লন্ডনের এক ফার্মেসীতে আমার এক আশ্চর্য্য অভিজ্ঞতা

সেটা ছিল ২০২১ সাল।

লন্ডনে পুপুর কাছে এসেছি কিছুদিনের জন্যে।  

সত্যি কথা বলতে কি এবার লন্ডনে আসার খুব একটা ইচ্ছে আমার ছিলনা। প্রায় দুই বছর কোভিডের সংক্রমণ থেকে খুব সাবধানে নিজেকে বাঁচিয়ে পূর্ণদাস রোডের বাড়ীতে আমি আর সুভদ্রা সকাল থেকে রাত পর্য্যন্ত একটা নিয়মিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সুতরাং মনের মধ্যে একটা স্থবিরতা শিকড় গেড়ে জমিয়ে বসেছিল।  

নিউটনের ভাষায় যাকে বলে ইনার্শিয়া অফ রেস্ট। 

এখনো সংক্রমণ কমার কোন চিহ্ন নেই, এদেশেও নয়, লন্ডনেও নয়। তাহলে এখন ওখানে গিয়ে আমাদের কিছু হলে মেয়ে জামাই নাতনীদের জন্যে সেটা কি খুব ভাল হবে?  মেয়েরা জোর করাতে শেষ পর্য্যন্ত অবশ্য রাজী হতেই হলো। এখন আমাদের জীবনের সব সিদ্ধান্ত ওদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি। 

যাবার আগে অনেক হ্যাপা। RTPCR test, Travel insurance এর জন্যে medical test, টিকিট কাটা। Vaccine certificate, Subidha form এবং আরও নানারকম কাগজপত্র তৈরী করা। কোন ভুল হলেই প্লেনে উঠতে দেবেনা।  

পুপু সাথে থাকায় খুব সুবিধে হয়েছিল অবশ্যই। এয়ারপোর্টে আর প্লেনে সমস্ত কাগজপত্র দেখানোর কাজ ওই একা সামলেছে, তার ওপরে আমাদের দু’জনের দেখাশোনা, মালপত্র সামলানো।    

তবু প্লেনে ওঠার পর হঠাৎ শরীর টা বেশ খারাপ লাগতে শুরু করলো। মাথাটা বেশ শূন্য শূণ্য লাগছিল, তাছাড়া প্রচন্ড শারীরিক অস্থিরতা, অক্ষিদে। সুন্দরী বিমানসেবিকাদের দেওয়া শ্যাম্পেন ছুঁলামনা, এবং সারা দিন কিছু মুখেও দিইনি। গত ক’দিনের এত টেনশন বোধহয় শরীর আর নিতে পারেনি।  

যাই হোক, এখানে এসে দশ দিন বাড়ীতে কোয়ারান্টাইনে কাটানোর পর ওমিপ্রাজোল এর একটা কোর্স খেয়ে কিছুটা সামলালেও অক্ষিদে আর গ্যাসটা যাচ্ছিলোনা কিছুতেই।  তার ওপর এখানে এসে খাবার দাবারের অনেকটা পরিবর্ত্তন হয়েছে, রোজ ভাত ডাল রুটি তরকারী এখানে কে রান্না করবে? কিন্তু দিনের পর দিন পাস্তা,স্যান্ডউইচ আর ফ্রেঞ্চ টোস্ট খেয়েই বা আর কত দিন থাকা যায়? 

পুপু কাজে, একদিন বিকেলে আমি একাই বাড়ীর কাছে Ocean ফার্মেসী তে গিয়ে কাউন্টারের এক বয়স্ক ভদ্রমহিলার কাছে antacid tablet  চাইলাম।  

তিনি বেশ আন্তরিক ভাবে জিজ্ঞেস করলেন আমার কি হয়েছে?  

এ আবার কি প্রশ্ন? Antacid তো over the counter drug, প্রেসক্রিপশনের তো প্রয়োজন নেই? তাহলে এত কৌতুহল কেন? একটু বিরক্ত বোধ করলেও একে নতুন জায়গা তার ওপরে ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক, তাই বলতেই হলো বদহজম,  পেটে একটা ঘিনঘিনে ব্যথা। এই সব কথা বাংলায় যত সহজে বোঝানো যায়, ইংরেজীতে কাজটা তত সহজ নয়।  

যাই হোক, কোনমতে বোঝানো তো গেল। 

ভদ্রমহিলা আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব উদবেগের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কোন জি পির সাথে পরামর্শ করেছেন? 

আমি অল্প হেসে বললাম হ্যাঁ আমার মেয়ে একজন জি পি, তাকে জানিয়েছি। 

তিনি র‍্যাক থেকে আমার জন্যে রেনী ট্যাবলেটের প্যাকেট দিয়ে বললেন “জি পির সাথে পরামর্শ করতে কিন্তু কোনমতেই ভুলবেন না~” 

আমি ভদ্রভাবে একটু হাসলাম। বার বার এক কথা বলার কি দরকার? একটু বাড়াবাড়ি মনে হলো। 

তারপরে টাকা নিয়ে ক্যাশ মেশিন থেকে রিসিট বের করার সময় মহিলা কিছুটা করুণ গলায় আমায় বললেন, “আমার স্বামীরও এরকম রিফ্লাক্স আর পেটে ব্যথা হত। কিন্তু তিনি অনেক বলা সত্ত্বেও কোনদিন জিপির কাছে যাননি। শেষ পর্য্যন্ত তিনি মারা গেলেন!” 

“হে ভগবান,” সমবেদনায় গলা কিছুটা ভারী হয়ে এলো আমার।  “কি হয়েছিল ওনার? পেটে আলসার?” 

ভদ্রমহিলা বললেন, “না ওনার হার্টের সমস্যা ছিল, জি পি র কাছে গেলে ধরা পড়তো। কিন্তু গেলেন না কিছুতেই। আপনি কিন্তু গিয়ে একবার পরীক্ষা করিয়ে নেবেন।“ 

ওষূধের প্যাকেট আর টাকার চেঞ্জ টা নিয়ে বেরিয়ে আসছি, দরজার কাছে পিছন থেকে ভদ্রমহিলা আবার কিছুটা অনুনয়ের গালায় বলে উঠলেন, “Promise me you will go and see a GP”!  

ফার্মেসীতে গিয়ে ওষুধ কেনার সময় এরকম আন্তরিক সমবেদনা তো পাইনি কোনদিন, তাই সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা আজও ভুলতে পারিনি। বাড়ী ফেরার পথে কেমন যেন একটু আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম, সে কথা মনে পড়ে।  

3 thoughts on “লন্ডনের এক ফার্মেসীতে আমার এক আশ্চর্য্য অভিজ্ঞতা

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান