বলে একটা কথা আছে, মানে ছেলেরা সাধারণতঃ তাদের মামাদের মত হয়, আমি অনেকদিন ভেবেছি বড় হলে মামার মত এরকম একটা বিশাল বাড়ী আমারও হবে নিশ্চয়। কিন্তু ওই কথাটা আমার ওপরে খাটেনি, দুঃখের বিষয়।    

আমার চার মামাতো ভাই বোন, ঝুমুদি, রুমি, ভাস্বর আর মিনি। এছাড়া ছিলাম আমি আর আমার মেজমসাসীর ছেলে রঞ্জু। রঞ্জু আমার থেকে বয়সে অল্প ছোট, ভাস্বর আবার রঞ্জুর থেকেও সামান্য ছোট, কিন্তু আমরা সবাই পিঠোপিঠি ভাই বোন বলে একসাথে হলে খুব হৈ হৈ করতাম। আর হৈ হৈ করার জন্যে কোর্ট রোডের ওই বাড়ীটা ছিল যাকে ইংরেজীতে বলে আইডিয়াল।

আসানসোল কলকাতা থেকে বেশী দূরে নয় তাই ছুটিছাটাতে প্রায়ই আসানসোলে মামার বাড়ী যাওয়া হতো। আরও অনেক আত্মীয় স্বজন আসতেন, বিশেষ করে গরমের ছুটিতে ওই বাড়ীটা আড্ডা, হাসি, ঠাট্টা, আর গল্পতে সরগরম হয়ে থাকতো সব সময়। মামার একটা চমৎকার আকর্ষনীয় (হাসিখুসী, মজলিসী আড্ডাবাজ আর হুল্লোড়ে) ব্যক্তিত্ব ছিল, তাই হয়তো ছুটিছাটায়  তাঁর বাড়ীতে নানা আত্মীয়স্বজনের ভীড় লেগেই থাকতো।  তাছাড়া মামা আর মামীমা খুব অতিথিবৎসল ছিলেন, বাড়ীতে অনেক লোক থাকলেও তাঁদের আতিথ্যে কোন ত্রুটি থাকতোনা।  

গরমের ছুটিতে রোজ সকালে আমরা ছোটরা বাড়ীর বাগানে রাবারের কিংবা ক্যাম্বিসের বল দিয়ে পিট্টু আর কিং কিং খেলতাম, আর আম গাছে চড়ে কাঁচা আম পেড়ে খেতাম। বিকেলে ঘাসের জমিতে নেট টাঙিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা হত।

আর ওই টালির ছাদ দিয়ে ঢাকা টানা বারান্দা ছিল আমাদের ক্যারম খেলার জায়গা। 

ছুটির দিন গুলো ওই বাংলো তে কি করে যে কেটে যেত বোঝাই যেতনা। 

এমনিতে মামা খুব jovial মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁর পছন্দমতো কিছু না হলে তিনি বেশ রেগে যেতেন। বেশ হাসি ঠাট্টা করছেন, হঠাৎ দুম করে রাগ হয়ে গেলে তিনি একদম অন্য মানুষ। মামা একদিকে তিনি যেমন হাসিখুসী, আড্ডাবাজ, গপ্পে ছিলেন, অন্যদিকে আমরা ছোটরা তাঁকে বেশ সমীহ আর সন্মান করতাম, ভয়ও পেতাম, কখন কিছু অপছন্দ হলেই রেগে যাবেন কে জানে?

একবার ব্রীজ খেলার সময় তাঁর পার্টনার মনোরঞ্জন মল্লিক নামে এক ভদ্রলোক বিড করতে কিংবা লীড দিতে মারাত্মক একটা ভুল করেছিলেন, সেই ভুলের জন্যে তাঁদের গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফস্কে যায়। মল্লিকবাবু আসানসোল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের জাজ, সন্মানীয় লোক, মামার থেকে বয়সেও বড়, কিন্তু তাঁর ওই ভুল দেখে মামা দুম করে রেগে গিয়ে মল্লিক বাবুকে বলেছিলেন আপনার মত গাধার সাথে ব্রীজ খেলার কোন মানেই হয়না।

গাধা বলেছিলেন না বোকাপাঁঠা বলেছিলেন ঠিক জানিনা, অন্য কিছুও বলে থাকতে পারেন, কিন্তু যাই বলে থাকুন মল্লিক বাবুর সেটা ভাল লাগেনি, সবার সামনে অপমানিত হয়ে তাঁর মুখ চোখ লাল হয়ে যায়। তার পর থেকে তিনি আর কোন দিন মামার সাথে ব্রীজ খেলতে আসেন নি।  

মামার রাগ আর মেজাজের এই রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তার মধ্যে থেকে নীচের দুটি ঘটনার কথা লেখা যেতে পারে, এই দুটি ঘটনা থেকে মামাকে জানা সহজ হবে।

