২০১৬ সালের মে মাসে আমরা কুয়েত থেকে পাকাপাকি দেশে ফিরে এসেছি। কোন কাজ নেই, এই সময় দু’তিন দিনের জন্যে কলকাতার কাছে কোথাও বেড়াতে গেলে বেশ হয়।
হুগলি জেলায় ইটাচুণার রাজবাড়ী কথা বেশ কিছুদিন শুনছি। চেনাশোনা অনেকেই সেখানে গিয়ে থেকে এসেছে, তাদের কাছ থেকে খবর পেয়েই আমরা দুজনে এক উইকেন্ডে সেখানে গাড়ী ভাড়া এক রাতের জন্যে ঘুরে আসবো ভেবেছিলাম। দীপা গরমের ছুটিতে ছেলের সাথে কলকাতায় আছে, সে একদিন এসেছিল দেখা করতে, আমরা ইটাচূনা রাজবাড়ী যেতে চাই শুনে সে নেচে উঠলো, “চলো সুভদ্রা দি’, আমরা একসাথে যাই।”
সুব্রত ঈদের ছুটিতে কুয়েত থেকে কলকাতায় আসছে, ওরা ইটাচূনা যায়নি, ঠিক হল আমরা চারজন একসাথে যাবো।
ইটাচূণা আবার কি নাম?
অবশ্য গ্রামের নামের কোন মানে থাকতে হবে তার কি মানে আছে?
জলপাইগুড়ি তে ডুয়ার্সের একটা চা বাগানে একবার কাজে গিয়েছিলাম, অপূর্ব্ব সুন্দর জায়গা, চা বাগানের মধ্যে সারি সারি লম্বা লম্বা shade tree, দূরে নীল পাহাড়, কিন্তু জায়গাটার নাম ঘাটিয়া…
আমার ভালকাকীমার বাপের বাড়ী ছিল পুর্ব্ব বাংলার রংপুরের কাছে একটা গ্রামে, তার নাম গাইবান্ধা। কেন? ওখানে কি গরুদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয় নাকি?
গ্রামের নামের কোন মাথামুন্ডু হয় না, যা ইচ্ছে একটা হলেই হলো।
ইটাচূণা নামটা অবশ্য বেশ ভাল, তার ওপরে আবার রাজবাড়ী। গ্রামে আবার রাজা কোথা থেকে এল? জমিদার বা খুব বড়লোক হলে সবাই রাজামশায় বলে ডাকে। সেরকমই কিছু হবে। ওই গ্রামের এক ভদ্রলোক শোনা যায় সাহেবদের আমলে ইট আর চূনের ব্যবসা করে লালে লাল হয়ে গিয়েছিলেন। সাহেবরা তাঁকে ভালবেসে অনেক জমি আর রাজা উপাধি দিয়ে থাকবেন, সেই থেকেই ইটাচূণা রাজবাড়ী।
সুভদ্রা ইন্টারনেট থেকে ফোন নাম্বার যোগাড় করে ফোন করে দুটো ঘর বুক করে ফেলেছে। ঘরের নাম ঠাকুমার ঘর আর বড়বৌদির ঘর। বেশ নাম তো ? বনেদী রাজবাড়ীর অন্তঃপুরের একটা গন্ধ পাওয়া যায় ওই নামগুলোতে। ওই ঘরে আমরা থাকবো ভাবতে বেশ একটা উত্তেজনা হচ্ছিল।
সুভদ্রা যদি ঠাকুমা হয়, আমি কি তাহলে ঠাকুর্দ্দা? কিংবা সুভদ্রা বড়বৌদি, আমি বড়দা’?
মন্দ কি?
ইন্টারনেটের কল্যাণে আজকাল সব কিছুই ঘরে বসেই করা যায়, ইটাচূণা রাজবাড়ীর ওয়েবসাইটে গিয়ে আমি পরের দিন এক রাতের জন্যে পেমেন্ট ও করে দিলাম। দীপারা একটা বড় গাড়ীর বন্দোবস্ত করেছে।
বুধবার ৬ই জুলাই সকালে বেরোব, আগের দিন রাজবাড়ীর marketing office থেকে ফোন এলো। hiসকালে আর রাত্রে কি খাবেন? মেনু হল মাছ, মাংস, চিকেন আর ডিম।
বেশ ভাল ব্যবস্থা তো? Very well organized…
আমি আর সুভদ্রা মাছ, দীপা আর সুব্রত ডিম অর্ডার করলাম।
ছয় তারিখ কথামতো ঠিক সকাল সাড়ে দশটায় গাড়ী নিয়ে দীপা আর সুব্রত আমাদের আইরনসাইড রোডের বাড়ীতে হাজির। আমরাও তৈরী হয়ে ছিলাম।
বড় গাড়ী। টয়োটা ইনোভা, পিছনে বুটে আমাদের মালপত্র রেখে আমরা যে যার মত বসে গেলাম। আমি ক্যামেরা হাতে সামনে, ড্রাইভারের পাশে। ড্রাইভারের নাম বাপী। বাপীর ছোটখাটো চেহারা, সে অল্প কথার মানুষ, আমায় একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলল দরকার পড়লে ডাকবেন, আমি এই দেশের সব জায়গায় গাড়ী চালিয়েছি। সব রাস্তা আমার চেনা।
কাল ইন্টারনেট থেকে আমি ম্যাপ ডাউনলোড করেছি, কিন্তু তার আর দরকার হবেনা, ইটাচূণা রাজবাড়ির রাস্তা বাপীর চেনা, সে এখানে আগে এসেছে।
রাস্তায় খাবার জন্যে আমরা গতকাল হলদিরাম থেকে কিছু নোনতা স্ন্যাক কিনেছি, আজ দীপা আর সুব্রত বেকবাগানে মিঠাই থেকে সিঙাড়া আর কড়াপাকের সন্দেশ কিনে নিলো গাড়ী থামিয়ে।
পার্ক সার্কাস ব্রীজ ছাড়িয়ে সেকেন্ড হুগলী ব্রীজ, সেটা ছাড়াতেই দেখা গেল নীল রং দিয়ে সাজানো নবান্ন বিল্ডিং। তারপরে কোনা রোড চলে এলো, ক্রমশঃ লোকালয় ছাড়িয়ে যাচ্ছি আমরা, দু’পাশের দৃশ্যপট landscape দ্রুত পালটে যাচ্ছে। সুভদ্রাদের রামরাজাতলার বাড়ীর রাস্তা পেরিয়ে গেলাম, শহর থেকে শহরতলী, রাস্তার পাশে বাড়ী আর দোকান বাজারের চেহারা পালটে যাচ্ছে।
শহরতলী ছাড়িয়ে ক্রমশঃ চওড়া দূর্গাপুর হাইওয়ে দিয়ে আমাদের গাড়ী যাচ্ছে।
অনেকক্ষণ গাড়ীতে আছি, এবার একটা rest room break নিলে হয়না?
