আমাদের জ্যেঠু বাবা কাকাদের সব ভাইদের নামের শেষে একটা বন্ধু জোড়া ছিল। বিশ্ববন্ধু প্রিয়বন্ধু, নিখিল বন্ধু, প্রাণবন্ধু এই রকম। এই চার ভাইয়ের স্কুলের সহপাঠী রা তাদের এই নাম নিয়ে মজা করে বলতো, “এই নিখিল বিশ্বে প্রাণটা বড়ই প্রিয়। ”
আমার বিয়ে ঠিক হবার পরে আমার শ্বশুরমশায় সুভদ্রাকে বলেছিলেন, “তোমার শ্বশুররা সবাই friends, মা!”
নামের শেষে বন্ধু জোড়া থাকলেও একমাত্র ছোটকাকা (অশোকবন্ধু ) আর সোনাকাকা (সুনীলবন্ধু) – এই দুজনই আমাদের ছোটদের সাথে বন্ধুর মত মিশতেন, সব সময়ে আমাদের সাথে হাসি খুসী মজা ঠাট্টা করতেন।
সোনাকাকা পাটনায় থাকতেন তাই তাঁকে আমরা খুব কাছে পাইনি। কিন্তু মনোহরপুকুরে ছোটকাকা ছিলেন আমাদের খুব কাছের মানুষ।
এই গল্পটা তাঁকে নিয়ে।
একদিন সন্ধ্যায় আমাদের বড় বারান্দায় খোদেচাটা পুরনো গোল টেবিলে কয়েকজন বসে চা খাচ্ছি। ছোটকাকা বললেন, “বুঝলি মান্টু, আমি এবার একটা ফিল্ম তৈরী করবো ঠিক করেছি।”
ফিল্ম? আমরা সবাই তো লাফিয়ে উঠলাম।
ছোটকাকা বললেন “ফিল্মের গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ, সঙ্গীত, পরিচালনা সবটাই আমার। কেবল অভিনয়ের জন্যে একজন নায়ক আর একজন নায়িকা আমার দরকার। বাকি সবটাই আমি দেখবো।”
কিছুদিন আগেই আমাদের সবাই কে নিয়ে ছোটকাকা সত্যজিত রায়ের “কাঞ্চনজঙ্ঘা” দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন কিনা কে জানে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম “গল্পটা লিখে ফেলেছো?”
ছোটকাকা বললেন, “না শুরু করিনি এখনো, তবে ছবির নাম ঠিক করে ফেলেছি!”
আমরা সবাই তো উত্তেজিত। কি নাম হবে ছবির?
ছোটকাকা বললেন “তুমি, আমি ও গাঁদাল পাতা।”
এ আবার কি নাম?
জিজ্ঞেস করলে ছোটকাকা আয়েস করে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “এটা হলো আমাদের মত সাধারণ মানুষের জীবনের কথা, বুঝলিনা?”
স্বপ্নময় চক্রবর্ত্তী আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় সংখ্যায় “সাদা কাক” নামে একটি কলাম লিখতেন, তাতে নানা ধরণের চরিত্রের কথা থাকতো। তাতে একটা লেখায় দুই প্রেমিক প্রেমিকার কথা ছিল, তাদের নাম চানু আর মিনু।
স্বপ্নময় লিখছেন কমবয়েসে স্কুলে থাকতেই চানু একজন প্রেমিকা যোগাড় করার ক্যালি দেখিয়েছিল। ওরা দুজন যখন নদীর ধারে গিয়ে বসতো তখন তারা কি বলছে শোনার জন্যে বন্ধুরা পিছনে গিয়ে দাঁড়াতো। ওদের কথাবার্ত্তা শুনে তারা বুঝেছিল যে প্রেম করার জন্যে “জীবন” কথাটা খুব দরকারী।
যেমন নদীর ওপারে একটা আলো জ্বলছে আর নিবছে, চানু বললো, “আলোটা কিন্তু জ্বলেই আছে, নিবছেনা আসলে। আমাদের জীবনটাই ওরম। মনে হয় নিবে গেছে, কিন্তু আসলে নেবেনি!”
কিংবা “ওই দ্যাখো মাঝে মাঝে নদীর জল সরে গেলে কেমন কাদা ভেসে আসছে। আমাদের জীবনটাই ওরম। কখনো জল আর কখনো কাদা!”
অথবা, “ইস এই আমগুলোর মধ্যে বেশ কিছু আম পচা বেরোল, আমাদের জীবনটাই ওরম। কিছু ভালো কিছু পচা।”
চানুর এই সব কথা মিনু মুগ্ধ হয়ে শুনতো, আর এই ভাবেই ওদের মধ্যে প্রেমটা বেশ জমে ওঠে।
হাই থট কথাটাও লোককে ইম্প্রেস করতে বেশ কাজে লাগে।
চারুলতা ছবির শেষ দৃশ্যে মিনু জিজ্ঞেস করেছিল “ওরা দু’জন ফ্রিজ করে গেল কেন গো?” চানু বলেছিল “ওটা হাই থট, বোঝাতে সময় লাগবে, নিরিবিলি পেলে বুঝিয়ে দেবো!”
অশনি সংকেত ছবিতে একটা দুর্ভিক্ষের দৃশ্য ছিল। গ্রামের মানুষ খেতে পাচ্ছেনা। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রজাপতির উড়ে যাওয়া দেখানো হয়েছিল। মিনু জিজ্ঞেস করেছিল,”প্রজাপতি গুলো উড়ছে কেন গো?”
চানু বলেছিল “বুঝলেনা, হাই থট, আমাদের জীবনও ওই প্রজাপতির মতই কেবল উড়তে চায়!”
গোল টেবিলে চা খেতে খেতে ছোটকাকা বললেন, “শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে নায়ক নায়িকার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে, আর দূর থেকে গাঁদাল পাতার গন্ধ ভেসে আসছে!”
আমি বললাম, “ছবিতে গাঁদাল পাতার গন্ধ বোঝাবে কি করে?”
ছোটকাকা বললেন, “অসুবিধা কি আছে? একটা সংলাপ দিয়ে দেবো নায়কের মুখে। নায়ক উদাস আর করুণ মুখ করে গন্ধ শোঁকার ভান করবে আর বলবে, আঃ গাঁদাল পাতা! উঃ গাঁদাল পাতা! ব্যাস দর্শক বুঝে যাবে।”
আমি বললাম, “তা না হয় হলো, কিন্তু এত জিনিষ থাকতে গাঁদাল পাতা কেন?”
গত মঙ্গলবার (১৮/১০/২০১৬) চৈতী, সুভদ্রা আর আমি উত্তরপাড়া তে গিয়ে মাধবকাকার সাথে দেখা করে এলাম।
মাধবকাকা এখন উত্তরপাড়ায় ছোট ছেলে রঞ্জু, বৌমা জয়া আর নাতি অরিজিৎ (দানু) কে নিয়ে থাকেন। ফোন করে তাঁর সাথে কথা বলা যায়না, কেননা তিনি এখন কানে একেবারেই শোনেন না। তার ছেলে রঞ্জুর সাথে কথা হল, বললাম বিজয়ার পরে দেখা করতে যাবো। চৈতীকে বলাতে সেও এক কথায় আমার আর সুভদ্রার সাথে যেতে রাজী।
চৈতী কে গোলপার্ক থেকে তুলে বেরোতে বেরোতে সাড়ে চারটে বেজে গেল। আজকাল সাড়ে পাঁচটায় অন্ধকার হয়ে আসে, পার্ক সার্কাস ফ্লাই ওভার দিয়ে দ্বিতীয় হুগলী ব্রীজ দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন নদীর ওপারে লাল টুকটুকে বলের মত সূর্য্য অস্ত যাচ্ছে। কোনা রোড ধরে সোজা বালীখাল, সেখানে হাইওয়ে থেকে নেমে জি টি রোডে পড়লাম। রঞ্জু ফোনে direction দিয়ে দিয়েছিল।
জি টি রোড আছে আগের মতোই, নোংরা সরু রাস্তা, পথচারীদের ভীড়, দু’পাশে সারি সারি দোকান, গাড়ী বাস ঠ্যালাগাড়ী রিক্সা, নানা যানবাহন, হর্ণের বিকট আওয়াজ। সামনেই কালীপুজো, রাস্তার পাশে বেশ কিছু বাঁশের structure, পূজোর প্যান্ডেল বানানো শুরু হয়ে গেছে, একটা টেম্পো করে বেশ কিছু লোক একটি বেশ বড় কালীপ্রতিমা নিয়ে যাচ্ছে চোখে পড়লো। এখানে সেখানে মাইক থেকে হিন্দী ফিল্মের গানের আওয়াজ ভেসে আসছে।
এই সবের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছি, হঠাৎ তাকিয়ে দেখি আহিরীটোলা খেয়াঘাট, রাস্তার একদম পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে গঙ্গা। দেখে মনটা হঠাৎ ভাল হয়ে গেল। ওই নোংরা ঘিঞ্জি রাস্তার পাশেই এক বিশাল বিস্তীর্ণ নদী বয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্য সত্যিই অবাক করার মত, সামঞ্জস্য হীন।
খেয়া ঘাট ছাড়িয়ে একটু আগে ভদ্রকালীর সখের বাজারের মোড়। সেখান থেকে রঞ্জু কে ফোন করতে সে বললো, “ওখানেই গাড়ীটা রাখুন, আমি দানুকে পাঠাচ্ছি।” মিনিট দশেক এর মধ্যে সাইকেলে চেপে দানু চলে এল, তাকে follow করে আমরা পৌঁছে গেলাম মাধবকাকার বাড়ীর গলিতে। রামলাল দত্ত লেন। রঞ্জু আমাদের অপেক্ষায় গলির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে আগে কোনদিন দেখিনি, ফোনে কথা হয়েছে, কিন্তু প্রথম দেখাতেই তাকে মাধবকাকার ছেলে বলে চিনতে পারলাম। দু’জনের মুখের বেশ সাদৃশ্য আছে।
যেতে সব মিলিয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা লাগলো। পৌঁছলাম ছ’টার একটু পরে। তখন বেশ অন্ধকার।
একটা gated compound এর ভেতরে মাধবকাকার তিনতলা বাড়ী, ছোটর মধ্যে বেশ ছিমছাম সাজানো গোছানো। মাধবকাকা থাকেন দোতলায়, হাঁটুর ব্যথায় কষ্ট পান, তাই আজকাল আর বেশী চলাফেরা করতে পারেন না। ওপরেই থাকেন, নীচে নামেন না। বেশ সেজেগুজে স্মার্ট একটা টি শার্ট পরে খাটে বসেছিলেন, আমরা গিয়ে প্রণাম করলাম। চেহারাটা বয়সের তুলনায় এখনও বেশrobust আছে, কেবল মুখ আর ঠোঁটের কাছটা যেন একটু ফোলা লাগলো। এমনিতে কথা বেশী বলছিলেন না, সারাক্ষণ চুপ করেই বসে রইলেন। বোধ হয় কানে কিছ শুনতে না পারার জন্যেই।
দোতলায় দুটো ঘর, তার মধ্যে বড় ঘরটিতে মাধবকাকা বিছানায় বসেছিলেন, আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম।
বাড়ীটা ছোট হলেও ঝকঝকে পরিস্কার, মোজেইক এর মেঝে, দেয়ালে নানা পারিবারিক ছবি সাজানো। বোঝাই যায় যে জয়া সুগৃহিণী। মাধবকাকার ঘরে বিছানার ওপর পরিপাটি করে চাদর বিছোনো। খাটের পিছনে দেয়ালে মাধবকাকা আর কাকীমার একটা বড় করে বাঁধানো ছবি টাঙানো আছে। বোধ হয় বিয়ের পরে তোলা। কাকীমার লাল শাড়ী, মাথায় ঘোমটা। সেই ছবিতে মাধবকাকাকে চেনাই যাচ্ছেনা, রোগা, ল্যাংপ্যাঙ্গে এক অচেনা যুবক। অবশ্য একটু খেয়াল করে দেখলে মুখের মিলটা টের পাওয়া যায়।
চৈতী জিজ্ঞেস করলো এটা কি মাধবকাকার ছবি?
