মনোহরপুকুরের বাড়ীতে ছোটবেলার একটা সন্ধ্যার কথা খুব মনে পড়ে।
বড় বারান্দায় সিঁড়ির কাছে আমাদের ধোপা এক বিরাট বান্ডিল কাপড় জামা নিয়ে এসে বসেছে, মা জ্যেঠিমা কাকীমারা তার সাথে কাপড়ের হিসেব করছেন, এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে ছোটকাকা উঠে এলেন। বারান্দায় উঠে আসতেই চার বৌদি ঘিরে ধরলেন তাঁকে।
“অশোক, আজ নাইট শো তে আমাদের হারানো সুর দেখাতে নিয়ে চলো।”
ছোটকাকার তখনো বিয়ে হয়নি, তিনি বৌদিদের একমাত্র অবিবাহিত দ্যাওর। আর খুব pampered..
ছোটকাকার বরাবরই একটু মজা করার অভ্যেস, আর প্রতি কথার শেষে অ্যাঁ? বলা তার একটা মুদ্রাদোষ ছিল। হীরকের রাজা যেমন “ঠিক কি না?” বলতেন, অনেকটা সেরকম।
ছোটকাকা সেদিন গম্ভীর আর উদাস মুখ করে বলেছিলেন, “যে সুর হারিয়ে গেছে তাকে আর দেখতে গিয়ে কি হবে, অ্যাঁ?”
এখন জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে সেই জীবনের নানা হারানো সুর হঠাৎ আচমকা ফিরে আসে।
যেমন গতকাল ছিল বিশ্বকর্ম্মা পূজো।
ছোটবেলায় বিশ্বকর্ম্মা পূজো আমাদের জন্যে ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর season এর শেষ দিন। তার আগের দিন গুলো ঘুড়ি ওড়ালেও ওই দিনটা বলতে গেলে ছিল ঘুড়ি উৎসব এর দিন। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত “ভোকাট্টা”…
বাবলু আর আমি আমাদের বাড়ীর ছাত থেকে খুব ঘুড়ি উড়িয়েছি একসময়।
মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীর ছাদে আমরা বেশ কিছুদিন আগে থেকে ওই দিনটার জন্যে prepare করতাম। সুতো লাটাই ঘুড়ি কেনা হতো সতীশ মুখার্জ্জী রোডে “মাণিক লাল দত্তের” দোকান থেকে। সিকি তেল, আধ তেল, এক তেল। কত রকম ঘুড়ির design ছিল তখন, আর তাদের কতরকম নাম ছিল – ঘয়েলা, ময়ূরপঙ্খী, মোমবাতি, চৌরঙ্গী…তারপরে সেই ঘুড়িতে ব্যালান্স করে সুতোর কার্ণিক লাগানো ছিল একটা কঠিন কাজ।
আর মাঞ্জা দেবার জন্যে কিনতাম এরারুট, কাঁচগুড়ো আর রং। এক ছুটির দিন দুপুরে আমি আর বাবলু ছাদে সুতোয় মাঞ্জা দিতাম। সাদা সুতো কিনে মাঞ্জা দেওয়া হতো ছাতে। অ্যারারুট, কাঁচগুড়ো আর রং জল মিশিয়ে মন্ড তৈরী করে সুতোর ওপরে কয়েকবার লাগাতে হতো, রোদ্দুরে শুকোবার পরে সুতোয় এমন ধার হত যে আঙুল কেটে যেতো অসাবধান হলেই।
বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন সকাল থেকেই আকাশ ভরে উঠতো লাল নীল ঘুড়িতে। প্যাঁচ খেলে কোন ঘুড়ি কে কাটলে চারিদিক থেকে উল্লসিত আওয়াজ উঠতো – ভোকা…আ…আ…ট্টা…। সেই আওয়াজ এখনো আমার কানে ভাসে। আর কারুর ঘুড়ি কাটতে পারলে যে মনের মধ্যে একটা গর্ব্ব আর আনন্দের অনুভূতি হতো সেটাও এখনো ভুলিনি।
বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন বাবলুর স্কুল ছুটি কিন্তু আমার মিশনারী স্কুলে ছুটি নেই। ইচ্ছে না থাকলেও আমায় স্কুলে যেতেই হতো। মা’কে বলে লাভ হতোনা। She was too strict…
বাবলু এদিকে সকাল থেকে ছাদে।
সেদিন স্কুলে লাস্ট পিরিয়ডটা যেন কাটতেই চাইতোনা। বিকেলে ছুটির ঘন্টা বাজলেই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটতাম মনে পড়ে। বাড়ী পৌঁছেই দুড্ডাড় করে ছাতে চলে যেতাম, তারপর সন্ধ্যা নামা পর্য্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো।
ঘুন্টু সেলিমপুরের বাড়ীতে উঠে যাবার পর প্রায় প্রতি বছর বিকেলে মনোহরপুকুরে ঘুড়ি ওড়াতে চলে আসতো। হাজরা মোড়ে সাধনদাদুর কারখানায় বেশ বড় করে বিশ্বকর্ম্মা পূজো হতো। আমি ঘুন্টু আর বাবলু সন্ধ্যাবেলা সেখানে গিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসতাম।
ঘুড়ি ওড়ানো এখন অনেকদিন বন্ধ, তবে এখন লকডাউনের এই ঘরবন্দী জীবনে রোজ সন্ধ্যায় আমাদের পূর্ণ দাস রোডের বাড়ীর ছাতে হাঁটার সময় ইদানীং মাথার ওপরে খোলা আকাশে শনশন আওয়াজ পাই, দেখি ঘুড়ি উড়ছে চারিদিকে। গতকাল বিশ্বকর্ম্মা পূজোর দিন দেখলাম আকাশে অনেক ঘুড়ি, খুব প্যাঁচ লড়া চলছে, কয়েকটা ঘুড়ি কাটা পড়ে ভাসতে ভাসতে নীচে নেমে আসছে, একটা কাটা ঘুড়ি আমাদের ছাতে এসে পড়লো।
গত শনিবার ১৪/৬/২৫ আমাদের বাড়ীতে ভাই বোনদের আড্ডা বসেছিল। খোকন, মিঠু,ঝুনকু, ভান্টুলি,ঝুন্টু আর কৌশিকী আর আমরা দু’জন। সব মিলিয়ে আমরা আট জন। যখন কাজ করতাম তখন শনি আর রবিবার ছিল ছুটির দিন। কিন্তু এখন কাজ থেকে অবসর নেবার পরে তো রোজই ছুটি,যে কোন একদিন বসলেই হয়। তবু কেন জানিনা শনি আর রবিবারের ছুটির আমেজ টা আজও মন থেকে মুছে যায়নি।
এই দুই দিনের মধ্যে শনিবারটা ছুটি হিসেবে রবিবারের থেকেও ভাল কেননা যখন কাজ করতাম তখন রবিবার কেটে গেলে সন্ধ্যা থেকে পরের দিন আবার কাজে যেতে হবে ভেবে মন খারাপ হয়ে থাকতো শনিবার সন্ধ্যায় মন খারাপ হতোনা, পরের দিনটাও তো ছুটি। কুয়েতে প্রথম গিয়ে শুনি শুক্রবার ওদের জুম্মাবার, সেদিনই ওদের সপ্তাহান্তের ছুটি। রবিবার কাজ করতে যেতে কি যে খারাপ লাগতো। যাক, জীবনের সেই চ্যাপ্টার এখন শেষ।
সবাই বেলা বারোটার মধ্যে কথামতো চলে এলো। আমি আর খোকন সিঙ্গল মল্ট্ নিয়ে বসলাম, বাকিরা সবাই পেপসি আর কোক। সুভদ্রা সাথে চিপ্স্ আর কাঠবাদাম (Almonds) প্লেটে সাজিয়ে এনে দিলো।
আড্ডা ক্রমশঃ জমে উঠলো।
খোকন মিঠুর সাথে আমরা কিছুদিন আগে অমৃতসর ডালহাউসী আর ধর্মশালা ঘুরে এসেছি। আমরা দিল্লী হয়ে গেছি, খোকনরা গেছে কলকাতা থেকে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সাথে অপারেশন সিঁদুরের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, অমৃতসর শহরটা পাকিস্তান বর্ডারের খুব কাছে, কিছুদিন আগে ওখানে বোমা পড়েছে, ব্ল্যাক আউটও ছিল। ওয়াগা আতারী বর্ডার বন্ধ। এই সময়ে ওই জায়গায় যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে?
দিল্লীতে মুকুর সাথে কথা হলো। অমৃতসরের কাছে গুরদাসপুরে মুকু অনেকদিন পোস্টেড ছিল। ওই জায়গাটা তার খুব পরিচিত। তার মত হলো এখন ওইসব জায়গায় না যাওয়াই ভালো। কিন্তু টিকিট কাটা হয়ে গেছে, গাড়ী হোটেল ইত্যাদি সব কিছু বন্দোবস্ত হয়ে গেছে, তা ছাড়া যুদ্ধ তো শেষ। Cease Fire declare করা হয়েছে,এখন পিছিয়ে আসা মুস্কিল।
আমার কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে মুকু খোকন কে ফোন করেছিল। খোকন আমাদের সেই ফোন কল টা অভিনয় করে দেখালো। সে বেশ ভাল অভিনয় করে। তার গলার modulation ও দারুণ, কানের কাছে হাত রেখে অনেকটা যেন টেলিফোনে কথা বলছে সেই ভাবে মুকুর গলাটা যথাসম্ভব গম্ভীর আর ভারী (মুকু দা’ কথা বলে কর্ণেল সাহেবের মতো বেশ আদেশের ভঙ্গীতে) করে আর নিজের গলাটা কিছুটা নরম আর মিনমিনে করে সে তাদের কথোপকথন হুবহু বলে গেল।
মুকুঃ হ্যালো, খোকন?
খোকনঃ মুকুদা’, বলো?
মুকুঃ মান্টুর কাছে শুনলাম তোরা নাকি অমৃতসর যাচ্ছিস?
খোকন (আমতা আমতা করে) – হ্যাঁ, সেরকমই তো ঠিক আছে।
মুকুঃ না না এখন যাস, না। আমি মান্টুকেও বলেছি।
খোকনের স্টকে মুকুর সাথে এইরকম অনেক টেলিফোন কথোপকথন রয়েছে। খোকন সেই গুলো ও আমাদের শোনালো।
প্রথম টা জন্মদিন নিয়েঃ
মুকুঃ হ্যালো, খোকন?
খোকনঃ মুকুদা’ , বলো?
মুকুঃ Happy birthday!
খোকন (আমতা আমতা করে) – আজ তো আমার জন্মদিন নয়?
মুকুঃ (খুব অবাক হয়ে) সে কি? তাহলে আজ কা’র জন্মদিন?
আর এটা হলো বাড়ীর ঠিকানা নিয়েঃ
মুকুঃ হ্যালো, খোকন?
খোকনঃ মুকুদা’ আমি দিল্লী এসেছি। তোমার সাথে দেখা করতে আসবো।
এই গল্পটা শুনে ভান্টুলী অবাক হয়ে বললো মুকুদা’ U 18 এর ঠিকানা ভুলে গেছে? আমার তো এখনো U 18 এর ফোন নাম্বারও মনে আছে।
ন’কাকা কাকীমা অনেক দিন দিল্লীতে জ্যেঠুর বাড়ীতে গ্যারেজের ওপরে একটা ঘর নিয়ে থাকতেন। ভান্টূলি বললো রাস্তার উল্টোদিকে বিপুমামার বাড়ী ছিল V 16 Green Park Extension । বিপুমামা মুম্বাই তে ফিল্ম প্রোডিউসার ছিলেন, মাঝে মাঝে ওনার বাড়ীতে বলিউডের ফিল্ম স্টার রা এসে থাকতো। ওই বাড়ীতে ফোন ছিলনা, ফোন করার দরকার পড়লে তাদের বলা ছিল U 18 এ গিয়ে ফোন করতে।
একবার নাকি বিখ্যাত ফিল্মস্টার জিতেন্দ্র ফোন করতে এসেছিলেন। জ্যেঠু তখন বাড়ীতে খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে মুগুর ভাঁজছেন। বাড়ীতে ছিল শিখা তার তখনো বিয়ে হয়নি, সে তো সামনা সামনি জিতেন্দ্র কে দেখে কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা। জিতেন্দ্র যখন বললো আমি কি একটা ফোন করতে পারি, শিখা ছূটে নাকি জ্যেঠুকে বলেছিল বাবা বাবা জিতেন্দ্র এসেছে ফোন করতে…
জ্যেঠু নাকি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন জিতেন্দ্রটা আবার কে?
শিখা নাকি জ্যেঠুকে এক ধমক দিয়ে বলেছিল,তুমি জিতেন্দ্রর নাম শোনোনি? আশ্চর্য্য! যাও তাড়াতাড়ি পাজামা পাঞ্জাবি পরে এসো।
সেখান থেকে জিতেন্দ্র কে নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হয়ে গেল। জিতেন্দ্রর প্রথম ছবিটা যেন কি? কারুর ঠিক মনে পড়ছেনা।
সুভদ্রা বললো জীনে কি রাহ!
কৌশিকীর পুরনো ছবি তে বেশ ভাল ফান্ডা – সে বললো না না, ওর প্রথম ছবি হলো ফর্জ্।
আজকাল আমাদের কিছু মনে থাকেনা, স্মৃতি ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, এখন আমাদের গুগলই ভরসা। ঝুনকু ফোন খুলে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখে বললো, হ্যাঁ ফর্জ ই ওর প্রথম ছবি।
সুভদ্রার ও হিন্দী সিনেমার ফাণ্ডা বেশ ভাল। সে বললো ইস্, ফর্জের গান গুলো কি দারুণ, – মস্ত বাহারো কা ম্যায় হুঁ আশিক – আহা – ঝুন্টু তোর মনে আছে আমরা কিরকম হিন্দী ছবি দেখেছি এক সময়। তুই টিকিট কেটে আনতি।
সুভদ্রা এখনো হিন্দী গান বেশ ভালই গায়, সে দুই হাত ছড়িয়ে নাচের ভঙ্গীতে গেয়ে উঠলোঃ সারা জাঁহা হ্যায় মেরে লিয়ে ~
আমাদের সকলের যে বয়েস হচ্ছে, তা এখন আমাদের কথাবার্ত্তা থেকেই বোঝা যায়। কিছুদিন আগেও আমাদের এই আড্ডায় খুব হাসি ঠাট্টা হতো, আমরা বেড়াতে যাবার কথা বলতাম। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনীরা আমাদের আলোচনায় আসতো। এবার দেখলাম আমরা বেশীর ভাগ সময়ে কথা বলছি আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের জীবনে ক্রমশঃ একটা ছায়া নেমে আসছে। ভাই বোনেরা অনেকেই বিদায় নিয়েছে, আমরা যারা আছি, তারাও একটা বাধ্যতামূলক একা হয়ে যাওয়া আর পরাধীনতার দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধছে, আমরা হয়তো জানিওনা। আমরা কেউ কেউ যারা কানে কম শুনছি তাদের সাথে বেশ জোরে বা কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। খোকন বললো সে কিছুদিন আগে স্নেহদিয়া নামে রাজারহাটে একটা Old age home এ গিয়ে কথা বলে খোঁজখবর করে এসেছে।
এই নিয়ে কিছুদিন আগে প্রচেত গুপ্ত রবিবাসরীয় আনন্দবাজারে একটা প্রবন্ধ লিখেছেন, তার নাম “এ বড় সুখের সময় নয়!”
