পুরোন বন্ধুর সাথে পঞ্চাশ বছর পরে দেখা

মানস(সেন) আর আমি খড়্গপুরে পাঁচ বছর সহপাঠী ছিলাম। মানস আর তার বৌ কেয়া এখন থাকে লন্ডনে, আমি সেখানে এক মাসের জন্যে গেছি পুপুর কাছে। ১৯৬৮ সালে খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরে আমাদের আর দেখা হয়নি।

আমরা দুজনে লন্ডনের দুই প্রান্তে থাকি, পুপুদের বাড়ী East London এর South Woodford এ আর মানস আর কেয়া দুজনে থাকে West London এর  Harrow তে তাদের ফ্ল্যাটে।  

মানসের সাথে ফোনে কথা বলে ঠিক করলাম আমরা সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে বন্ড স্ট্রীট টিউব স্টেশনে দেখা করবো Boot’s এর সামনে। ঠিক এগারোটায় পৌঁছে দেখি ওরা দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। মানস কে চিনতে কোন অসুবিধেই হলোনা, প্রায় আগের মতই আছে, দু’জনে দু’জন কে জড়িয়ে ধরলাম। 

মানস বলল তোদের আসতে কতক্ষণ লাগলো? আমি বললাম এক ঘন্টা, ঠিক দশটায় বেরিয়েছি। মানস বলল দশটায় আমরা already এখানে!কেয়া বললো দেখুন না এই মানুষটা কে আমায় রোজ ঠেলে বের করতে হয়, আজ নিজেই ভোর বেলা উঠে আমায় তাড়া দিচ্ছে।

জুন মাস পড়ে গেছে, তবু বাইরে বেশ ঠান্ডা, হিমের মত হাওয়া দিচ্ছে, আকাশ মেঘলা, মানস একটা বড় ওভারকোট পরে এসেছে, আমার গায়েও গরম জ্যাকেট।  কিছু ছবি তোলা হল স্টেশন থেকে বেরিয়ে Oxford Street এ ভীড়ের রাস্তায়।   তারপরে কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে আমাদের গল্প শুরু হলো। মানস বললো নে এবার শুরু কর্‌। খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরের দিন থেকে বল্‌ কি কি করলি। কিচ্ছু বাদ দিবিনা।

জীবনানন্দের সামনে মুখোমুখি বসিবার জন্যে ছিলেন বনলতা সেন।  আমার ভাগ্যে মানস সেন।

পঞ্চাশ বছরের গল্প দুই ঘ্ন্টায় শেষ হয় নাকি?  কি আর করি, সেই ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করতে হলো।

গল্পে গল্পে ওই সময়টুকু কি করে কেটে গেল টেরই পেলাম না।

মানসের জীবনপঞ্জী সংক্ষেপে জানলাম। রেজাল্ট বেরোবার আগেই Philips এর কলকাতা অফিসে চাকরী পায়। সেখানে তিন বছর কাজ করে ১৯৭১ এ বিয়ে, তারপরে ITC তে সাহারানপুর, হায়দ্রাবাদ। ITC থেকে ABT তে transfer এবং পৃথিবীর নানা জায়গায় কাজ, ইয়েমেন, দুবাই, নাইজিরিয়া। একমাত্র ছেলের দিল্লীতে সেন্ট স্টিফেন্স এ পড়াশোনা করে অক্সফোর্ড এ স্কলারশিপ পাওয়া। 

দেশের বাইরে নানা জায়গায় কাজের অনেক অভিজ্ঞতা মানসের, সেই সব গল্প অনেক শোনালো সে আমায়। নাইজিরিয়া থেকে সাহারা মরুভূমিতে গিয়ে বর্ষার নদী দেখা, ইয়েমেন এ রেড সী তে গিয়ে মাছ ধরা আর সাঁতার কাটা ইত্যাদি।

রেড সী তে সাঁতার, সে তো দারুণ ব্যাপার, তুই ভাল সাঁতার কাটিস বুঝি, আমি জিজ্ঞেস করলাম। মানস কিছুটা বিনয়ের সাথে বললো ওই আর কি, স্কুলে থাকতে বেঙ্গল represent করেছি! Andersen Club এ Waterpolo খেলতাম।

বলে কি? খড়্গপুরে ওর এই গুণটা জানার সুযোগ পাইনি। আমাদের সময় তো কোন সুইমিং পুল ছিলনা।

আর বলিস না, মানস বললো, ওই পাঁচ বছর সাঁতার এর “জলাঞ্জলি”! বেশ মজার মজার কথা বলে এখনো মানস সেই আগের মতোই।

আমি কেয়া কে আমাদের সেই খড়্গপুরে প্রথম ইন্টারভিউ দিতে যাবার দিন নেতাজী অডিটোরিয়ামে আলাপ হবার গল্প করলাম। কি কি প্রশ্ন করতে পারে এই সব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে গরম জায়গা কোথায়? মানস কে তখন ও ভাল চিনিনা, সে বলে উঠলো উনুনের ভেতর~

কেয়া বললো আপনার এত দিন পরেও মনে আছে?

আমি বললাম মনে থাকবেনা কেন, আমার তো মনে হয় এই ক’দিন মাত্র আগে।

  ৩

মানসের সাথে রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে আমাদের দু’জনের জীবন নিয়ে নানা গল্পের মধ্যে ওর আর কেয়ার বিয়ের গল্পটা বেশ মজার।

ওদের বিয়ে হয় ১৯৭০ সালে। অর্থাৎ খড়গপুর থেকে পাশ করে বেরোনোর দুই বছরের মধ্যেই। ততদিনে সে Philips এর চাকরীতে সুপ্রতিষ্ঠিত, বালীগঞ্জে নিজেদের বাড়ী, ইতিমধ্যে একটা গাড়ীও কিনে ফেলেছে, ওই অল্প বয়সেই সে অতি সুপাত্র।  

মানস কে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেয়ার সাথে তোর কি বিয়ের আগে আলাপ আর প্রেম ছিল, নাকি আমার আর সুভদ্রার মত তোরও arranged marriage? মানস বললো আমার জগবন্ধু স্কুলে এক বন্ধু ছিল তার নাম সূর্য্য, তার মা’র আবার আমায় খুব পছন্দ ছিল, আর তিনি ছিলেন তিনি ভীষণ dominating মহিলা বুঝলি, তিনি যেটা চাইতেন সেটা করেই ছাড়তেন। কেয়া হলো তাঁর বোনের মেয়ে, মানে সূর্য্যর মাসতুতো বোন, ওরা থাকতো পাটনায়। 

সূর্য্যর মা আমার সাথে কেয়ার বিয়ে দেবেনই দেবেন, আমার মা’র সাথে তাঁর কথা হয়ে গেছে, মা’র ও কোন আপত্তি নেই, এদিকে আমি অবশ্য এসব কিছুই জানিনা।

সূর্য্যর বাবা পোর্ট ট্রাস্টে বড় কাজ করতেন, আলিপুরের ওদিকে গঙ্গার ধারে ওদের বিশাল বাড়ী, খেলার মাঠ। একদিন রবিবার আমাদের সেখানে খাবার নেমন্তন্ন, আমরা বন্ধুরা মিলে মাঠে জমিয়ে ক্রিকেট খেলছি, হঠাৎ মাসীমা নীচে নেমে এসে আমায় বললেন, এই মানস আমার বোনের মেয়ে কেয়া কে দেখেছিস তো, ওরা পাটনায় থাকে, ছুটিতে কয়েকদিনের জন্যে আমার কাছে বেড়াতে এসেছে, ওর খুব ইচ্ছে ন্যাশনাল লাইব্রেরী দেখার, তুই তোর গাড়ীতে করে একটু দেখিয়ে নিয়ে আয় না রে!

কিরকম ধুরন্ধর মহিলা বুঝেছিস তো?

আমি একটু অপাঙ্গে কেয়ার দিকে তাকালাম। তার মুখে মুচকি হাসি।

মানস বলতে থাকলো – আমি তখন ক্রিকেট খেলা নিয়ে ব্যস্ত, আমি বলে দিলাম, মাসীমা আমার ব্যাটিং এখনো বাকী, আমি এখন কাউকে নিয়ে কোথাও যেতে পারবোনা। তাছাড়া আজ রবিবার, ন্যাশনাল লাইব্রেরী তো বন্ধ, আজ তো দেখার কোন প্রশ্নই নেই। কিন্তু মাসীমা কে কে বোঝাবে? তিনি আমায় পাঠাবেনই।

মাসীমা বললেন তা হোক, তুই ওকে একটি লাইব্রেরীটা বাইরে থেকেই দেখিয়ে নিয়ে আয় বাবা…

কি আর করা ব্যাটিং মাথায় থাকলো আমি আমার বন্ধুদের বললাম তাহলে তোরাও চল্‌, গাড়ীতে ওঠ্‌। মাসীমা হাঁ হাঁ করে উঠে বললেন না না আর কেউ না, তোর ওই ছোট গাড়ীতে এত লোক আঁটবেনা তুই শুধু কেয়া কে নিয়ে যা…

আমি কেয়াকে বললাম তুমি এই আনরোমান্টিক লোকটাকে বিয়ে করলে কি বলে?

কেয়া আবার সেই মুচকি হাসি হেসে বলল আই আই টির ছেলেরা তো সবাই ওরকম ই হয়…

মানস বলল তো সে যাই হোক ঘুরে টুরে এসে তো ওপরে গেছি, হঠাৎ মা আর মাসীমার কথাবার্ত্তা কানে এলো। মা বলছেন দুজনের হাইট এও বেশ মানিয়েছে!

অ্যাঁ ? তার মানে? মানিয়েছে মানে কি?

আমি হো হো করে হেসে কেয়া কে বললাম আচ্ছা তুমি এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপার টা আগে থেকে জানতে নিশ্চয়?

কেয়ার মুখে আবার সেই মুচকি হাসি।