-
সেন্ট লরেন্স ১৯৬৩ ব্যাচ – স্বর্ণজয়ন্তী সভা – শনিবার ১১ই জানুয়ারী, ২০১৪

১ দীপঙ্করের ফোন
১৯৬৩ সালে হায়ার সেকেণ্ডারী পরীক্ষার পরে স্কুল ছেড়েছিলাম। তার পর পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেল! স্কুল ছাড়ার স্বর্ণজয়ন্তী উৎসব উদযাপন করতে আমরা স্কুলের বন্ধুরা জড়ো হচ্ছি দীপঙ্করের বাড়ী। শনিবার ১১ই জানুয়ারী, ২০১৪।
প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে যাওয়ায় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরেই ক্রমশঃ যোগাযোগ বেড়েছে। বেশ কয়েকজন বন্ধুর সাথে নিয়মিত ইমেল চালাচালি হয়, যারা কলকাতায় থাকে তারা মাঝে মাঝে এর ওর বাড়িতে বা ক্লাবে একটা সন্ধ্যা একসাথে কাটায়। যারা বিদেশে থাকে তারা ছুটিতে দেশে এলে দেখা করে।
কিন্তু আমাদের স্কুলের বন্ধুদের আনুষ্ঠানিক রি-ইউনিয়ন এই প্রথম।
প্রথম প্রস্তাবটা আসে প্রবীরের (ঘোষ) কাছ থেকে। তারপর প্রবীর, দীপঙ্কর (চ্যাটার্জ্জী), উৎপল (সোম), বিপ্লব (রায়) এবং আরো কয়েকজন একসাথে বসে দিনটা ঠিক করে আমাদের বাকিদের ইমেলে জানায়। শেষ পর্য্যন্ত প্রবীরদের উদ্যোগে আমাদের সহপাঠী দের একটা প্রাথমিক লিস্ট তৈরী হয়, সবার নাম ঠিকানা, ইমেল, টেলিফোন নম্বর একটা স্প্রেডশীটে ফেলে সবাইকে পাঠানো হয়।
আমাদের মধ্যে অনেক বন্ধুই এখন দেশের বাইরে থাকে – এদের মধ্যে যারা আসতে পারবেনা, তারা সবাই মেলে শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
এরা ছাড়াও আরও অনেক স্কুলের বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। এরা সব কোথায়? আজকের এই ইন্টারনেট আর ফেসবুকের যুগে তার লুকিয়ে আছে কি করে? এদের সাথে একদিন না একদিন ভবিষ্যতে যোগাযোগ হবেই, প্রবীরের ধারণা।
আমি ২০১৩ র ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কুয়েত থেকে কলকাতা পৌঁছে গেছি। পুরনো বন্ধুদের সাথে এত বছর পরে দেখা হবে ভাবতে বেশ ভালো লাগছে।
ঠিক এক সপ্তাহ আগে শনিবার ৪ঠা জানুয়ারী সকালে বাড়ীতে হঠাৎ এক ফোন। একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “মে আই স্পিক্ টু মিস্টার ভৌমিক?”
অবাক হলাম না, এই মেয়েটির ফোন আমি আগেও পেয়েছি। মেয়েটি হলো দীপঙ্করের সেক্রেটারী, এবং আমি বাঙ্গালী জেনেও কেন জানিনা সে ইংরেজীতেই আমার সাথে কথা বলে।
আমিও ইংরেজিতেই জবাব দিলাম। “ইয়েস, স্পিকিং”। মেয়েটি বললো “প্লিজ হোল্ড অন, মিস্টার দীপঙ্কর চ্যাটার্জ্জী উইল স্পিক টু ইউ।”
দীপঙ্কর হলো ওর অফিসের বিগ বস্, তাই ও নিজে কখনো ফোন করেনা।
কিছুক্ষণ ধরে থাকার পর ফোনের ওপার থেকে দীপঙ্করের মন্দ্র কন্ঠ ভেসে এলো।
“ইন্দ্রজিৎ!”
আর একটু হলেই বলতে যাচ্ছিলাম “ইয়েস স্যার”, কিন্তু শেষ মূহুর্ত্তে সামলে নিয়ে বললাম, “দীপঙ্কর! বলো কি খবর?”
দীপঙ্কর বেশী সময় নষ্ট করেনা, সোজা পয়েন্টে চলে আসে। সে বললো, “আজ সন্ধ্যায় আমার বাড়ীতে কে কে আসছে জানো?”
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “কে কে আসছে?”
দীপঙ্কর বললো, “প্রবীর ঘোষ, বিপ্লব রায়, উৎপল সোম, প্রদীপ ব্যানার্জ্জী আর অমিতাভ মল্লিক।”
আমি বললাম, “বাঃ, এ তো চাঁদের হাট~”
দীপঙ্কর বললো, “তুমিও চলে এসো।”
আমি একটু মিন মিন করে বলতে গেলাম আমি তো এগারো তারিখ আসছি, আজ বাড়ীতে মেয়ে জামাই আর দুই নাতনী আছে, আজ একটু অসুবিধে…কিন্তু দীপঙ্কর কোন কথাই শুনবেনা।
শেষ পর্য্যন্ত ঠিক হলো আমি এক ঘন্টার জন্যে যাবো।
তো চলে গেলাম।

২ প্রস্তুতি
জানুয়ারীর চার তারিখে সন্ধ্যায় দীপঙ্করের বাড়ী গিয়ে দেখি সবাই এসে গেছে, অনুষ্ঠান কোথায় হবে সেই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রবীর দেখি খুব চিন্তিত মুখে হাতে একটা ফোন নিয়ে এদিক ওদিক হেঁটে বেড়াচ্ছে। প্রবীরের চেহারাটা আগের মতোই আছে, ব্যাকব্রাশ চুল, ছিপছিপে, মাথার সামনেটা একটু ফাঁকা হতে শুরু করেছে।
প্রবীর, উৎপল আর অমিতাভর সাথে কলকাতায় এলে মাঝে মাঝে দেখা হয়েছে, কিন্তু বিপ্লব আর প্রদীপের সাথে সেই স্কুল ছাড়ার পরে এই প্রথম দেখা। পঞ্চাশ বছরের ব্যবধান, তবু আমাদের পরস্পর কে চিনতে কোন অসুবিধে হলোনা। সবাই সবাই কে জড়িয়ে ধরলাম। আগের মতোই তুই বলে সম্বোধন করলাম নিজেদের, খবরাখবর নিলাম, কে কোথায় আছে, কি করছে, ইত্যাদি। প্রদীপের মাথার চুল আমার মতোই সাদা, বিপ্লবের মাথায় বেশ বড় টাক। অমিতাভ আর উৎপল এর চেহারা তেমন পাল্টায়নি, অবশ্য ওদের সাথে তো মাঝে মাঝে দেখা হয়, তাই পাল্টালেও তেমন চোখে পড়েনা।
প্রবীরের হাতে একটা লম্বা লিস্ট, সে হিসেব করে বলে দিল ১১ তারিখ কতো জন আসবে। দীপঙ্করের বাড়ীর বাইরের ঘরটা বেশ বড় আর সাজানো, সেখানে আমাদের বসার জন্যে অনেক সোফা আর চেয়ার সাজানো আছে। তা ছাড়া তার ডাইনিং রুম টাও বেশ বড়, আর খাবার গরম করার জন্যে তার কিচেনেও যথেষ্ট জায়গা আছে।
কে কে আসছে আর কে কে আসতে পারবেনা সেই নিয়েও আলোচনা হলো। অনেকেই আসবে – যেমন অরুণাভ ঘোষ থাকে ইংল্যান্ডে – এখন ছুটিতে কলকাতায়, অজয়নাথ রায়, প্রদীপ ভট্টাচার্য্য, প্রদীপ সোম, সুবীর ঘোষ। বোধহয় ক্লাস নাইন বা টেনে ভাস্কর চ্যাটার্জ্জী আমাদের স্কুল থেকে ট্র্যান্সফার নিয়ে চলে যায়, শুনলাম ভাস্করও আসবে। এদের সাথে সেই স্কুল ছাড়ার পর আর আমার দেখা হয়নি। ওদের সাথে আবার দেখা হবে ভাবতেই বেশ ভাল লাগছিল। সেই সব পুরোনো মুখ আর হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা স্মৃতিতে ভেসে আসছিল।
আলোচনার মধ্যে দীপঙ্করের লোকেরা চা আর খাবার দাবার নিয়ে এলো। নানা ধরনের পদ, দীপঙ্কর সব বেঙ্গল ক্লাব থেকে আনিয়েছে।
গল্পে গল্পে কখন এক ঘন্টার জায়গায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে, ইচ্ছে না থাকলেও তাই উঠতেই হলো।
সামনের শনিবার ১১ই জানুয়ারী আবার দেখা হবে বলে উঠলাম।


রবীন নাগ অজয়নাথ রায়
৩ ১১ই জানুয়ারী, ২০১৪
দীপঙ্করের বাড়িতে সুভদ্রা আর আমি যখন পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে সাতটা। বেশী দেরী হয়নি ভেবেছিলাম, কিন্তু গিয়ে দেখি হাউসফুল, পার্টি শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। প্রবীর আমায় দেখে বললো, “একি হেরি, এত দেরী? আমি তো ভাবলাম তুই আর আসবিনা।”
দীপঙ্করের বিরাট হলঘর, বেশ গমগম করছে দেখলাম, পার্র্টি জমে উঠেছে, মেয়েরা সবাই সোফায় বসে গল্পে মশগুল, ছেলেরা গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আলাপে ব্যস্ত। গ্লাসের গায়ে বরফের ঠোকাঠুকির টুংটাং আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। দীপঙ্কর গৃহস্বামী, গোলগাল, মাথায় টাক, গালে আধপাকা দাড়ি, ট্রাউজার্স সার্ট আর ব্রেসে তাকে দেখতে বেশ সম্ভ্রান্ত লাগছে। অনেকটা Solzhenitsyn এর মত। সে দেখি কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার স্টাইলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর কারুর প্লেট বা গ্লাস ফাঁকা দেখলেই তাদের নাও নাও বলে যারপরনাই ব্যতিব্যস্ত করছে।
সেদিন আমার শরীর টা ভাল ছিলনা, সর্দ্দি জ্বর, ক্রোসিন খাচ্ছি সকাল থেকে, কিন্তু দীপঙ্কর কিছুতেই ছাড়বেনা, আরে খাও খাও বলে সে আমায় একটা সিঙ্গল্ মল্টের এর গ্লাস ধরিয়ে দিল।
চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, অনেক অচেনা অল্পচেনা প্রৌঢ় মুখ। এরা কি তারাই, যাদের সাথে শৈশব আর কৈশোরের কমবেশী দশ বছর একসাথে কাটিয়েছি আমি? ভাল করে তাকিয়ে সেই কিশোর মুখগুলো চিনে নেবার চেষ্টা করলাম। কঠিন কাজ। সেই কিশোরেরা তো আজ আর কেউ নেই, সবাই হারিয়ে গেছে, জীবনের সেই দিনগুলোর মতোই। আর তাদের সাথে হারিয়ে গেছি সেই ছোটবেলার আমিও।
এখন যাদের আমার চারিপাশে দেখছি তার সবাই প্রাজ্ঞ, প্রবীণ, কারুর মাথায় টাক, কারুর ভুঁড়ি, কারুর মাথাভর্ত্তি পাকা চুল। স্কুলজীবনের সেই হাফপ্যাণ্ট পরা হাসিখুসী উচ্ছল ছেলেগুলো কোথায় গেল? তারা আজ কেউ হাইকোর্টের বিচারক বা উচ্চপদস্থ সরকারী আমলা, কেউ লব্ধপ্রতিষ্ঠ ইঞ্জিনীয়ার, আবার কেউ সফল ব্যবসায়ী।
এদের আমি চিনিনা।
জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত, ওঠা পড়া, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছি আমরা। এখন আমাদের জীবন ঘিরে আছে নতুন আপনজনেরা, স্ত্রী, পুত্র কন্যা, নাতি, নাতনী, নতুন বন্ধু, সহযোগী, সতীর্থ। পুরনো বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা অনেকটা দূরে সরে গেছি এই পঞ্চাশ বছরে।
তা হোক, তবু কবির ভাষায় “পুরানো সেই দিনের কথা, সেই কি ভোলা যায়?”
ভোলা যায়না।
মনের মধ্যে সেই স্কুলের ক্লাসরুম, বারান্দা, বিশাল সবুজ মাঠ, মাঠের দক্ষিণ দিকে তেঁতুল আর পলাশ গাছ, সেই পুকুর আর বাঁধাকপির ক্ষেত, সেই চুড়োনওয়ালা, টিফিন পিরিয়ডের ছুটোছুটি, হাসাহাসি, কলরব, আর সেই সময়ের সহপাঠী আর শিক্ষকদের মুখ সব একসাথে ফিরে এল। অনেকটা যেন reverse osmosis process ব্যবহার করে পঞ্চাশ বছরের ব্যবধান পেরিয়ে পিছিয়ে গেলাম সেই দিনগুলোতে।
নিবিড় সুখে, মধুর দুখে, জড়িত ছিল সেই দিন/
দুই তারে জীবনের বাঁধা ছিল বীণ/


২০১৮ সাল
৪ নতুন করে সবার সাথে আলাপ
আমার প্রথম কাজ হল ঘুরে ঘুরে করে সবার সাথে দেখা করা এবং বিশেষ করে অচেনা বন্ধুপত্নী দের সাথে আলাপ করা। তাঁরা সবাই দেখলাম বেশ জমিয়ে গল্প করছেন সোফায় বসে, তাদের মধ্যে কারুর কারুর আজই হয়তো প্রথম দেখা, কিন্তু দেখে কে বলবে? মনে হয় যেন ওদের বহু দিনের বন্ধুত্ব! সুভদ্রার সাথে একমাত্র অমিতাভর বৌ সুজাতার আলাপ ছিল, আমি এক এক করে অন্য সবার সাথে ওর আলাপ করিয়ে দিলাম।
অরুণাভ ঘোষ কে দেখে চিনতে পারিনি, স্কুলে এক মাথা কোঁকড়া চুল আর বেশ কোমল তারুণ্যে ভরা মুখ ছিল ওর, সব সময় মজার মজার কথা বলে হাসাতো আমাদের। এখন তার মাথায় মোড়ানো চুল, মুখশ্রীতে সেই লাবণ্য আর নেই। তার জায়গায় বাসা বেঁধেছে একটা বয়সোচিত গাম্ভীর্য্য। ও এখন UK তে থাকে, এবার সাথে তার বৌ নেই, সে একাই এসেছে দেশে।
তার পাশে সুবীর ঘোষ, ছোটখাট চেহারা, আগের মতোই অবিকল, চিনতে কোন অসুবিধে হয়নি। স্যুট টাই পরে সুবীর খুব ফর্মাল, যাকে বলে একেবারে টিপটপ, ফিটফাট। চুপচাপ, মুখে স্মিত হাসি। সেও একা এসেছে। স্যুট টাই কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সুবীর বলল, “আজকের অনুষ্ঠানের একটা মর্য্যাদা আছে তো, নাকি?”
আর রবীন নাগ, সে থাকে দিল্লীতে। এখন সে কিঞ্চিৎ অসুস্থ। সেও আজ একা এসেছে। একসময় দারুণ ফুটবল খেলতো রবীন, আমরা একসাথে প্রচুর বল পিটিয়েছি স্কুলে থাকতে এবং পরে আই আই টি খড়্গপুরে । নীল চোখ আর সোনালী চুল, স্কুলে থাকতে রবীন ছিল আমাদের পোস্টার বয়। আজকের রবীন কে দেখলে সেই ছোটবেলার রবীনকে একটু একটু মনে পড়ে।
উৎপল আর প্রদীপ সোম দুই ভাই, এদের স্ত্রীরা পাশাপাশি বসে আছে, তাদের নাম চিত্রা আর ভারতী। তাদের সাথে গিয়ে আলাপ করলাম। উৎপল দেখি খুব ব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু প্রদীপ চুপ করে সোফায় বসে। স্কুলেও দুই ভাই এর স্বভাবে একটা পার্থক্য ছিল মনে আছে, উৎপল হাসিখুসী, চঞ্চল, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, ওদিকে প্রদীপ একটু ছোটখাটো, দুর্ব্বল, চুপচাপ। প্রদীপের বৌ ভারতী বলল, “দেখুন না খুব বড় একটা অসুখ থেকে উঠল, এত করে বললাম যেও না, কিন্তু কথা শুনলোনা, বললো পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করবোনা, কি যে বলো?”
প্রবীরের বৌ সুপ্রিয়া আর পৃথ্বীরাজ এর বৌ অনিন্দিতা দেখি পাশাপাশি বসে খুব গল্প করছে, এদের দুজনের আগেই আলাপ ছিল বোধ হয়। সুপ্রিয়া খুব সপ্রতিভ, তাকে আমি বললাম “আপনাদের বিয়ে তে আমি মাধব লেনের বাড়িতে গিয়েছিলাম”। সুপ্রিয়া বলল “বাড়িটার বয়স একশো বছর হয়ে গেল, জানেন? আমার এখন বম্বে থেকে কলকাতায় এলে ওখানেই থাকি, আসুন না একদিন?”
বহুদিন আগে, তখন আমাদের সবে বিয়ে হয়েছে, পৃথ্বীরাজরা থাকত যোধপুর পার্কে আর তাদের বাড়ীর ঠিকানা ছিল M Jodhpur Park। ঠিকানাটা অদ্ভুত, তাই এখনও মনে আছে। সেই বাড়ীতে একটা বিরাট ছাত ছিল। পৃথ্বীরাজ ম্যানিলা তে AIM এ পড়তে যাবার আগে একদিন সুভদ্রা আর আমি আর অন্য কয়েকজন বন্ধু সেই বাড়িতে ওদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেই স্মৃতিচারণ করলাম ওদের সাথে। পৃথ্বীরাজ অবিকল আগের মত আছে, বুড়িয়ে যায়নি, বেশ সুন্দর স্বাস্থ্য, চুল কালো, আগের মতোই চুপচাপ। মুখে হাসি।
এবার দেখা হলো এক অচেনা ভদ্রলোকের সাথে, ইনি আবার কে? চেনা যাচ্ছেনা তো? বেশ অভিজাত বনেদী চেহারা, একটা নীল পুলোভার আর ট্রাউজার্স এ বেশ মানিয়েছে, মাথাজোড়া টাক, চোখে একটা বাহারী চশমা, প্রফেসর প্রফেসর লাগছে। পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন আমার নাম প্রদীপ ভট্টাচার্য্য, আমি ছিলাম বি সেকশনে। অর্থাৎ যাদের বাংলার জায়গায় হিন্দী ছিল ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ।
ও হরি, প্রদীপ, তুমি?
আমাদের ক্লাসের তিন জন প্রদীপ সেদিন উপস্থিত। সোম, ব্যানার্জ্জী, ভট্টাচার্য্য। প্রদীপ মিত্র প্রদীপ রাও, প্রদীপ চক্রবর্ত্তী আর প্রদীপ সেন আসেনি, ওদের নিয়ে আমাদের ক্লাসে সাতজন প্রদীপ ছিল।
আমরা ছিলাম যাকে বলে প্রদীপের আলোয় আলোকিত।
প্রদীপ ভট্টাচার্য্য বি সেকশনে (হিন্দী) পড়লেও আমাদের অনেক কমন ক্লাস থাকত, আর টিফিন আর লাঞ্চ এর ব্রেকে তো একসাথেই মিলে মিশে থাকতাম আমরা । সুতরাং প্রদীপকে ভোলার প্রশ্নই ওঠেনা। একটু গাবদু ছিল, আর খুব হাসিখুসী। শুনলাম ও IAS এ ছিল, এখন রিটায়ার করে মহাভারত নিয়ে রিসার্চ করে এবং বম্বে ইউনিভার্সিটি তে পার্ট টাইম পড়ায়।
সেদিন প্রদীপ ভট্টাচার্য্য বেশ একটা ভারিক্কী ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমাদের মধ্যে সেই একমাত্র IAS, আর সেই একমাত্র বি সেকশন। সুতরাং একটু পাঙ্গা নেবার অধিকার তার আছে।
স্মৃতি একটু ক্ষীণ বলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি হায়ার সেকেন্ডারী পর্য্যন্ত স্কুলে ছিলে না আগেই ট্র্যান্সফার নিয়ে চলে গিয়েছিলে?” তাই শুনে প্রদীপ আমার ওপর বেশ চটে গেল। পাশেই বসে ছিল ওর বৌ, তার কাছে আমায় টেনে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করে দিয়েই বললো ইন্দ্রজিৎ কি বলছে শোন। আমি নাকি…
আমি একটু অপ্রস্তুতের হাসি হাসলাম।
অজয় একটা ওয়াইন এর গ্লাস হাতে নানা মজার কথা বলছে আর খুব জোরে জোরে হাসছে। তার গালে বিরাট জুলফি, তাকে বেশ মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো দেখতে লাগছে। স্কুলে থাকতে অজয় বেশ লাজুক ছিল, আর কম কথা বলতো, কিন্তু এই বয়েসে এসে সে বেশ প্রগলভ, তার ওপরে সে এখন হাইকোর্টে বিচারক। নির্দ্বিধায় সে আমাদের একটার পর একটা আদিরসাত্মক জোক শুনিয়ে গেল। তার স্টক বেশ ভাল দেখলাম।
ভাস্কর কে দেখলাম বহু বছর পর, তার মাথা ভর্ত্তি সাদা চুল, বেশ রাশভারী চেহারা। সেই ক্লাস এইট বা নাইনের পরে আর দেখা নেই, যোগাযোগ ও নেই, কিন্তু দেখেই চিনলাম। এখনো ভাস্কর আগের মতোই হাসিখুসী, প্রাণবন্ত। ওর স্ত্রীর সাথেও আলাপ হলো। ওরা থাকে গুরগাঁও তে। প্রদীপ ব্যানার্জ্জী (বাঁড়ু) আর তার বৌ এসেছে USA থেকে। ভাস্করের সাথে সে যাদবপুরে পড়েছে, প্রতি বছর ওদেরও (মেকানিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং ক্লাসের) জানুয়ারী মাসে কলকাতায় রিউনিয়ন হয়, সেখানে সুভাষ মাধব, প্রদ্যোত, অরুনাভ সবাই আসে, তাই ওদের মধ্যে ভাল যোগাযোগ আছে দেখলাম।
বিপ্লব আর তার বৌ ডালিয়ার সাথে গল্প করছিলাম, এমন সময় পাশে প্রদীপ ভট্টাচার্য্য গ্লাস হাতে এসে দাঁড়ালো। আমি ডালিয়া কে বললাম, “আপনার স্বামীর স্কুলে পড়ার সময় মাথা ভর্ত্তি কালো চুল ছিল জানেন, আর ছিল বড় বড় নিষ্পাপ দুটি চোখ। ”
প্রদীপ পাশ থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো, “আঃ, নিষ্পাপ!”
আমি বললাম, “চোখ দুটো এখনো আগের মতোই আছে, কিন্তু মাথার চুল…”
বিপ্লব নীচু ক্লাস থেকেই পড়াশোনায় ভাল। ক্লাস থ্রি তে এন্টনী স্যার প্রতি সপ্তাহের শেষে আমাদের নানা রং এর কার্ড দিতেন, গোলাপী পেতো সবচেয়ে ভাল ছেলেরা, তারপর সবুজ, হলদে ইত্যাদি। আমি ডালিয়া কে বললাম, “বিপ্লব প্রত্যেক সপ্তাহে গোলাপী কার্ড পেতো, জানেন তো? আর আমরা ছিলাম হলদে সবুজ ওরাং ওটাং!”
বিপ্লব বললো “বল্ তো, একদম আমায় পাত্তা দেয়না।”
পাশ থেকে প্রদীপ আবার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো, “ঘর ঘর কি কাহানী!”
সবাই গল্পে মত্ত। প্রচুর ছবি তোলা হচ্ছে। আজকাল সেলফোনের ক্যামেরা দিয়ে বেশ ভাল ছবি তোলা যায়, আলাদা ক্যামেরার দরকার পড়েনা। আমি আমার ফোন দিয়ে বেশ কিছু ছবি তুলে ফেললাম। প্রবীর আজকের সন্ধ্যার প্রধান ব্যবস্থাপক, স্বভাবতঃই তার কাঁধে অনেক দায়িত্ব। সারাক্ষণই তাকে খুব ব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে, একবার এদিকে আর একবার ওদিকে। মাঝে মাঝে ছবি তোলার জন্যে কোন গ্রুপে বন্ধুদের কাঁধে হাত রেখে হাসিনুখে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
অজয় বললো, “প্রবীর আর দীপঙ্কর আজকের অনুষ্ঠানের অর্গানাইজার আর হোস্ট – ওদের দু’জনের সাথে সব মেয়েদের একটা ছবি তোলা হোক~”!
আমরা সবাই বললাম, খুব ভালো আইডিয়া! আমাদের বৌদের সবাই কে ডেকে ওদের দু’জন কে মাঝখানে রেখে ছবি তোলা হলো।
মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায়/
আবার দেখা যদি হলো সখা, প্রাণের মাঝে আয়/



২০২০ সাল
৫ মানুষ গড়ার কারিগর
আমাদের সময়ে ভাল স্কুল হিসেবে আমাদের স্কুলের বেশ সুনাম ছিল। হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় আমাদের স্কুলের রেজাল্ট খুব ভাল হতো। প্রায় প্রতি বছরই আমাদের স্কুল থেকে সারা বাংলায় প্রথম দশজনের মধ্যে একজন বা দু’জন থাকতোই। একদিকে যেমন স্কুলে একটা অনুশাসন আর শৃঙ্খলার পরিবেশ ছিল, অন্যদিকে তেমন আমাদের শিক্ষকেরা সবাই আমাদের সুশিক্ষার ব্যাপারে মনোযোগ দিতেন। অ্যানুয়াল আর হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা ছাড়াও বছরের প্রায় পুরোটাই প্রতি শুক্রবার আমাদের সাপ্তাহিক পরীক্ষা দিতে হতো। ফলে পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়া সম্ভব ছিলনা।
পড়াশোনা ছাড়াও, খেলাধূলাতেও আমাদের স্কুলের নাম ছিল। প্রথমেই বলতে হয় আমাদের স্কুলের সেই বিশাল সবুজ মাঠের কথা। কলকাতা শহরের বুকে ওই রকম বড় মাঠ আর কোন স্কুলে ছিল বলে আমার জানা নেই। ওই মাঠ ছিল আমাদের স্কুলের একটা বড় গর্ব্বের জায়গা। সেই মাঠে কত যে ফুটবল হকি ক্রিকেট খেলেছি আমরা! কলকাতার অন্য ক্রিশ্চিয়ান স্কুল যেমন সেন্ট পল্স্, সেন্ট জেভিয়ার্স্ ইত্যাদি তাদের ফুটবল টীম নিয়ে এসে আমাদের সাথে টূর্ণামেন্ট খেলতো।
পড়াশোনা ও খেলাধূলায় আমাদের স্কুলের এই সাফল্যের পিছনে আমাদের শিক্ষকদের অবদান একটা প্রধান কারণ ছিল, আমাদের আলাপে পুরনো দিনের কথার মধ্যে তাই অনেকটাই আমাদের স্কুলের শিক্ষকদের কথা চলে আসে।
কম বয়েসে নীচু ক্লাসে ছিলেন পুলিন স্যার, পাঞ্জা স্যার, খান স্যার, চৌধুরী স্যার, মন্ডল স্যার।
পুলিন স্যারের ব্যায়াম পুষ্ট চেহারাটা বেশ মনে পড়ে। তিনি ছিলেন আমাদের ড্রিল (Physical Education) টিচার। সপ্তাহে একদিন শেষ পিরিয়ডে মাঠে আমাদের ড্রিল হত, তাতে স্যার আমাদের নানা রকম ব্যায়াম আর কসরত শেখাতেন। আর কেউ কিছু না পারলে তার মাথায় হাল্কা করে একটা গাঁট্টা মারতেন। “পুলিন স্যারের গাঁট্টা, পয়সায় আটটা” নামে একটা ছড়া বেশ প্রচলিত ছিল তখন।
বছরে একদিন স্কুলের বিশাল সবুজ মাঠে Sports day হতো, আমাদের পরিবারের অনেকে আমাদের দৌড় ঝাঁপ এবং অন্যান্য কসরত দেখতে আসতেন। সেদিন দর্শকদের সামনে আমরা অনেক জিমন্যাস্টিক খেলা দেখাতাম। তার মধ্যে একটা আগুনের রিং এর মধ্যে দিয়ে ডিগবাজী দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে যাওয়া খেলাও ছিল, পুলিন স্যার সেটা আমাদের দিয়ে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই প্রচুর প্র্যাকটিস করাতেন।
ড্রয়িং শেখাতেন পাঞ্জা স্যার। ধুতি পাঞ্জাবী পরা রোগা পাতলা চেহারা, দুটো চোখে দুষ্টুমি ভরা হাসি, সব সময় খুব মজার মজার কথা বলতেন। খাইবার পাস আর বেলুচিস্থান নিয়ে তাঁর বিখ্যাত একটা গল্প ছিল। এক বিয়েবাড়ীতে এক নিমন্ত্রিত বরযাত্রী ভদ্রলোক খাবার ডাক পড়ায় তাড়াহুড়ো তে ভুল করে বাথরুমের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। একটি ফাজিল ছেলে তাকে ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে খাবার জায়গাটা দেখিয়ে দিয়ে বলে “এদিকে নয় স্যার, ওদিকে যান। এদিকটা হলো বেলুচিস্থান। ওদিকটা খাইবার পাস।”
ক্লাস ফাইভে ভূগোল পড়ানোর সময় মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে পাঞ্জা স্যার আমাদের বলেছিলেন “তোমরা বাড়িতে গিয়ে যখন মা’কে বলো, ‘মা, ভাত দাও’, তখন আর কিছু দিতে বলোনা কেননা ডাল তরকারী মাছ ওই সব খাবার ভাতের সাথেই আসে তোমরা জানো। ওদেশের ছেলেরা তাদের মা’দের কি বলে জানো?” আমরা কৌতূহলী হয়ে বলতাম, “কি বলে স্যার?” উনি হেসে বলতেন ওরা বলে “মা, খেজুর দাও!”
ঘটনাচক্রে আমি এখন এই মরুভূমির দেশেই থাকি। পাঞ্জা স্যারের ওই কথাটা এখনো ভুলিনি। খেজুর খাবার সময় ওঁর ওই কথাটা মনে পড়বেই। হাসি আর মজা করে বলা কথা এরকম মনে গেঁথে যায়।
খান স্যার আমাদের ইতিহাস পড়াতেন। সাধারণ দোহারা চেহারা, পরনে সাদা সার্ট আর ধুতি, কালো ফ্রেমের চশমার পিছনে উজ্জ্বল দুটো চোখ। ইতিহাস ছিল তাঁর passion । খান স্যার বড় ভালো পড়াতেন, আকবর, বীরবল, শিবাজী, আফজল খাঁ রা সবাই তাঁর পড়ানোর মধ্যে দিয়ে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠতেন। তিনি হলদিবাড়ী বা পানিপতের যুদ্ধের কথা পড়াবার সময় আমরা তলোয়ারের ঝনঝন আওয়াজ, আহত সৈনিকদের আর্তনাদ, ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাক যেন কানে শুনতে পেতাম। নিজেকে আমি মাঝে মাঝে নিজেকে সেই যুদ্ধের মধ্যে এক অনামী সৈনিক বলেও ভেবেছি।
খান স্যারের সবই ভালো ছিল, কেবল মাঝে মাঝে হঠাৎ আমরা পড়ায় মনোযোগ দিচ্ছি কিনা পরীক্ষা করার জন্যে দুমদাম প্রশ্ন করে বসতেন। একটু অমনোযোগী হলেই আমরা ঠিক ওনার কাছে ধরা পড়ে যেতাম।
তো একবার মনে পড়ে ক্লাসে বারো ভুইঁয়া দের সম্বন্ধে পড়াচ্ছেন খান স্যার। আমি সেদিন তৈরী হয়ে আসিনি, তাই খান স্যারের চোখের দিকে তাকাচ্ছি না, পাছে আমায় কোন প্রশ্ন করে বসেন। খান স্যার বুঝতে পেরে আমায় বললেন, “ইন্দ্রজিৎ, তুমি তো ভৌমিক, তাই না? তার মানে তুমি নিশ্চয় কোন বারো ভুঁইয়ার বংশধর। আচ্ছা, তুমি বলো তো…”সব্বোনাশ!
যা ভয় পাচ্ছিলাম, তাই!
ভৌমিক হয়ে জন্মাবার জন্যে বেশ দুঃখ হয়েছিল সেদিন। ঘোষ বোস মিত্র বা মুখুজ্যে বাঁড়ূজ্যে হলেও এই বিপদে পড়তে হতোনা আমায়।
উঁচু ক্লাসে ওঠার পরে নতুন বিষয় নিয়ে পড়াতে এলেন নতুন শিক্ষকেরা। মিত্র স্যার পড়াতেন ফিজিক্স, সুহাস স্যার কেমিস্ট্রী আর ভট্টাচার্য্য স্যার অঙ্ক। বাংলা পড়াতেন অমল সান্যাল স্যার, ইংরেজী ফাদার ভেটিকাড। আমরা খুব ভাগ্যবান ছিলাম শিক্ষক হিসেবে এঁদের পেয়ে।
নিউটনের Laws of motion পড়ানো হচ্ছে, তৃতীয় Law – “Every action has an equal and opposite reaction” শিখে সবাই সবার পিঠে আচমকা কিল বসিয়ে দিচ্ছি। “কি রে আমায় মারলি কেন?” বললে উত্তর আসছে “আরে তোর পিঠও তো আমার হাতে সমান ভাবে মেরেছে!”
আর ছিল ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি ল্যাব।
ফিজিক্স ল্যাবে পেন্ডূলাম ব্যবহার করে acceleration due to gravity (g) বের করতে হতো, উত্তরটা তো জানা 981cm/square second তাই কিছুটা কারিকুরি করে ৯৮১ তে পৌঁছে যাওয়া কঠিন ছিলোনা। তবে লেন্সের focal length কিংবা কেমিসট্রী ল্যাবে সল্ট বের করা অত সহজ ছিলনা। কপার সালফেটের রং সবুজ, তাই সেটাই সব চেয়ে সহজে ধরে ফেলতাম।
অন্যান্য বিষয়ের সাথে Moral Science নামে একটা সাবজেক্ট পড়ানো হতো আমাদের তাতে খ্রীশ্চান (রোমান ক্যাথলিক) ধর্মের নানা বাণী আর বাইবেল (Old and new Testaments, Gospels) থেকে নানা গল্প পড়াতেন আমাদের বিদেশী সাহেব শিক্ষকেরা, যাদের Father নামে ডাকা হতো। এঁদের বেশীর ভাগই আসতেন ইউরোপ থেকে, এবং স্কুলের একটা বাড়ীতেই তাঁদের থাকার আর খাওয়ার বন্দোবস্ত হতো। এঁদের মধ্যে কিছু ভারতীয় ফাদারও ছিলেন, যেমন ফাদার পিন্টো, ফাদার ডি’সুজা, ফাদার ডি সিলভা, ইত্যাদি। এঁদের সবার পোষাক ছিল সাদা আলখাল্লা।
যীশু খ্রীষ্টের জীবন গুলে খেতে হয়েছে সেই সময়। Old Testament এর অনেক গল্প মনে আছে এখনো। Return of the Prodigal son, The Good Samaritan ইত্যাদি এই সব গল্প এখনো মনে পড়ে।
আর মনে পড়ে আমাদের কিছু সহপাঠীদের কথা যারা আবাসিক (বোর্ডার) ছিল। তাদের জন্যে স্কুলে আলাদা থাকা খাওয়ার জায়গা ছিল। প্রধানতঃ গ্রামের দু;স্থ প্রান্তিক পরিবারের ছেলেদের ক্রীশ্চান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে তাদের স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এদের বেশীর ভাগ ছেলের ক্রীশ্চান নাম ছিল, আর পদবী ছিল গোম্স্।
আমাদের এই আবাসিক সহপাঠীরা পড়াশোনায় তেমন ভাল না হলেও অনেকেই খেলা ধূলায় খুব ভাল ছিল। ক্লাস শেষ হলে বিকেলে তারা অনেকেই আমাদের সাথে ফুটবল খেলতো। তার পর সন্ধ্যার ঘ্ন্টা বাজলেই তারা তাদের হোস্টেলে ফিরে যেত। ক্রীশ্চান ধর্মের কঠোর অনুশাসনের মধ্যে তাদের রাখা হতো বলেই এখন মনে হয়। অল্প বয়েসে মা বাবা আর পরিবারের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়া আর অন্য ধর্ম্মে ধর্মান্তরিত হওয়া তাদের মনে কি প্রভাব ফেলেছিল তা জানিনা, তবে তারা কমবেশী সবাই চুপচাপ মাথা নীচু করেই থাকতো। খেলার মাঠে অবশ্য তাদের অন্য রূপ।
একবার অঘোর শীল্ডের ফাইনাল খেলা হচ্ছে ঢাকুরিয়া লেকে, ন্যাশনাল হাই স্কুলের বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে আমরা জিতেছিলাম, সেন্টার ফরোয়ার্ড সাইমন গোম্স্ একাই তিন গোল করে হ্যাটট্রিক করেছিল। আমি সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে খেলা দেখেছিলাম। কি যে আনন্দ হয়েছিল! আর রাইট আউটে দারুণ খেলেছিল ক্ল্যারেন্স রডরিগ্স্ (ডাক নাম বাচ্চা), ক্ষিপ্র গতিতে বল নিয়ে ডান দিক থেকে তার উঠে আসা এখনও পরিস্কার চোখে ভাসে।
আমাদের ক্লাসে বোর্ডার সহপাঠীদের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল গোম্স্, সুনীল গোম্স্ আর ক্লিফোর্ড রডরিগ্স্ এর চেহারা গুলো এখনো ভুলিনি। কোথায় কেমন আছে আমাদের এই সহপাঠীরা এখন, তা কেই বা জানে?
তাছাড়া মনে পড়ে আমাদের বেশ কিছু সহপাঠীদের, যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে চিরদিনের জন্যে। তারাও ফিরে এলো আমাদের সেদিনের স্মৃতিচারণে। তাদের মধ্যে আছে হিতেন চক্রবর্ত্তী, বিনোদ কোহলী, নারায়ণ কৃষ্ণান, আর ললিত মোহন নন্দা।


২০২৩ সাল
৬ পঞ্চাশ আর ষাটের দশক
সেদিন স্কুলের পুরনো বন্ধুদের সাথে স্মৃতিরোমন্থন করতে করতে, পঞ্চাশের দশক যেন হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া যেন একটা অদৃশ্য জানলা খুলে মনের ভেতরে ঢুকে এলো।
আজকাল মাঝে মাঝে বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় স্কুল বিল্ডিং এর দিকে তাকিয়ে দেখি, বড় বড় জানলা, বিরাট বাড়ী, ভিতরে ক্লাস হচ্ছে, বাইরে সেই অর্জুন গাছগুলো পাতা ছড়িয়ে এখনো দাঁড়িয়ে। বহুদিন আগে আমি আর আমার এই সহপাঠীরা ওই ক্লাসরুমে বেঞ্চিতে বসতাম, বাইরে জানলা দিয়ে তাকালে অর্জুন গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যেত Army Camp এর স্কাইলাইন, স্যাররা পড়াতেন, ক্লাসে কোন আওয়াজ নেই, শুধু ফ্যান চলার শব্দ। আর টিফিনের ঘন্টা বাজলেই শুরু হতো ছুটোছুটি আর হুটোপাটি, কান ঝালাপালা করা আওয়াজ।
ক্লাস টু থেকে শুরু করে থ্রী ফোর, ফাইভ…। একটা করে বছর যায়, আমরা বড় হতে থাকি। প্রমোশন পেয়ে নতুন ক্লাসে উঠি, বছরের শুরুতে নতুন ক্লাসের বুক লিস্ট নিয়ে দোকান থেকে বই কিনে নিয়ে আসি। নতুন বইয়ের একটা আলাদা গন্ধ আছে, সেই সব নতুন বই পেয়ে সে কি উত্তেজনা আমাদের। কত নতুন কিছু শিখবো আমরা সামনের বছরে।
আমরা ভাল করে সেই বইদের মলাট দিয়ে ঢাকি। ভিতরে প্রথম পাতায় নিজেদের নাম লিখি। কেউ কেউ আবার ঠিকানাও লেখে। সেই ঠিকানা শুধু কলকাতা বা ভারতবর্ষের নয়। আমাদের কল্পনায় আমরা হলাম বিশ্বনাগরিক, মহাবিশ্বে আমাদের বাসস্থান।
Indrajit Bhowmick, Class 5, St Lawrence High School, 27,Ballygunje Circular Road, Kolkata 19, West Bengal, India, Asia, World, Solar System, Milky way, Universe – অনেকটা এই রকম।
বারোটা থেকে একটা এক ঘণ্টা লাঞ্চ ব্রেকের কিছুটা আগে থেকেই চিলরা আকাশে ভীড় করতো। ওদের sense of timing দেখে বেশ অবাক হতাম। আমার হাত থেকে বেশ কয়েকবার টিফিন কিছু বোঝার আগেই সোঁ করে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে চিল। কলকাতার আকাশ থেকে চিল এখন উধাও। তারা আর বোধ হয় আর টিফিন টাইমে স্কুলের আকাশে ভীড় করেনা।
আর এক ঘন্টা লাঞ্চ ব্রেকে প্রখর গ্রীষ্মেও মাঠে নেমে ফুটবল পেটাতাম আমরা, তার পর ঘেমে চুপচুপে হয়ে ভিজে ক্লাসে গিয়ে ক্লাসে বসতাম, ফ্যানের হাওয়ায় জামা শুকিয়ে যেত, এখন ভাবলে বেশ আশ্চর্য্য লাগে।
আর মনে পড়ে সকালে একা একা স্কুলে আসা আর বিকেলে স্কুল ছুটি হলে বন্ধুদের সাথে বাড়ী ফেরার কথা। তখন রিচি রোডের গেটটাই ব্যবহার করতাম আমরা। আমাদের স্কুল শুরু হতো সকাল দশটা চল্লিশে, তখন একা একাই হেঁটে আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ী থেকে ল্যান্সডাউন রোডে শিশুমঙ্গল হাসপাতাল ছাড়িয়ে হাজরা রোড ধরে ম্যাডক্স স্কোয়ার এর পাশ দিয়ে রিচি রোড ধরতাম। বিকেলে স্কুল ছুটি হতো বিকেল তিনটে বেজে চল্লিশ মিনিটে – বাড়ী ফেরার পথে সাথে কোন না কোন বন্ধু থাকতো।
কেমন ছিল আমাদের সেই পঞ্চাশ আর ষাটের দশকের কলকাতা?
বিকেলে হোসপাইপ দিয়ে জল দিয়ে রাস্তা ধুতো কর্পোরেশনের লোকেরা। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে আর দেয়ালে হোর্ডিং এ উত্তম সুচিত্রা রাজ কাপুর নার্গিস দিলীপ কুমার বৈজয়ন্তীমালা, দেব আনন্দ্ মধুবালাদের ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো থাকতো। মাইকে ভেসে আসতো তখনকার সময়ের জনপ্রিয় ফিল্মী হিন্দী আর বাংলা গান। রাস্তা দিয়ে রাজহাঁসের মত রাজকীয় চালে চলে যেতো ডাউস ঢাউস ঢাউস বিদেশী গাড়ী – শেভ্রোলে স্টুডিবেকার, প্লাইমাউথ, ডজ্, ইমপালা, অস্টিন, হিলম্যান, আর সাথে আমাদের দেশী গাড়ী – ল্যান্ডমাস্টার, ফিয়াট, স্ট্যান্ডার্ড হেরল্ড। আর ছিল লাল রং এর 2, 2B 8B আর দশ নম্বর দোতলা বাস। টুং টুং করে ঘন্টা বাজিয়ে পাশ দিয়ে যেতো হাতে টানা রিক্সা।
স্কুল ছুটির পরে বাড়ী ফেরার সময় বন্ধুদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে কত কথাই না হতো আমাদের। ফিল্ম, সাহিত্য, সিনেমা খেলাধূলা নিয়ে। ষাটের দশকে আমাদের বয়ঃসন্ধির বয়েস, রাস্তা ঘাটে সুন্দরী মেয়েদের দিকে আড়চোখে তাকাই, দেশ পত্রিকায় বড়দের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস শুরু হয়েছে। দেশে ধারাবাহিক বেরোচ্ছে অচিন্ত্য সেনগুপ্তর প্রথম কদম ফুল কিংবা নরেন্দ্রনাথ মিত্রের সূর্য্যসাক্ষী। সেই সব প্রেমের উপন্যাস নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমাদের উত্তেজিত আলোচনা চলে।
তাছাড়া আছে ময়দানে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের লীগ আর আই এফ এ শীল্ডের খেলা, আর ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হল গিলক্রিষ্টের ফাস্ট বোলিং। রেডিওতে কমলদা’ অজয় বসু পিয়ারসন সুরিটার কমেন্টারী, শনি রবিবার দুপুরে অনুরোধের আসর, আর শুক্রবার রাত ন’টায় নাটক।
প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার আমাদের সাপ্তাহিক পরীক্ষা থাকতো, এবং সেই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যে আগের দিন অর্থাৎ বৃহষ্পতিবার থাকতো আমাদের সাপ্তাহিক ছুটি। রবিবার নিয়ে আমাদের সপ্তাহে দুই দিন ছুটি ছিল। আর শুক্রবার পরীক্ষা হয়ে যাবার পরে রাত্রে রেডিওর সামনে বসে রাত ন’টার নাটক শুনতে কি যে ভাল লাগতো।
স্কুল থেকে বছরের প্রথমে আমাদের সবাইকে একটা বাৎসরিক ক্যালেন্ডার দেওয়া হতো, তাতে থাকতো বারো মাসের নানা ছুটি্র দিন এবং অন্যান্য নানা খবর। জেসুইট সাহেবরা স্কুল চালাতেন, তাই অনেক ক্রীশ্চান উৎসবের ছুটিও থাকতো – Good Friday, Easter ছাড়াও Ignatious Loyola’s birthday, St Patrick’s day ইত্যাদি। এছাড়া গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, বড়দিনের ছুটি।
কি অনবদ্য ছিল আমাদের সেই শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলো, যা আমরা বন্ধুদের সাথে কাটিয়েছি একসাথে, গভীর অন্তরঙ্গতায় কাটানো সেই দিনগুলোর নানা স্মৃতি ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ধরে আছে আমাদের।
এই বন্ধুত্ব চিরদিনের।

