ডঃ বীরেন বসু

ছোটবেলায় যে কোন কারণেই হোক আমার মাঝে মাঝেই অসুখ হতো।  জ্বর, পেটব্যথা, কাশি, এই সব।  বোধহয় immunity কম ছিল, তাই ।  

অসুখ হলে স্কুলে যেতে হতোনা, সেটা ওই বয়সে ভালোই লাগত অবশ্য, কিন্তু সারাদিন বাড়িতে ঘরে শুয়ে থাকাও বেশ কষ্টকর। ।  মা সকাল দশটায় অফিস চলে যেতেন, তার পর সন্ধ্যায় মা না ফেরা পর্য্যন্ত সারাদিন আমি জ্যেঠিমা আর কাকীমাদের হেফাজতে। মাথা ধুইয়ে দেওয়া, থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দেখা, ওষুধ খাওয়ানো, এসব তো ছিলই, তাছাড়া সংসারের নানা কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও দিনের মধ্যে মাঝে মাঝেই তাঁরা আমার শয্যার পাশে বসে খানিকক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে যেতেন । অসুখের দিনগুলোর স্মৃতির সাথে তাঁদের সেই স্নেহস্পর্শের স্মৃতি অবধারিত  মিশে আছে।

আর মনে পড়ে আমাদের গৃহচিকিৎসক ডঃ বীরেন বসুর কথা।  

আজকাল অসুখ হলে সবাই চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে যায়। কেননা সেখানে স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখানো ছাড়াও অনেক সুবিধে, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে সেখানে নানা যন্ত্রপাতি আছে, তাছাড়া নার্সরা ও নানা কাজে সাহায্য করে। আজকাল কোন রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলে রিসেপশনে রোগী এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের ভীড়ের বহর দেখলে ভির্মি খেতে হয়। কিন্তু ভীড় থাকলেও বিশেষ করে শক্ত অসুখ হলে হাসপাতাল যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

আর সেরকম শক্ত অসুখ না হলে আমরা আজকাল যাই ডাক্তারদের চেম্বারে। সেখানেও বেশ ভীড়, বহু রোগী। বিশেষ করে কোন নামী ডাক্তার হলে ভীড় আরও বেশী।

এই অভিজ্ঞতা কমবেশী আমাদের সকলের।

আমাদের ছোটবেলায় বাড়ীতে কারুর অসুখ হলে গৃহচিকিৎসক আসার (home visit) যে চল ছিল তা আজকাল প্রায় উঠেই গেছে।                    

আমাদের গৃহচিকিৎসক ছিলেন ডঃ বীরেন  বসু।   

উজ্জ্বলা সিনেমার উল্টোদিকে ওনার চেম্বার ছিল।  তার সাথে ছিল একটা Pharmacy  যার নাম ছিল ক্যালকাটা মেডিকাল হল।  আজ সেই উজ্জ্বলা সিনেমাও নেই, ক্যালকাটা মেডিকাল হলও নেই , সেখানে এখন বীরেন বাবুর ছোট ছেলে শিবাজীর চেম্বার।  শিবাজী এখন কলকাতায় একজন প্রথম সারির Urologist, তার চেম্বারে আমিও দুই একবার গেছি। বেশ রাত পর্য্যন্ত সেখানে বহু রোগীর ভীড়।

বীরেনবাবুর চেম্বার আমাদের বাড়ী থেকে বেশী দূরে না হলেও  আমার মনে পড়ে যে আমাদের ছোটদের অসুখ বিসুখ হলে বীরেনবাবু আমাদের বাড়ীতে এসেই দেখতেন। অসুখ হলে ওনাকে দেখাতে ওনার চেম্বারে কখনো গিয়েছি বলে মনে পড়েনা।

বীরেনবাবু থাকতেনও আমাদের বাড়ীর পিছনেই, ওঁর বাড়ীতে বা চেম্বারে গিয়ে একটা খবর দিলেই উনি  চেম্বার থেকে বাড়ী ফেরার পথে অথবা বাড়ী থেকে চেম্বারে যাবার পথে সময় করে ঠিক একবার আমাদের বাড়ীতে চলে আসতেন।              

বীরেন বাবুর ডাক্তার হিসেবে পাড়ায় খুব নাম ডাক ছিল। তিনি  প্রিয়দর্শন মানুষ ছিলেন,  সুন্দর হেসে কথা বলতেন, চমৎকার  ব্যবহার ছিল। ডাক্তারদের Home visit  করার সময় Bedside manners জানা খুব দরকার, সেই দিক দিয়ে বীরেন বাবু ছিলেন একজন আদর্শ গৃহচিকিৎসক। একদিকে হাসিখুসী অন্যদিকে রাশভারী, বীরেনবাবুর ব্যক্তিত্ব ছিল খুব আকর্ষনীয়। উনি এলেই বাড়ীতে একটা বেশ সোরগোল পড়ে যেতো।

একটা বড় চামড়ার ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকে উনি jযখন আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলতেন “কি গো, আবার কি অসুখ বাধিয়ে বসলে?” তখন মনে হতো ওনাকে দেখেই আমার অসুখ অর্দ্ধেক সেরে গেল।

ডাক্তারী ছাড়াও বীরেন বাবুর একটা সামাজিক আর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, কংগ্রেসের টিকিটে তিনি ভোটে জিতে আমাদের ওয়ার্ড থেকে কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হয়েছিলেন একবার।  সেটা ছিল ওনার ব্যক্তিত্বের আর একটা দিক। তিনি তাঁর ওয়ার্ডে নানা জনহিতকর সামাজিক কাজের সাথে জড়িত থাকতেন।      

আমাদের ছোটবেলায় Antibiotic এর প্রচলন হয়নি। Mass produced ট্যাবলেট এর ব্যবহারও তখন  সে ভাবে শুরু হয়নি।       সেই সময় ডাক্তারেরা  নানা ওষুধ মিশিয়ে একটা মিক্সচার prescribe করতেন, যা ছিল একজন রোগীর  জন্যেই তৈরী,  ইংরেজীতে যাকে বলে customised and tailored…

বীরেনবাবু তাঁর প্যাডে মিক্সচারের প্রেসক্রিপশন  লিখে দিতেন, আমরা সেই  প্রেসক্রিপশন নিয়ে Pharmacy তে যেতাম। সেখানে কম্পাউন্ডার বাবু সেই প্রেসক্রিপশন এ অনেকক্ষণ ধরে ভুরু কুঁচকে চোখ বোলাতেন, যেন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পড়ছেন। তার পর বলতেন, “আধ ঘন্টা পরে ঘুরে এসো খোকা, তৈরী করতে সময় লাগবে!”

শিবাজীর কাছে গেলে অথবা কালীঘাট পোস্টাপিসের পাশে ওই রাস্তা টা দিয়ে এখনো যখন হেঁটে যাই, তখন সেই ক্যালকাটা মেডিকাল হলে গিয়ে মিক্সচার আনার কথা মনে পড়ে। একটা বোতলে লাল রঙ এর ওষুধ, বোতলের গায়ে কাগজ কেটে ডোজের মাপ দেওয়া থাকতো।

আজকাল আরও অনেক কিছুর সাথে মিক্সচার ব্যাপারটাও উঠে গেছে।