বাপীকে বলতেই সে পথে একটা Rest area তে নিয়ে এসে গাড়ী থামালো। এই সব জায়গা সব তার হাতের পাতার মত চেনা।
বিরাট একটা খোলা জায়গা, মাঝখানে HP petrol station, দূরে HP নামে একটা ধাবা।
ধাবার দরজায় এক বিশাল চেহারার ভদ্রলোক হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন।
এই এক শুরু হয়েছে দেখছি আজকাল এই দুই হাত জোড় করে নমস্কার। কোন মলে গেলে সিকিউরিটি গার্ডরা আমাদের body check করার আগে নমস্কার করবেই। কেন রে বাপু? আমরা তো টেররিস্ট হতে পারি। আমাদের পেটে বোমা গোঁজা কিংবা পকেটে ছুরি কিংবা রিভলভার থাকতে পারেনা? ভাল করে আমাদের চেক কর্ তা না যেন আমরা রামচন্দ্র আর তারা ভক্ত হনুমান।
“অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ” কথাটা পালটে এখন বলা উচিত “অতি ভক্তি গার্ডের লক্ষণ।”
দোকান ফাঁকা, কিছু চেয়ার আর সোফা এদিক ওদিক বসানো। কাউন্টারে আর এক হুমদো মত ভদ্রলোক বসে আছেন।
প্রথম হুমদো হাত জোড় করে নমস্কার করে আমাদের বললেন “আসুন, আসুন!”
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কফি পাওয়া যাবে?”
অবশ্যই পাওয়া যাবে জানালেন তিনি। কফির অর্ডার দিয়ে দিলাম আমরা। সুভদ্রা আর দীপা বাথরুমে যাবে। কিন্তু ধাবায় বাথরুম নেই। দোকানের একটি ছেলে ওদের দূরে বাথরুম দেখাতে নিয়ে গেল। ইতিমধ্যে সুব্রত কাউন্টারের দ্বিতীয় হুমদো ভদ্রলোক কে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে শুরু করেছে।
এই দোকানটা কি HPর ? না, ওঁরা ফ্রাঞ্চাইজ নিয়েছেন।
মালিক কে? ওই যিনি দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন।
তাহলে আপনি? আমি কর্ম্মচারী।
আজ তো ঈদের ছুটি, দোকানে ভীড় নেই কেন? কি করে বলবো? পরে বিকেলের দিকে ভীড় হবে আশা করছি।
আপনাদের এখানে কি ঘর পাওয়া যায়? না।
ক’জন লোক কাজ করে? দশজন।
আমি বুঝতে পারছিলাম সুব্রত র এই grilling ভদ্রলোকের পছন্দ হচ্ছেনা। কিছুক্ষণ পরে ওনার একটা ফোন এল, তিনি সুব্রতর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেলেন।
কফি আর আসেনা, ওদিকে সুভদ্রা আর দীপাও ফিরছেনা। আমি আর সুব্রত দু’জনে বসে আড্ডা মারছি। আমাদের আজকের সাবজেক্ট পৃথিবীতে তেলের দাম কেন কমে যাচ্ছে? সুব্রত তেল কোম্পানীতে কাজ করে, আমিও একসময় Indian Oil এ কাজ করেছি। তাই ভারতের তেল নিয়ে কথা উঠলো, আমরা কত তেল import করি, ইত্যাদি। সেখান থেকে কথায় কথায় ভারতবর্ষের Refinery র কথা উঠলো। আমি সুব্রত কে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা আম্বানীদের গুজরাটে একটা Refinery আছে না? কোথায় যেন?
এই রে!
সুব্রতর কিছুতেই মনে পড়ছেনা জায়গাটার নাম। আমারও না। কিছু জানা জিনিষের নাম ভুলে গেলে বড্ড অস্বস্তি হয়, না মনে পড়া পর্য্যন্ত অস্থির লাগে।
ওই কাউন্টারের ভদ্রলোক কি জানেন ? ওনাকে সুব্রত জিজ্ঞেস করবে নাকি? কিন্তু ভদ্রলোক সেই যে ফোন কানে নিয়ে বসে আছেন, কার সাথে এত লম্বা কথা বলছেন কে জানে। কিংবা হয়তো কারুর সাথে কথা বলছেন না আদৌ, সুব্রতর প্রশ্নবাণ আবার শুরু হবে এই ভয়ে ফোনে কথা বলার অভিনয় করছেন।
ভুলে যাওয়া নিয়ে এই রকম একটা গল্প আছে। এক ভুলো লোকের বাড়ীতে তার বন্ধু এসেছে, সে তার বন্ধুকে বলছে জানিস, কাল আমরা একটা রেস্টুরেন্টে খেলাম। সে যে কি অপূর্ব্ব খাবার~
বন্ধু জিজ্ঞেস করল কোন রেস্টুরেন্ট? কি নাম?
এই রে, নাম তো মনে পড়ছেনা। একটা ফুলের নাম কর্, যা প্রেমিকরা প্রেমিকাদের দেয়।
বন্ধু বললো, কার্নেশন?
