Tag Archives: মামাবাড়ী

মামাবাড়ী ভারী মজা

আমার মামা (ধ্রুবনারায়ণ বাগচী) ছিলেন একজন বর্ণময় চরিত্র।

দীর্ঘদেহী, ছয় ফিটের ওপর লম্বা, ঘষা কাঁচের হাই পাওয়ারের চশমার ভিতরে চোখে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, উঁচু গলায় কথা বলেন, নানা বিষয়ে বিশেষ করে ইঞ্জিনীয়ারিং সংক্রান্ত যে কোন ব্যাপারে প্রগাঢ় জ্ঞান, অঙ্কে দুর্দ্দান্ত মাথা, আমাদের ভাই বোনদের প্রতি স্নেহপরায়ণ, মামা ছিলেন আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একজন কাছের মানুষ।

মা’রা পাঁচ বোন, এক ভাই। ফলে আমাদের মাসতুতো ভাইবোনদের একমাত্র একজনই মামা। কৃতী ছাত্র ছিলেন, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে শেষ জীবনে Directorate General of Mines Safety (DGMS) তে Joint Director হয়েছিলেন, যেমন উঁচু পদ সেরকম কঠিন দায়িত্ব। কয়লা খনির মালিক রা তাদের শ্রমিক দের কাজের পরিবেশে, বিশেষ করে Underground mine গুলোতে, সব রকম সাবধানতা অবলম্বন করছে কিনা তা দেখার জন্যে প্রায় প্রতিদিন সকালে মামা গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। তাঁর কাজের পরিধি ছিল রাণীগঞ্জ, আসানসোল, সীতারামপুর আর ধানবাদের কয়লাখনি অঞ্চলে।

আমি মামার সাথে বেশ কয়েকবার খনি পরিদর্শনে গিয়েছি।

আমাদের ছোটবেলায় মামা থাকতেন আসানসোলে কোর্ট রোডে পাঁচিল ঘেরা এক বিশাল বাংলোতে। জি টি রোডের ওপরে বি এন আর ব্রীজের পাশে যে রাস্তাটা  ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট হয়ে বার্ণপুর রোডে গিয়ে পড়েছে, সেই রাস্তায় একটু এগিয়ে গেলে ডান দিকে হলুদ রং এর করবী ফুলের ঝাড় দিয়ে ঘেরা একটা কাঠের গেট। সেই গেট দিয়ে একটা লাল কাঁকরের রাস্তা এঁকেবেঁকে বাড়ীর সামনে চলে এসেছে। সাহেবী আমলের বাংলো, ঘাসের জমি থেকে তিন চার step সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসতে হয়। বাড়ীর সামনে sloping টালির ছাদ দিয়ে ঢাকা লম্বা টানা বারান্দা। বাংলোতে অনেকগুলো ঘর, বড় বড় সেগুন কাঠের জানলা দরজা, সব ঘরে উঁচু সীলিং,  সেখান থেকে লম্বা রড দিয়ে ঝোলানো সিলিং ফ্যান, গরমকালে সেগুলো চালালে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ হয়।

বাড়ীর চারিদিকে অন্ততঃ বিঘা দুয়েক জমি, সেই জমিতে মালীদের কেয়ারী করা ফুলের বাগান, আর প্রচুর গাছপালা। ওই বাড়ী ঘিরে আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি।    

নরাণাং মাতুলং ক্রমঃ বলে একটা কথা আছে, মানে ছেলেরা সাধারণতঃ তাদের মামাদের মত হয়, আমি অনেকদিন ভেবেছি বড় হলে মামার মত এরকম একটা বিশাল বাড়ী আমারও হবে নিশ্চয়। কিন্তু ওই কথাটা আমার ওপরে খাটেনি, দুঃখের বিষয়।    

আমার চার মামাতো ভাই বোন, ঝুমুদি, রুমি, ভাস্বর আর মিনি। এছাড়া ছিলাম আমি আর আমার মেজমসাসীর ছেলে রঞ্জু। রঞ্জু আমার থেকে বয়সে অল্প ছোট, ভাস্বর আবার রঞ্জুর থেকেও সামান্য ছোট, কিন্তু আমরা সবাই পিঠোপিঠি ভাই বোন বলে একসাথে হলে খুব হৈ হৈ করতাম। আর হৈ হৈ করার জন্যে কোর্ট রোডের ওই বাড়ীটা ছিল যাকে ইংরেজীতে বলে আইডিয়াল।

