এ আমার, এ আমার, এ আমার

মা ও ছেলে

নভেম্বর, ২০১৭

মা’র ৯৪ বছর বয়েস হল, ক্রমশঃ আরো ক্ষীন আর দুর্ব্বল হচ্ছেন। সারাদিন বাড়ীতে বন্দী, লাঠি ধরে আস্তে আস্তে হাঁটেন। ভাই বোন সমবয়েসী খেলার সাথী এক এক করে সবাই চলে গেছেন, এখন তাঁরও ওপারে যাবার অপেক্ষা।

আমি মা’র একমাত্র সন্তান তাই তাঁর স্নেহের সিংহভাগ আমিই পেয়ে এসেছি। অবশ্য সেই স্নেহের উল্টোদিকে ছিল কঠোর শাসন আর পরের দিকে গভীর দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগ, যার ভারও আমায় সারা জীবন একাই বইতে হয়েছে।

১৯৬৩ সালে খড়গপুরে হোস্টেলে যাবার সময়ে (আমার সেই প্রথম বাড়ী ছেড়ে একা থাকা)হাওড়া স্টেশনে আমায় তুলে দিতে এসেছিলেন মা আর বাবা। ট্রেণ ছেড়ে দেবার পরে অনেকক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়েছিলাম। দু’দিন পরে বাবার লেখা পোস্টকার্ড পেলাম। হাওড়া স্টেশনের পোস্ট অফিস থেকে সে দিন আমায় ট্রেণে তুলে দিয়েই লিখে পোস্ট করেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন তোমাকে ছেড়ে তোমার মা খুব কাঁদছেন, তুমি ঠিকঠাক পৌঁছলে কিনা জানার জন্যে আমরা খুব উদ্বিগ্ন থাকবো, তাই এই চিঠি পেয়েই উত্তর দিও।

এবছর পূজা সংখ্যা দেশে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস “ঘটনাক্রমে” র এক জায়গায় বৃদ্ধা মা মোহিনী এবং তাঁর প্রৌঢ় এবং অসুস্থ ছেলে সুকুমার কে নিয়ে তিনি লিখেছেনঃ

—————–

মোহিনী আর আগের মত চটপটে নন্‌, নানা ব্যথা বেদনা অস্থি সন্ধিতে বিকলতা, লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়। তাই তাঁর ছেলে সুকুমার যখন শেষ দুপুরে নার্সিং হোম থেকে ফিরলেন, তখন তিনি তেমন উদ্বেলিত হতে পারলেন না। তবে তাঁর মুখে এক অপরূপ হাসি ছিল। সুকুমার যখন তাঁর বিছানার পাশে পা ঝুলিয়ে বসলেন তখন মোহিনীর রোগা হাত সুকুমারের পিঠে বিচরণ করছে। কি খুঁজছে সেখানে কে জানে? কে জানে মায়ের হাত সন্তানের শরীরে বার বার নিজেকেই খুঁজে পায় কিনা। হয়তো হাত ও বিড়বিড় করে। এ আমার এ আমার এ আমার।

——————–

গল্পের মোহিনীর মত আমার মা ও এক কালে খুব চটপটে ছিলেন, সারা জীবন এ জি বেঙ্গলে চাকরী করেছেন, রোজ সকালে নিয়ম করে ভীড় বাসে চড়ে ডালহাউসী স্কোয়ারে অফিস গিয়েছেন, সন্ধ্যাবেলা রোজ ফিরেছেন ট্রামে। তাছাড়া বিশাল যৌথ পরিবারের অনেক দায়িত্ব সামলেছেন, নিকট এবং দূর সম্পর্কের দুঃস্থ আত্মীয়দের যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। দেশের প্রায় সব তীর্থস্থানে গিয়েছেন। সব মিলিয়ে তিনি এক আশ্চর্য্য সফল, ব্যস্ত এবং কর্ম্মবহুল জীবন কাটিয়েছেন। 

ছোটবেলায় আমি মা’র সাথে দূরপাল্লার ট্রেণে করে অনেক ঘুরেছি। কখনও দিল্লী, কখনও পাটনা, কখনও কাশী। সেই সব ভীড় ট্রেণে unreserved কামরায় হুড়োহুড়ি করে আমার হাত ধরে মা কি করে যে ঢুকে জায়গা করে নিতেন, ভাবলে বেশ অবাক লাগে।

কিন্তু সেই মা এখন সারাদিন আমাদের পূর্ণ দাস রোডের বাড়ীর বারান্দায় জানলার সামনে একটা চেয়ারে একা চুপ করে বসে থাকেন। কথা বলার লোক নেই, বলার মত কোন কথাও নেই। কিছুদিন আগেও খবরের কাগজ আর দেশ পত্রিকা খুঁটিয়ে পড়তেন, কিন্তু এখন মাঝে মাঝে কেবল গীতা নিয়ে পাতা উল্টোন্‌।

এখন আমি রোজ একবার মা’র কাছে বিকেলে যাই, মা’র পাশে বসে একসাথে চা খাই। পুরনো দিনের নানা কথা হয়। গল্পের মোহিনী র মতো মা আমার গায়ে মাথায় হাত বুলোন।

কোন কাজে আটকে গেলে আজ যেতে পারছিনা বলার জন্যে মা’কে ফোন করি, কিন্তু আমার ফোন পেয়ে কিছু বলার আগে মা নিজেই জিজ্ঞেস করেন, “কি রে আজ আসতে পারবিনা? আজ কি হলো, শরীর ঠিক আছে তো?”     

এই উদ্বেগ অবশ্য আমার বেশ ভালোই লাগে। নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি।     

একবার মনে আছে মা’কে নিয়ে এক ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে বাইরে হলে ডাক্তারের ডাকের অপেক্ষায় বসে আছি। পাশাপাশি বসার জায়গা নেই, তাই মা’র থেকে J একটু দূরে বসেছি। আমার পাশের লোকটি উঠে গেলে একটু জায়গা হতেই মা, ছোটখাটো মানুষটি, ক্ষিপ্র ভঙ্গীতে তীর বেগে কেউ আসার আগেই চলে এসে আমার পাশে বসে পড়লেন।

ছোট্ট ঘটনা, কিন্তু এখনো ভুলতে পারিনা।    

মাঝে মাঝে আমি আমার গাড়ীতে মা’কে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কোনদিন মাসতুতো বোন গার্গীর বাড়ী বাঁশদ্রোণী। কোনদিন মামাতো বোন মিনির বাড়ী কসবায়। এরকম আরো অনেক আত্মীয়স্বজন আর কাছের লোকের কাছে চলে যাই, খানিকক্ষন সময় কাটিয়ে আসি। মা বেশী কথা না বললেও তাঁর ভাল লাগে বুঝতে পারি। যাদের বাড়ীতে যাই তারাও খুব খুসী হয় মা’কে পেলে।

আমাদের যৌথ পরিবারে মা লতায় পাতায় সবার সাথে গভীর সম্পর্ক রাখতেন। এ ব্যাপারে তাঁর একটা স্বাভাবিক তৎপরতা ছিল।

কিছুদিন আগে মা’কে বললাম চলো তোমাকে তোমার অফিস দেখিয়ে আনি। এক সময়ে যেখানে তুমি রোজ যেতে।

মা রাজী।

প্রথম স্টপ মনোহরপুকুর। আমাদের বাড়ি আর নেই, বিক্রী হয়ে গেছে, সেখানে এখন নতুন বাড়ি, তার তলায় গিয়ে গাড়ীটা পার্ক করে কিছুক্ষণ থাকলাম। মা চুপ করে তাকিয়ে থাকলেন বাড়ীটার দিকে। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় তিনি এখানে কাটিয়েছেন।   

সেখান থেকে কালীঘাটে মায়ের মন্দির। মহিম হালদার স্ট্রীট দিয়ে কালীমন্দির যাবার পথে একটা নকুলেশ্বর শিবের মন্দির পড়তো সেখানে মা আর জ্যেঠিমা শিবের মাথায় জল দিতেন।বছরে অন্ততঃ তিন দিন আমি আর মা এক সাথে কালীবাড়ী যেতাম। আমার জন্মদিনে ভোরবেলা, শিবরাত্রির দিন বিকেলে আর কালীপূজোর দিন রাত্রে।

কালীঘাট থানার পরে মন্দিরের রাস্তায় ঢুকে ডান দিক বন্ধ, পুলিশ গাড়ী ঢুকতে দেবেনা, দূর থেকেই মা দুই হাত জুড়ে প্রণাম করে নিলেন। মা খুব শিবের ভক্ত ছিলেন, প্রায় সব সময় তাঁর গলায় “প্রণমামি শিবং শিব কল্পতরুং” গানের সুর শুনে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। 

তার পরে সেখান থেকে আশুতোষ মুখার্জ্জী রোড, হাজরা মোড়, পুর্ণ সিনেমা, জগুবাবুর বাজার, এলগিন রোড, লছমী বাবু কা সোনা চাঁদী কি দুকান। মা’কে বললাম কি, এই সব জায়গা চিনতে পারছো? তোমার তো চেনা রাস্তা, রোজ দু’বেলা বাসে করে এই রুটে যাতায়াত করতে।

মা ঘোলাটে চোখে জানলার বাইরে তাকিয়ে বললেন “কতো গাড়ী, কি ভীড়!”

সবই মা’র চোখে নতুন লাগছে মনে হলো।

তারপর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হয়ে রেড রোড দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন মা দেখলাম বাইরের সবুজ দেখে খুব খুসী। তার পরে ইডেন গার্ডেন আকাশবাণী ভবন হয়ে রাজভবনের সামনে মা’র পুরনো অফিস। সেখান থেকে আউটরাম ঘাটে গঙ্গা। মা আবার হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন।

এই সব জায়গা এক সময় কত পরিচিত ছিল তাঁর!   

বাড়ী যখন ফিরছি তখন অন্ধকার নেমে আসছে।

———————-

নভেম্বর, ২০২৩

এখন  এই ২০২৩ সালে যখন মা আর আমাদের মধ্যে নেই, আমি মাঝে মাঝে বাড়ীর বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি।  নীচে পূর্ণ দাস রোডে আর কেয়াতলা রোডে লোকজন, ব্যস্ততা,  গাছে পাখী এসে বসছে, কাঠবিড়ালী তরতর করে গাছের ডাল দিয়ে চলে যাচ্ছে,  চারিদিকে প্রাণের খেলা।

মনে হয় সবই আছে আগের মত, শুধু মা ই আর নেই।

কিছুদিন আগে সোশাল মিডিয়াতে একটা ভিডিও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।  সেখানে এক ভদ্রমহিলা বলছিলেন, এখন থেকে একশো বছর পরে, ধরো ২১২৩ সালে, যখন আমরা কেউ বেঁচে থাকবোনা,  তখন আমাদের এই যে এখন এত বাড়ী গাড়ী টাকা পয়সা,  এই সব কোথায় থাকবে? আমাদের কষ্টার্জ্জিত টাকায়  তৈরী বাড়ীতে থাকবে অচেনা লোকেরা, আমাদের এত সাধের দামী গাড়ী স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে পড়ে থাকবে।  আমাদের মৃত্যুর পর বড় জোর কয়েক দশক আমাদের পরের প্রজন্ম আমাদের মনে রাখবে,  আমাদের ছবি দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখবে, কিন্তু তারপর? আমরা কি আমাদের ঠাকুর্দ্দার ঠাকুর্দ্দার নাম কেউ জানি, বা জানতে চাই?

তাহলে মোদ্দা কথাটা কি দাঁড়ালো? 

ভিডিওর মহিলা বলছেন,  সবসময় ভাবো কত ক্ষণস্থায়ী আমাদের জীবন,  তাই  “এ আমার এ আমার এ আমার” বলে কোন কিছুকেই একান্ত নিজের বলে আঁকড়ে থেকে মনকে ভারাক্রান্ত কোরোনা।  

গীতায় ও ভগবান শ্রী কৃষ্ণ আমাদের সেই নিরাসক্তি আর নির্লিপ্তি সাধনা করার উপদেশ দিয়ে গেছেন।

মা’র মৃত্যু এখন অন্য আর একটি কারণে আমার জন্যে অনেক সহনীয় হয়ে  এসেছে।

২০১৯ সালে মা চলে যাবার পরের বছরেই (২০২০ সালে) আমাদের জীবনে কোভিডের অতিমারীর আবির্ভাব হয়।  

কোভিডের আগে অনেক বছর ধরে আমাদের মনে সার্থক জীবন আর ভাল মৃত্যু সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরী হয়েছে।  আগে  সেই চলে যাওয়া ছিল এক সার্থক জীবনের সুখী পরিণতি। দীর্ঘ জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে সব দায়িত্ব পালন করে পরিণত বয়সে আত্মীয় পরিজনদের সবাইকে পাশে রেখে সেই চলে যাওয়ার সার্থকতা এতদিন ছিল সামাজিক পরিপূর্ণতায়।

আমার মা যখন পরিণত বয়সে মারা যান, তখন শ্মশান ঘাটে গিয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আমার সব ভাই বোনেরা গিয়েছিল। তাঁর শ্রাদ্ধবাসরেও অনেকে এসেছিলেন, স্মৃতিচারণ করেছিলেন। আমাদের ধারণায় এই ছিল গ্রহণযোগ্য মৃত্যু।   

কিন্তু ২০২০ সালের এই করোনা ভাইরাস এসে ব্যক্তিমানুষের মৃত্যু নিয়ে আমাদের ধারণা যেন আমূল পালটে দিয়ে গেল।  

মৃত্যুর কি নতুন রূপ দেখলাম আমরা?

আনন্দবাজারে সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত লিখেছেন – “আমরা দেখলাম করোনা আক্রান্ত কে বাড়ী ফিরতে দেওয়া হচ্ছেনা, চিকিৎসক কে পাড়া ছাড়া করা হচ্ছে, মুমূর্ষূ কে এম্বুল্যান্স থেকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, আক্রান্ত কে তো বটেই, তার পরিবার কেও একঘরে করা হচ্ছে, ফুটপাথে পড়া রোগীর দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছেনা।  সেই সঙ্গে আতঙ্ক, গুজব, কুসংস্কার।  সংক্রমণের আশঙ্কায় আত্মীয় স্বজন কে মৃতদেহের কাছে যেতে দেওয়া হয়না। হাসপাতাল থেকেই সোজা কোভিড আক্রান্ত দের জন্যে আলাদা শ্মশানে দাহ করার জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ”

যাঁরা দেখাশোনা করেন, সেই নার্স ও ডাক্তাররা স্পেসস্যুটের মত পোষাক পরে থাকেন, যাতে তাঁরা আক্রান্ত না হন্‌। তাঁদের হাতে দস্তানা, চোখে ভারী গগলস্, যাতে বীজানু না ঢোকে। ফলে মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে রোগীর সাথে কোন মানুষের শারীরিক যোগাযোগ নেই। এমন কি ডাক্তার বা নার্সের চোখে কোন সহানুভূতির ছায়া অথবা তাঁরা যে কোন মানুষের সঙ্গের স্বাদ পাবেন, তারও উপায় নেই। 

আপনজনের মৃত্যু এমনিতেই অসহনীয় দুঃখের, কিন্তু করোনার আবহে  করোনাভাইরাস এমন একটা অসামাজিক চেহারা দিল মৃত্যুকে, যার জন্যে আমরা মানসিক ভাবে এখনো তৈরী নই।  হয়তো কোন দিন হবোনা।

আমার মা এই কোভিড অতিমারীর আগে চলে গেছেন এই কথা ভেবে মনের মধ্যে একটা স্বস্তি অনুভব করি।

ভুলভুলাইয়া

ধাবার সামনে দীপা, সুভদ্রা আর সুব্রত

২০১৬ সালের মে মাসে আমরা কুয়েত থেকে পাকাপাকি দেশে ফিরে এসেছি। কোন কাজ নেই, এই সময় দু’তিন দিনের জন্যে কলকাতার কাছে কোথাও বেড়াতে গেলে বেশ হয়।

হুগলি জেলায় ইটাচুণার রাজবাড়ী কথা বেশ কিছুদিন শুনছি। চেনাশোনা অনেকেই সেখানে গিয়ে থেকে এসেছে, তাদের কাছ থেকে খবর পেয়েই আমরা দুজনে এক উইকেন্ডে সেখানে গাড়ী ভাড়া এক রাতের জন্যে ঘুরে আসবো ভেবেছিলাম। দীপা গরমের ছুটিতে ছেলের সাথে কলকাতায় আছে, সে একদিন এসেছিল দেখা করতে, আমরা ইটাচূনা রাজবাড়ী যেতে চাই শুনে সে নেচে উঠলো, “চলো সুভদ্রা দি’, আমরা একসাথে যাই।”  

সুব্রত ঈদের ছুটিতে কুয়েত থেকে কলকাতায় আসছে, ওরা ইটাচূনা যায়নি, ঠিক হল আমরা চারজন একসাথে যাবো।  

ইটাচূণা আবার কি নাম?