জয়ার সাথে আগে আমাদের কোন পরিচয় ছিলনা, কিন্তু সে দেখলাম আমাদের পরিবারের সব খবরই রাখে, মা জ্যেঠিমা কাকীমাদের সবাইকে চেনে। মনোহরপুকুরে গেছেও বলল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে জয়া আর রঞ্জু আমাদের আপন করে নিল। যে ঘরে আমরা বসেছিলাম সেই ঘরের সাথে লাগানো কিচেন। “চা খাবেন তো?” বলে জয়া সেখানে গিয়ে খুটখাট শুরু করে দিল। রঞ্জু হঠাৎ কোথায় বেরিয়ে গেল, নিশ্চয় আমাদের জন্যে কিছু কিনতে।
আমরা দানুর সাথে কথা বলে জানলাম সে Globsyn নামে কলকাতার একটা Management Institute থেকে MBA করেTimes of India তে Digital marketing এর কাজ নিয়েছে, কিন্তু সে এই কাজে খুব একটা happy নয়। তার future career নিয়ে অনেক আলোচনা হল, বুঝলাম সে মা আর বাবা কে ছেড়ে কলকাতার বাইরে যেতে প্রস্তুত নয়। বাইরে গেলে বেশী টাকা জমাতে পারবেনা, সে বলল মা আর বাবা তাকে তাঁদের কষ্টার্জ্জিত টাকা খরচ করে MBA পড়িয়েছেন, এখন সেই টাকা তাঁদের ফেরত দেওয়া তার আশু কর্ত্তব্য। কলকাতার বেশ কিছু জায়গায় সে চাকরীর চেষ্টা চালাচ্ছে, তার মধ্যে কোথাও না কোথাও একটা লেগে যাবে তার আশা। আমরা তাকে আমাদের শুভেচ্ছা জানালাম।
আমরা আসবো বলে অনেক খাবারের আয়োজন করেছে জয়া। মাঝে মাঝে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সে আমাদের আলোচনাতে যোগ দিচ্ছে, আর তার কাছ থেকে আমরা অনেক খবর পাচ্ছি। মাধবকাকার ভাইরা আর কেউ বেঁচে নেই, তাঁদের ছেলেমেয়েরা কেউ আর উত্তরপাড়ায় থাকেনা, তাদের বাড়ী সব ফাঁকা পড়ে আছে। একমাত্র বোন ভক্তি পিসী এখন মেয়ের কাছে নবদ্বীপে থাকেন ইত্যাদি। রঞ্জু কাছেই কো অপেরাটিভ ব্যাঙ্কে কাজ করতো, কিন্তু রাজনৈতিক গুন্ডা দের চাপ অসহ্য হওয়ায় তার blood sugar অত্যধিক বেড়ে যায়। ফলে সে কাজ থেকে voluntary retirement নিয়ে নিয়েছে। এখন দানু দাঁড়িয়ে গেলে তারা দু’জনে নিশ্চিন্ত।
ইতিমধ্যে রঞ্জু দোকান থেকে খাবার কিনে ফিরে এসেছে, জয়া চায়ের সাথে বাড়ীতে বানানো বিস্কুট, গজা প্লেটে করে এগিয়ে দিলো আমাদের। তার পরে একে একে আসতে লাগলো বাড়ীতে বানানো নারকেলের নাড়ু, দোকান থেকে আনা ভেজিটেবল প্যাটিস, নানা রকমের মিষ্টি – সন্দেশ, রসগোল্লা।
সর্ব্বনাশ, এত কে খাবে?
জয়া বললো এর পরে আইসক্রীম আছে !
গল্পে গল্পে ঘন্টা খানেক কেটে গেল। এবার উঠতে হবে।
জয়া আমাদের তিনতলায় তার পূজোর ঘর দেখাতে নিয়ে গেল। পাশেই এক চিলতে ছাত। অন্ধকার, মাথার ওপরে তারাভরা আকাশ, চারিপাশে ঘনবসতি, গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ীর ঘন ঠাসবুনোট। কিছু বাড়ী অন্ধকার। কিছু বাড়ীর জানলায় আলো জ্বলছে। জয়া বললো জানেন, আমি রোজ সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ ছাতে এসে বসে থাকি, আমার খুব ভাল লাগে।
ছাত থেকে রাতের শহরের ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে পড়ল, মাধবকাকার বিয়েতে মনোহরপুকুর থেকে মা জ্যেঠিমা কাকীমারা সবাই আমাদের ছোটদের নিয়ে বিকেলে এসেছিলেন, রাত্রের ট্রেণ ধরে আমরা ফিরে যাই। তখন এই জায়গাটা কি ফাঁকা ছিল, চারিদিকে খোলা মাঠ, মিঠু, আমি বাবলু আর সমবয়েসী অনেক ছেলে মেয়েরা সেই মাঠে সারা বিকেল খুব ছোটাছুটি করেছিলাম। ওই মাঠেই বিয়ের অনুষ্ঠান আর খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল।
এখন আর কোন ফাঁকা জায়গা নেই, চারিদিকে শুধু বাড়ী।
ছাত থেকে নামার সময় সিঁড়ির পাশে দেখলাম দেয়ালে বুক কেস, তার ভেতরে যত্ন করে সাজানো অনেক বই। জয়া বললো আপনার বাবার লেখা পূর্ব্বাচল বইটা আমাদের কাছে আছে। জেনে আমি অবাক হলাম, আর খুসীও।
ফেরার সময় রঞ্জু আর জয়া অনেক করে বললো আবার আসবেন, এবার বেশীক্ষণ থাকলেন না, এর পরের বার সারা দিনের জন্যে আসুন, আমরা সকলে মিলে বেলুড়ের মন্দির দেখে আসবো। তাদের দু’জনের এই আন্তরিক ব্যবহারের মধ্যে কোথাও যেন মাধবকাকার স্বভাব আর ব্যবহারের ছায়া দেখতে পেলাম আমি।
রঞ্জু এসে গলির মোড় পর্য্যন্ত এগিয়ে দিল আমাদের।
ফেরার পথে আমরা বালী (বিবেকানন্দ) ব্রীজ ধরে দক্ষিণেশ্বর হয়ে ফিরলাম। বিবেকানন্দ ব্রীজে রাস্তার কাজ হবার জন্যে অনেকদিন দু’দিকই বন্ধ ছিল, সম্প্রতি ফেরার দিকটা খুলে দেওয়া হয়েছে। ব্রীজের ওপর দিয়ে আসার সময় নীচে কালো নদী, আর নদীর ওপারে দূরে মা ভবতারিণীর সাদা রং এর মন্দির আলোয় ঝলমল করছে, দেখে মনটা অকস্মাৎ খুব প্রশান্ত হয়ে উঠলো।
দক্ষিণেশ্বর থেকে দমদম এয়ারপোর্ট পর্য্যন্ত নতুন রাস্তা হয়েছে, তার পরে রাজারহাট হয়ে বাইপাস, পরমা ফ্লাইওভার। ভেবেছিলাম ফেরাটা তাড়াতাড়ি হবে, কিন্তু পশ্চিম দিক দিয়ে হাওড়া হয়ে যাবার তুলনায় এই উত্তর আর পূব দিক দিয়ে ফেরার দূরত্বটা বোধ হয় একটু বেশী। তাই ভাল রাস্তা হওয়া সত্ত্বেও ফিরতেও দেড় ঘন্টা লেগে গেল। উত্তরপাড়া থেকে রাত সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে গোলপার্ক পৌঁছলাম রাত ন’টার একটু পরে।
সব মিলিয়ে বিকেল সাড়ে চারটে থেকে রাত ন’টা, সাড়ে চার ঘন্টা, দেড় ঘন্টা যেতে, দেড়্ ঘন্টা ফিরতে আর দেড়ঘণ্টা ওদের সাথে। বেশ ভালোই হলো আমাদের trip সব মিলিয়ে।
কবি তারাপদ রায় আমার সম্পর্কে দাদা হতেন। একটু লতায় পাতায় অবশ্য, উনি হলেন বাবার পিসতুতো ভাইয়ের ছেলে।
আমার ঠাকুর্দারা দুই ভাই এবং এক বোন ছিলেন, বাবাদের সেই একমাত্র পিসীর বিয়ে হয় ময়মনসিংহে, দেশভাগের পরে তাঁরা ভারতে আসেননি। পিসেমশায় ডাক্তার ছিলেন, ময়মনসিংহে তাঁর সম্পন্ন পরিবার, কাজে সুনাম আর পসার ভাল ছিল ধরে নেওয়া যায়। সে সব ফেলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে তাঁরা পূর্ব্ব বাংলায় থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন্। তাঁদের দুই ছেলে পূর্ণ আর সুশীলও এদেশে আসেননি।
পূর্ণ জ্যাঠামশায়ের কোন সন্তান ছিলনা, ষাটের দশকে তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রীর পক্ষে একা ওদেশে থাকা সম্ভব ছিলনা, তিনি তখন ভারতে চলে আসেন। আমাদের সেই ময়মনসিংহের জ্যেঠিমাকে নিয়ে আমি এখানে আগে লিখেছি, হয়তো তোমাদের কারুর কারুর মনে থাকবে।,
ছোটভাই সুশীল ছিলেন উকিল, তিনি টাঙ্গাইল শহরে ওকালতি করতেন। তবে দেশভাগের সময় তিনি এবং তাঁর স্ত্রী নিজেরা টাঙ্গাইলে থেকে গেলেও তাঁদের দুই ছেলে তারাপদ আর বিজন কে ভারতে কলেজে পড়তে পাঠিয়ে দেন্। স্ত্রীর মৃত্যুর পরেও সুশীল একাই টাঙ্গাইল শহরে থেকে যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
যাই হোক, বাবাদের এই পিসতুতো ভাইদের পরিবারের অনেকেই ভারতে এসে থাকতে শুরু করেন। আমাদের বাঙালদের লতায় পাতায় পারিবারিক সম্পর্ক আর network এর সুবাদে এঁদের সাথে আমাদের পরিচয় ছিল। সেই সূত্রেই তারাপদদা’র সাথে আমার প্রথম আলাপ। তখন আমি স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি, বঙ্কিমচন্দ্র শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ মোটামুটি পড়ে ফেলে ক্রমশঃ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিকে ঝুঁকছি।
সেই ষাটের দশকে কল্লোল যুগ তখন অতিক্রান্ত, কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠীর সুনাম ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছে।
তারাপদ দা’ সেই কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠীর একজন প্রধান সদস্য ছিলেন, নিঃসন্দেহে সেই সময়ের একজন প্রথম সারির কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। বুদ্ধদেব বসু মারা যাবার পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, এবং শরৎ মুখোপাধ্যায়ের সাথে তিনিও একজন শববাহক হয়েছিলেন।
