কবি বলেছেন একাকী গায়কের নহেকো গান, গাহিতে হবে দুই জনে। গায়কের সাথে শ্রোতার যে একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে, এ কথা অস্বীকার করা যায়না।
রাজসভায় সবাই কাশীনাথের গান শুনে ধন্য ধন্য করছে কিন্তু বুড়ো রাজার সেই গান শুনে মন ভরেনা, তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধু বরজলালের গান শুনতে চান। এদিকে বরজলালের বয়স হয়েছে, তার গলা কেঁপে যাচ্ছে, সুরও ঠিক ধরছেনা, সভাসদ দের তার গান একেবারেই পছন্দ নয়। কিন্তু রাজা কেবল বরজলালের গানই শুনবেন।
একেই বোধ হয় বলে জেনারেশন গ্যাপ!
আমার শ্বশুর মশায় সুভদ্রা কে বলতেন কি এমন গান গায় তোমাদের লতা মঙ্গেশকার, মা? সে গাইতো আমাদের কাননবালা…
এদিকে সুভদ্রা কিছুতেই তার বাবার কথা মানবেনা। সে বেশ কয়েকবার কাননবালা দেবীর গান শুনেছে, তার মোটেই ভাল লাগেনি। কোথায় লতা মঙ্গেশকার আর কোথায় কাননবালা!
এই নিয়ে সুভদ্রার সাথে তার বাবার তর্ক লেগেই থাকতো।
১৯৮০ র দশকে আসামে “বাঙ্গাল খেদা” আন্দোলনের ফলে দুলিয়াজান এর Assam Oil Company থেকে আসাম থেকে অনেক বাঙালী Geologist, Drilling Engineer, আর Petroleum Engineer কুয়েতে কাজ নিয়ে চলে আসেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন Senior ম্যানেজার ও ছিলেন। আমার বন্ধু সিদ্ধার্থ, তখন যুবক, সেও দুলিয়াজান থেকে কাজ নিয়ে ওই সিনিয়রদের সাথে কুয়েতে আসে। এই সব সিনিয়র দের কেউ তার চন্দদা’, কেউ ওয়াদ্দেদার দা’, কেউ সেনদা’, কেউ চ্যাটার্জ্জী দা’।
এদের মধ্যে চ্যাটার্জী (তপোব্রত) দা’ ছিলেন একজন সঙ্গীতরসিক মানুষ, নিজে ভাল গান গাইতেন, আর গান শুনতে ভালবাসতেন। আর তাঁর প্রিয় গায়ক ছিলেন পঙ্কজ মল্লিক।
Kuwait Oil Company তে দুপুরে এক ঘন্টার লাঞ্চ ব্রেক। সিদ্ধার্থ রোজ চ্যাটার্জীদা’র গাড়ীতে বাড়িতে লাঞ্চ খেতে যায়। আর সারাটা পথ চ্যাটার্জ্জীদা’র গাড়িতে ক্যাসেটে পঙ্কজ মল্লিকের গান বাজে। এদিকে সিদ্ধার্থর প্রিয় গায়ক হলেন কিশোর কুমার। রোজ রোজ গাড়িতে যেতে যেতে পঙ্কজ মল্লিকের নাকি গলায় গান শুনতে তার একেবারেই ভাল লাগেনা। আর বার বার চ্যাটার্জ্জী দা’ তাঁর একটা বিশেষ প্রিয় গান বাজাবেন ই।
পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা/
আঁ আঁ আঁ আঁ/
পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা/
ওই এক গান বার বার শোনা সিদ্ধার্থর কাছে এক বিরাট যন্ত্রণা।
তো রোজ রোজ ওই একই গান শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে সিদ্ধার্থ এক দিন চ্যাটার্জ্জী দা’ কে বলল চ্যাটার্জ্জী দা’, রোজ রোজ আপনার গাড়িতে আমি লাঞ্চ খেতে যাচ্ছি, আজ বরং আপনি আমার গাড়িতে চলুন।
চ্যাটার্জ্জী দা’ স্মিত হেসে বললেন “বেশ, চলো”!
সিদ্ধার্থর গাড়িতে উঠে বসে সীট বেল্ট বেঁধে হঠাৎ চ্যাটার্জ্জীদা’র কি যেন মনে পড়ে গেল। তিনি বললেন একটূ দাঁড়াও তো সিদ্ধার্থ, একটা জিনিষ নিয়ে আসি।
কি জিনিষ?
একটু পরে চ্যাটার্জীদা’ ফিরে এসে সিদ্ধার্থ কে একটা ক্যাসেট দিয়ে বললেন নাও, এটা চালিয়ে দাও, রাস্তায় যেতে যেতে একটু গান শোনা যাক ~
সব্বোনাশ!
আবার সারা রাস্তা ধরে সেই পিঁয়া মিঁলন কোঁ যাঁনা…
সিদ্ধার্থ সেদিন তার বৌ সুমিতাকে বললো কাল থেকে আমায় লাঞ্চ দিয়ে দিও, আমি অফিসেই খেয়ে নেবো।
ভালকাকা কোন কথার মধ্যে প্রায়ই বলতেন “বুঝলি তো” তাই কাউকে “বুঝলি তো” বলতে শুনলেই অবধারিত ভালকাকার কথা মনে পড়ে।
তারাপদ দা’ বলতেন “বুঝতে পেরেছো তুমি?” ওটা তাঁর একটা মুদ্রাদোষ ছিল। ওনার পন্ডিতিয়া রোডের বাড়ীতে প্রায়ই আমি আর সুভদ্রা গিয়ে আড্ডা মেরে আসতাম। নানা গল্প হত। আর তারাপদ দা’র সব গল্পেই বার বার ওই কথাটা ফিরে আসবেই।
আমার এক কুয়েতের বন্ধু ধ্রুব আবার বলেন “বুঝতে পেরেছেন তো আমি কি বলছি?”
কিছু দিন আগে আমাদের কাম্বোডিয়া আর ভিয়েতনাম বেড়ানো নিয়ে আলোচনা করতে ধ্রুব আর আমি হাজরা রোড এ Altair Travel এর অফিসে গিয়েছি। Altair Travel এর মালিক উপানীতা সেন কে ধ্রুব চেনেন ভাল করে। ধ্রুব্র যাবতীয় travel এর বন্দোবস্ত উপানীতাই করেন।
গাড়ীতে আসতে আসতে ট্রিপ নিয়ে নানা কথা হচ্ছে, ধ্রুব হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা ইন্দ্রজিৎ আপনি কি জানেন এই সব দেশে হোটেলে বাথরুমে commode shower থাকে কি না?”
Commode আর shower? আমি বললাম, “থাকবেনা কেন? সব হোটেলেই আজকাল কমোড আর স্নান করার শাওয়ার থাকে।”
ধ্রুব একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “আরে না না, Commode আর shower নয়, আমি বলছি Bidet Shower এর কথা। আপনি বুঝতে পেরেছেন তো আমি কি বলছি?
ও হরি, বুঝলাম, কোন শাওয়ারের কথা ধ্রুব বলছেন। মানে বাঁ হাতের কাজের জন্যে।
ঠিক হলো উপানীতা কে জিজ্ঞেস করা হবে।
হাজরা রোডে মহারাষ্ট্র নিবাসের উল্টোদিকে একটা বাড়ীর দোতলায় একটা ফ্ল্যাটে Altair Travel এর অফিস। উপা্নিতা একটা ঘরে বসে আছেন। বাইরে হলে বেশ কিছু মেয়ে তাদের টেবিলে PC র স্ক্রিনে চোখ রেখে একমনে কাজ করে যাচ্ছে।
আমাদের দেখে উপানীতা আসুন আসুন বলে তাঁর ঘরে ডেকে নিলেন।
সব কথা যখন প্রায় শেষ, তখন ধ্রুব তাঁর favourite bidet shower এর কথাটা তুললেন।
“আচ্ছা এইসব দেশের হোটেলে কি বাথরুমে bidet shower পাওয়া যাবে?”
তার পরে আমি যেরকম প্রথমে বুঝতে পারিনি সেরকম উপানীতা ও বুঝতে পেরেছেন কিনা তা সম্বন্ধে সন্দেহ থাকায় ধ্রুব তাঁকে বললেন, “বুঝতে পেরেছেন তো আমি কি বলছি?”
উপানীতা কিছুক্ষণ ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে থেকে খুব নির্ব্বিকার গলায় বললেন, “You mean bum shower?”
Bum shower?
