নতুন পোস্ট

  • খান স্যার

    স্কুলের ইতিহাস পাঠক্রম নিয়ে আমাদের দেশে এখন অনেক তর্ক বিতর্ক হচ্ছে। এখন হিন্দুত্ববাদীদের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা। তাদের মত হলো স্বাধীনতার পর থেকে ভারতে স্কুল আর কলেজের ছাত্ররা ইতিহাসের বইতে শুধু মুঘল আর অন্যান্য মুসলমান রাজাদের কাহিনী পড়ে।  হিন্দু সাম্রাজ্য এবং হিন্দু রাজাদের কথা দেশের ছাত্রদের  সেরকম ভাবে কিছুই পড়ানো হয়না। উত্তর ভারতের গুপ্ত সাম্রাজ্য, দক্ষিণের চোলা বা বিজয়নগর, বাংলার সেন বা পাল বংশ এমন কি শিবাজীর মাড়াঠাদের নিয়ে আমাদের স্কুলের বা কলেজের ইতিহাসের বইতে সেরকম উল্লেখ নেই। সেখানে শুধু মুঘলদের এবং পরে ইংরেজদের ইতিহাস।

    হিন্দুত্ববাদী বিক্রম সম্পথ ইতিহাসের এই বিকৃতি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি অনেক ইতিহাসবিদ – যেমন রমেশচন্দ্র দত্ত, যদুনাথ সরকার ইত্যাদি – তাঁদের লেখা ইতিহাসের পাঠে হিন্দু রাজত্বের কথা লিখলেও প্রথম দিকের অসাম্প্রদায়িক (Left/Secular)ভারত সরকার ইতিহাসের পাঠ থেকে হিন্দু রাজাদের মোটামুটি বাইরে রেখেছেন। বিক্রম বলছেন তার ফলে প্রাচীন ভারতের অনেক হিন্দু রাজত্বের উজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের ছাত্রদের গোচরে আসছেনা।

    তর্কের অন্যদিকে Left secular ইতিহাসবিদ রা – যেমন রোমিলা থাপার, রামচন্দ্র গুহ – প্রতিবাদ করে বলছেন মুসলমান invader দের আসার আগে ভারত নানা ছোটখাটো রাজাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে ছিল। মুঘলরা এবং পরে ইংরেজদের  শাসনের ফলে ভারত এক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, ভারতের হিন্দুদের সাথে তাদের মুসলমান বা ইংরেজ শাসকদের কোন বিবাদ ছিলনা ইত্যাদি।

    এর মধ্যে আমি মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদের স্কুলজীবনে ইতিহাসে কি পড়েছিলাম তা মনে করার চেষ্টা করি।                 

    আমাদের স্কুলে (সেন্ট লরেন্স, বালীগঞ্জ, কলকাতা) ইতিহাস পড়াতেন খান স্যার । সাধারণ দোহারা চেহারা, পরনে সাদা সার্ট আর ধুতি, কালো ফ্রেমের চশমার পিছনে উজ্জ্বল দুটো চোখ। ইতিহাস ছিল তাঁর passion ।

    যতদূর মনে পড়ে আমাদের ইতিহাসের বইতে বহিরাগত মুসলমান শাসকদেরই প্রাধান্য ছিল বেশী। তবে রাণা প্রতাপ, শিবাজী, চন্দ্রগুপ্ত, অশোক দের কথাও পড়েছি। তবে তাদের মোটামুটি সকলকেই minor player হিসেবে ই দেখানো হতো। চোলা বা বিজয়নগর সাম্রাজ্য সম্বন্ধে তো আমাদের কিছুই পড়ানো হয়েছে বলে মনে পড়েনা।

    আর প্রায় প্রত্যেক যুদ্ধেই হিন্দু রাজাদের হার হতো – এখনকার হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসের ছাত্র – বিক্রম সম্পথ আর স্বপন দাশগুপ্তদের –  এই আপত্তি খুব একটা ভুল বোধ হয় নয়।  আমাদের বাংলার ইতিহাসেও সেন আর পাল বংশ এবং পরে বারো ভুঁইয়া দেরও দেখানো হয়েছে মুঘল বা ইংরেজদের বিরুদ্ধে পরাজিত হিসেবে।

    হিন্দু রাজাদের পরাক্রম, সাহস আর বিদ্রোহের কথা আমাদের স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে খুব বেশী নেই, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মারাঠাদের কথা, বাঙলায় সশস্ত্র আন্দোলন, সিপাহী বা নৌবিদ্রোহ কেও খুব একটা মাহাত্ম্য দেখানো হয়নি। গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনের জন্যেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি এই কথাই আমরা জানি।

    এখন এই হিন্দুত্ববাদীদের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে যে আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সশস্ত্র আন্দোলন এবং প্রাণ বিসর্জ্জন কে আমাদের ইতিহাসে যথাযোগ্য সন্মান জানানো হয়নি। স্বাধীনতার জন্যে ভগত সিং, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মত নেতাদের অবদানের নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।

    আমাদের ছোটবেলায় এই সব বিতর্ক আর বিবাদ ছিলনা।         

    খান স্যার বড় ভালো পড়াতেন, আকবর, বীরবল, শিবাজী, আফজল খাঁ রা সবাই তাঁর পড়ানোর মধ্যে দিয়ে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠতেন। তিনি হলদিবাড়ী বা পানিপতের যুদ্ধের কথা পড়াবার সময় আমরা তলোয়ারের ঝনঝন আওয়াজ, আহত সৈনিকদের আর্তনাদ, ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাক যেন কানে শুনতে পেতাম। নিজেকে আমি মাঝে মাঝে নিজেকে সেই যুদ্ধের মধ্যে এক অনামী সৈনিক বলেও ভেবেছি।  