তাঁর এই কবিখ্যাতি আমার কৈশোরে তাঁর প্রতি আকর্ষণ জন্মাবার একটি প্রধান কারণ ছিল। তাছাড়া তিনি খুব মজলিসী আর আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন, তাঁর স্টকে অনেক মজার গল্প, আর সেই সব মজার গল্প বলার তাঁর একটা অননুকরণীয় স্টাইল ছিল, যেটা আমার খুব ভাল লাগত। হেঁড়ে গলায় সামান্য বাঙ্গাল উচ্চারণে উনি নানা গল্প করে যেতেন একের পর এক, আর এই সব গল্প বলার সময় তারাপদ দা’ প্রায় প্রতি বাক্যের মধ্যেই একবার “বুঝতে পেরেছো তুমি?” বলতেন। ওটা তাঁর একটা মুদ্রাদোষ ছিল।
পন্ডিতিয়া রোড টা ক্যালকাটা কেমিকালের পরে যেখানে বেঁকে হাজরা রোডের দিকে চলে গেছে ঠিক সেই জায়গায় একটা ছোট ভাড়া বাড়ীর একতলায় থাকতেন তারাপদ দা’, মিনতি বৌদি আর তাঁদের ছেলে তাতাই (কৃত্তিবাস)। আমি থাকতাম মনোহরপুকুর রোডে, ত্রিধারার পাশ দিয়ে শর্টকাট করে চলে যেতাম, খুব বেশী দূর নয়, হেঁটে মিনিট পনেরো লাগতো। ওনার সেই পন্ডিতিয়া রোডের বাড়ীতে প্রায়ই আমি আর সুভদ্রা গিয়ে আড্ডা মেরে আসতাম। নানা গল্প হত। আর তারাপদ দা’র সব গল্পেই বার বার ওই কথাটা ফিরে আসবেই।
ধরা যাক তারাপদ দা’ কে কেউ এক জন একটা Rubic Cube উপহার দিয়েছে। তারাপদ দা’র ছেলে তাতাই সেটা নিয়ে অনায়াসে সব লাল এক দিকে, সব নীল এক দিকে, আর সব হলদে এক দিকে করে দেয়, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেটা তারাপদ দা’ কিছুতেই পারছেন না।
এই ব্যাপার টা বলতে হলে তারাপদ দা’ বলবেন “সবাই শুয়ে পড়লে, বুঝতে পেরেছো তুমি, আমি ওটা নিয়ে অনেক রাত পর্য্যন্ত নাড়াচাড়া করি, কিন্তু কিছুতেই রং গুলো এক জায়গায় আনতে পারিনা, বুঝতে পেরেছো তুমি, অথচ তাতাই কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পেরেছো তুমি, ওই জিনিষটা তে যদি কেউ ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়, তাহলে দেখবে শুধু আমারই হাতের ছাপ, বুঝতে পেরেছো তুমি…”
তারাপদ দা’র বসার ঘর রাস্তার ওপরেই, দরজা সব সময় খোলা থাকত। ছোট ঘর, একটা টেবিল, বই পত্রে ঠাসা, কিছু চেয়ার আর একটা সোফা।
সেই সময়ে নিজের খরচে তারাপদ দা একটা লিটল ম্যাগাজিন ছাপাতেন, তার নাম ছিল “কয়েকজন”। সেই ম্যাগাজিনে ওঁর বন্ধুরা – যেমন নবনীতা দেব সেন, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, হিমানীশ গোস্বামী, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত ইত্যাদিরা লিখতেন। রাইটার্সে ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন তারাপদ দা, সেই সরকারী কাজ সেরে লেখা যোগাড় করা, প্রেসে যাওয়া, প্রুফ দেখা, কয়েকজনের জন্যে বিজ্ঞাপন আনা, বিজ্ঞাপনের টাকার তাগাদা দেওয়া সব কাজ তাঁকে একাই করতে হতো। তবু ওটা একটা নেশার মতোই ছিল ওঁর কাছে।
পন্ডিতিয়া রোডে তারাপদ দার সাথে কাটানো সেই সন্ধ্যাগুলো এখনো বেশ পরিস্কার মনে পড়ে। সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা হত, বিশেষ করে কবিতা নিয়ে। সেই আলোচনায় সমর সেন, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র দের ঘিরে নানা টক ঝাল মিষ্টি গসিপ উঠে আসত, আর সেই সাথে অবশ্যই আসত তারাপদ দার ওই “বুঝতে পেরেছো তুমি” দিয়ে punctuate করা অজস্র সরস গল্প।
সেই সব গল্প থেকে দুটো গল্প এই সাথে।
২ – Radish with molasses
বাঙ্গালী সংষ্কৃতি এবং সাহিত্য নিয়ে খুব উৎসাহী এক আমেরিকান দম্পতি কলকাতায় এসেছেন। প্রায় এক মাস কলকাতায় থেকে তাঁরা খুব কাছ থেকে বাঙ্গালীদের জীবনের নানা দিক – বাঙ্গালীর পূজো আর্চ্চা, বাঙ্গালীর রান্না, বাঙ্গালীর আড্ডা, বাঙ্গালীর রাজনীতি– এই সব খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখেছেন। দেশে ফিরে যাবার কিছুদিন আগে তাঁরা দুজনে একদিন কোন এক মন্ত্রীর সাথে দেখা করতে রাইটার্সে এসে হাজির।
তারাপদ দা’ বিখ্যাত কবি, মন্ত্রী মশাই ওনাদের তারাপদ দা’র কাছে নিয়ে এসে আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, “তারাপদ, তুমি তো কালীঘাটে থাকো, এনারা কালীঘাটের মন্দিরে গিয়ে মা কে দর্শন করতে চান, তুমি একটু ওঁদের নিয়ে গিয়ে দর্শন করিয়ে দেবে?”
সেদিন শনিবার, হাফ ছুটি। তারাপদ দা’ তখন থাকেন কালীঘাটে মহিম হালদার স্ট্রীটে, ওঁর বাড়ি থেকে মন্দির কাছেই, হাঁটাপথ। মা’র দর্শন হয়ে গেলে তিনি দুজন কে নিয়ে বাসায় গিয়ে দেখেন মিনতি বৌদি বাড়ি নেই, বাড়ি ফাঁকা। সকালে একটু বৌদির সাথে বাদানুবাদ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাই বলে বৌদি বাড়ী ছেড়ে চলে যাবেন এটা তারাপদ দা ভাবেন নি।
সর্ব্বনাশ! এখন এই দুই অতিথির খাওয়ার বন্দোবস্ত কি হবে? বিকেল প্রায় চারটে বাজে, এখন তো আর বাইরেও কোথাও যাওয়া যাবেনা। তার ওপর খিদেও পেয়েছে প্রচন্ড।
তারাপদ দা’ রান্নাঘরে গিয়ে দেখেন বৌদি কোন রান্নাই করে রেখে যান নি। শুধু এক কোণে পড়ে আছে কয়েকটা মূলো আর একটু ঝোলা গুড়।
নিরুপায় হয়ে তারাপদ দা ওই বিদেশী অতিথিদের প্লেটে করে কিছু মূলো আর গুড় দিয়ে বললেন এটা খান, এই পদটার নাম Radish with molasses, এটা হলো বাঙ্গালীদের একটা স্পেশাল খাবার। যাকে বলে ডেলিকেসী।
এর পরে অনেকদিন কেটে গেছে।
হঠাৎ একদিন নিউ ইয়র্ক থেকে এয়ার মেলে তারাপদ দা’র নামে এক চিঠি এল। সেই দম্পতি তারাপদ দা’ কে তাঁর সেদিনের আতিথেয়তার জন্যে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠির শেষে লিখেছেন, আপনি জেনে খুশী হবেন যে আমরা নিউ ইয়র্কে একটা রেস্তোরাঁ খুলেছি, আর আমাদের মেনু তে লাউ চিংড়ি, মোচার চপ, আলু পোস্ত, চালতার টক, ইত্যাদি অনেক বাঙ্গালী পদ রেখেছি।
কিন্তু সব চেয়ে বেশী লোকের কি পছন্দ জানেন? আপনার দেওয়া রেসিপি দিয়ে তৈরী Radish with molasses, যা কিনা হু হু করে বিক্রী হচ্ছে!
বুঝতে পেরেছো তুমি?
৩ – গৃহপালিত গন্ডার
সারা পৃথিবীতে কত গৃহপালিত জন্তু আছে তাই নিয়ে ইউনাইটেড নেশনের এক সমীক্ষা হবে। তার ফর্ম ছাপিয়ে পাঠানো হয়েছে পৃথিবীর নানা শহরে আর গ্রামে।
এই ধরনের সমীক্ষায় সাধারনতঃ Statistical sampling technique ব্যবহার করা হয়, সারা পৃথিবী থেকে তো আর information জোগাড় করা সম্ভব নয়, তাই কিছু selected representative জায়গা থেকে data collection করে তার পর Computer software দিয়ে data extrapolation করে সারা পৃথিবী সম্বন্ধে একটা ধারণা করে নেওয়া হয়।
তো ইউনাইটেড নেশনের সেই সমীক্ষার ফর্ম এসে পৌঁছলো বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই গ্রামে ইংরেজী জানা কোন লোক নেই, পোস্টমাস্টার মশাই ক্লাস ফাইভ পর্য্যন্ত পড়েছেন, একমাত্র তিনি কিছুটা ইংরেজী জানেন, এবং তাই নিয়ে তাঁর আবার একটু গোপন অহংকার ও আছে।
এদিকে গ্রামের পাঠশালার মাস্টার মশায়ের এক ভাইপো ঢাকায় স্কুলে পড়ে, তার বয়েস বছর দশ এগারো হবে, সে ছুটিতে কাকার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। সে ভালই ইংরেজি জানে, তাছাড়া সে বেশ উৎসাহী আর কাজের ছেলে, তাই তার উপরেই ভার পড়ল সারা গ্রামে কত গৃহপালিত জন্তু আছে তার একটা হিসেব করে ফর্ম ফিল আপ করার।
ছেলেটি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ক’দিনের মধ্যেই একটা লিস্ট তৈরী করে ফেললো। তার পর ইংরেজী তে ফর্ম ফিল আপ করার পালা।
ছেলেটি গোটা গোটা ইংরেজী হরফে ফর্মে লিখলোঃ
Cow 20, Goat 45, Pig 28, Sheep 32, Rooster 50, Hen 55, Gander 12, Geese 15, Cat 62, Dog 45 ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেই ফর্ম শেষ পর্য্যন্ত পৌঁছলো পোস্টমাস্টারের কাছে। তিনি সেই ফর্ম খামে ভরে পাঠিয়ে দেবেন সঠিক জায়গায়।
পোস্টমাস্টার মশায় ফর্ম টা দেখে কৌতূহলী হয়ে ভাবলেন দেখি তো ছোঁড়া কিরকম ইংরেজী লিখেছে। পড়তে পড়তে হঠাৎ গ্যান্ডার এ এসে তাঁর চোখ আটকে গেল।
গ্যান্ডার?