আরে না না।
তাহলে কি প্যানসি?
না না, যে ফুলের গাছে কাঁটা থাকে।
ও Rose?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলে ভুলো লোকটি তার বৌ কে ডেকে বললো, এই Rose, কাল আমরা যে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম তার নামটা যেন কি?
তার মানে রেস্টুরেন্টের নাম তো ভুলেছেই, তার ওপর নিজের বৌয়ের নামও মনে নেই!
সুব্রতর অবশ্য অত খারাপ অবস্থা নয়, সে বৌয়ের নাম ভোলেনি।
একটু পরে দীপা আর সুভদ্রা ফিরতেই সুব্রতর দীপাকে প্রথম প্রশ্ন – অমুক দা কোথায় থাকেন যেন?
দীপা একটুও সময় না নিয়ে promptly বললো জামনগরে!
সুব্রতর মুখটা তাই শুনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আমার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে সে বললো ~
সুভদ্রা, আমি, আমার ভাই খোকন আর তার ছেলে বুবান আমরা চার জনে দেরাদুন থেকে গাড়ী নিয়ে গঙ্গোত্রী যাচ্ছি।
আমাদের ড্রাইভার এর নাম রামেন্দ্র রাওয়াত, আমাদের গন্তব্য হলো গঙ্গোত্রীর কাছে ধারালী নামে একটা জায়গায়, সেখানে আমাদের হোটেলের নাম হলো Prakriti the Retreat – সেটাই দেখলাম সবচেয়ে ভাল হোটেল সেখানে।
কাছেই হারশিল নামে একটা শহর আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ভাল হোটেল নেই। রামেন্দ্র বললো হারশিল কথাটা এসেছে হরিশিলা থেকে।
দেরাদুন থেকে ধারালীর দূরত্ব প্রায় ২০০ কিমি। পথে উত্তরকাশীতে থেমে দুপুরের খাওয়া খেতে ঘন্টা খানেক নিয়ে সব মিলিয়ে ধারালীতে হোটেলে পৌঁছতে আমাদের আনুমানিক আট ঘন্টা লাগবে। অর্থাৎ বিকেল পাঁচটা নাগাদ পৌঁছবো।
রামেন্দ্র বললো আপনাদের হোটেলটা একদম নদীর পাশে। পাহাড়ের ওপরে তখনো যথেষ্ট আলো থাকবে। আপনারা হোটেলে পৌঁছে নদীর ধারে চলে যেতে পারেন।
রামেন্দ্র উত্তরাখন্ডের লোক, সে হলো গাড়োয়ালী। হিন্দী অবশ্য সে ভালোই বলে। সে মধ্যবয়েসী, হাসিখুসী, বেশ কথা বলে, আমাদের সাথে তার আলাপ জমে গেল অল্পক্ষনের মধ্যেই। জানা গেল সে তার বৌ আর ছেলে মেয়েদের নিয়ে দেরাদুনে থাকে। তবে অনেক বছর ধরে সে নিয়মিত দেরাদুন থেকে চার ধামে গাড়ী চালিয়েছে বলে এই অঞ্চলের রাস্তাঘাটের সাথে সে খুব পরিচিত।
তার গাড়ী চালানো দেখে বুঝলাম সে বেশ দক্ষ ড্রাইভার। আমাদের গাড়ীটাও (Toyota RAV 4) বেশ বড়ো আর নতুন। বেশী ঝাঁকানী নেই। আমি সামনে রামেন্দ্রর পাশে ক্যামেরা হাতে বসলাম। ওরা তিনজন আরাম করে পা ছড়িয়ে পিছনে। লম্বা পাহাড়ী রাস্তায় এই বড় গাড়ীই ভালো। Comfortable and safe…
দেরাদুন শহরটা পেরোলেই পাহাড়ী রাস্তা শুরু। এই রাস্তায় আমরা মুসৌরী গেছি অনেকবার। কিছুটা এগিয়ে যাবার পরে Road sign দেখে বুঝলাম আমরা মুসৌরী্র দিকে না গিয়ে অন্য দিকে বেঁকে গেলাম। রামেন্দ্র বললো ওই রাস্তাটা বাঁ দিকে মুসৌরী আর যমুনোত্রীর দিকে চলে গেছে। আমরা যাচ্ছি ডান দিকে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রীর দিকে।
গাড়ী চলছে, জানলার বাইরে দেখছি পাহাড়ের রূপ। ছবি তুলে যাচ্ছি। কথাবার্ত্তাও চলছে টুকটাক।
রাস্তায় খুব কাজ হচ্ছে দেখছি। রামেন্দ্র বললো মোদীজী উত্তরাখন্ডে তিব্বত বর্ডারের চারিপাশে চওড়া all weather road তৈরী করছেন, যাতে army trucks আর artillery চট করে বর্ডারে পৌঁছে দেওয়া যায়। উত্তরাখন্ডে বি জে পি সম্প্রতি Assembly election এ জিতেছে। তাদের মুখ্যমন্ত্রীর বিশাল ছবি রাস্তার পাশে হোর্ডিং এ চোখে পড়ে।
বেশ কিছুক্ষণ গাড়ী চালাবার পরে একটা জায়গায় এসে রামেন্দ্র গাড়ী থামালো। চা আর বাথরুম ব্রেক। দোকানের নাম কাজল রেস্টুরেন্ট এন্ড কাফে। রাস্তার ধারে বেশ ছিমছাম দোকান, সেখানে বসার জায়গা আছে, অনেক গুলো টেবিল চেয়ার। আমরা যখন গেলাম তখন দোকানে কোন লোক নেই। আমরা গরম কফি আর বিস্কুট অর্ডার করে বসলাম। ওদের টয়লেটটা খুব পরিস্কার, দেখে বেশ ভাল লাগলো। এই পাহাড়ের দেশের লোকেদের ওপর বেশ একটা শ্রদ্ধা আর সন্মানের ভাব জন্মাচ্ছে আমার মনে। দোকানের মালিক কাউন্টারে বসে আছেন তাঁর সাথে কিছুক্ষণ গল্প জুড়ে দিলাম।