২০২৪ সাল
৭ যখন ভাঙ্গলো মিলনমেলা
আড্ডা হাসি ঠাট্টা স্মৃতি চারণে দীপঙ্করের বড় হলঘর গমগম করছে। প্রচুর ছবিও তোলা হচ্ছে এদিক ওদিক।
দেরী হয়ে যাচ্ছে, এবার ডিনার শুরু করা যাক, বলল প্রবীর। ততক্ষণে বেশ কয়েক বার আমার গ্লাস ভরে দিয়ে গেছে দীপঙ্কর, মাথাটা বেশ টলমল করছে, পুরনো বন্ধুদের সাথে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চারিপাশ টা বেশ রঙ্গীন লাগছে, মন বেশ হাল্কা, যাকে বলে উড়ুউড়ু।
ডিনার এর আয়োজন খুব পরিপাটি, নিখুঁত মেনু। প্রবীরের কেটারার (গুঁই কেটারার্স) এর লোকেরা (তারা সবাই আবার ইউনিফর্ম পরা) দীপঙ্করের ডাইনিং টেবিলে তাদের খাবারদাবার সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে, পাশের ঘরে মেয়েদের বসার বন্দোবস্ত। সব পদই খুব সুস্বাদু, মুখরোচক। শেষপাতে মিস্টি। রাবড়ী আর সন্দেশ। বেশ জমে গেল।
খাবার পালা শেষ হতেই যাবার পালা শুরু। প্রায় এগারোটা বাজে, বেশ রাত হয়েছে, এক এক করে সবাই উঠতে শুরু করলো। আমরা কয়েকজন যারা রইলাম তারা দীপঙ্করের বারান্দায় গিয়ে আবার কিছু গ্রুপ ফটো তুললাম, সবাই সবার কাঁধে হাত রেখে। কেউ সামনে বসে কেউ পিছনে দাঁড়িয়ে।
বাইরে রাত গভীর হচ্ছে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শেষ বারের মতো গল্প করে নিলাম আমরা ক’জন। আবার কবে দেখা হবে, আদৌ হবে কিনা, তা না জেনে।
আবার সামনের বছর দেখা হবে কি? কে জানে? বন্ধুদের সবার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সেই প্রশ্নটা মনে এলো। নাকি আমরা আবার যে যার নিজের বৃত্তে ফিরে যাবো, আমাদের মধ্যে আবার ফিরে আসবে সেই আগেকার দূরত্ব?
না,না তা কি করে হয়? আজকের এই ইন্টারনেট, ইমেল আর ফেসবুকের যুগে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ এত সহজ হয়ে উঠেছে, এখন একবার পুরনো বন্ধুদের খুঁজে পেয়ে আর কি হারানো সম্ভব? আশা করব আমরা এবার থেকে প্রতি বছর একসাথে জড়ো হব, আমাদের সেই বাৎসরিক মিলন উৎসবে এবার যারা আসতে পারেনি, তারাও যোগ দেবে। ক্রমশঃ সেই সব হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের এক এক করে আমরা আমাদের মধ্যে ফিরে পাবো।
সেই আশা নিয়ে আমাদের আজকের এই প্রথম সভা শেষ হলো।

২০২৫ সাল
৮) পুনশ্চ
২০২৫ সালে এই লেখা যখন লিখছি, তখন সেই ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল বারো বছর জানুয়ারীর প্রথমে দীপঙ্করের বাড়ীতে আমাদের বন্ধুদের এই বার্ষিক রিইউনিয়ন প্রতি বছর নিয়মিত হয়ে এসেছে।
২০১৪ সালের পর থেকে নতুন অনেকে পরের বছর গুলোতে আমাদের অনেক প্রবাসী সহপাঠী তাদের সুবিধা মতো এই পুনর্মিলন সভায় যোগ দিয়েছে। তাদের মধ্যে আছে হায়দ্রাবাদ থেকে চৈতন্যময় (গাঙ্গুলী), সিঙ্গাপুর থেকে দেবব্রত (ব্যানার্জ্জী), USA থেকে সুভাষ (চন্দ্র বোস) আর কিশোর (আচার্য্য), কুয়েত থেকে সিদ্ধার্থ (ভট্টাচার্য্য), কলকাতা থেকে জয়ন্ত দে।
কিন্তু এই বারো বছরে আমরা হারিয়েছি আরো বেশ কিছু সহপাঠীকে। ২০১৪ সালেই চলে গেছে অজয় নাথ রায় আর রবীন নাগ। তার পরে এক এক করে চলে গেছে সুভাষ মাধব বোস, প্রদীপ সোম, প্রদীপ মিত্র আর বিপ্লব রায়।
ভগবানের কাছে তাদের সবার আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি।

২০২৫ সাল
-
নামটা যেন কি? ইস্ মনে পড়ছেনা, এই বল্না…

গত শনিবার ১৪/৬/২৫ আমাদের বাড়ীতে ভাই বোনদের আড্ডা বসেছিল। খোকন, মিঠু,ঝুনকু, ভান্টুলি,ঝুন্টু আর কৌশিকী আর আমরা দু’জন। সব মিলিয়ে আমরা আট জন। যখন কাজ করতাম তখন শনি আর রবিবার ছিল ছুটির দিন। কিন্তু এখন কাজ থেকে অবসর নেবার পরে তো রোজই ছুটি,যে কোন একদিন বসলেই হয়। তবু কেন জানিনা শনি আর রবিবারের ছুটির আমেজ টা আজও মন থেকে মুছে যায়নি।
এই দুই দিনের মধ্যে শনিবারটা ছুটি হিসেবে রবিবারের থেকেও ভাল কেননা যখন কাজ করতাম তখন রবিবার কেটে গেলে সন্ধ্যা থেকে পরের দিন আবার কাজে যেতে হবে ভেবে মন খারাপ হয়ে থাকতো শনিবার সন্ধ্যায় মন খারাপ হতোনা, পরের দিনটাও তো ছুটি। কুয়েতে প্রথম গিয়ে শুনি শুক্রবার ওদের জুম্মাবার, সেদিনই ওদের সপ্তাহান্তের ছুটি। রবিবার কাজ করতে যেতে কি যে খারাপ লাগতো। যাক, জীবনের সেই চ্যাপ্টার এখন শেষ।
সবাই বেলা বারোটার মধ্যে কথামতো চলে এলো। আমি আর খোকন সিঙ্গল মল্ট্ নিয়ে বসলাম, বাকিরা সবাই পেপসি আর কোক। সুভদ্রা সাথে চিপ্স্ আর কাঠবাদাম (Almonds) প্লেটে সাজিয়ে এনে দিলো।
আড্ডা ক্রমশঃ জমে উঠলো।
খোকন মিঠুর সাথে আমরা কিছুদিন আগে অমৃতসর ডালহাউসী আর ধর্মশালা ঘুরে এসেছি। আমরা দিল্লী হয়ে গেছি, খোকনরা গেছে কলকাতা থেকে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সাথে অপারেশন সিঁদুরের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, অমৃতসর শহরটা পাকিস্তান বর্ডারের খুব কাছে, কিছুদিন আগে ওখানে বোমা পড়েছে, ব্ল্যাক আউটও ছিল। ওয়াগা আতারী বর্ডার বন্ধ। এই সময়ে ওই জায়গায় যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে?
দিল্লীতে মুকুর সাথে কথা হলো। অমৃতসরের কাছে গুরদাসপুরে মুকু অনেকদিন পোস্টেড ছিল। ওই জায়গাটা তার খুব পরিচিত। তার মত হলো এখন ওইসব জায়গায় না যাওয়াই ভালো। কিন্তু টিকিট কাটা হয়ে গেছে, গাড়ী হোটেল ইত্যাদি সব কিছু বন্দোবস্ত হয়ে গেছে, তা ছাড়া যুদ্ধ তো শেষ। Cease Fire declare করা হয়েছে,এখন পিছিয়ে আসা মুস্কিল।
আমার কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে মুকু খোকন কে ফোন করেছিল। খোকন আমাদের সেই ফোন কল টা অভিনয় করে দেখালো। সে বেশ ভাল অভিনয় করে। তার গলার modulation ও দারুণ, কানের কাছে হাত রেখে অনেকটা যেন টেলিফোনে কথা বলছে সেই ভাবে মুকুর গলাটা যথাসম্ভব গম্ভীর আর ভারী (মুকু দা’ কথা বলে কর্ণেল সাহেবের মতো বেশ আদেশের ভঙ্গীতে) করে আর নিজের গলাটা কিছুটা নরম আর মিনমিনে করে সে তাদের কথোপকথন হুবহু বলে গেল।
মুকুঃ হ্যালো, খোকন?
খোকনঃ মুকুদা’, বলো?
মুকুঃ মান্টুর কাছে শুনলাম তোরা নাকি অমৃতসর যাচ্ছিস?
খোকন (আমতা আমতা করে) – হ্যাঁ, সেরকমই তো ঠিক আছে।
মুকুঃ না না এখন যাস, না। আমি মান্টুকেও বলেছি।
খোকনের স্টকে মুকুর সাথে এইরকম অনেক টেলিফোন কথোপকথন রয়েছে। খোকন সেই গুলো ও আমাদের শোনালো।
প্রথম টা জন্মদিন নিয়েঃ
মুকুঃ হ্যালো, খোকন?
খোকনঃ মুকুদা’ , বলো?
মুকুঃ Happy birthday!
খোকন (আমতা আমতা করে) – আজ তো আমার জন্মদিন নয়?
মুকুঃ (খুব অবাক হয়ে) সে কি? তাহলে আজ কা’র জন্মদিন?
আর এটা হলো বাড়ীর ঠিকানা নিয়েঃ
মুকুঃ হ্যালো, খোকন?
খোকনঃ মুকুদা’ আমি দিল্লী এসেছি। তোমার সাথে দেখা করতে আসবো।
মুকুঃ চলে আয়!
খোকন (আমতা আমতা করে) – তোমার বাড়ীর ঠিকানা টা দেবে?
মুকুঃ ঠিকানা? দাঁড়া দিচ্ছি।
বেশ কিছুক্ষণ পর~
মুকুঃ খোকন, খুঁজে পাচ্ছিনা রে।
খোকন – কি খুঁজে পাচ্ছোনা?
মুকুঃ আমার চশমাটা! কোথায় যে রাখলাম!
এই গল্পটা শুনে ভান্টুলী অবাক হয়ে বললো মুকুদা’ U 18 এর ঠিকানা ভুলে গেছে? আমার তো এখনো U 18 এর ফোন নাম্বারও মনে আছে।
ন’কাকা কাকীমা অনেক দিন দিল্লীতে জ্যেঠুর বাড়ীতে গ্যারেজের ওপরে একটা ঘর নিয়ে থাকতেন। ভান্টূলি বললো রাস্তার উল্টোদিকে বিপুমামার বাড়ী ছিল V 16 Green Park Extension । বিপুমামা মুম্বাই তে ফিল্ম প্রোডিউসার ছিলেন, মাঝে মাঝে ওনার বাড়ীতে বলিউডের ফিল্ম স্টার রা এসে থাকতো। ওই বাড়ীতে ফোন ছিলনা, ফোন করার দরকার পড়লে তাদের বলা ছিল U 18 এ গিয়ে ফোন করতে।
একবার নাকি বিখ্যাত ফিল্মস্টার জিতেন্দ্র ফোন করতে এসেছিলেন। জ্যেঠু তখন বাড়ীতে খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে মুগুর ভাঁজছেন। বাড়ীতে ছিল শিখা তার তখনো বিয়ে হয়নি, সে তো সামনা সামনি জিতেন্দ্র কে দেখে কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা। জিতেন্দ্র যখন বললো আমি কি একটা ফোন করতে পারি, শিখা ছূটে নাকি জ্যেঠুকে বলেছিল বাবা বাবা জিতেন্দ্র এসেছে ফোন করতে…
জ্যেঠু নাকি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন জিতেন্দ্রটা আবার কে?
শিখা নাকি জ্যেঠুকে এক ধমক দিয়ে বলেছিল,তুমি জিতেন্দ্রর নাম শোনোনি? আশ্চর্য্য! যাও তাড়াতাড়ি পাজামা পাঞ্জাবি পরে এসো।
সেখান থেকে জিতেন্দ্র কে নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হয়ে গেল। জিতেন্দ্রর প্রথম ছবিটা যেন কি? কারুর ঠিক মনে পড়ছেনা।
সুভদ্রা বললো জীনে কি রাহ!
কৌশিকীর পুরনো ছবি তে বেশ ভাল ফান্ডা – সে বললো না না, ওর প্রথম ছবি হলো ফর্জ্।
আজকাল আমাদের কিছু মনে থাকেনা, স্মৃতি ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, এখন আমাদের গুগলই ভরসা। ঝুনকু ফোন খুলে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখে বললো, হ্যাঁ ফর্জ ই ওর প্রথম ছবি।
সুভদ্রার ও হিন্দী সিনেমার ফাণ্ডা বেশ ভাল। সে বললো ইস্, ফর্জের গান গুলো কি দারুণ, – মস্ত বাহারো কা ম্যায় হুঁ আশিক – আহা – ঝুন্টু তোর মনে আছে আমরা কিরকম হিন্দী ছবি দেখেছি এক সময়। তুই টিকিট কেটে আনতি।
সুভদ্রা এখনো হিন্দী গান বেশ ভালই গায়, সে দুই হাত ছড়িয়ে নাচের ভঙ্গীতে গেয়ে উঠলোঃ সারা জাঁহা হ্যায় মেরে লিয়ে ~
আমাদের সকলের যে বয়েস হচ্ছে, তা এখন আমাদের কথাবার্ত্তা থেকেই বোঝা যায়। কিছুদিন আগেও আমাদের এই আড্ডায় খুব হাসি ঠাট্টা হতো, আমরা বেড়াতে যাবার কথা বলতাম। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনীরা আমাদের আলোচনায় আসতো। এবার দেখলাম আমরা বেশীর ভাগ সময়ে কথা বলছি আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের জীবনে ক্রমশঃ একটা ছায়া নেমে আসছে। ভাই বোনেরা অনেকেই বিদায় নিয়েছে, আমরা যারা আছি, তারাও একটা বাধ্যতামূলক একা হয়ে যাওয়া আর পরাধীনতার দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধছে, আমরা হয়তো জানিওনা। আমরা কেউ কেউ যারা কানে কম শুনছি তাদের সাথে বেশ জোরে বা কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। খোকন বললো সে কিছুদিন আগে স্নেহদিয়া নামে রাজারহাটে একটা Old age home এ গিয়ে কথা বলে খোঁজখবর করে এসেছে।
এই নিয়ে কিছুদিন আগে প্রচেত গুপ্ত রবিবাসরীয় আনন্দবাজারে একটা প্রবন্ধ লিখেছেন, তার নাম “এ বড় সুখের সময় নয়!”
সব চেয়ে বেশী যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হল আমাদের স্মৃতিশক্তি খুব দুর্ব্বল হয়ে যাচ্ছে। Dementia বা Alzheimers এখনও হয়নি কারুরই, কিন্তু কোন জায়গা বা কোন সিনেমা বা কারুর নাম বলতে গেলে কোথাও আটকে যাই, প্রানপণ চেষ্টা করেও কোন নাম কিছুতেই মনে করতে পারিনা। মাথার ভিতরে memory cell গুলো কোন অদৃশ্য পোকা কুরে কুরে খেয়ে চলেছে।
বিশেষ করে নাম ভুলে যাওয়া টাই সব চেয়ে বেশী। ঝুন্টু বললো ও নাকি Proper noun মনে রাখতে পারেনা।
বহুদিন আগে, তখন কুয়েতে উইকেন্ডে বন্ধুদের বাড়ীতে আড্ডা বসত। সেই রকম কোন এক আড্ডায় একবার আমাদের এক বন্ধু সিদ্ধার্থ সাহেব বিবি গোলাম সিনেমাটার নাম কিছুতেই মনে করতে পারছিলোনা। তার সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটা এখনো মনে পড়ে। যাতে আমাদের কারুর মনে পড়ে সেই জন্যে আমাদের নানা clue দিয়ে যাচ্ছিল। আরে বিমল মিত্রের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস। আরে সেই যে এক জমিদারের সুন্দরী বৌ সুমিত্রা দেবী একা একা মদ খেতে শুরু করলো! আরে উত্তম কুমার ও ছিলো একটা ছোট রোলে! মনে পড়ছেনা?
আমি লেখালেখি করি। লিখতে গিয়ে প্রায়ই কোন একটা বিশেষ শব্দ ব্যবহার করতে চাই, সেই শব্দটা আমার জানা, কিন্তু কিছুতেই সেই শব্দটা মনে পড়েনা। মাথার ভিতরে কোন এক অতল অন্ধকার জায়গায় সে লুকিয়ে থাকে, সেখান থেকে তাকে অনেক চেষ্টা করেও বের করে আনতে পারিনা। গভীর জলের তলায় যেন ডুবে থাকা মণি মুক্তোর মতই লাগে তাদের, ডুবুরী লাগিয়েও যাদের খুঁজে পাওয়া সোজা কাজ নয়। তখন খুব অসহায় লাগে।
আমি ঝুন্টু কে বললাম আমার তো Common noun ও মনে আসেনা রে।
শরীর আমাদের এই সব ছোট ছোট সাবধানবাণী শোনাচ্ছে – যাকে বলে early signal – বিদায়ের সময় আগত ভাই সব! প্রস্তুতি শুরু করো।
ঝুন্টু কৌশিকী কে বললো, “আমরা মান্টুদা’ কে আজ কি একটা ্জিজ্ঞেস করবো ভেবেছিলাম না?” কৌশিকী বলল, “সত্যি, একদম মনে পড়ছেনা।“
আরো অনেক কিছুই এরকম মনে থাকেনা।
যাই হোক, জিতেন্দ্র থেকে আমরা চলে গেলেম নায়িকাদের দিকে। ফর্জে জিতেন্দ্রর নায়িকা কে ছিল? কারুর মনে নেই। সাধনা, নূতন, রেহানা সুলতানা?
আমাদের গুগল বিশেষজ্ঞ ঝুনকু আবার ভুরু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ববিতা”…
ববিতা নামে যে একজন নায়িকা ছিল তা আমরা ভুলেই গেছি।
আমি বললাম ওফ, সেই সময়ের সিনেমায় নায়ক আর নায়িকারা কি নাচানাচি আর ছোটাছুটিই না করত, মাঠে ঘাটে ,রাস্তা ঘাটে পাহাড়ে গাছের মধ্যে যেখানে হোক, ধেই ধেই করে নেচে প্রেম নিবেদন।
তারাপদদা’র কবিতায় একটা লাইন ছিল~
ভালবাসাবাসি ছাড়া আর কোন কাজ নেই সোমত্থ যুবক যুবতীর।
আমাদের কমবয়েসে শাম্মী কাপুর আর জিতেন্দ্র এই দু’জন ছিল নাচানাচি তে ওস্তাদ।
কে বেশী সুন্দরী ছিল,নূতন না সাধনা?
এই নিয়ে বেশ কিছু মতভেদ দেখা গেল। সাধনা কে নিয়ে আমি আমার জীবনের একটা গল্প বললাম।
মার্চ্চ, ১৯৬৩। হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার প্রথম দিন। বাবা একটা গাড়ী বলেছেন আমায় পরীক্ষার সেন্টারে নামিয়ে দেবে। আমি মনোহরপুকুরের বাড়ীর ছোট বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ীটা আসতে এত দেরী করছে কেন? গত তিন মাস খুব খেটেছি, কিন্তু এখন যেন কিছুই মনে পড়ছেনা, বেশ নার্ভাস লাগছে, ভয়ে বুক দুরদুর করছে। কি প্রশ্ন আসতে পারে তাই নিয়ে ভেবে যাচ্ছি।
হঠাৎ দেখি রাস্তা দিয়ে একদল ছেলে যাচ্ছে, তারা নিজেদের মধ্যে বেশ চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে শুনে বুঝলাম তারাও হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে, কাছেই কোন স্কুলে তাদের সীট পড়েছে। তাদের সকলেরি হাসি মুখ, চিন্তার লেশমাত্র আছে বলে মনে হলোনা। একজন শুনলাম বলছে “saলা, আমি তো saধনার মুখ টা মনে করে যা খুসী লিখে আসবো মাইরী।“
সাধনা খুব একটা তেমন সুন্দরী না হলেও তখন খুব জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন। কিন্তু সুভদ্রার ভাল লাগতো নূতন কে।
সেই রাজকাপুর আর নূতনের সিনেমাটা যেন কি? দারুন সব গান ছিল মুকেশ আর লতার…
আমি বললাম “আনাড়ী?”
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলে সুভদ্রা গেয়ে উঠলো , “ও চাঁদ খিলা,ও তারে হসে, ও রাত অজব মতওয়ারী হ্যায় – সমঝনে ওয়ালে সমঝ গয়ে হ্যায় – না সমঝে ও আনাড়ী হ্যায়”। হিন্দী গানে সুভদ্রা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী যাকে বলে second to none..
এই সব গল্প হতে হতে বেলা দু’টো বেজে গেছে , এবার লাঞ্চ।
আজকের মেনু হলো খাঁটি বাড়ীর খাবার। ভাত, ডাল, লাউচিংড়ী, ধোকার ডালনা, পার্শে মাছ ভাজা, রুই মাছের ঝোল, কাঁচা আমের চাটনি। শেষপাতে মিষ্টি, কৌশিকী এনেছে লাল দই, আর মিঠু এনেছে রাজভোগ আর হিমসাগর আম।
খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে আবার আড্ডা, সেই আড্ডায় এলো অনেক পুরনো দিনের মনোহরপকুরের বাড়ীর পারিবারিক স্মৃতি। আমাদের পিতামহ ব্রজবন্ধু ভৌমিকের লেখা তাঁর বাবা দীনবন্ধু ভৌমিকের সংক্ষিপ্ত জীবনী “পিতৃতর্পন” নিয়ে আলোচনা হলো। আমি বললাম আমাদের ভৌমিক পরিবারের ইতিহাস এবং বংশ তালিকা নিয়ে আমার একটা বই লেখার পরিকল্পনার কথা। সকলে খুব উৎসাহ দিলো আমায়। কিন্তু শুধু মুখের উৎসাহ দিলে তো হবেনা। আমায় তথ্য দিতে হবে। আমি এটা খসড়া করে সবাইকে পাঠাবো বললাম, কোন তথ্য না থাকলে বা তাতে কোন ভুলচুক হলে যেন সবাই যার যার মত করে সেগুলো আমায় সংশোধন করে দেয়।
এদিকে কলকাতায় খুব বাঁদরের উৎপাত শুরু হয়েছে। অনেক জায়গাতেই খবর পাচ্ছি কলকাতায় বাঁদরদের উপদ্রব বাড়ছে। ঝুনকু বললো ওদের পাটুলীর বাড়ীতে নাকি একটা বাঁদর ছানা এসে বাড়ীর ভিতর থেকে কিছু খাবার নিয়ে ছাদে গিয়ে বসে খাচ্ছিল। খবর পেয়ে ঝুনকু নাকি ছাদে গিয়ে বাঁদর ছানা টাকে বাংলায় তুমুল বকেছে। “আর এক বার যদি এরকম বাঁদরামি করিস তাহলে ঠাসঠাস করে দুই গালে দুই চড় খাবি।“
ঝুন্টু বললো কি আশ্চর্য্য, বাঁদররা তো বাঁদরামি ই করবে।
ঝুনকু বললো না রে, আমার বকুনী খেয়ে বাঁদরবাচ্চা টা ঠিক মানুষের বাচ্চার মত ভয় পেয়ে মুখ লুকিয়ে ফেললো।
খোকন বললো সাবধান ওদের বেশী কাছে যাস্না। বাচ্চাটার মা এসে “আমার ছেলে কে কেন বকছো বলে তোকেই দুটো ঠাস ঠাস করে কষিয়ে দুটো চড় মেরে দেবে।‘
বাঁদর দের নিয়ে একটা বিখ্যাত জোক আছে, সেটা অনেকেই জানে, কিন্তু তা সত্ত্বেও বার বার শুনেও সবাই হো হো করে হাসে। যেন এই প্রথম শুনলো।
———–
চিড়িয়াখানায় খাঁচার ভিতর থেকে একটি বাঁদর এক ভদ্রলোকের চশমা কেড়ে নেয়।
কি করে এটা সম্ভব হলো?
আসলে হয়েছে কি, খাঁচার সামনে একটা নোটিস টাঙ্গানো ছিল। ভদ্রলোক কৌতূহলী হয়ে খাঁচার খুব কাছে গিয়ে ঝুঁকে নোটিসটা পড়তে গিয়েছিলেন, তাতেই এই বিপত্তি।
নোটিসে লেখা ছিল “সাবধান!! বাঁদরেরা চশমা কাড়িয়া লয়!”
এই গল্পটা শুনে একটি মেয়ে নাকি একটুও না হেসে বলেছিল “সত্যি বাঁদরগুলো যা অসভ্য!”
———–
এবার ও খুব একচোট হাসাহাসি হলো।
বিকেলে কফির সাথে সুভদ্রার তৈরী Banana ব্রেড।
দিনটা বেশ কাটলো।

-
আশ্চর্য্য ভ্রমণ – গোপালপুর (২২ – ২৬ আগস্ট, ২০২২)

পূর্ব্বকথা
আমরা স্কুলের তিন বন্ধু অমিতাভ, দীপঙ্কর আর আমি গোপালপুর বেড়াতে যাচ্ছি।
অনেক আলোচনার পরে গোপালপুর যাওয়া ঠিক হয়েছে।। কাছেই পুরী আর দীঘা আছে, কিন্তু দুটোই চেনা এবং বড্ড ভীড়। গোপালপুরে ওবেরয় দের পাম বীচ রিসর্ট হোটেলটা বেশ upmarket, এখন অবশ্য মেফেয়ার নামে একটা চেন সেটা কিনে নিয়ে renovate করে অনেক বাড়িয়েছে, সেখানে সমুদ্রতট ও শুনেছি খুব চওড়া আর পরিস্কার আর ভীড়ও কম।
আমি কখনো সেখানে যাইনি, কিন্তু ছোটবেলায় সুভদ্রা মা বাবার সাথে গেছে একবার। আমরা দু’জনেই গোপালপুরে যেতে রাজী। অমিতাভ সুজাতারা বিয়ের পরে ১৯৭২ সালে সেখানে হানিমুন করতে গিয়েছিল। সেখানে অনেক বছর পরে গিয়ে আর একবার সেই পুরনো দিনের স্মৃতি ফিরে পাবার জন্যে তারাও যেতে রাজী। আর দীপঙ্কর সেখানে একসময় Institute of Chartered Accountant (East India Chapter) এর সেক্রেটারী পোস্টের ইলেকশনে জেতার জন্যে উড়িষ্যা চষে খেয়েছে, জায়গাটা তাই এখনো তার হাতের পাতার মত চেনা। সেও রাজী।
ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে নির্জ্জন এক সমুদ্রের বেলাতটে কিছুদিন একসাথে কাটানোটাই আসল উদ্দেশ্য। আমাদের তিনজনের অনেকদিনের বন্ধুত্ব, আমরা তিন জনেই সারা পৃথিবীর অনেক জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি। কিন্তু একসাথে আমাদের বেড়ানো এই প্রথম।
গোপালপুরে হাওড়া থেকে ট্রেণে করে বেরহমপুর স্টেশনে ভোরবেলা নেমে গাড়ী করে হোটেলে যাওয়া যায়। সেখান থেকে গোপালপুর বেশী দূর নয়। কম বয়েসে দীপঙ্কর আর অমিতাভ ট্রেণেই গোপালপুর গেছে, হোটেল থেকে স্টেশনে গাড়ীও পাঠিয়ে দেবে বললে। তবে এই বয়সে ট্রেণের থেকে প্লেনে যাওয়া টাই আমাদের কাছে বেশী সুবিধের মনে হলো। আজকাল প্লেনের টিকিট আর ট্রেনে ফার্স্ট ক্লাস স্লীপারের ভাড়া প্রায় একই। তাই খরচও তেমন কিছু বেশী নয়। দমদম থেকে সকালের প্লেনে ভুবনেশ্বর পৌঁছে সেখান থেকে বড় একটা গাড়ী ভাড়া করে গোপালপুরে হোটেলে পৌঁছনোটাই শেষ পর্য্যন্ত ঠিক হলো।
ভুবনেশ্বর থেকে গোপালপুর ১৭০ কিলোমিটার, গাড়ীতে যেতে প্রায় চার ঘন্টা লাগবে, সেটাই একমাত্র downside। রাস্তা (ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৬) অবশ্য খুব ভাল, দীপঙ্কর জানালো।
ঠিক হলো আমরা বেরোব ২২শে আগস্ট, ফিরবো ২৬শে আগস্ট, ২০২২। হোটেলে চার রাতের রিসার্ভেশন করলো অমিতাভ। দীপঙ্কর কাটলো প্লেনের টিকিট। সুভদ্রা ভুবনেশ্বর এয়ারপোর্ট থেকে গোপালপুর মেফেয়ার পাম বীচ হোটেল পর্য্যন্ত যাবার গাড়ীর বন্দোবস্ত করে ফেললো।
আজকাল এসব কাজ করা যায় বাড়ীতে বসে একটা মোবাইল ফোন থেকে। টেকনোলজী কা কেয়া খেল্ হ্যায়!




প্রথম দিন ২২শে আগস্ট, ২০২২
১) আমাদের যাত্রা হলো শুরু
২২/৮/২২ সকালে দমদম এয়ারপোর্টে চেক ইন করে পাঁচজনে গিয়ে ডিপার্চার লাউঞ্জে বসে গল্প করছি। দীপঙ্কর খোঁজ নিয়ে এসে জানালো যে আমাদের প্লেন এখনো এসে পৌঁছয়নি। তাই প্লেন ছাড়ার এখনো বেশ দেরী। আমি আর অমিতাভ এর মধ্যে একটু কফি খেয়ে এলাম। কোথাও বেড়াতে যাবার আগে এই সময়টা আমার বেশ লাগে, সামনের দিনগুলোর কথা ভেবে একটা অষ্পষ্ট ভাল লাগা, উত্তেজনা।
ইতিমধ্যে দীপঙ্করের বাড়ী থেকে একটা ফোন এলো। দীপঙ্কর দেখলাম ফোনটা পেয়ে বেশ একটু রেগে গিয়ে বলছে, “কি? কেক আর ফুল রেখে গেছে? কে? কি নাম?” তার একটু পরে শুনলাম বলছে, “ঠিক আছে কেকটা তোমরা খেয়ে নাও আর ফুলগুলো সব ফেলে দাও~”
বাড়ীর কাজের লোকের ফোন, যা বোঝা গেল। কেউ একজন দীপঙ্করকে কেক আর ফুল পাঠিয়েছে। কিন্তু এতে রেগে যাবার কি আছে? সুজাতা বললো “বুঝলেনা, এক নাছোড়বান্দা মহিলা…”
আমি বললাম “তা তো বুঝলাম, কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে আজ দীপঙ্করের জন্মদিন নাকি? তাহলে তো হোটেলে গিয়ে সেলিব্রেট করতে হবে!”
দীপঙ্কর সজোরে প্রতিবাদ করে বললো “আরে ভাই, না না, আজ আমার জন্মদিন নয়।” দীপঙ্করের প্রায় সব কথাই “আরে ভাই” দিয়ে শুরু হয়।
অমিতাভ বললো “কাল দীপঙ্করের জন্মদিন, আমরা হোটেলে কাল সেলিব্রেট করবো!”
বেশ বেশ, বেড়ানো এবং জন্মদিন – একসাথে দুই মজা।
মাত্র দেড় ঘন্টার প্লেন জার্নি ভালোই হলো, কিছু বোঝার আগেই নির্ঝঞ্ঝাটে সময় মত ভুবনেশ্বর পৌঁছে গেলাম। দীপঙ্করের সেক্রেটারী খাবারের অর্ডার দিয়ে রেখেছিল, স্যান্ডুইচ আর Mango juice, তা ছাড়াও আমাদের সাথে কিছু কেক বিস্কুট ইত্যাদি ছিল। সেগুলোর ও সদব্যবহার হলো।
গাড়ী এসে গেল ফোন করতেই। মালপত্র তুলে বেরিয়ে পড়লাম।
ভুবনেশ্বর শহরটা বেশ লাগছিল গাড়ীর জানলার বাইরে, ছিমছাম সবুজ, low skyline, পরিস্কার চওড়া রাস্তা ঘাট, আর একবার শহরের বাইরে আসার পরে রাস্তার দুই পাশে একের পর এক স্কুল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়, বেশীর ভাগই বেসরকারী মনে হলো। দীপঙ্কর বললো উড়িষ্যা হলো দেশের মধ্যে শিক্ষায় সবচেয়ে এগিয়ে। দেশের নানা প্রদেশ থেকে ছেলে মেয়েরা এখানে পড়তে আসে।
গাড়ীর ভেতরে যেতে যেতে নানা গল্প হচ্ছে, বেশীর ভাগ গল্প দীপঙ্করের। সে কম বয়সে এখানে এসে Institute of Chartered Accountants এর সেক্রেটারী হবার ইলেকশনে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পেন করতে এসে প্রায় সব নামকরা Chartered Accountancy firm এর পার্টনার দের সাথে দেখা করেছিল, পরে সে নির্ব্বাচনে জিতে ICA Eastern Chapter এর সেক্রেটারী হবার পরে সেই যোগাযোগ আরো গাঢ় হয়, এবং এদের অনেকের সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্কও তৈরি হয়। তার নিজের ব্যবসার জন্যেও এই যোগাযোগ এবং বন্ধুত্ব খুব জরুরী।
এই সব কারণে উড়িষ্যার এই দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের সাথে তার পরিচয় খুব গভীর।
এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অডিটর যিনি কিনা উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকের ব্যক্তিগত কাজ দেখেন, তিনি হলেন দীপঙ্করের এক অন্তরঙ্গ বন্ধু। তিনি নাকি প্রতি বছর তাকে নিজের বাগানের প্রচুর আম পাঠান। গাড়ীতে যেতে যেতে দীপঙ্কর সেই ভদ্রলোককে ফোন করে জানিয়ে রাখলো সে গোপালপুর যাচ্ছে এবং রাত্রে হোটেল থেকে ফোন করে কথা বলবে।
এরকম জনসংযোগ না থাকলে ব্যবসা বাড়ানো যায়না। দীপঙ্করের চার্টার্ড একাউন্টেসী ফার্মের ব্যবসা হু হু করে বেড়ে চলেছে।
কিছুদূর পরে একটা ছোট জনপদ পড়লো রাস্তার দুই পাশে অনেক ভীড় জটলা, কিছু দোকান। একটা দোকানের সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা “কুনা কাফে।”
সুভদ্রা বললো কি অদ্ভুত নাম, কুনা কাফে।
দীপঙ্কর খুব গম্ভীর মুখ করে বলল “কুনা কাফে মানে কি জানো তো? এই কাফে টা হলো ঘরকুনো লোকেদের বাড়ীর বাইরে একমাত্র কফি খাবার জায়গা।”
সুজাতা একটু হেসে প্রশ্রয়ের ভঙ্গীতে বললো, “দীপঙ্করের যত সব বাজে কথা!”
এই রকম ভাবে দীপঙ্করের গল্প আর অনর্গল ফাজলামি ভরা কথা শুনতে শুনতে আমরা যখন গোপালপুর পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে।
মেফেয়ার পাম বীচ হোটেলটা বেশ ঝাঁ চকচকে। ঢুকেই বিশাল লাউঞ্জ। এই পাঁচতারা হোটেলটা প্রথমে ওবেরয়দের ছিল। দেশের মধ্যে Premier Deluxe luxury resort হিসেবে গোপালপুরের ওবেরয় পাম বীচ হোটেলের খুব সুনাম ছিল। মেফেয়ার গ্রুপ তাদের কাছ থেকে প্রপার্টিটা কিনে নিয়ে এখন অনেকটা বাড়িয়ে নিয়েছে শুনেছি। তাছাড়া আগে একতলা ছিল, এখন দোতলা হয়েছে।
যাই হোক, হোটেলের রিসেপশনে গিয়ে আমাদের ঘরের চাবি আর মালপত্র ঘরে পৌঁছে দেবার বন্দোবস্ত করে ঘরে যাবার পথে দীপঙ্কর রিসেপশনের ছেলেটাকে একটু হেসে বলে গেল, “আমাদের ভালো ভাবে দেখাশোনা কোরো কিন্তু, নাহলে দিলীপের কাছে খবর চলে যাবে!”
দিলীপ রায় হলো মেফেয়ারের মালিক, আর দীপঙ্করের বন্ধু।




২ আড্ডা আর ডিনার
হোটেলটা 5 Star Deluxe, তাই বেশ সাজানো গোছানো ঝকঝকে। দামী কার্পেটে ঢাকা মেঝে। আমাদের তিনটে ঘর দোতলায়। আমাদের আর অমিতাভদের ঘর পাশাপাশি, দীপঙ্করের ঘর সামান্য একটু দূরে। বেশ বড় ঘর, উঁচু সিলিং। ঘরের পাশে একটা লম্বা ব্যালকনি, সেখানে চেয়ার টেবিল সাজানো, বড় কাঁচের জানলা দিয়ে দূরে সমুদ্র দেখা যায়, কিন্তু এখন অন্ধকার, কাল সকালে সেখানে চা নিয়ে বসে গল্প করা যাবে। দীপঙ্করের ঘরে ব্যালকনি নেই। ওর বুকিং একজনের জন্যে, তাই বোধ হ্য় ব্যালকনি ছাড়া ঘর।
মালপত্র রেখে হাত পা মুখ ধুয়ে আমরা দীপঙ্করের ঘরে গিয়ে বসলাম। ডিনারে যাবার আগে দীপঙ্করের আনা দামী হুইস্কির সাথে একটু আড্ডা হোক। সাথে অনেক চানাচুর আর বাদাম ও আনা হয়েছে।
দীপঙ্কর তিনটে খুব নামী দামী, স্কচ হুইস্কির বোতল এনেছে, যদিও আমি কোনটারই নাম শুনিনি, কিন্তু গলায় ঢেলেই বুঝতে পারছি এর জাত আলাদা, এই তরলে গলা জ্বলেনা, একটা ঝিমঝিমে নেশা হয়। অভ্যাস মত সাথে কচর মচর করে হুইস্কির সাথে চানাচুর আর বাদাম খাচ্ছি হঠাৎ দীপঙ্কর বললো, “ইন্দ্রজিৎ, এই মালের সাথে কোন কিছু খাওয়ার নিয়ম নেই ভাই, শুধু না গলায় ঢাললে এর স্বাদ বুঝবেনা।”
সুভদ্রা বলল “দ্যাখোনা ইন্দ্রজিৎ তো সাথে বিস্কুট না থাকলে চা খায়না। যেন বিস্কুট খাবার জন্যেই ও চা খায় মনে হয়। আর যে কোন ড্রিঙ্কের সাথে ওকে বাদাম চিপস বা মাছের চপ দিতেই হবে।” আমার নামে কিছু বলার সুযোগ পেলে সুভদ্রা ছাড়েনা।
চানাচুর আর বাদাম বাদ দিয়ে শুধু দীপঙ্করের দামী হুইস্কি খেতে কিন্তু বেশ ভাল লাগলো, অস্বীকার করবোনা।
আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। এর মধ্যে দীপঙ্করের সেই বন্ধু ফোন করে খবরাখবর নিলেন। আমাদের বেড়াবার কি প্ল্যান ওনাকে জানালে উনি সব বন্দোবস্ত করে দেবেন। বালুগাঁও এর মাছের বাজার অথবা চিল্কা হ্রদে নৌকাবিহার, কাছাকাছি সব দর্শনীয় স্থানেই তাঁর অনেক চেনশোনা। চিল্কায় পান্থনিবাস হোটেলে আমাদের লাঞ্চের ব্যাপারটাও উনি দেখে দেবেন বললেন। দীপঙ্কর ওনাকে কাল ফোন করে আমাদের বেড়াবার প্ল্যান জানাবে ঠিক হলো।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে দীপঙ্করের গভীর জ্ঞান, তাই আমাদের আলোচনায় রাগ রাগিনী খেয়াল ধ্রুপদ কিংবদন্তী শিল্পী আর তাঁদের ঘরানা এসে গেল। বিসমিল্লা খান কিরকম অল্প বয়সে বেনারসে কাকা অসুস্থ হলে অষ্টপ্রহর বাঁশী বাজিয়েছিলেন, আল্লারাখা রবিশঙ্কর কে এক ফাংশনে কানে কানে বলেছিলেন “বেটা আউর শাদী মত্ কর্”, কোন এক দুঃস্থ কিশোর খুঁজে খুঁজে অনেক দূরের কোন শহরে গিয়ে শেষ পর্য্যন্ত তার গুরুকে খুঁজে পেয়ে পরে এক বিখ্যাত শিল্পী হয়েছিলেন, এই সব অনেক গল্প আমরা শুনলাম দীপঙ্করের কাছে।
রাগ রাগিনী নিয়েও দীপঙ্করের পান্ডিত্য অসাধারণ, তার কাছে কলকাতায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল কালেকশন তার বাড়ীতে প্রায়ই সঙ্গীতের আসর বসে, সেই আসরে কলকাতার অনেক সঙ্গীত রসিক ও বোদ্ধারা এসে মাঝে মাঝে যোগ দেন।
দীপঙ্করের কাছ থেকে জানলাম ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (আগুণ), মরুৎ (বাতাস) আর ব্যোম (আকাশ) এই পাঁচ টি প্রাকৃতিক element নিয়ে মহাদেব পাঁচটি রাগ তৈরী করার পরে পার্ব্বতী চেয়েছিলেন পাঁচটি একসাথে মিশিয়ে একটি রাগ যেন মহাদেব তৈরী করেন। মহাদেব নাকি পার্ব্বতীকে বলেছিলেন এই কাজটা তুমি করো পারু।
আমি দীপঙ্কর কে বললাম মহাদেব পার্ব্বতী কে পারু বলে ডাকতেন নাকি? দীপঙ্কর বলল “হ্যাঁ, সেজন্যেই তো শরৎচন্দ্র দেবদাস কে দিয়ে পার্ব্বতীকে ওই নামে ডাকিয়েছেন।”
অমিতাভ বললো, “তো পারু কি রাগ কোন তৈরী করেছিলেন?”
দীপঙ্কর বলল “মালকোষ!”
সুভদ্রা্র ও রাগ রাগিণী নিয়ে কিছু ফান্ডা আছে, সে বললো পন্ডিত যশরাজ একবার দূর্গা পূজোয় কুয়েতে এসে রাগ দূর্গা শুনিয়েছিলেন, এত ভাল লেগেছিল, এখনো ভুলিনি।
দীপঙ্কর সুভদ্রাকে উড়িয়ে দিয়ে বললো “যশরাজ? দূর, ওই লোকটার তো পোটাটো ডিফেক্ট~”
সুজাতা সুভদ্রার হয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বললো “গান গাইবার সাথে পোটাটো ডিফেক্ট এর কি সম্পর্ক?”
সুভদ্রা আমার নামে কিছু বলার সুযোগ পেয়ে বললো “ইন্দ্রজিৎ এর ও খুব পোটাটো ডিফেক্ট জানো তো, ওর পিছনে মেয়েদের লম্বা লাইন…”
সুজাতা বললো, “তাই নাকি ইন্দ্রজিৎ? এটা তো জানতামনা।”
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, “সব গুণী লোকেদেরই পোটাটো ডিফেক্ট থাকে, যেমন রবীন্দ্রনাথ, পন্ডিত যশরাজ, আমি…”
এই সব কথা হচ্ছে এমন সময় রেস্টুরেন্ট থেকে ফোন এলো, স্যার আপনাদের ডিনার রেডি, চলে আসুন।
বিশাল বড় আলো ঝলমলে সাজানো গোছানো রেস্টুরেন্ট। দরজার বাইরে সাদা দেয়ালে টাঙানো ইন্দিরা গান্ধী, জে আর ডি টাটা, এবং আরও নানা রথী মহারথীর ছবি, তাঁরা সবাই এই হোটেলে অতিথি হয়ে এসে থেকে গেছেন। উঁচু সিলিং, ঝকঝকে মার্বেলের মেঝে, ভারী দরজা, চারিদিকে বৈভবের ছাপ। ওবেরয় সাহেবের উত্তরাধিকার, বোঝা যায়। আমাদের দেশের হোটেলের ব্যবসায় তিনি এক উজ্জ্বল পথিকৃৎ ছিলেন।
একটি মেয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করে একটা বড় টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসালো। তার নাম লোপামুদ্রা। মেয়েটি হাসিখুসী, ছোটখাটো গোলগাল চেহারা, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা তার কাজ হলো সবার দেখাশোনা করা, সে হলো হোস্টেস। আমাদের সাথে তার বেশ আলাপ হয়ে গেল।
আমরা লোপামুদ্রা কে বললাম কাল আমাদের বন্ধুর জন্মদিন, আমরা একটা স্পেশাল কেক চাই, আর তাছাড়া তোমাদের এখানে একটা ছানাপোড়া বলে একটা মিষ্টি আছে, সেটা কাল আমাদের খাওয়াতে পারবে?
লোপামুদ্রা তখন ওদের শেফ কে নিয়ে সাথে আলাপ করিয়ে দিলো। কাল দীপঙ্করের জন্মদিন পালন করা হবে একটা স্পেশাল ডিনার দিয়ে, তার মেনুও আমরা ঠিক করে দিলাম, সাথে কেক, ছানাপোড়া সব ওরা বন্দোবস্ত করবে। শেফ আমাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন তিনি নিজে কেক আর ছানাপোড়া তৈরীর দায়িত্ব নেবেন।
কেক এ দীপঙ্করের নাম লেখা হবে, আমি সেই নামের বানান লোপামুদ্রাকে একটা কাগজে লিখে দিলাম।
৩ ) দ্বিতীয় দিন – ২৩/৮/২২
দীপঙ্করের জন্মদিন আজ, সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে তাকে সবাই অভিনন্দন জানালাম। ব্রেকফাস্টের পর সেরে সবাই মিলে সমুদ্রের ধারে হোটেলের পিছনে একটা বড় বাগান, চারদিকে দেয়ালে ঘেরা, এক কোণে একটা ছোট রেস্টুরেন্ট, পাশে কিছু টেবিল চেয়ার পাতা। শুনলাম প্রতিদিন বিকেলে সেখানে বসে সমুদ্র দেখতে দেখতে চা খাওয়া যায়, সাথে সিঙাড়া, ঝালমুড়ি। On the house..তা ছাড়া সাথে একটা গানের অনুষ্ঠান ও নাকি রোজ বিকেলে
হোটেলের বাইরে সমুদ্র, সেখানে যেতে গেলে একটা গেট দিয়ে যেতে হবে, সেখানে একজন লোক একটা খাতা খুলে বসে আছে, নাম ধাম রুম নম্বর ইত্যাদি লিখতে হবে, হোটেলের অতিথিরা বাইরে গেলে তাদের একটা রেকর্ড রাখা, হোটেলে ফেরার সময় আবার সেই খাতায় সই করতে হবে। কেউ যাতে হারিয়ে না যায়, তার ব্যবস্থা। মানে হয়তো সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে আর ফিরলোনা, হতেও তো পারে?
এই হোটেলের নিজের কোন সৈকত আছে বলে kiমনে হলোনা। নিজের নুলিয়াও নেই। তবে কয়েকজন নুলিয়া এসে আলাপ করলো। তারা ভাঙা ভাঙা বাংলা বলে। অনেক করে বলা সত্ত্বেও আমরা টায়ার নিয়ে সমুদ্রে নামবোনা, তাই তারা বেশ আশাহত। নিজের মনেই তারা সমুদ্রের জলে নেমে কাঁকড়া ধরতে চলে গেল।
আমরা তিন জনেই আজ হাফ প্যান্ট পরে এসেছি। কমবয়েসে সমুদ্র অনেকবার দেখা, নুলিয়ার হাত ধরে সমুদ্রে ঢেউয়ের মোকাবিলাও করেছি অনেক। এই বয়সে এখন আর জলে নামার ইচ্ছে নেই। এখন শুধু সমুদ্রের শোভা দেখা আর নরম ভেজা বালিতে পা ডুবিয়ে হাঁটা।
একটা বিশাল ছাতা হোটেল থেকে দিয়ে গেছে, তার তলায় অনেক গুলো চেয়ার। আমরা সেখানে বসে বালিতে পা ডুবিয়ে কিছুক্ষন আড্ডা দিলাম। তারপরে খালি পায়ে বালির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেলাম। হোটেল ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে একটা খুব পুরনো লাইটহাউস। লাল সাদা রং এর এই লাইটহাউসটি গোপালপুরের একটি দর্শনীয় স্থাপত্য, নানা জায়গায় এর ছবি দেখেছি।


তবে এক সময় এই লাইটহাউসটি জাহাজের নাবিকদের কাজে লাগলেও, আজ তার চারিদিকে ভাঙ্গাচোরা কিছু বাড়ী, অবক্ষয়ের চিহ্ন চারিদিকে। এত দামী একটা 5 star luxury resort এর ঠিক পাশে এই রকম একটা বিশ্রী পরিবেশ দেখে বেশ অবাকই লাগে। ওবেরয় রা অনায়াসে এখানে একটা চমৎকার বাগান বানিয়ে দিতে পারতেন। তার বদলে এখানে ভাঙাচোরা আর পোড়ো বাড়ী, ধুলো ময়লা ভরা রাস্তাঘাট, এত দামী একটা হোটেলের পাশে মোটেই মানানসই নয়।
অনেকটা হেঁটে ফিরে এসে দীপঙ্কর আর আমি গিয়ে সমুদ্রের ধারে বসলাম। ঢেউ এসে পায়ের কাছে ভেঙে আবার ফিরে যাচ্ছে, আমরা গল্প করে যাচ্ছি। দূরে পাহাড়ের মতো উঁচু ঢেউ উঠছে একের পর এক, কিন্তু আমরা নিরাপদ দূরত্বে পা ছড়িয়ে শুয়ে আছি। কূলে ঢেউ এসে ভেঙে আমাদের পা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু বড় ঢেউ বুক পর্য্যন্ত এসে ফিরে যাচ্ছে।
আমাদের দু’জনের বাড়ী কাছাকাছি ছিল বলে স্কুলে পড়তে দীপঙ্কর আর আমি একসাথে নানা গল্প করতে করতে হেঁটে বাড়ী ফিরতাম, তখন থেকেই দীপঙ্করের খুব সাহিত্যে নেশা। আমিও বইয়ের পোকা ছিলা, কিন্তু আমি পড়তাম বাংলা গল্প উপন্যাস, দীপঙ্করের নেশা ছিল ইংরেজী ভাষায় নানা দেশের লেখকদের লেখা non-fiction – নানা বিষয় নিয়ে লেখা প্রবন্ধ। আমাদের দু’জনেরি বই পড়ার ব্যাপারে সেই অভ্যেস এখনো আছে। দীপঙ্কর আমায় আমাকে তার প্রিয় লেখক এবং তাদের কিছু অসাধারণ বই সম্বন্ধে বলে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কিছু বই সে আমায় পড়াবেই। পরে সে একটা কাগজে তার প্রিয় কিছু লেখক ও তাদের কয়েকটা বইয়ের নাম ও লিখে দিয়েছিল। ওর ধারণা শুধু fiction পড়া, তাও আবার বাংলায়, মোটেই কাজের কথা নয়।


গল্প করতে করতে একটু অন্যমনস্ক হয়েছি, হঠাৎ একটা বিশাল ঢেউ গর্জ্জন করে এসে আমাদের মাথায় নাকে মুখে একরাশ নোনা জল ঢেলে দিয়ে গেল।
ভাবটা যেন, “কি রে, কিরকম দিলাম?”
সমুদ্রে এসে জলে একটু না ভিজলে কি করে হবে? কিন্তু মুস্কিল হলো সারা গায়ে মাথায় চুলে একরাশ বালি। ঘরে ফিরে স্নান করার সময় অনেকক্ষন লাগলো শরীর থেকে সব বালি সরাতে। প্যান্টের পকেটও ভারী, কেননা বালিতে ভর্ত্তি।
দুপুরে সুভদ্রা আর আমি হোটেলের বাইরে একটু হেঁটে একটা বাজারের মধ্যে স্বস্তি নামে একটা হোটেলে লাঞ্চ করলাম। উড়িষ্যায় দুটো হোটেলের বেশ নাম। এক হলো এই স্বস্তি আর একটা হলো পান্থনিবাস। স্বস্তি হোটেলের ম্যানেজার ভদ্রলোক খুব আলাপী আর মিশুকে, তিনি আমাদের বললেন কাল আপনাদের বন্ধুদের নিয়ে আসুন না, আমি আপনাদের খয়রা মাছ খাওয়াবো।
খয়রা? সেটা আবার কি মাছ?
এদিকে আজ দীপঙ্কর অমিতাভ আর সুজাতা খেয়েছে পান্থনিবাসে। সেটাও হোটেলের বাইরে বাজারের মধ্যে। হাঁটাপথের দূরত্বে। কাল আমরা সবাই স্বস্তিতে যাবো ঠিক হলো খয়রা মাছ খেতে। লাঞ্চের পর একটু রেস্ট নিয়ে সূর্য্যাস্ত দেখতে বাইরে গিয়ে হোটেলের বাইরে ওই চায়ের দোকানে চা আর ঝালমুড়ি নিয়ে বসে আড্ডা হলো। কাল ঠিক হলো একটা গাড়ী নিয়ে আমরা একটু চিল্কা ঘুরে আসবো।
আজ রাত্রে আবার কালকের মত দীপঙ্করের ঘরে বিশুদ্ধ বিলিতি মাল সহকারে আড্ডা। আজ রাগ রাগিনী নয়, আজ ছেলেবেলার স্কুলের গল্প। দীপঙ্কর আর অমিতাভ দুজনেই হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় প্রথম দশজনের মধ্যে ছিল। দীপঙ্কর চ্যাটার্জ্জি নামে আর একজন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ছিল, আমাদের সাথে একই সালে সে বেচারা হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দেয়, কিন্তু আমাদের দীপঙ্করের মত অত ভালো রেজাল্ট তার হয়নি।
অনেক পরে দুই দীপঙ্করের দেখা এবং আলাপ হয়, এখন দু’জনের গভীর বন্ধুত্ব। আলাপ হবার পর একদিন দ্বিতীয় দীপঙ্কর হেসে আমাদের দীপঙ্কর কে নাকি বলেছিলেন, “আপনার জন্যে মশাই ছোটবেলায় আমায় বাবার কাছে খুব মার খেতে হয়েছে!”
“আমার জন্যে?” দীপঙ্কর তো অবাক, “আমি আবার কি করলাম?”
দ্বিতীয় দীপঙ্কর বললেন, “আরে মশাই আপনি তো হায়ার সেকেন্ডারীতে সেকেন্ড হলেন, তার পর আপনার নাম খবরের কাগজে দেখে আমাদের যত আত্মীয়স্বজন, বাবার বন্ধুরা সবাই বাবাকে ফোন করে আর বলে “কি খুসী হয়েছি, আমাদের দীপু সেকেন্ড হয়েছে, কি গর্ব্ব হচ্ছে, কি আনন্দ…”
“আর প্রত্যেক বার ফোন নামিয়ে রেখে আমায় বাবার এক চড়। সেদিন অন্ততঃপক্ষে চল্লিশ পঞ্চাশটা চড় খেতে হয়েছিল মশাই আপনার জন্যে।”
হায়ার সেকেন্ডারী তে ভাল রেজাল্ট না হলে কি হবে, এই দ্বিতীয় দীপঙ্কর খুব সফল ব্যবসায়ী। তাঁর বাবার একটা চা বাগান ছিল আসামে, বাবার সেই ব্যবসা বাড়িয়ে আসামে ও ডুয়ার্সে তিনি এখন অন্ততঃ কুড়িটা চা বাগানের মালিক। দীপঙ্কর মাঝে মাঝেই গিয়ে বন্ধুর চা বাগানের গেস্ট হাউসে কিছুদিন কাটিয়ে আসে।ব্যবসার কাজে দুজনে এক সাথে পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘুরেও এসেছে বেশ কয়েক বার।
কাল চিল্কা যাবার জন্যে হোটেল থেকে একটা গাড়ীর বন্দোবস্ত করা হলো। আর দীপঙ্কর তার বন্ধু কে ফোন করে বলতেই তিনি সেখানকার পান্থনিবাসের ম্যানেজার কে আমাদের ওখানে দুপুরের খাওয়ার কথা বলে দেবেন বললেন।
আড্ডার মধ্যে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার ডাক এলো। আজ দীপঙ্করের জন্মদিন বলে সে একটা লাল জামা পরে বেশ সাজগোজ করে এসেছে। আমাদের টেবিলটা এক কোনে সাজানো হয়েছে ফুল দিয়ে। শেফ এসে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা বিশাল কেক নিয়ে এলো।
এদিকে হয়েছে কি, রেস্টুরেন্টের অন্য কোণে আর একটা টেবিলে একটা বেশ বড় গ্রুপ বসে আছে, সেখানেও একজনের আজ জন্মদিন। দূর থেকে আমরা দেখলাম হোটেল এর ওয়েটাররা একটা বড় কেক নিয়ে এসে সেই টেবিলের সামনে খুব হ্যাপি বার্থডে বলে গান গাইছে। যে মেয়েটির আজ জন্মদিন, সে হাসিমুখে অনেকগুলো মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নেভালো। ভদ্রমহিলা বেশ সুন্দরী আর হাসিখুসী, রঙ্গীন টপ আর স্কার্টে তাকে বেশ মানিয়েছে, তার দুই ছোট ছেলে মেয়েও তাদের মা’কে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করছে দেখলাম। তাছাড়া টেবিলের অন্য পুরুষ ও মহিলারা সবাই তাকে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে।
ইতিমধ্যে আমাদের টেবিলেও গান গাইতে গাইতে চলে এলো ওয়েটাররা, তাদের মধ্যে আছে হোটেলের শেফ আর জমকালো শাড়ী পরে চোখে গোল চশমা আমাদের লোপামুদ্রা।
দীপঙ্করের কেক কাটা হয়ে গেছে এমন সময় ওই টেবিল থেকে জন্মদিনের মহিলা এবং তার বর আমাদের টেবিলে এসে দীপঙ্কর কে শুভেচ্ছা জানাতে এলো। দীপঙ্করকেও পালটা শুভেচ্ছা জানাতে হবে, সে মেয়েটিকে হেসে বলল- “Two birthdays today, 75 and 25!”
মহিলার বর পাশ থেকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে তার বর কে হাত তুলে থামিয়ে দীপঙ্করকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফিরে গেল। তার মুখে জ্বলজ্বল করছিল একগাল হাসি। কোন পুরুষ, তা সে যতই বুড়ো হোক, তাকে দেখে পঁচিশ বছর বয়েস বললে তার তো খুসী হবারই কথা!
তারপরে তো আমাদের খাওয়া দাওয়া বেশ জমে গেল। পোলাও, মাংস, চিংড়ি মাছের মালাইকারী, আর সবশেষে শেফের নিজের তৈরী ছানাপোড়া।
ঘরে ফেরার পথে আমি দীপঙ্কর কে বললাম “ওই ভদ্রমহিলার বয়েস তোমার পঁচিশ মনে হলো?” দীপঙ্কর বললো, “আরে ভাই, সুন্দরী মেয়েদের বয়েস কখনো পঁচিশের থেকে বেশী হয় নাকি?”


তৃতীয় দিন – ২৪/৮/২২
৪) অলিভ রিডলি কচ্ছপ
আজ আমাদের চিল্কা হ্রদ যাবার দিন।
এখানে আসার আগে আমি গোপালপুর আর চিল্কা সম্বন্ধে কিছু পড়াশোনা করে এসেছিলাম, এখানে কি কি দেখার জায়গা আছে ইত্যাদি। পর্য্যটক দের জন্যে চিল্কা হ্রদ অবশ্যই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তার নানা কারণ আছে। বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম কূলে ১১০০ স্কোয়ার কিমি বিস্তৃত এই চিল্কা হলো আমাদের দেশের সব চেয়ে বড় হ্রদ। সমুদ্রের সাথে এই হ্রদের যোগ থাকায় জোয়ারের সময় এই হ্রদে লোনা জল এসে যায়। কিন্তু বেশ কিছু নদী চিল্কায় এসে মেশায় একে fresh water লেকও বলা হয়। এই হ্রদে ইরাবতী শুশুক ছাড়া নানা জলচর প্রাণী বাস করে।
চিল্কার তীরে অনেক মাছের বাজার তাই, প্রধানতঃ এই তীর চিংড়ি আর কাঁকড়া কেনাবেচার জন্যে বিখ্যাত। শীতকালে এই হ্রদে অনেক পরিযায়ী পাখী চলে আসে। গুগল এ গিয়ে অনেক গোলাপী ফ্লামিঙ্গোর ছবি দেখলাম। এরা আসে উত্তরে সাইবেরিয়া বৈকাল হ্রদ এবং অন্যান্য নানা পাহাড়ী জায়গা থেকে।
আর একটা বিশেষ ব্যাপারের জন্যে চিল্কা বিখ্যাত। অলিভ রিডলি নামে এক জাতীয় সামুদ্রিক কাছিমরা দলে দলে ওড়িশার সমুদ্রকূলে এসে ডিম পাড়ে –এদের জল্পাই রং এর খোলসের সূত্রেই তাদের এই নাম। আকারে তারা ছোট, এবং তাদের ফ্লিপারের মত পা থাকে যা ডাঙায় বসবাসকারী কাছিম দের থেকে আলাদা। উড়িষ্যা ও ভারতের অন্য কিছু রাজ্যের উপকূলে তারা দলে দলে প্রজননের জন্যে আসে। এর নাম হলো মাস নেস্টিং যার প্রধান ঠিকানা হলো ওড়িশার কেন্দ্রপাড়া জেলার অন্তর্গত গহিরমাথা অঞ্চল।কিন্তু সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ, কেননা সেটি ভারত সরকারের সুরক্ষিত এলাকা।
কিন্তু গঞ্জাম ডিস্ট্রিক্টে রম্ভার কাছে রুশিকুল্য নদীর মোহনাও মাস নেস্টিং এর আর এক ঠিকানা, এবং পর্য্যটকদের কাছে তা এক প্রধান আকর্ষণ। জায়গাটা গোপালপুর থেকে খুব কাছে, কিন্তু আমরা আগস্টে এসেছি, মাস নেস্টিং এর সময়টা মোটামুটি হলো ফেব্রুয়ারী থেকে মার্চের মাঝামাঝি। সুতরাং আমাদের দেখা কপালে নেই।
ডিসেম্বর মাসে ওড়িশা উপকূলে সমুদ্রের পরিস্কার জলে পুরুষ ও স্ত্রী কাছিমরা একত্রিত হয় মেটিং এর জন্যে। এর পর পুরুষ কাছিমরা ফিরে যায় তাদের বিচরণ স্থানে। স্ত্রী কাছিমরা অপেক্ষা করে, সঠিক আবহাওয়া আর উপযুক্ত পটভূমি পেলে তবেই এরা দলে দলে ডিম পাড়ার জন্যে পারে উঠে আসে। সে এক অদ্ভুত, অভিন্ব, অভাবনীয় দৃশ্য। প্রতিটি ঢেউ সঙ্গে করে নিয়ে আসে একরাশ প্রাণ!
সাধারণতঃ এই সমারোহ চলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে। আসে কয়েক লক্ষ অলিভ রিডলি। যারা এখানে জন্মগ্রহণ করে তারাই নাকি ফিরে আসে আবার জননী হয়ে। শোনা গেল সে এক আশ্চর্য্য অভিনব প্রাকৃতিক লীলা। প্রতিটি কাছিম সেই বিস্তীর্ণ বালুতটে ঢেউয়ের নাগালের বাইরে জায়গা খুঁজে নিয়ে গর্ত্ত খুঁড়তে শুরু করে দেয়। তারপরে তাদের ডিম সেই গর্ত্তে রেখে প্রাণপন শক্তি দিয়ে সেই গর্ত্ত বালি দিয়ে ঢেকে ধরিত্রী মায়ের সুরক্ষায় তাদের জমা করে তারা আবার ফিরে যায় জলে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে জলে ফিরতে প্রায় এক ঘন্টা বা তারও বেশী লেগে যায়।
এই কাহিনীর দ্বিতীয় ভাগ এখন থেকে দেড় মাস পরে রচিত হবে, মে মাসে। তখন বালির গরমে ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরোবে, এবং নিজেরাই শুধুমাত্র প্রকৃতির দুর্বোধ সঙ্কেত চিনে নিয়ে নির্ভুল পথে পাড়ি দেবে দূর সাগরে নিজেদের ডেরায়। ততদিন পর্য্যন্ত সরকারের বন দফতর আর নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লোকেরা অক্লান্ত ভাবে সামলে ডিমগুলো সামলে রাখবে পশুপাখী আর মানুষের হাত থেকে।
গোপালপুরে এসে রম্ভায় গিয়ে সেখানে মাস নেস্টিং দেখা না হওয়ায় আমাদের মন একটু খারাপ।
দীপঙ্কর বললো, “আরে ভাই ইউটিউবে ভিডিও তে দেখে নিও। কষ্ট করে রাত জেগে সমুদ্রের তীরে গিয়ে বসে থাকার বয়েস কি আমাদের আর আছে?”
৫) চিল্কায় নৌকাবিহার
গঞ্জাম জেলার বারকুল আর খোরদা জেলার রম্ভা নামে চিল্কার তীরে দুটি জায়গা থেকে পর্য্যটকরা হ্রদে বোটিং করে। দীপঙ্করের বন্ধু আমাদের বলেছেন বারকুলে যেতে, সেটা রম্ভার তুলনায় গোপালপুর থেকে কাছে এবং সেখানকার পান্থনিবাসে তিনি আমাদের লাঞ্চের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। ম্যানেজারের নাম মিস্টার কর্। কর্ পদবীটা বাঙালীদেরও হয়, কিন্তু ইনি উড়িষ্যার লোক।
তাই আমরা বারকুলেই যাচ্ছি।
চিল্কায় অনেক দ্বীপ। এই সব দ্বীপে নৌকা নিয়ে পর্য্যটকরা যায়, আমরা তো ঠিক সে অর্থে পর্য্যটক নই। তবু দীপঙ্করের বন্ধু বলে দিয়েছেন, বারকুলে লাঞ্চ সেরে আমরা যেন একটা নৌকা ভাড়া করে কালিজায়ি নামে একটা দ্বীপে গিয়ে সেখানে এক কালীমন্দিরে পূজো দিয়ে আসি। কালিজায়ির মা কালী খুব জাগ্রত।
এ ছাড়া তিনি বলে দিয়েছেন যে বারকুল পৌঁছবার আগে টামপারা নামে একটা লেক পড়বে, সেই জায়গাটাও দেখার মত। আমরা চাইলে সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ কাটাতে পারি।
তো আমরা ব্রেকফাস্টের পর বেরিয়ে পড়লাম। আজও বড় গাড়ী। রাস্তাও বেশ ভাল, কোন ঝাঁকানি নেই। গোপালপুর থেকে টামপারা এক ঘণ্টার মত পথ। পথে ছত্রপুর নামে একটা শহর পড়লো।


টামপারা (fresh water) লেকটা দেখলাম বেশ বড় (৭৫০ acre – অর্থাৎ প্রায় পাঁচ স্কোয়ার কিমি এর বিস্তার)। রুশিকুল্য নদীর মোহনাও এখান থেকে বেশী দূরে নয়। সেই হ্রদের ধারে একটা চমৎকার বাগানের সামনে এসে আমাদের গাড়ী থামলো। আকাশে সেদিন মেঘ, পাশের হ্রদ থেকে ঠান্ডা একটা হাওয়া দিচ্ছে, এই আগস্ট মাসেও তেমন গরম নেই, বাগানের গাছগাছালির মধ্যে একটি বাঁধানো রাস্তা এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে। বেশ কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গিয়ে আমরা একটা কফি শপে গিয়ে বসলাম।
কফি শপের ঠিক উল্টো দিকে হ্রদের ধারে একটা ছোট্ট হোটেল, বাইরে বড় একটা সাইনবোর্ডে লেখা টাম্পারা গেস্ট হাউস, ছত্রপুর।
দীপঙ্কর বললো, “আমার গার্লফ্রেন্ডরা যখন আমার সাথে এখানে আসে তখন আমরা এই গেস্ট হাউসে এসে উঠি, আর একটা ঘর নিই যাতে জানলা খুললেই সামনে হ্রদ দেখা যায়!”
সুজাতা বললো “এই আবার দীপঙ্করের ঢপ্ শুরু হলো!”
সুভদ্রা বললো “যাও যাও তোমার ক্যালি আমাদের খুব জানা আছে! গার্লফ্রেন্ড না ছাই!”
দীপঙ্কর বললো, “আরে ভাই, তোমরা বিশ্বাস না করলে আমি কি করতে পারি, পূর্ণিমার রাতে লেকের জল চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করে, আমার বান্ধবীরা কেউ ওই Lake facing room ছাড়া থাকবেনা! ”




টামপারা থেকে বারকুল কাছেই। সেখানে পান্থনিবাস হোটেলে গিয়ে দেখি সেখানকার ম্যানেজার কর্ সাহেব আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। হোটেলে অনেক গেস্ট, বেশ ভীড়, তাই তিনি তাদের নিয়ে কিছুটা ব্যস্ত। আমাদের জন্যে তিনি একটা হোটেলের ঘর খুলে দিলেন, আমরা সেখানে গিয়ে একটু বিশ্রাম করে নিতে নিতে তিনি আমাদের জন্যে রেস্টুরেন্টে টেবিলের আর খাবারের ব্যবস্থা করে দেবেন।
লাঞ্চ ভালোই হলো। কর্ সাহেব ভালোই বন্দোবস্ত করেছেন। চিংড়ী মাছ আর কাঁকড়ার ঝোল খেলাম ভাত দিয়ে। তা ছাড়া ভাত ডাল আর তরকারী। শেষ পাতে মিষ্টি দই।
লাঞ্চের পর কাছেই হ্রদের ধারে সারি সারি নৌকা বাঁধা আছে সেখানে একটা কাউন্টারে এক ঘণ্টা বোটিং এর টিকিট কিনে আমরা একটা নৌকায় উঠে পড়লাম। ওঠার আগে আমাদের প্রত্যেককে একটা লাইফ জ্যাকেট পরতে হলো।
আমাদের নৌকাটা একটা মটরবোট, ডিজেল ইঞ্জিনে চলে। মাঝি একটা স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বোটটা চালাচ্ছে, আমরা বোটের দুই পাশে বসে জলের ঢেউএর দোলায় অল্প অল্প দুলছি, অভিজ্ঞতাটা মন্দ নয়। তীরের কাছাকাছি দিয়ে আমাদের বোট চলছে, সেদিকে তাকালে তীরের গাছপালা ঘরবাড়ী পাহাড় সব চোখে পড়ছে, আর অন্যদিকে অকূল জল। ঠিক সমুদ্রের মতোই। যতদূর তাকাই শুধু জল আর জল। কোন ডলফিন চোখে না পড়লেও অনেক পাখী আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর জলের মধ্যে কিছু কচ্ছপ চোখে পড়লো, তারা চার পা চালিয়ে বেশ আরাম করে হাই স্পীডে জলের মধ্যে সাঁতার কেটে ভেসে যাচ্ছে। মাটিতে তারা আস্তে আস্তে এগোয়, কিন্তু জলের মধ্যে তারা বেশ স্বচ্ছন্দ। মিনিট পনেরোর মধ্যে কালিজায়ী দ্বীপে পৌঁছে গেলাম আমরা। সুজাতা আর সুভদ্রা মন্দিরে গেল পূজো দিতে, আমাদের ছেলেদের মনে অত ভক্তি নেই, সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য এই প্রিন্সিপল ফলো করে আমরা তিন জন একটা জলের মধ্যে রাবারের তৈরী একটা ভাসমান র্যাম্পের ওপর দিয়ে উঠে কিছুদূর গিয়ে চিল্কার সীমাহীন জলের শোভা দেখলাম।
এদিকে আকাশে তখন কালো মেঘ জড়ো হচ্ছে, ঝড় উঠবে নাকি? এখন ভালোয় ভালোয় ফিরে গেলে হয়।
আবার সবাই বোটে এসে বসলাম, মিনিট পাঁচেক যাবার পরে বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলো। আকাশের মেঘ আর বাষ্প নেমে এসেছে অনেক নীচে, তীরের পাহাড় বাড়ী গাছপালা সবই ঝাপসা দেখাচ্ছে আর তীব্র হাওয়ায় জলে বেশ ধেউ উঠছে। আমি সেই ঝাপসা পাহাড় আর জলের ঢেউয়ের কিছু ছবি তুলে নিলাম।
আমাদের ছোটবেলায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া একটি জনপ্রিয় গানের (শান্ত নদীটি, পটে আঁকা ছবিটি) শেষের দিকে এই লাইন গুলো ছিল।
জমছে কালো মেঘ, অন্ধকার ঘনায়/
তাই দেখে মাঝি আকাশে তাকায়/
রুদ্র ঝড়ে উঠবে নড়ে স্তব্ধ প্রকৃতি/
আমাদের মাঝি লোকটিকে দেখে মনে হচ্ছেনা তার কোন ভাবান্তর হচ্ছে, এই ধরণের ঝড় বৃষ্টি তার অনেক দেখা আছে, ভয়ের কোন কারণ নেই। আমরা সবাই চুপ, কার মনে কি চলছে বলা মুস্কিল, তবে আমি ভাবছি ঝড় আর বৃষ্টি যেন আমাদের নিরাপদে কূলে পৌঁছে যাওয়া পর্য্যন্ত একটু অপেক্ষা করে।
শেষ পর্য্যন্ত তাই হলো অবশ্য। এর প্রধান কারণ আমার মনে হয় মা কালীর আশীর্ব্বাদ। সুজাতা আর সুভদ্রা ভাগ্যিস তাঁর মন্দিরে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করে এসেছে। তা না করলে কি হতো বলা মুস্কিল।





যাই হোক, পারে পৌঁছবার পরে মাঝি বোট নোঙ্গর করে ছুটলো আমাদের জন্যে ছাতা আনতে। আমরা সেই ছাতার তলায় মাথা বাঁচিয়ে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ছুটে গিয়ে কাছেই একটি ঘরের ভিতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের ড্রাইভার সেখানে গাড়ী নিয়ে চলে এলো, আমরা গাড়িতে উঠে স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম।
বারকুল থেকে বৃষ্টির মধ্যে হোটেলে ফেরার কথাটা অনেকদিন মনে থাকবে। সামনের সীটে বসে আমি দেখছিলাম বৃষ্টি তে ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর, চারিদিক ঝাপসা, উইন্ডশীল্ডে ঝাঁপিয়ে পড়া বৃষ্টিকে সামলাতে ঝপাঝপ শব্দ করে দুটো ওয়াইপার উঠছে আর নামছে। যে রাস্তায় সকালে এসেছিলাম, এখন সে রাস্তা আর চেনার উপায় নেই। জীবনে এরকম বেশ কিছু মূহুর্ত্ত আর অভিজ্ঞতা আসে যা চট করে ভোলা যায়না। আমাদের চিল্কা যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা সেই রকম।
ড্রাইভার ছেলেটি বলতেই হবে ওই দুর্য্যোগের মধ্যে খুব সুন্দর গাড়ী চালিয়েছিল সেদিন।


৬) চতুর্থ দিন – ২৫/৮/২২
আজ গোপালপুরে আমাদের শেষদিন। আজকের সকালটা আরাম করে সমুদ্র তীরে রোদ বাঁচিয়ে ছাতার তলায় বসে গল্প করে কেটে গেল। নরম ভেজা বালিতে জলে পা ডুবিয়ে হাঁটতে বেশ লাগে।
সুভদ্রা আর আমি একটু হোটেলের সুইমিং পুলে নামলাম। পুলে আর কেউ নেই শুধু আমরা দু’জন। ট্রাঙ্ক এর বদলে একটা শর্ট পরে এসেছি আমি, যেটা পরে সমুদ্রর তীরেও হাঁটা যায় আবার পুলেও নামা যায়।
ঘর থেকে বেরোবার আগে যে মানিব্যাগটা পকেটে নিয়ে বেরিয়েছি, পুলে নামার আগে তা খেয়ালই ছিলনা। জলে কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে দু’তিনটে ল্যাপ নেবার পরে সুভদ্রার সাথে জলের মধ্যেই দাঁড়িয়ে গল্প করছি, হঠাৎ মনে হলো পকেটটা এত ভারী লাগছে কেন?
পিছু কেন ভারী ঠেকে ভাবে কোচোয়ান…
চকিতে বুঝলাম কেন। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে ব্যাগটা বের করে বুঝলাম যা কেলো হবার তা হয়ে গেছে। টাকার নোট সব ভিজে। ডেবিট ক্রেডিট কার্ডের কিছু হবেনা। কিন্তু নোট গুলো শুকোনো একটা বড় কাজ এখন।
ঘরে ফিরে নোট গুলো ব্যাগ থেকে বের করে বিছানায় শুকোতে দিলাম। ব্যাগটাও সপসপে ভিজে।
রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্তবুড়ীর দিদিশ্বাশুড়ীর তিন বোনের কথা লিখেছিলেন, আমার অবস্থা অনেকটা তাঁদের মত।
কোন দোষ পাছে ধরে নিন্দুকে, নিজে থাকে তারা লোহাসিন্দুকে/
টাকাকড়ি গুলো হাওয়া খাবে বলে রেখে দেয় খোলা জানলায়/
আমি অবশ্য টাকার নোট গুলো জানলায় রাখিনি, বিছানায় রেখে ফুল স্পীডে ফান চালিয়ে তাদের হাওয়া খাইয়েছিলাম।
দুপুরে আজ সবাই মিলে স্বস্তি হোটেলে লাঞ্চে গেলাম। কালকের সেই ম্যানেজার ভদ্রলোক আমাদের খুব খাতির করে বড় একটা গোল টেবিলে বসালেন। খয়রা মাছটা দেখলাম অনেকটা তেলাপিয়ার মত। খুব সুস্বাদু রান্না, বেশ ভাল লাগলো খেতে। শেষ পাতে ছানাপোড়া।
কাল আমরা কলকাতা ফিরছি, সাথে বাড়ীর জন্যে কিছু ছানাপোড়া নিয়ে গেলে কেমন হয়?
ম্যানেজার ভদ্রলোক কে আমাদের জন্যে কিছু ছানাপোড়া প্যাক করে দিতে বললাম। তিনি বললেন, “কাল ভুবনেশ্বর যাবার পথে ল্যাংলেশ্বর নামে একটা ছোট শহর পড়বে। ওই শহরে কোন এক ভালো দোকান থেকে আপনারা ছানাপোড়া কিনে নেবেন, কেননা ওখানকার ছানাপোড়াই হল বিখ্যাত, কাছাকাছির মধ্যে সব চেয়ে নাম করা।”
লাঞ্চের পরে আবার একটু বিশ্রাম সেরে আমরা সমুদ্রের ধারে চা আর ঝালমুড়ি নিয়ে বসে গেলাম। নানা আলোচনার মধ্যে ফেনার মুকুট পরা সমুদ্রের ঢেউয়ের ক্লান্তিহীন আসা যাওয়া দেখতে দেখতে পশ্চিমের আকাশ কমলা আর লাল রং এ ভরিয়ে সুর্য্যাস্ত হল, তারপর নেমে এলো অন্ধকার।





৭) পঞ্চম দিন – ২৬/৮/২৩ – ফেরা
কাল ফ্লাইটের চেক ইন আর বোর্ডিং পাস হোটেল থেকে লোপামুদ্রা করিয়ে রেখেছে।
আজ ব্রেকফাস্ট এর পর সকাল সকাল হোটেল থেকে চেক আউট করে মালপত্র গাড়ীতে তুলে বেরিয়ে পড়লাম। ভুবনেশ্বর পর্য্যন্ত চার ঘন্টার লম্বা রাস্তা।
পথে ল্যাংলেশ্বর জায়গাটা পড়ল। ড্রাইভার আমাদের একটা মশহুর ছানাপোড়া দোকানের সামনে এসে গাড়ী থামালো। আমরা যে যার দরকার মত কেউ এক কেজি কেউ দুই কেজি ছানাপোড়া কিনে নিলাম।
সুজাতা বলল, ল্যাংলেশ্বর! কি নাম বাবা…
দীপঙ্কর বলল “আরে ভাই, এই নামটা কি করে হলো জানো? এর একটা হিস্ট্রি আছে। একবার বহু বছর আগে ঈশ্বর নামে একটি লোক এই জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল, সে ছিল ছানাপোড়া তৈরী করার একজন বিখ্যাত কারিগর। দেশজুড়ে তার সুনাম। এখানকার কিছু লোক তাকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়, তার ফলে পড়ে গিয়ে তার পা ভেঙে যায়, সে আর কোথাও যেতে পারেনা। এখানেই সে ছানাপোড়া তৈরীর কারখানা খোলে এবং ক্রমে ক্রমে এই জায়গাটা ছানাপোড়ার জন্যে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। সেই থেকে এই জায়গাটার নাম হয়েছে ল্যাংলেশ্বর।”
সুভদ্রা বলল ভ্যাট্, দীপঙ্করের যত হাবিজাবি গল্প।
আমাদের প্লেন ছাড়ছে বেলা দুটো। দমদম পৌঁছবো বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদ। আমি ফোনে আমাদের ড্রাইভার কে বাড়ী থেকে গাড়ীটা নিয়ে দমদমে আসতে বলছি।
“একটু আগে এসে গাড়ীতে তেল আছে কিনা দেখে নিও, টায়ার গুলোতে হাওয়া ভরতে হতে পারে, তিনটের একটু আগে দমদম পৌঁছে যেও”, ইত্যাদি বলে যাচ্ছি আর ভাবছি মোবাইল ফোন যখন ছিলনা, তখন আমরা কি করে বেঁচে ছিলাম!
দীপঙ্কর বসে ছিল পিছনে, সে বললো ইন্দ্রজিৎ এর ড্রাইভার কে এই পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ দেওয়া দেখে আমার একটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে।
কি গল্প?
এক কোম্পানীর মালিক তাঁর এক কর্ম্মচারীকে পাঠাবেন আসানসোলে তাঁর এক খদ্দেরের কাছ থেকে একটা চেক নিয়ে আসতে। ইয়ার এন্ড এসে যাচ্ছে, তাই চেক টা পাওয়া খুব দরকারী।
কর্ম্মচারী ছেলেটি খুব বিশ্বাসী আর বশংবদ।
মালিক তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ দিচ্ছেন এই ভাবে।
শোনো তুমি সামনের সোমবার ভোরবেলা হাওড়া স্টেশন থেকে ব্ল্যাক ডায়মন্ড ধরবে, বুঝেছো?
হ্যাঁ, স্যার!
ব্ল্যাক ডায়মন্ড প্ল্যাটফর্ম আট থেকে সকাল সাড়ে ছ’টায় ছাড়বে, তার মানে তোমায় হাওড়া স্টেশনে পৌনে ছটার আগে পৌঁছে যেতে হবে, বুঝতে পেরেছো?
হ্যাঁ, স্যার!
তুমি সেদিন ভোর চারটে তে এলার্ম দিয়ে ঘুম থেকে উঠবে, উঠে সব কাজ সেরে সাড়ে চারটের মধ্যে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়বে। তুমি তো ফার্ণ রোডে আলেয়া সিনেমার কাছে থাকো, ওখান থেকে গড়িয়াহাটে হেঁটে যেতে তোমার দুই তিন মিনিট লাগবে, সেখানে গিয়ে তুমি পাঁচ নম্বর বাস ধরবে, ফার্স্ট বাস আসে ভোর পাঁচটায় তাই তার আগেই তোমায় বাস স্টপে পৌঁছে যেতে হবে, দেরী করবেনা, বুঝেছো?
হ্যাঁ, স্যার!
আচ্ছা ওই সকালে বাসে তুমি হাওড়া স্টেশনে ছ’টার আগেই পৌঁছে যাবে, সেখানে গিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল ধরে টিকিট রিসার্ভেশন কাউন্টারে লাইন দিয়ে ব্ল্যাক ডায়মন্ড চেয়ার কারে তোমার সীট রিসার্ভ করে টিকিট কিনবে। ঠিক আছে?
হ্যাঁ, স্যার! এবার আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম্মে গিয়ে ট্রেণে উঠে নিজের সীটে গিয়ে বসবে। আসানসোল স্টেশনে ট্রেণ পৌছবে সকাল ন’টায়। কিন্তু তুমি যে অফিসে যাবে তারা খোলে বেলা দশটায়। তাই তুমি ট্রেণ থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানে বসে মিনিট পনেরো চা খেয়ে নিয়ে নিও। ক্লীয়ার?
হ্যাঁ, স্যার!
তারপরে বাইরে বেরিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে ওদের অফিসে গিয়ে আমার চিঠিটা ওদের দেখিও। ওরা তোমায় এক টা চেক দেবে, সেটা নিয়ে তুমি আবার স্টেশনে ফিরে বিকেল চারটে তে কোলফিল্ড এক্সপ্রেস ধরে হাওড়া ফিরে এসো।
সোমবার ন’টা নাগাদ মালিকের মোবাইল ফোনে একটা কল এলো। সেই বশংবদ কর্ম্মচারীর ফোন।
এবার তাদের দু’জনের কথাবার্ত্তা এরকম হলো।
কি হলো? কি ব্যাপার? সব ঠিক আছে তো? ভোরবেলা গড়িয়াহাট থেকে ফার্স্ট বাস পাঁচ নম্বর ধরেছিলে?
হ্যাঁ, স্যার!
বেশ! তারপর? ট্রেণের টিকিট কাটলে? সীট রিসার্ভ করতে পারলে?
হ্যাঁ স্যার!
বেশ বেশ! আসানসোল পৌছে গেছো?
হ্যাঁ স্যার!
তাহলে তো সবই ঠিকঠাকই করেছো। ফোন করছো কেন? কোন প্রবলেম?
হ্যাঁ স্যার একটা প্রবলেম হয়েছে।
মালিক একটু অবাক। কি আবার প্রবলেম হলো।
স্যার এই দোকানে চা পাওয়া যায়না, কেবল কফি। আমি কি কফি খেতে পারি, স্যার?