“ছোঁড়া গন্ডারের ইংরেজী লিখেছে গ্যান্ডার! ছি ছি! কিস্যু ইংরেজি শেখেনি বোঝাই যাচ্ছে” মনে মনে এই কথা বলে তিনি ফর্মে গ্যান্ডার -১২ কেটে লাল কালি দিয়ে লিখে দিলেন রাইনোসেরাস – ১২।
নানা দেশ ঘুরে সেই ফর্ম শেষ পর্য্যন্ত পৌঁছলো ইউনাইটেড নেশনের হেড কোয়ার্টারে। সেখানে কারুর চোখে কোন অসঙ্গতি ধরা পড়লোনা, Computer software দিয়ে সেই data extrapolate করে বড় একটা রিপোর্ট তৈরী হলো, সেখানে দেখা গেল সারা পৃথিবীতে গৃহপালিত গন্ডারের সংখ্যা হল দুই লক্ষ ছাব্বিশ হাজার!
এক এক জনের নামের সাথে তাদের সাথে সম্পর্কিত কোন জায়গার নাম যোগ হয়ে যায়, তোমরা কেউ খেয়াল করেছো?
আমাদের ছিলেন পাটনার দাদু, দিল্লীর জ্যেঠু, উত্তরপাড়ার দিদা।
আর ছিলেন ময়মনসিংহের জ্যেঠিমা।
আমাদের ভৌমিক পরিবারের আদি বসবাস ছিল ওপার বাংলায় টাঙ্গাইলের ভাদরা গ্রামে। সেই সময়ে সেই জায়গাটা পড়তো ময়মনসিংহ জেলায় – এখন অবশ্য টাঙ্গাইল জেলা হয়েছে।
যাই হোক দেশভাগের পরে পরিবারের সবাই ভারতে চলে এলেও বাবাদের এক পিসী (আমাদের দাদুদের এক মাত্র বোন) এবং তাঁর স্বামী ওদিকেই থেকে যান্। বাবাদের পিসেমশায় ময়মনসিংহ শহরে ডাক্তারী করতেন, তাঁর পসার ভাল ছিল। ভিটে মাটির টানে তিনি দেশ ছাড়তে রাজী হন্নি।
দেশে ফিরে আসা পরিবারের বাকি সদস্যদের সাথে বাবাদের এই পিসী ও তাঁর দুই ছেলের যোগাযোগ স্তিমিত হয়ে আসে। তবে দেশভাগের আগে পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানে দুই পক্ষেরই আসা যাওয়া ছিল। আমার মা আর বাবার বিয়েতে (১৯৩৯ সালে) পিসীমা তাঁর ছেলেদের এবং বৌমা দের নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন।
তবে দেশভাগের পরে তাঁদের সাথে আমাদের যোগাযোগ ক্রমশঃ স্তিমিত হয়ে আসে।
পিসীমার বড় ছেলে পূর্ণ (রায়) তাঁর বাবার মত ময়মনসিংহ শহরে ডাক্তারী করতেন। আমাদের ময়মনসিংহের জ্যেঠিমা ছিলেন তাঁর স্ত্রী। চট্টগ্রামের বনেদী পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল।
বাবার এই পিসতুতো দাদা পূর্ণর সাথে খুব অল্পবয়েসে তাঁর বিয়ে হয়। ওঁদের কোন ছেলেপুলে হয়নি। স্বাধীনতার পরে তাঁরাও ভারতে আসেন নি। পূর্ণ জ্যাঠামশায় ডাক্তার ছিলেন, সম্পত্তি আর জমিজমা ছিল, অতএব ময়মনসিংহে তাঁর প্রতিপত্তি ও পসার দুইই ভাল ছিল ধরে নেওয়া যায়।
১৯৬০ সালে স্বামী পূর্ণ মারা যাবার পর জ্যেঠিমা ওখানে আর একা থাকতে পারেন নি, ততদিনে তাঁর সব আত্মীয় স্বজন ভারতে চলে এসেছে। স্বজনহীন, সহায়হীন একা বিধবা আশ্রয়ের সন্ধানে তখন কলকাতা চলে আসেন। কিন্তু সেখানে কোন আত্মীয় দের কাছে তাঁর আশ্রয় মেলেনি। মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীও তখন ভর্ত্তি।
টালীগঞ্জের চন্ডীতলায় একটা ছোট এক কামরার বাসা ভাড়া করে তিনি এবং তাঁর বিধবা দিদি দুই বোন থাকতেন।
তখন থেকেই ময়মনসিংহের জ্যেঠিমা থেকে তিনি হয়ে যান্ আমাদের টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা।
সেই ১৯৬০ সালে তাঁর বয়স পঞ্চাশের নীচেই ছিল, নিজেই হাঁটাচলা বাজার ইত্যাদি করতেন। প্রায়ই বাসে চেপে আমাদের মনোহরপুকুর রোডের বাড়িতে তিনি চলে আসতেন। বোধহয় আমাদের যৌথ পরিবারের কোলাহল আর ব্যস্ততার মধ্যে তিনি তাঁর ফেলে আসা জীবনের হারিয়ে যাওয়া উষ্ণতা কিছুটা খুঁজে পেতেন। তাঁর হাসিখুশী ব্যবহারের জন্যে তিনি আমাদের সকলের খুব প্রিয় ছিলেন। আমার তখন অল্প বয়েস, তবু তাঁর নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের কষ্ট বুঝতে আমার অসুবিধে হত না।
টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা যে কমবয়েসে খুব সুন্দরী ছিলেন তাঁকে দেখেই তা বোঝা যেতো। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, টুলটুলে মুখে অজস্র বলিরেখা, মাথায় কিছু রূপোলী চুলের ঝিলিক, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা, আর মুখ ভর্ত্তি পানে ঠোঁট লাল, সব মিলিয়ে তাঁর সেই চেহারাটা এখনো পরিস্কার চোখে ভাসে। মুখ টিপে অল্প হেসে অনেক মজার মজার কথা বলতেন জ্যেঠিমা, তাঁর ব্যক্তিত্বে বনেদীয়ানার একটা সুস্পষ্ট ছাপ ছিল। তাঁকে দেখে তাঁর জীবনের নানা বিপন্নতা আর বিষাদ একেবারেই বোঝা যেতোনা।
আমাদের বাড়ি থেকে ফেরার সময় নিয়ম করে তাঁকে আমি বসুশ্রী সিনেমার সামনে বাসে তুলে দিয়ে আসতাম। চার নম্বর বাস যেত টালিগঞ্জের চন্ডীতলায়। বাসে খুব ভীড় থাকলেও ওনাকে দেখে কন্ডাক্টররা ভালবেসে “আসুন দিদিমা” বলে হাত ধরে টেনে তুলে নিত। আর চন্ডীতলায় ওনার ঘরে মাঝে মাঝে গেলে কি খুশী যে হতেন দুই বোন। পাথরের থালায় বাড়িতে বানানো নারকেলের নাড়ু, অথবা রাঘবসাই খেতে দিতেন, সাথে কাঁসার গেলাসে কুঁজোর ঠান্ডা জল।
২) বালিকা বধূ
ইন্দিরা তে ম্যাটিনি শো তে বালিকা বধূ দেখাচ্ছে । সুভদ্রা আর জ্যেঠিমা সেজেগুজে বেরোচ্ছে সিনেমা দেখতে। টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা তখন মনোহরপুকুরে কিছুদিনের জন্যে এসে আছেন, তিনি ঠিক লক্ষ্য করেছেন । এই দুজন কোথায় যায় এই দুপুরবেলায় এত সেজেগুজে?
“তোরা কোথা যাওস?”
দুজনে সিনেমা যাচ্ছে শুনে তিনি “আমারেও নিয়া চল্” বলে ধরে বসলেন, তাঁকে না বলা কঠিন। সুতরাং তিনিও ওদের সাথে চললেন ।
সিনেমা শুরু হলো।
বিয়ের দৃশ্যের পর ফুলশয্যা । বালিকা বধূ তার বরকে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলছে, “দ্যাখো দ্যাখো, কি সুন্দর চমচমে জ্যোৎস্না!”
এমন সময় হঠাৎ পাশ থেকে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ শব্দ ।
কি ব্যাপার? কে কাঁদে?
সুভদ্রা দ্যাখে পাশে টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা ঘন ঘন শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছছেন । ক্রমশঃ তাঁর কান্না আর বাঁধ মানলোনা । হু হু করে চোখ দিয়ে জল আর হাপুস নয়নে কান্না ।
পাশ থেকে অনেকে বিরক্ত হয়ে নানা রকম মন্তব্য করতে লাগলো।
সুভদ্রা আর জ্যেঠিমা ভীষণ অপ্রস্তুত।
“আমার ও ঠিক এই বয়সে বিয়া হয়েসিল রে, সেই কথা বড় মনে পড়ত্যাসে!”
এই গল্পটা পরে সুভদ্রা আর জ্যেঠিমার মুখে অনেকবার শুনেছি। আর প্রত্যেক বারই এই নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়েছে।
কিন্তু এখন মাঝে মাঝে ভাবি গল্পটা কি আসলে হাসির না দুঃখের?
