সত্যি কথা বলতে কি এবার লন্ডনে আসার খুব একটা ইচ্ছে আমার ছিলনা। প্রায় দুই বছর কোভিডের সংক্রমণ থেকে খুব সাবধানে নিজেকে বাঁচিয়ে পূর্ণদাস রোডের বাড়ীতে আমি আর সুভদ্রা সকাল থেকে রাত পর্য্যন্ত একটা নিয়মিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সুতরাং মনের মধ্যে একটা স্থবিরতা শিকড় গেড়ে জমিয়ে বসেছিল।
নিউটনের ভাষায় যাকে বলে ইনার্শিয়া অফ রেস্ট।
এখনো সংক্রমণ কমার কোন চিহ্ন নেই, এদেশেও নয়, লন্ডনেও নয়। তাহলে এখন ওখানে গিয়ে আমাদের কিছু হলে মেয়ে জামাই নাতনীদের জন্যে সেটা কি খুব ভাল হবে? মেয়েরা জোর করাতে শেষ পর্য্যন্ত অবশ্য রাজী হতেই হলো। এখন আমাদের জীবনের সব সিদ্ধান্ত ওদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি।
যাবার আগে অনেক হ্যাপা। RTPCR test, Travel insurance এর জন্যে medical test, টিকিট কাটা। Vaccine certificate, Subidha form এবং আরও নানারকম কাগজপত্র তৈরী করা। কোন ভুল হলেই প্লেনে উঠতে দেবেনা।
পুপু সাথে থাকায় খুব সুবিধে হয়েছিল অবশ্যই। এয়ারপোর্টে আর প্লেনে সমস্ত কাগজপত্র দেখানোর কাজ ওই একা সামলেছে, তার ওপরে আমাদের দু’জনের দেখাশোনা, মালপত্র সামলানো।
তবু প্লেনে ওঠার পর হঠাৎ শরীর টা বেশ খারাপ লাগতে শুরু করলো। মাথাটা বেশ শূন্য শূণ্য লাগছিল, তাছাড়া প্রচন্ড শারীরিক অস্থিরতা, অক্ষিদে। সুন্দরী বিমানসেবিকাদের দেওয়া শ্যাম্পেন ছুঁলামনা, এবং সারা দিন কিছু মুখেও দিইনি। গত ক’দিনের এত টেনশন বোধহয় শরীর আর নিতে পারেনি।
যাই হোক, এখানে এসে দশ দিন বাড়ীতে কোয়ারান্টাইনে কাটানোর পর ওমিপ্রাজোল এর একটা কোর্স খেয়ে কিছুটা সামলালেও অক্ষিদে আর গ্যাসটা যাচ্ছিলোনা কিছুতেই। তার ওপর এখানে এসে খাবার দাবারের অনেকটা পরিবর্ত্তন হয়েছে, রোজ ভাত ডাল রুটি তরকারী এখানে কে রান্না করবে? কিন্তু দিনের পর দিন পাস্তা,স্যান্ডউইচ আর ফ্রেঞ্চ টোস্ট খেয়েই বা আর কত দিন থাকা যায়?
পুপু কাজে, একদিন বিকেলে আমি একাই বাড়ীর কাছে Ocean ফার্মেসী তে গিয়ে কাউন্টারের এক বয়স্ক ভদ্রমহিলার কাছে antacid tablet চাইলাম।
তিনি বেশ আন্তরিক ভাবে জিজ্ঞেস করলেন আমার কি হয়েছে?
এ আবার কি প্রশ্ন? Antacid তো over the counter drug, প্রেসক্রিপশনের তো প্রয়োজন নেই? তাহলে এত কৌতুহল কেন? একটু বিরক্ত বোধ করলেও একে নতুন জায়গা তার ওপরে ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক, তাই বলতেই হলো বদহজম, পেটে একটা ঘিনঘিনে ব্যথা। এই সব কথা বাংলায় যত সহজে বোঝানো যায়, ইংরেজীতে কাজটা তত সহজ নয়।
যাই হোক, কোনমতে বোঝানো তো গেল।
ভদ্রমহিলা আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব উদবেগের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কোন জি পির সাথে পরামর্শ করেছেন?
আমি অল্প হেসে বললাম হ্যাঁ আমার মেয়ে একজন জি পি, তাকে জানিয়েছি।
তিনি র্যাক থেকে আমার জন্যে রেনী ট্যাবলেটের প্যাকেট দিয়ে বললেন “জি পির সাথে পরামর্শ করতে কিন্তু কোনমতেই ভুলবেন না~”
আমি ভদ্রভাবে একটু হাসলাম। বার বার এক কথা বলার কি দরকার? একটু বাড়াবাড়ি মনে হলো।
তারপরে টাকা নিয়ে ক্যাশ মেশিন থেকে রিসিট বের করার সময় মহিলা কিছুটা করুণ গলায় আমায় বললেন, “আমার স্বামীরও এরকম রিফ্লাক্স আর পেটে ব্যথা হত। কিন্তু তিনি অনেক বলা সত্ত্বেও কোনদিন জিপির কাছে যাননি। শেষ পর্য্যন্ত তিনি মারা গেলেন!”
“হে ভগবান,” সমবেদনায় গলা কিছুটা ভারী হয়ে এলো আমার। “কি হয়েছিল ওনার? পেটে আলসার?”
ভদ্রমহিলা বললেন, “না ওনার হার্টের সমস্যা ছিল, জি পি র কাছে গেলে ধরা পড়তো। কিন্তু গেলেন না কিছুতেই। আপনি কিন্তু গিয়ে একবার পরীক্ষা করিয়ে নেবেন।“
ওষূধের প্যাকেট আর টাকার চেঞ্জ টা নিয়ে বেরিয়ে আসছি, দরজার কাছে পিছন থেকে ভদ্রমহিলা আবার কিছুটা অনুনয়ের গালায় বলে উঠলেন, “Promise me you will go and see a GP”!
ফার্মেসীতে গিয়ে ওষুধ কেনার সময় এরকম আন্তরিক সমবেদনা তো পাইনি কোনদিন, তাই সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা আজও ভুলতে পারিনি। বাড়ী ফেরার পথে কেমন যেন একটু আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম, সে কথা মনে পড়ে।
১৯৯৭ সালে আমি কুয়েতে বি সি এসের সভাপতি হয়েছিলাম। তার আগে আমি কোনদিন বি সি এসের কোন কমিটি তে আসিনি, গায়ে ফুঁ লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। একেবারে প্রথমেই এক লাফে সভাপতি! মানে আনকোরা নতুন, এবং আনাড়ী – ইংরেজীতে যাকে বলে rookie । অবশ্য আমার কমিটিতে সহ সভাপতি রঞ্জন গুহ রায়, সেক্রেটারী তপন ঘোষ এবং অন্যান্য সবাই বেশ অভিজ্ঞ, এবং কাজে পোক্ত। আমার পক্ষে সেটা একটা বাঁচোয়া ছিল।
আর হবি তো হ’, সেই বছরটা (১৯৯৭) ছিল দারুণ ঘটনাবহুল – আমাদের দেশের স্বাধীনতার স্বর্ণজয়ন্তী র উদযাপন উৎসবের বছর, তাছাড়া সে বছর নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জন্মশতবার্ষিকী। কুয়েতে বিসি এসের নাম উজ্জ্বল করতে গেলে এ বছর দারুণ কিছু তো একটা কিছু করতে হবে?
কিন্তু কি করা যায়?
কুয়েতে বি সি এসের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের উৎকর্ষতা নিয়ে খুব সুনাম। আমাদের member দের মধ্যে অনেক talent, কিন্তু আমাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তাই বছরে আমরা একটা স্যুভেনির ছাপাই, এবং তাতে যে বিজ্ঞাপন পাই তার টাকা এবং সদস্যদের চাঁদা এই নিয়ে বছরে আমাদের ৪০০০ দিনার মত আয় হয়। টাকাটা খুব একটা কম নয়, তা দিয়ে বছরে আমরা কিছু বাঁধাধরা অনুষ্ঠান করি। তার মধ্যে একটা পূর্ণাঙ্গ নাটক, একটা রবীন্দ্রনাথের গান বা নৃত্যনাট্য, একটা ছোটদের অনুষ্ঠান। তাছাড়া পিকনিক, আর বিজয়া সন্মিলনী। এতেই আমাদের সব টাকা খরচ হয়ে যায়, যার মধ্যে খাওয়া দাওয়া হলো একটা বড় খরচ, অন্ততঃ ৬০%। পরের কমিটি কে দিয়ে যাবার মত খুব অল্প টাকাই অবশিষ্ট থাকে।
সভাপতি হবার পর এই সব দেখে শুনে আমি প্রথমেই অনুভব করেছিলাম যে কলকাতার সাংষ্কৃতিক জগতের সাথে আমাদের যোগাযোগ তৈরী করতে গেলে অর্থাৎ দেশ থেকে নামী শিল্পীদের কুয়েতে এনে তাদের দিয়ে জমকালো কিছু অনুষ্ঠান করার জন্যে যে পরিমাণ অর্থ আমাদের দরকার, তা যোগাড় করতে গেলে Sponsored program করা ছাড়া গতি নেই।
প্রধানতঃ সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz ১৯৯৭ থেকেই আমরা শুরু করি।
বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz ১৯৯৭ অনুষ্ঠান করে আমাদের তহবিলে যে উ্দবৃত্ত অর্থ জমেছিল, তাই দিয়ে আমরা সে বছর প্রমিতা মল্লিক আর সুগত বসুকে কুয়েতে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম।
প্রমিতা “দেশমাতৃকা” নামে একটি চমৎকার দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠান আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। সুগত (নেতাজী সুভাষের ভ্রাতুস্পুত্র শিশির কুমার বসুর ছেলে) প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ও স্কলার, তিনি আমাদের নেতাজীর জীবন এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান নিয়ে একটি অনবদ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ লেকচার দিয়েছিলেন, পরে তাঁর সাথে আমাদের একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব ও আলোচনাও হয়। সেই অনুষ্ঠানের নাম আমরা দিয়েছিলাম “লহ প্রণাম!”
সুখের এবং গর্ব্বের কথা যে সেই sponsored অনুষ্ঠানের ট্র্যাডিশন বি সি এসে এখনও চলেছে। তার পর থেকে কুয়েতে প্রায় প্রতি বছর দেশ থেকে আমরা নিয়ে এসেছি নানা নামী দামী শিল্পী, সঙ্গীত এবং নাটকের দলকে। সেই সাথে কুয়েতে উচ্চমানের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে বি সি এসের সুনাম ক্রমশঃ বেড়েছে।
Sponsored program না করলে এসব সম্ভব হতোনা।
কিন্তু নতুন কিছু করতে গেলে কিছু প্রশ্ন, কিছু অভিযোগ তো আসবেই।
আমাদের অনেক সদস্যদের কাছ থেকে তখন শুনতে হয়েছিল আমরা নাকি বি সি এস কে “commercialise” করছি। ভাবটা যেন কি দরকার আমাদের অতো টাকার? আমরা হলাম একটি Non-Profit association আমাদের তো যা পাচ্ছি তাই নিয়েই দিব্বি চলে যাচ্ছে! বেশী লাভের লোভ কি ভালো? ইত্যাদি। আবার এমন কি এ কথাও আমার কানে এলো যে লাভের বদলে সেই অনুষ্ঠান করলে যদি আর্থিক ক্ষতি হয়, কেউ কেউ বলছে তাহলে তার ভার কে নেবে?
বলা বাহুল্য এই সব অভিযোগ যারা করছিল তারা সংখ্যায় খুবই কম।
আমি তখন একটা GBM ডেকে সবাইকে বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz নিয়ে খুব উৎসাহব্যঞ্জক একটা presentation দিয়েছিলাম মনে আছে। তাতে উল্লেখ করেছিলাম ওই অনুষ্ঠান করলে কুয়েতের বৃহত্তর সমাজে আমাদের recognition – সুনাম এবং সন্মান – কতোটা বাড়বে। এও বলেছিলাম যে ওই অনুষ্ঠান করতে আর্থিক ক্ষতি হবার যদিও কোন সম্ভাবনাই নেই, তবু যদি তা হয়, তাহলে আমি এবং আমার কমিটির সব সদস্য সেই ক্ষতি মিটিয়ে দেবো।
সবার সন্মতি পাবার পর আমরা হৈ হৈ করে স্পনসরের খোঁজে নেমে পড়েছিলাম।
সেবার Pepsi আমাদের main sponsor হয়েছিল, আর তার সাথে co-sponsor হতে এগিয়ে এসেছিলেন অনেক ভারতীয় উদ্যোগপতিরা। তাদের মধ্যে ছিলেন Caesars এর মিস্টার লরে্নস, Mailem এর মিস্টার লাম্বা, Toyotar মিস্টার সানি ম্যাথিউস, KITCO র ধীরাজ ওবেরয়। এ ছাড়াও আমাদের সাহায্য করতে হাত বাড়িয়েছিল অনেকে ভারতীয় কোম্পানী- Book sellers, Travel agents, Jewellers, Restaurants এবং আরও অনেকে। আমাদের মেম্বাররা সবাই এগিয়ে এসে সাহায্য করেছিল এই সব স্পনসর যোগাড় করতে।
শ’খানেক কিংবা আরো বেশী স্পনসর পেয়েছিলাম আমরা সেবার।
কি যে আশাতীত সাড়া পেয়েছিলাম আমরা সবার কাছ থেকে সেই প্রথম বোর্ণ ভিটা ইন্টার স্কুল Quiz অনুষ্ঠানে এখনো ভাবলে বেশ একটা গর্ব আর আনন্দের অনুভূতি হয়। ইংরেজীতে যাকে বলে pride and joy..
যাই হোক, সেই বোর্ণ ভিটা Quiz এর অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যেই আমি বি সি এসের একটা লোগো design করার পরিকল্পনা করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে অনেক ভারতীয় এবং বিদেশীরা আমাদের অতিথি হয়ে আসবেন, তাঁদের মনে আমাদের সম্বন্ধে একটা ভাল impression তৈরী করার জন্যে বি সি এসের নিজস্ব একটা Brand Identity দরকার বলে আমার মনে হয়েছিল।
তাই সেবার গরমের ছুটিতে কলকাতায় গিয়ে একটা Design Consultant কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমায় তিনটে লোগো ডিজাইন করে দেয়। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। পঞ্চাশ দিনার মতো।
কুয়েতে ফিরে এসে একটা GBM এ আমরা মেম্বার দের কাছে সেই তিনটে লোগোর মধ্যে কোনটা সবাই চায় তাই নিয়ে একটা ভোট করালাম। আশি শতাংশর বেশী ভোট পড়েছিল আমাদের এখনকার লোগো ডিজাইনে।
যাকে বলে Hands down winner!
বোর্ণ ভিটা Quiz এর অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে আমরা প্রত্যেক পোস্টার, প্রত্যেক বিজ্ঞাপন প্রত্যেক চিঠি এবং আমাদের অন্যান্য সব official কাগজপত্রে ওই লোগো ব্যবহার করা শুরু করি।
সেই প্রথম Inter-school Quiz এর ফাইনালে প্রতিযোগী ছাত্র ছাত্রীদের জন্যে ছয়টা সাদা রং এর কাঠের টেবিল তৈরী করা হয়েছিল। সাথে ছিল buzzer আর সেটা টিপলে জ্বলে ওঠা আলো। স্টেজে সেই সাদা টেবিলগুলোর প্রত্যেকটার সামনে বি সি এসের লোগো জ্বলজ্বল করতে দেখে কি যে ভাল লেগেছিল! সেদিন অন্যান্য Community থেকে নানা স্কুলের ছাত্র ছাত্রী দের সাথে তাদের মা বাবারা এসেছিলেন, হল ভর্ত্তি লোক, তাদের মনের মধ্যে Quiz program এর quality র সাথে এই লোগোর মধ্যে দিয়ে বি সি এস সম্বন্ধে সবারএকটা ভাল impression হয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সেই থেকে এই লোগো যেখানেই দেখি মনে বেশ একটা আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। ভাবতে ভাল লাগে যে আমি যখন কুয়েতে থাকবোনা, তখন এই লোগো থাকবে আমার legacy হয়ে।
মনোহরপুকুরের বাড়ীতে ছোটবেলার একটা সন্ধ্যার কথা খুব মনে পড়ে।
বড় বারান্দায় সিঁড়ির কাছে আমাদের ধোপা এক বিরাট বান্ডিল কাপড় জামা নিয়ে এসে বসেছে, মা জ্যেঠিমা কাকীমারা তার সাথে কাপড়ের হিসেব করছেন, এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে ছোটকাকা উঠে এলেন। বারান্দায় উঠে আসতেই চার বৌদি ঘিরে ধরলেন তাঁকে।
“অশোক, আজ নাইট শো তে আমাদের হারানো সুর দেখাতে নিয়ে চলো।”
ছোটকাকার তখনো বিয়ে হয়নি, তিনি বৌদিদের একমাত্র অবিবাহিত দ্যাওর। আর খুব pampered..
ছোটকাকার বরাবরই একটু মজা করার অভ্যেস, আর প্রতি কথার শেষে অ্যাঁ? বলা তার একটা মুদ্রাদোষ ছিল। হীরকের রাজা যেমন “ঠিক কি না?” বলতেন, অনেকটা সেরকম।
ছোটকাকা সেদিন গম্ভীর আর উদাস মুখ করে বলেছিলেন, “যে সুর হারিয়ে গেছে তাকে আর দেখতে গিয়ে কি হবে, অ্যাঁ?”
এখন জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে সেই জীবনের নানা হারানো সুর হঠাৎ আচমকা ফিরে আসে।
যেমন গতকাল ছিল বিশ্বকর্ম্মা পূজো।
ছোটবেলায় বিশ্বকর্ম্মা পূজো আমাদের জন্যে ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর season এর শেষ দিন। তার আগের দিন গুলো ঘুড়ি ওড়ালেও ওই দিনটা বলতে গেলে ছিল ঘুড়ি উৎসব এর দিন। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত “ভোকাট্টা”…
বাবলু আর আমি আমাদের বাড়ীর ছাত থেকে খুব ঘুড়ি উড়িয়েছি একসময়।
মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীর ছাদে আমরা বেশ কিছুদিন আগে থেকে ওই দিনটার জন্যে prepare করতাম। সুতো লাটাই ঘুড়ি কেনা হতো সতীশ মুখার্জ্জী রোডে “মাণিক লাল দত্তের” দোকান থেকে। সিকি তেল, আধ তেল, এক তেল। কত রকম ঘুড়ির design ছিল তখন, আর তাদের কতরকম নাম ছিল – ঘয়েলা, ময়ূরপঙ্খী, মোমবাতি, চৌরঙ্গী…তারপরে সেই ঘুড়িতে ব্যালান্স করে সুতোর কার্ণিক লাগানো ছিল একটা কঠিন কাজ।
আর মাঞ্জা দেবার জন্যে কিনতাম এরারুট, কাঁচগুড়ো আর রং। এক ছুটির দিন দুপুরে আমি আর বাবলু ছাদে সুতোয় মাঞ্জা দিতাম। সাদা সুতো কিনে মাঞ্জা দেওয়া হতো ছাতে। অ্যারারুট, কাঁচগুড়ো আর রং জল মিশিয়ে মন্ড তৈরী করে সুতোর ওপরে কয়েকবার লাগাতে হতো, রোদ্দুরে শুকোবার পরে সুতোয় এমন ধার হত যে আঙুল কেটে যেতো অসাবধান হলেই।
বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন সকাল থেকেই আকাশ ভরে উঠতো লাল নীল ঘুড়িতে। প্যাঁচ খেলে কোন ঘুড়ি কে কাটলে চারিদিক থেকে উল্লসিত আওয়াজ উঠতো – ভোকা…আ…আ…ট্টা…। সেই আওয়াজ এখনো আমার কানে ভাসে। আর কারুর ঘুড়ি কাটতে পারলে যে মনের মধ্যে একটা গর্ব্ব আর আনন্দের অনুভূতি হতো সেটাও এখনো ভুলিনি।
বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন বাবলুর স্কুল ছুটি কিন্তু আমার মিশনারী স্কুলে ছুটি নেই। ইচ্ছে না থাকলেও আমায় স্কুলে যেতেই হতো। মা’কে বলে লাভ হতোনা। She was too strict…
বাবলু এদিকে সকাল থেকে ছাদে।
সেদিন স্কুলে লাস্ট পিরিয়ডটা যেন কাটতেই চাইতোনা। বিকেলে ছুটির ঘন্টা বাজলেই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটতাম মনে পড়ে। বাড়ী পৌঁছেই দুড্ডাড় করে ছাতে চলে যেতাম, তারপর সন্ধ্যা নামা পর্য্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো।
ঘুন্টু সেলিমপুরের বাড়ীতে উঠে যাবার পর প্রায় প্রতি বছর বিকেলে মনোহরপুকুরে ঘুড়ি ওড়াতে চলে আসতো। হাজরা মোড়ে সাধনদাদুর কারখানায় বেশ বড় করে বিশ্বকর্ম্মা পূজো হতো। আমি ঘুন্টু আর বাবলু সন্ধ্যাবেলা সেখানে গিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসতাম।
ঘুড়ি ওড়ানো এখন অনেকদিন বন্ধ, তবে এখন লকডাউনের এই ঘরবন্দী জীবনে রোজ সন্ধ্যায় আমাদের পূর্ণ দাস রোডের বাড়ীর ছাতে হাঁটার সময় ইদানীং মাথার ওপরে খোলা আকাশে শনশন আওয়াজ পাই, দেখি ঘুড়ি উড়ছে চারিদিকে। গতকাল বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন দেখলাম আকাশে অনেক ঘুড়ি, খুব প্যাঁচ লড়া চলছে, কয়েকটা ঘুড়ি কাটা পড়ে ভাসতে ভাসতে নীচে নেমে আসছে, একটা কাটা ঘুড়ি আমাদের ছাতে এসে পড়লো।
১৯৬৮ সালে খড়্গপুর থেকে ইঞ্জীনিয়ারিং পাশ করার পরে আমি রাণীগঞ্জে বেঙ্গল পেপার মিলে বছর খানেক কাজ করেছিলাম। সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চাকরী। তখন আমার বাইশ বছর বয়েস।
বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে ১৯৬৫ সালে, তখন আমার খড়গপুরে থার্ড ইয়ার। তাঁর দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে মা’র প্রায় সমস্ত সঞ্চয় নিঃশেষিত। জমি বিক্রী করে প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে ধার করে তিনি সেই খরচের ধাক্কা সামলেছেন। তার ওপরে ছিল আমার কলেজে টিউশন আর হোস্টেলে থাকার খরচ। মা আমায় এই খরচ নিয়ে কিছু বুঝতে না দিলেও আমাদের আর্থিক অবস্থা যে বেশ শোচনীয় তা বোঝার মত বয়েস আমার হয়েছিল।
তাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে একটা চাকরী পেয়ে উপার্জ্জন শুরু করে মা’র পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর ভার লাঘব করাই আমার তখন প্রধান কাজ। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের পিতৃহীন, বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে – ভাল চাকরী পাবার জন্যে আমার কোন খুঁটির জোর ছিলনা। কেবল ছিল আমার আই আই টি খড়্গপুর থেকে পাওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এর একটা ডিগ্রী।
তার ওপর চাকরী পাবার পক্ষে ১৯৬৮ সালটা খুব একটা অনুকূল ছিলনা।
১৯৬৬ সাল থেকে দেশের অর্থনীতি ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি সামলাতে টাকার মূল্য কমানো u হলো। এর মধ্যে ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টরা ভোটে জিতে বাংলা কংগ্রেস এর সাথে যুক্তফ্রণ্ট তৈরী করে ক্ষমতায় এসেছে। অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী, জ্যোতি বসু উপ মুখ্যমন্ত্রী।
বড় বড় সব কারখানা তে নানা দাবী দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। এক এক করে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার ওপরে নকশালবাড়ীতে কৃষক আন্দোলন নিয়ে মার্ক্সিস্ট কম্যুনিস্ট পার্টি দুই ভাগ হয়ে গেছে, মার্ক্সসিস্ট লেনিনিস্ট পার্টি নামে একটা নতুন রাজনৈতিক দল গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের পক্ষ নিয়ে চীনের মাও সে তুং এর সাংষ্কৃতিক বিপ্লবের আদর্শে কৃষিবিপ্লবের ডাক দিয়েছে। তার ওপর ভিয়েতনামের যুদ্ধ চলছে, আমেরিকার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে সবাই সোচ্চার।
