নতুন পোস্ট

  • জন্মদিন

    ছোটবেলায় জন্মদিন গুলো ছিল নিখাদ আনন্দের দিন।

    খুব ভোরে উঠতে হত, মা আর জ্যেঠিমা র সাথে প্রতি বছর জন্মদিনে নিয়ম করে কালীঘাটে মায়ের মন্দির যেতাম।  পথে মহিম হালদার স্ট্রীটে নকুলেশ্বর শিবের মন্দির পড়ত। মা আর জ্যেঠিমার সাথে আমিও শিবলিঙ্গের  মাথায় জল ঢালতাম।

    আমার জন্মদিনের সাথে ভোরবেলার কালীঘাটের মন্দির আর সিঁদুর লাগানো প্যাঁড়ার ঠোঙ্গার তাই অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক।

    সারাদিন কাটতো গভীর আনন্দে, ওই দিনটা যেন শুধু আমার।

    বিকেলে মনোহরপুকুরের বাড়ীতে  অনেকে আত্মীয় স্বজন আসতেন, আমরা ছোটরা সারা বিকেল আর সন্ধ্যা হৈ হৈ করে হুটোপাটি করতাম। এখনকার মত কেক কাটা আর গান গাওয়া অবশ্য তখন হতোনা, বেলুন দিয়ে বাড়ী  সাজানোর প্রথাও তখন বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারে শুরু হয়নি।  কিন্তু খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হত বেশ বড় করে। আর পায়েস তো হতোই।  সাথে লুচি বা পোলাও আর মাংস।

    একটু রাত হলে সবাই চলে যাবার পর আমি বসতাম উপহার পাওয়া বই নিয়ে। সে যুগে বই উপহার দেবারই চল ছিল। ছোট বেলা থেকেই আমি ছিলাম বইয়ের পোকা, নতুন বইয়ের মলাট খুলে যে গন্ধ টা পেতাম তার মজাই আলাদা।

    জয়ন্ত মাণিক আর বিমল কুমার দের নিয়ে হেমেন্দ্র কুমার রায়ের গোয়েন্দা কাহিনী তো ছিলই, তা ছাড়া কত বিদেশী বই য়ের বাংলা  সংস্করণ, Hunchback of Notre Dame, Count of Monti Christo, Three Musketeers, Last days of Pompei, এবং এই রকম আর ও কত বই তখন জন্মদিনে উপহার পেয়ে গোগ্রাসে গিলেছি। আর একটু বড় হবার পরে  পেতাম শরৎচন্দ্র বঙ্কিম চন্দ্র…

    আমার দশ বছরের জন্মদিন আমার মা মনোহরপুকুরের বাড়ীতে খুব বড় করে celebrate করেছিলেন মনে আছে, এই সাথে সেই দিনের দু’টো ছবি। সেদিন আমায় মা ধুতি পাঞ্জাবী পরিয়েছিলেন, আমার একেবারেই ভাল লাগেনি, ধুতি পরে কি সারা ছাতময় ভাই বোন দের সাথে দৌড়াদৌড়ি করা যায়? কিন্তু সেই বয়সে মা’র কথাই শেষ কথা। কি আর করা যাবে? ছবিতে দেখা যাচ্ছে আমার পাঞ্জাবীটা বেশ stylish, মাঝখানে নয়, ডান দিকে বোতাম।

    কত দিন হয়ে গেল, তবু সেই দিনটার কিছু স্মৃতি এখনো আমার বেশ মনে থেকে গেছে।

    দুপুরে তিন তলায় রান্নাঘরের পাশে মেঝেতে আসন পেতে আমি খেতে বসেছি, আমার থালার চারিদিকে বাটি সাজানো , আর আমার মাস্তুতো দাদা রতন দা আমার সামনে ক্যামেরা নিয়ে  সমানে বলে যাচ্ছে মুখ তোল্‌,  একটু হাস্‌…

    কিংবা বিকেলেবেলা ছাদে প্রচুর ভীড়, তার মধ্যে মা আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন রতন আমাদের দু’জনের একটা ছবি তুলে দে তো। ছবিতে দেখছি আমার ভুরু কোঁচকানো, বেশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমায় ছবি তুলতে হচ্ছে, তোলা হয়ে গেলেই মা’র হাত ছাড়িয়ে আমি ছুট মারবো ভাই বোনদের সাথে খেলতে।

    সেদিন আমায় কে যেন একটা গ্যাস বেলুন দিয়েছিলো, সেটা আকাশে উড়িয়ে আমি শক্ত করে সুতোটা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় কেউ একজন, বোধহয় ছোটকাকা, আমায় এসে “ মান্টু, একটা মজা দেখবি” বলে আমার হাত থেকে সুতো টা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি অসহায় হয়ে দেখলাম বেলুনটা  ভাসতে ভাসতে আকাশে হারিয়ে গেল।

    সেই হারানো বেলুনটার জন্যে সেদিন খুব দুঃখ হয়েছিল।

    আমার ছোটবেলার জন্মদিন গুলোও সেই বেলুনটার মতই বহুদিন হারিয়ে গেছে।

  • প্রতিমা

    সুভদ্রা একদিন আমায় Ironside এ নামিয়ে Forum এ কেনাকাটা করতে চলে গেছে, আমি বাড়ীতে ল্যাপটপে বসে কাজ করছি, এমন সময় হঠাৎ দরজায় বেল। এই ভর দুপুরে আবার কে এল?

     দরজা খুলে দেখি প্রতিমা।  

    প্রতিমা আমাদের ফ্ল্যাটে দিনের বেলা ঠিকে কাজ করে। তাছাড়া রাত্রে সে মা’র ঘরে শুয়ে ঘুমোয়, দরকার পড়লে  উঠে মা’কে বাথরুমে নিয়ে যায়।   

    সকালে আজ আমরা তাড়াতাড়ি বেরিয়েছি, প্রতিমা সকালে এসে ঘর ঝাড়াঝুড়ি করে দিয়ে গেছে, কিন্তু ঘর মোছার আর সময় পায়নি। আমায় বাড়ীতে দেখে একগাল হেসে প্রতিমা বললো, “আমি দেখতে এলাম তোমরা বাড়ীতে আছো কিনা। ঘরটা মুছে দিয়ে যাই?”

    অবাক হয়ে গেলাম। কি কাজের মেয়ে বাবা? এরকম দায়িত্ববোধ দেখা যায়না।

    জবা আমাদের বাড়ীতে চব্বিশ ঘন্টার লোক, সে বললো, “প্রতিমাদি কাজ ছাড়া থাকতে পারেনা। শীতলা মন্দিরের কাছে যে বাড়ীতে ও কাজ করে, তারা মাসে মাত্র এক হাজার টাকা দেয় আর কতো কাজ করিয়ে নেয়। রোজ সকালে বাজার করা থেকে শুরু করে রোগী দেখা, ঘর ঝাড়পোঁছ সব হাসিমুখে করে।”

    মা র কাছে রোজ রাত্রে এসে শোয় প্রতিমা, কিন্তু শুয়েও যেন তার ঘুম আসেনা। জবা ওকে বলে, “প্রতিমাদি’ তুই সারারাত এই বারান্দায় হেঁটে বেড়া, তোকে আর ঘুমোতে হবেনা।”

    প্রতিমা রোজ পাঁচ ছয়টা বাড়িতে কাজ করে রাত্রে মা’র কাছে গিয়ে শোয়, রাত্রে দরকার মতো উঠে মা’কে বাথরুমে নিয়ে যায়। সকালে মা কে ভাল করে তেল মালিশ করে স্নান করিয়ে তার পরে গড়িয়াহাটে বাজার করে শীতলা মন্দিরের কাছে এক বাড়িতে কাজ করতে যায়।

    রাত্রে মা’র কাছে থাকে বলে তার গ্রামের বাড়িতেও নিয়মিত যাওয়া হয়না। মাসে দুমাসে একবার কি দুবার যায় কেবল, ছেলেকে টাকা দিতে।

    প্রতিমা এত হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটে, তবু তার মুখে সবসময় হাসি। ওর শরীরে কি কোন ক্লান্তি নেই? কিছুদিন আগে তার মুখে একটা ঘা হয়েছিল অপারেশন করার পর মুখটা অল্প বেঁকে আছে, ক্যান্সার নয়তো?