আসানসোল কলকাতা থেকে বেশী দূরে নয় তাই ছুটিছাটাতে প্রায়ই আসানসোলে মামার বাড়ী যাওয়া হতো। আরও অনেক আত্মীয় স্বজন আসতেন, বিশেষ করে গরমের ছুটিতে ওই বাড়ীটা আড্ডা, হাসি, ঠাট্টা, আর গল্পতে সরগরম হয়ে থাকতো সব সময়। মামার একটা চমৎকার আকর্ষনীয় (হাসিখুসী, মজলিসী আড্ডাবাজ আর হুল্লোড়ে) ব্যক্তিত্ব ছিল, তাই হয়তো ছুটিছাটায়  তাঁর বাড়ীতে নানা আত্মীয়স্বজনের ভীড় লেগেই থাকতো।  তাছাড়া মামা আর মামীমা খুব অতিথিবৎসল ছিলেন, বাড়ীতে অনেক লোক থাকলেও তাঁদের আতিথ্যে কোন ত্রুটি থাকতোনা।  

গরমের ছুটিতে রোজ সকালে আমরা ছোটরা বাড়ীর বাগানে রাবারের কিংবা ক্যাম্বিসের বল দিয়ে পিট্টু আর কিং কিং খেলতাম, আর আম গাছে চড়ে কাঁচা আম পেড়ে খেতাম। বিকেলে ঘাসের জমিতে নেট টাঙিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা হত।

আর ওই টালির ছাদ দিয়ে ঢাকা টানা বারান্দা ছিল আমাদের ক্যারম খেলার জায়গা। 

ছুটির দিন গুলো ওই বাংলো তে কি করে যে কেটে যেত বোঝাই যেতনা। 

এমনিতে মামা খুব jovial মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁর পছন্দমতো কিছু না হলে তিনি বেশ রেগে যেতেন। বেশ হাসি ঠাট্টা করছেন, হঠাৎ দুম করে রাগ হয়ে গেলে তিনি একদম অন্য মানুষ। মামা একদিকে তিনি যেমন হাসিখুসী, আড্ডাবাজ, গপ্পে ছিলেন, অন্যদিকে আমরা ছোটরা তাঁকে বেশ সমীহ আর সন্মান করতাম, ভয়ও পেতাম, কখন কিছু অপছন্দ হলেই রেগে যাবেন কে জানে?

একবার ব্রীজ খেলার সময় তাঁর পার্টনার মনোরঞ্জন মল্লিক নামে এক ভদ্রলোক বিড করতে কিংবা লীড দিতে মারাত্মক একটা ভুল করেছিলেন, সেই ভুলের জন্যে তাঁদের গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফস্কে যায়। মল্লিকবাবু আসানসোল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের জাজ, সন্মানীয় লোক, মামার থেকে বয়সেও বড়, কিন্তু তাঁর ওই ভুল দেখে মামা দুম করে রেগে গিয়ে মল্লিক বাবুকে বলেছিলেন আপনার মত গাধার সাথে ব্রীজ খেলার কোন মানেই হয়না।

গাধা বলেছিলেন না বোকাপাঁঠা বলেছিলেন ঠিক জানিনা, অন্য কিছুও বলে থাকতে পারেন, কিন্তু যাই বলে থাকুন মল্লিক বাবুর সেটা ভাল লাগেনি, সবার সামনে অপমানিত হয়ে তাঁর মুখ চোখ লাল হয়ে যায়। তার পর থেকে তিনি আর কোন দিন মামার সাথে ব্রীজ খেলতে আসেন নি।  

মামার রাগ আর মেজাজের এই রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তার মধ্যে থেকে নীচের দুটি ঘটনার কথা লেখা যেতে পারে, এই দুটি ঘটনা থেকে মামাকে জানা সহজ হবে।

আসানসোল শহরে এক রবিবার মামা সপরিবারে গাড়ী নিয়ে বাজার করতে এসেছেন, ভীড়ের মধ্যে হাঁটার সময়  তিনি খেয়াল করলেন তাঁর পকেটমার হচ্ছে, একটি যুবক তাঁর মানিব্যাগটা নিয়ে ভীড় কেটে এঁকেবেঁকে তীর বেগে পালিয়ে যাচ্ছে। মামা সব ফেলে তাকে ধাওয়া করে শেষ পর্য্যন্ত ধরে ফেলে মানিব্যাগ ফেরত নিয়ে এসেছিলেন। এর থেকে মামার উপস্থিত বুদ্ধি, সজাগ মন, সাহস, এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। আসানসোলের মত গুন্ডা অধ্যুষিত জায়গায় বাজারের ভীড়ের মধ্যে জল কাদা ঠেঙিয়ে হাই স্পীডে দৌড়িয়ে চোর ধরা সহজ কাজ  নয়। বুকের পাটা লাগে। আর মামার তখন মধ্যবয়েস, শরীর আর স্বাস্থ্য ও তেমন মজবুত নয়। পুরোটাই মনের জোর।