আসানসোল শহরে এক রবিবার মামা সপরিবারে গাড়ী নিয়ে বাজার করতে এসেছেন, ভীড়ের মধ্যে হাঁটার সময়  তিনি খেয়াল করলেন তাঁর পকেটমার হচ্ছে, একটি যুবক তাঁর মানিব্যাগটা নিয়ে ভীড় কেটে এঁকেবেঁকে তীর বেগে পালিয়ে যাচ্ছে। মামা সব ফেলে তাকে ধাওয়া করে শেষ পর্য্যন্ত ধরে ফেলে মানিব্যাগ ফেরত নিয়ে এসেছিলেন। এর থেকে মামার উপস্থিত বুদ্ধি, সজাগ মন, সাহস, এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। আসানসোলের মত গুন্ডা অধ্যুষিত জায়গায় বাজারের ভীড়ের মধ্যে জল কাদা ঠেঙিয়ে হাই স্পীডে দৌড়িয়ে চোর ধরা সহজ কাজ  নয়। বুকের পাটা লাগে। আর মামার তখন মধ্যবয়েস, শরীর আর স্বাস্থ্য ও তেমন মজবুত নয়। পুরোটাই মনের জোর।

আর একবার দিদা বেনারস থেকে আসছেন, মামা গেছেন আসানসোল স্টেশনে তাঁকে receive করতে। ট্রেণ লেট, কিন্তু কত লেট, কখন আসবে, তার কোন announcement হচ্ছেনা, কেবল বার বার মাইকে বলা হচ্ছে “যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে টিকিট কাটার সময় দয়া করে দরকার মতো খুচরো পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করুন!”

বেশ কয়েকবার ওই এক announcement শোনার পরে মামার মেজাজ গেল বিগড়ে, তিনি সটান স্টেশন মাস্টারের ঘরে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে তাঁকে দিলেন এক ধমক।

ট্রেণ এর টাইমিং  নিয়ে কোন খবর নেই, বার বার শুধু খুচরো নিয়ে আসুন, খুচরো নিয়ে আসুন, এটা কি ধরণের ইয়ার্কি হচ্ছে মশাই?

মামার বকুনী খাবার পরে আবার ঠিক ঠাক announcement শুরু হল। অমুক নম্বর ট্রেণ তমুক নম্বর প্ল্যাটফর্মে তসুক সময়ে আসছে..

আমার মাসতুতো ভাই রঞ্জু ছোটবেলা থেকেই বেশ দুরন্ত, ও যখন নরেন্দ্রপুরে রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের হোস্টেলে থেকে ক্লাস নাইনে পড়ে, তখন মেসোমশায় মারা যান (১৯৬০)।  স্কুলের ছুটি হলে হোস্টেল থেকে বাড়ী  ফিরলে মাসী তাঁর দুরন্ত ছেলেকে ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। রঞ্জু কে শাসন করার ক্ষমতা মাসীর ছিলনা, কেননা তিনি খুব নরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, তাঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে মামার শাসনে থাকলে ছেলে ভাল থাকবে, বখে যাবেনা বা হাতের বাইরে চলে যাবেনা।   

রঞ্জু তাই মামার বাড়ীতে আমার থেকে অনেক বেশী থেকেছে, মামা আর মামীমাও রঞ্জু কে নিজের ছেলের মতই ভালবাসতেন, মামাতো ভাই বোনেদের সাথে রঞ্জূ পরিবারের একজনই হয়ে গিয়েছিল।

মামাবাড়ী ভারী মজা, কিল চড় নাই বলে একটা কথা আছে, সেটা রঞ্জুর কাছে কতোটা ঠিক ছিল বলা মুস্কিল। কেননা পড়াশুনা, বিশেষ করে অঙ্ক ঠিক করতে না পারলে মামার প্রচন্ড মেজাজ গরম হয়ে যেত, বকুনী তো খেতে হতোই, কিল চড় ও যে মাঝে মাঝে খেতোনা, তাও জোর করে বলা যায়না। বিশেষ করে বুদ্ধির অঙ্ক ছিল মামার ফেভারিট, বুদ্ধির অঙ্ক আর নানা ধরণের ধাঁধা দিয়ে মামা আমাদের প্রায়ই বেশ বোকা বানাতেন। আর পড়াশোনার ব্যাপারে মামা ছিলেন firm and uncompromising, a very strict taskmaster.. 