আমাদের ছোটবেলায় সেই পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে যখন মনোহরপুকুরের বাড়ীতে আমাদের মধ্যবিত্ত যৌথপরিবারে আমরা ভাইবোনেরা বড় হচ্ছি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা সংঘাত ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে দেশ তখন সবে স্বাধীন হয়েছে – সেই সময়ের কথা ভাবলে দেশের মানুষের জীবনে শান্তির একটা বাতাবরণ নেমে আসার কথা মনে পড়ে। সেই শান্তির আবহ আমাদের পারিবারিক জীবনেও তার ছায়া ফেলেছিল।
মধ্যবিত্ত পরিবার বড় হলেও আমাদের ভাইবোনদের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করার জন্যে আমাদের সুশিক্ষা আর সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারে মা বাবাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলনা। আর বাড়ীর বৌরা – আমাদের মা জ্যেঠীমা কাকীমারা – সর্ব্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন আমাদের পরিবারের এবং বিশেষ করে আমাদের ছোটদের কল্যাণ কামনায়।
সেই কল্যাণ কামনা থেকেই আমাদের জন্যে তাঁদের নানা ব্রত, নানা উপোস, নানা পূজো। নীল ষষ্ঠী, শিবরাত্রি, অক্ষয় তৃতীয়া…
মনোহরপকুরের বাড়ীতে সরস্বতী পূজো আর লক্ষ্মী পূজো দু’টোই হতো বেশ ধূমধাম করে। মা জ্যেঠিমা কাকীমারা সবাই খুব ভক্তি আর নিষ্ঠার সাথে পূজোর আয়োজন করতেন, আমাদের বাড়ীর সামনে টিনের চালের একতলা বাসায় থাকতেন হারু আর কানাই, দুই ভাই। ওঁদের মধ্যে একজন এসে পূজো করতেন।
যেহেতু সরস্বতী হলেন বিদ্যার দেবী, তাই তাঁর পূজো আমাদের ছোটদের – যারা স্কুলে পড়ি এবং যাদের মা সরস্বতীর আশীর্ব্বাদ একান্ত প্রয়োজন – তাদেরও পূজো ছিল , পূজোয় খুব মজা করতাম আমরা ভাইবোনেরা।
আমাদের স্কুলের পাঠ্য বই আর কলম দেবীর সামনে রাখা হতো, “জয় জয় দেবী চরাচর সারে” বলে হাত জোড় করে আমরা সবাই অঞ্জলি দিতাম, বেলপাতায় খাগের কলম দিয়ে “ওঁ সরস্বতৈ নমো নিত্যং” লিখতাম।
সরস্বতী পূজোর আগে কুল খাওয়া মানা ছিল, খেলে দেবী পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবেন এরকম একটা ধারণা আমাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা অনেকেই অবশ্য সেটা মানতাম না, মা সরস্বতী তাঁকে আগে না খাইয়ে নিজেরা কুল খেয়ে নিয়েছে বলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের শাস্তি দিয়ে ফেল করিয়ে দেবেন, এত নিষ্ঠুর তিনি নন্।
গুরুজনদের না জানিয়ে মাঝে মাঝে পূজোর আগেই কুল খেয়েছি এ কথা এতদিন পরে এখন স্বীকার করতে বাধা নেই। মা’রা বাড়ীতে নানা মিষ্টি – তিলের নাড়ু নারকোলের নাড়ু, গজা মালপোয়া ইত্যাদি তৈরী করতেন, কিন্তু যে মিষ্টির কথা সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে তা হলো কদমা। আদ্যোপান্ত চিনি দিয়ে তৈরী ওই গোল মিষ্টিটা আর কোন পূজোতে খেয়েছি বলে মনে পড়েনা।
কদমা হলো সরস্বতী পূজোর মিষ্টি।
আর যেটা মনে পড়ে তা হলো আমরা ভাইবোনেরা নানা রং এর কাগজ কেটে গদের আঠা দিয়ে অনেক লম্বা লম্বা শিকল বানিয়ে সেগুলো বারান্দার দেয়ালে আটকে দিতাম। সারা বারান্দা ঝলমলে সুন্দর হয়ে সেজে উঠতো, বেশ একটা উৎসবের মেজাজ নেমে আসতো আমাদের সকলের মনে।
এতগুলো বছর কেটে গেছে, তবু এখনো প্রতি বছর সরস্বতী পূজো এলেই সেই শিকল বানানোর কাজে আমাদের ভাইবোনদের উৎসাহ আর উত্তেজনার কথা মনে পড়ে।
আর মনে পড়ে ঠাকুর কিনতে যাবার কথা।
একবার ১৯৬০ সালে, আমার তখন ক্লাস নাইন, সরস্বতী পূজোর দুই দিন আগে মেসোমশায় (রঞ্জুর বাবা, ভগবতী মাসীর -স্বামী) রাত প্রায় দশটা নাগাদ সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন। উনি অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন, তাই তাঁর মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিলনা। কিন্তু অত রাতে মারা যাওয়াতে একটু logistical অসুবিধে হয়েছিল।
মাসী ছিলেন মা’র ঠিক ওপরের বোন, ভগবতী নাম থেকে তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল ভাগু। সবার কাছে তিনি ছিলেন ভাগুদি। আর ওই দুই বোন ছিলেন ভীষন কাছের মানুষ, বিয়ের পর থেকেই দু’জনে কলকাতায় থাকার জন্যে অন্য দুই ছোট বোনদের তুলনায় তাঁদের দু’জনের মধ্যে একটা একটা অদ্ভুত bonding তৈরী হয়েছিল। আর আমি আর রঞ্জু দু’জনে ছিলাম দুই বোনের এক মাত্র সন্তান। ছোটবেলায় মা আমায় নিয়ে মাঝে মাঝেই রবিবার বা কোন ছুটির দিন সকালে মাসীর বাড়ী (এন্টালী ক্রিস্টোফার রোডে সি আই টি বিলডিংএ সরকারী আবাসন) চলে যেতেন। ৩৩ নম্বর বাসে মাসীর বাড়ী যাওয়া হতো। হাজরা মোড়ে উঠতাম। আর পার্ক সার্কাস ছাড়িয়ে পদ্মপুকুর স্টপে নেমে কিছুটা হাঁটতে হতো।
মাসীর বাড়ীতেই লাঞ্চ খেতাম। আর সারা দিন আমি আর রঞ্জু এক সাথে । কখনো পাড়ায় ক্রিকেট, কখনো বাড়ীতে ক্যারম, কখনো রেডিও তে অনুরোধের আসর। আবার মাসী আর মা’র নানা কাজেও আমাদের দুই মাণিকজোড় ছুটোছুটি করতাম। ট্যাক্সি ডেকে দেওয়া, চিঠি পোস্ট করা, ট্রেণের টিকিট কাটা, বাজার করে নিয়ে আসা, এই সব নানা কাজ দু’জনে মিলে করতে বেশ লাগতো।
রঞ্জু আর আমি দুই ভাই ক্রমশঃ অভিন্নহৃদয় বন্ধু হয়ে যাই।
মেসোমশায় খুব চুপচাপ মানুষ ছিলেন, নিজের ঘর থেকে বেরোতেন না, শেষের দিকে অসুখে প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিলেন।
বাবার মৃত্যুর সময় রঞ্জু তখন নরেন্দ্রপুরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে, তার বয়স মাত্র তেরো বছর। মাসী অত রাতে মেসোমশায়ের সেক্রেটারী রামুয়াকে পাঠালেন মেসোমশায়ের গাড়ী নিয়ে রঞ্জুকে আনতে। মাসী রামুয়াকে বলে দিয়েছিলেন রঞ্জুকে তুলে ফেরার পথে আমাদের বাড়ী থেকে মা’কে তুলে নিতে। মাসীর আর আমাদের দুজনের বাড়ীতেই ফোন ছিলনা, তাই আগে খবর দেওয়া সম্ভব ছিলনা।
রামুয়া যখন আমাদের বাড়ীর দরজায় কড়া নাড়লো, তখন রাত প্রায় দু’টো।
কড়ার শব্দ শুনে বাড়ীর বড়রা সবাই ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছেন, আমারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মা খবর পেয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
গাড়ীতে তখন ছোট্ট রঞ্জু ঘুমিয়ে পড়েছে।
পরের দিন আমার স্কুলে সাইন্সের পরীক্ষা ছিল মনে আছে। Weekly test..আর তার পরের দিন বাড়ীতে সরস্বতী পূজো।
স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পরে ভালকাকা আমায় আর বাবলুকে নিয়ে গোপালনগরে সরস্বতী ঠাকুর কিনতে গিয়েছিলেন। বেশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, আলো জ্বলে উঠেছিল চারিদিকে, বিশাল একটা প্রাঙ্গনে অনেক ঠাকুর সাজানো, কেনা বেচা চলছে, বেশ ভীড়, তার মধ্যেই ভালকাকার সাথে আমাদের কোন এক দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। মনে হলো মেসোমশায়কে তিনি চিনতেন।
ভালকাকা তাঁকে বলেছিলেন, “খবর টা শুনেছেন নাকি? ননীবাবু কাল রাত্রে মারা গেছেন। স্ট্রোক হয়েছিল। ”
তারপরে দু’জনের মধ্যে মেসোমশায় কে নিয়ে কিছু শোকপ্রকাশ এবং কিছু আলোচনা হয়েছিল। মৃত্যু যে আমাদের জীবনে একটি সামাজিক ঘটনা, লোকের মুখে মুখে যে এই ভাবে মানুষের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, সেদিন সরস্বতী ঠাকুর কিনতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা জানতে পারি।
পারিবারিক গন্ডীর মধ্যে ১৯৬০ সালে সেই ছিল আমার জীবনে পরিবারে্র এত কাছের একজন মানুষের মৃত্যুর প্রথম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। মনে আছে সরস্বতী পুজোর আনন্দ সেবছর অনেকটাই মুছে দিয়েছিল সেই মৃত্যু সংবাদ।
এখন এতদিন পরে জীবন সায়াহ্নে পোঁছে আমার কাছের কত লোক এক এক করে চলে গেলেন। মৃত্যু এখন আর আমার কাছে অপরিচিত নয়।
আমাদের আগের প্রজন্মের কেউই আর এখন আমাদের কাছে নেই। মৃত্যু এসে হানা দিয়েছে আমাদের প্রজন্মেও। শঙ্কর আর তাপার পরে সম্প্রতি মিঠুও চলে গেল আমাদের ছেড়ে।
এখন সরস্বতী পূজো এলেই আমাদের ছোটবেলার মনোহরপুকুরে সেই গমগমে সরস্বতী পুজোর পরিবেশের কথা মনে পড়লে মনটা এখন বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
উর্ম্মি আর উদয়ন অনেক বছর পরে কলকাতায় এসেছে। পাটুলীতে ঝুনকুর ঝকঝকে নতুন বাড়ীতে আমরা ভাইবোনেরা সবাই একটা সন্ধ্যা ওদের সাথে কাটালাম।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এক সূত্রে বাঁধা আছে সহস্র জীবন। আমরা ভাইবোনেরা যে সুতোয় বাঁধা আছি তা হলো আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ীতে একসাথে কাটানো বাল্য আর কৈশোরের প্রায় পনেরো কুড়ি বছরের দিনগুলোর স্মৃতি।
এই বাঁধন এতগুলো বছরেও আলগা হয়নি।
উর্ম্মিরা বলেছিল বিকেল পাঁচটার মধ্যে চলে আসতে, তো আমরা চলে এলাম। সুভদ্রা আর আমি। মিঠু, খোক্ন, টুপসি, ওর ছেলে, আর বুবান। ভান্টুলি আর শ্রেয়া। কৌশিকী, ঝুন্টু, আর ঋদ্ধি। তা ছাড়া উর্ম্মি, উদয়ন আর ঝুনকু। সব মিলিয়ে টুপসির বাচ্চাটাকে নিয়ে আমরা পনেরো জন।
তারপর শুধু হাসি আর আড্ডা, যাকে বলে নরক গুলজার।
মনোহরপুকুরের দিন গুলো নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ হলো। সেই সবাই মিলে ছাতের বারান্দায় মাদুরে বসে কাঁসার থালায় খাওয়ার কথা কি ভোলা যায়? সেই অন্নপূর্ণা বাবু, মাখনবাবু, সুন্দর স্টূডিওর পাঞ্জাবী ভদ্রলোক যার নাম খোকন দিয়েছে সুন্দরবাবু, পাশের পাঁচুবাবুর বাড়ীর তলায় মুচি, বসন্ত নাপিত। কত সব চেনা মানুষ। তাদের নিয়ে কত কথা। কত গল্প। শেষ আর হয়না।
হরিকুমার বাবু থাকতেন মঞ্জুশ্রীর গলির পরে মোহন বিশুদের বাড়ীর তলায়। উর্ম্মি বললো মোহনের বৌর ওপরে মাঝে মাঝে কোন দেবী এসে ভর করতেন, আর ভর হলেই নাকি সেই বৌ ঠাস ঠাস করে তার শ্বাশুড়ীকে গালে চড় মারতো। এমন কি মোহনকেও সে এমন চড় মেরেছে যে সে নাকি বৌয়ের ভর হলেই নীচে রকে গিয়ে বসে থাকতো। বাপ্পা বলেছে ভরটর সব বাজে, আসলে শ্বাশুড়ী আর বরের ওপর রাগ মেটানোর ওটা একটা উপলক্ষ্য।
আমরা একবার সবাই মিলে ট্রেণে ডায়মন্ড হারবার গিয়েছিলাম, উদয়নও ছিল আমাদের সাথে, মনে আছে? বৃষ্টিভেজা দিন ছিল, উদয়ন উদাত্ত গলায় অনেক কবিতা আবৃত্তি করেছিল নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে। মনে আছে? আর একবার আমরা উর্ম্মির দুই যমজ মেয়েকে দেখে ফেরার সময় দেশপ্রিয় পার্কের সামনে ফুটপাথে একটা গ্রুপ ফটো তুলেছিলাম, মনে আছে? দিদিভাই ও ছিল সেবার আমাদের সাথে।
সবার সব পরিস্কার মনে আছে।
ট্রেণের কথা উঠতে খোকন বলল মাঝে মাঝে আমি কাজ থেকে বাড়ী ফেরার সময় শিয়লাদা থেকে ট্রেণ ধরে গড়িয়া আসতাম। সে কি ভীড়। কে যে কাকে ধরে ঝুলছে বোঝার উপায় নেই। এক ভদ্রলোক হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন আরে আরে আমার ধুতি! কিন্তু কিছু বোঝার আগেই তাঁর ধুতি অন্য কারুর হাতে চলে গেছে।
খোকনের এই সব মজার মজার কথা শুনে সব চেয়ে বেশী হাসছে উর্ম্মি আর ঝুনকু।
“হি হি হা হা, আমার ধুতি… হো হো হা হা”!