উত্তরকাশী যাবার পথে এবার নদীর পাশ দিয়ে এঁকে বেঁকে আমাদের রাস্তা। দূরে পাহাড়, পাশে নদী নুড়ি পাথরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে আমরা নদীর এদিকে মাঝে মাঝে ব্রীজ পার হয়ে ওদিকে। রামেন্দ্র আমাদের বলে দিয়েছে এখানে নদীর নাম গঙ্গা নয়। এখানে তার নাম হলো ভাগীরথী। আরও নীচে রুদ্রপ্রয়াগ আর দেবপ্রয়াগে মন্দাকিনী আর অলকনন্দারর সাথে মিশে যাওয়ার পরে তিন সখীর মিলিত নাম হলো গঙ্গা, যা তার পরে হৃষিকেশ আর হরিদ্বারে সমতলে নেমে এসেছে।
কিছুক্ষণ পরে আমরা ভাগীরথী নদীর ওপরে Tehri dam এর কাছে এসে পৌঁছলাম। এখানে Hydroelectric power generation plant আছে। ২০০৬ সালে এই বাঁধের কাজ শেষ হবার পরে এখান থেকেই এখন উত্তরাখন্ডের প্রায় ৯০% বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। রামেন্দ্র আমাদের একটা Viewing point এর সামনে নিয়ে গেল। খুব দূর থেকে নীচে দেখা যায় বাঁধের reservoir – বিশাল এক নীল হ্রদ।
রক্তকরবীতে রাজা নিজের সাথে নন্দিনীর তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “সরোবর কি ফেনার নূপুর পরা ঝর্ণার মত নাচতে পারে?” টেহরী বাঁধের বিশাল নীল সরোবর দেখে আমার রাজার সেই কথাটা মনে পড়লো। ফেনার নূপুর পরা উচ্ছল বালিকা ভাগীরথী কে এখানে পায়ে শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।
উত্তরকাশী পৌঁছলাম প্রায় দেড়টা নাগাদ। উত্তরাখন্ডের এই শহরটিকে বেশ ধূলিধূসরিত আর নোংরা মনে হলো । বেশ চওড়া একটা রাস্তা, সেখান দিয়ে একের পর এক বাস আর গাড়ী চলে যাচ্ছে। বেশ কিছু বাসের পিছনে বদ্রীনাথ লেখা আছে দেখলাম। রাস্তার দু’পাশে দোকান, তার মধ্যে রামেন্দ্রর বাছা একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ করলাম। মেনু দেখে বুঝলাম এখানে প্রধান দু’টো খাবার – staple food – হলো মোমো আর ম্যাগীর স্যুপ। কিসের মাংস দেবে কে জানে এই ভেবে আমরা তিন জন নিরামিষ মোমো অর্ডার করলাম কিন্তু বুবান নিরামিষ ভালবাসেনা। আমরা অনেক বারণ করা সত্ত্বেও সে চিকেন মোমো অর্ডার করলো।
সেই ২০১৭ সালের পর থেকে কি একটা ওষুধ খাবার পরে তার পেট এখনো একদিনও খারাপ হয়নি জানালো সে। এখানে চিকেন মোমো খেয়েও তার কিছুই হবেনা সে নিশ্চিত।
বুবান বললো , “আমার পেটটা বীভৎস!”
বীভৎস?
বুবান একটু অপ্রস্তুত আর লজ্জিত ভঙ্গীতে বললো, এখানে বীভৎস মানে ব্যাপক, মানে ভাল, দারুণ, দুর্দ্দান্ত!”
কত বদলে যাচ্ছে আমাদের বাংলা ভাষা!
খেয়ে দেয়ে রাস্তায় বেরিয়ে রাস্তার এক ঠ্যালাওয়ালার কাছ থেকে কিছু ফল – কমলালেবু, আঙ্গুর ইত্যাদি কেনা হলো। তারপরে আর সময় নষ্ট না করে সোজা ধারালীর পথে।
এবার পাহাড়ী রাস্তায় ক্রমাগত সেকেন্ড গীয়ারে ওঠা। এঁকে বেঁকে আস্তে আস্তে এক পাহাড় থেকে পাশের পাহাড়ে চলে যাচ্ছি, যত ওপরে উঠছি তত যেন বেশ ঠান্ডা লাগছে, আমরা সকলেই গায়ে আর এক গরম জামা পরে নিলাম। কেউ জ্যাকেট, কেউ সোয়েটার, কেউ শাল।
রাস্তার এক একটা বাঁক ঘুরতেই আশ্চর্য্য সুন্দর সব দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে বৃত্তাকারে নেমে গেছে ক্ষেত, দূরে ছোট ছোট গ্রাম দেখা যায়, সেই গ্রামের ছোট ছোট বাড়ীতে বিকেলের সূর্য্যের আলো এসে পড়েছে। মাঝে মাঝেই দূরের পাহাড়ের গা থেকে ধোঁয়া উঠছে দেখা যায়। রামেন্দ্র বললো – Forest fire – বনে আগুন লেগেছে, তাই ধোঁয়া।
ক্রমশঃ দূরের পাহাড়গুলো কাছে চলে আসতে শুরু করলো, তাদের চূড়ো সব বরফে ঢাকা। সেই বরফের ওপরে অস্তগামী সূর্য্যের লাল আলো এসে পড়েছে।
জীবনে অনেক হিল স্টেশনে গিয়েছি কিন্তু এত কাছ থেকে বিশাল বরফে ঢাকা পর্ব্বতচুড়ো দেখার সৌভাগ্য এই প্রথম।
বুবান বললো, “জ্যেঠু আমরা আর একটু ওপরে উঠলে ওই ঝাউ গাছ গুলোর মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের চুড়োয় বরফের মধ্যে সূর্য্যের লাল আলো এসে পড়ছে, এরকম বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিও। বীভৎস উঠবে। ”
Good Friday agreement এর জন্যে UK আর Republic of Ireland এর মধ্যে কোন hard border নেই, UK Visa নিয়ে আমাদের Dublin এ ঢুকতে কোন অসুবিধে হয়নি। ইদানীং No Deal Brexit হলে এই Hard border উঠে যাওয়া নিয়ে খুব অশান্তি হচ্ছে। আমরা এইসব ঝামেলার আগেই দেশটা ঘুরে গেলাম।
কথায় আছে যারা শহরে বাস করে, তাদের কাছে যে কোন শহরই প্রিয়, কোন নির্জন শান্তিপূর্ণ গ্রামে গিয়ে তাদের থাকতে ভাল লাগবেনা। আমি তো শহরের লোক, তাই ডাবলিন শহরের সাথে এই তিন দিনেই আমার বেশ ভাব হয়ে গেল।