-
এ আবার কি অসভ্যতা

মার্চ ৩১, ২০১৮। কাল আমরা বন্ধুরা মাদ্রিদ থেকে লিসবনে এসে পৌঁছে হলিডে ইন হোটেলে উঠেছি।
আজ সকালে আমাদের half day লিসবন সিটি ট্যূর।
হোটেলে সকাল ন’টায় বাস আসবে। আমরা সবাই রেডি হয়ে লাউঞ্জে এসে সোফায় বসে আছি।
এমন সময় হোটেলের বাইরে একটা বড় বাস এসে দাঁড়ালো, এবং একটু পরে একটি সুদর্শন যুবক আমাদের সামনে এসে বললো You are the group of Prodosh Mitra? My name is Nunu and I shall be your guide today…
নুনু?
এ আবার কি অসভ্য নাম?
অবশ্য পর্তুগীজ ভাষায় অসভ্য নয় নিশ্চয়, নাহলে ওরকম গর্ব্ব আর আনন্দের সাথে কেউ বলে আমার নাম নুনু? পরে জেনেছিলাম কথাটার মানে হলো petite ছোটখাটো, আদরের।
অসভ্য কথা শুনলেই মেয়েদের খুব হাসি পায়, আমাদের বৌদের মধ্যেও স্বাভাবিক ভাবেই একটা চাপা হাসির গুঞ্জন উঠলো। আমরা ছেলেরা অবশ্য অসভ্য কথাকে হাসির ভাবিনা, তবু আমরাও একটু চোখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। ছেলেটির জন্যে একটু সহানুভূতিও অনুভব করলাম, বেচারা জানেওনা কি বিশ্রী একটা নাম তার গায়ে আটকে আছে চিরজীবনের মতো।
নুনু ছেলেটি কিন্তু খুব স্মার্ট, সুন্দর কথা বলে, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সাথে তার বেশ ভাল আলাপ হয়ে গেল।
কিন্তু মুস্কিল হলো বাসে সে বসে আছে একেবারে সামনে, তার সাথে কথা বলতে গেলে বা তাকে কোন প্রশ্ন করতে গেলে তাকে নাম ধরে ডাকতে হবে।
সুমিতা সিদ্ধার্থ কে বলল তুমি ওকে নাম ধরে ডাকেবেনা। কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে বলবে Excuse me?
নাম ধরে ডাকতে হবে তাই আমরা কেউ ই নুনুকে কোন প্রশ্ন করছিনা। কিছুক্ষণ বকবক করে নুনু ড্রাইভারের পাশের সীটে সামনের দিকে মুখ করে বসে আছে।
এদিকে বাসে একদম পিছনে বসে আছি আমি আর প্রদোষ। বাসে এ সি চলছেনা, বেশ গরম। তুতু বসে আছে একদম সামনে, প্রদোষ তুতু কে বললো এই নুনু কে বলো তো এ সি টা চালাতে।
তুতু পিছন দিকে প্রদোষ কে একটা বিশ্রী দৃষ্টি দিয়ে বললো, না আমি বলতে পারবোনা, তুমি বলো।
প্রদোষ আর কি করে, সে কয়েকবার মিন মিন করে খুব নীচু গলায় মিস্টার নুনু, মিস্টার নুনু বলে ডাকলো, কিন্তু অত আস্তে বললে নুনু শুনবে কি করে? তখন মরিয়া হয়ে লজ্জা শরম বিসর্জ্জন দিয়ে প্রদোষ বেশ জোরে ডেকে উঠলো – মিস্টার নুনু !
এবার কথাটা নুনুর কানে গেছে, সে মুখ ফিরিয়ে বললো, ইয়েস?
প্রদোষ বলল Please will you turn the air conditioning on?
Sure, বললো নুনু।
কিছুক্ষন পরে আবার এক মুস্কিল। মাইক্রোফোন থেকে একটা খসখস আওয়াজ হচ্ছে, কানে লাগছে।
প্রদোষ এবার তার সংকোচ ছাড়িয়ে উঠেছে। তার গলায় এখন বেশ জোর।
আমি ওর পাশে বসে ছিলাম, আমি বললাম মিস্টার বলার কি দরকার, বাচ্চা ছেলে, ওকে নাম ধরেই ডাকোনা।
বজ্রগম্ভীর স্বরে প্রদোষ ডেকে উঠলো এই নুনু, নুনু!
সামনে বসে ছিল তুতু, সে পিছন ফিরে প্রদোষ কে বলল “এসব কি অসভ্যতা হচ্ছে?”
কিন্তু প্রদোষ কে থামানো যাচ্ছেনা, সে ওই খসখস আওয়াজ আর সহ্য করতে পারছেনা।
সে আবার পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠলো “নুনু, এই নুনু! আওয়াজ টা বন্ধ কর্ মাইরী…”

-
আরশোলা ভাজা, টিকটিকির চাটনী

মার্চ, ২০১৭। আমরা কুয়েতের বন্ধুরা ভিয়েতনাম আর কাম্বোডিয়া বেড়াতে এসেছি।
আমাদের ট্রিপ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। গত সাত দিন ভিয়েতনামে হানয় আর হ্যালং বে তে ঘুরে আর কাম্বোডিয়াতে সীম রীপ (আঙ্কোর ভাট মন্দির) দেখে এখন আমরা বাসে চেপে চলেছি কাম্বোডিয়ার রাজধানী Phnom Penh এর দিকে। সেখানে আমাদের প্ল্যান হলো Khmer Rouge এর বন্দীদের যেখানে রেখে অত্যাচার করা হতো, সেই বিখ্যাত Tuol Sleng prison দেখা। তারপরে মেকং নদীতে নৌকাভ্রমণ।
পরের দিন দেশে ফেরা।
সীম রীপ থেকে Phnom Penh ঘন্টা পাঁচেকের রাস্তা। বিকেলের আলো থাকতে পৌঁছতে হবে তাই আমরা সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট খেয়ে মালপত্র বাসে তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। পথে কোথাও একটা ব্রেক নিয়ে কিছু খেয়ে নেবো।
মার্চ মাসে তেমন গরম পড়েনি তখনো, আমরা বাসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখছি কাম্বোডিয়ার গ্রামের দৃশ্যপট। আমাদের বাংলাদেশের গ্রামের সাথে মতোই অনেকটা। আজ দিনটা বেশ সুন্দর, নীল আকাশ, নরম রোদ, চারিদিকে সবুজের মেলা। বিস্তীর্ণ সবুজ ক্ষেত, চারিদিকে তাল আর নারকেল গাছের সারি। মাঝে মাঝে কিছু জনপদ পেরিয়ে যাচ্ছি। কিছু কৃষক কে মাঠে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে, তাদের মাথায় সাদা ত্রিভুজ টোকা। গ্রামের বাড়ীগুলোর ডিজাইন একটু অন্যরকম, আমাদের চোখে বেশ নতুন লাগলো। আর তাদের মধ্যে পাকাবাড়ীর বদলে বাঁশের তৈরী বাড়ীই বেশী।

মাঝপথে আমাদের ড্রাইভার একটা জায়গায় এসে বাস থামালো। দেখলাম এখানে একটা বেশ বড় বাজার বসেছে। তরী তরকারী ফলমূল এই সব সাজিয়ে নিয়ে বসেছে বিক্রেতারা, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে দরদাম করে কেনাকাটা করছে বহু লোক। আজ রবিবার, ছুটির দিন, তাই বোধ হয় ভীড় এক্টূ বেশী। আমরা একটা চায়ের দোকান খুঁজে চা খাচ্ছি, এমন হঠাৎ সমবেত মেয়েলী গলায় একটা আর্ত আওয়াজ পেলাম।
“ও মাগো! দেখে যাও শিগগিরি!”
আমাদের বৌরা যথারীতি দোকান গুলোতে ঘুরে দেখতে গেছে কেনার মত কিছু স্যুভেনির সেখানেপাওয়া যায় কিনা দেখতে। সেখানে গিয়ে ঢালাও করে যা বিক্রী হচ্ছে তা’ দেখে তাদের এই সমবেত আর্ত্তনাদ।
আমরা ছেলেরা কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে আমরাও তাজ্জব।
এক এক টা দোকানে পর্য্যাপ্ত পরিমাণে পাহাড়ের মত উঁচু ঢিপ করে রাখা আছে কালো কালো নানা ধরণের পতঙ্গ ভাজা। তাদের মধ্যে আরশোলা আছে, আরো কি কি আছে কে জানে, উচ্চিংড়ে, ফড়িং, locust ইত্যাদি জাতীয় সব প্রাণী। কাঁচের শিশিতে তেলের মধ্যে চার পা ছড়িয়ে উল্টো হয়ে ভাসছে টিকটিকি। আচার নাকি? হতেও পারে।
আমার মনে আছে রাজগীর থেকে পাটনা ফেরার পথে একটা দোকানে মৌরলা মাছ ভাজা পাওয়া যেত। আমরা প্লেট ভর্ত্তি করে নিয়ে মনের সুখে খেয়েছি। আর কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে Carniviore নামে একটা বেশ নামী রেস্তোরাঁ আছে, সেখানে মেনু তে বীফ, পর্ক, চিকেন, হরিণ ইত্যাদি ছাড়াও অন্যান্য নানা বন্য জন্তুর মাংস – তার মধ্যে আছে জলহস্তী, গণ্ডার, হাতি, সিংহ, চিতাবাঘ, হায়েনা ইত্যাদি। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ উৎসাহ নিয়ে সে সব অর্ডার করেছিল, আমি অবশ্য risk নিইনি।
কিন্তু এখানে এই সব কেঁচো সুঁওপোকা ব্যাং টিকটিকি এমন কি সাপ দেখে এই সব কেউ ভালবেসে খায় ভেবে বেশ বমি পাচ্ছিল আমাদের সবার।


আরও অবাক করার মত ব্যাপার হলো সেই সব অখাদ্য ভালবেসে কিনছে যে খদ্দেররা, তাদের মধ্যে আছে বেশ কিছু সুন্দরী কমবয়েসী মেয়েরাও। তাদের বেশভূষা দেখলে মনে হয় তারা বেশ সম্পন্ন পরিবারের উচ্চশিক্ষিত মহিলা, তাদের অনেকের হাতে ফ্যাশানী হ্যান্ডব্যাগ, চোখে রোদচশমা।
আজ রবিবার, সন্ধ্যায় বন্ধুবান্ধব এর সাথে বসে পার্টিতে হুইস্কির সাথে জমিয়ে আরশোলা আর উচ্চিংড়ে ভাজা, পরে ডিনারে ডালভাতের সাথে ব্যাঙএর চপ, সাপের ডালনা, আর টিকটিকির আচার?
ওয়াক!
মনে মনে ভাবলাম ভাগ্যিস এই সব দেশে আমি জন্মাইনি।


-
আশ্চর্য্য ভ্রমণ – মুর্শিদাবাদ (১২-১৪ ডিসেম্বর, ২০২৩)

হাজারদুয়ারী প্রাসাদ
প্রথম দিন ১২/১২/২০২৩
১) ট্রেণ যাত্রা
ছোটবেলার স্কুলের বন্ধুদের সাথে আড্ডায় আজকাল KP mপ্রায়ই কোথাও একসাথে বেড়াতে যাবার কথা ওঠে। বিশেষ করে কিছুদিন আগে দীপঙ্কর অমিতাভ সুজাতা সুভদ্রা আর আমি একসাথে গোপালপুর বেড়িয়ে আসার পর আমাদের এই যৌথ বেড়ানোর প্রতি আগ্রহ বেশ বেড়ে গেছে। এবার আমরা যাচ্ছি মুর্শিদাবাদ, আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে প্রবীর আর সুপ্রিয়া।
মুর্শিদাবাদে আমাদের কাশিমবাজারের রাজবাড়ীতে দুই রাতের থাকার বন্দোবস্ত করছে অমিতাভ। কাশিমবাজারের আজকের রাজা প্রশান্ত রায়ের ছেলে পল্লব রায় এখন এই রাজবাড়ীটার দেখাশোনা করে। সে অমিতাভর বন্ধু, তারা দু’জনেই Calcutta Club এর সদস্য, এবং আমাদের এই ট্রিপের সব বন্দোবস্তই পল্লব করে দিয়েছে।
মঙ্গলবার ১২ই ডিসেম্বর সকাল ন’টায় আমাদের ট্রেণ হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস কলকাতা স্টেশন থেকে ছাড়বে।
কলকাতা স্টেশন আবার কোথায়?
আমরা কেউ ওই স্টেশন চিনিনা। যাই হোক, আমাদের সকলের ড্রাইভাররা জায়গাটা চেনে। তাই অসুবিধে হয়নি। জায়গাটা হলো উত্তর কলকাতায়, আর জি কর মেডিকাল কলেজ আর হাসপাতালের কাছে। আমাদের বেরোতে একটু দেরী হয়েছে, তবে এই সাত সকালে কলকাতার রাস্তা ফাঁকা। তবু আমরা যখন স্টেশনে পৌঁছলাম তখন ট্রেণ ছাড়বার বেশী দেরী নেই। দীপঙ্কর, প্রবীর, আর অমিতাভ ঠিক সময়ে পৌঁছে গেছে, আমাদের দেরী দেখে ওরা উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করল কয়েকবার।
ট্রেণ দাঁড়িয়ে আছে লাইনের ওপারের প্ল্যাটফর্মে, ওভারব্রীজ দিয়ে লাইন ক্রস করার সময় হাতে নেই, আমাদের বুড়ো কুলী আমাদের মাল মাথায় নিয়ে হেঁটে লাইন ক্রস করে আমাদের ট্রেণে উঠিয়ে দিলো। সেই কুলীটির অভিজ্ঞতা আর উপস্থিত বুদ্ধির জন্যে সেদিন ট্রেণ মিস করিনি।
ট্রেণের চেয়ার কারের টিকিট কেটে রেখেছিলো প্রবীর।
একটু পরেই ট্রেণ ছেড়ে দিলো। মন্থর গতিতে আমরা কলকাতা শহর আর শহরতলীর মধ্যে দিয়ে এগোতে লাগলাম, কারুর হেঁসেল, কারুর রান্নাঘর, কারুর উঠোন দুই পাশে দেখা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কিছু কোঠাবাড়ী, তার বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে, ছাতে শাড়ি শুকোচ্ছে। দুই একটা পুকুর চোখে পড়ছে সেখানে সকালবেলায় দাঁতন করছে কিছু লোক, তাদের পরণে গামছা, হয়তো এর পরে পুকুরে নেমে স্নান সেরে নিয়ে তারা অফিস যাবার জন্যে তৈরী হবে।
একটা নতুন দিন শুরু হচ্ছে, ঘুম ভাঙ্গছে কলকাতা শহরের।
একটু পরেই অবশ্য শিয়ালদা লাইনে এসে পড়ার পরে চেনা স্টেশন এক এক করে আসতে লাগলো। দমদম জংশন, বরানগর, বেলঘরিয়া, আগরপাড়া। বহুদিন আগে, ১৯৬৬ সালে, আমি তখন খড়্গপুরে থার্ড ইয়ার, গরমের ছুটিতে আমার ট্রেনিং ছিল বেলঘরিয়াতে Texmaco কোম্পানীতে। আগরপাড়াতেও Texmaco র একটা ফ্যাক্টরী ছিল, তাই কাজ থাকলে বেলঘরিয়া থেকে আগরপাড়া ও অনেক বার লাইন ধরে হেঁটে গেছি। ওই স্টেশনগুলো পেরিয়ে যাবার সময় সেই কলেজ জীবনের দিনগুলোর স্মৃতি মনে ভেসে আসছিল।
ট্রেণ বেশ ভাল স্পীড নেবার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল কামরায় হকারদের আনাগোনা। তাদের মধ্যে বেশ কিছু ভিখারী, একটি বিকলাঙ্গ শিশু দেখলাম ঘষ্টে ঘষ্টে কামরার এক দিক থেকে অন্য দিকে দুই পায়ে ভর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তার সাথের লোকটি করুণ চোখে হাত পেতে আছে। জীবিকা অর্জ্জনের জন্যে এই শিশুটিকে ব্যবহার করছে তার পরিবার। এই ধরণের দৃশ্য আমাদের সবার মোটামুটি পরিচিত। আমরা কেউ কেউ ব্যাগ থেকে কিছু খুচরো পয়সা বের করে ওই বাড়িয়ে দেওয়া হাতে গুঁজে দিই। আবার কেউ কেউ উদাস চোখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। জগতের সব দুঃখ কষ্ট অনাচার অবিচার অসাম্য দূর করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
এছাড়া আছে খাবার দাবার, ব্রেকফাস্টের জন্যে চা আর স্যান্ডুইচ বিক্রেতারা। বেশ কয়েকবার আমরা লেবু চা কিনে খেলাম। লেবু চার কাগজের কাপ গুলো এত ছোট যে বার বার না খেলে ঠিক চা খেয়েছি বলে মনেই হয়না।
এটা কি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট চায়ের কাপ?
আর হকারদের কথা তো বলে শেষ করাই যাবেনা। পৃথিবীতে এমন কোন জিনিষ নেই, যা এখানে পাওয়া যাবেনা। অফিস স্টেশনারীর পসরা সাজিয়ে একটা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার হাতে আছে A4 কাগজ, পেন্সিল, বল পয়েন্ট পেন, ফাইল, স্টেপলার, হোলপাঞ্চ, টর্চ, ব্যাটারী এবং আরো অনেক এরকম অত্যন্ত দরকারী জিনিষ। লোকে পটাপট কিনছে দেখলাম। একজন রংচঙে গামছা বিক্রী করছিল, সুভদ্রা তার কাছ থেকে দুটো লাল নীল বেগুণি রঙের চেক আর স্ট্রাইপ করা গামছা কিনে নিল। ওই গামছা দিয়ে সুন্দর কামিজ কিংবা টপ্ বানানো যাবে।
এরপরে একটি লোক এলো যে পিঠ চুলকানোর সুবিধের জন্যে লম্বা প্লাস্টিকের লাঠি বিক্রী করছে। লাঠিটার শেষটা আঙুলের নখের মত ছুঁচলো, চুলকানোর সুবিধের জন্যে।
বিয়ের পরে বেশ কয়েক বছর মেয়েদের এই নিয়ে কোন অসুবিধে থাকেনা। তখন তাদের বাধ্য বরেরা বললেই তারা বৌদের মাথা পা বা কোমর টেপার জন্যে প্রস্তুত। “শুনছো, পিঠের এই জায়গাটায় একটু চুলকে দাওনা গো”, বললেই তারা হাসিমুখে এসে বৌদের হুকুম তামিল করতো।
কিন্তু বিয়ের পঞ্চাশ বছর পরে এখন সেই বরেদের আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তন হয়ে গেছে। এখন তাদের দেখলে আর চেনাই যায়না।
একজন তো সারাদিন ভুরু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে শেয়ার মার্কেটের ওঠা পড়া দেখে। আর একজন রাত দুটো থেকে রাত চারটে টি ভি চালিয়ে ফুটবল খেলা দেখে যায়। আর তৃতীয় জনের অবস্থা আরো খারাপ, সারাদিন তার ফোন আসে, কে বা কারা যে তাকে এত ফোন করে কে জানে, তার ওপরে সে আবার রাত্রে ল্যাপটপ খুলে কি যে হাবিজাবি লেখা লেখে, তার কোন মাথামুন্ডু নেই।
বৌদের সাথে কথা বলার সময় এখন এদের কারুর নেই।
সখীর হৃদয় কুসুম কোমল/কার অনাদরে আজি ঝরে যায়/
কেন কাছে আসো, কেন মিছে হাসো/ কাছে যে আসিত, সে তো আসিতে না চায়/
সুতরাং, এখন হলো নিজের পিঠ নিজে চুলকোবার দিন। কিন্তু মুস্কিল হলো নিজের পিঠ নিজে চুলকোনো অত সোজা কাজ নয়। ভগবান আমাদের শরীরের ডিজাইন করার সময় পিঠ আর হাতের ভারসাম্যের কথাটা চিন্তা করেননি। ফলে পিঠের অনেক জায়গাই আমাদের হাত পৌঁছয়না। আর পিঠের যে সব জায়গা্য আমাদের হাত পৌঁছয়না সেই সব জায়গাই অবধারিত বেশি চুলকোয়।
সে এক মহা যন্ত্রণা।
সুজাতা সুপ্রিয়া আর সুভদ্রা তিনজনেই প্লাস্টিকের পিঠ চুলকোনোর লাঠি কিনে নিলো।
এই সব যখন চলছে তখন আমাদের ট্রেণ একটার পর একটা স্টেশন ক্রস করে যাচ্ছে। অমিতাভ মাথা নীচু করে চোখ কুঁচকে তার ফোনে স্টেশন এর নাম দেখে যাচ্ছে, বেথুয়াডহরী, রানাঘাট, কৃষ্ণনগর…
খুব কম স্টেশনেই আমাদের ট্রেণ থামছে। বেলঘরিয়ার পরে রাণাঘাট আর তার পরে কৃষ্ণনগর। প্রত্যেক স্টেশনে মাত্র এক মিনিটের জন্যে ট্রেণ দাঁড়ায়। সামনে বহরমপুর আর তারপর আমাদের স্টেশন মুর্শিদাবাদ। এক মিনিটের মধ্যে নামতে হবে, তাই আমরা আগে থেকেই ওপরের র্যাক থেকে আমাদের ব্যাগ নামিয়ে প্রস্তুত হয়ে নিয়েছি।
অমিতাভ দুটো Toyota Innova SUV বলে রেখেছিল, সেই দুটো গাড়িতে চড়ে আমরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গন্তব্য কাশিমবাজারের রাজবাড়ী।

২) কাশিমবাজার রাজবাড়ী
স্টেশন থেকে কাশিমবাজারের রাজবাড়ী বেশী দূর নয়। পথে আসতে আসতে মুর্শিদাবাদ শহরের প্রধান এবং জনবহুল, ব্যস্ত এবং ব্যবসায়িক অঞ্চল লালবাগের রাস্তাঘাটে প্রচুর ভীড় আর রাস্তায় অনেক ঘোড়ায় টানা গাড়ী চোখে পড়ল। বিয়ের পরে সুভদ্রা আর আমি একবার ১৯৭৫ সালে মুর্শিদাবাদে এসেছিলাম। প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে মুর্শিদাবাদে এসে রাস্তার ভীড় আর ঘোড়ায় টানা গাড়ী দেখে সেই পুরনো দিনগুলো আবার মনের মধ্যে ফিরে এলো।
সেবার একদিন একটা সাইকেল রিক্সায় চেপে আমরা অনেক জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম, হাজারদুয়ারী, মোতিঝিল এই সব জায়গার নাম এখন আবছা মনে পড়ে, কিন্তু এখন এতদিন পরে স্মৃতি একেবারেই ঝাপসা। আমার ক্যামেরায় অনেক ছবিও তুলেছিলাম সেবার, তার মধ্যে আমার সুন্দরী নতুন বিয়ে করা বৌয়ের নানা ভঙ্গিমায় তোলা ছবিই বেশী ছিল।
এই প্রাচীন শহর অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। এই শহরে ছড়িয়ে আছে বহু দর্শনীয় স্থান, যেখানে বাংলার ইতিহাস জানার জন্যে যেতেই হবে। দুঃখের বিষয় বিয়ের পরের সেই দিনগুলোতে অতীতের ইতিহাস আমার জীবনে ততোটা গুরুত্ব পেতোনা, তখন বর্ত্তমানেই মজে ছিলাম। এখন এই বয়েসে এসে ইতিহাস জানার ইচ্ছেটা বেশী।
একসময় সমস্ত বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল মুর্শিদাবাদের নবাবী মসনদ থেকে। শুধু মাত্র নবাবরাই নন, বর্ধিষ্ণু এই অঞ্চলে ছিল বহু জমিদার বংশের প্রভাব ও প্রতিপত্তি। পরে সেই ধনী জমিদারদের মধ্যে অনেকে ইংরেজ শাসকদের কাছে রাজা উপাধি পান্। কাশিমবাজার রাজবাড়ি সেই ইতিহাসেরই মূর্ত প্রতীক।
আমরা কাশিমবাজারের রাজবাড়ী পৌঁছে গেলাম মিনিট পনেরোর মধ্যে।
প্রথম দর্শনে সামনে থেকে দেখে ধবধবে সাদা বাড়ীটির ইউরোপীয় (Romanesque) স্থাপত্য আমার চোখে খুব সুন্দর লাগলো। সামনে ত্রিভুজাকার façade, এবং তার তলায় বেশ কিছু স্তম্ভ, আর বাড়ীটির সামনে ঘন সবুজ রং এর ঘাসের গালিচা বাড়ীর সাদা রং এর সাথে একটা অদ্ভুত সুন্দর contrast তৈরী করে বাড়ীটার একটা বনেদী চেহারা দিয়েছে।
১৯৭৪ সালে সুভদ্রার আর আমার বিয়ের বৌভাতের অনুষ্ঠান হয়েছিল কলকাতায় কাশিমবাজার রাজবাড়ীতে। এলগিন রোড আর হরিশ মুখার্জ্জী রোডের মোড়ে অবস্থিত ওই রাজবাড়ীটি তেও যতদূর মনে পড়ছে ধবধবে সাদা প্রাসাদোপম বাড়ীর সামনে বিশাল সবুজ লন্ ছিল। আমার মাস্তুতো দাদা রতনদা’ বোধহয় ওই রাজবাড়ীতে কাউকে চিনতেন, তিনিই বৌভাতের জন্যে বাড়ীটির বন্দোবস্ত করে দেন্।
যাই হোক্, ভিতরে ঢুকে রিসেপশনে চেক ইন করে দোতলায় যার যার নিজের ঘরে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নীচে একতলায় নেমে এলাম আমরা। সেখানে একটা বিশাল ডাইনিং রুম, এক দিকে একটা লম্বা টেবিলে আমাদের জায়গা করা হয়েছে। শেফ ভদ্রলোক আমরা পল্লবের চেনা বলে এসে খুব খাতির করে এসে আমাদের সাথে কথা বলে গেলেন।
লাঞ্চের মেনু পুরো বাড়ীর খাবার, সুক্তো, ডাল, ভাত, পাঁচমিশেলী তরকারী, মাছের ঝোল, মাংস, চাটনি – সব সুস্বাদু বাঙালী রান্না। শেষ পাতে মিষ্টি ছিল লাল দই, আর বহরমপুরের বিখ্যাত মিষ্টি, ছানাবড়া। কাশিমবাজারের রায় পরিবারের এখন একটা মিষ্টির দোকান কলকাতায় খুব নাম করেছে, তার নাম “Sugarr and Spice”,মুর্শিদাবাদের রাজবাড়ীতেও তাদের একটা দোকান আছে সেখান থেকেই আবাসিক দের জন্যে মিষ্টি সরবরাহ করা হয়।
জমিয়ে খেলাম সবাই, বেশ ক্ষিদেও পেয়েছিল। দুই দিনের মধ্যে মুর্শিদাবাদ শহরে যত দেখার জায়গা আছে, সব তো চাক্ষুস করা সম্ভব নয়, এই বয়সে এসে বেশী ছোটাছুটিও আমরা করতে চাইনা। হোটেলের রিসেপশনে গিয়ে আমরা আজ আর সামনের দুই দিন কোথায় কোথায় যাওয়া যায় আর কি কি দেখা যায়, তার একটা ছক করে ফেললাম।

৩) কাটরা মসজিদ
প্রথমে কাটরা মসজিদ। এখানে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর সমাধি। ঢোকবার মুখেই বেশ কিছু গাইড দাঁড়িয়ে।
সেই গাইড দের মধ্যে একজনের সাথে আমাদের রফা হলো। তার নাম মনোজ তরফদার। তার কাছে শুনলাম যে কাটরা মসজিদ এবং মুর্শিদাবাদের অন্যান্য যত প্রাচীন প্রাসাদ আছে সব সরকারী পুরাতত্ত্ব বিভাগ ASI (Archeological Society of India) দেখাশোনা করে। এই গাইড রাও সবাই ASI দ্বারা লাইসেন্স প্রাপ্ত।
এক হিন্দু পরিবারে ১৬৭০ সালে এক হিন্দু ব্রাম্ভন পরিবারে মুর্শিদকুলী খাঁর জন্ম, তাঁর নাম ছিল সূর্য্য নারায়ণ মিশ্র। ন’বছর বয়েসে, মাথা মুন্ডন করে পৈতে নেওয়া হয়ে গেছে, সংস্কৃত মন্ত্র ছাড়াও রামায়ণ মহাভারত পুরান পড়েন। গায়ত্রী মন্ত্র মুখস্থ। সেই সময় পারস্যের এক ধনী ব্যক্তি সফিউদ্দীন ইসলাম তাঁকে দত্তক নেন্, এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। তখন তাঁর নাম হয় কারতলব খান।
সফিউদ্দীন সম্রাট আওরংজেবের কাছের মানুষ ছিলেন। সফির পালিত পুত্র কারতলবের জমি জমা আর কর খাজনা ইত্যাদির হিসেব করার কাজ দেখে খুসী হয়ে সম্রাট আওরংজেব ১৭০০ সালে তাঁকে মুর্শিদকুলী খাঁ উপাধি দিয়ে বাংলার দিওয়ান করে ঢাকায় (তখন জাহাঙ্গীরাবাদ) পাঠান।
ঢাকায় তখন বাংলা বিহার উড়িষ্যার সুবেদার ছিলেন সম্রাটের নাতি আজিম উস শান, যিনি কারতলবের প্রতি আওরংজেবের স্নেহ ভাল চোখে দেখেননি। তাঁদের শত্রুতা চরমে ওঠায়, মুর্শিদকুলী আওরংজেবের অনুমতি নিয়ে ঢাকা থেকে কিছুটা পশ্চিমে মুকসুদাবাদ নামে একটি ছোট শহরে তাঁর দপ্তর সরিয়ে আনেন। ১৭০৭ সালে আওরংজেবের মৃত্যু পর্য্যন্ত তিনি আনুগত্য ও দক্ষতার সাথে দিওয়ান হিসেবে তাঁর কাজ করে গেছেন, নিয়মিত মোগল সম্রাটের কাছে খাজনা পাঠিয়েছেন, এবং নিজের প্রদেশে কৃষকদের মধ্যে জমি বন্টন এবং জায়গীরদার প্রথা সংক্রান্ত নানা উদ্ভাবনী কাজ করেছেন।
দিল্লীতে আজিম উস শানের ছেলে ফারুকশিয়ার মোগল সম্রাট হবার পরে তিনি ১৭১৩ সালে মুর্শিদকুলী খান কে বাংলা প্রদেশের সুবেদার করেন, কিন্তু চার বছর পরে মুর্শিদকুলী খাঁ মোগলদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন করে খাজনা পাঠানো বন্ধ করে ১৭১৭ সালে বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব হন্। এবং এই মুকসুদাবাদই পরে স্বাধীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ হয়ে ওঠে।
কাটরা কথাটার মানে হলো সরাই খানা, সেই মধ্যযুগে বিদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এই সরাইখানা তে বিশ্রাম নিতো, সাথে খানা পিনা নাচ গান ও হতো নিশ্চয়।
কাটরা মসজিদ একটা চৌকো জায়গা নিয়ে তৈরী, যার চার কোণে বসানো চারটে উঁচু মিনার। ইঁটের তৈরী লাল রং এর মসজিদ, তার চারিপাশে সবুজ বাগান আর সামনে একটা লম্বা দোতলা বাড়ী, সেটাও লাল ইঁটের তৈরী, তাতে সারি সারি ঘর আর জানলা। এই ঘরগুলো নাকি ছিল ৭০০ জন মাদ্রাসার ছাত্রদের কোরান পড়ার জন্যে। সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই মসজিদ ছিল ইসলামী শিক্ষার একটি বড় কেন্দ্র।
চারিদিকে লাল রং আর মাঝখানে সাজানো সবুজ বাগান পরিবেশকে একটা আলাদা সৌন্দর্য্য দিয়েছে। পড়ন্ত বিকেলে সেরকম ভীড় নেই, শুধু আমরা ক’জন, সেই নির্জনতাও খুব উপভোগ করেছিলাম সেদিন। ১৭২৪ সালে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর তৈরী এই কাটরা মসজিদ আজ দেশের হেরিটেজ প্রপার্টি।
মনোজ আমাদের গল্প করলো যে দিওয়ান হবার পরে মুর্শিদকুলী খাঁ সম্রাট আওরংজেব কে খুসী করার জন্যে নিয়মিত খাজনা পাঠিয়ে দিতেন। একবার তিনি নাকি তাঁর ছেলের হাতে ১০০০ স্বর্ণ মুদ্রা (মোহর) পাঠিয়েছিলেন, সে নাকি তার মধ্যে থেকে একটি মোহর এক গরীব দুঃখী লোক কে দান করে। ভেবেছিল কেউ গুণে দেখবেনা তাই ধরা পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই।
কিছুদিন পরে মুর্শিদকুলী খাঁ সম্রাটের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলেন। তাতে লেখা এক হাজারের জায়গায় একটা মোহর কম পাঠিয়েছো দেখছি, কি ব্যাপার?
ছেলে কে জিজ্ঞেস করে যখন জানলেন সে একটা মোহর একজন গরীব লোককে দয়াপরবশ হয়ে দান করেছে, তিনি নাকি ছেলেকে মেরে তার মৃত ছেলের শিরচ্ছেদ করে তার মাথা ও একটি মোহর সম্রাট কে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
যখন আমরা মনোজের এই গল্প অবাক হয়ে শুনছি, আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল দীপঙ্কর, খেলোয়াড়ী হাফ প্যান্ট (বার্মুডা) পরে তাকে বেশ স্মার্ট দেখাচ্ছে, নীচু গলায় সে আমায় বললো “এর একটা কথাও বিশ্বাস কোরোনা ইন্দ্রজিৎ, সব ডাহা গুল!”
তারপরে মনোজ বললো নবাবের বড় মেয়ে আজিমুন্নিসা বেগমকে তাঁর কোন একটি ব্যাধি নিরাময়ের জন্যে ১০০ টি শিশুর কলিজা খাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁর ব্যাধি নিরাময় হলেও শিশুদের কলিজা খাওয়া নাকি তাঁর নেশা হয়ে গিয়েছিল। সেই কারণে তাকে কলিজা খেকো বেগম ও বলা হয়। মুর্শিদকুলি খাঁ না কি সে জন্যে রেগে গিয়ে নিজের মেয়েকে জ্যান্ত কবর দিয়ে মেরে ফেলেন।
আমার পাশ থেকে অবিশ্বাসী দীপঙ্কর আবার বলে উঠলো “ইন্দ্রজিৎ এসব পুরো গ্যাঁজা, বুঝেছো তো?”
মনোজ বলল “না স্যার, সত্যি স্যার, কলিজা খাকী বেগমের সমাধি আর বাচ্চা মসজিদ এখান থেকে কাছে, বলেন তো আমি আপনাদের দেখিয়ে আনতে পারি ওখানে সব লেখা আছে!”
মুর্শিদকুলী খাঁ যতদূর জানা যায়, দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, ১৭২৭ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্য্যন্ত তাঁর রাজত্বে শান্তি এবং হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় ছিল। কাটরা মসজিদের প্রাঙ্গনে বাগানের এক পাশে একটি ছোট শিবমন্দির দেখলাম। ব্যক্তিগত জীবনেও মুর্শিদকুলী খাঁ উচ্ছৃঙ্খল ছিলেননা, তাঁর হারেম ছিলনা, এক স্ত্রীর সাথে সারা জীবন কাটিয়েছেন।
জমিজমা সংক্রান্ত আইনের সংস্কারকে মুর্শিদকুলী খাঁর অন্যতম অবদান হিসেবে ধরা হয়। মোগলদের জায়গীর প্রথাকে পালটে তিনি যে জমি আইনের প্রবর্ত্তন করেছিলেন, তাই শেষে জমিদারী প্রথা হিসেবে চালু হয়।
কাটরা মসজিদ থেকে বেরোবার দরজার পাশে নীচে একটি সিঁড়ি নেমে গেছে, মনোজ দেখালো মাটির তলায় নবাবের সমাধি। ধর্ম্মপ্রাণ নবাবের নাকি ইচ্ছে ছিল যে তাঁর মৃত্যুর পরে মানুষের যাতায়াতের পায়ের তলায় তাঁর সমাধি থাকবে, যাতে জীবনে যত পাপ তিনি করেছেন, মানুষের পায়ের তলায় কবরে শুয়ে থাকলে সেই পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে।


৪) জাহানকোষা কামান
কাটরা মসজিদের পরে জাহানকোষা কামান। জায়গাটা খুব কাছে । দুই মিনিটে পৌঁছে গেলাম।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে শুধু যুদ্ধ। ক্ষমতা আর আধিপত্যের, লোভ আর হিংসার কাহিনী। আর সেই যুদ্ধে ব্যবহার হয় গুলি বারুদ আর কামান।
কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁর বিখ্যাত “পলাশীর যুদ্ধ” কাব্যে লিখেছিলেন,
“আবার, আবার সেই কামান গর্জন!
কাঁপাইয়া ধরাতল, বিদারিয়া রণস্থল,
উঠিল যে ভীম রব, ফাটিল গগন”
আজ কবি কথিত সেই সব কামান অব্যবহার্য হয়ে পড়লেও তাদের আকর্ষণ বিন্দুমাত্রও কমেনি। পশ্চিমবঙ্গের যে দু’টি বিখ্যাত কামানের নাম সর্বজনবিদিত, সেগুলি হল বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের দলমাদল এবং মুর্শিদাবাদের জাহানকোষা। প্রথমটি প্রচারের আলোয় অনেকটা বেশি আলোকিত হলেও জাহানকোষার মাহাত্ম্যও কম নয়।জাহানকোষা কামানটি রাখা আছে কাটরা মসজিদ থেকে কাছেই একটি গ্রামে যার নাম তোপখানা। আমাদের গাড়ী দুটো সেই গ্রামের ভিতরে ঢুকে রাস্তার পাশে দাঁড়ালো। গাছপালার মধ্যে ধুলোমাখা সরু রাস্তা, সেই পড়ন্ত বিকেলে কিছু লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছে, বাচ্চারা খেলা করছে। কিছুটা দূরে একটা ঘেরা জায়গায় দেখা যাচ্ছে একটি কামান, কিছুটা যেন অনাদৃত, অবহেলিত আর একলা, আশে পাশে তাকে দেখার বা তাকে দেখে মুগ্ধ বা আশ্চর্য্য হবার কেউ নেই। পর্য্যটক বা গাইড ও কেউ নেই। শুধু আমরা ক’জন।
অষ্টধাতু দিয়ে তৈরী বলে কামানে এখনো কোন জং পড়েনি। কামানটির গায়ে খুব সুক্ষ্ম কাজে লেখা আছে ফারসী ভাষায় কোন লিপি। পাশে একটা ASI এর নোটিস বোর্ড সেখানে কামান সংক্রান্ত অনেক তথ্য। যে লোহার চাকাযুক্ত গাড়িতে কামানটি স্থাপিত ছিল তা বহু বছর আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।


