Category Archives: সাঁত্রাগাছি

এই সেই পিস্তল

বড় হয়ে আমিও বাবার মত গাড়ী চালাবো

হাওড়ার সাঁত্রাগাছি (রামরাজাতলা) তে সুভদ্রাদের লতায় পাতায় বিরাট পরিবার, সুভদ্রা গল্প করে যে তার ছোটবেলায় ওদের’, বাড়ীতে বাবা কাকারা সবাই মিলে নাটক করতেন। পারিবারিক কোন বাড়ির দেউড়িতে কিছুটা জায়গা নিয়ে স্টেজ বাঁধা হত।  বাকি অংশে বড়রা সামনে চেয়ার পেতে বসতেন, আর ছোটরা সবাই বসতো স্টেজের সামনে সতরঞ্চি পেতে।

আমার শ্বশুর মশায় (গৌর চন্দ্র ভট্টাচার্য্য,  চেনাশোনা সবার কাছে গৌর বা গৌরদা’, ছোটদের কাছে নতুন কা’) ছিলেন দীর্ঘদেহী ফর্সা সুদর্শন মানুষ, একেবারে নায়কোচিত যাকে বলে, সেই সময়ের বিখ্যাত Hollywood হীরো Clark Gable এর মতো অনেকটা। অবশ্যই তিনি হতেন নায়ক। আর গোবিন্দকা’ ছিলেন ছোটখাটো মানুষ, মেয়েলী সুন্দর চেহারা, আর তাঁর গলাটাও একটু মেয়েলী, তাই তিনি সাধারণতঃ হতেন নায়িকা।

একবার কি একটা নাটকে পটলাকা’ কে কোন পার্ট দেওয়া হয়নি। তাঁর চেহারা বেশ ভারী, একবার কোন একটা নাটকে তিনি স্টেজে উঠতেই নাকি স্টেজ ভেঙে পড়েছিল। তার পর থেকে তাঁকে কেউ নাটকে পার্ট দেবার রিস্ক নেয়না। পটলাকা’ রোজ এসে আমার শ্বশুরমশায় কে বলেন, “এই গৌর, ওদের আমায় একটা পার্ট দিতে বল্‌না।”

তো আমার শ্বশুরমশায় গিয়ে নাটকের পরিচালক কে বললেন, “পটলার মোটা সোটা ভারী চেহারা ওকে পুলিশের একটা ছোট রোল আছে, ওটা দিয়ে দাও। বড্ড ধরেছে আমায়।”

পুলিশের রোল টা একদম শেষে, যেখানে পটলাকা’ কে কোমরের খাপ থেকে একটা পিস্তল (Murder instrument) বের করে সেটা দেখিয়ে বলতে হবে, “এই সেই পিস্তল!” তার পরে তিনি আমার শ্বশুরমশায় কে দড়ি দিয়ে বেঁধে  জেলে নিয়ে যাবেন।        

তো নাটক ভালই হচ্ছে, দেউড়িতে লোক উপছে পড়ছে, কাকা জ্যাঠা, মা মাসী জ্যেঠিমা কাকীমারা সবাই সামনে চেয়ারে বসে, সুভদ্রা তখন ছোট মেয়ে, ছয় সাত বছর বয়েস হবে, সে অন্য ভাই বোনেদের সাথে সামনে সতরঞ্চিতে বসে মুগ্ধ হয়ে তার বাবার অভিনয় দেখছে।

শেষ সীনে পটলা কা’ স্টেজে ঢুকে খাপ থেকে পিস্তল আর বের করতে পারেননা। খাপে মরচে পড়ে জ্যাম হয়ে গেছে।   এদিকে পটলাকা’র ওই খাপ ধরে টানাটানি দেখে সারা হলে খিলখিল হাসির গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। পিস্তল আর বেরোয়ই না! কি আর করা যায়? কিছুক্ষণ চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে পটলা কা’ দুচ্ছাই বলে খালি হাত টা উঁচু করে দেখিয়েই বলে দিলেন, “এই সেই পিস্তল!” হলে তখন দমফাটা হাসির ফোয়ারা।

পটলা কা’ র সাথে আমার কোন দিন আলাপ হয়নি, তবে এই গল্পটা থেকে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি বা প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের একটা পরিচয় পাওয়া যায়, ইংরেজীতে যাকে বলে presence of mind! তিনি খাপে মরচে ধরে জ্যাম হয়ে গেছে তাই পিস্তল বের করা যাবেনা বুঝতে পেরে আর কোন সময় নষ্ট করেন নি, হাত দিয়েই কাজ চালিয়ে নিয়েছেন তাতে হাসাহাসি একটু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নাটকের flow নষ্ট হয়নি।   

বিয়ের পরে প্রথম প্রথম আমার শ্বশুরমশায় আমায় তাঁদের পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে নানা পারিবারিক গল্প বলতেন, ছুটির দিন বিকেলে দু’জনে পাশাপাশি বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে বসে চা খেতে খেতে এই সব গল্প শুনতে আমার বেশ লাগতো। তার মধ্যে পটলাকা’র এই গল্পটা বলার সময় তিনি তাঁর ডান হাতটা এগিয়ে আঙুল উঁচিয়ে পটলাকা’ কে অনুকরণ করে “এই সেই পিস্তল” বলে নিজেই হো হো করে হাসতেন, হাসির উচ্ছ্বাসে তাঁর চোখ মুখ বুঁজে আসতো।   

সবাই হাসলেও ছোট্ট সুভদ্রা কিন্তু একটুও হাসেনি। তার বাবাকে পুলিশ দড়ি দিয়ে বেঁধে জেলে নিয়ে যাচ্ছে, পিছন পিছন লাল পাড় শাড়ি পরা গোবিন্দকা ইনিয়ে বিনিয়ে “ওঁগো, তুঁমি জেঁলে যেঁওনাকো” বলে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছেন, তাই দেখে সুভদ্রার মুখ শুকিয়ে গেছে।

নাটক শেষ হয়ে যাবার পরে বাবা নারায়ণের বাড়িতে সবার সাথে খেতে বসেছেন, সুভদ্রা আর বাবার পাশ থেকে সরছেনা। যদি আবার পুলিশ আসে বাবাকে নিয়ে যেতে? সে কিছুতেই কাউকে বাবা কে নিয়ে যেতে দেবেনা। তার বাবা তাকে অনেক বোঝাচ্ছেন, ওটা আসল নয় মা, আমরা নাটক করছিলাম, কেউ আমায় নিতে আসবেনা, ভয় নেই…

কিন্তু সুভদ্রা কিছুতেই বুঝবেনা।

সুভদ্রা কে অবশ্য দোষ দেওয়া যায়না, কেননা জীবনে কোনটা যে অভিনয়, আর কোন টা যে real life, সেটা বোঝা মোটেই সহজ কাজ নয়, আমাদের প্রাপ্তবয়স্কদেরই গুলিয়ে যায়, তার তো তখন মাত্র ছয় কি সাত বছর বয়েস।

মহাকবি শেক্সপিয়ার বলে গেছেন না, The world is a stage…