ডাবলিন শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী লিফি। তার ওপরে অনেক ব্রীজ সারা শহরে ছড়ানো। সেই সব ব্রীজ কিছু যানবাহন এর জন্যে আবার কিছু শুধু পথচারীদের।
দুঃখী নগর, কি চাও শুধাই যদি/ হয়তো বলবে ছোট্ট একটি নদী/
ডাবলিন কি দুঃখী নগর? হতেই পারে, এই গরীব দেশটা সেই আদিকাল থেকে ধর্ম্ম নিয়ে অন্তর্দ্বন্দে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এসেছে। তাকে তো দুঃখী বলাই যায়। ডাবলিন কি একটি ছোট্ট নদী চেয়েছিল? যদি চেয়ে থাকে তাহলে তার সাধ পূর্ণ হয়েছে বলতে হবে।
আমরা শহরের এক প্রান্তে Docklands এর কাছে apartment নিয়েছিলাম, সেখান থেকে লিফি নদী কাছেই, একটু হাঁটলেই নদীর ধারে পৌঁছে যাওয়া যায়। সেখানে নদীর ওপরে স্যামুয়েল বেকেট ব্রীজ, একটা harp এর মত তার ডিজাইন। Brian Boru নামে medieval 15th century র এই harp হলো Ireland এর national symbol। নদীর ধারের বাঁধানো রাস্তা গাছপালা দিয়ে সাজানো, হাঁটার জন্য ideal, এক পাশে cyclist track, সেখান দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে যায় যুবক যুবতীরা।
ইউরোপের অনেক শহরেই ট্রাম আছে, ডাবলিন ও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা তিন দিনের জন্যে বাস আর ট্রামের পাস কিনে ফেললাম। অপরিচিত একটি শহরকে চেনার জন্যে ভীড়ের মধ্যে অনির্দ্দিষ্ট হাঁটা আর ট্রাম বাসে চড়া হলো সব চেয়ে ভাল উপায়। আজকাল স্মার্ট ফোনে পুরো শহরের ম্যাপ ভরা থাকে, সার্চ করলেই জানা যায় কাছাকাছি কি কি দেখার আছে, কোথায় বইয়ের দোকান, কোথায় পার্ক, কোথায় কফিশপ বা কোথায় আইসক্রীম পাওয়া যায়। তাছাড়া কত নম্বর বাস বা ট্রাম সেখানে আমাদের নিয়ে যাবে, বাস বা ট্রাম স্টপ কত দূরে। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করার কোন দরকারই নেই। এমন কি বাস স্টপে আমাদের বাস কতক্ষণ পরে আসবে তাও এই সব mapping app জানিয়ে দেয়। বলা যায়না হয়তো নিজের সীটে বসে আছি হঠাৎ টুং করে ফোনে alert এসে গেল, ওঠো হে পরের স্টপে নামতে হবে।
নখদর্পনে বলে বাংলায় একটা কথা ছিল, সেটা এই যুগে বদলে এখন হয়েছে সেলফোন দর্পনে। যেদিকেই তাকাও দেখবে সবাই মাথা নীচু করে সেলফোনের দিকে তাকিয়ে।
একটা অচেনা শহর কত সহজে চেনা হয়ে যায় আজকাল।
আমাদের apartment থেকে Town centre তেমন কিছু দূর নয়, নদীর ধার দিয়ে হেঁটেই চলে যাওয়া যায়। প্রথম দিন সকালে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। লিফি নদীর কথা জয়েসের “Dubliners” বই তে পেয়েছি, নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শহরের নানা রাস্তায় ঘোরার সময় অবধারিত মনে পড়ছিল সেই বইয়ের চরিত্রদের কথা। জয়েস নিজেও এক সময় এই রাস্তা দিয়ে হেঁটেছেন ভেবে গায়ে একটু কাঁটাও দিচ্ছিল।
নদীর ধার দিয়ে একটু এগোলেই দেখা যায় নদীতে নোঙ্গর করে বাঁধা মাস্তুল তোলা এক বিশাল নৌকা তার পাশে এক নোটিসে লেখা ১৮৯০ সালে দুর্ভিক্ষের সময় প্রায় ১৫০০ লোক ১০০ মাইল হেঁটে Dublin harbor থেকে এই জাহাজে উঠে কানাডার Quebec গিয়েছিল। অনাহারে অর্দ্ধাহারে তাদের অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছবার আগে সেই জাহাজে মারা যায়। এই হাঁটাপথের নাম দেওয়া হয়েছে National Famine way, আর জাহাজের ঠিক সামনে রাস্তার এক ধারে সেই সব বিপন্ন ক্ষুধার্ত মানুষদের কিছু sculpture সাজানো। কারুর হাতে কিছু থালা বাসন, কারুর কাঁধে ব্যাগ, কারুর গলায় শিশু ঝুলে আছে।
ম্যাপ দেখে হাঁটতে হাঁটতে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই Dublin City Centre এ পৌঁছে গেলাম। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত Trinity College, অজস্র দোকানপাট, খাবারের দোকান, উঁচু উঁচু বাড়ী, অবিশ্রান্ত জনস্রোত, রং বেরং এর দোতলা বাস, তাদের খোলা ছাদে বসে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছে উৎসাহী ছেলে মেয়েরা। অনেক দোকান, অনেক রেস্টুরেন্ট, অনেক মিউজিয়াম। যেন একটা মেলা বসে গেছে। কবির ভাষায় জগতের আনন্দযজ্ঞ।
Trinity College এর কাছেই Tourist Department, সেখানে কাউন্টারে বসা সুন্দরী হাসিখুসী মেয়েটি বললো অনেক দেখার জায়গা আছে আমাদের দেশে, কোথায় যেতে চাও?
