Tag Archives: ভাস্বর

আমের বদলে স্ট্যাম্প

মামা বাড়ীর বাগানে রঞ্জু ভাস্বর আর চার বোন

আমার চার মামাতো ভাই বোন, ঝুমুদি, রুমি, ভাস্বর আর মিনি। এছাড়া ছিলাম আমি আর আমার মেজমাসীর ছেলে রঞ্জু। আমরা সবাই পিঠোপিঠি ভাই বোন বলে একসাথে হলে খুব হৈ হৈ করতাম। আর হৈ হৈ করার জন্যে আসানসোলে মামার কোর্ট রোডের  বিশাল বাগানবাড়ীটা ছিল যাকে ইংরেজীতে বলে আইডিয়াল। স্কুলে পড়ার সময় মাস দুয়েক গরমের ছুটির  সময় মা আর মাসীর সাথে আমি আর রঞ্জু আসানসোলে মামা বাড়ীতে কিছুদিন কাটিয়ে আসতাম।  

ভাস্বরের সাথে এখন দেখা হলে ছোটবেলার এই সব ছুটির দিনগুলোর গল্প হয়। সেই সব দিনের নানা ছোটখাটো মজার ঘটনার কথা ভাস্বরের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল। আর ভাস্বরের গল্প বলার একটা নিজস্ব স্টাইল আছে। প্রথমতঃ সেই সব ছোটবেলার গল্প সবই হাসি আর মজার। আর দ্বিতীয়তঃ গল্প বলার সময় কোন সেই সব মজার জায়গায় এলে ভাস্বর প্রাণ খুলে গলা কাঁপিয়ে হা হা হো হো করে হাসে, সেই হাসি দেখে তখন যে গল্প শুনছে তার ও হাসি পেয়ে যাবেই। তৃতীয়তঃ ভাস্বরের গলা কাঁপানো হাসিটা আবার ললিত বা বেহাগ রাগের খেয়ালের মত, যা কিনা আলাপ থেকে ঝালার মত ধীরে ধীরে ক্রমশঃ নীচু থেকে উঁচুতে স্পীড বাড়িয়ে উঠতে থাকে এবং গলার সাথে সাথে ভাস্বরের সারা শরীর ও কেঁপে কেঁপে ওঠে।  আর চতুর্থতঃ ভাস্বর এই সব গল্প বলার মধ্যে মাঝে মাঝেই সে “মান্টু দা’, একবার চিন্তা করে দেখো অবস্থাটা”, কিংবা “মান্টুদা’ দৃশ্যটা একবার কল্পনা করো” বলে  শ্রোতাকে (এ ক্ষেত্রে আমাকে) একেবারে গল্পের পরিবেশে নিয়ে যায়, যেন আমি পুরো ঘটনাটা চোখের সামনে ছবির মত দেখতে পাই।

সব মিলিয়ে ভাস্বরের মুখে কোন গল্প শোনা একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা।      

এই গল্পটা ভাস্বরের মুখে সম্প্রতি শুনলাম। এই গল্পে মূল চরিত্র হলো ভাস্বর আর রঞ্জু। আর পার্শ্বচরিত্রে মামা আর মামীমা।

গরমের ছুটিতে রঞ্জুকে মাসী আসানসোলে মামার বাড়ীতে রেখে এসেছেন। ভাস্বর আর রঞ্জু ছুটির দিনগুলো কোর্ট রোডের বাড়ীর বিশাল বাগানে হুটোপাটি ছুটোছুটি আর দৌরাত্ম্য করে বেড়াচ্ছে।

ওদের দু’জনের আবার দেশ বিদেশের স্ট্যাম্প জমানোর অভ্যেস, সেই সব স্ট্যাম্প আদান প্রদান হয় দু’জনের মধ্যে।  রঞ্জুর কাছে একটা ইউরোপের কোন এক দেশের রং বেরং এর সুন্দর ছবি আঁকা একটা বড় স্ট্যাম্প আছে। ভাস্বরের ওই স্ট্যাম্পের ওপর খুব লোভ। কিন্তু রঞ্জু কিছুতেই সেই স্ট্যাম্প তাকে দিতে রাজী হচ্ছেনা।

একদিন সকালে দুই ভাই বাড়ীর বাগানে একটা বিশাল ডালপালাওয়ালা আমগাছে চড়ে গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করছে, এমন সময় রঞ্জু হঠাৎ দ্যাখে টুকটুকে লাল একটা পাকা আম সরু একটা ডালের ওপর ঝুলছে। সেই সরু ডালে গিয়ে রঞ্জুর পক্ষে ওই আম পাড়া সম্ভব নয়, কিন্তু ভাস্বরের শরীর হাল্কা আর নমনীয়, সে অনায়াসে ওই আমটা পেড়ে আনতে পারে।

রঞ্জু ভাস্বর কে বললো, “তুই যদি আমায় ওই আমটা পেড়ে এনে দিস, তাহলে ওই স্ট্যাম্পটা আমি তোকে দেবো।”

আমি ভাস্বর কে বললাম, “এতো সেই নাকের বদলে নরুণ পাবার গল্প হয়ে গেল!”