সব চেয়ে বেশী যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হল আমাদের স্মৃতিশক্তি খুব দুর্ব্বল হয়ে যাচ্ছে। Dementia বা Alzheimers এখনও হয়নি কারুরই, কিন্তু কোন জায়গা বা কোন সিনেমা বা কারুর নাম বলতে গেলে কোথাও আটকে যাই, প্রানপণ চেষ্টা করেও কোন নাম কিছুতেই মনে করতে পারিনা। মাথার ভিতরে memory cell গুলো কোন অদৃশ্য পোকা কুরে কুরে খেয়ে চলেছে।
বিশেষ করে নাম ভুলে যাওয়া টাই সব চেয়ে বেশী। ঝুন্টু বললো ও নাকি Proper noun মনে রাখতে পারেনা।
বহুদিন আগে, তখন কুয়েতে উইকেন্ডে বন্ধুদের বাড়ীতে আড্ডা বসত। সেই রকম কোন এক আড্ডায় একবার আমাদের এক বন্ধু সিদ্ধার্থ সাহেব বিবি গোলাম সিনেমাটার নাম কিছুতেই মনে করতে পারছিলোনা। তার সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটা এখনো মনে পড়ে। যাতে আমাদের কারুর মনে পড়ে সেই জন্যে আমাদের নানা clue দিয়ে যাচ্ছিল। আরে বিমল মিত্রের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস। আরে সেই যে এক জমিদারের সুন্দরী বৌ সুমিত্রা দেবী একা একা মদ খেতে শুরু করলো! আরে উত্তম কুমার ও ছিলো একটা ছোট রোলে! মনে পড়ছেনা?
আমি লেখালেখি করি। লিখতে গিয়ে প্রায়ই কোন একটা বিশেষ শব্দ ব্যবহার করতে চাই, সেই শব্দটা আমার জানা, কিন্তু কিছুতেই সেই শব্দটা মনে পড়েনা। মাথার ভিতরে কোন এক অতল অন্ধকার জায়গায় সে লুকিয়ে থাকে, সেখান থেকে তাকে অনেক চেষ্টা করেও বের করে আনতে পারিনা। গভীর জলের তলায় যেন ডুবে থাকা মণি মুক্তোর মতই লাগে তাদের, ডুবুরী লাগিয়েও যাদের খুঁজে পাওয়া সোজা কাজ নয়। তখন খুব অসহায় লাগে।
আমি ঝুন্টু কে বললাম আমার তো Common noun ও মনে আসেনা রে।
শরীর আমাদের এই সব ছোট ছোট সাবধানবাণী শোনাচ্ছে – যাকে বলে early signal – বিদায়ের সময় আগত ভাই সব! প্রস্তুতি শুরু করো।
ঝুন্টু কৌশিকী কে বললো, “আমরা মান্টুদা’ কে আজ কি একটা ্জিজ্ঞেস করবো ভেবেছিলাম না?” কৌশিকী বলল, “সত্যি, একদম মনে পড়ছেনা।“
আরো অনেক কিছুই এরকম মনে থাকেনা।
যাই হোক, জিতেন্দ্র থেকে আমরা চলে গেলেম নায়িকাদের দিকে। ফর্জে জিতেন্দ্রর নায়িকা কে ছিল? কারুর মনে নেই। সাধনা, নূতন, রেহানা সুলতানা?
আমাদের গুগল বিশেষজ্ঞ ঝুনকু আবার ভুরু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ববিতা”…
ববিতা নামে যে একজন নায়িকা ছিল তা আমরা ভুলেই গেছি।
আমি বললাম ওফ, সেই সময়ের সিনেমায় নায়ক আর নায়িকারা কি নাচানাচি আর ছোটাছুটিই না করত, মাঠে ঘাটে ,রাস্তা ঘাটে পাহাড়ে গাছের মধ্যে যেখানে হোক, ধেই ধেই করে নেচে প্রেম নিবেদন।
তারাপদদা’র কবিতায় একটা লাইন ছিল~
ভালবাসাবাসি ছাড়া আর কোন কাজ নেই সোমত্থ যুবক যুবতীর।
আমাদের কমবয়েসে শাম্মী কাপুর আর জিতেন্দ্র এই দু’জন ছিল নাচানাচি তে ওস্তাদ।
কে বেশী সুন্দরী ছিল,নূতন না সাধনা?
এই নিয়ে বেশ কিছু মতভেদ দেখা গেল। সাধনা কে নিয়ে আমি আমার জীবনের একটা গল্প বললাম।
মার্চ্চ, ১৯৬৩। হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার প্রথম দিন। বাবা একটা গাড়ী বলেছেন আমায় পরীক্ষার সেন্টারে নামিয়ে দেবে। আমি মনোহরপুকুরের বাড়ীর ছোট বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ীটা আসতে এত দেরী করছে কেন? গত তিন মাস খুব খেটেছি, কিন্তু এখন যেন কিছুই মনে পড়ছেনা, বেশ নার্ভাস লাগছে, ভয়ে বুক দুরদুর করছে। কি প্রশ্ন আসতে পারে তাই নিয়ে ভেবে যাচ্ছি।
হঠাৎ দেখি রাস্তা দিয়ে একদল ছেলে যাচ্ছে, তারা নিজেদের মধ্যে বেশ চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে শুনে বুঝলাম তারাও হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে, কাছেই কোন স্কুলে তাদের সীট পড়েছে। তাদের সকলেরি হাসি মুখ, চিন্তার লেশমাত্র আছে বলে মনে হলোনা। একজন শুনলাম বলছে “saলা, আমি তো saধনার মুখ টা মনে করে যা খুসী লিখে আসবো মাইরী।“
সাধনা খুব একটা তেমন সুন্দরী না হলেও তখন খুব জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন। কিন্তু সুভদ্রার ভাল লাগতো নূতন কে।
সেই রাজকাপুর আর নূতনের সিনেমাটা যেন কি? দারুন সব গান ছিল মুকেশ আর লতার…
আমি বললাম “আনাড়ী?”
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলে সুভদ্রা গেয়ে উঠলো , “ও চাঁদ খিলা,ও তারে হসে, ও রাত অজব মতওয়ারী হ্যায় – সমঝনে ওয়ালে সমঝ গয়ে হ্যায় – না সমঝে ও আনাড়ী হ্যায়”। হিন্দী গানে সুভদ্রা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী যাকে বলে second to none..
এই সব গল্প হতে হতে বেলা দু’টো বেজে গেছে , এবার লাঞ্চ।
আজকের মেনু হলো খাঁটি বাড়ীর খাবার। ভাত, ডাল, লাউচিংড়ী, ধোকার ডালনা, পার্শে মাছ ভাজা, রুই মাছের ঝোল, কাঁচা আমের চাটনি। শেষপাতে মিষ্টি, কৌশিকী এনেছে লাল দই, আর মিঠু এনেছে রাজভোগ আর হিমসাগর আম।
খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে আবার আড্ডা, সেই আড্ডায় এলো অনেক পুরনো দিনের মনোহরপকুরের বাড়ীর পারিবারিক স্মৃতি। আমাদের পিতামহ ব্রজবন্ধু ভৌমিকের লেখা তাঁর বাবা দীনবন্ধু ভৌমিকের সংক্ষিপ্ত জীবনী “পিতৃতর্পন” নিয়ে আলোচনা হলো। আমি বললাম আমাদের ভৌমিক পরিবারের ইতিহাস এবং বংশ তালিকা নিয়ে আমার একটা বই লেখার পরিকল্পনার কথা। সকলে খুব উৎসাহ দিলো আমায়। কিন্তু শুধু মুখের উৎসাহ দিলে তো হবেনা। আমায় তথ্য দিতে হবে। আমি এটা খসড়া করে সবাইকে পাঠাবো বললাম, কোন তথ্য না থাকলে বা তাতে কোন ভুলচুক হলে যেন সবাই যার যার মত করে সেগুলো আমায় সংশোধন করে দেয়।
এদিকে কলকাতায় খুব বাঁদরের উৎপাত শুরু হয়েছে। অনেক জায়গাতেই খবর পাচ্ছি কলকাতায় বাঁদরদের উপদ্রব বাড়ছে। ঝুনকু বললো ওদের পাটুলীর বাড়ীতে নাকি একটা বাঁদর ছানা এসে বাড়ীর ভিতর থেকে কিছু খাবার নিয়ে ছাদে গিয়ে বসে খাচ্ছিল। খবর পেয়ে ঝুনকু নাকি ছাদে গিয়ে বাঁদর ছানা টাকে বাংলায় তুমুল বকেছে। “আর এক বার যদি এরকম বাঁদরামি করিস তাহলে ঠাসঠাস করে দুই গালে দুই চড় খাবি।“
ঝুন্টু বললো কি আশ্চর্য্য, বাঁদররা তো বাঁদরামি ই করবে।
ঝুনকু বললো না রে, আমার বকুনী খেয়ে বাঁদরবাচ্চা টা ঠিক মানুষের বাচ্চার মত ভয় পেয়ে মুখ লুকিয়ে ফেললো।
খোকন বললো সাবধান ওদের বেশী কাছে যাস্না। বাচ্চাটার মা এসে “আমার ছেলে কে কেন বকছো বলে তোকেই দুটো ঠাস ঠাস করে কষিয়ে দুটো চড় মেরে দেবে।‘
বাঁদর দের নিয়ে একটা বিখ্যাত জোক আছে, সেটা অনেকেই জানে, কিন্তু তা সত্ত্বেও বার বার শুনেও সবাই হো হো করে হাসে। যেন এই প্রথম শুনলো।
———–
চিড়িয়াখানায় খাঁচার ভিতর থেকে একটি বাঁদর এক ভদ্রলোকের চশমা কেড়ে নেয়।
কি করে এটা সম্ভব হলো?
আসলে হয়েছে কি, খাঁচার সামনে একটা নোটিস টাঙ্গানো ছিল। ভদ্রলোক কৌতূহলী হয়ে খাঁচার খুব কাছে গিয়ে ঝুঁকে নোটিসটা পড়তে গিয়েছিলেন, তাতেই এই বিপত্তি।
নোটিসে লেখা ছিল “সাবধান!! বাঁদরেরা চশমা কাড়িয়া লয়!”
এই গল্পটা শুনে একটি মেয়ে নাকি একটুও না হেসে বলেছিল “সত্যি বাঁদরগুলো যা অসভ্য!”
জয়পদ আর বিজয়পদ এই দু’জন যমজ ভাই ছিল identical twins – দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ক্যানিং এর কাছে কোন এক অখ্যাত প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আমাদের পরিবারে কাজের লোক হিসেবে যখন তারা আসে তখন তাদের অল্প বয়েস। দু’জনে একেবারে এক রকম দেখতে, দু’জনেরি গায়ের রং কুচকুচে কালো, কথাবার্ত্তাও দু’জনে গ্রামের ভাষায় একই ভাবে বলে। দু’জনেই স্বাস্থ্যবান আর কর্মঠ, বাড়ীর কাজে তারা দু’জন – প্রথমে বিজয় ও সে কাজ ছেড়ে দেবার পরে জয় – বহাল হয়ে গেল সহজেই। ওরা আমারই বয়সী ছিল, হয়তো আমার থেকে সামান্য বড়োও হতে পারে।
আমাদের বাড়ীতে ছোটবেলা থেকেই সংসারে ঠিকে এবং দিন রাতের লোকেদের কাজ করতে দেখেছি। আমরা স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করে কত কিছু জানবো শিখবো, আর জয় বিজয় আমাদের সমবয়সী হলেও ওরা বাড়ীতে ফাইফরমাস খাটবে, আমাদের সাথে ওদের এই পার্থক্য, এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু আমাদের চোখে পড়েনি।
গ্রাম আর শহর, শিক্ষিত আর অশিক্ষিত, ভদ্রলোক আর অন্ত্যজ – আমাদের সমাজের মধ্যে এই যে একটা পরিস্কার শ্রেণীবিভাজনরেখা রয়েছে, সমাজের নিয়ম হিসেবেই আমরা তা মেনে নিয়েছি। হয়তো ওই প্রান্তিক খেটে খাওয়া সমাজের নীচের তলার মানুষেরাও সেই নিয়ম মেনে নিয়েছিল।
এটা এখন ভাবলে বেশ খারাপ লাগে।
তবে এটাও ঠিক যে ছোটবেলায় আমাদের ভাই বোনদের মনে ওই কাজের লোকদের প্রতি কোন নাক উঁচু মনোভাব ছিলনা। আমাদের বাড়ীর পরিবেশে কাজের লোকেরা থাকতো বাড়ীর লোকের মতোই। আর যেহেতু ওই দুই ভাইয়ের চমৎকার হাসিখুসী স্বভাব ছিল তাই অল্পদিনের মধ্যেই ওরা আমাদের বাড়ীর লোকের মত হয়ে যায়।
ইদানীং আমাদের দেশে খুব ধীরে হলেও ক্রমশঃ সমাজের নীচের স্তরের প্রান্তিক মানুষদের কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর প্রযুক্তি পৌঁছে যাচ্ছে। এখন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে পাকা বাড়ী, শৌচালয়, জল বিদ্যুৎ ইন্টারনেট মোবাইল ফোন ইত্যাদি সবই সহজলভ্য। একদা পিছিয়ে পড়া গ্রামের দলিত আদিবাসী লোকেরাও তাদের জীবনকে একটু একটু করে নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাবার সু্যোগ পাচ্ছে।
সম্প্রতি বিজয়ের গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে তার পরিবারের সাথে একটা দিন কাটাবার সুযোগ হয়েছিল। সেইদিন বিজয় কে দেখে দেশের সেই সামাজিক পরিবর্ত্তনের একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হলো আমাদের। যা ছিল একসাথে কৌতূহলোদ্দীপক এবং আনন্দদায়ক।
এই লেখাটা সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে।
২ মান্টুদা, মুখ থেইকে মাক্সোটা খুইলে ফেলো
জয়পদ আর বিজয়পদ দুই ভাই আমাদের বাড়ীর কাজ ছেড়ে দেবার পর ওদের সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিলনা। তবে ছোটমা অনেক চেষ্টা করে নানা জায়গায় তদবির করে বিজয় কে স্টেট ব্যাঙ্ক আর জয় কে FCI তে চাকরী করে দিয়েছিলেন। সরকারী চাকরী পেয়ে তাদের দুজনের জীবনেই অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছিল, অনেক দিন কাজ করার পরে ভাল পেনশন ইত্যাদি পেয়ে তাদের গ্রামের জীবনযাত্রা আমূল পালটে যায়।
সেই জন্যে ছোটমা’র প্রতি দুই ভাইয়ের মনে একটা কৃতজ্ঞতা বোধ ছিল, তাই আমাদের বাড়ীতে কাজের লোক না হলেও আমাদের পরিবারের সাথে এই দুই ভাইয়ের একটা যোগাযোগ থেকেই যায়। আমাদের নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ওরা আসতো, না বলতেই নিজে থেকে নানা কাজ করে দিত। তাদের গ্রামের বাড়ী থেকে তরীতরকারী ফলমূল ইত্যাদি এনে দিতো।
তারপরে তো অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে প্রধানতঃ খোকনের কাছ থেকে শুনতাম বিজয় এখন একজন সম্পন্ন গৃহস্থ, স্ত্রী ছেলে পুত্রবধূ নিয়ে বারুইপুরের কাছে এক গ্রামে তার বিরাট সংসার। তার আমন্ত্রণে ওদের গ্রামের বাড়ীতে ওরা মাঝে মাঝে যায়, আর গেলে বিজয় আর তার পরিবার তাদের নিয়ে কি করবে ভেবে পায়না, তাদের আদর যত্ন আর আতিথেয়তা পেয়ে খোকনরা আপ্লুত। ছোটমা বেশ কয়েক বার ওদের বাড়ীতে অতিথি হিসেবেও থেকে এসেছেন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষে লকডাউন এর প্রভাব যখন একটু কমেছে, শীত তখনো বিদায় নেয়নি, আমরা ভাই বোনেরা ভাবছি কোথাও সবাই মিলে একসাথে বেড়িয়ে আসবো, তখন খোকন একদিন বললো বিজয় বার বার বলছে ওদের বাড়ী আসতে, ওদের গ্রামটা দেখে আসবি নাকি?