আমি আর ধ্রুব ভদ্রমহিলার কাছ থেকে bum কথাটা শুনে বেশ ব্যোমকেই গেলাম।
ধ্রুব একটু আমতা আমতা করে বললেন হ্যাঁ হ্যাঁ…
যেন কিছুই নয় এইরকম একটা ভাব করে উপানীতা ফোন টা তুলে বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলতে লাগলেন, তাঁর কথার মধ্যে বার বার Bum shower শুনে বুঝলাম উনি খোঁজ খবর নিচ্ছেন ওই জিনিষ টা আছে কিনা কাম্বোডিয়ার কোন হোটেলে।
Bum, bum bum…
ভদ্রমহিলা Bum নিয়ে ফোনে তাঁর প্রশ্নবাণ চালিয়ে যাচ্ছেন, আমি আর ধ্রুব কিছুটা লজ্জায় মাথা নীচু করে চুপ করে বসে আছি।
কি করবো আমরা দু’জনেই তো পুরুষ মানুষ, আমাদের তো যাকে বলে one track mind…bum কথাটা শুনলেই আমাদের মনে অদ্ভুত অদ্ভুত যত সব অসভ্য ছবি ফুটে ওঠে।
উপানীতা র কাছে অবশ্য এসব কোন ব্যাপার নয়। ফোন শেষ হয়ে গেলে তিনি বেশ matter of fact গলায় আমাদের বললেন, “না, ওদেশের কোন হোটেলে কোন bum shower নেই।”
বেরিয়ে এসে গাড়ীতে উঠে আমি ধ্রুবকে বললাম No problem, আমরা একটা করে ঘটি নিয়ে যাবো সাথে করে।
আমার বন্ধু সিদ্ধার্থর মেজমাসীর একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল, luck ও বলা যায়, তাঁর সাথে celebrity দের পথে ঘাটে দেখা হয়ে যেত। এবং তাদের সাথে দেখা হলেই চেনা নেই শোনা নেই তবু মেজমাসী খুব smartly তাদের সাথে গিয়ে আলাপ জুড়ে দিতে পারতেন। এবং আলাপ করে বাড়ি এসেই তিনি তাঁর বোনদের সবাই কে ফোন করে বলতেন কার সাথে দেখা হল, তিনি কাকে কি বললেন, তারা কি বললো ইত্যাদি।
একবার নিউ মার্কেটে মাধবী মুখার্জ্জীর সাথে মেজমাসীর দেখা। মেজমাসী বললেন এ কী মাধবী, তোমার মুখটা এত শুকনো লাগছে কেন? শরীর খারাপ নাকি? মাধবী একটু সংকোচের সাথে বললেন আমি তো মাসীমা আপনাকে ঠিক…
মেজমাসী বললেন আমায় চিনতে পারছোনা তো? কি করে চিনবে? তুমি তো আমায় কোনদিন দ্যাখোইনি।
এই নিয়ে মাসীমা মানে সিদ্ধার্থর মা’র একটা inferiority complex ছিল, কেননা তাঁর সাথে কোনদিন কোন celebrity র দেখা হয়না।
তো একবার মাসীমা ছেলের কাছে কুয়েতে বেড়াতে এসেছেন। মাস তিনেক থাকার পরে সিদ্ধার্থ তাঁকে নিয়ে কলকাতা যাচ্ছে। দুবাই তে Stop over, সেখানে সিদ্ধার্থ দ্যাখে মৃণাল সেন লাউঞ্জে একটু দূরে বসে আছেন। মাসীমাও দেখেছেন।
সিদ্ধার্থ মাসীমাকে বলল মা আমি একটু বাথরুমে যাচ্ছি, তুমি কিন্তু একদম ওনার সাথে গিয়ে কথা বলবেনা।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে সিদ্ধার্থ দ্যাখে যা ভয় পেয়েছিল তাই, মাসীমা মৃণাল বাবুর পাশে বসে দিব্বি আলাপ করে যাচ্ছেন। সিদ্ধার্থ কাছে আসতে মাসীমা বললেন এই হল আমার ছেলে, কুয়েতে থাকে। মৃণাল বাবু বেশ গপ্পে লোক, তিনি বললেন আমিও কুয়েতে গিয়েছিলাম একবার বেশ কিছুদিন আগে…
দমদম থেকে যাদবপুরে বাড়িতে ঢুকেই মাসীমার ফোন মেজমাসীকে।
টিঙ্কু আর দেবাশীষ কলকাতায় ফিরে আসার পর, তাদের ড্রাইভার সুভাষ ওদের প্রায় বাড়ীর লোক হয়ে গেছে। গাড়ী চালানো ছাড়া সে ওদের বাজার দোকান ইত্যাদি অনেক কাজ হাসিমুখে করে দেয়। সে একাধারে বিশ্বাসী আর করিতকর্ম্মা ছেলে।
তো একদিন টিঙ্কু সুভাষ কে বললো, “আমার জন্যে বারোটা বারোটা করে দুই গোছা চব্বিশটা রজনীগন্ধা নিয়ে আসিস তো। কাটতে হবেনা, আমি কেটে নেবো।”
কিছুক্ষণ পরে সুভাষ রজনীগন্ধা নিয়ে এসে হাজির। টিঙ্কু বলল, “নিয়ে এসেছিস, ঠিক আছে ফ্রিজে রেখে দে।”
বিকেলে টিঙ্কু ফ্রিজ খুলে কোথাও ফুল না দেখে সুভাষ কে বললো, “কি রে রজনীগন্ধা কোথায় রাখলি? ফ্রিজে তো দেখছিনা?”
“কেন, ওখানেই তো আছে”, বলে সুভাষ দুই তাড়া রজনীগন্ধা পান মসালার প্যাকেট নিয়ে এসে টিঙ্কু কে দিলো!
টিঙ্কুর তো তাই দেখে চক্ষু চড়কগাছ!
টিঙ্কুর বকুনী খেয়ে সুভাষ বলেছিল, “তাই দোকানের লোকটা বলছিল এগুলো তো এক প্যাকেটে দশটা করে থাকে, বারোটা তো হবেনা, দুটো আলাদা নিয়ে যান!”
কুয়েতে এসেছি প্রায় এক বছর হলো। এই মরুভূমির শহরে যে এত বাঙালী পরিবার বাস করে তা আসার আগে জানা ছিলোনা। তাছাড়া রাস্তায় ঘাটে দোকানে বাজারে বাংলাদেশী লোকেরাও বাংলায় কথা বলছে, শুনলেই বেশ মনটা ভাল হয়ে যায়।
এর মধ্যে অভীক (দাশগুপ্ত) আর তার বৌ পাপিয়ার সাথে আমাদের বেশ আলাপ আর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অভীক নিউ ইয়র্ক এর Citibank থেকে কুয়েতে কিছুদিনের জন্যে কুয়েতের Commercial Bank এ assignment নিয়ে এসেছে। USA তে থাকলেও ওরা দুজনেই originally কলকাতার, তার ওপর বেরিয়ে গেল যে পাপিয়া আর সিদ্ধার্থর স্ত্রী সুমিতা আশুতোষ কলেজে ক্লাসমেট ছিল, এবং দুজনে একসাথে গীতবিতানে গান শিখেছে।
আমাদের সান্ধ্য আড্ডায় প্রায়ই কলকাতার কথা উঠে আসে। কুয়েতে বসে লেক মার্কেট, রাসবিহারী এভিনিউ, দেশপ্রিয় পার্ক, ল্যান্সডাউন রোড এই সব নামগুলো শুনলেই গা টা’ কেমন শিরশির করে ওঠে…
তো যাই হোক, একদিন সুভদ্রা গেছে অভীকদের সাথে কুয়েত শহরে কর্ণফুলী স্টোর্সে। দোকান টা নতুন খুলেছে, সেখানে নাকি খুব ভালো বাংলাদেশী তরীতরকারী, ফলমূল আর মাছ পাওয়া যায়, ইদানীং অভীকরা ওখান থেকেই বাজার করে।
দোকানে গিয়ে সুভদ্রা এটা ওটা দেখছে এমন সময় দোকানদার একটি ছেলে সুভদ্রাকে বললো ফুটি সাই আপা? ভাল ফুটি আসে…
ফুটি?
ফুটি কথাটা শুনলে সুভদ্রার মনে যে ছবি ফুটে ওঠে তা হলো তরমুজ জাতীয় একটি রসালো ফলের। কিন্তু ফুটি কিনবার ইচ্ছে তখন সুভদ্রার একেবারেই নেই, সে এসেছে মাছ কিনতে।
সুভদ্রা বললো, ফুটি? না না, ফুটি চাইনা।
অভীক বরিশালের ছেলে, সে সুভদ্রাকে বলল তুমি যে ফুটি ভাবছো এ সে ফুটি নয়। এ হলো পুঁটি মাছ…
দোকানদার ছেলেটি খুব উৎসাহিত হয়ে সুভদ্রাকে বললো সরষে বাটা দিয়া ফাক কইরা দেখুন আপা, চমৎকার স্বাদ হইবো…
অভীক ছেলেটিকে বলেছিল কারে কি কন্, দ্যাকসেন না পাঁড় ঘটি, আমাগো বাঙালদের খাওন দাওন ঘটিরা কি বোঝবো, কয়েন?
কুমারেশ আমার কুয়েতের বন্ধু, কয়েক বছর আগে দুরারোগ্য রোগে তার মৃত্যু হয়।
তাকে নিয়ে এই গল্পটা।
আমাদের বন্ধুদের কোন জমায়েতে কুমারেশ থাকলে এই গল্পটা তার কাছ থেকে আমরা বার বার শুনেছি। আর কুমারেশ এমন মজা করে বলতো যে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়তাম।
——————————————————
কুমারেশ কিছুদিন হল কুয়েতে এসেছে, আরবী ভাষাটা তার তখনো ভাল করে রপ্ত হয়নি। কিছু কিছু কথা কেবল শিখে রেখেছে, যেমন আমি আরবি জানিনা, মা আরিফ আরবী।
তো হয়েছে কি, একদিন কি একটা কাজে কুমারেশ কে Indian Embassy যেতে হবে। গাড়ি নেই, অতএব ট্যাক্সি নিতে হল। সে এক বিরাট ট্যাক্সি, GM এর Caprice Classic…ছয় সিলিন্ডার চার লিটার এর ভি ইঞ্জিন, কোন ঝাঁকানী নেই, কোন আওয়াজ নেই। বাইরে প্রচন্ড গরম, কিন্তু ভিতরে এয়ার কন্ডিশনিং এর ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া। আমাদের দেশের এম্বাসাডর গাড়ীর সাথে এই গাড়ীর কোন তুলনাই হয়না।
কুমারেশ জেনে নিয়েছে Indian Embassy আরবী তে হল সাফারা হিন্দী। ড্রাইভার কে সে কথা বলে সে Air conditioned গাড়ির পিছনের সীটের নরম গদিতে গা ডুবিয়ে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে।
আবু হালিফা থেকে ইস্তিকলাল স্ট্রীট দূর কম নয়, গাড়ী চলেছে, ড্রাইভার লোকটা বেশ গম্ভীর, তার মুখে কোন কথা নেই, কুমারেশও কিছু বলছেনা। আর তারা কথা বলবেই বা কি করে, ড্রাইভার ইংরেজী জানেনা, আর কুমারেশ আরবী জানেনা।
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কুমারেশ ভাবলো আরে এই লোকটা আমায় Indian Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে তো? তার বদলে ভুলভাল কোন জায়গায় নিয়ে গেলেই তো সর্ব্বনাশ!
কুমারেশ ট্যাক্সিচালক কে জিজ্ঞেস করবে “কি ভাই তুমি ঠিক Indian Embassy তেই যাচ্ছো তো?” কিন্তু tension এর জন্যে Embassy কথাটার আরবী যে সাফারা তা সে বেমালুম ভুলে গেছে। তার কেন জানিনা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে Embassy আরবী তে হল সাইয়ারা। ওকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায়না, স্বীকার করতেই হবে যে দুটো কথার মধ্যে বেশ মিল আছে।
এদিকে আরবীতে সাইয়ারা হলো গাড়ী।
কুমারেশ ট্যাক্সি চালক কে জিজ্ঞেস করলো, “আন্তা সাইয়ারা হিন্দী?”
সে লোকটা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “লা, সাইয়ারা আমরিকী।”
কুমারেশ ভাবল এই রে, যা ভেবেছি তাই। এই গাধাটা এত করে বলা সত্ত্বেও আমায় US Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে!
সে তখন বেশ রেগে গিয়ে বলল “লা লা, সাইয়ারা হিন্দী।”
লোকটা এইবার ভীষণ রেগে গেল। এত বড় অপমান? আমার এই সাধের Caprice Classic কে ব্যাটা বলে কিনা Indian গাড়ী?
এই রকম বেশ কিছুক্ষন চলল।
কুমারেশ বলে সাইয়ারা হিন্দী আর ট্যাক্সিচালক বলে লা সাইয়ারা আমরিকী।
শেষ পর্য্যন্ত রেগেমেগে “ট্যাক্সি থেকে বেরোও” বলে কুমারেশ কে রাস্তার মাঝখানে নামিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। এত অপমান তার সহ্য হয়নি।
————————————
২০০২ সালে কুয়েতে আমরা রবীন্দ্রনাথের শেষরক্ষা নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলাম । সেই নাটকে দাপুটে ডাক্তার শিবচরণের ভূমিকায় দারুণ অভিনয় করেছিল কুমারেশ। তার লম্বা চওড়া চেহারা, পরণে ধুতি আর কালো কোট, হাতে একটা ছাতা, গলায় স্টেথোস্কোপ, চরিত্রের সাথে তাকে দিব্বি মানিয়ে গিয়েছিল।
এই সাথে সেই নাটকের দুটি ছবি।
——————————
প্রথমটি ছেলে গদাই এর সাথে বাগবাজারের কাদম্বিনী চৌধুরীর বাড়ির সামনে।
শিবচরণঃ বাপু হে, মেডিকাল কালেজ টা কোন দিকে একটু দেখিয়ে দাও তো।
কুয়েতে পাসপোর্টে তিনটে নাম ছিল বাধ্যতামূলক। আরবদের রীতি অনুযায়ী প্রথম নাম হলো নিজের, দ্বিতীয় নাম বাবার, আর তৃতীয় নাম পরিবারের ও হতে পারে গ্রামের বা জন্মস্থানের ও হতে পারে, কিছু একটা হলেই হলো।
মোটমাট তিনটে নাম থাকতেই হবে।
আমাদের বন্ধু ধ্রুব মুখার্জী র পাসপোর্টে নাম ছিল SHRI DHRUBA MUKHERJEE.
সুতরাং কুয়েতে officially তাঁর নাম হয়ে গেল শ্রী। সিভিল আই ডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি সব সরকারী কাগজপত্রে আরবী ভাষায় তাঁর সেই প্রথম নামটাই লেখা থাকতো, এবং সেই নামের পরে নামের বাকি দু’টো অংশ ধ্রুব আর মুখার্জ্জি।], যেগুলো তেমন ধর্ত্তব্যের মধ্যে নয়।
প্রথমে এ ব্যাপারটা ধ্রুব ঠিক বুঝতে পারেন নি।
কিন্তু এই নিয়ে তাঁর একবার একটা “বিশ্রী” অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
একবার জাবরিয়াতে ট্র্যাফিক ডিপার্টমেন্টের অফিসে তিনি তাঁর driving license renew করতে গেছেন। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, ধ্রুব বসে আছেন। কাগজপত্র সব দেওয়া হয়ে গেছে, এখন তাঁর নাম ডাকার অপেক্ষা।
কিন্তু তাঁর নাম আর ডাকেনা। ধ্রুব বসে আছেন তো আছেন ই। ইতিমধ্যে হলঘর প্রায় খালি হয়ে আসছে, যাদের নাম ডাকা হচ্ছে তারা কাউন্টারে গিয়ে তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে চলে যাচ্ছে।
নানা নাম ডাকা হচ্ছে, তার মধ্যে বেশ ব্যগ্র ভাবে ডাকা একটা নাম শোনা যাচ্ছে বার বার – “সিরি” – , কিন্তু ধ্রুব জানেন না যে তাঁকেই ডাকা হচ্ছে, তাই তিনি চুপ করে ধৈর্য্য ধরে লক্ষ্মী ছেলের মতো বসে আছেন।
কিন্তু এত দেরী হচ্ছে কেন? ধ্রুব মনে মনে একটু বিরক্ত আর অধৈর্য্য হয়ে পড়ছেন।
যে লোকটি তাঁর নাম ডাকছে, তারও ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থা। বেশ রাগী গলায় সে ডাকছে ওই অদ্ভুত নাম ধরে।
ওয়েন সিরি? ওয়েন সিরি?
আরবী ভাষায় ওয়েন মানে হলো কোথায়।
শেষে হল ফাঁকা হয়ে গেল, কেউ নেই, ধ্রুব একা বসে আছেন। ধ্রুব কাউন্টারে খোঁজ করতে যেতেই লোকটা রাগে ফেটে পড়লো।
আন্তা সিরি? (তুমি শ্রী? )
এতক্ষণে ধ্রুব বুঝতে পেরেছেন তাঁর ভুলটা কোথায় হয়েছে।
তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে লোকটার একটানা অশ্রাব্য গালাগালি শুনতে হলো তাঁকে! একবিন্দু আরবী না জানলেও লোকটি যে কি বলছে তা বোঝা তাঁর পক্ষে খুব একটা কঠিন নয়।
বাংলায় তার গূঢ়ার্থ হচ্ছেঃ
ফাজলামী করার আর জায়গা পাওনি? আমার সাথে ইয়ার্কি হচ্ছে? এতক্ষণ ধরে তোমার নাম ডাকছি, কথা কানেই যাচ্ছেনা? বলি কানের মাথাটা কি খেয়েছো নাকি?
আমার এক IBM এর সহকর্ম্মী বন্ধু প্রবীর কুমার সেনগুপ্ত আর আমি একসাথে কুয়েতে আসি। প্রবীরকে সবাই আমরা পিকে বলে ডাকতাম, ওটাই ওর নাম হয়ে গেছে, আমাদের সবার কাছে ও হলো universal পিকে।
কুয়েতে আসার পর প্রথম ঝামেলা হলো নাম নিয়ে। আরবী ভাষায় প বলে কোন শব্দ নেই! আশ্চর্য্য ব্যাপার। এত মহান একটা ভাষা, এত লোকে এই ভাষায় কথা বলে, অথচ প নেই? পিকে কে সবাই বিকে বলে ডাকতে শুরু করলো। আরবদের নিয়ে এক মুস্কিল হলো যে তারা কিছুতেই ভুল স্বীকার করতে চায়না, পিকে যত বলে “আরে, বিকে নয়, আমায় পিকে বলে ডাকো”, তারা বলে “আমরা তো বিকে ই বলছি”।
এই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পিকে এক বছরের মধ্যেই কুয়েত ছেড়ে দেশে ফিরে গেল।
এদিকে আমার ও ঝঞ্ঝাট কম নয়। প এর সাথে সাথে আরবী তে ভ ও নেই। তিন রকমের শ আছে, চার রকমের হ, কিন্তু প ও নেই, ভ ও নেই।
কোন মানে হয়?
আমার নাম ভৌমিক থেকে হয়ে গেল বোমিক। Driving License, Civil id, ইত্যাদি সব দরকারী সরকারী document এ আমি হয়ে গেলাম বোমিক। Birthday card এ আমায় বন্ধুরা ভালোবেসে লেখে, “Happy Birthday, Bombom!”
এসব কি হচ্ছে টা কি?
এদিকে আবার কিছু উচ্চারণ বিশারদ লোক আছে, যাদের উচ্চারণ (শিব্রামের ভাষায় উশ্চারণ) নিয়ে প্রচন্ড মাথাব্যথা, যেন উচ্চারণ ঠিক না হলে তাদের রাত্রে ঘুম হয়না। তারা অনেক চেষ্টা, অনেক কসরত, অনেক পরিশ্রম করে আমার নামটা উচ্চারণ করে “বোহোমিক”।
তার পর “কি, এবার ঠিক হলো তো” ধরণের একটা দেঁতো হাসি হাসে, যা দেখে আমার গা জ্বলে যায়।
আমি ওদের বোঝাই আরে না না, বোহোমিক নয়, ভৌমিক! বোহো নয়, ভৌ, ভৌ! দু তিন বার এরকম ভৌ ভৌ করার পর একটু লজ্জাই করে, আমি বানান করে বোঝাই। B, H, O,W, বুঝেছো? Baby, Honey, Oscar, William…
কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা।
কিছুদিন পরে সেই উচ্চারণ বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা হলে তিনি আবার বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলেন, “কি খবর, কেমন আছো বোহোমিক?”
মানস(সেন) আর আমি খড়্গপুরে পাঁচ বছর সহপাঠী ছিলাম। মানস আর তার বৌ কেয়া এখন থাকে লন্ডনে, আমি সেখানে এক মাসের জন্যে গেছি পুপুর কাছে। ১৯৬৮ সালে খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরে আমাদের আর দেখা হয়নি।
আমরা দুজনে লন্ডনের দুই প্রান্তে থাকি, পুপুদের বাড়ী East London এর South Woodford এ আর মানস আর কেয়া দুজনে থাকে West London এর Harrow তে তাদের ফ্ল্যাটে।
মানসের সাথে ফোনে কথা বলে ঠিক করলাম আমরা সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে বন্ড স্ট্রীট টিউব স্টেশনে দেখা করবো Boot’s এর সামনে। ঠিক এগারোটায় পৌঁছে দেখি ওরা দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। মানস কে চিনতে কোন অসুবিধেই হলোনা, প্রায় আগের মতই আছে, দু’জনে দু’জন কে জড়িয়ে ধরলাম।
মানস বলল তোদের আসতে কতক্ষণ লাগলো? আমি বললাম এক ঘন্টা, ঠিক দশটায় বেরিয়েছি। মানস বলল দশটায় আমরা already এখানে!কেয়া বললো দেখুন না এই মানুষটা কে আমায় রোজ ঠেলে বের করতে হয়, আজ নিজেই ভোর বেলা উঠে আমায় তাড়া দিচ্ছে।
জুন মাস পড়ে গেছে, তবু বাইরে বেশ ঠান্ডা, হিমের মত হাওয়া দিচ্ছে, আকাশ মেঘলা, মানস একটা বড় ওভারকোট পরে এসেছে, আমার গায়েও গরম জ্যাকেট। কিছু ছবি তোলা হল স্টেশন থেকে বেরিয়ে Oxford Street এ ভীড়ের রাস্তায়। তারপরে কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে আমাদের গল্প শুরু হলো। মানস বললো নে এবার শুরু কর্। খড়্গপুর থেকে পাশ করে বেরোবার পরের দিন থেকে বল্ কি কি করলি। কিচ্ছু বাদ দিবিনা।
জীবনানন্দের সামনে মুখোমুখি বসিবার জন্যে ছিলেন বনলতা সেন। আমার ভাগ্যে মানস সেন।
পঞ্চাশ বছরের গল্প দুই ঘ্ন্টায় শেষ হয় নাকি? কি আর করি, সেই ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করতে হলো।
২
গল্পে গল্পে ওই সময়টুকু কি করে কেটে গেল টেরই পেলাম না।
মানসের জীবনপঞ্জী সংক্ষেপে জানলাম। রেজাল্ট বেরোবার আগেই Philips এর কলকাতা অফিসে চাকরী পায়। সেখানে তিন বছর কাজ করে ১৯৭১ এ বিয়ে, তারপরে ITC তে সাহারানপুর, হায়দ্রাবাদ। ITC থেকে ABT তে transfer এবং পৃথিবীর নানা জায়গায় কাজ, ইয়েমেন, দুবাই, নাইজিরিয়া। একমাত্র ছেলের দিল্লীতে সেন্ট স্টিফেন্স এ পড়াশোনা করে অক্সফোর্ড এ স্কলারশিপ পাওয়া।
দেশের বাইরে নানা জায়গায় কাজের অনেক অভিজ্ঞতা মানসের, সেই সব গল্প অনেক শোনালো সে আমায়। নাইজিরিয়া থেকে সাহারা মরুভূমিতে গিয়ে বর্ষার নদী দেখা, ইয়েমেন এ রেড সী তে গিয়ে মাছ ধরা আর সাঁতার কাটা ইত্যাদি।
রেড সী তে সাঁতার, সে তো দারুণ ব্যাপার, তুই ভাল সাঁতার কাটিস বুঝি, আমি জিজ্ঞেস করলাম। মানস কিছুটা বিনয়ের সাথে বললো ওই আর কি, স্কুলে থাকতে বেঙ্গল represent করেছি! Andersen Club এ Waterpolo খেলতাম।
বলে কি? খড়্গপুরে ওর এই গুণটা জানার সুযোগ পাইনি। আমাদের সময় তো কোন সুইমিং পুল ছিলনা।
আর বলিস না, মানস বললো, ওই পাঁচ বছর সাঁতার এর “জলাঞ্জলি”! বেশ মজার মজার কথা বলে এখনো মানস সেই আগের মতোই।
আমি কেয়া কে আমাদের সেই খড়্গপুরে প্রথম ইন্টারভিউ দিতে যাবার দিন নেতাজী অডিটোরিয়ামে আলাপ হবার গল্প করলাম। কি কি প্রশ্ন করতে পারে এই সব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে গরম জায়গা কোথায়? মানস কে তখন ও ভাল চিনিনা, সে বলে উঠলো উনুনের ভেতর~
কেয়া বললো আপনার এত দিন পরেও মনে আছে?