অবশ্য গ্রামের নামের কোন মানে থাকতে হবে তার কি মানে আছে?

জলপাইগুড়ি তে ডুয়ার্সের একটা চা বাগানে একবার কাজে গিয়েছিলাম, অপূর্ব্ব সুন্দর জায়গা, চা বাগানের মধ্যে সারি সারি  লম্বা লম্বা shade tree,  দূরে নীল পাহাড়, কিন্তু জায়গাটার নাম ঘাটিয়া…

আমার ভালকাকীমার বাপের বাড়ী ছিল পুর্ব্ব বাংলার রংপুরের কাছে একটা গ্রামে, তার নাম গাইবান্ধা। কেন? ওখানে কি গরুদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয় নাকি?

গ্রামের নামের কোন মাথামুন্ডু হয় না, যা ইচ্ছে একটা হলেই হলো।

ইটাচূণা নামটা অবশ্য বেশ ভাল, তার ওপরে আবার রাজবাড়ী। গ্রামে আবার রাজা কোথা থেকে এল? জমিদার বা খুব বড়লোক হলে সবাই রাজামশায় বলে ডাকে।  সেরকমই কিছু হবে। ওই গ্রামের এক ভদ্রলোক শোনা যায় সাহেবদের আমলে ইট আর চূনের ব্যবসা করে লালে লাল হয়ে গিয়েছিলেন। সাহেবরা তাঁকে ভালবেসে অনেক জমি আর রাজা উপাধি দিয়ে থাকবেন, সেই থেকেই ইটাচূণা রাজবাড়ী। 

সুভদ্রা ইন্টারনেট থেকে ফোন নাম্বার যোগাড় করে ফোন করে দুটো ঘর বুক করে ফেলেছে। ঘরের নাম ঠাকুমার ঘর আর  বড়বৌদির ঘর।  বেশ নাম তো ? বনেদী রাজবাড়ীর অন্তঃপুরের একটা গন্ধ পাওয়া যায় ওই নামগুলোতে। ওই ঘরে আমরা থাকবো ভাবতে বেশ একটা উত্তেজনা হচ্ছিল।

সুভদ্রা যদি ঠাকুমা হয়, আমি কি তাহলে ঠাকুর্দ্দা? কিংবা সুভদ্রা বড়বৌদি, আমি বড়দা’?

মন্দ কি?

ইন্টারনেটের কল্যাণে আজকাল সব কিছুই ঘরে বসেই করা যায়, ইটাচূণা রাজবাড়ীর ওয়েবসাইটে গিয়ে আমি পরের দিন এক রাতের জন্যে পেমেন্ট ও করে দিলাম। দীপারা একটা বড় গাড়ীর বন্দোবস্ত করেছে।

বুধবার ৬ই জুলাই সকালে বেরোব, আগের দিন রাজবাড়ীর marketing office থেকে ফোন এলো। hiসকালে আর রাত্রে কি খাবেন? মেনু হল মাছ, মাংস, চিকেন আর ডিম।

বেশ ভাল ব্যবস্থা তো? Very well organized…

আমি আর সুভদ্রা মাছ, দীপা আর সুব্রত ডিম অর্ডার করলাম।

ছয় তারিখ কথামতো ঠিক সকাল সাড়ে দশটায় গাড়ী নিয়ে দীপা আর সুব্রত আমাদের আইরনসাইড রোডের বাড়ীতে হাজির। আমরাও তৈরী হয়ে ছিলাম।

বড় গাড়ী। টয়োটা ইনোভা,  পিছনে বুটে আমাদের মালপত্র রেখে আমরা যে যার মত বসে গেলাম। আমি ক্যামেরা হাতে সামনে, ড্রাইভারের পাশে। ড্রাইভারের নাম বাপী। বাপীর ছোটখাটো চেহারা, সে অল্প কথার মানুষ, আমায় একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলল দরকার পড়লে ডাকবেন, আমি এই দেশের সব জায়গায় গাড়ী চালিয়েছি। সব রাস্তা আমার চেনা।

কাল ইন্টারনেট থেকে আমি ম্যাপ ডাউনলোড করেছি, কিন্তু তার আর দরকার হবেনা, ইটাচূণা রাজবাড়ির রাস্তা বাপীর চেনা, সে এখানে আগে এসেছে।

রাস্তায় খাবার জন্যে আমরা গতকাল হলদিরাম থেকে কিছু নোনতা স্ন্যাক কিনেছি, আজ দীপা আর সুব্রত বেকবাগানে মিঠাই থেকে সিঙাড়া আর কড়াপাকের সন্দেশ কিনে নিলো গাড়ী থামিয়ে।

পার্ক সার্কাস ব্রীজ ছাড়িয়ে সেকেন্ড হুগলী ব্রীজ, সেটা ছাড়াতেই দেখা গেল নীল রং দিয়ে সাজানো নবান্ন বিল্ডিং। তারপরে কোনা রোড চলে এলো, ক্রমশঃ লোকালয় ছাড়িয়ে যাচ্ছি আমরা, দু’পাশের দৃশ্যপট landscape দ্রুত পালটে যাচ্ছে। সুভদ্রাদের রামরাজাতলার বাড়ীর রাস্তা পেরিয়ে গেলাম, শহর থেকে শহরতলী, রাস্তার পাশে বাড়ী আর দোকান বাজারের চেহারা পালটে যাচ্ছে।

শহরতলী ছাড়িয়ে ক্রমশঃ চওড়া দূর্গাপুর হাইওয়ে দিয়ে আমাদের গাড়ী যাচ্ছে।  

অনেকক্ষণ গাড়ীতে আছি, এবার একটা rest room break নিলে হয়না?

বাপীকে বলতেই সে পথে একটা Rest area তে নিয়ে এসে গাড়ী থামালো। এই সব জায়গা সব তার হাতের পাতার মত চেনা।

বিরাট একটা খোলা জায়গা, মাঝখানে HP petrol station, দূরে HP নামে একটা ধাবা।    

ধাবার দরজায় এক বিশাল চেহারার ভদ্রলোক হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন।

এই এক শুরু হয়েছে দেখছি আজকাল এই দুই হাত জোড় করে নমস্কার। কোন মলে গেলে সিকিউরিটি গার্ডরা আমাদের body check করার আগে নমস্কার করবেই। কেন রে বাপু? আমরা তো টেররিস্ট হতে পারি। আমাদের পেটে বোমা গোঁজা কিংবা পকেটে ছুরি কিংবা রিভলভার থাকতে পারেনা? ভাল করে আমাদের চেক কর্‌ তা না যেন আমরা রামচন্দ্র আর তারা ভক্ত হনুমান।

“অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ” কথাটা পালটে এখন বলা উচিত “অতি ভক্তি গার্ডের লক্ষণ।”   

দোকান ফাঁকা, কিছু চেয়ার আর সোফা এদিক ওদিক বসানো। কাউন্টারে আর এক হুমদো মত ভদ্রলোক বসে আছেন।

প্রথম হুমদো হাত জোড় করে নমস্কার করে আমাদের বললেন “আসুন, আসুন!”

আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কফি পাওয়া যাবে?”

অবশ্যই  পাওয়া যাবে জানালেন তিনি। কফির অর্ডার দিয়ে দিলাম আমরা। সুভদ্রা আর দীপা বাথরুমে যাবে। কিন্তু ধাবায় বাথরুম নেই। দোকানের একটি ছেলে ওদের দূরে বাথরুম দেখাতে নিয়ে গেল। ইতিমধ্যে সুব্রত কাউন্টারের দ্বিতীয় হুমদো ভদ্রলোক কে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে শুরু করেছে।

এই দোকানটা কি HPর ? না, ওঁরা ফ্রাঞ্চাইজ নিয়েছেন।

মালিক কে? ওই যিনি দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন।

তাহলে আপনি? আমি কর্ম্মচারী।

আজ তো ঈদের ছুটি, দোকানে ভীড় নেই কেন? কি করে বলবো? পরে বিকেলের দিকে ভীড় হবে আশা করছি।

আপনাদের এখানে কি ঘর পাওয়া যায়? না।

ক’জন লোক কাজ করে? দশজন।

আমি বুঝতে পারছিলাম সুব্রত র এই  grilling ভদ্রলোকের পছন্দ হচ্ছেনা। কিছুক্ষণ পরে ওনার একটা ফোন এল, তিনি সুব্রতর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেলেন। 

কফি আর আসেনা, ওদিকে সুভদ্রা আর দীপাও ফিরছেনা। আমি আর সুব্রত দু’জনে বসে আড্ডা মারছি। আমাদের আজকের সাবজেক্ট পৃথিবীতে তেলের দাম কেন কমে যাচ্ছে? সুব্রত তেল কোম্পানীতে কাজ করে, আমিও একসময় Indian Oil এ কাজ করেছি। তাই ভারতের তেল নিয়ে কথা উঠলো, আমরা কত তেল import করি, ইত্যাদি। সেখান থেকে কথায় কথায় ভারতবর্ষের Refinery র কথা উঠলো। আমি সুব্রত কে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা আম্বানীদের গুজরাটে একটা Refinery আছে না? কোথায় যেন?

এই রে!

সুব্রতর কিছুতেই মনে পড়ছেনা জায়গাটার নাম। আমারও না। কিছু জানা জিনিষের নাম ভুলে গেলে বড্ড অস্বস্তি হয়, না মনে পড়া পর্য্যন্ত অস্থির লাগে।

ওই কাউন্টারের ভদ্রলোক কি জানেন ? ওনাকে সুব্রত জিজ্ঞেস করবে নাকি? কিন্তু ভদ্রলোক সেই যে ফোন কানে নিয়ে বসে আছেন, কার সাথে এত লম্বা কথা বলছেন কে জানে। কিংবা হয়তো কারুর সাথে কথা বলছেন না আদৌ, সুব্রতর প্রশ্নবাণ আবার শুরু হবে এই ভয়ে ফোনে কথা বলার অভিনয় করছেন।

ভুলে যাওয়া নিয়ে এই রকম একটা গল্প আছে। এক ভুলো লোকের বাড়ীতে তার বন্ধু এসেছে, সে তার বন্ধুকে বলছে জানিস,  কাল আমরা একটা রেস্টুরেন্টে খেলাম। সে যে কি অপূর্ব্ব খাবার~

বন্ধু জিজ্ঞেস করল কোন রেস্টুরেন্ট? কি নাম?

এই রে, নাম তো মনে পড়ছেনা। একটা ফুলের নাম কর্‌, যা প্রেমিকরা প্রেমিকাদের দেয়।

বন্ধু বললো, কার্নেশন?

আরে না না।

তাহলে কি প্যানসি?

না না, যে ফুলের গাছে কাঁটা থাকে।

ও Rose?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলে ভুলো লোকটি তার বৌ কে ডেকে বললো, এই Rose, কাল আমরা যে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম তার নামটা যেন কি?

তার মানে রেস্টুরেন্টের নাম তো ভুলেছেই, তার ওপর নিজের বৌয়ের নামও মনে নেই!

সুব্রতর অবশ্য অত খারাপ অবস্থা নয়, সে বৌয়ের নাম ভোলেনি।

একটু পরে দীপা আর সুভদ্রা ফিরতেই সুব্রতর দীপাকে প্রথম প্রশ্ন – অমুক দা কোথায় থাকেন যেন?

দীপা একটুও সময় না নিয়ে promptly বললো জামনগরে!

সুব্রতর মুখটা তাই শুনে  উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।  আমার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে সে বললো ~

ইন্দ্রজিৎ দা’, জামনগর!