৫) মোতিঝিল
ক্রমশঃ সন্ধ্যা নামছে, আমরা মোতিঝিল প্রাসাদের দিকে রওনা দিলাম।
মোতিঝিল মুর্শিদাবাদ শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে, আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন পড়ন্ত বিকেল। একটা বিশাল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে, সেই গেটে বড় বড় করে “মোতিঝিল” লেখা। গেটের সামনে অনেক দোকান পাট, ভীড়। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় সাজানো বাগান, আর এক দিকে একটা বেশ বড় ঝিল।
মুর্শিদাবাদে মোতিঝিলে ঘসেটি বেগমের প্রাসাদ হল পর্য্যটকদের জন্য একটা বড় আকর্ষন।
কে এই ঘসেটি বেগম?
১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলী খাঁর মৃত্যুর পরে নানা ঘটনাবলীর পরে ১৭৪০ সালে বাংলার নবাব হন্ আলীবর্দ্দী খাঁ। দীর্ঘ ষোল বছর (১৭৬০ সাল পর্য্যন্ত) তিনি বাংলার নবাব ছিলেন।
আলিবর্দ্দীর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের স্বামী আলীবর্দ্দির ভ্রাতুষ্পুত্র নওয়াজেস মহম্মদ ধনী ছিলেন এবং তিনি দানধ্যানে বহু অর্থ অকাতরে বিলোতেন। তাঁরা থাকতেন মুর্শিদাবাদে মোতিঝিল প্রাসাদে। নওয়াজেস তাঁর দান ধ্যান এবং ধার্মিক ব্যবহারের জন্যে ক্রমশ; সাধারণ এবং অভিজাত সবার মধ্যেই অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠছিলেন। নওয়াজেস আলিবর্দ্দীর জীবনদশাতেই অল্প বয়েসে মারা না গেলে হয়তো সিরাজের জায়গায় তিনিই নবাব হতেন। তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যরকম হতো কিনা কে জানে?
তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পরে ঘসেটি বেগম উত্তরাধিকার সূত্রে তার স্বামীর কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে ধন সম্পদ পান। মোতিঝিল প্রাসাদে গেলে সেই সব ধন রত্ন বিলাস সামগ্রী আজও যত্ন করে সাজানো আছে দেখা যায়।
নবাব আলীবর্দ্দী খানের মৃত্যুর পরে, ঘসেটি বেগম চেষ্টা করছিলেন দ্বিতীয় বোন শাহ বেগমের পুত্র শওকত জঙ্গ কে সিংহাসনে বসানোর। কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত আলিবর্দ্দী খাঁ মৃত্যুর আগে তাঁর প্রিয় দৌহিত্র ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের ছেলে সিরাজউদ্দৌলা কে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব হিসেবে অভিষিক্ত করেন।
ঘসেটি বেগম তাই নবাব আলীবর্দী খানের সেনাপতি মীরজাফর, ধনী ব্যবসায় জগৎ শেঠ, এবং উমিচাঁদের সঙ্গে গোপনে ষড়যন্ত্র করেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ দের কাছে পরাজিত হন এবং ইংরেজরা মীর জাফরকে নবাব বানান।
বিয়ের পরে যখন আমরা এসেছিলাম, মনে আছে এই প্রাসাদের ভিতরে আমরা অনেকটা সময় কাটাই। সেখানে অনেক দর্শনীয় এবং মূল্যবান জিনিষ ছিল, তার মধ্যে বিশেষ করে মনে পড়ে লাল নীল কাঁচের জানলা, যা কিনা বিদেশ থেকে কেনা। তা ছাড়া ঝাড়লন্ঠন ঘর সাজানোর জিনিষ, নানা কারুকার্য্য, চারিদিকে বৈভবের ছড়াছড়ি।
এবার আর হাতে বেশী সময় না থাকায় ঘসেটি বেগমের প্রাসাদ পর্য্যন্ত আর হাঁটা গেলনা। গেট থেকে প্রাসাদ পর্য্যন্ত একটা ছোট ট্রেনে করে যাওয়ার বন্দোবস্ত ছিল, কিন্তু সন্ধ্যা নামায় সেটাও বন্ধ। আমরা তাই ঝিলের ধারে একটু হেঁটে বেড়ালাম।

৬) সন্ধ্যার আড্ডা
কাশিমবাজার রাজবাড়ীতে ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে একটু বিশ্রাম করে আমরা বসলাম আড্ডায়। দোতলায় আমাদের ঘর গুলো পাশাপাশি, এই সময়ে হোটেল খালি, আমরা ছাড়া এখানে আর কোন অতিথি নেই।
দীপঙ্কর আর অমিতাভর ঘরের পাশে একটা বসবার ঘর আছে লাউঞ্জের মত, সেখানে অনেক চেয়ার পাতা। দীপঙ্করের আনা মহার্ঘ্য হুইস্কি আর জিন যে যার মতো নিয়ে জমিয়ে বসলাম আমরা।
আমাদের মধ্যে দীপঙ্কর সেই কলেজ জীবন থেকেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভক্ত। খুব কম বয়েস থেকেই নানা সঙ্গীত সন্মেলন এর টিকিট কেটে রাত জেগে সে বিখ্যাত নানা শিল্পীর অনুষ্ঠান শুনতো। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তার একটা স্বাভাবিক আর সহজাত ভাল লাগা ছিল। তার ওপরে সে বেশ কিছু বছর ধরে নানা জায়গা থেকে অনেক দুষ্প্রাপ্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পুরনো রেকর্ড আর সি ডির collection করে আসছে। এই সব দুষ্প্রাপ্য গান শুনতে তার বাড়ীতে নানা গুনীজনের আগমন হয়।
হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, রাগ রাগিনী ও নানা ঘরানার শিল্পীদের নিয়ে তার অপরিমিত পড়াশোনা আর জ্ঞান। আমাদের সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় তার উত্তেজনা দেখে আমরা যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তেমন বুঝিনা, তারাও বুঝি যে ব্যাপারটা তার কাছে একটা গভীর প্রেমের মত, একটা নেশার মত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু মুস্কিল হলো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যে একটা নিয়ম শৃঙ্খলার ব্যাপার আছে, তার বাইরে যাওয়া নিয়ে দীপঙ্করের প্রবল আপত্তি। এ ব্যাপারে সে কঠোর ভাবে রক্ষণশীল। তাই রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে তার নানা অভিযোগ, এমন কি সে রবীন্দ্রনাথকেও পছন্দ করেনা, শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যাবার কথা উঠলে সে অবজ্ঞা করে বলে তোমরা যাও, আমার ওখানে যাবার কোন ইচ্ছে নেই।
এদিকে সুপ্রিয়া আবার রবীন্দ্রনাথের গানে একেবার যাকে বলে নিমজ্জিত। মুম্বাই তে তার বাড়ীতে সে রবীন্দ্রনাথের গান শেখানোর স্কুল খুলেছিল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও তার যথেষ্ট তালিম আছে। গানের ভাব প্রকাশের জন্যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শৃঙ্খলার সামন্য একটু এদিক ওদিক হলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়, এই নিয়ে দীপঙ্করের সাথে তার তর্ক শুরু হয়ে গেল।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর কোন রাগাশ্রিত গানে কঠোর রাগের আধার কে মুখ্য করে তোলেননি। গানের কথার চারিপাশে তিনি উন্মুক্ত রেখেছেন সুরের প্রবাহ, রাগের মূল মেজাজ ও লয় বজায় রেখে তিনি কাঠামোগত বন্ধন থেকে তাঁর গানগুলিকে মুক্তি দিয়েছেন।
আমরা বাকিরা এই তর্কে যোগ দিইনা, তবে সাধারণ ভাবে যেহেতু আমরাও সুপ্রিয়ার মত রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে ভালবাসি এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে আমাদের তেমন জ্ঞান বা উৎসাহ নেই, তাই আমরা এই তর্কে মনে মনে সুপ্রিয়ার পক্ষেই থাকি।
বেশ কিছুক্ষণ তর্ক চলার পরে শেষে আমরা সুপ্রিয়া কে গান গাইতে অনুরোধ করলাম। সে আমাদের অনুরোধে দুটি গান গাইলো~
“আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা”, আর “বাজিল কাহার বীণা”।
বড় ভাল গায় সুপ্রিয়া। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনলাম।
আমার জীবনে “আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা” গানটার একটা বিশেষ তাৎপর্য্য আছে। পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭৪ সালে আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে সুভদ্রার সাথে আমার বিয়ের কথাবার্ত্তা চলছে। তো একদিন আমরা বেশ কয়েকজন জানুয়ারী মাসের এক বিকেলে গেছি ওদের সাঁতরাগাছির বাড়ীতে, কনে দেখা আর জামাই দেখা দুটোই একসাথে হবে।
আমার মা’র অনুরোধে সেদিন সুভদ্রা আমাদের ওই গানটা খুব সপ্রতিভ ভাবে গেয়ে শুনিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্য্যায়ের ওই ছোট গানটিতে প্রতিটি ছত্রে ভালবাসার কথা।
আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা, প্রিয় আমার ওগো প্রিয়/
বড় উতলা আজ পরাণ আমার, খেলাতে হার মানবে কি ও?/
অনাত্মীয় অল্পবয়েসী একটি সুন্দরী মেয়ে আমার মত একজন অচেনা ছেলে কে একঘর লোকের সামনে প্রেম নিবেদন করবে তা তো হতে পারেনা। আমি অত নির্বোধ ও ছিলাম না যে তা ভাববো। কিন্তু আমি নিজেকেই কিছুটা অবাক করে দিয়ে সুভদ্রার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে একটি ছোট প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছিলাম।
গোপন কথাটি রবে না গোপনে/ উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে/
হয়তো আমি সেই অচেনা সুন্দরী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম “হ্যাঁ, আমি খেলায় হার মানতে রাজী, যদি তুমি আমার সাথে খেলতে রাজী থাকো।”
আমরা দু’জনেই রবীন্দ্রনাথের গান ভালবেসে শুনতাম। কবি তাঁর গানের মধ্যে দিয়েই আমাদের বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন।
সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল কিন্তু সেই বিকেলটার স্মৃতি আমার মনে এখনো অমলিন। বিশেষ করে এই গানটা যখন যেখানেই শুনি, মনে মনে চলে যাই সেই পঞ্চাশ বছর আগের এক শীতের বিকেলে একটি অচেনা সুন্দরী মেয়ের গান শুনে তাকে ভাল লাগার দিনে।
সুপ্রিয়াকে পরে সেই কথা জানিয়ে ঐ গানটি সেদিন গাইবার জন্যে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম।


মোতিঝিল
দ্বিতীয় দিন – ১৩/১২/২০২৩
১) কাঠগোলা
আজকে সকালে সবাই তৈরী হয়ে ব্রেকফাস্ট করতে নেমে এলাম। আজ প্রাতরাশে প্রথমে ফলের রস, তার পরে লুচি হালুয়া তরকারী। সাথে টোস্ট ডিম, চা কফি।
শেফ ভদ্রলোক আমাদের খুব খাতির করছেন, লাঞ্চে কি খাবেন, ডিনারে কি খাবেন সব জিজ্ঞেস করে নিচ্ছেন আগে থেকেই। আমরা যখন খেতে বসি তিনি নিজে এসে তত্ত্বাবধান করে যান। রাজবাড়ীতে এই ক’দিন বেশ রাজার হালেই থাকা যাবে মনে হচ্ছে।
আজ আমাদের প্রথম স্টপ হলো কাঠগোলা। এটা এক পুরনো দিনের রাজস্থানী ব্যবসায়ী পরিবারের বাগানবাড়ী। গেট দিয়ে ঢুকে একটি অল্পবয়েসী ছেলেকে আমাদের গাইড হিসেবে পেলাম। তার বিশেষত্ব হলো সে একজন স্বভাব কবি, অধিকাংশ সময়ে সে আমাদের সাথে কবিতায় কথা বলছিল।
মোগল আমলে রাজস্থান থেকে আসা জৈন ব্যবসায়ীদের আনাগোনা এখানে বাড়তে থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পরিচিত নাম অবশ্যই জগৎ শেঠ। নবাব এবং ইংরেজদের দু’ দিকের সাথেই এদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল, তাদের তাঁরা চড়া শুদে টাকা ধার দিতেন। ব্যবসা করে এদের এত বাড়বাড়ন্ত হয়েছিলে, যে শোনা যায় এঁদের ধন সম্পত্তি নাকি আজকের আদানী আম্বানীর থেকেও অনেক গুণ বেশী ছিল।
কাঠগোলা বাগান বা কাঠগোলা প্রাসাদ তার কালো গোলাপ এর বাগান আর আদিনাথের (জৈনধর্মের আদিপুরুষ) মন্দিরের জন্যে বিখ্যাত। পঞ্চাশ বিঘা জুড়ে এক বিশাল জমির ওপর এই বাগান বিস্তৃত। কালো গোলাপ অবশ্য এখন আর নেই, কিন্তু সেখানে আজ এক বিশাল আমবাগান। কথিত আছে এই কাঠগোলা বাগান আর প্রাসাদ তৈরী করেন লক্ষীপত সিং দুগার। আজ কাঠগোলার এই বাগানটি মুর্শিদাবাদের পর্য্যটকদের জন্যে একটি অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনস্থল। বাগানের চার কোণে চারটি অশ্বারোহীর সাদা মার্বেলের স্ট্যাচু। শোনা গেল তারা হলেন সেই দুগার পরিবারের চার ভাই।
কাঠগোলা নাম কেন? আমাদের গাইডের কাছে শুনলাম দুগার দের নাকি বিশাল কাঠের ব্যবসা ছিল, সেখান থেকেই ওই নাম।
গেট দিয়ে ঢুকে সামনেই একটা বিশাল টলটলে জলের বিশাল পুকুর, কিছু লোক ঘাটে দাঁড়িয়ে জলে খাবার ছুঁড়ে দিচ্ছে, আর জলের মধ্যে অনেক রঙ্গীন মাছ খলবল করে জলে ঢেউ তুলছে। পুকুরের চার দিকে ঘাটের সিঁড়ি জলে নেমে গেছে, বেশ কিছু রাজহাঁস সেখানে ব্যস্ত ভঙ্গীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কাঠগোলার দুগার দের সাথে জগৎ শেঠের ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল। আমাদের গাইড রাস্তার পাশে একটি সুড়ঙ্গ দেখালো, সেখানে সিঁড়ি নেমে গেছে এবং নীচে জল দেখা যায়। এই সুড়ঙ্গ দিয়ে নাকি এই বাড়ীর সাথে জগৎ শেঠের বাড়ীতে মাটির তলা দিয়ে জলপথে যোগাযোগ ছিল। গোপন নথিপত্র সরকারী নজর এড়িয়ে নাকি এই সুড়ঙ্গ দিয়ে নৌকা করে বা অন্য কোন উপায়ে এক বাড়ী থেকে অন্য বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়া হত।
পথচারীদের সেই সুড়ঙ্গের কাছে না আসার জন্যে বলা হত এখানে মেয়েরা স্নান করছে, একটু দূরত্ব রেখে হাঁটুন। আমাদের গাইড কবিতায় বুঝিয়ে বললো – “মেয়েরা হেথায় করিতেছে স্নান, আপনারা দয়া করে দূর দিয়ে যান্!”
আর একটু এগিয়ে গেলে দুগার পরিবারের একটা বিরাট প্রাসাদ, আর পাশে ফুলের বাগান। এখানে নাকি রঙ্গীন মাছগুলো মারা গেলে তাদের যত্ন করে মাটির তলায় কবর দেওয়া হত। আমাদের গাইড বললো – “দ্যাখো মাছেদের কি কদর, মাটির নীচে তাদের কবর!”
প্রাসাদ ছেড়ে এগিয়ে গেলে একটা চাঁপা গাছ, তার গুঁড়ির একটা দিক বেশ কিছুটা ভেঙ্গে ফাঁক হয়ে গেছে, আমাদের কবি গাইড এর ভাষায় “গাছটি চাঁপা, পিছনটা ফাঁপা”।
বাগানের পাশে একটু দূরে দেখলাম একটা ধবধবে সাদা মার্বেলের তৈরী মন্দির। এই হলো সেই কাঠগোলার বিখ্যাত পরশনাথের মন্দির। তার সামনে ফুলের বাগান। গাইডের কাজ শেষ, সে এবার ফিরে যাবে।
সে আমাদের বিদায় জানিয়ে বললো – “সামনে বাগান, আমি যাই, আপনারা আগান!”
২) জগৎ শেঠের বাড়ী – নসীপুর
কাঠগোলার পরে আমাদের গন্তব্য জগৎ শেঠের বাড়ী।
স্কুলে থাকতে ইতিহাস পড়ে আমার ধারণা ছিল যে জগৎ শেঠ একজন ধনী ব্যবসায়ীর নাম। আমি মনে মনে তাঁর চেহারা ও কল্পনা করতাম বিশাল বপু, বিশাল গোঁফ, কিছুটা আমাদের বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের মত।
পরে জানলাম জগৎ শেঠ আসলে একজন বিশেষ কারুর নাম নয়, ওটা একটা পারিবারিক উপাধি। এই উপাধির মানে তারা হল জগতের অর্থাৎ সারা পৃথিবীর মালিক।
এই পরিবারের আদিপুরুষের নাম মাণিক চাঁদ। তিনি ব্যবসার সুত্রে ১৭০০ সালে প্রথম পাটনা থেকে ঢাকা আসেন। মাণিকচাঁদের নিজের সন্তান ছিলনা, ১৭১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পালিত পুত্র ফতেচাঁদ শেঠ পরিবারের ব্যবসার উত্তরাধিকারী হন্ এবং তাঁর সময়ে তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে। ১৭২৩ সালে মোগল সম্রাট ফারুকশিয়ার ফতেচাঁদকে জগৎ শেঠ উপাধি দেন। এরপর থেকে ফতেচাঁদের পুরো পরিবার জগৎ শেঠ পরিবার নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তার সময়েই শেঠ পরিবারের যশ-প্রতিপত্তি চূড়ায় পৌঁছয়।
জগৎ শেঠের বিলাসবহুল বাড়ী এখন একটি জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। বাড়ীর পাশে একটি বড় সাদা রং এর জৈন মন্দির। টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ঢুকলাম।
বাড়ীর ভিতরে ঢুকে মিউজিয়াম, শেঠদের নানা ব্যক্তিগত সংগ্রহ সেখানে রাখা। টাকশালে তৈরী সোনা আর রূপোর মুদ্রা। মুর্শিদাবাদের সিল্ক আর ঢাকাই মসলিন শাড়ী। এছাড়া কিছু প্রাকৃতিক সৃষ্টি, যেমন ফসিল ও উল্কা পাথর। বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য অয়েল পেন্টিং দেয়ালে টাঙানো। মূল্যবান আসবাব পত্র, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ছাপ মারা লোহার চেয়ার। অস্ত্র শস্ত্র রাখার গুপ্ত ঘর মাটির ২০ ফিট তলায়।
আর মাটির তলায় সেই গুপ্ত সুড়ঙ্গ – যার অন্য দিকটা আমরা একটু আগে দেখে এসেছি কাঠগোলায়।
সব মিলিয়ে জগৎ শেঠের বাড়ীর ভিতরে ঢুকে খুব একটা আহামরি কিছু লাগলোনা আমাদের কাছে। বেশ এলোমেলো ভাবে জিনিষপত্র রাখা, কিছু মরচে পড়া কোম্পানীর আমলের কিছু মরচে পড়া লোহার চেয়ার রাখা আছে ঘরের এক কোণে। দেয়ালে রং ও করা হয়নি বহুদিন। যত বৈভব আশা করেছিলাম, তত কিছু চোখে পড়লোনা।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধনকুবের, যার কাছে আজকের আদানী, আমবানী, বিল গেটস, এয়ন মাস্ক, জেফ বেজোস সবাই শিশু, তার বাড়ী দেখে বেশ আশাভঙ্গই হয়েছিল সেদিন আমাদের।
প্রবীর অমিতাভকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা, জগুদা’ দের এত টাকা কি করে হলো রে?”
আসলে আমি আর প্রবীর হলাম ইঞ্জিনীয়ার, লোহা লক্কড় যন্ত্রপাতি নিয়ে আমাদের কাজ, ওদিকে অমিতাভ আর দীপঙ্কর হলো ফাইন্যান্সের লোক, টাকা জমানোর ব্যাপারটা ওরা ভাল জানবে।
দীপঙ্কর বললো, “আরে ভাই, টাকা রোজগার করার অনেক ফন্দী ফিকির আছে, সে সব জানতে গেলে আগে টাকা ভালবাসতে হবে, টাকা অন্ত প্রাণ হতে হবে। ক্ষমতাশালী রাজাদের (আজকের দিনে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতাদের) সাথে যোগাযোগ আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী করা হলো সবচেয়ে জরুরী। রাজনৈতিক ক্ষমতা আর ব্যবসা – power and business – এই দুইয়ের সম্পর্কের নাম হলো Crony capitalism, ব্যাপারটা আগেও ছিল, এখনো আছে। জগু দা’রা এই ব্যাপারটা খুব ভাল জানতেন। ”
অমিতাভ তার সাথে যোগ করে বললো, “অবশ্য টাকা থাকলেই জীবনটা সুখের হবে তার কোন মানে নেই। না হলে এই জগৎ শেঠের পরিবারে এত সৈন্য সামন্ত, এত অস্ত্রশস্ত্র কেন দরকার হতো?”
আমি বললাম “ওরা হলো গিয়ে ভাগ্যলক্ষীর বরপুত্র। সেই Abba র গানটা মনে আছে তো? It’s a rich man’s world?”
Money, money, money, must be funny, in the rich man’s world/
Money, money, money, always sunny, in the rich man’s world/





৩) হাজারদুয়ারী
হাজারদুয়ারী মুর্শিদাবাদের অন্যতম দর্শনীয় জায়গা। বাস্তবিক হাজারদুয়ারী আর মুর্শিদাবাদ দুটো কথা প্রায় সমার্থক। আমরা যে ট্রেনে এসেছি তার নাম ও ছিল হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস। সুতরাং মুর্শিদাবাদ এলে হাজারদুয়ারী তো দেখতেই হবে।
জগৎ শেঠের বাড়ীর পরে আমরা গেলাম হাজারদুয়ারী দেখতে। কাছেই, গাড়ীতে মিনিট দশেক লাগলো। যখন পৌঁছলাম তখন বেলা হয়েছে, মাথার ওপরে সূর্য্য, বেশ গরম।
গঙ্গার ধারে একটা বিশাল জায়গা নিয়ে হাজারদুয়ারী প্রাসাদ আর ইমামবাড়া।
গেটের সামনে সরু রাস্তায় ময়লা ছড়ানো, বিক্ষিপ্ত ভীড়, ঘোড়ার গাড়ী। পুরো পরিবেশেই কেমন যেন একটা অবক্ষয় আর অযত্নের মলিন ছাপ। যাই হোক, গেট দিয়ে ঢুকে টিকিট কাটার পরে আমরা একজন গাইডকে নিলাম। সুজাতা আমাদের খরচের হিসাব রাখছে। পরে হিসেব করে ভাগাভাগি করে নেবো আমরা।
একটা গাছের ছায়ায় বসে আমাদের গাইড তার লেকচার শুরু করলো।
১৭৫৬ সালে আলীবর্দ্দী খাঁর মৃত্যুর পরে বাংলার নবাব হন্ তাঁর দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা।
মাত্র তেইশ বছর বয়েসে সিরাজ যখন বাংলার নবাব হন্ তখন উড়িষ্যা আর বিহারের অনেকটাই আলীবর্দ্দী হারিয়েছেন মারাঠাদের সাথে চুক্তির জন্যে । সিরাজ মুর্শিদকুলী খাঁ বা আলীবর্দ্দী খাঁর মত বিচক্ষণ ছিলেননা, নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতাও তাঁর ছিলনা। কম বয়েস হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন স্বেচ্ছাচারী, এবং তাঁর অত্যাচারে অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর চারিদিকে বহু শত্রু এবং অনেক মসনদ দখল করার দাবীদার জড়ো হয়ে যায়। তার ওপরে ঐতিহাসিকেরা সিরাজকে একজন নির্বোধ, এবং লম্পট মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দীর্ঘদিন রাজত্ব শাসন করার সুযোগ সিরাজ পান্নি। শেষে মাত্র এক বছর রাজত্বের পরে ১৭৫৭ সালে ইংরেজদের সাথে পলাশীর যুদ্ধে প্রধানতঃ তাঁর নিজের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে তাঁর পরাজয় ও মৃত্যু হয়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নাটকে গানে গল্পে কবিতায় বার বার কিন্তু একজন ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে উঠে এসেছে সিরাজের নাম। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা সিরাজউদ্দৌলা নাটকে সিরাজ ব্রিটিশ বিরোধী এই ভাগ্য বিড়ম্বিত নায়কের প্রতি একটা বড় অংশের বাঙালীর সহানুভূতি রয়েছে।
এই ভাল আর মন্দ দুই দিকের মধ্যে কোনটা ঠিক? সিরাজ কি নায়ক ছিলেন, না খলনায়ক?
গাইড ছেলেটির কাছ থেকে হাজারদুয়ারী এবং তার উলটো দিকে ইমামবাড়া নিয়ে কিছু তথ্য জানা গেল।
এই প্রাসাদে কি সত্যিই এক হাজারটি দরজা আছে? গাইড ছেলেটি বললো প্রাসাদটিতে মাত্র ১০০ টি বাস্তব দরজা রয়েছে আর বাকি ৯০০ টি নাকি নকল। ভাগীরথী নদীর তীরে কিলা নিজামত বা নিজামত কিলা ছিল মুর্শিদাবাদের পুরনো দুর্গের স্থান। এই প্রাসাদের নির্মানের জন্য দুর্গটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। জায়গাটি এখনো কিলা নিজামত নামে পরিচিত।
হাজারদুয়ারী প্রধানতঃ একটি জাদুঘর, সেখানে এ সযত্নে ধরে রাখা আছে স্বাধীন বাংলার ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায়ের অজস্র নিদর্শন। সেখানে কি কি দর্শনীয় জিনিষ আছে তা গাইড ছেলেটি আমাদের জানিয়ে দিল। একটা ছবি আছে, সামনে খাবারের থালা নিয়ে বসে একটি বিশাল মোটা লোক খাচ্ছে। সেই ছবিটা দেখতে ভুলবেন না, বললো সে।
গাইডের বক্তব্য শেষ হলে তার পাওনা মিটিয়ে আমরা টিকিট কেটে হাজারদুয়ারীর ভেতরে প্রবেশ করলাম।
এই প্রাসাদের মোট তিনটি তলা রয়েছে। আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। তৎকালীন নবাব দের ব্যবহৃত অস্ত্র শস্ত্র – আলীবর্দ্দী খাঁ এবং সিরাজের তরবারী এমন কি যে ছুরি দিয়ে মহম্মদী বেগ সিরাজ কে খুন করেছিলেন তা পর্য্যন্ত রক্ষিত আছে এই সংগ্রহশালায়। এছাড়া আছে মার্বেল মূর্তি, চীনামাটির বাসন, ধাতব সামগ্রী, দুর্লভ বই, পাণ্ডুলিপি, পুরনো মানচিত্র, ভূমি রাজস্ব রেকর্ড। আছে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার দেওয়া উপহার রূপোর সিংহাসন আর বিশাল ঝাড়বাতি। আর তিনতলায় আছে নবাব আমলের নানা নিদর্শন। সোনা দিয়ে মোড়া কোরাণ শরীফ, নানা অমূল্য পুঁথিপত্র, অসংখ্য বই, আবুল ফজলের আইনী আকবরীর পান্ডুলিপি, তাছাড়া নানা পুরাকীর্তি এবং আসবাবপত্রের বিশাল সংগ্রহ। দেশ বিদেশ থেকে সংগৃহীত নানা ধরণের ঘড়ি, রাফায়েল, ভ্যান ডাইক এবং অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পীদের অয়েল পেন্টিং, শ্বেত পাথরের মূর্ত্তি, এবং আরও অনেক দর্শনীয় জিনিষ।
এ ছাড়া ৯০ ডিগ্রীতে একটি জোড়া আয়নার রাখা আছে । এই আয়নায় মানুষ তার নিজের মুখ দেখতে পারে না যদিও অন্যরা একই দেখতে পারে। এটি নবাব আক্রমণকারীদের দূরে রাখার জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
একটা ফেলে আসা সময়কে ধরে রেখেছে হাজারদুয়ারী।




৪) ইমামবাড়া
হাজারদুয়ারীর ঠিক উল্টো দিকে এক বিশাল লম্বা প্রাসাদ। শুনলাম এটি হল শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের ইমামবাড়া তার কাছেই আছে মদিনা মসজিদ। এটি শুধুমাত্র মহরমের সময় দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
ইমামবাড়ার সামনে একটি কামান, যার নাম বাচাওয়ালি টোপ, এটি তৈরি করেছিলেন মুর্শিদকুলী খান। কামানটি মুখ উঁচু করে একটি উঁচু বেদীর উপর অবস্থিত। এই কামানটি নাকি ভাগীরথীর জলের তলায় ছিল, নদী সরে যাবার পরে এক উদ্ধার করে এখানে রাখা হয়।
ইমামবাড়ার স্থাপত্যও চোখে পড়ার মত, সামনে অসংখ্য স্তম্ভ, আর প্রবেশদ্বার হিসাবে একটি বিশাল গেট, যার নাম দক্ষিণ দরওয়াজা অন্য প্রান্তে যেখানে সিঁড়ি শুরু হয়, সেখানে দুটি ভিক্টোরিয়ান সিংহের মূর্তি রয়েছে। গাইডের মুখে শুনলাম মহরম উৎসবের সময় এখানে মেলা বসে, অনেক লোকজনের ভীড়ে জায়গাটা জমজমাট হয়ে ওঠে।
হাজারদুয়ারী আর ইমামবাড়ার চারিপাশে একটু ঘুরে বেড়ালাম আমরা। কাছেই দুটো বড় মসজিদ। চারিদিকে পর্য্যটকদের ভীড়, বেশ একটা উৎসবের বা মেলার মত পরিবেশ।
বেশ কিছু ছবি তোলা হলো।



৫) একটি আশ্চর্য্য স্বপ্ন
হাজারদুয়ারী আর ইমামবাড়া দেখার পরে আজ বিকেলে আর কোথাও যাবার নেই, হোটেলে ফিরে আমরা সোজা ডাইনিং রুমে গিয়ে খাবার টেবিলে বসে গেলাম। আবার উপাদেয় সব পদ, শেষ পাতে মিষ্টি দই আর রাজভোগ। শেফ ভদ্রলোক আবার কাছে এসে রাত্রে কি খাবো জিজ্ঞেস করে গেলেন। এদের আতিথেয়তার কোন ত্রুটি নেই। আমরা রায় পরিবারের ছোটবাবু পল্লবের অতিথি। সুতরাং আমাদের দিকে তো নজর একটু বেশী হবেই।
দুপুরে একটু বিশ্রাম নেবার পরে সন্ধ্যায় আবার আড্ডা দেবো এই হলো আমাদের প্ল্যান। তো বিছানায় শুয়ে বালিশে মাথা রাখতেই গভীর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেলাম। আসলে রোদের মধ্যে অত হাঁটা, তারপরে জমিয়ে একটা লাঞ্চ। ঘুমের আর দোষ কি?
আর এই দু’দিন গাইডদের মুখে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের নানা আজব আজগুবি উদ্ভট গল্প মাথার মধ্যে গজগজ করছে, ঘুমের মধ্যেই স্বপ্নে আমি ফিরে গেলাম সোজা অষ্টাদশ শতাব্দীতে। সেই স্বপ্নে আমি মোগল আমলের দেওয়ান মুর্শিদকুলী খাঁ, সম্রাট আওরংজেব আমায় ডেকেছেন, আমি তার কাছে খাজনা নিয়ে দেখা করতে গেছি।
স্বপ্নে আমি সম্রাটের সাথে বেশ সুন্দর উর্দ্দু ভাষায় কথা বলে যাচ্ছি, কোন অসুবিধেই হচ্ছেনা, আওরংজেব আমার ওপর মোটের ওপর বেশ সদয় মনে হচ্ছে, বেটা বেটা বলে তিনি আমায় অনেক উপদেশ দিচ্ছেন।
তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে পালঙ্কে বসে আছেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব, শণের মত সাদা চুল দাড়ি, শ্যেন দৃষ্টি, সারা মুখে অসংখ্য বলিরেখা। পরণে সাদা ঢোলা আলখাল্লা, পাজামা। গলায় মুক্তোর মালা, হাতের মুঠোয় তসবি। সামনে মেঝেতে জাজিম বিছানো, তার ওপর হাঁটু মুড়ে বসে আছি আমি, কারতলব খান।
আওরংজেব আমায় বললেন তোমায় দেখলে আমার সফির কথা মনে পড়ে। সে আমার আত্মীয় ছিল। সফি তোমায় আমার কাছে নিয়ে এসেছিল । সে যখন আমায় বলল তোমার আগের পরিচয়, তখন প্রথমে আমি একটু নারাজ ছিলাম। কারণ আমি হিন্দুদের তত বিশ্বাস করতামনা।
তুমি জন্মেছো এদেশের আদি ধর্ম্মের পরিবারে, সেই ধর্ম্ম জেনেছো, পড়েছো, এতে কোন কসুর নেই। ঘটনাক্রমে তার পরে দীক্ষিত হয়েছো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ন্ম ইসলামে। পড়েছো কোরান, হাদিস। এটা তোমার জীবনের পরম সৌভাগ্য। তুমি হিন্দু মুসলমান সব ধর্মের মানুষের মন পড়তে পারো। ভাল মন্দ বুঝতে পারো, সবার প্রতি ন্যায় বিচার করতে পারো।
তুমি হিন্দু ঘরের আউলাদ, এটা তোমার অতিরিক্ত সুবিধা, হিন্দুদের কাছে টানো। তারা সচরাচর বেইমানী করেনা, তাদের লালচ আর সাহস দুইই কম। কিন্তু তোমার মধ্যে আমি কূটনীতির অভাব লক্ষ্য করি।
পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজনীতির চাল দেওয়া, দরকারে দুশমনের গালে চুমু খাওয়া ধূর্ততা, শঠতা, লোক চেনার মত পরিপক্কতা এই সব তোমাকে আয়ত্ত্ব করতে হবে।
বেটা, আমি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি সবার ওপরে ইনসানিয়াত, মনুষ্যত্ব। সর্ব্বশক্তিমান আল্লা তাদেরই পাশে থাকেন যারা মানুষের পাশে থাকে। আল্লার কাছে দোয়া করি যেন তুমি শেষ দিন পর্য্যন্ত যে ধর্ম্মেরই মানুষ হোক, সাচ্চা ইনসানের পাশে যেন দাঁড়াতে পারো।
আমায় এই সব উপদেশ দিতে দিতে নৃশংস নিষ্ঠুর হিন্দু বিদ্বেষী সম্রাট আওরংজেব হঠাৎ যেন একটু আত্মবিস্মৃত হয়ে গেলেন, তাঁর গলায় আমি পেলাম অনুতাপের আর আত্মধিক্কারের সুর। এ যেন এক অন্য আওরংজেব!
বেটা,আমি জীবনে যত অপরাধ করেছি, তার শেষ নেই, আমি জানি খোদাতালার কাছে তার ক্ষমা নেই। সেই পাপ এই মুলুক আমার তখত্ সব ধ্বংস করে দেবে। এ থেকে আমার রেহাই নেই বেটা।
কুর্সির লালচে আমি আব্বাজানকে বন্দী করেছি,অত্যাচার করেছি, নিজের ভাইদের একে একে নৃশংস ভাবে খতম করেছি। আমার হাত খুনে লাল হয়ে আছে। তখন আমার একটাই লক্ষ্য, সকলকে সরিয়ে আমিই হবো হিন্দুস্তানের মালিক। আলমগীর আওরংজেব। বাকি সবাই থাকবে আমার পায়ের তলায়। যে যখন আমার বিরোধিতা করেছে, তাকে আমি সরিয়ে দিয়েছি। আল্লার দরবারে এর কোন ক্ষমা নেই।
এদিকে আমি মনে মনে ভাবছি ব্যাপারটা কি, বাদশা একবার বলছেন ধূর্ত্ত হও, শঠ হও, নির্মম হও, আবার অন্যদিকে মানবতার বাণী শোনাচ্ছেন, আবার নিজের কৃতকর্মের জন্যে অনুশোচনা করছেন। এতো মরণকালে হরিনামের মত শোনাচ্ছে! দেরীতে বোধোদয়?
এই সব ভাবছি, এমন সময় সুভদ্রার ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল। দেখলাম সন্ধ্যা হয়েছে, হোটেল থেকে ঘরে চা দিতে এসেছে, সাথে বিস্কুট। স্বপ্নের রেশটা কিন্তু রয়েই গেল মনের ভিতরে। ভাবছিলাম কে যে আমাদের মনের নানা চিন্তা আর কল্পনা মিশিয়ে এই সব আশ্চর্য্য বাস্তব স্বপ্ন তৈরী করে্ !
আমি সেই লোকটার নাম দিয়েছি স্বপ্নের জাদুকর।


৬) রাত্রের আড্ডা
আজকের আড্ডার বিষয় হলো কর্পোরেট জগতে প্রেম। দীপঙ্করের কর্পোরেট জগতের হোমরা চোমরা লোক – কানোরিয়া, বাজোরিয়া, গোয়েঙ্কা, বাঙ্গুর, আগরওয়াল দের সাথে খুব মেলামেশা, দহরম মহরম। তার স্টকে তাই তাদের নিয়ে অনেক গল্প। সেই সব গল্প আমাদের সে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলে।
দীপঙ্করের সেদিন বলা দুটো গল্প এখনো মনে পড়ে।
প্রথম গল্প – দজ্জাল বৌ
একটা বড় রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান তাঁর সেক্রেটারী একটি কমবয়েসী মেয়ের প্রেমে পড়ে গেছেন। অফিসে অনেক সিনিয়র ম্যানেজার দের দু’জনের এই পারস্পরিক ভাল লাগার ব্যাপারে কিছুটা আন্দাজ আছে, কিন্তু এই নিয়ে কেউ কিছু বলেনা, প্রাপ্তবয়স্ক দুই নারী ও পুরুষ তাদের সম্পর্ক কি ভাবে তৈরী করবে তাতে কার কি বলার আছে? তার ওপর চেয়ারম্যান বলে কথা।
তো একদিন সকালে চেয়রাম্যান ট্যুরে কলকাতার বাইরে গেছেন, তাই তাঁর অফিস প্রায় খালি। সেই সেক্রেটারী মহিলা আর কিছু অন্য মহিলা টাইপিস্ট নিজেদের মধ্যে হাসি ঠাট্টা করছেন। বস্ নেই তাই কাজ ও নেই, বেশ একটা খুসীর আমেজ অফিসে।
এমন সময় রঙ্গমঞ্চে হঠাৎ চেয়ারম্যানের স্ত্রীর প্রবেশ। তাঁকে ওই মেয়েরা সবাই চেনে, সবাই সন্মান জানিয়ে তাঁকে গুড মর্ণিং ম্যাডাম বলার আগেই মহিলা গিয়ে সেই সেক্রেটারী মেয়েটির কাছে গিয়ে তার চুল ধরে এক টান। আর এলোপাথাড়ি চড় চাপড় এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি।
তোর এত বড় আস্পর্দ্ধা, আমার বরের সাথে লুকিয়ে প্রেম করছিস, জানিস তোর কি ব্যবস্থা করবো আমি? আমায় তুই চিনিস না্…ইত্যাদি।
সেই সেক্রেটারী মেয়েটি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও পরে সেও সহকর্ম্মীদের সামনে এই অপমান সহ্য করবে কেন, সেও সমান তালে মহিলার ওপরে চড়াও হলো। চেয়ারম্যানের দামী কার্পেটে ঢাকা অফিসে দুই বয়স্ক ভদ্রমহিলার মধ্যে শুরু হয়ে গেল চুলোচুলি।
সৌভাগ্য বশতঃ সেদিন ব্যাঙ্কের আরও দুই একজন উচ্চপদস্থ অফিসার সেদিন সেই অফিসে নিজেদের ঘরে ছিলেন, তাঁরা বাইরে বেরিয়ে এসে কোনমতে দুই মহিলাকে থামান।
দীপঙ্কর ওই ব্যাঙ্কের ডাইরেক্টর ছিল, সে এই ঘটনার কথা শোনে কোম্পানীর সেক্রেটারীর কাছ থেকে। তিনি নাকি দীপঙ্কর কে বলেছিলেন মিস্টার চ্যাটার্জ্জি, আপনি একটু চেয়ারম্যান সাহেব কে বুঝিয়ে বলুন না।
আমি বললাম তুমি কি বুঝিয়ে বললে?
দীপঙ্কর বলল দূর, আমি কি বোঝাবো? শেষ পর্য্যন্ত ওই দজ্জাল বৌয়ের ভয়ে তিনি নিজে থেকেই সরে এসেছেন
দ্বিতীয় গল্প – কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে
একটি নামকরা এয়ার কন্ডিশনার কোম্পানীর মালিক এক মাড়োয়ারী, শিক্ষিত, সুদর্শন ভদ্রলোক, স্ত্রী আর দুই প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ে নিয়ে তাঁর সুখী পরিবার। এই কোম্পানীটা তিনি নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন।
তো এক দিন একটি অল্প বয়েসী মেয়ে তাঁকে লাইফ ইন্স্যুরেন্স বিক্রী করতে আসে। কি যে ছিল সেই মেয়েটির মধ্যে কে জানে, ভদ্রলোক তার প্রেমে পড়ে গেলেন। তারপরে এই দু’জনের মধ্যে যে একটা অদ্ভুত,অবিশ্বাস্য, অসমবয়েসী সম্পর্ক তৈরী হল তা কেবল গল্প উপন্যাসেই সম্ভব।
শেষ পর্য্যন্ত ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে ডিভোর্স করে তাঁর পরিবার কে ছেড়ে দিয়ে মেয়েটির সাথে ঘর বাঁধলেন। তিনি তাঁর সম্পত্তির সিংহভাগ, তাঁর বাড়ী ঘর, এমনকি কোম্পানীর সব শেয়ার তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে উইল করেছিলেন, নিজেও কোম্পানী থেকে সরে এসেছিলেন।
দীপঙ্কর ছিল সেই কোম্পানীর অডিটর। ভদ্রলোকের অনুরোধে দীপঙ্কর তাঁর উইল এবং ডিভোর্সের কাজ কর্ম, সম্পত্তির ভাগ ইত্যাদি সব দেখা শোনা করেছিল।
কর্পোরেট জগতের পুরুষ ও নারীর নিষিদ্ধ সম্পর্কের এই দু’টি গল্প নিয়ে আমাদের অনেক তর্কের অবকাশ ছিল। প্রথম গল্পটি তো অনায়াসে “Me too” আন্দোলনের পর্য্যায়ে পড়বে। সেক্রেটারী মেয়েটির সাথে চেয়ারম্যানের এই সম্পর্ক কোন ভাবেই প্রেম বলে ধরা যায়না। এটা অবশ্যই পুরুষের ক্ষমতার অপব্যবহার। কিন্তু দ্বিতীয় গল্পটি ঠিক সেই জাতের নয়। এই গল্পেও নিষিদ্ধ সম্পর্ক আছে, কিন্তু নারী পুরুষের গভীর প্রেমই হলো এই গল্পের প্রধান উপজীব্য। একজন পুরুষ একজন নারীকে ভালবেসে তাঁর সামাজিক সন্মান, প্রতিপত্তি, ধন, মান এমন কি নিজের স্ত্রী আর পরিবারকেও ছেড়ে যেতে পারেন?
এসেছো প্রেম, এসেছো আজ, কি মহা সমারোহে…
কিন্তু এর মধ্যেও মেয়েরা পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচার দেখবে আমার সন্দেহ নেই। তাদের সহানুভূতি থাকবে স্ত্রী এবং সন্তানদের প্রতি। তাদের এই ভাবে ছেড়ে চলে যাবার কোন অজুহাতই তারা মেনে নেবেনা। দাম্পত্যে বিষ জমলেও দু’জন কে একসাথে থেকে যেতে হবে? আর ছাড়াছাড়ি হলেই ছেলেদের দোষ!
আমাদের চেনা জানা অনেক গুণী মানুষ বিবাহিত হয়েও নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়িয়ে স্ত্রীকে ছেড়ে অন্য নারীর সাথে জীবন কাটিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন রবিশঙ্কর, সমরেশ বসু, সলিল চৌধুরীর মত সর্ব্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষেরা।
আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই তথাকথিত hegemonic toxic masculinity নিয়ে আমাদের বৌরা একটা আক্রমনাত্মক আলোচনা শুরু করার জন্যে মুখিয়ে ছিল, কিন্তু আমাদের ভাগ্য ভাল যে তার আগেই নীচ থেকে একজন এসে বললো স্যার খেতে আসুন, ডিনার রেডি।



