Tag Archives: মনোহরপুকুর

মামা, কাটবো?

মনোহরপুকুর, বোধহয় ১৯৫৭ সাল।

দিদিভাই আমাদের ছোটদের নিয়ে বাড়ির বড়ো বারান্দায় একটা সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। উপলক্ষ্যটা ঠিক মনে নেই। রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী  কিংবা বসন্ত উৎসব হবে হয়তো।

প্ল্যান হলো দিদিভাই ব্যাকস্টেজ থেকে রবীন্দ্রনাথের “পূজারিণী”  কবিতাটা আবৃত্তি করবে আর তার  সাথে আমরা স্টেজে কবিতাটার একটা নাট্যরূপ অভিনয় করব। এর সাথে থাকবে কিছু গান, আবৃত্তি, আর আবহসঙ্গীত।

আমাদের সকলের তো খুব উৎসাহ। রোজ বিকেলে ছাতে গান আর নাটকের রিহার্সাল চলে। “ওরে ভাই ফাগুণ লেগেছে বনে বনে” গানটা দিদিভাই এর কাছ থেকে আমরা শিখে নিয়েছি।

নাটকে চারজন চরিত্র।

আমি হলাম “নৃপতি বিম্বিসার”, প্রথম সীনে – “নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইল পদনখকণা তার”- আমি বুদ্ধের মূর্ত্তির সামনে গিয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে যাব।  

বাবলু হলো বিম্বিসারের ছেলে অজাতশত্রু, সে আবার বুদ্ধকে দু চক্ষে দেখতে পারেনা। সে রাজা হয়ে বুদ্ধের পূজা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, তার রাজত্বে শুধু মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা। বাবলুর প্রথম সীন হলো হাতে একটা রাংতার তৈরী তলোয়ার মাথার ওপর বাঁইবাঁই করে ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ স্টেজে নাচবে। সাথে বাজনা।

এছাড়া দুজন মেয়ে। এক হলো রাজমহিষী, যার কাজ হলো শুধু সাজগোজ করা, ওই পার্টটা করেছিল সামনের বাড়ীর অপুমাসী র মেয়ে টুটু।  আর একজন “শ্রীমতী নামে সে দাসী” সেটা করেছিল দিদিভাইয়ের বন্ধু গৌরীদির বোন বাসন্তী। ওরা আমাদের পাড়াতেই থাকতো। দাসী শ্রীমতী কে রাজমহিষী অনেক বারণ করা সত্ত্বেও সে বুদ্ধদেবের পূজো করবেই। শেষ সীনে সে যখন পূজো করছে তখন অজাতশত্রু এসে তার গলা কেটে তাকে মারবে।

মোটামুটি এই হলো নাটক।

বাবলু কে পই পই করে বলে দেওয়া হয়েছে যে তলোয়ার দিয়ে গলা কাটার timing  টা ভীষন important, ও শ্রীমতীর গলার কাছে তলোয়ার নামানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝ্যাং করে একটা বাজনা বাজবে আর স্টেজ অন্ধকার হয়ে যাবে। বাবলু তাই ওই সীন টা নিয়ে বেশ চিন্তিত।

 ২

নাটকের দিন বারান্দায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসার জায়গাতে স্টেজ বানানো হয়েছে। জ্যেঠিমার ঘর হলো গ্রীনরুম। সেখানে আমাদের সব সাজগোজ করিয়ে দিয়েছে দিদিভাই। চায়ের ঘরটা হলো উইংস। সেখানে ভালোকাকীমার ভাই শ্যামলমামা দাঁড়িয়ে। তিনি হলেন ব্যাকস্টেজ ম্যানেজার।

স্টেজের সামনে বারান্দায় চাদর পাতা, একটু একটু করে সেখানে বেশ ভীড় জমে গেল। অনেকে এসেছে। তাদের মধ্যে আত্মীয়রা আছেন, আর পাড়ার ও অনেকে নিমন্ত্রিত।

প্রথম আর্টিস্ট পলা । সে হলো ভজা জ্যেঠুর ভাই পূজা জ্যেঠুর মেয়ে। তখন পলার কতোই বা বয়েস? বারো কি তেরো হবে। লাল রং এর ডুরে শাড়ি, আঁট করে চুল বাঁধা, চোখ নাচিয়ে হাত ঘুরিয়ে বেশ গিন্নীর মতো পলা “হাইস্যো না কো বাবুরা, বুড়া আমায় মারিসে” বলে একটা কবিতা সুন্দর ঝরঝর করে আবৃত্তি করল। She was a big hit, প্রচুর হাততালি পড়ল দর্শকদের কাছ থেকে।

তারপর আমাদের কোরাসে “ওরে ভাই ফাগুণ লেগেছে বনে বনে” গান। সেটাও মোটামুটি ভালোই উতরে গেল।

তারপর শুরু হলো নাটক। সেটাও ভালোই এগোচ্ছিল, কিন্তু বাবলুর লাস্ট সীনে গিয়ে একটু কেলো হয়ে গেল। দোষ অবশ্য বাবলু কে দেওয়া যায়না। আগেই বলেছি ওই গলা কাটার timing টা নিয়ে ওর বেশ চিন্তা ছিল। যদি তলোয়ার নামানোর সময় ঝ্যাং করে বাজনাটা না বাজে, যদি স্টেজ অন্ধকার না হয়?

বাবলু তাই রাংতার তরোয়াল মাথার ওপর ধরে দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। ওদিকে শ্যামলমামাও (যার কাজ হলো ঝ্যাং বাজনা টা বাজানো আর স্টেজে আলো নেবানো), বসে আছেন বাবলুর তরোয়াল নামানোর অপেক্ষায়।

বেশ কিছুক্ষণ এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর বাবলু উইংসে দাঁড়ানো শ্যামলমামা কে জিজ্ঞেস করেছিল, “মামা, কাটবো?”

