অনুগ্রহ নারায়ন ঠাকুর

পাটনায় রান্নার লোকদের বাবাজী নামে ডাকা হতো, কিন্তু মনোহরপুকুরে রান্নার লোকদের সবাই ডাকতো ঠাকুর নামে।

আমার ছোটবেলায় মনোহরপুকুরে ঠাকুর ছিল একজন বিহারী লোক, তার নাম  অনুগ্রহ নারায়ণ ঝা। তার দেশ বিহারের ছাপরা জেলায়, ছিপছিপে সুদর্শন চেহারা, ফর্সা, বড় বড় চোখ, নাকের নীচে মস্ত গোঁফ আর মাথায় একটা মস্ত টিকি। যখন ছোট ছিলাম তখন সুযোগ পেলে ঠাকুরের টিকি ধরে টান দিয়ে খুব মজা পেতাম।     আমায় খুব ছোট বয়স থেকে দেখার ফলে আমার প্রতি তার একটা বিশেষ স্নেহের ভাব ছিল, তাই টিকি ধরে টান মারলেও সে রাগ করতোনা, প্রশ্রয়ের হাসি হাসতো।

আমাদের পারিবারিক এ্যালবামে ঠাকুরের সাথে মনোহরপুকুরের ছাতে তোলা আমার অনেক ছোটবেলার ছবি এখনো রাখা আছে। পুরনো হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর স্মৃতির মতো সেই ছবি গুলোও এখন বিবর্ণ।

অনুগ্রহ নারায়ণ আমাদের বাড়িতে  বোধ হয় দশ বছরের ও বেশী কাজ করেছিল। ক্রমশঃ ধর্মভীরু আর বিশ্বাসী এই লোকটি আমাদের পরিবারের অংশই হয়ে যায়।

একবার মনে পড়ে ঠাকুর আমাদের সব ভাইবোনদের নিয়ে রাসবিহারী এভিনিউতে জলযোগের লাল দই খাওয়াতে নিয়ে যায়। সেই দোকানে দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের একটা খুব বড় অয়েল পেন্টিং টাঙ্গানো ছিল, আর সাথে লেখা ছিল “জলযোগের পয়োধি খাইয়া বড় তৃপ্তি পাইলাম!”

পয়োধি মানে কি লাল দই? এই প্রশ্নটা সেই ছোটবেলাতেই মনে আসে। আর মনে পড়ে ঠাকুরের পিছন পিছন এক বিকেলবেলা আমরা ভাই বোনেরা সবাই দল বেঁধে নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য্য লেন দিয়ে নতুন পার্ক ছাড়িয়ে বিপিন পাল রোড দিয়ে হেঁটে চলেছি।  

ন’কাকার সাথে কিছু একটা বাদানুবাদ বা তর্কে জড়িয়ে পড়ে একদিনের মধ্যে আমাদের পরিবারের সাথে এতদিনের সম্পর্ক এক কথায় শেষ করে ঠাকুর দেশে ফিরে যায়। তার এই প্রখর আত্মমর্য্যাদাবোধের কথা ভাবলে এখনো বেশ অবাক লাগে।

অনুগ্রহ নারায়ণের ভাইয়ের নাম অনুরোধ নারায়ণ, দাদার জায়গায় সে পরে আমাদের বাড়ীতে কাজ করতে আসে কিছুদিনের জন্যে। সেও বেশ ফর্সা সুপুরুষ লোক ছিল, মাথাভর্ত্তি কালো চুল, হাতে উল্কি, বেশ শক্তসমর্থ চেহারা, কানে মাকড়ি পরতো, তারও মাথায় টিকি। নিয়ম করে রোজ সন্ধ্যায় সে তুলসীদাসের রামায়ণ পড়তো মনে আছে।

অনুগ্রহ, অনুরোধ, কি সব নাম!

এই সব নাম দেখে মনে হয় ওদের বেশ শিক্ষিত পরিবার ছিল। ওদের আর কোন ভাই ছিল নাকি? কে জানে, থাকলে তাদের নাম নিশ্চয় অনু দিয়ে শুরু – অনুমান,অনুরাগ, অনুনয়, অনুকূল, কিংবা অনুভব এই সব হবে!

আমাদের বাড়ির কাজ ছেড়ে চলে যাবার কয়েক বছরের মধ্যে অনুগ্রহনারায়ণের ক্যান্সার হয়। চিকিৎসার জন্যে কলকাতায় এসে সে আমাদের বাড়িতে কিছুদিনে জন্যে থেকেছিল। আশ্রয় দেবার সাথে সাথে বাবা কাকারা তার চিকিৎসাতে সাহায্য ও করে থাকবেন।

সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পথে মনোহরপুকুরে  কুঠুরী র মতো একটা  ছোট ঘর ছিল, আমরা বলতাম ঠাকুরের ঘর, সেই ঘরে মাথা নীচু করে কোন মতে ঢুকে শুয়ে পড়তে হবে, কেননা বসলেও মাথা দেয়ালে ঠেকে যেত।

সেই ঘরে চুপ করে শুয়ে থাকতো অনুগ্রহনারায়ণ ঠাকুর, মারণ রোগ তখন তার শরীরে বাসা বেঁধেছে, তার চেহারা শুকিয়ে প্রায় কঙ্কালের মতো, সারা মুখে ক্লান্তি, হতাশা আর জীবন শেষ হয়ে যাবার যন্ত্রণাবোধ। 

সেই সিঁড়ির ঘরের পাশ দিয়ে ওঠা নামা করার সময় আমার চোখাচোখি হতো তার সাথে, আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান কিন্তু পরিচিত একটা হাসি হাসতো ঠাকুর, তার সেই হাসিটা এখনো মনে পড়ে।