দূর, আমাদের হাতে অত সময় কোথায়? আছি তো মাত্র তিন দিন। আমরা বেশী দূরে না গিয়ে ডাবলিন শহরটাই ভাল করে দেখব ঠিক করলাম।
কাছেই Grafton Street, সেখানে Molly Malone এর statue র সামনে গীটার বাজিয়ে গান গাইছে একটি যুবক, তার পাশে ভীড় জমে গেছে, বেশ একটা উৎসবের পরিবেশ। আমরা উল্টোদিকে M J Oneill’s নামে একটি আইরিশ পাবে লাঞ্চ খেতে ঢুকে পড়লাম। পাবের ভিতরে প্রচন্ড ভীড়, কোনমতে একটা জায়গা পাওয়া গেল।
আইরিশ লাগার বীয়ারই খেলাম। গিনেস খাবার মত সাহস পেলাম না। বড্ড কড়া আর তেতো।
বেরিয়ে এসে ট্রামে বাসে বেশ কিছু ঘুরে খুঁজে খুঁজে একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে বেশ সস্তায় কিছু ভাল বই কিনে ফেললাম। Bernard Shaw, Oscar Wilde, Samuel Beckett, James Joyce… কত সব বিখ্যাত লেখকদের কত বিখ্যাত বই সেখানে থরে থরে সাজানো আছে।
বেরিয়ে এসে ট্রামে বাসে বেশ কিছু ঘুরে খুঁজে খুঁজে ডাবলিনের St Joseph’s Park এ গিয়ে বেঞ্চি তে বসে আইসক্রীম খেতে খেতে চারিদিকে ফুলের মেলা আর লেকে ভাসমান রাজহাঁস দেখতে দেখতে ভাবছিলাম সকালে নদীর ধার দিয়ে হাঁটার সময় ছিলাম এক আজনবী ইস্ শহর মে, আর এখন সন্ধ্যায় আমরা আর আজনবী নই, এখন এই শহর আমাদের খুব চেনা, পরিচিত।
রাণী এলিজাবেথ ১ এর রাজত্ব কালে ষোড়শ খ্রিষ্টাব্দীতে (১৫৯২) ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড আর কেম্ব্রিজের মডেলে ডাবলিনে Research University হিসেবে ট্রিনিটি কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়। এই প্রায় ছ’শো বছর আগে প্রতিষ্টিত এই সুপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এখন ডাউনটাঊন ডাবলিন শহরের একদম মধ্যিখানে, মেন গেটের সামনে দিয়ে জনস্রোত বয়ে যাচ্ছে, সামনে রাস্তা দিয়ে গাড়ী আর বাসের ভীড়।
কিন্তু একবার গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলে জায়গাটার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে একটা পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইউরোপে তো বটেই, এমন কি সারা পৃথিবীতে একটি অন্যতম শিক্ষার স্থান বলে তার জায়গা করে নিয়েছে। বিশাল ক্যাম্পাস জুড়ে চোখ জড়ানো সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল জমি, অনেক গাছপালা। চারিদিকে ছড়ানো অসংখ্য majestic buildings, প্রাচীন আর আধুনিক মেশানো তাদের স্থাপত্য, যা দেখলে মনের ভিতরে একটা সম্ভ্রমের ভাব জাগে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা জন্মায়। শোনা যায় যে ট্রিনিটি কলেজের ক্যাম্পাসকে পৃথিবীর অন্যতম iconic বলে ধরা হয়। এই ক্যাম্পাস কে পটভূমিকা করে নাকি অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে, ফিল্ম ও তৈরী হয়েছে।
ষোড়শ শতাব্দীতে ট্রিনিটি কলেজ যখন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন ইংল্যান্ডে Henry VIII এর হাত ধরে ইউরোপ থেকে Martin Luther এর ক্রীশ্চান reformation এর ঢেউ এসে গেছে। প্রথম থেকেই তাই এই কলেজ Protestant ধর্মের জন্যে সংরক্ষিত ছিল, Catholic দের সেখানে ছাত্র অথবা শিক্ষক হিসেবে কাজ পেতে গেলে কিছু oath নিতে হতো, যা তাদের জন্যে সন্মানের ছিলনা। আর তাদের স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ পেতেও নাকি অনেক বাধা নিষেধ ছিল। পরে অবশ্য সেই সব নিয়ম তুলে নেওয়া হয়।
কিছুটা অদ্ভুত শোনালেও ট্রিনিটি কলেজে মেয়েদের নেওয়া শুরু হয় বেশ কিছু বছর পরে – ১৯০৪ সালে।
আয়ার্ল্যান্ডের প্রায় সব বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিল্পী, দেশের প্রেসিডেন্ট ট্রিনিটি কলেজে পড়েছেন বা পড়িয়েছেন।
এখন ট্রিনিটি কলেজ একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যলায় হিসেবে স্বীকৃত, এখানে ছাত্র ছাত্রীদের প্রায় ৩০% আয়ার্ল্যান্ডের বাইরে থেকে এখানে পড়তে আসে।
ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে দেখলাম সেখানে নানা exhibition চলছে বিভিন্ন জায়গায়। লোকেরা লাইন দিয়ে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আমরা Book of Kells আর লাইব্রেরীর (Long Room) টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম।
টিকিট কেটে প্রথমেই গেলাম Book of Kells এর exhibition দেখতে।
যীশুখ্রীষ্টের চার জন কাছের মানুষ (Evangelist) – Mark, Mathew, Luke আর John তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর জীবনের নানা ঘটনা এবং তাঁর বাণী, তাঁর শিষ্যদের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের ক্রীশ্চান ধর্ম্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচার করার জন্যে তাঁদের নিজেদের মত করে চার জন চারটি গসপেল (প্রভু যীশুর সুসমাচার) লিখে যান। ধরে নেওয়া হয় এই চারটি গসপেল মোটামুটি ভাবে যিশুখ্রীষ্টের মৃত্যুর ত্রিশ থেকে একশো বছরের (30-100 AD) মধ্যে লেখা হয়। সেই হিসেবে এই প্রাচীন লেখার authencity বা সত্যতা সম্বন্ধে কারুর মনে কোন সন্দেহ নেই। বাইবেলের New Testament প্রধানতঃ এই চারটে গসপেল এর ওপর নির্ভর করেই লেখা হয়েছে।
ইউরোপে ক্রীশ্চান ধর্ম্মের প্রসারের সাথে সাথে নানা দেশে গীর্জ্জায় আর Monastery তে হাতে লেখা Gospel এর নানা কপি ছড়িয়ে পড়ে।
Book of Kells হলো এই রকমই একটি হাতে লেখা ও আঁকা চারটি গসপেল। Book of Kells বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত আলঙ্করিক পুঁথি, যা পন্ডিতদের ধারণা লেখা হয়েছিল ছয়শো থেকে আটশো খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে (600-800AD) আয়ার্ল্যান্ড ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের St. Columban Abbey আর Monastery তে। এর নামটা আসে আয়ার্ল্যান্ড এর Abbey of Kells থেকে, যেখানে এই পুঁথিগুলো সযত্নে রাখা ছিল বহু শতক ধরে।
Book of Kells কে Medieval Europe এর early Christianity র এক অসাধারণ অসামান্য কাজ (“Ireland’s finest national treasure”) বলে ধরা হয়, অষ্টম শতাব্দী তে Irish Christian monk দের লেখা ল্যাটিন ভাষায় এই পুঁথির নিখুঁত calligraphy রংএর ব্যবহার আর শিল্পসুষমা দেখলে মুগ্ধ হতে হয়।
Exhibition এ জানানো হয়েছে কারা এই গসপেল গুলো লিখেছে, কি কাগজে লিখেছে, কি তুলি আর রং ব্যবহার করেছে এই সব। চারটি বাঁধানো Volume এ সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০ পাতার এই বইটির প্রতিটি পাতা ১৩ ইঞ্চি x ১০ ইঞ্চি সাইজের off white রংএর calf vellum দিয়ে তৈরী কাগজে। লেখার calligraphy বড় দৃষ্টিমধুর, Font এর কিছুটা আঁকা বাঁকা ornate swirling দৃষ্টি আকর্ষন করে। সারা বই তে অনেক ছবি – মানুষ, জন্তু জানোয়ার আর mythical beast রা সেই সব ছবিতে সজীব vibrant রং এর ব্যবহারে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
Book of Kells Exhibition দেখে আমাদের মন ভরে উঠলো। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা পাশেই ট্রিনিটি কলেজের লাইব্রেরী -The Long room এ চলে গেলাম।
১৮০০ শতাব্দীতে তৈরী এই প্রাচীন গ্রন্থাগারে বছরে ৫০০,০০০ এর ও বেশী দর্শক ও পাঠক আসে, তাই এটি আয়ার্ল্যান্ডের তো বটেই, সারা পৃথিবীতেই একটি অন্যতম বিখ্যাত ও বিশাল গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত।
Long Room এর বিশাল হলঘর, উঁচু গোলার্ধ ছাদ (vaulted ceiling), মেঝে থেকে ছাদ পর্য্যন্ত ঠাসা বই এর র্যাক, সেখানে প্রায় ২০০,০০০ পুরনো বই পুঁথি আর পান্ডুলিপির সম্ভার, থরে থরে সাজানো। আর প্রায় একশো জন মনীষী দের marble bust, সাজানো রয়েছে গ্রন্থাগারের চারিদিকে – তার মধ্যে আছেন প্লেটো, সক্রেটিস, সেনাকা, আরিস্টট্ ইউরিপিডিস থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত আধুনিক মনীষীরা – নিউটন, ডারউইন, শেক্সপিয়ার। ভেতরে ঢুকে গা বেশ ছমছম করছিল।
অত লোক ভেতরে ঘোরা ফেরা করছে, তাদের পায়ের শব্দ আর কথাবার্ত্তার একটা মৃদু গুঞ্জন বাতাসে ভেসে থাকে। পড়াশোনা করার উপযোগী নিস্তব্ধ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এখানে নেই। পড়ার জন্যে টেবিল বা চেয়ার ও চোখে পড়লোনা। মনে হয় পাঠকেরা এখান থেকে দরকার মত বই নিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে পড়ে। Reading Library নয়, এটা হলো Reference Library…
Long Room এর লাইব্রেরীতে আর যা আছে তা হলো এক মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য পুঁথি – ১৯১৬ সালের Proclamation of the Irish Republic এবং পনেরোশো শতাব্দীর একটি কাঠের তৈরী harp, যা এখন এই দেশের একটি প্রতীক চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আজ আমাদের পৃথিবীতে ক্রমবর্দ্ধমান জ্ঞানের ভান্ডার তো রাখা আছে মেঘের (Cloud) ভিতরে ইন্টারনেটে বিশাল ও বিস্ময়কর Electronic storage এর ভিতর, Wikipedia থেকে বা গুগল এর Search ইঞ্জিন ব্যবহার করে সেখান থেকে অনায়াসে যা তথ্য দরকার সব এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসে।
ট্রিনিটি কলেজের Long Room এ ঘুরে ঘুরে বই এর র্যাক দেখতে দেখতে এই সব প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল।
????