দুই অর্জ্জুনের সাথে একদিন

১) প্রথম অর্জ্জুন – দীপু ঘোষ

বিখ্যাত ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় দীপু ঘোষের সাথে কলেজের বন্ধু তপন রায়ের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সূত্রে বেশ কয়েক বছর আগে আমার ইমেলে যোগাযোগ হয়। তখন তিনি আর তাঁর স্ত্রী শ্যামলী বৌদি আইসল্যান্ডে থাকতেন। সেই দেশে তিনি অনেক বছর আগে ব্যাডমিন্টন কোচ হয়ে গিয়েছিলেন, এবং সেই দেশের সরকারের আনুকুল্যে তিনি সেখানেই থেকে যান। সম্প্রতি তাঁরা আইসল্যান্ড ছেড়ে সিঙ্গাপুরে তাঁদের একমাত্র ছেলের কাছে এসে আছেন।

তিনি আমাদের থেকে বয়সে বেশ কিছুটা বড়, তপন তাঁকে দীপুদা’ বলে ডাকে, তাই তিনি আমারও দীপুদা’ হয়ে গেলেন চট করে। ২০২১ সালে প্রথম আলাপের সময় দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদি  আইসল্যান্ডে রামকৃষ্ণ মিশনের নানা কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাঁর ইমেলের বেশীর ভাগই ঠাকুর রামকৃষ্ণ আর স্বামী বিবেকানন্দের নানা বাণী এবং রামকৃষ্ণ চরিতামৃত থেকে উদ্ধৃতি থাকে, সেই সব মেল থেকে তাঁকে একজন ধার্ম্মিক এবং আধ্যাত্মিক লোক বলে মনে হয়, ব্যাডমিন্টন খেলার সাথে তাঁর এখন আর কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয়না।              

আমাদের ছোটবেলায় – ষাটের দশকে – আমাদের দেশে নন্দু নাটেকার, সুরেশ গোয়েল, দীনেশ খান্নার মতো ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও দীপুদা’ পর পর ছয়বার ব্যাডমিন্টন জাতীয় প্রতি্যোগিতার ফাইনালে উঠেছিলেন, তার থেকে বোঝা যায় কত উঁচুদরের খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। অবশ্য তার মধ্যে তিনি মাত্র একবার (১৯৬৯) জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন্‌, বাকি পাঁচবার সেই সময়ের অন্য বিখ্যাত খেলোয়াড়দের কাছে ফাইনালে হেরে যান।

সেই একবার তাঁর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়াও একটা গল্প।

দীপুদা’ South Eastern Railway তে চাকরী করতেন, একদিন গার্ডেনরীচে প্র্যাকটিস করতে যাবার সময় একটি ট্রাক তাঁর স্কুটার কে ধাক্কা মারায় তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় সাতমাস রেল হাসপাতালে ভর্ত্তি ছিলেন। তাঁর ডাক্তাররা তিনি আবার ফিরে এসে খেলতে পারবেন এই আশা দিতে পারেননি, কিন্তু তাঁদের অবাক করে তিনি ফিরে এসে ১৯৬৯ সালে সেমি ফাইনালে দীনেশ খান্না আর ফাইনালে সুরেশ গোয়েল কে হারিয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন্‌।   

আমি তখন স্কুলে পড়ি, ইডেন ইন্ডোর স্টেডিয়াম এ National Badminton championship এর খেলা হচ্ছিল, বাবার সাথে আমি সেখানে সেমি ফাইনাল আর ফাইনালে দীপুদা’র খেলা দেখি। সেমি ফাইনালে দীপুদা’ ত্রিলোক নাথ শেঠ কে হারিয়ে ফাইনালে শেষে নন্দু নাটেকারের কাছে হেরে যান্‌। ফাইনাল খেলাটা হয়েছিল সমানে সমানে – যে কেউ জিততে পারতেন, নন্দু শেষ পর্য্যন্ত জিতলেও দীপুদা’কে হারানো তাঁর পক্ষে সোজা হয়নি।

সেই বয়সে ওই দু’জনের মধ্যে দীপু ঘোষ কেই আমার বেশী ভাল লেগেছিল মানে পড়ে, উনি হেরে যাওয়াতে আমার যে মন খারাপ হয়েছিল সেটাও পরিস্কার মনে পড়ে। উনি বাঙালী ছিলেন বলেই হয়তো আমার দিক থেকে একটু পক্ষপাতিত্ব ছিল।।তাছাড়া ওই ছোটখাটো ছিপছিপে তরুণটি অসাধারণ খেলেছিলেন সেদিন, সারা কোর্ট জুড়ে তাঁর আধিপত্য, তাঁর ওভারহেড স্ম্যাশ, নিখুঁত ড্রপ শট, নেট প্লে, এই সব দেখে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম, নন্দু নাটেকারের মত দুর্দ্ধর্ষ খেলোয়াড়ও ওনার কাছে বেশ বিপর্য্যস্ত হয়েছিলেন সেদিন।

ভাই রমেন ঘোষের সাথে ডাবলস খেলে দীপুদা’ ১৯৬৩-৭০ এই সময়ের মধ্যে প্রতি বছর জাতীয় ফাইনালে ওঠেন, এবং পাঁচ বার ডাবলস্‌ চ্যাম্পিয়ন হন্‌। এটা বোধ হয় একটা জাতীয় রেকর্ড।

দেশের হয়ে Thomas Cup এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও দীপুদা’ তাঁর খেলোয়াড় জীবনে অনেক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, দেশের জন্যে তাঁর এই অবদানের জন্যে ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে অর্জ্জুন পুরস্কার প্রদান করেন।

গত বছর ২০২২ সালে দীপুদা’ আমাদের লিখলেন তিনি আর বৌদি সিঙ্গাপুর থেকে পূজোয় মাস খানেকের জন্যে কলকাতা আসছেন। অনেক বছর পরে এখানে আসা, অনেক কাজ, অনেকের সাথে দেখাশোনা, এন্টালীর ফ্ল্যাটটা ময়লা হয়ে পড়ে আছে ওটা পরিস্কার করতে হবে, এই সব – কিন্তু তার মধ্যে সময় করে একদিন দেখা করা গেলে তাঁদের খুব ভাল লাগবে।

সুভদ্রাদের হাওড়ার রামরাজাতলার বাড়ীতে দুর্গা পূজো হয়। সপ্তমীর দিন সেখানে দুপুরে সব জ্ঞাতিদের নিমন্ত্রণ থাকে, আমি দীপুদা’ কে সেদিন সেখানে বাড়ীর পূজোতে আসতে অনুরোধ করলাম, এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলেন। আমি তাঁর কাছে অচেনা মানুষ, আমার শ্বশুরবাড়ীতে অত লোক সেদিন আসবে, তারাও সবাই তাঁর অচেনা, কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো দীপুদার সে ব্যাপারে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।বরং বাড়ীর পূজো কাছ থেকে দেখার সু্যোগ করে দেবার জন্যে তিনি বার বার তাঁর কৃতজ্ঞতা আর আনন্দের কথা আমায় বলে যাচ্ছেন। 

কলকাতায় ওঁরা এসে কিছুদিনের জন্যে উঠলেন গোলপার্কে রামকৃষ্ণ মিশনের গেস্ট হাউসে, আমাদের পূর্ণ দাস রোডের বাড়ী থেকে খুব কাছে। কথা হলো সপ্তমীর দিন সকালে ওঁরা সেখান থেকে চেক আউট করবেন, আমি আমার গাড়ীতে ওদের তুলে সাঁতরাগাছি নিয়ে যাবো, ওঁদের মালপত্র – দুটো স্যুটকেস – থাকবে আমার গাড়ীর বুটে, বিকেল বেলা বাড়ী ফেরার পথে আমরা ওঁদের এন্টালীর ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিয়ে যাবো।        

কথামতো সপ্তমীর সকালে গোলপার্কে সুভদ্রা আর আমি দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদিকে আমাদের গাড়ীতে তুলে নিলাম। প্রথম দর্শনে দীপুদা’কে আরো ছোটখাটো লাগলো, তবে আশির ওপরে বয়েস হলেও সোজা হয়ে হাঁটেন, মুখে একটা স্মিত হাসি, হাত বাড়িয়ে এসে আমার হাত ধরলেন, আমি যেন কতদিনের চেনা।  

হাওড়ায় পৌঁছতে আজকাল সেকেন্ড হাওড়া ব্রীজ আর কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ধরলে আধঘন্টা লাগে, রাস্তায় দীপুদা’ আর বৌদির সাথে আমাদের একটা প্রাথমিক আলাপ হয়ে গেল। দীপুদা’র কাছ থেকে তাঁর ব্যাডমিন্টন খেলার জীবনের অনেক গল্প জানার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু দেখছিলাম তিনি খেলা এবং তাঁর অতীতের খেলোয়াড় জীবন নিয়ে কোন আলোচনাতেই যেতে চান্‌না, একটু হেসে এড়িয়ে যান্‌। আমাদের আলাপ হলো মামুলী আটপৌরে কথা দিয়ে।

কলকাতায় এতবছর পরে এসে ওঁরা দুজনেই খুব উত্তেজিত। শ্যামলী বৌদি নবমীর দিন একটা বাসে করে পুরনো বাড়ীর পূজা পরিক্রমা ট্যুর বুক করেছেন। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী দীপা ভাল ব্যাডমিন্টন খেলতেন, সেই সূত্রে ওঁদের সাথে দীপুদা’ দের অন্তরঙ্গ আলাপ ছিল, সম্প্রতি সৌমিত্র গত হয়েছেন, তাই এবার আর তাঁদের সাথে আগের মত আড্ডা দিতে যাওয়া হবেনা, তবে দীপার সাথে একবার তো দেখা করতে যাবেনই। ভাই রমেন উনি আসাতে তাঁর বাড়ীতে আত্মীয়স্বজনের সাথে একদিন একসাথে কাটাবার আয়োজন করেছেন। এই সব কথা।   

রামজাতলায় সুভদ্রাদের দুর্গাবাড়ীর পূজোর দালানে সেদিন আত্মীয়স্বজন আর জ্ঞাতিদের বেশ ভীড়, তার মধ্যে দীপুদা’ আর বৌদির সহজেই মিশে গেলেন, তাঁদের মধ্যে কোন জড়তা নেই। সুভদ্রার দাদারা দীপুদা’র পরিচয় পেয়ে অনেকেই তাঁকে ঘিরে ধরলেন, তাঁর খেলার প্রশ্ংসায় সবাই পঞ্চমুখ, “আপনি একবার আমাদের বাণী নিকেতন ক্লাবে খেলতে এসেছিলেন, আমরা আপনার খেলা দেখেছি” ইত্যাদি অনেক প্রশস্তি শুনে দীপুদা’র মুখে শুধু সেই স্মিত হাসি, কোন কথা নেই, যেন সেই হাসিটুকু দিয়ে তিনি তাঁদের প্রশংসার জন্যে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।

মনে মনে আমি সেদিনের সেই ক্ষিপ্র তরুণ খেলোয়াড়টির সাথে আজকের দীপুদা’ কে মেলানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলামনা। আজকের দীপুদা’ একজন অন্য মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। তিনি এখন শান্ত ধীর স্থির আর অমায়িক, আদ্যোপান্ত বিনয়ী ও ভদ্রলোক, স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত তাঁর জীবন।

খুব ভক্তিভরে পূজো দেখলেন দু’জনে, পুষ্পাঞ্জলি দিলেন, শান্তিজল মাথায় নিলেন, আর বার বার আমাদের এই বাড়ীর পূজো দেখার সু্যোগ করে দেবার জন্যে ধন্যবাদ জানালেন।

সারা সকাল আমি তাঁদের সঙ্গ দিলাম সেদিন, পূজোর দালানে সুভদ্রার আত্মীয়স্বজনের ভীড়ের মধ্যে এক কোণে চেয়ার টেনে বসে আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। কথায় কথায় জানলাম শ্যামলী বৌদির বাপের বাড়ী হাওড়ায় শিবপুরে সুতরাং হাওড়ার এই সব অঞ্চল তাঁর খুব চেনা। বাড়ীর পূজো দেখার সু্যোগ করে দেবার জন্যে দীপুদা’ বার বার তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন, তাঁর মত এক প্রবাদপ্রতিম দিকপাল খেলোয়াড়ের কাছ থেকে এরকম বিনয়ী আর আন্তরিক ব্যবহার পেয়ে আমি অভিভূত হয়েছিলাম, অবশ্য এটাও ঠিক যে আইসল্যান্ড থেকে পাঠানো  তাঁর ইমেল থেকে তাঁর এই চারিত্রিক বিনয়ের কিছুটা আন্দাজ আমার ছিল।     

ইতিমধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে দেউড়িতে একটু জল কাদা জমেছে, আমরাও একটু পরে বেরোব বলে কাছেই দাঁড়িয়ে আছি, সুভদ্রার এক বৃদ্ধা আত্মীয়া ভাল করে হাঁটতে পারেননা, তাঁকে ধরে ধরে গাড়ীতে তোলা হচ্ছে, দীপুদা’ হঠাৎ দেখি সামনে এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধার জন্যে গাড়ীর দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন। দৃশ্যটা এখনো ভুলতে পারিনি। বৌদি বললেন, “দীপুর এটা একটা স্বভাব, কোথাও কারুর বিপদ দেখলে ও সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে যায়।”

২) দ্বিতীয় অর্জ্জুন – অরুণ ঘোষ  

ষাটের দশকের প্রখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় অরুণ ঘোষ হাওড়ার ব্যাতড়ে থাকেন, দীপুদা’ আর তিনি দু’জনে একসাথে South Eastern Railway তে একসময় কাজ করেছেন, তখন দু’জনের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। দীপুদা’ খুব সঙ্কোচের সাথে আমায় বললেন “অনেকদিন অরুণদা’র সাথে দেখা নেই, এখন বয়েস হয়েছে, শুনেছিলাম ওঁর শরীর ভাল যাচ্ছেনা। এত কাছে যখন এলাম, ফেরার পথে কিছুক্ষণের জন্যে কি একবার ওনার বাড়ীতে গিয়ে দেখা করা যায়?”

“অবশ্যই যায়”, আমি বললাম, “কিন্তু অরুণদা’ কোথায় থাকেন সেটা কি করে জানা যাবে?”

শ্যামলী বৌদি বললেন “ব্যাতড়ে আমার এক মামা থাকে, আমরা সমবয়েসী, আমি ওকে ফোন করেছিলাম, ও অরুণদা’র বাড়ীটা চেনে।” ঠিক হলো খাওয়া দাওয়া শেষ হলে আমরা বেরিয়ে পড়বো, ব্যাতড়ে বৌদি তাঁর মামার সাথে কথা বলে নিলেন, তিনি আমাদের জন্যে পথে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। 

অরুণ ঘোষ ছিলেন বাংলার ফুটবলে এক প্রবাদপ্রতিম স্টপার। ষাটের দশকে কলকাতার ময়দানে কখনো ইস্টবেঙ্গল কখনো মোহনবাগান কখনো বি এন আর এর হয়ে খেলে মাঝমাঠে রাজত্ব করে গেছেন অরুণ।   আমি তাঁকে অনেকবার খেলতে দেখেছি, তাঁর সেই লম্বা চওড়া চেহারা সুঠাম স্বাস্থ্যবান চেহারাটা এখনো চোখের সামনে ভাসে। রক্ষণে তিনি থাকলে তাঁকে ভেদ করে যাওয়া ফরোয়ার্ডদের পক্ষে সহজ কাজ ছিলনা।    

১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিক, ১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমস্‌, ১৯৬৪ সালে মাড়ডেকা এবং AFC Cup এ ইত্যাদি নানা প্রতিযোগিতায় তিনি ভারতীয় দলে থেকে দেশের হয়ে অনেক পদক জিতেছেন। পরে কিছুদিনের জন্যে তিনি ভারতীয় দলের কোচ ও ছিলেন।

তাছাড়া বংলাও তাঁর অধিনায়কত্বে সন্তোষ ট্রফি জিতেছে বেশ কয়েকবার। 

১৯৬৭ সালে অসাধারণ ফুটবলার হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে অর্জুন পুরস্কার প্রদান করেন।    

যাই হোক, শেষ পর্য্যন্ত ব্যাতড়ে গিয়ে বৌদির মামার দেখা পাওয়া গেল, তিনি আমাদের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁকে আমরা গাড়ীতে তুলে নিলাম। দেখলাম বৌদি আর তাঁর মামা নিজেদের মধ্যে তুই তুই করে কথা বলছেন, ওঁরা দু’জন ছেলেবেলার বন্ধু।

সপ্তমীর দুপুর, জায়গাটা নির্জন, কাছাকাছি কোন বারোয়ারী পূজো নেই, তাই এই জায়গাটা ভীড় আর ঢাকের আওয়াজ নেই। একটা গলির ভিতর দু’দিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ী, ঢুকে একটু এগিয়েই একটা   তিন তলা বাড়ীতে দোতলার একটা ফ্ল্যাটে অরুণদা’ থাকেন। বৌদির মামাকে অনুসরণ করে আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরজায় বেল বাজালাম। একটি কমবয়েসী মেয়ে দরজা খুলে দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদিকে চিনতে পেরে আপ্যায়ণ করে আমাদের ভিতরে ডেকে নিলো।

পরে আলাপ হয়ে জেনেছিলাম সে অরুণদা’র বড় মেয়ে। তার মুখের সাথে অরুণদা’র মুখের অদ্ভুত সাদৃশ্য – সে কথা বলতে মেয়েটি হেসে বলেছিল, “হ্যাঁ, জানি, সবাই তাই বলে।”   

দরজা দিয়ে ঢুকেই ছোট একটা বসার ঘর, সেখানে একটা সোফায় দেখি এক ভদ্রলোক লম্বা পা ছড়িয়ে বসে আছেন, তাঁকে দেখে অতীতের অরুণদা’ বলে চেনা যায়, আগের সেই সুস্বাস্থ্য আর নেই, তবু শরীরের কাঠামোটা এখনো মজবুত, দীপুদা’ তাঁকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে গিয়ে “অরুণদা’ কত দিন পরে দেখা হলো”, বলে জড়িয়ে ধরলেন।

আমরা না জানিয়ে হঠাৎ এসেছি, কিন্তু তাতে দরজা খুলে দেওয়া মেয়েটির মুখে কোন বিরূপতা নেই, বরং দীপুদা’ আর বৌদিকে এরকম ভাবে হঠাৎ পেয়ে তাকে বেশ খুসীই মনে হচ্ছে।

পুরনো বন্ধুর সাথে অনেক বছর পরে দেখা হয়ে দীপুদা’ ছেলেমানুষের মত খুসী হয়েছিলেন, তাঁকে দেখেই তা বোঝা যাচ্ছিল, দুই বন্ধু ওঁদের পুরনো জীবনের অনেক ঘটনার স্মৃতিরোমন্থন করলেন। গার্ডেনরীচ থেকে নৌকা করে নদী পার হয়ে দু’জনে হাওড়া আসতেন, সেই গল্পও হলো। অরুণদা’র মেয়ের কাছে যখন তিনি শুনলেন অরুণদা’র জন্ম ১৯৪১ সালে, তিনি খুব অবাক হয়ে কিছুটা অনুশোচনার ভঙ্গীতে বলেছিলেন,“১৯৪১?সে কি? তাহলে তো আমি অরুণদা’র থেকে দুই বছরের বড় হলাম। অরুণদা’, দ্যাখো বয়েসে বড় হয়েও এতগুলো বছর আমি তোমায় দাদা বলে ডেকে এসেছি!”