ফলে মামার রাগ আর মেজাজের সাথে সব চেয়ে বেশী পরিচয় ছিল ভাস্বর আর রঞ্জুর। তারা দুজন মামাকে যমের মত ভয় পেতো।

১৯৬৩ সালে হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার পরে লম্বা ছুটি তে মাসী  as usual রঞ্জুকে মামার কাছে আসানসোলে পাঠিয়ে দেন। সামনে রঞ্জুর বি ই কলেজের Admission test, তার জন্যে  application form fill up করা হয়েছে,  সেটা পোস্ট অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি করতে হবে।

মামা রঞ্জু আর ভাস্বরকে টাকা দিয়ে পোস্ট অফিসে পাঠালেন।   

সেদিন আবার দিদা বিকেলে কলকাতায় যাচ্ছেন, প্যাকিং ইত্যাদি নিয়ে মামা বেশ ব্যস্ত ছিলেন, দুপুরের খাওয়া হয়ে গেলে তাঁর মনে পড়ল রেজিস্ট্রি করার কথা, তিনি রঞ্জু আর ভাস্বর কে জিজ্ঞেস করলেন, “কি রে তোরা application form  রেজিস্ট্রি  করে এলি?”

দুজনেই মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ!

মামা বললেন “Receipt টা দেখি”।

Receipt? Receipt আবার কি?  Receipt তো নেই!  দুজনে তো অবাক।

তারপরে মামার হিমশীতল চাহনি দেখে অবশ্য দু’জনেই বুঝলো কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে, তারা একটা কেলো করেছে নিশ্চয়!

পোস্ট অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি করতে কত টাকার স্ট্যাম্প লাগবে জেনে স্ট্যাম্প কিনে আর লাগিয়ে তারা খামটা পোস্ট বক্সে ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে এসেছে, আগে তো কোনদিন তারা রেজিস্ট্রি করেনি, জানবে কি করে যে কাউন্টারে জমা দিয়ে Receipt নিতে হয়।

তারপরে শুরু হল মামার বকুনী। সমুদ্রের ঢেউএর মত সেই বকুনী আর ধমক তাদের ওপরে আছড়ে পড়লো বেশ কিছুক্ষণ।

তার পরে মামা গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে গেলেন পোস্ট অফিসে। সেখানে তিনি শুনলেন যে সেদিনের মেল স্টেশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে sorting এর জন্যে। সেখান থেকে মামা ছুটলেন স্টেশনে। সেই স্টেশন মাস্টার ভদ্রলোক যিনি কিছুদিন আগে মামার কাছে বকুনী খেয়েছেন, তিনি মামাকে দেখে অনেক খাতির করে তাঁর লোকদের পাঠিয়ে রঞ্জুর application form  টা আনাবার বন্দোবস্ত করলেন।

সেদিন বিকেলে দিদাকে নিয়ে স্টেশন যাবার সময়ে মামা রঞ্জু আর ভাস্বর কে বললেন তোরাও আমার সাথে চল্‌। স্টেশন মাস্টার তোদের দেখতে চেয়েছেন। আজ বাদে কাল কলেজে ভর্ত্তী হবে আর এখন ও চিঠি রেজিস্ট্রি করতে জানেনা? একবার ওদের নিয়ে আসবেন তো, দেখবো।

এই গল্পটা বলার সময় ভাস্বর বলে জানো মান্টুদা’, স্টেশন মাস্টার ভদ্রলোক কিন্তু মোটেই আমাদের দেখতে চান নি। ওটা পুরোপুরি বাবার বানানো। আমাদের যাতে আরও খারাপ লাগে তার ব্যবস্থা করা। উনি তো আমাদের দেখে খুব ভালোমানুষের মত বলেছিলেন, “না না ধ্রুব বাবু, কি যে বলেন, ছোট ছেলে, এরা কোন দিন আগে চিঠি রেজিস্ট্রি করেনি। ভুল তো হতেই পারে।”

তার পরে ওদের দুজন কে গাড়ীতে গিয়ে বসতে বলে মামা দিদা কে প্লাটফর্মে see off করতে চলে গেলেন।

রঞ্জু আর ভাস্বর দুই ভাই মুখ চূণ করে গাড়ীতে গিয়ে বসে আছে, এমন সময় রঞ্জু হঠাৎ দেখে গাড়ির পিছনের সীটে একটা লম্বা বাঁশের লাঠি পড়ে আছে। এই লাঠিটা কার? দিদার লাঠি নাকি? মামা ভুল করে গাড়ীতে ফেলে গেছেন নির্ঘাত।

রঞ্জু ভাস্বর কে বললো যা, এটা মামাকে তাড়াতাড়ি গিয়ে দিয়ে আয়। ট্রেণ এখুনি ছেড়ে দেবে।

রঞ্জু বোধহয় ভেবেছিল লাঠিটা দিয়ে এলে মামা খুসী হবেন, সারাদিন রেজিস্ট্রী চিঠি নিয়ে এই ঝামেলা হবার পর অন্ততঃ কিছুটা কৃতিত্ব তো এখন তাঁর কাছে পাওয়া যাবে। কিন্তু তাদের দুজনেরই বকুনী খেয়ে মাথা এমন গুলিয়ে গেছে যে তারা চিন্তা করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে, বুদ্ধিশুদ্ধি যা ছিল, সব লোপ পেয়েছে।

