
১
সীতা মনোহরপুকুরে কাজে এসেছিল চৈতীর বিয়ের এক মাস পর। মা কে জিজ্ঞেস করে জানলাম। তার মানে চল্লিশ বছর হয়ে গেল।
ক্যানিং লাইনে লক্ষ্মীকান্তপুরে সীতাদের গ্রাম। সেই ১৯৭২ সালে দুই মেয়ে কে নিয়ে সীতার জীবন সেখানে বেশ কষ্টের ছিল, কেননা তার বরের কোন কাজ বা উপার্জ্জন ছিলনা। ওর এক গ্রাম সম্পর্কে বোন অমলা মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীতে ঠিকে কাজ করত, সেই সীতা কে আমাদের বাড়ীতে প্রথম নিয়ে আসে।
অমলা কে মনে আছে, সে “র” বলতে পারতোনা। বোধহয় ওদের গ্রামে কেউই “র” বলেনা, সীতাও না। তাই তার নাম রমলা না অমলা এই নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে সে বলতো, “না না অমলা নয় গো, আমি অমলা~”
তো এই অমলা একদিন সীতাকে গিয়ে বললো, “তোকে আর ঘরে বইসে থাকতি হবেনাকো। আমার সাথে চল্ দিনি, বওমাকে (বড়মা, মানে জ্যেঠিমা, মনোহরপুকুরের সর্ব্বময়ী কর্ত্রী) বইলে একেচি। ওই বাড়িতে তোর কাজ হইয়ে যাবে।”
সেই যে সীতা এল আমাদের বাড়ীতে কাজের লোক হয়ে, কবে যে সে ধীরে ধীরে পরিবারের একজন হয়ে গেল, আমরা জানতে পারলামনা।
১৯৭৬ সালে সীতার বড় মেয়ে খুব অল্পবয়েসে দুর্ঘটনায় মারা যায়। পুপুরাণী র জন্মের পর (১৯৭৭) আমরা ১৯৮০ সালে Ironside Road এ shift করার আগে তিন চার বছর মনোহরপুকুরে ছিলাম। সেই সময় ছোট্ট পুপুকে প্রায় নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসত সীতা, আগলে রাখত সব সময়। বিকেল বেলা হলে “চল্ সীতাদিদি, দুধ আনতে যাই” বলে পাড়ায় এক গোয়ালার কাছে সীতাদিদির হাত ধরে দুধ আনতে যেত পুপু, কিংবা সন্ধ্যায় “চল্ সীতাদিদি, উটি বেলতে যাই” বলে ছাদে রান্নাঘরে গিয়ে আটা আর বেলনা নিয়ে খেলা করতো। পুপু তখন সবাই কেই “তুই” বলে ডাকতো, তাই সীতাদিদিও “তুই”।
বেশ ছিল সেই দিনগুলো।
পুপুর প্রতি সীতার বাৎসল্য আর স্নেহের ভাব টা এখনও খুব গভীর। পুপু এলেই সে তার কাছে এসে গায়ে মাথায় হাত বোলায়, “আয় সোনামণি, তোর চুল টা বেঁইধে দিই” বলে একটা চিরুণী নিয়ে তার পাশে এসে বসে।

২
জ্যেঠুকে বড়বাবা বলে ডাকতো সীতা। তাঁর জীবনের শেষের কয়েকটা বছরে প্রাণ দিয়ে তাঁকে সেবা করেছে সে। জ্যেঠুর মৃত্যুর পর মনোহরপুকুরের বাড়ী বিক্রী হয়ে গেলে সীতা মার কাছে Ironside Road এ চলে আসে। এখন মার দেখাশোনার ভার তার হাতেই।
আত্মীয়স্বজন কেউ Ironside Road এর বাড়ীতে এলে সীতার খুব আনন্দ হয়। তাদের সবার আদর আপ্যায়ন করার ভার মা তার ওপরেই ছেড়ে দেন আজকাল। সে আমাদের বিশাল পরিবারের সবাই কে চেনে, নিজের লোকের মতোই সবার খোঁজখবর নেয়। আমি তো সীতার আতিথ্যের বহর দেখে বেশ অস্বস্তি তে পড়ে যাই মাঝে মাঝে। দরজা দিয়ে ঢুকেছি কি ঢুকিনি, সীতা শুরু করে দেয়। দাদাবাবু, চা করি? সিঙ্গাড়া নিয়ে আসব? নিমকি খাবে? কাল বানিয়েছি তোমার জন্যে। একটা রসগোল্লা দিই?
মাকে নিয়ে অসুস্থ ছোটকাকা বা মৃত্যুশয্যায় শায়িত জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে গেলে অবধারিত সীতাকে ও নিয়ে যেতে যাবে আমাদের সাথে। না নিয়ে গেলে তার মন খারাপ হয়। এতদিন থেকে দেখেছে তাদের, এক সাথে এতদিন থেকেছে, তাই এখন তাদের শেষ দেখা দেখতে সে যাবেনা তা কি করে হয়?
সীতার বয়েস এখন ষাট ছাড়িয়েছে। চল্লিশ বছর ধরে বাড়ীর কাজে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে সে। এখন এই বয়েসে বেশী পরিশ্রম করার সামর্থ্য তার আর নেই। তার ওপরে বেশ কয়েক বছর তার diabetes হয়েছে, নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হয়। চোখেও কম দেখছে। সীতা কি এবার তার গ্রামে ফিরে গিয়ে ছোট মেয়ে, জামাই আর নাতি দের সাথে জীবনের বাকি দিনগুলো শান্তি তে কাটাবে? তার মাইনে টা আমি তাকে pension হিসেবেই দেবো বলে রেখেছি। চল্লিশ বছর নিষ্ঠা আর সততার সাথে কাজ করার পর এটুকু তো তার rightful due!
কিন্তু মুশকিল হলো সীতা আর তার গ্রামে ফিরতে চায়না। সেখানে পাকা বাড়ি নেই, বাড়িতে ঠান্ডা জল নেই, বোধহয় আলো পাখাও নেই। এতগুলো বছর শহরে কাটিয়ে তার অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। তাছাড়া যখন তার আরও বয়েস বাড়বে, শরীর আরও খারাপ হবে, তখন গ্রামে চিকিৎসা হবে কিনা, তার মেয়ে জামাই আর নাতিরা তাকে ভালোবাসে খুব, ফোন করে প্রায়ই, কিন্তু ওদের কাছে ফিরে গেলে তার প্রতি তাদের ব্যবহার কেমন হবে সে বিষয় ও তার সন্দেহ আছে।
তাছাড়া সে এখন আমাদের পরিবারের অংশ বলেই নিজেকে ভাবে, আমাদের ছেড়ে সে থাকবেই বা কি করে? আমরাই কি তাকে চলে যেতে বলতে পারবো কোন দিন?
————————-
পরিশিষ্ট
২০১৪ সাল থেকে সীতার আর কাজ করারা ক্ষমতা ছিলনা। ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হবার পরে তার শরীর ক্রমশঃ দুর্ব্বল হতে থাকে, চোখেও সে ভাল দেখতে পেতোনা। তখন তার মেয়ে সন্ধ্যা আর জামাই শ্রীমন্ত তাকে তাদের গ্রামে নিয়ে চলে যায়। আমি সীতাকে তার চিকিৎসার জন্যে নিয়মিত পেনশন এর টাকা পাঠাতাম। সীতার জামাই শ্রীমন্ত আমাদের বাড়ীতে এসে টাকা নিয়ে যেত, এবং প্রত্যেকবার আমাদের জন্যে তাদের বাগানের তরকারী আর পুকুরের মাছ দিয়ে যেতো।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর ২৫ শে সীতার মৃত্যু হয়। সন্ধ্যা আর শ্রীমন্ত খুব নিয়ম মেনে তার পারলৌকিক কাজ করেছিল।
সীতার পরলোকগত আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