    খান স্যারের সবই ভালো ছিল, কেবল মাঝে মাঝে হঠাৎ আমরা পড়ায় মনোযোগ দিচ্ছি কিনা পরীক্ষা করার জন্যে দুমদাম প্রশ্ন করে বসতেন। একটু অমনোযোগী হলেই আমরা ঠিক ওনার কাছে ধরা পড়ে যেতাম।

    তো একবার মনে পড়ে ক্লাসে বারো ভুইঁয়া দের সম্বন্ধে পড়াচ্ছেন খান স্যার। আমি সেদিন তৈরী হয়ে আসিনি, তাই খান স্যারের চোখের দিকে তাকাচ্ছি না, পাছে আমায় কোন প্রশ্ন করে বসেন। খান স্যার বুঝতে পেরে আমায় বল্লেন “ইন্দ্রজিৎ, তুমি তো ভৌমিক, তাই না? তার মানে তুমি নিশ্চয় কোন বারো ভুঁইয়ার বংশধর। আচ্ছা, তুমি বলো তো…

    সব্বোনাশ!

    যা ভয় পাচ্ছিলাম, তাই!  

    ভৌমিক হয়ে জন্মাবার জন্যে বেশ দুঃখ হয়েছিল সেদিন। ঘোষ বোস মিত্র বা মুখুজ্যে বাঁড়ূজ্যে হলেও এই বিপদে পড়তে হতোনা আমায়।

  • মামা, কাটবো?

    মনোহরপুকুর, বোধহয় ১৯৫৭ সাল।

    দিদিভাই আমাদের ছোটদের নিয়ে বাড়ির বড়ো বারান্দায় একটা সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। উপলক্ষ্যটা ঠিক মনে নেই। রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী  কিংবা বসন্ত উৎসব হবে হয়তো।

    প্ল্যান হলো দিদিভাই ব্যাকস্টেজ থেকে রবীন্দ্রনাথের “পূজারিণী”  কবিতাটা আবৃত্তি করবে আর তার  সাথে আমরা স্টেজে কবিতাটার একটা নাট্যরূপ অভিনয় করব। এর সাথে থাকবে কিছু গান, আবৃত্তি, আর আবহসঙ্গীত।

    আমাদের সকলের তো খুব উৎসাহ। রোজ বিকেলে ছাতে গান আর নাটকের রিহার্সাল চলে। “ওরে ভাই ফাগুণ লেগেছে বনে বনে” গানটা দিদিভাই এর কাছ থেকে আমরা শিখে নিয়েছি।

    নাটকে চারজন চরিত্র।

    আমি হলাম “নৃপতি বিম্বিসার”, প্রথম সীনে – “নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইল পদনখকণা তার”- আমি বুদ্ধের মূর্ত্তির সামনে গিয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে যাব।  

    বাবলু হলো বিম্বিসারের ছেলে অজাতশত্রু, সে আবার বুদ্ধকে দু চক্ষে দেখতে পারেনা। সে রাজা হয়ে বুদ্ধের পূজা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, তার রাজত্বে শুধু মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা। বাবলুর প্রথম সীন হলো হাতে একটা রাংতার তৈরী তলোয়ার মাথার ওপর বাঁইবাঁই করে ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ স্টেজে নাচবে। সাথে বাজনা।

    এছাড়া দুজন মেয়ে। এক হলো রাজমহিষী, যার কাজ হলো শুধু সাজগোজ করা, ওই পার্টটা করেছিল সামনের বাড়ীর অপুমাসী র মেয়ে টুটু।  আর একজন “শ্রীমতী নামে সে দাসী” সেটা করেছিল দিদিভাইয়ের বন্ধু গৌরীদির বোন বাসন্তী। ওরা আমাদের পাড়াতেই থাকতো। দাসী শ্রীমতী কে রাজমহিষী অনেক বারণ করা সত্ত্বেও সে বুদ্ধদেবের পূজো করবেই। শেষ সীনে সে যখন পূজো করছে তখন অজাতশত্রু এসে তার গলা কেটে তাকে মারবে।

    মোটামুটি এই হলো নাটক।

    বাবলু কে পই পই করে বলে দেওয়া হয়েছে যে তলোয়ার দিয়ে গলা কাটার timing  টা ভীষন important, ও শ্রীমতীর গলার কাছে তলোয়ার নামানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝ্যাং করে একটা বাজনা বাজবে আর স্টেজ অন্ধকার হয়ে যাবে। বাবলু তাই ওই সীন টা নিয়ে বেশ চিন্তিত।

     ২

    নাটকের দিন বারান্দায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসার জায়গাতে স্টেজ বানানো হয়েছে। জ্যেঠিমার ঘর হলো গ্রীনরুম। সেখানে আমাদের সব সাজগোজ করিয়ে দিয়েছে দিদিভাই। চায়ের ঘরটা হলো উইংস। সেখানে ভালোকাকীমার ভাই শ্যামলমামা দাঁড়িয়ে। তিনি হলেন ব্যাকস্টেজ ম্যানেজার।

    স্টেজের সামনে বারান্দায় চাদর পাতা, একটু একটু করে সেখানে বেশ ভীড় জমে গেল। অনেকে এসেছে। তাদের মধ্যে আত্মীয়রা আছেন, আর পাড়ার ও অনেকে নিমন্ত্রিত।