ওই লম্বা ভারী বাঁশের লাঠি যে দিদার হতেই পারেনা সেটা ওদের মাথায়ই আসেনি। আর তাছাড়া ভাস্বরের তো জানা উচিত যে ওই লাঠিটা মামার, খনি পরিদর্শনে যাবার সময় রোজ সকালে তিনি ওই লাঠিটা নিয়ে বেরোন।

ভাস্বর উৎসাহের সাথে দৌড়তে দৌড়তে মামাকে লাঠিটা দিতে গেল। প্ল্যাটফর্মে মামার কাছাকাছি যেতেই ভাস্বর দেখলো মামা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর চোখ দিয়ে আগুণ ঠিকরে বেরোচ্ছে। তাঁর সেই আগুণে দৃষ্টি থেকে ভাস্বর বুঝে নিল মামা বলছেন, “তবে রে, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা, আজ তোর পিঠেই এই লাঠিটা ভাঙবো!”

নিমেষের মধ্যে ভাস্বর বুঝে নিলো সর্ব্বনাশ, আবার একটা ভুল হয়ে গেছে। লাঠিটা দিদার নয়, তার বাবার। সঙ্গে সঙ্গে ফুল স্পীডে ব্যাক।

গাড়ীতে ফিরে ভাস্বর রঞ্জু কে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো “লাঠিটা বাবার।”

রঞ্জু আর নেই, সে বেশ কয়েক বছর হলো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ও যখন ছিল তখন আমরা দু’জন আর ভাস্বর একসাথে হলেই সেই কোর্ট রোডের বাড়ীতে কাটানো দিনগুলোর গল্প হত, নানা ঘটনার মধ্যে এই রেজিস্ট্রী আর লাঠির গল্পটা উঠে আসতোই।

রঞ্জুর গল্প বলার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল, আর ওর হাসিটা ছিল খুব সংক্রামক, ও যখন এই সব গল্পগুলো ওর নিজস্ব অননুকরণীয় ভঙ্গীঁতে বলত, আমরা তিনজন হো হো করে হাসতাম। এখন রঞ্জু আর নেই, ভাস্বরের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়, আমরা পুরো্নো দিনের গল্প করি, আর এই   গল্পটা বলার সময় ভাস্বরও খুব হাসে।   

ভাস্বরের বৌ মালা একটু বিরক্ত হয়ে বলে এ আবার কি? বাবার কাছে বোকামী করে বকুনী খেয়েছো তো তাতে এত হাসার কি আছে?

ভাস্বর একটু উদাস মুখ করে বলে সে তুমি বুঝবেনা !

সত্যি, এই গল্প গুলো করার সময় আমাদের এত হাসি পায় কেন?  

নিজেদের ভুল বোকামী ইত্যাদি (bloopers and blunders) – আমি কি বোকা ছিলাম হি হি হি, কিংবা আমি মামার কাছে কি solid বকুনী খেলাম হা হা হা – নিয়ে নিজেরাই মজা করা বা হাসাহাসি করা হল ইংরেজীতে যাকে বলে Self-deprecating humour, যা কিনা রসিকতার একটা উচ্চ স্তর। ভাস্বরের হাসি বোধ হয় সেভাবে ব্যাখা করা যায়।

ওই গল্পটা বলার সময় ভাস্বরের হাসার আরও একটা কারণ হয়ত এই যে ছোটবেলায় কোর্ট রোডের বাংলো তে কাটানো সেই হাসি আর আনন্দের (carefree) দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সে মনে মনে সেই দিনগুলোতে ফিরে যায়। ভাস্বর আমায় বলল জানো মান্টুদা’, ছোটবেলায় আমি বাবাকে খুব ভয় পেতাম,  কিন্তু এখন মনে হয় বাবার ওই শাসন আর বকুনীর মধ্যে একটা বিশেষ ভালবাসার আর স্নেহের স্পর্শ ছিলো।

সেই দিনগুলোর স্মৃতির মধ্যে একদিকে যেমন মিশে আছে আমাদের ছেলেমানুষী দুষ্টুমি, দুষ্কর্ম্ম, আর বোকামী,  ঠিক তেমনই অন্যদিকে আছে গুরুজনদের শাসন, ধমক আর বকুনী। এই দুই মিলিয়েই দিন গুলো বড় সুন্দর ছিল।

তাই এই স্মৃতিচারণ করার সময় ভাস্বর যে কেন এত প্রাণ খুলে হাসে, তা বোঝা কঠিন নয়।

কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই, আজ আর নেই।