ঝুন্টুর কৌতূহল একটু বেশী । সে বললো, “তলায় কিছু ছিল তো?”
ভান্টুলি বললো “না থাকলেও কিছু দেখা যেতোনা। ওপরে পাঞ্জাবী ছিল নিশ্চয়, তাতে সব ঢাকা পড়ে যাবে…”
ঝুনকু বললো, “যাঃ, কি সব অসভ্যতা হচ্ছে…”
ভান্টুলির স্টকেও ট্রেণের গল্প। এটা ফুলকাকাকে নিয়ে।
একবার ফুলকাকা ট্রেণে করে কোথাও যাচ্ছেন, রাত হয়েছে। কামরায় তিন জন তাস খেলছে, তারা ফুলকাকাকে বললো “তিন পাত্তি খেলবেন?” ফুলকাকা তাস খেলেন না তিনি তাঁর ব্যাগ মাথার নীচে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখেন সেই খেলোয়াড়রা কেউ নেই, তাঁর ব্যাগটাও উধাও।
খোকন বললো, “ভাগ্যিস মাথাটাও নিয়ে যায়নি…”
ঝুনকু আর উর্ম্মি যথারীতি হেসে লুটিয়ে পড়লো।
“হি হি হা হা, মাথাটাও নিয়ে যায়নি হো হো হা হা”!
আমি বললাম কি হচ্ছে কি? কারুর ধুতি, কারুর ব্যাগ হারিয়ে যাচ্ছে, এ তো দুঃখের গল্প! এত হাসছিস কেন তোরা?
জ্যেঠিমার বোন শেফালী মাসীর বর মেসোমশায়ের ডাকনাম ছিল খোকা। মাঝে মাঝে শেফালী মাসীর কোন কাজে – কিছু দিতে বা নিতে – উনি কাজ থেকে পুলিশের ড্রেস পরে মনোহরপুকুরে আসতেন, আর এলেই জ্যেঠিমা “ওরে খোকা বাবু এসেছে” বলে একটা হাঁক পাড়তেন।
মেসোমশায় ছিলেন কলকাতার কোন এক থানার ওসি। লম্বা চওড়া চেহারা, পরণে পুলিশের ইউনিফর্ম, তার ওপরে গমগমে গলা। রসিক লোক ছিলেন, নিজের রসিকতাতে নিজেই যখন হাসতেন তখন আমাদের বাড়ীর কড়িবরগা সব কেঁপে উঠতো।
এদিকে আমাদের বাড়ীর সামনে এক মুদীর দোকান ছিল, সেখানে আমরা চাল ডাল তেল ইত্যাদি কিনতে যেতাম। যে লোকটা সেই দোকান চালাতো তাকে সবাই খোকা নামে চিনতো। মুদীর দোকানের নাম হয়ে গিয়েছিল খোকার দোকান। মা কাকীমারা মাঝে মাঝে আমাদের বলতো, “খোকার দোকান থেকে আড়াইশো গ্রাম মুড়ি নিয়ে আয় তো~ ”
ঝুন্টূ বললো “একদিন মেজমা শুনি পিছনের গলিতে কে পেচ্ছাপ করছিল তাকে ধমক দিয়ে বলছে খোকাকে বলবো একদিন পুলিশের ড্রেস পরে এসে তোমায় ধরতে। মজাটা বুঝবে সেদিন। আমি ভাবলাম My God, মুদীর দোকানের ওই মোটাসোটা ভুঁড়িওয়ালা ছেঁড়া গেঞ্জী পরা লোকটার এত ক্ষমতা?”
আসলে দুজনের নামই খোকা, তাই ঝুন্টুর গুলিয়ে গেছে। খোকন গম্ভীর ভাবে বলল “A case of mistaken identity”..
ঝুন্টু বললো “তার পর থেকে আমি খোকার দোকানে গেলে লোকটাকে খুব সন্মান করে কথা বলতাম…”
তাই শুনে ঝুনকু আর উর্ম্মি আবার হেসে গড়াগড়ি।
“হি হি হা হা, সন্মান করে কথা বলতাম, হো হো হা হা”!
আমাদের বাড়ীর পাশে ডক্টর মৃণাল দত্তের চেম্বার, সেখানে এক কম্পাউন্ডার ভদ্রলোক ইঞ্জেকশন দিতে আসতেন, তার নাম ভালোকাকীমা দিয়েছিলেন ফুটুবাবু। উর্ম্মি বলল একবার নাকি রাস্তায় ভালোকাকার সাথে আচমকা ফুটূবাবুর দেখা হয়। এখন ভালকাকা ছিলেন পাড়ার একজন সন্মানীয় লোক, সবাই দেখা হলেই খুব খাতির করে তাঁকে শ্যামলদা’ বলে ডাকে, তিনি নাকি ফুটুবাবুকে দেখে কিছুটা patronizing ভঙ্গীতে হাসি মুখে যেন অনেক দিনে চেনা এই ভাবে “ভাল আছো ফুটু?” বলেছিলেন।
খোকন বললো “ওনার নাম যে ফুটু উনি কি সেটা জানতেন নাকি?”
আমি বললাম “মনে হচ্ছে উনি ভেবেছিলেন কে না কে ফুটু, আমায় শ্যামলদা’ ফুটু ভাবছে – a case of mistaken identity”..
উর্ম্মি আর ঝুনকুর হাসি আর থামেই না।
“হি হি হা হা, ভাল আছো ফুটু, হো হো হা হা”!
উদয়ন ও বেশ ভাল গল্প বলতে পারে। সে শুরু করলো হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার পরে তার স্কুলের বন্ধুদের সাথে জম্বুদ্বীপে বেড়াতে যাবার লোমহর্ষক গল্প। রামায়ণের জম্বু দ্বীপ নয়, এ হলো সুন্দরবনের জম্বুদ্বীপ, সাগর দ্বীপের কাছে। শীতের দিন ফ্রেজারগঞ্জ থেকে নৌকায় সাত বন্ধু – তারা আবার সবাই হিন্দু স্কুলের মেধাবী ছাত্র – বিকেলে গিয়ে পৌছল সেই দ্বীপে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, সারাদিন খাওয়া হয়নি, এদিকে নির্জন জনমানবশুন্য দ্বীপ, থাকা খাওয়ার জায়গা নেই, ওদিকে নৌকা নিয়ে মাঝিও কেটে পড়েছে, এখন উপায়?
হঠাৎ তারা শোনে অন্ধকারে কোথাও রেডিও তে লতা মঙ্গেশকারের গান বাজছে। কেউ কোথাও নেই, গানটা বাজাচ্ছে কে? ভূতুড়ে ব্যাপার। তারপর তো সেই রেডিওর খোঁজে গিয়ে কিছু জেলের দেখা পাওয়া গেল, তারা তাদের ভালবেসে অনেক রাতে রান্না সেরে মাছের ঝোল ভাত খাওয়ালো আর পরের দিন ছোট নৌকায় করে ওদের আবার ফ্রেজারগঞ্জে পৌঁছে দিল।
এই নৌকা মাছ ধরার নয়। ছোট এবং নীচু, মাছ নিয়ে যাবার নৌকা, সেখানে সাত জন বসাতে নৌকার অর্ধেক জলের তলায়। জায়গাটা নদীর মোহনা, চারিদিকে অকূল সমুদ্র, ছোট নৌকায় করে জল ছেঁচে ছেঁচে ফ্রেজারগঞ্জে পৌঁছবার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা উদয়ন এতগুলো বছর পরেও এখনো ভোলেনি। তার সাথে সাথে সন্ধ্যাবেলা সমুদ্রের ঢেউ এ অস্তগামী সূর্য্যের লাল আলো পড়ার দৃশ্যটা এখনো উদয়নের মনে পড়ে। সে এক অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য।
উদয়ন বেশ ভাল গল্প বলে, কিন্তু সব চেয়ে জমিয়ে গল্প বলে আমাদের খোকন। খোকনের গল্প বলার একটা অননুকরণীয় ভঙ্গী আছে, সেটা হলো কোন গল্প বলার সাথে সাথে তার দুটি হাত কে সে নানা ভাবে ঘুরিয়ে ব্যবহার করে।
শম্ভু মিত্র ম্যাগসেসে পুরস্কার নিতে ম্যানিলা যাচ্ছেন, তাঁকে এয়ারপোর্টে দেখাশোনা করার ভার পড়েছে খোকনের ওপর। সে তখন দমদমে পোস্টেড। খোকন কিছুদিন আগে রাজা অয়দিপাউস নাটকে শম্ভু মিত্রের অভিনয় দেখে মুগ্ধ। সেই মানুষটাকে অভাবিত ভাবে এত কাছে পেয়ে তাই স্বভাবতঃই সে দারুণ অভিভূত।
খোকন হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বালে যাচ্ছে “আমি তো ওনাকে অনেক কিছু বলে যাচ্ছি, আপনি আমাদের বাঙালীদের গর্ব, আপনি এত বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কার নিতে যাচ্ছেন আপনার এই সন্মান আমাদেরও সন্মান, ইত্যাদি প্রভৃতি। আর উনি শুধু গম্ভীর মুখে হুঁ হুঁ করে যাচ্ছেন।”
তারপর যেই না বলেছি “আমি একাডেমীতে গত সপ্তাহে আপনাদের বহুরূপীর রাজা অয়দিপাউস নাটকটা দেখেছি, আমার খুব ভাল লেগেছে”, ওমনি ভদ্রলোক যেন হঠাৎ জেগে উঠলেন, আমার দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “তুমি দেখেছ? হলে কোথায় বসেছিলে বলো তো?”
যেই আমি বলেছি সামনের পাঁচ নম্বর রো তে বাঁদিকে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমায় বললেন “আচ্ছা অমুক সীনে আমি যখন হাতটা ঘুরিয়ে (খোকন এই জায়গাটা হাত ঘুরিয়ে দেখালো উনি কেমন করে দেখাচ্ছেন)কপালের কাছে নিয়ে আসছি, তখন তোমাদের সীট থেকে আমার মুখটা কি দেখা যাচ্ছিলো?”
খোকন বললো “আমি ভাবলাম এই রে সেরেছে, এর পরে আমায় নাটকের সমঝদার ভেবে আবার কি প্রশ্ন করবেন কে জানে, তাড়াতাড়ি এক জন কে ডেকে বললাম ভাই এনাকে লাউঞ্জে পৌঁছে দিয়ে এসো।”
এই রকম নানা গল্প করতে করতে রাত প্রায় ন’টা বেজে গেল।
ইতিমধ্যে কেটারার এসে বড় বড় কড়ায় করে খাবার দিয়ে গেছে। মেনু হলো মিষ্টি পোলাও, ফুলকপির রোস্ট, মাংস, চাটনি আর ক্ষীরকদম্ব।
শেষ পর্য্যন্ত যখন বেরোলাম তখন রাত দশটা বেজে গেছে।
প্রায় পাঁচ ঘন্টা কি করে যে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।
মুকুদের Army Officers Golf Club এ চারিদিকে অবারিত আদিগন্ত সবুজ গলফ কোর্স । খোলা আকাশের নীচে ক্লাবের outdoor restaurant, চারিপাশে অনেক গাছপালা, তাদের পাতার মাঝখান দিয়ে ঝিলিমিলি রোদ্দুর, মরশুমী ফুলের বাগান। সেই রেস্টুরেন্টের নিরিবিলি কোণ বেছে নিয়ে একটা টেবিলে আমরা দুজনে বীয়ার নিয়ে মুখোমুখি বসে আড্ডা মারি। শীতের সকাল, নরম সোনালী রোদ, পরিবেশটা খুব সুন্দর, আমি আমার মনের মধ্যে বেশ একটা ফুরফুরে আনন্দের ভাব টের পাই।
মুকুদের ক্লাবের চারিদিকে সাদা উর্দ্দি পরা মাথায় পাগড়ী পরা অধস্তন কর্ম্মচারীরা কাজ করছে, কেউ রিসেপশন কাউন্টারে, কেউ রেস্টুরেন্টের ওয়েটার, কেউ আবার মালী। Army তে rank ব্যাপারটা খুব important, তাই Army officer দের তুলনায় এই সব কর্ম্মচারীরা একটু নীচের তলার লোক।
উত্তর ভারতে হিন্দী belt এর প্রদেশ গুলোতে “বেটা” কথাটা নিজের ছেলেমেয়েদের অথবা ছোটদের ভালবেসে বলা হয়।
আমি দেখলাম মুকু অক্লেশে এই সব উর্দ্দী পরা মাঝবয়েসী এমন কি বেশ বুড়ো ওয়েটারদেরও আদর করে “বেটা” বলে সম্বোধন করছে, এবং তার কাছ থেকে এই পুত্রসদৃশ স্নেহের ব্যবহার পেয়ে তাদেরও কোন ভাবান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। অফিসারদের কাছ থেকে এই অপত্যস্নেহ পাওয়া তাদের কাছে নতুন কিছু নয়, এতে তারা বেশ অভ্যস্ত বলেই মনে হয়।
এই নিয়ে মুকুর একটা গল্প আছে।
—————-
মুকুর মেয়ে মণিকা Institute of Mass Communication এ admission পেয়েছে, এখানে admission পাওয়া সোজা নয়, খুব কম লোকেই পায়। মুকু তার সাথে ব্যাঙ্কে গেছে admission fee pay করতে। সেখানে গিয়ে দেখে বিশাল লম্বা লাইন। অন্ততঃ ঘন্টা দুয়েক লেগে যাবে লাইনের সামনে পৌঁছতে।
মুকু মণিকা কে বলল, “থাক্ তোর আর এখানে ভর্ত্তি হতে হবেনা, তুই বরং বরোদাতে গিয়ে Art History নিয়ে MA পড়তে যা, সেখানে এরকম লাইন দেবার ব্যাপার নেই, আমি টাকাটা ব্যাঙ্ক ট্র্যান্সফার করে দেবো।”
এই সব কথা হচ্ছে, এমন সময় একটি উর্দ্দি পরা ব্যাঙ্কের দারোয়ান এসে মুকু কে বললো “সাব্, আমায় চেক লিখে দিন্, আমি আপনার টাকা জমা দিয়ে রিসিট এনে দিচ্ছি”।
আমি মুকু কে বললাম, “কে লোকটা?”
মুকু বললো, “শোন্ না! আমি তো চেক লিখে দিলাম, ভাবলাম account payee cheque, কি আর করবে? দেখাই যাক না”।
মিনিট দশেক পরে লোকটা এসে মুকুকে টাকার রিসিট দিয়ে একটু দুঃখ দুঃখ মুখ করে বললো, “আপ মেরেকো পহচানা নেহী, সাব্?”
আজকাল সুভদ্রা আর আমি মাঝে মাঝে দিল্লী যাই। সেখানে আমাদের ছোট মেয়ে বুড়ী থাকে, আমরা মেয়ে জামাই আর নাতি নাতনীদের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে আসি। দিল্লী গেলেই মুকুর সাথে দেখা হয়, আর আমরা নিয়ম করে একদিন কিছুক্ষণ একসাথে কাটাই।
মুকু আমাকে ওর গাড়ীতে তাদের Army Officers Golf Club এ নিয়ে যায়। রাস্তায় গাড়ী চালাতে চালাতে মুকু অনর্গল কথা বলে যায়। তার অনেক গল্প। আর সেই কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে মুকু মাঝে মাঝে বেশ কিছু গানের দুই এক কলি নিজের মনেই গেয়ে ওঠে।
মুকু সম্বন্ধে কিছু লিখতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে সে একজন সঙ্গীতরসিক, এমন কি ভাল বাংলায় তাকে সঙ্গীতপিপাসু ও বলা যায়। একটু সুযোগ পেলেই সে কিছু গান গুণগুণ করে গাইবেই। আর একটা আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো যে জীবনটা প্রায় সবটাই বাংলার বাইরে কাটালেও তার প্রিয় গান গুলো সবই বাংলা গান। স্কুলের উঁচু ক্লাসে (ক্লাস নাইন থেকে ইলেভেন ১৯৬০-৬৩) পড়ার সময়ে সে তিন বছর কলকাতায় ছিল। সেটা ছিল বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। সেই সময়ের বহু বাংলা গান মুকুর এখনো বেশ মনে আছে, গত বছর সে গাড়ী চালাতে চালাতে স্টিয়ারিং এ তবলা বাজাতে বাজাতে গাইছিল মান্না দে’র আমি যামিনী তুমি শশী হে…
এবার তার গলায় শুনলাম দুই ভাই সিনেমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত সুপারহিট গান “তারে বলে দিও সে যেন আসেনা আমার দ্বারে”…ওই গানের একটা interlude আছে গানের মাঝখানে বিশ্বজিৎ (রাধাকান্ত নন্দী) হঠাৎ তবলা বাজানো বন্ধ করবে আর উত্তমকুমার (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) বলবে “কি রে থামলি কেন, বাজা?”
ট্র্যাফিক জ্যামে গাড়ী আটকে গেলে বা ট্র্যাফিক লাইটে গাড়ী থামলেই মুকু আনমনে গান থামিয়ে বলে উঠছে, “কি রে থামলি কেন, বাজা?”
এই গান গাওয়া নিয়ে মুকুর একটি গল্প আছে, এর থেকে তার self mocking আর self deprecating persona সম্বন্ধে একটা ধারণা করা যাবে।
————-
একবার বহুদিন আগে পঞ্চাশের দশকে (মুকুর বয়েস তখন সাত কি আট বছর) জ্যেঠুরা তখন পান্ডারা রোডে থাকেন, সবাই মিলে টাঙ্গা চড়ে বিপু মামার বাড়ীতে যাওয়া হচ্ছে। গাড়ীতে জ্যেঠিমা (মুকুর মেজমা) ও আছেন।
মুকুর সব গল্প শুনলেই সেগুলো মনের মধ্যে একটা ছবির মত ফুটে ওঠে। ওর গল্প বলার মধ্যে একটা স্বাভাবিক দক্ষতা আছে।
আমি শুনছিলাম আর মনে মনে কল্পনা করে নিচ্ছিলাম সেই সময়কার পান্ডারা রোড, নির্জ্জন, গাছের ছায়ায় ঢাকা, তার মধ্যে টাঙ্গা চলছে, ঘোড়ার খুরের খট্খট্ আর গাড়োয়ানের জিভ দিয়ে তোলা টক্টক্ আওয়াজ শোনা যায়, তার সাথে মাঝে মাঝে স্পীড বাড়ানোর জন্যে ঘোড়ার পিঠে আলতো করে মারা চাবুকের সপ্সপ্ শব্দ।
ছোটবেলায় এক সময়ে কত টাঙ্গায় চড়েছি, দিল্লী পাটনা লক্ষ্ণৌ কাশী এই সব শহরে। এখন আর কোথাও টাঙ্গা চলেনা, তার জায়গায় এখন অটো আর রিক্সা।
যাই হোক, টাঙ্গায় যেতে যেতে মুকু – সে সেই অল্পবয়েস থেকেই সঙ্গীতপিপাসু – জ্যেঠিমা কে বললো, “মেজমা তুমি একটা গান গাও না!”
জ্যেঠিমা বললেন, “আমি তো গান গাইতে পারিনা মুকু, বরং তুই একটা গান গা’ না”।
এখন মুকু হচ্ছে এমন একজন ছেলে যাকে গান গাইতে বলার দরকার হয়না, সে এমনিতেই নিজের উৎসাহেই গান গেয়ে যায়। সুতরাং বলা বাহুল্য জ্যেঠিমা বলার সাথে সাথে সে একটা গান গাইতে শুরু করে দিলো।
“কি গান গাইলি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
কিছু দিন আগে শুমার কাছ থেকে শুনে এই গানের সুরটা তার খুব ভালো লেগেছে। সে গাইতে শুরু করে দিলো “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো…”
মুকু আমায় বললো , “আমি বেশ ভালোই গান টা শুরু করেছিলাম, বুঝলি, কিন্তু দুই লাইন গাইবার পরেই আমার মাথায় এক বিরাট চাঁটি ”…
চাঁটি? আমি বললাম “সে কি রে, কে মারলো?”