আর একবার দিদা বেনারস থেকে আসছেন, মামা গেছেন আসানসোল স্টেশনে তাঁকে receive করতে। ট্রেণ লেট, কিন্তু কত লেট, কখন আসবে, তার কোন announcement হচ্ছেনা, কেবল বার বার মাইকে বলা হচ্ছে “যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে টিকিট কাটার সময় দয়া করে দরকার মতো খুচরো পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করুন!”

বেশ কয়েকবার ওই এক announcement শোনার পরে মামার মেজাজ গেল বিগড়ে, তিনি সটান স্টেশন মাস্টারের ঘরে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে তাঁকে দিলেন এক ধমক।

ট্রেণ এর টাইমিং  নিয়ে কোন খবর নেই, বার বার শুধু খুচরো নিয়ে আসুন, খুচরো নিয়ে আসুন, এটা কি ধরণের ইয়ার্কি হচ্ছে মশাই?

মামার বকুনী খাবার পরে আবার ঠিক ঠাক announcement শুরু হল। অমুক নম্বর ট্রেণ তমুক নম্বর প্ল্যাটফর্মে তসুক সময়ে আসছে..

আমার মাসতুতো ভাই রঞ্জু ছোটবেলা থেকেই বেশ দুরন্ত, ও যখন নরেন্দ্রপুরে রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের হোস্টেলে থেকে ক্লাস নাইনে পড়ে, তখন মেসোমশায় মারা যান (১৯৬০)।  স্কুলের ছুটি হলে হোস্টেল থেকে বাড়ী  ফিরলে মাসী তাঁর দুরন্ত ছেলেকে ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। রঞ্জু কে শাসন করার ক্ষমতা মাসীর ছিলনা, কেননা তিনি খুব নরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, তাঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে মামার শাসনে থাকলে ছেলে ভাল থাকবে, বখে যাবেনা বা হাতের বাইরে চলে যাবেনা।   

রঞ্জু তাই মামার বাড়ীতে আমার থেকে অনেক বেশী থেকেছে, মামা আর মামীমাও রঞ্জু কে নিজের ছেলের মতই ভালবাসতেন, মামাতো ভাই বোনেদের সাথে রঞ্জূ পরিবারের একজনই হয়ে গিয়েছিল।

মামাবাড়ী ভারী মজা, কিল চড় নাই বলে একটা কথা আছে, সেটা রঞ্জুর কাছে কতোটা ঠিক ছিল বলা মুস্কিল। কেননা পড়াশুনা, বিশেষ করে অঙ্ক ঠিক করতে না পারলে মামার প্রচন্ড মেজাজ গরম হয়ে যেত, বকুনী তো খেতে হতোই, কিল চড় ও যে মাঝে মাঝে খেতোনা, তাও জোর করে বলা যায়না। বিশেষ করে বুদ্ধির অঙ্ক ছিল মামার ফেভারিট, বুদ্ধির অঙ্ক আর নানা ধরণের ধাঁধা দিয়ে মামা আমাদের প্রায়ই বেশ বোকা বানাতেন। আর পড়াশোনার ব্যাপারে মামা ছিলেন firm and uncompromising, a very strict taskmaster.. 

ফলে মামার রাগ আর মেজাজের সাথে সব চেয়ে বেশী পরিচয় ছিল ভাস্বর আর রঞ্জুর। তারা দুজন মামাকে যমের মত ভয় পেতো।

১৯৬৩ সালে হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার পরে লম্বা ছুটি তে মাসী  as usual রঞ্জুকে মামার কাছে আসানসোলে পাঠিয়ে দেন। সামনে রঞ্জুর বি ই কলেজের Admission test, তার জন্যে  application form fill up করা হয়েছে,  সেটা পোস্ট অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি করতে হবে।

মামা রঞ্জু আর ভাস্বরকে টাকা দিয়ে পোস্ট অফিসে পাঠালেন।   

সেদিন আবার দিদা বিকেলে কলকাতায় যাচ্ছেন, প্যাকিং ইত্যাদি নিয়ে মামা বেশ ব্যস্ত ছিলেন, দুপুরের খাওয়া হয়ে গেলে তাঁর মনে পড়ল রেজিস্ট্রি করার কথা, তিনি রঞ্জু আর ভাস্বর কে জিজ্ঞেস করলেন, “কি রে তোরা application form  রেজিস্ট্রি  করে এলি?”