কলকাতার রাস্তায় তখন এই ধরণের দেয়াল লিখন দেখা যায়।
“তোমার নাম, আমার নাম, ভিয়েতনাম”। “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান”। “বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।” ইত্যাদি। সারা দেশে একটা অশান্তি মারামারি খুনোখুনি আর নৈরাজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে ক্রমশঃ।
যাই হোক, এর মধ্যেই ইন্টারভিউ দিয়ে আমরা দুই ক্লাসমেট রমাপদ ত্রিপাঠী আর আমি চাকরী নিয়ে রাণীগঞ্জে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। মাইনে মাত্র তিনশো টাকা ছিল। তার মানে আমরা দুজনেই সেভাবে টাকার কথা ভাবিনি। ওই অশান্ত সময়ে একটা চাকরী পেয়ে কাজ শেখাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে কাজের অভিজ্ঞতাটা দরকার, মাইনে কম হতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতা অমূল্য।
আমরা দু’জনেই কিছু দিনের মধ্যে চাকরী ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই। সামান্য যা উপার্জ্জন করতাম সেটা বোধহয় নতুন কোন ভালো চাকরী খোঁজার পিছনেই খরচ হতো। তাছাড়া মাইনে থেকে কিছুটা হাত খরচ বাঁচতো, যেটা খড়গপুরে সেভাবে হাতে আসতোনা।
রাণীগঞ্জের সেই দিন গুলো বেশ ছিল। বয়েস্ও কম ছিল, যতদিন ছিলাম, খুব উপভোগ করেছি।
বেশ ভাল একটা ফ্ল্যাট পেয়েছিলাম, চার বেলা মেসে খাবারের ব্যবস্থাও ছিল। মিলের পাশেই দামোদর নদ, গরমে হাঁটু জল, নদীর ওপারে বাঁকুড়া জেলা, সেখান থেকে জলের মধ্যে দল বেঁধে হেঁটে শ্রমিকেরা কাজে আসে, বিকেলে বাড়ী যায়, সে এক সুন্দর দৃশ্য।
বেশ কিছু সমবয়েসী বন্ধূও জুটে গেছে, স্থানীয় ক্লাবে গিয়ে টেবিল টেনিস খেলি, ফুটবলও পেটাই মাঝে মাঝে। নদীর ধারে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে সেখানে ঘুরে ঘুরে বেলুন ফাটাই, জিলিপি খাই। ক্লাবের লনে টেনিস খেলি। অনেকে মিলে উইকেন্ডে রাণীগঞ্জ শহরে গিয়ে সিনেমা দেখি, আসানসোলে গিয়ে রেস্টুরেন্টে বিয়ার খাই। পূজোর পর দুর্গাপুরে জলসা শুনতে গিয়েছিলাম এক দিন বাসের মাথায় চড়ে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনবো বলে। তাছাড়া ছিল কাছের গ্রামে যাত্রাপালা, আমার সেই প্রথম যাত্রা দেখা।
মামা মামীমা থাকতেন আসানসোলে, কোর্ট রোডে মামার বিশাল বাংলো। সেখানে সুযোগ পেলেই চলে যেতাম। মামাতো মাসতুতো ভাই বোনদের সাথে খুব হুটোপাটি হতো। আম গাছে চড়তাম, তাছাড়া ছিল বারান্দায় বসে ক্যারম বা ব্যাডমিন্টন খেলা।
সব মিলিয়ে বেশ ছিল সেই রাণীগঞ্জের দিনগুলো আমার জন্যে।
২ নোপুর গ্রাম
বেঙ্গল পেপার মিলে আমি কাজ শুরু করলাম ওয়ার্কশপে, সেখানে মিলের নানা মেশিন যেমন পাম্প ইত্যাদি বিকল হইয়ে গেলে সারানোর জন্যে আসে। সেখানে লেদ মিলিং প্লেনিং ইত্যাদি নানা মেশিন, এবং বেশ কিছু ফিটার আর মেশিনিস্ট কাজ করে, এরা সবাই কাছাকাছি গ্রামের ছেলে। রমাপদ কজ পেলো পাওয়ার প্ল্যাণ্টে, তার কাজ টার্ব্বাইন নিয়ে।
আমাদের ওয়ার্কশপের ম্যানেজার চৌধুরী সাহেব বেশ মাইডিয়ার লোক। আর যারা সেখানে কাজ করে তাদের কাছ থেকে কত নতুন কিছু জানা যায়, যা আমি কলেজে শিখিনি। তাদের অনেকের সাথেই কয়েক মাসের মধ্যেই আমার বেশ ভাব হয়ে গেল। চৌধুরী সাহেবের ভাই মহাদেব চৌধুরী একজন সিনিয়র ফিটার, বয়স্ক এবং কাজের লোক, স্বাস্থ্যবান বলিষ্ঠ সুঠাম শরীর, ফর্সা এক মাথা কালো চুল, চুপচাপ, অমায়িক, সবসময় তাঁর মুখে হাসি। কিন্তু ইদানীং তাঁর শরীর খারাপ হয়েছে, নিয়মিত কাজে আসেননা, ক্রমশঃ বেশ রোগাও হয়ে যাচ্ছেন, চেহারায় একটা ক্লান্তির ভাব, চোখের তলায় কালি।
ভাই কে নিয়ে চৌধুরী সাহেব বেশ চিন্তিত। তিনি ভাইয়ের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করছেন। মুস্কিল হলো চৌধুরী সাহেব থাকেন মিলের কলোনীতে তাঁর ম্যানেজারের বাংলোতে, আর তাঁর ভাই মহাদেব থাকেন কাছেই নোপুর নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে ভালো ডাক্তার বা হাসপাতাল নেই।
বেঙ্গল পেপার মিলের ওয়ার্কশপে কার্ত্তিক বারিক নামে একটি ছেলে ছিল, তার কাজ ছিল নানা দরকারী জিনিষ পত্র জোগাড় করার। খুব কাজের ছেলে ছিল কার্ত্তিক, আর খুব ফুর্ত্তিবাজ। আমার আর রমার সাথে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।
তো একদিন কার্ত্তিক রমা আর আমায় নিয়ে একদিন সাইকেলে চেপে ওদের গ্রাম (নোপুর) দেখাতে নিয়ে গেল। আমাদের মিল টা ছিল রানীগঞ্জ থেকে কিছুটা দূরে বল্লভপুর নামে একটা জায়গায়, দামোদরের তীরে। সেখান থেকে নোপুর গ্রাম ক্রোশ খানেকের পথ, সাইকেলে যেতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগে।
আমাদের সাই্কেল ছিলোনা, কার্ত্তিক কোথা থেকে দু’টো সাইকেল জোগাড় করে নিয়ে আসে।
পড়ন্ত বিকেলে আলপথে সাইকেলে চেপে যেতে পাশে সবুজ ধানক্ষেত। কার্ত্তিক আবার একটু কবিতাপ্রেমী, সে রবীন্দ্রনাথের “গগনে গরজে মেঘ” এর সাথে “রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হলো সারা” এই লাইন দুটি নিয়ে তার আপত্তি ব্যক্ত করেছিল। ওর মতে আষাঢ় শ্রাবণে ধান কাটা হয়না।
রমার সাথে (সেও গ্রামের না হলেও শহরতলী হাওড়ার ছেলে) তার এই নিয়ে সেদিন তর্ক বেঁধে যায়। সেই তর্কে আমন আর আউষ ধানের কথা উঠে এসেছিল। আমি তো শহরের ছেলে, এ সব ব্যাপারে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত, আমি কোন তর্কের ভিতরে না গিয়ে চারিদিকের অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মন দিচ্ছিলাম।
পরে শুনেছি কার্ত্তিকের কথাই ঠিক। আউষ ধান বর্ষাকালে ধানের চারা পোঁতা (রোপন)হয়, সেই ধান অগ্রহায়নে কাটা হয়। আর আমন ধান পোঁতা হয় শীতকালে, কাটা হয় চৈত্রে। বর্ষাকালে ধান কাটা নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল সোনার তরী কবিতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
নোপুর গ্রাম থেকে মিলে অনেকে কাজ করতে আসে, তাদের অনেকের বাড়ীতে কার্ত্তিক আমাদের নিয়ে গিয়েছিল সেদিন। মাটির বাড়ী, ধুলোর রাস্তা, পানাপুকুর, নারকেল গাছের সারি, বাংলার গ্রামের সেই ধূলিমলিন চেহারা এখনো বেশ মনে পড়ে।
মহাদেবের বাড়ীতেও আমরা গিয়েছিলাম সেদিন। অপ্রত্যাশিত ভাবে আমাদের পেয়ে মহাদেব খুব খুসী হয়েছিলেন মনে আছে। সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী মহাদেবকে দেখে সেদিন কিছুটা ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। কিন্তু মহাদেব নিজের শরীর খারাপ নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, “না না আমি তো ঠিক আছি, ও কিছু নয়”, স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন “এরা আমার জন্যে অযথা চিন্তা করে।”
বাইরে বেরিয়ে কার্ত্তিক বেশ চিন্তিত মুখে আমাদের বলেছিল, “বৌদি বলছিলেন মহাদেবদা’ কে একবার বর্দ্ধমান জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। চৌধুরীবাবুর সাথে এই নিয়ে কথা বলতে হবে। উনি নিজের ভাইয়ের চিকিৎসার বন্দোবস্তর ভার নেবেন আমায় বলেছেন।”
তারপরে সেদিন কার্ত্তিক আমাদের তার বাড়ীতে নিয়ে গিয়েছিল। কার্ত্তিকের বাড়ীর সামনে বিশাল মাঠ, আর তাদের নিজেদের অনেক খেজুর গাছ। সেদিন কার্ত্তিক আমাদের জিরেন গাছের খেজুর রস খাইয়েছিল।
“আপনাদের জন্যে তিন দিন জিরেন রেখেছি” বলেছিল কার্ত্তিক।
আমার এখনো মনে আছে যে ঢকঢক করে সেই মিষ্টি রস বেশ কয়েক গেলাস খেয়ে ফেলে আমার বেশ একটু নেশা হয়েছিল, আমি কার্ত্তিক কে কিছুটা জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করেছিলাম “টয়লেট টা কোন দিকে ভাই?”
কার্ত্তিক কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “টয়লেট ? আপনার সামনে দিব্বি ফাঁকা মাঠ পড়ে আছে…যেখানে ইচ্ছে চলে যান…”
১৯৬৩ সালে হায়ার সেকেণ্ডারী পরীক্ষার পরে স্কুল ছেড়েছিলাম। তার পর পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেল! স্কুল ছাড়ার স্বর্ণজয়ন্তী উৎসব উদযাপন করতে আমরা স্কুলের বন্ধুরা জড়ো হচ্ছি দীপঙ্করের বাড়ী। শনিবার ১১ই জানুয়ারী, ২০১৪।
প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে যাওয়ায় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরেই ক্রমশঃ যোগাযোগ বেড়েছে। বেশ কয়েকজন বন্ধুর সাথে নিয়মিত ইমেল চালাচালি হয়, যারা কলকাতায় থাকে তারা মাঝে মাঝে এর ওর বাড়িতে বা ক্লাবে একটা সন্ধ্যা একসাথে কাটায়। যারা বিদেশে থাকে তারা ছুটিতে দেশে এলে দেখা করে।
কিন্তু আমাদের স্কুলের বন্ধুদের আনুষ্ঠানিক রি-ইউনিয়ন এই প্রথম।
প্রথম প্রস্তাবটা আসে প্রবীরের (ঘোষ) কাছ থেকে। তারপর প্রবীর, দীপঙ্কর (চ্যাটার্জ্জী), উৎপল (সোম), বিপ্লব (রায়) এবং আরো কয়েকজন একসাথে বসে দিনটা ঠিক করে আমাদের বাকিদের ইমেলে জানায়। শেষ পর্য্যন্ত প্রবীরদের উদ্যোগে আমাদের সহপাঠী দের একটা প্রাথমিক লিস্ট তৈরী হয়, সবার নাম ঠিকানা, ইমেল, টেলিফোন নম্বর একটা স্প্রেডশীটে ফেলে সবাইকে পাঠানো হয়।
আমাদের মধ্যে অনেক বন্ধুই এখন দেশের বাইরে থাকে – এদের মধ্যে যারা আসতে পারবেনা, তারা সবাই মেলে শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
এরা ছাড়াও আরও অনেক স্কুলের বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। এরা সব কোথায়? আজকের এই ইন্টারনেট আর ফেসবুকের যুগে তার লুকিয়ে আছে কি করে? এদের সাথে একদিন না একদিন ভবিষ্যতে যোগাযোগ হবেই, প্রবীরের ধারণা।
আমি ২০১৩ র ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কুয়েত থেকে কলকাতা পৌঁছে গেছি। পুরনো বন্ধুদের সাথে এত বছর পরে দেখা হবে ভাবতে বেশ ভালো লাগছে।
ঠিক এক সপ্তাহ আগে শনিবার ৪ঠা জানুয়ারী সকালে বাড়ীতে হঠাৎ এক ফোন। একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “মে আই স্পিক্ টু মিস্টার ভৌমিক?”
অবাক হলাম না, এই মেয়েটির ফোন আমি আগেও পেয়েছি। মেয়েটি হলো দীপঙ্করের সেক্রেটারী, এবং আমি বাঙ্গালী জেনেও কেন জানিনা সে ইংরেজীতেই আমার সাথে কথা বলে।
আমি একটু মিন মিন করে বলতে গেলাম আমি তো এগারো তারিখ আসছি, আজ বাড়ীতে মেয়ে জামাই আর দুই নাতনী আছে, আজ একটু অসুবিধে…কিন্তু দীপঙ্কর কোন কথাই শুনবেনা।
শেষ পর্য্যন্ত ঠিক হলো আমি এক ঘন্টার জন্যে যাবো।
তো চলে গেলাম।
২ প্রস্তুতি
জানুয়ারীর চার তারিখে সন্ধ্যায় দীপঙ্করের বাড়ী গিয়ে দেখি সবাই এসে গেছে, অনুষ্ঠান কোথায় হবে সেই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রবীর দেখি খুব চিন্তিত মুখে হাতে একটা ফোন নিয়ে এদিক ওদিক হেঁটে বেড়াচ্ছে। প্রবীরের চেহারাটা আগের মতোই আছে, ব্যাকব্রাশ চুল, ছিপছিপে, মাথার সামনেটা একটু ফাঁকা হতে শুরু করেছে।
প্রবীর, উৎপল আর অমিতাভর সাথে কলকাতায় এলে মাঝে মাঝে দেখা হয়েছে, কিন্তু বিপ্লব আর প্রদীপের সাথে সেই স্কুল ছাড়ার পরে এই প্রথম দেখা। পঞ্চাশ বছরের ব্যবধান, তবু আমাদের পরস্পর কে চিনতে কোন অসুবিধে হলোনা। সবাই সবাই কে জড়িয়ে ধরলাম। আগের মতোই তুই বলে সম্বোধন করলাম নিজেদের, খবরাখবর নিলাম, কে কোথায় আছে, কি করছে, ইত্যাদি। প্রদীপের মাথার চুল আমার মতোই সাদা, বিপ্লবের মাথায় বেশ বড় টাক। অমিতাভ আর উৎপল এর চেহারা তেমন পাল্টায়নি, অবশ্য ওদের সাথে তো মাঝে মাঝে দেখা হয়, তাই পাল্টালেও তেমন চোখে পড়েনা।
প্রবীরের হাতে একটা লম্বা লিস্ট, সে হিসেব করে বলে দিল ১১ তারিখ কতো জন আসবে। দীপঙ্করের বাড়ীর বাইরের ঘরটা বেশ বড় আর সাজানো, সেখানে আমাদের বসার জন্যে অনেক সোফা আর চেয়ার সাজানো আছে। তা ছাড়া তার ডাইনিং রুম টাও বেশ বড়, আর খাবার গরম করার জন্যে তার কিচেনেও যথেষ্ট জায়গা আছে।
কে কে আসছে আর কে কে আসতে পারবেনা সেই নিয়েও আলোচনা হলো। অনেকেই আসবে – যেমন অরুণাভ ঘোষ থাকে ইংল্যান্ডে – এখন ছুটিতে কলকাতায়, অজয়নাথ রায়, প্রদীপ ভট্টাচার্য্য, প্রদীপ সোম, সুবীর ঘোষ। বোধহয় ক্লাস নাইন বা টেনে ভাস্কর চ্যাটার্জ্জী আমাদের স্কুল থেকে ট্র্যান্সফার নিয়ে চলে যায়, শুনলাম ভাস্করও আসবে। এদের সাথে সেই স্কুল ছাড়ার পর আর আমার দেখা হয়নি। ওদের সাথে আবার দেখা হবে ভাবতেই বেশ ভাল লাগছিল। সেই সব পুরোনো মুখ আর হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা স্মৃতিতে ভেসে আসছিল।
আলোচনার মধ্যে দীপঙ্করের লোকেরা চা আর খাবার দাবার নিয়ে এলো। নানা ধরনের পদ, দীপঙ্কর সব বেঙ্গল ক্লাব থেকে আনিয়েছে।
গল্পে গল্পে কখন এক ঘন্টার জায়গায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে, ইচ্ছে না থাকলেও তাই উঠতেই হলো।
সামনের শনিবার ১১ই জানুয়ারী আবার দেখা হবে বলে উঠলাম।
দীপঙ্করের বাড়িতে সুভদ্রা আর আমি যখন পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে সাতটা। বেশী দেরী হয়নি ভেবেছিলাম, কিন্তু গিয়ে দেখি হাউসফুল, পার্টি শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। প্রবীর আমায় দেখে বললো, “একি হেরি, এত দেরী? আমি তো ভাবলাম তুই আর আসবিনা।”
দীপঙ্করের বিরাট হলঘর, বেশ গমগম করছে দেখলাম, পার্র্টি জমে উঠেছে, মেয়েরা সবাই সোফায় বসে গল্পে মশগুল, ছেলেরা গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আলাপে ব্যস্ত। গ্লাসের গায়ে বরফের ঠোকাঠুকির টুংটাং আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। দীপঙ্কর গৃহস্বামী, গোলগাল, মাথায় টাক, গালে আধপাকা দাড়ি, ট্রাউজার্স সার্ট আর ব্রেসে তাকে দেখতে বেশ সম্ভ্রান্ত লাগছে। অনেকটা Solzhenitsyn এর মত। সে দেখি কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার স্টাইলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর কারুর প্লেট বা গ্লাস ফাঁকা দেখলেই তাদের নাও নাও বলে যারপরনাই ব্যতিব্যস্ত করছে।
সেদিন আমার শরীর টা ভাল ছিলনা, সর্দ্দি জ্বর, ক্রোসিন খাচ্ছি সকাল থেকে, কিন্তু দীপঙ্কর কিছুতেই ছাড়বেনা, আরে খাও খাও বলে সে আমায় একটা সিঙ্গল্ মল্টের এর গ্লাস ধরিয়ে দিল।
চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, অনেক অচেনা অল্পচেনা প্রৌঢ় মুখ। এরা কি তারাই, যাদের সাথে শৈশব আর কৈশোরের কমবেশী দশ বছর একসাথে কাটিয়েছি আমি? ভাল করে তাকিয়ে সেই কিশোর মুখগুলো চিনে নেবার চেষ্টা করলাম। কঠিন কাজ। সেই কিশোরেরা তো আজ আর কেউ নেই, সবাই হারিয়ে গেছে, জীবনের সেই দিনগুলোর মতোই। আর তাদের সাথে হারিয়ে গেছি সেই ছোটবেলার আমিও।
এখন যাদের আমার চারিপাশে দেখছি তার সবাই প্রাজ্ঞ, প্রবীণ, কারুর মাথায় টাক, কারুর ভুঁড়ি, কারুর মাথাভর্ত্তি পাকা চুল। স্কুলজীবনের সেই হাফপ্যাণ্ট পরা হাসিখুসী উচ্ছল ছেলেগুলো কোথায় গেল? তারা আজ কেউ হাইকোর্টের বিচারক বা উচ্চপদস্থ সরকারী আমলা, কেউ লব্ধপ্রতিষ্ঠ ইঞ্জিনীয়ার, আবার কেউ সফল ব্যবসায়ী।
এদের আমি চিনিনা।
জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত, ওঠা পড়া, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছি আমরা। এখন আমাদের জীবন ঘিরে আছে নতুন আপনজনেরা, স্ত্রী, পুত্র কন্যা, নাতি, নাতনী, নতুন বন্ধু, সহযোগী, সতীর্থ। পুরনো বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা অনেকটা দূরে সরে গেছি এই পঞ্চাশ বছরে।
তা হোক, তবু কবির ভাষায় “পুরানো সেই দিনের কথা, সেই কি ভোলা যায়?”
ভোলা যায়না।
মনের মধ্যে সেই স্কুলের ক্লাসরুম, বারান্দা, বিশাল সবুজ মাঠ, মাঠের দক্ষিণ দিকে তেঁতুল আর পলাশ গাছ, সেই পুকুর আর বাঁধাকপির ক্ষেত, সেই চুড়োনওয়ালা, টিফিন পিরিয়ডের ছুটোছুটি, হাসাহাসি, কলরব, আর সেই সময়ের সহপাঠী আর শিক্ষকদের মুখ সব একসাথে ফিরে এল। অনেকটা যেন reverse osmosis process ব্যবহার করে পঞ্চাশ বছরের ব্যবধান পেরিয়ে পিছিয়ে গেলাম সেই দিনগুলোতে।
আমার প্রথম কাজ হল ঘুরে ঘুরে করে সবার সাথে দেখা করা এবং বিশেষ করে অচেনা বন্ধুপত্নী দের সাথে আলাপ করা। তাঁরা সবাই দেখলাম বেশ জমিয়ে গল্প করছেন সোফায় বসে, তাদের মধ্যে কারুর কারুর আজই হয়তো প্রথম দেখা, কিন্তু দেখে কে বলবে? মনে হয় যেন ওদের বহু দিনের বন্ধুত্ব! সুভদ্রার সাথে একমাত্র অমিতাভর বৌ সুজাতার আলাপ ছিল, আমি এক এক করে অন্য সবার সাথে ওর আলাপ করিয়ে দিলাম।
অরুণাভ ঘোষ কে দেখে চিনতে পারিনি, স্কুলে এক মাথা কোঁকড়া চুল আর বেশ কোমল তারুণ্যে ভরা মুখ ছিল ওর, সব সময় মজার মজার কথা বলে হাসাতো আমাদের। এখন তার মাথায় মোড়ানো চুল, মুখশ্রীতে সেই লাবণ্য আর নেই। তার জায়গায় বাসা বেঁধেছে একটা বয়সোচিত গাম্ভীর্য্য। ও এখন UK তে থাকে, এবার সাথে তার বৌ নেই, সে একাই এসেছে দেশে।
তার পাশে সুবীর ঘোষ, ছোটখাট চেহারা, আগের মতোই অবিকল, চিনতে কোন অসুবিধে হয়নি। স্যুট টাই পরে সুবীর খুব ফর্মাল, যাকে বলে একেবারে টিপটপ, ফিটফাট। চুপচাপ, মুখে স্মিত হাসি। সেও একা এসেছে। স্যুট টাই কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সুবীর বলল, “আজকের অনুষ্ঠানের একটা মর্য্যাদা আছে তো, নাকি?”
আর রবীন নাগ, সে থাকে দিল্লীতে। এখন সে কিঞ্চিৎ অসুস্থ। সেও আজ একা এসেছে। একসময় দারুণ ফুটবল খেলতো রবীন, আমরা একসাথে প্রচুর বল পিটিয়েছি স্কুলে থাকতে এবং পরে আই আই টি খড়্গপুরে । নীল চোখ আর সোনালী চুল, স্কুলে থাকতে রবীন ছিল আমাদের পোস্টার বয়। আজকের রবীন কে দেখলে সেই ছোটবেলার রবীনকে একটু একটু মনে পড়ে।
উৎপল আর প্রদীপ সোম দুই ভাই, এদের স্ত্রীরা পাশাপাশি বসে আছে, তাদের নাম চিত্রা আর ভারতী। তাদের সাথে গিয়ে আলাপ করলাম। উৎপল দেখি খুব ব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু প্রদীপ চুপ করে সোফায় বসে। স্কুলেও দুই ভাই এর স্বভাবে একটা পার্থক্য ছিল মনে আছে, উৎপল হাসিখুসী, চঞ্চল, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, ওদিকে প্রদীপ একটু ছোটখাটো, দুর্ব্বল, চুপচাপ। প্রদীপের বৌ ভারতী বলল, “দেখুন না খুব বড় একটা অসুখ থেকে উঠল, এত করে বললাম যেও না, কিন্তু কথা শুনলোনা, বললো পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করবোনা, কি যে বলো?”
প্রবীরের বৌ সুপ্রিয়া আর পৃথ্বীরাজ এর বৌ অনিন্দিতা দেখি পাশাপাশি বসে খুব গল্প করছে, এদের দুজনের আগেই আলাপ ছিল বোধ হয়। সুপ্রিয়া খুব সপ্রতিভ, তাকে আমি বললাম “আপনাদের বিয়ে তে আমি মাধব লেনের বাড়িতে গিয়েছিলাম”। সুপ্রিয়া বলল “বাড়িটার বয়স একশো বছর হয়ে গেল, জানেন? আমার এখন বম্বে থেকে কলকাতায় এলে ওখানেই থাকি, আসুন না একদিন?”
বহুদিন আগে, তখন আমাদের সবে বিয়ে হয়েছে, পৃথ্বীরাজরা থাকত যোধপুর পার্কে আর তাদের বাড়ীর ঠিকানা ছিল M Jodhpur Park। ঠিকানাটা অদ্ভুত, তাই এখনও মনে আছে। সেই বাড়ীতে একটা বিরাট ছাত ছিল। পৃথ্বীরাজ ম্যানিলা তে AIM এ পড়তে যাবার আগে একদিন সুভদ্রা আর আমি আর অন্য কয়েকজন বন্ধু সেই বাড়িতে ওদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেই স্মৃতিচারণ করলাম ওদের সাথে। পৃথ্বীরাজ অবিকল আগের মত আছে, বুড়িয়ে যায়নি, বেশ সুন্দর স্বাস্থ্য, চুল কালো, আগের মতোই চুপচাপ। মুখে হাসি।
এবার দেখা হলো এক অচেনা ভদ্রলোকের সাথে, ইনি আবার কে? চেনা যাচ্ছেনা তো? বেশ অভিজাত বনেদী চেহারা, একটা নীল পুলোভার আর ট্রাউজার্স এ বেশ মানিয়েছে, মাথাজোড়া টাক, চোখে একটা বাহারী চশমা, প্রফেসর প্রফেসর লাগছে। পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন আমার নাম প্রদীপ ভট্টাচার্য্য, আমি ছিলাম বি সেকশনে। অর্থাৎ যাদের বাংলার জায়গায় হিন্দী ছিল ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ।
ও হরি, প্রদীপ, তুমি?
আমাদের ক্লাসের তিন জন প্রদীপ সেদিন উপস্থিত। সোম, ব্যানার্জ্জী, ভট্টাচার্য্য। প্রদীপ মিত্র প্রদীপ রাও, প্রদীপ চক্রবর্ত্তী আর প্রদীপ সেন আসেনি, ওদের নিয়ে আমাদের ক্লাসে সাতজন প্রদীপ ছিল।
আমরা ছিলাম যাকে বলে প্রদীপের আলোয় আলোকিত।
প্রদীপ ভট্টাচার্য্য বি সেকশনে (হিন্দী) পড়লেও আমাদের অনেক কমন ক্লাস থাকত, আর টিফিন আর লাঞ্চ এর ব্রেকে তো একসাথেই মিলে মিশে থাকতাম আমরা । সুতরাং প্রদীপকে ভোলার প্রশ্নই ওঠেনা। একটু গাবদু ছিল, আর খুব হাসিখুসী। শুনলাম ও IAS এ ছিল, এখন রিটায়ার করে মহাভারত নিয়ে রিসার্চ করে এবং বম্বে ইউনিভার্সিটি তে পার্ট টাইম পড়ায়।
সেদিন প্রদীপ ভট্টাচার্য্য বেশ একটা ভারিক্কী ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমাদের মধ্যে সেই একমাত্র IAS, আর সেই একমাত্র বি সেকশন। সুতরাং একটু পাঙ্গা নেবার অধিকার তার আছে।
স্মৃতি একটু ক্ষীণ বলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি হায়ার সেকেন্ডারী পর্য্যন্ত স্কুলে ছিলে না আগেই ট্র্যান্সফার নিয়ে চলে গিয়েছিলে?” তাই শুনে প্রদীপ আমার ওপর বেশ চটে গেল। পাশেই বসে ছিল ওর বৌ, তার কাছে আমায় টেনে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করে দিয়েই বললো ইন্দ্রজিৎ কি বলছে শোন। আমি নাকি…
আমি একটু অপ্রস্তুতের হাসি হাসলাম।
অজয় একটা ওয়াইন এর গ্লাস হাতে নানা মজার কথা বলছে আর খুব জোরে জোরে হাসছে। তার গালে বিরাট জুলফি, তাকে বেশ মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো দেখতে লাগছে। স্কুলে থাকতে অজয় বেশ লাজুক ছিল, আর কম কথা বলতো, কিন্তু এই বয়েসে এসে সে বেশ প্রগলভ, তার ওপরে সে এখন হাইকোর্টে বিচারক। নির্দ্বিধায় সে আমাদের একটার পর একটা আদিরসাত্মক জোক শুনিয়ে গেল। তার স্টক বেশ ভাল দেখলাম।
ভাস্কর কে দেখলাম বহু বছর পর, তার মাথা ভর্ত্তি সাদা চুল, বেশ রাশভারী চেহারা। সেই ক্লাস এইট বা নাইনের পরে আর দেখা নেই, যোগাযোগ ও নেই, কিন্তু দেখেই চিনলাম। এখনো ভাস্কর আগের মতোই হাসিখুসী, প্রাণবন্ত। ওর স্ত্রীর সাথেও আলাপ হলো। ওরা থাকে গুরগাঁও তে। প্রদীপ ব্যানার্জ্জী (বাঁড়ু) আর তার বৌ এসেছে USA থেকে। ভাস্করের সাথে সে যাদবপুরে পড়েছে, প্রতি বছর ওদেরও (মেকানিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং ক্লাসের) জানুয়ারী মাসে কলকাতায় রিউনিয়ন হয়, সেখানে সুভাষ মাধব, প্রদ্যোত, অরুনাভ সবাই আসে, তাই ওদের মধ্যে ভাল যোগাযোগ আছে দেখলাম।
বিপ্লব আর তার বৌ ডালিয়ার সাথে গল্প করছিলাম, এমন সময় পাশে প্রদীপ ভট্টাচার্য্য গ্লাস হাতে এসে দাঁড়ালো। আমি ডালিয়া কে বললাম, “আপনার স্বামীর স্কুলে পড়ার সময় মাথা ভর্ত্তি কালো চুল ছিল জানেন, আর ছিল বড় বড় নিষ্পাপ দুটি চোখ। ”
প্রদীপ পাশ থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো, “আঃ, নিষ্পাপ!”
আমি বললাম, “চোখ দুটো এখনো আগের মতোই আছে, কিন্তু মাথার চুল…”
বিপ্লব নীচু ক্লাস থেকেই পড়াশোনায় ভাল। ক্লাস থ্রি তে এন্টনী স্যার প্রতি সপ্তাহের শেষে আমাদের নানা রং এর কার্ড দিতেন, গোলাপী পেতো সবচেয়ে ভাল ছেলেরা, তারপর সবুজ, হলদে ইত্যাদি। আমি ডালিয়া কে বললাম, “বিপ্লব প্রত্যেক সপ্তাহে গোলাপী কার্ড পেতো, জানেন তো? আর আমরা ছিলাম হলদে সবুজ ওরাং ওটাং!”
বিপ্লব বললো “বল্ তো, একদম আমায় পাত্তা দেয়না।”
পাশ থেকে প্রদীপ আবার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো, “ঘর ঘর কি কাহানী!”
সবাই গল্পে মত্ত। প্রচুর ছবি তোলা হচ্ছে। আজকাল সেলফোনের ক্যামেরা দিয়ে বেশ ভাল ছবি তোলা যায়, আলাদা ক্যামেরার দরকার পড়েনা। আমি আমার ফোন দিয়ে বেশ কিছু ছবি তুলে ফেললাম। প্রবীর আজকের সন্ধ্যার প্রধান ব্যবস্থাপক, স্বভাবতঃই তার কাঁধে অনেক দায়িত্ব। সারাক্ষণই তাকে খুব ব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে, একবার এদিকে আর একবার ওদিকে। মাঝে মাঝে ছবি তোলার জন্যে কোন গ্রুপে বন্ধুদের কাঁধে হাত রেখে হাসিনুখে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
অজয় বললো, “প্রবীর আর দীপঙ্কর আজকের অনুষ্ঠানের অর্গানাইজার আর হোস্ট – ওদের দু’জনের সাথে সব মেয়েদের একটা ছবি তোলা হোক~”!
আমরা সবাই বললাম, খুব ভালো আইডিয়া! আমাদের বৌদের সবাই কে ডেকে ওদের দু’জন কে মাঝখানে রেখে ছবি তোলা হলো।
আমাদের সময়ে ভাল স্কুল হিসেবে আমাদের স্কুলের বেশ সুনাম ছিল। হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় আমাদের স্কুলের রেজাল্ট খুব ভাল হতো। প্রায় প্রতি বছরই আমাদের স্কুল থেকে সারা বাংলায় প্রথম দশজনের মধ্যে একজন বা দু’জন থাকতোই। একদিকে যেমন স্কুলে একটা অনুশাসন আর শৃঙ্খলার পরিবেশ ছিল, অন্যদিকে তেমন আমাদের শিক্ষকেরা সবাই আমাদের সুশিক্ষার ব্যাপারে মনোযোগ দিতেন। অ্যানুয়াল আর হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা ছাড়াও বছরের প্রায় পুরোটাই প্রতি শুক্রবার আমাদের সাপ্তাহিক পরীক্ষা দিতে হতো। ফলে পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়া সম্ভব ছিলনা।
পড়াশোনা ছাড়াও, খেলাধূলাতেও আমাদের স্কুলের নাম ছিল। প্রথমেই বলতে হয় আমাদের স্কুলের সেই বিশাল সবুজ মাঠের কথা। কলকাতা শহরের বুকে ওই রকম বড় মাঠ আর কোন স্কুলে ছিল বলে আমার জানা নেই। ওই মাঠ ছিল আমাদের স্কুলের একটা বড় গর্ব্বের জায়গা। সেই মাঠে কত যে ফুটবল হকি ক্রিকেট খেলেছি আমরা! কলকাতার অন্য ক্রিশ্চিয়ান স্কুল যেমন সেন্ট পল্স্, সেন্ট জেভিয়ার্স্ ইত্যাদি তাদের ফুটবল টীম নিয়ে এসে আমাদের সাথে টূর্ণামেন্ট খেলতো।
পড়াশোনা ও খেলাধূলায় আমাদের স্কুলের এই সাফল্যের পিছনে আমাদের শিক্ষকদের অবদান একটা প্রধান কারণ ছিল, আমাদের আলাপে পুরনো দিনের কথার মধ্যে তাই অনেকটাই আমাদের স্কুলের শিক্ষকদের কথা চলে আসে।
কম বয়েসে নীচু ক্লাসে ছিলেন পুলিন স্যার, পাঞ্জা স্যার, খান স্যার, চৌধুরী স্যার, মন্ডল স্যার।
পুলিন স্যারের ব্যায়াম পুষ্ট চেহারাটা বেশ মনে পড়ে। তিনি ছিলেন আমাদের ড্রিল (Physical Education) টিচার। সপ্তাহে একদিন শেষ পিরিয়ডে মাঠে আমাদের ড্রিল হত, তাতে স্যার আমাদের নানা রকম ব্যায়াম আর কসরত শেখাতেন। আর কেউ কিছু না পারলে তার মাথায় হাল্কা করে একটা গাঁট্টা মারতেন। “পুলিন স্যারের গাঁট্টা, পয়সায় আটটা” নামে একটা ছড়া বেশ প্রচলিত ছিল তখন।
বছরে একদিন স্কুলের বিশাল সবুজ মাঠে Sports day হতো, আমাদের পরিবারের অনেকে আমাদের দৌড় ঝাঁপ এবং অন্যান্য কসরত দেখতে আসতেন। সেদিন দর্শকদের সামনে আমরা অনেক জিমন্যাস্টিক খেলা দেখাতাম। তার মধ্যে একটা আগুনের রিং এর মধ্যে দিয়ে ডিগবাজী দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে যাওয়া খেলাও ছিল, পুলিন স্যার সেটা আমাদের দিয়ে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই প্রচুর প্র্যাকটিস করাতেন।
ড্রয়িং শেখাতেন পাঞ্জা স্যার। ধুতি পাঞ্জাবী পরা রোগা পাতলা চেহারা, দুটো চোখে দুষ্টুমি ভরা হাসি, সব সময় খুব মজার মজার কথা বলতেন। খাইবার পাস আর বেলুচিস্থান নিয়ে তাঁর বিখ্যাত একটা গল্প ছিল। এক বিয়েবাড়ীতে এক নিমন্ত্রিত বরযাত্রী ভদ্রলোক খাবার ডাক পড়ায় তাড়াহুড়ো তে ভুল করে বাথরুমের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। একটি ফাজিল ছেলে তাকে ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে খাবার জায়গাটা দেখিয়ে দিয়ে বলে “এদিকে নয় স্যার, ওদিকে যান। এদিকটা হলো বেলুচিস্থান। ওদিকটা খাইবার পাস।”
ক্লাস ফাইভে ভূগোল পড়ানোর সময় মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে পাঞ্জা স্যার আমাদের বলেছিলেন “তোমরা বাড়িতে গিয়ে যখন মা’কে বলো, ‘মা, ভাত দাও’, তখন আর কিছু দিতে বলোনা কেননা ডাল তরকারী মাছ ওই সব খাবার ভাতের সাথেই আসে তোমরা জানো। ওদেশের ছেলেরা তাদের মা’দের কি বলে জানো?” আমরা কৌতূহলী হয়ে বলতাম, “কি বলে স্যার?” উনি হেসে বলতেন ওরা বলে “মা, খেজুর দাও!”
ঘটনাচক্রে আমি এখন এই মরুভূমির দেশেই থাকি। পাঞ্জা স্যারের ওই কথাটা এখনো ভুলিনি। খেজুর খাবার সময় ওঁর ওই কথাটা মনে পড়বেই। হাসি আর মজা করে বলা কথা এরকম মনে গেঁথে যায়।
খান স্যার আমাদের ইতিহাস পড়াতেন। সাধারণ দোহারা চেহারা, পরনে সাদা সার্ট আর ধুতি, কালো ফ্রেমের চশমার পিছনে উজ্জ্বল দুটো চোখ। ইতিহাস ছিল তাঁর passion । খান স্যার বড় ভালো পড়াতেন, আকবর, বীরবল, শিবাজী, আফজল খাঁ রা সবাই তাঁর পড়ানোর মধ্যে দিয়ে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠতেন। তিনি হলদিবাড়ী বা পানিপতের যুদ্ধের কথা পড়াবার সময় আমরা তলোয়ারের ঝনঝন আওয়াজ, আহত সৈনিকদের আর্তনাদ, ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাক যেন কানে শুনতে পেতাম। নিজেকে আমি মাঝে মাঝে নিজেকে সেই যুদ্ধের মধ্যে এক অনামী সৈনিক বলেও ভেবেছি। খান স্যারের সবই ভালো ছিল, কেবল মাঝে মাঝে হঠাৎ আমরা পড়ায় মনোযোগ দিচ্ছি কিনা পরীক্ষা করার জন্যে দুমদাম প্রশ্ন করে বসতেন। একটু অমনোযোগী হলেই আমরা ঠিক ওনার কাছে ধরা পড়ে যেতাম। তো একবার মনে পড়ে ক্লাসে বারো ভুইঁয়া দের সম্বন্ধে পড়াচ্ছেন খান স্যার। আমি সেদিন তৈরী হয়ে আসিনি, তাই খান স্যারের চোখের দিকে তাকাচ্ছি না, পাছে আমায় কোন প্রশ্ন করে বসেন। খান স্যার বুঝতে পেরে আমায় বললেন, “ইন্দ্রজিৎ, তুমি তো ভৌমিক, তাই না? তার মানে তুমি নিশ্চয় কোন বারো ভুঁইয়ার বংশধর। আচ্ছা, তুমি বলো তো…”
সব্বোনাশ!
যা ভয় পাচ্ছিলাম, তাই!
ভৌমিক হয়ে জন্মাবার জন্যে বেশ দুঃখ হয়েছিল সেদিন। ঘোষ বোস মিত্র বা মুখুজ্যে বাঁড়ূজ্যে হলেও এই বিপদে পড়তে হতোনা আমায়।
উঁচু ক্লাসে ওঠার পরে নতুন বিষয় নিয়ে পড়াতে এলেন নতুন শিক্ষকেরা। মিত্র স্যার পড়াতেন ফিজিক্স, সুহাস স্যার কেমিস্ট্রী আর ভট্টাচার্য্য স্যার অঙ্ক। বাংলা পড়াতেন অমল সান্যাল স্যার, ইংরেজী ফাদার ভেটিকাড। আমরা খুব ভাগ্যবান ছিলাম শিক্ষক হিসেবে এঁদের পেয়ে।
নিউটনের Laws of motion পড়ানো হচ্ছে, তৃতীয় Law – “Every action has an equal and opposite reaction” শিখে সবাই সবার পিঠে আচমকা কিল বসিয়ে দিচ্ছি। “কি রে আমায় মারলি কেন?” বললে উত্তর আসছে “আরে তোর পিঠও তো আমার হাতে সমান ভাবে মেরেছে!”
আর ছিল ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি ল্যাব।
ফিজিক্স ল্যাবে পেন্ডূলাম ব্যবহার করে acceleration due to gravity (g) বের করতে হতো, উত্তরটা তো জানা 981cm/square second তাই কিছুটা কারিকুরি করে ৯৮১ তে পৌঁছে যাওয়া কঠিন ছিলোনা। তবে লেন্সের focal length কিংবা কেমিসট্রী ল্যাবে সল্ট বের করা অত সহজ ছিলনা। কপার সালফেটের রং সবুজ, তাই সেটাই সব চেয়ে সহজে ধরে ফেলতাম।
অন্যান্য বিষয়ের সাথে Moral Science নামে একটা সাবজেক্ট পড়ানো হতো আমাদের তাতে খ্রীশ্চান (রোমান ক্যাথলিক) ধর্মের নানা বাণী আর বাইবেল (Old and new Testaments, Gospels) থেকে নানা গল্প পড়াতেন আমাদের বিদেশী সাহেব শিক্ষকেরা, যাদের Father নামে ডাকা হতো। এঁদের বেশীর ভাগই আসতেন ইউরোপ থেকে, এবং স্কুলের একটা বাড়ীতেই তাঁদের থাকার আর খাওয়ার বন্দোবস্ত হতো। এঁদের মধ্যে কিছু ভারতীয় ফাদারও ছিলেন, যেমন ফাদার পিন্টো, ফাদার ডি’সুজা, ফাদার ডি সিলভা, ইত্যাদি। এঁদের সবার পোষাক ছিল সাদা আলখাল্লা।
যীশু খ্রীষ্টের জীবন গুলে খেতে হয়েছে সেই সময়। Old Testament এর অনেক গল্প মনে আছে এখনো। Return of the Prodigal son, The Good Samaritan ইত্যাদি এই সব গল্প এখনো মনে পড়ে।
আর মনে পড়ে আমাদের কিছু সহপাঠীদের কথা যারা আবাসিক (বোর্ডার) ছিল। তাদের জন্যে স্কুলে আলাদা থাকা খাওয়ার জায়গা ছিল। প্রধানতঃ গ্রামের দু;স্থ প্রান্তিক পরিবারের ছেলেদের ক্রীশ্চান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে তাদের স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এদের বেশীর ভাগ ছেলের ক্রীশ্চান নাম ছিল, আর পদবী ছিল গোম্স্।
আমাদের এই আবাসিক সহপাঠীরা পড়াশোনায় তেমন ভাল না হলেও অনেকেই খেলা ধূলায় খুব ভাল ছিল। ক্লাস শেষ হলে বিকেলে তারা অনেকেই আমাদের সাথে ফুটবল খেলতো। তার পর সন্ধ্যার ঘ্ন্টা বাজলেই তারা তাদের হোস্টেলে ফিরে যেত। ক্রীশ্চান ধর্মের কঠোর অনুশাসনের মধ্যে তাদের রাখা হতো বলেই এখন মনে হয়। অল্প বয়েসে মা বাবা আর পরিবারের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়া আর অন্য ধর্ম্মে ধর্মান্তরিত হওয়া তাদের মনে কি প্রভাব ফেলেছিল তা জানিনা, তবে তারা কমবেশী সবাই চুপচাপ মাথা নীচু করেই থাকতো। খেলার মাঠে অবশ্য তাদের অন্য রূপ।
একবার অঘোর শীল্ডের ফাইনাল খেলা হচ্ছে ঢাকুরিয়া লেকে, ন্যাশনাল হাই স্কুলের বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে আমরা জিতেছিলাম, সেন্টার ফরোয়ার্ড সাইমন গোম্স্ একাই তিন গোল করে হ্যাটট্রিক করেছিল। আমি সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে খেলা দেখেছিলাম। কি যে আনন্দ হয়েছিল! আর রাইট আউটে দারুণ খেলেছিল ক্ল্যারেন্স রডরিগ্স্ (ডাক নাম বাচ্চা), ক্ষিপ্র গতিতে বল নিয়ে ডান দিক থেকে তার উঠে আসা এখনও পরিস্কার চোখে ভাসে।
আমাদের ক্লাসে বোর্ডার সহপাঠীদের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল গোম্স্, সুনীল গোম্স্ আর ক্লিফোর্ড রডরিগ্স্ এর চেহারা গুলো এখনো ভুলিনি। কোথায় কেমন আছে আমাদের এই সহপাঠীরা এখন, তা কেই বা জানে?
তাছাড়া মনে পড়ে আমাদের বেশ কিছু সহপাঠীদের, যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে চিরদিনের জন্যে। তারাও ফিরে এলো আমাদের সেদিনের স্মৃতিচারণে। তাদের মধ্যে আছে হিতেন চক্রবর্ত্তী, বিনোদ কোহলী, নারায়ণ কৃষ্ণান, আর ললিত মোহন নন্দা।
সেদিন স্কুলের পুরনো বন্ধুদের সাথে স্মৃতিরোমন্থন করতে করতে, পঞ্চাশের দশক যেন হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া যেন একটা অদৃশ্য জানলা খুলে মনের ভেতরে ঢুকে এলো।
আজকাল মাঝে মাঝে বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় স্কুল বিল্ডিং এর দিকে তাকিয়ে দেখি, বড় বড় জানলা, বিরাট বাড়ী, ভিতরে ক্লাস হচ্ছে, বাইরে সেই অর্জুন গাছগুলো পাতা ছড়িয়ে এখনো দাঁড়িয়ে। বহুদিন আগে আমি আর আমার এই সহপাঠীরা ওই ক্লাসরুমে বেঞ্চিতে বসতাম, বাইরে জানলা দিয়ে তাকালে অর্জুন গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যেত Army Camp এর স্কাইলাইন, স্যাররা পড়াতেন, ক্লাসে কোন আওয়াজ নেই, শুধু ফ্যান চলার শব্দ। আর টিফিনের ঘন্টা বাজলেই শুরু হতো ছুটোছুটি আর হুটোপাটি, কান ঝালাপালা করা আওয়াজ।
ক্লাস টু থেকে শুরু করে থ্রী ফোর, ফাইভ…। একটা করে বছর যায়, আমরা বড় হতে থাকি। প্রমোশন পেয়ে নতুন ক্লাসে উঠি, বছরের শুরুতে নতুন ক্লাসের বুক লিস্ট নিয়ে দোকান থেকে বই কিনে নিয়ে আসি। নতুন বইয়ের একটা আলাদা গন্ধ আছে, সেই সব নতুন বই পেয়ে সে কি উত্তেজনা আমাদের। কত নতুন কিছু শিখবো আমরা সামনের বছরে।
আমরা ভাল করে সেই বইদের মলাট দিয়ে ঢাকি। ভিতরে প্রথম পাতায় নিজেদের নাম লিখি। কেউ কেউ আবার ঠিকানাও লেখে। সেই ঠিকানা শুধু কলকাতা বা ভারতবর্ষের নয়। আমাদের কল্পনায় আমরা হলাম বিশ্বনাগরিক, মহাবিশ্বে আমাদের বাসস্থান।
Indrajit Bhowmick, Class 5, St Lawrence High School, 27,Ballygunje Circular Road, Kolkata 19, West Bengal, India, Asia, World, Solar System, Milky way, Universe – অনেকটা এই রকম।
বারোটা থেকে একটা এক ঘণ্টা লাঞ্চ ব্রেকের কিছুটা আগে থেকেই চিলরা আকাশে ভীড় করতো। ওদের sense of timing দেখে বেশ অবাক হতাম। আমার হাত থেকে বেশ কয়েকবার টিফিন কিছু বোঝার আগেই সোঁ করে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে চিল। কলকাতার আকাশ থেকে চিল এখন উধাও। তারা আর বোধ হয় আর টিফিন টাইমে স্কুলের আকাশে ভীড় করেনা।
আর এক ঘন্টা লাঞ্চ ব্রেকে প্রখর গ্রীষ্মেও মাঠে নেমে ফুটবল পেটাতাম আমরা, তার পর ঘেমে চুপচুপে হয়ে ভিজে ক্লাসে গিয়ে ক্লাসে বসতাম, ফ্যানের হাওয়ায় জামা শুকিয়ে যেত, এখন ভাবলে বেশ আশ্চর্য্য লাগে।
আর মনে পড়ে সকালে একা একা স্কুলে আসা আর বিকেলে স্কুল ছুটি হলে বন্ধুদের সাথে বাড়ী ফেরার কথা। তখন রিচি রোডের গেটটাই ব্যবহার করতাম আমরা। আমাদের স্কুল শুরু হতো সকাল দশটা চল্লিশে, তখন একা একাই হেঁটে আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ী থেকে ল্যান্সডাউন রোডে শিশুমঙ্গল হাসপাতাল ছাড়িয়ে হাজরা রোড ধরে ম্যাডক্স স্কোয়ার এর পাশ দিয়ে রিচি রোড ধরতাম। বিকেলে স্কুল ছুটি হতো বিকেল তিনটে বেজে চল্লিশ মিনিটে – বাড়ী ফেরার পথে সাথে কোন না কোন বন্ধু থাকতো।
কেমন ছিল আমাদের সেই পঞ্চাশ আর ষাটের দশকের কলকাতা?
বিকেলে হোসপাইপ দিয়ে জল দিয়ে রাস্তা ধুতো কর্পোরেশনের লোকেরা। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে আর দেয়ালে হোর্ডিং এ উত্তম সুচিত্রা রাজ কাপুর নার্গিস দিলীপ কুমার বৈজয়ন্তীমালা, দেব আনন্দ্ মধুবালাদের ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো থাকতো। মাইকে ভেসে আসতো তখনকার সময়ের জনপ্রিয় ফিল্মী হিন্দী আর বাংলা গান। রাস্তা দিয়ে রাজহাঁসের মত রাজকীয় চালে চলে যেতো ডাউস ঢাউস ঢাউস বিদেশী গাড়ী – শেভ্রোলে স্টুডিবেকার, প্লাইমাউথ, ডজ্, ইমপালা, অস্টিন, হিলম্যান, আর সাথে আমাদের দেশী গাড়ী – ল্যান্ডমাস্টার, ফিয়াট, স্ট্যান্ডার্ড হেরল্ড। আর ছিল লাল রং এর 2, 2B 8B আর দশ নম্বর দোতলা বাস। টুং টুং করে ঘন্টা বাজিয়ে পাশ দিয়ে যেতো হাতে টানা রিক্সা।
স্কুল ছুটির পরে বাড়ী ফেরার সময় বন্ধুদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে কত কথাই না হতো আমাদের। ফিল্ম, সাহিত্য, সিনেমা খেলাধূলা নিয়ে। ষাটের দশকে আমাদের বয়ঃসন্ধির বয়েস, রাস্তা ঘাটে সুন্দরী মেয়েদের দিকে আড়চোখে তাকাই, দেশ পত্রিকায় বড়দের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস শুরু হয়েছে। দেশে ধারাবাহিক বেরোচ্ছে অচিন্ত্য সেনগুপ্তর প্রথম কদম ফুল কিংবা নরেন্দ্রনাথ মিত্রের সূর্য্যসাক্ষী। সেই সব প্রেমের উপন্যাস নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমাদের উত্তেজিত আলোচনা চলে।
তাছাড়া আছে ময়দানে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের লীগ আর আই এফ এ শীল্ডের খেলা, আর ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হল গিলক্রিষ্টের ফাস্ট বোলিং। রেডিওতে কমলদা’ অজয় বসু পিয়ারসন সুরিটার কমেন্টারী, শনি রবিবার দুপুরে অনুরোধের আসর, আর শুক্রবার রাত ন’টায় নাটক।
প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার আমাদের সাপ্তাহিক পরীক্ষা থাকতো, এবং সেই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যে আগের দিন অর্থাৎ বৃহষ্পতিবার থাকতো আমাদের সাপ্তাহিক ছুটি। রবিবার নিয়ে আমাদের সপ্তাহে দুই দিন ছুটি ছিল। আর শুক্রবার পরীক্ষা হয়ে যাবার পরে রাত্রে রেডিওর সামনে বসে রাত ন’টার নাটক শুনতে কি যে ভাল লাগতো।
স্কুল থেকে বছরের প্রথমে আমাদের সবাইকে একটা বাৎসরিক ক্যালেন্ডার দেওয়া হতো, তাতে থাকতো বারো মাসের নানা ছুটি্র দিন এবং অন্যান্য নানা খবর। জেসুইট সাহেবরা স্কুল চালাতেন, তাই অনেক ক্রীশ্চান উৎসবের ছুটিও থাকতো – Good Friday, Easter ছাড়াও Ignatious Loyola’s birthday, St Patrick’s day ইত্যাদি। এছাড়া গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, বড়দিনের ছুটি।
কি অনবদ্য ছিল আমাদের সেই শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলো, যা আমরা বন্ধুদের সাথে কাটিয়েছি একসাথে, গভীর অন্তরঙ্গতায় কাটানো সেই দিনগুলোর নানা স্মৃতি ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ধরে আছে আমাদের।
আড্ডা হাসি ঠাট্টা স্মৃতি চারণে দীপঙ্করের বড় হলঘর গমগম করছে। প্রচুর ছবিও তোলা হচ্ছে এদিক ওদিক।
দেরী হয়ে যাচ্ছে, এবার ডিনার শুরু করা যাক, বলল প্রবীর। ততক্ষণে বেশ কয়েক বার আমার গ্লাস ভরে দিয়ে গেছে দীপঙ্কর, মাথাটা বেশ টলমল করছে, পুরনো বন্ধুদের সাথে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চারিপাশ টা বেশ রঙ্গীন লাগছে, মন বেশ হাল্কা, যাকে বলে উড়ুউড়ু।
ডিনার এর আয়োজন খুব পরিপাটি, নিখুঁত মেনু। প্রবীরের কেটারার (গুঁই কেটারার্স) এর লোকেরা (তারা সবাই আবার ইউনিফর্ম পরা) দীপঙ্করের ডাইনিং টেবিলে তাদের খাবারদাবার সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে, পাশের ঘরে মেয়েদের বসার বন্দোবস্ত। সব পদই খুব সুস্বাদু, মুখরোচক। শেষপাতে মিস্টি। রাবড়ী আর সন্দেশ। বেশ জমে গেল।
খাবার পালা শেষ হতেই যাবার পালা শুরু। প্রায় এগারোটা বাজে, বেশ রাত হয়েছে, এক এক করে সবাই উঠতে শুরু করলো। আমরা কয়েকজন যারা রইলাম তারা দীপঙ্করের বারান্দায় গিয়ে আবার কিছু গ্রুপ ফটো তুললাম, সবাই সবার কাঁধে হাত রেখে। কেউ সামনে বসে কেউ পিছনে দাঁড়িয়ে।
বাইরে রাত গভীর হচ্ছে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শেষ বারের মতো গল্প করে নিলাম আমরা ক’জন। আবার কবে দেখা হবে, আদৌ হবে কিনা, তা না জেনে।
আবার সামনের বছর দেখা হবে কি? কে জানে? বন্ধুদের সবার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সেই প্রশ্নটা মনে এলো। নাকি আমরা আবার যে যার নিজের বৃত্তে ফিরে যাবো, আমাদের মধ্যে আবার ফিরে আসবে সেই আগেকার দূরত্ব?
না,না তা কি করে হয়? আজকের এই ইন্টারনেট, ইমেল আর ফেসবুকের যুগে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ এত সহজ হয়ে উঠেছে, এখন একবার পুরনো বন্ধুদের খুঁজে পেয়ে আর কি হারানো সম্ভব? আশা করব আমরা এবার থেকে প্রতি বছর একসাথে জড়ো হব, আমাদের সেই বাৎসরিক মিলন উৎসবে এবার যারা আসতে পারেনি, তারাও যোগ দেবে। ক্রমশঃ সেই সব হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের এক এক করে আমরা আমাদের মধ্যে ফিরে পাবো।
২০২৫ সালে এই লেখা যখন লিখছি, তখন সেই ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল বারো বছর জানুয়ারীর প্রথমে দীপঙ্করের বাড়ীতে আমাদের বন্ধুদের এই বার্ষিক রিইউনিয়ন প্রতি বছর নিয়মিত হয়ে এসেছে।
২০১৪ সালের পর থেকে নতুন অনেকে পরের বছর গুলোতে আমাদের অনেক প্রবাসী সহপাঠী তাদের সুবিধা মতো এই পুনর্মিলন সভায় যোগ দিয়েছে। তাদের মধ্যে আছে হায়দ্রাবাদ থেকে চৈতন্যময় (গাঙ্গুলী), সিঙ্গাপুর থেকে দেবব্রত (ব্যানার্জ্জী), USA থেকে সুভাষ (চন্দ্র বোস) আর কিশোর (আচার্য্য), কুয়েত থেকে সিদ্ধার্থ (ভট্টাচার্য্য), কলকাতা থেকে জয়ন্ত দে।
কিন্তু এই বারো বছরে আমরা হারিয়েছি আরো বেশ কিছু সহপাঠীকে। ২০১৪ সালেই চলে গেছে অজয় নাথ রায় আর রবীন নাগ। তার পরে এক এক করে চলে গেছে সুভাষ মাধব বোস, প্রদীপ সোম, প্রদীপ মিত্র আর বিপ্লব রায়।
ভগবানের কাছে তাদের সবার আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি।
ষাটের দশকে আমাদের ছোটবেলায় শঙ্করীপ্রসাদ বসু ক্রিকেট খেলার বর্ণময় ইতিহাস নিয়ে “ইডেনে শীতের দুপুর” নামে একটা বই লিখেছিলেন। তোমাদের মধ্যে যারা আমার সমবয়সী এবং ক্রিকেট নিয়ে তখন যাদের উৎসাহ ছিল তাদের সেই বইটির কথা মনে আছে নিশ্চয়। এই লেখাটির নাম সেই বই থেকে ধার করা।
কুয়েতের বন্ধুদের সাথে সেই আশির দশক থেকে বন্ধত্ব। সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত এর ভেতর দিয়ে আমদের একসাথে পথচলা। এখন সবাই কাজ থেকে অবসর নিয়ে কুয়েত থেকে ফিরে এসেছি। আমাদের মধ্যে যারা কলকাতায় এসে থিতু হয়েছি তারা মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে আড্ডা জমাই। বা একসাথে কলকাতার কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে চলে যাই।
এই লেখাটা আমাদের বন্ধুদের কোলাঘাট বেড়ানো নিয়ে।
——————————————–
কাজ থেকে অবসর নেবার পরে এখন আমাদের জীবন বেশ আনন্দের, রোজই ছুটি, যখন যেখানে খুসী চলে যাই, উইকএন্ডের সন্ধ্যায় আবার কাল সকালে কাজে যেতে হবে বলে মন খারাপ হয়না। এখন সপ্তাহের প্রতিদিনই উইকএন্ড। কিন্তু কোভিডের অতিমারীতে ২০২০ সালটা প্রায় পুরোটাই বাড়ীতে বন্দী হয়ে কেটেছে।
২০২১ সালের জানুয়ারী মাসে – তখন কোভিডের প্রকোপ কিছুটা কমেছে, ভ্যাক্সিন আসার কথা শোনা যাচ্ছে – আমরা কুয়েতের বন্ধুরা দুচ্ছাই আর পারা যাচ্ছেনা বলে দু’দিনের জন্যে কলকাতা থেকে বাস ভাড়া করে কোলাঘাট ঘুরে এলাম।
কলকাতা থেকে কোলাঘাট ঘন্টা দুয়েকের পথ, বেশ চওড়া পরিস্কার রাস্তা। সকাল সকাল বেরিয়ে বেলা বারোটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম।
আমাদের হোটেলের নাম সোনার বাংলা। রূপনারায়ণ নদীর ধারে। সুন্দর বাগান, সেখানে এই জানুয়ারীর শীতে ফুলের মেলা। আর সোনালী রোদ। আমাদের সবার গায়ে গরম জামা, মনের ভিতরে উষ্ণতা ।
বেলা একটা নাগাদ পোঁছে ইলিশ মাছের নানা পদ দিয়ে তৈরী উপাদেয় লাঞ্চ সেরে বাগানে চেয়ার টেনে গোল হয়ে বসে আমাদের আড্ডা শুরু হলো।
সারা দুপুর আর সন্ধ্যা পর্য্যন্ত চললো আমাদের অন্তহীন আড্ডা। অনেক দিন পরে একসাথে হয়েছি আমরা – তাই আমাদের গল্প আর ফুরোতে চায়না। এক এক জন এক একটা গল্প বলে আর বাকি আমরা সবাই হো হো করে হাসিতে লুটিয়ে পড়ি।
গল্পে গল্পে কি করে যে সময়টা কেটে গেল বুঝতেই পারলামনা। রেস্টুরেন্ট থেকে আমাদের টেবিলে চা দিয়ে গেল। ক্রমশঃ সন্ধ্যা নামলো। নদীর ওপারে সুর্য্যাস্ত হলো, কুয়াশার স্তর নেমে এলো নদীর জলের ওপর। বেশ মায়াবী দৃশ্য।
আমাদের আড্ডায় অনেক মজার মজার গল্প বললো সবাই। সব গল্পই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তুলে আনা।
সেদিনের কিছু গল্প এই সাথে।
১ – সুভদ্রার গল্প – পুলি পিঠে
কুয়েতে সুভদ্রা ALICO তে লাইফ ইন্সুরেন্স বিক্রী করতো আর তার খদ্দেরদের কাছে যাবার জন্যে সে তার সাধের বিশাল Mitsubishi Pajero (SUV) গাড়ী চড়ে সারা কুয়েত শহর চষে বেড়াতো।
তার গাড়ীর গ্যারেজ ছিলো Sharq এ Fisheries বিল্ডিং এর উল্টোদিকে। গাড়ীতে কোন গন্ডগোল হলে সে নিজেই সেখানে গাড়ী নিয়ে চলে যেতো। সেই গ্যারেজের মেকানিকরা সবাই ভারতীয়। তাদের যে লীডার তার নাম মওলা, সে অন্ধ্রের লোক। ভাঙা ভাঙা হিন্দী তে কথা বলে।
তো একবার সুভদ্রার গাড়ীর ফ্যান বেল্ট ছিঁড়ে খুলে গেছে। আমি সুভদ্রা কে বললাম পুলি থেকে বেল্টটা খুলে গেছে, মওলা কে বললেই ও বুঝে যাবে।
সুভদ্রা ফ্যান বেল্ট কথাটা ভুলে গেছে, তার শুধু মনে আছে পুলি।
সে গ্যারেজে গিয়ে মওলা কে বললো “দেখো তো পিঠে মে কুছ হুয়া…”
পিঠে?
মওলা তো অবাক!
“পিঠে কেয়া হ্যায় ম্যাডাম?”
তারপর গাড়ীর বনেট খুলে অবশ্য মওলা বুঝে যায় প্রবলেমটা কি।
আমার বন্ধু সিদ্ধার্থর মেজমাসীর একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল, luck ও বলা যায়, তাঁর সাথে celebrity দের পথে ঘাটে দেখা হয়ে যেত। এবং তাদের সাথে দেখা হলেই চেনা নেই শোনা নেই তবু মেজমাসী খুব smartly তাদের সাথে গিয়ে আলাপ জুড়ে দিতে পারতেন। এবং আলাপ করে বাড়ি এসেই তিনি তাঁর বোনদের সবাই কে ফোন করে বলতেন কার সাথে দেখা হল, তিনি কাকে কি বললেন, তারা কি বললো ইত্যাদি।
একবার নিউ মার্কেটে মাধবী মুখার্জ্জীর সাথে মেজমাসীর দেখা। মেজমাসী বললেন এ কী মাধবী, তোমার মুখটা এত শুকনো লাগছে কেন? শরীর খারাপ নাকি? মাধবী একটু সংকোচের সাথে বললেন আমি তো মাসীমা আপনাকে ঠিক…
মেজমাসী বললেন আমায় চিনতে পারছোনা তো? কি করে চিনবে? তুমি তো আমায় কোনদিন দ্যাখোইনি।
এই নিয়ে মাসীমা মানে সিদ্ধার্থর মা’র একটা inferiority complex ছিল, কেননা তাঁর সাথে কোনদিন কোন celebrity র দেখা হয়না।
তো একবার মাসীমা ছেলের কাছে কুয়েতে বেড়াতে এসেছেন। মাস তিনেক থাকার পরে সিদ্ধার্থ তাঁকে নিয়ে কলকাতা যাচ্ছে। দুবাই তে Stop over, সেখানে সিদ্ধার্থ দ্যাখে মৃণাল সেন লাউঞ্জে একটু দূরে বসে আছেন। মাসীমাও দেখেছেন।
সিদ্ধার্থ মাসীমাকে বলল মা আমি একটু বাথরুমে যাচ্ছি, তুমি কিন্তু একদম ওনার সাথে গিয়ে কথা বলবেনা।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে সিদ্ধার্থ দ্যাখে যা ভয় পেয়েছিল তাই, মাসীমা মৃণাল বাবুর পাশে বসে দিব্বি আলাপ করে যাচ্ছেন। সিদ্ধার্থ কাছে আসতে মাসীমা বললেন এই হল আমার ছেলে, কুয়েতে থাকে। মৃণাল বাবু বেশ গপ্পে লোক, তিনি বললেন আমিও কুয়েতে গিয়েছিলাম একবার বেশ কিছুদিন আগে…
দমদম থেকে যাদবপুরে বাড়িতে ঢুকেই মাসীমার ফোন মেজমাসীকে।
মেজদি, জানিস আজ কার সাথে দেখা হলো?
ঋত্বিক ঘটক!
৩ – টিঙ্কুর গল্প
টিঙ্কু আর দেবাশীষ কলকাতায় ফিরে আসার পর, তাদের ড্রাইভার সুভাষ ওদের প্রায় বাড়ীর লোক হয়ে গেছে। গাড়ী চালানো ছাড়া সে ওদের বাজার দোকান ইত্যাদি অনেক কাজ হাসিমুখে করে দেয়। সে একাধারে বিশ্বাসী আর করিতকর্ম্মা ছেলে।
তো একদিন টিঙ্কু সুভাষ কে বললো, “আমার জন্যে বারোটা বারোটা করে দুই গোছা চব্বিশটা রজনীগন্ধা নিয়ে আসিস তো। কাটতে হবেনা, আমি কেটে নেবো।”
কিছুক্ষণ পরে সুভাষ রজনীগন্ধা নিয়ে এসে হাজির। টিঙ্কু বলল, “নিয়ে এসেছিস, ঠিক আছে ফ্রিজে রেখে দে।”
বিকেলে টিঙ্কু ফ্রিজ খুলে কোথাও ফুল না দেখে সুভাষ কে বললো, “কি রে রজনীগন্ধা কোথায় রাখলি? ফ্রিজে তো দেখছিনা?”
“কেন, ওখানেই তো আছে”, বলে সুভাষ দুই তাড়া রজনীগন্ধা পান মসালার প্যাকেট নিয়ে এসে টিঙ্কু কে দিলো!
টিঙ্কুর তো তাই দেখে চক্ষু চড়কগাছ!
টিঙ্কুর বকুনী খেয়ে সুভাষ বলেছিল, “তাই দোকানের লোকটা বলছিল এগুলো তো এক প্যাকেটে দশটা করে থাকে, বারোটা তো হবেনা, দুটো আলাদা নিয়ে যান!”
সত্যি পান মসালার নাম রজনীগন্ধা হলে সুভাষ কি করবে?
কিন্তু টিঙ্কুরই বা কি দোষ?
৪) কোলাঘাট থেকে ফেরার পথে কোভিডের টেস্ট
পরের দিন কোলাঘাট থেকে কলকাতা ফেরার পথে এক জায়গায় গাড়ী দাঁড় করিয়ে রাস্তার পাশে একটা হোটেলে আমরা লাঞ্চ খেতে ঢুকলাম। প্রসূণ বললো, “তোমরা যাও আমি একটু টয়লেট হয়ে আসছি।”
একটু পরে ফিরে প্রসূণ ফিরে এলো, তার মুখের ওপর একটা রুমাল। সে বললো “আমার কোভিড হয়নি। ”
আমরা বললাম, “কি করে জানলে?”
প্রসূণ বললো “বাথরুমে একটা কোভিড টেস্ট দিয়ে এলাম। সব গন্ধই নাকে পেয়েছি। নিশ্চিন্ত।“
জয়পদ আর বিজয়পদ এই দু’জন যমজ ভাই ছিল identical twins – দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ক্যানিং এর কাছে কোন এক অখ্যাত প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আমাদের পরিবারে কাজের লোক হিসেবে যখন তারা আসে তখন তাদের অল্প বয়েস। দু’জনে একেবারে এক রকম দেখতে, দু’জনেরি গায়ের রং কুচকুচে কালো, কথাবার্ত্তাও দু’জনে গ্রামের ভাষায় একই ভাবে বলে। দু’জনেই স্বাস্থ্যবান আর কর্মঠ, বাড়ীর কাজে তারা দু’জন – প্রথমে বিজয় ও সে কাজ ছেড়ে দেবার পরে জয় – বহাল হয়ে গেল সহজেই। ওরা আমারই বয়সী ছিল, হয়তো আমার থেকে সামান্য বড়োও হতে পারে।
আমাদের বাড়ীতে ছোটবেলা থেকেই সংসারে ঠিকে এবং দিন রাতের লোকেদের কাজ করতে দেখেছি। আমরা স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করে কত কিছু জানবো শিখবো, আর জয় বিজয় আমাদের সমবয়সী হলেও ওরা বাড়ীতে ফাইফরমাস খাটবে, আমাদের সাথে ওদের এই পার্থক্য, এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু আমাদের চোখে পড়েনি।
গ্রাম আর শহর, শিক্ষিত আর অশিক্ষিত, ভদ্রলোক আর অন্ত্যজ – আমাদের সমাজের মধ্যে এই যে একটা পরিস্কার শ্রেণীবিভাজনরেখা রয়েছে, সমাজের নিয়ম হিসেবেই আমরা তা মেনে নিয়েছি। হয়তো ওই প্রান্তিক খেটে খাওয়া সমাজের নীচের তলার মানুষেরাও সেই নিয়ম মেনে নিয়েছিল।
এটা এখন ভাবলে বেশ খারাপ লাগে।
তবে এটাও ঠিক যে ছোটবেলায় আমাদের ভাই বোনদের মনে ওই কাজের লোকদের প্রতি কোন নাক উঁচু মনোভাব ছিলনা। আমাদের বাড়ীর পরিবেশে কাজের লোকেরা থাকতো বাড়ীর লোকের মতোই। আর যেহেতু ওই দুই ভাইয়ের চমৎকার হাসিখুসী স্বভাব ছিল তাই অল্পদিনের মধ্যেই ওরা আমাদের বাড়ীর লোকের মত হয়ে যায়।
ইদানীং আমাদের দেশে খুব ধীরে হলেও ক্রমশঃ সমাজের নীচের স্তরের প্রান্তিক মানুষদের কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর প্রযুক্তি পৌঁছে যাচ্ছে। এখন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে পাকা বাড়ী, শৌচালয়, জল বিদ্যুৎ ইন্টারনেট মোবাইল ফোন ইত্যাদি সবই সহজলভ্য। একদা পিছিয়ে পড়া গ্রামের দলিত আদিবাসী লোকেরাও তাদের জীবনকে একটু একটু করে নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাবার সু্যোগ পাচ্ছে।
সম্প্রতি বিজয়ের গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে তার পরিবারের সাথে একটা দিন কাটাবার সুযোগ হয়েছিল। সেইদিন বিজয় কে দেখে দেশের সেই সামাজিক পরিবর্ত্তনের একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হলো আমাদের। যা ছিল একসাথে কৌতূহলোদ্দীপক এবং আনন্দদায়ক।
এই লেখাটা সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে।
২ মান্টুদা, মুখ থেইকে মাক্সোটা খুইলে ফেলো
জয়পদ আর বিজয়পদ দুই ভাই আমাদের বাড়ীর কাজ ছেড়ে দেবার পর ওদের সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিলনা। তবে ছোটমা অনেক চেষ্টা করে নানা জায়গায় তদবির করে বিজয় কে স্টেট ব্যাঙ্ক আর জয় কে FCI তে চাকরী করে দিয়েছিলেন। সরকারী চাকরী পেয়ে তাদের দুজনের জীবনেই অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছিল, অনেক দিন কাজ করার পরে ভাল পেনশন ইত্যাদি পেয়ে তাদের গ্রামের জীবনযাত্রা আমূল পালটে যায়।
সেই জন্যে ছোটমা’র প্রতি দুই ভাইয়ের মনে একটা কৃতজ্ঞতা বোধ ছিল, তাই আমাদের বাড়ীতে কাজের লোক না হলেও আমাদের পরিবারের সাথে এই দুই ভাইয়ের একটা যোগাযোগ থেকেই যায়। আমাদের নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ওরা আসতো, না বলতেই নিজে থেকে নানা কাজ করে দিত। তাদের গ্রামের বাড়ী থেকে তরীতরকারী ফলমূল ইত্যাদি এনে দিতো।
তারপরে তো অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে প্রধানতঃ খোকনের কাছ থেকে শুনতাম বিজয় এখন একজন সম্পন্ন গৃহস্থ, স্ত্রী ছেলে পুত্রবধূ নিয়ে বারুইপুরের কাছে এক গ্রামে তার বিরাট সংসার। তার আমন্ত্রণে ওদের গ্রামের বাড়ীতে ওরা মাঝে মাঝে যায়, আর গেলে বিজয় আর তার পরিবার তাদের নিয়ে কি করবে ভেবে পায়না, তাদের আদর যত্ন আর আতিথেয়তা পেয়ে খোকনরা আপ্লুত। ছোটমা বেশ কয়েক বার ওদের বাড়ীতে অতিথি হিসেবেও থেকে এসেছেন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষে লকডাউন এর প্রভাব যখন একটু কমেছে, শীত তখনো বিদায় নেয়নি, আমরা ভাই বোনেরা ভাবছি কোথাও সবাই মিলে একসাথে বেড়িয়ে আসবো, তখন খোকন একদিন বললো বিজয় বার বার বলছে ওদের বাড়ী আসতে, ওদের গ্রামটা দেখে আসবি নাকি?
আসবো তো বটেই, এরকম লোভনীয় প্রস্তাব কেউ ছাড়ে নাকি? আমরা এক কথায় রাজী। টুবলি কলকাতা এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে, সেও আমাদের সাথে যোগ দিতে চায়।
বুধবার ফেব্রুয়ারীর ষোল তারিখ যাওয়া ঠিক হলো।
কথামতো সেদিন সকাল দশটা নাগাদ একটা বড় Mahindra Scorpio SUV গাড়ী নিয়ে আমরা রওনা হলাম। পথে গড়িয়া থেকে খোকন মিঠু আর টুবলিকে তুলে নেওয়া হলো। টুবলি সল্ট লেকে ওদের বাড়ী থেকে Uber নিয়ে গড়িয়া চলে এসেছে।
গড়িয়া থেকে বাইপাস ধরে নরেন্দ্রপুর সোনারপুর ছাড়িয়ে আমরা বারুইপুরের দিকে এগোলাম। কলকাতা শহরের এই দক্ষিণ প্রান্তে বাইপাসের ধারে কত উঁচু উঁচু বাড়ী আর Housing complex ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে, দেখে অবাক হতে হয়।
বারুইপুর শহরটা বেশ বড়, শহরের প্রধান রাস্তার দুই দিকে দোকান, জমজমাট ভীড়। ছোটকাকা কাজ থেকে অবসর নেবার পরে এখানে একটা জমি কিনে বাড়ী করে বেশ কয়েক বছর ছিলেন। টুবলির তাই জায়গাটা চেনা। “বিয়ের পরে কলকাতা থেকে মা বাবার কাছে আসলে ট্রেণ থেকে নেমে এই স্টেশন রোড থেকে রিক্সা নিয়ে আমি বাড়ী যেতাম”, কিছুটা স্মৃতিমেদুর হয়ে বললো সে।
বারুইপুর থেকে বিজয়দের গ্রাম আরো প্রায় মিনিট পনেরোর রাস্তা, বিজয় বলে দিয়েছিল বন্ধন ব্যাঙ্ক এর পরে একটা রাস্তা ডান দিকে গ্রামের ভিতরে চলে গেছে, সেখানে পৌঁছে ওকে একটা ফোন করতে।
শহর কলকাতা ক্রমশঃ তার থাবা বাড়াচ্ছে কলকাতার উপকণ্ঠে।
বন্ধন ব্যাঙ্ক চোখে পড়তেই বিজয়ের নির্দ্দেশ অনুযায়ী আমরা বড় রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে তার গ্রামের সরু রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। আর ঢুকেই পল্লীগ্রামের পরিবেশ চোখে পড়লো। দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত, চারিদিকে প্রচুর গাছ পালা, তার মাঝে কিছু মাটির আর পাকা বাড়ী। সরু কিন্তু পাকা সিমেন্টের রাস্তা, আমাদের গাড়ীটা পুরো রাস্তা জুড়ে যাচ্ছে, উল্টো দিক থেকে কোন গাড়ী এলে কি হবে কে জানে, তার ওপরে মাঝে মাঝে রাস্তার একেবারে পাশে পুকুর, একটু এদিক ওদিক হলেই গাড়ীশুদ্ধ জলে।
ঝুনকু আর খোকন এখানে বেশ কয়েকবার এসেছে, তাই জায়গাটার সাথে তারা পরিচিত। তাছাড়া বিজয় তার বাড়ী থেকে বেরিয়ে আমাদের জন্যে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক দিন পরে তাকে দেখলাম। বেশ রোগা হয়ে গেছে বিজয়, একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে দেখলাম, খোকনের প্রশ্নের উত্তরে বলল কোমরে ব্যথা, ডাক্তার দেখিয়েছে। আমায় অনেকদিন পরে দেখছে বিজয় কিন্তু তার ব্যবহারে তা বোঝার জো নেই। আন্তরিক ভাবে সে আমার হাত ধরে আমায় তার বাড়ীর ভিতরে নিয়ে গেল।
“এখেনে কেউ মাক্স পরেনা মান্টুদা, মুখ থেইকে মাক্স টা খুইলে ফেলো”, বেশ ভারিক্কী চালেই আমায় বললো বিজয়।
তার কথায় একটা অধিকারবোধ আর শাসনের ভাব ছিল যেটা খুব উপভোগ করেছিলাম সেদিন। এত বছর পরে দেখা, আমি তো তার কাছে বলতে গেলে একজন অজানা অচেনা লোক। কিন্তু কত সহজে সে আমায় আত্মীয়ের মতো আপন করে নিলো একেবারে প্রথম থেকেই, তা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার প্রতি তার ব্যবহারে কোন জড়তা ছিলনা।
৩ – বিজয়ের গ্রাম, বাড়ী আর সংসার
আগে মাটির বাড়ীতে থাকতো বিজয়রা, এখন বিজয় তার নিজের পাকা বাড়ী বানিয়েছে, উঠোনের দেয়ালে তার বাবা আর তার নাম বেশ স্টাইল করে সিমেন্ট দিয়ে লেখা।
স্বর্গীয় ঋতুরাম সর্দ্দার – বিজয়পদ সর্দ্দার
উঠোনের এক দিকে রান্নাঘর, সেখানে একটি অল্পবয়েসী মেয়ে আমাদের দেখে লাজুক হাসলো। বিজয় আলাপ করিয়ে দিয়ে বললো, “সকাল থেকে বৌমা তোমাদের জন্যে রান্না করতি লেগেছে”। বৌটির গায়ে গায়ে ঘুরছে তার দুই ছেলেমেয়ে, বিজয়ের নাতি অঙ্কিত আর নাতনী অদ্বিতীয়া। তারাও তাদের মা’র মত বেশ চুপচাপ। বিজয়ের বৌ প্রভা বাড়ী নেই, শুনলাম সে গেছে তাদের পুকুর ঘাটে, বাড়ীর পাশেই রাস্তার ওপারে বিজয়দের নিজের পুকুর।
আমি সুভদ্রা আর টুবলি এই প্রথম বিজয়ের বাড়ী এসেছি, সে আমাদের বাড়ীটা ঘুরিয়ে দেখালো। প্রচ্ছন্ন গর্ব মেশানো বিনয়ের সাথে সে আমাদের জানালো যে তার বাড়ীতে টি ভি, এ সি, ওয়াই ফাই, ব্রড ব্যান্ড ইন্টারনেট, বেশ কিছু মোবাইল ফোন – এ সমস্ত কিছুই আছে। আর আছে আধুনিক বাথরুম সেখানে কমোডের ও ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ আমাদের শহুরে বাড়ীতে যা কিছু আছে সবই আছে তার এই গ্রামের বাড়ীতেও। দিদি আর বৌদিদের তাই কোন অসুবিধেই হবেনা এখানে।
দোতলা বাড়ী, তিনতলায় ছাত। দোতলায় দুটো শোবার ঘর, আর আছে একটা খোলা ছাদ, সেখানে পরে ঘর উঠবে হয়তো। বিজয় আর অঙ্কিত দু’জনে মিলে সেই ছাতে আমাদের বসার জন্যে কিছু চেয়ার এনে দিলো।
তিন তলার ছাতে ওঠার পথে পূজোর ঘর। সেটা ছাড়িয়ে ওপরের ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রথমেই দেখলাম সারা ছাতে শুকোনোর জন্যে ছড়ানো আছে প্রচুর ধান। সন্তর্পনে সেই ধান কাটিয়ে পাঁচিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নীচে তাকিয়ে দেখি চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে পল্লীগ্রাম তার যাবতীয় সৌন্দর্য্য নিয়ে। যতদূর চোখ যায় শুধু অবারিত সবুজ ধানক্ষেত। কচি ধানের চারার তলায় জমে আছে জল, আর রোদ পড়ে সেই জল চিকচিক করছে।
আমার শহুরে চোখে এই দৃশ্য খুব মায়াবী লাগলো, আর অবধারিত ভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনগুলো মনে পড়ে গেল।
বিজয় বললো “ওই যে ক্ষেতটা দেখতিছো, ওটা সবটাই আমার। প্রায় কুড়ি বিঘা জমি।”
“কে চাষ করে, তুমি লোক রেখেছো?”
বিজয় বলল, “চাষ করার জন্যি লোক আছে, আমি নিজেও কাজে লাগি।” এই বয়সেও বিজয় খুব কর্মঠ।
আমরা ভাইবোনেরা কিছুক্ষন দোতলার ছাতে চেয়ারে বসে গল্প করলাম, বিজয় আমাদের জন্যে ডাবের জল নিয়ে এলো। তারপর খোকন আর আমি বিজয়ের সাথে গেলাম গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে। গ্রামের নাম চয়নী মাঝেরহাট। ঘুরে ঘুরে এঁকে বেঁকে সরু সিমেন্টের রাস্তা চলে গেছে গ্রামের মধ্যে দিয়ে। মাঝে মাঝে পুকুর, সেখানে ঘাটে বেশ কিছু লোক গা ডুবিয়ে স্নান করছে, আর কোথাও ঘাটের সিঁড়িতে বসে কাজে ব্যস্ত কিছু মেয়ে। আমাদের মত অচেনা শহুরে মানুষদের দেখে তারা মাথায় ঘোমটা দিলো।
সত্যেন দত্তের সেই পালকীর গানের লাইনগুলো মনে এলো তাদের দেখে।
এঁটো হাতে হাতের পোঁছায়, গায়ে মাথার কাপড় গোছায়/হুন হুনা, হুনহুনা/
পথে জয়পদর বাড়ী পড়লো। জয় হলো বিজয়ের যমজ ভাই। ওরা Identical twins, কম বয়েসে ওদের অবিকল এক চেহারা ছিল। পাশাপাশি রাখলে কে যে কে চেনা প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন অবশ্য চেহারা অনেক আলাদা হয়ে গেছে দু’জনের। বিজয় কাজ ছেড়ে দেবার পরে তার দুই ভাই জয়পদ আর চিন্তামণি আমাদের বাড়ীতে কাজ করেছে কিছুদিন।
দেখা গেল জয়পদ বাড়ী নেই, পুকুরে স্নান করতে গেছে। তো বিজয় আমাদের নিয়ে চলে গেল সেই পুকুরঘাটে। জয় আর চিন্তামণি দুজনেই আমাদের দেখে খুব খুসী। পুকুর ধারে রাস্তার ওপরেই অনেক কথা হলো তিন ভাইয়ের সাথে। মনোহরপুকুরের বাড়ীর সেই পুরনো দিনগুলো নিয়েই স্মৃতিরোমন্থন হলো। বিশেষ করে তাদের মনে আছে মেজমা আর সেজমার (জ্যেঠিমা আর আমার মা) কথা। জ্যেঠিমা সম্বন্ধে বিজয়ের সহাস্য মন্তব্য – “বড়মা খুব ভালবাসতো আমাদের, কিন্তু মাঝে মাঝে বড় গরম হই যেতো” শুনে বাকি দুই ভাইও হেসে তাদের সোৎসাহী সমর্থন জানালো।
তিন ভাই এর সাথে আমি আর খোকন ওই পুকুর পাড়ে গ্রুপ ফটো তুললাম।
তার পরে বাড়ী ফেরার পথে তার নিজের পুকুর দেখাতে নিয়ে গেল বিজয়, সেখানে বিজয়ের বৌ প্রভা তখন তার কাজ সেরে বেশ কিছু বাসন হাতে বাড়ী ফিরছে। আমাদের দেখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে তার বৌমার মতোই শান্ত স্মিত হেসে সে নীরবে অভ্যর্থনা জানালো আমাদের।
গ্রাম দেখা শেষ করে আমরা বাড়ী ফিরলাম। ইতিমধ্যে বিজয়ের ছেলে বিশ্বজিৎ তার কাজ থেকে ফিরে এসেছে, বাড়ীর কাছেই বড় রাস্তার ওপর সে একটা বাড়ী কিনে সেটা বন্ধন ব্যাঙ্ক কে একটা দিক ভাড়া দিয়েছে, তা ছাড়াও তার একটা বিয়েবাড়ী ভাড়া আর কেটারিং এর ব্যবসা আছে, আর সেই বাড়ীর একতলায় বিল্ডিং মেটিরিয়াল এর দোকান। বেশ করিতকর্ম্মা আর উদ্যমী ছেলে বিশ্বজিৎ। এত অল্প বয়সে এতগুলো ব্যবসা করার মত মূলধন সে পেলো কোথায় এই প্রশ্ন অবশ্য করিনি। ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে সেই টাকা খাটিয়ে বাড়িয়েছে ধরে নিতে হবে, তাছাড়া বিজয়ও তার পেনশনের টাকা থেকে ছেলে কে সাহায্য করেছে নিশ্চয়।
বড় কথা হলো সে টাকাটা নষ্ট করেনি, ঠিকঠাক কাজে লাগিয়েছে।
“বড় রাস্তার পাশে জমিটা কত দিয়ে কিনলে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“কত আর? পঞ্চাশ লাখ মতো হবে! জলা জমি বলে একটু সস্তায় পেলাম!” বিশ্বজিৎএর কথায় তার বাবার মত কোন গ্রামীন টান নেই।
“আর বাড়ীটা তৈরী করতে কত পড়লো?”
খানিকটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে বিশ্বজিৎ বললো, “এখনো পর্য্যন্ত তো দুই কোটি টাকা মতো লেগেছে, কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি।”
বলে কি?
আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ীটা তো মনে হচ্ছে বিজয়ই কিনে নিতে পারতো~
বিজয় বললো “মান্টুদা’, তোমরা এবার এসে খেতি বোসো, আর দেরী কইরোনা, খাবার ঠান্ডা হই যাবে। ”
তাকিয়ে দেখি উঠোনের মাঝখানে বেশ কিছু টেবিল চেয়ার পাতা। বিয়ের নেমন্তন্নের পার্টির মতো ধবধবে পরিস্কার সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। বিশ্বজিৎএর কেটারিং এর ব্যবসা আছে, ওই বন্দোবস্ত করেছে।
আমরা গিয়ে যে যার মত বসে পড়লাম, বেশ ক্ষিদেও পেয়েছিলো। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার শিউমঙ্গলও এসে বসলো আমাদের সাথে।
৪ – বিজয় আর মার্লন ব্র্যান্ডো
সেই ভোরবেলা থেকে বিজয়ের বৌমা আমাদের জন্যে রান্না করেছে শুনেছিলাম, এবার সে নিজেই আমাদের পরিবেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বড় নম্র আর শান্ত মেয়েটি, একা একা এত কাজ সে হাসিমুখে করছে, তার মাথায় ঘোমটা, মুখে কোন কথা নেই, তাকে দেখে আমাদের খুব ভাল লাগলো। বিজয়ের কাছে শুনেছি সে বড় ঘরের মেয়ে। তার তিন ভাই এর কাছ থেকে সে তার বাবার সম্পত্তির কোন ভাগ চায়নি, তাই ভাইয়েরা ভালবেসে তাকে প্রায়ই এটা সেটা উপহার দিয়ে যায়। বিজয় তার ছেলের বিয়েতে তার বড়লোক বেয়াই এর কাছ থেকে কোন যৌতুক ও নেয়নি, তাই দুই পরিবারের মধ্যে খুব সুসম্পর্ক।
আমাদের সাথে বিজয় আর তার নাতি নাতনীও খেতে বসেছে, তারাও তাদের মা’র মতোই খুব চুপচাপ আর শান্ত। বিজয়ের বৌ প্রভা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখাশোনা করতে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে তাদের আতিথেয়তা বড় আন্তরিক।
এলাহী মেনু।
সেদ্ধ চালের ভাত, শুনলাম সেই চাল বিজয়ের নিজের ক্ষেতের। বিশ্বজিৎ এর ব্যবসায় যারা কাজ করে, সেখানে তাদের দুপুরের খাবারের চালও যায় এখান থেকে। তার পরে মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, সাথে বেগুণী, আর বাটা মাছ ভাজা। চাল এসেছে বিজয়ের ক্ষেত থেকে, বাটা মাছ বিজয়ের পুকুরের। তার পর এক এক করে গলদা চিংড়ীর মালাইকারী, রুই মাছের কালিয়া আর পাঁঠার মাংস। শেষ পাতে টোম্যাটো আর আমসত্ত্বের চাটনি আর মিষ্টি।
বিজয় কিছু বাকি রাখেনি।
প্রত্যেকটি পদ অত্যন্ত সুস্বাদু লাগলো আমাদের । আমরা প্রত্যেকেই সাধারণ ভাবে আমাদের খাবারে একটি বিশেষ স্বাদে অভ্যস্ত থাকি, আমাদের জিভে সেই স্বাদের একটা ভাল লাগা আগে থেকেই তৈরী হয়ে থাকে। সেই তৈরী স্বাদের থেকে খাবারের রসায়নে একটু এদিক ওদিক হলেই আমরা টের পাই। হয়তো ভাত ভাল সেদ্ধ হয়নি, কিংবা নুন মশলা আমাদের মনোমত নয়, আমরা টের পাবোই।
কিন্তু বিজয়ের বউমার প্রত্যেকটি রান্না একেবারে আমাদের palette এর সাথে যাকে বলে perfect fit…
সে যে একজন পাকা রাঁধুনী তা বুঝতে দেরী হলোনা, হুস হাস করে চেটে পুটে খেলাম সবাই।
খাবার পরে লম্বা গেলাসে করে ডাবের জল নিয়ে এলো বিজয়। তার নিজের জমিরই গাছ, সম্ভবতঃ। ডাব নিজেই কেটে গেলাসে ভরেছে সে।
সারা দুপুর বিজয়দের চাতালে বসে নানা গল্প হলো আমাদের।
মাসে ইলেক্ট্রিক বিল কত হয়? হাজার চারেক টাকা।
লোড শেডিং হয় কিনা। না, আজকাল আর হয়না।
মশারী ব্যবহার করতে হয় রাতে? হ্যাঁ।
চুরি চামারী ডাকাতি? গরু নাকি অনেক চুরি হয়ে গেছে এই গ্রাম থেকে। বাংলা দেশে পাচার হয়ে যায় তারা। এখন তাই সবার শুধু ছোট ছোট “হেলে” গরু। গ্রামে হিন্দুদের বাস, তাই গরুর মাংস এখানে খাওয়ার চল নেই।
রাজনীতির লোকেদের টাকা পয়সা খাওয়াতে হয়? তা তো হয় অবশ্যই। তবে টাকা দিলে তাদের দিয়ে কাজও হয়। এই তো গ্রামে পাকা রাস্তা হয়েছে।
এই সব নানা প্রসঙ্গ চলে এলো আমাদের আলোচনায়।
কথাবার্ত্তা বেশী বলেনা বিজয়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বে আর ব্যবহারে পরিবারের ওপরে তার যে একটা অনায়াস আধিপত্য আছে, সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়না। এমন নয় যে তাকে সবাই ভয় পায়, বা তাকে দেখে তঠস্থ হয়ে থাকে। বরং তার মুখে সবসময়ই লেগে থাকে এক চিলতে হাসি যার থেকে তার আত্মবিশ্বাসের একটা সুস্পষ্ট আন্দাজ পাওয়া যায়।
নাতি নাতনীরা এত চুপচাপ কেন? তোমরা ওদের বেশী বকঝকা করোনা তো – সুভদ্রার এই প্রশ্নের ঊত্তরে বিজয়পদ তার সহজ হাসি হেসে বলেছিল “একটু আধটু শাসন না করলি চলবি কি করে?” এক এক জন মানুষ থাকে যাদের ব্যক্তিত্ব আশেপাশের লোকেদের কাছ থেকে ভয় আর সমীহ আদায় করে নেয়। বিজয় ডন নয়, তবু তার গ্রামের লোকজন আর সংসারের কাছের মানুষদের কাছে তার প্রভাব আর প্রতিপত্তি আমার নজর এড়ায়নি। আজকের স্বল্পবাক আত্মবিশ্বাসী বিজয় কে দেখে আমার গডফাদার ছবিতে ডন কর্লিয়নের ভূমিকায় মার্লন ব্র্যান্ডোর দুর্দ্দান্ত অভিনয়ের কথা মনে পড়ছিল। নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ঘটনাবহুল জীবনের শেষে পৌঁছে এক শান্ত সৌম্য পরিতৃপ্ত ডন বসে আছেন তাঁর বাগানে, তাকিয়ে দেখছেন তাঁর নাতি নাতনীরা বাগানে ছুটোছুটি করে খেলা করছে। সে এমন এক মায়াবী দৃশ্য, অভিনয়ের গুণে যা মনে থেকে যায় অনেকদিন।
৫) বিদায়ের পালা
আলো কমে আসছে, আমাদের ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো।
বাড়ী থেকে বেরিয়ে গাড়ীতে ওঠার পথে দেখি বিজয়ের বাড়ীর বাগানে শিম গাছে রাশি রাশি শিম ঝুলছে। বিজয় আমাদের জন্যে তার বাগানের গাছ থেকে বেশ কিছু শিম আর শীষ পালং তুলে আমাদের জন্যে থলিতে ভরে দিলো।
বড় রাস্তা পর্য্যন্ত আমাদের গাড়ীতে করে এলো বিজয়। তার ছেলের দোকান আর অফিস রাস্তার ওপরে, বন্ধন ব্যাঙ্কের বিরাট সাইনবোর্ড। দোতলায় বন্ধন ব্যাঙ্ক, একতলায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাড়া দেবার জন্যে একটা আলাদা জায়গা করা হয়েছে, আর পাশে একটা বিল্ডিং মেটিরিয়ালের শোরুম।
ব্যবসার দুটো সাইনবোর্ড টাঙানো আছে চোখে পড়লো। প্রভা বিল্ডার্স আর অদ্বিতীয়া কেটারিং। মা আর মেয়ের নামে তার কোম্পানীর নাম রেখেছে বিশ্বজিৎ।
বিশ্বজিৎ আমাদের সব ঘুরিয়ে দেখালো। তার আর বিজয়ের মুখে একটা সাফল্য আর তৃপ্তির হাসি লক্ষ্য করে বেশ ভাল লাগলো।
গাড়ীতে ফিরতে ফিরতে বিজয়ের একটা কথা বার বার মনে পড়ছিল।
“মান্টুদা, আমার যা কিছু হয়েছে, সব তোমাদের আশীর্ব্বাদে”, বার বার বলেছিল সে। তার সেই কথার মধ্যে ছিল বিশুদ্ধ আন্তরিকতা। আর তার সেই কথা শুনে আমার বেশ লজ্জাই করেছিল সেদিন। সেই আশীর্ব্বাদ তো সে পেয়েছে তার ভাগ্যদেবতার কাছ থেকে।
বাকিটা তার একান্ত নিজের সুকৃতি, তার সততা, নিষ্ঠা আর কর্ম্মক্ষমতা।
বিজয়দের সাথে তাদের গ্রামে কাটানো সেই দিনটির কথা আর তাদের আতিথেয়তার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
সুভদ্রা আর আমি দিল্লীতে এসেছি বুড়ীর কাছে দিন দশেকের জন্যে।
দিল্লীতে এলে মুকুর সাথে একবার দেখা হবেই। সাধারণতঃ ও আমায় ওদের Army Officers Club এ নিয়ে যায়, সেখানে খানাপিনা আর আড্ডা হয়। এবার আমরা সোনুকেও ডেকে নিলাম।
কথামতো সকালে সোনু চলে এলো আমায় তুলতে। দিল্লীর সব রাস্তাঘাট ওর মোটামুটি চেনা। যদিও এখন অনেকদিন গুরগাঁও তে থাকার জন্যে দিল্লী তার কাছে কিছুটা অপরিচিত, তার একটা প্রধান কারণ হলো দিল্লী শহরটাও এতগুলো বছরে অনেকটাই পালটে গেছে।
আমিও এক সময় দিল্লীতে প্রায়ই আসতাম। ন’কাকা দেরাদুন থেকে দিল্লীতে এসে প্রথমে রামকৃষ্ণপুরম ও পরে নৌরজী নগরে থাকতেন। জ্যেঠুর U18 গ্রীন পার্ক এক্সটেন্সনের বাড়ীতে ও কতবার গেছি। তখন বাসে স্কুটারে বা ভটভটিয়াতে সফদরজং হাসপাতালের পাশে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে নেমে ইউসুফসরাই এর গলি দিয়ে সোজা চলে যেতাম। এখন ওই সব জায়গা একেবারেই অচেনা মনে হয়। দিল্লী আর আমার চেনা সেই আগের দিল্লী নেই।
বুড়ীরা আগে থাকতো নিজামুদ্দীন ইস্টে, এখন তারা পঞ্চশীল পার্কে চলে এসেছে। S Block এ ওদের বাড়ী। সোনুকে ঠিকানা দিয়ে রেখেছিলাম। পঞ্চশীল পার্কের ওই জায়গাটা অনেকটা খাঁচার মত,সেখানে ঢোকার আর বেরোবার জন্যে আবার তিনটে গেট। এক নম্বর গেট মাসের ১-১০ তারিখ খোলা, দুই নম্বর গেট খোলা মাসের ১১-২০ তারিখ, আর ২১ থেকে ৩০ তারিখ তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢোকা বেরোনো। সেদিন ছিল ৩০ তারিখ, তাই তিন নম্বর গেটের এই মাসে সেটাই শেষ দিন।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কমনে আসে যায়…
সোনুর আসতে একটু দেরী হলো। সে বললো আমি তো পঞ্চশীল পার্কের বি ব্লক দিয়ে ঢুকলাম, জানি সোজা রাস্তা। ওমা, কিছুদূর গিয়ে দেখি গেট বন্ধ তালা ঝুলছে। কি আর করি আবার বেরিয়ে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হলো।
খাঁচা থেকে বেরোতে গিয়ে আবার এক ঝামেলা। গেটে তালা লাগানো।
যারা বাইরে থাকে তারা এসব জানবে কি করে?সোনু বেচারা কে দোষ দেওয়া যায়না।
এই তারিখ নিয়ে একটা মজার গল্প আছে।
——————–
এক ভদ্রলোক বর্দ্ধমান থেকে ট্রেণে ব্যান্ডেল যাচ্ছেন, সেখন থেকে তিনি কর্ড লাইনের লোকাল ধরবেন, সেটা ছাড়ে বেলা দুটোয়। তাঁর হাতে ঘড়ি নেই, সহযাত্রী এক ভদ্রলোকের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি দেখছেন দুটো প্রায় বাজে, তার মানে ব্যাণ্ডেল এর ওই ট্রেণ তাঁর মিস হয়ে যাবে। মরিয়া হয়ে তিনি সেই সহযাত্রীকে প্রশ্ন করলেন, “আপনার ঘড়িতে ক’টা বাজে দাদা? আমার একটা দুটোর ট্রেণ ধরতে হবে ব্যান্ডেল থেকে…”
তিনি উত্তরে জিজ্ঞেস করলেন আজ কত তারিখ?
তারিখ? ভদ্রলোক তো অবাক! সময়ের সাথে তারিখের কি সম্পর্ক?
“আজ তো কুড়ি তারিখ” তিনি বললেন।
“আমার ঘড়িটা দিনে দুই মিনিট করে ফাস্ট হয়ে যায় বুঝলেন, আমি মাসে একবার করে ঠিক করে নিই। আজ যদি কুড়ি তারিখ হয়, তার মানে আমার ঘড়ি এখন চল্লিশ মিনিট ফাস্ট, তার মানে দু’টো বাজতে এখনো অনেক দেরী। ব্যাণ্ডেলে ট্রেণ আপনি পেয়ে যাবেন চিন্তা নেই।“
তাই শুনে ভদ্রলোক একটা স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেছিলেন।
—————–
যাই হোক অনেক দিন পরে সোনুর সাথে দেখা, আমরা গাড়ীতেই যেতে যেতে গল্প শুরু করে দিলাম। সম্প্রতি তনুজ আর সুদীপ্তার ছেলে হয়েছে, পাটনার দিকে আমাদের বংশের পঞ্চম প্রজন্মের প্রথম সন্তান। পাটনার দাদু জগদবন্ধুকে প্রথম প্রজন্ম ধরলে সোনাকাকা দ্বিতীয়, সোনু তৃতীয়, অনুজ হলো চতুর্থ প্রজন্ম।
আমাদের বাবা কাকারা যৌথ পরিবারে এক সাথে বড় হয়েছিলেন, আমাদের ভাই বোনেরাও মোটামুটি তাই। সেই জন্যে আমাদের মধ্যে এখনো যথেষ্ট আলাপ পরিচয় বন্ধুত্ব আর যোগাযোগ আছে, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেটা আশা করা যায়না। এই নবজাতক সোনুর নাতি যখন বড় হবে তখন আমাদের প্রজন্মের কেউ থাকবোনা, এবং আমাদের এখনকার পারিবারিক সম্পর্কগুলোও অনেকটা আলগা হয়ে আসবে। আবার নানা নতুন সম্পর্কের সূচনা হবে।
সেটাই স্বাভাবিক।
সোনু বললো সুদীপ্তার মা এখন কিছুদিন ওদের কাছে আছেন, বাচ্চার দেখাশোনা করার জন্যে। বাচ্চার এখন এক মাস বয়েস। সোনু ফোনে ছবি দেখালো, খুব সুন্দর দেখতে হয়েছে তাকে।
এই সব গল্প করতে করতে সোনু বেশ কয়েকবার ভুল রাস্তা ধরেছে। আর বার বার কপাল চাপড়ে বলছে, “আরে আমি কি করছি? এর পরের ডান দিকের এক্সিট টা নিতে হতো। আবার কিছুটা ঘুরতে হবে।“
সোনু আবার ওদের বাঙালী পূজোর কমিটির এক চাঁই। এবছর পূজো তে ওরা পরশুরামের “ভূষন্ডির মাঠে” নাটক করবে। বিখ্যাত মজার নাটক। তাতে সোনুর একটা ছোট রোল আছে। পুরোদমে নাটকের রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে।
এ ছাড়া পূজোর নানা কাজ। বেশ কিছু ফোন এলো গাড়ীতেই। কেউ জানতে চাইছে দাদা পুলিশের ক্লিয়ারেনসটা কবে পাওয়া যাবে, কেউ বলছে দাদা নাটকের প্রপ গুলো কে দেখছে,? সোনু গাড়ী চালাতে চালাতে এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আবার ভুল করে এক জায়গায় বাঁ দিকে না গিয়ে সোজা চলে গেল। “ও হো, এটা আমি কি করলাম”, কপাল চাপড়ে বললো সোনু, “দ্যাখো বাঁ দিকে না ঢুকে সোজা ইউসুফসরাই চলে এসেছি।“
আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম এটা ইয়ুসুফসরাই নাকি? সেই পুরনো দিনের ইয়ুসুফসরাই বলে চেনাই যাচ্ছেনা। ওই গলির ভিতের একটা হনুমানের মন্দির ছিল না?
যাই হোক, আবার ইউ টার্ণ।
এর মধ্যে দুই বার মুকুর ফোন এসেছে। কি রে তোদের কি হলো?
শেষ পর্য্যন্ত ইউ ১৮এ তো পৌঁছলাম। বাড়ীর পাশে অনেক নতুন বাড়ী উঠেছে, জায়গাটা আর চেনা যায়না। পাশে একটা বড় মাঠ ছিল আগে, সেখানে একটা কবরস্থান ছিল, সেই মাঠের মধ্যে দিয়ে ন’কাকা দের নওরোজী নগরের বাড়ীতে যাবার একটা সর্টকাট ছিল। হাতে সময় থাকলে আমরা হেঁটে চলে যেতাম। “কমল” নামে একটা সিনেমা হল ও ছিল কাছেই। সোনু বলল সেটা আর নেই। ভেঙে শপিং মল করা হয়েছে নাকি।
মুকু আমাদের নিয়ে গেল ওদের Dhaulakia Officers’ club এ – রাস্তাটা ওর ভালোই চেনা, কেননা সেখানে সে অরুণা বৌদি আর মনিকাকে নিয়ে প্রায়ই যায়। সাধারণতঃ ওখানে ওরা বিকেলে পুলে সাঁতার কেটে সন্ধ্যায় কিছু খেয়ে বাড়ী ফিরে আসে।
সোনুর তুলনায় দেখলাম মুকু দিল্লীর রাস্তাঘাট অনেক ভাল চেনে। বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখালো তাকে, দুই এক বার আমাদের “দ্যাখ্, একটা অন্য রাস্তা দিয়ে তোদের নিয়ে যাচ্ছি” বলে সে দুম্ করে একটা no entry দিয়ে একটা মিলিটারী টাউনশিপে ঢুকে পড়লো।
সোনু মুকুকে মাঝে মাঝে “কর্ণেল সাহাব” বলে ডাকে, সে বললো পুলিস আমাদের কর্ণেল সাহাব কে কিছু বলবেনা।
যাই হোক ওই টাউনশিপের মধ্যে দিয়ে আমরা মুকুদের ক্লাবে পিছন দিক দিয়ে একটা এন্ট্রি নিলাম। গেটে যারা পাহারা দিচ্ছিল, তারা সবাই দেখলাম মুকুকে ভালই চেনে। জায়গাটা বেশ সুন্দর, প্রচুর গাছপালা। সোমবার সকাল, ভীড় ও তেমন নেই।
আমরা একটা বার কাম রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে বসলাম। মুকু আমাদের দু’জনের জন্যে বীয়ার অর্ডার দিল, সোনু চাইলো জিন আর সোডা। সাথে আলু ভাজা আর ফ্রাইড চিকেন।
আমাদের গল্প শুরু হলো। নানা ধরনের গল্প। তবে প্রধানতঃ পুরনো দিনের পারিবারিক স্মৃতি।
এদিকে রেস্তোঁরার টিভি তে ক্রিকেট দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের সাথে আমাদের টেস্ট ম্যাচ। আমি আজকাল ক্রিকেটের কোন খবর রাখিনা, কিন্তু সোনুর খুব উৎসাহ। সে নিজে কমবয়সে ভাল ক্রিকেট খেলতো – পেস বোলার ছিল। কিন্তু জোরে বল করতে গিয়ে তার মাস্ল্ এ স্ট্রেন হওয়ায় পরে সে স্পিনে চলে যায়।
“তখন তো আমাদের ভাল Physio আর কোচ ছিলনা”, দুঃখ করে বললো সে।
বাংলাদেশের সাথে এই টেস্ট ম্যাচে প্রথম তিন দিন বৃষ্টি হওয়াতে আজ চতুর্থ দিন প্রথম খেলা। মীমাংসা হবার কোন চান্স নেই, ড্র হবেই। যাই হোক, বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হবার পরে আমাদের রবীন্দ্র জাডেজা ৩০০০ রান আর তিনশোটা উইকেট পেয়েছে জানা গেল। এই সব দেখতে দেখতে মুকু তার এক CO (Commanding Officer) র কথা বললো, তিনি নাকি সব কথার মধ্যে ক্রিকেটের ভাষায় কথা বলতেন। যেমন – “That was a googly”, “I played him with a straight bat” কিংবা, “I sent him to the boundary” – এইরকম আর কি।
তো একদিন মুকু সেই CO ভদ্রলোকের সামনে বসে আছে, একজন আর্দ্দালী এসে বললো “স্যার আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন, নাম বলছেন না, কিন্তু দেখা করা খুব নাকি আর্জেন্ট।“ CO ভদ্রলোক তাকে বললেন “LBW”!
মুকু তো অবাক! তার মানে কি?
ভদ্রলোক হেসে বললেন, “বুঝলেনা তো?” ওর মানে হচ্ছে “Let the bugger wait!”
আমাদের ছোটবেলায় জহর রায়ের একটা হাসির গল্প ছিল – ইডেন গার্ডেনে ম্যাচ দেখতে গিয়ে একজন দর্শক নাকি গ্যালারীতে মাল খেয়ে out হয়ে গিয়ে টলমল করে হাঁটছিলেন, জহর রায় তাঁকে LBW out বলেছিলেন। সে ক্ষেত্রে অবশ্য তার মানে ছিল “Loaded belly with wine!”
মুকুর আর একটা গল্প আমার বাবা (তার সেজকাকা) কে নিয়ে। একবার,মুকু তখন খুব ছোট, ব্যাঙ্গালোরের কাছে জালাহালি নামে একটা জায়গায় জ্যেঠু পোস্টেড।
“গাড়ী করে সবাই মিলে কোথাও যাওয়া হচ্ছে, গাড়ীর সামনে সেজকাকা, পাশে বাবা গাড়ী চালাচ্ছেন। পিছনে মা আর আমরা তিন ভাই বোন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, একটা গাছে দেখলাম একটা বোর্ড টাঙানো, তাতে লেখা আছে “Block Development Officer”।আমি সেজকাকাকে জিজ্ঞেস করলাম “What does a Block Development officer do?” এক মূহুর্ত্ত দেরী না করে সেজকাকা হেসে বললেন “কি আবার? He blocks development!”
আমি হেসে বললাম “এটা তো বাবা একটা ওভারবাউন্ডারী হাঁকালেন!”
মুকু খবর দিলো ঝর্ণা দি মারা গেছেন কয়েক দিন আগে। তোমরা যারা ঝর্ণা দি’কে চেনোনা, তাদের জানাই যে তিনি মুকুদের বদুমামার স্ত্রী ছিলেন। মুকুর মামাদের মধ্যে বদুমামা আর নিতুমামা দুই ভাই সব চেয়ে ছোট ছিলেন, নিতু মামা বিয়ে করেননি, বদু মামার বিয়ে হয়েছিল আমাদের উষাপিসীর মেয়ে ঝর্ণাদি’র সাথে,ওঁদের দু’জনের কোন সন্তান ছিলনা। বামুনপাড়ায় শেষের দিকে যখন ওঁদের সাথে দেখা করতে যেতাম, তখন বদু মামা আর নিতু মামা চলে গেছেন, সেই বিশাল বাড়ীতে শুধু থাকতেন ঝর্ণা দি আর রাদুমামার স্ত্রী। দুজনেই শয্যাশায়ী। তাদের দেখা শোনা করতো বড়মামার মেয়ে কেয়া – সেও বিয়ে করেনি।
রাদুমামীমা আর ঝর্ণাদি দু’জনেই চলে যাবার ফলে এখন কেয়া একা হয়ে গেল। বড়মামার ছেলে ঢুন্ডি কাছেই থাকে। তার ছেলের বিয়েতে মুকুরা সামনের নভেম্বরে কলকাতায় আসবে, তখন ওরা সবাই মিলে বাড়ীটা নিয়ে কি করবে তার সিদ্ধান্ত নেবে।
মনোহরপুকুরের বাড়ীটার মত বামুনপাড়ার বাড়ীটাও হয়তো হাতবদল হবে, সেখানে নতুন একটা বিশাল বাড়ী তৈরী হবে। ওই বাড়ীটার সাথে আমার ও অনেক স্মৃতি জড়িত, বাড়ীর সামনে একটা গলি, তার শেষে একটা গেট আর গেট দিয়ে ঢুকে এক চিলতে জমি। সেই জমিতে আমার কম বয়সে নিতু মামা বদুমামারা কালীপূজোয় বাড়ীতে তৈরী বসন তুবড়ী জ্বালাতো, তার ফুলকি উঠে যেতো তিন তলার ছাদ ছাড়িয়ে অনেক ওপরে।
মনোহরপকুরের বাড়ীর মত ওই বাড়ীতেও এক সময় খুব হৈ হুল্লোড় হয়েছে।
সোনুদের গুরগাঁওতে সম্প্রতি হরিয়ানার Assembly election হয়ে গেল। এবং জম্মু কাশ্মীরেও পরে পরেই। সোনু রাজনীতির অনেক খবর রাখে, সে বললো হরিয়ানায় এবার কংগ্রেস জিতবে। কাশ্মীরেও NC কংগ্রেস জোটের জেতার সম্ভাবনা। বি জে পির সময়টা গত লোকসভার পর থেকে ভাল যাচ্ছেনা। মোদী ম্যাজিক ভ্যানিশ। ভালোই, মাঝে মাঝে সরকার পালটানো দরকার। কেউই অপরিহার্য্য নয়।
এর মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড বিয়ার আর জিন এসে গেছে। আমাদের ছোটবেলায় বাবা কাকারা বাড়িতে কোনদিন ড্রিঙ্ক করেননি। ব্যাপার টা সেই যুগে ভদ্রসমাজে ভাল চোখে দেখা হতোনা।
সোনু গল্প করলো, একবার অনেক দিন আগে, সোনা কাকা তখন সিমলার কাছে চেল নামে একটা জায়গায় পোস্টেড। শীতকাল, প্রচন্ড ঠান্ডা, চারিদিকে বরফ পড়ছে, বাড়ীর ভিতরে সোনাকাকার কিছু সহকর্ম্মী Army officer এসেছেন, সবাই মিলে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে গা গরম করার জন্যে ব্র্যান্ডি আর হুইস্কী পান চলছে, এমন সময় হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে কাঁপা কাঁপা মেয়েলী গলায় কে যেন”সোঁনাকাঁকু,সোঁনাকাঁকু” বলে ডেকে উঠলো। ডাকটা সোনু বেশ সুন্দর নকল করে শোনালো আমাদের সেদিন, সে অভিনয়টা বেশ ভালই করে বুঝলাম।
এই ভর সন্ধ্যে বেলা যাদের নাম করতে নেই, সেই সব অশরীরী আত্মারা কেউ নাকি? “বাবার একটু ভূতের ভয় ছিল বেশ কয়েকবার ওই খনখনে কাঁপা কাঁপা গলায় ”সোঁনাকাঁকু,সোঁনাকাঁকু”ডাক শোনার পরে বাবা আমায় বললো, “সোনু যা তো দরজা টা একটু ফাঁক করে দ্যাখ্ তো কে আমায় ডাকছে?”
যাই হোক, দরজা খুলে দেখা গেল, শিখা আর শঙ্কর। কিছুদিন আগে ওদের বিয়ে হয়েছে, বোধহয় হানিমুন করতেই ওদের সিমলায় আসা। কিন্তু এই বরফ পড়ায় ওরা কিছুটা বিপদে পড়ে গেছে।
ওরা দুজন সোনাকাকীমার দেওয়া শুকনো জামাকাপড় পরে নেবার পরে সবাই মিলে গল্প করছে, সোনাকাকা সোনু কে বললেন “নতুন জামাই কে তো আমি হুইস্কি অফার করতে পারিনা, তুই বরং ওদের দু’জনকে এই Glenfiddich এর নতুন বোতলটা দিয়ে আয়। আমাদের বুড়োদের সাথে তোরা ছোটরাও একটু গা গরম করে নে।“
সোনাকাকা এরকমই দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন।
শঙ্কর নাকি কিছুতেই নতুন শ্বশুরের সামনে হুইস্কি খাবেনা, তার নাকি ভীষন লজ্জা করবে…সোনু এবার শঙ্করের সেই লজ্জিত ভঙ্গীর পার্ট টাও নিখুঁত অভিনয় করে দেখালো আমাদের।
শেষ পর্য্যন্ত সেদিন ওরা নাকি বোতলটা প্রায় শেষ করে দিয়েছিল।
৩
বেলা প্রায় দু’টো বাজে, আমাদের ড্রিঙ্ক শেষ, মুকু আমাদের পাশে একটা সাজানো গোছানো রেস্তোঁরা তে লাঞ্চে নিয়ে গেল। সেখানে তিন জনে বসে খেতে খেতে মুকু বললো “কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় আমরা সাঁতার কেটে এখানে খেতে বসেছি, এমন সময় হঠাৎ চৈতীর ছেলে সুমন – ও অন্য একটা টেবিলে কারুর সাথে খাচ্ছিল – আমাদের কাছে এসে বলল “মুকুমামা আমায় চিনতে পারছো?”
“চিনতে পারবোনা কেন? কবে দিল্লী এসেছিস? বাড়ীতে আয় একদিন!” ওকে বলেছিল মুকু। আমাদের বারেন্দ্র দের যৌথ পরিবারের লতায় পাতায় এই সব কিছুটা দূরের সম্পর্কের মধ্যেও কিরকম গভীর আত্মীয়তার টান থেকে যায়!
সুমন কাজে মাঝে মাঝে অল্প দিনের জন্যে দিল্লী আসে, এবার হঠাৎ মুকুমামার সাথে দেখা হয়ে যাওয়াতে সে খুব খুসী।
সোনু বললো “সুমনের মত ভাল ছেলে চট করে দেখা যায়না, he is a gem…”
বেশ কয়েকবছর আগে মঙ্গল আর রুণার বড় ছেলে মটরবাইক কিনে একাই সেই নতুন বাইকে চেপে ব্যাঙ্গালোর থেকে তিরুপতি যাচ্ছিল। পথে একটা ট্রাকের ধাক্কায় সে অনেক দূরে ছিটকে পড়ে শেষ পর্য্যন্ত মারা যায়। মঙ্গল আর রুমা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানিপত্ থেকে দিল্লী আসে। সোনুর ছেলে তনুজ তখন ব্যাঙ্গালোরে, তার কাছ থেকে খবর পেয়ে সুমন – তখন সে কোন এক এয়ারলাইনে কাজ করতো – Spicejet কিংবা Go Air ঠিক মনে নেই – তাদের সাথে কথা বলে দু’জন passenger কে offload করে ওদের ব্যাঙ্গালোর নিয়ে আসে, এবং শুধু তাই নয়, সেই এয়ারলাইনের গাড়িতে করে এয়ারপোর্ট থেকে মঙ্গল আর রুণা কে প্রথমে accident site ও পরে হাসপাতালে পৌঁছে দেবার বন্দোবস্তও করে।
প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন সম্ভাবনাময় তরুণ সন্তানের এরকম অকাল্মৃত্যু মঙ্গল আর রুণার মনে কতটা আঘাত হেনেছিল তা সহজেই কল্পনা করা যায়। পাঞ্জাবের পানিপত্ শহরে চলে যাবার পরে ওরা এমনিতেই পরিবারের বাকি সবার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল,এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পরে এখন তারা আরও অনেক বেশী চুপচাপ হয়ে গেছে।
তবে মুকু আর সোনু দু’জনেই বললো মঙ্গল আর রুণা পানিপতে এখন তাদের নিজেদের হার্ট এর হাসপাতাল খুলেছে, এবং সেই হাসপাতাল নাকি খুব ভাল চলছে সেখানে। মুকু ওকে পাটনায় নিজেদের বাড়ীতে ক্লিনিক খোলার কথা বলেছিল, কিন্তু কোন কারণে সে আর পাটনায় আসতে চায়না।
ছোটবেলায় যখন পাটনায় যেতাম, ভাইদের মধ্যে রাঙাকাকাই তখন একমাত্র পাটনায় থাকতেন, তাই কৃষ্ণা শুক্লা বন্টু মঙ্গল এদের সাথেই বাগানে খুব হুটোপাটি করেছি তখন। রাঙাকাকার তিন মেয়ের পরে এক ছেলে হওয়াতে মঙ্গল দাদু আর দিদার খুব ফেভারিট নাতি ছিল মনে পড়ে। তার আদরের শেষ ছিলনা। ভোজপুরী ভাষায় তাকে সবাই ডাকতো “মঙ্গলওয়া”।
এখন সে সবার কাছ থেকে দূরে থাকে স্বেচ্ছা নির্ব্বাসনে।
পাটনার অন্যান্য ভাই বোনেদেরও খবরাখবর নিলাম, বিশেষ করে যাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বহুদিন। বড় জ্যেঠুর ছেলে মেয়েরা – দীপা গুণু খোকন যেমন। সবাই নিজের নিজের মত ভাল আছে জেনে ভাল লাগলো। বড়জ্যেঠুর ছোট ছেলে আমাদের সব চেয়ে ছোট ভাই লাল্টুর সাথে অবশ্য সম্প্রতি আমার দেখা হয়েছে, মাঝে মাঝে সে আমায় ফোন ও করে আজকাল। লাল্টুর সাথে মনোহরপকুরের ঝুন্টু ভান্টুলী আর টুবলির বেশ ভাল যোগাযোগ আছে, এবং সে দূরে ব্যাঙ্গালোরে থাকলেও আমাদের অনেকেরই বেশ ভাল খোঁজ রাখে।
আমাদের পরের প্রজন্মের কেউ তো কাউকে চিনবেনা। সম্পর্কে ভাই বোন হলেও তারা পরস্পরের কাছে অচেনা অজানাই থেকে যাবে। সেটাই স্বাভাবিক। এটা নিয়ে ভাবনার কোন কারণ নেই।
খাওয়া শেষ, এবার বাড়ী ফেরার পালা।
সোনুর তুলনায় মুকু দেখলাম দিল্লীর রাস্তাঘাট অনেক ভাল চেনে। সে নানা রাস্তা আর ওভারব্রীজের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ী চালিয়ে নিয়ে গেল। তার homing instinct এর প্রশংসা করতেই হয়। বহুদিন ধরে দিল্লীতে গাড়ী চালাচ্ছে সে।
প্রানী জগতে নানা জীব জন্তুর এরকম অসাধারণ homing instinct দেখা যায়। Monarch butterfly রা মহাসমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে বহুদূর গন্তব্যে পৌঁছে যায়। Olive Ridley কচ্ছপেরা প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা নির্দিষ্ট সমুদ্র উপকূলে এসে ডিম পেড়ে বালি দিয়ে ঢেকে সমুদ্রে ফিরে চলে যায়। আর সেই ডিম ফেটে যে বাচ্চারা জন্মায় তারা সমুদ্রে ফিরে যায়, কিন্তু এক বছর পরে ঠিক সময়ে নিজেদের ডিম পাড়তে আবার তারা তাদের জন্মস্থানে ফিরে আসে।
আমাদের গৃহপালিত বেড়ালদের ও নাকি নিজের জায়গায় চিনে ফিরে আসার একটা আশ্চর্য্য ক্ষমতা আছে। এই নিয়ে শিবরাম চক্রবর্ত্তির একটা বিখ্যাত গল্প আছে, যারা পড়োনি তাদের জন্যে এখানে লিখে রাখি।
————-
শিবরাম এর বাড়ীতে একটা বেড়াল আছে, তিনি সেটাকে মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে ফেলে রেখে আসেন, কিন্তু সে দুই তিন দিনের মধ্যেই আবার তার কাছে ফিরে আসে।
একবার তিনি বেড়ালটাকে একটা বস্তার মধ্যে বন্দী করে ট্রেণে করে অনেক দূরে গিয়ে একটা জায়গায় ফেলে দিয়ে আসেন। কিন্তু মুস্কিল হলো এবার তিনি নিজেই রাস্তা গুলিয়ে ফেলে আর নিজের বাড়ী ফিরতে পারছেন না। অগত্যা শেষ পর্য্যন্ত সেই বেড়াল টাকে follow করেই তিনি নিজের বাড়ী ফিরেছিলেন।
কিন্তু বেড়াল তো আর সোজা পথে বাড়ী ফেরেনা। তারা গেরস্থের বাড়ীর দেয়াল টপকায়, বাড়ীর দেয়ালে জলের পাইপ বেয়ে ছাদে ওঠে, এক বাড়ীর ছাদ থেকে পাশের বাড়ীর ছাদে লাফ দিয়ে চলে যায়।
শিবরাম যখন বাড়ী ফিরলেন, তখন তাঁর জামাকাপড়ে ধুলো ময়লার কালো দাগ, হাতে কালশিরে পড়েছে, পাঞ্জাবীর হাতা ছিঁড়ে গেছে, হাঁটু ছড়ে রক্ত বেরোচ্ছে, চুল এলোমেলো, তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর মাথার ওপর দিয়ে একটা ঝড় চলে গেছে।
তাঁর প্রতিবেশীরা তো তাঁকে দেখে অবাক। এ কি চেহারা হয়েছে আপনার?
শিবরাম একটু কাষ্ঠহাসি হেসে তাদের বলেছিলেন, “আর বলবেননা, বেড়াল কে অনুসরণ করে বাড়ী ফেরা যে কি কঠিন কাজ, কি বলবো?”
—————-
মুকু সেই বেড়ালটার মতোই বেশ সাবলীল ভঙ্গী তে পঞ্চশীল পার্কে আমাদের নিয়ে এলো। আমি বললাম, “আজ কিন্তু ৩০ তারিখ, মনে রাখিস তিন নম্বর গেট।“ কুছ পরোয়া নেই ভঙ্গীতে মুকু ঠিক তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে পড়লো।
আমায় নামিয়ে ওরা দু’জন ওপরে উঠে সুভদ্রা আর বুড়ী সৌগত আর ওদের বাচ্চা দের সাথে দেখা করে এলো। সুভদ্রা বললো “তোমরা আমাদের বৌদের না নিয়ে নিজেরা গিয়ে গল্প করে আসো কেন?কি এত গল্প তোমাদের যা আমাদের বলা যায়না?”
সোনু বললো,”বৌদি, আজ আমরা যে সময়ের কথা বললাম, সেই সময়ে তো তোমরা কেউ ছিলেনা, তাই ওইসব গল্প শুনে তোমাদের ভীষণ বোরিং লাগতো।“
ভেবে দেখলে কথাটা কিন্তু ঠিকই বলেছে সোনু। সারাদিন তিন জনে মিলে কত বোরিং কথা বলে হাসাহাসি করলাম আমরা। আমাদের সাথে মঙ্গলটা থাকলে আরো ভাল হতো, ওর কাছ থেকে আরও এইরকম বেশ কিছু বোরিং গল্প শোনা যেতো।
কিন্তু তা আর হবার নয়। মঙ্গলের সাথে দেখা করতে গেলে আমাদের পানিপত্ যেতে হবে।
সেই দিন কুয়েতে সালমিয়ার ভারতীয় স্কুলের অডিটোরিয়ামে বঙ্গীয় সাংষ্কৃতিক সমিতি (বি সি এস) এর উদ্যোগে আমরা বাদল সরকারের বিখ্যাত নাটক “এবং ইন্দ্রজিৎ” সাফল্যের সাথে মঞ্চস্থ করেছিলাম।
সেই বছর সমিতির সভাপতি তাপস (বসু) যখন আমায় নাটক পরিচালনার ভার দিলে্ন, তখন আমি এই নাটকটিকেই বেছে নিয়েছিলাম। তার প্রধান কারণ অবশ্যই এই যে প্রায় চল্লিশ বছর আগে (১৯৬৫) লেখা এই নাটকটি কে এখনো বাংলায় লেখা সর্ব্বকালের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক নাটকের প্রথম পাঁচটি মধ্যে একটি বলে ধরা হয়।
বাদল সরকারের অনবদ্য সৃষ্টি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি তিনি লেখেন প্রবাস জীবনে, নাইজেরিয়ায় থাকতে ১৯৬৩ সালে। আর নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৬৫ সালে কলকাতায়।
বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিক – দুই দিক থেকেই নাটকটি নিঃসন্দেহে বাংলা নাটকের ইতিহাসে একটি দিকচিহ্ন হিসেবে নিজের পরিচিতি আদায় করে নিয়েছে। এই নাটকটি ইংরেজী এবং নানা ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এবং সারা দেশে এটি এখনো নিয়মিত অভিনীত হয়ে থাকে। নাটকটি নিয়ে অনেক্ লেখালেখি এবং আলোচনা হয়েছে, এবং শুনেছি কলকাতা এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের এম এ ক্লাসের পাঠ্যতালিকায়তেও এই নাটক টি স্থান পেয়েছে।
নাটকটি পছন্দ করার আর একটি কারণ ছিল এই যে ১৯৬৬ সালে – তখন কলেজে পড়ি এবং নাটক দেখায় তখন দারুন নেশা – কলকাতায় রাসবিহারী মোড়ের কাছে মুক্ত অঙ্গন প্রেক্ষাগৃহে এক সন্ধ্যায় শৌভনিক গোষ্ঠীর প্রযোজনায় ওই নাটকটি দেখে আমি মুগ্ধ আর অভিভূত হয়েছিলাম, সেই ভাল লাগা আর মুগ্ধতা কুয়েতের বাঙালী বন্ধুদের মনে পৌঁছে দিতে আমার গভীর আগ্রহ ছিল।
অবশ্য মনে একটু দুশ্চিন্তাও যে ছিলনা তা বলবোনা। নাটকটি বেশ কঠিন এবং দুর্ব্বোধ্য, তাই আগে থেকে একটু তৈরী হয়ে না এলে এবং খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে নাটকটি সাধারণ দর্শকদের ভাল না লাগারই সম্ভাবনাই বেশী। সাধারণত; কুয়েতে আমরা প্রতি বছর আমাদের দর্শকদের বিনোদন হিসেবে একটি হালকা হাসির নাটকই পরিবেশন করতাম।
এই নাটকে সেরকম কোন গল্প নেই, কোন হাসি গান বা মজার দৃশ্য বা সংলাপ নেই। এখানে নেই কোন নাটকীয় সংঘাত, অথবা কোন নাটকীয় ক্লাইম্যাক্স। এই নাটক হলো মধ্যবিত্ত মানুষের সাধারণ জীবনের কথা, নীরবে বয়ে চলা নিস্তরঙ্গ নদীর মত সেই জীবন, এবং তারই টুকরো টুকরো ছবি।
তবু কেন জানিনা আমাদের দর্শকদের শিল্পবোধের ওপর আমার আস্থা ছিল। আমার মনে হয়েছিল, যে নাটকটি তে নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের যে যান্ত্রিক এবং নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা গতানুগতিক দিকটা ফুটে উঠেছে, তার সাথে গড়পড়তা কুয়েতের সব বাঙালী দর্শকই কমবেশী পরিচিত। এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকটিতে আমাদের সকলের জীবনের কথাই বলা হয়েছে। তাই এই নাটকের সাথে আমরা আমাদের জীবনের মিল খুঁজে পাবো।
আমি জানতাম এবং ইন্দ্রজিৎ কুয়েতের দর্শকের ভাল লাগবে, এবং শেষ পর্য্যন্ত তাই হয়েওছিল।
নাটকটি যে আমাদের দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলবে তা আমি বুঝি নাটকের মহড়ার সময়ে। একমাত্র নুপূর (রায়চৌধুরী – মাসীমা) ছাড়া এই নাটকে যারা অভিনয় করেছিল তারা সকলেই বয়সে তরুণ। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এই নাটকটি যখন লেখা হয় তখন এদের কারুর জন্ম হয়নি। প্রথম দিকে চল্লিশ বছর আগে লেখা নাটকটির আজকের যুগে প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমার মনে কিছুটা সংশয় ছিল তা ঠিক। কিন্তু চার মাস মহড়া দেবার সময় লক্ষ্য করলাম বয়সে তরুণ এই ছেলেমেয়েদের নাটকটির প্রতি আকর্ষন ক্রমশঃ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ওদের উৎসাহ একটা সময়ে এসে আমার উৎসাহ কেও অতিক্রম করে গেছে।
তবু সাবধানের মার নেই ভেবে আমি নাটকটি মঞ্চস্থ হবার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বি সি এসের website এ নাটকটির বিষয় বস্তু নিয়ে অনেক লেখালেখি ও আলোচনা করেছিলাম। যাতে সেই সব লেখা পড়ে আমাদের সমিতির সভ্যরা নাটক দেখতে আসার আগে কিছুটা মানসিক ভাবে প্রস্তুত হয়ে আসে।
ইংরেজীতে একটা কথা আছে – “Fools dare where angels fear to tread” – আমিও সেরকম কিছুটা দুঃসাহসী হয়ে কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নিই। সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল, কেননা আমাদের দর্শকরা নাটকটি মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখেছিলেন, এবং নাটকের শেষে তাঁরা আমাদের প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।
২) অমল, বিমল, কমল, ইন্দ্রজিৎ আর মানসী
নাটকটিতে মূল চরিত্র সাতটি। তাদের মধ্যে দু’জন – লেখক আর মাসীমা – হলেন রক্তমাংসের মানুষ, অর্থাৎ জীবন্ত চরিত্র। বাকি পাঁচ জন – অমল বিমল কমল ইন্দ্রজিৎ আর মানসী – এরা সবাই বাস করে লেখকের কল্পনায়। এই পাঁচ জন কাল্পনিক চরিত্র কে নিয়ে লেখক একটি নাটক লিখতে চান। এই ব্যাপারটা না জানা থাকলে নাটকের মধ্যে অনেক জায়গাতেই এই চার জনের সাথে লেখকের ব্যবহার আর সংলাপ দর্শকের কাছে দুর্ব্বোধ্য মনে হতে পারে। নাটকটি শুরু হবার আগে তাই পরিচালক হিসেবে মাইক হাতে আমি মিনিট পাঁচেক ধরে দর্শকদের নাটকটি র মূল আখ্যান আর আঙ্গিক নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলাম।
BCS Website এ বিশদে নাটক টি নিয়ে লেখা আর নাটকের আগে এই বক্তৃতাটা বেশ কাজে দিয়েছিল বলেই আমার ধারণা।
এই নাটকের প্রধান চরিত্র একজন উদীয়মান তরুণ লেখক, যিনি আধুনিক বাঙালী মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের জীবন কে উপজীব্য করে নিয়ে একটি নাটক লিখতে চান্। সেই নাটকে উঠে আসবে তাদের জীবনচক্রের নানা দিক।
এই আধুনিক নাগরিক সমাজ নিয়ে নাটকের শুরুতে লেখক দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলছেন~
“ ১৯৬১ সালের আদমশুমারির হিসাবে কলকাতার বর্তমান লোকসংখ্যা ২৯,২৭,২৮৯। এর শতকরা প্রায় আড়াই ভাগ গ্র্যাজুয়েট বা আরো উচ্চশিক্ষিত। বিভিন্ন নামে এঁদের পরিচিতি। এঁরা মধ্যবিত্ত, যদিও এঁদের মধ্যে বিত্তের তারতম্য যথেষ্ট। এঁরা বুদ্ধিজীবী যদিও বুদ্ধি জীবিকা হলে অনেকেই অনাহারে মরতো। এঁরা শিক্ষিত, যদি ডিগ্রিকে শিক্ষা বলে ধরে নেওয়া চলে। এঁরা ভদ্রলোক, ছোটলোকদের থেকে নিজেদের পার্থক্যটা বোঝেন বলে। এঁরা অমল বিমল কমল। এবং ইন্দ্রজিৎ।”
অমল, বিমল, কমল, এবং ইন্দ্রজিৎ, নাটকের এই চার জন চরিত্রের সাথে দর্শকদের আলাপ হবে যখন এরা কলেজে পড়ে। এদের সাথে আছে মানসী, সে ইন্দ্রজিৎ এর প্রেমিকা।
কলেজের ক্লাসের কিছু দৃশ্যতে এরা চারজন ছাত্র, তারা স্টেজে যন্ত্রের মত চলাফেরা করে যন্ত্রের মত শিক্ষকদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। ক্লাসের পরে বসে নানা বিষয় নিয়ে তাদের প্রাণখোলা আড্ডা।
কলেজে শিক্ষক ও ছাত্র
কলেজের পর প্রাণখোলা আড্ডা
লেখক দেখিয়েছেন যে আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ, হয়তো চেষ্টা করলে আমরাও উল্লেখযোগ্য হতে পারতাম, কিন্তু আমরা চেষ্টা করিনি, মিশে গেছি জনারণ্যে। আমাদের মতই সাধারণ হলো অমল, বিমল আর কমল। এই সাধারণ মানুষেরা সমাজের নানা নিয়ম মেনে নিয়ে একটা যান্ত্রিক জীবনে বাঁধা পড়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। এদের নিয়ে নাটক লেখা যায়না।
কিন্তু এদের থেকে আলাদা একজন আছে, সে ‘ইন্দ্রজিৎ’। সে আমাদের মত সাধারণ অমল-কমল-বিমল বা নির্মল নয়, সে ইন্দ্রজিৎ। আর আলাদা বলেই ইন্দ্রজিৎকে নিয়ে নাটক লেখা হয়।
দর্শক-পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ইন্দ্রজিৎকে নিয়ে কেন এই নাটক। কেন ইন্দ্রজিৎ নাটকের নামভূমিকায়? কি ভাবে ইন্দ্রজিৎ তার বন্ধুদের থেকে আলাদা?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো ইন্দ্রজিৎ আলাদা তার চিন্তাভাবনায়। সে অন্য তিনজনের মত অবলীলায় সব কিছু মেনে নিতে পারে না। এই যেমন সে তার প্রেমিকা মানসীকে বলে, “যে নিয়মে সাত বছরের ছেলেকে জুতো পালিশ করতে হয়, সে নিয়মটাকে আমি মানতে পারি না”।
কলেজের সেই প্রাণখোলা আড্ডার পরে একদিন সবাই চলে গেলে ইন্দ্রজিৎ একা বসে থাকে। বন্ধুদের সাথে রোজ সেই একই বিষয় নিয়ে একই কথা বলতে তার ভাল লাগেনা। এমন সময় লেখক তার কাছে আসে।
লেখকঃ কি রে এখানে একা বসে কি ভাবছিস? তোর স্যাঙাৎরা সবাই কোথায়? অমল বিমল কমল?
ইন্দ্রজিৎঃ ওরা একটু আগে চলে গেল।
লেখকঃ কি নিয়ে গ্যাঁজালি?
ইন্দ্রজিৎঃ (কিছুটা বিরক্ত) ওই তো সেই একই বিষয় – ক্রিকেট, রাজনীতি, সিনেমা, ফিসিক্স আর সাহিত্য। আর ভাল লাগেনা এই সব। ইচ্ছে হয় কোথাও বেরিয়ে পড়ি! কোন নাম না জানা জায়গায়…
লেখকঃ আমারও ওই রকম। চল্ একটা বাস ধরে হাওড়া স্টেশন চলে যাই, তারপরে যে ট্রেণটা প্রথমে পাবো, সেটা ধরে এই টাকায় যত দূর যাওয়া যায়, চলে যাই।
যাওয়া অবশ্য শেষ পর্য্যন্ত হয়না।
লেখক ইন্দ্রজিৎ কে বাদামের ঠোঙা এগিয়ে দিয়ে বলে, “নে, বাদাম খা!”
নে, বাদাম খা
৩) নাটকের বিষয়বস্তু
এই নাটকের মূল বিষয়বস্তু হলো অমল বিমল কমলের মত আজকের সাধারণ নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষ এক অসার অর্থহীন যান্ত্রিক এবং নানা সামাজিক নিয়মের নাগপাশে বাঁধা জীবনে আটকে পড়ে আছে। ইন্দ্রজিৎ এর মত কিছু মানুষ এই নিয়মের গন্ডী থেকে বেরিয়ে পড়তে চায়। তারা হল বিদ্রোহী। ইংরেজীতে যাকে বলে non- compliant, uncompromising… নাটকের এই বিদ্রোহী চরিত্র ইন্দ্রজিৎ আসলে লেখক নিজেই, নাটকে তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ইন্দ্রজিৎ এর সংলাপে তাঁর নিজের ভাবনা চিন্তারই প্রতিফলন ঘটেছে। ইন্দ্রজিৎ লেখকেরই দ্বৈত সত্তা, তার অল্টার ইগো।
লেখক ইন্দ্রজিৎকে নিয়ে যে নাটক লেখার চেষ্টা করছেন সেখানে তিনি আমাদের সাধারণ মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের চক্র বোঝাতে গিয়ে বলছেন “স্কুল থেকে কলেজ। কলেজ আর পরীক্ষা। পরীক্ষা আর পাস। তারপর দুনিয়া”। লেখক চরিত্রের ভেতর দিয়ে বাদল সরকার খুব সহজে জীবনের একটা ছক এঁকেছেন, যেই ছকে আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষেরা সবাই কম-বেশি ঘুরপাক খাচ্ছি।
ঘুরছি, ঘুরছি আর ঘুরছি…
লেখকের সংলাপে বার বার ওই কথা টা ঘুরে ফিরে আসে।
সেই ঘোরা বোঝাবার জন্যে আমরা স্টেজের পিছনের কালো ব্যাকড্রপে একটা মোটিফ এঁকে টাঙিয়ে দিয়েছিলাম, তাতে আঁকা ছিল একটা চাকার ছবি আর সেই চাকার মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে কিছু মানুষ।
ঘুরছি, ঘুরছি আর ঘুরছি
৪) অভিনব আঙ্গিক
বাদল সরকার এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকে এমন কিছু নতুন আঙ্গিক ব্যবহার করেছিলেন, যা আর কোন মৌলিক বাংলা নাটকে এর আগে দেখা যায়নি।
প্রথমতঃ, এই নাটকে স্টেজ বলতে কেবল লেখকের চেয়ার, টেবিল, আর একটা টেবিল ল্যাম্প, এ ছাড়া অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎ এর বসার জন্যে চারটে কাঠের cube, সেগুলো দরকার মত তারাই এখান থেকে ওখানে সরিয়ে নিয়ে যাবে। আর বাগানে ইন্দ্রজিৎ আর মানসীর পাশাপাশি বসে কথা বলার জন্যে একটা বেঞ্চ।
ব্যাস বাকি যত কিছু প্রপ্ দরকার সব অদৃশ্য, দর্শক কে কল্পনা করে নিতে হবে।
চাকরীর ইন্টারভিউ দেবার সীনে এক এক করে অমল বিমল কমল ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে, বাকিরা বাইরে বসে। ইন্টারভিউ যারা নিচ্ছেন তাঁরা অদৃশ্য, যে ইন্টারভিউ দিচ্ছে সে কেবল হাত পা নেড়ে মূকাভিনয় করে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। শেষে অদৃশ্য তিনজন প্রশ্নকারীদের সাথে হাত মিলিয়ে হেসে সে পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলে পরের জন ঢুকছে। বাইরে অপেক্ষমান অন্যরা তাদের নিজেদের সংলাপ বলে যাচ্ছে।
লেখক এর একটা সংলাপ আছে সেখানে সে বলছে আসলে ওদের বেশী প্রশ্ন নেই তো, একই প্রশ্ন সবাইকে করছে, তাই ওরা চায়না যে বাইরে বেরিয়ে এসে কেউ তার প্রশ্নগুলো তার বন্ধুদের বলে দিক।
চাকরীর ইন্টারভিউ
চাকরী পাবার পরে অফিসের সীনে, সেখানে অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎ কাজ করে। চার জন পাশাপাশি বসে। তাদের সামনে অদৃশ্য টেবিলে রাখা অদৃশ্য ফাইল ,কাগজ, টাইপরাইটার। তারা কথা বলতে বলতে হাত চালিয়ে ফাইলে চোখ বোলাচ্ছে, অদৃশ্য পাতা ওল্টাচ্ছে, অদৃশ্য টাইপরাইটারে অদৃশ্য কাগজ লাগিয়ে দুই আঙুল ব্যবহার করে বাতাসে টাইপ করছে।
এছাড়া আছে একই অভিনেতার বিভিন্ন রোলের মধ্যে অনায়াস বিচরণ।
যেমন অফিসের দৃশ্যে লেখক হয়ে যান্ অফিসের বেয়ারা “হরিশ”! সেখানে তার কাজ হলো বাবুদের ফাই ফরমাস খাটা, দরকার মতো চা, সিগারে্ট, ফাইল এই সব এনে দেওয়া। অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎরা তাকে নানা সুরে “হরিশ ! হরিশ!!” বলে ডাকলেই সে তাদের কাছে “বলুন স্যার” বলে গিয়ে হাজির হয়। হরিশের জন্যে কোন আলাদা অভিনেতা নেই, লেখক দর্শকদের সামনেই কাঁধে একটা কাপড় নিয়ে হরিশ হয়ে যায়।
মাঝে মাঝে সেই হরিশ আবার অফিসের ম্যানেজার হয়ে গিয়ে সেক্রেটারী মিস মালহোত্রা কে ডেকে চিঠি dictate করে। তখন তার কাঁধে আর টেবিল পরিস্কার করার কাপড় নেই, তার চালচলনে তখন রাশভারী ব্যক্তিত্ব। অমল বিমল কমলরা তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে “গুড মর্ণিং স্যার” বলে।
এদিকে মানসী দিব্বি মিস মালহোত্রা হয়ে গিয়ে অদৃশ্য খাতায় অদৃশ্য পেন দিয়ে ডিক্টেশন লেখে।
এই সব অভিনব নতুন আঙ্গিক ব্যবহার করার জন্যেও এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছে সমানভাবে আদৃত হয়।
অফিসের দৃশ্য – কখনো হরিশ, কখনো ম্যানেজার
৫) নাটকের শুরু
এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকের শুরুটা বেশ মজার।
রাসবিহারী মোড়ের কাছে মুক্ত অঙ্গন মঞ্চে এই নাটকটা প্রথম দেখি ১৯৬৬ সালে। প্রথম সীনে পর্দ্দা খোলার পরে যখন লেখক স্টেজে দর্শকদের সাথে কথা বলছে তখন হঠাৎ সামনের সারির দর্শক আসন থেকে একটা গুঞ্জন শুরু হলো। দু’জন দর্শকের মধ্যে সীট নিয়ে বাদানুবাদ। একদিকে স্টেজে লেখক তার সংলাপ বলছে, অন্যদিকে হলে সেই জায়গাটাতে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে গেছে, একটা জটলার মত, আর গুঞ্জন ক্রমশঃ কোলাহলের দিকে এগোচ্ছে।
ব্যাপার টা কি?
এমন সময়ে ওই জটলার দিকে লেখকের চোখ পড়বে, এবং সে তার সংলাপ বন্ধ করে ওই কোলাহলরত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলবে, “এই যে শুনছেন, ও মশাই! আপনারা একবার একটু ওপরে উঠে আসবেন?”
তারপর “আমাদের বলছেন?” বলে চার মূর্ত্তি অমল বিমল কমল ইন্দ্রজিৎ এক এক করে স্টেজে উঠে তাদের নাম বলবে।
কি নাম আপনার? অমল কুমার বোস।
আপনার? বিমল কুমার ঘোষ। ইত্যাদি।
আমার ভাই খোকন গল্প করে যে তার এক বন্ধু সব্যসাচী নাকি একবার নাটক দেখতে গিয়ে ওই ঝগড়ার সময়ে অমল বিমলদের পিছনেই বসেছিল। ওদের ঝগড়া দেখে সে বুঝতে পারেনি যে ওই ঝগড়াটা আসলে নাটকেরই একটা অংশ, সে ওদের কাছে গিয়ে ঝগড়া থামাতে যায়। তার পরে লেখক যখন ওদের স্টেজে ডাকছে, তখন লেখক তাকেও ডাকছে এই ভেবে সে ওদের সাথে আর একটু হলেই স্টেজে উঠে “আমার নাম সব্যসাচী সেন” বলে একটা কেলো করতে যাচ্ছিল, নাটকের কিছু লোক তাকে হাত ধরে টেনে নামিয়ে আনে।
এই সীট নিয়ে ঝগড়ার কথা অবশ্য নাটকে লেখা নেই। এটা কিছুটা ইম্প্রোভাইস করা। আমরাও এই ভাবে আমাদের নাটক শুরু করি।
এই দৃশ্য টা রোজ রীতিমতো রিহার্সাল হতো। অবশ্য আমাদের নাটকের ভিডিও তে ঝগড়াটা ওঠেনি। আমি আমাদের ভিডিওগ্রাফার ভিক্টর কে বলেছিলাম ঝগড়াটা তুলতে কিন্তু ওই জায়গাটা অন্ধকার ছিল, তাই বোধহয় তোলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ওই সময়ে হলে একটা অস্পস্ট চ্যাঁচামেচির আওয়াজ ভিডিওতে উঠেছে, এবং দেখা যাচ্ছে সামনের সারিতে বসে আমাদের সত্য (চক্রবর্ত্তী) বেশ বিরক্ত হয়ে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে কি যেন বলছে। ঝগড়া থামাতে বলছে ধরে নেওয়া যায়।
তার মানে আমাদের অভিনয় বেশ বিশ্বাস্য হয়েছিল!
নাটকের শুরু
৬) মাসীমা
মধ্যবিত্ত বাঙালী পরিবারে স্নেহময়ী মাসীমা জ্যেঠিমা কাকীমা পিসীমা কেউ না কেউ একজন থাকবেনই। এই নাটকেও একটি মাসীমার চরিত্র আছে, যিনি মাঝে মাঝেই লেখকের কাছে এসে “ওরে ভাত যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল, কখন থেকে ডাকছি, খেতে আয় বাবা!” বলে অনুরোধ উপরোধ করেন।
কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ হয়না।
লেখকের মনে নানা চিন্তা। আমি কে? আমি কি? আমি কেন? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি?
মাসীমা এসব কি কেন কোথায় প্রশ্নের মানে বোঝেন না। তিনি বলেন “কি যে ছাই হাবি জাবি ভাবিস তুই, বুঝিনা বাবা!”
কেন তুমি ঘড়ি ধরে অফিসেতে ছুটবে, তেল দিতে কেন বাছো অন্যের চরকাই?
সব্বাই করে বলে সব্বাই করে তাই। ”
নিয়মের গন্ডীতে বাঁধা আমাদের নাগরিক জীবন কে বোঝাতে বাদলবাবু এই “সব্বাই করে বলে” লাইনটি ব্যবহার করেছিলেন, যা এক সময় লোকের মুখে মুখে ঘুরতো।
সব্বাই করে বলে সব্বাই করে তাই – লেখক ও মাসীমা
৭) প্রেম
স্কুলের পরে কলেজ, এবং কলেজে পড়ার সময় প্রেম।
আমাদের প্রায় প্রত্যেকের জীবনচক্রে এ এক অনিবার্য্য ঘটনা, নাটকে জীবনের ওই সময়টা ছুঁয়ে গেছেন নাট্যকার।
অমল বিমল কমল আর লেখক চার জন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের সামনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় নানা বয়সের নানা ধরণের মেয়েরা, তারা সতৃষ্ণ নয়নে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথমে দেখা যায় সাধারণ পরিবারের একটি মেয়ে হাতে বই খাতা নিয়ে কলেজে হেঁটে যাচ্ছে। তার একটু পরে দেখা গেল এক আধুনিকাকে, তার হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ, চোখে সানগ্লাস, চলার ভঙ্গীতে লাস্য।
এবং আরও একটু পরে তার আশ্চর্য্য হয়ে দেখলো একটি মেয়ের সাথে কথা হেসে হেসে অন্তরঙ্গ ভঙ্গীতে কথা বলতে বলতে তাদের দিকে একবার ও না তাকিয়ে চলে গেল তাদের বন্ধু ইন্দ্রজিৎ~
“ডুবে ডুবে কিরকম জল খাচ্ছে দেখেছিস – আমাদের সাথে একবার আলাপ করিয়ে দিলোনা।” দু;খ করে বললো অমল বিমল কমল।
কিন্তু ইন্দ্রজিৎ এর সাথে এই মেয়েটি কে?
জানা গেল এই মেয়েটির নাম মানসী, এবং সে ইন্দ্রজিৎ এর এক দূর সম্পর্কের বোন হয়। তারা পার্কের বেঞ্চে গিয়ে পাশাপাশি বসে, কথা বলে, আর দর্শকদের কল্পনা করে নিতে হয়, তাদের মাথার ওপরে কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল ধরেছে, সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে আকাশে চাঁদ ওঠে, ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলো জ্বলে ওঠে।
ইন্দ্রজিৎ ও মানসীর প্রেম শেষ পর্য্যন্ত নাটকে পরিণতি লাভ করেনি। ইন্দ্রজিৎ চেয়েছিল মানসীকে বিয়ে করতে। কিন্তু মানসী রাজী হয়নি। এখানেও সেই সমাজের নিয়মের প্রশ্ন উঠে এসেছে। মানসীর মনে সংশয় ছিল যে দূর সম্পর্কের বোন কে বিয়ে করলে তাদের বিয়ে পরিবারের মান্যতা হয়তো পাবেনা।
অনেকদিন মানসী বা ইন্দ্রজিৎ কেউই বিয়ে করেনি। দেখা করেছে, কথা বলেছে। ইন্দ্রজিৎ বারবার বলেছে বিয়ের কথা কিন্তু মানসী রাজি নয়।
ইন্দ্রজিৎ ও মানসী
৮) বিবাহ
লেখক যে জীবন চক্রের ছক এঁকেছেন তাতে কলেজ পাসের পর দুনিয়া। সেই দুনিয়ায় টিকতে হলে একটা চাকরি দরকার, রুটি-রুজির নিশ্চিত ব্যবস্থা দরকার। ইন্দ্রজিৎ ও তাঁর বন্ধুরা সেজন্য চাকরির খোঁজ করে, ইন্টারভিউ দেয়। তারপরে এক সময় তারা চাকরীও পায়। এবং স্বাবলম্বী হবার পরে তারা জগতের নিয়ম মেনে বিয়েও করে।
এই ভাবেই নাটকে জীবনের একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে যায় তারা।
বিয়ের প্রথমে বর আর বৌ, মধ্যবয়েসে স্বামী আর স্ত্রী আর শেষ বয়েসে গিয়ে কর্ত্তা আর গিন্নী… নাটকে জীবনের তিন বয়সের দাম্পত্যের দৃশ্য দেখিয়েছেন নাট্যকার।
সদ্য বিয়ে হয়েছে অমলের, সদ্যবিবাহিত বলে তারা এখন বর আর বৌ। বৌকে একা পেয়ে অমল তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে লজ্জা পেয়ে বৌ “কি করছো? কেউ দেখে ফেলবে!” বলে একটু দূরে সরে যায়।
বিমলের বিয়ে কয়েক বছর হলো হয়েছে, তারা এখন স্বামী আর স্ত্রী। এক দৃশ্যে সকালে বিমল খবরের কাগজ পড়ছে, তার স্ত্রী তার সামনে চায়ের কাপ রেখে বলে “আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরো, দিদি জামাইবাবুর বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে!”
কমলের এখন বেশ বয়েস, সে আর তার স্ত্রী এখন কর্ত্তা আর গিন্নী। তাদের ছেলের অসুখ, অফিস ফেরত তার ওষুধ কিনে আনার কথা ছিল, কিন্তু সে ভুলে গেছে, তাই তাকে গিন্নীর গঞ্জনা শুনতে হয়।
আমাদের সকলের দাম্পত্য জীবনের এই সব অতি পরিচিত দৃশ্য!
বিয়ের পরে বর বৌ, স্বামী স্ত্রী, ও কর্ত্তা গিন্নী
৯) দুনিয়া
এই ভাবেই দিন কাটে। অমল বিমল কমল যুবক থেকে মধ্যবয়েসী এবং তারপর প্রৌঢ় হতে থাকে।
জীবনচক্রে ধীরে ধীরে আটকে যায় সবাই।
ঘুরে ফিরে অমল-কমল-বিমলের সাথে দেখা হয় লেখকের। এরা সবাই চাকরি-বাকরি, ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। যদিও কেউই তেমন সুখী নয়।
অমল লেখককে বলে, “এই এ-বি-সি-ডি কোম্পানিতে ঢুকে ভবিষ্যৎটা ঝরঝরে হয়ে গেল। সিনিয়র অ্যাসিসটেন্টের পোস্টে ছ’বছরের এক্সপেরিয়েন্স, জানো? আর অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার করে নিয়ে এল, বাইরে থেকে এক মাদ্রাজিকে!”
বিমল জমি কেনা বেচা আর বাড়ী তৈরী করার প্রোমোটার হয়েছে। তার হাতে অনেক বাড়ী আর জমি। লেখক কিনতে চাইলে খুব কম দামে সে ভাল জমি বা বাড়ীর সন্ধান দিতে পারে। তাছাড়া তার মনে অনেক নতুন লাভজনক ব্যবসার স্কীম আছে, লেখকের যদি উৎসাহ থাকে…
ওদিকে কমল তার চাকরীর বাঁধা মাইনের বাইরেও কিছু উপার্জ্জনের আশায় ইন্সিওরেন্স বিক্রী করে। সে লেখক কে বলে “একটা ইন্সিওরেন্স পলিসি করিয়ে নিতে ভুলোনা কিন্তু!”
এই ভাবেই আমাদের বাঙ্গালী মধ্যবিত্তদের বর্ণহীন, স্বাদহীন, যান্ত্রিক, গতানুগতিক নাগরিক জীবন এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে এগিয়ে যায়। অমল রিটায়ার করে, অমলের ছেলে অমল চাকরী পায়। বিমল অসুখে পড়ে, বিমলের ছেলে বিমল চাকরী পায়। কমল মারা যায়, কমলের ছেলে কমল…
১০) ইন্দ্রজিৎ কি নির্মল ?
কিন্তু নাটকের মুখ্য চরিত্র ইন্দ্রজিৎ কোথায়? ওদের মতই সেও কি চাকরি করছে? বিয়ে করেছে?
জানা গেল ইন্দ্রজিৎ একটা কোর্স করতে লন্ডন চলে যায়। সেখান থেকে সে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে পৃথিবীর পথে। ত।রপর এক সময় দেশে ফিরে আসে ইন্দ্রজিৎ। বিয়ে করে অন্য এক মানসী কে। লেখকের সাথে একদিন দেখা হয় তার। অনেকদিন পর দেখা তাই লেখক অনেক কথাই জানতে চাইছে ইন্দ্রজিতের কাছে, কেমন আছে? কি করছে? কিন্তু লেখক যতোটা শুনতে চায় ইন্দ্রজিতের বলার মতো ততোটা নেই।
আমাদের জীবনের দৈনন্দিনতা আর প্রাত্যহিকতার গ্লানি, রোজ রোজ একই বিষয়ের ফিরে ফিরে আসা, একই রুটিনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া, অস্তিত্বের ভার, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার মধ্যে মধ্যে নিহিত থাকে এক ধরণের অবসাদ আর ক্লান্তি। তার সাথে থাকে আমাদের হাজারো না পাওয়া, বাধাবিপত্তি, অসুখবিসুখ, ব্যর্থতা, বিপর্য্যয়।
ইন্দ্রজিৎ বলে, “দুনিয়াতে বলবার মত ঘটনা প্রায়ই ঘটে না”।
আমি সকালে বাজার করি। আমার বৌ রান্না করে।
আমি খেয়ে দেয়ে অফিসে যাই। আমার বৌ বাড়ীর কাজ করে।
আমি অফিস থেকে ফিরি। আমার বৌ আমার জন্যে চা নিয়ে আসে।
সুমন গুণের সাম্প্রতিক এই কবিতাটিতে এক সাধারণ নারীর জীবনের এইরকম বর্ণহীন, স্বাদহীন, গন্ধহীন একটি দিনের কথা লেখা আছে।
—————
লালন – সুমন গুণ
বাড়ীতে দুপুরে তুমি একা থাকো, একমাত্র ছেলে সকাল দশটায় যায় কাজে/
তারপর তোমার আর খুব কিছু করার থাকেনা, ভোরে উঠে চা করে ঘর মুছে/
ইন্দ্রজিৎ তার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, কারণ সে ভেবেছিল সে বাকিদের থেকে আলাদা। কিন্তু আজ তার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। এখন তার মনে হচ্ছে সে ইন্দ্রজিৎ নয়, সে অমল-কমল-বিমলের মতই সাধারণ আরেকজন। সে নির্মল। এখন বাকি জীবনটা ঘর-সংসার, চাকরি-বাকরি করে কাটিয়ে দিতে চায় সে।
কিন্তু ইন্দ্রজিৎ তো নির্মল হতে পারবেনা, সে তো সাধারণ হতে পারবে না। কারণ হিসেবে লেখক বলেন, “কিন্তু তোমার যে কিছু নেই। প্রমোশন নেই, বাড়ি করা নেই, ব্যবসার স্কিম নেই, কী করে নির্মল হবে তুমি?”
তাহলে কি ইন্দ্রজিৎ আলাদা হতে পারলো? ইন্দ্রজিৎ কে নিয়ে নাটক লেখা কি সার্থক হলো?
লেখক নাটকের শেষ টানেন, “আমাদের অতীত-ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে গেছে। আমরা জেনে গেছি পেছনে যা ছিল, সামনেও তাই।”
মোটিফের কাগজে তাই ওই চাকার পাশে একটা দূরান্তে চলে যাওয়া এক জোড়া রেল লাইন ও এঁকে দিই আমরা।
পিছনেও যা, সামনেও তাই। মনে হয় দুই লাইন হয়তো কোথাও এক জায়গায় গিয়ে মিশেছে, কিন্তু তা নয়। কোনদিনই ওরা এক হবেনা।
গ্রীক পুরাণের হতভাগ্য সিসিফাস সারা জীবন একাট ভারী লোহার বল ঠেলে ঠেলে পাহাড়ের ওপরে তুলতেই সেটা আবার গড়িয়ে নীচে নেমে যেতো। বাদল সরকার নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষদের সেই সিসিফাসের সাথে তুলনা করেছেন।
That’s all ladies and gentlemen
১১) আমাদের দল
কুয়েতের বি সি এসে নাটকে উৎসাহী যুবকের কোন অভাব নেই। বরং তারা সংখ্যায় এত বেশী যে সবাইকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়াই মাঝে মাঝে কঠিন হয়ে পড়ে। এবং ইন্দ্রজিৎ এর ক্ষেত্রে যেহেতু মাত্র সাতটি চরিত্র তাই অনেককেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাদ দিতে হয়েছিল।
মহড়া হয়েছিল প্রায় তিন মাস ধরে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবার বাড়ীতেই হতো। মনে আছে আমাদের সবার মাসীমা নুপূর রোজ রিহার্সালে বাড়ীতে তৈরী নারকেলের নাড়ু বানিয়ে নিয়ে আসতো। নিমেষে তা উধাও হয়ে যেতো অবশ্যই।
প্রবাসী জীবনে নাটকের থেকেও বেশী উপভোগ্য হত মহড়া উপলক্ষ্যে সবার একজোট হওয়া। হৈ হৈ আড্ডা এর ওর পিছনে লাগা এসব তো ছিলই। কিন্তু সব চেয়ে ভাল লাগতো নাটকটির পিছনে এই দলের সকলের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে।
পার্থসারথী (বর্দ্ধন) স্টেজ আর আবহের দায়িত্বে ছিল। স্টেজে অবশ্য বিশেষ কাজ কিছু ছিলনা। কেবল ওই পিছনে কালো কাগজের ওপর একটা চাকা আর রেল লাইনের মোটিফ এঁকে সাঁটিয়ে দিতে বলেছিলাম ওকে। আবহে সে ব্যবহার করেছিল পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীত। Bach, Beethoven এবং অন্যান্য দিকপালদের Cello Violin ইত্যাদি। অভিনেতাদের সংলাপ ধরার জন্যে মেঝেতে রাখা ফ্লোর মাইক ব্যবহার করেছিলাম।
অমিতেন্দ্র (বাগচী) ছিল আলোর দায়িত্বে। এই নাটকে আলোর কোন কেরামতি ছিলনা। দু’ তিনতে ফ্লাড লাইটেই কাজ হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তার তেমন কোন অসুবিধে হয়নি।
মনে পড়ে যে নাটক শুরু হবার এক ঘন্টা তখনো বাকি, আমি হলে পৌঁছে দেখি সেই মোটিফের কাগজটা পিছনের ব্যাকড্রপে সাঁটানো হয়নি, পার্থকেও দেখা যাচ্ছেনা। কোথায় গেল? এদিকে একটু পর থেকে দর্শকরা আসতে শুরু করবে।
পার্থ অবশ্য খুবই দায়িত্ববান ছেলে। বি সি এসের অনেক নাটকের কাজ সে একাই সামলেছে। তো একটু পরেই সে তার কাগজটা নিয়ে এসে পিছনে সাঁটিয়ে দিলো।
দিয়ে আমায় বললো, “কি ইন্দ্রজিৎ দা’, ঠিক আছে তো?”
দেখলাম তার আঁকার size আর proportion আমি যেরকম চেয়েছিলাম, একদম তাই হয়েছে। হলের একদম পিছন থেকেও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।
আমি পার্থকে বললাম, “পারফেক্ট!”
কুয়েতের তিনটে ইংরেজী কাগজেই আমাদের নাটকের রিভিউ ছাপা হয়েছিলা। তার সব গুলোতেই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা।
আমাদের দলের অভিনেতা দের সাথে সুভদ্রা আর আমি (নাটকের আগে)
কাস্ট পার্টি তে উপহার পেয়ে উৎফুল্ল পরিচালক
১২) পরিশিষ্ট – বাদলবাবু
কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ মঞ্চস্থ করার আগে নিয়ম অনুযায়ী পরিচালক হিসেবে বি সি এসের হয়ে আমি নাট্যকার বাদলবাবুকে নাটকটি কুয়েতে করার অনুমতি চাইবার জন্যে কলকাতায় ফোন করেছিলাম। তিনি আমার ফোন পেয়ে খুসী হয়েছিলেন, এবং অবশ্যই আমাদের কুয়েতে তাঁর নাটক মঞ্চস্থ করার অনুমতি ও দিয়েছিলেন।
সাফল্যের সাথে নাটকটি কুয়েতে মঞ্চস্থ হবার পরে আমরা তাঁকে বি সি এসের পক্ষ থেকে সন্মানী হিসেবে একটি চেক পাঠাই। লেখকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল শুকদেব (চট্টোপাধ্যায়) , সে নিজে হাতে গিয়ে বাদলবাবুকে সেই চেক দিয়ে আসে। সেই চেকের সাথে একটা ইংরজীতে লেখা প্রাপ্তির (Receipt) চিঠিও ছিল, তাতে সই করে আমাদের পাঠাবার জন্যে।
সেই ইংরেজী প্রাপ্তির চিঠি সই করার সাথে সাথে বাদলবাবু বাংলায় নিজে হাতে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লিখে আমাদের পাঠিয়েছিলেন।
বাদলবাবু আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, আমরা তাঁর পরলোকগত আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি
তোমাদের মধ্যে যাদের আমার কাছাকাছি বয়েস, তাদের মনে থাকতে পারে আমাদের ছোটবেলায় বিজয়া দশমী এলে পূজো শেষ হয়ে গেল ভেবে মনটা বেশ খারাপ হত ঠিকই, কিন্তু একই সাথে বিজয়ায় অনেক আত্মীয়স্বজন বাড়ীতে দেখা করতে আসতেন এবং তাঁদের জন্যে মা জ্যেঠিমা কাকীমারা অনেক খাবার তৈরি করে রাখতেন। আর আমরা ছোটরা সেই সব খাবারের ভাগ পেতাম।
কিন্তু বিজয়ার প্রধান downside ছিল দু’টো।
এক হলো গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা। আজকাল এই নিয়মটা কি উঠে গেছে? বোধ হয় না।
এখন আমি নিজে একজন গুরুজন হয়ে গেছি, কেউ আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে আমার একটু অস্বস্তি হয়। কিছুদিন আগে গায়ত্রীমাসীর নাতি ঋদ্ধির (মুনিয়া আর দেবাশীষের ছেলে) বিয়েতে গিয়েছিলাম, সেখানে ছোটরা অনেকে ছিল। ঋদ্ধি আর তার নববধূ শীতল তো বটেই্, তা ছাড়া গার্গীর ছেলে শুভ আর তার বৌ সোহিনী, উদয়ের মেয়ে রমিতা, রঞ্জুর মেয়ে তু্তুন, আর তার স্বামী রোহন। এরকম আরো অনেকে সবাই আমায় আর সুভদ্রাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো, আমি বাধা দিতে গেলে তারা আমার কথা শোনেনি।
বড়দের শ্রদ্ধা জানানোর এই পুরনো প্রথা আজকের তরুণ ছেলে মেয়েরাও চালু রেখেছে দেখে আমার ভাল লেগেছে।
মনোহরপুকুরে আমাদের ও তখন এই রকম পাইকারী হারে গুরুজন দের প্রণাম করার প্রথা ছিল। আমাদের বাড়ী তখন গুরুজনে একেবার টইটম্বুর ভর্ত্তি, তার ওপর আবার যাঁরা দেখা করতে আসতেন তাঁদেরও প্রণাম করা নিয়ম ছিল। নো ছাড়ান ছুড়ন…
——–
বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় তাঁর বরযাত্রী বই তে এক জায়গায় লিখছেন, গণশা বলিল, “পরশু মাসীর বাড়ী গেছলাম। মা মাসী ডেকে ডেকে তেইশজন কে পায়ে হাত দিয়ে পেরনাম করালে, তার মধ্যে তিন জন ফাউ। সেখানে অত গুরুজন আছে জানলে ওদিক মাড়াতামনা। কোমরের ফিক ব্যাথাটা এসা আউড়ে উঠেছে!”
ত্রিলোচন প্রশ্ন করিল, “ফাউ মানে?”
“তিনটে তাদের মধ্যে কাজের লোক ছিল, ঘাড় তুলে তাকাবার তো আর ফুরসত ছিলনা!”
————
বিজয়াতে ছেলেদের মধ্যে কোলাকুলির চল অবশ্য এখনো আছে। এখানে ছোট বড়র কোন প্রভেদ নেই, ছোটরাও গুরুজনদের সাথে কোলাকুলি করতে পারে্।
এই নিয়ে একটা গল্প শুনেছিলাম।
———–
একবার বিজয়ার পর ভীড় বাসে দুই বন্ধুর দেখা, কিন্তু তাদের মাঝখানে অনেক সহযাত্রী, তাদের শরীরের মধ্যে কয়েক স্কোয়ার ইঞ্চি ফাঁক, সেই ফাঁক দিয়ে তারা পরস্পর কে হেসে শুভ বিজয়া জানাচ্ছে।
কিন্তু এই ভীড় বাসে দূর থেকে নমস্কার বা কোলাকুলি করা অসম্ভব। একে তো দূরত্ব, তার ওপরে দুই হাত দিয়ে ওপরে বাসের হ্যান্ডেল ধরা। নমস্কার যে করবেন তারও উপায় নেই, হ্যান্ডেল থেকে হাত ছাড়লেই উল্টে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা।
দু’জনে তাই যতটা সম্ভব তাদের হাত দুটো ওপরে রেখেই দুই কাঁধ সামনে পিছনে একটু আন্দোলিত করলেন, কোলাকুলি বোঝাতে।
বোঝো কান্ড।
————
দ্বিতীয় downside ছিল বিজয়ার চিঠি লেখা। উঃ, এখন ভাবলে মনে হয় সে ছিল এক বিভীষিকা।
আর যে সব গুরুজনরা বাইরে থাকতেন – তাঁদের সংখ্যাও কিছু কম নয় – তাঁদের নিয়ম করে চিঠিতে বিজয়ার প্রণাম জানাতে হতো। সে আর এক যন্ত্রণা। আজ যেরকম গ্রুপ মেলে বা Whatsapp এ একবার লিখেই সবাইকে একসাথে সবাই কে পাঠিয়ে দেওয়া যায়, তখন তো আর তা ছিলনা। তখন প্রতিটি চিঠি আলাদা আলাদা লিখতে হতো, আর তাও শুধু ন্য়, একটা পোস্টকার্ডে বা ইনল্যান্ডে বেশ কয়েকজন প্রণাম আশীর্ব্বাদ ইত্যাদি জানাচ্ছেন, লেখার জায়গা ক্রমশঃ কমে আসছে, কিন্তু তার মধ্যেই কোনমতে জায়গা করে নিয়ে কখনো মার্জিনে কিছুটা, শেষে কিছুটা, এই ভাবে ভেঙে ভেঙে লিখতে হতো, মাঝে মাঝে নাম ঠিকানার জায়গাতেও প্রণাম জানিয়েছি, প্রায়ই অক্ষর গুলো এত ছোট হয়ে যেত আর হাতের লেখা এত বিশ্রী, যে কেউ সেই লেখা পড়তে পারতো কিনা বলা মুস্কিল।
কেবল একটাই যা সান্ত্বনা ছিল, যে পড়তে না পারলেও কোন অসুবিধে ছিলানা, কেননা কি লেখা আছে তা তো সবারই জানা।
“তুমি আমার বিজয়ার প্রণাম নিও, ছোটদের ভালবাসা জানিও।” ব্যাস, এই তো?
এই একই বাক্য আমাদের সারা দিন ধরে শ’ খানেক চিঠিতে রোবোটের মত লিখে যেতে হতো।
এটা একটা শাস্তি নয়?
বিজয়া দশমী এলেই সেই মিষ্টি খাবার আনন্দের পাশাপাশি ওই শাস্তির কথাটাও এখনো মনে পড়ে।