    প্রথম আর্টিস্ট পলা । সে হলো ভজা জ্যেঠুর ভাই পূজা জ্যেঠুর মেয়ে। তখন পলার কতোই বা বয়েস? বারো কি তেরো হবে। লাল রং এর ডুরে শাড়ি, আঁট করে চুল বাঁধা, চোখ নাচিয়ে হাত ঘুরিয়ে বেশ গিন্নীর মতো পলা “হাইস্যো না কো বাবুরা, বুড়া আমায় মারিসে” বলে একটা কবিতা সুন্দর ঝরঝর করে আবৃত্তি করল। She was a big hit, প্রচুর হাততালি পড়ল দর্শকদের কাছ থেকে।

    তারপর আমাদের কোরাসে “ওরে ভাই ফাগুণ লেগেছে বনে বনে” গান। সেটাও মোটামুটি ভালোই উতরে গেল।

    তারপর শুরু হলো নাটক। সেটাও ভালোই এগোচ্ছিল, কিন্তু বাবলুর লাস্ট সীনে গিয়ে একটু কেলো হয়ে গেল। দোষ অবশ্য বাবলু কে দেওয়া যায়না। আগেই বলেছি ওই গলা কাটার timing টা নিয়ে ওর বেশ চিন্তা ছিল। যদি তলোয়ার নামানোর সময় ঝ্যাং করে বাজনাটা না বাজে, যদি স্টেজ অন্ধকার না হয়?

    বাবলু তাই রাংতার তরোয়াল মাথার ওপর ধরে দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। ওদিকে শ্যামলমামাও (যার কাজ হলো ঝ্যাং বাজনা টা বাজানো আর স্টেজে আলো নেবানো), বসে আছেন বাবলুর তরোয়াল নামানোর অপেক্ষায়।

    বেশ কিছুক্ষণ এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর বাবলু উইংসে দাঁড়ানো শ্যামলমামা কে জিজ্ঞেস করেছিল, “মামা, কাটবো?”

    প্রশ্নটা বেশ উঁচু গলায় জোরেই করতে হয়েছিল বাবলুকে, কেননা উইংস টা ছিল স্টেজের মাঝখান থেকে বেশ দূরেই। ফলে ওর ওই কথাটা হল শুদ্ধ সবাই শুনে ফেলে।

    তার পর থেকে বহুদিন বাবলুকে “মামা কাটবো?” বলে খ্যাপানো হয়েছে।

    মনোহরপুকুরের বাড়ীর ইতিহাস যদি কোনদিন লেখা হয় তাহলে এই গল্পটা তার মধ্যে স্থান পাবে নিশ্চয়।

  • সুতা হ্যায় সুতা?

    ইদানীং আমাদের দেশে বাংলায় কথা বললে বাংলার বাইরে বাঙালীদের হেনস্থার কথা শোনা যাচ্ছে। নীচের এই গল্পটা তাই নিয়ে, যদিও এটা অনেক দিন আগের কথা, তখন দেশে বাঙালীদের এত হেনস্থা হতোনা।

    মাধবকাকা ছিলেন আমাদের বাবা কাকাদের পিসতুতো ভাই।  তাঁর মা অর্থাৎ আমাদের বাবাদের পিসীমা ছিলেন  দাদুদের একমাত্র এবং সবচেয়ে ছোট বোন, এবং তাই তাঁর দাদাদের খুব আদরের। তাঁর বিয়ে হয় কলকাতার কাছে  উত্তরপাড়ার লাহিড়ী পরিবারে। তাঁর সন্তানদের মধ্যে মাধবকাকা – মেজ ছেলে – কোন কারণে আমাদের পরিবারের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।  তাঁর হাসিখুশী  সুন্দর স্বভাবের জন্যে বাবা কাকারা এবং মা কাকীমারা সবাই মাধবকাকাকে খুব স্নেহ করতেন।

     মাধবকাকা আমাদের পরিবারের  সকলের খুব প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। এই গল্পটা তাঁকে নিয়ে। তবে এর কতটা সত্যি আর কতটা বানানো, আমি জানিনা।  

    ————————–

    মাধব কাকা দিল্লী বেড়াতে এসে তাঁর মামাতো দাদা আমাদের নিখিল জ্যেঠুর Green Park Extension এর বাড়ীতে উঠেছেন।  নিখিল জ্যেঠুর স্ত্রীর নাম শুভা, আমরা ছোটরা তাঁকে শুমা বলে ডাকি।

    দিল্লী শহরে কত কি দেখার আছে, কুতুব মিনার, লাল কেল্লা, জামা মসজিদ। এই সব জায়াগা গুলো ভাল করে দেখার জন্যে মাধবকাকা একাই রোজ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েন, সন্ধ্যায় ফেরেন।

    একদিন সকালে মাধবকাকা বাইরে বেরোবেন, এমন সময়  শুমা বল্লেন “মাধব ঠাকুরপো, আপনার জামার দু’টো বোতাম খুলে গেছে দেখছি, আপনি আজ ফেরার সময় দোকান থেকে একটু সুতো কিনে আনবেন তো, আপনার জামার ওই বোতাম দু’টো আমি সেলাই করে দেবো।”

    এ দিকে হয়েছে কি, মাধবকাকা হিন্দী টা ভালো জানেন না। সুতোর হিন্দী কি? মাধবকাকা র কেবল মনে পড়ছে “রসসি”! কিন্তু রসসি মানে তো দড়ি? একটা দোকানে ঢুকে মাধবকাকা জিজ্ঞেস করলেন “রসসি  হ্যায়, রসসি?” তারপর আর একটু ভালো করে বোঝাবার জন্যে বল্লেন “পাতলা রসসি, সেলাই করনে কে লিয়ে!”