আর এক দিন আমরা গেলাম EPIC Irish Emigration Museum এ।
এইটুকু ছোট্ট একটা দেশ আয়ার্ল্যান্ড, কিন্তু পৃথিবীকে সে কত কি দিয়েছে তা দেখতে হলে যেতে হবে সেখানে। আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে EPIC Museum বেশী দূরে নয়, নদীর ধারেই। সকালে On line এ টিকিট কেটে আমরা সেখানে গিয়ে হাজির হলাম।
Ireland কে land of Emigrants বলা হয়, সারা পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে দলে দলে এই দ্বীপ থেকে নতুন জীবন শুরু করার আশায় মানুষ পাড়ি দিয়েছে নানা দেশে। কেউ গেছে অত্যাচার অনাচার দারিদ্র্যের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে। আবার কেউ গেছে জীবনে উন্নতি করার জন্যে, সাফল্য অর্জ্জন করার জন্যে। এক দিকে hunger, oppression, unemployment, অন্যদিকে love, community, opportunity, এক দিকে বিষাদ, অন্যদিকে আশা। তাছাড়াও কেউ গেছে ধর্ম্ম প্রচারের কাজে, কেউ শিক্ষা বিস্তারের ব্রত নিয়ে। তাদের সবার গল্প বলা হয়েছে EPIC Museum এ।
শোনা গেল এই এপিক মিউজিয়াম হলো ইয়োরোপের সব চেয়ে বড় পর্য্যটক আকর্ষন। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো দর্শকদের দেখানো যে এইটুকু ছোট্ট একটা দেশ আয়ার্ল্যান্ড, তবু আজ সারা বিশ্বে সেই ছোট্ট দেশের মানুষরা কতটা প্রভাব ফেলেছে।
Museum টা দশটা গ্যালারীতে বিভক্ত। প্রথম থেকে শেয পর্য্যন্ত এক গ্যালারী থেকে পরের গ্যালারী তে আমাদের যাত্রাপথ। আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটা পাসপোর্টের পাতা। প্রতি ঘরে ঢোকার আর ছাড়ার (entry and exit) সময় সেই পাতায় একটা করে ছাপ লাগিয়ে নিতে হচ্ছে মেশিনে। যাতে আমাদের প্রত্যেকের যাত্রা পথের একটা record থেকে যায় মিউজিয়ামের সার্ভারে।
প্রথম গ্যালারী গুলোতে মানুষের নিজের দেশ ছেড়ে যাবার বেদনা আর কষ্ট, আর নতুন দেশে নতুন জীবন শুরু করার কঠিন চ্যালেঞ্জের গল্প। কাগজে জাহাজের বিজ্ঞাপন (যেখানে শ্রমিক এবং সন্তান উৎপাদনে সক্ষম অবিবাহিতা নারীকে বিনামূল্যে Australia, Canada বা USA নিয়ে যাবার আহবান জানানো হচ্ছে ), জাহাজের টিকিট, বিদায়ের সময় প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে কান্নার ছবি, এবং নানা Audio visual presentation ব্যবহার করে সেই সব গল্প বলা হয়েছে।
পরের গ্যালারীগুলোতে কেন লোকে নিজের দেশ নিজের পরিবার ছেড়ে নতুন জায়গায় চলে যায় এই নিয়ে নানা বিশ্লেষণ। আমাদের বোঝার সুবিধের জন্যে ছয়জন চরিত্র কে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাদের নিয়ে ভিডিও ফিল্ম তৈরী করে দেখানো হচ্ছে , আর যাদের ভূমিকায় অভিনয় করছেন আজকের অভিনেতা অভিনেত্রীরা। এই ফিল্মে আমরা তাদের কাছ থেকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনছি।
তার পরে দেখানো হয়েছে কি করে আইরিশ মানুষেরা তাদের সাংষ্কৃতিক ঐতিহ্য – culture আর tradition – সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে, তাদের খাবার, তাদের নাচ গান, তাদের উৎসব, তাদের সাহিত্য, তাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা।
সবশেষের গ্যালারী গুলোর theme – The Irish Diaspora today – কি ভাবে প্রবাসী আইরিশ আর তাদের পরের প্রজন্ম – তাদের সন্তান সন্ততিরা – এখনো আয়ার্ল্যান্ড আর আইরিশ ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে।
এই গ্যালারীগুলোতে দেখানো হয়েছে সারা পৃথিবীতে জীবনের নানা ক্ষেত্রে আইরিশ মানুষ দের (যারা emigrate করেছিল, এবং তাদের সন্তানসন্ততিরা) অবদান, এখনকার পৃথিবীর কত প্রথম সারির ব্যক্তিত্বেরা হলেন Irish descendant… জীবনের নানা ক্ষেত্রে কত দিকপাল প্রতিভা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে এই ছোট্ট দ্বীপ টি।
সেই নামের এক বিশাল লম্বা তালিকা। কে নেই সেখানে? সাহিত্যে Bernard Shaw, Samuel Becket, William Butler Yeats, Oscar Wilde, James Joyce, ওদিকে শিল্পে আর অভিনয়ে John Wayne, Robert de Niro, Maureen O’hara, Liam Neeson, Pierce Brosnan, Grace Kelly, Michael Caine. কত নাম করবো? দেখলাম তিন জন Beatles এর ও পূর্ব্বপুরুষ Irish…
প্রশ্নঃ কতজন US President এর Irish roots?
উত্তরঃ ২২ জন, বারাক ওবামাকে নিয়ে।
EPIC Museum হলো Irish অস্মিতার একটি সোচ্চার বিজ্ঞাপন।
ডাবলিনে গেলে এপিক মিউজিয়াম একটি অবশ্য দ্রষ্টব্য জায়গা।