মুকু বললো, “কে আবার? বাবা…”
মুকুর পাশে বসেছিলেন জ্যেঠু, তিনি নাকি মুকুর মাথায় এক চাঁটি মেরে বলেছিলেন, “এই ভর দুপুরে চাঁদের আলো! যত্ত সব ইয়ার্কি, হুঁঃ! তোকে আর গান গাইতে হবেনা, ঢের হয়েছে, থামা তোর গান। ”
১৯৫৩ সাল, আমার সাত বছর বয়েস, মা’র সাথে বাবার কাছে দিল্লীতে গিয়েছি। সেই প্রথম আমার দিল্লী যাওয়া।
নিখিল জ্যেঠু (আমরা বলতাম দিল্লীর জ্যেঠু) তখন দিল্লীতে পোস্টেড, সফদরজং এনক্লেভে ওঁর বিরাট বাগানওয়ালা বিশাল কোয়ার্টার, সেখানে গিয়ে প্রথম মুকুর সাথে আমার দেখা।
মুকু সেই ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত আর দামাল, সব সময় দুদ্দাড় করে ছুটে বেড়াচ্ছে, সেই তুলনায় আমি শান্ত, লাজুক আর ভীতু, বিশেষ করে নতুন জায়গায় নতুন লোকজনেদের সাথে একেবারেই মিশতে পারিনা, ফলে ওনাদের বাড়ী গেলে শুমা আর জ্যেঠু আমায় অনেক আদর করা সত্ত্বেও আমি মা’র আঁচলের পিছনে লুকিয়ে থাকি।
তার ওপরে মুকুদের বাড়িতে একটা বিরাট অ্যালশেসিয়ান কুকুর আছে, তার নাম তোজো, তাকে আমি ভীষণ ভয় পাই। সব মিলিয়ে মুকুদের বাড়িতে যেতে আমার মোটেই ভাল লাগেনা। যাই হোক, এক ছুটির দিন সবাই মিলে কুতব মিনার যাওয়া হবে, জ্যেঠুর গাড়ীতে পিছনের সীটে বসে আছি মুকু আর শিখার সাথে, শিখা তখন ছোট্ট মেয়ে, চার কি পাঁচ বছর বয়েস, পুটপুট করে দুই ভাই বোনে ইংরেজীতে কি যে কথা বলে যাচ্ছে, আমার মাথায় কিছুই ছাই ঢুকছেনা, আমি চুপ করে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি।
Feeling quite left out and ignored যাকে বলে!
কিছুক্ষণ পরে মুকু আর শিখা হঠাৎ “কুতব মিনার কুতব মিনার” বলে চ্যাঁচাতে শুরু করলো। ব্যাপারটা কি ?
আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি গাঢ় লাল রং এর বেশ উঁচু একটা টাওয়ার, তলাটা মোটা, খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা দেয়াল, লম্বা হয়ে ছোট হতে হতে ওপরে উঠে গেছে, মাঝে মাঝে কিছু গোল বারান্দা, তাতে বেশ কিছু লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে নীচ থেকে দেখা যায়।
এটাই কুতব মিনার নাকি ?
লোক গুলো ওই ওপরের বারান্দায় উঠল কেমন করে ? হাঁচোড় পাঁচোড় করে ওই খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা দেয়াল বেয়ে নাকি ?
সব্বোনাশ! আমার দ্বারা ও কাজ জীবনেও হবেনা।
জ্যেঠু বললেন, “কে কে কুতব মিনারে চড়বে, হাত তোলো।” মুকু তো সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে ready, ওদিকে ছোট্ট শিখাও দেখি হাসিমুখে হাত তুলে বসে আছে।
আমি তো অবাক, এ কি রে ? এইটুকু মেয়ে, সে কিনা ওই লম্বা টাওয়ারের গা বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠবে? সাহস তো কম নয় ? জ্যেঠু আর শুমার ও তো তাই নিয়ে কোন চিন্তা আছে বলে মনে হচ্ছেনা! আমি মনে মনে কল্পনা করলাম দুরন্ত মুকু হাঁই পাঁই করে লাফিয়ে লাফিয়ে ওই দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে, আর তার পিছন পিছন হামাগুড়ি দিয়ে শিখা…
আমি আর হাত তুলছিনা, চুপ করে বসে আছি! তোমরা যত ইচ্ছে ওঠো বাবা, আমি ওতে নেই । শুমা বললেন “মান্টুবাবুর কি হলো ? তুমি কুতব মিনারে চড়বেনা ?”
আমি চুপ।
কিন্তু পরে সামনে গিয়ে দেখি ও হরি, ভেতরে তো দিব্বি ওপরে ওঠার সিঁড়ি!
তখন আর আমায় পায় কে ? মুকুর সাথে আমিও দুদ্দাড় করে ওপরে উঠে গেলাম। তখন ভেতরটা বেশ অন্ধকার, সরু, ঘুলঘুলি দিয়ে অল্প আলো আসছে, উত্তাল স্রোতের মত ওই একই সিঁড়ি দিয়ে লোক উঠছে আর নামছে তার মধ্যে দিয়েই আমরা দুজন প্রায় দৌড়ে উঠছি, এ যেন বেশ একটা মজার খেলা! তখন তো আর এখনকার মতো হাঁটু কনকন আর কোমর টনটন নেই, শরীরের কলকব্জা সব brand new, ফুসফুসে অফুরন্ত দম!
একেবারে ওপরের বারান্দায় উঠে গিয়েছিলাম আমরা দু’জনে। সেখান থেকে নীচটা খুব সুন্দর দেখায়, সাজানো বাগান, প্রচুর ফুল ফুটে আছে।
আর দূরে যতদূর চোখ যায় দেখা যায় দিল্লী শহরের ঘরবাড়ী, আর দিকচক্রবালে সবুজ বনানী।
দিদিভাই আমাদের ছোটদের নিয়ে বাড়ির বড়ো বারান্দায় একটা সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। উপলক্ষ্যটা ঠিক মনে নেই। রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী কিংবা বসন্ত উৎসব হবে হয়তো।
প্ল্যান হলো দিদিভাই ব্যাকস্টেজ থেকে রবীন্দ্রনাথের “পূজারিণী” কবিতাটা আবৃত্তি করবে আর তার সাথে আমরা স্টেজে কবিতাটার একটা নাট্যরূপ অভিনয় করব। এর সাথে থাকবে কিছু গান, আবৃত্তি, আর আবহসঙ্গীত।
আমাদের সকলের তো খুব উৎসাহ। রোজ বিকেলে ছাতে গান আর নাটকের রিহার্সাল চলে। “ওরে ভাই ফাগুণ লেগেছে বনে বনে” গানটা দিদিভাই এর কাছ থেকে আমরা শিখে নিয়েছি।
নাটকে চারজন চরিত্র।
আমি হলাম “নৃপতি বিম্বিসার”, প্রথম সীনে – “নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইল পদনখকণা তার”- আমি বুদ্ধের মূর্ত্তির সামনে গিয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে যাব।
বাবলু হলো বিম্বিসারের ছেলে অজাতশত্রু, সে আবার বুদ্ধকে দু চক্ষে দেখতে পারেনা। সে রাজা হয়ে বুদ্ধের পূজা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, তার রাজত্বে শুধু মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা। বাবলুর প্রথম সীন হলো হাতে একটা রাংতার তৈরী তলোয়ার মাথার ওপর বাঁইবাঁই করে ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ স্টেজে নাচবে। সাথে বাজনা।
এছাড়া দুজন মেয়ে। এক হলো রাজমহিষী, যার কাজ হলো শুধু সাজগোজ করা, ওই পার্টটা করেছিল সামনের বাড়ীর অপুমাসী র মেয়ে টুটু। আর একজন “শ্রীমতী নামে সে দাসী” সেটা করেছিল দিদিভাইয়ের বন্ধু গৌরীদির বোন বাসন্তী। ওরা আমাদের পাড়াতেই থাকতো। দাসী শ্রীমতী কে রাজমহিষী অনেক বারণ করা সত্ত্বেও সে বুদ্ধদেবের পূজো করবেই। শেষ সীনে সে যখন পূজো করছে তখন অজাতশত্রু এসে তার গলা কেটে তাকে মারবে।
মোটামুটি এই হলো নাটক।
বাবলু কে পই পই করে বলে দেওয়া হয়েছে যে তলোয়ার দিয়ে গলা কাটার timing টা ভীষন important, ও শ্রীমতীর গলার কাছে তলোয়ার নামানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝ্যাং করে একটা বাজনা বাজবে আর স্টেজ অন্ধকার হয়ে যাবে। বাবলু তাই ওই সীন টা নিয়ে বেশ চিন্তিত।
২
নাটকের দিন বারান্দায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসার জায়গাতে স্টেজ বানানো হয়েছে। জ্যেঠিমার ঘর হলো গ্রীনরুম। সেখানে আমাদের সব সাজগোজ করিয়ে দিয়েছে দিদিভাই। চায়ের ঘরটা হলো উইংস। সেখানে ভালোকাকীমার ভাই শ্যামলমামা দাঁড়িয়ে। তিনি হলেন ব্যাকস্টেজ ম্যানেজার।
স্টেজের সামনে বারান্দায় চাদর পাতা, একটু একটু করে সেখানে বেশ ভীড় জমে গেল। অনেকে এসেছে। তাদের মধ্যে আত্মীয়রা আছেন, আর পাড়ার ও অনেকে নিমন্ত্রিত।
প্রথম আর্টিস্ট পলা । সে হলো ভজা জ্যেঠুর ভাই পূজা জ্যেঠুর মেয়ে। তখন পলার কতোই বা বয়েস? বারো কি তেরো হবে। লাল রং এর ডুরে শাড়ি, আঁট করে চুল বাঁধা, চোখ নাচিয়ে হাত ঘুরিয়ে বেশ গিন্নীর মতো পলা “হাইস্যো না কো বাবুরা, বুড়া আমায় মারিসে” বলে একটা কবিতা সুন্দর ঝরঝর করে আবৃত্তি করল। She was a big hit, প্রচুর হাততালি পড়ল দর্শকদের কাছ থেকে।
তারপর আমাদের কোরাসে “ওরে ভাই ফাগুণ লেগেছে বনে বনে” গান। সেটাও মোটামুটি ভালোই উতরে গেল।
তারপর শুরু হলো নাটক। সেটাও ভালোই এগোচ্ছিল, কিন্তু বাবলুর লাস্ট সীনে গিয়ে একটু কেলো হয়ে গেল। দোষ অবশ্য বাবলু কে দেওয়া যায়না। আগেই বলেছি ওই গলা কাটার timing টা নিয়ে ওর বেশ চিন্তা ছিল। যদি তলোয়ার নামানোর সময় ঝ্যাং করে বাজনাটা না বাজে, যদি স্টেজ অন্ধকার না হয়?
বাবলু তাই রাংতার তরোয়াল মাথার ওপর ধরে দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। ওদিকে শ্যামলমামাও (যার কাজ হলো ঝ্যাং বাজনা টা বাজানো আর স্টেজে আলো নেবানো), বসে আছেন বাবলুর তরোয়াল নামানোর অপেক্ষায়।
বেশ কিছুক্ষণ এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর বাবলু উইংসে দাঁড়ানো শ্যামলমামা কে জিজ্ঞেস করেছিল, “মামা, কাটবো?”
প্রশ্নটা বেশ উঁচু গলায় জোরেই করতে হয়েছিল বাবলুকে, কেননা উইংস টা ছিল স্টেজের মাঝখান থেকে বেশ দূরেই। ফলে ওর ওই কথাটা হল শুদ্ধ সবাই শুনে ফেলে।
তার পর থেকে বহুদিন বাবলুকে “মামা কাটবো?” বলে খ্যাপানো হয়েছে।
মনোহরপুকুরের বাড়ীর ইতিহাস যদি কোনদিন লেখা হয় তাহলে এই গল্পটা তার মধ্যে স্থান পাবে নিশ্চয়।