দুজনেই মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ!

মামা বললেন “Receipt টা দেখি”।

Receipt? Receipt আবার কি?  Receipt তো নেই!  দুজনে তো অবাক।

তারপরে মামার হিমশীতল চাহনি দেখে অবশ্য দু’জনেই বুঝলো কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে, তারা একটা কেলো করেছে নিশ্চয়!

পোস্ট অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি করতে কত টাকার স্ট্যাম্প লাগবে জেনে স্ট্যাম্প কিনে আর লাগিয়ে তারা খামটা পোস্ট বক্সে ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে এসেছে, আগে তো কোনদিন তারা রেজিস্ট্রি করেনি, জানবে কি করে যে কাউন্টারে জমা দিয়ে Receipt নিতে হয়।

তারপরে শুরু হল মামার বকুনী। সমুদ্রের ঢেউএর মত সেই বকুনী আর ধমক তাদের ওপরে আছড়ে পড়লো বেশ কিছুক্ষণ।

তার পরে মামা গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে গেলেন পোস্ট অফিসে। সেখানে তিনি শুনলেন যে সেদিনের মেল স্টেশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে sorting এর জন্যে। সেখান থেকে মামা ছুটলেন স্টেশনে। সেই স্টেশন মাস্টার ভদ্রলোক যিনি কিছুদিন আগে মামার কাছে বকুনী খেয়েছেন, তিনি মামাকে দেখে অনেক খাতির করে তাঁর লোকদের পাঠিয়ে রঞ্জুর application form  টা আনাবার বন্দোবস্ত করলেন।

সেদিন বিকেলে দিদাকে নিয়ে স্টেশন যাবার সময়ে মামা রঞ্জু আর ভাস্বর কে বললেন তোরাও আমার সাথে চল্‌। স্টেশন মাস্টার তোদের দেখতে চেয়েছেন। আজ বাদে কাল কলেজে ভর্ত্তী হবে আর এখন ও চিঠি রেজিস্ট্রি করতে জানেনা? একবার ওদের নিয়ে আসবেন তো, দেখবো।

এই গল্পটা বলার সময় ভাস্বর বলে জানো মান্টুদা’, স্টেশন মাস্টার ভদ্রলোক কিন্তু মোটেই আমাদের দেখতে চান নি। ওটা পুরোপুরি বাবার বানানো। আমাদের যাতে আরও খারাপ লাগে তার ব্যবস্থা করা। উনি তো আমাদের দেখে খুব ভালোমানুষের মত বলেছিলেন, “না না ধ্রুব বাবু, কি যে বলেন, ছোট ছেলে, এরা কোন দিন আগে চিঠি রেজিস্ট্রি করেনি। ভুল তো হতেই পারে।”

তার পরে ওদের দুজন কে গাড়ীতে গিয়ে বসতে বলে মামা দিদা কে প্লাটফর্মে see off করতে চলে গেলেন।

রঞ্জু আর ভাস্বর দুই ভাই মুখ চূণ করে গাড়ীতে গিয়ে বসে আছে, এমন সময় রঞ্জু হঠাৎ দেখে গাড়ির পিছনের সীটে একটা লম্বা বাঁশের লাঠি পড়ে আছে। এই লাঠিটা কার? দিদার লাঠি নাকি? মামা ভুল করে গাড়ীতে ফেলে গেছেন নির্ঘাত।

রঞ্জু ভাস্বর কে বললো যা, এটা মামাকে তাড়াতাড়ি গিয়ে দিয়ে আয়। ট্রেণ এখুনি ছেড়ে দেবে।

রঞ্জু বোধহয় ভেবেছিল লাঠিটা দিয়ে এলে মামা খুসী হবেন, সারাদিন রেজিস্ট্রী চিঠি নিয়ে এই ঝামেলা হবার পর অন্ততঃ কিছুটা কৃতিত্ব তো এখন তাঁর কাছে পাওয়া যাবে। কিন্তু তাদের দুজনেরই বকুনী খেয়ে মাথা এমন গুলিয়ে গেছে যে তারা চিন্তা করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে, বুদ্ধিশুদ্ধি যা ছিল, সব লোপ পেয়েছে।