    দোকানদার এর মাথায় কিছুই ঢুকলোনা।

    তারপর আর একটা দোকান। মাধবকাকা ভাবলেন সংস্কৃত টা হিন্দীর কাছাকাছি, হয়তো “রজ্জু” বললে বোঝানো যাবে। দোকানদার যদি উপনিষদ পড়ে থাকে তাহলে “রজ্জুতে সর্পভ্রম” কথাটা জানে নিশ্চয়। মাধবকাকা সেখানেও অনেক কষ্ট করে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। “সেলাই করনে কে লিয়ে পাতলা সরু রজ্জু হ্যায় ?” কিন্তু দোকানদার দের সংস্কৃত জানা নেই, উপনিষদ পড়া তো দূরের কথা।

    দোকানে দোকানে ঘুরে ব্যর্থমনোরথ ক্লান্ত মাধবকাকা শেষে একটা দোকানে ঢুকে ভাবলেন নাঃ, বাংলাতেই চেষ্টা করা যাক। সুতো কথাটা যতোটা পারা যায় হিন্দী তে উচ্চারণ করে মাধবকাকা দোকানদার কে বললেন “সুতা হ্যায়,সুতা?”

    দোকানদার ভদ্রলোক একটু হেসে পরিস্কার বাংলায় বললেন “দাদা, আপনি সুতো চান তো? বাংলা তে ই বলুন না,আমরা এখানে সবাই তো বাঙালী”।

  • জ্যেঠুর দর্জির ব্যবসা

    আমাদের বাবা কাকাদের কারুর ব্যবসাতে তেমন এলেম ছিলোনা। প্রায় সবাই সরকারী চাকরী করেই জীবন টা কাটিয়ে গেছেন। জ্যেঠু (প্রিয়বন্ধু) আর ভালকাকা (শ্যামলবন্ধু) ছিলেন ভাইদের মধ্যে ব্যতিক্রম।

    শুনেছি চশমার দোকান খোলার আগে জ্যেঠু নাকি একবার দর্জির দোকান খুলেছিলেন। এদিকে বাড়ীর ঠাকুর (রান্নার লোক) এর একটা পাঞ্জাবীর খুব সখ। সে এসে জ্যেঠুকে ধরলো। দাদাবাবু, আপনি আমায় একটা পাঞ্জাবী বানিয়ে দেবেন?

    জ্যেঠু বললেন, ঠিক আছে, অসুবিধে নেই। No problem ।

    সেই ঠাকুর ছিল একটু সৌখীন মানুষ। সে তার দাদাবাবুর কাছে আব্দারের ভঙ্গীতে বললো পাঞ্জাবী র গলার বোতাম লাগাবার জায়গাটা মাঝামাঝি না হয়ে যেন একটু বাঁ দিকে হয়। ওটা ই নাকি latest fashion!

    পাঞ্জাবী তৈরী হয়ে এলো। জ্যেঠু বেশ গর্ব্বের সাথে ঠাকুর কে বললেন নাও, তোমার পাঞ্জাবী। এবার খুশী তো?

    কিছুক্ষণ পরে ঠাকুর মুখ শুকনো করে এসে হাজির।

    আবার কি হলো?

    ঠাকুর বললো, দাদাবাবু হাতা দুটো যে ছোট বড়ো হয়ে গেছে।

    জ্যেঠু নাকি খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, তোমার সখ তো কম নয়? বোতাম বাঁ দিকে চাই, আবার হাতা দুটো ও সমান হতে হবে?

    বলা বাহুল্য, জ্যেঠুর ওই দোকান টা বেশী দিন চলেনি।

  • ছোটকাকার ফুলশয্যা

    ছোটকাকার বিয়ে হয় ১৯৫৬ সালে, তখন আমার ক্লাস ফাইভ, এগারো বছর বয়স।

    পাটনার কাছে দানাপুরে ছোটকাকীমার বাপের বাড়ি, বিয়েটা পাটনা থেকেই দেওয়া হয়। কিন্তু বৌভাত হয়েছিল মনোহরপুকুরে। পাটনা থেকে সবাই এসেছিলেন। দিদা, রাঙ্গাকাকা, সোনাকাকা, বড়মা, রাঙ্গাকাকীমা, সোনাকাকীমা, কৃষ্ণা, শুক্লা এবং আরো অনেকে। সারা বাড়ি আনন্দ উত্তেজনায় কয়েকদিন বেশ সরগরম হয়েছিল। 

    বৌভাতের পর ফুলশয্যা যেদিন হবে সেদিন সকাল থেকে বাড়িতে বিশাল হৈ হৈ। বিশেষ করে ভালোকাকা আর সোনাকাকার উৎসাহ সবচেয়ে বেশী। লেক মার্কেট থেকে প্রচুর ফুল কিনে আনা হয়েছে, সেই ফুল দিয়ে দুই ভাই মাঝের ঘরের খাট সাজাতে বসে গেছেন।

    এদিকে ছোটকাকা কিছুটা লজ্জা লজ্জা মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কাকীমারা সবাই তাঁর সাথে নানারকম মজা করে কথা বলছেন, সবচেয়ে বেশী পিছনে লাগছেন বড়মা। আর ওদিকে ছোটকাকীমা নতুন বৌ, তিনি ঘোমটার আড়ালে প্রায় সারা মুখ ঢেকে এক কোণে বসে আছেন। আমরা ছোটরা নতুন কাকীমার সাথে কখন আলাপ হবে সেই আশায় বসে আছি। নতুন অতিথি কে নিয়ে আমাদের মনে প্রচন্ড কৌতূহল। কিন্তু আমরা তেমন পাত্তা পাচ্ছিনা।

    ফুলশয্যা ব্যাপারটা যে কি সে বিষয়ে আমার কোন ধারণা নেই, কেবল বুঝতে পারছি যে ব্যাপারটা বেশ ধুমধাড়াক্কা কিছু হবে, একটা বেশ জমকালো পারিবারিক উৎসব, ছাতে উঠে তুবড়ী আর বাজী পোড়ানো হতে পারে, বাতাসা ছুঁড়ে বারান্দায় হরির লুঠ হতে পারে, গান বাজনার অনুষ্ঠান হতে পারে। মোটমাট যাই হোক না কেন, এটা ঠিক ই বুঝতে পারছি যে ফুলশয্যা কিছুতেই মিস করা চলবেনা।

    এদিকে হয়েছে কি, সারা সকাল ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হয়ে দুপুরে খাবার পর বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম যখন ভাঙলো তখন সন্ধ্যা, বাইরে ক্রমশঃ অন্ধকার নেমে আসছে।

    ঘুম থেকে উঠেই মনে হল এই রে, নির্ঘাত ঘুমিয়ে ফুলশয্যা টা মিস করে ফেললাম! ইস্‌, কোন মানে হয়?

    আমি মাকে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করেছিলাম “মা, ফুলশয্যা কি হয়ে গেছে?”

    আমার সেই কথা শুনে সারা বাড়ীর লোক নাকি খুব হাসাহাসি করেছিল।

    শোনা যায় যে বড়মা নাকি রাত্রে মাঝের ঘরে খাটের তলায় লুকিয়ে বসেছিলেন, কিন্তু ছোটকাকা ঠিক তাঁকে ধরে ফেলেন। অবশ্য ছোটকাকা তাঁকে ধরে ফেলেন না বড়মা লজ্জা পেয়ে নিজে থেকেই ধরা দেন, তা আর এখন জানা সম্ভব নয়।

  • ভালোকাকার হিন্দী

    মনোহরপুকুরের বাড়িতে আমাদের ছোটবেলায় কোন ফোন ছিলনা। চাইলেও তখন ফোনের লাইন পাওয়া যেতোনা। Calcutta Telephones এ apply  করে লাইন পেতে বছর দশেক অপেক্ষা করতে হতো। কিংবা তারও বেশী।  

    সেই সময় ফোন থাকতো বনেদী বড়লোকদের বাড়িতে, কিছুটা Status symbol এর মতো। তেমন কোন emergency  হলে আমরা রাস্তার উল্টোদিকে হাঁদুবাবুদের বাড়িতে যেতাম ফোন করতে। আর মাঝে মাঝে ওই বাড়ি থেকে হাঁক পাড়তেন কেউ, “তোমাদের ফোন!”

    আজকে এই সবার হাতে সেলফোন থাকার যুগে এক কালে ফোন ছাড়া কি করে আমরা জীবন কাটিয়েছি ভাবলে বেশ অবাক ই লাগে।      

    আশির দশকে অজিত হালদার নামে একজন ডাক্তার আমাদের নীচের বাড়িতে ভাড়া থাকার সময় একটা ফোনের লাইন এর বন্দোবস্ত করেছিলেন। ডাক্তার হিসেবে হয়তো উনি হয়তো priority পেয়ে থাকবেন। যাই হোক, ওঁরা চলে যাবার পর ওই লাইনটা থাকায় ভালোকাকা একটা ফোনের কানেকশন পেয়ে যান। তার পর থেকে আমরা ফোন করতে হলে নীচের বাড়ি থেকেই করতাম।

    কুয়েত থেকে সপ্তাহে একদিন মাকে ফোন করতাম। চৈতী নীচ থেকে মা’কে চেঁচিয়ে ডাকতো, “সেজমা, মান্টুদার ফোন!” কিছুক্ষণ ফোন ধরে অপেক্ষা করতে হতো, তারপর মা নীচে নেমে এসে ফোন ধরতেন।

    মাঝে মাঝে চৈতী বা ভালোকাকীমা না থাকলে ভালোকাকা এসে ফোন ধরতেন। আর ধরেই কেন জানিনা হিন্দীতে কথা শুরু করে দিতেন।

    “কৌন বোল রহেঁ হ্যায়?” কিংবা, “কিসকো চাহিয়ে?” ইত্যাদি।

    ভালোকাকার কাছে ব্যবসা সূত্রে অনেক অবাঙ্গালী লোকের ফোন আসতো বোধ হয়। তাছাড়া টিভি তে অনবরত হিন্দী সিরিয়াল আর হিন্দি ছবি দেখার ও প্রভাব একটা ছিল হয়তো।

    ভালোকাকার হিন্দী শুনে আমি বেশ বিব্রত বোধ করতাম মনে আছে। লাইন ও বেশীর ভাগ দিন বেশ খারাপ থাকত, বার বার “ভালোকাকা, আমি মান্টু” বললেও ভালোকাকা আমার কথা না শুনতে পেয়ে কেবল “কৌন?” “কৌন?” বলে যেতেন।

    দুচ্ছাই বলে মাঝে মাঝে বেশ ব্যগ্র ইচ্ছে হতো বলি, “ভালোকাকা, ম্যায় মান্টু, কুয়েত সে ফোন কর রহা হুঁ, মাজী কো যরা বুলা দিজিয়েগা?”

    বলিনি অবশ্য কোনদিন।

  • গোবিন্দ

    কয়েকমাস আগে দিল্লী গিয়েছিলাম।

    শুনেছিলাম  East of Kailash এ ISKCON এর মন্দির, তার পাশে গোবিন্দ (Govinda) বলে একটা Vegetarian restaurant আছে, সেখানে খাবারটা নাকি বেশ ভাল।

    তো ওইদিকে একটা কাজে গিয়েছিলাম, ভাবলাম মন্দিরটা দেখেই যাই, আর তাহলে গোবিন্দতে গিয়ে খেয়েও আসা যাবে।

    নিরামিষ খাবারই আজকাল ভাল লাগে খেতে।

    যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় দুটো বাজে, মন্দির বন্ধ, চারটে তে খুলবে, কিন্তু restaurant খোলা। আমরা ভেতরে গিয়ে বসলাম। বেশ বড় Air-conditioned হল, অনেক চেয়ার টেবিল, ওই সময়ে মোটামুটি খালি।

    একপাশে বিরাট Buffet এর আয়োজন, আর হলের ভেতরে কিছু সাত্ত্বিক ধরণের লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের সবার পরণে সাদা ধুতি কামিজ, কপালে বড় সাদা তিলক, দেখে মনে হয় সবাই পূজারী ব্রাম্ভণ, পূজো করতে করতে উঠে এসেছে কিংবা একটু পরেই পূজো করতে যাবে!

    তাদের মধ্যে থেকে একজন ভক্ত হনুমানের মত হাত জোড় করে সামনে এসে দাঁড়ালো।

    এই কি waiter নাকি?

    সত্যিই তাই, দেখা গেল এখানে waiter দের ওটাই uniform!

    যাই হোক খাওয়া দাওয়া ভালই হলো। শেষ করে বিল মিটিয়ে উঠবো ভাবছি, এমন সময় এক ভদ্রলোক, দেখেই বোঝা যায় বাঙ্গালী, গলায় একটা মস্ত বড় ভিক্ষার ঝুলি, কপালে বিরাট তিলক, মনে হলো ইনি বোধহয় Restaurant এর Manager, আমাদের দেখে কাছে এসে একগাল হেসে হাত জোড় করে অত্যন্ত বিনয়ী অমায়িক ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করলেন, “খানা ক্যায়সা লাগা?”

    সুভদ্রা বললো, “খুব ভাল লাগা, আপনি বাঙ্গালী?”

  • খোকনের মোবাইল চুরি

    কিছুদিন আগে একটা কাজে কালীঘাট থানায় যেতে হয়েছিল।

    সেখানে ডিউটি অফিসারের টেবিল এর কাঁচের তলায় মুক্তোর মত সুন্দর হাতের লেখায় দেখি একটা মোবাইল চুরির দরখাস্ত।

    মহাশয়, অমুক তারিখে অমুক জায়গায় আমার মোবাইল ফোন (নং অমুক) চুরি হইয়াছে।

    লিখেছেন কোন এক কাজল মুখার্জ্জী।

    নীচে ইংরেজিতেও লেখা।

    ওটা যে একটা sample চিঠি সেটা প্রথমে বুঝিনি।

    বুঝলাম একটু পরেই যখন তিন জন ছেলে এসে বলল তাদের একজনের মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে গেছে একজন লোক।  কে সে, কেমন করে চুরি করলো, তারা অসাবধান হয়েছিল কিনা, ইত্যাদি অনেক প্রশ্নোত্তর চলল বেশ কিছুক্ষণ।

    ডিউটি অফিসারের যুক্তি হল অসাবধান হয়ে থাকলে দোষটা তাদের। তারাও সেটা দেখলাম স্বীকার করে নিল।

    তাতে খুসী হয়ে ডিউটি অফিসার ওদের কাজল মুখার্জ্জীর লেখা sample application দেখিয়ে বললেন,  “ঠিক এই ভাবে লিখে নিয়ে এসো তারপরে দেখবো। ”

    ওদের কাছে কাগজ পেন নেই, চাইলে তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন।

    “চিঠির draft করে দিচ্ছি এই না কত। তার ওপরে আবার বাবুদের কাগজ আর পেন দিতে হবে! হুঁ! আবদার! এটা কি থানা না মামাবাড়ী? যাও যাও নিয়ে এসো, আমার এখানে কাগজ পেন কিছু নেই। ”

    মোবাইল ফোন চুরি, যা বুঝলাম খুব common এখন।

    আজকাল একটা মোবাইল ফোন চুরি মানে হলো প্রায় সর্বস্ব চুরি যাওয়া।  সেখানে জীবনের বহু ব্যক্তিগত এবং মহামূল্যবান তথ্য এবং ছবি রাখা থাকে।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সব তথ্য ছবি ইত্যাদির কোন back up থাকেনা।  অতএব একবার ফোন হারিয়ে গেলে সেই মূল্যবান তথ্য আবার খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব , এবং যদিও বা সেই সব  যোগাড় করা সম্ভব হয় তার জন্যে ব্যাপক কাঠখড় পোড়াতে হবে এবং অনেক সময়  লাগবে।  এমন কি বছর খানেক বা তার বেশীও লেগে যেতে পারে।

    এখন আমরা আছি Information age এ, এখন তথ্যই হলো সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু (Asset)।

    এই নিয়ে একটা গল্প নীচে।

    খোকন আমার ভাই।

    ———–

    কাস্টমস ক্লাব থেকে একদিন সন্ধ্যায় খোকন বাড়ি ফিরছে, হাওড়া ইউনিয়ন মহামেডান ক্লাবের ঘেরা মাঠ ছাড়িয়ে রাস্তা পেরিয়ে মনুমেন্টের পাশে গিয়ে ট্রাম ধরবে, আর না পেলে আর একটু এগিয়ে বাস বা মিনিবাস।

    ক্রমশঃ অন্ধকার নামছে, ময়দানের ওই জায়গাটা বেশ নির্জন। হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন কিছুটা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল ~ আপনার কাছে কি একটা মোবাইল ফোন আছে, দাদা?