আসবো তো বটেই, এরকম লোভনীয় প্রস্তাব কেউ ছাড়ে নাকি? আমরা এক কথায় রাজী। টুবলি কলকাতা এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে, সেও আমাদের সাথে যোগ দিতে চায়।
বুধবার ফেব্রুয়ারীর ষোল তারিখ যাওয়া ঠিক হলো।
কথামতো সেদিন সকাল দশটা নাগাদ একটা বড় Mahindra Scorpio SUV গাড়ী নিয়ে আমরা রওনা হলাম। পথে গড়িয়া থেকে খোকন মিঠু আর টুবলিকে তুলে নেওয়া হলো। টুবলি সল্ট লেকে ওদের বাড়ী থেকে Uber নিয়ে গড়িয়া চলে এসেছে।
গড়িয়া থেকে বাইপাস ধরে নরেন্দ্রপুর সোনারপুর ছাড়িয়ে আমরা বারুইপুরের দিকে এগোলাম। কলকাতা শহরের এই দক্ষিণ প্রান্তে বাইপাসের ধারে কত উঁচু উঁচু বাড়ী আর Housing complex ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে, দেখে অবাক হতে হয়।
বারুইপুর শহরটা বেশ বড়, শহরের প্রধান রাস্তার দুই দিকে দোকান, জমজমাট ভীড়। ছোটকাকা কাজ থেকে অবসর নেবার পরে এখানে একটা জমি কিনে বাড়ী করে বেশ কয়েক বছর ছিলেন। টুবলির তাই জায়গাটা চেনা। “বিয়ের পরে কলকাতা থেকে মা বাবার কাছে আসলে ট্রেণ থেকে নেমে এই স্টেশন রোড থেকে রিক্সা নিয়ে আমি বাড়ী যেতাম”, কিছুটা স্মৃতিমেদুর হয়ে বললো সে।
বারুইপুর থেকে বিজয়দের গ্রাম আরো প্রায় মিনিট পনেরোর রাস্তা, বিজয় বলে দিয়েছিল বন্ধন ব্যাঙ্ক এর পরে একটা রাস্তা ডান দিকে গ্রামের ভিতরে চলে গেছে, সেখানে পৌঁছে ওকে একটা ফোন করতে।
শহর কলকাতা ক্রমশঃ তার থাবা বাড়াচ্ছে কলকাতার উপকণ্ঠে।
বন্ধন ব্যাঙ্ক চোখে পড়তেই বিজয়ের নির্দ্দেশ অনুযায়ী আমরা বড় রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে তার গ্রামের সরু রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। আর ঢুকেই পল্লীগ্রামের পরিবেশ চোখে পড়লো। দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত, চারিদিকে প্রচুর গাছ পালা, তার মাঝে কিছু মাটির আর পাকা বাড়ী। সরু কিন্তু পাকা সিমেন্টের রাস্তা, আমাদের গাড়ীটা পুরো রাস্তা জুড়ে যাচ্ছে, উল্টো দিক থেকে কোন গাড়ী এলে কি হবে কে জানে, তার ওপরে মাঝে মাঝে রাস্তার একেবারে পাশে পুকুর, একটু এদিক ওদিক হলেই গাড়ীশুদ্ধ জলে।
ঝুনকু আর খোকন এখানে বেশ কয়েকবার এসেছে, তাই জায়গাটার সাথে তারা পরিচিত। তাছাড়া বিজয় তার বাড়ী থেকে বেরিয়ে আমাদের জন্যে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক দিন পরে তাকে দেখলাম। বেশ রোগা হয়ে গেছে বিজয়, একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে দেখলাম, খোকনের প্রশ্নের উত্তরে বলল কোমরে ব্যথা, ডাক্তার দেখিয়েছে। আমায় অনেকদিন পরে দেখছে বিজয় কিন্তু তার ব্যবহারে তা বোঝার জো নেই। আন্তরিক ভাবে সে আমার হাত ধরে আমায় তার বাড়ীর ভিতরে নিয়ে গেল।
“এখেনে কেউ মাক্স পরেনা মান্টুদা, মুখ থেইকে মাক্স টা খুইলে ফেলো”, বেশ ভারিক্কী চালেই আমায় বললো বিজয়।
তার কথায় একটা অধিকারবোধ আর শাসনের ভাব ছিল যেটা খুব উপভোগ করেছিলাম সেদিন। এত বছর পরে দেখা, আমি তো তার কাছে বলতে গেলে একজন অজানা অচেনা লোক। কিন্তু কত সহজে সে আমায় আত্মীয়ের মতো আপন করে নিলো একেবারে প্রথম থেকেই, তা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার প্রতি তার ব্যবহারে কোন জড়তা ছিলনা।
৩ – বিজয়ের গ্রাম, বাড়ী আর সংসার
আগে মাটির বাড়ীতে থাকতো বিজয়রা, এখন বিজয় তার নিজের পাকা বাড়ী বানিয়েছে, উঠোনের দেয়ালে তার বাবা আর তার নাম বেশ স্টাইল করে সিমেন্ট দিয়ে লেখা।
স্বর্গীয় ঋতুরাম সর্দ্দার – বিজয়পদ সর্দ্দার
উঠোনের এক দিকে রান্নাঘর, সেখানে একটি অল্পবয়েসী মেয়ে আমাদের দেখে লাজুক হাসলো। বিজয় আলাপ করিয়ে দিয়ে বললো, “সকাল থেকে বৌমা তোমাদের জন্যে রান্না করতি লেগেছে”। বৌটির গায়ে গায়ে ঘুরছে তার দুই ছেলেমেয়ে, বিজয়ের নাতি অঙ্কিত আর নাতনী অদ্বিতীয়া। তারাও তাদের মা’র মত বেশ চুপচাপ। বিজয়ের বৌ প্রভা বাড়ী নেই, শুনলাম সে গেছে তাদের পুকুর ঘাটে, বাড়ীর পাশেই রাস্তার ওপারে বিজয়দের নিজের পুকুর।
আমি সুভদ্রা আর টুবলি এই প্রথম বিজয়ের বাড়ী এসেছি, সে আমাদের বাড়ীটা ঘুরিয়ে দেখালো। প্রচ্ছন্ন গর্ব মেশানো বিনয়ের সাথে সে আমাদের জানালো যে তার বাড়ীতে টি ভি, এ সি, ওয়াই ফাই, ব্রড ব্যান্ড ইন্টারনেট, বেশ কিছু মোবাইল ফোন – এ সমস্ত কিছুই আছে। আর আছে আধুনিক বাথরুম সেখানে কমোডের ও ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ আমাদের শহুরে বাড়ীতে যা কিছু আছে সবই আছে তার এই গ্রামের বাড়ীতেও। দিদি আর বৌদিদের তাই কোন অসুবিধেই হবেনা এখানে।
দোতলা বাড়ী, তিনতলায় ছাত। দোতলায় দুটো শোবার ঘর, আর আছে একটা খোলা ছাদ, সেখানে পরে ঘর উঠবে হয়তো। বিজয় আর অঙ্কিত দু’জনে মিলে সেই ছাতে আমাদের বসার জন্যে কিছু চেয়ার এনে দিলো।
তিন তলার ছাতে ওঠার পথে পূজোর ঘর। সেটা ছাড়িয়ে ওপরের ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রথমেই দেখলাম সারা ছাতে শুকোনোর জন্যে ছড়ানো আছে প্রচুর ধান। সন্তর্পনে সেই ধান কাটিয়ে পাঁচিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নীচে তাকিয়ে দেখি চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে পল্লীগ্রাম তার যাবতীয় সৌন্দর্য্য নিয়ে। যতদূর চোখ যায় শুধু অবারিত সবুজ ধানক্ষেত। কচি ধানের চারার তলায় জমে আছে জল, আর রোদ পড়ে সেই জল চিকচিক করছে।
আমার শহুরে চোখে এই দৃশ্য খুব মায়াবী লাগলো, আর অবধারিত ভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনগুলো মনে পড়ে গেল।
বিজয় বললো “ওই যে ক্ষেতটা দেখতিছো, ওটা সবটাই আমার। প্রায় কুড়ি বিঘা জমি।”
“কে চাষ করে, তুমি লোক রেখেছো?”
বিজয় বলল, “চাষ করার জন্যি লোক আছে, আমি নিজেও কাজে লাগি।” এই বয়সেও বিজয় খুব কর্মঠ।
আমরা ভাইবোনেরা কিছুক্ষন দোতলার ছাতে চেয়ারে বসে গল্প করলাম, বিজয় আমাদের জন্যে ডাবের জল নিয়ে এলো। তারপর খোকন আর আমি বিজয়ের সাথে গেলাম গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে। গ্রামের নাম চয়নী মাঝেরহাট। ঘুরে ঘুরে এঁকে বেঁকে সরু সিমেন্টের রাস্তা চলে গেছে গ্রামের মধ্যে দিয়ে। মাঝে মাঝে পুকুর, সেখানে ঘাটে বেশ কিছু লোক গা ডুবিয়ে স্নান করছে, আর কোথাও ঘাটের সিঁড়িতে বসে কাজে ব্যস্ত কিছু মেয়ে। আমাদের মত অচেনা শহুরে মানুষদের দেখে তারা মাথায় ঘোমটা দিলো।
সত্যেন দত্তের সেই পালকীর গানের লাইনগুলো মনে এলো তাদের দেখে।
এঁটো হাতে হাতের পোঁছায়, গায়ে মাথার কাপড় গোছায়/হুন হুনা, হুনহুনা/
পথে জয়পদর বাড়ী পড়লো। জয় হলো বিজয়ের যমজ ভাই। ওরা Identical twins, কম বয়েসে ওদের অবিকল এক চেহারা ছিল। পাশাপাশি রাখলে কে যে কে চেনা প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন অবশ্য চেহারা অনেক আলাদা হয়ে গেছে দু’জনের। বিজয় কাজ ছেড়ে দেবার পরে তার দুই ভাই জয়পদ আর চিন্তামণি আমাদের বাড়ীতে কাজ করেছে কিছুদিন।
দেখা গেল জয়পদ বাড়ী নেই, পুকুরে স্নান করতে গেছে। তো বিজয় আমাদের নিয়ে চলে গেল সেই পুকুরঘাটে। জয় আর চিন্তামণি দুজনেই আমাদের দেখে খুব খুসী। পুকুর ধারে রাস্তার ওপরেই অনেক কথা হলো তিন ভাইয়ের সাথে। মনোহরপুকুরের বাড়ীর সেই পুরনো দিনগুলো নিয়েই স্মৃতিরোমন্থন হলো। বিশেষ করে তাদের মনে আছে মেজমা আর সেজমার (জ্যেঠিমা আর আমার মা) কথা। জ্যেঠিমা সম্বন্ধে বিজয়ের সহাস্য মন্তব্য – “বড়মা খুব ভালবাসতো আমাদের, কিন্তু মাঝে মাঝে বড় গরম হই যেতো” শুনে বাকি দুই ভাইও হেসে তাদের সোৎসাহী সমর্থন জানালো।
তিন ভাই এর সাথে আমি আর খোকন ওই পুকুর পাড়ে গ্রুপ ফটো তুললাম।
তার পরে বাড়ী ফেরার পথে তার নিজের পুকুর দেখাতে নিয়ে গেল বিজয়, সেখানে বিজয়ের বৌ প্রভা তখন তার কাজ সেরে বেশ কিছু বাসন হাতে বাড়ী ফিরছে। আমাদের দেখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে তার বৌমার মতোই শান্ত স্মিত হেসে সে নীরবে অভ্যর্থনা জানালো আমাদের।
গ্রাম দেখা শেষ করে আমরা বাড়ী ফিরলাম। ইতিমধ্যে বিজয়ের ছেলে বিশ্বজিৎ তার কাজ থেকে ফিরে এসেছে, বাড়ীর কাছেই বড় রাস্তার ওপর সে একটা বাড়ী কিনে সেটা বন্ধন ব্যাঙ্ক কে একটা দিক ভাড়া দিয়েছে, তা ছাড়াও তার একটা বিয়েবাড়ী ভাড়া আর কেটারিং এর ব্যবসা আছে, আর সেই বাড়ীর একতলায় বিল্ডিং মেটিরিয়াল এর দোকান। বেশ করিতকর্ম্মা আর উদ্যমী ছেলে বিশ্বজিৎ। এত অল্প বয়সে এতগুলো ব্যবসা করার মত মূলধন সে পেলো কোথায় এই প্রশ্ন অবশ্য করিনি। ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে সেই টাকা খাটিয়ে বাড়িয়েছে ধরে নিতে হবে, তাছাড়া বিজয়ও তার পেনশনের টাকা থেকে ছেলে কে সাহায্য করেছে নিশ্চয়।
বড় কথা হলো সে টাকাটা নষ্ট করেনি, ঠিকঠাক কাজে লাগিয়েছে।
“বড় রাস্তার পাশে জমিটা কত দিয়ে কিনলে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“কত আর? পঞ্চাশ লাখ মতো হবে! জলা জমি বলে একটু সস্তায় পেলাম!” বিশ্বজিৎএর কথায় তার বাবার মত কোন গ্রামীন টান নেই।
“আর বাড়ীটা তৈরী করতে কত পড়লো?”
খানিকটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে বিশ্বজিৎ বললো, “এখনো পর্য্যন্ত তো দুই কোটি টাকা মতো লেগেছে, কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি।”
বলে কি?
আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ীটা তো মনে হচ্ছে বিজয়ই কিনে নিতে পারতো~
বিজয় বললো “মান্টুদা’, তোমরা এবার এসে খেতি বোসো, আর দেরী কইরোনা, খাবার ঠান্ডা হই যাবে। ”
তাকিয়ে দেখি উঠোনের মাঝখানে বেশ কিছু টেবিল চেয়ার পাতা। বিয়ের নেমন্তন্নের পার্টির মতো ধবধবে পরিস্কার সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। বিশ্বজিৎএর কেটারিং এর ব্যবসা আছে, ওই বন্দোবস্ত করেছে।
আমরা গিয়ে যে যার মত বসে পড়লাম, বেশ ক্ষিদেও পেয়েছিলো। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার শিউমঙ্গলও এসে বসলো আমাদের সাথে।
৪ – বিজয় আর মার্লন ব্র্যান্ডো
সেই ভোরবেলা থেকে বিজয়ের বৌমা আমাদের জন্যে রান্না করেছে শুনেছিলাম, এবার সে নিজেই আমাদের পরিবেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বড় নম্র আর শান্ত মেয়েটি, একা একা এত কাজ সে হাসিমুখে করছে, তার মাথায় ঘোমটা, মুখে কোন কথা নেই, তাকে দেখে আমাদের খুব ভাল লাগলো। বিজয়ের কাছে শুনেছি সে বড় ঘরের মেয়ে। তার তিন ভাই এর কাছ থেকে সে তার বাবার সম্পত্তির কোন ভাগ চায়নি, তাই ভাইয়েরা ভালবেসে তাকে প্রায়ই এটা সেটা উপহার দিয়ে যায়। বিজয় তার ছেলের বিয়েতে তার বড়লোক বেয়াই এর কাছ থেকে কোন যৌতুক ও নেয়নি, তাই দুই পরিবারের মধ্যে খুব সুসম্পর্ক।
আমাদের সাথে বিজয় আর তার নাতি নাতনীও খেতে বসেছে, তারাও তাদের মা’র মতোই খুব চুপচাপ আর শান্ত। বিজয়ের বৌ প্রভা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখাশোনা করতে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে তাদের আতিথেয়তা বড় আন্তরিক।
এলাহী মেনু।
সেদ্ধ চালের ভাত, শুনলাম সেই চাল বিজয়ের নিজের ক্ষেতের। বিশ্বজিৎ এর ব্যবসায় যারা কাজ করে, সেখানে তাদের দুপুরের খাবারের চালও যায় এখান থেকে। তার পরে মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, সাথে বেগুণী, আর বাটা মাছ ভাজা। চাল এসেছে বিজয়ের ক্ষেত থেকে, বাটা মাছ বিজয়ের পুকুরের। তার পর এক এক করে গলদা চিংড়ীর মালাইকারী, রুই মাছের কালিয়া আর পাঁঠার মাংস। শেষ পাতে টোম্যাটো আর আমসত্ত্বের চাটনি আর মিষ্টি।
বিজয় কিছু বাকি রাখেনি।
প্রত্যেকটি পদ অত্যন্ত সুস্বাদু লাগলো আমাদের । আমরা প্রত্যেকেই সাধারণ ভাবে আমাদের খাবারে একটি বিশেষ স্বাদে অভ্যস্ত থাকি, আমাদের জিভে সেই স্বাদের একটা ভাল লাগা আগে থেকেই তৈরী হয়ে থাকে। সেই তৈরী স্বাদের থেকে খাবারের রসায়নে একটু এদিক ওদিক হলেই আমরা টের পাই। হয়তো ভাত ভাল সেদ্ধ হয়নি, কিংবা নুন মশলা আমাদের মনোমত নয়, আমরা টের পাবোই।
কিন্তু বিজয়ের বউমার প্রত্যেকটি রান্না একেবারে আমাদের palette এর সাথে যাকে বলে perfect fit…
সে যে একজন পাকা রাঁধুনী তা বুঝতে দেরী হলোনা, হুস হাস করে চেটে পুটে খেলাম সবাই।
খাবার পরে লম্বা গেলাসে করে ডাবের জল নিয়ে এলো বিজয়। তার নিজের জমিরই গাছ, সম্ভবতঃ। ডাব নিজেই কেটে গেলাসে ভরেছে সে।
সারা দুপুর বিজয়দের চাতালে বসে নানা গল্প হলো আমাদের।
মাসে ইলেক্ট্রিক বিল কত হয়? হাজার চারেক টাকা।
লোড শেডিং হয় কিনা। না, আজকাল আর হয়না।
মশারী ব্যবহার করতে হয় রাতে? হ্যাঁ।
চুরি চামারী ডাকাতি? গরু নাকি অনেক চুরি হয়ে গেছে এই গ্রাম থেকে। বাংলা দেশে পাচার হয়ে যায় তারা। এখন তাই সবার শুধু ছোট ছোট “হেলে” গরু। গ্রামে হিন্দুদের বাস, তাই গরুর মাংস এখানে খাওয়ার চল নেই।
রাজনীতির লোকেদের টাকা পয়সা খাওয়াতে হয়? তা তো হয় অবশ্যই। তবে টাকা দিলে তাদের দিয়ে কাজও হয়। এই তো গ্রামে পাকা রাস্তা হয়েছে।
এই সব নানা প্রসঙ্গ চলে এলো আমাদের আলোচনায়।
কথাবার্ত্তা বেশী বলেনা বিজয়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বে আর ব্যবহারে পরিবারের ওপরে তার যে একটা অনায়াস আধিপত্য আছে, সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়না। এমন নয় যে তাকে সবাই ভয় পায়, বা তাকে দেখে তঠস্থ হয়ে থাকে। বরং তার মুখে সবসময়ই লেগে থাকে এক চিলতে হাসি যার থেকে তার আত্মবিশ্বাসের একটা সুস্পষ্ট আন্দাজ পাওয়া যায়।
নাতি নাতনীরা এত চুপচাপ কেন? তোমরা ওদের বেশী বকঝকা করোনা তো – সুভদ্রার এই প্রশ্নের ঊত্তরে বিজয়পদ তার সহজ হাসি হেসে বলেছিল “একটু আধটু শাসন না করলি চলবি কি করে?” এক এক জন মানুষ থাকে যাদের ব্যক্তিত্ব আশেপাশের লোকেদের কাছ থেকে ভয় আর সমীহ আদায় করে নেয়। বিজয় ডন নয়, তবু তার গ্রামের লোকজন আর সংসারের কাছের মানুষদের কাছে তার প্রভাব আর প্রতিপত্তি আমার নজর এড়ায়নি। আজকের স্বল্পবাক আত্মবিশ্বাসী বিজয় কে দেখে আমার গডফাদার ছবিতে ডন কর্লিয়নের ভূমিকায় মার্লন ব্র্যান্ডোর দুর্দ্দান্ত অভিনয়ের কথা মনে পড়ছিল। নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ঘটনাবহুল জীবনের শেষে পৌঁছে এক শান্ত সৌম্য পরিতৃপ্ত ডন বসে আছেন তাঁর বাগানে, তাকিয়ে দেখছেন তাঁর নাতি নাতনীরা বাগানে ছুটোছুটি করে খেলা করছে। সে এমন এক মায়াবী দৃশ্য, অভিনয়ের গুণে যা মনে থেকে যায় অনেকদিন।
৫) বিদায়ের পালা
আলো কমে আসছে, আমাদের ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো।
বাড়ী থেকে বেরিয়ে গাড়ীতে ওঠার পথে দেখি বিজয়ের বাড়ীর বাগানে শিম গাছে রাশি রাশি শিম ঝুলছে। বিজয় আমাদের জন্যে তার বাগানের গাছ থেকে বেশ কিছু শিম আর শীষ পালং তুলে আমাদের জন্যে থলিতে ভরে দিলো।
বড় রাস্তা পর্য্যন্ত আমাদের গাড়ীতে করে এলো বিজয়। তার ছেলের দোকান আর অফিস রাস্তার ওপরে, বন্ধন ব্যাঙ্কের বিরাট সাইনবোর্ড। দোতলায় বন্ধন ব্যাঙ্ক, একতলায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাড়া দেবার জন্যে একটা আলাদা জায়গা করা হয়েছে, আর পাশে একটা বিল্ডিং মেটিরিয়ালের শোরুম।
ব্যবসার দুটো সাইনবোর্ড টাঙানো আছে চোখে পড়লো। প্রভা বিল্ডার্স আর অদ্বিতীয়া কেটারিং। মা আর মেয়ের নামে তার কোম্পানীর নাম রেখেছে বিশ্বজিৎ।
বিশ্বজিৎ আমাদের সব ঘুরিয়ে দেখালো। তার আর বিজয়ের মুখে একটা সাফল্য আর তৃপ্তির হাসি লক্ষ্য করে বেশ ভাল লাগলো।
গাড়ীতে ফিরতে ফিরতে বিজয়ের একটা কথা বার বার মনে পড়ছিল।
“মান্টুদা, আমার যা কিছু হয়েছে, সব তোমাদের আশীর্ব্বাদে”, বার বার বলেছিল সে। তার সেই কথার মধ্যে ছিল বিশুদ্ধ আন্তরিকতা। আর তার সেই কথা শুনে আমার বেশ লজ্জাই করেছিল সেদিন। সেই আশীর্ব্বাদ তো সে পেয়েছে তার ভাগ্যদেবতার কাছ থেকে।
বাকিটা তার একান্ত নিজের সুকৃতি, তার সততা, নিষ্ঠা আর কর্ম্মক্ষমতা।
বিজয়দের সাথে তাদের গ্রামে কাটানো সেই দিনটির কথা আর তাদের আতিথেয়তার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
তিন বছর আগে মা’র প্রথম সন্তান কাশীতে চিকিৎসার গাফিলতিতে মারা যায়। তাই আমার জন্মের সময় বাবা আর কোন রিস্ক নেন্নি, তিনি মা’কে কাশীতে দিদিমার কাছে না পাঠিয়ে কলকাতায় আমাদের মনোহরপুকু্রের বাড়ীতে রেখেছিলেন, এবং তখনকার সময়ের একজন নামকরা ডাক্তার ডঃ স্বদেশ বোস মা’কে দেখেছিলেন।
সেই মনোহরপুকুরের বাড়ীতেই ১৯৪৬ সালে দোলপূর্ণিমার দিন ১৭ই মার্চ (রবিবার) বিকেলে আমি জন্ম নিই।
আমার জন্মের সময় মা’র নিজের শ্বশুর শ্বাশুড়ি ছিলেননা, তাঁরা তখন দুজনেই মারা গেছেন, পাটনা থেকে তাঁর খুড়শ্বাশুড়ী – বাবাদের কাকীমা, আমাদের পাটনার দিদা – আর মা’র আপন দিদি ভগবতী – সবার ভাগুদি – এসে ছিলেন মা’র পাশে।
বাবার ডায়েরী লেখার অভ্যেস ছিল, তাঁর একটা ছোট ডায়েরীতে ১৭/৩/৪৬ তারিখের পাতায় আমার জন্ম নিয়ে লেখা ছিল “Khoka born to Saraswati at 3.15pm”!
আমি নাকি জন্মাবার পরে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদিনি। সেটা ডাক্তার স্বদেশ বোসের কাছে একটা বিপদের কারণ ছিল, কেননা শিশু জন্মাবার পরে না কাঁদলে তার ফুসফুসে বাতাস না যাবার ফলে তার মৃত্যু হবার সম্ভাবনা। তিনি নাকি ক্রমাগত আমায় উলটে ধরে আমার পিছনে অনবরত চাপড় মেরেছিলেন। বেশ কয়েকবার সেই চাপড় খেয়ে শেষ পর্য্যন্ত আমি কেঁদে উঠি। এবং তার পরে আমার কান্না থামেনি, আমি নাকি সারা রাত কেঁদেছিলাম।
কিন্তু আমার কান্না আমার মা’র জন্যে ছিল খুব আনন্দের কারণ। অবশেষে তিনি মা হয়েছেন। সেই মাতৃত্বের আনন্দের সাথে কোন আনন্দেরই বোধহয় কোন তুলনা হয়না।
স্বদেশ বাবু নাকি সেদিন পরে কোন এক বন্ধুর বাড়ীতে গিয়ে বলেছিলেন, “আজ একটা difficult case ছিল। বাচ্চাটা প্রায় যায় যায় অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু যায়নি, বেঁচে গেছে।”
আমি এই পৃথিবীতে আমার প্রথম রাতের কান্নার কথা ভাবি মাঝে মাঝে। আমার জীবনের কান্নার কোটা সেদিনই অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে, এটাই যা সুখবর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরে পৃথিবীর বুকে একটা শান্তির বাতাবরণ নেমে আসে। ওই সময় (১৯৪৬-১৯৬৪) সারা পৃথিবীতে জন্মের হার হঠাৎ বেড়ে যায়, শুধু ১৯৪৬ সালেই প্রায় ৭৫ লক্ষ শিশুর জন্ম হয়। যুদ্ধ পরবর্ত্তী এই Population explosion কে baby boom বলা হয়, এবং সেই অনুযায়ী আমাদের এই প্রজন্মের নাম হলো Baby boomers!
এই লেখা লিখবার সময় (২০২১ সালে) আমাদের প্রজন্মের সবার পৃথিবী ছেড়ে যাবার সময় হয়ে এসেছে, আমাদের Baby boomer দের বয়স এখন পঁচাত্তরের কাছাকাছি। কিন্তু একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে প্রজন্ম হিসেবে আমরা আগের প্রজন্মের লোকেদের থেকে বেশী শিক্ষিত, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, কর্ত্তব্যপরায়ণ, দায়িত্বশীল, কর্মঠ আর পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ।
যুদ্ধ পরবর্ত্তী শান্তির পৃথিবীতে যখন জীবনের নানা ক্ষেত্রে একটা বিশাল পরিবর্ত্তনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল, সেই সময় জন্মাবার জন্যে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান বলেই মনে হয়।
২) The great Calcutta killing – আগস্ট ১৬, ১৯৪৬
আমার জন্মের আগে থেকেই ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশনের সাথে দুটো রাজনৈতিক দলের – কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ – দেশের স্বাধীনতা এবং দেশভাগ নিয়ে আলোচনা চলছে। মুসলিম লীগ ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমান দের জন্যে আলাদা দেশ চায়। কিন্তু আলোচনায় কোন ফল হচ্ছেনা।
মুসলিম লীগের নেতা মহম্মদ জিন্না সাহেব ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবিত প্ল্যান নাকচ করে ১৬ই আগস্ট Direct Action Day হবে ঘোষনা করলেন।
বাংলায় তখন মুসলীম লীগের সরকার, মুখ্যমন্ত্রী হুসেন শহীদ সুরাবর্দ্দী। ঠিক হলো কলকাতায় মনুমেন্টের পাশে ময়দানে মুসলমানদের বিক্ষোভ সভা হবে।
আবহাওয়া ক্রমশঃ উত্তপ্ত হচ্ছে, হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হবে ধরে নিয়ে অনেকেই কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমার এক মাস বয়েসে – এপ্রিল ১৯৪৬ – পাটনার দিদা মা আর আমাকে নিয়ে পাটনায় নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। একমাস পরে মে মাসে বাবা এসে আমাদের কলকাতা নিয়ে এলেন, কিন্তু তখন কলকাতার অবস্থা ক্রমশঃ খারাপের দিকে এগোচ্ছে। অনেকেই আর কলকাতায় থাকতে সাহস পাচ্ছেনা।
বাবা তখন আমায় আর মা’কে নিয়ে দিদিমার কাছে কাশীতে রেখে এসেছিলেন।
তার কিছুদিন পরে ১৬ ই আগস্টে Direct Action day তে মনুমেন্টের ওই বিক্ষোভ সভার পরে সারা শহরে দাঙ্গা আর মারামারি খুনোখুনি শুরু হয়েছিল। পরে শোনা যায় যে মুসলমান গুন্ডারা আগে থেকেই হিন্দুদের মারার জন্যে প্রস্তুত হয়ে এসেছিল।
প্রথমে মার খেয়ে কিছুদিন পর থেকে হিন্দুরাও নৃশংস ভাবে মুসলমান দের হত্যা করতে শুরু করে।
মাসী (মা’র ভাগুদি’) আর মেসোমশায় তখন থাকতেন মৌলালীর কাছে তাঁদের সার্পেন্টাইন লেনের বাড়ীতে। সেই জায়গাটা মুসলমান পাড়া, তাই বাবা পুলিসের গাড়ী নিয়ে সেখানে গিয়ে তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করে আনেন।
৩) আমার মুখে ভাত আর নামকরণ
দাঙ্গা শেষ হবার পরে বাবা মা’কে আর আমাকে কাশী থেকে কলকাতা নিয়ে এলেন। আমার মুখে ভাত অনুষ্ঠান হলো মনোহরপুকুর রোডের বাড়ীতে। অনেকে এসেছিলেন, বাবার বন্ধুরা – বাণীবাবু, ভাষিবাবু, বীরেনদা’ । তাছাড়া অনেক আত্মীয়স্বজন, পাটনা থেকেও অনেকে।
মামা আমায় ভাত খাইয়েছিলেন।
সেই অনুষ্ঠানে আমার নামকরণ হয়েছিল। সেটা একটা বেশ মজার গল্প।
বাবার ডায়েরীতে এই নিয়ে লেখা আছে~
——————
মান্টুর অন্নপ্রাশনের সময় ওর নাম রাখার কথা হওয়াতে আমার শান্তিনিকেতনের বন্ধু ক্ষিতীশ রায় (বাণী) প্রস্তাব করলো যে লটারী করা হোক্।
ছোট ছোট কাগজের টুকরোতে যার যেরকম ইচ্ছে নাম লেখা ঠিক হলো। দু’টো করে নাম প্রত্যেকে লিখবে ঠিক হলো। কাগজগুলো মুড়ে একটা বাটিতে রেখে মান্টুর সামনে রাখা হলো। ছোট ছোট হাতে মান্টু খপ্ করে তার মধ্যে থেকে একটা কাগজ তুলে নিলো।
সেটাই অঞ্জুর রাখা নাম – “ইন্দ্রজিৎ”~
অঞ্জু (অঞ্জনা) হল আমার জ্যাঠতুতো দিদি (দিদিভাই) – তখন তার আট বছর বয়েস।
———————- মা গল্প করতেন যে সবার নাম লেখা কাগজ যখন বাটিতে রাখা হয়ে গেছে, তখন দিদিভাই নাকি ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে “আমিও একটা নাম দেবো” বলে ছুটতে ছুটতে নেমে আসে।
তাই দিদিভাইয়ের দেওয়া কাগজটা বোধ হয় সবচেয়ে পরে আসায় সবচেয়ে ওপরে ছিল। তাই সেটাই আমি তুলে নিই। কিংবা এমনও হতে পারে আমি হয়তো ওই নামটা তুলিনি, কিন্তু মা’র হয়তো ওই নামটাই ভাল লেগেছিল? সে যাই হোক্, ইন্দ্রজিৎ নামটাই আমার সাথে সারা জীবনের মত সেঁটে গেল। আমার অন্য কোন নামের কথা আর ভাবতেই পারিনা।
আমাদের জ্যেঠু বাবা কাকাদের সব ভাইদের নামের শেষে একটা বন্ধু জোড়া ছিল। বিশ্ববন্ধু প্রিয়বন্ধু, নিখিল বন্ধু, প্রাণবন্ধু এই রকম। এই চার ভাইয়ের স্কুলের সহপাঠী রা তাদের এই নাম নিয়ে মজা করে বলতো, “এই নিখিল বিশ্বে প্রাণটা বড়ই প্রিয়। ”
আমার বিয়ে ঠিক হবার পরে আমার শ্বশুরমশায় সুভদ্রাকে বলেছিলেন, “তোমার শ্বশুররা সবাই friends, মা!”
নামের শেষে বন্ধু জোড়া থাকলেও একমাত্র ছোটকাকা (অশোকবন্ধু ) আর সোনাকাকা (সুনীলবন্ধু) – এই দুজনই আমাদের ছোটদের সাথে বন্ধুর মত মিশতেন, সব সময়ে আমাদের সাথে হাসি খুসী মজা ঠাট্টা করতেন।
সোনাকাকা পাটনায় থাকতেন তাই তাঁকে আমরা খুব কাছে পাইনি। কিন্তু মনোহরপুকুরে ছোটকাকা ছিলেন আমাদের খুব কাছের মানুষ।
এই গল্পটা তাঁকে নিয়ে।
একদিন সন্ধ্যায় আমাদের বড় বারান্দায় খোদেচাটা পুরনো গোল টেবিলে কয়েকজন বসে চা খাচ্ছি। ছোটকাকা বললেন, “বুঝলি মান্টু, আমি এবার একটা ফিল্ম তৈরী করবো ঠিক করেছি।”
ফিল্ম? আমরা সবাই তো লাফিয়ে উঠলাম।
ছোটকাকা বললেন “ফিল্মের গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ, সঙ্গীত, পরিচালনা সবটাই আমার। কেবল অভিনয়ের জন্যে একজন নায়ক আর একজন নায়িকা আমার দরকার। বাকি সবটাই আমি দেখবো।”
কিছুদিন আগেই আমাদের সবাই কে নিয়ে ছোটকাকা সত্যজিত রায়ের “কাঞ্চনজঙ্ঘা” দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন কিনা কে জানে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম “গল্পটা লিখে ফেলেছো?”
ছোটকাকা বললেন, “না শুরু করিনি এখনো, তবে ছবির নাম ঠিক করে ফেলেছি!”
আমরা সবাই তো উত্তেজিত। কি নাম হবে ছবির?
ছোটকাকা বললেন “তুমি, আমি ও গাঁদাল পাতা।”
এ আবার কি নাম?
জিজ্ঞেস করলে ছোটকাকা আয়েস করে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “এটা হলো আমাদের মত সাধারণ মানুষের জীবনের কথা, বুঝলিনা?”
স্বপ্নময় চক্রবর্ত্তী আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় সংখ্যায় “সাদা কাক” নামে একটি কলাম লিখতেন, তাতে নানা ধরণের চরিত্রের কথা থাকতো। তাতে একটা লেখায় দুই প্রেমিক প্রেমিকার কথা ছিল, তাদের নাম চানু আর মিনু।
স্বপ্নময় লিখছেন কমবয়েসে স্কুলে থাকতেই চানু একজন প্রেমিকা যোগাড় করার ক্যালি দেখিয়েছিল। ওরা দুজন যখন নদীর ধারে গিয়ে বসতো তখন তারা কি বলছে শোনার জন্যে বন্ধুরা পিছনে গিয়ে দাঁড়াতো। ওদের কথাবার্ত্তা শুনে তারা বুঝেছিল যে প্রেম করার জন্যে “জীবন” কথাটা খুব দরকারী।
যেমন নদীর ওপারে একটা আলো জ্বলছে আর নিবছে, চানু বললো, “আলোটা কিন্তু জ্বলেই আছে, নিবছেনা আসলে। আমাদের জীবনটাই ওরম। মনে হয় নিবে গেছে, কিন্তু আসলে নেবেনি!”
কিংবা “ওই দ্যাখো মাঝে মাঝে নদীর জল সরে গেলে কেমন কাদা ভেসে আসছে। আমাদের জীবনটাই ওরম। কখনো জল আর কখনো কাদা!”
অথবা, “ইস এই আমগুলোর মধ্যে বেশ কিছু আম পচা বেরোল, আমাদের জীবনটাই ওরম। কিছু ভালো কিছু পচা।”
চানুর এই সব কথা মিনু মুগ্ধ হয়ে শুনতো, আর এই ভাবেই ওদের মধ্যে প্রেমটা বেশ জমে ওঠে।
হাই থট কথাটাও লোককে ইম্প্রেস করতে বেশ কাজে লাগে।
চারুলতা ছবির শেষ দৃশ্যে মিনু জিজ্ঞেস করেছিল “ওরা দু’জন ফ্রিজ করে গেল কেন গো?” চানু বলেছিল “ওটা হাই থট, বোঝাতে সময় লাগবে, নিরিবিলি পেলে বুঝিয়ে দেবো!”
অশনি সংকেত ছবিতে একটা দুর্ভিক্ষের দৃশ্য ছিল। গ্রামের মানুষ খেতে পাচ্ছেনা। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রজাপতির উড়ে যাওয়া দেখানো হয়েছিল। মিনু জিজ্ঞেস করেছিল,”প্রজাপতি গুলো উড়ছে কেন গো?”
চানু বলেছিল “বুঝলেনা, হাই থট, আমাদের জীবনও ওই প্রজাপতির মতই কেবল উড়তে চায়!”
গোল টেবিলে চা খেতে খেতে ছোটকাকা বললেন, “শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে নায়ক নায়িকার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে, আর দূর থেকে গাঁদাল পাতার গন্ধ ভেসে আসছে!”
আমি বললাম, “ছবিতে গাঁদাল পাতার গন্ধ বোঝাবে কি করে?”
ছোটকাকা বললেন, “অসুবিধা কি আছে? একটা সংলাপ দিয়ে দেবো নায়কের মুখে। নায়ক উদাস আর করুণ মুখ করে গন্ধ শোঁকার ভান করবে আর বলবে, আঃ গাঁদাল পাতা! উঃ গাঁদাল পাতা! ব্যাস দর্শক বুঝে যাবে।”
আমি বললাম, “তা না হয় হলো, কিন্তু এত জিনিষ থাকতে গাঁদাল পাতা কেন?”
কবি তারাপদ রায় আমার সম্পর্কে দাদা হতেন। একটু লতায় পাতায় অবশ্য, উনি হলেন বাবার পিসতুতো ভাইয়ের ছেলে।
আমার ঠাকুর্দারা দুই ভাই এবং এক বোন ছিলেন, বাবাদের সেই একমাত্র পিসীর বিয়ে হয় ময়মনসিংহে, দেশভাগের পরে তাঁরা ভারতে আসেননি। পিসেমশায় ডাক্তার ছিলেন, ময়মনসিংহে তাঁর সম্পন্ন পরিবার, কাজে সুনাম আর পসার ভাল ছিল ধরে নেওয়া যায়। সে সব ফেলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে তাঁরা পূর্ব্ব বাংলায় থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন্। তাঁদের দুই ছেলে পূর্ণ আর সুশীলও এদেশে আসেননি।
পূর্ণ জ্যাঠামশায়ের কোন সন্তান ছিলনা, ষাটের দশকে তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রীর পক্ষে একা ওদেশে থাকা সম্ভব ছিলনা, তিনি তখন ভারতে চলে আসেন। আমাদের সেই ময়মনসিংহের জ্যেঠিমাকে নিয়ে আমি এখানে আগে লিখেছি, হয়তো তোমাদের কারুর কারুর মনে থাকবে।,
ছোটভাই সুশীল ছিলেন উকিল, তিনি টাঙ্গাইল শহরে ওকালতি করতেন। তবে দেশভাগের সময় তিনি এবং তাঁর স্ত্রী নিজেরা টাঙ্গাইলে থেকে গেলেও তাঁদের দুই ছেলে তারাপদ আর বিজন কে ভারতে কলেজে পড়তে পাঠিয়ে দেন্। স্ত্রীর মৃত্যুর পরেও সুশীল একাই টাঙ্গাইল শহরে থেকে যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
যাই হোক, বাবাদের এই পিসতুতো ভাইদের পরিবারের অনেকেই ভারতে এসে থাকতে শুরু করেন। আমাদের বাঙালদের লতায় পাতায় পারিবারিক সম্পর্ক আর network এর সুবাদে এঁদের সাথে আমাদের পরিচয় ছিল। সেই সূত্রেই তারাপদদা’র সাথে আমার প্রথম আলাপ। তখন আমি স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি, বঙ্কিমচন্দ্র শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ মোটামুটি পড়ে ফেলে ক্রমশঃ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিকে ঝুঁকছি।
সেই ষাটের দশকে কল্লোল যুগ তখন অতিক্রান্ত, কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠীর সুনাম ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছে।
তারাপদ দা’ সেই কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠীর একজন প্রধান সদস্য ছিলেন, নিঃসন্দেহে সেই সময়ের একজন প্রথম সারির কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। বুদ্ধদেব বসু মারা যাবার পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, এবং শরৎ মুখোপাধ্যায়ের সাথে তিনিও একজন শববাহক হয়েছিলেন।
তাঁর এই কবিখ্যাতি আমার কৈশোরে তাঁর প্রতি আকর্ষণ জন্মাবার একটি প্রধান কারণ ছিল। তাছাড়া তিনি খুব মজলিসী আর আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন, তাঁর স্টকে অনেক মজার গল্প, আর সেই সব মজার গল্প বলার তাঁর একটা অননুকরণীয় স্টাইল ছিল, যেটা আমার খুব ভাল লাগত। হেঁড়ে গলায় সামান্য বাঙ্গাল উচ্চারণে উনি নানা গল্প করে যেতেন একের পর এক, আর এই সব গল্প বলার সময় তারাপদ দা’ প্রায় প্রতি বাক্যের মধ্যেই একবার “বুঝতে পেরেছো তুমি?” বলতেন। ওটা তাঁর একটা মুদ্রাদোষ ছিল।
পন্ডিতিয়া রোড টা ক্যালকাটা কেমিকালের পরে যেখানে বেঁকে হাজরা রোডের দিকে চলে গেছে ঠিক সেই জায়গায় একটা ছোট ভাড়া বাড়ীর একতলায় থাকতেন তারাপদ দা’, মিনতি বৌদি আর তাঁদের ছেলে তাতাই (কৃত্তিবাস)। আমি থাকতাম মনোহরপুকুর রোডে, ত্রিধারার পাশ দিয়ে শর্টকাট করে চলে যেতাম, খুব বেশী দূর নয়, হেঁটে মিনিট পনেরো লাগতো। ওনার সেই পন্ডিতিয়া রোডের বাড়ীতে প্রায়ই আমি আর সুভদ্রা গিয়ে আড্ডা মেরে আসতাম। নানা গল্প হত। আর তারাপদ দা’র সব গল্পেই বার বার ওই কথাটা ফিরে আসবেই।
ধরা যাক তারাপদ দা’ কে কেউ এক জন একটা Rubic Cube উপহার দিয়েছে। তারাপদ দা’র ছেলে তাতাই সেটা নিয়ে অনায়াসে সব লাল এক দিকে, সব নীল এক দিকে, আর সব হলদে এক দিকে করে দেয়, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেটা তারাপদ দা’ কিছুতেই পারছেন না।
এই ব্যাপার টা বলতে হলে তারাপদ দা’ বলবেন “সবাই শুয়ে পড়লে, বুঝতে পেরেছো তুমি, আমি ওটা নিয়ে অনেক রাত পর্য্যন্ত নাড়াচাড়া করি, কিন্তু কিছুতেই রং গুলো এক জায়গায় আনতে পারিনা, বুঝতে পেরেছো তুমি, অথচ তাতাই কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পেরেছো তুমি, ওই জিনিষটা তে যদি কেউ ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়, তাহলে দেখবে শুধু আমারই হাতের ছাপ, বুঝতে পেরেছো তুমি…”
তারাপদ দা’র বসার ঘর রাস্তার ওপরেই, দরজা সব সময় খোলা থাকত। ছোট ঘর, একটা টেবিল, বই পত্রে ঠাসা, কিছু চেয়ার আর একটা সোফা।
সেই সময়ে নিজের খরচে তারাপদ দা একটা লিটল ম্যাগাজিন ছাপাতেন, তার নাম ছিল “কয়েকজন”। সেই ম্যাগাজিনে ওঁর বন্ধুরা – যেমন নবনীতা দেব সেন, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, হিমানীশ গোস্বামী, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত ইত্যাদিরা লিখতেন। রাইটার্সে ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন তারাপদ দা, সেই সরকারী কাজ সেরে লেখা যোগাড় করা, প্রেসে যাওয়া, প্রুফ দেখা, কয়েকজনের জন্যে বিজ্ঞাপন আনা, বিজ্ঞাপনের টাকার তাগাদা দেওয়া সব কাজ তাঁকে একাই করতে হতো। তবু ওটা একটা নেশার মতোই ছিল ওঁর কাছে।
পন্ডিতিয়া রোডে তারাপদ দার সাথে কাটানো সেই সন্ধ্যাগুলো এখনো বেশ পরিস্কার মনে পড়ে। সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা হত, বিশেষ করে কবিতা নিয়ে। সেই আলোচনায় সমর সেন, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র দের ঘিরে নানা টক ঝাল মিষ্টি গসিপ উঠে আসত, আর সেই সাথে অবশ্যই আসত তারাপদ দার ওই “বুঝতে পেরেছো তুমি” দিয়ে punctuate করা অজস্র সরস গল্প।
সেই সব গল্প থেকে দুটো গল্প এই সাথে।
২ – Radish with molasses
বাঙ্গালী সংষ্কৃতি এবং সাহিত্য নিয়ে খুব উৎসাহী এক আমেরিকান দম্পতি কলকাতায় এসেছেন। প্রায় এক মাস কলকাতায় থেকে তাঁরা খুব কাছ থেকে বাঙ্গালীদের জীবনের নানা দিক – বাঙ্গালীর পূজো আর্চ্চা, বাঙ্গালীর রান্না, বাঙ্গালীর আড্ডা, বাঙ্গালীর রাজনীতি– এই সব খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখেছেন। দেশে ফিরে যাবার কিছুদিন আগে তাঁরা দুজনে একদিন কোন এক মন্ত্রীর সাথে দেখা করতে রাইটার্সে এসে হাজির।
তারাপদ দা’ বিখ্যাত কবি, মন্ত্রী মশাই ওনাদের তারাপদ দা’র কাছে নিয়ে এসে আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, “তারাপদ, তুমি তো কালীঘাটে থাকো, এনারা কালীঘাটের মন্দিরে গিয়ে মা কে দর্শন করতে চান, তুমি একটু ওঁদের নিয়ে গিয়ে দর্শন করিয়ে দেবে?”
সেদিন শনিবার, হাফ ছুটি। তারাপদ দা’ তখন থাকেন কালীঘাটে মহিম হালদার স্ট্রীটে, ওঁর বাড়ি থেকে মন্দির কাছেই, হাঁটাপথ। মা’র দর্শন হয়ে গেলে তিনি দুজন কে নিয়ে বাসায় গিয়ে দেখেন মিনতি বৌদি বাড়ি নেই, বাড়ি ফাঁকা। সকালে একটু বৌদির সাথে বাদানুবাদ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাই বলে বৌদি বাড়ী ছেড়ে চলে যাবেন এটা তারাপদ দা ভাবেন নি।
সর্ব্বনাশ! এখন এই দুই অতিথির খাওয়ার বন্দোবস্ত কি হবে? বিকেল প্রায় চারটে বাজে, এখন তো আর বাইরেও কোথাও যাওয়া যাবেনা। তার ওপর খিদেও পেয়েছে প্রচন্ড।
তারাপদ দা’ রান্নাঘরে গিয়ে দেখেন বৌদি কোন রান্নাই করে রেখে যান নি। শুধু এক কোণে পড়ে আছে কয়েকটা মূলো আর একটু ঝোলা গুড়।
নিরুপায় হয়ে তারাপদ দা ওই বিদেশী অতিথিদের প্লেটে করে কিছু মূলো আর গুড় দিয়ে বললেন এটা খান, এই পদটার নাম Radish with molasses, এটা হলো বাঙ্গালীদের একটা স্পেশাল খাবার। যাকে বলে ডেলিকেসী।
এর পরে অনেকদিন কেটে গেছে।
হঠাৎ একদিন নিউ ইয়র্ক থেকে এয়ার মেলে তারাপদ দা’র নামে এক চিঠি এল। সেই দম্পতি তারাপদ দা’ কে তাঁর সেদিনের আতিথেয়তার জন্যে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠির শেষে লিখেছেন, আপনি জেনে খুশী হবেন যে আমরা নিউ ইয়র্কে একটা রেস্তোরাঁ খুলেছি, আর আমাদের মেনু তে লাউ চিংড়ি, মোচার চপ, আলু পোস্ত, চালতার টক, ইত্যাদি অনেক বাঙ্গালী পদ রেখেছি।
কিন্তু সব চেয়ে বেশী লোকের কি পছন্দ জানেন? আপনার দেওয়া রেসিপি দিয়ে তৈরী Radish with molasses, যা কিনা হু হু করে বিক্রী হচ্ছে!
বুঝতে পেরেছো তুমি?
৩ – গৃহপালিত গন্ডার
সারা পৃথিবীতে কত গৃহপালিত জন্তু আছে তাই নিয়ে ইউনাইটেড নেশনের এক সমীক্ষা হবে। তার ফর্ম ছাপিয়ে পাঠানো হয়েছে পৃথিবীর নানা শহরে আর গ্রামে।
এই ধরনের সমীক্ষায় সাধারনতঃ Statistical sampling technique ব্যবহার করা হয়, সারা পৃথিবী থেকে তো আর information জোগাড় করা সম্ভব নয়, তাই কিছু selected representative জায়গা থেকে data collection করে তার পর Computer software দিয়ে data extrapolation করে সারা পৃথিবী সম্বন্ধে একটা ধারণা করে নেওয়া হয়।
তো ইউনাইটেড নেশনের সেই সমীক্ষার ফর্ম এসে পৌঁছলো বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই গ্রামে ইংরেজী জানা কোন লোক নেই, পোস্টমাস্টার মশাই ক্লাস ফাইভ পর্য্যন্ত পড়েছেন, একমাত্র তিনি কিছুটা ইংরেজী জানেন, এবং তাই নিয়ে তাঁর আবার একটু গোপন অহংকার ও আছে।
এদিকে গ্রামের পাঠশালার মাস্টার মশায়ের এক ভাইপো ঢাকায় স্কুলে পড়ে, তার বয়েস বছর দশ এগারো হবে, সে ছুটিতে কাকার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। সে ভালই ইংরেজি জানে, তাছাড়া সে বেশ উৎসাহী আর কাজের ছেলে, তাই তার উপরেই ভার পড়ল সারা গ্রামে কত গৃহপালিত জন্তু আছে তার একটা হিসেব করে ফর্ম ফিল আপ করার।
ছেলেটি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ক’দিনের মধ্যেই একটা লিস্ট তৈরী করে ফেললো। তার পর ইংরেজী তে ফর্ম ফিল আপ করার পালা।
ছেলেটি গোটা গোটা ইংরেজী হরফে ফর্মে লিখলোঃ
Cow 20, Goat 45, Pig 28, Sheep 32, Rooster 50, Hen 55, Gander 12, Geese 15, Cat 62, Dog 45 ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেই ফর্ম শেষ পর্য্যন্ত পৌঁছলো পোস্টমাস্টারের কাছে। তিনি সেই ফর্ম খামে ভরে পাঠিয়ে দেবেন সঠিক জায়গায়।
পোস্টমাস্টার মশায় ফর্ম টা দেখে কৌতূহলী হয়ে ভাবলেন দেখি তো ছোঁড়া কিরকম ইংরেজী লিখেছে। পড়তে পড়তে হঠাৎ গ্যান্ডার এ এসে তাঁর চোখ আটকে গেল।
গ্যান্ডার?
“ছোঁড়া গন্ডারের ইংরেজী লিখেছে গ্যান্ডার! ছি ছি! কিস্যু ইংরেজি শেখেনি বোঝাই যাচ্ছে” মনে মনে এই কথা বলে তিনি ফর্মে গ্যান্ডার -১২ কেটে লাল কালি দিয়ে লিখে দিলেন রাইনোসেরাস – ১২।
নানা দেশ ঘুরে সেই ফর্ম শেষ পর্য্যন্ত পৌঁছলো ইউনাইটেড নেশনের হেড কোয়ার্টারে। সেখানে কারুর চোখে কোন অসঙ্গতি ধরা পড়লোনা, Computer software দিয়ে সেই data extrapolate করে বড় একটা রিপোর্ট তৈরী হলো, সেখানে দেখা গেল সারা পৃথিবীতে গৃহপালিত গন্ডারের সংখ্যা হল দুই লক্ষ ছাব্বিশ হাজার!
এক এক জনের নামের সাথে তাদের সাথে সম্পর্কিত কোন জায়গার নাম যোগ হয়ে যায়, তোমরা কেউ খেয়াল করেছো?
আমাদের ছিলেন পাটনার দাদু, দিল্লীর জ্যেঠু, উত্তরপাড়ার দিদা।
আর ছিলেন ময়মনসিংহের জ্যেঠিমা।
আমাদের ভৌমিক পরিবারের আদি বসবাস ছিল ওপার বাংলায় টাঙ্গাইলের ভাদরা গ্রামে। সেই সময়ে সেই জায়গাটা পড়তো ময়মনসিংহ জেলায় – এখন অবশ্য টাঙ্গাইল জেলা হয়েছে।
যাই হোক দেশভাগের পরে পরিবারের সবাই ভারতে চলে এলেও বাবাদের এক পিসী (আমাদের দাদুদের এক মাত্র বোন) এবং তাঁর স্বামী ওদিকেই থেকে যান্। বাবাদের পিসেমশায় ময়মনসিংহ শহরে ডাক্তারী করতেন, তাঁর পসার ভাল ছিল। ভিটে মাটির টানে তিনি দেশ ছাড়তে রাজী হন্নি।
দেশে ফিরে আসা পরিবারের বাকি সদস্যদের সাথে বাবাদের এই পিসী ও তাঁর দুই ছেলের যোগাযোগ স্তিমিত হয়ে আসে। তবে দেশভাগের আগে পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানে দুই পক্ষেরই আসা যাওয়া ছিল। আমার মা আর বাবার বিয়েতে (১৯৩৯ সালে) পিসীমা তাঁর ছেলেদের এবং বৌমা দের নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন।
তবে দেশভাগের পরে তাঁদের সাথে আমাদের যোগাযোগ ক্রমশঃ স্তিমিত হয়ে আসে।
পিসীমার বড় ছেলে পূর্ণ (রায়) তাঁর বাবার মত ময়মনসিংহ শহরে ডাক্তারী করতেন। আমাদের ময়মনসিংহের জ্যেঠিমা ছিলেন তাঁর স্ত্রী। চট্টগ্রামের বনেদী পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল।
বাবার এই পিসতুতো দাদা পূর্ণর সাথে খুব অল্পবয়েসে তাঁর বিয়ে হয়। ওঁদের কোন ছেলেপুলে হয়নি। স্বাধীনতার পরে তাঁরাও ভারতে আসেন নি। পূর্ণ জ্যাঠামশায় ডাক্তার ছিলেন, সম্পত্তি আর জমিজমা ছিল, অতএব ময়মনসিংহে তাঁর প্রতিপত্তি ও পসার দুইই ভাল ছিল ধরে নেওয়া যায়।
১৯৬০ সালে স্বামী পূর্ণ মারা যাবার পর জ্যেঠিমা ওখানে আর একা থাকতে পারেন নি, ততদিনে তাঁর সব আত্মীয় স্বজন ভারতে চলে এসেছে। স্বজনহীন, সহায়হীন একা বিধবা আশ্রয়ের সন্ধানে তখন কলকাতা চলে আসেন। কিন্তু সেখানে কোন আত্মীয় দের কাছে তাঁর আশ্রয় মেলেনি। মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীও তখন ভর্ত্তি।
টালীগঞ্জের চন্ডীতলায় একটা ছোট এক কামরার বাসা ভাড়া করে তিনি এবং তাঁর বিধবা দিদি দুই বোন থাকতেন।
তখন থেকেই ময়মনসিংহের জ্যেঠিমা থেকে তিনি হয়ে যান্ আমাদের টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা।
সেই ১৯৬০ সালে তাঁর বয়স পঞ্চাশের নীচেই ছিল, নিজেই হাঁটাচলা বাজার ইত্যাদি করতেন। প্রায়ই বাসে চেপে আমাদের মনোহরপুকুর রোডের বাড়িতে তিনি চলে আসতেন। বোধহয় আমাদের যৌথ পরিবারের কোলাহল আর ব্যস্ততার মধ্যে তিনি তাঁর ফেলে আসা জীবনের হারিয়ে যাওয়া উষ্ণতা কিছুটা খুঁজে পেতেন। তাঁর হাসিখুশী ব্যবহারের জন্যে তিনি আমাদের সকলের খুব প্রিয় ছিলেন। আমার তখন অল্প বয়েস, তবু তাঁর নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের কষ্ট বুঝতে আমার অসুবিধে হত না।
টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা যে কমবয়েসে খুব সুন্দরী ছিলেন তাঁকে দেখেই তা বোঝা যেতো। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, টুলটুলে মুখে অজস্র বলিরেখা, মাথায় কিছু রূপোলী চুলের ঝিলিক, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা, আর মুখ ভর্ত্তি পানে ঠোঁট লাল, সব মিলিয়ে তাঁর সেই চেহারাটা এখনো পরিস্কার চোখে ভাসে। মুখ টিপে অল্প হেসে অনেক মজার মজার কথা বলতেন জ্যেঠিমা, তাঁর ব্যক্তিত্বে বনেদীয়ানার একটা সুস্পষ্ট ছাপ ছিল। তাঁকে দেখে তাঁর জীবনের নানা বিপন্নতা আর বিষাদ একেবারেই বোঝা যেতোনা।
আমাদের বাড়ি থেকে ফেরার সময় নিয়ম করে তাঁকে আমি বসুশ্রী সিনেমার সামনে বাসে তুলে দিয়ে আসতাম। চার নম্বর বাস যেত টালিগঞ্জের চন্ডীতলায়। বাসে খুব ভীড় থাকলেও ওনাকে দেখে কন্ডাক্টররা ভালবেসে “আসুন দিদিমা” বলে হাত ধরে টেনে তুলে নিত। আর চন্ডীতলায় ওনার ঘরে মাঝে মাঝে গেলে কি খুশী যে হতেন দুই বোন। পাথরের থালায় বাড়িতে বানানো নারকেলের নাড়ু, অথবা রাঘবসাই খেতে দিতেন, সাথে কাঁসার গেলাসে কুঁজোর ঠান্ডা জল।
২) বালিকা বধূ
ইন্দিরা তে ম্যাটিনি শো তে বালিকা বধূ দেখাচ্ছে । সুভদ্রা আর জ্যেঠিমা সেজেগুজে বেরোচ্ছে সিনেমা দেখতে। টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা তখন মনোহরপুকুরে কিছুদিনের জন্যে এসে আছেন, তিনি ঠিক লক্ষ্য করেছেন । এই দুজন কোথায় যায় এই দুপুরবেলায় এত সেজেগুজে?
“তোরা কোথা যাওস?”
দুজনে সিনেমা যাচ্ছে শুনে তিনি “আমারেও নিয়া চল্” বলে ধরে বসলেন, তাঁকে না বলা কঠিন। সুতরাং তিনিও ওদের সাথে চললেন ।
সিনেমা শুরু হলো।
বিয়ের দৃশ্যের পর ফুলশয্যা । বালিকা বধূ তার বরকে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলছে, “দ্যাখো দ্যাখো, কি সুন্দর চমচমে জ্যোৎস্না!”
এমন সময় হঠাৎ পাশ থেকে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ শব্দ ।
কি ব্যাপার? কে কাঁদে?
সুভদ্রা দ্যাখে পাশে টালিগঞ্জের জ্যেঠিমা ঘন ঘন শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছছেন । ক্রমশঃ তাঁর কান্না আর বাঁধ মানলোনা । হু হু করে চোখ দিয়ে জল আর হাপুস নয়নে কান্না ।
পাশ থেকে অনেকে বিরক্ত হয়ে নানা রকম মন্তব্য করতে লাগলো।
সুভদ্রা আর জ্যেঠিমা ভীষণ অপ্রস্তুত।
“আমার ও ঠিক এই বয়সে বিয়া হয়েসিল রে, সেই কথা বড় মনে পড়ত্যাসে!”
এই গল্পটা পরে সুভদ্রা আর জ্যেঠিমার মুখে অনেকবার শুনেছি। আর প্রত্যেক বারই এই নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়েছে।
কিন্তু এখন মাঝে মাঝে ভাবি গল্পটা কি আসলে হাসির না দুঃখের?
আমাদের ছোটবেলায় সেই পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে যখন মনোহরপুকুরের বাড়ীতে আমাদের মধ্যবিত্ত যৌথপরিবারে আমরা ভাইবোনেরা বড় হচ্ছি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা সংঘাত ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে দেশ তখন সবে স্বাধীন হয়েছে – সেই সময়ের কথা ভাবলে দেশের মানুষের জীবনে শান্তির একটা বাতাবরণ নেমে আসার কথা মনে পড়ে। সেই শান্তির আবহ আমাদের পারিবারিক জীবনেও তার ছায়া ফেলেছিল।
মধ্যবিত্ত পরিবার বড় হলেও আমাদের ভাইবোনদের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করার জন্যে আমাদের সুশিক্ষা আর সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারে মা বাবাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলনা। আর বাড়ীর বৌরা – আমাদের মা জ্যেঠীমা কাকীমারা – সর্ব্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন আমাদের পরিবারের এবং বিশেষ করে আমাদের ছোটদের কল্যাণ কামনায়।
সেই কল্যাণ কামনা থেকেই আমাদের জন্যে তাঁদের নানা ব্রত, নানা উপোস, নানা পূজো। নীল ষষ্ঠী, শিবরাত্রি, অক্ষয় তৃতীয়া…
মনোহরপকুরের বাড়ীতে সরস্বতী পূজো আর লক্ষ্মী পূজো দু’টোই হতো বেশ ধূমধাম করে। মা জ্যেঠিমা কাকীমারা সবাই খুব ভক্তি আর নিষ্ঠার সাথে পূজোর আয়োজন করতেন, আমাদের বাড়ীর সামনে টিনের চালের একতলা বাসায় থাকতেন হারু আর কানাই, দুই ভাই। ওঁদের মধ্যে একজন এসে পূজো করতেন।
যেহেতু সরস্বতী হলেন বিদ্যার দেবী, তাই তাঁর পূজো আমাদের ছোটদের – যারা স্কুলে পড়ি এবং যাদের মা সরস্বতীর আশীর্ব্বাদ একান্ত প্রয়োজন – তাদেরও পূজো ছিল , পূজোয় খুব মজা করতাম আমরা ভাইবোনেরা।
আমাদের স্কুলের পাঠ্য বই আর কলম দেবীর সামনে রাখা হতো, “জয় জয় দেবী চরাচর সারে” বলে হাত জোড় করে আমরা সবাই অঞ্জলি দিতাম, বেলপাতায় খাগের কলম দিয়ে “ওঁ সরস্বতৈ নমো নিত্যং” লিখতাম।
সরস্বতী পূজোর আগে কুল খাওয়া মানা ছিল, খেলে দেবী পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবেন এরকম একটা ধারণা আমাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা অনেকেই অবশ্য সেটা মানতাম না, মা সরস্বতী তাঁকে আগে না খাইয়ে নিজেরা কুল খেয়ে নিয়েছে বলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের শাস্তি দিয়ে ফেল করিয়ে দেবেন, এত নিষ্ঠুর তিনি নন্।
গুরুজনদের না জানিয়ে মাঝে মাঝে পূজোর আগেই কুল খেয়েছি এ কথা এতদিন পরে এখন স্বীকার করতে বাধা নেই। মা’রা বাড়ীতে নানা মিষ্টি – তিলের নাড়ু নারকোলের নাড়ু, গজা মালপোয়া ইত্যাদি তৈরী করতেন, কিন্তু যে মিষ্টির কথা সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে তা হলো কদমা। আদ্যোপান্ত চিনি দিয়ে তৈরী ওই গোল মিষ্টিটা আর কোন পূজোতে খেয়েছি বলে মনে পড়েনা।
কদমা হলো সরস্বতী পূজোর মিষ্টি।
আর যেটা মনে পড়ে তা হলো আমরা ভাইবোনেরা নানা রং এর কাগজ কেটে গদের আঠা দিয়ে অনেক লম্বা লম্বা শিকল বানিয়ে সেগুলো বারান্দার দেয়ালে আটকে দিতাম। সারা বারান্দা ঝলমলে সুন্দর হয়ে সেজে উঠতো, বেশ একটা উৎসবের মেজাজ নেমে আসতো আমাদের সকলের মনে।
এতগুলো বছর কেটে গেছে, তবু এখনো প্রতি বছর সরস্বতী পূজো এলেই সেই শিকল বানানোর কাজে আমাদের ভাইবোনদের উৎসাহ আর উত্তেজনার কথা মনে পড়ে।
আর মনে পড়ে ঠাকুর কিনতে যাবার কথা।
একবার ১৯৬০ সালে, আমার তখন ক্লাস নাইন, সরস্বতী পূজোর দুই দিন আগে মেসোমশায় (রঞ্জুর বাবা, ভগবতী মাসীর -স্বামী) রাত প্রায় দশটা নাগাদ সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন। উনি অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন, তাই তাঁর মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিলনা। কিন্তু অত রাতে মারা যাওয়াতে একটু logistical অসুবিধে হয়েছিল।
মাসী ছিলেন মা’র ঠিক ওপরের বোন, ভগবতী নাম থেকে তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল ভাগু। সবার কাছে তিনি ছিলেন ভাগুদি। আর ওই দুই বোন ছিলেন ভীষন কাছের মানুষ, বিয়ের পর থেকেই দু’জনে কলকাতায় থাকার জন্যে অন্য দুই ছোট বোনদের তুলনায় তাঁদের দু’জনের মধ্যে একটা একটা অদ্ভুত bonding তৈরী হয়েছিল। আর আমি আর রঞ্জু দু’জনে ছিলাম দুই বোনের এক মাত্র সন্তান। ছোটবেলায় মা আমায় নিয়ে মাঝে মাঝেই রবিবার বা কোন ছুটির দিন সকালে মাসীর বাড়ী (এন্টালী ক্রিস্টোফার রোডে সি আই টি বিলডিংএ সরকারী আবাসন) চলে যেতেন। ৩৩ নম্বর বাসে মাসীর বাড়ী যাওয়া হতো। হাজরা মোড়ে উঠতাম। আর পার্ক সার্কাস ছাড়িয়ে পদ্মপুকুর স্টপে নেমে কিছুটা হাঁটতে হতো।
মাসীর বাড়ীতেই লাঞ্চ খেতাম। আর সারা দিন আমি আর রঞ্জু এক সাথে । কখনো পাড়ায় ক্রিকেট, কখনো বাড়ীতে ক্যারম, কখনো রেডিও তে অনুরোধের আসর। আবার মাসী আর মা’র নানা কাজেও আমাদের দুই মাণিকজোড় ছুটোছুটি করতাম। ট্যাক্সি ডেকে দেওয়া, চিঠি পোস্ট করা, ট্রেণের টিকিট কাটা, বাজার করে নিয়ে আসা, এই সব নানা কাজ দু’জনে মিলে করতে বেশ লাগতো।
রঞ্জু আর আমি দুই ভাই ক্রমশঃ অভিন্নহৃদয় বন্ধু হয়ে যাই।
মেসোমশায় খুব চুপচাপ মানুষ ছিলেন, নিজের ঘর থেকে বেরোতেন না, শেষের দিকে অসুখে প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিলেন।
বাবার মৃত্যুর সময় রঞ্জু তখন নরেন্দ্রপুরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে, তার বয়স মাত্র তেরো বছর। মাসী অত রাতে মেসোমশায়ের সেক্রেটারী রামুয়াকে পাঠালেন মেসোমশায়ের গাড়ী নিয়ে রঞ্জুকে আনতে। মাসী রামুয়াকে বলে দিয়েছিলেন রঞ্জুকে তুলে ফেরার পথে আমাদের বাড়ী থেকে মা’কে তুলে নিতে। মাসীর আর আমাদের দুজনের বাড়ীতেই ফোন ছিলনা, তাই আগে খবর দেওয়া সম্ভব ছিলনা।
রামুয়া যখন আমাদের বাড়ীর দরজায় কড়া নাড়লো, তখন রাত প্রায় দু’টো।
কড়ার শব্দ শুনে বাড়ীর বড়রা সবাই ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছেন, আমারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মা খবর পেয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
গাড়ীতে তখন ছোট্ট রঞ্জু ঘুমিয়ে পড়েছে।
পরের দিন আমার স্কুলে সাইন্সের পরীক্ষা ছিল মনে আছে। Weekly test..আর তার পরের দিন বাড়ীতে সরস্বতী পূজো।
স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পরে ভালকাকা আমায় আর বাবলুকে নিয়ে গোপালনগরে সরস্বতী ঠাকুর কিনতে গিয়েছিলেন। বেশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, আলো জ্বলে উঠেছিল চারিদিকে, বিশাল একটা প্রাঙ্গনে অনেক ঠাকুর সাজানো, কেনা বেচা চলছে, বেশ ভীড়, তার মধ্যেই ভালকাকার সাথে আমাদের কোন এক দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। মনে হলো মেসোমশায়কে তিনি চিনতেন।
ভালকাকা তাঁকে বলেছিলেন, “খবর টা শুনেছেন নাকি? ননীবাবু কাল রাত্রে মারা গেছেন। স্ট্রোক হয়েছিল। ”
তারপরে দু’জনের মধ্যে মেসোমশায় কে নিয়ে কিছু শোকপ্রকাশ এবং কিছু আলোচনা হয়েছিল। মৃত্যু যে আমাদের জীবনে একটি সামাজিক ঘটনা, লোকের মুখে মুখে যে এই ভাবে মানুষের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, সেদিন সরস্বতী ঠাকুর কিনতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা জানতে পারি।
পারিবারিক গন্ডীর মধ্যে ১৯৬০ সালে সেই ছিল আমার জীবনে পরিবারে্র এত কাছের একজন মানুষের মৃত্যুর প্রথম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। মনে আছে সরস্বতী পুজোর আনন্দ সেবছর অনেকটাই মুছে দিয়েছিল সেই মৃত্যু সংবাদ।
এখন এতদিন পরে জীবন সায়াহ্নে পোঁছে আমার কাছের কত লোক এক এক করে চলে গেলেন। মৃত্যু এখন আর আমার কাছে অপরিচিত নয়।
আমাদের আগের প্রজন্মের কেউই আর এখন আমাদের কাছে নেই। মৃত্যু এসে হানা দিয়েছে আমাদের প্রজন্মেও। শঙ্কর আর তাপার পরে সম্প্রতি মিঠুও চলে গেল আমাদের ছেড়ে।
এখন সরস্বতী পূজো এলেই আমাদের ছোটবেলার মনোহরপুকুরে সেই গমগমে সরস্বতী পুজোর পরিবেশের কথা মনে পড়লে মনটা এখন বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
সত্তরের দশকে IBM Sales এর কাজে আমায় নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো।
কলকাতার কাছাকাছি কোথাও যেতে হলে নিজের গাড়ী নিয়েই যেতাম, কিন্তু কলকাতার বাইরে কোথাও গেলে লোকাল ট্রেণ ধরে যেতেই আমার ভাল লাগতো।
সেই সব লোকাল ট্রেণে ভীড় আর চাপাচাপির মধ্যে কোনমতে জায়গা করে মাথার ওপরে হাতল ধরে ট্রেণের চাকার ঝাঁকানীর শব্দ শুনে, আর দুলুনী তে দুলতে দুলতে চারিপাশের মানুষজন কে দেখে বেশ সময় কেটে যেত মনে পড়ে।
ডেলি প্যাসেঞ্জারদের এক একটা গ্রুপ থাকতো। রোজ দেখা হবার ফলে তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী হয়েছে, তাদের আড্ডা, হাসিঠাট্টা আর রসিকতা আমরা বাকি যাত্রীরাও বেশ উপভোগ করি। আবার কিছু যাত্রীর হলো তাসের নেশা, একটা চাদর পেতে তারা টোয়েন্টি নাইন (ষোল আছি সতেরো আছি) কিংবা ব্রীজ (ওয়ান স্পেড টু হার্ট )শুরু করে দেয়। এই চলন্ত ট্রেণে বসে তাস খেলায় তাদের মনোযোগ আর মগ্নতা দেখলে মনে হবে তারা বিশ্বসংসার ভুলতে বসেছে।
আর থাকতো ফেরীওয়ালারা। অল্পবয়েসী কিশোর থেকে যুবক, মধ্যবয়েসী, এবং অনেক প্রৌঢ় মানুষ নানা ধরণের জিনিষ বিক্রী করার জন্যে এক কম্পার্টমেন্ট থেকে আর এক কম্পার্টমেন্টে ঘুরে বেড়াতেন। কেউ কলম, কেউ লেবু লজেন্স, কেউ ঝালমুড়ি। বিক্রী তেমন কিছু হতো বলে মনে হয়না, তবু তারা প্রাণপণ চেষ্টা করে যেতেন। সকাল থেকে রাত পর্য্যন্ত এক ট্রেন থেকে আর এক ট্রেন, জীবিকা উপার্জ্জনের বাধ্যবাধকতার তাগিদে তাদের সেই ক্লান্তি হীন, বিরামহীন ছুটে চলা দেখে মনের মধ্যে একটা বিষাদ অনুভব করতাম।
আর থাকতো গানওয়ালারা।
নানা ধরণের গান – ভক্তিগীতি, বাংলা আধুনিক, হিন্দী ফিল্মের গান – গেয়ে যাত্রীদের মনোরঞ্জন করে তারা তাদের পয়সার কৌটো ঝনঝন শব্দে এগিয়ে দিতো। কিন্তু প্রায় সব যাত্রীই মুখ ঘুরিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতো, গান শুনে ভিক্ষা দেবার মত পকেটে রেস্ত তাদের কারুরই নেই। মানসিকতাও নেই হয়তো।
ষাটের দশকের শেষে তখন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় দেশে ধারাবাহিক “পারাপার” লিখছেন, সেই উপন্যাসে মাঝে মাঝেই ভীড়ের ট্রেণের কথা উঠে আসে। গাদাগাদি ভীড়ের মধ্যে কোনমতে গাড়ীর পাদানিতে পা আর সারা শরীর বাইরে রেখে ঝুলে থাকা একটি মানুষ জানেওনা তার দিকে উলটো দিক থেকে ঘন্টায় ষাট মাইল বেগে ছুটে আসছে প্রাণঘাতী টেলিগ্রাফের পোস্ট।
শীর্ষেন্দু লিখেছিলেন – “অন্ধকারে ছুটে যায় জন্মান্ধ মানুষ। ”
সেইরকম একটি জন্মান্ধ কিশোরকে দেখেছিলাম একদিন ট্রেণে। নিষ্পাপ সুকুমার মুখ, দুটো চোখ বোঁজা, বোঝাই যায় যে তার পৃথিবী অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু তার রিনরিনে মিষ্টি গলায় বেশ সুর আছে, দুই হাতে দুটো ইঁটের চাকতি কে খঞ্জনির মতো টকাটক করে বাজিয়ে তাল রেখে সে সেই সময়ের শ্যমল মিত্রের একটি জনপ্রিয় গান গেয়েছিল।
কে জানে, কে জানে ?/
কবে আবার দেখবো পৃথিবীটাকে/
এই ফুল, এই আলো আর হাসিটিকে/
তার কাছের লোকেরা তাকে দিয়ে এই অল্প বয়েসে ট্রেণে ট্রেণে ঘুরে গান গেয়ে উপার্জ্জন করতে পাঠিয়েছে ভেবে সেদিনা আমার মন বেশ খারাপ হয়েছিল, তার ছোট হাত দুটো ধরে আমি কিছু টাকা গুঁজে দিয়েছিলাম।
সেই ফুটফুটে কিশোরটিকে এখনো ভুলতে পারিনি।
আর একটি বিকেলের কথা মনে পড়ে।
বৈদ্যবাটীতে একটা জুট মিলে কাজ সেরে বিকেলের ট্রেন ধরে কলকাতা ফিরছি।
অফিস ফেরত লোকেদের ভীড়ে ঠাসা কামরা, কোনমতে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। শেওড়াফুলি স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতেই দেখলাম আমাদের কামরার সামনে প্ল্যাটফর্মে একটা জটলা, আর কার একজনের গলায় গান ভেসে আসছে।
মান্না দের “সেই তো আবার কাছে এলে”~
আহা, বেশ সুন্দর গাইছে তো ছেলেটা? মিষ্টি গলা, গায়কীটাও পরিণত।
কৌতূহল হলো, বাইরে তাকিয়ে জটলার মধ্যে দেখি একটি যুবক দাঁড়িয়ে, দেখে একটু অপ্রকৃতিস্থ মনে হয়, পরনে সার্ট আর পাজামা, মুখে অনেকদিনের না কামানো দাড়ি, চুল উস্কোখুস্কো, আত্মমগ্ন হয়ে আপন মনে গান গেয়ে যাচ্ছে। আর তার চারিপাশে শ্রোতার দল মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে চুপ করে তার গান শুনছে।
ছেলেটি কি পাগল? অথবা ব্যর্থ প্রেমিক? সন্ধ্যাবেলা শেওড়াফুলি স্টেশনের ব্যস্ত ভীড় আর কোলাহল কে সে তার আশ্চর্য্য গানের যাদু দিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছে। সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য।
সে পরের গান ধরলো। “আমি নিরালায় বসে বেঁধেছি~”
আবার মান্না দে?
