-
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে

আল বাহার আই ক্লিনিক, কুয়েত
বাদল সরকারের এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকে একটা অফিসের দৃশ্য ছিল, সেখানে অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎ কাজ করে। সেই অফিসে হরিশ নামে একটি বেয়ারার চরিত্র ছিল, যার কাজ ছিল বাবুদের ফাই ফরমাস খাটা, দরকার মতো চা, সিগারে্ট, ফাইল এই সব এনে দেওয়া। অমল বিমল কমল আর ইন্দ্রজিৎরা তাকে নানা সুরে “হরিশ ! হরিশ!!” বলে ডাকলেই সে তাদের কাছে “বলুন স্যার” বলে গিয়ে হাজির হতো।
হরিশের জন্যে কোন আলাদা অভিনেতা নেই, সেই নাটকের প্রধান চরিত্র হলো লেখক, সেই লেখকই দরকার মত কাঁধে একটা কাপড় নিয়ে হরিশের ভূমিকায় অভিনয় করতো।
মাঝে মাঝে সেই হরিশ আবার সেই অফিসের ম্যানেজার হয়ে গিয়ে সেক্রেটারী মিস মালহোত্রা কে ডেকে চিঠি dictate করতো। তখন তার কাঁধে আর টেবিল পরিস্কার করার কাপড় নেই, তার চালচলনে তখন রাশভারী ব্যক্তিত্ব। অমল বিমল কমলরা তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে Good morning sir বলে।
স্টেজে অভিনেতাদের এক রোল থেকে আর এক রোলে এই seamless transformation টা দর্শকদের কাছে বেশ উপভোগ্য ছিল।