যে সোফায় অরুণদা’ পা এলিয়ে বসেছিলেন, সেই সোফার পিছনে দেয়ালে টাঙানো তাঁর খেলোয়াড় জীবনের অনেক ছবি মন দিয়ে দেখলাম। তার মধ্যে দেশের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অর্জ্জুন পুরস্কার নেবার ছবিও ছিল। 

আমি ষাটের দশকে কলকাতার ময়দানে অরুণদা’ র খেলা অনেক দেখেছি। চমৎকার সুঠাম স্বাস্থ্য ছিল অরুণদা’র, প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের ঢেউয়ের মত আক্রমণের বিরুদ্ধে শালপ্রাংশুর মতো তিনি ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন, তাঁর ট্যাকলিং, পাসিং, শুটিং এর কথা এখনো পরিস্কার মনে পড়ে।      

নিজের নিজের খেলায় এঁরা দুজনেই যৌবনে অসাধারণ দক্ষতা আর পারদর্শিতার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তার ওপরেও তাঁদের যা ছিল, তা হলো ইস্পাতকঠিন হার না মানা মানসিকতা, জেতার অদম্য ইচ্ছা, পরিশ্রম করার ক্ষমতা, এবং প্রখর আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস। চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে শুধু ভাল খেললেই হয়না, তার সাথে চাই জেতার ক্ষিদে। এই দু’জনের মধ্যে যা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল।  

অরুণদা’র বাড়ী থেকে বেরিয়ে, বৌদির মামা কে কাছেই তাঁর বাড়ীতে নামিয়ে পার্ক সার্কাসের কাছে দীপুদা’ আর শ্যামলী বৌদি কে তাঁদের এণ্টালীর ফ্ল্যাট বাড়ীতে নামিয়ে আমরা বাড়ী ফিরলাম। 

দেশের মধ্যে এক সময়ের শ্রেষ্ঠতম এই দুই খেলোয়াড়ের সান্নিধ্য পেয়ে সেদিন নিজেকে খুব ভাগ্যবান আর ধন্য মনে হয়েছিল। গত বছরের (২০২২) পূজোর সপ্তমীর দিনটা তাই আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে।        

কলকাতার পূজো, ২০১৮

বাগবাজার সার্ব্বজনীন

১  – একাল সেকাল

ত্রিশ বছর পর কাজ থেকে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে দূর্গা পূজোর দিনগুলো এখন কলকাতায় কাটাচ্ছি। চারিদিকে ঢাকের আওয়াজ শুনছি আর মন চলে যাচ্ছে সেই পঞ্চাশ ষাট আর সত্তরের দশকের আমার কম বয়েসের পূজোর দিনগুলোতে।

পবিত্র সরকারের লেখা সনৎ সিংহের গাওয়া একটা জনপ্রিয় গান মনে পড়ে। সেই গানে পাঠশালায় ছেলেমেয়েরা নামতা মুখস্থ করছে, কিন্তু তাদের মন পড়ে আছে চন্ডীতলায়, সেখানে কুমোর ঠাকুর গড়ার কাজে ব্যস্ত, পূজোর আর বেশী দেরী নেই, তাদের খুব ইচ্ছে করছে এক ছুটে চলে যায় সেখানে। হয়তো মায়ের চোখ আঁকা হচ্ছে এখন, কিংবা মোষের পেট ফেটে অসুর হয়তো বেরিয়ে এসেছে এতক্ষণে। পবিত্র সেই গানে চমৎকার ধরেছেন ছোটদের মনের ওই অস্থিরতা, পূজো আসার আগে থেকেই মনের মধ্যে আমিও কমবয়সে ঠিক ওইরকম একটা উত্তেজনার ভাব টের পেতাম।

কাছে এলো পূজোর ছুটি, রোদ্দুরে লেগেছে চাঁপাফুলের রং। কবি বলেছেন।

একটা বয়স ছিল যখন সেই রং লাগতো আমার মনেও।

নিয়ম করে  প্রতি বছর মহালয়ার দিন রাত থাকতে উঠে সব ভাইবোনদের সাথে অন্ধকারে রেডিওর সামনে বসে কত আগ্রহ আর উৎসাহ নিয়ে মহিষাসুর মর্দ্দিনী অনুষ্ঠান শুনতাম তখন। পূজোর আগে কোথাও বাঁশ দিয়ে প্যান্ডেলের কাঠামো তৈরী হচ্ছে দেখলে মন কেমন একটা অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠত। দেব সাহিত্য কুটীরের শারদীয়া পত্রিকা বাড়ীতে এলে তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। টেনিদা’ আর তার দলবল, কিংবা হর্ষবর্ধন গোবর্ধন দুই ভাইয়ের মজার যত সব কান্ডকারখানা! পূজোর জলসায় পূজোর গান গাইতে আসতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।  “পূজোয় চাই নতুন জুতো” নামে বাটা একটা ক্যাম্পেন করতো পূজোর সময়। আমরা পূজোয় পেতাম নতুন জুতো আর জামাকাপড়…

এখন আর মহালয়ার ভোরে ঘুম ভাঙেনা। এখন সি ডি চালিয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ শুনি। পূজোর আগে এক গাদা বাঁশ রাস্তায় স্তূপ হয়ে পড়ে আছে কিংবা রাস্তা বন্ধ করে প্যান্ডেল হচ্ছে দেখলে আজকাল বেশ বিরক্তই লাগে। টেনিদা’ আর হর্ষবর্ধন গোবর্ধন নিরুদ্দেশে চলে গেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শ্যামল মিত্ররা আর নেই। এখনো রমরম করে চলে পূজোর বাজার, কেনাকাটা। ফুটপাথে অসংখ্য হকারের স্টল, ভীড় ঠেলে হাঁটা প্রায় অসম্ভব। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, ভাল লাগেনা।

আজও পূজোর বেশ কিছু দিন আগে থেকে শহরের প্রায় সব রাস্তার দুই পাশ বড় বড় হোর্ডিং এ ঢাকা থাকে। তবে সেই সব হোর্ডিং গুলোতে খেয়াল করলে দেখা যায় অর্ধেকের ওপর বিজ্ঞাপন পান পরাগ আর পানমসালার। 

এই সব কোম্পানী  মৃত্যু বেচে এত লাভ করছে ? ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়।   

কমবয়েসে আমরা ভীড়ের মধ্যে গা ভাসিয়ে ঘুরে ঘুরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে প্রতিমা দেখে বেড়াতাম। পা ব্যথা কি বস্তু জানাই ছিলনা। এখন আগের মত ভীড়ের মধ্যে গা ভাসিয়ে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরার সামর্থ্য এবং উৎসাহ কোনটাই নেই। এখন বাড়ীতে আরাম করে বসে ইন্টারনেট কিংবা টিভি তেই সব ঠাকুর বেশ ভাল ভাবেই দেখা যায়। তা ছাড়া আছে ফেসবুক, এবং নানাবিধ Mobile App…

আগে বারোয়ারী পূজোর খরচ উঠতো বাড়ী বাড়ী চাঁদা তুলে। এখন কর্পোরেট স্পনসরশীপ আর তোলাবাজীর টাকা থেকে কোটি কোটি টাকা খাটে এক একটা পূজোয়। এখন পূজো হলো big business…

এ বছর সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে থীম ছিল মহাভারত, সেখানে দেখলাম অর্জ্জুন আর শ্রীকৃষ্ণের এক বিশাল রূপোর রথ, যার দাম নাকি কুড়ি কোটি টাকা। এত টাকা এরা কোথায় পায় কে জানে? এদিকে দেশে লোকে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে।  ওই রথ আর অনাবশ্যক, অবিশ্বাস্য  অপচয় দেখে শামশুর রহমানের কবিতার সেই লাইনটা মনে পড়ে যায়।  

“এক অদ্ভুত উটের পিঠে চড়ে চলেছে স্বদেশ~”

সময় বদলেছে, আমি নিজেও বয়সের সাথে সাথে অনেক পালটে গেছি, আমার সেই সবুজ চশমাটা হারিয়ে গেছে।  এখন আর আমার মনে চাঁপাফুলের রং লাগেনা।

But, wait….

একটা জিনিষ আছে যা এখনও আনন্দে মন মাতায়, তা হলো ওই ঢাকের আওয়াজ। সনৎ সিংহের সেই গানের কথায় সেটা এখনও আগের মতোই “মিষ্টি মধুর”‘~

“তা ধিনা তাকতা ধিনা, তাক গুড় গুড়, কুরুড় কুরুড় তাক… ”

সমাজসেবী সঙ্ঘ হিন্দুস্তান পার্ক সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার

২  – পূজো না উৎসব?

সাবেকী না থীম? পূজো না উৎসব? এই নিয়ে এখন কলকাতায় serious তরজা চলছে।

এখন হলো থীম পূজোর যুগ। সার্ব্বজনীন পূজো মানে এখন শুধু প্রতিমা নয়, প্যান্ডেলসজ্জা, আলো এই সব নিয়ে একটা সর্ব্বাঙ্গীন প্যাকেজ। অবশ্য কিছু পুজো যেমন একডালিয়া, বাগবাজার, কলেজ স্কোয়ার এখনও তাদের সাবেকী পূজোর পরিবেশ বজায় রেখেছে। তাদের বক্তব্য হলো পূজো তে ভক্তিভরে মায়ের আরাধনাই হলো আসল, বাকি যা তা হলো বর্জ্জনীয় আড়ম্বর।

ওদিকে যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লী, সমাজসেবী, নাকতলা, বেহালা সুরুচি সঙ্ঘ, ত্রিধারা অকালবোধন, মুদিয়ালী, কসবা বোসপুকুর, এবং অন্য অনেক নামী দামী পুজোতেই এখন থীম। সেখানে কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের সাবেকী সনাতন প্রতিমার জায়গা এখন অধিকার করে নিয়েছেন আর্ট কলেজের স্বনামধন্য শিল্পীরা – ভবতোষ সুতার, সনাতন দিন্দা এবং অন্যান্যরা। তাঁদের তৈরী মায়ের প্রতিমার নান্দনিক সৌন্দর্য্য দর্শক কে মুগ্ধ করে ঠিকই, কিন্তু সাবেকীদের মতে সেই মুগ্ধতার মধ্যে কোথায় যেন মায়ের প্রতি সন্তানের ভালবাসা ও ভক্তিবোধের কিছুটা অভাব থেকেই যায়। কিন্তু থীমের প্রবক্তাদের মত হলো থীম হচ্ছে উৎসবের অঙ্গ। থীমই হাজার হাজার মানুষ কে পূজোর দিকে টানে, থীমের মধ্যেই আছে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করার প্রধান উপাদান।

এবছর আমি আর সুভদ্রা চতুর্থী আর পঞ্চমীর দিন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এক দিন দক্ষিণ আর এক দিন উত্তর কলকাতা। পূজো শুরু হতে তখনও দুই দিন বাকী, তবু চতুর্থী থেকেই রাস্তায় মানুষের ঢল।   

সমাজসেবী সঙ্ঘের এবারের পূজোর থীম অন্ধদের নিয়ে, সেখানে প্যান্ডেলে সব কিছু ব্রেলে লেখা। রামরাজাতলায় সুভদ্রাদের দূর্গাবাড়ীর পিছনে ইছাপুর জগাছার বিখ্যাত শিবাজী সঙ্ঘের পুজো। সেখানে এবছর থীম হলো আমাদের জীবনে টেকনোলজীর অভিশাপ। প্যান্ডেল জুড়ে মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপের ছবি। ছেলেমেয়েরা সবাই মাথা নীচু করে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। বিবেকানন্দ রোডের লোহাপট্টি চালতাবাগানে থীম এবার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বিশাল ছবি, তাঁর কবিতা লেখা চারিদিকে, মাইকে তাঁর গান বাজছে। কত পরিকল্পনা, যত্ন আর কত লোকের পরিশ্রম লুকিয়ে আছে এই সব থীম তৈরীর  পিছনে তা ভাবলে অবাক হতে হয়।    

আগে কলেজ স্কোয়ারে ঠাকুর দেখে পাশেই প্যারামাউন্টে মালাই সরবৎ খাওয়া আমাদের নিয়ম ছিল।   কিন্তু এবার চতুর্থীর বিকেলেই দোকানের দরজায় ভীড় উপছে পড়ছে। প্যারামাউন্টে সরবৎ না খেতে পাওয়ার দুঃখ কিছুটা অন্ততঃ ভোলা গেল বিবেকানন্দ রোডের চালতাবাগানে। সেখানে রাস্তার পাশে দোকানে গরম গরম সিঙ্গাড়া আর অমৃতি বিক্রী হচ্ছে… খেতে একেবারে অমৃত!

সেন্ট্রাল এভিনিউ দিয়ে ফেরার সময় মহম্মদ আলি পার্কের বিরাট পূজো। দেখি বাঁশ দিয়ে তৈরী বেড়ার মধ্যে দিয়ে পিলপিল করে হাজার হাজার লোক ঢুকছে, প্রায় মাইল খানেক লম্বা লাইন।  আমি সুভদ্রাকে বললাম, “কি যাবে নাকি?”

সুভদ্রার প্রশ্নসূচক উত্তর খুব সংক্ষিপ্ত। সে ভুরু কুঁচকে বললো, “পাগল?”