    না না, তা কি করে হয়? ক্যান্সার হলে কি আর এই খাটুনী সে খাটতে পারতো?

    প্রতিমার বড় ছেলে সারদা চিট ফান্ডের এজেন্ট ছিল। সেই চিট ফান্ড ডুবে গেছে, চিটফান্ডের মালিক সুদীপ্ত সেন এখন জেলে। যাদের কাছ থেকে প্রতিমার ছেলে  টাকা নিয়েছিল, তারা এখন তার কাছ থেকে সেই টাকা ফেরৎ চাইছে। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা সে কোথা থেকে ফেরৎ দেবে?

    সারদার এরকম অনেক এজেন্ট টাকা ফেরৎ দিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে শোনা যায়।

    প্রতিমা তার ছেলেকে বলেছে তুই ভয় পাসনা, আমি রোজগার করে তোকে পাঁচ লাখ টাকা এনে দেবো।

  • অন্ধ ধোপা

    মনোহরপুকুরে আমাদের ছোটবেলায় একজন ধোপা বাড়ী তে কাপড় নিয়ে আসত, তার একটা চোখ অন্ধ, সব সময় বোঁজা থাকতো – তাকে কি কারুর মনে আছে?

    ছোটখাটো মানুষটি, কাঁধে একটা বিশাল ভারী কাপড়ের বস্তা নিয়ে সে সামান্য কুঁজো হয়ে আমাদের পাড়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, এই দৃশ্য প্রায়ই দেখা যেত।

    আমাদের বাড়ীতে কাপড় দিতে আর নিতে সে আসতো সন্ধ্যাবেলা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে   আলোর নীচে বারান্দায় এসে কাঁধ থেকে কাপড়জামার স্তূপ নামিয়ে সে উবু হয়ে বসতো। মা জ্যেঠিমা কাকীমা রা সবাই এসে নিজের নিজের কাপড় জামার হিসেব মিলিয়ে নিতেন।

    ভালোকাকীমা র কাজ ছিল একটা মোটা ধোপার খাতায় সব হিসেব লিখে রাখা।

    মাঝে মাঝেই হিসেব মিলতোনা।

    তখন ওই ধোপা বেচারা  মা কাকীমাদের কাছে solid বকুনি খেতো। কাপড় কম হলে তো বটেই, এমন কি কাপড় কয়েকটা বেশী এসে গেলেও মা রা মনের সুখে তাকে বকতেন আর সে মুখ বুঁজে বকুনী খেয়ে যেত। “হাঁ মাইজী, নেহী মাইজী” ছাড়া তার মুখে কোন কথাও শুনিনি কোনদিন।

    বাবুরাম সাপুড়ের সেই বিখ্যাত সাপের মতোই নিরীহ নির্ব্বিবাদী লোক ছিল আমাদের সেই অন্ধ ধোপা।

     ২

    একবার ছোটকাকীমা দুই দিন পরে দানাপুর যাবেন, তাঁর একটা শাড়ী ধোপার কাছে পড়ে আছে, সেই শাড়ি টা তার এতদিনে দিয়ে যাবার কথা, কিন্তু সে আসেনি, আমার ওপর ভার পড়ল ধোপার বাড়ী গিয়ে সেই শাড়ী নিয়ে আসার।

    খুঁজে খুঁজে এক পড়ন্ত বিকেলে গিয়ে পৌঁছলাম ধোপার আস্তানায়। জায়গাটা হলো দেওদার স্ট্রীট। হাজরা রোড আর বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের মাঝামাঝি,  ডোভার রোড দিয়ে  ঢুকতে হয়।  

    একটা অন্ধকার সরু গলি র দুই পাশে ঘন বস্তী, অন্ধকার হয়ে আসছে, রাস্তায় ম্লান আলো।  বাচ্চারা খেলছে, তাদের কলরব, সব মিলিয়ে একটা নোংরা, ময়লা পরিবেশ, এখানে আমাদের কাপড় কাচা হয়?

    বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের ওই upmarket locality র একদম পাশে ধোপাদের ওই বস্তী দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম মনে পড়ে।

    শেষ পর্য্যন্ত সেই অন্ধ ধোপার ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। সে আমায় দেখে খুব লজ্জিত হয়েছিল, যতদূর মনে পড়ছে শরীর খারাপ বলে সে আসতে পারেনি আমাদের বাড়ি। ছোটকাকীমার শাড়ীটা আমায় সেদিন দিয়েছিল কিনা, অথবা পরের দিন দিয়ে এসেছিল কিনা তা আর এখন মনে পড়েনা।

    কিন্তু সেই অন্ধ ধোপা কে ভুলিনি। তার নিজের থেকেও ভারী কাপড়ের বিশাল বস্তা নিয়ে ছোটখাটো মানুষটার অল্প কুঁজো হয়ে পাড়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া, আমাদের বাড়ীর বারান্দায় মা কাকিমাদের সামনে উবু হয়ে বসে তার চুপ করে বকুনি খাওয়া, নোংরা বস্তীর মধ্যে তার অন্ধকার ছোট ঘরে হঠাৎ আমায় দেখে অপ্রস্তুত হওয়া, এই সব এখনো ছবির মতো মনের মধ্যে রয়ে গেছে। 

  • সুন্দর বাবু

    আমাদের ছোটবেলায় পঞ্চাশের দশকে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা ছোটদের গোয়েন্দা উপন্যাস খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। জন্মদিনে আমরা এই সব বই (“যখের ধন”, “আবার যখের ধন”, “নীল পত্রের রক্ত লেখা”) উপহার পেতাম, আর গোগ্রাসে গিলতাম।

    সেই সব উপাদেয় গল্পে  মোটাসোটা পুলিশ অফিসার সুন্দরবাবুকে তোমাদের মধ্যে যারা আমার সমবয়েসী তাদের মনে আছে  নিশ্চয়।  সেই পুলিশ ইন্সপেক্টর সুন্দরবাবু কে হেমেন্দ্রকুমার বেশ একটা কমিক (হাসির) চরিত্র করেই উপস্থিত করেছেন তাঁর গল্পে। তিনি জয়ন্ত আর মাণিকের বাড়ী তে এসে ডিমের “মামলেট” খেতেন আর কথায় কথায় “হুম” বলতেন। 

    এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কি আর এই সব বই পড়ে? বোধহয় না।

    আমার এই লেখাটি অবশ্য অন্য একজন সুন্দরবাবুকে নিয়ে।

    কিছুদিন আগে কাগজে পড়েছিলাম JEE Entrance Application form এর সাথে ছবি তে অনেকে নানা ভঙ্গী তে তোলা নিজের সেলফি পাঠিয়েছে, সবাই নানা ড্রেসে। চকরা বকরা সার্ট , মাথায় টুপি, চোখে সান গ্লাস। কেউ হাসছে কেউ নাচছে, কারুর মুখে সিগারেট…

    তাদের এই সব ছবি দেখে কর্তাব্যক্তিরা যাকে বলে থ।

    এসব কি হচ্ছে টা কি? 

