সত্যি কথা বলতে কি এবার লন্ডনে আসার খুব একটা ইচ্ছে আমার ছিলনা। প্রায় দুই বছর কোভিডের সংক্রমণ থেকে খুব সাবধানে নিজেকে বাঁচিয়ে পূর্ণদাস রোডের বাড়ীতে আমি আর সুভদ্রা সকাল থেকে রাত পর্য্যন্ত একটা নিয়মিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সুতরাং মনের মধ্যে একটা স্থবিরতা শিকড় গেড়ে জমিয়ে বসেছিল।
নিউটনের ভাষায় যাকে বলে ইনার্শিয়া অফ রেস্ট।
এখনো সংক্রমণ কমার কোন চিহ্ন নেই, এদেশেও নয়, লন্ডনেও নয়। তাহলে এখন ওখানে গিয়ে আমাদের কিছু হলে মেয়ে জামাই নাতনীদের জন্যে সেটা কি খুব ভাল হবে? মেয়েরা জোর করাতে শেষ পর্য্যন্ত অবশ্য রাজী হতেই হলো। এখন আমাদের জীবনের সব সিদ্ধান্ত ওদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি।
যাবার আগে অনেক হ্যাপা। RTPCR test, Travel insurance এর জন্যে medical test, টিকিট কাটা। Vaccine certificate, Subidha form এবং আরও নানারকম কাগজপত্র তৈরী করা। কোন ভুল হলেই প্লেনে উঠতে দেবেনা।
পুপু সাথে থাকায় খুব সুবিধে হয়েছিল অবশ্যই। এয়ারপোর্টে আর প্লেনে সমস্ত কাগজপত্র দেখানোর কাজ ওই একা সামলেছে, তার ওপরে আমাদের দু’জনের দেখাশোনা, মালপত্র সামলানো।
তবু প্লেনে ওঠার পর হঠাৎ শরীর টা বেশ খারাপ লাগতে শুরু করলো। মাথাটা বেশ শূন্য শূণ্য লাগছিল, তাছাড়া প্রচন্ড শারীরিক অস্থিরতা, অক্ষিদে। সুন্দরী বিমানসেবিকাদের দেওয়া শ্যাম্পেন ছুঁলামনা, এবং সারা দিন কিছু মুখেও দিইনি। গত ক’দিনের এত টেনশন বোধহয় শরীর আর নিতে পারেনি।
যাই হোক, এখানে এসে দশ দিন বাড়ীতে কোয়ারান্টাইনে কাটানোর পর ওমিপ্রাজোল এর একটা কোর্স খেয়ে কিছুটা সামলালেও অক্ষিদে আর গ্যাসটা যাচ্ছিলোনা কিছুতেই। তার ওপর এখানে এসে খাবার দাবারের অনেকটা পরিবর্ত্তন হয়েছে, রোজ ভাত ডাল রুটি তরকারী এখানে কে রান্না করবে? কিন্তু দিনের পর দিন পাস্তা,স্যান্ডউইচ আর ফ্রেঞ্চ টোস্ট খেয়েই বা আর কত দিন থাকা যায়?
পুপু কাজে, একদিন বিকেলে আমি একাই বাড়ীর কাছে Ocean ফার্মেসী তে গিয়ে কাউন্টারের এক বয়স্ক ভদ্রমহিলার কাছে antacid tablet চাইলাম।
তিনি বেশ আন্তরিক ভাবে জিজ্ঞেস করলেন আমার কি হয়েছে?
এ আবার কি প্রশ্ন? Antacid তো over the counter drug, প্রেসক্রিপশনের তো প্রয়োজন নেই? তাহলে এত কৌতুহল কেন? একটু বিরক্ত বোধ করলেও একে নতুন জায়গা তার ওপরে ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক, তাই বলতেই হলো বদহজম, পেটে একটা ঘিনঘিনে ব্যথা। এই সব কথা বাংলায় যত সহজে বোঝানো যায়, ইংরেজীতে কাজটা তত সহজ নয়।
যাই হোক, কোনমতে বোঝানো তো গেল।
ভদ্রমহিলা আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব উদবেগের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কোন জি পির সাথে পরামর্শ করেছেন?
আমি অল্প হেসে বললাম হ্যাঁ আমার মেয়ে একজন জি পি, তাকে জানিয়েছি।
তিনি র্যাক থেকে আমার জন্যে রেনী ট্যাবলেটের প্যাকেট দিয়ে বললেন “জি পির সাথে পরামর্শ করতে কিন্তু কোনমতেই ভুলবেন না~”
আমি ভদ্রভাবে একটু হাসলাম। বার বার এক কথা বলার কি দরকার? একটু বাড়াবাড়ি মনে হলো।
তারপরে টাকা নিয়ে ক্যাশ মেশিন থেকে রিসিট বের করার সময় মহিলা কিছুটা করুণ গলায় আমায় বললেন, “আমার স্বামীরও এরকম রিফ্লাক্স আর পেটে ব্যথা হত। কিন্তু তিনি অনেক বলা সত্ত্বেও কোনদিন জিপির কাছে যাননি। শেষ পর্য্যন্ত তিনি মারা গেলেন!”
“হে ভগবান,” সমবেদনায় গলা কিছুটা ভারী হয়ে এলো আমার। “কি হয়েছিল ওনার? পেটে আলসার?”
ভদ্রমহিলা বললেন, “না ওনার হার্টের সমস্যা ছিল, জি পি র কাছে গেলে ধরা পড়তো। কিন্তু গেলেন না কিছুতেই। আপনি কিন্তু গিয়ে একবার পরীক্ষা করিয়ে নেবেন।“
ওষূধের প্যাকেট আর টাকার চেঞ্জ টা নিয়ে বেরিয়ে আসছি, দরজার কাছে পিছন থেকে ভদ্রমহিলা আবার কিছুটা অনুনয়ের গালায় বলে উঠলেন, “Promise me you will go and see a GP”!
ফার্মেসীতে গিয়ে ওষুধ কেনার সময় এরকম আন্তরিক সমবেদনা তো পাইনি কোনদিন, তাই সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা আজও ভুলতে পারিনি। বাড়ী ফেরার পথে কেমন যেন একটু আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম, সে কথা মনে পড়ে।
লন্ডনে আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে গ্রীনিচ (Greenwich) জায়গাটা খুব বেশী দূরে নয়। লন্ডনে এলে এখনো দুই একবার গ্রীনিচে যাই, কেননা জায়গাটা বড় সুন্দর, খোলা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, প্রচুর বড় বড় গাছ সেখানে ছড়িয়ে আছে। আর আছে ফুলের বাগান সেখানে ছোট লেকে সাদা হাঁসেরা ভেসে বেড়ায়। তাছাড়া আছে কফি শপ, রেস্টুরেন্ট।
গ্রীনিচ অবশ্যই গ্রীনিচ মীন টাইম এর জন্যে বিখ্যাত, এখান দিয়েই চলে গেছে মেরিডিয়ান লাইন (zero ডিগ্রী longitude )। কিন্তু সেখানে Time keeping আর Astronomy সম্পর্কিত আরও অনেক প্রাচীন এবং বৈজ্ঞানিক আকর্ষণ আছে বিশেষ করে Royal Astronomical Observatory , Naval Museum, Planetarium, Cutty Sark, ইত্যাদি। সেগুলো আছে একটা টিলার ওপরে অনেকটা জায়গা নিয়ে। তার মধ্যে একটা বিশাল চত্বর, সেখানে মেরিডিয়ান লাইন আঁকা আর সেই লাইনের দুই পাশে নানা শহরের নাম (আর তাদের longitude ডিগ্রী – কতটা পূবে আর কতটা পশ্চিমে)।
গ্রীনিচে একটা hilltop viewing point আছে, যেখানে দাঁড়ালে দূরে নীচে দেখা যায় লন্ডন শহরের স্কাইলাইন, এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া টেম্স্ নদী আর তার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া Emirates রোপওয়ে আর তার পাশে O2 Mall এর বিশাল তাঁবুর মত সাদা hemispheric ছাউনী।
টিলার ওপর থেকে নীচে গ্রীনিচ শহরে যাবার রাস্তা আর সিঁড়ি নেমে গেছে। নীচে একটা বড় flea market বসে, তাছাড়া শহর টা বেশ ছবির মত নিরিবিলি আর সুন্দর। সেখানেও মাঝে মাঝে যাওয়া হয়।
গ্রীনিচ একদিনের ফ্যামিলি পিকনিকের পক্ষে আদর্শ জায়গা।
The Meridian Line
গ্রীনিচ এর ছবি
এই গল্পটা অবশ্য গ্রীনিচ বরোতে O2 মল নিয়ে। সেটা Observatory আর Museum থেকে কিছুটা দূরে।
O2 নামে এই দেশে একটা মোবাইল টেলিফোন নেটওয়ার্ক কোম্পানী আছে, এই মলটা তাদের নামে তৈরী। সেই মলের তাঁবুর মত hemispheric ছাউনীতে সিঁড়ি বেয়ে অনেক লোক ওপরে চলে যায়, নীচ থেকে তাদের দেখতে বেশ পিঁপড়ের মত লাগে। কম বয়েস হলে আমিও অনায়াসে ওপরে দৌড়ে উঠে যেতাম, কিন্তু এখন বয়েসটা বাদ সাধে।
O2 Mall এ অনেক কোম্পানীর ফ্যাকটরী আউটলেট আছে, যেখানে জামাকাপড় জুতো ইত্যাদি অনেক জিনিষপত্রের দাম অবিশ্বাস্য কম, এবার একদিন আমরা সস্তায় কেনাকাটা করার জন্যে সেখানে গিয়েছিলাম।
O2 mall এ গাড়ীতে গেলে নদী পার হবার জন্যে Blackwell Tunnel আছে, আর টিউবে গেলে জুবিলী লাইনে North Greenwich স্টেশনে নেমে নদীর ওপরে Emirates রোপওয়ে ধরে চলে যাওয়া যায়। রোপওয়ে তে আগে চড়া হয়েছে, এবার তাই নদীর নীচে টানেল পেরিয়ে গাড়ীতেই যাওয়া হলো।
কেনাকাটা সারা হলে মলের ভিতরে একটা ইটালিয়ায়ন রেস্টুরেন্ট – Frankie and Benny’s- এ খেতে ঢুকলাম আমরা। সেটা ছিল ২০২১ সাল, কোভিড এর জন্যে দোকান সব খোলা হলেও মল বেশ ফাঁকা, রেস্টুরেন্টও খালি।
আমাদের ওয়েটার ছেলেটি খুব প্রিয়দর্শন। ফর্সা, একমাথা কালো চুল, একটু গাবদু চেহারা হলেও তার চলাফেরায় বেশ একটা ক্ষিপ্র, চটপটে ভাব আছে। পরনে সাদা সার্টের ওপরে লাল রং এর একটা apron, কোম্পানীর ইউনিফর্ম হবে, ফর্সা রং এর সাথে তা দিব্বি মানিয়েছে। ছেলেটি বেশ হাসিখুসী, কথাবার্ত্তা বেশ ভদ্র, আর ইংরেজী ভাল বললেও তার কথাবার্তায় সেরকম কোন ব্রিটিশ accent নেই, চেহারা দেখে ইউরোপের কোন দেশের বলে মনে হয়। স্পেন বা ইটালী?