ওই লম্বা ভারী বাঁশের লাঠি যে দিদার হতেই পারেনা সেটা ওদের মাথায়ই আসেনি। আর তাছাড়া ভাস্বরের তো জানা উচিত যে ওই লাঠিটা মামার, খনি পরিদর্শনে যাবার সময় রোজ সকালে তিনি ওই লাঠিটা নিয়ে বেরোন।

ভাস্বর উৎসাহের সাথে দৌড়তে দৌড়তে মামাকে লাঠিটা দিতে গেল। প্ল্যাটফর্মে মামার কাছাকাছি যেতেই ভাস্বর দেখলো মামা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর চোখ দিয়ে আগুণ ঠিকরে বেরোচ্ছে। তাঁর সেই আগুণে দৃষ্টি থেকে ভাস্বর বুঝে নিল মামা বলছেন, “তবে রে, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা, আজ তোর পিঠেই এই লাঠিটা ভাঙবো!”

নিমেষের মধ্যে ভাস্বর বুঝে নিলো সর্ব্বনাশ, আবার একটা ভুল হয়ে গেছে। লাঠিটা দিদার নয়, তার বাবার। সঙ্গে সঙ্গে ফুল স্পীডে ব্যাক।

গাড়ীতে ফিরে ভাস্বর রঞ্জু কে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো “লাঠিটা বাবার।”

রঞ্জু আর নেই, সে বেশ কয়েক বছর হলো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ও যখন ছিল তখন আমরা দু’জন আর ভাস্বর একসাথে হলেই সেই কোর্ট রোডের বাড়ীতে কাটানো দিনগুলোর গল্প হত, নানা ঘটনার মধ্যে এই রেজিস্ট্রী আর লাঠির গল্পটা উঠে আসতোই।

রঞ্জুর গল্প বলার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল, আর ওর হাসিটা ছিল খুব সংক্রামক, ও যখন এই সব গল্পগুলো ওর নিজস্ব অননুকরণীয় ভঙ্গীঁতে বলত, আমরা তিনজন হো হো করে হাসতাম। এখন রঞ্জু আর নেই, ভাস্বরের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়, আমরা পুরো্নো দিনের গল্প করি, আর এই   গল্পটা বলার সময় ভাস্বরও খুব হাসে।   

ভাস্বরের বৌ মালা একটু বিরক্ত হয়ে বলে এ আবার কি? বাবার কাছে বোকামী করে বকুনী খেয়েছো তো তাতে এত হাসার কি আছে?

ভাস্বর একটু উদাস মুখ করে বলে সে তুমি বুঝবেনা !

সত্যি, এই গল্প গুলো করার সময় আমাদের এত হাসি পায় কেন?  

নিজেদের ভুল বোকামী ইত্যাদি (bloopers and blunders) – আমি কি বোকা ছিলাম হি হি হি, কিংবা আমি মামার কাছে কি solid বকুনী খেলাম হা হা হা – নিয়ে নিজেরাই মজা করা বা হাসাহাসি করা হল ইংরেজীতে যাকে বলে Self-deprecating humour, যা কিনা রসিকতার একটা উচ্চ স্তর। ভাস্বরের হাসি বোধ হয় সেভাবে ব্যাখা করা যায়।

ওই গল্পটা বলার সময় ভাস্বরের হাসার আরও একটা কারণ হয়ত এই যে ছোটবেলায় কোর্ট রোডের বাংলো তে কাটানো সেই হাসি আর আনন্দের (carefree) দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সে মনে মনে সেই দিনগুলোতে ফিরে যায়। ভাস্বর আমায় বলল জানো মান্টুদা’, ছোটবেলায় আমি বাবাকে খুব ভয় পেতাম,  কিন্তু এখন মনে হয় বাবার ওই শাসন আর বকুনীর মধ্যে একটা বিশেষ ভালবাসার আর স্নেহের স্পর্শ ছিলো।

সেই দিনগুলোর স্মৃতির মধ্যে একদিকে যেমন মিশে আছে আমাদের ছেলেমানুষী দুষ্টুমি, দুষ্কর্ম্ম, আর বোকামী,  ঠিক তেমনই অন্যদিকে আছে গুরুজনদের শাসন, ধমক আর বকুনী। এই দুই মিলিয়েই দিন গুলো বড় সুন্দর ছিল।

তাই এই স্মৃতিচারণ করার সময় ভাস্বর যে কেন এত প্রাণ খুলে হাসে, তা বোঝা কঠিন নয়।

কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই, আজ আর নেই।