চালতাবাগান হিন্দুস্তান পার্ক শিবাজী সঙ্ঘ, জগাছা, হাওড়া

কলেজ স্কোয়ার ত্রিধারা চালতাবাগান

৩  – বাড়ীর পূজো

আমার শ্বশুরবাড়ীতে, হাওড়ার রামরাজাতলায় ১৯৬০ সালে নিজেদের বাড়ীতে দূর্গা পূজো শুরু করেছিলেন সুভদ্রার জ্যাঠা কাকা বাবারা। সেই পূজোর প্রায় ষাট বছর হতে চললো। বাবা কাকারা এখন আর কেউ নেই, এখন পূজোর দায়িত্ব নিয়েছে পরের প্রজন্ম, বাড়ীর ছেলে মেয়ে বৌরা। দেশে ফিরে আসার পর থেকে সুভদ্রা এখন পূজোর অনেক দায়িত্ব সামলায়। পূজোর দিনগুলো আমাদের সেখানেই কাটে।

বাড়ীর পূজোতে ওই সাবেকী vs  উৎসবের conflict টা নেই। এখানে নিষ্ঠা আর ভক্তির সাথে পূজো হয়, এবং একই সাথে পারিবারিক আনন্দ উৎসবেরও একটা চমৎকার জমজমাট পরিবেশ তৈরী হয়।  ইংরেজীতে যাকে বলে best of both worlds…         

রামরাজাতলায় সুভদ্রাদের লতায় পাতায় ছড়ানো ছিটোনো তিন চার পুরুষের বিশাল যৌথ পরিবার। এবং এই বিশাল পরিবারের মধ্যে পারিবারিক সম্প্রীতি এখনও অটুট, মাঝেই মাঝেই নানা অনুষ্ঠানে অনেকে একসাথে জড়ো হয়। স্বাভাবিক ভাবেই তাই পূজোতেও রোজ এই extended family র অনেকে নিমন্ত্রিত হয়ে সুভদ্রাদের বাড়ীতে আসেন। পূজোতে অংশ নেবার পরে সবাই মিলে পূজোর দালানে বসে গল্প, আড্ডা, খাওয়া দাওয়া হয়। সমবেত হাসি ঠাট্টার কলতানে ঠাকুরদালান মুখরিত হয়ে ওঠে।   

বাড়ীর মেয়েরা সবাই মিলে পূজোর কাজের ভার নেয়। ভোরবেলা উঠে ভোগ রান্না করা, শাঁখ বাজানো,    প্রদীপ হাতে ঘুরে ঘুরে সবাই কে হোমের শিখার তাপ দেওয়া, প্রসাদ বিতরণ এই সব কাজ ভাগাভাগি করাতে বেশ একটা মজা আছে। সুভদ্রাদের কুলদেবতা হলেন নারায়ণ, পূজোর দালানে যে হাড়িকাঠ আছে সেখানে পাঁঠার বদলে চালকুমড়ো বলি হয়, সেটাও বেশ একটা দেখার মত জিনিষ।

সকাল থেকেই পূজোর আয়োজন শুরু হয়ে যায়। প্রথমে পূজো, তারপরে এক এক করে হাড়িকাঠে চালকুমড়ো বলি, পুষ্পাঞ্জলি, হোম। শেষে শান্তির জল। অষ্টমী আর নবমীর মাঝে সময় মেনে হয় সন্ধিপূজো। সেই পূজোতে সবাই মিলে রামচন্দ্রের একশো আট গোলাপী পদ্মফুল মা’র পায়ে অর্পণ করে প্রদীপ জ্বালানো হয়। পদ্মফুল বাজার থেকে আসে আধফোটা অবস্থায়। সেই ফুল হাত দিয়ে আলতো করে চাপ দিয়ে তারপর ধীরেসুস্থে সাবধানে একটা একটা করে পাপড়ি ফোটানোর কাজটা বেশ সময়সাপেক্ষ। বাড়ীর মেয়েদের ওপরেই থাকে সেই কাজের ভার।       

আর রোজ সন্ধ্যায় হয় ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে আরতি। তখন বাড়ীশুদ্ধ সবাই পূজোর দালানে এসে জড়ো হয়। কাঁসরঘন্টার আওয়াজ আর ধুনোর ধোঁয়ায় আর গন্ধে কিছুক্ষনের জন্যে সেখানে একটা মোহময় অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মা’ যেন ধীরে ধীরে সবার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠেন।   

দুপুরে রোজ জমিয়ে খাওয়া হয়। আজকাল তো আর মাটিতে বসে কলাপাতা শালপাতা মাটির ভাঁড়  নেই। এখন চেয়ার টেবিলে বসে কাগজের প্লেট আর গ্লাস। তবু সেই “ওরে এদিকে একটু শুক্তো”, অথবা “জগন্নাথ, চিংড়ী মাছটা এদিকে আর এক রাউন্ড পাঠা”, কিংবা “ভাই, আমায় একটু দই এর মাথা প্লীজ্‌” এসব তো আর কোন দিন পুরনো হবেনা, এসব হলো চিরকালীন।

আর আমার কাছে যেটা সব চেয়ে লোভনীয় ছিল তা হলো বাড়ীর তৈরী নানারকম মিষ্টি – নারকোলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, গজা, মোয়া। কত বছর বাড়ীর তৈরী গজা খাইনি, এ জিনিষ কি ছাড়া যায়? প্রসাদের থালা নিয়ে অনেকেই আমার কাছে আসছে, আমি সেখান থেকে বেশ কয়েকবার গজা তুলে নিচ্ছি।

কিছুক্ষণ পর সুভদ্রার কাছে ধমক খেলাম। “সকাল থেকে কতবার গজা খেয়েছো আজ?”

সত্যি, এই বয়সে এত মিষ্টি খাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?

কিন্তু কি করবো, এতগুলো বছর দেশের বাইরে ছিলাম, আমার জীবনের গজা খাওয়ার কোটা তো কমপ্লিট হতে এখনো অনেক দেরী?  

আমি সুভদ্রা কে বললাম, “না না, মা’র নাম করে খেলে কিছু হয়না।”

৪  – কেন চেয়ে আছো গো মা

এ বছর আমাদের গোল পার্কের যে ফ্ল্যাটে আমার মা আর শ্বাশুড়ী থাকেন সেই building complex এর পূজোর ঠাকুর ভাসান দেখতে বিজয়া দশমীর দিন বিকেলে আমি কয়েকজন আবাসিকদের সাথে গঙ্গার ঘাটে গিয়েছিলাম। আমরা যখন ইডেন গার্ডেন এর পিছনে গঙ্গার ঘাটে পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় চারটে, জায়গাটা বেশ গমগম করছে লোকের ভীড়ে। এক একটা ট্রাকে করে প্রতিমা আসছে, আর আসতে না আসতেই এক দল ছেলে মাথায় গামছা আর ফেট্টি বেঁধে সেখানে চলে আসছে। তাদের রেট বাঁধা, সামান্য দরাদরি হচ্ছে ব্যাস্‌, তারপর তারা কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে হৈ হৈ করে চলে যাচ্ছে নদীতে।

আমাদের প্রতিমাও পাঁচ মিনিটের মধ্যে কয়েকজন ছেলে কাঁধে চাপিয়ে নদীতে নিয়ে গেল।

ঘাটের ওপরে বাঁধানো দেয়াল, সেখানে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ। পড়ন্ত বিকেলে রোদের তেজ কমে আসছে, সামনে মন্থর ঘোলাটে নদী নিজের মনে বয়ে যাচ্ছে, আর সেই নদীর জলে এক এক করে প্রতিমা বিসর্জ্জন হচ্ছে, সেই দৃশ্য দেখছে সবাই। মন খারাপ করা দৃশ্য। মেয়েদের সবার পরণে লাল পাড় সাদা শাড়ী, সারা মুখে গালে কপালে সিঁদূর মাখামাখি। সবাই তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। ওদিকে একের পর এক ট্রাক আসছে, তাদের ঘিরে উন্মাদের মত নেচে চলেছে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে। ঢাকীরা সাথে ঢাক বাজিয়ে যাচ্ছে। বেশ frenetic scene, বিশেষ করে কাঁধে প্রতিমা নিয়ে যখন হৈ হৈ করে হাই স্পীডে ছেলেগুলো ভীড়ের মধ্যে চলে আসছে, তখন একটু অন্যমনস্ক হয়ে তাদের সামনে পড়ে গেলে বিশ্রী দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

আমরা দেয়ালের পাশে গিয়ে ভীড়ের মধ্যে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। দূরে দেখা যাচ্ছে এক দিকে হাওড়া ব্রীজ, আর অন্য দিকে বিদ্যাসাগর সেতু, শেষ বিকেলের মায়াবী কুয়াশায় তারা কিছুটা ঢাকা। নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে একের পর এক প্রতিমা, কিছু লোক জলে নেমে ঘড়া বা বোতলে গঙ্গাজল ভরে নিচ্ছে, ওই নোংরা polluted জল আমাদের অনেকের কাছেই খুব পবিত্র।  

যতোটা বিশৃঙ্খলা আশঙ্কা করে গিয়েছিলাম, তার তুলনায় সব ব্যাপারটা বেশ সুসংবদ্ধ ভাবেই হলো।     

ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে কাজ মিটিয়ে বাড়ী ফিরে এলাম।

সেদিন পরে দুই মা’র সাথে বিজয়ার সন্ধ্যেটা কাটিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে রাত ন’টা নাগাদ গাড়ীতে করে বালীগঞ্জ পোস্ট অফিসের কাছে আমাদের আয়রনসাইড রোডের ফ্ল্যাটে ফিরছি। গড়িয়াহাট মোড়ে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে গেলাম।  গাড়ীর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি  অনেক মানুষের ভীড়।  ফুটপাথে বহুলোক দাঁড়িয়ে, আর  রাস্তার ওপর কাগজ পেতে হাজার হাজার লোক বসে আছে।  তারা প্রতিমা বিসর্জ্জন দেখবে, তাই আগে থেকে জায়গা নিয়ে অপেক্ষা করছে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে না ঘুরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে অনেক প্রতিমা দেখার এই একমাত্র সুযোগ। একের পর এক ট্রাকে প্রতিমা আসছে, তাদের ভিতরে আলোর মালায় সাজানো ঝলমলে প্রতিমা। সামনে প্যাঁ পোঁ করে ব্যান্ড পার্টি কুচকাওয়াজ করে হাঁটছে, আর তাদের পিছনে নাচানাচি করছে বহু ছেলেমেয়ে। ট্রাকের পিছনে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়া গাড়ী বাস আর নানা যানবাহনের বিশাল লাইন।  

গাড়ীতে বসে পূজোর গত কয়েকদিনের নানা স্মৃতি নানা ছবি মনে ভেসে আসছিল। বিশেষ করে মনে পড়ছিল একটু আগে পড়ন্ত বিকেলে গঙ্গার ঘাটে  ছেলেদের কাঁধে  বিসর্জ্জন যাবার পথে মায়ের প্রতিমার আয়ত চোখ দুটো।  যেন আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে আছেন।

কেন চেয়ে আছো গো মা, মুখপানে…

এই গান  রবীন্দ্রনাথ পঁচিশ বছর বয়েসে লিখেছিলেন, উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালীদের সম্বন্ধে। সেই সময় শোনা যায় বাংলায় নবজাগরণ এসেছিল, তবু তাঁর এই গানে বাঙ্গালীদের সম্বন্ধে তাঁর দুঃখ আর লজ্জা বেশ পরিস্কার বোঝা যায়।

এরা চাহেনা তোমারে, চাহেনা যে, আপন মায়েরে নাহি জানে/

এরা তোমায় কিছু দেবেনা, দেবেনা, মিথ্যা কহে শুধু কত কি ভাণে/

আজ যদি কবি বেঁচে থাকতেন, তাহলে উৎসবকে উপলক্ষ্য করে আজ যে মাতামাতি আর উচ্ছৃঙ্খলতা চলছে আমাদের দেশে, এই অর্থের অপচয় (unproductive expenditure) , হুজুগ আর হুল্লোড়, রাস্তায় অবিশ্রান্ত জনস্রোত, ট্র্যাফিক আটকে দিয়ে রাস্তায় উদ্দাম নাচানাচি, এই সব দেখে উনি আজকের আমাদের বাঙালীদের সম্বন্ধে কি ভাবতেন?

তবে কবির গানে মা অবশ্য দেশমাতৃকা, মা দূর্গা নন্‌। তবু মা’ই তো?

বিজয়া দশমীর রাতে রাস্তায় ট্র্যাফিক জ্যামে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে আটকে গিয়ে গাড়ীতে বসে এই সব ভাবছিলাম।

আজকের দিনটা হলো মন খারাপের দিন।

ফেলে এসেছি ঘরবাড়ী মোরা

আগস্ট মাস এলেই ১৯৯০ সালের সেই ইরাকের কুয়েত আক্রমণের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।

সেই সময়ে আমরা বেশ কয়েকজন বাঙালী কুয়েতে আটকে পড়ি।  মাস খানেক পরে ১৯৯০র সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি আমরা প্রায় সবাই কুয়েত ছেড়ে দেশে আমাদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে গিয়েছিলাম। 

এখন এত দিন পরে জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবলে মনের মধ্যে সেই সময়ের নানা স্মৃতি ভেসে আসে।  সে ছিল আমাদের জন্যে এক অস্থির সময়,  অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কার কালো মেঘ আমদের সকলের জীবনে ঘনিয়ে এসেছিল।

আমাদের প্রায় সবার বৌ আর ছেলেমেয়েরা স্কুল ছুটি হবার কারণে দেশে চলে গেছে, এটা একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমাদের ও অনেকের দেশে যাবার টিকিট কাটা ছিল, কিন্তু এখন এয়ারপোর্ট বন্ধ এখন আমরা এ দেশে বন্দী।  কবে দেশে ফেরা যাবে জানিনা। আমাদের সবার মনের ভিতরে এই অনিশ্চয়তা আর বিষাদের ভাবটা আমরা লুকিয়ে রাখি। এই স্থায়ী চাকরী, এই সুখের জীবন ছেড়ে সব কিছু ফেলে দিয়ে এই মধ্যবয়সে আবার নতুন করে কোথাও শুরু করতে হবে? 

এদিকে কুয়েতের রাস্তায় বন্দুক হাতে ইরাকী সৈন্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, জায়গায় জায়গায় কুয়েতীরা  প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, মাঝে মাঝেই গুলি বোমার আওয়াজ কানে আসে।  কুয়েতের রাস্তায় ইরাকী ট্যাঙ্ক চলছে, আকাশে জেট প্লেনের আওয়াজ শোনা যায়।  যুদ্ধ শুরু হলে সাদ্দাম হুসেন কি কুয়েতে কেমিকাল গ্যাস এর মিসাইল ছুঁড়বে?