ভাস্বর তার শরীর আর গলা কাঁপানো হাসিটা হেসে বললো, “ঠিক বলেছো মান্টুদা’, আমের বদলে স্ট্যাম্প পেলাম, টাক ডুমা ডুম ডুম!”

ছোটবেলায় এই ধরণের barter বা দেয়া নেয়া বেশ স্বাভাবিক ছিল।

তো ভাস্বর সেই সরু ডাল বেয়ে প্রায় আমের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, হাত বাড়িয়ে আমটা পাড়তে যাবে, এমন সময় হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে ডালটা আচমকা দুলে উঠলো, আর ভাস্বর টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে যেতে কোনমতে দুই হাতে ডালটা ধরে ঝুলে রইলো।

এদিকে তাই দেখে রঞ্জু তো প্রাণপনে চ্যাঁচাতে শুরু করে দিয়েছে। বাড়ীতে অনেক কাজের লোক, কিন্তু কেউ রঞ্জুর চ্যাঁচানী শুনতে পাচ্ছেনা, তাই বেশ কিছুক্ষন ভাস্বর ডাল ধরে ঝুলে আছে, এদিকে হাওয়া দিচ্ছে বেশ জোরে, ডালটাও দুলছে, আর কতক্ষন ভাস্বর ঝুলে থাকতে পারবে বলা কঠিন।

গাছের তলায় কিছু লোহার রড আর ইঁটের টুকরো জড়ো করা ছিল, সেই জন্যে ভাস্বর মাটিতে পড়লে বেশ চোট পাবে, হাত পা ভেঙেও যেতে পারে।

এই রকম সময় রঞ্জুর আর্ত্তনাদ কানে আসায় কিছু একটা হয়েছে ভেবে মামা আর মামীমা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো দু’জনে কেমন যেন চিত্রার্পিত হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন, কাজের লোকদের ডাকছেন না, গাছের তলায় গিয়ে ভাস্বর কে উদ্ধার করার ও কোন চেষ্টা করার লক্ষণ দেখাচ্ছেন না।

ভাস্বর তার ললিত রাগে গলা কাঁপানো হাসি হেসে বললো “মান্টুদা’ দৃশ্যটা একবার কল্পনা করো…”

আমি দৃশ্যটা কল্পনায় পরিস্কার দেখলাম। একেবারে ছবির মতো। অল্প হাওয়ায় গাছের ডাল দুলছে,  এবং সেই ডাল ধরে ভাস্বর ঝুলছে। আর ওদিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মামা আর মামীমা স্থানুর মত দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের মুখে কোন কথা নেই।

হঠাৎ মামীমা মামাকে বলে উঠলেন, “গাড়ীটা গ্যারেজ থেকে বের করো~”

মামীমার এই কথা শুনে মামা বেশ অবাক হয়ে গেছেন, তিনি বললেন, “গাড়ী? গাড়ী বের করবো কেন?”

মামীমা বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “কি আশ্চর্য্য, তোমার ছেলে তো এখুনি গাছ থেকে পড়ে হাত পা কিছু একটা ভাঙবে, তখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবেনা?”

খুব উচ্চস্বরে বেহাগ রাগে তার শরীর কাঁপানো হাসি হেসে ভাস্বর বললো, “চিন্তা করে দ্যাখো মান্টুদা, কিরকম মা বাবা, ছেলে গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছে, কোথায় এসে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে, তা না…”  

গল্পের শেষে অবশ্য কিছু কাজের লোক এসে ভাস্বরকে ডাল থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে। তার হাত পা কিছুই ভাঙ্গেনি, গাড়ীও বের করতে হয়নি। হাসপাতালেও যেতে হয়নি।

সব ভাল যার শেষ ভালো। তবে ওই স্ট্যাম্পটা ভাস্বরের কপালে ছিলোনা। 

ভাস্বরের বৌ মালা একদিন কথায় কথায় আমায় বলেছিল, “জানেন মান্টুদা’, ও না মাঝে মাঝে একা ঘরে বসে এই সব পুরনো দিনের কথা ভেবে নিজের মনেই হাসে। আমার বেশ ভয় করে। আমি ওকে বলি “ওগো, তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছো”, কিন্তু ও আমার কোন কথা কানেই নেয়না, বলে “এসব তুমি বুঝবেনা…”