তৃতীয় এবং শেষ দিন – ১৪/১২/২০২৩
১) রাজবাড়ী ট্যুর
আজ আমাদের এখানে শেষ দিন।
পল্লব আজ সকালে আমাদের জন্যে কাশিমবাজারের রাজবাড়ীর একটা ট্যুরের বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। ব্রেকফাস্টের পরে এক মহিলা আমাদের নিয়ে পুরো রাজবাড়ী ঘুরিয়ে দেখালেন, তার সাথে তিনি কাশিমপুরের রাজপরিবারের এবং রাজবাড়ীর ইতিহাস নিয়ে ও অনেক তথ্য জানালেন আমাদের।
আমরা জানলাম ১৭৪০ খৃস্টাব্দে পেশায় ব্যবসায়ী দীনবন্ধু রায় এই প্রাসাদোপম বাড়িটি তৈরি করেন। পরে ব্রিটিশ সরকার এই জমিদার পরিবারকে তাদের প্রজাকল্যাণ, ধর্ম্মনিরপেক্ষতা আর সুশাসনের পুরস্কার হিসেবে রাজা উপাধি দেন। ১৯৯০ এর দশকে পরিবারের উত্তরাধিকারীরা বাড়ির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন। বাড়ির কিছুটা অংশ নিয়ে অতীত ঐতিহ্য বজায় রেখে পরিবারেরই উদ্যোগে ট্যুরিস্টদের থাকার জন্য চালু হয়েছে কাশিমবাজার রাজবাড়ী গেস্ট হাউস।
বিশাল জায়গা জুড়ে রাজবাড়ী। প্রথমে আমরা গেলাম বাড়ীর বাইরে চারিদিক টা দেখতে। প্রাসাদের সামনে সুন্দর সবুজ লন আছে, কিন্তু বাড়ীর পিছনে সেই তুলনায় বেশ অযত্নের ছাপ। একটা পুকুর পাশে বাঁধানো ঘাট, কিন্তু জল ময়লা, ব্যবহার করা হয় বলে মনে হলোনা। চারিদিকে ছাতিম, চাঁপা, এবং আরও অনেক বড় বড় গাছ। একটা সিমেন্টের টেনিস কোর্ট ও দেখলাম হইয়তো বহুদিন আগে সাহেবসুবোরা সেখানে খেলতেন, কিন্তু এখন আর কেউ খেলেনা, কোর্টময় ধূলো আর চারিদিকে শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে। রাজবাড়ীকে ফাইভ স্টার ডি লুক্স হোটেল করতে গেলে পল্লবদের এখনো অনেক টাকা ঢালতে হবে।
বাড়ীর অন্দরমহলটা কিন্তু সুন্দর, পরিস্কার, সাজানো গোছানো। বৈভবের চিহ্ন চারিদিকে। এক তলার সুদৃশ্য হলঘরে ঝকঝকে পরিস্কার মার্বেলের মেঝে। চারিপাশের দেয়ালে সাজানো নানা মূল্যবান কাঁচের, রুপোর, হাতির দাঁতের তৈরী ঘর সাজাবার সামগ্রী, আর ফ্রেমে বাঁধানো অনেক পুরনো পারিবারিক ছবি। হলঘরে বসার জন্যে দামী এবং আরামদায়ক সোফা, আর মাথার ওপরে বিশাল ঝাড়লন্ঠন। একটা প্রাচীন পাল্কীও রাখা আছে দেখলাম এক জায়গায়, কবে সেটা শেষ ব্যবহার করা হয়েছিল, এবং কি উপলক্ষ্যে, কে জানে?
রাধা গোবিন্দ মন্দির, নাটমন্দির, ভোগের ঘর, দালান ও গর্ভগৃহ দেখে আমরা এগোলাম চন্ডীমণ্ডপের দিকে। এই চন্ডীমণ্ডপেই খুব ধূমধাম করে দূর্গা পূজো হয়, কলকাতা থেকে রায় পরিবারের সবাই আসেন। দূর্গা দালানে অনেক গান বাজনা ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
আমাদের রাজবাড়ীর ট্যুর শেষ হলো বেলা দশটা নাগাদ।
সন্ধ্যায় আমাদের ফেরার ট্রেণ, দিনের অনেকটাই বাকি আছে, দুটো গাড়ীও আছে, সাথে, তাই কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়?
মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি দেখার মত অনেক ঐতিহাসিক জায়গা আছে, রয়েছে প্রচুর মন্দির, যার অধিকাংশই বেশ কয়েক শতাব্দী পুরনো। কাশিমবাজারে মোগলদের আমলে ব্রিটিশ আর ডাচরা এখানে নদীর ধারে কুঠি (warehouse) বানিয়ে থাকতো, এখানে তাদের কবরখানা দেখতে অনেকে আসে। । বহু প্রভাব প্রতিপত্তিশালী ব্রিটিশ এবং ডাচ ব্যক্তিত্বের শেষ শয়নভূমি এই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেই।
তাছাড়া আছে ১৭৫০ ক্রিস্টাব্দ নাগাদ স্থাপিত নাটোরের রানী ভবানীর টেরাকোটার মন্দিরগুলি। কিরিটেশ্বড়ী কালী মন্দির, যা কালী পিঠগুলির মধ্যে অন্যতম। খোশবাগে আছে সিরাজউদ্দৌলা এবং তার পরিবারের কবরগুলি।
সময় থাকলে পলাশীতেও হয়তো যাওয়া যেতো্ কিন্তু শুনলাম সেখানে ধূ ধূ করছে ফাঁকা মাঠ, তার মধ্যে একটা জায়গায় লাঠির ওপরে একটা বোর্ড টাঙানো আছে, তাতে লেখা “এই স্থানে ১৭৫৭ সালের জুন মাসে পলাশীর যুদ্ধ হইয়াছিল।”
সেই বোর্ড দেখার জন্যে দেড় ঘণ্টা গাড়ী চালিয়ে যাবার কোন মানে হয়না।
আমাদের হাতে সময় নেই তাই এত সব জায়গা দেখে আসা সম্ভব হবেনা। এই বয়সে এত ছোটাছুটিও করা মুস্কিল।
অমিতাভ বললো গাড়ী নিয়ে গঙ্গার ব্রীজ পেরিয়ে আজিমগঞ্জ যাওয়া যেতে পারে, লাঞ্চের মধ্যে ফিরে আসা যাবে। সেখানে নাকি বড়াকোঠি বলে ভাগীরথীর তীরে একটা বড় নিরামিষ হোটেল আছে, খুব দামী, প্রতি রাতে এক ঘরের ভাড়া প্রায় ৩০,০০০ টাকা, সেখানে শুধু খুব বড়লোক মাড়োয়ারীরাই গিয়ে থাকে।
তারপরে আজিমগঞ্জ থেকে ফিরে দুপুরে লাঞ্চের পরে একটু হোটেলে বসে প্যাকিং সেরে বিল মিটিয়ে বিকেলের দিকে স্টেশন চলে যাবো।




২) আজিমগঞ্জ
দু’টো গাড়ী নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আজিমগঞ্জের দিকে। সামনের গাড়ীতে ড্রাইভারের পাশে সামনে আমি, পিছনে দীপঙ্কর প্রবীর আর অমিতাভ, পিছনের গাড়ীতে মেয়েরা।
মুর্শিদাবাদ আর বহরমপুর পাশাপাশি শহর। বহরমপুর এখন মুর্শিদাবাদ জেলার প্রশাসনিক হেড কোয়ার্টার, প্রধানতঃ কাঁসা আর পেতলের বাসনের জন্যে জায়গাটা বিখ্যাত, তা ছাড়া শোলা, সিল্ক, হাতির দাঁত ইত্যাদি নিয়েও এখানে অনেক কুটির শিল্পের দোকান দেখা যায়, রাস্তায় বেশ ভীড়, দুই পাশে প্রচুর দোকানপাট। তাছাড়া অবশ্যই আছে এখানকার বিখ্যাত মিষ্টি ছানাবড়ার দোকান।
একটু পরেই এসে গেল ভাগীরথীর ওপরে ব্রীজ। এবং তার পরেই দীপঙ্করের ফোন বেজে উঠলো, ক্রিং ক্রিং!
বাইরে বেড়াতে এলেও দীপঙ্কর তার অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে, মাঝে মাঝেই তার কাছে নানা কাজের ফোন আসে, এবং সে তার কর্ম্মচারীদের নানা রকম নির্দেশ দিয়ে আবার আমাদের আড্ডায় ফিরে আসে।
আজ তাকে ফোন করছে তার সেক্রেটারী। আমরা শুনেছি মেয়েটি খুব কাজের, দীপঙ্কর তার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অফিসের বাইরে থাকলে তার সাথে ফোনে কথা বলতে দীপঙ্করের বেশ ভালোই লাগে।
যাই হোক, ওদিক থেকে মেয়েটি কি বলছে শোনা না গেলেও দীপঙ্করের কথা শুনে বুঝলাম যে হায়দ্রাবাদে কিছুদিন পরে তাকে একটা কোম্পানীর বোর্ড মিটিং এ যেতে হবে, তাঁর সাথে কলকাতা থেকে যাবেন আর এক ভদ্রলোক। মিটিংটা বিকেলে হবার কথা কিন্তু দীপঙ্করের অন্য একটা কাজ পড়ে যাওয়ায় সে মিটিংটা পরের দিন সকালে করতে চায়। কিন্তু এই বদল করাটা সোজা কাজ নয়।
প্রথমতঃ সেই কোম্পানী কে রাজী করাতে হবে, তারপর তারা রাজী হলে ওই অন্য ভদ্রলোক কে জানাতে হবে, তিনি রাজী হলে দু’জনের এয়ার টিকিট আর একটা রাত থাকার জন্যে হোটেলের ব্যবস্থা করতে হবে। ইত্যাদি।
এক বার ভাল করে বুঝিয়ে বললে এই সেক্রেটারী মেয়েটি এক এক করে গুছিয়ে এই সমস্ত কাজ করে ফেলতে পারে। কিন্তু দীপঙ্কর ফোনে তাকে কাজগুলো দিচ্ছে এক এক করে, মেয়েটি একটা কাজ শেষ করে ফোনে জানাচ্ছে, দীপঙ্কর তখন তাকে ফোনে পরের কাজটা বিশদ করে বুঝিয়ে দিচ্ছে।
ক্রিং ক্রিং… “কি কোম্পানী রাজী হলো? তাহলে এবার মিস্টার ভটচাজ্জি কে ফোন করে জানাও”।
ক্রিং ক্রিং…“মিস্টার ভটচাজ্জি রাজী? বেশ! এবার তুমি আমাদের বিজনেস ক্লাসে দুটো রিটার্ণ এয়ার টিকিটের বন্দোবস্ত করে ফেলো! পরের দিন সন্ধ্যায় ফিরবো! ”
ক্রিং ক্রিং…
এই ভাবে পাঁচ দশ মিনিট অন্তর অন্তর দীপঙ্করের ফোন আসতেই লাগলো। এক দিকের বাক্যালাপ শুনে বেশ সময়টা কেটে গেল। ইতিমধ্যে আমরা আজিমগঞ্জ রেল স্টেশন পৌঁছে গেছি। স্টেশনের পরে একটা সরু রাস্তা তাতে বিস্তর যানবাহন চলাচল করছে। আমাদের বড় Innova SUV কোনমতে সেই রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছে।
কিন্তু কোথায় বড়াকোঠি?
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে জায়গাটা পাওয়া গেল। বাইরে থেকে দেখে বড়াকোঠির মাহাত্ম্য টের পাওয়া মুস্কিল। সাধারণ একাট বাড়ী, সামনে কোন বড় গেট নেই, বাগান নেই, শুধু একটা ছোট খোলা দরজা। গাড়ী পার্ক করার জন্যে একটা খোলা মাঠ সামনে, সেখানে গাড়ি রেখে আমরা সেই বাড়ীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
হোটেলে কোন ঘর খালি নেই, আমাদের ভিতরে ঢুকে দেখার আবেদন মঞ্জুর হলোনা। বড়াকোঠি আসা আমাদের বিফল ই হলো।
অবশ্য পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলা যাবেনা। বড়াকোঠি একেবারে নদীর ধারে, সেখানে অতিথিদের সকালের ব্রেকফাস্ট আর বিকেলের চা খাবার জন্যে অনেক টেবিল আর চেয়ার সাজানো আছে, সেখানে এই দুপুরে কেউ নেই, আমরা গিয়ে সেখান থেকে নদীর শোভা দেখলাম বসে বসে।
সেই গভীর স্রোতহীন শান্ত নদীর নীরবে বয়ে যাওয়া বড় সুন্দর দৃশ্য। নদীর জলে আকাশের ছায়া পড়েছে, দুই পারের ঘাটে অনেক মানুষ জনের জটলা, কিছু দোকান পাট, আর নদী পারাপার করছে অনেক নৌকা। কেউ মাল বোঝাই, কিছু নৌকায় অনেক মানুষ এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে।
যেন আবহমান কাল থেকে বয়ে যাচ্ছে এই নদী। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী সে। আজিমগঞ্জে বড়াকোঠির পাশে ভাগীরথীর পারে বসে নদীর ওপারে মুর্শিদাবাদ শহরের দিকে তাকিয়ে আমার মন চলে গেল সেই সব পুরনো দিনে।
আমি মনে মনে চলে গেলাম সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর মুর্শিদাবাদে। মোগল সাম্রাজ্য ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে, মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলার স্বাধীন নবাব, ইংরেজরা ক্রমশঃ মোগলদের সরিয়ে তাদের ক্ষমতা বিস্তার করছে। ইংরেজদের কাছে বেঙ্গল প্রভিন্স হলো সোনার দেশ। মুর্শিদাবাদ ও তার নিকটবর্ত্তী শহর ও গঞ্জ থেকে তারা কিনে আনে আফিম, তামাক, নীল, সোরা, পাট, তুলো, রেশম থেকে খাদ্যশস্য মশলা ও নানাবিধ জিনিষ। সেই মালপত্র রাখা হয় নদীতীরবর্ত্তী কাশিমবাজার কুঠির গুদামঘরে।
ওদিকে হুগলী নদীর কাছে তিনটি গ্রাম ইজারা নিয়ে ইংরেজরা গড়ে তুলেছে এক নতুন শহর, তার নাম ক্যালকাটা। উদীয়মান সেই শহরে এসে বসতি স্থাপন করছে নানা জাতির ভাগ্যান্বেষী মানুষজন।
কাশিমবাজার এবং দেশের অন্যান্য শহর থেকে এই সব মজুত মাল যথেষ্ট পরিমাণ হলে তাদের ছোট বড় নানা নৌকায় নিয়ে যাওয়া হয় সেই নতুন শহর ক্যালকাটায়। তারপরে সেই সব মাল বোঝাই করা হয় জাহাজঘাটায় নোঙ্গর করে থাকা বিশাল বিশাল বাণিজ্যপোতে। তারা পাল তুলে রওনা হয়ে যায় সাত সমুদ্র পেরিয়ে ইংল্যান্ডের দিকে।
একসময় যিনি ছিলেন স্রেফ দেওয়ান কারতলব খান, সেই তিনিই এখন বাংলা বিহার উড়িষ্যা সুবার দন্ড মুন্ডের কর্তা নবাব মুর্শিদকুলী খান। তাঁর কর্ম্মক্ষেত্র ছিল ছোট এক জনপদ মুকসুদাবাদ, এক পীরের নামে। সেই শহর এখন সুবা বাংলার রাজধানী – মুর্শিদাবাদ, তাঁর নামাঙ্কিত।
মুর্শিদকুলী খানের স্বপ্ন দিয়ে সাজানো এই শহর। নদীর পাড় দিয়ে পরের পর কেয়ারী করা ফুলের বাগিচা। ঘাটে ঘাটে নোঙ্গর ফেলে আছে নানা জাতের জলযা্ন, ডিঙ্গি নৌকা থেকে বড় বড় বর্ণময় ময়ূরপঙ্খী, মকরমুখী সাগরদাঁড়ি বজরা । শহর জুড়ে অসংখ্য অট্টালিকা, মসজিদ, সুউচ্চ মিনার, গম্বুজ, আছে ত্রিশূল চিহ্নিত শিব মন্দিরও। আলোয় আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে।
গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা, কাবেরী যমুনা ওই/
বহিয়া চলেছে আগের মত, কইরে আগের মানুষ কই?/
আগের মানুষ নেই, সেই আগের বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী আলো ঝলমল মুর্শিদাবাদও কি আর আছে?
আজ সে ধূলিধূসরিত এক মলিন শহর, তার সারা গায়ে আজ অবক্ষয় আর দারিদ্র্যের চিহ্ন।




৩) ফেরা
আজমগঞ্জ থেকে কাশিমবাজারে ফিরে লাঞ্চ সেরে মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে হোটেলের বিল মিটিয়ে স্টেশনের দিকে এগোলাম। লালবাগের ব্যস্ত রাস্তায় তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে।
বিদায়, মুর্শিদাবাদ!

-
কোলাঘাটে রূপনারায়ণের তীরে শীতের দুপুর – জানুয়ারী, ২০২১

ষাটের দশকে আমাদের ছোটবেলায় শঙ্করীপ্রসাদ বসু ক্রিকেট খেলার বর্ণময় ইতিহাস নিয়ে “ইডেনে শীতের দুপুর” নামে একটা বই লিখেছিলেন। তোমাদের মধ্যে যারা আমার সমবয়সী এবং ক্রিকেট নিয়ে তখন যাদের উৎসাহ ছিল তাদের সেই বইটির কথা মনে আছে নিশ্চয়। এই লেখাটির নাম সেই বই থেকে ধার করা।
কুয়েতের বন্ধুদের সাথে সেই আশির দশক থেকে বন্ধত্ব। সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত এর ভেতর দিয়ে আমদের একসাথে পথচলা। এখন সবাই কাজ থেকে অবসর নিয়ে কুয়েত থেকে ফিরে এসেছি। আমাদের মধ্যে যারা কলকাতায় এসে থিতু হয়েছি তারা মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে আড্ডা জমাই। বা একসাথে কলকাতার কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে চলে যাই।
এই লেখাটা আমাদের বন্ধুদের কোলাঘাট বেড়ানো নিয়ে।
——————————————–


কাজ থেকে অবসর নেবার পরে এখন আমাদের জীবন বেশ আনন্দের, রোজই ছুটি, যখন যেখানে খুসী চলে যাই, উইকএন্ডের সন্ধ্যায় আবার কাল সকালে কাজে যেতে হবে বলে মন খারাপ হয়না। এখন সপ্তাহের প্রতিদিনই উইকএন্ড। কিন্তু কোভিডের অতিমারীতে ২০২০ সালটা প্রায় পুরোটাই বাড়ীতে বন্দী হয়ে কেটেছে।
২০২১ সালের জানুয়ারী মাসে – তখন কোভিডের প্রকোপ কিছুটা কমেছে, ভ্যাক্সিন আসার কথা শোনা যাচ্ছে – আমরা কুয়েতের বন্ধুরা দুচ্ছাই আর পারা যাচ্ছেনা বলে দু’দিনের জন্যে কলকাতা থেকে বাস ভাড়া করে কোলাঘাট ঘুরে এলাম।
কলকাতা থেকে কোলাঘাট ঘন্টা দুয়েকের পথ, বেশ চওড়া পরিস্কার রাস্তা। সকাল সকাল বেরিয়ে বেলা বারোটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম।
আমাদের হোটেলের নাম সোনার বাংলা। রূপনারায়ণ নদীর ধারে। সুন্দর বাগান, সেখানে এই জানুয়ারীর শীতে ফুলের মেলা। আর সোনালী রোদ। আমাদের সবার গায়ে গরম জামা, মনের ভিতরে উষ্ণতা ।


বেলা একটা নাগাদ পোঁছে ইলিশ মাছের নানা পদ দিয়ে তৈরী উপাদেয় লাঞ্চ সেরে বাগানে চেয়ার টেনে গোল হয়ে বসে আমাদের আড্ডা শুরু হলো।
সারা দুপুর আর সন্ধ্যা পর্য্যন্ত চললো আমাদের অন্তহীন আড্ডা। অনেক দিন পরে একসাথে হয়েছি আমরা – তাই আমাদের গল্প আর ফুরোতে চায়না। এক এক জন এক একটা গল্প বলে আর বাকি আমরা সবাই হো হো করে হাসিতে লুটিয়ে পড়ি।
গল্পে গল্পে কি করে যে সময়টা কেটে গেল বুঝতেই পারলামনা। রেস্টুরেন্ট থেকে আমাদের টেবিলে চা দিয়ে গেল। ক্রমশঃ সন্ধ্যা নামলো। নদীর ওপারে সুর্য্যাস্ত হলো, কুয়াশার স্তর নেমে এলো নদীর জলের ওপর। বেশ মায়াবী দৃশ্য।
আমাদের আড্ডায় অনেক মজার মজার গল্প বললো সবাই। সব গল্পই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তুলে আনা।
সেদিনের কিছু গল্প এই সাথে।


১ – সুভদ্রার গল্প – পুলি পিঠে
কুয়েতে সুভদ্রা ALICO তে লাইফ ইন্সুরেন্স বিক্রী করতো আর তার খদ্দেরদের কাছে যাবার জন্যে সে তার সাধের বিশাল Mitsubishi Pajero (SUV) গাড়ী চড়ে সারা কুয়েত শহর চষে বেড়াতো।
তার গাড়ীর গ্যারেজ ছিলো Sharq এ Fisheries বিল্ডিং এর উল্টোদিকে। গাড়ীতে কোন গন্ডগোল হলে সে নিজেই সেখানে গাড়ী নিয়ে চলে যেতো। সেই গ্যারেজের মেকানিকরা সবাই ভারতীয়। তাদের যে লীডার তার নাম মওলা, সে অন্ধ্রের লোক। ভাঙা ভাঙা হিন্দী তে কথা বলে।
তো একবার সুভদ্রার গাড়ীর ফ্যান বেল্ট ছিঁড়ে খুলে গেছে। আমি সুভদ্রা কে বললাম পুলি থেকে বেল্টটা খুলে গেছে, মওলা কে বললেই ও বুঝে যাবে।
সুভদ্রা ফ্যান বেল্ট কথাটা ভুলে গেছে, তার শুধু মনে আছে পুলি।
সে গ্যারেজে গিয়ে মওলা কে বললো “দেখো তো পিঠে মে কুছ হুয়া…”
পিঠে?
মওলা তো অবাক!
“পিঠে কেয়া হ্যায় ম্যাডাম?”
তারপর গাড়ীর বনেট খুলে অবশ্য মওলা বুঝে যায় প্রবলেমটা কি।
গল্পটা শুনে সিদ্ধার্থ বললো তুমি ওকে বললেনা কেন “পাটিসাপটা কো জরা দেখনা, উসমে কুছ গড়বড় হুয়া হোগা…”

২ – সিদ্ধার্থর গল্প
আমার বন্ধু সিদ্ধার্থর মেজমাসীর একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল, luck ও বলা যায়, তাঁর সাথে celebrity দের পথে ঘাটে দেখা হয়ে যেত। এবং তাদের সাথে দেখা হলেই চেনা নেই শোনা নেই তবু মেজমাসী খুব smartly তাদের সাথে গিয়ে আলাপ জুড়ে দিতে পারতেন। এবং আলাপ করে বাড়ি এসেই তিনি তাঁর বোনদের সবাই কে ফোন করে বলতেন কার সাথে দেখা হল, তিনি কাকে কি বললেন, তারা কি বললো ইত্যাদি।
একবার নিউ মার্কেটে মাধবী মুখার্জ্জীর সাথে মেজমাসীর দেখা। মেজমাসী বললেন এ কী মাধবী, তোমার মুখটা এত শুকনো লাগছে কেন? শরীর খারাপ নাকি? মাধবী একটু সংকোচের সাথে বললেন আমি তো মাসীমা আপনাকে ঠিক…
মেজমাসী বললেন আমায় চিনতে পারছোনা তো? কি করে চিনবে? তুমি তো আমায় কোনদিন দ্যাখোইনি।
এই নিয়ে মাসীমা মানে সিদ্ধার্থর মা’র একটা inferiority complex ছিল, কেননা তাঁর সাথে কোনদিন কোন celebrity র দেখা হয়না।
তো একবার মাসীমা ছেলের কাছে কুয়েতে বেড়াতে এসেছেন। মাস তিনেক থাকার পরে সিদ্ধার্থ তাঁকে নিয়ে কলকাতা যাচ্ছে। দুবাই তে Stop over, সেখানে সিদ্ধার্থ দ্যাখে মৃণাল সেন লাউঞ্জে একটু দূরে বসে আছেন। মাসীমাও দেখেছেন।
সিদ্ধার্থ মাসীমাকে বলল মা আমি একটু বাথরুমে যাচ্ছি, তুমি কিন্তু একদম ওনার সাথে গিয়ে কথা বলবেনা।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে সিদ্ধার্থ দ্যাখে যা ভয় পেয়েছিল তাই, মাসীমা মৃণাল বাবুর পাশে বসে দিব্বি আলাপ করে যাচ্ছেন। সিদ্ধার্থ কাছে আসতে মাসীমা বললেন এই হল আমার ছেলে, কুয়েতে থাকে। মৃণাল বাবু বেশ গপ্পে লোক, তিনি বললেন আমিও কুয়েতে গিয়েছিলাম একবার বেশ কিছুদিন আগে…
দমদম থেকে যাদবপুরে বাড়িতে ঢুকেই মাসীমার ফোন মেজমাসীকে।
মেজদি, জানিস আজ কার সাথে দেখা হলো?
ঋত্বিক ঘটক!

৩ – টিঙ্কুর গল্প
টিঙ্কু আর দেবাশীষ কলকাতায় ফিরে আসার পর, তাদের ড্রাইভার সুভাষ ওদের প্রায় বাড়ীর লোক হয়ে গেছে। গাড়ী চালানো ছাড়া সে ওদের বাজার দোকান ইত্যাদি অনেক কাজ হাসিমুখে করে দেয়। সে একাধারে বিশ্বাসী আর করিতকর্ম্মা ছেলে।
তো একদিন টিঙ্কু সুভাষ কে বললো, “আমার জন্যে বারোটা বারোটা করে দুই গোছা চব্বিশটা রজনীগন্ধা নিয়ে আসিস তো। কাটতে হবেনা, আমি কেটে নেবো।”
কিছুক্ষণ পরে সুভাষ রজনীগন্ধা নিয়ে এসে হাজির। টিঙ্কু বলল, “নিয়ে এসেছিস, ঠিক আছে ফ্রিজে রেখে দে।”
বিকেলে টিঙ্কু ফ্রিজ খুলে কোথাও ফুল না দেখে সুভাষ কে বললো, “কি রে রজনীগন্ধা কোথায় রাখলি? ফ্রিজে তো দেখছিনা?”
“কেন, ওখানেই তো আছে”, বলে সুভাষ দুই তাড়া রজনীগন্ধা পান মসালার প্যাকেট নিয়ে এসে টিঙ্কু কে দিলো!
টিঙ্কুর তো তাই দেখে চক্ষু চড়কগাছ!
টিঙ্কুর বকুনী খেয়ে সুভাষ বলেছিল, “তাই দোকানের লোকটা বলছিল এগুলো তো এক প্যাকেটে দশটা করে থাকে, বারোটা তো হবেনা, দুটো আলাদা নিয়ে যান!”
সত্যি পান মসালার নাম রজনীগন্ধা হলে সুভাষ কি করবে?
কিন্তু টিঙ্কুরই বা কি দোষ?

৪) কোলাঘাট থেকে ফেরার পথে কোভিডের টেস্ট
পরের দিন কোলাঘাট থেকে কলকাতা ফেরার পথে এক জায়গায় গাড়ী দাঁড় করিয়ে রাস্তার পাশে একটা হোটেলে আমরা লাঞ্চ খেতে ঢুকলাম। প্রসূণ বললো, “তোমরা যাও আমি একটু টয়লেট হয়ে আসছি।”
একটু পরে ফিরে প্রসূণ ফিরে এলো, তার মুখের ওপর একটা রুমাল। সে বললো “আমার কোভিড হয়নি। ”
আমরা বললাম, “কি করে জানলে?”
প্রসূণ বললো “বাথরুমে একটা কোভিড টেস্ট দিয়ে এলাম। সব গন্ধই নাকে পেয়েছি। নিশ্চিন্ত।“



-
বিজয়পদ সর্দ্দারের গ্রামের বাড়ীতে একদিন

১ – ওরা থাকে ওধারে
জয়পদ আর বিজয়পদ এই দু’জন যমজ ভাই ছিল identical twins – দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ক্যানিং এর কাছে কোন এক অখ্যাত প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আমাদের পরিবারে কাজের লোক হিসেবে যখন তারা আসে তখন তাদের অল্প বয়েস। দু’জনে একেবারে এক রকম দেখতে, দু’জনেরি গায়ের রং কুচকুচে কালো, কথাবার্ত্তাও দু’জনে গ্রামের ভাষায় একই ভাবে বলে। দু’জনেই স্বাস্থ্যবান আর কর্মঠ, বাড়ীর কাজে তারা দু’জন – প্রথমে বিজয় ও সে কাজ ছেড়ে দেবার পরে জয় – বহাল হয়ে গেল সহজেই। ওরা আমারই বয়সী ছিল, হয়তো আমার থেকে সামান্য বড়োও হতে পারে।
আমাদের বাড়ীতে ছোটবেলা থেকেই সংসারে ঠিকে এবং দিন রাতের লোকেদের কাজ করতে দেখেছি। আমরা স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করে কত কিছু জানবো শিখবো, আর জয় বিজয় আমাদের সমবয়সী হলেও ওরা বাড়ীতে ফাইফরমাস খাটবে, আমাদের সাথে ওদের এই পার্থক্য, এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু আমাদের চোখে পড়েনি।
গ্রাম আর শহর, শিক্ষিত আর অশিক্ষিত, ভদ্রলোক আর অন্ত্যজ – আমাদের সমাজের মধ্যে এই যে একটা পরিস্কার শ্রেণীবিভাজনরেখা রয়েছে, সমাজের নিয়ম হিসেবেই আমরা তা মেনে নিয়েছি। হয়তো ওই প্রান্তিক খেটে খাওয়া সমাজের নীচের তলার মানুষেরাও সেই নিয়ম মেনে নিয়েছিল।
এটা এখন ভাবলে বেশ খারাপ লাগে।
তবে এটাও ঠিক যে ছোটবেলায় আমাদের ভাই বোনদের মনে ওই কাজের লোকদের প্রতি কোন নাক উঁচু মনোভাব ছিলনা। আমাদের বাড়ীর পরিবেশে কাজের লোকেরা থাকতো বাড়ীর লোকের মতোই। আর যেহেতু ওই দুই ভাইয়ের চমৎকার হাসিখুসী স্বভাব ছিল তাই অল্পদিনের মধ্যেই ওরা আমাদের বাড়ীর লোকের মত হয়ে যায়।
ইদানীং আমাদের দেশে খুব ধীরে হলেও ক্রমশঃ সমাজের নীচের স্তরের প্রান্তিক মানুষদের কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর প্রযুক্তি পৌঁছে যাচ্ছে। এখন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে পাকা বাড়ী, শৌচালয়, জল বিদ্যুৎ ইন্টারনেট মোবাইল ফোন ইত্যাদি সবই সহজলভ্য। একদা পিছিয়ে পড়া গ্রামের দলিত আদিবাসী লোকেরাও তাদের জীবনকে একটু একটু করে নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাবার সু্যোগ পাচ্ছে।
সম্প্রতি বিজয়ের গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে তার পরিবারের সাথে একটা দিন কাটাবার সুযোগ হয়েছিল। সেইদিন বিজয় কে দেখে দেশের সেই সামাজিক পরিবর্ত্তনের একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হলো আমাদের। যা ছিল একসাথে কৌতূহলোদ্দীপক এবং আনন্দদায়ক।
এই লেখাটা সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে।


২ মান্টুদা, মুখ থেইকে মাক্সোটা খুইলে ফেলো
জয়পদ আর বিজয়পদ দুই ভাই আমাদের বাড়ীর কাজ ছেড়ে দেবার পর ওদের সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিলনা। তবে ছোটমা অনেক চেষ্টা করে নানা জায়গায় তদবির করে বিজয় কে স্টেট ব্যাঙ্ক আর জয় কে FCI তে চাকরী করে দিয়েছিলেন। সরকারী চাকরী পেয়ে তাদের দুজনের জীবনেই অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছিল, অনেক দিন কাজ করার পরে ভাল পেনশন ইত্যাদি পেয়ে তাদের গ্রামের জীবনযাত্রা আমূল পালটে যায়।
সেই জন্যে ছোটমা’র প্রতি দুই ভাইয়ের মনে একটা কৃতজ্ঞতা বোধ ছিল, তাই আমাদের বাড়ীতে কাজের লোক না হলেও আমাদের পরিবারের সাথে এই দুই ভাইয়ের একটা যোগাযোগ থেকেই যায়। আমাদের নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ওরা আসতো, না বলতেই নিজে থেকে নানা কাজ করে দিত। তাদের গ্রামের বাড়ী থেকে তরীতরকারী ফলমূল ইত্যাদি এনে দিতো।
তারপরে তো অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে প্রধানতঃ খোকনের কাছ থেকে শুনতাম বিজয় এখন একজন সম্পন্ন গৃহস্থ, স্ত্রী ছেলে পুত্রবধূ নিয়ে বারুইপুরের কাছে এক গ্রামে তার বিরাট সংসার। তার আমন্ত্রণে ওদের গ্রামের বাড়ীতে ওরা মাঝে মাঝে যায়, আর গেলে বিজয় আর তার পরিবার তাদের নিয়ে কি করবে ভেবে পায়না, তাদের আদর যত্ন আর আতিথেয়তা পেয়ে খোকনরা আপ্লুত। ছোটমা বেশ কয়েক বার ওদের বাড়ীতে অতিথি হিসেবেও থেকে এসেছেন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষে লকডাউন এর প্রভাব যখন একটু কমেছে, শীত তখনো বিদায় নেয়নি, আমরা ভাই বোনেরা ভাবছি কোথাও সবাই মিলে একসাথে বেড়িয়ে আসবো, তখন খোকন একদিন বললো বিজয় বার বার বলছে ওদের বাড়ী আসতে, ওদের গ্রামটা দেখে আসবি নাকি?
আসবো তো বটেই, এরকম লোভনীয় প্রস্তাব কেউ ছাড়ে নাকি? আমরা এক কথায় রাজী। টুবলি কলকাতা এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে, সেও আমাদের সাথে যোগ দিতে চায়।
বুধবার ফেব্রুয়ারীর ষোল তারিখ যাওয়া ঠিক হলো।
কথামতো সেদিন সকাল দশটা নাগাদ একটা বড় Mahindra Scorpio SUV গাড়ী নিয়ে আমরা রওনা হলাম। পথে গড়িয়া থেকে খোকন মিঠু আর টুবলিকে তুলে নেওয়া হলো। টুবলি সল্ট লেকে ওদের বাড়ী থেকে Uber নিয়ে গড়িয়া চলে এসেছে।
গড়িয়া থেকে বাইপাস ধরে নরেন্দ্রপুর সোনারপুর ছাড়িয়ে আমরা বারুইপুরের দিকে এগোলাম। কলকাতা শহরের এই দক্ষিণ প্রান্তে বাইপাসের ধারে কত উঁচু উঁচু বাড়ী আর Housing complex ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে, দেখে অবাক হতে হয়।
বারুইপুর শহরটা বেশ বড়, শহরের প্রধান রাস্তার দুই দিকে দোকান, জমজমাট ভীড়। ছোটকাকা কাজ থেকে অবসর নেবার পরে এখানে একটা জমি কিনে বাড়ী করে বেশ কয়েক বছর ছিলেন। টুবলির তাই জায়গাটা চেনা। “বিয়ের পরে কলকাতা থেকে মা বাবার কাছে আসলে ট্রেণ থেকে নেমে এই স্টেশন রোড থেকে রিক্সা নিয়ে আমি বাড়ী যেতাম”, কিছুটা স্মৃতিমেদুর হয়ে বললো সে।
বারুইপুর থেকে বিজয়দের গ্রাম আরো প্রায় মিনিট পনেরোর রাস্তা, বিজয় বলে দিয়েছিল বন্ধন ব্যাঙ্ক এর পরে একটা রাস্তা ডান দিকে গ্রামের ভিতরে চলে গেছে, সেখানে পৌঁছে ওকে একটা ফোন করতে।
শহর কলকাতা ক্রমশঃ তার থাবা বাড়াচ্ছে কলকাতার উপকণ্ঠে।
বন্ধন ব্যাঙ্ক চোখে পড়তেই বিজয়ের নির্দ্দেশ অনুযায়ী আমরা বড় রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে তার গ্রামের সরু রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। আর ঢুকেই পল্লীগ্রামের পরিবেশ চোখে পড়লো। দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত, চারিদিকে প্রচুর গাছ পালা, তার মাঝে কিছু মাটির আর পাকা বাড়ী। সরু কিন্তু পাকা সিমেন্টের রাস্তা, আমাদের গাড়ীটা পুরো রাস্তা জুড়ে যাচ্ছে, উল্টো দিক থেকে কোন গাড়ী এলে কি হবে কে জানে, তার ওপরে মাঝে মাঝে রাস্তার একেবারে পাশে পুকুর, একটু এদিক ওদিক হলেই গাড়ীশুদ্ধ জলে।
ঝুনকু আর খোকন এখানে বেশ কয়েকবার এসেছে, তাই জায়গাটার সাথে তারা পরিচিত। তাছাড়া বিজয় তার বাড়ী থেকে বেরিয়ে আমাদের জন্যে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক দিন পরে তাকে দেখলাম। বেশ রোগা হয়ে গেছে বিজয়, একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে দেখলাম, খোকনের প্রশ্নের উত্তরে বলল কোমরে ব্যথা, ডাক্তার দেখিয়েছে। আমায় অনেকদিন পরে দেখছে বিজয় কিন্তু তার ব্যবহারে তা বোঝার জো নেই। আন্তরিক ভাবে সে আমার হাত ধরে আমায় তার বাড়ীর ভিতরে নিয়ে গেল।
“এখেনে কেউ মাক্স পরেনা মান্টুদা, মুখ থেইকে মাক্স টা খুইলে ফেলো”, বেশ ভারিক্কী চালেই আমায় বললো বিজয়।
তার কথায় একটা অধিকারবোধ আর শাসনের ভাব ছিল যেটা খুব উপভোগ করেছিলাম সেদিন। এত বছর পরে দেখা, আমি তো তার কাছে বলতে গেলে একজন অজানা অচেনা লোক। কিন্তু কত সহজে সে আমায় আত্মীয়ের মতো আপন করে নিলো একেবারে প্রথম থেকেই, তা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার প্রতি তার ব্যবহারে কোন জড়তা ছিলনা।


৩ – বিজয়ের গ্রাম, বাড়ী আর সংসার
আগে মাটির বাড়ীতে থাকতো বিজয়রা, এখন বিজয় তার নিজের পাকা বাড়ী বানিয়েছে, উঠোনের দেয়ালে তার বাবা আর তার নাম বেশ স্টাইল করে সিমেন্ট দিয়ে লেখা।
স্বর্গীয় ঋতুরাম সর্দ্দার – বিজয়পদ সর্দ্দার
উঠোনের এক দিকে রান্নাঘর, সেখানে একটি অল্পবয়েসী মেয়ে আমাদের দেখে লাজুক হাসলো। বিজয় আলাপ করিয়ে দিয়ে বললো, “সকাল থেকে বৌমা তোমাদের জন্যে রান্না করতি লেগেছে”। বৌটির গায়ে গায়ে ঘুরছে তার দুই ছেলেমেয়ে, বিজয়ের নাতি অঙ্কিত আর নাতনী অদ্বিতীয়া। তারাও তাদের মা’র মত বেশ চুপচাপ। বিজয়ের বৌ প্রভা বাড়ী নেই, শুনলাম সে গেছে তাদের পুকুর ঘাটে, বাড়ীর পাশেই রাস্তার ওপারে বিজয়দের নিজের পুকুর।
আমি সুভদ্রা আর টুবলি এই প্রথম বিজয়ের বাড়ী এসেছি, সে আমাদের বাড়ীটা ঘুরিয়ে দেখালো। প্রচ্ছন্ন গর্ব মেশানো বিনয়ের সাথে সে আমাদের জানালো যে তার বাড়ীতে টি ভি, এ সি, ওয়াই ফাই, ব্রড ব্যান্ড ইন্টারনেট, বেশ কিছু মোবাইল ফোন – এ সমস্ত কিছুই আছে। আর আছে আধুনিক বাথরুম সেখানে কমোডের ও ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ আমাদের শহুরে বাড়ীতে যা কিছু আছে সবই আছে তার এই গ্রামের বাড়ীতেও। দিদি আর বৌদিদের তাই কোন অসুবিধেই হবেনা এখানে।
দোতলা বাড়ী, তিনতলায় ছাত। দোতলায় দুটো শোবার ঘর, আর আছে একটা খোলা ছাদ, সেখানে পরে ঘর উঠবে হয়তো। বিজয় আর অঙ্কিত দু’জনে মিলে সেই ছাতে আমাদের বসার জন্যে কিছু চেয়ার এনে দিলো।
তিন তলার ছাতে ওঠার পথে পূজোর ঘর। সেটা ছাড়িয়ে ওপরের ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রথমেই দেখলাম সারা ছাতে শুকোনোর জন্যে ছড়ানো আছে প্রচুর ধান। সন্তর্পনে সেই ধান কাটিয়ে পাঁচিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নীচে তাকিয়ে দেখি চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে পল্লীগ্রাম তার যাবতীয় সৌন্দর্য্য নিয়ে। যতদূর চোখ যায় শুধু অবারিত সবুজ ধানক্ষেত। কচি ধানের চারার তলায় জমে আছে জল, আর রোদ পড়ে সেই জল চিকচিক করছে।
আমার শহুরে চোখে এই দৃশ্য খুব মায়াবী লাগলো, আর অবধারিত ভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনগুলো মনে পড়ে গেল।
ওপারেতে দেখি আঁকা/ তরুছায়া মসী মাখা/ গ্রামখানি মেঘে ঢাকা/প্রভাতবেলা/
বিজয় বললো “ওই যে ক্ষেতটা দেখতিছো, ওটা সবটাই আমার। প্রায় কুড়ি বিঘা জমি।”
“কে চাষ করে, তুমি লোক রেখেছো?”
বিজয় বলল, “চাষ করার জন্যি লোক আছে, আমি নিজেও কাজে লাগি।” এই বয়সেও বিজয় খুব কর্মঠ।
আমরা ভাইবোনেরা কিছুক্ষন দোতলার ছাতে চেয়ারে বসে গল্প করলাম, বিজয় আমাদের জন্যে ডাবের জল নিয়ে এলো। তারপর খোকন আর আমি বিজয়ের সাথে গেলাম গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে। গ্রামের নাম চয়নী মাঝেরহাট। ঘুরে ঘুরে এঁকে বেঁকে সরু সিমেন্টের রাস্তা চলে গেছে গ্রামের মধ্যে দিয়ে। মাঝে মাঝে পুকুর, সেখানে ঘাটে বেশ কিছু লোক গা ডুবিয়ে স্নান করছে, আর কোথাও ঘাটের সিঁড়িতে বসে কাজে ব্যস্ত কিছু মেয়ে। আমাদের মত অচেনা শহুরে মানুষদের দেখে তারা মাথায় ঘোমটা দিলো।
সত্যেন দত্তের সেই পালকীর গানের লাইনগুলো মনে এলো তাদের দেখে।
কার বহুড়ী বাসন মাজে, পুকুর ঘাটে ব্যস্ত কাজে/ হুন হুনা/
এঁটো হাতে হাতের পোঁছায়, গায়ে মাথার কাপড় গোছায়/হুন হুনা, হুনহুনা/
পথে জয়পদর বাড়ী পড়লো। জয় হলো বিজয়ের যমজ ভাই। ওরা Identical twins, কম বয়েসে ওদের অবিকল এক চেহারা ছিল। পাশাপাশি রাখলে কে যে কে চেনা প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন অবশ্য চেহারা অনেক আলাদা হয়ে গেছে দু’জনের। বিজয় কাজ ছেড়ে দেবার পরে তার দুই ভাই জয়পদ আর চিন্তামণি আমাদের বাড়ীতে কাজ করেছে কিছুদিন।
দেখা গেল জয়পদ বাড়ী নেই, পুকুরে স্নান করতে গেছে। তো বিজয় আমাদের নিয়ে চলে গেল সেই পুকুরঘাটে। জয় আর চিন্তামণি দুজনেই আমাদের দেখে খুব খুসী। পুকুর ধারে রাস্তার ওপরেই অনেক কথা হলো তিন ভাইয়ের সাথে। মনোহরপুকুরের বাড়ীর সেই পুরনো দিনগুলো নিয়েই স্মৃতিরোমন্থন হলো। বিশেষ করে তাদের মনে আছে মেজমা আর সেজমার (জ্যেঠিমা আর আমার মা) কথা। জ্যেঠিমা সম্বন্ধে বিজয়ের সহাস্য মন্তব্য – “বড়মা খুব ভালবাসতো আমাদের, কিন্তু মাঝে মাঝে বড় গরম হই যেতো” শুনে বাকি দুই ভাইও হেসে তাদের সোৎসাহী সমর্থন জানালো।
তিন ভাই এর সাথে আমি আর খোকন ওই পুকুর পাড়ে গ্রুপ ফটো তুললাম।
তার পরে বাড়ী ফেরার পথে তার নিজের পুকুর দেখাতে নিয়ে গেল বিজয়, সেখানে বিজয়ের বৌ প্রভা তখন তার কাজ সেরে বেশ কিছু বাসন হাতে বাড়ী ফিরছে। আমাদের দেখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে তার বৌমার মতোই শান্ত স্মিত হেসে সে নীরবে অভ্যর্থনা জানালো আমাদের।
গ্রাম দেখা শেষ করে আমরা বাড়ী ফিরলাম। ইতিমধ্যে বিজয়ের ছেলে বিশ্বজিৎ তার কাজ থেকে ফিরে এসেছে, বাড়ীর কাছেই বড় রাস্তার ওপর সে একটা বাড়ী কিনে সেটা বন্ধন ব্যাঙ্ক কে একটা দিক ভাড়া দিয়েছে, তা ছাড়াও তার একটা বিয়েবাড়ী ভাড়া আর কেটারিং এর ব্যবসা আছে, আর সেই বাড়ীর একতলায় বিল্ডিং মেটিরিয়াল এর দোকান। বেশ করিতকর্ম্মা আর উদ্যমী ছেলে বিশ্বজিৎ। এত অল্প বয়সে এতগুলো ব্যবসা করার মত মূলধন সে পেলো কোথায় এই প্রশ্ন অবশ্য করিনি। ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে সেই টাকা খাটিয়ে বাড়িয়েছে ধরে নিতে হবে, তাছাড়া বিজয়ও তার পেনশনের টাকা থেকে ছেলে কে সাহায্য করেছে নিশ্চয়।
বড় কথা হলো সে টাকাটা নষ্ট করেনি, ঠিকঠাক কাজে লাগিয়েছে।
“বড় রাস্তার পাশে জমিটা কত দিয়ে কিনলে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“কত আর? পঞ্চাশ লাখ মতো হবে! জলা জমি বলে একটু সস্তায় পেলাম!” বিশ্বজিৎএর কথায় তার বাবার মত কোন গ্রামীন টান নেই।
“আর বাড়ীটা তৈরী করতে কত পড়লো?”
খানিকটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে বিশ্বজিৎ বললো, “এখনো পর্য্যন্ত তো দুই কোটি টাকা মতো লেগেছে, কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি।”
বলে কি?
আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ীটা তো মনে হচ্ছে বিজয়ই কিনে নিতে পারতো~
বিজয় বললো “মান্টুদা’, তোমরা এবার এসে খেতি বোসো, আর দেরী কইরোনা, খাবার ঠান্ডা হই যাবে। ”
তাকিয়ে দেখি উঠোনের মাঝখানে বেশ কিছু টেবিল চেয়ার পাতা। বিয়ের নেমন্তন্নের পার্টির মতো ধবধবে পরিস্কার সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। বিশ্বজিৎএর কেটারিং এর ব্যবসা আছে, ওই বন্দোবস্ত করেছে।
আমরা গিয়ে যে যার মত বসে পড়লাম, বেশ ক্ষিদেও পেয়েছিলো। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার শিউমঙ্গলও এসে বসলো আমাদের সাথে।



