
আল বাহার আই ক্লিনিক, কুয়েত
বাদল সরকারের এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকে একটা অফিসের দৃশ্য ছিল, সেখানে অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎ কাজ করে। সেই অফিসে হরিশ নামে একটি বেয়ারার চরিত্র ছিল, যার কাজ ছিল বাবুদের ফাই ফরমাস খাটা, দরকার মতো চা, সিগারে্ট, ফাইল এই সব এনে দেওয়া। অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎরা তাকে নানা সুরে “হরিশ ! হরিশ!!” বলে ডাকলেই সে তাদের কাছে “বলুন স্যার” বলে গিয়ে হাজির হতো।
হরিশের জন্যে কোন আলাদা অভিনেতা নেই, সেই নাটকের প্রধান চরিত্র হলো লেখক, সেই লেখকই দরকার মত কাঁধে একটা কাপড় নিয়ে হরিশের ভূমিকায় অভিনয় করতো।
মাঝে মাঝে সেই হরিশ আবার সেই অফিসের ম্যানেজার হয়ে গিয়ে সেক্রেটারী মিস মালহোত্রা কে ডেকে চিঠি dictate করতো। তখন তার কাঁধে আর টেবিল পরিস্কার করার কাপড় নেই, তার চালচলনে তখন রাশভারী ব্যক্তিত্ব। অমল বিমল কমলরা তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে Good morning sir বলে।
স্টেজে অভিনেতাদের এক রোল থেকে আর এক রোলে এই seamless transformation টা দর্শকদের কাছে বেশ উপভোগ্য ছিল।


কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকের দু’টি দৃশ্য
একই লোকের এই transformation নাটকের বাইরে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও কি হয়না?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর একটা লেখায় তিনি Writers Building একজন Class Four staff এর কথা লিখেছিলেন। রাইটার্সে তাকে দেখে চুপচাপ বশংবদ ব্যক্তিত্বহীন বলে মনে হতো, সে নীরবে মাথা নীচু করে চা সার্ভ করতো, টেবিলে টেবিলে ফাইল দিয়ে যেতো, অফিসারদের নানা ফাইফরমাস খাটতো – ঠিক ওই নাটকের হরিশের মতোই। একবার সুনীল ওই লোকটির গ্রামের বাড়ীতে যান, সেখানে গিয়ে দেখেন তার অন্য রূপ। সেখানে সেই একই লোক তার গ্রামের একজন নেতা, তার বাড়ীতে লোকেরা এসে নানা ব্যাপারে তার পরামর্শ আর সাহায্য চায়, তার সাথে সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধার সাথে কথা বলে।
এরকম একটি transformation চাক্ষুস করেছিলাম আমিও।
এক বছর আগে আমার চোখে একটা infection হয়েছিল, আমার এক বন্ধু সত্যজিৎ (তারও চোখের সমস্যা) আমায় Shuwaikh এর Al Bahar Eye Clinic এর Dr. Seemant নামে একজন নামকরা eye specialist এর সাথে appointment করে দিয়েছিল। সকাল সকাল সেখানে চলে গিয়ে ফাইল খুলে নাম্বার নিয়ে waiting hall এ বসে আছি, ওই সাত সকালেও ক্লিনিকে বেশ ভীড়, ডঃ সীমন্তের রোগীই সব চেয়ে বেশী, আমার নাম্বার বেশ পিছনে। মাঝে মাঝে ডাক্তারের চেম্বারের দরজায় গিয়ে দেখে আসছি কতটা এগোল।
দু’ দিকে সারি সারি চেম্বার, মাঝখানে লম্বা সরু করিডর, সেখানে অনেকে ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভীড়ের মধ্যে এক ভদ্রলোক কে দেখে আমার চোখ আটকে গেল।
খুব চেনা চেনা লাগছে, কে ইনি, এঁকে আগে কোথায় দেখেছি?
দোহারা চেহারা, পরিস্কার পাটভাঙা ডার্ক সার্ট আর হাল্কা রং এর ট্রাউজার্সে দারুণ স্মার্ট লাগছে, চুলটা পরিপাটি করে ব্যাকব্রাশ করা, মাথার সামনেটা চুল একটু পাতলা হয়ে এসে ভদ্রলোকের চেহারায় যেন একটু বেশী ব্যক্তিত্ব যোগ হয়েছে, স্টাইলিশ ভঙ্গী তে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখে কোন হিন্দী ছবির নামকরা পার্শচরিত্রাভিনেতা বলে মনে হতেই পারে।
Sales and Marketing এর কাজে এতগুলো বছরে কত লোকের সাথে রোজ দেখা হয়েছে। তাদের অনেকের সাথে আলাপ আর বন্ধুত্ব হয়, কেউ কেউ থেকে যায় মনের ভিতরে। আবার অনেককে ভুলেও যাই। এঁকে ভুলিনি কিন্তু কোথায় যে দেখেছি কিছুতেই মনে পড়ছেনা।
ইনি কি কুয়েত ইউনিভার্সিটির কোন প্রফেসর, কিংবা KNPC তে Planning Engineer, অথবা KOC IT তে কাজ করেন?
সুভদ্রা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করতে সে ভদ্রলোকের দিকে এক মিনিট তাকিয়ে দেখেই যেন কিছুই না এই ভাবে বললো, “ও এই লোকটা তো সালমিয়া ইডি স্টোর্সে তরকারী ফল আর আনাজ ওজন করে দামের স্টিকার লাগায়। ”
অ্যাঁ , বলে কি?
আবার ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তাই। সেই লোকটাই।
একে বলে connecting the dots, সুভদ্রার এই ক্ষমতাটা অসাধারণ।
কুয়েতের ভারতীয়রা যারা সালমিয়াতে ইডি স্টোর্সে বাজার করে তারা সবাই নিশ্চয় ওই লোকটাকে চেনে। তরকারী আর ফলের র্যাকের পাশে এক কোণে ছোট এক জায়গায় বসে সে কাস্টমার দের তরকারী ফল আর আনাজ ওজন করে আর প্লাস্টিকের ব্যাগে দামের স্টিকার লাগায়। সকাল থেকে রাত প্রতিদিন ওই তার কাজ। তার বেশবাস একান্ত আটপৌরে, অনেক সময়ে গায়ে সার্ট ও নেই, শুধু গেঞ্জী। চুল অর্ধেক দিন ভাল ভাবে আঁচড়ানো হয়না। তার মুখেও কোন কথা কিংবা হাসি নেই, তাকে দেখে একজন ব্যক্তিত্বহীন, মাথা নীচু করা, হেরে যাওয়া লোক বলেই মনে হয়।
সেদিন আল বাহার আই ক্লিনিকে আমি যে স্টাইলিশ ভদ্রলোক কে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, তিনি কি ওই একই লোক?

ইডি স্টোর্স, সালমিয়া, কুয়েত