    কে রে বাবা?

    খোকন তাকিয়ে দেখে পাশে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে, বেশভূষা দেখে গ্রামের ছেলে বলে মনে হয়, গায়ের রং কুচকুচে কালো, কথাবার্ত্তায় আর উচ্চারণে একটা টান আছে যা ক্যানিং বা লক্ষীকান্তপুরের লোকেদের গলায় শোনা যায়। 

    ফোন আছে শুনে ছেলেটি প্রায় কেঁদে ফেলে বলল, আমার বাবার বড় অসুখ দাদা, আজ তেনাকে হাসপাতালে ভর্ত্তি কইরেছে, দয়া কইরে একটু ফোন টা দ্যান,আমি একটু বাবার সাথে কথা কই?”

    এতো বড় বিপদ হল! খোকন ভাবলো এ এখন বাবার সাথে কতক্ষণ কথা বলবে কে জানে?

    ছেলেটা বাজে কথা বলছেনা তো? একটু বাজিয়ে দেখবার জন্যে খোকন বলল “কি নাম্বার তোমার বাবার, আমি ফোন করে দেখছি, লাইন পাওয়া যায় কিনা।”

    ছেলেটা যে নাম্বার বলল তাতে রিং হতে খোকন ছেলেটাকে ওর ফোন টা দিয়ে বললো, “নাও কথা বলো।”

    ছেলেটা কান্নায় ভেঙে পড়ে বেশ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তার বাবার সাথে কথা একতরফা কথা বলতে লাগলো। তার কথাগুলো অনেকটা এরকম (খোকন বেশ ভাল নকল করে, আমি অতটা পারবোনা)~

    “বাবা গো, তুমি কেমন আছো গো, তুমি হাসপাতালে কেন গেলে গো, তোমার কি হইয়েছে গো, আমি এখুনি তোমার কাছে আসতেছি গো…”

    তার এই আকুলি বিকুলি কান্না দেখে খোকন বেশ একটু অপ্রস্তুত হল, ছেলেটিকে সন্দেহ করেছিল বলে তার মনে একটু দুঃখ আর লজ্জাও হল, কিন্তু তার পরে যা ঘটল তার জন্যে সে একেবারেই প্রস্তুত ছিলনা।

    “আমি  এখুনি তোমার কাছে আসতেছি গো…আমি দৌড়ি দৌড়ি আসতেছি গো” বলতে বলতে ছেলেটি পাঁই পাঁই করে ছুট!

    খোকন “আরে আরে কোথায় যাচ্ছো আমার ফোন দিয়ে যাও” বলতে বলতে ওর পিছনে ধাওয়া করেও কোন লাভ হলনা, এই বয়সে একটা অল্পবয়েসী ছেলের সাথে দৌড়ে কেউ পারে নাকি? তার ওপরে আবার গ্রামের ছেলে!

    ইউসিন বোল্টের মত তীরবেগে ছুটে ছেলেটা ময়দানের অন্ধকারে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল।  খোকনের ফোন কানে ধরে তার বাবার সাথে কেঁদে কেঁদে কথা বলতে বলতে সে উধাও হয়ে গেল।

  • কাজের লোক

    মনোহরপুকুরের বাড়ী ছেড়ে দেবার পরে জ্যেঠিমা দিদিভাই এর কাছে থাকতেন। আমি দেশে গেলে নিয়ম করে তাঁর সাথে দেখা করতে যেতাম। জ্যেঠিমা থাকতেন দিদিভাইদের বাড়ির এক তলার একটা ঘরে। জ্যেঠিমা তখন বিছানায় শয্যাশায়ী। উঠে বসতে পারতেন না। আমায় দেখে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। অনেক পুরনো দিনের কথা হতো আমাদের।

    দিদিভাই এর বাড়ীতে অনেক কাজের লোক, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে জ্যেঠিমাকে দেখাশোনা করার জন্যে। আমরা জ্যেঠিমা কে দেখতে গেলে সেই কাজের লোকেরা আমাদের খুব দেখভাল করে। চা করে নিয়ে আসে, আর আমাদের গল্প করার সময় চুপ করে পাশে বসে থেকে খুব উৎসাহ নিয়ে আমাদের কথা শোনে।

    তো একবার আমি আর সুভদ্রা গেছি জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে। দিদিভাই গেছে ওপরে আমাদের জন্যে চা নিয়ে আসতে। আর জ্যেঠিমার দু’জন কাজের লোক পাশে বসে আমাদের কথা শুনছে। তাদের মধ্যে একজনের গলা একটু ফ্যাঁসফ্যাঁসে,ভাঙা।

    আমাদের সেদিন বোধহয় একটু তাড়া ছিল কোথাও যাবার, দেরী হয়ে গিয়েছিল তাই সুভদ্রা বেশ কয়েক বার “এবার আমরা উঠি” বলে তাড়া দিচ্ছিল।

    সুভদ্রা যেই বলে “এবার আমরা উঠি”,  ওমনি ওই  ফ্যাঁসফ্যাঁসে,ভাঙা গলার মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “না গো,এখন যেউনি, একটু বোসো গো বৌদি, দিদি এই চা করে নিয়ে এলো বলে!”

    এই রকম বার তিনেক হবার পরে, যেই ওই মেয়েটি আবার বলেছে “নাঁ গোঁ বৌঁদি, যেঁওনাকো”, সুভদ্রার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বোধ হয় অনেকক্ষণ থেকেই তার মেজাজ টা চড়ছিলা, আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। সুভদ্রা হঠাৎ দুম করে রেগে গিয়ে মেয়েটাকে এক ধমক দিয়ে বললো, “তুমি চুপ করো! তখন থেকে খ্যাঁকখ্যাঁকে গলায় চেঁচিয়ে যাচ্ছো!”