৪ – বিজয় আর মার্লন ব্র্যান্ডো
সেই ভোরবেলা থেকে বিজয়ের বৌমা আমাদের জন্যে রান্না করেছে শুনেছিলাম, এবার সে নিজেই আমাদের পরিবেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বড় নম্র আর শান্ত মেয়েটি, একা একা এত কাজ সে হাসিমুখে করছে, তার মাথায় ঘোমটা, মুখে কোন কথা নেই, তাকে দেখে আমাদের খুব ভাল লাগলো। বিজয়ের কাছে শুনেছি সে বড় ঘরের মেয়ে। তার তিন ভাই এর কাছ থেকে সে তার বাবার সম্পত্তির কোন ভাগ চায়নি, তাই ভাইয়েরা ভালবেসে তাকে প্রায়ই এটা সেটা উপহার দিয়ে যায়। বিজয় তার ছেলের বিয়েতে তার বড়লোক বেয়াই এর কাছ থেকে কোন যৌতুক ও নেয়নি, তাই দুই পরিবারের মধ্যে খুব সুসম্পর্ক।
আমাদের সাথে বিজয় আর তার নাতি নাতনীও খেতে বসেছে, তারাও তাদের মা’র মতোই খুব চুপচাপ আর শান্ত। বিজয়ের বৌ প্রভা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখাশোনা করতে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে তাদের আতিথেয়তা বড় আন্তরিক।
এলাহী মেনু।
সেদ্ধ চালের ভাত, শুনলাম সেই চাল বিজয়ের নিজের ক্ষেতের। বিশ্বজিৎ এর ব্যবসায় যারা কাজ করে, সেখানে তাদের দুপুরের খাবারের চালও যায় এখান থেকে। তার পরে মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, সাথে বেগুণী, আর বাটা মাছ ভাজা। চাল এসেছে বিজয়ের ক্ষেত থেকে, বাটা মাছ বিজয়ের পুকুরের। তার পর এক এক করে গলদা চিংড়ীর মালাইকারী, রুই মাছের কালিয়া আর পাঁঠার মাংস। শেষ পাতে টোম্যাটো আর আমসত্ত্বের চাটনি আর মিষ্টি।
বিজয় কিছু বাকি রাখেনি।
প্রত্যেকটি পদ অত্যন্ত সুস্বাদু লাগলো আমাদের । আমরা প্রত্যেকেই সাধারণ ভাবে আমাদের খাবারে একটি বিশেষ স্বাদে অভ্যস্ত থাকি, আমাদের জিভে সেই স্বাদের একটা ভাল লাগা আগে থেকেই তৈরী হয়ে থাকে। সেই তৈরী স্বাদের থেকে খাবারের রসায়নে একটু এদিক ওদিক হলেই আমরা টের পাই। হয়তো ভাত ভাল সেদ্ধ হয়নি, কিংবা নুন মশলা আমাদের মনোমত নয়, আমরা টের পাবোই।
কিন্তু বিজয়ের বউমার প্রত্যেকটি রান্না একেবারে আমাদের palette এর সাথে যাকে বলে perfect fit…
সে যে একজন পাকা রাঁধুনী তা বুঝতে দেরী হলোনা, হুস হাস করে চেটে পুটে খেলাম সবাই।
খাবার পরে লম্বা গেলাসে করে ডাবের জল নিয়ে এলো বিজয়। তার নিজের জমিরই গাছ, সম্ভবতঃ। ডাব নিজেই কেটে গেলাসে ভরেছে সে।
সারা দুপুর বিজয়দের চাতালে বসে নানা গল্প হলো আমাদের।
মাসে ইলেক্ট্রিক বিল কত হয়? হাজার চারেক টাকা।
লোড শেডিং হয় কিনা। না, আজকাল আর হয়না।
মশারী ব্যবহার করতে হয় রাতে? হ্যাঁ।
চুরি চামারী ডাকাতি? গরু নাকি অনেক চুরি হয়ে গেছে এই গ্রাম থেকে। বাংলা দেশে পাচার হয়ে যায় তারা। এখন তাই সবার শুধু ছোট ছোট “হেলে” গরু। গ্রামে হিন্দুদের বাস, তাই গরুর মাংস এখানে খাওয়ার চল নেই।
রাজনীতির লোকেদের টাকা পয়সা খাওয়াতে হয়? তা তো হয় অবশ্যই। তবে টাকা দিলে তাদের দিয়ে কাজও হয়। এই তো গ্রামে পাকা রাস্তা হয়েছে।
এই সব নানা প্রসঙ্গ চলে এলো আমাদের আলোচনায়।
কথাবার্ত্তা বেশী বলেনা বিজয়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বে আর ব্যবহারে পরিবারের ওপরে তার যে একটা অনায়াস আধিপত্য আছে, সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়না। এমন নয় যে তাকে সবাই ভয় পায়, বা তাকে দেখে তঠস্থ হয়ে থাকে। বরং তার মুখে সবসময়ই লেগে থাকে এক চিলতে হাসি যার থেকে তার আত্মবিশ্বাসের একটা সুস্পষ্ট আন্দাজ পাওয়া যায়।
নাতি নাতনীরা এত চুপচাপ কেন? তোমরা ওদের বেশী বকঝকা করোনা তো – সুভদ্রার এই প্রশ্নের ঊত্তরে বিজয়পদ তার সহজ হাসি হেসে বলেছিল “একটু আধটু শাসন না করলি চলবি কি করে?” এক এক জন মানুষ থাকে যাদের ব্যক্তিত্ব আশেপাশের লোকেদের কাছ থেকে ভয় আর সমীহ আদায় করে নেয়। বিজয় ডন নয়, তবু তার গ্রামের লোকজন আর সংসারের কাছের মানুষদের কাছে তার প্রভাব আর প্রতিপত্তি আমার নজর এড়ায়নি। আজকের স্বল্পবাক আত্মবিশ্বাসী বিজয় কে দেখে আমার গডফাদার ছবিতে ডন কর্লিয়নের ভূমিকায় মার্লন ব্র্যান্ডোর দুর্দ্দান্ত অভিনয়ের কথা মনে পড়ছিল। নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ঘটনাবহুল জীবনের শেষে পৌঁছে এক শান্ত সৌম্য পরিতৃপ্ত ডন বসে আছেন তাঁর বাগানে, তাকিয়ে দেখছেন তাঁর নাতি নাতনীরা বাগানে ছুটোছুটি করে খেলা করছে। সে এমন এক মায়াবী দৃশ্য, অভিনয়ের গুণে যা মনে থেকে যায় অনেকদিন।


৫) বিদায়ের পালা
আলো কমে আসছে, আমাদের ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো।
বাড়ী থেকে বেরিয়ে গাড়ীতে ওঠার পথে দেখি বিজয়ের বাড়ীর বাগানে শিম গাছে রাশি রাশি শিম ঝুলছে। বিজয় আমাদের জন্যে তার বাগানের গাছ থেকে বেশ কিছু শিম আর শীষ পালং তুলে আমাদের জন্যে থলিতে ভরে দিলো।
বড় রাস্তা পর্য্যন্ত আমাদের গাড়ীতে করে এলো বিজয়। তার ছেলের দোকান আর অফিস রাস্তার ওপরে, বন্ধন ব্যাঙ্কের বিরাট সাইনবোর্ড। দোতলায় বন্ধন ব্যাঙ্ক, একতলায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাড়া দেবার জন্যে একটা আলাদা জায়গা করা হয়েছে, আর পাশে একটা বিল্ডিং মেটিরিয়ালের শোরুম।
ব্যবসার দুটো সাইনবোর্ড টাঙানো আছে চোখে পড়লো। প্রভা বিল্ডার্স আর অদ্বিতীয়া কেটারিং। মা আর মেয়ের নামে তার কোম্পানীর নাম রেখেছে বিশ্বজিৎ।
বিশ্বজিৎ আমাদের সব ঘুরিয়ে দেখালো। তার আর বিজয়ের মুখে একটা সাফল্য আর তৃপ্তির হাসি লক্ষ্য করে বেশ ভাল লাগলো।
গাড়ীতে ফিরতে ফিরতে বিজয়ের একটা কথা বার বার মনে পড়ছিল।
“মান্টুদা, আমার যা কিছু হয়েছে, সব তোমাদের আশীর্ব্বাদে”, বার বার বলেছিল সে। তার সেই কথার মধ্যে ছিল বিশুদ্ধ আন্তরিকতা। আর তার সেই কথা শুনে আমার বেশ লজ্জাই করেছিল সেদিন। সেই আশীর্ব্বাদ তো সে পেয়েছে তার ভাগ্যদেবতার কাছ থেকে।
বাকিটা তার একান্ত নিজের সুকৃতি, তার সততা, নিষ্ঠা আর কর্ম্মক্ষমতা।
বিজয়দের সাথে তাদের গ্রামে কাটানো সেই দিনটির কথা আর তাদের আতিথেয়তার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
ভগবান তাদের মঙ্গল করুন।





-
মুকু আর সোনুর সাথে দিল্লীতে কিছুক্ষণ

১
সোমবার, ৩০/৯/২০২৪
সুভদ্রা আর আমি দিল্লীতে এসেছি বুড়ীর কাছে দিন দশেকের জন্যে।
দিল্লীতে এলে মুকুর সাথে একবার দেখা হবেই। সাধারণতঃ ও আমায় ওদের Army Officers Club এ নিয়ে যায়, সেখানে খানাপিনা আর আড্ডা হয়। এবার আমরা সোনুকেও ডেকে নিলাম।
কথামতো সকালে সোনু চলে এলো আমায় তুলতে। দিল্লীর সব রাস্তাঘাট ওর মোটামুটি চেনা। যদিও এখন অনেকদিন গুরগাঁও তে থাকার জন্যে দিল্লী তার কাছে কিছুটা অপরিচিত, তার একটা প্রধান কারণ হলো দিল্লী শহরটাও এতগুলো বছরে অনেকটাই পালটে গেছে।
আমিও এক সময় দিল্লীতে প্রায়ই আসতাম। ন’কাকা দেরাদুন থেকে দিল্লীতে এসে প্রথমে রামকৃষ্ণপুরম ও পরে নৌরজী নগরে থাকতেন। জ্যেঠুর U18 গ্রীন পার্ক এক্সটেন্সনের বাড়ীতে ও কতবার গেছি। তখন বাসে স্কুটারে বা ভটভটিয়াতে সফদরজং হাসপাতালের পাশে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে নেমে ইউসুফসরাই এর গলি দিয়ে সোজা চলে যেতাম। এখন ওই সব জায়গা একেবারেই অচেনা মনে হয়। দিল্লী আর আমার চেনা সেই আগের দিল্লী নেই।
বুড়ীরা আগে থাকতো নিজামুদ্দীন ইস্টে, এখন তারা পঞ্চশীল পার্কে চলে এসেছে। S Block এ ওদের বাড়ী। সোনুকে ঠিকানা দিয়ে রেখেছিলাম। পঞ্চশীল পার্কের ওই জায়গাটা অনেকটা খাঁচার মত,সেখানে ঢোকার আর বেরোবার জন্যে আবার তিনটে গেট। এক নম্বর গেট মাসের ১-১০ তারিখ খোলা, দুই নম্বর গেট খোলা মাসের ১১-২০ তারিখ, আর ২১ থেকে ৩০ তারিখ তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢোকা বেরোনো। সেদিন ছিল ৩০ তারিখ, তাই তিন নম্বর গেটের এই মাসে সেটাই শেষ দিন।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কমনে আসে যায়…
সোনুর আসতে একটু দেরী হলো। সে বললো আমি তো পঞ্চশীল পার্কের বি ব্লক দিয়ে ঢুকলাম, জানি সোজা রাস্তা। ওমা, কিছুদূর গিয়ে দেখি গেট বন্ধ তালা ঝুলছে। কি আর করি আবার বেরিয়ে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হলো।
খাঁচা থেকে বেরোতে গিয়ে আবার এক ঝামেলা। গেটে তালা লাগানো।
যারা বাইরে থাকে তারা এসব জানবে কি করে?সোনু বেচারা কে দোষ দেওয়া যায়না।
এই তারিখ নিয়ে একটা মজার গল্প আছে।
——————–
এক ভদ্রলোক বর্দ্ধমান থেকে ট্রেণে ব্যান্ডেল যাচ্ছেন, সেখন থেকে তিনি কর্ড লাইনের লোকাল ধরবেন, সেটা ছাড়ে বেলা দুটোয়। তাঁর হাতে ঘড়ি নেই, সহযাত্রী এক ভদ্রলোকের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি দেখছেন দুটো প্রায় বাজে, তার মানে ব্যাণ্ডেল এর ওই ট্রেণ তাঁর মিস হয়ে যাবে। মরিয়া হয়ে তিনি সেই সহযাত্রীকে প্রশ্ন করলেন, “আপনার ঘড়িতে ক’টা বাজে দাদা? আমার একটা দুটোর ট্রেণ ধরতে হবে ব্যান্ডেল থেকে…”
তিনি উত্তরে জিজ্ঞেস করলেন আজ কত তারিখ?
তারিখ? ভদ্রলোক তো অবাক! সময়ের সাথে তারিখের কি সম্পর্ক?
“আজ তো কুড়ি তারিখ” তিনি বললেন।
“আমার ঘড়িটা দিনে দুই মিনিট করে ফাস্ট হয়ে যায় বুঝলেন, আমি মাসে একবার করে ঠিক করে নিই। আজ যদি কুড়ি তারিখ হয়, তার মানে আমার ঘড়ি এখন চল্লিশ মিনিট ফাস্ট, তার মানে দু’টো বাজতে এখনো অনেক দেরী। ব্যাণ্ডেলে ট্রেণ আপনি পেয়ে যাবেন চিন্তা নেই।“
তাই শুনে ভদ্রলোক একটা স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেছিলেন।
—————–
যাই হোক অনেক দিন পরে সোনুর সাথে দেখা, আমরা গাড়ীতেই যেতে যেতে গল্প শুরু করে দিলাম। সম্প্রতি তনুজ আর সুদীপ্তার ছেলে হয়েছে, পাটনার দিকে আমাদের বংশের পঞ্চম প্রজন্মের প্রথম সন্তান। পাটনার দাদু জগদবন্ধুকে প্রথম প্রজন্ম ধরলে সোনাকাকা দ্বিতীয়, সোনু তৃতীয়, অনুজ হলো চতুর্থ প্রজন্ম।
আমাদের বাবা কাকারা যৌথ পরিবারে এক সাথে বড় হয়েছিলেন, আমাদের ভাই বোনেরাও মোটামুটি তাই। সেই জন্যে আমাদের মধ্যে এখনো যথেষ্ট আলাপ পরিচয় বন্ধুত্ব আর যোগাযোগ আছে, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেটা আশা করা যায়না। এই নবজাতক সোনুর নাতি যখন বড় হবে তখন আমাদের প্রজন্মের কেউ থাকবোনা, এবং আমাদের এখনকার পারিবারিক সম্পর্কগুলোও অনেকটা আলগা হয়ে আসবে। আবার নানা নতুন সম্পর্কের সূচনা হবে।
সেটাই স্বাভাবিক।
সোনু বললো সুদীপ্তার মা এখন কিছুদিন ওদের কাছে আছেন, বাচ্চার দেখাশোনা করার জন্যে। বাচ্চার এখন এক মাস বয়েস। সোনু ফোনে ছবি দেখালো, খুব সুন্দর দেখতে হয়েছে তাকে।
এই সব গল্প করতে করতে সোনু বেশ কয়েকবার ভুল রাস্তা ধরেছে। আর বার বার কপাল চাপড়ে বলছে, “আরে আমি কি করছি? এর পরের ডান দিকের এক্সিট টা নিতে হতো। আবার কিছুটা ঘুরতে হবে।“
সোনু আবার ওদের বাঙালী পূজোর কমিটির এক চাঁই। এবছর পূজো তে ওরা পরশুরামের “ভূষন্ডির মাঠে” নাটক করবে। বিখ্যাত মজার নাটক। তাতে সোনুর একটা ছোট রোল আছে। পুরোদমে নাটকের রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে।
এ ছাড়া পূজোর নানা কাজ। বেশ কিছু ফোন এলো গাড়ীতেই। কেউ জানতে চাইছে দাদা পুলিশের ক্লিয়ারেনসটা কবে পাওয়া যাবে, কেউ বলছে দাদা নাটকের প্রপ গুলো কে দেখছে,? সোনু গাড়ী চালাতে চালাতে এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আবার ভুল করে এক জায়গায় বাঁ দিকে না গিয়ে সোজা চলে গেল। “ও হো, এটা আমি কি করলাম”, কপাল চাপড়ে বললো সোনু, “দ্যাখো বাঁ দিকে না ঢুকে সোজা ইউসুফসরাই চলে এসেছি।“
আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম এটা ইয়ুসুফসরাই নাকি? সেই পুরনো দিনের ইয়ুসুফসরাই বলে চেনাই যাচ্ছেনা। ওই গলির ভিতের একটা হনুমানের মন্দির ছিল না?
যাই হোক, আবার ইউ টার্ণ।
এর মধ্যে দুই বার মুকুর ফোন এসেছে। কি রে তোদের কি হলো?
শেষ পর্য্যন্ত ইউ ১৮এ তো পৌঁছলাম। বাড়ীর পাশে অনেক নতুন বাড়ী উঠেছে, জায়গাটা আর চেনা যায়না। পাশে একটা বড় মাঠ ছিল আগে, সেখানে একটা কবরস্থান ছিল, সেই মাঠের মধ্যে দিয়ে ন’কাকা দের নওরোজী নগরের বাড়ীতে যাবার একটা সর্টকাট ছিল। হাতে সময় থাকলে আমরা হেঁটে চলে যেতাম। “কমল” নামে একটা সিনেমা হল ও ছিল কাছেই। সোনু বলল সেটা আর নেই। ভেঙে শপিং মল করা হয়েছে নাকি।
মুকু বাড়ীর বাইরেই দাঁড়িয়েছিল। ওর গাড়ীতেই বেরোলাম আমরা।

২
মুকু আমাদের নিয়ে গেল ওদের Dhaulakia Officers’ club এ – রাস্তাটা ওর ভালোই চেনা, কেননা সেখানে সে অরুণা বৌদি আর মনিকাকে নিয়ে প্রায়ই যায়। সাধারণতঃ ওখানে ওরা বিকেলে পুলে সাঁতার কেটে সন্ধ্যায় কিছু খেয়ে বাড়ী ফিরে আসে।
সোনুর তুলনায় দেখলাম মুকু দিল্লীর রাস্তাঘাট অনেক ভাল চেনে। বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখালো তাকে, দুই এক বার আমাদের “দ্যাখ্, একটা অন্য রাস্তা দিয়ে তোদের নিয়ে যাচ্ছি” বলে সে দুম্ করে একটা no entry দিয়ে একটা মিলিটারী টাউনশিপে ঢুকে পড়লো।
সোনু মুকুকে মাঝে মাঝে “কর্ণেল সাহাব” বলে ডাকে, সে বললো পুলিস আমাদের কর্ণেল সাহাব কে কিছু বলবেনা।
যাই হোক ওই টাউনশিপের মধ্যে দিয়ে আমরা মুকুদের ক্লাবে পিছন দিক দিয়ে একটা এন্ট্রি নিলাম। গেটে যারা পাহারা দিচ্ছিল, তারা সবাই দেখলাম মুকুকে ভালই চেনে। জায়গাটা বেশ সুন্দর, প্রচুর গাছপালা। সোমবার সকাল, ভীড় ও তেমন নেই।
আমরা একটা বার কাম রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে বসলাম। মুকু আমাদের দু’জনের জন্যে বীয়ার অর্ডার দিল, সোনু চাইলো জিন আর সোডা। সাথে আলু ভাজা আর ফ্রাইড চিকেন।
আমাদের গল্প শুরু হলো। নানা ধরনের গল্প। তবে প্রধানতঃ পুরনো দিনের পারিবারিক স্মৃতি।
এদিকে রেস্তোঁরার টিভি তে ক্রিকেট দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের সাথে আমাদের টেস্ট ম্যাচ। আমি আজকাল ক্রিকেটের কোন খবর রাখিনা, কিন্তু সোনুর খুব উৎসাহ। সে নিজে কমবয়সে ভাল ক্রিকেট খেলতো – পেস বোলার ছিল। কিন্তু জোরে বল করতে গিয়ে তার মাস্ল্ এ স্ট্রেন হওয়ায় পরে সে স্পিনে চলে যায়।
“তখন তো আমাদের ভাল Physio আর কোচ ছিলনা”, দুঃখ করে বললো সে।
বাংলাদেশের সাথে এই টেস্ট ম্যাচে প্রথম তিন দিন বৃষ্টি হওয়াতে আজ চতুর্থ দিন প্রথম খেলা। মীমাংসা হবার কোন চান্স নেই, ড্র হবেই। যাই হোক, বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হবার পরে আমাদের রবীন্দ্র জাডেজা ৩০০০ রান আর তিনশোটা উইকেট পেয়েছে জানা গেল। এই সব দেখতে দেখতে মুকু তার এক CO (Commanding Officer) র কথা বললো, তিনি নাকি সব কথার মধ্যে ক্রিকেটের ভাষায় কথা বলতেন। যেমন – “That was a googly”, “I played him with a straight bat” কিংবা, “I sent him to the boundary” – এইরকম আর কি।
তো একদিন মুকু সেই CO ভদ্রলোকের সামনে বসে আছে, একজন আর্দ্দালী এসে বললো “স্যার আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন, নাম বলছেন না, কিন্তু দেখা করা খুব নাকি আর্জেন্ট।“ CO ভদ্রলোক তাকে বললেন “LBW”!
মুকু তো অবাক! তার মানে কি?
ভদ্রলোক হেসে বললেন, “বুঝলেনা তো?” ওর মানে হচ্ছে “Let the bugger wait!”
আমাদের ছোটবেলায় জহর রায়ের একটা হাসির গল্প ছিল – ইডেন গার্ডেনে ম্যাচ দেখতে গিয়ে একজন দর্শক নাকি গ্যালারীতে মাল খেয়ে out হয়ে গিয়ে টলমল করে হাঁটছিলেন, জহর রায় তাঁকে LBW out বলেছিলেন। সে ক্ষেত্রে অবশ্য তার মানে ছিল “Loaded belly with wine!”
মুকুর আর একটা গল্প আমার বাবা (তার সেজকাকা) কে নিয়ে। একবার,মুকু তখন খুব ছোট, ব্যাঙ্গালোরের কাছে জালাহালি নামে একটা জায়গায় জ্যেঠু পোস্টেড।
“গাড়ী করে সবাই মিলে কোথাও যাওয়া হচ্ছে, গাড়ীর সামনে সেজকাকা, পাশে বাবা গাড়ী চালাচ্ছেন। পিছনে মা আর আমরা তিন ভাই বোন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, একটা গাছে দেখলাম একটা বোর্ড টাঙানো, তাতে লেখা আছে “Block Development Officer”।আমি সেজকাকাকে জিজ্ঞেস করলাম “What does a Block Development officer do?” এক মূহুর্ত্ত দেরী না করে সেজকাকা হেসে বললেন “কি আবার? He blocks development!”
আমি হেসে বললাম “এটা তো বাবা একটা ওভারবাউন্ডারী হাঁকালেন!”
মুকু খবর দিলো ঝর্ণা দি মারা গেছেন কয়েক দিন আগে। তোমরা যারা ঝর্ণা দি’কে চেনোনা, তাদের জানাই যে তিনি মুকুদের বদুমামার স্ত্রী ছিলেন। মুকুর মামাদের মধ্যে বদুমামা আর নিতুমামা দুই ভাই সব চেয়ে ছোট ছিলেন, নিতু মামা বিয়ে করেননি, বদু মামার বিয়ে হয়েছিল আমাদের উষাপিসীর মেয়ে ঝর্ণাদি’র সাথে,ওঁদের দু’জনের কোন সন্তান ছিলনা। বামুনপাড়ায় শেষের দিকে যখন ওঁদের সাথে দেখা করতে যেতাম, তখন বদু মামা আর নিতু মামা চলে গেছেন, সেই বিশাল বাড়ীতে শুধু থাকতেন ঝর্ণা দি আর রাদুমামার স্ত্রী। দুজনেই শয্যাশায়ী। তাদের দেখা শোনা করতো বড়মামার মেয়ে কেয়া – সেও বিয়ে করেনি।
রাদুমামীমা আর ঝর্ণাদি দু’জনেই চলে যাবার ফলে এখন কেয়া একা হয়ে গেল। বড়মামার ছেলে ঢুন্ডি কাছেই থাকে। তার ছেলের বিয়েতে মুকুরা সামনের নভেম্বরে কলকাতায় আসবে, তখন ওরা সবাই মিলে বাড়ীটা নিয়ে কি করবে তার সিদ্ধান্ত নেবে।
মনোহরপুকুরের বাড়ীটার মত বামুনপাড়ার বাড়ীটাও হয়তো হাতবদল হবে, সেখানে নতুন একটা বিশাল বাড়ী তৈরী হবে। ওই বাড়ীটার সাথে আমার ও অনেক স্মৃতি জড়িত, বাড়ীর সামনে একটা গলি, তার শেষে একটা গেট আর গেট দিয়ে ঢুকে এক চিলতে জমি। সেই জমিতে আমার কম বয়সে নিতু মামা বদুমামারা কালীপূজোয় বাড়ীতে তৈরী বসন তুবড়ী জ্বালাতো, তার ফুলকি উঠে যেতো তিন তলার ছাদ ছাড়িয়ে অনেক ওপরে।
মনোহরপকুরের বাড়ীর মত ওই বাড়ীতেও এক সময় খুব হৈ হুল্লোড় হয়েছে।
সোনুদের গুরগাঁওতে সম্প্রতি হরিয়ানার Assembly election হয়ে গেল। এবং জম্মু কাশ্মীরেও পরে পরেই। সোনু রাজনীতির অনেক খবর রাখে, সে বললো হরিয়ানায় এবার কংগ্রেস জিতবে। কাশ্মীরেও NC কংগ্রেস জোটের জেতার সম্ভাবনা। বি জে পির সময়টা গত লোকসভার পর থেকে ভাল যাচ্ছেনা। মোদী ম্যাজিক ভ্যানিশ। ভালোই, মাঝে মাঝে সরকার পালটানো দরকার। কেউই অপরিহার্য্য নয়।
এর মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড বিয়ার আর জিন এসে গেছে। আমাদের ছোটবেলায় বাবা কাকারা বাড়িতে কোনদিন ড্রিঙ্ক করেননি। ব্যাপার টা সেই যুগে ভদ্রসমাজে ভাল চোখে দেখা হতোনা।
সোনু গল্প করলো, একবার অনেক দিন আগে, সোনা কাকা তখন সিমলার কাছে চেল নামে একটা জায়গায় পোস্টেড। শীতকাল, প্রচন্ড ঠান্ডা, চারিদিকে বরফ পড়ছে, বাড়ীর ভিতরে সোনাকাকার কিছু সহকর্ম্মী Army officer এসেছেন, সবাই মিলে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে গা গরম করার জন্যে ব্র্যান্ডি আর হুইস্কী পান চলছে, এমন সময় হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে কাঁপা কাঁপা মেয়েলী গলায় কে যেন”সোঁনাকাঁকু,সোঁনাকাঁকু” বলে ডেকে উঠলো। ডাকটা সোনু বেশ সুন্দর নকল করে শোনালো আমাদের সেদিন, সে অভিনয়টা বেশ ভালই করে বুঝলাম।
এই ভর সন্ধ্যে বেলা যাদের নাম করতে নেই, সেই সব অশরীরী আত্মারা কেউ নাকি? “বাবার একটু ভূতের ভয় ছিল বেশ কয়েকবার ওই খনখনে কাঁপা কাঁপা গলায় ”সোঁনাকাঁকু,সোঁনাকাঁকু”ডাক শোনার পরে বাবা আমায় বললো, “সোনু যা তো দরজা টা একটু ফাঁক করে দ্যাখ্ তো কে আমায় ডাকছে?”
যাই হোক, দরজা খুলে দেখা গেল, শিখা আর শঙ্কর। কিছুদিন আগে ওদের বিয়ে হয়েছে, বোধহয় হানিমুন করতেই ওদের সিমলায় আসা। কিন্তু এই বরফ পড়ায় ওরা কিছুটা বিপদে পড়ে গেছে।
ওরা দুজন সোনাকাকীমার দেওয়া শুকনো জামাকাপড় পরে নেবার পরে সবাই মিলে গল্প করছে, সোনাকাকা সোনু কে বললেন “নতুন জামাই কে তো আমি হুইস্কি অফার করতে পারিনা, তুই বরং ওদের দু’জনকে এই Glenfiddich এর নতুন বোতলটা দিয়ে আয়। আমাদের বুড়োদের সাথে তোরা ছোটরাও একটু গা গরম করে নে।“
সোনাকাকা এরকমই দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন।
শঙ্কর নাকি কিছুতেই নতুন শ্বশুরের সামনে হুইস্কি খাবেনা, তার নাকি ভীষন লজ্জা করবে…সোনু এবার শঙ্করের সেই লজ্জিত ভঙ্গীর পার্ট টাও নিখুঁত অভিনয় করে দেখালো আমাদের।
শেষ পর্য্যন্ত সেদিন ওরা নাকি বোতলটা প্রায় শেষ করে দিয়েছিল।

৩
বেলা প্রায় দু’টো বাজে, আমাদের ড্রিঙ্ক শেষ, মুকু আমাদের পাশে একটা সাজানো গোছানো রেস্তোঁরা তে লাঞ্চে নিয়ে গেল। সেখানে তিন জনে বসে খেতে খেতে মুকু বললো “কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় আমরা সাঁতার কেটে এখানে খেতে বসেছি, এমন সময় হঠাৎ চৈতীর ছেলে সুমন – ও অন্য একটা টেবিলে কারুর সাথে খাচ্ছিল – আমাদের কাছে এসে বলল “মুকুমামা আমায় চিনতে পারছো?”
“চিনতে পারবোনা কেন? কবে দিল্লী এসেছিস? বাড়ীতে আয় একদিন!” ওকে বলেছিল মুকু। আমাদের বারেন্দ্র দের যৌথ পরিবারের লতায় পাতায় এই সব কিছুটা দূরের সম্পর্কের মধ্যেও কিরকম গভীর আত্মীয়তার টান থেকে যায়!
সুমন কাজে মাঝে মাঝে অল্প দিনের জন্যে দিল্লী আসে, এবার হঠাৎ মুকুমামার সাথে দেখা হয়ে যাওয়াতে সে খুব খুসী।
সোনু বললো “সুমনের মত ভাল ছেলে চট করে দেখা যায়না, he is a gem…”
বেশ কয়েকবছর আগে মঙ্গল আর রুণার বড় ছেলে মটরবাইক কিনে একাই সেই নতুন বাইকে চেপে ব্যাঙ্গালোর থেকে তিরুপতি যাচ্ছিল। পথে একটা ট্রাকের ধাক্কায় সে অনেক দূরে ছিটকে পড়ে শেষ পর্য্যন্ত মারা যায়। মঙ্গল আর রুমা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানিপত্ থেকে দিল্লী আসে। সোনুর ছেলে তনুজ তখন ব্যাঙ্গালোরে, তার কাছ থেকে খবর পেয়ে সুমন – তখন সে কোন এক এয়ারলাইনে কাজ করতো – Spicejet কিংবা Go Air ঠিক মনে নেই – তাদের সাথে কথা বলে দু’জন passenger কে offload করে ওদের ব্যাঙ্গালোর নিয়ে আসে, এবং শুধু তাই নয়, সেই এয়ারলাইনের গাড়িতে করে এয়ারপোর্ট থেকে মঙ্গল আর রুণা কে প্রথমে accident site ও পরে হাসপাতালে পৌঁছে দেবার বন্দোবস্তও করে।
প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন সম্ভাবনাময় তরুণ সন্তানের এরকম অকাল্মৃত্যু মঙ্গল আর রুণার মনে কতটা আঘাত হেনেছিল তা সহজেই কল্পনা করা যায়। পাঞ্জাবের পানিপত্ শহরে চলে যাবার পরে ওরা এমনিতেই পরিবারের বাকি সবার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল,এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পরে এখন তারা আরও অনেক বেশী চুপচাপ হয়ে গেছে।
তবে মুকু আর সোনু দু’জনেই বললো মঙ্গল আর রুণা পানিপতে এখন তাদের নিজেদের হার্ট এর হাসপাতাল খুলেছে, এবং সেই হাসপাতাল নাকি খুব ভাল চলছে সেখানে। মুকু ওকে পাটনায় নিজেদের বাড়ীতে ক্লিনিক খোলার কথা বলেছিল, কিন্তু কোন কারণে সে আর পাটনায় আসতে চায়না।
ছোটবেলায় যখন পাটনায় যেতাম, ভাইদের মধ্যে রাঙাকাকাই তখন একমাত্র পাটনায় থাকতেন, তাই কৃষ্ণা শুক্লা বন্টু মঙ্গল এদের সাথেই বাগানে খুব হুটোপাটি করেছি তখন। রাঙাকাকার তিন মেয়ের পরে এক ছেলে হওয়াতে মঙ্গল দাদু আর দিদার খুব ফেভারিট নাতি ছিল মনে পড়ে। তার আদরের শেষ ছিলনা। ভোজপুরী ভাষায় তাকে সবাই ডাকতো “মঙ্গলওয়া”।
এখন সে সবার কাছ থেকে দূরে থাকে স্বেচ্ছা নির্ব্বাসনে।
পাটনার অন্যান্য ভাই বোনেদেরও খবরাখবর নিলাম, বিশেষ করে যাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বহুদিন। বড় জ্যেঠুর ছেলে মেয়েরা – দীপা গুণু খোকন যেমন। সবাই নিজের নিজের মত ভাল আছে জেনে ভাল লাগলো। বড়জ্যেঠুর ছোট ছেলে আমাদের সব চেয়ে ছোট ভাই লাল্টুর সাথে অবশ্য সম্প্রতি আমার দেখা হয়েছে, মাঝে মাঝে সে আমায় ফোন ও করে আজকাল। লাল্টুর সাথে মনোহরপকুরের ঝুন্টু ভান্টুলী আর টুবলির বেশ ভাল যোগাযোগ আছে, এবং সে দূরে ব্যাঙ্গালোরে থাকলেও আমাদের অনেকেরই বেশ ভাল খোঁজ রাখে।
আমাদের পরের প্রজন্মের কেউ তো কাউকে চিনবেনা। সম্পর্কে ভাই বোন হলেও তারা পরস্পরের কাছে অচেনা অজানাই থেকে যাবে। সেটাই স্বাভাবিক। এটা নিয়ে ভাবনার কোন কারণ নেই।
খাওয়া শেষ, এবার বাড়ী ফেরার পালা।
সোনুর তুলনায় মুকু দেখলাম দিল্লীর রাস্তাঘাট অনেক ভাল চেনে। সে নানা রাস্তা আর ওভারব্রীজের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ী চালিয়ে নিয়ে গেল। তার homing instinct এর প্রশংসা করতেই হয়। বহুদিন ধরে দিল্লীতে গাড়ী চালাচ্ছে সে।
প্রানী জগতে নানা জীব জন্তুর এরকম অসাধারণ homing instinct দেখা যায়। Monarch butterfly রা মহাসমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে বহুদূর গন্তব্যে পৌঁছে যায়। Olive Ridley কচ্ছপেরা প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা নির্দিষ্ট সমুদ্র উপকূলে এসে ডিম পেড়ে বালি দিয়ে ঢেকে সমুদ্রে ফিরে চলে যায়। আর সেই ডিম ফেটে যে বাচ্চারা জন্মায় তারা সমুদ্রে ফিরে যায়, কিন্তু এক বছর পরে ঠিক সময়ে নিজেদের ডিম পাড়তে আবার তারা তাদের জন্মস্থানে ফিরে আসে।
আমাদের গৃহপালিত বেড়ালদের ও নাকি নিজের জায়গায় চিনে ফিরে আসার একটা আশ্চর্য্য ক্ষমতা আছে। এই নিয়ে শিবরাম চক্রবর্ত্তির একটা বিখ্যাত গল্প আছে, যারা পড়োনি তাদের জন্যে এখানে লিখে রাখি।
————-
শিবরাম এর বাড়ীতে একটা বেড়াল আছে, তিনি সেটাকে মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে ফেলে রেখে আসেন, কিন্তু সে দুই তিন দিনের মধ্যেই আবার তার কাছে ফিরে আসে।
একবার তিনি বেড়ালটাকে একটা বস্তার মধ্যে বন্দী করে ট্রেণে করে অনেক দূরে গিয়ে একটা জায়গায় ফেলে দিয়ে আসেন। কিন্তু মুস্কিল হলো এবার তিনি নিজেই রাস্তা গুলিয়ে ফেলে আর নিজের বাড়ী ফিরতে পারছেন না। অগত্যা শেষ পর্য্যন্ত সেই বেড়াল টাকে follow করেই তিনি নিজের বাড়ী ফিরেছিলেন।
কিন্তু বেড়াল তো আর সোজা পথে বাড়ী ফেরেনা। তারা গেরস্থের বাড়ীর দেয়াল টপকায়, বাড়ীর দেয়ালে জলের পাইপ বেয়ে ছাদে ওঠে, এক বাড়ীর ছাদ থেকে পাশের বাড়ীর ছাদে লাফ দিয়ে চলে যায়।
শিবরাম যখন বাড়ী ফিরলেন, তখন তাঁর জামাকাপড়ে ধুলো ময়লার কালো দাগ, হাতে কালশিরে পড়েছে, পাঞ্জাবীর হাতা ছিঁড়ে গেছে, হাঁটু ছড়ে রক্ত বেরোচ্ছে, চুল এলোমেলো, তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর মাথার ওপর দিয়ে একটা ঝড় চলে গেছে।
তাঁর প্রতিবেশীরা তো তাঁকে দেখে অবাক। এ কি চেহারা হয়েছে আপনার?
শিবরাম একটু কাষ্ঠহাসি হেসে তাদের বলেছিলেন, “আর বলবেননা, বেড়াল কে অনুসরণ করে বাড়ী ফেরা যে কি কঠিন কাজ, কি বলবো?”
—————-
মুকু সেই বেড়ালটার মতোই বেশ সাবলীল ভঙ্গী তে পঞ্চশীল পার্কে আমাদের নিয়ে এলো। আমি বললাম, “আজ কিন্তু ৩০ তারিখ, মনে রাখিস তিন নম্বর গেট।“ কুছ পরোয়া নেই ভঙ্গীতে মুকু ঠিক তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে পড়লো।
আমায় নামিয়ে ওরা দু’জন ওপরে উঠে সুভদ্রা আর বুড়ী সৌগত আর ওদের বাচ্চা দের সাথে দেখা করে এলো। সুভদ্রা বললো “তোমরা আমাদের বৌদের না নিয়ে নিজেরা গিয়ে গল্প করে আসো কেন?কি এত গল্প তোমাদের যা আমাদের বলা যায়না?”
সোনু বললো,”বৌদি, আজ আমরা যে সময়ের কথা বললাম, সেই সময়ে তো তোমরা কেউ ছিলেনা, তাই ওইসব গল্প শুনে তোমাদের ভীষণ বোরিং লাগতো।“
ভেবে দেখলে কথাটা কিন্তু ঠিকই বলেছে সোনু। সারাদিন তিন জনে মিলে কত বোরিং কথা বলে হাসাহাসি করলাম আমরা। আমাদের সাথে মঙ্গলটা থাকলে আরো ভাল হতো, ওর কাছ থেকে আরও এইরকম বেশ কিছু বোরিং গল্প শোনা যেতো।
কিন্তু তা আর হবার নয়। মঙ্গলের সাথে দেখা করতে গেলে আমাদের পানিপত্ যেতে হবে।