যাই হোক, খাবার অর্ডার দিয়ে আমরা নানা গল্প করে যাচ্ছি, ছেলেটি সব খাবার এক এক করে নিয়ে এসে নিখুঁত ভাবে আমাদের টেবিলে পরিবেশন করে গেলো।
তারপর হঠাৎ আমাদের অবাক করে সে বললো, “Please don’t mind my asking, but are you speaking in Bengali?”
অ্যাঁ , বলে কি?
একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে সে ইংরেজীতে বললো, “তোমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলে তো তাই শুনে মনে হলো~”
তুমি বাংলা জানো? ইংরেজীতেই জিজ্ঞেস করলাম আমি।
এবার সে একগাল হেসে বললো “একটু একটু!”
তারপরে তো অনেক গল্প হলো তার সাথে। ইংরেজীতেই।
সে নাকি কলকাতায় ও গিয়েছে বেশ কয়েকবার তার মামার কাছে। মামা ছিলেন তার মা’র আপন দাদা, বোন আর ভাগ্নে কে তিনি খুব ভালবাসতেন। তিনি ভাল বেহালা বাজাতেন, মুম্বাই থেকে কলকাতায় বেহালা বাজাতে কয়েকবার গিয়ে কলকাতা তাঁর এত ভাল লেগে যায় যে তিনি শেষ পর্য্যন্ত সেখানে থেকে যান। তোমরা হয়তো তাঁর নাম শুনেও থাকতে পারো।
ভি জি জোগের নাম জানবোনা? আমি তো হৈ হৈ করে উঠলাম। ওনার মত এত বড় শিল্পী, পদ্মভূষণ, সঙ্গীত নাটক আকাদেমী ইত্যাদি কত খেতাব আর পুরস্কার পেয়েছেন, তার ওপরে কলকাতার সাথে তাঁর গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক তো সবাই জানে। কলকাতা আর বাঙালী কে ভালবাসার সূত্রে তিনি তো আমাদেরও আত্মীয়।
ছেলেটির সাথে তারপর বেশ কিছুক্ষণ আলাপ জমে গেল আমাদের। ওর মা থাকেন পুণাতে। মারা যাবার আগে পর্য্যন্ত বোনের কাছে মামা আসতেন মাঝে মাঝে, মুম্বাই তে কাজে এলেই। ও নিজে কোন গান বাজনা জানেনা, তবে লতা মাসী আর আশা মাসীর গান ওর খুব ভালো লাগে, ওঁরা ওদের পুণার বাড়ীতে প্রায়ই আসতেন ওর ছোটবেলায়।
নদীর ধারে কাছেই গ্রীনিচের এক এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সে একাই থাকে। তবে একা হলেও লন্ডনে তার থাকতে ভালোই লাগছে, কয়েক বছর হলো তার মা আর বাবাও গত হয়েছেন, তাই দেশে ফেরার টান তার আর নেই।
বিল মিটিয়ে ছেলেটিকে অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম।।
লন্ডনের সাথে কলকাতার এই আশ্চর্য্য যোগাযোগের জন্যে গ্রীনিচের সেই দুপুরটার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
লন্ডনে আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে গ্রীনিচ (Greenwich) জায়গাটা খুব বেশী দূরে নয়। লন্ডনে এলে এখনো দুই একবার গ্রীনিচে যাই, কেননা জায়গাটা বড় সুন্দর, খোলা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, প্রচুর বড় বড় গাছ সেখানে ছড়িয়ে আছে। আর আছে ফুলের বাগান সেখানে ছোট লেকে সাদা হাঁসেরা ভেসে বেড়ায়। তাছাড়া আছে কফি শপ, রেস্টুরেন্ট।
গ্রীনিচ অবশ্যই গ্রীনিচ মীন টাইম এর জন্যে বিখ্যাত, এখান দিয়েই চলে গেছে মেরিডিয়ান লাইন (zero ডিগ্রী longitude )। কিন্তু সেখানে Time keeping আর Astronomy সম্পর্কিত আরও অনেক প্রাচীন এবং বৈজ্ঞানিক আকর্ষণ আছে বিশেষ করে Royal Astronomical Observatory , Naval Museum, Planetarium, Cutty Sark, ইত্যাদি। সেগুলো আছে একটা টিলার ওপরে অনেকটা জায়গা নিয়ে। তার মধ্যে একটা বিশাল চত্বর, সেখানে মেরিডিয়ান লাইন আঁকা আর সেই লাইনের দুই পাশে নানা শহরের নাম (আর তাদের longitude ডিগ্রী – কতটা পূবে আর কতটা পশ্চিমে)।
Meridian Line
গ্রীনিচে একটা hilltop viewing point আছে, যেখানে দাঁড়ালে দূরে নীচে দেখা যায় লন্ডন শহরের স্কাইলাইন, এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া টেম্স্ নদী আর তার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া Emirates রোপওয়ে আর তার পাশে O2 Mall এর বিশাল তাঁবুর মত সাদা hemispheric ছাউনী।
টিলার ওপর থেকে নীচে গ্রীনিচ শহরে যাবার রাস্তা আর সিঁড়ি নেমে গেছে। নীচে একটা বড় flea market বসে, তাছাড়া শহর টা বেশ ছবির মত নিরিবিলি আর সুন্দর। সেখানেও মাঝে মাঝে যাওয়া হয়।
গ্রীনিচ একদিনের ফ্যামিলি পিকনিকের পক্ষে আদর্শ জায়গা।
এই গল্পটা অবশ্য গ্রীনিচ বরোতে O2 মল নিয়ে। সেটা Observatory আর Museum থেকে কিছুটা দূরে।
O2 নামে এই দেশে একটা মোবাইল টেলিফোন নেটওয়ার্ক কোম্পানী আছে, এই মলটা তাদের নামে তৈরী। সেই মলের তাঁবুর মত hemispheric ছাউনীতে সিঁড়ি বেয়ে অনেক লোক ওপরে চলে যায়, নীচ থেকে তাদের দেখতে বেশ পিঁপড়ের মত লাগে। কম বয়েস হলে আমিও অনায়াসে ওপরে দৌড়ে উঠে যেতাম, কিন্তু এখন বয়েসটা বাদ সাধে।
O2 Mall এ অনেক কোম্পানীর ফ্যাকটরী আউটলেট আছে, যেখানে জামাকাপড় জুতো ইত্যাদি অনেক জিনিষপত্রের দাম অবিশ্বাস্য কম, এবার একদিন আমরা সস্তায় কেনাকাটা করার জন্যে সেখানে গিয়েছিলাম।
O2 mall এ গাড়ীতে গেলে নদী পার হবার জন্যে Blackwell Tunnel আছে, আর টিউবে গেলে জুবিলী লাইনে North Greenwich স্টেশনে নেমে নদীর ওপরে Emirates রোপওয়ে ধরে চলে যাওয়া যায়। রোপওয়ে তে আগে চড়া হয়েছে, এবার তাই নদীর নীচে টানেল পেরিয়ে গাড়ীতেই যাওয়া হলো।
কেনাকাটা সারা হলে মলের ভিতরে একটা ইটালিয়ায়ন রেস্টুরেন্ট – Frankie and Benny’s- এ খেতে ঢুকলাম আমরা। কোভিড এর জন্যে দোকান সব খোলা হলেও মল বেশ ফাঁকা, রেস্টুরেন্টও খালি।
আমাদের ওয়েটার ছেলেটি খুব প্রিয়দর্শন। ফর্সা, একমাথা কালো চুল, একটু গাবদু চেহারা হলেও তার চলাফেরায় বেশ একটা ক্ষিপ্র, চটপটে ভাব আছে। পরনে সাদা সার্টের ওপরে লাল রং এর একটা apron, কোম্পানীর ইউনিফর্ম হবে, ফর্সা রং এর সাথে তা দিব্বি মানিয়েছে। ছেলেটি বেশ হাসিখুসী, কথাবার্ত্তা বেশ ভদ্র, আর ইংরেজী ভাল বললেও তার কথাবার্তায় সেরকম কোন ব্রিটিশ accent নেই, চেহারা দেখে ইউরোপের কোন দেশের বলে মনে হয়। স্পেন বা ইটালী?
যাই হোক, খাবার অর্ডার দিয়ে আমরা নানা গল্প করে যাচ্ছি, ছেলেটি সব খাবার এক এক করে নিয়ে এসে নিখুঁত ভাবে আমাদের টেবিলে পরিবেশন করে গেলো।
তারপর হঠাৎ আমাদের অবাক করে সে বললো, “Please don’t mind my asking, but are you speaking in Bengali?”
অ্যাঁ , বলে কি?
একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে সে ইংরেজীতে বললো, “তোমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলে তো তাই শুনে মনে হলো~”
তুমি বাংলা জানো? ইংরেজীতেই জিজ্ঞেস করলাম আমি।
এবার সে একগাল হেসে বললো “একটু একটু!”
তারপরে তো অনেক গল্প হলো তার সাথে। ইংরেজীতেই।
সে নাকি কলকাতায় ও গিয়েছে বেশ কয়েকবার তার মামার কাছে। মামা ছিলেন তার মা’র আপন দাদা, বোন আর ভাগ্নে কে তিনি খুব ভালবাসতেন। তিনি ভাল বেহালা বাজাতেন, মুম্বাই থেকে কলকাতায় বেহালা বাজাতে কয়েকবার গিয়ে কলকাতা তাঁর এত ভাল লেগে যায় যে তিনি শেষ পর্য্যন্ত সেখানে থেকে যান। তোমরা হয়তো তাঁর নাম শুনেও থাকতে পারো।
ভি জি জোগের নাম জানবোনা? আমি তো হৈ হৈ করে উঠলাম। ওনার মত এত বড় শিল্পী, পদ্মভূষণ সঙ্গীত নাটক আকাদেমী ইত্যাদি কত খেতাব আর পুরস্কার পেয়েছেন, তার ওপরে কলকাতার সাথে তাঁর গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক তো সবাই জানে। কলকাতা আর বাঙালী কে ভালবাসার সূত্রে তিনি তো আমাদেরও আত্মীয়।
ছেলেটির সাথে তারপর বেশ কিছুক্ষণ আলাপ জমে গেল আমাদের। ওর মা থাকেন পুণাতে। মারা যাবার আগে পর্য্যন্ত বোনের কাছে মামা আসতেন মাঝে মাঝে, মুম্বাই তে কাজে এলেই। ও নিজে কোন গান বাজনা জানেনা, তবে লতা মাসী আর আশা মাসীর গান ওর খুব ভালো লাগে, ওঁরা ওদের পুণার বাড়ীতে প্রায়ই আসতেন ওর ছোটবেলায়।
নদীর ধারে কাছেই গ্রীনিচের এক এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সে একাই থাকে। তবে একা হলেও লন্ডনে তার থাকতে ভালোই লাগছে, কয়েক বছর হলো তার মা আর বাবাও গত হয়েছেন, তাই দেশে ফেরার টান তার আর নেই।
বিল মিটিয়ে ছেলেটিকে অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম।।
লন্ডনের সাথে কলকাতার এই আশ্চর্য্য যোগাযোগের জন্যে গ্রীনিচের সেই দুপুরটার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
আমার বাবা আমায় স্কুলে থাকতে কলকাতায় সাউথ ক্লাবে BLTA (Bengla Lawn tennis Association) এর টেনিস কোচিং ক্লাসে ভর্ত্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানে আমাদের খেলা শেখাতেন নরেশ কুমার আর আখতার আলি। পাশের কোর্টে প্র্যাক্টিস করতে দেখতাম জয়দীপ মুখার্জ্জি আর প্রেমজিৎ লালকে। সেই ১৯৬০ সালে তারা ভারতের দুই জন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন।
টেনিস এর প্রতি আমার মনে আকর্ষণ আর ভালবাসা জন্মায় সেই সময় থেকেই। বাবা নিজে খুব ভাল টেনিস খেলতেন সাউথ ক্লাবে মেম্বার ছিলেন, ওখানকার অনেকের সাথেই ওঁর ভাল আলাপ ছিল। সুমন্ত মিশ্র, অধীপ মুখার্জ্জী, হরিগোপাল দাশগুপ্ত দের সাথে প্রায়ই ক্লাবে বসে গল্প আর হাসি ঠাট্টা করতেন। তাছাড়া কাস্টমস ক্লাবে প্রতি রবিবার গিয়ে ওখানকার সবুজ লনে বন্ধুদের সাথে টেনিস খেলতেন। আমি কিছুটা টেনিস খেলতে শেখার পরে আমায় নিয়েও খেলেছেন।
আমাদের স্কুল জীবনে তো টিভি ছিলনা, BBC রেডিও ও পেতাম না। টেনিস এর খবর কাগজ পড়েই follow করতাম। রড লেভার, কেন রোজওয়াল, রয় ইমারসন, আমাদের রমানাথন কৃষ্ণণ। কে জিতলো কে হারলো সব খবর ছিল আমার নখদর্পণে।
এক বন্ধুর বাড়ীতে কালার টিভি তে প্রথম উইম্বল্ডন ফাইনাল দেখি সত্তরের দশকে। ম্যাকেনরো আর বর্গ। সেই সবুজ ঘাস, সেই সাদা পোষাকের খেলোয়াড়রা, সেই পরিবেশ, দেখে একেবারে মজে গিয়েছিলাম। তারপরে কত বছর কেটে গেছে, টি ভি তে উইম্বল্ডন ম্যাচ দেখা পারলে miss করিনি কখনো।
এতবার লন্ডন গেছি, কিন্তু উইম্বলডনের All England Lawn Tennis Club (AELTC) Ground এ কোনদিন খেলা দেখতে যাওয়া হয়নি।
এবছর আমার সেই আক্ষেপটা মিটলো।
আমার মেয়ে লটারীর টিকিট পেয়েছিল, সেন্টার কোর্টে দ্বিতীয় দিন। সেদিন সেখানে খেললো এঞ্জেলিকা কার্ব্বার, রজার ফেডারার আর সেরেনা উইলিয়ামস। একটার সময় খেলা শুরু, হিসেব করে দেখা গেল বাড়ী থেকে ক্লাবে পৌঁছতে ঘন্টা খানেক লাগবে।
বেলা দশটা নাগাদ ধীরেসুস্থে বেরোলাম। বাড়ীর কাছে Central line টিউব স্টেশন South Woodford, সেখান থেকে Stratford গিয়ে লাইন চেঞ্জ করে জুবিলী লাইন ধরে ওয়াটারলু স্টেশন। তারপর overland ট্রেণ ধরে উইম্বলডন। এখানে ঘড়ির কাঁটা ধরে ট্রেণ চলে, অতএব গন্তব্যে পৌঁছতে লাগলো ঠিক পঞ্চাশ মিনিট। সুন্দর আবহাওয়া এখন, বাইশ ডিগ্রী সেলশিয়াস। নীল আকাশ, সোনালী রোদ।
স্টেশনের বাইরে চারিদিকে অনেক বুথ, সেখানে ব্যাজ পরা volunteer রা সাহায্য করার জন্যে প্রস্তুত, তাদের কারুর হাতে tournament schedule, কারুর হাতে map, আর সবার মুখে হাসি।
স্টেশন থেকে All England Lawn Tennis Club (AELTC) Ground পর্য্যন্ত হেঁটে যেতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে, সামনেই ট্যাক্সির জন্যে লম্বা লাইন, সেখানে দাঁড়িয়ে গেলাম। গাড়ীতে পাঁচজনের সীট, আড়াই পাউন্ড এক এক জনের। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম।
স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে গাড়ীর জানলা দিয়ে উইম্বলডন শহর টা কে বেশ বর্ধিষ্ণু বলে মনে হলো। রাস্তার পাশে সাজানো গোছানো দোকানপাট, বুটিক, সেলন, রেস্টুরেন্ট।, কালো ট্যাক্সি আর লাল দোতলা বাস চলে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। Tournament চলছে বলেই বোধ হয় রাস্তায় অনেক মানুষের ভীড় ।
প্রথম দর্শনে উইম্বলডন শহর কে বেশ ভালোই লাগলো।
Club ground এ বারোটার মধ্যে পোঁছে গেলাম। ক্লাবের অনেক গুলো গেট। আমাদের গেট নাম্বার ১৩। অন্য এক গেটের সামনে দেখি বিরাট লাইন। সেটা হলো যাদের টিকিট নেই তাদের জন্যে। সকাল সকাল গেলে টিকিট পাওয়া যায় ছোট ছোট কোর্টের। একশো পাউন্ডের এর কাছাকাছি দাম। তাছাড়া পঁচিশ পাউন্ডে শুধু ভেতরে ঢোকার টিকিট ও আছে। Henman Hill এর সবুজ ঘাসে বসে বড় স্ক্রীনে ভাল খেলা দেখার সাথে সাথে family আর বন্ধুবান্ধব কে নিয়ে একটা পিকনিক ও হয়ে যায়।
আর বেলা যত এগোয় তত যারা খেলা দেখে চলে যায় তাদের টিকিট তারা ক্লাব কে দিয়ে যেতে পারে। সেই used ticket এর জন্যেও আলাদা কাউন্টার আছে। তার দাম পাঁচ পাউন্ড।
Security check এর পরে তেরো নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে জনসমুদ্র।
এত লোক?
সব কোর্ট মিলিয়ে শুনেছি এখানকার capacity বড় জোর চল্লিশ হাজার, Wembley বা আমাদের Eden Gardens এর তুলনায় কিছুই না। এদের মধ্যে একটা বড় অংশের কোর্টে যাবার টিকিট নেই, তারা এসেছে সেখানকার উৎসবের পরিবেশটা উপভোগ করতে। প্রত্যেকে খুব সাজগোজ করে এসেছে, ছেলেদের মাথায় ফেল্টের হ্যাট, হাতে চুরুট, মেয়েদের চোখে বাহারী সানগ্লাস।
ভীড়ের আর একটা কারণ ক্লাবের ভিতরে হাঁটার রাস্তা বেশী চওড়া নয় , কোর্ট গুলো অনেক জায়গা নিয়ে নিয়েছে।
আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে জায়গাটার সাথে পরিচিত হলাম। বিশাল সেন্টার কোর্ট, তার সামনে ফ্রেড পেরীর স্ট্যাচু। আমার মতো যারা টেনিস খেলেছে বা টেনিস খেলাটা কে ভালোবাসে, তাদের কাছে উইম্বলডন হলো একটি তীর্থক্ষেত্র। তাদের কাছে এই জায়গার aura ই আলাদা। বেশ বিহবল বোধ করছিলাম মনে মনে।
সামনেই শ্যাম্পেন, Pimms, Strawberry and cream, Pizza ইত্যাদির স্টল, সেখানে লম্বা লাইন। আমরা সেন্টার কোর্টের গেট সন্ধান করে জেনে নিয়ে কিছু ছবি তুলে লাইনে দাঁড়িয়ে স্যান্ডউইচ আর শ্যাম্পেন কিনে এক জায়গায় বসে খেয়ে নিলাম।
একটা বাজতে আর পনেরো মিনিট বাকি। এবার সীটে গিয়ে বসার সময় হয়েছে।
সেন্টার কোর্টের একদম ওপরে আমাদের সীট। গেট ৫১১। পাঁচ তলায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে দম বেরিয়ে গেল। বেশ সরু প্যাসেজ আর তুমুল ভীড়। ব্যাজ পরা Volunteer আর Security র লোকেরা চারিদিকে দাঁড়িয়ে।
৫১১ তে পোঁছে গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়লো নীচে বহু নীচে সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা কোর্ট, আর দর্শকে ঠাসা কোর্টের চারিদিক। ছাদ এর Cover খোলা, তাই রোদ এসে ভরিয়ে দিয়েছে সবুজ ঘাসের কোর্ট আর গ্যালারী।
অত ওপর থেকে বেশ লাগছিলো। Bird’s eye view যাকে বলে।
খেলা শুরু হলো কাঁটায় কাঁটায় একটায়, গত বছরের চ্যাম্পিয়ন Angelique Kerber আর Tatjana Maria নামে একজন অচেনা মেয়ের, দু’জনেই জার্মান। টি ভি তে যেরকম দেখি সবই একরকম, কেবল খুব ওপর থেকে দেখা বলে অন্যরকম লাগছে।
চারিদিক তাকিয়ে দেখছি এমন সময় হঠাৎ হাততালির শব্দ!
কি ব্যাপার?
দেখি দুজন প্লেয়ার মাঠে ঢুকছে, দর্শকরা প্রথা অনুযায়ী তাদের অভিবাদন জানাচ্ছে। তারপরে টস আর কিছুক্ষণ প্র্যাকটিস। আম্পায়ার “টাইম” বলার পরে ম্যাচ শুরু।
সারা জীবন এতগুলো বছর High Definition large screen colour TV তে টেনিস খেলা দেখেছি। সেখানে ক্যামেরার গুণে বাড়ীতে বসেই মনে হয় যেন কোর্ট সাইডে বসে খেলা দেখছি। সেই যেরকম সাঊথ ক্লাবের কাঠের গ্যালারীতে বসে সামনা সামনি জয়দীপ প্রেমজিত এর প্র্যাক্টিস ম্যাচ বা বা ডেভিস কাপে রয় ইমারসন রমানাথন কৃষ্ণন এর খেলা দেখতাম।
সেই অভিজ্ঞতার সাথে এত ওপর থেকে খেলা দেখার মধ্যে অনেক তফাত। তার ওপর আমাদের বাইনোকুলার ও নেই। থাকলেও কত সুবিধে হতো কে জানে।
কিন্তু আমি নিজেকে বোঝালাম আমি তো খেলা দেখতে আসিনি, আমি এসেছি এখানকার পরিবেশ দেখতে, Wimbledon Centre Court এ যে একদিন এসে খেলা দেখেছি এটাই কি যথেষ্ট নয়? আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কিছু আশা আকাঙ্খা থাকে, যা পূর্ণ না হলে মনের ভিতরে কেমন যেন একটা খেদ থেকে যায়।
এখন এতদিন পরে আমি এখানে। আজ যদি খেলা টা ভাল ভাবে নাও দেখতে পারি, এখানকার এই পরিবেশটা চুটিয়ে উপভোগ করে নিই।
ফার্স্ট রাউন্ডের খেলা তো একপেশে one sided হবে জানাই কথা, সেদিন কার্বার আর সেরেনা দু’জনেই সহজে স্ট্রেট সেটে জিতলো। রজার কিছুটা অবাক করে ফার্স্ট সেটটা হেরে পরের তিন সেটে উড়িয়ে দিলো তার প্রথম রাউন্ডের প্রতিযোগীকে।
রজার ফেডারার কে এখন ঘাসের কোর্টের সর্ব্বকালের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ টেনিস খেলোয়াড় বলা হয়, তার খেলা উইম্বলডন সেণ্টার কোর্টে বসে দেখছি ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। চার সেট খেলার জন্যে রজারের শিল্পসুষমা ভরা খেলার অনেক নিদর্শন দেখলাম।
খেলার মাঝে মাঝে খেলোয়াড় দের বিশ্রামের সময় দর্শকরা উঠে চলাফেরা করতে পারে, কিন্তু খেলা চলার সময় gallery তে কোন movement চলবেনা। বাইরে করিডরে যাবার দরজা আটকে দু’জন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে, ঢোকা বেরনো দুটোই বারণ।আমি একবার বাথরুমে যাবো বলে বাইরে বেরিয়ে আটকে গেলাম, দুটো গেম খেলা শেষ হবার পরে প্রহরীরা ভেতরে ঢুকতে দিলো। আমার সাথে অবশ্য বাইরে বহু লোক ছিল, সবাই ভিতরে ঢুকবে।
প্রতি খেলার পরে মিনিট পনেরো ব্রেক, তার মধ্যে বাইরে বেরিয়ে করিডর দিয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে toilet আর refreshment shop। দুই জায়গাতেই বিশাল লম্বা লাইন। রজারের খেলা শুরু হবার আগে আমরা Elderberry drink আর উইম্বলডনের বিখ্যাত Strawberry and cream কিনে নিয়ে এলাম। এবছর শুনেছিলাম উইম্বলডনে স্ট্রবেরী বেশী আমদানী হয়নি, যাও বা পাওয়া গেছে তাও তেমন সুবিধের নয়। আমাদের তো একেবারেই ভাল লাগলোনা। জঘন্য টক। তবু হাসিমুখেই খেলাম।
ফেডারার এর পরে সেদিনের শেষ ম্যাচ ছিল সেরেনার। সে প্রথম সেটটা জেতার পরে আমি সুভদ্রা আর পুপু কে বললাম তোমরা খেলা দ্যাখো, আমি একটু বাইরে বেরিয়ে জায়গাটা ঘুরে দেখে আসি।
টিকিটের সাথে Ticket holder’s guide নামে একটা booklet এসেছে, তাতে সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে লেখা, সেখানে সব কোর্টের ম্যাপ আঁকা আছে, সেই ম্যাপ দেখে দেখে ভীড়ের মধ্যে গা ভাসিয়ে ঘুরে বেড়ালাম কিছুক্ষণ। সব মিলিয়ে আঠেরোটা কোর্ট, তার মধ্যে সেন্টার কোর্ট আর এক নম্বর কোর্টের ছাদ আছে, তাদের মাঝখানে চৌদ্দ থেকে সতেরো নম্বর কোর্ট সেখানে সাধারণ কাঠের গ্যালারী। আমাদের সাউথ ক্লাবের মতই। সব কোর্টেই খেলা চলছে, তবে বাইরে থেকে খেলা দেখার উপায় নেই। ঘাসে বল বাউন্স করার অবিরাম শব্দ ভেসে আসছে বাতাসে। সব গ্যালারী ই লোকে ভর্ত্তি।
সতেরো নম্বর কোর্টের পরে হেনম্যান হিল, একটা সিঁড়ি উঠে গেছে তার পাশ দিয়ে। হেনম্যান হিলের সামনে বড় টিভিতে নাদালের খেলা দেখানো হচ্ছে, আর অন্য দিকে সিঁড়ির ওপাশে উঁচু আঠেরো নম্বর কোর্ট।সেই কোর্ট covered না হলেও অনেক উঁচু তে। এবং তার capacity ও বেশী।
হেনম্যান হিলে লোক গিজগিজ করছে, ঘাসের ওপরে বসে সবাই সামনে টিভিতে নাদালের খেলা দেখছে, একটা মেলার মত পরিবেশ। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। সবাই খুব সেজে গুজে এসেছে, বিশেষ করে মহিলাদের বেশভূষা দেখলে তাদের খুব upmarket বলে বোঝা যায়, উইম্বলডন হলো একটা বনেদী দের গার্ডেন পার্টি। আমি গরীব মধ্যবিত্ত সেখানে খানিকটা হলেও বেমানান।
সুভদ্রা আর পুপু বেরিয়ে আসার পর তিন জনে মিলে Souvenir shopping সেরে গিয়ে একটা open air cafe তে গিয়ে কফি নিয়ে বসলাম। তখন খেলা সব প্রায় শেষ, অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, তবু এত ভীড়, কফি শপে বসবার জায়গা পেতেই অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল।
উইম্বল্ডনে খুব সবুজ রং এর আধিক্য, green environment নিয়ে AELTC অনেক কাজও করছে। কোর্ট গুলো তো সবই চোখ জোড়ানো সবুজ ঘাসের, তাছাড়া হেনম্যান হিল এও যেন ঘাসের গালিচা পাতা। গ্যালারীর স্ট্যান্ড সব গাঢ় সবুজ আর সেন্টার কোর্ট বিল্ডিং এর দেয়ালেও চারিদিকে সবুজ রং।এর আগে নাকি ঘাস দিয়েই দেয়াল ঢাকা থাকতো, কিন্তু গরমে ঘাস শুকিয়ে যায় তাই এখন artificial grass..আমার চোখে অবশ্য বেশ underwhelming লাগলো।
গেট থেকে যখন বেরোলাম তখন সন্ধ্যা নামছে। স্টেশনে যাবার ট্যাক্সি পাবার জন্যে বিশাল লম্বা লাইন। সেই লাইনে দাঁড়িয়ে আলাপ হয়ে গেল একটি ভারতীয় পরিবারের সাথে, স্বামী স্ত্রী, তারা আমেরিকা থেকে এসেছে। তবে টেনিসের থেকে ক্রিকেটেই তাদের উৎসাহ বেশী। এখন ইংল্যান্ডে Limited Over ক্রিকেটের World Cup এর খেলা চলছে। তারা ক্রিকেটের ভক্ত, একটা সেমি ফাইনালের টিকিট পেয়েছে। ভারত এবার জিতবে world cup জিতবে নিশ্চয়। কি বলেন?
উইম্বলডনে টেনিস খেলা দেখতে এসে ক্রিকেট নিয়ে ওই দু’জনের সাথে আলোচনা করলাম ট্যাক্সি না আসা পর্য্যন্ত। এই ক্রিকেট পাগলদের পাল্লায় পড়ে শেষটা একটু anti climax এর মত হয়ে গেল।
সেবছর লর্ডসে পঞ্চাশ ওভার One day ক্রিকেট ফাইনাল আর উইম্বলডনে পুরুষদের টেনিস ফাইনাল এই দুটো ম্যাচ এক দিনে প্রায় এক সাথে খেলা হয়েছিল। এবং দুটোই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ। ইংল্যান্ড ক্রিকেটে হারিয়েছিল নিউজিল্যান্ডকে আর টেনিসে নোভাকের কাছে পাঁচ সেটের ম্যাচে হেরে গিয়েছিল রজার। দুটো ম্যাচেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল, শেষে দুটোই টাই ব্রেক পর্য্যন্ত গড়ায়। আমি বাড়ীতে বসে টিভি চ্যানেল ঘন ঘন পালটে সেই দুটো খেলাই দেখেছি সেদিন।
তবে সত্যি বলতে কি উইম্বলডনে ওই পাঁচ তলার ওপর থেকে খেলা দেখার থেকে বাড়ীতে আরাম করে টিভির সামনে বসে খেলা দেখার কোন তুলনাই হয়না। প্রথমতঃ সেখানে কোর্টের সামনের সীটে বসে খেলা দেখার টিকিটের দাম আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভাগ্যে লটারীর শিকে ছিঁড়লে যা বুঝলাম ওই ওপর থেকেই খেলা দেখতে হবে। আর বাড়ীতে বসে টিভিতে High resolution ক্যামেরার সৌজন্যে আমি ওই সামনে বসে থাকা গ্যালারীর দর্শকদের থেকেও অনেক বেশী কাছ থেকে খেলা দেখছি বলে মনে হয়। খেলোয়াড়দের যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে, তাদের মুখের অভিব্যক্তি – ব্যর্থতার গ্লানি কিংবা সাফল্যের আনন্দ – স্পিনে বল কেমন ঘুরছে, ঘাসে বল পড়লে ধূলো উড়ছে, এই সব পরিস্কার দেখতে পাই।
আমি আর উইম্বলডন যাচ্ছিনা। একবার গিয়ে দেখে নিলাম, ব্যাস, আমার বাকেট লিস্টে টিক্ পড়ে গেছে। ওই বিখ্যাত স্ট্রবেরী আর ক্রীম খাবার কোন ইচ্ছেও আমার আর নেই। বডড টক!
মানস(সেন) আর আমি খড়্গপুরে পাঁচ বছর সহপাঠী ছিলাম। মানস আর তার বৌ কেয়া এখন থাকে লন্ডনে, আমি সেখানে এক মাসের জন্যে গেছি পুপুর কাছে। ১৯৬৮ সালে খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরে আমাদের আর দেখা হয়নি।
আমরা দুজনে লন্ডনের দুই প্রান্তে থাকি, পুপুদের বাড়ী East London এর South Woodford এ আর মানস আর কেয়া দুজনে থাকে West London এর Harrow তে তাদের ফ্ল্যাটে।
মানসের সাথে ফোনে কথা বলে ঠিক করলাম আমরা সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে বন্ড স্ট্রীট টিউব স্টেশনে দেখা করবো Boot’s এর সামনে। ঠিক এগারোটায় পৌঁছে দেখি ওরা দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। মানস কে চিনতে কোন অসুবিধেই হলোনা, প্রায় আগের মতই আছে, দু’জনে দু’জন কে জড়িয়ে ধরলাম।
মানস বলল তোদের আসতে কতক্ষণ লাগলো? আমি বললাম এক ঘন্টা, ঠিক দশটায় বেরিয়েছি। মানস বলল দশটায় আমরা already এখানে!কেয়া বললো দেখুন না এই মানুষটা কে আমায় রোজ ঠেলে বের করতে হয়, আজ নিজেই ভোর বেলা উঠে আমায় তাড়া দিচ্ছে।
জুন মাস পড়ে গেছে, তবু বাইরে বেশ ঠান্ডা, হিমের মত হাওয়া দিচ্ছে, আকাশ মেঘলা, মানস একটা বড় ওভারকোট পরে এসেছে, আমার গায়েও গরম জ্যাকেট। কিছু ছবি তোলা হল স্টেশন থেকে বেরিয়ে Oxford Street এ ভীড়ের রাস্তায়। তারপরে কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে আমাদের গল্প শুরু হলো। মানস বললো নে এবার শুরু কর্। খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরের দিন থেকে বল্ কি কি করলি। কিচ্ছু বাদ দিবিনা।
জীবনানন্দের সামনে মুখোমুখি বসিবার জন্যে ছিলেন বনলতা সেন। আমার ভাগ্যে মানস সেন।
পঞ্চাশ বছরের গল্প দুই ঘ্ন্টায় শেষ হয় নাকি? কি আর করি, সেই ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করতে হলো।
২
গল্পে গল্পে ওই সময়টুকু কি করে কেটে গেল টেরই পেলাম না।
মানসের জীবনপঞ্জী সংক্ষেপে জানলাম। রেজাল্ট বেরোবার আগেই Philips এর কলকাতা অফিসে চাকরী পায়। সেখানে তিন বছর কাজ করে ১৯৭১ এ বিয়ে, তারপরে ITC তে সাহারানপুর, হায়দ্রাবাদ। ITC থেকে ABT তে transfer এবং পৃথিবীর নানা জায়গায় কাজ, ইয়েমেন, দুবাই, নাইজিরিয়া। একমাত্র ছেলের দিল্লীতে সেন্ট স্টিফেন্স এ পড়াশোনা করে অক্সফোর্ড এ স্কলারশিপ পাওয়া।
দেশের বাইরে নানা জায়গায় কাজের অনেক অভিজ্ঞতা মানসের, সেই সব গল্প অনেক শোনালো সে আমায়। নাইজিরিয়া থেকে সাহারা মরুভূমিতে গিয়ে বর্ষার নদী দেখা, ইয়েমেন এ রেড সী তে গিয়ে মাছ ধরা আর সাঁতার কাটা ইত্যাদি।
রেড সী তে সাঁতার, সে তো দারুণ ব্যাপার, তুই ভাল সাঁতার কাটিস বুঝি, আমি জিজ্ঞেস করলাম। মানস কিছুটা বিনয়ের সাথে বললো ওই আর কি, স্কুলে থাকতে বেঙ্গল represent করেছি! Andersen Club এ Waterpolo খেলতাম।
বলে কি? খড়্গপুরে ওর এই গুণটা জানার সুযোগ পাইনি। আমাদের সময় তো কোন সুইমিং পুল ছিলনা।
আর বলিস না, মানস বললো, ওই পাঁচ বছর সাঁতার এর “জলাঞ্জলি”! বেশ মজার মজার কথা বলে এখনো মানস সেই আগের মতোই।
আমি কেয়া কে আমাদের সেই খড়্গপুরে প্রথম ইন্টারভিউ দিতে যাবার দিন নেতাজী অডিটোরিয়ামে আলাপ হবার গল্প করলাম। কি কি প্রশ্ন করতে পারে এই সব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে গরম জায়গা কোথায়? মানস কে তখন ও ভাল চিনিনা, সে বলে উঠলো উনুনের ভেতর~
কেয়া বললো আপনার এত দিন পরেও মনে আছে?
আমি বললাম মনে থাকবেনা কেন, আমার তো মনে হয় এই ক’দিন মাত্র আগে।
৩
মানসের সাথে রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে আমাদের দু’জনের জীবন নিয়ে নানা গল্পের মধ্যে ওর আর কেয়ার বিয়ের গল্পটা বেশ মজার।
ওদের বিয়ে হয় ১৯৭০ সালে। অর্থাৎ খড়গপুর থেকে পাশ করে বেরোনোর দুই বছরের মধ্যেই। ততদিনে সে Philips এর চাকরীতে সুপ্রতিষ্ঠিত, বালীগঞ্জে নিজেদের বাড়ী, ইতিমধ্যে একটা গাড়ীও কিনে ফেলেছে, ওই অল্প বয়সেই সে অতি সুপাত্র।
মানস কে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেয়ার সাথে তোর কি বিয়ের আগে আলাপ আর প্রেম ছিল, নাকি আমার আর সুভদ্রার মত তোরও arranged marriage? মানস বললো আমার জগবন্ধু স্কুলে এক বন্ধু ছিল তার নাম সূর্য্য, তার মা’র আবার আমায় খুব পছন্দ ছিল, আর তিনি ছিলেন তিনি ভীষণ dominating মহিলা বুঝলি, তিনি যেটা চাইতেন সেটা করেই ছাড়তেন। কেয়া হলো তাঁর বোনের মেয়ে, মানে সূর্য্যর মাসতুতো বোন, ওরা থাকতো পাটনায়।
সূর্য্যর মা আমার সাথে কেয়ার বিয়ে দেবেনই দেবেন, আমার মা’র সাথে তাঁর কথা হয়ে গেছে, মা’র ও কোন আপত্তি নেই, এদিকে আমি অবশ্য এসব কিছুই জানিনা।
সূর্য্যর বাবা পোর্ট ট্রাস্টে বড় কাজ করতেন, আলিপুরের ওদিকে গঙ্গার ধারে ওদের বিশাল বাড়ী, খেলার মাঠ। একদিন রবিবার আমাদের সেখানে খাবার নেমন্তন্ন, আমরা বন্ধুরা মিলে মাঠে জমিয়ে ক্রিকেট খেলছি, হঠাৎ মাসীমা নীচে নেমে এসে আমায় বললেন, এই মানস আমার বোনের মেয়ে কেয়া কে দেখেছিস তো, ওরা পাটনায় থাকে, ছুটিতে কয়েকদিনের জন্যে আমার কাছে বেড়াতে এসেছে, ওর খুব ইচ্ছে ন্যাশনাল লাইব্রেরী দেখার, তুই তোর গাড়ীতে করে একটু দেখিয়ে নিয়ে আয় না রে!
কিরকম ধুরন্ধর মহিলা বুঝেছিস তো?
আমি একটু অপাঙ্গে কেয়ার দিকে তাকালাম। তার মুখে মুচকি হাসি।
মানস বলতে থাকলো – আমি তখন ক্রিকেট খেলা নিয়ে ব্যস্ত, আমি বলে দিলাম, মাসীমা আমার ব্যাটিং এখনো বাকী, আমি এখন কাউকে নিয়ে কোথাও যেতে পারবোনা। তাছাড়া আজ রবিবার, ন্যাশনাল লাইব্রেরী তো বন্ধ, আজ তো দেখার কোন প্রশ্নই নেই। কিন্তু মাসীমা কে কে বোঝাবে? তিনি আমায় পাঠাবেনই।
মাসীমা বললেন তা হোক, তুই ওকে একটি লাইব্রেরীটা বাইরে থেকেই দেখিয়ে নিয়ে আয় বাবা…
কি আর করা ব্যাটিং মাথায় থাকলো আমি আমার বন্ধুদের বললাম তাহলে তোরাও চল্, গাড়ীতে ওঠ্। মাসীমা হাঁ হাঁ করে উঠে বললেন না না আর কেউ না, তোর ওই ছোট গাড়ীতে এত লোক আঁটবেনা তুই শুধু কেয়া কে নিয়ে যা…
আমি কেয়াকে বললাম তুমি এই আনরোমান্টিক লোকটাকে বিয়ে করলে কি বলে?
কেয়া আবার সেই মুচকি হাসি হেসে বলল আই আই টির ছেলেরা তো সবাই ওরকম ই হয়…
মানস বলল তো সে যাই হোক ঘুরে টুরে এসে তো ওপরে গেছি, হঠাৎ মা আর মাসীমার কথাবার্ত্তা কানে এলো। মা বলছেন দুজনের হাইট এও বেশ মানিয়েছে!
অ্যাঁ ? তার মানে? মানিয়েছে মানে কি?
আমি হো হো করে হেসে কেয়া কে বললাম আচ্ছা তুমি এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপার টা আগে থেকে জানতে নিশ্চয়?
গত উইকেন্ডে আমরা এখানে দিসুম (Dishoom) নামে একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম।
এই রেস্টুরেন্টটা লন্ডনে বেশ নাম করেছে, গত তিন চার বছরে অনেকগুলো ব্রাঞ্চ খুলেছে Covent Garden Kings Cross এবং আরো নানা জনপ্রিয় upmarket জায়গায়, শুনলাম শিগগিরি Edinburgh এও নাকি খুলবে। আমরা বাড়ির কাছে East London এ Shoreditch Dishoom এ গেলাম।
দিসুম আবার কি নাম? শুনলেই হিন্দী সিনেমার সেই নায়ক আর ভিলেন এর ঢিসুম ঢিসুম ঘুঁসোঘুঁসির কথা মনে পড়েনা ? গাড়ীতে যেতে যেতে আমি আমার নাতনীদের বললাম, “Be careful, the waiters may greet you with a punch on the nose~”
বড় নাতনীকে আজকাল ঠকানো যায়না, সে বললো, “You are joking, Dabhai!”
রেস্টুরেন্টে দেখলাম বেশ ভীড়, গমগম করছে লোক, waiter রা ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। আগে সীট বুক করে যাইনি তাই জায়গা পেতে একটু সময় লাগলো। নিজেদের টেবিলে বসে মেনু কার্ড টা পড়তে গিয়ে দেখি এরা পুরনো বোম্বাইয়ের হারিয়ে যাওয়া ইরানী কাফে কে আবার ফিরিয়ে আনতে চায়।
ইরানী কাফে?
নিমেষের মধ্যে ফিরে গেলাম ১৯৬৯ সালের বোম্বাইয়ে, Indian Oil Marketing Division এর Management trainee হয়ে সেখানে আমি আর সুমন্ত্র (ঘোষাল) তখন দু’জনে Santa Cruz East এর একটা ছোট হোটেলে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি।
ইরানী কাফের কথায় ছবির মত সেই দিনগুলো আবার ফিরে এলো আমার মনে।
কি সুন্দর শহর মনে হতো বোম্বাই কে তখন, কলকাতা দেখে অভ্যস্ত আমার চোখে মনে হত এ যেন এক বিদেশী শহর, পরিস্কার রাস্তাঘাট, শহরের মধ্যে দিয়ে রেললাইন চলে গেছে, স্টেশনে গেলে মনে হয় আমি পৌঁছলেই আমার জন্যে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে একটা ট্রেণ, বাস স্টপে লম্বা কিন্তু খুব disciplined queue, দাপুটে কন্ডাক্টর দের শাসনে বাসে গাদাগাদি ভীড় নেই, বাসের দোতলায় বসে আমরা বিনা পয়সায় দেখে নিই নীল সমুদ্র। অফিস ছুটির পরে কোনদিন ফ্লোরা ফাউন্টেন, কোন দিন চার্চ গেট। পেডার রোড কিংবা নেপিয়ান সী রোডে Zacaranda গাছগুলো ভরে থাকে নীল ফুলে। আর কি আশ্চর্য্য সুন্দর রাত্রে মেরিন ড্রাইভে আলোর মালা।
সম্প্রতি আমরা চাঁদে পা দিয়েছি, সারা পৃথিবীময় তাই নিয়ে দারুণ উত্তেজনা, বোম্বাইয়ের রাস্তায় নানা জায়গায় বিশাল বিলবোর্ডে চাঁদের মাটিতে Air India র মহারাজা আর নীল আর্মস্ট্রং এর সেই iconic বিজ্ঞাপন। রাজকীয় পোষাকে মহারাজা, মাথায় পাগড়ী, পায়ে শুঁড় তোলা নাগরা জুতো, চাঁদে স্পেসস্যুট পরা নীল – কে মাথা ঝুঁকিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা – Mr. Armstrong, I presume…
জুলাই মাসে বোম্বাই তে সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি। আমরা দু’জন ছাতা মাথায় রোজ সকালে কাছেই একটা ইরানী কাফে তে গিয়ে মাসকা বান আর চা খেয়ে 84 Ltd বাস ধরে Worli তে Indian Oil এর অফিস যাই। সুমন্ত্রর আবার একটু স্বাস্থ্য বাতিক, তাই সে মাসকা বানের সাথে একটা মর্ত্তমান কলাও খায়।
আর সেই শহরের নানা কোনায় রাস্তার মোড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এই সব ইরানী কাফে। ইরান থেকে আসা Zoroastrian immigrant দের তৈরী করা এই সব দোকানের একটা আলাদা look and feel ছিল, ঢুকলেই সেই বৈশিষ্ট্য আমার নজরে পড়ত, elegant distinguished and unique! Bentwood chairs, দেয়ালে লাগানো sepia family portraits, stained mirrors, মাথার ওপরে ঘটাংঘট করে আস্তে আস্তে ঘুরতো চার পাখার সিলিং ফ্যান। কত রকমের লোক এসে ভীড় জমাতো সেই সব কাফেতে, বড়লোক ব্যবসাদার, গরীব ট্যাক্সি ড্রাইভার, courting couples, budding writers, কলেজ যাবার পথে ছাত্র ছাত্রীরা। Smart brisk waiter রা সবাই ব্যস্ত ভাবে চারিদিকে ঘোরাঘুরি করত, পরিবেশ টা বেশ লাগতো আমার।
সেই বিগত বিস্মৃত বোম্বাই এর ইরানী কাফের পরিবেশ আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চায় দিশুম।
সুভদ্রা আর পুপু মেনু কার্ড দেখছে, এই সু্যোগে আমি আমাদের Waiter এর সাথে আলাপ জুড়ে দিলাম। এই আমার এক দোষ। রাস্তা ঘাটে অচেনা কোন মানুষ কে ভাল লেগে গেলে তার সাথে আলাপ করতে আমার বেশ লাগে। আমাদের Waiter ছেলেটি বেশ স্বাস্থ্যবান যুবক, সুঠাম চেহারা, চমৎকার ইংরেজী বললেও তার চেহারা দেখে বোঝা যায় যে সে British নয়। জিজ্ঞেস করে জানলাম তার দেশ হলো ব্রাজিল, রিওর কাছে এক শহরে তার বাড়ী। ব্যাস আমিও শুরু করে দিলাম, রিও কি সুন্দর জায়গা, তোমরা কি সুন্দর অলিম্পিক games organize করলে, আমার খুব ইচ্ছে একদিন তোমাদের দেশটা ঘুরে আসবো ইত্যাদি। ছেলেটি দেখলাম অলিম্পিক নিয়ে তেমন উৎসাহী নয়, তাকে বেশ bitter শোনালো, সে বলল জানো তো আমাদের দেশটা গরীব, অলিম্পিক করতে গিয়ে এত টাকা বাজে খরচ করা হল~
ইতিমধ্যে সুভদ্রা’র মেনু দেখা শেষ, সে অর্ডার দেবে, কিন্তু আমি Waiter এর সাথে কথা বলেই যাচ্ছি। খেয়ালই নেই। সুভদ্রা আমার দিকে দেখি কঠিন দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে দেখে আমি থামলাম।
বেশ ভাল খাবার, service ও বেশ prompt, খেতে খেতে খেয়াল করছিলাম এক বেশ ভারী চেহারার দাড়িওয়ালা সাহেব এই টেবিলে ওই টেবিলে ঘুরে ঘুরে patron দের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন। মনে হলো তিনি বোধ হয় এই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার, কার কি রকম লাগছে তার খোঁজখবর করছেন।
খাওয়া হয়ে গেলে বিল মিটিয়ে বেরোচ্ছি, হঠাৎ সেই ম্যানেজার ভদ্রলোকের মুখোমুখি পড়ে গেলাম।
“Did you have a good meal sir?” বেশ amiable cheerful গলায় জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশ ভাল লাগলো, আপনি এখানকার ম্যানেজার বুঝি? বলে আমিও আলাপ জুড়ে দিলাম। তারপরে যেই বলেছি আমি পুরনো বোম্বাই তে ইরানী কাফে তে একসময় যেতাম, তাঁর উৎসাহ আর দেখে কে, তাঁকে আর থামানোই গেলনা। এই দ্যাখো আমরা কি রকম সেই পুরনো পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি, দ্যাখো আমাদের মেঝে, আমাদের দেয়ালে টাঙ্গানো ছবি, দ্যাখো মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে, আমাদের ওয়েবসাইটে একবার যেও, সেখানে পুরনো দিনের ইরানী কাফের অনেক গল্প পাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাঁর সাথে কথা বলতে গিয়ে আটকে গেলাম বেশ কিছুক্ষণ।
ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে দেখি ওরা সবাই বাইরে গাড়ীতে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
কাজ থেকে অবসর নিয়ে লন্ডনে এসে ভেবেছিলাম এখন আমার স্বাধীন জীবন, লম্বা ছুটি, যা ইচ্ছে করে বেড়াবো, যেখানে ইচ্ছে যাবো, কি মজা!
লন্ডনে কত কি করার আছে, দেখার আছে…
কিন্তু ব্যাপারটা আদপেই তা হচ্ছেনা।
বিভূতিভুষণ মুখোপাধ্যায় এর বরযাত্রী তে একটা গল্প ছিল যেখানে গনশার দল নদীর ধারে একটা মেলায় ব্যাজ পরে ভলন্টিয়ারের কাজ করছে, কিন্তু কোন সেরকম বিপদ আপদ ঘটছেনা তাই তাদের কাজও নেই। হঠাৎ তারা দেখলো একটি ছোট মেয়ে নদীর ধারে চুপ করে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তারা গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে খুকী? কথায় কথায় জানা গেল, তার দিদিমা নদীতে স্নান করতে গেছে, অনেকক্ষণ হয়ে গেল, এখনো ফিরছেনা।
সর্ব্বনাশ, গনশা বললো এ তো জলে ডোবা কেস। তারা মেয়েটির কাছে রাজেন কে রেখে গেল পুলিশে খবর দিতে, এতক্ষণে একটা ভাল কাজ পাওয়া গেছে। ওদিকে রাজেন মেয়েটিকে মন ভোলাবার জন্যে যথাসাধ্য সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে।
“দিদিমার তো অনেক বয়েস হয়েছিল খুকী, আর দিদিমারা তো কারো চিরকাল থাকেনা!”
তার এই সান্ত্বনা শুনে মেয়েটা ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করে দিলো। এদিকে ওদের ঘিরে আস্তে আস্তে একটা ভীড় জড়ো হচ্ছে।
বিভূতিভুষণ লিখছেন, “ভীড়ের ভিতর হইতে একটি গ্রাম্য লোক মন্তব্য করিলো, দিদিমা আর কার লবযুবতী থাকে বাবু?”