আমি বললাম মনে থাকবেনা কেন, আমার তো মনে হয় এই ক’দিন মাত্র আগে।
৩
মানসের সাথে রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে আমাদের দু’জনের জীবন নিয়ে নানা গল্পের মধ্যে ওর আর কেয়ার বিয়ের গল্পটা বেশ মজার।
ওদের বিয়ে হয় ১৯৭০ সালে। অর্থাৎ খড়গপুর থেকে পাশ করে বেরোনোর দুই বছরের মধ্যেই। ততদিনে সে Philips এর চাকরীতে সুপ্রতিষ্ঠিত, বালীগঞ্জে নিজেদের বাড়ী, ইতিমধ্যে একটা গাড়ীও কিনে ফেলেছে, ওই অল্প বয়সেই সে অতি সুপাত্র।
মানস কে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেয়ার সাথে তোর কি বিয়ের আগে আলাপ আর প্রেম ছিল, নাকি আমার আর সুভদ্রার মত তোরও arranged marriage? মানস বললো আমার জগবন্ধু স্কুলে এক বন্ধু ছিল তার নাম সূর্য্য, তার মা’র আবার আমায় খুব পছন্দ ছিল, আর তিনি ছিলেন তিনি ভীষণ dominating মহিলা বুঝলি, তিনি যেটা চাইতেন সেটা করেই ছাড়তেন। কেয়া হলো তাঁর বোনের মেয়ে, মানে সূর্য্যর মাসতুতো বোন, ওরা থাকতো পাটনায়।
সূর্য্যর মা আমার সাথে কেয়ার বিয়ে দেবেনই দেবেন, আমার মা’র সাথে তাঁর কথা হয়ে গেছে, মা’র ও কোন আপত্তি নেই, এদিকে আমি অবশ্য এসব কিছুই জানিনা।
সূর্য্যর বাবা পোর্ট ট্রাস্টে বড় কাজ করতেন, আলিপুরের ওদিকে গঙ্গার ধারে ওদের বিশাল বাড়ী, খেলার মাঠ। একদিন রবিবার আমাদের সেখানে খাবার নেমন্তন্ন, আমরা বন্ধুরা মিলে মাঠে জমিয়ে ক্রিকেট খেলছি, হঠাৎ মাসীমা নীচে নেমে এসে আমায় বললেন, এই মানস আমার বোনের মেয়ে কেয়া কে দেখেছিস তো, ওরা পাটনায় থাকে, ছুটিতে কয়েকদিনের জন্যে আমার কাছে বেড়াতে এসেছে, ওর খুব ইচ্ছে ন্যাশনাল লাইব্রেরী দেখার, তুই তোর গাড়ীতে করে একটু দেখিয়ে নিয়ে আয় না রে!
কিরকম ধুরন্ধর মহিলা বুঝেছিস তো?
আমি একটু অপাঙ্গে কেয়ার দিকে তাকালাম। তার মুখে মুচকি হাসি।
মানস বলতে থাকলো – আমি তখন ক্রিকেট খেলা নিয়ে ব্যস্ত, আমি বলে দিলাম, মাসীমা আমার ব্যাটিং এখনো বাকী, আমি এখন কাউকে নিয়ে কোথাও যেতে পারবোনা। তাছাড়া আজ রবিবার, ন্যাশনাল লাইব্রেরী তো বন্ধ, আজ তো দেখার কোন প্রশ্নই নেই। কিন্তু মাসীমা কে কে বোঝাবে? তিনি আমায় পাঠাবেনই।
মাসীমা বললেন তা হোক, তুই ওকে একটি লাইব্রেরীটা বাইরে থেকেই দেখিয়ে নিয়ে আয় বাবা…
কি আর করা ব্যাটিং মাথায় থাকলো আমি আমার বন্ধুদের বললাম তাহলে তোরাও চল্, গাড়ীতে ওঠ্। মাসীমা হাঁ হাঁ করে উঠে বললেন না না আর কেউ না, তোর ওই ছোট গাড়ীতে এত লোক আঁটবেনা তুই শুধু কেয়া কে নিয়ে যা…
আমি কেয়াকে বললাম তুমি এই আনরোমান্টিক লোকটাকে বিয়ে করলে কি বলে?
কেয়া আবার সেই মুচকি হাসি হেসে বলল আই আই টির ছেলেরা তো সবাই ওরকম ই হয়…
মানস বলল তো সে যাই হোক ঘুরে টুরে এসে তো ওপরে গেছি, হঠাৎ মা আর মাসীমার কথাবার্ত্তা কানে এলো। মা বলছেন দুজনের হাইট এও বেশ মানিয়েছে!
অ্যাঁ ? তার মানে? মানিয়েছে মানে কি?
আমি হো হো করে হেসে কেয়া কে বললাম আচ্ছা তুমি এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপার টা আগে থেকে জানতে নিশ্চয়?