    আমরা তো college application এর পাসপোর্ট সাইজের ছবি স্টুডিও থেকে  তুলিয়ে পাঠাতাম। সেই ছবি তে সাধারণতঃ আমাদের শুধু গম্ভীর গোমড়া মুখ। কদাচিৎ এক চিলতে হাসি।

    দিন কাল কত পালটে গেল, ভাবা যায়না।

    আমাদের ছোটবেলায়  বাড়ীর কাছে হাজরা  রোড আর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোডের মোড়ের দক্ষিণ পূর্ব্ব কোণে একটা বিরাট বাড়ির দোতলায় একটা স্টুডিও ছিল, তার নাম সুন্দর স্টুডিও।  সেই স্টুডিও তে আমরা ছোটবেলায় এবং বড় হয়ে ফটোও তুলতে গেছি অনেকবার। ছোটবেলায় পারিবারিক অনেক ফটো সেই স্টুডিও তে তোলা হয়েছে, তার পরে কলেজ ভর্তি বা চাকরীর application এর জন্যে পাসপোর্ট ফটো দরকার হলে ওখানেই গিয়েছি।

    হাজরা মোড়ে মানুষের ভীড় ট্রাম বাস গাড়ীর ব্যস্ততার মধ্যে ওই বিশাল বাড়ীটার কথা বেশ মনে  পড়ে।  বাড়ীর তলায় ফুটপাথে  জুতো পালিশওয়ালারা সারি সারি বসে থাকতো।  আর টাইপরাইটার মেশিন নিয়ে বসে খুব মন দিয়ে বেশ কিছু মাঝবয়েসী চশমা পরা লোক ভুরু কুঁচকে কাগজ দেখে দেখে ঠকাঠক শব্দ করে টাইপ করতো।  আর ছিল অনেক খবরের কাগজ আর পত্রপত্রিকার স্টল, সেখান থেকে প্রায়ই সাপ্তাহিক  দেশ পত্রিকা কিনেছি।  তাছাড়া ছিল একটা সরবতের দোকান।  গরমকালে সেখানে ঠান্ডা বরফ মেশানো লেবু সরবত স্ট্র দিয়ে চোঁ চোঁ করে খেয়ে তেষ্টা মিটিয়েছি অনেক।   

    বাড়ীটার ওপরে বড় বড় অক্ষরে ইংরেজীতে SUNDAR STUDIO লেখা বিশাল হোর্ডিং, অনেক দূর থেকে চোখে পড়ত।

     ষাটের দশকে যখন প্রথম নিজের ক্যামেরা দিয়ে ফটো তোলা শুরু করি, তখন ফিল্ম ডেভেলপ আর প্রিন্ট করাতেও আমি সেখানে প্রায়ই যেতাম। কাছাকাছি সেই সময় আর কোন স্টুডিও ছিলনা।

    সরু অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে দোতলায় উঠে স্টুডিওর দরজা। ঢুকেই একটা ঘর, সেখানে স্টুডিওর মালিক এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোকের অফিস। ঘরটা বেশ সুন্দর সাজানো, customer  দের বসবার জন্যে সোফা, দেয়ালে এক সুন্দরী লাস্যময়ী যুবতীর অনেক হাস্যমুখী ছবি টাঙানো।

    উচ্চারণে একটু টান থাকলেও ভদ্রলোক বাংলাটা মোটামুটি ভালই বলতে পারতেন। তাঁর বেশভূষা দেখলে তাকে বেশ সৌখীন লোক বলেই মনে হতো। ছোটখাটো কিন্তু বেশ ফিটফাট চেহারা, ব্যাকব্রাশ করা চুল, পরিস্কার ইস্ত্রী করা জামাকাপড়, গলায় একটা রঙ্গীন স্কার্ফ, পালিশ করা চকচকে জুতো। ফটো তোলা থেকে শুরু করে ল্যাবের কাজ সব তিনি একাই করতেন মনে হয়, তাঁর কোন assistant কে কোনদিন দেখেছি বলে মনে পড়েনা।

    স্টুডিওর ওই ঘরটার আর একটা দরজা ছিল বাড়ির ভেতরে যাওয়ার। সেখানে একটা পর্দা টাঙ্গানো থাকত। মাঝে মাঝে সেই পর্দা সরিয়ে এক মোটাসোটা মহিলা  ভেতরে ঢুকে ভদ্রলোকের সাথে বেশ ঝগড়ার বা আদেশের ভঙ্গিতে কথা বলতেন মনে আছে। তাঁর সাথে পায়ে পায়ে একটা গোলগাল বাচ্চা ছেলেও আসত। সেও মার সাথে বাবার দিকে বেশ একটা বিরক্তির দৃষ্টি নিয়ে তাকাতো, যেন মার সাথে সেও বাবা কে কিছুটা বকুনী দিতে পারলে খুসী হয়।

    মা আর ছেলে কে দোকানে customer দের সামনে দেখলে ভদ্রলোক স্পষ্টতঃই বেশ অপ্রস্তুত হতেন। নীচু গলায় বার বার হিন্দী তে বলতেন, ঠিক আছে, ভেতরে যাও, আমি আসছি। কিন্তু ভদ্রমহিলা তাঁর কথা শেষ না করে যেতেন না।

    একবার আমি আর আমার ভাই খোকন ওই দোকানে বসে আছি, এমন সময় সেই ভদ্রমহিলার প্রবেশ। খোকন আমায় ফিসফিস করে বললো সুন্দরবাবুর বৌ, বুঝলি?

    সুন্দরবাবু? সে আবার কে?  আমি একটু ব্যোমকেই গেলাম।

    তার পর বুঝলাম ও হরি, খোকন স্টুডিওর নাম থেকে ওই পাঞ্জাবী ভদ্রলোকের নাম দিয়েছে সুন্দরবাবু। 

    দেয়ালে টাঙানো ছবির ওই সুন্দরী লাস্যময়ী যুবতী ইনিই নাকি?  মুখের মিল আছে সন্দেহ নেই। খোকনের observation  যথারীতি অব্যর্থ এবং নির্ভুল! 

    এক সময় এই ছবির মেয়েটির প্রেমে পড়ে একে বিয়ে করেছিলেন সুন্দরবাবু, এখন এত বছর পরে সে মেয়েটি হারিয়ে গেছে, সে প্রেমও বোধ হয় আর নেই, এখন শুধু গঞ্জনা আর কথা কাটাকাটি।

    তার পর বহুদিন কেটে গেছে।

    যতদূর মনে পড়ে আশির দশকের প্রথম দিকে বাজারে Colour film আসার পর সুন্দরবাবুর ব্যবসা মার খেতে শুরু করে। ততো দিনে তাঁর ছেলে বেশ বড়ো আর লায়েক হয়ে গেছে। শেষের দিকে গেলে মাঝে মাঝে সেই ছেলেকেই বাবার জায়গায় কাউন্টারে বসতে দেখতাম। তার পর কালের নিয়ম মেনেই সে দোকান উঠে গেছে।

    এখন এই  Digital Photography র যুগে এসে মাঝে মাঝে যখন  album খুলে সেই পুরনো Black and white ফটো গুলো দেখি, তখন সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে, আর সুন্দরবাবুর গলায় রঙ্গীন স্কার্ফ ফিটফাট চেহারা আর বাইরের লোকের সামনে বৌয়ের গঞ্জনা খেয়ে অপ্রস্তুত মুখটাও ভুলতে পারিনা।

    —————

    সাথের দুটো ছবি সুন্দর স্টুডিও তে তোলা।

    প্রথম টা মা’র সাথে আমি –   ছেলেকে বেশ সাজিয়ে গুজিয়ে মা নিয়ে গেছেন ছবি তোলাতে।  তখনকার দিনে এই ধরণের ছবি তোলার চল ছিল।  এখন তো আর স্টুডিওতে যাবার দরকার পড়েনা।  বাড়ীতেই মা বাবারা তাঁদের শিশুদের ইচ্ছেমতো ছবি তুলে নিতে পারেন। 

    দ্বিতীয় ছবিতে দুই জ্যাঠতুতো দিদির সাথে আমি।  লক্ষ্য করলে দেখবে তিনজনে তিন দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হয় আমাদের সামনে আমাদের তিন মা আমাদের direction দিচ্ছেন,  সোজা হয়ে বসো, হাসো, সামনের দিকে তাকাও, ইত্যাদি।     

    সুন্দরবাবু বেশ ভালো  ছবি তুলতেন, স্বীকার করতেই হবে।

  • নয় নম্বর

    আমাদের বাড়ীটা ছিল মনোহরপুকুর রোডের  ঠিক ওপরে, সেখানে দোতলায় উত্তর দিকে রাস্তার দিকে মুখ করা একটা ছোট বারান্দা ছিল, সেখানে  দাঁড়ালে নীচে রাস্তায় একটা চলমান জীবন চোখে পড়তো।  সেই বারান্দাকে আমরা উত্তরের বারান্দা বলতাম। 

    বিশেষ করে বর্ষা কালে তুমুল বৃষ্টি হলে বাড়ী থেকে বেরোতে পারতামনা, আর আমাদের বাড়ীর ঠিক সামনে চট করে জল জমে যেতো। বর্ষা ভেজা সেই বিকেলগুলো আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে জমা জলের মধ্যে ছাতা মাথায় হাঁটু পর্য্যন্ত কাপড় তুলে লোকজনের যাতায়াত আর ঘন্টি বাজানো হাতে টানা রিক্সা দেখতাম।

    পূজোর পরে কাছাকাছি পাড়ার যত বিসর্জ্জনের ঠাকুর ট্রাকে করে আমাদের বাড়ীর সামনে দিয়ে চলে যেতো, সেই সব আলো ঝলমলে ট্রাকের আগে আর পিছনে বহু লোক নাচতে নাচতে যেতো। তাদের সাথে থাকতো প্রচন্ড আওয়াজের প্যাঁ পোঁ ব্যান্ড পার্টি। খুব আস্তে আস্তে অনেকক্ষণ ধরে যেত তারা, আমাদের বারন্দায় বাড়ীর সকলে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। একের পর এক ঠাকুর যেতো, দূর থেকে তাদের প্যাঁ পোঁ আওয়াজ পেলেই  ভাই বোনদের মধ্যে কেউ আমাদের সবাই কে ডাকতো “ঠাকুর আসছে ঠাকুর আসছে…” আর তাই শুনে আমরা সব কাজ ফেলে হুড়মুড় করে ছুটে উত্তরের বারান্দায় চলে যেতাম।

    আর মনে পড়ে দিবারাত্র সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতার কথা।

    আমাদের ছোটবেলায় পাড়ার ক্লাব সাথী সংঘের পরিচালনায়  দিবারাত্র সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা হতো । কে সব চেয়ে বেশী দিন অবিরাম সাইকেল চালাতে পারে। যে সব থেকে বেশী দিন সাইকেল এর ওপর থাকবে তার জন্যে বোধ হয় পাঁচশো টাকা  পুরস্কার ছিল। পাঁচশো টাকা সেই সময় অনেক টাকা। 

    সেই সাইকেল চালানোর রুট টা সাথী সঙ্ঘ থেকে শুরু হয়ে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গিয়ে সতীশ মুখার্জ্জী রোড, রাসবিহারী এভিনিউ, লেক মার্কেট হয়ে দেশপ্রিয় পার্ক দিয়ে ল্যান্সডাউন ধরে আবার সাথী সঙ্ঘের পাশ দিয়ে মনোহরপুকুর রোড ধরত।

    প্রথম চব্বিশ ঘন্টা সবাই বেশ চটপট তাড়াতাড়ি সাইকেল চালাত, তাদের তখন প্রচুর এনার্জি।  কিন্তু আটচল্লিশ ঘন্টা হয়ে গেলে ক্রমশঃ সবাইকে বেশ ক্লান্ত আর নির্জীব দেখাত, বাড়ির সামনে দিয়ে তারা যাবার সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা বেশ উৎসাহের সাথে তাদের দেখতাম।

    প্রত্যেকের জামায় কাগজে একটা করে নাম্বার লাগানো থাকতো। নয় নম্বর যার, সেই লোকটা ছিল আমার ফেভারিট। মধ্যবয়েসী, কিছুটা ভারী চেহারা, গায়ের রং কালো, কেন জানিনা আমার ইচ্ছে ছিল সেই জিতুক।

    তিন চার দিন এর পর থেকে অনেকেই আর পারতোনা, যে দুই তিন জন তখনো ধুঁকতে ধুঁকতে কোনমতে সাইকেল চালাত, তাদের জামায় এক টাকা দু’ টাকার বেশ কিছু নোট পিন দিয়ে আটকানো থাকত। কারুর কারুর জামায় পাঁচ দশ টাকাও শেষের দিকে আটকানো দেখেছি।  তাদের সাথে একদল লোক হাতে জলের বোতল নিয়ে পাশে পাশে হেঁটে যেতো, সাইকেলে বসেই তারা এক হাতে বোতল ধরে ঢকঢক করে জল খেত।

    রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসা পর্য্যন্ত আমি ওদের কথা ভাবতাম। ওরা কি রাতেও সাইকেল চালাচ্ছে? ওদের কি ঘুম পায়না? খাওয়া, বাথরুম যাওয়া এই সব কখন কি করে করে ওরা? ক্লাবের লোকেরা কি ওদের পিছন পিছন ঘুরে ঘুরে দেখে ওরা সাইকেল চালাচ্ছে না সাইকেল থেকে নেমে বিশ্রাম নিচ্ছে? 

    নয় নম্বর সেবার জিততে পারেনি, সে দ্বিতীয় হয়েছিল। আট নম্বর তাকে হারিয়ে প্রথম হয়েছিল মনে আছে। আট নম্বর ছেলেটার বয়স কম, পেটানো চেহারা, তার চোখে মুখে প্রত্যয় আর আত্মবিশ্বাস। তাকে হারানো নয় নম্বরের মতো একজন মাঝ বয়েসী লোকের কম্মো নয়। তবু নয় নম্বর দ্বিতীয় হলেও সে আমার হিরো ই থেকে গিয়েছিল কোন কারণে। 

    ওদের দুজনকে মালা পরিয়ে কাঁধে চাপিয়ে হৈ হৈ করে খুব ঘোরানো হয়েছিল মনে পড়ে।

    বেশ কিছুদিন পরে আমি মা’র সাথে কোথায় যেন যাচ্ছি, হঠাৎ মনোহরপুকুর ল্যান্সডাউনের মোড়ে  রাস্তায় সেই নয় নম্বর ভদ্রলোক এর সাথে দেখা। তার পরনে তখন সাধারণ পাজামা পাঞ্জাবী,  চটি পরে এক বন্ধুর সাথে কথা বলতে বলতে তিনি হাঁটছেন।

    আমি তাকে চিনতে পেরে উত্তেজিত হয়ে মা’কে বলতে যাচ্ছিলাম, “মা  দ্যাখো, দ্যাখো – নয় নম্বর!”

    কিন্তু ভেবে দেখলাম না বলাই ভালো।

    সেই দশ বারো বছর বয়েসে আমি তখন মা’র আঁচলের তলা থেকে ক্রমশঃ আস্তে আস্তে  বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে আসছি। স্কুলে যাই, পাড়ায় বন্ধুদের সাথে গলিতে  মাঠে পার্কে ক্রিকেট ফুটবল খেলি।  পাড়ার পূজোয় ভলন্টিয়ারের ব্যাজ পরে ঘুরে বেড়াই, এই সব আর কি। তখন থেকেই ক্রমশঃ বুঝতে পারছি যে মা’র ভাল লাগা আর আমার ভাল লাগার হামেশাই মিল হচ্ছেনা। দু’জনের জগত যেন কেমন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

    আমার জগতে গ্যারী সোবার্স, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়,  চূণী গোস্বামী আর  মা’র জগতে সত্যনারায়ণ, নীলষষ্ঠী আর শিবরাত্রির উপোস, কোষাকুষি, গঙ্গাজল, ফুল বেলপাতা, সিন্নী আর পায়েস।

    সাইকেল প্রতিযোগিতা সম্বন্ধে মা কোন খবর রাখেননা,  কে জিতলো কে হারল তা জানবার বিন্দুমাত্র উৎসাহ ও মা’র নেই।

    নয় নম্বর শুনে  তাঁর মনে হতে পারে ছেলে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলছে, ব্যাপার কি? মাথাটা খারাপ হয়ে গেল নাকি?  তারপর জোর করে আমায় চেপ্পে ধরে কোন মাথার ডাক্তারকে দেখাতে নিয়ে যাবেন হয়তো,  সেই বয়সে শরীরে সামান্য  জ্বরজারি হলেই ডাক্তার দেখানো বাধ্যতামূলক ছিল আমার জন্যে। 

    এই সব ভেবে তাই চুপ করেই রইলাম।

    আমার পাশ দিয়ে সেই নয় নম্বর সাইকেল চালক ভদ্রলোক তাঁর বন্ধুর সাথে গল্প করতে করতে চলে গেলেন।  আমি সতৃষ্ণ নয়নে আমার সেই ট্র্যাজিক হিরোর দিকে তাকিয়ে রইলাম।  হিরোসুলভ চেহারা তাঁর একেবারেই নয়,  বরং উল্টোটাই।  গায়ের রং মিশমিশে কালো, তার ওপরে বেশ মেদবহুল শরীর, সামান্য ভুঁড়ি।  কিন্তু কি করে যে তাঁর প্রতি আমার মনে এক আশ্চর্য্য ভাল লাগা তৈরী হয়েছিল তা এখনো ভাবলে অবাক লাগে।

    আরও আশ্চর্য্য এই যে এতগুলো বছর কেটে গেলেও সেই নয় নম্বরের স্মৃতি আমার মনে এখনো অমলিন।

  • হরিকুমার বাবু  

    মনোহরপুকুর রোডে আমাদের ছোটবেলায় আমাদের বাড়ী থেকে কিছুদূরে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন হরিকুমার বাবু।তখন হরিকুমার বাবু পাড়ায় মোটামুটি চেনা মুখ। এদিকে ওদিকে পূজো বা পাড়ার অন্য নানা বারোয়ারী অনুষ্ঠানে মাতব্বরি করতে দেখা যেত তাঁকে, যদিও কারুর কাছ থেকেই তেমন পাত্তা পেতেন না।

    একটু অসংলগ্ন কথাবার্ত্তা বলতেন, মাঝে মাঝে টলতে টলতে হাঁটতেন, চোখ দুটো প্রায়ই লাল হয়ে থাকতো। নেশা করতেন হয়তো। রাইটার্সে বোধহয় একটা পিয়ন বা বেয়ারার কাজ করতেন।    

    পাড়ায় পাগলাটে বলে তাঁর দুর্নাম ছিল। তবে নিজের মত থাকতেন, কারুর সাথে কোন দুর্ভাব বা ঝগড়াঝাঁটি ছিলনা। সবাই যতটা পারে তাঁকে এড়িয়েই চলতো।

    এই হরিকুমার বাবু আমাদের বাড়ীতে মাঝে মাঝেই আসতেন।

    মার মুখে শুনেছি ওনার পরিবার ছিল পাটনায়, আমাদের পরিবারের  পাটনার শাখার সাথে ওনার পরিবারের সেখানে এক জ্ঞাতি সম্পর্ক তৈরী হয়। যেখান থেকে ভাগ্যের ফেরে যুদ্ধের সময় কলকাতায় এসে তিনি মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীতে উঠেছিলেন। পরে পাশেই একটা ছোট ঘর নিয়ে থাকতে শুরু করেন।

    আমাদের ছোটবেলায় ওনাকে একটু দুঃখী একলা মানুষ বলে মনে হতো আমার। পরে বড় হয়ে বুঝেছি, উনি ছিলেন একজন ব্যক্তিত্বহীন, হেরে যাওয়া মানুষ। সবার উপহাস, অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের পাত্র।  

    চালচুলো হীন, আপাতদৃষ্টিতে এই একাকী অসহায় মানুষটির জন্যে আমার মনে কোথাও একটা সমবেদনা আর সহানুভূতি অনুভব করতাম মনে পড়ে। কারুর ভালবাসা পেলে হয়তো তাঁর জীবনটা পালটে যেতো। কিন্তু তাঁর জীবনে ভালবাসা নিয়ে কেউ আসেনি।     

    এই পৃথিবীতে এই ধরণের হতভাগ্য লোক অনেক আছে, আমাদের হরিকুমার বাবু ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন।   

    সারা জীবন একলা কাটিয়ে গিয়েছিলেন হরিকুমার বাবু, তাঁর মৃত্যুও হয় সকলের অজান্তে, নিভৃতে। অনেক দিন থেকে তাঁর ঘর বন্ধ ছিল। ভেতর থেকে মৃতদেহের দুর্গন্ধ পেয়ে পাড়ার লোকেরা পুলিশ ডেকে তাঁর দরজা ভেঙে ঢুকে তাঁর মৃতদেহ  উদ্ধার করে তাঁর সৎকার করে।

    গোড়ালী পর্য্যন্ত নেমে আসা ঢলঢলে প্যান্ট, ময়লা বুশসার্ট আর ছেঁড়া চটি পরে মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যাবেলা আসতেন হরিকুমার বাবু। চোখ দুটো অল্প লাল, কথা একটু জড়ানো, হাঁটার ভঙ্গি টাও কেমন যেন একটু টলমলে।

    তিনি যে এসেছেন তা কেউ গ্রাহ্যই করতোনা, কেউ বসতে বলতনা তাঁকে, কেউ কথাও বলতোনা তাঁর সাথে। তিনি নিজের মনেই বিড়বিড় করে কি বলতেন কেউ শুনতো না

    জ্যেঠিমা কে কিছুটা কুণ্ঠিত ভঙ্গী তে বলতেন “বৌদি, একটু চা হবে?”

    তার পর বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একা একা চা খেয়ে কাপ টা টেবিলে রেখে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে যেতেন, দেখে ওনার জন্যে বেশ মায়াই হতো।

    বাংলা দেশের কোন গ্রাম থেকে মাঝে মাঝে হরিকুমার বাবুর নামে পোস্টকার্ডে চিঠি লিখত সুধা নামে একটি মেয়ে। সেই চিঠি ওনার জন্যে রেখে দেওয়া হতো বারান্দায় Book case এর ওপর। খোলা পড়ে থাকা গোটা গোটা মেয়েলী অক্ষরে লেখা সেই পোস্টকার্ডের চিঠিতে কৌতূহলবশতঃ আমরা অনেকেই চোখ বোলাতাম, অস্বীকার করবোনা। 

    “শ্রীচরণেষু  হরিকাকা” দিয়ে শুরু, আর “ইতি প্রণতা সুধা” দিয়ে শেষ, সেই চিঠি গুলো জুড়ে থাকতো অনেক দুঃখের কথা। হয়তো কাকার কাছে নিজেদের অবস্থার কথা জানানো র মধ্যে কিছু সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল সুধার। চিঠির মধ্যে কিছুটা হলেও একটা আর্তি আর প্রার্থনার সুর ধরা পড়তো, আমার মনে পড়ে।       

    হরিকুমার বাবু আমাদের বাড়ী এলে তাঁকে সেই চিঠি দেওয়া হতো। তিনি মন দিয়ে সেই চিঠি পড়তেন। তার পর কেমন যেন উদাস হয়ে যেতেন। চুপ করে বাইরে তাকিয়ে থাকতেন বেশ কিছুক্ষণ। কি ভাবতেন কে জানে? 

    মনোহরপুকুরের বাড়িতে কাটানো সেই সব ছেলেবেলার দিনগুলোর স্মৃতির মধ্যে হরিকুমার বাবু তাঁর জায়গা করে নিয়েছেন।

  • অন্নপূর্ণা বাবু

    তোমরা নিশ্চয় ভাবছো, অন্নপূর্ণা তো মেয়েদের নাম, তাহলে অন্নপূর্ণা বাবু আবার হয় কি করে? পরশুরামের চিকিৎসা সঙ্কটের সেই ডাক্তার বাবুর মতো তাহলে বলবো, “অয় অয়,  zaaন্‌তি পারোনা!”

    মনোহরপুকুর রোড আর সতীশ মুখার্জ্জী রোডের মোড়ে একটা বাড়ির একতলায় পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে অন্নপূর্ণা স্টোর্স নামে একটা স্টেশনারীর দোকান খুলে বসেছিলেন এক ভদ্রলোক। এমন কিছু বড় বা আহামরি নয়, ছোট আর সাধারণ দোকান, কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই দোকানটা আমাদের পাড়ায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

    কাছাকাছির মধ্যে আর কোন ভালো স্টেশনারীর দোকান ছিলনা বলেই কিছুটা হয়তো, আর তাছাড়া সেই ভদ্রলোক এর মধ্যে ব্যবসা বুদ্ধি ও বেশ ভাল ছিল মনে হয়, কেননা প্রসাধনের জিনিষ যেমন সাবান, পাউডার, মাথায় মাখার তেল, খাবার  জিনিষ যেমন বিস্কুট, চা, পাঁউরুটি, স্টেশনারী items  যেমন খাতা, পেন্সিল, writing pad,  হার্ডওয়ার  items যেমন পেরেক, হাতুড়ি, টর্চ, ইত্যাদি, মোটমাট আমাদের দৈনিক জীবন যাপনের জন্যে সংসারে যা যা দরকার সবই ওনার দোকানে গেলেই আমরা চট করে পেয়ে যেতাম। কোন কিছু দরকার পড়লেই জ্যেঠিমা মা কাকীমারা বলতেন “অন্নপূর্ণা থেকে অমুক জিনিষ টা নিয়ে আয় তো?” 