—-
গল্পের সেই দিদিমার মত আমিও আর লবযুবক নই, এই কথাটা মাঝে মাঝেই খেয়াল হয় আজকাল।
লন্ডনের রাস্তায় বেরিয়ে লাল রং এর ফাঁকা দোতলা বাস গুলো দেখে বড্ড ইচ্ছে করে London Transport এর একটা All day card কিনে এক লাফ দিয়ে পাদানী তে উঠে পড়ি, তারপরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আরাম করে বসে চলন্ত বাস থেকে শহরের রাস্তাঘাট ঘরবাড়ী বাগান দোকানপাট দেখতে দেখতে যেদিকে দু’ চোখ যায় চলে যাই।
অথবা ওয়েম্বলী কিংবা এমিরেটস স্টেডিয়াম এ গিয়ে প্রিমিয়ার লীগে আর্সেনাল বা এভার্টন এর ফুটবল খেলা দেখে আসি। লর্ডস বা ওভাল এ ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর সাথে ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেট খেলা হচ্ছে, এক রবিবার সারাদিন কাটিয়ে আসতে খুব ইচ্ছে করে।
Garrick Theatre এ John Osborne এর The Entertainers এ Sir Kenneth Branagh অভিনয় করছেন, তাঁর অভিনয় দেখার জন্যে সব টিকিট এক মাস আগে থেকে বিক্রী হয়ে যায়, এক বৃষ্টি ভেজা বিকেলে ইচ্ছে করে ছাতা মাথায় গিয়ে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। কিংবা South Bank এ Globe এ Theatre Repertory র King Lear হচ্ছে, Shakespeare এর শহরে এসে এই সু্যোগ কি ছাড়া উচিত?
কিন্তু সে সব আর কিছুই হবার নয়। এই সব ইচ্ছে শেষ পর্য্যন্ত অপূর্ণই থেকে যায়।
কম বয়সের সেই বেপরোয়া লাগামহীন স্বাধীন জীবন আমি হারিয়েছি।
লন্ডন Underground ট্রেণে উঠে ভীড়ের মধ্যে আমায় দেখে তরুণ যুবক যুবতীরা আমায় তাদের সীট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, আমার বেশ অস্বস্তি হয়। বলতে ইচ্ছে করে আরে না না আমি তত কিছু বুড়ো হইনি, তোমরা বোসো, আমি ঠিক আছি। কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত বসতেই হয়। বহু Tourist attraction spot এ ভেতরে ঢোকার জন্যে টিকিট কাটার সময়ে আমায় দেখে কাউন্টার এর লোকেরা জিজ্ঞেস করে তুমি কি OAP?
প্রথম দিন আমি আমার মেয়ে (পুপু) কে জিজ্ঞেস করলাম, OAP মানে কি রে?
OAP মানে হল Old age pensioner, তার মানে আমার টিকিট লাগবেনা, অথবা half price…
মনে মনে এখনো লবযুবক হলে কি হবে, এখন বাইরের সবার চোখে আমি বেশ বুড়োই।
বিশেষ করে আমার দুই মেয়ের চোখে আমি এখন খুব fragile, এবার লন্ডনে এসে দেখছি পুপু আমার শরীর আর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ভীষণ চিন্তিত আর সাবধানী। প্রতি সপ্তাহে আমার প্রেশার চেক করছে, প্রেশার আর কোলেস্টরলের ওষুধ নিয়মিত খাচ্ছি কিনা খোঁজ নিচ্ছে। ভিটামিন ডি আর ক্যালসিয়াম এর ওষুধ কিনে দিচ্ছে। ওগুলো নাকি আমার এখন খাওয়া উচিত।
আর সবসময় উপদেশ। এটা করো। সেটা কোরোনা। কোথাও বেড়াতে গেলে স্যুটকেস তুলবেনা। পিঠে লেগে যাবে, আমি তুলছি। সিঁড়ি বা escalator দিয়ে ওঠানামা করার সময় হাতল ধরে থাকো। বাথরুমে পিছলে পড়ে যেওনা, সাবধান!
রোজ সকাল বেলা বাড়ীর কাছে একটা দোকানে খবরের কাগজ কিনতে যাই, আর বিকেলে বাড়ীর কাছে রাস্তায় একটু হেঁটে আসি, কিন্তু পুপু পারতপক্ষে আমায় একা ছাড়তে চায়না। আর আমার সাথে বেরোলে সবসময় তার শাসন শুনতে হবেই। ফাঁকা সরু রাস্তা, আমি অনায়াসে এক লাফে ক্রস করে যেতে পারি। হয়তো বহু দূরে একটা গাড়ী দেখা যাচ্ছে, যেই রাস্তায় পা রেখেছি, অমনি শুনতে হবে, আঃ বাবা, ফুটপাথ দিয়ে হাঁটো, গাড়ী আসছে, দেখছোনা?
এখন ছুটির দিনে আমি পার্কে গিয়ে বসে থাকি। মেয়ে আর নাতনীরা জগ্ করে, সাইকেল চালায়, সুভদ্রা হাঁটে, আর আমি চুপ করে একটা বই নিয়ে বেঞ্চে বসে থাকি। গা জোড়ানো ঠান্ডা বাতাস বয়, পিঠে অল্প রোদ এসে পড়ে, চারিদিকে বহু গাছ, সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ, শান্ত পরিবেশ, বেশ লাগে।
স্নেহ নিম্নগামী বলে একটা কথা আছে না? আমার মেয়েরা দু’জনেই এখন মা হয়েছে, আমিও কি এখন তাদের কাছে সন্তানের মতোই?
কি জানি।
কিন্তু সত্যি বলতে কি আমায় নিয়ে আমার মেয়েদের এই fussing আমার বেশ লাগে।
ওরা আমার লবযুবক না হবার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।
এর মধ্যে আমরা একদিন Whitechapel এ Spitalfields নামে একটা Street Market এ গিয়েছিলাম। লন্ডনের নানা জায়গায় এরকম অনেক Street Market আছে, Covent Garden, Greenwich, Notting Hill, এই সব মার্কেটে অনেক খাবার স্টল, লোকেরা বাইরে টেবিল চেয়ারে বসে খাচ্ছে, নানা দোকানের স্টল, সেখানে কেনাকাটা চলছে, সারা জায়গাটা গমগম করছে, যেন একটা উৎসবের পরিবেশ।
তো আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি, দোকানে দোকানে। কোথাও জামাকাপড়, কোথাও গয়নাগাঁটি। কোথাও পুরনো রেকর্ড, এক কি দুই পাউণ্ডে সেকেণ্ড হ্যান্ড বই। না কিনলে শুধু দেখেই চোখের বেশ সুখ হয়। একটা দোকানে দেখলাম অনেক মজার মজার poster টাঙানো। একটা তে লেখা “I do not need Google. My wife knows everything”, অন্য আর একটা তে বেড়াল কোলে একটা মেয়ের ছবি, তলায় লেখা “My husband said it is either the cat or me. I miss him sometimes…”
সুভদ্রা আর পুপু দরদাম করে কিছু কেনাকাটাও করছে, নাতনীদের জন্যে টপ, দীপের (জামাই) জন্যে টি শার্ট।
হঠাৎ একটা দোকানে দেখলাম সুন্দর ডিজাইনের Cosmetic jewellery – চেন আর লকেট – সাজিয়ে রাখা আছে, তা দেখে পুপুর খুব পছন্দ হয়ে গেল। দামও বেশী নয়, মাত্র পনেরো পাউন্ড। আমাদের সাধ্যের মধ্যে।
কিন্তু পুপু নিজের জন্যে কিনতে ইতস্ততঃ করছে দেখে আমি বললাম এটা আমি তোকে কিনে দেবো। বোধহয় আমি পুপুকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম, কিংবা কাঁধে হাত রেখেছিলাম, ঠিক মনে নেই, এই ধরণের public show of affection এ দেশে খুব normal…
দোকানের অল্পবয়েসী মেয়েটি (তাকে দেখে আর তার উচ্চারণ শুনে তাকে East European বলে মনে হয়) আমাদের হাসিমুখে লক্ষ্য করছিল, পুপু তাকে বলল আমার বাবা আমায় এই লকেটটা present করবে বলছে।
মেয়েটির হাসিমুখ অল্পের জন্যে যেন কিছুটা মেঘলা হয়ে গেল, আর তার চোখ দুটো যেন একটু ছলোছলো ! খুব ধরা গলায় সে বলল জানি, তোমার বাবা কে দেখে আমার নিজের বাবার কথা বড্ড মনে পড়ে যাচ্ছে ! তোমায় আমি পাঁচ পাউন্ড কমিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমায় দশ পাউন্ড দিও।
এ কি রে?
“না না, তা কি করে হয়” বলে আমরা খুব অপ্রস্তুত হয়ে আপত্তি জানালাম। কিন্তু মেয়েটি আমাদের কথায় কান দিলোনা, সে অবিচলিত।
শেষ পর্য্যন্ত তাকে দশ পাউন্ড দিয়ে পুপু বলল “Thank you, you are very kind…”