নালন্দা ট্রিপ, ১৯৮৯, সামনে মঙ্গল বসে , পাশে বুড়ী -
কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ

১) মুখবন্ধ
ডিসেম্বর ৭, ২০০৭।
সেই দিন কুয়েতে সালমিয়ার ভারতীয় স্কুলের অডিটোরিয়ামে বঙ্গীয় সাংষ্কৃতিক সমিতি (বি সি এস) এর উদ্যোগে আমরা বাদল সরকারের বিখ্যাত নাটক “এবং ইন্দ্রজিৎ” সাফল্যের সাথে মঞ্চস্থ করেছিলাম।
সেই বছর সমিতির সভাপতি তাপস (বসু) যখন আমায় নাটক পরিচালনার ভার দিলে্ন, তখন আমি এই নাটকটিকেই বেছে নিয়েছিলাম। তার প্রধান কারণ অবশ্যই এই যে প্রায় চল্লিশ বছর আগে (১৯৬৫) লেখা এই নাটকটি কে এখনো বাংলায় লেখা সর্ব্বকালের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক নাটকের প্রথম পাঁচটি মধ্যে একটি বলে ধরা হয়।
বাদল সরকারের অনবদ্য সৃষ্টি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি তিনি লেখেন প্রবাস জীবনে, নাইজেরিয়ায় থাকতে ১৯৬৩ সালে। আর নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৬৫ সালে কলকাতায়।
বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিক – দুই দিক থেকেই নাটকটি নিঃসন্দেহে বাংলা নাটকের ইতিহাসে একটি দিকচিহ্ন হিসেবে নিজের পরিচিতি আদায় করে নিয়েছে। এই নাটকটি ইংরেজী এবং নানা ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এবং সারা দেশে এটি এখনো নিয়মিত অভিনীত হয়ে থাকে। নাটকটি নিয়ে অনেক্ লেখালেখি এবং আলোচনা হয়েছে, এবং শুনেছি কলকাতা এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের এম এ ক্লাসের পাঠ্যতালিকায়তেও এই নাটক টি স্থান পেয়েছে।
নাটকটি পছন্দ করার আর একটি কারণ ছিল এই যে ১৯৬৬ সালে – তখন কলেজে পড়ি এবং নাটক দেখায় তখন দারুন নেশা – কলকাতায় রাসবিহারী মোড়ের কাছে মুক্ত অঙ্গন প্রেক্ষাগৃহে এক সন্ধ্যায় শৌভনিক গোষ্ঠীর প্রযোজনায় ওই নাটকটি দেখে আমি মুগ্ধ আর অভিভূত হয়েছিলাম, সেই ভাল লাগা আর মুগ্ধতা কুয়েতের বাঙালী বন্ধুদের মনে পৌঁছে দিতে আমার গভীর আগ্রহ ছিল।
অবশ্য মনে একটু দুশ্চিন্তাও যে ছিলনা তা বলবোনা। নাটকটি বেশ কঠিন এবং দুর্ব্বোধ্য, তাই আগে থেকে একটু তৈরী হয়ে না এলে এবং খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে নাটকটি সাধারণ দর্শকদের ভাল না লাগারই সম্ভাবনাই বেশী। সাধারণত; কুয়েতে আমরা প্রতি বছর আমাদের দর্শকদের বিনোদন হিসেবে একটি হালকা হাসির নাটকই পরিবেশন করতাম।
এই নাটকে সেরকম কোন গল্প নেই, কোন হাসি গান বা মজার দৃশ্য বা সংলাপ নেই। এখানে নেই কোন নাটকীয় সংঘাত, অথবা কোন নাটকীয় ক্লাইম্যাক্স। এই নাটক হলো মধ্যবিত্ত মানুষের সাধারণ জীবনের কথা, নীরবে বয়ে চলা নিস্তরঙ্গ নদীর মত সেই জীবন, এবং তারই টুকরো টুকরো ছবি।
তবু কেন জানিনা আমাদের দর্শকদের শিল্পবোধের ওপর আমার আস্থা ছিল। আমার মনে হয়েছিল, যে নাটকটি তে নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের যে যান্ত্রিক এবং নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা গতানুগতিক দিকটা ফুটে উঠেছে, তার সাথে গড়পড়তা কুয়েতের সব বাঙালী দর্শকই কমবেশী পরিচিত। এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকটিতে আমাদের সকলের জীবনের কথাই বলা হয়েছে। তাই এই নাটকের সাথে আমরা আমাদের জীবনের মিল খুঁজে পাবো।
আমি জানতাম এবং ইন্দ্রজিৎ কুয়েতের দর্শকের ভাল লাগবে, এবং শেষ পর্য্যন্ত তাই হয়েওছিল।
নাটকটি যে আমাদের দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলবে তা আমি বুঝি নাটকের মহড়ার সময়ে। একমাত্র নুপূর (রায়চৌধুরী – মাসীমা) ছাড়া এই নাটকে যারা অভিনয় করেছিল তারা সকলেই বয়সে তরুণ। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এই নাটকটি যখন লেখা হয় তখন এদের কারুর জন্ম হয়নি। প্রথম দিকে চল্লিশ বছর আগে লেখা নাটকটির আজকের যুগে প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমার মনে কিছুটা সংশয় ছিল তা ঠিক। কিন্তু চার মাস মহড়া দেবার সময় লক্ষ্য করলাম বয়সে তরুণ এই ছেলেমেয়েদের নাটকটির প্রতি আকর্ষন ক্রমশঃ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ওদের উৎসাহ একটা সময়ে এসে আমার উৎসাহ কেও অতিক্রম করে গেছে।
তবু সাবধানের মার নেই ভেবে আমি নাটকটি মঞ্চস্থ হবার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বি সি এসের website এ নাটকটির বিষয় বস্তু নিয়ে অনেক লেখালেখি ও আলোচনা করেছিলাম। যাতে সেই সব লেখা পড়ে আমাদের সমিতির সভ্যরা নাটক দেখতে আসার আগে কিছুটা মানসিক ভাবে প্রস্তুত হয়ে আসে।
ইংরেজীতে একটা কথা আছে – “Fools dare where angels fear to tread” – আমিও সেরকম কিছুটা দুঃসাহসী হয়ে কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নিই। সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল, কেননা আমাদের দর্শকরা নাটকটি মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখেছিলেন, এবং নাটকের শেষে তাঁরা আমাদের প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।

২) অমল, বিমল, কমল, ইন্দ্রজিৎ আর মানসী
নাটকটিতে মূল চরিত্র সাতটি। তাদের মধ্যে দু’জন – লেখক আর মাসীমা – হলেন রক্তমাংসের মানুষ, অর্থাৎ জীবন্ত চরিত্র। বাকি পাঁচ জন – অমল বিমল কমল ইন্দ্রজিৎ আর মানসী – এরা সবাই বাস করে লেখকের কল্পনায়। এই পাঁচ জন কাল্পনিক চরিত্র কে নিয়ে লেখক একটি নাটক লিখতে চান। এই ব্যাপারটা না জানা থাকলে নাটকের মধ্যে অনেক জায়গাতেই এই চার জনের সাথে লেখকের ব্যবহার আর সংলাপ দর্শকের কাছে দুর্ব্বোধ্য মনে হতে পারে। নাটকটি শুরু হবার আগে তাই পরিচালক হিসেবে মাইক হাতে আমি মিনিট পাঁচেক ধরে দর্শকদের নাটকটি র মূল আখ্যান আর আঙ্গিক নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলাম।
BCS Website এ বিশদে নাটক টি নিয়ে লেখা আর নাটকের আগে এই বক্তৃতাটা বেশ কাজে দিয়েছিল বলেই আমার ধারণা।
এই নাটকের প্রধান চরিত্র একজন উদীয়মান তরুণ লেখক, যিনি আধুনিক বাঙালী মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের জীবন কে উপজীব্য করে নিয়ে একটি নাটক লিখতে চান্। সেই নাটকে উঠে আসবে তাদের জীবনচক্রের নানা দিক।
এই আধুনিক নাগরিক সমাজ নিয়ে নাটকের শুরুতে লেখক দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলছেন~
“ ১৯৬১ সালের আদমশুমারির হিসাবে কলকাতার বর্তমান লোকসংখ্যা ২৯,২৭,২৮৯। এর শতকরা প্রায় আড়াই ভাগ গ্র্যাজুয়েট বা আরো উচ্চশিক্ষিত। বিভিন্ন নামে এঁদের পরিচিতি। এঁরা মধ্যবিত্ত, যদিও এঁদের মধ্যে বিত্তের তারতম্য যথেষ্ট। এঁরা বুদ্ধিজীবী যদিও বুদ্ধি জীবিকা হলে অনেকেই অনাহারে মরতো। এঁরা শিক্ষিত, যদি ডিগ্রিকে শিক্ষা বলে ধরে নেওয়া চলে। এঁরা ভদ্রলোক, ছোটলোকদের থেকে নিজেদের পার্থক্যটা বোঝেন বলে। এঁরা অমল বিমল কমল। এবং ইন্দ্রজিৎ।”
অমল, বিমল, কমল, এবং ইন্দ্রজিৎ, নাটকের এই চার জন চরিত্রের সাথে দর্শকদের আলাপ হবে যখন এরা কলেজে পড়ে। এদের সাথে আছে মানসী, সে ইন্দ্রজিৎ এর প্রেমিকা।
কলেজের ক্লাসের কিছু দৃশ্যতে এরা চারজন ছাত্র, তারা স্টেজে যন্ত্রের মত চলাফেরা করে যন্ত্রের মত শিক্ষকদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। ক্লাসের পরে বসে নানা বিষয় নিয়ে তাদের প্রাণখোলা আড্ডা।


কলেজে শিক্ষক ও ছাত্র

কলেজের পর প্রাণখোলা আড্ডা
লেখক দেখিয়েছেন যে আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ, হয়তো চেষ্টা করলে আমরাও উল্লেখযোগ্য হতে পারতাম, কিন্তু আমরা চেষ্টা করিনি, মিশে গেছি জনারণ্যে। আমাদের মতই সাধারণ হলো অমল, বিমল আর কমল। এই সাধারণ মানুষেরা সমাজের নানা নিয়ম মেনে নিয়ে একটা যান্ত্রিক জীবনে বাঁধা পড়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। এদের নিয়ে নাটক লেখা যায়না।
কিন্তু এদের থেকে আলাদা একজন আছে, সে ‘ইন্দ্রজিৎ’। সে আমাদের মত সাধারণ অমল-কমল-বিমল বা নির্মল নয়, সে ইন্দ্রজিৎ। আর আলাদা বলেই ইন্দ্রজিৎকে নিয়ে নাটক লেখা হয়।
দর্শক-পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ইন্দ্রজিৎকে নিয়ে কেন এই নাটক। কেন ইন্দ্রজিৎ নাটকের নামভূমিকায়? কি ভাবে ইন্দ্রজিৎ তার বন্ধুদের থেকে আলাদা?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো ইন্দ্রজিৎ আলাদা তার চিন্তাভাবনায়। সে অন্য তিনজনের মত অবলীলায় সব কিছু মেনে নিতে পারে না। এই যেমন সে তার প্রেমিকা মানসীকে বলে, “যে নিয়মে সাত বছরের ছেলেকে জুতো পালিশ করতে হয়, সে নিয়মটাকে আমি মানতে পারি না”।
কলেজের সেই প্রাণখোলা আড্ডার পরে একদিন সবাই চলে গেলে ইন্দ্রজিৎ একা বসে থাকে। বন্ধুদের সাথে রোজ সেই একই বিষয় নিয়ে একই কথা বলতে তার ভাল লাগেনা। এমন সময় লেখক তার কাছে আসে।
লেখকঃ কি রে এখানে একা বসে কি ভাবছিস? তোর স্যাঙাৎরা সবাই কোথায়? অমল বিমল কমল?
ইন্দ্রজিৎঃ ওরা একটু আগে চলে গেল।
লেখকঃ কি নিয়ে গ্যাঁজালি?
ইন্দ্রজিৎঃ (কিছুটা বিরক্ত) ওই তো সেই একই বিষয় – ক্রিকেট, রাজনীতি, সিনেমা, ফিসিক্স আর সাহিত্য। আর ভাল লাগেনা এই সব। ইচ্ছে হয় কোথাও বেরিয়ে পড়ি! কোন নাম না জানা জায়গায়…
লেখকঃ বাঃ, চল্ তাহলে, আমিও যাবো তোর সাথে। তোর পকেটে কত টাকা আছে?
ইন্দ্রজিৎঃ (মানিব্যাগে টাকা গুণে) – আড়াই টাকা।
লেখকঃ আমারও ওই রকম। চল্ একটা বাস ধরে হাওড়া স্টেশন চলে যাই, তারপরে যে ট্রেণটা প্রথমে পাবো, সেটা ধরে এই টাকায় যত দূর যাওয়া যায়, চলে যাই।
যাওয়া অবশ্য শেষ পর্য্যন্ত হয়না।
লেখক ইন্দ্রজিৎ কে বাদামের ঠোঙা এগিয়ে দিয়ে বলে, “নে, বাদাম খা!”

নে, বাদাম খা
৩) নাটকের বিষয়বস্তু
এই নাটকের মূল বিষয়বস্তু হলো অমল বিমল কমলের মত আজকের সাধারণ নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষ এক অসার অর্থহীন যান্ত্রিক এবং নানা সামাজিক নিয়মের নাগপাশে বাঁধা জীবনে আটকে পড়ে আছে। ইন্দ্রজিৎ এর মত কিছু মানুষ এই নিয়মের গন্ডী থেকে বেরিয়ে পড়তে চায়। তারা হল বিদ্রোহী। ইংরেজীতে যাকে বলে non- compliant, uncompromising… নাটকের এই বিদ্রোহী চরিত্র ইন্দ্রজিৎ আসলে লেখক নিজেই, নাটকে তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ইন্দ্রজিৎ এর সংলাপে তাঁর নিজের ভাবনা চিন্তারই প্রতিফলন ঘটেছে। ইন্দ্রজিৎ লেখকেরই দ্বৈত সত্তা, তার অল্টার ইগো।
লেখক ইন্দ্রজিৎকে নিয়ে যে নাটক লেখার চেষ্টা করছেন সেখানে তিনি আমাদের সাধারণ মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের চক্র বোঝাতে গিয়ে বলছেন “স্কুল থেকে কলেজ। কলেজ আর পরীক্ষা। পরীক্ষা আর পাস। তারপর দুনিয়া”। লেখক চরিত্রের ভেতর দিয়ে বাদল সরকার খুব সহজে জীবনের একটা ছক এঁকেছেন, যেই ছকে আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষেরা সবাই কম-বেশি ঘুরপাক খাচ্ছি।
ঘুরছি, ঘুরছি আর ঘুরছি…
লেখকের সংলাপে বার বার ওই কথা টা ঘুরে ফিরে আসে।
সেই ঘোরা বোঝাবার জন্যে আমরা স্টেজের পিছনের কালো ব্যাকড্রপে একটা মোটিফ এঁকে টাঙিয়ে দিয়েছিলাম, তাতে আঁকা ছিল একটা চাকার ছবি আর সেই চাকার মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে কিছু মানুষ।

ঘুরছি, ঘুরছি আর ঘুরছি
৪) অভিনব আঙ্গিক
বাদল সরকার এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকে এমন কিছু নতুন আঙ্গিক ব্যবহার করেছিলেন, যা আর কোন মৌলিক বাংলা নাটকে এর আগে দেখা যায়নি।
প্রথমতঃ, এই নাটকে স্টেজ বলতে কেবল লেখকের চেয়ার, টেবিল, আর একটা টেবিল ল্যাম্প, এ ছাড়া অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎ এর বসার জন্যে চারটে কাঠের cube, সেগুলো দরকার মত তারাই এখান থেকে ওখানে সরিয়ে নিয়ে যাবে। আর বাগানে ইন্দ্রজিৎ আর মানসীর পাশাপাশি বসে কথা বলার জন্যে একটা বেঞ্চ।
ব্যাস বাকি যত কিছু প্রপ্ দরকার সব অদৃশ্য, দর্শক কে কল্পনা করে নিতে হবে।
চাকরীর ইন্টারভিউ দেবার সীনে এক এক করে অমল বিমল কমল ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে, বাকিরা বাইরে বসে। ইন্টারভিউ যারা নিচ্ছেন তাঁরা অদৃশ্য, যে ইন্টারভিউ দিচ্ছে সে কেবল হাত পা নেড়ে মূকাভিনয় করে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। শেষে অদৃশ্য তিনজন প্রশ্নকারীদের সাথে হাত মিলিয়ে হেসে সে পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলে পরের জন ঢুকছে। বাইরে অপেক্ষমান অন্যরা তাদের নিজেদের সংলাপ বলে যাচ্ছে।
লেখক এর একটা সংলাপ আছে সেখানে সে বলছে আসলে ওদের বেশী প্রশ্ন নেই তো, একই প্রশ্ন সবাইকে করছে, তাই ওরা চায়না যে বাইরে বেরিয়ে এসে কেউ তার প্রশ্নগুলো তার বন্ধুদের বলে দিক।


চাকরীর ইন্টারভিউ
চাকরী পাবার পরে অফিসের সীনে, সেখানে অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎ কাজ করে। চার জন পাশাপাশি বসে। তাদের সামনে অদৃশ্য টেবিলে রাখা অদৃশ্য ফাইল ,কাগজ, টাইপরাইটার। তারা কথা বলতে বলতে হাত চালিয়ে ফাইলে চোখ বোলাচ্ছে, অদৃশ্য পাতা ওল্টাচ্ছে, অদৃশ্য টাইপরাইটারে অদৃশ্য কাগজ লাগিয়ে দুই আঙুল ব্যবহার করে বাতাসে টাইপ করছে।

এছাড়া আছে একই অভিনেতার বিভিন্ন রোলের মধ্যে অনায়াস বিচরণ।
যেমন অফিসের দৃশ্যে লেখক হয়ে যান্ অফিসের বেয়ারা “হরিশ”! সেখানে তার কাজ হলো বাবুদের ফাই ফরমাস খাটা, দরকার মতো চা, সিগারে্ট, ফাইল এই সব এনে দেওয়া। অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎরা তাকে নানা সুরে “হরিশ ! হরিশ!!” বলে ডাকলেই সে তাদের কাছে “বলুন স্যার” বলে গিয়ে হাজির হয়। হরিশের জন্যে কোন আলাদা অভিনেতা নেই, লেখক দর্শকদের সামনেই কাঁধে একটা কাপড় নিয়ে হরিশ হয়ে যায়।
মাঝে মাঝে সেই হরিশ আবার অফিসের ম্যানেজার হয়ে গিয়ে সেক্রেটারী মিস মালহোত্রা কে ডেকে চিঠি dictate করে। তখন তার কাঁধে আর টেবিল পরিস্কার করার কাপড় নেই, তার চালচলনে তখন রাশভারী ব্যক্তিত্ব। অমল বিমল কমলরা তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে “গুড মর্ণিং স্যার” বলে।
এদিকে মানসী দিব্বি মিস মালহোত্রা হয়ে গিয়ে অদৃশ্য খাতায় অদৃশ্য পেন দিয়ে ডিক্টেশন লেখে।
এই সব অভিনব নতুন আঙ্গিক ব্যবহার করার জন্যেও এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছে সমানভাবে আদৃত হয়।


অফিসের দৃশ্য – কখনো হরিশ, কখনো ম্যানেজার
৫) নাটকের শুরু
এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকের শুরুটা বেশ মজার।
রাসবিহারী মোড়ের কাছে মুক্ত অঙ্গন মঞ্চে এই নাটকটা প্রথম দেখি ১৯৬৬ সালে। প্রথম সীনে পর্দ্দা খোলার পরে যখন লেখক স্টেজে দর্শকদের সাথে কথা বলছে তখন হঠাৎ সামনের সারির দর্শক আসন থেকে একটা গুঞ্জন শুরু হলো। দু’জন দর্শকের মধ্যে সীট নিয়ে বাদানুবাদ। একদিকে স্টেজে লেখক তার সংলাপ বলছে, অন্যদিকে হলে সেই জায়গাটাতে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে গেছে, একটা জটলার মত, আর গুঞ্জন ক্রমশঃ কোলাহলের দিকে এগোচ্ছে।
ব্যাপার টা কি?
এমন সময়ে ওই জটলার দিকে লেখকের চোখ পড়বে, এবং সে তার সংলাপ বন্ধ করে ওই কোলাহলরত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলবে, “এই যে শুনছেন, ও মশাই! আপনারা একবার একটু ওপরে উঠে আসবেন?”
তারপর “আমাদের বলছেন?” বলে চার মূর্ত্তি অমল বিমল কমল ইন্দ্রজিৎ এক এক করে স্টেজে উঠে তাদের নাম বলবে।
কি নাম আপনার? অমল কুমার বোস।
আপনার? বিমল কুমার ঘোষ। ইত্যাদি।
আমার ভাই খোকন গল্প করে যে তার এক বন্ধু সব্যসাচী নাকি একবার নাটক দেখতে গিয়ে ওই ঝগড়ার সময়ে অমল বিমলদের পিছনেই বসেছিল। ওদের ঝগড়া দেখে সে বুঝতে পারেনি যে ওই ঝগড়াটা আসলে নাটকেরই একটা অংশ, সে ওদের কাছে গিয়ে ঝগড়া থামাতে যায়। তার পরে লেখক যখন ওদের স্টেজে ডাকছে, তখন লেখক তাকেও ডাকছে এই ভেবে সে ওদের সাথে আর একটু হলেই স্টেজে উঠে “আমার নাম সব্যসাচী সেন” বলে একটা কেলো করতে যাচ্ছিল, নাটকের কিছু লোক তাকে হাত ধরে টেনে নামিয়ে আনে।
এই সীট নিয়ে ঝগড়ার কথা অবশ্য নাটকে লেখা নেই। এটা কিছুটা ইম্প্রোভাইস করা। আমরাও এই ভাবে আমাদের নাটক শুরু করি।
এই দৃশ্য টা রোজ রীতিমতো রিহার্সাল হতো। অবশ্য আমাদের নাটকের ভিডিও তে ঝগড়াটা ওঠেনি। আমি আমাদের ভিডিওগ্রাফার ভিক্টর কে বলেছিলাম ঝগড়াটা তুলতে কিন্তু ওই জায়গাটা অন্ধকার ছিল, তাই বোধহয় তোলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ওই সময়ে হলে একটা অস্পস্ট চ্যাঁচামেচির আওয়াজ ভিডিওতে উঠেছে, এবং দেখা যাচ্ছে সামনের সারিতে বসে আমাদের সত্য (চক্রবর্ত্তী) বেশ বিরক্ত হয়ে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে কি যেন বলছে। ঝগড়া থামাতে বলছে ধরে নেওয়া যায়।
তার মানে আমাদের অভিনয় বেশ বিশ্বাস্য হয়েছিল!



নাটকের শুরু
৬) মাসীমা
মধ্যবিত্ত বাঙালী পরিবারে স্নেহময়ী মাসীমা জ্যেঠিমা কাকীমা পিসীমা কেউ না কেউ একজন থাকবেনই। এই নাটকেও একটি মাসীমার চরিত্র আছে, যিনি মাঝে মাঝেই লেখকের কাছে এসে “ওরে ভাত যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল, কখন থেকে ডাকছি, খেতে আয় বাবা!” বলে অনুরোধ উপরোধ করেন।
কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ হয়না।
লেখকের মনে নানা চিন্তা। আমি কে? আমি কি? আমি কেন? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি?
মাসীমা এসব কি কেন কোথায় প্রশ্নের মানে বোঝেন না। তিনি বলেন “কি যে ছাই হাবি জাবি ভাবিস তুই, বুঝিনা বাবা!”
লেখক মাসীমাকে একটু খ্যাপাবার জন্যে কবিতা করে বলে~
“কেন তুমি তরকারী বঁটি দিয়ে কুটবে, কেন তুমি ডালে দেবে আটখানা লংকাই?
সব্বাই করে বলে সব্বাই করে তাই।
কেন তুমি ঘড়ি ধরে অফিসেতে ছুটবে, তেল দিতে কেন বাছো অন্যের চরকাই?
সব্বাই করে বলে সব্বাই করে তাই। ”
নিয়মের গন্ডীতে বাঁধা আমাদের নাগরিক জীবন কে বোঝাতে বাদলবাবু এই “সব্বাই করে বলে” লাইনটি ব্যবহার করেছিলেন, যা এক সময় লোকের মুখে মুখে ঘুরতো।

সব্বাই করে বলে সব্বাই করে তাই – লেখক ও মাসীমা
৭) প্রেম
স্কুলের পরে কলেজ, এবং কলেজে পড়ার সময় প্রেম।
আমাদের প্রায় প্রত্যেকের জীবনচক্রে এ এক অনিবার্য্য ঘটনা, নাটকে জীবনের ওই সময়টা ছুঁয়ে গেছেন নাট্যকার।
অমল বিমল কমল আর লেখক চার জন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের সামনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় নানা বয়সের নানা ধরণের মেয়েরা, তারা সতৃষ্ণ নয়নে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথমে দেখা যায় সাধারণ পরিবারের একটি মেয়ে হাতে বই খাতা নিয়ে কলেজে হেঁটে যাচ্ছে। তার একটু পরে দেখা গেল এক আধুনিকাকে, তার হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ, চোখে সানগ্লাস, চলার ভঙ্গীতে লাস্য।
এবং আরও একটু পরে তার আশ্চর্য্য হয়ে দেখলো একটি মেয়ের সাথে কথা হেসে হেসে অন্তরঙ্গ ভঙ্গীতে কথা বলতে বলতে তাদের দিকে একবার ও না তাকিয়ে চলে গেল তাদের বন্ধু ইন্দ্রজিৎ~
“ডুবে ডুবে কিরকম জল খাচ্ছে দেখেছিস – আমাদের সাথে একবার আলাপ করিয়ে দিলোনা।” দু;খ করে বললো অমল বিমল কমল।


কিন্তু ইন্দ্রজিৎ এর সাথে এই মেয়েটি কে?
জানা গেল এই মেয়েটির নাম মানসী, এবং সে ইন্দ্রজিৎ এর এক দূর সম্পর্কের বোন হয়। তারা পার্কের বেঞ্চে গিয়ে পাশাপাশি বসে, কথা বলে, আর দর্শকদের কল্পনা করে নিতে হয়, তাদের মাথার ওপরে কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল ধরেছে, সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে আকাশে চাঁদ ওঠে, ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলো জ্বলে ওঠে।
ইন্দ্রজিৎ ও মানসীর প্রেম শেষ পর্য্যন্ত নাটকে পরিণতি লাভ করেনি। ইন্দ্রজিৎ চেয়েছিল মানসীকে বিয়ে করতে। কিন্তু মানসী রাজী হয়নি। এখানেও সেই সমাজের নিয়মের প্রশ্ন উঠে এসেছে। মানসীর মনে সংশয় ছিল যে দূর সম্পর্কের বোন কে বিয়ে করলে তাদের বিয়ে পরিবারের মান্যতা হয়তো পাবেনা।
অনেকদিন মানসী বা ইন্দ্রজিৎ কেউই বিয়ে করেনি। দেখা করেছে, কথা বলেছে। ইন্দ্রজিৎ বারবার বলেছে বিয়ের কথা কিন্তু মানসী রাজি নয়।


ইন্দ্রজিৎ ও মানসী
৮) বিবাহ
লেখক যে জীবন চক্রের ছক এঁকেছেন তাতে কলেজ পাসের পর দুনিয়া। সেই দুনিয়ায় টিকতে হলে একটা চাকরি দরকার, রুটি-রুজির নিশ্চিত ব্যবস্থা দরকার। ইন্দ্রজিৎ ও তাঁর বন্ধুরা সেজন্য চাকরির খোঁজ করে, ইন্টারভিউ দেয়। তারপরে এক সময় তারা চাকরীও পায়। এবং স্বাবলম্বী হবার পরে তারা জগতের নিয়ম মেনে বিয়েও করে।
এই ভাবেই নাটকে জীবনের একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে যায় তারা।
বিয়ের প্রথমে বর আর বৌ, মধ্যবয়েসে স্বামী আর স্ত্রী আর শেষ বয়েসে গিয়ে কর্ত্তা আর গিন্নী… নাটকে জীবনের তিন বয়সের দাম্পত্যের দৃশ্য দেখিয়েছেন নাট্যকার।
সদ্য বিয়ে হয়েছে অমলের, সদ্যবিবাহিত বলে তারা এখন বর আর বৌ। বৌকে একা পেয়ে অমল তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে লজ্জা পেয়ে বৌ “কি করছো? কেউ দেখে ফেলবে!” বলে একটু দূরে সরে যায়।
বিমলের বিয়ে কয়েক বছর হলো হয়েছে, তারা এখন স্বামী আর স্ত্রী। এক দৃশ্যে সকালে বিমল খবরের কাগজ পড়ছে, তার স্ত্রী তার সামনে চায়ের কাপ রেখে বলে “আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরো, দিদি জামাইবাবুর বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে!”
কমলের এখন বেশ বয়েস, সে আর তার স্ত্রী এখন কর্ত্তা আর গিন্নী। তাদের ছেলের অসুখ, অফিস ফেরত তার ওষুধ কিনে আনার কথা ছিল, কিন্তু সে ভুলে গেছে, তাই তাকে গিন্নীর গঞ্জনা শুনতে হয়।
আমাদের সকলের দাম্পত্য জীবনের এই সব অতি পরিচিত দৃশ্য!




বিয়ের পরে বর বৌ, স্বামী স্ত্রী, ও কর্ত্তা গিন্নী
৯) দুনিয়া
এই ভাবেই দিন কাটে। অমল বিমল কমল যুবক থেকে মধ্যবয়েসী এবং তারপর প্রৌঢ় হতে থাকে।
জীবনচক্রে ধীরে ধীরে আটকে যায় সবাই।
ঘুরে ফিরে অমল-কমল-বিমলের সাথে দেখা হয় লেখকের। এরা সবাই চাকরি-বাকরি, ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। যদিও কেউই তেমন সুখী নয়।
অমল লেখককে বলে, “এই এ-বি-সি-ডি কোম্পানিতে ঢুকে ভবিষ্যৎটা ঝরঝরে হয়ে গেল। সিনিয়র অ্যাসিসটেন্টের পোস্টে ছ’বছরের এক্সপেরিয়েন্স, জানো? আর অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার করে নিয়ে এল, বাইরে থেকে এক মাদ্রাজিকে!”
বিমল জমি কেনা বেচা আর বাড়ী তৈরী করার প্রোমোটার হয়েছে। তার হাতে অনেক বাড়ী আর জমি। লেখক কিনতে চাইলে খুব কম দামে সে ভাল জমি বা বাড়ীর সন্ধান দিতে পারে। তাছাড়া তার মনে অনেক নতুন লাভজনক ব্যবসার স্কীম আছে, লেখকের যদি উৎসাহ থাকে…
ওদিকে কমল তার চাকরীর বাঁধা মাইনের বাইরেও কিছু উপার্জ্জনের আশায় ইন্সিওরেন্স বিক্রী করে। সে লেখক কে বলে “একটা ইন্সিওরেন্স পলিসি করিয়ে নিতে ভুলোনা কিন্তু!”
এই ভাবেই আমাদের বাঙ্গালী মধ্যবিত্তদের বর্ণহীন, স্বাদহীন, যান্ত্রিক, গতানুগতিক নাগরিক জীবন এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে এগিয়ে যায়। অমল রিটায়ার করে, অমলের ছেলে অমল চাকরী পায়। বিমল অসুখে পড়ে, বিমলের ছেলে বিমল চাকরী পায়। কমল মারা যায়, কমলের ছেলে কমল…
১০) ইন্দ্রজিৎ কি নির্মল ?
কিন্তু নাটকের মুখ্য চরিত্র ইন্দ্রজিৎ কোথায়? ওদের মতই সেও কি চাকরি করছে? বিয়ে করেছে?
জানা গেল ইন্দ্রজিৎ একটা কোর্স করতে লন্ডন চলে যায়। সেখান থেকে সে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে পৃথিবীর পথে। ত।রপর এক সময় দেশে ফিরে আসে ইন্দ্রজিৎ। বিয়ে করে অন্য এক মানসী কে। লেখকের সাথে একদিন দেখা হয় তার। অনেকদিন পর দেখা তাই লেখক অনেক কথাই জানতে চাইছে ইন্দ্রজিতের কাছে, কেমন আছে? কি করছে? কিন্তু লেখক যতোটা শুনতে চায় ইন্দ্রজিতের বলার মতো ততোটা নেই।
আমাদের জীবনের দৈনন্দিনতা আর প্রাত্যহিকতার গ্লানি, রোজ রোজ একই বিষয়ের ফিরে ফিরে আসা, একই রুটিনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া, অস্তিত্বের ভার, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার মধ্যে মধ্যে নিহিত থাকে এক ধরণের অবসাদ আর ক্লান্তি। তার সাথে থাকে আমাদের হাজারো না পাওয়া, বাধাবিপত্তি, অসুখবিসুখ, ব্যর্থতা, বিপর্য্যয়।
ইন্দ্রজিৎ বলে, “দুনিয়াতে বলবার মত ঘটনা প্রায়ই ঘটে না”।
আমি সকালে বাজার করি। আমার বৌ রান্না করে।
আমি খেয়ে দেয়ে অফিসে যাই। আমার বৌ বাড়ীর কাজ করে।
আমি অফিস থেকে ফিরি। আমার বৌ আমার জন্যে চা নিয়ে আসে।
সুমন গুণের সাম্প্রতিক এই কবিতাটিতে এক সাধারণ নারীর জীবনের এইরকম বর্ণহীন, স্বাদহীন, গন্ধহীন একটি দিনের কথা লেখা আছে।
—————
লালন – সুমন গুণ
বাড়ীতে দুপুরে তুমি একা থাকো, একমাত্র ছেলে সকাল দশটায় যায় কাজে/
তারপর তোমার আর খুব কিছু করার থাকেনা, ভোরে উঠে চা করে ঘর মুছে/
ভাতের সাথে একটা দুটো তরকারী বানিয়ে নাও/
ছেলে যাবার পরে দিন খুব বড় হয়ে যায়/
গ্রিল টেনে দিয়ে তুমি ঘরে আসো, চেয়ার এলিয়ে কিছুক্ষন বসে থাকো/
বেশীক্ষন দাঁড়াতে পারোনা, বিছানায় শুয়ে নাও, ঘুম পায়, দরজা খোলা থাকে/
এক সময় ঘুম ভেঙে উঠে, স্নান সেরে, ছাদে যাও/
দুপুরের স্তব্ধ রোদে মেলে দাও শাড়ি, গামছা, ছেলের পাজামা/
আস্তে আস্তে নেমে এসে বারান্দায় সামান্য দাঁড়াও/
দুপুরে কখনো অল্প ঘুম আসে, বিকেলের আগে ঘুম ভাঙে/
তবু কিছুক্ষন বিছানায় চোখ বুজে থাকো/
নৈহাটি লোকাল এসে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায়/
গ্রিলের আওয়াজে তুমি বারান্দায় এলে গ্রিল খুলে/
ক্লান্ত, জীর্ণ, অপত্যকালীন সন্ধ্যা ঘরে উঠে আসে/
——————
ইন্দ্রজিৎ তার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, কারণ সে ভেবেছিল সে বাকিদের থেকে আলাদা। কিন্তু আজ তার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। এখন তার মনে হচ্ছে সে ইন্দ্রজিৎ নয়, সে অমল-কমল-বিমলের মতই সাধারণ আরেকজন। সে নির্মল। এখন বাকি জীবনটা ঘর-সংসার, চাকরি-বাকরি করে কাটিয়ে দিতে চায় সে।
কিন্তু ইন্দ্রজিৎ তো নির্মল হতে পারবেনা, সে তো সাধারণ হতে পারবে না। কারণ হিসেবে লেখক বলেন, “কিন্তু তোমার যে কিছু নেই। প্রমোশন নেই, বাড়ি করা নেই, ব্যবসার স্কিম নেই, কী করে নির্মল হবে তুমি?”
তাহলে কি ইন্দ্রজিৎ আলাদা হতে পারলো? ইন্দ্রজিৎ কে নিয়ে নাটক লেখা কি সার্থক হলো?
লেখক নাটকের শেষ টানেন, “আমাদের অতীত-ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে গেছে। আমরা জেনে গেছি পেছনে যা ছিল, সামনেও তাই।”
মোটিফের কাগজে তাই ওই চাকার পাশে একটা দূরান্তে চলে যাওয়া এক জোড়া রেল লাইন ও এঁকে দিই আমরা।
পিছনেও যা, সামনেও তাই। মনে হয় দুই লাইন হয়তো কোথাও এক জায়গায় গিয়ে মিশেছে, কিন্তু তা নয়। কোনদিনই ওরা এক হবেনা।
গ্রীক পুরাণের হতভাগ্য সিসিফাস সারা জীবন একাট ভারী লোহার বল ঠেলে ঠেলে পাহাড়ের ওপরে তুলতেই সেটা আবার গড়িয়ে নীচে নেমে যেতো। বাদল সরকার নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষদের সেই সিসিফাসের সাথে তুলনা করেছেন।


That’s all ladies and gentlemen
১১) আমাদের দল
কুয়েতের বি সি এসে নাটকে উৎসাহী যুবকের কোন অভাব নেই। বরং তারা সংখ্যায় এত বেশী যে সবাইকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়াই মাঝে মাঝে কঠিন হয়ে পড়ে। এবং ইন্দ্রজিৎ এর ক্ষেত্রে যেহেতু মাত্র সাতটি চরিত্র তাই অনেককেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাদ দিতে হয়েছিল।
লেখক করেছিল শুকদেব (চট্টোপাধ্যায়), ইন্দ্রজিৎ – শুভঙ্কর (রায়), অমল – অজিত (চ্যাটার্জ্জী), বিমল – দেবাঞ্জন (ভট্টাচার্য্য), কমল – তাপস (ভট্টাচার্য্য), মাসীমা – নুপূর (রায় চৌধুরী) আর মানসী – দীপা (গুপ্ত)।
মহড়া হয়েছিল প্রায় তিন মাস ধরে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবার বাড়ীতেই হতো। মনে আছে আমাদের সবার মাসীমা নুপূর রোজ রিহার্সালে বাড়ীতে তৈরী নারকেলের নাড়ু বানিয়ে নিয়ে আসতো। নিমেষে তা উধাও হয়ে যেতো অবশ্যই।
প্রবাসী জীবনে নাটকের থেকেও বেশী উপভোগ্য হত মহড়া উপলক্ষ্যে সবার একজোট হওয়া। হৈ হৈ আড্ডা এর ওর পিছনে লাগা এসব তো ছিলই। কিন্তু সব চেয়ে ভাল লাগতো নাটকটির পিছনে এই দলের সকলের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে।
পার্থসারথী (বর্দ্ধন) স্টেজ আর আবহের দায়িত্বে ছিল। স্টেজে অবশ্য বিশেষ কাজ কিছু ছিলনা। কেবল ওই পিছনে কালো কাগজের ওপর একটা চাকা আর রেল লাইনের মোটিফ এঁকে সাঁটিয়ে দিতে বলেছিলাম ওকে। আবহে সে ব্যবহার করেছিল পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীত। Bach, Beethoven এবং অন্যান্য দিকপালদের Cello Violin ইত্যাদি। অভিনেতাদের সংলাপ ধরার জন্যে মেঝেতে রাখা ফ্লোর মাইক ব্যবহার করেছিলাম।
অমিতেন্দ্র (বাগচী) ছিল আলোর দায়িত্বে। এই নাটকে আলোর কোন কেরামতি ছিলনা। দু’ তিনতে ফ্লাড লাইটেই কাজ হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তার তেমন কোন অসুবিধে হয়নি।
মনে পড়ে যে নাটক শুরু হবার এক ঘন্টা তখনো বাকি, আমি হলে পৌঁছে দেখি সেই মোটিফের কাগজটা পিছনের ব্যাকড্রপে সাঁটানো হয়নি, পার্থকেও দেখা যাচ্ছেনা। কোথায় গেল? এদিকে একটু পর থেকে দর্শকরা আসতে শুরু করবে।
পার্থ অবশ্য খুবই দায়িত্ববান ছেলে। বি সি এসের অনেক নাটকের কাজ সে একাই সামলেছে। তো একটু পরেই সে তার কাগজটা নিয়ে এসে পিছনে সাঁটিয়ে দিলো।
দিয়ে আমায় বললো, “কি ইন্দ্রজিৎ দা’, ঠিক আছে তো?”
দেখলাম তার আঁকার size আর proportion আমি যেরকম চেয়েছিলাম, একদম তাই হয়েছে। হলের একদম পিছন থেকেও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।
আমি পার্থকে বললাম, “পারফেক্ট!”
কুয়েতের তিনটে ইংরেজী কাগজেই আমাদের নাটকের রিভিউ ছাপা হয়েছিলা। তার সব গুলোতেই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা।

আমাদের দলের অভিনেতা দের সাথে সুভদ্রা আর আমি (নাটকের আগে)

কাস্ট পার্টি তে উপহার পেয়ে উৎফুল্ল পরিচালক
১২) পরিশিষ্ট – বাদলবাবু
কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ মঞ্চস্থ করার আগে নিয়ম অনুযায়ী পরিচালক হিসেবে বি সি এসের হয়ে আমি নাট্যকার বাদলবাবুকে নাটকটি কুয়েতে করার অনুমতি চাইবার জন্যে কলকাতায় ফোন করেছিলাম। তিনি আমার ফোন পেয়ে খুসী হয়েছিলেন, এবং অবশ্যই আমাদের কুয়েতে তাঁর নাটক মঞ্চস্থ করার অনুমতি ও দিয়েছিলেন।
সাফল্যের সাথে নাটকটি কুয়েতে মঞ্চস্থ হবার পরে আমরা তাঁকে বি সি এসের পক্ষ থেকে সন্মানী হিসেবে একটি চেক পাঠাই। লেখকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল শুকদেব (চট্টোপাধ্যায়) , সে নিজে হাতে গিয়ে বাদলবাবুকে সেই চেক দিয়ে আসে। সেই চেকের সাথে একটা ইংরজীতে লেখা প্রাপ্তির (Receipt) চিঠিও ছিল, তাতে সই করে আমাদের পাঠাবার জন্যে।
সেই ইংরেজী প্রাপ্তির চিঠি সই করার সাথে সাথে বাদলবাবু বাংলায় নিজে হাতে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লিখে আমাদের পাঠিয়েছিলেন।
বাদলবাবু আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, আমরা তাঁর পরলোকগত আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি
