তুমি আছো গৃহবাসে তাই আছে রুচি/ ~ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
ছোটবেলায় আমাদের মনোহরপুকুর রোডের বাড়ীতে কর্পোরেশন থেকে প্রতিদিন সকালে বাথরুম ধুতে একটি ছেলে আসতো, তাকে সবাই জমাদার বলে ডাকতাম।
ছেলেটি বিহার থেকে এসেছে এই কাজ নিয়ে, খুবই অল্প বয়েস, কুড়ি ও হবে কিনা সন্দেহ। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতো, কুচকুচে কালো গায়ের রং, কিন্তু দাঁত গুলো ধবধবে সাদা, আর হাসিটা খুব মিষ্টি।হাঁটু পর্য্যন্ত গোটানো মালকোচা মারা ধুতি, গায়ে একটা ফতুয়া, আর হাতে একটা ঝাঁটা, তার ওই চেহারাটা এখনো স্পষ্ট চোখে ভাসে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে বড়ো বারান্দায় ঢুকে সে “মেজমা” বলে একটা হাঁক দিয়ে নিজের উপস্থিতি সকলকে জানান দিতো। সঙ্গে সঙ্গে মা জ্যেঠিমা কাকীমা রা বলে উঠতেন “ওরে, বাথরুম থেকে জামাকাপড় বালতি ঘটি সব সরিয়ে রাখ্, জমাদারএসেছে।”,
মাঝে মাঝে কেউ না থাকলে সে আমাকেও বলতো,“বাথরুম থেকে কাপড় জামা আর বালতি টা সরিয়ে লিবেন দাদাবাবু!”
আমরা বাথরুম থেকে কাপড়জামা ঘটি সব না সরানো পর্য্যন্ত সে হাসিমুখে চুপ করে ঝাঁটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। তাকে ছুঁলে বা তার ছায়া মাড়ালে আমাদের জাত যাবে এ কথা ভাবতে তার কোন অপমানবোধ হতো না?
কি জানি!
তার হাসিমুখ দেখে আমার মনে হতো আমাদের অসুবিধের মধ্যে ফেলে সে বেশ মজাই পাচ্ছে। আমাদের এই অপমান সে গায়ে মাখছেনা, এই ব্যবস্থাযেন সে মেনেই নিয়েছে মনে মনে, যেন আমাদের কাছ থেকে এরকম ব্যবহার ই তার প্রাপ্য, তার বেশী কিছু সে চায়ও না।
২
অনেক দিন হয়ে গেছে, সেই জমাদার আর আসেনা, তার জায়গায় এখন অন্য লোক আসে, সেই original জমাদার কে আমরা সবাই ভুলেই গেছি।
সে কিন্তু আমাদের ভোলেনি!
শুনেছি অনেক বছর পর (আমি তখন বোধহয় খড়্গপুরে কলেজে পড়ি) একদিনহঠাৎ কোট প্যান্ট টুপি পরা একটি লোক সিঁড়ি দিয়ে বড়ো বারান্দায়উঠে এসে “বড়মা” বলে হাঁক দিয়েছিল।
এ আবার কে রে বাবা?
কে আবার? আমাদের সেই জমাদার।সে নাকি কর্পোরেশনের কাজ ছেড়ে দুবাই চলে গিয়েছিল, সেখান থেকে কিছুদিনের জন্যে দেশে ফিরেছে। মেজমা আর সেজমা (আমার মা) কে সে অনেক দিন দেখেনি, তাই সে দেখা করতে চলে এসেছে।
যাকে বলে প্রাণের টান!
আমি মা কে বললাম “তোমরা কি করলে তখন?”
মা বললেন,“কি আর করবো? চেয়ারে বসতে দিলাম। অনেক বাবা বাছা করলাম, এমন কি এক কাপ চা আর বিস্কুটও খেতে দিলাম। এত দূর থেকে দেখা করতে এসেছে!”
আমি বললাম, “তার পর ওই কাপ আর প্লেট এর কি হলো?”
মা বললেন “কি আবার হবে? মেজদি ফেলে দিল। ওই কাপে আর কাউকে চা দেওয়া যায় নাকি?”
Good Friday agreement এর জন্যে UK আর Republic of Ireland এর মধ্যে কোন hard border নেই, UK Visa নিয়ে আমাদের Dublin এ ঢুকতে কোন অসুবিধে হয়নি। ইদানীং No Deal Brexit হলে এই Hard border উঠে যাওয়া নিয়ে খুব অশান্তি হচ্ছে। আমরা এইসব ঝামেলার আগেই দেশটা ঘুরে গেলাম।
কথায় আছে যারা শহরে বাস করে, তাদের কাছে যে কোন শহরই প্রিয়, কোন নির্জন শান্তিপূর্ণ গ্রামে গিয়ে তাদের থাকতে ভাল লাগবেনা। আমি তো শহরের লোক, তাই ডাবলিন শহরের সাথে এই তিন দিনেই আমার বেশ ভাব হয়ে গেল।
ডাবলিন শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী লিফি। তার ওপরে অনেক ব্রীজ সারা শহরে ছড়ানো। সেই সব ব্রীজ কিছু যানবাহন এর জন্যে আবার কিছু শুধু পথচারীদের।
দুঃখী নগর, কি চাও শুধাই যদি/ হয়তো বলবে ছোট্ট একটি নদী/
ডাবলিন কি দুঃখী নগর? হতেই পারে, এই গরীব দেশটা সেই আদিকাল থেকে ধর্ম্ম নিয়ে অন্তর্দ্বন্দে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এসেছে। তাকে তো দুঃখী বলাই যায়। ডাবলিন কি একটি ছোট্ট নদী চেয়েছিল? যদি চেয়ে থাকে তাহলে তার সাধ পূর্ণ হয়েছে বলতে হবে।
আমরা শহরের এক প্রান্তে Docklands এর কাছে apartment নিয়েছিলাম, সেখান থেকে লিফি নদী কাছেই, একটু হাঁটলেই নদীর ধারে পৌঁছে যাওয়া যায়। সেখানে নদীর ওপরে স্যামুয়েল বেকেট ব্রীজ, একটা harp এর মত তার ডিজাইন। Brian Boru নামে medieval 15th century র এই harp হলো Ireland এর national symbol। নদীর ধারের বাঁধানো রাস্তা গাছপালা দিয়ে সাজানো, হাঁটার জন্য ideal, এক পাশে cyclist track, সেখান দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে যায় যুবক যুবতীরা।
ইউরোপের অনেক শহরেই ট্রাম আছে, ডাবলিন ও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা তিন দিনের জন্যে বাস আর ট্রামের পাস কিনে ফেললাম। অপরিচিত একটি শহরকে চেনার জন্যে ভীড়ের মধ্যে অনির্দ্দিষ্ট হাঁটা আর ট্রাম বাসে চড়া হলো সব চেয়ে ভাল উপায়। আজকাল স্মার্ট ফোনে পুরো শহরের ম্যাপ ভরা থাকে, সার্চ করলেই জানা যায় কাছাকাছি কি কি দেখার আছে, কোথায় বইয়ের দোকান, কোথায় পার্ক, কোথায় কফিশপ বা কোথায় আইসক্রীম পাওয়া যায়। তাছাড়া কত নম্বর বাস বা ট্রাম সেখানে আমাদের নিয়ে যাবে, বাস বা ট্রাম স্টপ কত দূরে। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করার কোন দরকারই নেই। এমন কি বাস স্টপে আমাদের বাস কতক্ষণ পরে আসবে তাও এই সব mapping app জানিয়ে দেয়। বলা যায়না হয়তো নিজের সীটে বসে আছি হঠাৎ টুং করে ফোনে alert এসে গেল, ওঠো হে পরের স্টপে নামতে হবে।
নখদর্পনে বলে বাংলায় একটা কথা ছিল, সেটা এই যুগে বদলে এখন হয়েছে সেলফোন দর্পনে। যেদিকেই তাকাও দেখবে সবাই মাথা নীচু করে সেলফোনের দিকে তাকিয়ে।
একটা অচেনা শহর কত সহজে চেনা হয়ে যায় আজকাল।
আমাদের apartment থেকে Town centre তেমন কিছু দূর নয়, নদীর ধার দিয়ে হেঁটেই চলে যাওয়া যায়। প্রথম দিন সকালে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। লিফি নদীর কথা জয়েসের “Dubliners” বই তে পেয়েছি, নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শহরের নানা রাস্তায় ঘোরার সময় অবধারিত মনে পড়ছিল সেই বইয়ের চরিত্রদের কথা। জয়েস নিজেও এক সময় এই রাস্তা দিয়ে হেঁটেছেন ভেবে গায়ে একটু কাঁটাও দিচ্ছিল।
নদীর ধার দিয়ে একটু এগোলেই দেখা যায় নদীতে নোঙ্গর করে বাঁধা মাস্তুল তোলা এক বিশাল নৌকা তার পাশে এক নোটিসে লেখা ১৮৯০ সালে দুর্ভিক্ষের সময় প্রায় ১৫০০ লোক ১০০ মাইল হেঁটে Dublin harbor থেকে এই জাহাজে উঠে কানাডার Quebec গিয়েছিল। অনাহারে অর্দ্ধাহারে তাদের অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছবার আগে সেই জাহাজে মারা যায়। এই হাঁটাপথের নাম দেওয়া হয়েছে National Famine way, আর জাহাজের ঠিক সামনে রাস্তার এক ধারে সেই সব বিপন্ন ক্ষুধার্ত মানুষদের কিছু sculpture সাজানো। কারুর হাতে কিছু থালা বাসন, কারুর কাঁধে ব্যাগ, কারুর গলায় শিশু ঝুলে আছে।
ম্যাপ দেখে হাঁটতে হাঁটতে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই Dublin City Centre এ পৌঁছে গেলাম। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত Trinity College, অজস্র দোকানপাট, খাবারের দোকান, উঁচু উঁচু বাড়ী, অবিশ্রান্ত জনস্রোত, রং বেরং এর দোতলা বাস, তাদের খোলা ছাদে বসে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছে উৎসাহী ছেলে মেয়েরা। অনেক দোকান, অনেক রেস্টুরেন্ট, অনেক মিউজিয়াম। যেন একটা মেলা বসে গেছে। কবির ভাষায় জগতের আনন্দযজ্ঞ।
Trinity College এর কাছেই Tourist Department, সেখানে কাউন্টারে বসা সুন্দরী হাসিখুসী মেয়েটি বললো অনেক দেখার জায়গা আছে আমাদের দেশে, কোথায় যেতে চাও?
দূর, আমাদের হাতে অত সময় কোথায়? আছি তো মাত্র তিন দিন। আমরা বেশী দূরে না গিয়ে ডাবলিন শহরটাই ভাল করে দেখব ঠিক করলাম।
কাছেই Grafton Street, সেখানে Molly Malone এর statue র সামনে গীটার বাজিয়ে গান গাইছে একটি যুবক, তার পাশে ভীড় জমে গেছে, বেশ একটা উৎসবের পরিবেশ। আমরা উল্টোদিকে M J Oneill’s নামে একটি আইরিশ পাবে লাঞ্চ খেতে ঢুকে পড়লাম। পাবের ভিতরে প্রচন্ড ভীড়, কোনমতে একটা জায়গা পাওয়া গেল।
আইরিশ লাগার বীয়ারই খেলাম। গিনেস খাবার মত সাহস পেলাম না। বড্ড কড়া আর তেতো।
বেরিয়ে এসে ট্রামে বাসে বেশ কিছু ঘুরে খুঁজে খুঁজে একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে বেশ সস্তায় কিছু ভাল বই কিনে ফেললাম। Bernard Shaw, Oscar Wilde, Samuel Beckett, James Joyce… কত সব বিখ্যাত লেখকদের কত বিখ্যাত বই সেখানে থরে থরে সাজানো আছে।
বেরিয়ে এসে ট্রামে বাসে বেশ কিছু ঘুরে খুঁজে খুঁজে ডাবলিনের St Joseph’s Park এ গিয়ে বেঞ্চি তে বসে আইসক্রীম খেতে খেতে চারিদিকে ফুলের মেলা আর লেকে ভাসমান রাজহাঁস দেখতে দেখতে ভাবছিলাম সকালে নদীর ধার দিয়ে হাঁটার সময় ছিলাম এক আজনবী ইস্ শহর মে, আর এখন সন্ধ্যায় আমরা আর আজনবী নই, এখন এই শহর আমাদের খুব চেনা, পরিচিত।
রাণী এলিজাবেথ ১ এর রাজত্ব কালে ষোড়শ খ্রিষ্টাব্দীতে (১৫৯২) ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড আর কেম্ব্রিজের মডেলে ডাবলিনে Research University হিসেবে ট্রিনিটি কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়। এই প্রায় ছ’শো বছর আগে প্রতিষ্টিত এই সুপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এখন ডাউনটাঊন ডাবলিন শহরের একদম মধ্যিখানে, মেন গেটের সামনে দিয়ে জনস্রোত বয়ে যাচ্ছে, সামনে রাস্তা দিয়ে গাড়ী আর বাসের ভীড়।
কিন্তু একবার গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলে জায়গাটার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে একটা পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইউরোপে তো বটেই, এমন কি সারা পৃথিবীতে একটি অন্যতম শিক্ষার স্থান বলে তার জায়গা করে নিয়েছে। বিশাল ক্যাম্পাস জুড়ে চোখ জড়ানো সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল জমি, অনেক গাছপালা। চারিদিকে ছড়ানো অসংখ্য majestic buildings, প্রাচীন আর আধুনিক মেশানো তাদের স্থাপত্য, যা দেখলে মনের ভিতরে একটা সম্ভ্রমের ভাব জাগে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা জন্মায়। শোনা যায় যে ট্রিনিটি কলেজের ক্যাম্পাসকে পৃথিবীর অন্যতম iconic বলে ধরা হয়। এই ক্যাম্পাস কে পটভূমিকা করে নাকি অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে, ফিল্ম ও তৈরী হয়েছে।
ষোড়শ শতাব্দীতে ট্রিনিটি কলেজ যখন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন ইংল্যান্ডে Henry VIII এর হাত ধরে ইউরোপ থেকে Martin Luther এর ক্রীশ্চান reformation এর ঢেউ এসে গেছে। প্রথম থেকেই তাই এই কলেজ Protestant ধর্মের জন্যে সংরক্ষিত ছিল, Catholic দের সেখানে ছাত্র অথবা শিক্ষক হিসেবে কাজ পেতে গেলে কিছু oath নিতে হতো, যা তাদের জন্যে সন্মানের ছিলনা। আর তাদের স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ পেতেও নাকি অনেক বাধা নিষেধ ছিল। পরে অবশ্য সেই সব নিয়ম তুলে নেওয়া হয়।
কিছুটা অদ্ভুত শোনালেও ট্রিনিটি কলেজে মেয়েদের নেওয়া শুরু হয় বেশ কিছু বছর পরে – ১৯০৪ সালে।
আয়ার্ল্যান্ডের প্রায় সব বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিল্পী, দেশের প্রেসিডেন্ট ট্রিনিটি কলেজে পড়েছেন বা পড়িয়েছেন।
এখন ট্রিনিটি কলেজ একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যলায় হিসেবে স্বীকৃত, এখানে ছাত্র ছাত্রীদের প্রায় ৩০% আয়ার্ল্যান্ডের বাইরে থেকে এখানে পড়তে আসে।
ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে দেখলাম সেখানে নানা exhibition চলছে বিভিন্ন জায়গায়। লোকেরা লাইন দিয়ে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আমরা Book of Kells আর লাইব্রেরীর (Long Room) টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম।
টিকিট কেটে প্রথমেই গেলাম Book of Kells এর exhibition দেখতে।
যীশুখ্রীষ্টের চার জন কাছের মানুষ (Evangelist) – Mark, Mathew, Luke আর John তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর জীবনের নানা ঘটনা এবং তাঁর বাণী, তাঁর শিষ্যদের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের ক্রীশ্চান ধর্ম্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচার করার জন্যে তাঁদের নিজেদের মত করে চার জন চারটি গসপেল (প্রভু যীশুর সুসমাচার) লিখে যান। ধরে নেওয়া হয় এই চারটি গসপেল মোটামুটি ভাবে যিশুখ্রীষ্টের মৃত্যুর ত্রিশ থেকে একশো বছরের (30-100 AD) মধ্যে লেখা হয়। সেই হিসেবে এই প্রাচীন লেখার authencity বা সত্যতা সম্বন্ধে কারুর মনে কোন সন্দেহ নেই। বাইবেলের New Testament প্রধানতঃ এই চারটে গসপেল এর ওপর নির্ভর করেই লেখা হয়েছে।
ইউরোপে ক্রীশ্চান ধর্ম্মের প্রসারের সাথে সাথে নানা দেশে গীর্জ্জায় আর Monastery তে হাতে লেখা Gospel এর নানা কপি ছড়িয়ে পড়ে।
Book of Kells হলো এই রকমই একটি হাতে লেখা ও আঁকা চারটি গসপেল। Book of Kells বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত আলঙ্করিক পুঁথি, যা পন্ডিতদের ধারণা লেখা হয়েছিল ছয়শো থেকে আটশো খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে (600-800AD) আয়ার্ল্যান্ড ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের St. Columban Abbey আর Monastery তে। এর নামটা আসে আয়ার্ল্যান্ড এর Abbey of Kells থেকে, যেখানে এই পুঁথিগুলো সযত্নে রাখা ছিল বহু শতক ধরে।
Book of Kells কে Medieval Europe এর early Christianity র এক অসাধারণ অসামান্য কাজ (“Ireland’s finest national treasure”) বলে ধরা হয়, অষ্টম শতাব্দী তে Irish Christian monk দের লেখা ল্যাটিন ভাষায় এই পুঁথির নিখুঁত calligraphy রংএর ব্যবহার আর শিল্পসুষমা দেখলে মুগ্ধ হতে হয়।
Exhibition এ জানানো হয়েছে কারা এই গসপেল গুলো লিখেছে, কি কাগজে লিখেছে, কি তুলি আর রং ব্যবহার করেছে এই সব। চারটি বাঁধানো Volume এ সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০ পাতার এই বইটির প্রতিটি পাতা ১৩ ইঞ্চি x ১০ ইঞ্চি সাইজের off white রংএর calf vellum দিয়ে তৈরী কাগজে। লেখার calligraphy বড় দৃষ্টিমধুর, Font এর কিছুটা আঁকা বাঁকা ornate swirling দৃষ্টি আকর্ষন করে। সারা বই তে অনেক ছবি – মানুষ, জন্তু জানোয়ার আর mythical beast রা সেই সব ছবিতে সজীব vibrant রং এর ব্যবহারে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
Book of Kells Exhibition দেখে আমাদের মন ভরে উঠলো। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা পাশেই ট্রিনিটি কলেজের লাইব্রেরী -The Long room এ চলে গেলাম।
১৮০০ শতাব্দীতে তৈরী এই প্রাচীন গ্রন্থাগারে বছরে ৫০০,০০০ এর ও বেশী দর্শক ও পাঠক আসে, তাই এটি আয়ার্ল্যান্ডের তো বটেই, সারা পৃথিবীতেই একটি অন্যতম বিখ্যাত ও বিশাল গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত।
Long Room এর বিশাল হলঘর, উঁচু গোলার্ধ ছাদ (vaulted ceiling), মেঝে থেকে ছাদ পর্য্যন্ত ঠাসা বই এর র্যাক, সেখানে প্রায় ২০০,০০০ পুরনো বই পুঁথি আর পান্ডুলিপির সম্ভার, থরে থরে সাজানো। আর প্রায় একশো জন মনীষী দের marble bust, সাজানো রয়েছে গ্রন্থাগারের চারিদিকে – তার মধ্যে আছেন প্লেটো, সক্রেটিস, সেনাকা, আরিস্টট্ ইউরিপিডিস থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত আধুনিক মনীষীরা – নিউটন, ডারউইন, শেক্সপিয়ার। ভেতরে ঢুকে গা বেশ ছমছম করছিল।
অত লোক ভেতরে ঘোরা ফেরা করছে, তাদের পায়ের শব্দ আর কথাবার্ত্তার একটা মৃদু গুঞ্জন বাতাসে ভেসে থাকে। পড়াশোনা করার উপযোগী নিস্তব্ধ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এখানে নেই। পড়ার জন্যে টেবিল বা চেয়ার ও চোখে পড়লোনা। মনে হয় পাঠকেরা এখান থেকে দরকার মত বই নিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে পড়ে। Reading Library নয়, এটা হলো Reference Library…
Long Room এর লাইব্রেরীতে আর যা আছে তা হলো এক মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য পুঁথি – ১৯১৬ সালের Proclamation of the Irish Republic এবং পনেরোশো শতাব্দীর একটি কাঠের তৈরী harp, যা এখন এই দেশের একটি প্রতীক চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আজ আমাদের পৃথিবীতে ক্রমবর্দ্ধমান জ্ঞানের ভান্ডার তো রাখা আছে মেঘের (Cloud) ভিতরে ইন্টারনেটে বিশাল ও বিস্ময়কর Electronic storage এর ভিতর, Wikipedia থেকে বা গুগল এর Search ইঞ্জিন ব্যবহার করে সেখান থেকে অনায়াসে যা তথ্য দরকার সব এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসে।
ট্রিনিটি কলেজের Long Room এ ঘুরে ঘুরে বই এর র্যাক দেখতে দেখতে এই সব প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল।
????
আর এক দিন আমরা গেলাম EPIC Irish Emigration Museum এ।
এইটুকু ছোট্ট একটা দেশ আয়ার্ল্যান্ড, কিন্তু পৃথিবীকে সে কত কি দিয়েছে তা দেখতে হলে যেতে হবে সেখানে। আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে EPIC Museum বেশী দূরে নয়, নদীর ধারেই। সকালে On line এ টিকিট কেটে আমরা সেখানে গিয়ে হাজির হলাম।
Ireland কে land of Emigrants বলা হয়, সারা পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে দলে দলে এই দ্বীপ থেকে নতুন জীবন শুরু করার আশায় মানুষ পাড়ি দিয়েছে নানা দেশে। কেউ গেছে অত্যাচার অনাচার দারিদ্র্যের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে। আবার কেউ গেছে জীবনে উন্নতি করার জন্যে, সাফল্য অর্জ্জন করার জন্যে। এক দিকে hunger, oppression, unemployment, অন্যদিকে love, community, opportunity, এক দিকে বিষাদ, অন্যদিকে আশা। তাছাড়াও কেউ গেছে ধর্ম্ম প্রচারের কাজে, কেউ শিক্ষা বিস্তারের ব্রত নিয়ে। তাদের সবার গল্প বলা হয়েছে EPIC Museum এ।
শোনা গেল এই এপিক মিউজিয়াম হলো ইয়োরোপের সব চেয়ে বড় পর্য্যটক আকর্ষন। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো দর্শকদের দেখানো যে এইটুকু ছোট্ট একটা দেশ আয়ার্ল্যান্ড, তবু আজ সারা বিশ্বে সেই ছোট্ট দেশের মানুষরা কতটা প্রভাব ফেলেছে।
Museum টা দশটা গ্যালারীতে বিভক্ত। প্রথম থেকে শেয পর্য্যন্ত এক গ্যালারী থেকে পরের গ্যালারী তে আমাদের যাত্রাপথ। আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটা পাসপোর্টের পাতা। প্রতি ঘরে ঢোকার আর ছাড়ার (entry and exit) সময় সেই পাতায় একটা করে ছাপ লাগিয়ে নিতে হচ্ছে মেশিনে। যাতে আমাদের প্রত্যেকের যাত্রা পথের একটা record থেকে যায় মিউজিয়ামের সার্ভারে।
প্রথম গ্যালারী গুলোতে মানুষের নিজের দেশ ছেড়ে যাবার বেদনা আর কষ্ট, আর নতুন দেশে নতুন জীবন শুরু করার কঠিন চ্যালেঞ্জের গল্প। কাগজে জাহাজের বিজ্ঞাপন (যেখানে শ্রমিক এবং সন্তান উৎপাদনে সক্ষম অবিবাহিতা নারীকে বিনামূল্যে Australia, Canada বা USA নিয়ে যাবার আহবান জানানো হচ্ছে ), জাহাজের টিকিট, বিদায়ের সময় প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে কান্নার ছবি, এবং নানা Audio visual presentation ব্যবহার করে সেই সব গল্প বলা হয়েছে।
পরের গ্যালারীগুলোতে কেন লোকে নিজের দেশ নিজের পরিবার ছেড়ে নতুন জায়গায় চলে যায় এই নিয়ে নানা বিশ্লেষণ। আমাদের বোঝার সুবিধের জন্যে ছয়জন চরিত্র কে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাদের নিয়ে ভিডিও ফিল্ম তৈরী করে দেখানো হচ্ছে , আর যাদের ভূমিকায় অভিনয় করছেন আজকের অভিনেতা অভিনেত্রীরা। এই ফিল্মে আমরা তাদের কাছ থেকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনছি।
তার পরে দেখানো হয়েছে কি করে আইরিশ মানুষেরা তাদের সাংষ্কৃতিক ঐতিহ্য – culture আর tradition – সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে, তাদের খাবার, তাদের নাচ গান, তাদের উৎসব, তাদের সাহিত্য, তাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা।
সবশেষের গ্যালারী গুলোর theme – The Irish Diaspora today – কি ভাবে প্রবাসী আইরিশ আর তাদের পরের প্রজন্ম – তাদের সন্তান সন্ততিরা – এখনো আয়ার্ল্যান্ড আর আইরিশ ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে।
এই গ্যালারীগুলোতে দেখানো হয়েছে সারা পৃথিবীতে জীবনের নানা ক্ষেত্রে আইরিশ মানুষ দের (যারা emigrate করেছিল, এবং তাদের সন্তানসন্ততিরা) অবদান, এখনকার পৃথিবীর কত প্রথম সারির ব্যক্তিত্বেরা হলেন Irish descendant… জীবনের নানা ক্ষেত্রে কত দিকপাল প্রতিভা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে এই ছোট্ট দ্বীপ টি।
সেই নামের এক বিশাল লম্বা তালিকা। কে নেই সেখানে? সাহিত্যে Bernard Shaw, Samuel Becket, William Butler Yeats, Oscar Wilde, James Joyce, ওদিকে শিল্পে আর অভিনয়ে John Wayne, Robert de Niro, Maureen O’hara, Liam Neeson, Pierce Brosnan, Grace Kelly, Michael Caine. কত নাম করবো? দেখলাম তিন জন Beatles এর ও পূর্ব্বপুরুষ Irish…
প্রশ্নঃ কতজন US President এর Irish roots?
উত্তরঃ ২২ জন, বারাক ওবামাকে নিয়ে।
EPIC Museum হলো Irish অস্মিতার একটি সোচ্চার বিজ্ঞাপন।
ডাবলিনে গেলে এপিক মিউজিয়াম একটি অবশ্য দ্রষ্টব্য জায়গা।
Roald Dahl এর BFG (Big friendly giant) রোজ বেশী রাতে বাচ্চাদের ঘরের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ঘুমন্ত শিশু দের মনে একটা নল দিয়ে স্বপ্নের বুদবুদ ছড়িয়ে দেয়। সেই সব স্বপ্ন অবশ্য সবই হাসির আর আনন্দের।
কিন্তু আমার ছোটবেলায় আমি খুব ভূতের স্বপ্ন দেখতাম। বোধহয় ছোটবেলায় সবাই তাই দ্যাখে, কেননা ছোটদের প্রায় সব গল্পই ভূত পেত্নী দৈত্য দানো আর রাক্ষস দের নিয়ে। আমার স্বপ্নে আমায় ভূতেরা ঘরের মধ্যে তাড়া করে বেড়াতো, আর আমি পালাতে পালাতে শেষে পাশে ঘুমিয়ে থাকা মা’কে জড়িয়ে মা’র বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতাম। মা’র কাছে থাকলে ভূতগুলো আমার কাছে আসতোনা, তারা আমাদের আলমারীটার মাথায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে খ্যাক খ্যাক করে হাসতো~
বড় হবার পরে ভূতের ভয় চলে যায়, তখন স্বপ্নেরা আমাদের জীবনের গল্প হয়ে দাঁড়ায়। সেই সব গল্পে বাস্তব আর কল্পনা আশ্চর্য্য ভাবে মিলে মিশে থাকে। এবং শুধু গল্প নয়, রীতিমতো সিনেমা বা নাটকের আঙ্গিকে তারা তৈরী, সেখানে নানা চরিত্র নানা ঘটনা, নানা ঘাত প্রতিঘাত।
এই সব স্বপ্নের চিত্রনাট্য কে তৈরী করে কে জানে?
আমি সেই লোকটির নাম দিয়েছি “স্বপ্নের জাদুকর।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মালিনী নাটকটি স্বপ্নে দেখেছিলেন। নাটকটির সূচনায় তিনি সেই কথা লিখে গেছেন। লন্ডনে একবার তারকনাথ পালিতের বাড়ীতে তাঁর ডিনারের নিমন্ত্রণ ছিল, অনেক দেরী হয়ে যাওয়ায় তিনি নিজের বাড়ীতে না ফিরে তারকনারথের বাড়ীতেই রাত কাটান। নাটকের সূচনায় তিনি লিখেছেন, “ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলুম যেন আমার সামনে একটি নাটকের অভিনয় হচ্ছে, বিষয়টা একটা বিদ্রোহের চক্রান্ত। দুই বন্ধুর মধ্যে একজন কর্ত্তব্যবোধে সেটা ফাঁস করে দিয়েছেন রাজার কাছে। মৃত্যুর পূর্ব্বে তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্যে তার বন্ধুকে যেই তার সামনে নিয়ে আসা হলো, দুই হাতের শিকল দিয়ে তার মাথায় মেরে বন্ধুকে দিলেন ধূলিসাৎ করে।
“জেগে উঠে যেটা আমার আশ্চর্য্য ঠেকলো সেটা হচ্ছে এই যে আমার মনের মধ্যে একভাগ নিশ্চেষ্ট শ্রোতামাত্র, অন্যভাগ বুনে চলেছে একখানা আস্ত নাটক। স্পষ্ট হোক, অস্পষ্ট হোক সংলাপ আর ঘটনাক্রমের দ্বারা সে নাটকের গল্পকে বহন করে চলেছিল।
“জেগে উঠে সেই গল্পটি আমি মনে করতে পারলামনা, কিন্তু অনেক কাল সেই স্বপ্ন আমার জাগ্রত মনের মধ্যে সঞ্চরণ করেছে। অবশেষে অনেক দিন পরে সেই স্বপ্নের স্মৃতি এই নাটকের আকার নিয়ে শান্ত হলো।”
মালিনী নাটকের সেই দুই বন্ধু হল ক্ষেমঙ্কর আর সুপ্রিয়।
আমার মনের মধ্যেও এই স্বপ্নের জাদুকর আমার অজান্তেই নানা ধরণের গল্প আর নাটক বুনে যায়।
একবার স্বপ্নে দেখলাম আমার অফিসে আমাদের কোম্পানীর Sales Manager নাসিম জাবেরীর ঘরে আড্ডা মারছি, পরের দিন আমার একটা important customer presentation, সেটা ল্যাপটপে রাখা। বাড়ি ফিরে দেখি ল্যাপটপটা নাসিমের ঘরেই ফেলে এসেছি। আবার অফিসে ফিরে গেলাম, কিন্তু নাসিমের ঘর তালা বন্ধ! তার ফোন নাম্বার ও আমার কাছে নেই!
সর্ব্বনাশ, কি হবে এখন?
স্বপ্নের মধ্যে এই ধরনের দুর্ঘটনা অবশ্য প্রায়ই হয়।
আমার বাড়িতে কাজ করে একটি বাংলাদেশী ছেলে তার নাম Faiz, তার সাথে নাসিমের কস্মিনকালেও কোন পরিচয় নেই, থাকার কথাও নয়। স্বপ্নের মধ্যে আমি আর কাউকে না পেয়ে Faiz কে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে নাসিম এর নাম্বার আছে?
কয়েক বছর আগে একবার কেরালা গিয়েছিলাম ছুটিতে বেড়াতে, সেখানে কানের মধ্যে চারিপাশ দিয়ে অনেক মালয়ালম কথা ঢুকেছে কিছুদিন। ফিরে আসার কিছুদিন পরে সুভদ্রা স্বপ্ন দেখলো সে দমদম এয়ারপোর্টে এসে দ্যাখে কোন ট্যাক্সি কিংবা বাস নেই, শুধু রিক্সা!
বালীগঞ্জে আমাদের আইরনসাইড রোডের বাড়ীতে আসবে বলে সে একটা রিক্সাতেই চড়ে বসলো। এদিকে সেই রিক্সাওয়ালা দেখা গেল কেরালার লোক, সে বাংলা হিন্দী ইংরেজী কিছুই বোঝেনা, কেবল মালয়ালম! তাকে আইরনসাইড রোড কোথায় বোঝাতে সুভদ্রা তো হিমসিম খেয়ে গেল, তার মাথায় কিছুই ঢোকেনা।
ধাপার মাঠ এর ভেতর দিয়ে এবড়ো খেবড়ো পথ দিয়ে যেতে যেতে সুভদ্রা হঠাৎ দেখে তারা Bypass এ অম্বুজা apartment এর কাছে চলে এসেছে। সেই apartment complex এ আমাদের কুয়েতের বন্ধু সুহাস দা’ (সান্ন্যাল) বৌদি রা থাকেন, আমরা তাঁদের বাড়ীতে গেছি বহুবার~
মালপত্র নিয়ে রিক্সায় বসে অসহায় বিরক্ত সুভদ্রা দ্যাখে সাত সকালে সুহাস দা’ রাস্তায় দাঁতন করতে করতে Morning walk করছেন। তাকে দেখে সুহাস দা’ বললেন “একি সুভদ্রা, তুমি এখানে?”
সুভদ্রা তো হাঁইমাই করে সুহাস দাকে রিক্সাওয়ালার নামে যা’ তা’ বলতে শুরু করে দিল, “দেখুন না সুহাস দা’, এই লোকটা একবিন্দু বাংলা জানেনা, এদিকে কলকাতায় রিক্সা চালাচ্ছে, বলছি আইরনসাইড রোডে নিয়ে চলো, সে বোঝেই না।”
সুহাসদা’ সব শুনে রিক্সাওয়ালা কে মালয়ালাম ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন কি করে আইরনসাইড রোডে যেতে হবে।
সুহাস দা’ মালয়ালাম ভাষা জানেন নাকি?
স্বপ্নে সবই সম্ভব!
বুদ্ধদেব বসু তাঁর “নীলাঞ্জনের খাতা” উপন্যাসে লিখেছিলেন “’দৈনন্দিন’ বলে একটি শব্দ প্রায় সব ভাষাতেই প্রচলিত আছে, কিন্তু রাত্রি থেকে ওরকম কোন বিশেষণ রচিত হয়নি। কেননা দিন, যা কাজের সময়, তা প্রতিদিন প্রায় সকলের পক্ষেই একরকম, আর রাত্রি যা স্বপ্নের সময়, তা প্রতিবারেই নতুন, অভাবনীয়, সদ্যোজাত।” এবং এই সব স্বপ্নে প্রায়শঃই আমাদের মনের নানা ভয় ভাবনা দুশ্চিন্তা – anxiety and angst – প্রতিফলিত হয়।
কবির ভাষায়-
মোর ভীরু ভাবনার অঞ্জলিতে/যতটুকু রয় তাই উচ্ছলিতে/ দিবসের দৈন্যের সঞ্চয় যত/সে যে রজনীর স্বপ্নের আয়োজন/
আমরা স্বপ্নে পেন হারাই, আমাদের গাড়ী চুরি হয়, প্লেন বা ট্রেন ধরতে গেলে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে যাই।
আমি এক জন কে চিনি, সে খুব মেধাবী ছাত্র, ম্যাট্রিকে ফার্স্ট হয়েছিল। সে নাকি প্রায়ই স্বপ্নে দেখতো যে পরীক্ষার হলে বসে সে দেখছে তার পেনে কালি নেই!
এই সব স্বপ্ন দেখার পর ঘুম ভেঙ্গে গেলে ভীষণ ভাল লাগে। বেশ নিশ্চিন্ত, মনে হয় যাক বাবা পেন হারায়নি, কিংবা গাড়ী চুরি হয়নি তাহলে। ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে ট্রেণ বা ফ্লাইট মিস ও করছিনা। অবশ্য সুখস্বপ্ন ও আছে। সেই সব সুখস্বপ্নে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় জনেরা আমাদের কাছে ফিরে আসেন। আর সেই স্বপ্ন আচমকা ভেঙ্গে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়।
সুভদ্রাকে একদিন ঘুম থেকে ডেকে দিতে সে আমার উপর খুব রেগে গিয়ে বললো “দিলে তো আমার ঘুমটা ভাঙ্গিয়ে? সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, আমার বাবা কে নিয়ে।”
কি স্বপ্ন?
সুভদ্রা তার বাবার সাথে অনেক ঘুরে ট্রেণে চেপে হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। বাবা তাকে বললেন “তুমি একটু দাঁড়াও মা, আমি একটা কুলি ডেকে নিয়ে আসছি।”
বাবা ফেরার আগেই আমি সুভদ্রার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়েছি। রাগ তো হবারই কথা।
আমি বললাম ঘুম যদি না ভাঙতো তাহলে দেখতে তোমার বাবা আমায় নিয়ে ফিরে আসছেন। আমার গায়ে লাল জামা, মাথায় পাগড়ী, হাতে পেতলের ব্যাজ, হাঁটু পর্য্যন্ত মালকোচা মারা ময়লা ধুতি, খালি পা।
তোমার বাবা তোমায় বলছেন, “দ্যাখো মা, তোমার জন্যে কি ভাল একটা কুলি নিয়ে এসেছি!”
মানস(সেন) আর আমি খড়্গপুরে পাঁচ বছর সহপাঠী ছিলাম। মানস আর তার বৌ কেয়া এখন থাকে লন্ডনে, আমি সেখানে এক মাসের জন্যে গেছি পুপুর কাছে। ১৯৬৮ সালে খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরে আমাদের আর দেখা হয়নি।
আমরা দুজনে লন্ডনের দুই প্রান্তে থাকি, পুপুদের বাড়ী East London এর South Woodford এ আর মানস আর কেয়া দুজনে থাকে West London এর Harrow তে তাদের ফ্ল্যাটে।
মানসের সাথে ফোনে কথা বলে ঠিক করলাম আমরা সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে বন্ড স্ট্রীট টিউব স্টেশনে দেখা করবো Boot’s এর সামনে। ঠিক এগারোটায় পৌঁছে দেখি ওরা দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। মানস কে চিনতে কোন অসুবিধেই হলোনা, প্রায় আগের মতই আছে, দু’জনে দু’জন কে জড়িয়ে ধরলাম।
মানস বলল তোদের আসতে কতক্ষণ লাগলো? আমি বললাম এক ঘন্টা, ঠিক দশটায় বেরিয়েছি। মানস বলল দশটায় আমরা already এখানে!কেয়া বললো দেখুন না এই মানুষটা কে আমায় রোজ ঠেলে বের করতে হয়, আজ নিজেই ভোর বেলা উঠে আমায় তাড়া দিচ্ছে।
জুন মাস পড়ে গেছে, তবু বাইরে বেশ ঠান্ডা, হিমের মত হাওয়া দিচ্ছে, আকাশ মেঘলা, মানস একটা বড় ওভারকোট পরে এসেছে, আমার গায়েও গরম জ্যাকেট। কিছু ছবি তোলা হল স্টেশন থেকে বেরিয়ে Oxford Street এ ভীড়ের রাস্তায়। তারপরে কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে আমাদের গল্প শুরু হলো। মানস বললো নে এবার শুরু কর্। খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরের দিন থেকে বল্ কি কি করলি। কিচ্ছু বাদ দিবিনা।
জীবনানন্দের সামনে মুখোমুখি বসিবার জন্যে ছিলেন বনলতা সেন। আমার ভাগ্যে মানস সেন।
পঞ্চাশ বছরের গল্প দুই ঘ্ন্টায় শেষ হয় নাকি? কি আর করি, সেই ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করতে হলো।
২
গল্পে গল্পে ওই সময়টুকু কি করে কেটে গেল টেরই পেলাম না।
মানসের জীবনপঞ্জী সংক্ষেপে জানলাম। রেজাল্ট বেরোবার আগেই Philips এর কলকাতা অফিসে চাকরী পায়। সেখানে তিন বছর কাজ করে ১৯৭১ এ বিয়ে, তারপরে ITC তে সাহারানপুর, হায়দ্রাবাদ। ITC থেকে ABT তে transfer এবং পৃথিবীর নানা জায়গায় কাজ, ইয়েমেন, দুবাই, নাইজিরিয়া। একমাত্র ছেলের দিল্লীতে সেন্ট স্টিফেন্স এ পড়াশোনা করে অক্সফোর্ড এ স্কলারশিপ পাওয়া।
দেশের বাইরে নানা জায়গায় কাজের অনেক অভিজ্ঞতা মানসের, সেই সব গল্প অনেক শোনালো সে আমায়। নাইজিরিয়া থেকে সাহারা মরুভূমিতে গিয়ে বর্ষার নদী দেখা, ইয়েমেন এ রেড সী তে গিয়ে মাছ ধরা আর সাঁতার কাটা ইত্যাদি।
রেড সী তে সাঁতার, সে তো দারুণ ব্যাপার, তুই ভাল সাঁতার কাটিস বুঝি, আমি জিজ্ঞেস করলাম। মানস কিছুটা বিনয়ের সাথে বললো ওই আর কি, স্কুলে থাকতে বেঙ্গল represent করেছি! Andersen Club এ Waterpolo খেলতাম।
বলে কি? খড়্গপুরে ওর এই গুণটা জানার সুযোগ পাইনি। আমাদের সময় তো কোন সুইমিং পুল ছিলনা।
আর বলিস না, মানস বললো, ওই পাঁচ বছর সাঁতার এর “জলাঞ্জলি”! বেশ মজার মজার কথা বলে এখনো মানস সেই আগের মতোই।
আমি কেয়া কে আমাদের সেই খড়্গপুরে প্রথম ইন্টারভিউ দিতে যাবার দিন নেতাজী অডিটোরিয়ামে আলাপ হবার গল্প করলাম। কি কি প্রশ্ন করতে পারে এই সব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে গরম জায়গা কোথায়? মানস কে তখন ও ভাল চিনিনা, সে বলে উঠলো উনুনের ভেতর~
কেয়া বললো আপনার এত দিন পরেও মনে আছে?
আমি বললাম মনে থাকবেনা কেন, আমার তো মনে হয় এই ক’দিন মাত্র আগে।
৩
মানসের সাথে রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে আমাদের দু’জনের জীবন নিয়ে নানা গল্পের মধ্যে ওর আর কেয়ার বিয়ের গল্পটা বেশ মজার।
ওদের বিয়ে হয় ১৯৭০ সালে। অর্থাৎ খড়গপুর থেকে পাশ করে বেরোনোর দুই বছরের মধ্যেই। ততদিনে সে Philips এর চাকরীতে সুপ্রতিষ্ঠিত, বালীগঞ্জে নিজেদের বাড়ী, ইতিমধ্যে একটা গাড়ীও কিনে ফেলেছে, ওই অল্প বয়সেই সে অতি সুপাত্র।
মানস কে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেয়ার সাথে তোর কি বিয়ের আগে আলাপ আর প্রেম ছিল, নাকি আমার আর সুভদ্রার মত তোরও arranged marriage? মানস বললো আমার জগবন্ধু স্কুলে এক বন্ধু ছিল তার নাম সূর্য্য, তার মা’র আবার আমায় খুব পছন্দ ছিল, আর তিনি ছিলেন তিনি ভীষণ dominating মহিলা বুঝলি, তিনি যেটা চাইতেন সেটা করেই ছাড়তেন। কেয়া হলো তাঁর বোনের মেয়ে, মানে সূর্য্যর মাসতুতো বোন, ওরা থাকতো পাটনায়।
সূর্য্যর মা আমার সাথে কেয়ার বিয়ে দেবেনই দেবেন, আমার মা’র সাথে তাঁর কথা হয়ে গেছে, মা’র ও কোন আপত্তি নেই, এদিকে আমি অবশ্য এসব কিছুই জানিনা।
সূর্য্যর বাবা পোর্ট ট্রাস্টে বড় কাজ করতেন, আলিপুরের ওদিকে গঙ্গার ধারে ওদের বিশাল বাড়ী, খেলার মাঠ। একদিন রবিবার আমাদের সেখানে খাবার নেমন্তন্ন, আমরা বন্ধুরা মিলে মাঠে জমিয়ে ক্রিকেট খেলছি, হঠাৎ মাসীমা নীচে নেমে এসে আমায় বললেন, এই মানস আমার বোনের মেয়ে কেয়া কে দেখেছিস তো, ওরা পাটনায় থাকে, ছুটিতে কয়েকদিনের জন্যে আমার কাছে বেড়াতে এসেছে, ওর খুব ইচ্ছে ন্যাশনাল লাইব্রেরী দেখার, তুই তোর গাড়ীতে করে একটু দেখিয়ে নিয়ে আয় না রে!
কিরকম ধুরন্ধর মহিলা বুঝেছিস তো?
আমি একটু অপাঙ্গে কেয়ার দিকে তাকালাম। তার মুখে মুচকি হাসি।
মানস বলতে থাকলো – আমি তখন ক্রিকেট খেলা নিয়ে ব্যস্ত, আমি বলে দিলাম, মাসীমা আমার ব্যাটিং এখনো বাকী, আমি এখন কাউকে নিয়ে কোথাও যেতে পারবোনা। তাছাড়া আজ রবিবার, ন্যাশনাল লাইব্রেরী তো বন্ধ, আজ তো দেখার কোন প্রশ্নই নেই। কিন্তু মাসীমা কে কে বোঝাবে? তিনি আমায় পাঠাবেনই।
মাসীমা বললেন তা হোক, তুই ওকে একটি লাইব্রেরীটা বাইরে থেকেই দেখিয়ে নিয়ে আয় বাবা…
কি আর করা ব্যাটিং মাথায় থাকলো আমি আমার বন্ধুদের বললাম তাহলে তোরাও চল্, গাড়ীতে ওঠ্। মাসীমা হাঁ হাঁ করে উঠে বললেন না না আর কেউ না, তোর ওই ছোট গাড়ীতে এত লোক আঁটবেনা তুই শুধু কেয়া কে নিয়ে যা…
আমি কেয়াকে বললাম তুমি এই আনরোমান্টিক লোকটাকে বিয়ে করলে কি বলে?
কেয়া আবার সেই মুচকি হাসি হেসে বলল আই আই টির ছেলেরা তো সবাই ওরকম ই হয়…
মানস বলল তো সে যাই হোক ঘুরে টুরে এসে তো ওপরে গেছি, হঠাৎ মা আর মাসীমার কথাবার্ত্তা কানে এলো। মা বলছেন দুজনের হাইট এও বেশ মানিয়েছে!
অ্যাঁ ? তার মানে? মানিয়েছে মানে কি?
আমি হো হো করে হেসে কেয়া কে বললাম আচ্ছা তুমি এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপার টা আগে থেকে জানতে নিশ্চয়?
গত উইকেন্ডে আমরা এখানে দিসুম (Dishoom) নামে একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম।
এই রেস্টুরেন্টটা লন্ডনে বেশ নাম করেছে, গত তিন চার বছরে অনেকগুলো ব্রাঞ্চ খুলেছে Covent Garden Kings Cross এবং আরো নানা জনপ্রিয় upmarket জায়গায়, শুনলাম শিগগিরি Edinburgh এও নাকি খুলবে। আমরা বাড়ির কাছে East London এ Shoreditch Dishoom এ গেলাম।
দিসুম আবার কি নাম? শুনলেই হিন্দী সিনেমার সেই নায়ক আর ভিলেন এর ঢিসুম ঢিসুম ঘুঁসোঘুঁসির কথা মনে পড়েনা ? গাড়ীতে যেতে যেতে আমি আমার নাতনীদের বললাম, “Be careful, the waiters may greet you with a punch on the nose~”
বড় নাতনীকে আজকাল ঠকানো যায়না, সে বললো, “You are joking, Dabhai!”
রেস্টুরেন্টে দেখলাম বেশ ভীড়, গমগম করছে লোক, waiter রা ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। আগে সীট বুক করে যাইনি তাই জায়গা পেতে একটু সময় লাগলো। নিজেদের টেবিলে বসে মেনু কার্ড টা পড়তে গিয়ে দেখি এরা পুরনো বোম্বাইয়ের হারিয়ে যাওয়া ইরানী কাফে কে আবার ফিরিয়ে আনতে চায়।
ইরানী কাফে?
নিমেষের মধ্যে ফিরে গেলাম ১৯৬৯ সালের বোম্বাইয়ে, Indian Oil Marketing Division এর Management trainee হয়ে সেখানে আমি আর সুমন্ত্র (ঘোষাল) তখন দু’জনে Santa Cruz East এর একটা ছোট হোটেলে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি।
ইরানী কাফের কথায় ছবির মত সেই দিনগুলো আবার ফিরে এলো আমার মনে।
কি সুন্দর শহর মনে হতো বোম্বাই কে তখন, কলকাতা দেখে অভ্যস্ত আমার চোখে মনে হত এ যেন এক বিদেশী শহর, পরিস্কার রাস্তাঘাট, শহরের মধ্যে দিয়ে রেললাইন চলে গেছে, স্টেশনে গেলে মনে হয় আমি পৌঁছলেই আমার জন্যে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে একটা ট্রেণ, বাস স্টপে লম্বা কিন্তু খুব disciplined queue, দাপুটে কন্ডাক্টর দের শাসনে বাসে গাদাগাদি ভীড় নেই, বাসের দোতলায় বসে আমরা বিনা পয়সায় দেখে নিই নীল সমুদ্র। অফিস ছুটির পরে কোনদিন ফ্লোরা ফাউন্টেন, কোন দিন চার্চ গেট। পেডার রোড কিংবা নেপিয়ান সী রোডে Zacaranda গাছগুলো ভরে থাকে নীল ফুলে। আর কি আশ্চর্য্য সুন্দর রাত্রে মেরিন ড্রাইভে আলোর মালা।
সম্প্রতি আমরা চাঁদে পা দিয়েছি, সারা পৃথিবীময় তাই নিয়ে দারুণ উত্তেজনা, বোম্বাইয়ের রাস্তায় নানা জায়গায় বিশাল বিলবোর্ডে চাঁদের মাটিতে Air India র মহারাজা আর নীল আর্মস্ট্রং এর সেই iconic বিজ্ঞাপন। রাজকীয় পোষাকে মহারাজা, মাথায় পাগড়ী, পায়ে শুঁড় তোলা নাগরা জুতো, চাঁদে স্পেসস্যুট পরা নীল – কে মাথা ঝুঁকিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা – Mr. Armstrong, I presume…
জুলাই মাসে বোম্বাই তে সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি। আমরা দু’জন ছাতা মাথায় রোজ সকালে কাছেই একটা ইরানী কাফে তে গিয়ে মাসকা বান আর চা খেয়ে 84 Ltd বাস ধরে Worli তে Indian Oil এর অফিস যাই। সুমন্ত্রর আবার একটু স্বাস্থ্য বাতিক, তাই সে মাসকা বানের সাথে একটা মর্ত্তমান কলাও খায়।
আর সেই শহরের নানা কোনায় রাস্তার মোড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এই সব ইরানী কাফে। ইরান থেকে আসা Zoroastrian immigrant দের তৈরী করা এই সব দোকানের একটা আলাদা look and feel ছিল, ঢুকলেই সেই বৈশিষ্ট্য আমার নজরে পড়ত, elegant distinguished and unique! Bentwood chairs, দেয়ালে লাগানো sepia family portraits, stained mirrors, মাথার ওপরে ঘটাংঘট করে আস্তে আস্তে ঘুরতো চার পাখার সিলিং ফ্যান। কত রকমের লোক এসে ভীড় জমাতো সেই সব কাফেতে, বড়লোক ব্যবসাদার, গরীব ট্যাক্সি ড্রাইভার, courting couples, budding writers, কলেজ যাবার পথে ছাত্র ছাত্রীরা। Smart brisk waiter রা সবাই ব্যস্ত ভাবে চারিদিকে ঘোরাঘুরি করত, পরিবেশ টা বেশ লাগতো আমার।
সেই বিগত বিস্মৃত বোম্বাই এর ইরানী কাফের পরিবেশ আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চায় দিশুম।
সুভদ্রা আর পুপু মেনু কার্ড দেখছে, এই সু্যোগে আমি আমাদের Waiter এর সাথে আলাপ জুড়ে দিলাম। এই আমার এক দোষ। রাস্তা ঘাটে অচেনা কোন মানুষ কে ভাল লেগে গেলে তার সাথে আলাপ করতে আমার বেশ লাগে। আমাদের Waiter ছেলেটি বেশ স্বাস্থ্যবান যুবক, সুঠাম চেহারা, চমৎকার ইংরেজী বললেও তার চেহারা দেখে বোঝা যায় যে সে British নয়। জিজ্ঞেস করে জানলাম তার দেশ হলো ব্রাজিল, রিওর কাছে এক শহরে তার বাড়ী। ব্যাস আমিও শুরু করে দিলাম, রিও কি সুন্দর জায়গা, তোমরা কি সুন্দর অলিম্পিক games organize করলে, আমার খুব ইচ্ছে একদিন তোমাদের দেশটা ঘুরে আসবো ইত্যাদি। ছেলেটি দেখলাম অলিম্পিক নিয়ে তেমন উৎসাহী নয়, তাকে বেশ bitter শোনালো, সে বলল জানো তো আমাদের দেশটা গরীব, অলিম্পিক করতে গিয়ে এত টাকা বাজে খরচ করা হল~
ইতিমধ্যে সুভদ্রা’র মেনু দেখা শেষ, সে অর্ডার দেবে, কিন্তু আমি Waiter এর সাথে কথা বলেই যাচ্ছি। খেয়ালই নেই। সুভদ্রা আমার দিকে দেখি কঠিন দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে দেখে আমি থামলাম।
বেশ ভাল খাবার, service ও বেশ prompt, খেতে খেতে খেয়াল করছিলাম এক বেশ ভারী চেহারার দাড়িওয়ালা সাহেব এই টেবিলে ওই টেবিলে ঘুরে ঘুরে patron দের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন। মনে হলো তিনি বোধ হয় এই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার, কার কি রকম লাগছে তার খোঁজখবর করছেন।
খাওয়া হয়ে গেলে বিল মিটিয়ে বেরোচ্ছি, হঠাৎ সেই ম্যানেজার ভদ্রলোকের মুখোমুখি পড়ে গেলাম।
“Did you have a good meal sir?” বেশ amiable cheerful গলায় জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশ ভাল লাগলো, আপনি এখানকার ম্যানেজার বুঝি? বলে আমিও আলাপ জুড়ে দিলাম। তারপরে যেই বলেছি আমি পুরনো বোম্বাই তে ইরানী কাফে তে একসময় যেতাম, তাঁর উৎসাহ আর দেখে কে, তাঁকে আর থামানোই গেলনা। এই দ্যাখো আমরা কি রকম সেই পুরনো পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি, দ্যাখো আমাদের মেঝে, আমাদের দেয়ালে টাঙ্গানো ছবি, দ্যাখো মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে, আমাদের ওয়েবসাইটে একবার যেও, সেখানে পুরনো দিনের ইরানী কাফের অনেক গল্প পাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাঁর সাথে কথা বলতে গিয়ে আটকে গেলাম বেশ কিছুক্ষণ।
ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে দেখি ওরা সবাই বাইরে গাড়ীতে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
কাজ থেকে অবসর নিয়ে লন্ডনে এসে ভেবেছিলাম এখন আমার স্বাধীন জীবন, লম্বা ছুটি, যা ইচ্ছে করে বেড়াবো, যেখানে ইচ্ছে যাবো, কি মজা!
লন্ডনে কত কি করার আছে, দেখার আছে…
কিন্তু ব্যাপারটা আদপেই তা হচ্ছেনা।
বিভূতিভুষণ মুখোপাধ্যায় এর বরযাত্রী তে একটা গল্প ছিল যেখানে গনশার দল নদীর ধারে একটা মেলায় ব্যাজ পরে ভলন্টিয়ারের কাজ করছে, কিন্তু কোন সেরকম বিপদ আপদ ঘটছেনা তাই তাদের কাজও নেই। হঠাৎ তারা দেখলো একটি ছোট মেয়ে নদীর ধারে চুপ করে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তারা গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে খুকী? কথায় কথায় জানা গেল, তার দিদিমা নদীতে স্নান করতে গেছে, অনেকক্ষণ হয়ে গেল, এখনো ফিরছেনা।
সর্ব্বনাশ, গনশা বললো এ তো জলে ডোবা কেস। তারা মেয়েটির কাছে রাজেন কে রেখে গেল পুলিশে খবর দিতে, এতক্ষণে একটা ভাল কাজ পাওয়া গেছে। ওদিকে রাজেন মেয়েটিকে মন ভোলাবার জন্যে যথাসাধ্য সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে।
“দিদিমার তো অনেক বয়েস হয়েছিল খুকী, আর দিদিমারা তো কারো চিরকাল থাকেনা!”
তার এই সান্ত্বনা শুনে মেয়েটা ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করে দিলো। এদিকে ওদের ঘিরে আস্তে আস্তে একটা ভীড় জড়ো হচ্ছে।
বিভূতিভুষণ লিখছেন, “ভীড়ের ভিতর হইতে একটি গ্রাম্য লোক মন্তব্য করিলো, দিদিমা আর কার লবযুবতী থাকে বাবু?”
—-
গল্পের সেই দিদিমার মত আমিও আর লবযুবক নই, এই কথাটা মাঝে মাঝেই খেয়াল হয় আজকাল।
লন্ডনের রাস্তায় বেরিয়ে লাল রং এর ফাঁকা দোতলা বাস গুলো দেখে বড্ড ইচ্ছে করে London Transport এর একটা All day card কিনে এক লাফ দিয়ে পাদানী তে উঠে পড়ি, তারপরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আরাম করে বসে চলন্ত বাস থেকে শহরের রাস্তাঘাট ঘরবাড়ী বাগান দোকানপাট দেখতে দেখতে যেদিকে দু’ চোখ যায় চলে যাই।
অথবা ওয়েম্বলী কিংবা এমিরেটস স্টেডিয়াম এ গিয়ে প্রিমিয়ার লীগে আর্সেনাল বা এভার্টন এর ফুটবল খেলা দেখে আসি। লর্ডস বা ওভাল এ ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর সাথে ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেট খেলা হচ্ছে, এক রবিবার সারাদিন কাটিয়ে আসতে খুব ইচ্ছে করে।
Garrick Theatre এ John Osborne এর The Entertainers এ Sir Kenneth Branagh অভিনয় করছেন, তাঁর অভিনয় দেখার জন্যে সব টিকিট এক মাস আগে থেকে বিক্রী হয়ে যায়, এক বৃষ্টি ভেজা বিকেলে ইচ্ছে করে ছাতা মাথায় গিয়ে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। কিংবা South Bank এ Globe এ Theatre Repertory র King Lear হচ্ছে, Shakespeare এর শহরে এসে এই সু্যোগ কি ছাড়া উচিত?
কিন্তু সে সব আর কিছুই হবার নয়। এই সব ইচ্ছে শেষ পর্য্যন্ত অপূর্ণই থেকে যায়।
কম বয়সের সেই বেপরোয়া লাগামহীন স্বাধীন জীবন আমি হারিয়েছি।
লন্ডন Underground ট্রেণে উঠে ভীড়ের মধ্যে আমায় দেখে তরুণ যুবক যুবতীরা আমায় তাদের সীট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, আমার বেশ অস্বস্তি হয়। বলতে ইচ্ছে করে আরে না না আমি তত কিছু বুড়ো হইনি, তোমরা বোসো, আমি ঠিক আছি। কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত বসতেই হয়। বহু Tourist attraction spot এ ভেতরে ঢোকার জন্যে টিকিট কাটার সময়ে আমায় দেখে কাউন্টার এর লোকেরা জিজ্ঞেস করে তুমি কি OAP?
প্রথম দিন আমি আমার মেয়ে (পুপু) কে জিজ্ঞেস করলাম, OAP মানে কি রে?
OAP মানে হল Old age pensioner, তার মানে আমার টিকিট লাগবেনা, অথবা half price…
মনে মনে এখনো লবযুবক হলে কি হবে, এখন বাইরের সবার চোখে আমি বেশ বুড়োই।
বিশেষ করে আমার দুই মেয়ের চোখে আমি এখন খুব fragile, এবার লন্ডনে এসে দেখছি পুপু আমার শরীর আর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ভীষণ চিন্তিত আর সাবধানী। প্রতি সপ্তাহে আমার প্রেশার চেক করছে, প্রেশার আর কোলেস্টরলের ওষুধ নিয়মিত খাচ্ছি কিনা খোঁজ নিচ্ছে। ভিটামিন ডি আর ক্যালসিয়াম এর ওষুধ কিনে দিচ্ছে। ওগুলো নাকি আমার এখন খাওয়া উচিত।
আর সবসময় উপদেশ। এটা করো। সেটা কোরোনা। কোথাও বেড়াতে গেলে স্যুটকেস তুলবেনা। পিঠে লেগে যাবে, আমি তুলছি। সিঁড়ি বা escalator দিয়ে ওঠানামা করার সময় হাতল ধরে থাকো। বাথরুমে পিছলে পড়ে যেওনা, সাবধান!
রোজ সকাল বেলা বাড়ীর কাছে একটা দোকানে খবরের কাগজ কিনতে যাই, আর বিকেলে বাড়ীর কাছে রাস্তায় একটু হেঁটে আসি, কিন্তু পুপু পারতপক্ষে আমায় একা ছাড়তে চায়না। আর আমার সাথে বেরোলে সবসময় তার শাসন শুনতে হবেই। ফাঁকা সরু রাস্তা, আমি অনায়াসে এক লাফে ক্রস করে যেতে পারি। হয়তো বহু দূরে একটা গাড়ী দেখা যাচ্ছে, যেই রাস্তায় পা রেখেছি, অমনি শুনতে হবে, আঃ বাবা, ফুটপাথ দিয়ে হাঁটো, গাড়ী আসছে, দেখছোনা?
এখন ছুটির দিনে আমি পার্কে গিয়ে বসে থাকি। মেয়ে আর নাতনীরা জগ্ করে, সাইকেল চালায়, সুভদ্রা হাঁটে, আর আমি চুপ করে একটা বই নিয়ে বেঞ্চে বসে থাকি। গা জোড়ানো ঠান্ডা বাতাস বয়, পিঠে অল্প রোদ এসে পড়ে, চারিদিকে বহু গাছ, সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ, শান্ত পরিবেশ, বেশ লাগে।
স্নেহ নিম্নগামী বলে একটা কথা আছে না? আমার মেয়েরা দু’জনেই এখন মা হয়েছে, আমিও কি এখন তাদের কাছে সন্তানের মতোই?
কি জানি।
কিন্তু সত্যি বলতে কি আমায় নিয়ে আমার মেয়েদের এই fussing আমার বেশ লাগে।
ওরা আমার লবযুবক না হবার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।
এর মধ্যে আমরা একদিন Whitechapel এ Spitalfields নামে একটা Street Market এ গিয়েছিলাম। লন্ডনের নানা জায়গায় এরকম অনেক Street Market আছে, Covent Garden, Greenwich, Notting Hill, এই সব মার্কেটে অনেক খাবার স্টল, লোকেরা বাইরে টেবিল চেয়ারে বসে খাচ্ছে, নানা দোকানের স্টল, সেখানে কেনাকাটা চলছে, সারা জায়গাটা গমগম করছে, যেন একটা উৎসবের পরিবেশ।
তো আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি, দোকানে দোকানে। কোথাও জামাকাপড়, কোথাও গয়নাগাঁটি। কোথাও পুরনো রেকর্ড, এক কি দুই পাউণ্ডে সেকেণ্ড হ্যান্ড বই। না কিনলে শুধু দেখেই চোখের বেশ সুখ হয়। একটা দোকানে দেখলাম অনেক মজার মজার poster টাঙানো। একটা তে লেখা “I do not need Google. My wife knows everything”, অন্য আর একটা তে বেড়াল কোলে একটা মেয়ের ছবি, তলায় লেখা “My husband said it is either the cat or me. I miss him sometimes…”
সুভদ্রা আর পুপু দরদাম করে কিছু কেনাকাটাও করছে, নাতনীদের জন্যে টপ, দীপের (জামাই) জন্যে টি শার্ট।
হঠাৎ একটা দোকানে দেখলাম সুন্দর ডিজাইনের Cosmetic jewellery – চেন আর লকেট – সাজিয়ে রাখা আছে, তা দেখে পুপুর খুব পছন্দ হয়ে গেল। দামও বেশী নয়, মাত্র পনেরো পাউন্ড। আমাদের সাধ্যের মধ্যে।
কিন্তু পুপু নিজের জন্যে কিনতে ইতস্ততঃ করছে দেখে আমি বললাম এটা আমি তোকে কিনে দেবো। বোধহয় আমি পুপুকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম, কিংবা কাঁধে হাত রেখেছিলাম, ঠিক মনে নেই, এই ধরণের public show of affection এ দেশে খুব normal…
দোকানের অল্পবয়েসী মেয়েটি (তাকে দেখে আর তার উচ্চারণ শুনে তাকে East European বলে মনে হয়) আমাদের হাসিমুখে লক্ষ্য করছিল, পুপু তাকে বলল আমার বাবা আমায় এই লকেটটা present করবে বলছে।
মেয়েটির হাসিমুখ অল্পের জন্যে যেন কিছুটা মেঘলা হয়ে গেল, আর তার চোখ দুটো যেন একটু ছলোছলো ! খুব ধরা গলায় সে বলল জানি, তোমার বাবা কে দেখে আমার নিজের বাবার কথা বড্ড মনে পড়ে যাচ্ছে ! তোমায় আমি পাঁচ পাউন্ড কমিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমায় দশ পাউন্ড দিও।
এ কি রে?
“না না, তা কি করে হয়” বলে আমরা খুব অপ্রস্তুত হয়ে আপত্তি জানালাম। কিন্তু মেয়েটি আমাদের কথায় কান দিলোনা, সে অবিচলিত।
শেষ পর্য্যন্ত তাকে দশ পাউন্ড দিয়ে পুপু বলল “Thank you, you are very kind…”