প্রশ্নটা বেশ উঁচু গলায় জোরেই করতে হয়েছিল বাবলুকে, কেননা উইংস টা ছিল স্টেজের মাঝখান থেকে বেশ দূরেই। ফলে ওর ওই কথাটা হল শুদ্ধ সবাই শুনে ফেলে।

তার পর থেকে বহুদিন বাবলুকে “মামা কাটবো?” বলে খ্যাপানো হয়েছে।

মনোহরপুকুরের বাড়ীর ইতিহাস যদি কোনদিন লেখা হয় তাহলে এই গল্পটা তার মধ্যে স্থান পাবে নিশ্চয়।

জ্যেঠুর দর্জির ব্যবসা

আমাদের বাবা কাকাদের কারুর ব্যবসাতে তেমন এলেম ছিলোনা। প্রায় সবাই সরকারী চাকরী করেই জীবন টা কাটিয়ে গেছেন। জ্যেঠু (প্রিয়বন্ধু) আর ভালকাকা (শ্যামলবন্ধু) ছিলেন ভাইদের মধ্যে ব্যতিক্রম।

শুনেছি চশমার দোকান খোলার আগে জ্যেঠু নাকি একবার দর্জির দোকান খুলেছিলেন। এদিকে বাড়ীর ঠাকুর (রান্নার লোক) এর একটা পাঞ্জাবীর খুব সখ। সে এসে জ্যেঠুকে ধরলো। দাদাবাবু, আপনি আমায় একটা পাঞ্জাবী বানিয়ে দেবেন?

জ্যেঠু বললেন, ঠিক আছে, অসুবিধে নেই। No problem ।

সেই ঠাকুর ছিল একটু সৌখীন মানুষ। সে তার দাদাবাবুর কাছে আব্দারের ভঙ্গীতে বললো পাঞ্জাবী র গলার বোতাম লাগাবার জায়গাটা মাঝামাঝি না হয়ে যেন একটু বাঁ দিকে হয়। ওটা ই নাকি latest fashion!

পাঞ্জাবী তৈরী হয়ে এলো। জ্যেঠু বেশ গর্ব্বের সাথে ঠাকুর কে বললেন নাও, তোমার পাঞ্জাবী। এবার খুশী তো?

কিছুক্ষণ পরে ঠাকুর মুখ শুকনো করে এসে হাজির।

আবার কি হলো?

ঠাকুর বললো, দাদাবাবু হাতা দুটো যে ছোট বড়ো হয়ে গেছে।

জ্যেঠু নাকি খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, তোমার সখ তো কম নয়? বোতাম বাঁ দিকে চাই, আবার হাতা দুটো ও সমান হতে হবে?

বলা বাহুল্য, জ্যেঠুর ওই দোকান টা বেশী দিন চলেনি।

ছোটকাকার ফুলশয্যা

ছোটকাকার বিয়ে হয় ১৯৫৬ সালে, তখন আমার ক্লাস ফাইভ, এগারো বছর বয়স।

পাটনার কাছে দানাপুরে ছোটকাকীমার বাপের বাড়ি, বিয়েটা পাটনা থেকেই দেওয়া হয়। কিন্তু বৌভাত হয়েছিল মনোহরপুকুরে। পাটনা থেকে সবাই এসেছিলেন। দিদা, রাঙ্গাকাকা, সোনাকাকা, বড়মা, রাঙ্গাকাকীমা, সোনাকাকীমা, কৃষ্ণা, শুক্লা এবং আরো অনেকে। সারা বাড়ি আনন্দ উত্তেজনায় কয়েকদিন বেশ সরগরম হয়েছিল। 

বৌভাতের পর ফুলশয্যা যেদিন হবে সেদিন সকাল থেকে বাড়িতে বিশাল হৈ হৈ। বিশেষ করে ভালোকাকা আর সোনাকাকার উৎসাহ সবচেয়ে বেশী। লেক মার্কেট থেকে প্রচুর ফুল কিনে আনা হয়েছে, সেই ফুল দিয়ে দুই ভাই মাঝের ঘরের খাট সাজাতে বসে গেছেন।

এদিকে ছোটকাকা কিছুটা লজ্জা লজ্জা মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কাকীমারা সবাই তাঁর সাথে নানারকম মজা করে কথা বলছেন, সবচেয়ে বেশী পিছনে লাগছেন বড়মা। আর ওদিকে ছোটকাকীমা নতুন বৌ, তিনি ঘোমটার আড়ালে প্রায় সারা মুখ ঢেকে এক কোণে বসে আছেন। আমরা ছোটরা নতুন কাকীমার সাথে কখন আলাপ হবে সেই আশায় বসে আছি। নতুন অতিথি কে নিয়ে আমাদের মনে প্রচন্ড কৌতূহল। কিন্তু আমরা তেমন পাত্তা পাচ্ছিনা।

ফুলশয্যা ব্যাপারটা যে কি সে বিষয়ে আমার কোন ধারণা নেই, কেবল বুঝতে পারছি যে ব্যাপারটা বেশ ধুমধাড়াক্কা কিছু হবে, একটা বেশ জমকালো পারিবারিক উৎসব, ছাতে উঠে তুবড়ী আর বাজী পোড়ানো হতে পারে, বাতাসা ছুঁড়ে বারান্দায় হরির লুঠ হতে পারে, গান বাজনার অনুষ্ঠান হতে পারে। মোটমাট যাই হোক না কেন, এটা ঠিক ই বুঝতে পারছি যে ফুলশয্যা কিছুতেই মিস করা চলবেনা।

এদিকে হয়েছে কি, সারা সকাল ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হয়ে দুপুরে খাবার পর বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম যখন ভাঙলো তখন সন্ধ্যা, বাইরে ক্রমশঃ অন্ধকার নেমে আসছে।

ঘুম থেকে উঠেই মনে হল এই রে, নির্ঘাত ঘুমিয়ে ফুলশয্যা টা মিস করে ফেললাম! ইস্‌, কোন মানে হয়?

আমি মাকে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করেছিলাম “মা, ফুলশয্যা কি হয়ে গেছে?”

আমার সেই কথা শুনে সারা বাড়ীর লোক নাকি খুব হাসাহাসি করেছিল।

শোনা যায় যে বড়মা নাকি রাত্রে মাঝের ঘরে খাটের তলায় লুকিয়ে বসেছিলেন, কিন্তু ছোটকাকা ঠিক তাঁকে ধরে ফেলেন। অবশ্য ছোটকাকা তাঁকে ধরে ফেলেন না বড়মা লজ্জা পেয়ে নিজে থেকেই ধরা দেন, তা আর এখন জানা সম্ভব নয়।

ভালোকাকার হিন্দী

মনোহরপুকুরের বাড়িতে আমাদের ছোটবেলায় কোন ফোন ছিলনা। চাইলেও তখন ফোনের লাইন পাওয়া যেতোনা। Calcutta Telephones এ apply  করে লাইন পেতে বছর দশেক অপেক্ষা করতে হতো। কিংবা তারও বেশী।  

সেই সময় ফোন থাকতো বনেদী বড়লোকদের বাড়িতে, কিছুটা Status symbol এর মতো। তেমন কোন emergency  হলে আমরা রাস্তার উল্টোদিকে হাঁদুবাবুদের বাড়িতে যেতাম ফোন করতে। আর মাঝে মাঝে ওই বাড়ি থেকে হাঁক পাড়তেন কেউ, “তোমাদের ফোন!”

আজকে এই সবার হাতে সেলফোন থাকার যুগে এক কালে ফোন ছাড়া কি করে আমরা জীবন কাটিয়েছি ভাবলে বেশ অবাক ই লাগে।      

আশির দশকে অজিত হালদার নামে একজন ডাক্তার আমাদের নীচের বাড়িতে ভাড়া থাকার সময় একটা ফোনের লাইন এর বন্দোবস্ত করেছিলেন। ডাক্তার হিসেবে হয়তো উনি হয়তো priority পেয়ে থাকবেন। যাই হোক, ওঁরা চলে যাবার পর ওই লাইনটা থাকায় ভালোকাকা একটা ফোনের কানেকশন পেয়ে যান। তার পর থেকে আমরা ফোন করতে হলে নীচের বাড়ি থেকেই করতাম।

কুয়েত থেকে সপ্তাহে একদিন মাকে ফোন করতাম। চৈতী নীচ থেকে মা’কে চেঁচিয়ে ডাকতো, “সেজমা, মান্টুদার ফোন!” কিছুক্ষণ ফোন ধরে অপেক্ষা করতে হতো, তারপর মা নীচে নেমে এসে ফোন ধরতেন।

মাঝে মাঝে চৈতী বা ভালোকাকীমা না থাকলে ভালোকাকা এসে ফোন ধরতেন। আর ধরেই কেন জানিনা হিন্দীতে কথা শুরু করে দিতেন।

“কৌন বোল রহেঁ হ্যায়?” কিংবা, “কিসকো চাহিয়ে?” ইত্যাদি।

ভালোকাকার কাছে ব্যবসা সূত্রে অনেক অবাঙ্গালী লোকের ফোন আসতো বোধ হয়। তাছাড়া টিভি তে অনবরত হিন্দী সিরিয়াল আর হিন্দি ছবি দেখার ও প্রভাব একটা ছিল হয়তো।

ভালোকাকার হিন্দী শুনে আমি বেশ বিব্রত বোধ করতাম মনে আছে। লাইন ও বেশীর ভাগ দিন বেশ খারাপ থাকত, বার বার “ভালোকাকা, আমি মান্টু” বললেও ভালোকাকা আমার কথা না শুনতে পেয়ে কেবল “কৌন?” “কৌন?” বলে যেতেন।

দুচ্ছাই বলে মাঝে মাঝে বেশ ব্যগ্র ইচ্ছে হতো বলি, “ভালোকাকা, ম্যায় মান্টু, কুয়েত সে ফোন কর রহা হুঁ, মাজী কো যরা বুলা দিজিয়েগা?”

বলিনি অবশ্য কোনদিন।

খোকনের মোবাইল চুরি

কিছুদিন আগে একটা কাজে কালীঘাট থানায় যেতে হয়েছিল।

সেখানে ডিউটি অফিসারের টেবিল এর কাঁচের তলায় মুক্তোর মত সুন্দর হাতের লেখায় দেখি একটা মোবাইল চুরির দরখাস্ত।

মহাশয়, অমুক তারিখে অমুক জায়গায় আমার মোবাইল ফোন (নং অমুক) চুরি হইয়াছে।

লিখেছেন কোন এক কাজল মুখার্জ্জী।

নীচে ইংরেজিতেও লেখা।

ওটা যে একটা sample চিঠি সেটা প্রথমে বুঝিনি।

বুঝলাম একটু পরেই যখন তিন জন ছেলে এসে বলল তাদের একজনের মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে গেছে একজন লোক।  কে সে, কেমন করে চুরি করলো, তারা অসাবধান হয়েছিল কিনা, ইত্যাদি অনেক প্রশ্নোত্তর চলল বেশ কিছুক্ষণ।

ডিউটি অফিসারের যুক্তি হল অসাবধান হয়ে থাকলে দোষটা তাদের। তারাও সেটা দেখলাম স্বীকার করে নিল।

তাতে খুসী হয়ে ডিউটি অফিসার ওদের কাজল মুখার্জ্জীর লেখা sample application দেখিয়ে বললেন,  “ঠিক এই ভাবে লিখে নিয়ে এসো তারপরে দেখবো। ”

ওদের কাছে কাগজ পেন নেই, চাইলে তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন।

“চিঠির draft করে দিচ্ছি এই না কত। তার ওপরে আবার বাবুদের কাগজ আর পেন দিতে হবে! হুঁ! আবদার! এটা কি থানা না মামাবাড়ী? যাও যাও নিয়ে এসো, আমার এখানে কাগজ পেন কিছু নেই। ”

মোবাইল ফোন চুরি, যা বুঝলাম খুব common এখন।

আজকাল একটা মোবাইল ফোন চুরি মানে হলো প্রায় সর্বস্ব চুরি যাওয়া।  সেখানে জীবনের বহু ব্যক্তিগত এবং মহামূল্যবান তথ্য এবং ছবি রাখা থাকে।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সব তথ্য ছবি ইত্যাদির কোন back up থাকেনা।  অতএব একবার ফোন হারিয়ে গেলে সেই মূল্যবান তথ্য আবার খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব , এবং যদিও বা সেই সব  যোগাড় করা সম্ভব হয় তার জন্যে ব্যাপক কাঠখড় পোড়াতে হবে এবং অনেক সময়  লাগবে।  এমন কি বছর খানেক বা তার বেশীও লেগে যেতে পারে।

এখন আমরা আছি Information age এ, এখন তথ্যই হলো সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু (Asset)।

এই নিয়ে একটা গল্প নীচে।

খোকন আমার ভাই।

———–

কাস্টমস ক্লাব থেকে একদিন সন্ধ্যায় খোকন বাড়ি ফিরছে, হাওড়া ইউনিয়ন মহামেডান ক্লাবের ঘেরা মাঠ ছাড়িয়ে রাস্তা পেরিয়ে মনুমেন্টের পাশে গিয়ে ট্রাম ধরবে, আর না পেলে আর একটু এগিয়ে বাস বা মিনিবাস।

ক্রমশঃ অন্ধকার নামছে, ময়দানের ওই জায়গাটা বেশ নির্জন। হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন কিছুটা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল ~ আপনার কাছে কি একটা মোবাইল ফোন আছে, দাদা?

কে রে বাবা?

খোকন তাকিয়ে দেখে পাশে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে, বেশভূষা দেখে গ্রামের ছেলে বলে মনে হয়, গায়ের রং কুচকুচে কালো, কথাবার্ত্তায় আর উচ্চারণে একটা টান আছে যা ক্যানিং বা লক্ষীকান্তপুরের লোকেদের গলায় শোনা যায়। 

ফোন আছে শুনে ছেলেটি প্রায় কেঁদে ফেলে বলল, আমার বাবার বড় অসুখ দাদা, আজ তেনাকে হাসপাতালে ভর্ত্তি কইরেছে, দয়া কইরে একটু ফোন টা দ্যান,আমি একটু বাবার সাথে কথা কই?”

এতো বড় বিপদ হল! খোকন ভাবলো এ এখন বাবার সাথে কতক্ষণ কথা বলবে কে জানে?

ছেলেটা বাজে কথা বলছেনা তো? একটু বাজিয়ে দেখবার জন্যে খোকন বলল “কি নাম্বার তোমার বাবার, আমি ফোন করে দেখছি, লাইন পাওয়া যায় কিনা।”

ছেলেটা যে নাম্বার বলল তাতে রিং হতে খোকন ছেলেটাকে ওর ফোন টা দিয়ে বললো, “নাও কথা বলো।”

ছেলেটা কান্নায় ভেঙে পড়ে বেশ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তার বাবার সাথে কথা একতরফা কথা বলতে লাগলো। তার কথাগুলো অনেকটা এরকম (খোকন বেশ ভাল নকল করে, আমি অতটা পারবোনা)~

“বাবা গো, তুমি কেমন আছো গো, তুমি হাসপাতালে কেন গেলে গো, তোমার কি হইয়েছে গো, আমি এখুনি তোমার কাছে আসতেছি গো…”

তার এই আকুলি বিকুলি কান্না দেখে খোকন বেশ একটু অপ্রস্তুত হল, ছেলেটিকে সন্দেহ করেছিল বলে তার মনে একটু দুঃখ আর লজ্জাও হল, কিন্তু তার পরে যা ঘটল তার জন্যে সে একেবারেই প্রস্তুত ছিলনা।

“আমি  এখুনি তোমার কাছে আসতেছি গো…আমি দৌড়ি দৌড়ি আসতেছি গো” বলতে বলতে ছেলেটি পাঁই পাঁই করে ছুট!

খোকন “আরে আরে কোথায় যাচ্ছো আমার ফোন দিয়ে যাও” বলতে বলতে ওর পিছনে ধাওয়া করেও কোন লাভ হলনা, এই বয়সে একটা অল্পবয়েসী ছেলের সাথে দৌড়ে কেউ পারে নাকি? তার ওপরে আবার গ্রামের ছেলে!

ইউসিন বোল্টের মত তীরবেগে ছুটে ছেলেটা ময়দানের অন্ধকারে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল।  খোকনের ফোন কানে ধরে তার বাবার সাথে কেঁদে কেঁদে কথা বলতে বলতে সে উধাও হয়ে গেল।

কাজের লোক

মনোহরপুকুরের বাড়ী ছেড়ে দেবার পরে জ্যেঠিমা দিদিভাই এর কাছে থাকতেন। আমি দেশে গেলে নিয়ম করে তাঁর সাথে দেখা করতে যেতাম। জ্যেঠিমা থাকতেন দিদিভাইদের বাড়ির এক তলার একটা ঘরে। জ্যেঠিমা তখন বিছানায় শয্যাশায়ী। উঠে বসতে পারতেন না। আমায় দেখে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। অনেক পুরনো দিনের কথা হতো আমাদের।

দিদিভাই এর বাড়ীতে অনেক কাজের লোক, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে জ্যেঠিমাকে দেখাশোনা করার জন্যে। আমরা জ্যেঠিমা কে দেখতে গেলে সেই কাজের লোকেরা আমাদের খুব দেখভাল করে। চা করে নিয়ে আসে, আর আমাদের গল্প করার সময় চুপ করে পাশে বসে থেকে খুব উৎসাহ নিয়ে আমাদের কথা শোনে।

তো একবার আমি আর সুভদ্রা গেছি জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে। দিদিভাই গেছে ওপরে আমাদের জন্যে চা নিয়ে আসতে। আর জ্যেঠিমার দু’জন কাজের লোক পাশে বসে আমাদের কথা শুনছে। তাদের মধ্যে একজনের গলা একটু ফ্যাঁসফ্যাঁসে,ভাঙা।

আমাদের সেদিন বোধহয় একটু তাড়া ছিল কোথাও যাবার, দেরী হয়ে গিয়েছিল তাই সুভদ্রা বেশ কয়েক বার “এবার আমরা উঠি” বলে তাড়া দিচ্ছিল।

সুভদ্রা যেই বলে “এবার আমরা উঠি”,  ওমনি ওই  ফ্যাঁসফ্যাঁসে,ভাঙা গলার মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “না গো,এখন যেউনি, একটু বোসো গো বৌদি, দিদি এই চা করে নিয়ে এলো বলে!”

এই রকম বার তিনেক হবার পরে, যেই ওই মেয়েটি আবার বলেছে “নাঁ গোঁ বৌঁদি, যেঁওনাকো”, সুভদ্রার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বোধ হয় অনেকক্ষণ থেকেই তার মেজাজ টা চড়ছিলা, আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। সুভদ্রা হঠাৎ দুম করে রেগে গিয়ে মেয়েটাকে এক ধমক দিয়ে বললো, “তুমি চুপ করো! তখন থেকে খ্যাঁকখ্যাঁকে গলায় চেঁচিয়ে যাচ্ছো!”

সেই ধমক খাবার পর থেকে যতক্ষণ ছিলাম, মেয়েটা চুপ করে বসে ছিল, একটা কথাও বলেনি।

পরের বার যখন জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে গেলাম, শুনলাম সেই  মেয়েটি নাকি চাকরী ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেছে।

ডঃ বীরেন বসু

ছোটবেলায় যে কোন কারণেই হোক আমার মাঝে মাঝেই অসুখ হতো।  জ্বর, পেটব্যথা, কাশি, এই সব।  বোধহয় immunity কম ছিল, তাই ।  

অসুখ হলে স্কুলে যেতে হতোনা, সেটা ওই বয়সে ভালোই লাগত অবশ্য, কিন্তু সারাদিন বাড়িতে ঘরে শুয়ে থাকাও বেশ কষ্টকর। ।  মা সকাল দশটায় অফিস চলে যেতেন, তার পর সন্ধ্যায় মা না ফেরা পর্য্যন্ত সারাদিন আমি জ্যেঠিমা আর কাকীমাদের হেফাজতে। মাথা ধুইয়ে দেওয়া, থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দেখা, ওষুধ খাওয়ানো, এসব তো ছিলই, তাছাড়া সংসারের নানা কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও দিনের মধ্যে মাঝে মাঝেই তাঁরা আমার শয্যার পাশে বসে খানিকক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে যেতেন । অসুখের দিনগুলোর স্মৃতির সাথে তাঁদের সেই স্নেহস্পর্শের স্মৃতি অবধারিত  মিশে আছে।

আর মনে পড়ে আমাদের গৃহচিকিৎসক ডঃ বীরেন বসুর কথা।  

আজকাল অসুখ হলে সবাই চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে যায়। কেননা সেখানে স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখানো ছাড়াও অনেক সুবিধে, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে সেখানে নানা যন্ত্রপাতি আছে, তাছাড়া নার্সরা ও নানা কাজে সাহায্য করে। আজকাল কোন রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলে রিসেপশনে রোগী এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের ভীড়ের বহর দেখলে ভির্মি খেতে হয়। কিন্তু ভীড় থাকলেও বিশেষ করে শক্ত অসুখ হলে হাসপাতাল যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

আর সেরকম শক্ত অসুখ না হলে আমরা আজকাল যাই ডাক্তারদের চেম্বারে। সেখানেও বেশ ভীড়, বহু রোগী। বিশেষ করে কোন নামী ডাক্তার হলে ভীড় আরও বেশী।

এই অভিজ্ঞতা কমবেশী আমাদের সকলের।

আমাদের ছোটবেলায় বাড়ীতে কারুর অসুখ হলে গৃহচিকিৎসক আসার (home visit) যে চল ছিল তা আজকাল প্রায় উঠেই গেছে।                    

আমাদের গৃহচিকিৎসক ছিলেন ডঃ বীরেন  বসু।   

উজ্জ্বলা সিনেমার উল্টোদিকে ওনার চেম্বার ছিল।  তার সাথে ছিল একটা Pharmacy  যার নাম ছিল ক্যালকাটা মেডিকাল হল।  আজ সেই উজ্জ্বলা সিনেমাও নেই, ক্যালকাটা মেডিকাল হলও নেই , সেখানে এখন বীরেন বাবুর ছোট ছেলে শিবাজীর চেম্বার।  শিবাজী এখন কলকাতায় একজন প্রথম সারির Urologist, তার চেম্বারে আমিও দুই একবার গেছি। বেশ রাত পর্য্যন্ত সেখানে বহু রোগীর ভীড়।

বীরেনবাবুর চেম্বার আমাদের বাড়ী থেকে বেশী দূরে না হলেও  আমার মনে পড়ে যে আমাদের ছোটদের অসুখ বিসুখ হলে বীরেনবাবু আমাদের বাড়ীতে এসেই দেখতেন। অসুখ হলে ওনাকে দেখাতে ওনার চেম্বারে কখনো গিয়েছি বলে মনে পড়েনা।

বীরেনবাবু থাকতেনও আমাদের বাড়ীর পিছনেই, ওঁর বাড়ীতে বা চেম্বারে গিয়ে একটা খবর দিলেই উনি  চেম্বার থেকে বাড়ী ফেরার পথে অথবা বাড়ী থেকে চেম্বারে যাবার পথে সময় করে ঠিক একবার আমাদের বাড়ীতে চলে আসতেন।              

বীরেন বাবুর ডাক্তার হিসেবে পাড়ায় খুব নাম ডাক ছিল। তিনি  প্রিয়দর্শন মানুষ ছিলেন,  সুন্দর হেসে কথা বলতেন, চমৎকার  ব্যবহার ছিল। ডাক্তারদের Home visit  করার সময় Bedside manners জানা খুব দরকার, সেই দিক দিয়ে বীরেন বাবু ছিলেন একজন আদর্শ গৃহচিকিৎসক। একদিকে হাসিখুসী অন্যদিকে রাশভারী, বীরেনবাবুর ব্যক্তিত্ব ছিল খুব আকর্ষনীয়। উনি এলেই বাড়ীতে একটা বেশ সোরগোল পড়ে যেতো।

একটা বড় চামড়ার ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকে উনি jযখন আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলতেন “কি গো, আবার কি অসুখ বাধিয়ে বসলে?” তখন মনে হতো ওনাকে দেখেই আমার অসুখ অর্দ্ধেক সেরে গেল।

ডাক্তারী ছাড়াও বীরেন বাবুর একটা সামাজিক আর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, কংগ্রেসের টিকিটে তিনি ভোটে জিতে আমাদের ওয়ার্ড থেকে কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হয়েছিলেন একবার।  সেটা ছিল ওনার ব্যক্তিত্বের আর একটা দিক। তিনি তাঁর ওয়ার্ডে নানা জনহিতকর সামাজিক কাজের সাথে জড়িত থাকতেন।      

আমাদের ছোটবেলায় Antibiotic এর প্রচলন হয়নি। Mass produced ট্যাবলেট এর ব্যবহারও তখন  সে ভাবে শুরু হয়নি।       সেই সময় ডাক্তারেরা  নানা ওষুধ মিশিয়ে একটা মিক্সচার prescribe করতেন, যা ছিল একজন রোগীর  জন্যেই তৈরী,  ইংরেজীতে যাকে বলে customised and tailored…

বীরেনবাবু তাঁর প্যাডে মিক্সচারের প্রেসক্রিপশন  লিখে দিতেন, আমরা সেই  প্রেসক্রিপশন নিয়ে Pharmacy তে যেতাম। সেখানে কম্পাউন্ডার বাবু সেই প্রেসক্রিপশন এ অনেকক্ষণ ধরে ভুরু কুঁচকে চোখ বোলাতেন, যেন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পড়ছেন। তার পর বলতেন, “আধ ঘন্টা পরে ঘুরে এসো খোকা, তৈরী করতে সময় লাগবে!”

শিবাজীর কাছে গেলে অথবা কালীঘাট পোস্টাপিসের পাশে ওই রাস্তা টা দিয়ে এখনো যখন হেঁটে যাই, তখন সেই ক্যালকাটা মেডিকাল হলে গিয়ে মিক্সচার আনার কথা মনে পড়ে। একটা বোতলে লাল রঙ এর ওষুধ, বোতলের গায়ে কাগজ কেটে ডোজের মাপ দেওয়া থাকতো।

আজকাল আরও অনেক কিছুর সাথে মিক্সচার ব্যাপারটাও উঠে গেছে।

অনুগ্রহ নারায়ন ঠাকুর

পাটনায় রান্নার লোকদের বাবাজী নামে ডাকা হতো, কিন্তু মনোহরপুকুরে রান্নার লোকদের সবাই ডাকতো ঠাকুর নামে।

আমার ছোটবেলায় মনোহরপুকুরে ঠাকুর ছিল একজন বিহারী লোক, তার নাম  অনুগ্রহ নারায়ণ ঝা। তার দেশ বিহারের ছাপরা জেলায়, ছিপছিপে সুদর্শন চেহারা, ফর্সা, বড় বড় চোখ, নাকের নীচে মস্ত গোঁফ আর মাথায় একটা মস্ত টিকি। যখন ছোট ছিলাম তখন সুযোগ পেলে ঠাকুরের টিকি ধরে টান দিয়ে খুব মজা পেতাম।     আমায় খুব ছোট বয়স থেকে দেখার ফলে আমার প্রতি তার একটা বিশেষ স্নেহের ভাব ছিল, তাই টিকি ধরে টান মারলেও সে রাগ করতোনা, প্রশ্রয়ের হাসি হাসতো।

আমাদের পারিবারিক এ্যালবামে ঠাকুরের সাথে মনোহরপুকুরের ছাতে তোলা আমার অনেক ছোটবেলার ছবি এখনো রাখা আছে। পুরনো হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর স্মৃতির মতো সেই ছবি গুলোও এখন বিবর্ণ।

অনুগ্রহ নারায়ণ আমাদের বাড়িতে  বোধ হয় দশ বছরের ও বেশী কাজ করেছিল। ক্রমশঃ ধর্মভীরু আর বিশ্বাসী এই লোকটি আমাদের পরিবারের অংশই হয়ে যায়।

একবার মনে পড়ে ঠাকুর আমাদের সব ভাইবোনদের নিয়ে রাসবিহারী এভিনিউতে জলযোগের লাল দই খাওয়াতে নিয়ে যায়। সেই দোকানে দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের একটা খুব বড় অয়েল পেন্টিং টাঙ্গানো ছিল, আর সাথে লেখা ছিল “জলযোগের পয়োধি খাইয়া বড় তৃপ্তি পাইলাম!”

পয়োধি মানে কি লাল দই? এই প্রশ্নটা সেই ছোটবেলাতেই মনে আসে। আর মনে পড়ে ঠাকুরের পিছন পিছন এক বিকেলবেলা আমরা ভাই বোনেরা সবাই দল বেঁধে নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য্য লেন দিয়ে নতুন পার্ক ছাড়িয়ে বিপিন পাল রোড দিয়ে হেঁটে চলেছি।  

ন’কাকার সাথে কিছু একটা বাদানুবাদ বা তর্কে জড়িয়ে পড়ে একদিনের মধ্যে আমাদের পরিবারের সাথে এতদিনের সম্পর্ক এক কথায় শেষ করে ঠাকুর দেশে ফিরে যায়। তার এই প্রখর আত্মমর্য্যাদাবোধের কথা ভাবলে এখনো বেশ অবাক লাগে।

অনুগ্রহ নারায়ণের ভাইয়ের নাম অনুরোধ নারায়ণ, দাদার জায়গায় সে পরে আমাদের বাড়ীতে কাজ করতে আসে কিছুদিনের জন্যে। সেও বেশ ফর্সা সুপুরুষ লোক ছিল, মাথাভর্ত্তি কালো চুল, হাতে উল্কি, বেশ শক্তসমর্থ চেহারা, কানে মাকড়ি পরতো, তারও মাথায় টিকি। নিয়ম করে রোজ সন্ধ্যায় সে তুলসীদাসের রামায়ণ পড়তো মনে আছে।

অনুগ্রহ, অনুরোধ, কি সব নাম!

এই সব নাম দেখে মনে হয় ওদের বেশ শিক্ষিত পরিবার ছিল। ওদের আর কোন ভাই ছিল নাকি? কে জানে, থাকলে তাদের নাম নিশ্চয় অনু দিয়ে শুরু – অনুমান,অনুরাগ, অনুনয়, অনুকূল, কিংবা অনুভব এই সব হবে!

আমাদের বাড়ির কাজ ছেড়ে চলে যাবার কয়েক বছরের মধ্যে অনুগ্রহনারায়ণের ক্যান্সার হয়। চিকিৎসার জন্যে কলকাতায় এসে সে আমাদের বাড়িতে কিছুদিনে জন্যে থেকেছিল। আশ্রয় দেবার সাথে সাথে বাবা কাকারা তার চিকিৎসাতে সাহায্য ও করে থাকবেন।

সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পথে মনোহরপুকুরে  কুঠুরী র মতো একটা  ছোট ঘর ছিল, আমরা বলতাম ঠাকুরের ঘর, সেই ঘরে মাথা নীচু করে কোন মতে ঢুকে শুয়ে পড়তে হবে, কেননা বসলেও মাথা দেয়ালে ঠেকে যেত।

সেই ঘরে চুপ করে শুয়ে থাকতো অনুগ্রহনারায়ণ ঠাকুর, মারণ রোগ তখন তার শরীরে বাসা বেঁধেছে, তার চেহারা শুকিয়ে প্রায় কঙ্কালের মতো, সারা মুখে ক্লান্তি, হতাশা আর জীবন শেষ হয়ে যাবার যন্ত্রণাবোধ। 

সেই সিঁড়ির ঘরের পাশ দিয়ে ওঠা নামা করার সময় আমার চোখাচোখি হতো তার সাথে, আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান কিন্তু পরিচিত একটা হাসি হাসতো ঠাকুর, তার সেই হাসিটা এখনো মনে পড়ে।  

সীতাদিদি

 ১

সীতা মনোহরপুকুরে কাজে এসেছিল চৈতীর বিয়ের এক মাস পর। মা কে জিজ্ঞেস করে জানলাম। তার মানে চল্লিশ বছর হয়ে গেল।

ক্যানিং লাইনে লক্ষ্মীকান্তপুরে সীতাদের গ্রাম। সেই ১৯৭২ সালে দুই মেয়ে কে নিয়ে সীতার জীবন সেখানে বেশ কষ্টের ছিল, কেননা তার বরের কোন কাজ বা উপার্জ্জন ছিলনা। ওর এক গ্রাম সম্পর্কে বোন অমলা মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীতে ঠিকে কাজ করত, সেই সীতা কে আমাদের বাড়ীতে প্রথম নিয়ে আসে।

অমলা কে মনে আছে, সে “র” বলতে পারতোনা। বোধহয় ওদের গ্রামে কেউই “র” বলেনা, সীতাও না। তাই তার নাম রমলা না অমলা এই নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে সে বলতো, “না না অমলা নয় গো, আমি অমলা~”

তো এই অমলা একদিন সীতাকে গিয়ে বললো, “তোকে আর ঘরে বইসে থাকতি হবেনাকো। আমার সাথে চল্‌ দিনি, বওমাকে (বড়মা, মানে জ্যেঠিমা, মনোহরপুকুরের সর্ব্বময়ী কর্ত্রী) বইলে একেচি। ওই বাড়িতে তোর  কাজ হইয়ে যাবে।”

সেই যে সীতা এল আমাদের বাড়ীতে কাজের লোক হয়ে, কবে যে সে ধীরে ধীরে পরিবারের একজন হয়ে গেল, আমরা জানতে পারলামনা।

১৯৭৬ সালে সীতার বড় মেয়ে খুব অল্পবয়েসে দুর্ঘটনায় মারা যায়। পুপুরাণী র জন্মের পর (১৯৭৭) আমরা ১৯৮০ সালে Ironside Road এ shift করার আগে তিন চার বছর মনোহরপুকুরে ছিলাম। সেই সময় ছোট্ট পুপুকে প্রায় নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসত সীতা, আগলে রাখত সব সময়। বিকেল বেলা হলে “চল্‌ সীতাদিদি, দুধ আনতে যাই” বলে পাড়ায় এক গোয়ালার কাছে সীতাদিদির হাত ধরে দুধ আনতে যেত পুপু, কিংবা সন্ধ্যায় “চল্‌ সীতাদিদি, উটি বেলতে যাই” বলে ছাদে রান্নাঘরে গিয়ে আটা আর বেলনা নিয়ে খেলা করতো। পুপু তখন সবাই কেই “তুই” বলে ডাকতো, তাই সীতাদিদিও “তুই”।

বেশ ছিল সেই দিনগুলো।

পুপুর প্রতি সীতার বাৎসল্য আর স্নেহের ভাব টা এখনও খুব গভীর। পুপু এলেই সে তার কাছে এসে গায়ে মাথায় হাত বোলায়, “আয় সোনামণি, তোর চুল টা বেঁইধে দিই” বলে একটা চিরুণী নিয়ে তার পাশে এসে বসে। 

জ্যেঠুকে বড়বাবা বলে ডাকতো সীতা। তাঁর জীবনের শেষের কয়েকটা বছরে প্রাণ দিয়ে তাঁকে সেবা করেছে সে। জ্যেঠুর মৃত্যুর পর মনোহরপুকুরের বাড়ী বিক্রী হয়ে গেলে সীতা মার কাছে Ironside Road এ চলে আসে। এখন মার দেখাশোনার ভার তার হাতেই।

আত্মীয়স্বজন কেউ  Ironside Road এর বাড়ীতে এলে সীতার খুব আনন্দ হয়।   তাদের সবার আদর আপ্যায়ন করার ভার মা তার ওপরেই ছেড়ে দেন আজকাল। সে আমাদের বিশাল পরিবারের সবাই কে চেনে, নিজের লোকের মতোই সবার খোঁজখবর নেয়। আমি তো সীতার আতিথ্যের বহর দেখে বেশ অস্বস্তি তে পড়ে যাই মাঝে মাঝে। দরজা দিয়ে ঢুকেছি কি ঢুকিনি, সীতা শুরু করে দেয়। দাদাবাবু, চা করি? সিঙ্গাড়া নিয়ে আসব? নিমকি খাবে? কাল বানিয়েছি তোমার জন্যে। একটা রসগোল্লা দিই?

মাকে নিয়ে অসুস্থ ছোটকাকা বা মৃত্যুশয্যায় শায়িত জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে গেলে অবধারিত সীতাকে ও নিয়ে যেতে যাবে আমাদের সাথে। না নিয়ে গেলে তার মন খারাপ হয়। এতদিন থেকে দেখেছে তাদের, এক সাথে এতদিন থেকেছে, তাই এখন তাদের শেষ দেখা দেখতে সে যাবেনা তা কি করে হয়?

সীতার বয়েস এখন ষাট ছাড়িয়েছে। চল্লিশ বছর ধরে বাড়ীর কাজে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে সে। এখন এই বয়েসে বেশী পরিশ্রম করার সামর্থ্য তার আর নেই। তার ওপরে বেশ কয়েক বছর তার diabetes হয়েছে, নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হয়। চোখেও কম দেখছে। সীতা কি এবার তার গ্রামে ফিরে গিয়ে ছোট মেয়ে, জামাই আর নাতি দের সাথে জীবনের বাকি দিনগুলো শান্তি তে কাটাবে? তার মাইনে টা আমি তাকে pension হিসেবেই দেবো বলে রেখেছি। চল্লিশ বছর নিষ্ঠা আর সততার সাথে কাজ করার পর এটুকু তো তার rightful due!

কিন্তু মুশকিল হলো সীতা আর তার গ্রামে ফিরতে চায়না। সেখানে পাকা বাড়ি নেই, বাড়িতে ঠান্ডা জল নেই, বোধহয় আলো পাখাও নেই। এতগুলো বছর শহরে কাটিয়ে তার অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। তাছাড়া যখন তার আরও বয়েস বাড়বে, শরীর আরও খারাপ হবে,  তখন গ্রামে চিকিৎসা হবে কিনা, তার মেয়ে জামাই আর নাতিরা তাকে ভালোবাসে খুব, ফোন করে প্রায়ই, কিন্তু ওদের কাছে ফিরে গেলে  তার প্রতি তাদের ব্যবহার কেমন হবে সে বিষয় ও তার সন্দেহ আছে।

তাছাড়া সে এখন আমাদের পরিবারের অংশ বলেই নিজেকে ভাবে, আমাদের ছেড়ে সে থাকবেই বা কি করে? আমরাই কি তাকে চলে যেতে বলতে পারবো কোন দিন?


————————-

পরিশিষ্ট

২০১৪ সাল থেকে সীতার আর কাজ করারা ক্ষমতা ছিলনা। ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হবার পরে তার শরীর ক্রমশঃ দুর্ব্বল হতে থাকে, চোখেও সে ভাল দেখতে পেতোনা। তখন তার মেয়ে সন্ধ্যা আর জামাই শ্রীমন্ত তাকে তাদের গ্রামে নিয়ে চলে যায়। আমি সীতাকে তার চিকিৎসার জন্যে নিয়মিত পেনশন এর টাকা পাঠাতাম। সীতার জামাই শ্রীমন্ত আমাদের বাড়ীতে এসে টাকা নিয়ে যেত, এবং প্রত্যেকবার আমাদের জন্যে তাদের বাগানের তরকারী আর পুকুরের মাছ দিয়ে যেতো।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর ২৫ শে সীতার মৃত্যু হয়। সন্ধ্যা আর শ্রীমন্ত খুব নিয়ম মেনে তার পারলৌকিক কাজ করেছিল।

সীতার পরলোকগত আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।

জন্মদিন

ছোটবেলায় জন্মদিন গুলো ছিল নিখাদ আনন্দের দিন।

খুব ভোরে উঠতে হত, মা আর জ্যেঠিমা র সাথে প্রতি বছর জন্মদিনে নিয়ম করে কালীঘাটে মায়ের মন্দির যেতাম।  পথে মহিম হালদার স্ট্রীটে নকুলেশ্বর শিবের মন্দির পড়ত। মা আর জ্যেঠিমার সাথে আমিও শিবলিঙ্গের  মাথায় জল ঢালতাম।

আমার জন্মদিনের সাথে ভোরবেলার কালীঘাটের মন্দির আর সিঁদুর লাগানো প্যাঁড়ার ঠোঙ্গার তাই অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক।

সারাদিন কাটতো গভীর আনন্দে, ওই দিনটা যেন শুধু আমার।

বিকেলে মনোহরপুকুরের বাড়ীতে  অনেকে আত্মীয় স্বজন আসতেন, আমরা ছোটরা সারা বিকেল আর সন্ধ্যা হৈ হৈ করে হুটোপাটি করতাম। এখনকার মত কেক কাটা আর গান গাওয়া অবশ্য তখন হতোনা, বেলুন দিয়ে বাড়ী  সাজানোর প্রথাও তখন বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারে শুরু হয়নি।  কিন্তু খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হত বেশ বড় করে। আর পায়েস তো হতোই।  সাথে লুচি বা পোলাও আর মাংস।

একটু রাত হলে সবাই চলে যাবার পর আমি বসতাম উপহার পাওয়া বই নিয়ে। সে যুগে বই উপহার দেবারই চল ছিল। ছোট বেলা থেকেই আমি ছিলাম বইয়ের পোকা, নতুন বইয়ের মলাট খুলে যে গন্ধ টা পেতাম তার মজাই আলাদা।

জয়ন্ত মাণিক আর বিমল কুমার দের নিয়ে হেমেন্দ্র কুমার রায়ের গোয়েন্দা কাহিনী তো ছিলই, তা ছাড়া কত বিদেশী বই য়ের বাংলা  সংস্করণ, Hunchback of Notre Dame, Count of Monti Christo, Three Musketeers, Last days of Pompei, এবং এই রকম আর ও কত বই তখন জন্মদিনে উপহার পেয়ে গোগ্রাসে গিলেছি। আর একটু বড় হবার পরে  পেতাম শরৎচন্দ্র বঙ্কিম চন্দ্র…

আমার দশ বছরের জন্মদিন আমার মা মনোহরপুকুরের বাড়ীতে খুব বড় করে celebrate করেছিলেন মনে আছে, এই সাথে সেই দিনের দু’টো ছবি। সেদিন আমায় মা ধুতি পাঞ্জাবী পরিয়েছিলেন, আমার একেবারেই ভাল লাগেনি, ধুতি পরে কি সারা ছাতময় ভাই বোন দের সাথে দৌড়াদৌড়ি করা যায়? কিন্তু সেই বয়সে মা’র কথাই শেষ কথা। কি আর করা যাবে? ছবিতে দেখা যাচ্ছে আমার পাঞ্জাবীটা বেশ stylish, মাঝখানে নয়, ডান দিকে বোতাম।

কত দিন হয়ে গেল, তবু সেই দিনটার কিছু স্মৃতি এখনো আমার বেশ মনে থেকে গেছে।

দুপুরে তিন তলায় রান্নাঘরের পাশে মেঝেতে আসন পেতে আমি খেতে বসেছি, আমার থালার চারিদিকে বাটি সাজানো , আর আমার মাস্তুতো দাদা রতন দা আমার সামনে ক্যামেরা নিয়ে  সমানে বলে যাচ্ছে মুখ তোল্‌,  একটু হাস্‌…

কিংবা বিকেলেবেলা ছাদে প্রচুর ভীড়, তার মধ্যে মা আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন রতন আমাদের দু’জনের একটা ছবি তুলে দে তো। ছবিতে দেখছি আমার ভুরু কোঁচকানো, বেশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমায় ছবি তুলতে হচ্ছে, তোলা হয়ে গেলেই মা’র হাত ছাড়িয়ে আমি ছুট মারবো ভাই বোনদের সাথে খেলতে।

সেদিন আমায় কে যেন একটা গ্যাস বেলুন দিয়েছিলো, সেটা আকাশে উড়িয়ে আমি শক্ত করে সুতোটা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় কেউ একজন, বোধহয় ছোটকাকা, আমায় এসে “ মান্টু, একটা মজা দেখবি” বলে আমার হাত থেকে সুতো টা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি অসহায় হয়ে দেখলাম বেলুনটা  ভাসতে ভাসতে আকাশে হারিয়ে গেল।

সেই হারানো বেলুনটার জন্যে সেদিন খুব দুঃখ হয়েছিল।

আমার ছোটবেলার জন্মদিন গুলোও সেই বেলুনটার মতই বহুদিন হারিয়ে গেছে।