
Roald Dahl এর BFG (Big friendly giant) রোজ বেশী রাতে বাচ্চাদের ঘরের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ঘুমন্ত শিশু দের মনে একটা নল দিয়ে স্বপ্নের বুদবুদ ছড়িয়ে দেয়। সেই সব স্বপ্ন অবশ্য সবই হাসির আর আনন্দের।
কিন্তু আমার ছোটবেলায় আমি খুব ভূতের স্বপ্ন দেখতাম। বোধহয় ছোটবেলায় সবাই তাই দ্যাখে, কেননা ছোটদের প্রায় সব গল্পই ভূত পেত্নী দৈত্য দানো আর রাক্ষস দের নিয়ে। আমার স্বপ্নে আমায় ভূতেরা ঘরের মধ্যে তাড়া করে বেড়াতো, আর আমি পালাতে পালাতে শেষে পাশে ঘুমিয়ে থাকা মা’কে জড়িয়ে মা’র বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতাম। মা’র কাছে থাকলে ভূতগুলো আমার কাছে আসতোনা, তারা আমাদের আলমারীটার মাথায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে খ্যাক খ্যাক করে হাসতো~
বড় হবার পরে ভূতের ভয় চলে যায়, তখন স্বপ্নেরা আমাদের জীবনের গল্প হয়ে দাঁড়ায়। সেই সব গল্পে বাস্তব আর কল্পনা আশ্চর্য্য ভাবে মিলে মিশে থাকে। এবং শুধু গল্প নয়, রীতিমতো সিনেমা বা নাটকের আঙ্গিকে তারা তৈরী, সেখানে নানা চরিত্র নানা ঘটনা, নানা ঘাত প্রতিঘাত।
এই সব স্বপ্নের চিত্রনাট্য কে তৈরী করে কে জানে?
আমি সেই লোকটির নাম দিয়েছি “স্বপ্নের জাদুকর।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মালিনী নাটকটি স্বপ্নে দেখেছিলেন। নাটকটির সূচনায় তিনি সেই কথা লিখে গেছেন। লন্ডনে একবার তারকনাথ পালিতের বাড়ীতে তাঁর ডিনারের নিমন্ত্রণ ছিল, অনেক দেরী হয়ে যাওয়ায় তিনি নিজের বাড়ীতে না ফিরে তারকনারথের বাড়ীতেই রাত কাটান। নাটকের সূচনায় তিনি লিখেছেন, “ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলুম যেন আমার সামনে একটি নাটকের অভিনয় হচ্ছে, বিষয়টা একটা বিদ্রোহের চক্রান্ত। দুই বন্ধুর মধ্যে একজন কর্ত্তব্যবোধে সেটা ফাঁস করে দিয়েছেন রাজার কাছে। মৃত্যুর পূর্ব্বে তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্যে তার বন্ধুকে যেই তার সামনে নিয়ে আসা হলো, দুই হাতের শিকল দিয়ে তার মাথায় মেরে বন্ধুকে দিলেন ধূলিসাৎ করে।
“জেগে উঠে যেটা আমার আশ্চর্য্য ঠেকলো সেটা হচ্ছে এই যে আমার মনের মধ্যে একভাগ নিশ্চেষ্ট শ্রোতামাত্র, অন্যভাগ বুনে চলেছে একখানা আস্ত নাটক। স্পষ্ট হোক, অস্পষ্ট হোক সংলাপ আর ঘটনাক্রমের দ্বারা সে নাটকের গল্পকে বহন করে চলেছিল।
“জেগে উঠে সেই গল্পটি আমি মনে করতে পারলামনা, কিন্তু অনেক কাল সেই স্বপ্ন আমার জাগ্রত মনের মধ্যে সঞ্চরণ করেছে। অবশেষে অনেক দিন পরে সেই স্বপ্নের স্মৃতি এই নাটকের আকার নিয়ে শান্ত হলো।”
মালিনী নাটকের সেই দুই বন্ধু হল ক্ষেমঙ্কর আর সুপ্রিয়।
আমার মনের মধ্যেও এই স্বপ্নের জাদুকর আমার অজান্তেই নানা ধরণের গল্প আর নাটক বুনে যায়।
একবার স্বপ্নে দেখলাম আমার অফিসে আমাদের কোম্পানীর Sales Manager নাসিম জাবেরীর ঘরে আড্ডা মারছি, পরের দিন আমার একটা important customer presentation, সেটা ল্যাপটপে রাখা। বাড়ি ফিরে দেখি ল্যাপটপটা নাসিমের ঘরেই ফেলে এসেছি। আবার অফিসে ফিরে গেলাম, কিন্তু নাসিমের ঘর তালা বন্ধ! তার ফোন নাম্বার ও আমার কাছে নেই!
সর্ব্বনাশ, কি হবে এখন?
স্বপ্নের মধ্যে এই ধরনের দুর্ঘটনা অবশ্য প্রায়ই হয়।
আমার বাড়িতে কাজ করে একটি বাংলাদেশী ছেলে তার নাম Faiz, তার সাথে নাসিমের কস্মিনকালেও কোন পরিচয় নেই, থাকার কথাও নয়। স্বপ্নের মধ্যে আমি আর কাউকে না পেয়ে Faiz কে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে নাসিম এর নাম্বার আছে?
Faiz বললো , “নাসিম দা’? হ্যাঁ, আছে তো, লিখে নিন। ”
স্বপ্নে সবই সম্ভব!
কয়েক বছর আগে একবার কেরালা গিয়েছিলাম ছুটিতে বেড়াতে, সেখানে কানের মধ্যে চারিপাশ দিয়ে অনেক মালয়ালম কথা ঢুকেছে কিছুদিন। ফিরে আসার কিছুদিন পরে সুভদ্রা স্বপ্ন দেখলো সে দমদম এয়ারপোর্টে এসে দ্যাখে কোন ট্যাক্সি কিংবা বাস নেই, শুধু রিক্সা!
বালীগঞ্জে আমাদের আইরনসাইড রোডের বাড়ীতে আসবে বলে সে একটা রিক্সাতেই চড়ে বসলো। এদিকে সেই রিক্সাওয়ালা দেখা গেল কেরালার লোক, সে বাংলা হিন্দী ইংরেজী কিছুই বোঝেনা, কেবল মালয়ালম! তাকে আইরনসাইড রোড কোথায় বোঝাতে সুভদ্রা তো হিমসিম খেয়ে গেল, তার মাথায় কিছুই ঢোকেনা।
ধাপার মাঠ এর ভেতর দিয়ে এবড়ো খেবড়ো পথ দিয়ে যেতে যেতে সুভদ্রা হঠাৎ দেখে তারা Bypass এ অম্বুজা apartment এর কাছে চলে এসেছে। সেই apartment complex এ আমাদের কুয়েতের বন্ধু সুহাস দা’ (সান্ন্যাল) বৌদি রা থাকেন, আমরা তাঁদের বাড়ীতে গেছি বহুবার~
মালপত্র নিয়ে রিক্সায় বসে অসহায় বিরক্ত সুভদ্রা দ্যাখে সাত সকালে সুহাস দা’ রাস্তায় দাঁতন করতে করতে Morning walk করছেন। তাকে দেখে সুহাস দা’ বললেন “একি সুভদ্রা, তুমি এখানে?”
সুভদ্রা তো হাঁইমাই করে সুহাস দাকে রিক্সাওয়ালার নামে যা’ তা’ বলতে শুরু করে দিল, “দেখুন না সুহাস দা’, এই লোকটা একবিন্দু বাংলা জানেনা, এদিকে কলকাতায় রিক্সা চালাচ্ছে, বলছি আইরনসাইড রোডে নিয়ে চলো, সে বোঝেই না।”
সুহাসদা’ সব শুনে রিক্সাওয়ালা কে মালয়ালাম ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন কি করে আইরনসাইড রোডে যেতে হবে।
সুহাস দা’ মালয়ালাম ভাষা জানেন নাকি?
স্বপ্নে সবই সম্ভব!
বুদ্ধদেব বসু তাঁর “নীলাঞ্জনের খাতা” উপন্যাসে লিখেছিলেন “’দৈনন্দিন’ বলে একটি শব্দ প্রায় সব ভাষাতেই প্রচলিত আছে, কিন্তু রাত্রি থেকে ওরকম কোন বিশেষণ রচিত হয়নি। কেননা দিন, যা কাজের সময়, তা প্রতিদিন প্রায় সকলের পক্ষেই একরকম, আর রাত্রি যা স্বপ্নের সময়, তা প্রতিবারেই নতুন, অভাবনীয়, সদ্যোজাত।”
এবং এই সব স্বপ্নে প্রায়শঃই আমাদের মনের নানা ভয় ভাবনা দুশ্চিন্তা – anxiety and angst – প্রতিফলিত হয়।
কবির ভাষায়-
মোর ভীরু ভাবনার অঞ্জলিতে/যতটুকু রয় তাই উচ্ছলিতে/
দিবসের দৈন্যের সঞ্চয় যত/সে যে রজনীর স্বপ্নের আয়োজন/
আমরা স্বপ্নে পেন হারাই, আমাদের গাড়ী চুরি হয়, প্লেন বা ট্রেন ধরতে গেলে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে যাই।
আমি এক জন কে চিনি, সে খুব মেধাবী ছাত্র, ম্যাট্রিকে ফার্স্ট হয়েছিল। সে নাকি প্রায়ই স্বপ্নে দেখতো যে পরীক্ষার হলে বসে সে দেখছে তার পেনে কালি নেই!
এই সব স্বপ্ন দেখার পর ঘুম ভেঙ্গে গেলে ভীষণ ভাল লাগে। বেশ নিশ্চিন্ত, মনে হয় যাক বাবা পেন হারায়নি, কিংবা গাড়ী চুরি হয়নি তাহলে। ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে ট্রেণ বা ফ্লাইট মিস ও করছিনা।
অবশ্য সুখস্বপ্ন ও আছে। সেই সব সুখস্বপ্নে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় জনেরা আমাদের কাছে ফিরে আসেন। আর সেই স্বপ্ন আচমকা ভেঙ্গে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়।
সুভদ্রাকে একদিন ঘুম থেকে ডেকে দিতে সে আমার উপর খুব রেগে গিয়ে বললো “দিলে তো আমার ঘুমটা ভাঙ্গিয়ে? সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, আমার বাবা কে নিয়ে।”
কি স্বপ্ন?
সুভদ্রা তার বাবার সাথে অনেক ঘুরে ট্রেণে চেপে হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। বাবা তাকে বললেন “তুমি একটু দাঁড়াও মা, আমি একটা কুলি ডেকে নিয়ে আসছি।”
বাবা ফেরার আগেই আমি সুভদ্রার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়েছি। রাগ তো হবারই কথা।
আমি বললাম ঘুম যদি না ভাঙতো তাহলে দেখতে তোমার বাবা আমায় নিয়ে ফিরে আসছেন। আমার গায়ে লাল জামা, মাথায় পাগড়ী, হাতে পেতলের ব্যাজ, হাঁটু পর্য্যন্ত মালকোচা মারা ময়লা ধুতি, খালি পা।
তোমার বাবা তোমায় বলছেন, “দ্যাখো মা, তোমার জন্যে কি ভাল একটা কুলি নিয়ে এসেছি!”