    সেই ধমক খাবার পর থেকে যতক্ষণ ছিলাম, মেয়েটা চুপ করে বসে ছিল, একটা কথাও বলেনি।

    পরের বার যখন জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে গেলাম, শুনলাম সেই  মেয়েটি নাকি চাকরী ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেছে।

  • পার্থর জ্যাকেট

    পার্থর বাড়ীতে নেমন্তন্ন থাকলে সেখানে আমাদের দু’টো প্রধান আকর্ষন।

    এক হলো সিঙ্গল মল্ট্‌। আর দুই মণিকার দুর্দ্দান্ত রান্না আর elaborate menu…তার সাথে অবশ্যই ওদের দুজনের আন্তরিক আতিথেয়তা।

    তো একবার এইরকম একটা নেমন্তন্নে গিয়ে হুইস্কির গ্লাস নিয়ে আমরা ক’জন আরাম করে পার্থদের বাড়ীর সুদৃশ্য ড্রয়িং রুমে নরম সোফায় গা ডুবিয়ে বসে আছি।

    KOC র  চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পার্থ সম্প্রতি  একটি মহামূল্য Apple I Phone উপহার পাবার গল্প করছে।  সে এক অদ্ভুত ফোন, কত কি যে তার ফিচার, পার্থ আমাদের সেই সব  বুঝিয়ে বলছে, কি দারুণ ক্যামেরা, কত মেগা পিক্সেল, কতগুলো সিমকার্ড।  ইত্যাদি ইত্যাদি।  এবং সেই ফোনের ভেতরে রাখা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে তার উপহার পাবার ছবিও সে আমাদের দেখাচ্ছে, যাতে আমরা তার কথা বিশ্বাস করি।  

    পার্থর মুখ গর্ব্বে জ্বলজ্বল করছে, তার সাফল্যে আমরা বন্ধুরাও খুব খুসী।  চেয়ারম্যানের হাত থেকে উপহার পাওয়া খুব কম লোকের ভাগ্যেই থাকে।  বন্ধুর ভাগ্যে আর সাফল্যে আমরাও গর্বিত।

    কিন্তু এর মধ্যে পার্থর একটা নতুন জ্যাকেট হারিয়ে গেছে বলে তার মন খুব খারাপ। কি করে হারালো, আমরা জানতে চাইলাম।

    আর বোলোনা, পার্থ বললো, মণিকা আর আমি নিউ ইয়র্কে সেন্ট্রাল পার্কে গিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি জ্যাকেটটা নেই। কোথায় গেল? চারিদিকে আশে পাশে অনেক খুঁজলাম। কোথাও নেই।

    তুতু বললো নতুন জ্যাকেট?

    পার্থ বলল আরে ভাই, of course – brand new! হুম্‌!

    সব কথার প্রথমে “আরে ভাই”, আর শেষে  “হুম্‌” বলা পার্থর একটা অভ্যেস।

    হুম্‌ কথাটা মাঝে মাঝে সন্মতিসূচকও হতে পারে আবার চিন্তাসূচক ও হতে পারে।

    আমি বললাম লেদার জ্যাকেট ছিল নাকি?

    পার্থ বললো আরে ভাই, of course – shining leather! হুম্‌!

    আমি বললাম সত্যি শীতকালে জ্যাকেট হারালে বড় মুস্কিল হয়।  গায়ে  অন্য গরম জামা ছিল।?

    পার্থ বললো আরে ভাই, of course, আমার তো গায়ে ভারী কোট থাকে সব সময়। হুম্‌!

    আমরা সবাই পার্থর জ্যাকেট হারানোর শোকে বেশ মুহ্যমান হয়ে পার্থের গল্প শুনছি আর ভাবছি এই বুঝি পার্থ জ্যাকেটটা খুঁজে পাবে। কিন্তু না, খুঁজে আর পাওয়া গেলনা।

    মিনি  বললো সত্যি নিউ ইয়র্ক শহরটা চোরে ভর্ত্তি।  আর সেন্ট্রাল পার্কে তো চারিদিকে চোর গিজগিজ করছে।

    প্রসূণ আমাদের মধ্যে বেশ প্র্যাকটিকাল, আর ডাক্তার বলে চোরদের মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে তার  বেশ ভাল ধারণা। সে বললো যে চুরি করেছে তার সাইজ যদি তোমার মত হয়, মানে তোমার জ্যাকেট যদি তার গায়ে ফিট করে যায় , তাহলে সে তো জ্যাকেটটা পরে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, কেউ জানবেই না যে ওটা তার নয়।

    তুতু বলল হয়তো বাড়ীতে ফেলে রেখে এসেছিলেন, ফিরে গিয়ে পেলেন?

    পার্ত্থ বললো আরে ভাই, না না জ্যাকেট টা তো নতুন ফোনের বাক্সের মধ্যেই ছিল, তখনো খুলে ফোনে পরানো হয়নি।  কোথায় যে ফেললাম! হুম্‌!

    ও হরি, ফোনের জ্যাকেট!

    আমরা সকলেই সেদিন বেশ আশাহত হয়েছিলাম, কেননা সবাই ভাবছিলাম ওটা একটা গায়ে পরবার জ্যাকেট।

    পার্থের গল্প বলার ভঙ্গীটাই ওইরকম।   শ্রোতাদের কাছ থেকে সম্ভ্রম আদায় করে নেবার ক্ষমতা আছে ওর।

    আমরা কেউই বুঝতে পারিনি যে ফোনের জ্যাকেটের কথা হচ্ছে।