আমরা ভয়ে ভয়ে থাকি।

এই দুর্দিনেও কিন্তু আমাদের বন্ধুদের আড্ডার শেষ নেই।  মাঝে মাঝেই কারুর না কারুর বাড়ীতে আমরা একসাথে বসি, নানা ব্যাপারে আলোচনা হয়।      

এত বিপদের মধ্যেও আমাদের সত্য (নারায়ণ, চক্রবর্ত্তী)  বিন্দাস। তার মুখে সবসময় এক হাজার ওয়াটের হাসি। তার হাতে এখন অঢেল সময়, তাই বাড়ীতে একা একা সময় কাটাতে সে এখন মজার মজার parody গান তৈরী করে। আর আমাদের আড্ডায় সত্য থাকলে সেই সব গান খুব দরদ দিয়ে সে গেয়ে শোনায় আমাদের।  

সত্যর দুটি গানের কথা এখনো মনে আছে।  দুটো গানই কুয়েতের  আমীর শেখ জাবের এর গলায়।

প্রথম গানে তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধু ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন কে বলছেন,

“কেন এলে মোর ঘরে আগে নাহি বলিয়া/

এসেছো কি তুমি ওগো তব পথ ভুলিয়া?/”

দ্বিতীয় গানে দুশ্চিন্তায় তাঁর রাত্রে ঘুম আসছেনা, তিনি নিজের মনেই গাইছেন~ 

“জাগরণে যায় বিভাবরী, আঁখি হতে ঘুম নিলো হরি/

সাদ্দাম নিলো হরি। কি যে করি, কি যে করি ই ই ই ই ?/

অত্যন্ত আবেগের সাথে চোখ বুঁজে দুই হাত নেড়ে সত্য যখন তার এই সব গান একের পর এক গেয়ে যায়, আমরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ি।  

শেষ পর্য্যন্ত অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমরা জর্ডানের ভিসা জোগাড় করে কুয়েত থেকে বাগদাদ হয়ে আম্মানে এসে পৌঁছেছি।  এয়ার ইন্ডিয়া কুয়েতের সব ভারতীয়দের সেখান থেকে ভারতে নিয়ে যাবে।  এই মহানিষ্ক্রমণের কথা গিনেস বুকে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

আম্মান এয়ারপোর্টের ভেতরেই আমরা বন্ধুরা সবাই মাটিতে বসে আড্ডা আর হাসি গল্পে মশগুল হয়ে সময় কাটালাম সারা রাত।  এই গত দেড় মাসের অনিশ্চয়তা আর উৎকন্ঠার হাত থেকে এখন আমরা মুক্তি পেয়েছি।

দেশে ফেরার পরে আমরা কি করবো?  সত্য বললো আমরা বন্ধুরা একটা বড় চাদর নিয়ে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো, আমাদের সামনে একটা বড় পোস্টারে লেখা থাকবে “কুয়েত প্রত্যাগত দুর্গত মানুষদের সাহায্য করুন ” বা ওই ধরনের কিছু।  সামনে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে থাকবেন অরবিন্দ, তাঁর রোগা পাতলা চেহারায় তাঁকে বন্যাবিদ্ধ্বস্ত বা দুর্ভিক্ষনিপীড়িতদের মত দুঃখী মানুষ  বলে সহজেই মানিয়ে যাবে। তিনি প্যাঁপোঁ করে হারমোনিয়াম বাজাবেন আর তাঁর পিছনে খঞ্জনী বাজিয়ে আমরা গান গাইবো। আর রাস্তার পাশে বাড়ীর বারান্দা থেকে লোকেরা কৌতূহলী চোখে আমাদের দেখবে আর কেউ কেউ আমাদের চাদরের ওপরে ছুঁড়ে দেবে কলাটা মূলোটা, আর সাথে কিছু সিকি আর আধুলিও।   

“ফেঁলে এঁসেছি ঘঁরবাঁড়ী মোঁরা –  ফেঁলে এঁসেছি সঁবকিছু – প্যাঁ পোঁ প্যাঁ পোঁ”, আম্মান এয়ারপোর্টের ব্যস্ত পরিবেশে মাঝরাতে এক কোণে আমাদের আড্ডায় বেশ দরদ দিয়ে খোলা গলায় গান গাইছে সত্য, হারমোনিয়াম এর আওয়াজ শুদ্ধ।

এই ছবিটা ওই দিনগুলোর কথা ভাবলেই মনে পড়ে।

এদিকে প্রায় ঘন্টায় ঘন্টায় আসছে একটা করে Air India র প্লেন, আর ঝাঁকে ঝাঁকে ভারতীয় দের নিয়ে মুম্বাই চলে যাচ্ছে তারা। সারা রাত ধরে Air India র  কর্ম্মকর্ত্তারা evacuee দের চেক ইন করতে আর বোর্ডিং পাস দিতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন।  

আমরা সবাই ভোরের দিকে আমাদের বোর্ডিং পাস পেলাম।  সেই মুম্বাই যাত্রার জন্যে আমাদের কোন টাকা পয়সা দিতে হয়নি, কেবল পাসপোর্টে একটা স্ট্যাম্প মারা হয়েছিল।  পরে অবশ্য আমরা সেই দেনা মিটিয়ে দিয়েছিলাম। 

মঙ্গলবার ১৮/৯/৯০ তারিখে  আম্মান থেকে আমাদের প্লেন ছাড়লো দুপুর দুটোয়। মনে আছে নিজের সীটে বসে একটা খুব তৃপ্তি আর আনন্দের দীর্ঘনিঃশ্বাস নিয়েছিলাম।  প্লেন আকাশে ওড়ার পরে  air hostess মেয়েটি দুই হাত জোড় করে মিষ্টি হেসে বলেছিল Welcome home!  সে কথাটা কোনদিন ভুলবোনা।  জীবনের অনেক অবিস্মরনীয় মুহূর্ত্তের মধ্যে সেটি ছিল একটি অন্যতম মুহূর্ত্ত।

পাকিস্তান আর ভারত

আজকাল সুভদ্রা আর আমি মাঝে মাঝে দিল্লী যাই।  সেখানে আমাদের ছোট মেয়ে বুড়ী থাকে, আমরা মেয়ে জামাই আর নাতি নাতনীদের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে আসি। দিল্লী গেলেই মুকুর সাথে দেখা হয়, আর আমরা নিয়ম করে একদিন কিছুক্ষণ একসাথে কাটাই।

মুকু আমাকে ওর গাড়ীতে তাদের Army Officers Golf Club এ নিয়ে যায়। সেখানে আমরা দুই ভাই গলফ কোর্সের পাশে একটা খোলা রেস্টুরেন্টে বসে নানা গল্প করে সময় কাটাই।

আর্মিতে অনেক বছর অফিসার হয়ে কাজ করেছে মুকু, দেশের নানা জায়গায় তার পোস্টিং ছিল। সে হলো যাকে বলে একজন পোড় খাওয়া আর্মি  অফিসার।    

সাধারণ ভারতীয় আর পাকিস্তানী লোকেদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এই গল্পটা তার কাছ থেকে সম্প্রতি শুনলাম।

ভারত আর পাকিস্তান শুনলেই মনে হয় সাবজেক্টটা খুব সংবেদনশীল, এই নিয়ে অনেক তর্কাতর্কির অবকাশ আছে। সেই তর্কের মধ্যে চলে আসে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের যন্ত্রণা, ১৯৬৫ আর ১৯৭১ এর যুদ্ধ, কাশ্মীর, কারগিল, মুম্বাই এর তাজমহল হোটেল। নানা তিক্ততা ও অসূয়া।

কিন্তু মুকুর এই গল্পটি শুনলে এই দুই দেশের মানুষের সম্পর্কের সম্বন্ধে একটা অন্যরকম ধারণা হয়।  Ground level এ দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পর্ক শত্রুতার নয়, সেই সম্পর্ক অনেক সময়ই বরং বন্ধুত্বের।   

মহম্মদ ইকবাল রহমান (M I Rehman) নামে মুকুর এক সহকর্ম্মী অফিসারের এক আত্মীয়ের বিয়ে হচ্ছে পাকিস্তানের করাচীতে।  অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে Ministry of Foreign Affairs আর  Indian Military Intelligence থেকে সে সেই বিয়েতে যোগ দেবার অনুমতি যোগাড় করেছে।

সেখান থেকে ফিরে এসে সে মুকু কে করাচীতে তার অভিজ্ঞতার র এই আশ্চর্য্য গল্পটা বলেছিল।    

সে বললো করাচীতে যতদিন সে ছিল, নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে সব জায়গায় তাকে shadow করতো plainclothes এ পাকিস্তানী Security agency ISI এর একজন লোক। যেখানেই সে যায়, সেখানেই কাছাকাছি বসে থাকে অথবা তাকে নজর রেখে ঘুরে বেড়ায় সেই লোকটি।

ইকবাল এবং সে কেউ কারুর সাথে কথা বলেনা, কিন্তু দুজনেই জানে পরস্পরের উপস্থিতি। ইকবাল জানে ঐ ISI এর লোকটি তার নিজের কাজ করছে, তার ওপরে নজরদারী রাখাই হলো তার কাজ।

এর মধ্যে বিয়ের সব অনুষ্ঠান শেষ, পরের দিন ইকবালের দেশে ফেরার কথা, সে যাবার আগে তার আত্মীয় বন্ধুদের এক রেস্টুরেন্টে খেতে ডেকেছে। সেখানেও ইকবাল দেখলো যথারীতি সেই লোকটি পাশের এক টেবিলে চুপচাপ এক কাপ চা নিয়ে বসে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

পার্টি শেষ, ইকবাল বিল pay করতে গেল, গিয়ে শোনে তার বিল কেউ একজন already pay করে দিয়েছে। ইকবাল তো অবাক।  এই বিদেশে কে তার বিল অযাচিত ভাবে pay করে দিলো?

কাউন্টারের  ভদ্রলোক তখন ওই ISI এর স্পাই টির দিকে আঙ্গুল তুলে দেখালো।  ওই লোকটাই তার বিল pay করেছে!

তাই শুনে ইকবালের বেশ রাগ হয়ে গেল।

এতদিন সে এই লোকটাকে সহ্য করে এসেছে, কিন্তু আজ এই শেষ রাতে তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল।  সে সেই লোকটার কাছে গিয়ে বললো, “সেই প্রথম দিন থেকে আপনি আমায় ফলো করছেন, আমি কিছু বলিনি, আজ এখানে আমার শেষ রাত, আমি আমার বন্ধু বান্ধব আত্মীয় দের এখানে খাওয়াতে নিয়ে এসেছি, সেখানেও আপনি এসে আমার সামনে বসে আছেন, তাও আমি আপত্তি জানাইনি। কিন্তু আপনি আমার রেস্টুরেন্টের বিল ও মিটিয়ে দেবেন, এটা কি হচ্ছেটা কি?”

তাই শুনে লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে ইকবালের দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে খুব বিনীত আন্তরিক ভাবে বললো, “স্যার,  please আমার ওপর রাগ করবেন না। এ ক’দিন আমি আপনাদের কাছে থেকে আপনাদের কথাবার্ত্তা শুনে জেনেছি যে আপনারা সবাই originally হায়দ্রাবাদের । জানেন আমিও হায়দ্রাবাদের ছেলে, ওখানেই আমার জন্ম, ওখানেই আমি বড় হয়েছি। আমার যখন দশ বছর বয়েস, তখন আমার আব্বা আর আম্মা আমায় নিয়ে করাচীতে চলে আসেন। কিন্তু এখনো আমি হায়দ্রাবাদে আমার ছোটবেলার দিনগুলোর কথা ভুলতে পারিনা। আপনি হায়দ্রাবাদ থেকে এসেছেন, তাই আপনাকে এবং আপনার এখানকার আত্মীয় বন্ধুদের সবাইকে ক’দিন থেকেই আমি খুব আপন ভাবছি। আপনারা হলেন আমার মেহমান, এই দেশে আমার অতিথি। সুতরাং আপনাকে অনুরোধ, আজ আপনাদের আতিথেয়তা আমায় করতে দিন্‌।”

মোহাম্মেদ  ইমলাক হুসেন সাহেবের আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তন

কুয়েতে  আমরা  মুরগাবে কর্ণফুলী স্টোর্সে নিয়মিত বাজার করি। তরীতরকারী ছাড়াও সেখানে বাংলাদেশের মাছ পাওয়া যায়। বরফের মাছ ঠিকই, তবু  কুয়েতের সমুদ্রের   fresh মাছের সাথে মাঝে মাঝে দেশের কাতলা মৃগেল আর পাপ্তা পার্শে ও খেতে ইচ্ছে করে। এর মধ্যে মুরগাবে অনেক বাংলাদেশী দোকান ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠলেও আমাদের কাছে কর্ণফুলী স্টোর্সের জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি।

এর প্রধান কারণ তাদের Customer relationship management (CRM) অন্য দোকানগুলোর থেকে অনেক ভালো, এবং তার জন্যে  স্বীকৃতি দিতে হবে তাদের মালিক মোহাম্মেদ ইমলাক হুসেন সাহেবকে। ভদ্রলোক দেখতে ছোটখাটো, কথা খুব কম বলেন, কিন্তু তাঁর ভেতরে একটা রাশভারী ব্যক্তিত্ব আছে, যেদিন তিনি কাউন্টারে থাকেন, সেদিন সব কর্ম্মচারী দের বেশ তঠস্থ দেখা যায়, ইমলাক সাহেব  তাদের কাজে কোন গাফিলতি দেখলে কোন চ্যাঁচামেচি করেননা, তাদের দিকে কেবল ঠাণ্ডা চোখে তাকান, ব্যাস তাতেই কাজ হয়…

কিছু ম্যানেজার আছেন যাঁরা চোখ রাঙান, আবার কিছু আছেন যাঁরা শুধু ঠান্ডা চোখে তাকান। ইমলাক সাহেব এই দ্বিতীয় দলের।  কর্ণফুলী স্টোর্সের এত বাড়বাড়ন্ত তাঁর কর্মকুশলতা আর নেতৃত্বেই হচ্ছে ধরে নেওয়া যায়, ইতিমধ্যে আবু হালিফার দিকেও তাদের একটা দোকান খোলা হয়েছে।

দোকানের বাইরে টাঙানো সাইনবোর্ডে দোকানের নামের তলায় বেশ বড় বড় করে তাঁর নাম লেখা –  “প্রোঃ – মোঃ ইমলাক হুসেন।”

কুয়েতের মত বিদেশে বসে এত বড় একটা দোকান চালানো সোজা কাজ নয়।  বাংলাদেশ থেকে তরীতরকারী মাছ আমদানী করা (Supply chain management, Storage), এখানকার কাস্টমস্‌, পুলিশ, মিউনিসিপ্যালিটি র লোকেদের তোয়াজ করা, কর্ম্মচারীদের কাজ দেখা, competition সত্ত্বেও sales  আর customer   বাড়ানো, এত সব দায়িত্ব প্রায় একা নিজের কাঁধে বইছেন তিনি, তাঁর এই    উদ্যোগী স্বভাবের  তারিফ করতেই হয়।

আমরা তাঁর দোকানে গেলে বিশেষ করে সুভদ্রাকে দেখলে আমি লক্ষ্য করি ইমলাক সাহেব কেমন যেন  বিহবল  হয়ে যান্‌। যেন কি করবেন ভেবে পান্‌না। নিজে আমাদের জন্যে ডাবের জলের can নিয়ে এসে খাবার জন্যে সাধাসাধি করেন। সুভদ্রা যা চায়, সে মাছই হোক, বা মুড়ি বা জর্দ্দা, তাঁর দোকানে না থাকলে তিনি নিজে ছুটে বাইরে কোন দোকান থেকে   নিয়ে আসেন।

আর আপত্তি জানালে তাঁর মুখে একটাই কথা, “অসুবিধা নাই”…

একদিকে কর্ম্মচারীদের সাথে কঠিন আর ঠান্ডা  ব্যবহার, অন্যদিকে  বিনয় বিগলিত, মাথা নীচু, মুখে হাসি, সুভদ্রাকে দেখলেই  ইমলাক সাহেবের ওই পরিবর্ত্তনটা আমি খুব উপভোগ করতাম।  

শেষের দিকে তাঁর সাথে বেশ আলাপ হয়ে গিয়েছিল, নানা রকম ব্যক্তিগত কথা বলতেন। স্ত্রী ও ছেলে কে USA পাঠিয়ে দিয়েছেন,  শরীরে ডায়াবেটিস বাসা বেঁধেছে, এই সব।  ক্রমশঃ তাঁকে বেশ ক্লান্ত, বিপর্য্যস্ত, চিন্তিত মনে হতো।  মাথায় বেশ কিছু পাকা চুল। দেখা হলে আমায় প্রায়ই বলতেন চট্টগ্রাম আসবেন একবার বৌদি কে নিয়ে, আমি সব বন্দোবস্ত করে দেবো, হোটেল, গাড়ী, গাইড। আপনাদের কোন চিন্তা নাই। পতেঙ্গা কক্সবাজার রাঙামাটি সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবো।

আমার সাথে কথা বলার সময় ইমলাক সাহেব আমাদের দিকের বাংলা ভাষায় কথা বলতেন, ভুলেও বাঙাল ভাষায় বলতেন না। ভাবী নয়, বৌদি। দিমু নয়, দেবো।

তো একদিন বাজার করতে গিয়ে সাইন বোর্ডে চোখ পড়লো, দেখলাম সেখানে ইমলাক সাহেবের নাম আর নেই।

কি হলো? 

শুনলাম তিনি  আর নেই, কর্ণফুলী স্টোর্স এর মালিকানা এখন নতুন কারুর হাতে। পুরনো কর্ম্মচারীরা সবাই আগের বলেই মনে হলো। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল ইমলাক সাহেব নাকি ব্যবসার বেশ কিছু টাকা আত্মসাৎ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

কর্ম্মচারীদের কথা মতো ইমলাক সাহেব  ভালো লোক ছিলেন, কিন্তু ওনার বৌ আর ছেলে নাকি তাঁর কাছ থেকে  টাকা চেয়ে চেয়ে তাঁকে “এক্কেরে শ্যাষ কইরা দিসিলো।” টাকা নিয়ে পালানো ছাড়া নাকি তাঁর আর কোন উপায় ছিলোনা।

এক উদ্যোগী সফল ব্যবসাদার ভদ্রলোক থেকে একজন চুরির আসামী  …ইমলাক সাহেবের এও এক আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তন!    

বীভৎস

সুভদ্রা, আমি, আমার ভাই খোকন আর তার ছেলে বুবান আমরা চার জনে দেরাদুন থেকে গাড়ী নিয়ে গঙ্গোত্রী যাচ্ছি।

আমাদের ড্রাইভার এর নাম রামেন্দ্র রাওয়াত, আমাদের গন্তব্য হলো গঙ্গোত্রীর কাছে ধারালী নামে একটা জায়গায়, সেখানে আমাদের হোটেলের নাম হলো Prakriti the Retreat – সেটাই দেখলাম সবচেয়ে ভাল হোটেল সেখানে।

কাছেই হারশিল নামে একটা শহর আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ভাল হোটেল নেই। রামেন্দ্র বললো হারশিল কথাটা এসেছে হরিশিলা থেকে।

দেরাদুন থেকে ধারালীর দূরত্ব প্রায় ২০০ কিমি। পথে উত্তরকাশীতে থেমে দুপুরের খাওয়া খেতে ঘন্টা খানেক নিয়ে সব মিলিয়ে ধারালীতে হোটেলে পৌঁছতে আমাদের আনুমানিক আট ঘন্টা লাগবে। অর্থাৎ বিকেল পাঁচটা নাগাদ পৌঁছবো।

রামেন্দ্র বললো আপনাদের হোটেলটা একদম নদীর পাশে। পাহাড়ের ওপরে তখনো যথেষ্ট আলো থাকবে। আপনারা হোটেলে পৌঁছে নদীর ধারে চলে যেতে পারেন।

রামেন্দ্র উত্তরাখন্ডের লোক, সে হলো গাড়োয়ালী। হিন্দী অবশ্য সে ভালোই বলে। সে মধ্যবয়েসী, হাসিখুসী, বেশ কথা বলে, আমাদের সাথে তার আলাপ জমে গেল অল্পক্ষনের মধ্যেই। জানা গেল সে তার বৌ আর ছেলে মেয়েদের নিয়ে দেরাদুনে থাকে। তবে অনেক বছর ধরে সে নিয়মিত দেরাদুন থেকে চার ধামে গাড়ী চালিয়েছে বলে এই অঞ্চলের রাস্তাঘাটের সাথে সে খুব পরিচিত।

তার গাড়ী চালানো দেখে বুঝলাম সে বেশ দক্ষ ড্রাইভার। আমাদের গাড়ীটাও (Toyota RAV 4) বেশ বড়ো আর নতুন। বেশী ঝাঁকানী নেই। আমি সামনে রামেন্দ্রর পাশে ক্যামেরা হাতে বসলাম। ওরা তিনজন আরাম করে পা ছড়িয়ে পিছনে। লম্বা পাহাড়ী রাস্তায় এই বড় গাড়ীই ভালো। Comfortable and safe…

দেরাদুন শহরটা পেরোলেই পাহাড়ী রাস্তা শুরু। এই রাস্তায় আমরা মুসৌরী গেছি অনেকবার। কিছুটা এগিয়ে যাবার পরে Road sign দেখে বুঝলাম আমরা মুসৌরী্র দিকে না গিয়ে অন্য দিকে বেঁকে গেলাম। রামেন্দ্র বললো ওই রাস্তাটা বাঁ দিকে মুসৌরী আর যমুনোত্রীর দিকে চলে গেছে। আমরা যাচ্ছি ডান দিকে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রীর দিকে।

গাড়ী চলছে, জানলার বাইরে দেখছি পাহাড়ের রূপ। ছবি তুলে যাচ্ছি। কথাবার্ত্তাও চলছে টুকটাক।

রাস্তায় খুব কাজ হচ্ছে দেখছি। রামেন্দ্র বললো মোদীজী উত্তরাখন্ডে তিব্বত বর্ডারের চারিপাশে চওড়া all weather road তৈরী করছেন, যাতে army trucks আর artillery চট করে বর্ডারে পৌঁছে দেওয়া যায়। উত্তরাখন্ডে বি জে পি সম্প্রতি Assembly election এ জিতেছে। তাদের মুখ্যমন্ত্রীর বিশাল ছবি রাস্তার পাশে হোর্ডিং এ চোখে পড়ে।

বেশ কিছুক্ষণ গাড়ী চালাবার পরে একটা জায়গায় এসে রামেন্দ্র গাড়ী থামালো। চা আর বাথরুম ব্রেক। দোকানের নাম কাজল রেস্টুরেন্ট এন্ড কাফে। রাস্তার ধারে বেশ ছিমছাম দোকান, সেখানে বসার জায়গা আছে, অনেক গুলো টেবিল চেয়ার। আমরা যখন গেলাম তখন দোকানে কোন লোক নেই। আমরা গরম কফি আর বিস্কুট অর্ডার করে বসলাম। ওদের টয়লেটটা খুব পরিস্কার, দেখে বেশ ভাল লাগলো। এই পাহাড়ের দেশের লোকেদের ওপর বেশ একটা শ্রদ্ধা আর সন্মানের ভাব জন্মাচ্ছে আমার মনে। দোকানের মালিক কাউন্টারে বসে আছেন তাঁর সাথে কিছুক্ষণ গল্প জুড়ে দিলাম।

উত্তরকাশী যাবার পথে এবার নদীর পাশ দিয়ে এঁকে বেঁকে আমাদের রাস্তা। দূরে পাহাড়, পাশে নদী নুড়ি পাথরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে আমরা নদীর এদিকে মাঝে মাঝে ব্রীজ পার হয়ে ওদিকে। রামেন্দ্র আমাদের বলে দিয়েছে এখানে নদীর নাম গঙ্গা নয়। এখানে তার নাম হলো ভাগীরথী। আরও নীচে রুদ্রপ্রয়াগ আর দেবপ্রয়াগে মন্দাকিনী আর অলকনন্দারর সাথে মিশে যাওয়ার পরে তিন সখীর মিলিত নাম হলো গঙ্গা, যা তার পরে হৃষিকেশ আর হরিদ্বারে সমতলে নেমে এসেছে।

কিছুক্ষণ পরে আমরা ভাগীরথী নদীর ওপরে Tehri dam এর কাছে এসে পৌঁছলাম। এখানে Hydroelectric power generation plant আছে। ২০০৬ সালে এই বাঁধের কাজ শেষ হবার পরে এখান থেকেই এখন উত্তরাখন্ডের প্রায় ৯০% বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। রামেন্দ্র আমাদের একটা Viewing point এর সামনে নিয়ে গেল। খুব দূর থেকে নীচে দেখা যায় বাঁধের reservoir – বিশাল এক নীল হ্রদ।

রক্তকরবীতে রাজা নিজের সাথে নন্দিনীর তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “সরোবর কি ফেনার নূপুর পরা ঝর্ণার মত নাচতে পারে?” টেহরী বাঁধের বিশাল নীল সরোবর দেখে আমার রাজার সেই কথাটা মনে পড়লো। ফেনার নূপুর পরা উচ্ছল বালিকা ভাগীরথী কে এখানে পায়ে শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।

উত্তরকাশী পৌঁছলাম প্রায় দেড়টা নাগাদ। উত্তরাখন্ডের এই শহরটিকে বেশ ধূলিধূসরিত আর নোংরা মনে হলো । বেশ চওড়া একটা রাস্তা, সেখান দিয়ে একের পর এক বাস আর গাড়ী চলে যাচ্ছে। বেশ কিছু বাসের পিছনে বদ্রীনাথ লেখা আছে দেখলাম। রাস্তার দু’পাশে দোকান, তার মধ্যে রামেন্দ্রর বাছা একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ করলাম। মেনু দেখে বুঝলাম এখানে প্রধান দু’টো খাবার – staple food – হলো মোমো আর ম্যাগীর স্যুপ। কিসের মাংস দেবে কে জানে এই ভেবে আমরা তিন জন নিরামিষ মোমো অর্ডার করলাম কিন্তু বুবান নিরামিষ ভালবাসেনা। আমরা অনেক বারণ করা সত্ত্বেও সে চিকেন মোমো অর্ডার করলো।

সেই ২০১৭ সালের পর থেকে কি একটা ওষুধ খাবার পরে তার পেট এখনো একদিনও খারাপ হয়নি জানালো সে। এখানে চিকেন মোমো খেয়েও তার কিছুই হবেনা সে নিশ্চিত।

বুবান বললো , “আমার পেটটা বীভৎস!”

বীভৎস?

বুবান একটু অপ্রস্তুত আর লজ্জিত ভঙ্গীতে বললো, এখানে বীভৎস মানে ব্যাপক, মানে ভাল, দারুণ, দুর্দ্দান্ত!”

কত বদলে যাচ্ছে আমাদের বাংলা ভাষা!

খেয়ে দেয়ে রাস্তায় বেরিয়ে রাস্তার এক ঠ্যালাওয়ালার কাছ থেকে কিছু ফল – কমলালেবু, আঙ্গুর ইত্যাদি কেনা হলো। তারপরে আর সময় নষ্ট না করে সোজা ধারালীর পথে।

এবার পাহাড়ী রাস্তায় ক্রমাগত সেকেন্ড গীয়ারে ওঠা। এঁকে বেঁকে আস্তে আস্তে এক পাহাড় থেকে পাশের পাহাড়ে চলে যাচ্ছি, যত ওপরে উঠছি তত যেন বেশ ঠান্ডা লাগছে, আমরা সকলেই গায়ে আর এক গরম জামা পরে নিলাম। কেউ জ্যাকেট, কেউ সোয়েটার, কেউ শাল।

রাস্তার এক একটা বাঁক ঘুরতেই আশ্চর্য্য সুন্দর সব দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে বৃত্তাকারে নেমে গেছে ক্ষেত, দূরে ছোট ছোট গ্রাম দেখা যায়, সেই গ্রামের ছোট ছোট বাড়ীতে বিকেলের সূর্য্যের আলো এসে পড়েছে। মাঝে মাঝেই দূরের পাহাড়ের গা থেকে ধোঁয়া উঠছে দেখা যায়। রামেন্দ্র বললো – Forest fire – বনে আগুন লেগেছে, তাই ধোঁয়া।

ক্রমশঃ দূরের পাহাড়গুলো কাছে চলে আসতে শুরু করলো, তাদের চূড়ো সব বরফে ঢাকা। সেই বরফের ওপরে অস্তগামী সূর্য্যের লাল আলো এসে পড়েছে।

জীবনে অনেক হিল স্টেশনে গিয়েছি কিন্তু এত কাছ থেকে বিশাল বরফে ঢাকা পর্ব্বতচুড়ো দেখার সৌভাগ্য এই প্রথম।

বুবান বললো, “জ্যেঠু আমরা আর একটু ওপরে উঠলে ওই ঝাউ গাছ গুলোর মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের চুড়োয় বরফের মধ্যে সূর্য্যের লাল আলো এসে পড়ছে, এরকম বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিও। বীভৎস উঠবে। ”

পেনাল্টি মিস্‌

কয়েক বছর আগে  আগে USA র বিরুদ্ধে কোপা সেমিফাইনালে তিরিশ গজ দূর থেকে মেসির ফ্রিকিক এ দুর্দ্ধর্ষ গোল দেখার পর মেসি কে সবাই দেবতা ভেবে আকাশে তুলে নাচছিল।  তার মাত্র কিছুদিন পরে স্প্যানিশ লীগের ম্যাচে বার্সিলোনার হয়ে খেলার সময় পেনাল্টি মিসের পর বেচারার মুখটা দেখে দুঃখই হচ্ছিল। কাল কাগজে তাকে নিয়ে কি লেখা হবে কে জানে।

আকাশ থেকে সোজা মাটিতে। দেবতা থেকে আবার একজন সাধারণ মানুষ?

সালা হুইমসিকাল পাব্লিক!

গত বছর (২০২২) কাতারের বিশ্বকাপে অনেক পেনাল্টি মিস দেখলাম । ফুল টাইমের মধ্যে খেলার মীমাংসা না হলে পেনাল্টি শুটআউটে জয় পরাজয় ঠিক হয়, অনেক সময় কোন টীম ১২০ মিনিট ভাল খেলেও পেনাল্টি মিসের জন্যে হেরে গেলে বেশ খারাপ লাগে। কাতারে আর্জেন্টিনা আর ফ্রান্সের ফাইনালে যা হলো। স্বস্তির কথা সেখানে অবশ্য মেসি বা এমব্যাপে দুজনেই পেনল্টি মিস করেনি।

কিন্তু ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে ইটালী ব্রাজিলের কাছে হারে। ইটালীর নামী ফরোয়ার্ড বাজিও সেবার পেনাল্টি মিস করে। তার পর মাঠে বেচারার দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্নার ছবি এখনো আমার চোখে ভাসে।

দেশের হয়ে খেলার সময়  এই সব নামী দামী খেলোয়াড়দের  মনের ওপরে কি ধরণের expectation এর চাপ থাকে তা আমাদের পক্ষে অনুমান করাও কঠিন।   

সুতরাং পেনাল্টি মিস হলে অবাক হবার তেমন কিছু নেই। হতেই পারে। মেসি রোনাল্ডো এবং আরও অনেক নামকরা খেলোয়াড় বহু বার পেনাল্টি মিস করেছে, ওই ম্যাচটাতে মেসিরও সেটা  প্রথম পেনাল্টি মিস ছিলনা!