ট্রেন থেকে নেমে পড়ে ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেলাম। একের পর এক মান্না দে’র গান গেয়ে গেল ছেলেটি, যেন সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে, পরিপার্শ্বের কোন খেয়াল নেই। আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার গান শুনে গেলাম।
তারপর দুটো ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিলাম সেদিন।
পরে ওই লাইনে ছেলেটিকে আর দেখিনি কোনদিন। কিন্তু তার পর থেকে মান্না দে’র কোন গান শুনলেই শেওড়াফুলি স্টেশনের সেই বিকেল আর সেই ছেলেটার কথা আমার মনে পড়ে যায়।
উর্ম্মি আর উদয়ন অনেক বছর পরে কলকাতায় এসেছে। পাটুলীতে ঝুনকুর ঝকঝকে নতুন বাড়ীতে আমরা ভাইবোনেরা সবাই একটা সন্ধ্যা ওদের সাথে কাটালাম।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এক সূত্রে বাঁধা আছে সহস্র জীবন। আমরা ভাইবোনেরা যে সুতোয় বাঁধা আছি তা হলো আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ীতে একসাথে কাটানো বাল্য আর কৈশোরের প্রায় পনেরো কুড়ি বছরের দিনগুলোর স্মৃতি।
এই বাঁধন এতগুলো বছরেও আলগা হয়নি।
উর্ম্মিরা বলেছিল বিকেল পাঁচটার মধ্যে চলে আসতে, তো আমরা চলে এলাম। সুভদ্রা আর আমি। মিঠু, খোক্ন, টুপসি, ওর ছেলে, আর বুবান। ভান্টুলি আর শ্রেয়া। কৌশিকী, ঝুন্টু, আর ঋদ্ধি। তা ছাড়া উর্ম্মি, উদয়ন আর ঝুনকু। সব মিলিয়ে টুপসির বাচ্চাটাকে নিয়ে আমরা পনেরো জন।
তারপর শুধু হাসি আর আড্ডা, যাকে বলে নরক গুলজার।
মনোহরপুকুরের দিন গুলো নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ হলো। সেই সবাই মিলে ছাতের বারান্দায় মাদুরে বসে কাঁসার থালায় খাওয়ার কথা কি ভোলা যায়? সেই অন্নপূর্ণা বাবু, মাখনবাবু, সুন্দর স্টূডিওর পাঞ্জাবী ভদ্রলোক যার নাম খোকন দিয়েছে সুন্দরবাবু, পাশের পাঁচুবাবুর বাড়ীর তলায় মুচি, বসন্ত নাপিত। কত সব চেনা মানুষ। তাদের নিয়ে কত কথা। কত গল্প। শেষ আর হয়না।
হরিকুমার বাবু থাকতেন মঞ্জুশ্রীর গলির পরে মোহন বিশুদের বাড়ীর তলায়। উর্ম্মি বললো মোহনের বৌর ওপরে মাঝে মাঝে কোন দেবী এসে ভর করতেন, আর ভর হলেই নাকি সেই বৌ ঠাস ঠাস করে তার শ্বাশুড়ীকে গালে চড় মারতো। এমন কি মোহনকেও সে এমন চড় মেরেছে যে সে নাকি বৌয়ের ভর হলেই নীচে রকে গিয়ে বসে থাকতো। বাপ্পা বলেছে ভরটর সব বাজে, আসলে শ্বাশুড়ী আর বরের ওপর রাগ মেটানোর ওটা একটা উপলক্ষ্য।
আমরা একবার সবাই মিলে ট্রেণে ডায়মন্ড হারবার গিয়েছিলাম, উদয়নও ছিল আমাদের সাথে, মনে আছে? বৃষ্টিভেজা দিন ছিল, উদয়ন উদাত্ত গলায় অনেক কবিতা আবৃত্তি করেছিল নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে। মনে আছে? আর একবার আমরা উর্ম্মির দুই যমজ মেয়েকে দেখে ফেরার সময় দেশপ্রিয় পার্কের সামনে ফুটপাথে একটা গ্রুপ ফটো তুলেছিলাম, মনে আছে? দিদিভাই ও ছিল সেবার আমাদের সাথে।
সবার সব পরিস্কার মনে আছে।
ট্রেণের কথা উঠতে খোকন বলল মাঝে মাঝে আমি কাজ থেকে বাড়ী ফেরার সময় শিয়লাদা থেকে ট্রেণ ধরে গড়িয়া আসতাম। সে কি ভীড়। কে যে কাকে ধরে ঝুলছে বোঝার উপায় নেই। এক ভদ্রলোক হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন আরে আরে আমার ধুতি! কিন্তু কিছু বোঝার আগেই তাঁর ধুতি অন্য কারুর হাতে চলে গেছে।
খোকনের এই সব মজার মজার কথা শুনে সব চেয়ে বেশী হাসছে উর্ম্মি আর ঝুনকু।
“হি হি হা হা, আমার ধুতি… হো হো হা হা”!
ঝুন্টুর কৌতূহল একটু বেশী । সে বললো, “তলায় কিছু ছিল তো?”
ভান্টুলি বললো “না থাকলেও কিছু দেখা যেতোনা। ওপরে পাঞ্জাবী ছিল নিশ্চয়, তাতে সব ঢাকা পড়ে যাবে…”
ঝুনকু বললো, “যাঃ, কি সব অসভ্যতা হচ্ছে…”
ভান্টুলির স্টকেও ট্রেণের গল্প। এটা ফুলকাকাকে নিয়ে।
একবার ফুলকাকা ট্রেণে করে কোথাও যাচ্ছেন, রাত হয়েছে। কামরায় তিন জন তাস খেলছে, তারা ফুলকাকাকে বললো “তিন পাত্তি খেলবেন?” ফুলকাকা তাস খেলেন না তিনি তাঁর ব্যাগ মাথার নীচে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখেন সেই খেলোয়াড়রা কেউ নেই, তাঁর ব্যাগটাও উধাও।
খোকন বললো, “ভাগ্যিস মাথাটাও নিয়ে যায়নি…”
ঝুনকু আর উর্ম্মি যথারীতি হেসে লুটিয়ে পড়লো।
“হি হি হা হা, মাথাটাও নিয়ে যায়নি হো হো হা হা”!
আমি বললাম কি হচ্ছে কি? কারুর ধুতি, কারুর ব্যাগ হারিয়ে যাচ্ছে, এ তো দুঃখের গল্প! এত হাসছিস কেন তোরা?
জ্যেঠিমার বোন শেফালী মাসীর বর মেসোমশায়ের ডাকনাম ছিল খোকা। মাঝে মাঝে শেফালী মাসীর কোন কাজে – কিছু দিতে বা নিতে – উনি কাজ থেকে পুলিশের ড্রেস পরে মনোহরপুকুরে আসতেন, আর এলেই জ্যেঠিমা “ওরে খোকা বাবু এসেছে” বলে একটা হাঁক পাড়তেন।
মেসোমশায় ছিলেন কলকাতার কোন এক থানার ওসি। লম্বা চওড়া চেহারা, পরণে পুলিশের ইউনিফর্ম, তার ওপরে গমগমে গলা। রসিক লোক ছিলেন, নিজের রসিকতাতে নিজেই যখন হাসতেন তখন আমাদের বাড়ীর কড়িবরগা সব কেঁপে উঠতো।
এদিকে আমাদের বাড়ীর সামনে এক মুদীর দোকান ছিল, সেখানে আমরা চাল ডাল তেল ইত্যাদি কিনতে যেতাম। যে লোকটা সেই দোকান চালাতো তাকে সবাই খোকা নামে চিনতো। মুদীর দোকানের নাম হয়ে গিয়েছিল খোকার দোকান। মা কাকীমারা মাঝে মাঝে আমাদের বলতো, “খোকার দোকান থেকে আড়াইশো গ্রাম মুড়ি নিয়ে আয় তো~ ”
ঝুন্টূ বললো “একদিন মেজমা শুনি পিছনের গলিতে কে পেচ্ছাপ করছিল তাকে ধমক দিয়ে বলছে খোকাকে বলবো একদিন পুলিশের ড্রেস পরে এসে তোমায় ধরতে। মজাটা বুঝবে সেদিন। আমি ভাবলাম My God, মুদীর দোকানের ওই মোটাসোটা ভুঁড়িওয়ালা ছেঁড়া গেঞ্জী পরা লোকটার এত ক্ষমতা?”
আসলে দুজনের নামই খোকা, তাই ঝুন্টুর গুলিয়ে গেছে। খোকন গম্ভীর ভাবে বলল “A case of mistaken identity”..
ঝুন্টু বললো “তার পর থেকে আমি খোকার দোকানে গেলে লোকটাকে খুব সন্মান করে কথা বলতাম…”
তাই শুনে ঝুনকু আর উর্ম্মি আবার হেসে গড়াগড়ি।
“হি হি হা হা, সন্মান করে কথা বলতাম, হো হো হা হা”!
আমাদের বাড়ীর পাশে ডক্টর মৃণাল দত্তের চেম্বার, সেখানে এক কম্পাউন্ডার ভদ্রলোক ইঞ্জেকশন দিতে আসতেন, তার নাম ভালোকাকীমা দিয়েছিলেন ফুটুবাবু। উর্ম্মি বলল একবার নাকি রাস্তায় ভালোকাকার সাথে আচমকা ফুটূবাবুর দেখা হয়। এখন ভালকাকা ছিলেন পাড়ার একজন সন্মানীয় লোক, সবাই দেখা হলেই খুব খাতির করে তাঁকে শ্যামলদা’ বলে ডাকে, তিনি নাকি ফুটুবাবুকে দেখে কিছুটা patronizing ভঙ্গীতে হাসি মুখে যেন অনেক দিনে চেনা এই ভাবে “ভাল আছো ফুটু?” বলেছিলেন।
খোকন বললো “ওনার নাম যে ফুটু উনি কি সেটা জানতেন নাকি?”
আমি বললাম “মনে হচ্ছে উনি ভেবেছিলেন কে না কে ফুটু, আমায় শ্যামলদা’ ফুটু ভাবছে – a case of mistaken identity”..
উর্ম্মি আর ঝুনকুর হাসি আর থামেই না।
“হি হি হা হা, ভাল আছো ফুটু, হো হো হা হা”!
উদয়ন ও বেশ ভাল গল্প বলতে পারে। সে শুরু করলো হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার পরে তার স্কুলের বন্ধুদের সাথে জম্বুদ্বীপে বেড়াতে যাবার লোমহর্ষক গল্প। রামায়ণের জম্বু দ্বীপ নয়, এ হলো সুন্দরবনের জম্বুদ্বীপ, সাগর দ্বীপের কাছে। শীতের দিন ফ্রেজারগঞ্জ থেকে নৌকায় সাত বন্ধু – তারা আবার সবাই হিন্দু স্কুলের মেধাবী ছাত্র – বিকেলে গিয়ে পৌছল সেই দ্বীপে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, সারাদিন খাওয়া হয়নি, এদিকে নির্জন জনমানবশুন্য দ্বীপ, থাকা খাওয়ার জায়গা নেই, ওদিকে নৌকা নিয়ে মাঝিও কেটে পড়েছে, এখন উপায়?
হঠাৎ তারা শোনে অন্ধকারে কোথাও রেডিও তে লতা মঙ্গেশকারের গান বাজছে। কেউ কোথাও নেই, গানটা বাজাচ্ছে কে? ভূতুড়ে ব্যাপার। তারপর তো সেই রেডিওর খোঁজে গিয়ে কিছু জেলের দেখা পাওয়া গেল, তারা তাদের ভালবেসে অনেক রাতে রান্না সেরে মাছের ঝোল ভাত খাওয়ালো আর পরের দিন ছোট নৌকায় করে ওদের আবার ফ্রেজারগঞ্জে পৌঁছে দিল।
এই নৌকা মাছ ধরার নয়। ছোট এবং নীচু, মাছ নিয়ে যাবার নৌকা, সেখানে সাত জন বসাতে নৌকার অর্ধেক জলের তলায়। জায়গাটা নদীর মোহনা, চারিদিকে অকূল সমুদ্র, ছোট নৌকায় করে জল ছেঁচে ছেঁচে ফ্রেজারগঞ্জে পৌঁছবার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা উদয়ন এতগুলো বছর পরেও এখনো ভোলেনি। তার সাথে সাথে সন্ধ্যাবেলা সমুদ্রের ঢেউ এ অস্তগামী সূর্য্যের লাল আলো পড়ার দৃশ্যটা এখনো উদয়নের মনে পড়ে। সে এক অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য।
উদয়ন বেশ ভাল গল্প বলে, কিন্তু সব চেয়ে জমিয়ে গল্প বলে আমাদের খোকন। খোকনের গল্প বলার একটা অননুকরণীয় ভঙ্গী আছে, সেটা হলো কোন গল্প বলার সাথে সাথে তার দুটি হাত কে সে নানা ভাবে ঘুরিয়ে ব্যবহার করে।
শম্ভু মিত্র ম্যাগসেসে পুরস্কার নিতে ম্যানিলা যাচ্ছেন, তাঁকে এয়ারপোর্টে দেখাশোনা করার ভার পড়েছে খোকনের ওপর। সে তখন দমদমে পোস্টেড। খোকন কিছুদিন আগে রাজা অয়দিপাউস নাটকে শম্ভু মিত্রের অভিনয় দেখে মুগ্ধ। সেই মানুষটাকে অভাবিত ভাবে এত কাছে পেয়ে তাই স্বভাবতঃই সে দারুণ অভিভূত।
খোকন হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বালে যাচ্ছে “আমি তো ওনাকে অনেক কিছু বলে যাচ্ছি, আপনি আমাদের বাঙালীদের গর্ব, আপনি এত বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কার নিতে যাচ্ছেন আপনার এই সন্মান আমাদেরও সন্মান, ইত্যাদি প্রভৃতি। আর উনি শুধু গম্ভীর মুখে হুঁ হুঁ করে যাচ্ছেন।”
তারপর যেই না বলেছি “আমি একাডেমীতে গত সপ্তাহে আপনাদের বহুরূপীর রাজা অয়দিপাউস নাটকটা দেখেছি, আমার খুব ভাল লেগেছে”, ওমনি ভদ্রলোক যেন হঠাৎ জেগে উঠলেন, আমার দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “তুমি দেখেছ? হলে কোথায় বসেছিলে বলো তো?”
যেই আমি বলেছি সামনের পাঁচ নম্বর রো তে বাঁদিকে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমায় বললেন “আচ্ছা অমুক সীনে আমি যখন হাতটা ঘুরিয়ে (খোকন এই জায়গাটা হাত ঘুরিয়ে দেখালো উনি কেমন করে দেখাচ্ছেন)কপালের কাছে নিয়ে আসছি, তখন তোমাদের সীট থেকে আমার মুখটা কি দেখা যাচ্ছিলো?”
খোকন বললো “আমি ভাবলাম এই রে সেরেছে, এর পরে আমায় নাটকের সমঝদার ভেবে আবার কি প্রশ্ন করবেন কে জানে, তাড়াতাড়ি এক জন কে ডেকে বললাম ভাই এনাকে লাউঞ্জে পৌঁছে দিয়ে এসো।”
এই রকম নানা গল্প করতে করতে রাত প্রায় ন’টা বেজে গেল।
ইতিমধ্যে কেটারার এসে বড় বড় কড়ায় করে খাবার দিয়ে গেছে। মেনু হলো মিষ্টি পোলাও, ফুলকপির রোস্ট, মাংস, চাটনি আর ক্ষীরকদম্ব।
শেষ পর্য্যন্ত যখন বেরোলাম তখন রাত দশটা বেজে গেছে।
প্রায় পাঁচ ঘন্টা কি করে যে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।