    ভদ্রলোকের নাম টা আমরা কেউ জানতাম না, পাড়ার সবার কাছে তিনি ছিলেন অন্নপূর্ণা বাবু। বেশ লম্বা ছিলেন, গায়ের রং ফর্সা, নাকের নীচে একটা হিটলারী গোঁফ, সবসময় একটা হাফ হাতা গেঞ্জী পরে থাকতেন। তাঁর figure টা ছিল কিছুটা পাশবালিশের খোলের মতো, বুক, পেট, কোমর, সব এক সাইজ। বেশ একটা নেয়াপাতি ভুঁড়িও ছিল তাঁর। আর প্রায় সব সময় তাঁর মুখে পান আর সুপুরী, তাই চিবোতে চিবোতে খদ্দের দের সাথে বেশ ভারিক্কী চালে কথা বলতেন অন্নপূর্ণা বাবু।

    একাই দোকান আর খদ্দের সামলাতেন, যার যা দরকার ক্ষিপ্র হাতে তা বের করে দিয়ে পয়সা কড়ি বুঝে নিতেন। তাঁর কাজে খুব efficient   ছিলেন অন্নপূর্ণা বাবু। তাঁর একটা জিনিষ কেবল আমার ভালো লাগতো না, সেটা হলো ওই সর্ব্বক্ষণ গেঞ্জী পরে থাকা।  

     এ আবার কি অসভ্যতা?

    তাঁর দোকানে পাড়ার অনেক সুন্দরী আর সম্ভ্রান্ত মহিলারা কেনাকাটা করতে আসতেন, তাদের সামনে এই গেঞ্জী পরে থাকাটা কি উচিত? কিন্তু এ ব্যাপারে  অন্নপূর্ণা বাবুর কোন হেলদোল ছিলনা।

    আজকের এই  Online retail এর যুগে  Amazon Flipcart ইত্যাদি বড় বড় Retail chain আর Supermarket কোম্পানীরা তাদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে  নানা Web service আর Software tools ব্যবহার করছে।

    খদ্দেরদের সাথে  পরিচয় বাড়াবার জন্যে তাদের আছে Customer relationship management (CRM) software..  আগের বার তুমি এটা কিনেছিলে, তার সাথে এবার এই জিনিষটা নিতে পারো। ভাল ডিসকাউন্ট পাওয়া যাচ্ছে।

    তার ওপর তাদের আছে Demand forecasting আর  Supply Chain management এর জন্যে দরকারী software, যাতে যখন যা দরকার তা সবসময় হাতের কাছে মজুদ থাকে, খদ্দের যেন খালি হাতে কখনো ফিরে না যায়। .  

    প্রযুক্তির ব্যবহার করে তারা তাদের Business volume,  scale আর  service এমন একটা উচ্চতায় ক্রমশঃ নিয়ে যাচ্ছে যে তাদের সাথে পাড়ার ছোট ছোট দোকানদারদের  মোকাবিলা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে ক্রমশঃ।  এমন কি মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে তাদের পাড়ার দোকান এর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।

    আমাদের ছোটবেলায় প্রযুক্তির এই উৎপাত শুরু হয়নি।  আমাদের অন্নপূর্ণাবাবুরও কখনো কোন SCM কিংবা CRM software এর দরকার পড়েনি, তিনি একাই দু’ হাতে সব সামলে নিতেন।  চমৎকার ব্যবসা চালাতেন তিনি,  খদ্দেররা সবাই খুসী, যে যা চায় সব হাতে হাতে পেয়ে যায়।  দামও গলাকাটা নয়।    

    রমরম করে চলতো অন্নপূর্ণা স্টোর্স।

    একবার বড়বাজারে কি একটা কাজে গেছি, সেখানে ভীড়ের মধ্যে হঠাৎ দেখি এক ভদ্রলোক, মুটের মাথায় অনেক মাল চাপিয়ে হাতে একটা ছাতা নিয়ে মুটের পিছন পিছন চলেছেন।  যাকে বলে Supply Chain Management at work in real time..

    কিন্তু এনাকে তো ভীষণ চেনা চেনা লাগছে, কোথায় যেন দেখেছি?

    তারপর বুঝলাম, আরে ইনি তো আমাদের অন্নপূর্ণা বাবু!

    বরাবর গেঞ্জী পরা অবস্থায় কাউন্টারের পিছনে তাঁর উপরের অর্দ্ধেক চেহারা টা দেখেছি। হঠাৎ সার্ট গায়ে ধুতি পরিহিত পুরো মানুষটা কে দেখলে চিনব কি করে?

    চোখাচোখি হতে অন্নপূর্ণা বাবু আমার দিকে তাকিয়ে তাঁর হিটলারী গোঁফের ফাঁক দিয়ে একটা চেনা হাসি হাসলেন। অর্থাৎ আমায় চিনেছেন ঠিক। যাকে বলে perfect Customer relationship management ।

    বছর ত্রিশ দোকান টা বেশ ভালই চলেছিল, কিন্তু একদিন হঠাৎ অন্নপূর্ণা বাবু দোকান তুলে দিয়ে কোথায় চলে গেলেন। জানিনা কেন, কি হয়েছিল। অন্নপূর্ণা বাবুর সাথে তারপর আর কোনদিন আমার দেখা হয়নি।

    এখনও ওই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় বাড়ীটা চোখে পড়লেই অন্নপূর্ণা বাবুর দোকান আর তার সাথে আমাদের ফেলে আসা হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।

  • ফুটুবাবু

    আমাদের ছোটবেলায় কর্পোরেশন থেকে আমাদের বাড়িতে রবিবার বা কোন ছুটির দিন সকালে এক ভদ্রলোক এসে হাজির হতেন বছরে দু’বার। একবার আমাদের বসন্তের টীকা আর একবার আমাদের TABC ইঞ্জেকশন দিতে। তাঁকে বেশ মনে পড়ে। মাথায় অল্প টাক, পরনে ধুতি পাঞ্জাবী, চোখে চশমা, হাতে একটা ব্যাগ, তার মধ্যে ইঞ্জেকশন এর এম্পুল, সিরিঞ্জ, টীকা দেবার নানা সরঞ্জাম। মুখে হাসি নেই, বেশ গম্ভীর, দেখলেই ভয় পাবার মতো চেহারা।

    তিনি এলেই সারা বাড়ীতে বেশ একটা হুলুস্থূল পড়ে যেত। উনি বড় বারান্দার গোল টেবিলে ব্যাগ থেকে তাঁর জিনিষপত্র সব বের করে রাখতেন, আর আমরা সবাই এক এক করে লাইন দিয়ে টীকা বা ইঞ্জেকশন নিতাম।

    টীকা টা একটা যন্ত্র দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাঁ হাতের মাঝখানে দেওয়া হতো। মাঝে মাঝে সেটা পেকে গিয়ে বেশ যন্ত্রণা হতো। আর TABC ইঞ্জেকশন এর পর হাতে যা প্রচন্ড ব্যথা হতো, অন্ততঃ দু দিন তার পর হাত তুলতে পারতামনা।

    TABC র নাম আমরা দিয়েছিলাম “টাইফয়েড, আমাশা, বসন্ত, কলেরা।”

    সেই পঞ্চাশের দশকে বসন্ত রোগ নির্মূল হয়নি, আর টাইফয়েডও বেশ কঠিন রোগ ছিল, সুতরাং খারাপ লাগলেও বা ভয় পেলেও আমাদের টীকা আর ইঞ্জেকশন নিতেই হতো, আপত্তি করার সুযোগ ছিলনা। জ্যেঠিমা, মা কাকীমারা ও নিতেন। বাবা কাকাদের নিতে দেখিনি, ওনারা ছুটির দিনে কেউ বাড়িতে থাকতেন না সকালে, সেই জন্যেই হয়তো।

    তখন তো আজকের মতো AIDS এর প্রাদুর্ভাব হয়নি, ইঞ্জেকশনের ছুঁচ থেকে রোগের সংক্রমণ এর কথা তখন বোধ হয় কেউ ভাবতোনা, disposable syringe ও তখন চালু হয়নি। একটা কাপের মধ্যে গরম জল আর disinfectant spirit এ ছুঁচ ডুবিয়ে তুলো দিয়ে মুছে আবার পরের জনের ওপর ব্যবহার করা হতো।

    এই ব্যবস্থা এখনো কলকাতায় চালু আছে কিনা জানিনা। হয়তো নেই। এখন বোধহয় ছেলেমেয়েরা immunization এর ইঞ্জেকশন নিতে  হাসপাতালে যায়।

    পরে মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ির পাশে ডক্টর মৃণাল দত্ত তাঁর চেম্বার খোলেন। মৃণাল বাবুর কম্পাউন্ডার ছিল একটি বেঁটে খাটো লোক। সেই লোকটি দারুণ ভালো ইঞ্জেকশন দিতো, ইঞ্জেকশন দিয়ে সে পাড়ায়  এমন নাম করে ফেলেছিল যে পাড়ায় কারুর ইঞ্জেকশন দেবার দরকার পড়লেই তার ডাক পড়তো। আমাদের বাড়িতেও একে ওকে ইঞ্জেকশন দেবার জন্যে সে লোক টি প্রায়ই আসতো। 

    তার আসল নাম টা আমরা কেউ জানতাম না, ভালোকাকীমা তার নাম দিয়েছিলেন “ফুটুবাবু”। শেষ পর্য্যন্ত আমাদের কাছে সে ফুটুবাবুই থেকে যায়।

    একবার কাকে একটা ইঞ্জেকশন দিতে হবে, তাই আমাদের কাজের লোক সীতা কে পাঠানো হলো ডক্টর দত্তের চেম্বারে ফুটুবাবুকে ডেকে আনতে। সীতা সেখানে গিয়ে “ফুটুবাবুকে একবার আমাদের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিও” বলাতে তাকে সবাই বলেছিল “এখানে ফুটুবাবু বলে কেউ নেই।” 

    আজ এই অতিমারীর যুগে ফুটুবাবু থাকলে তাঁর যে খুব কদর হতো তাতে কোন সন্দেহ নেই। White Tiger উপন্যাসের সেই ড্রাইভার ছেলেটি যেরকম ড্রাইভারদের নিয়ে একটা বিশাল ব্যবসা শুরু করেছিল, সেরকম ফুটুবাবুও অনেক ছেলেমেয়েকে ট্রেনিং দিয়ে তাঁর অফিসে নিয়ে ভ্যাক্সিনেশনের একটা বড় ব্যবসা শুরু করে দিতে পারতেন।

    অতিমারীর কল্যাণে তাঁর ও জীবনের ভোল পালটে যেত।

    জানিনা সেটা শেষ পর্য্যন্ত ঘটেছে কিনা।

  • এই সেই পিস্তল

    বড় হয়ে আমিও বাবার মত গাড়ী চালাবো

    হাওড়ার সাঁত্রাগাছি (রামরাজাতলা) তে সুভদ্রাদের লতায় পাতায় বিরাট পরিবার, সুভদ্রা গল্প করে যে তার ছোটবেলায় ওদের’, বাড়ীতে বাবা কাকারা সবাই মিলে নাটক করতেন। পারিবারিক কোন বাড়ির দেউড়িতে কিছুটা জায়গা নিয়ে স্টেজ বাঁধা হত।  বাকি অংশে বড়রা সামনে চেয়ার পেতে বসতেন, আর ছোটরা সবাই বসতো স্টেজের সামনে সতরঞ্চি পেতে।

    আমার শ্বশুর মশায় (গৌর চন্দ্র ভট্টাচার্য্য,  চেনাশোনা সবার কাছে গৌর বা গৌরদা’, ছোটদের কাছে নতুন কা’) ছিলেন দীর্ঘদেহী ফর্সা সুদর্শন মানুষ, একেবারে নায়কোচিত যাকে বলে, সেই সময়ের বিখ্যাত Hollywood হীরো Clark Gable এর মতো অনেকটা। অবশ্যই তিনি হতেন নায়ক। আর গোবিন্দকা’ ছিলেন ছোটখাটো মানুষ, মেয়েলী সুন্দর চেহারা, আর তাঁর গলাটাও একটু মেয়েলী, তাই তিনি সাধারণতঃ হতেন নায়িকা।

    একবার কি একটা নাটকে পটলাকা’ কে কোন পার্ট দেওয়া হয়নি। তাঁর চেহারা বেশ ভারী, একবার কোন একটা নাটকে তিনি স্টেজে উঠতেই নাকি স্টেজ ভেঙে পড়েছিল। তার পর থেকে তাঁকে কেউ নাটকে পার্ট দেবার রিস্ক নেয়না। পটলাকা’ রোজ এসে আমার শ্বশুরমশায় কে বলেন, “এই গৌর, ওদের আমায় একটা পার্ট দিতে বল্‌না।”

    তো আমার শ্বশুরমশায় গিয়ে নাটকের পরিচালক কে বললেন, “পটলার মোটা সোটা ভারী চেহারা ওকে পুলিশের একটা ছোট রোল আছে, ওটা দিয়ে দাও। বড্ড ধরেছে আমায়।”

    পুলিশের রোল টা একদম শেষে, যেখানে পটলাকা’ কে কোমরের খাপ থেকে একটা পিস্তল (Murder instrument) বের করে সেটা দেখিয়ে বলতে হবে, “এই সেই পিস্তল!” তার পরে তিনি আমার শ্বশুরমশায় কে দড়ি দিয়ে বেঁধে  জেলে নিয়ে যাবেন।        

    তো নাটক ভালই হচ্ছে, দেউড়িতে লোক উপছে পড়ছে, কাকা জ্যাঠা, মা মাসী জ্যেঠিমা কাকীমারা সবাই সামনে চেয়ারে বসে, সুভদ্রা তখন ছোট মেয়ে, ছয় সাত বছর বয়েস হবে, সে অন্য ভাই বোনেদের সাথে সামনে সতরঞ্চিতে বসে মুগ্ধ হয়ে তার বাবার অভিনয় দেখছে।

    শেষ সীনে পটলা কা’ স্টেজে ঢুকে খাপ থেকে পিস্তল আর বের করতে পারেননা। খাপে মরচে পড়ে জ্যাম হয়ে গেছে।   এদিকে পটলাকা’র ওই খাপ ধরে টানাটানি দেখে সারা হলে খিলখিল হাসির গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। পিস্তল আর বেরোয়ই না! কি আর করা যায়? কিছুক্ষণ চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে পটলা কা’ দুচ্ছাই বলে খালি হাত টা উঁচু করে দেখিয়েই বলে দিলেন, “এই সেই পিস্তল!” হলে তখন দমফাটা হাসির ফোয়ারা।

    পটলা কা’ র সাথে আমার কোন দিন আলাপ হয়নি, তবে এই গল্পটা থেকে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি বা প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের একটা পরিচয় পাওয়া যায়, ইংরেজীতে যাকে বলে presence of mind! তিনি খাপে মরচে ধরে জ্যাম হয়ে গেছে তাই পিস্তল বের করা যাবেনা বুঝতে পেরে আর কোন সময় নষ্ট করেন নি, হাত দিয়েই কাজ চালিয়ে নিয়েছেন তাতে হাসাহাসি একটু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নাটকের flow নষ্ট হয়নি।   

    বিয়ের পরে প্রথম প্রথম আমার শ্বশুরমশায় আমায় তাঁদের পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে নানা পারিবারিক গল্প বলতেন, ছুটির দিন বিকেলে দু’জনে পাশাপাশি বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে বসে চা খেতে খেতে এই সব গল্প শুনতে আমার বেশ লাগতো। তার মধ্যে পটলাকা’র এই গল্পটা বলার সময় তিনি তাঁর ডান হাতটা এগিয়ে আঙুল উঁচিয়ে পটলাকা’ কে অনুকরণ করে “এই সেই পিস্তল” বলে নিজেই হো হো করে হাসতেন, হাসির উচ্ছ্বাসে তাঁর চোখ মুখ বুঁজে আসতো।   

    সবাই হাসলেও ছোট্ট সুভদ্রা কিন্তু একটুও হাসেনি। তার বাবাকে পুলিশ দড়ি দিয়ে বেঁধে জেলে নিয়ে যাচ্ছে, পিছন পিছন লাল পাড় শাড়ি পরা গোবিন্দকা ইনিয়ে বিনিয়ে “ওঁগো, তুঁমি জেঁলে যেঁওনাকো” বলে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছেন, তাই দেখে সুভদ্রার মুখ শুকিয়ে গেছে।

    নাটক শেষ হয়ে যাবার পরে বাবা নারায়ণের বাড়িতে সবার সাথে খেতে বসেছেন, সুভদ্রা আর বাবার পাশ থেকে সরছেনা। যদি আবার পুলিশ আসে বাবাকে নিয়ে যেতে? সে কিছুতেই কাউকে বাবা কে নিয়ে যেতে দেবেনা। তার বাবা তাকে অনেক বোঝাচ্ছেন, ওটা আসল নয় মা, আমরা নাটক করছিলাম, কেউ আমায় নিতে আসবেনা, ভয় নেই…

    কিন্তু সুভদ্রা কিছুতেই বুঝবেনা।

    সুভদ্রা কে অবশ্য দোষ দেওয়া যায়না, কেননা জীবনে কোনটা যে অভিনয়, আর কোন টা যে real life, সেটা বোঝা মোটেই সহজ কাজ নয়, আমাদের প্রাপ্তবয়স্কদেরই গুলিয়ে যায়, তার তো তখন মাত্র ছয় কি সাত বছর বয়েস।

    মহাকবি শেক্সপিয়ার বলে গেছেন না, The world is a stage…

  • মাখনবাবু 

    আমাদের ছোট বেলায় মনোহরপুকুরের বাড়ী তে মাঝে মাঝে মাখনবাবু নামে এক ভদ্রলোক আসতেন। তাঁর ছিল গয়নার ব্যবসা, লেক মার্কেটের কাছে রাসবিহারী এভিনিউ এর ওপরে লক্ষ্মী জুয়েলার্স নামে তার একটা ছোট দোকান ও ছিল। 

    মাখনবাবু মনোহরপুকুরের বড় বারান্দার গোল টেবিলে বসে তাঁর গয়নার বাক্স খুলে মা জ্যেঠিমা কাকিমাদের নানা গয়নার sample দেখাতেন। তাছাড়া তাঁর কাছে গয়নার design এর  catalogue থাকতো, সেই বই খুলে তিনি মা’দের নানা রকম গয়নার design দেখাতেন। তাঁকে ভীড় করে ঘিরে মা জ্যেঠিমা কাকীমাদের সেই উৎসাহ, আর তাঁদের  উৎসুক দৃষ্টি মেলে গয়না দেখা বেশ মনে পড়ে।

    মাখনবাবু সার্থকনামা লোক ছিলেন। ধুতি পাঞ্জাবী পরে আসতেন, পাতা করে চুল আঁচড়ানো, পায়ে পাম শু, সবসময়  মুখে হাসি, অতি বিনয়ী, মিষ্টি মিষ্টি কথা, যাকে বলে perfect salesman! Smooth operator, মানে যাকে বাংলায় বলে “পুরো মাখন!”

    আর ওনার business model ও বেশ effective, গৃহিণী রা দোকানে আসার  অপেক্ষায় না থেকে সোজা তাদের বাড়ীতে চলে যাওয়া। Competition এর যেখানে কোন সম্ভাবনাই নেই।     

    আমার তখন দশ এগারো বছর বয়স, তার মানে আমার মা’র তখন তেত্রিশ বছর, কাকীমাদের ত্রিশ বছরের নীচে। ওই বয়সে গয়নার প্রতি মেয়েদের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা তো তেমন স্বচ্ছল ছিলামনা, আমাদের ছিল মধ্যবিত্ত পরিবার, প্রাচুর্য্যের মধ্যে আমরা মানুষ হইনি। তাই বেশী গয়না কেনার সামর্থ্য মা দের ছিল না ধরে নেওয়া যায়।

    মা কে জিজ্ঞেস করলাম তখন সোনার ভরি কত টাকা ছিল? মা’র মনে নেই। তবু এখনকার তুলনায় তখন সোনার দাম অনেক কম হলেও মাদের নাগালের বেশ কিছুটা বাইরেই ছিল নিশ্চয়। পরিবারের উপার্জন যা ছিল তার বেশীর ভাগটাই চলে যেত সংসারের খরচে।    

    তবু সামাজিক কারণেও তো গয়নার দরকার পড়ে। কারুর বিয়ে, কারুর মুখে ভাতে উপহার দিতে হয়,  তখন নতুন গয়না কেনার টাকা না থাকলে পুরনো গয়না ভাঙিয়ে কাজ সারতে হয়। মা কাকীমা রাও তাই করতেন। দরদাম হতো। মাখনবাবু কিন্তু বেশী দরাদরি তে যেতেন না, তাঁর মুখে শুধু হাসি। মা’রা মাখনবাবুর সাথে দরাদরি তে খুব একটা পেরে উঠতেন বলে মনে হয়না।

    খুব এলেমদার salesman ছিলেন মাখন বাবু, ব্যবসা টা ভালো ই বুঝতেন। মাদের মাথায় হাত বুলিয়ে প্রতিবার এসেই বেশ কিছু অর্ডার নিয়ে যেতেন।

    মাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম মাখনবাবু র সাথে তোমাদের যোগাযোগ হলো কি করে? শুনলাম উনি নাকি বাংলাদেশের (তখন East Bengal) গাইবান্ধার কাছের শহর কুড়িগ্রামের লোক, মা মাসী দের ছোটমামীমা র বাপের বাড়ী সেখানে। সেই সূত্রেই চেনাশোনা এবং যাতায়াত। মাসীদের বাড়িতেও মাখনবাবুকে মাঝে মাঝে দেখেছি। আমার মাসতুতো ভাই রঞ্জু ও তাঁকে বেশ ভালোই চিনতো।

    বাঙ্গালদের এই লতায় পাতায় আত্মীয়তা আর সম্পর্কের ব্যাপারটা আমার বেশ লাগে। চেনাশোনা সবাই কে কাছে টেনে নেওয়া আর সাহায্য করা বাঙ্গালদের সহজাত। আজকের পৃথিবী তে যৌথ পরিবারের অবলুপ্তির সাথে সাথে এই দুঃস্থ বিপন্ন আত্মীয় অনাত্মীয় কে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার অভ্যেস ক্রমশঃ যেন কমে আসছে। এখন হল  Take your  বস্তা,  see your রাস্তা র যুগ।

    রাসবিহারী রোডের দোকান টা ছেড়ে দিয়ে মাখনবাবু গড়িয়াহাটের বাজারের কাছে আলেয়া সিনেমার পাশে বড়ো একটা দোকান করেছিলেন, সেখানে পরে কয়েকবার গেছি। ক্রমশঃ মাখনবাবুর বয়স বেড়েছে, তাঁর ছেলের বিয়ে দেবার সময় আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন, বিয়ের পর ওনার দোকানে একবার সেই বিয়ের এলবামও দেখিয়েছিলেন আমাকে আর মাকে।

    প্রায় পরিবারের একজনই হয়ে গিয়েছিলেন মাখনবাবু।

    শেষ গড়িয়াহাটের লক্ষ্মী জুয়েলার্স এ যাই আমার মাসতুতো ভাই রঞ্জুর সাথে। নব্বই এর দশকের শেষে। গিয়ে দেখি Counter এ বসে একটি অল্পবয়েসী ছেলে, মাখনবাবুর কথা জিজ্ঞেস করাতে সে বললো “বাবা আর নেই~”

    তাকিয়ে দেখি তার পিছনে দেয়ালে মাখনবাবুর ছবি। ফ্রেমের ভেতর থেকে মাখনবাবু হাসি হাসি মুখ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।