২০০৬ সালে জার্মানীর বিশ্বকাপ Quarter Final এ পর্তুগালের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড এর বেকহ্যাম, জেরার্ড আর ল্যাম্পার্ড তিন জনেই পেনাল্টি মিস করে, এবং ইংল্যান্ড হেরে যায়। সেই সময়ে ইংল্যান্ডে Immigrant দের জন্যে Britishness course চালু করা হয়েছিল। যাতে তাদের মধ্যে ব্রিটিশদের মূল্যবোধ চারিত হয় আর তারা ভাল ভাবে ব্রিটিশ সমাজে মিশে যেতে পারে।

তো তার পরের দিন গার্ডিয়ানে একটা কার্টুন বেরিয়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে আলখাল্লা আর পাগড়ী  পরা এক মুখ দাড়িওয়ালা তিন জন লোক এরকম একটা Britishness course এর ক্যাম্প থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছে,তাদের একজন রিপোর্টার জিজ্ঞেস করছেঃWhat did you learn today?

উত্তরে তারা একগাল হেসে  বলছেঃ Today we learnt how to miss penalty kicks…

ইংল্যান্ডের এই পেনাল্টি মিস করে ম্যাচ হারা এখন একটা রসিকতার পর্য্যায়ে চলে গেছে।  

আমার বাবা (প্রাণবন্ধু, বাদল) তিরিশের দশকে কলকাতা ময়দানে ফার্স্ট ডিভিসনে ফুটবল খেলতেন। স্কটিশ চার্চ কলেজের হয়ে এলিয়ট শীল্ডে খেলার সময় তিনি এরিয়ানের দুখীরাম মজুমদারের নজরে পড়েন। দুখীরাম তাঁকে এরিয়ানে ডেকে নেন।

আমার মাসতুতো দাদা (বড়মাসীর ছেলে, রতন দা’) বাবার কাছ থেকে  পাস নিয়ে ময়দানে খেলা দেখতে যেতেন। রতনদা’র কাছে শুনেছি, “উঃ, মেসোমশায়ের দুই পায়ে সে কি দুর্দ্দান্ত  কিক!”

বাবা গল্প করতেন যে তিনি নাকি এমন কর্ণার কিক করতেন যে বল হামেশাই swerve করে সেকেণ্ড পোস্ট দিয়ে গোলে ঢুকে যেত।  Bend it like Beckham এর মত। তখন অবশ্য বেকহ্যাম এর জন্ম হয়নি। কথাটা হওয়া উচিত ছিল Bend it like Bhowmick!

তাই যে কোন খেলায় কর্ণার বা পেনাল্টি অবধারিত বাবাই নিতেন।

একবার কোন এক ম্যাচে বাবা নাকি পেনাল্টি মিস্‌ করেন। বল বারের সামান্য দুই ইঞ্চি ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

পরের দিন স্টেটসম্যান কাগজে সেই ম্যাচ রিপোর্টের হেডলাইন ছিলঃ

BHOWMICK MISSES PENALTY KICK!


পড়লে মনে হবে সেটা যেন পৃথিবীর একটা অন্যতম আশ্চর্য্য ঘটনা~

এই হেডলাইন টা বাবার খুব গর্ব্বের আর আত্মশ্লাঘার কারণ ছিল বলে আমার মনে হয়, কেননা এই গল্পটা তাঁর মুখে আমি অনেকবার শুনেছি। পেনাল্টি মিস করে যে দুঃখ বাবার হয়েছিল, আমার ধারণা স্টেটসম্যান এর মত বড় এবং নামকরা কাগজে বাবার নামে ওই হেডলাইন সেই দুঃখ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।

ছোটবেলার খেলার মাঠের বন্ধুরা

সকালবেলার কেয়াতলা রোড

১) স্বরাজ

 ২০২০ সালের আগস্ট মাস।

কোভিডের প্রকোপ কিছুটা কমেছে।  আমরা দু’টো ভ্যাক্সিন নিয়েছি, মুখে মাস্ক পরে মাঝে মাঝে বাড়ীর বাইরে বেরোই।  বিদেশ ভ্রমণের বাধানিষেধ কমেছে, লন্ডন থেকে পুপু এসেছে আমাদের দেখতে।

আমি  আর পুপু রোজ সকালে বাড়ীর কাছে ঢাকুরিয়া লেকে একটু হেঁটে আসি।

একদিন পুপুর সাথে লেকে হাঁটার পর  কেয়াতলা রোড দিয়ে  বাড়ী ফিরছি।  দক্ষিণ কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালী পাড়া, একদিকে নানা রং এর একতলা দো’তলা বাড়ী, তাদের সামনে এক চিলতে বারান্দা, আর মাঝে মাঝে  বস্তীতে টালির চালের বাড়ী । ওই সকালে রাস্তার ধারে জলের কলের সামনে কিছু মেয়েরা বাসন মাজছে।  কিছু  লোক গামছা পরে ঘটির জল দিয়ে স্নান করছে।  কেউ কেউ নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজছে,  এই সবের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম  সামনে উল্টো দিক থেকে এক ভদ্রলোক আমাদের দিকে হেঁটে আসছেন,  এবং মনে হলো তিনি যেন আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন।  

ইনি কি আমার পরিচিত কেউ?   আমার মতোই হাইট, ভারী চেহারা।  দু’জনেরই মুখে মাস্ক বলে চিনতে পারছিনা।  

আমাদের কাছে এসে ভদ্রলোক একটু হেসে  বললেন “মাস্ক টা একটু খুলবেন প্লীজ?”

এই কোভিডের সময় অপরিচিত কারুর কাছ থেকে এই ধরণের অনুরোধ আসলে একটু অস্বস্তি হয়। আমি অবশ্য ভদ্রতা করে মুখ থেকে মাস্ক টা খুলতেই যাচ্ছিলাম, কেননা মনে  হচ্ছিল ভদ্রলোক আমায় চেনেন।

কিন্তু  পুপু ডাক্তার, সে সোজা বলে দিলো “না বাবা”। ওর মা’র মতোই ও ও বেশ যাকে ইংরেজীতে বলে aggressive…

ভদ্রলোক এবং আমি দুজনেই একটু অপ্রস্তুত।

উনি বললেন,  “মান্টু না?”   

আমি ভাবলাম এই রে, ঠিক যা ভেবেছি। ইনি আমায় চেনেন। একটু বিব্রত হয়ে আমতা আমতা করে বললাম, “হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে মানে আমি তো ঠিক…

ভদ্রলোক বললেন ছোটবেলায় আমরা একসাথে কত খেলাধুলা করেছি। আমার সব মনে আছে, শ্যামল দা’,বাবলু, বাপ্পা, মনা, শঙ্কর, বাবু,  অলক, বিকাশ …

আমি খুব লজ্জা পেয়ে বললাম আপনার নামটা কি?

উনি বললেন, “আবার আপনি কেন? আমি হলাম স্বরাজ।  তুমি আমায় চিনতে পারছোনা? কালীঘাট পার্কে আমরা  কত ফুটবল খেলেছি একসাথে. আমার চেহারাটা পালটে গেছে, তাই তুমি চিনতে পারছোনা, কিন্তু তোমায়  দ্যাখো আমি চিনতে পেরে গেলাম, আমার বেশ গর্ব্ববোধ হচ্ছে,…  ”

স্বরাজ কে আমি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম, ষাট বছর পরে দেখা,সময়টা তো কম নয়।  আর তার ওপরে স্বরাজের চেহারা একেবারেই পালটে গেছে। আগে ছিল ছিপছিপে লম্বা, এখন চেহারাটা বেশ মুশকো হয়েছে।  কিন্তু যেই বললো কালীঘাট পার্কে ফুটবল খেলেছি এক সাথে, অমনি  এক মূহুর্ত্তের মধ্যে ছবির মত ওকে মনে পড়ে গেল। ওরা থাকতো হাজরা রোডে অন্য পাড়ায়। ওদের ক্লাব ছিল উদয়ন সঙ্ঘ, আর আমাদের ক্লাব ছিল মনোহরপুকুর বৈশাখী সঙ্ঘ। আমাদের দুই ক্লাবের ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হতো কালীঘাট পার্কে।

অসাধারণ বল কন্ট্রোল ছিল স্বরাজের।  তাছাড়া ছিল স্পীড আর দুর্দ্ধর্ষ ড্রিবলিং স্কিল।  এখনো মনে আছে একবার আমার মাথার ওপর দিয়ে বল ট্যাপ করে পাশ কাটিয়ে তীরবেগে আমাদের গোলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল সে।

আমিও ফুটবলটা ভালোই খেলতাম। তাই হয়তো স্বরাজের ও আমার কথা এতদিন পরেও মনে আছে।  ছোটবেলার খেলার মাঠের সেই বন্ধুত্ব কি কোন দিনই ভোলা যায়?  

সেই বন্ধুত্ব চিরকালীন।

তারপরে কিছু মামুলী কথাবার্ত্তার পর আমরা বিদায় নিলাম।  কেউই কাউকে ঠিকানা বা ফোন নাম্বার দিলামনা। 

২) কিরণ

কিরণকে কি কারুর মনে আছে? কিরণ সিনহা।

ফুটবলটা বেশ ভাল খেলত। উঁচু ক্লাসে উঠে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল বোধহয়। থাকতো বালীগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে। কোয়ালিটির পাশে একটা ছোট পার্কে ওকে পাড়ার ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলতে দেখেছি মাঝে মাঝে।

আমাদের সেন্ট লরেন্স স্কুলে ছিল বিশাল খেলার মাঠ,  সেই মাঠ ছোট ছোট ভাগ করে লাঞ্চ ব্রেকে আমরা চুটিয়ে ফুটবল খেলতাম। এখনো মনে পড়ে  স্কুলের পিছন দিকে বাঁধাকপির ক্ষেত আর পুকুরের দিকে এক চিলতে মাঠে ক্লাস ফোর ফাইভে খেলতাম আমরা। আর সেই সময় কিরণ ছিল আমাদের স্টার প্লেয়ার। এমনিতে পড়াশোনায় কিরণ তেমন ভাল ছিলনা,  ক্লাসে  মাথা নীচু করে চুপ করেই থাকতো বেশীর ভাগ সময়, খুব লাজুক ছিল কিরণ।

কিন্তু খেলার মাঠে বল পায়ে তার অন্য রূপ।  ফুটবল মাঠে সে একচ্ছত্র সম্রাট।  

বেশ কয়েক বছর আগে একবার বালীগঞ্জ ফাঁড়ির উল্টো দিকে পেট্রোল পাম্পের পাশে The Wardrobe নামে একটা লন্ড্রীতে কাপড় কাচাতে নিয়ে গেছি। ঢুকেই দেখি কাউন্টারে আমাদের কিরণ বসে।

অনেকদিন পর দেখা, কিন্তু আমি চিনলাম সহজেই, চেহারাটা অনেকটা আগের মতোই আছে, বেশ শক্তপোক্ত খেলোয়াড় সুলভ। মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করা, কপালের সামনে একটু পাতলা হয়েছে, বেশ ভারিক্কী হয়েছে কিরণ, দোকান টা ওরই  franchise  নেওয়া বুঝলাম, কেননা চারপাশের কর্ন্মচারীদের সাথে সে বেশ হুকুমের ভঙ্গী তে কথা বলছিল।

কিরণ ও আমায় চিনেছে ঠিক। ছোটবেলার ফুটবল মাঠের বন্ধুদের  সহজে ভোলা যায়না।

“এখনও খেলো নাকি?” কিছুটা লাজুক গলায় কিরণ জিজ্ঞেস করলো আমায়।

“কোথায় আর?” বললাম আমি।

তারপর বেশ কিছু খুচরো কথা হলো।

আমার বিলটা সই করার আগে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে পুরনো বন্ধুকে ২০% ডিসকাউন্ট লিখে দিল কিরণ।

কি মুস্কিল, এসব আবার কেন, বললাম আমি।

তার পরে আর কোনদিন কিরণের দোকানে কাপড় কাচাতে নিয়ে যাইনি।

বন্ধুদের এইরকম ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে ডিসকাউন্ট দিতে গিয়ে ওর দোকানটা শেষে উঠে যাক আর কি?

কি দরকার?

৩) পৃথ্বীশ

পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে যখন স্কুলে পড়ি, তখন কলকাতার দুই ফুটবল ক্লাব  মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল ছিল দুই  প্রবল পরান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বী, আর তাদের সমর্ত্থক দের মধ্যেও ছিল দারুণ রেষারেষি।

স্কুলে আমাদের নিজেদের মধ্যে খেলার জন্যে দুই ফুটবল টীম করার সময় প্রায়ই মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার দের নিয়ে টীম তৈরি  হতো।  আমি ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান কোন দলের সমর্থক ছিলামনা,  কিন্তু আমায় সবসময় ইস্টবেঙ্গলের টীমে খেলতে হতো।  আসলে আমাদের সহপাঠী খেলোয়াড়দের মধ্যে মোহনবাগানের সমর্থক অনেক বেশী থাকতো, তুলনায় ইস্টবেঙ্গলে অনেক কম।  তাই ইস্টবেঙ্গলের টীমে যথেষ্ট প্লেয়ার পাওয়া যেতোনা।  তাই আমায় ইস্টবেঙ্গলের টীমে খেলতে হতো।  সেই সব খেলা অবশ্য এলেবেলে খেলা, তাই কোন একটা দল হলেই হলো।

কিন্তু  ইস্টবেঙ্গলের দলে বাঁধা খেলোয়াড় ছিল পৃথ্বীশ। পৃথ্বীশ  চ্যাটার্জ্জী।

সে ছিল ইস্টবেঙ্গলের পাঁড় সমর্থক। তাকে ইস্টবেঙ্গল কেমন খেলেছে এই প্রশ্ন করা হলে তার তিনটে সম্ভাব্য উত্তর ছিলঃ

১) দারুণ খেলেছে

২) দুর্দ্দান্ত খেলেছে

৩) দুর্দ্ধর্ষ খেলেছে

ইস্টবেঙ্গল কখনো খারাপ খেলেছে, এ কথা সে ভাবতেই পারতোনা।

তো একবার কলকাতা লীগের খেলায় (বোধ হয় ১৯৫৭ কি ১৯৫৮ সালে) এরিয়ান ক্লাবের কাছে ইস্টবেঙ্গল ০-৪ হেরে যায়। পরের দিন স্কুলে আমি পৃথ্বীশ কে বললাম “কী রে, কাল তোদের কী হল?”

পৃথ্বীশ গোমড়া মুখ করে বললো, “অস্বীকার করছি, কাল ইস্টবেঙ্গল ভালো খেলেছে!”

ঢাকুরিয়া লেক