কুয়েতে এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকের দু’টি দৃশ্য
একই লোকের এই transformation নাটকের বাইরে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও কি হয়না?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর একটা লেখায় তিনি Writers Building একজন Class Four staff এর কথা লিখেছিলেন। রাইটার্সে তাকে দেখে চুপচাপ বশংবদ ব্যক্তিত্বহীন বলে মনে হতো, সে নীরবে মাথা নীচু করে চা সার্ভ করতো, টেবিলে টেবিলে ফাইল দিয়ে যেতো, অফিসারদের নানা ফাইফরমাস খাটতো – ঠিক ওই নাটকের হরিশের মতোই। একবার সুনীল ওই লোকটির গ্রামের বাড়ীতে যান, সেখানে গিয়ে দেখেন তার অন্য রূপ। সেখানে সেই একই লোক তার গ্রামের একজন নেতা, তার বাড়ীতে লোকেরা এসে নানা ব্যাপারে তার পরামর্শ আর সাহায্য চায়, তার সাথে সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধার সাথে কথা বলে।
এরকম একটি transformation চাক্ষুস করেছিলাম আমিও।
এক বছর আগে আমার চোখে একটা infection হয়েছিল, আমার এক বন্ধু সত্যজিৎ (তারও চোখের সমস্যা) আমায় Shuwaikh এর Al Bahar Eye Clinic এর Dr. Seemant নামে একজন নামকরা eye specialist এর সাথে appointment করে দিয়েছিল। সকাল সকাল সেখানে চলে গিয়ে ফাইল খুলে নাম্বার নিয়ে waiting hall এ বসে আছি, ওই সাত সকালেও ক্লিনিকে বেশ ভীড়, ডঃ সীমন্তের রোগীই সব চেয়ে বেশী, আমার নাম্বার বেশ পিছনে। মাঝে মাঝে ডাক্তারের চেম্বারের দরজায় গিয়ে দেখে আসছি কতটা এগোল।
দু’ দিকে সারি সারি চেম্বার, মাঝখানে লম্বা সরু করিডর, সেখানে অনেকে ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভীড়ের মধ্যে এক ভদ্রলোক কে দেখে আমার চোখ আটকে গেল।
খুব চেনা চেনা লাগছে, কে ইনি, এঁকে আগে কোথায় দেখেছি?
দোহারা চেহারা, পরিস্কার পাটভাঙা ডার্ক সার্ট আর হাল্কা রং এর ট্রাউজার্সে দারুণ স্মার্ট লাগছে, চুলটা পরিপাটি করে ব্যাকব্রাশ করা, মাথার সামনেটা চুল একটু পাতলা হয়ে এসে ভদ্রলোকের চেহারায় যেন একটু বেশী ব্যক্তিত্ব যোগ হয়েছে, স্টাইলিশ ভঙ্গী তে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখে কোন হিন্দী ছবির নামকরা পার্শচরিত্রাভিনেতা বলে মনে হতেই পারে।
Sales and Marketing এর কাজে এতগুলো বছরে কত লোকের সাথে রোজ দেখা হয়েছে। তাদের অনেকের সাথে আলাপ আর বন্ধুত্ব হয়, কেউ কেউ থেকে যায় মনের ভিতরে। আবার অনেককে ভুলেও যাই। এঁকে ভুলিনি কিন্তু কোথায় যে দেখেছি কিছুতেই মনে পড়ছেনা।
ইনি কি কুয়েত ইউনিভার্সিটির কোন প্রফেসর, কিংবা KNPC তে Planning Engineer, অথবা KOC IT তে কাজ করেন?
সুভদ্রা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করতে সে ভদ্রলোকের দিকে এক মিনিট তাকিয়ে দেখেই যেন কিছুই না এই ভাবে বললো, “ও এই লোকটা তো সালমিয়া ইডি স্টোর্সে তরকারী ফল আর আনাজ ওজন করে দামের স্টিকার লাগায়। ”
অ্যাঁ , বলে কি?
আবার ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তাই। সেই লোকটাই।
একে বলে connecting the dots, সুভদ্রার এই ক্ষমতাটা অসাধারণ।
কুয়েতের ভারতীয়রা যারা সালমিয়াতে ইডি স্টোর্সে বাজার করে তারা সবাই নিশ্চয় ওই লোকটাকে চেনে। তরকারী আর ফলের র্যাকের পাশে এক কোণে ছোট এক জায়গায় বসে সে কাস্টমার দের তরকারী ফল আর আনাজ ওজন করে আর প্লাস্টিকের ব্যাগে দামের স্টিকার লাগায়। সকাল থেকে রাত প্রতিদিন ওই তার কাজ। তার বেশবাস একান্ত আটপৌরে, অনেক সময়ে গায়ে সার্ট ও নেই, শুধু গেঞ্জী। চুল অর্ধেক দিন ভাল ভাবে আঁচড়ানো হয়না। তার মুখেও কোন কথা কিংবা হাসি নেই, তাকে দেখে একজন ব্যক্তিত্বহীন, মাথা নীচু করা, হেরে যাওয়া লোক বলেই মনে হয়।
সেদিন আল বাহার আই ক্লিনিকে আমি যে স্টাইলিশ ভদ্রলোক কে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, তিনি কি ওই একই লোক?

ইডি স্টোর্স, সালমিয়া, কুয়েত
-
বেসিকালী
কুয়েতে আমার কাজ ছিল IT Solutions sell করা। নানা জায়গায় যাই sales call এ, নানা লোকের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। তো একবার কুয়েতের Ministry of Electricity তে জালালুদ্দিন আহমেদ নামে এক ইঞ্জিনীয়ার ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
জালালুদ্দিন সাহেব অল্পবয়েসী হলেও খুব চৌখস এবং জ্ঞানী লোক, তাঁর চোখে মুখে কথা। আমাদের কথা শোনার বদলে তিনি নিজেই আমাদের তাঁর জ্ঞান বিতরণ শুরু করে দিলেন। তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ শুনেই বোঝা গেল তিনি “আমাগো দ্যাশের” লোক, পরিস্কার বাংলায় ইংরেজী বলে যাচ্ছেন। আর তাঁর মুদ্রাদোষ হলো প্রতি বাক্যের ভেতর বেশ কয়েকবার “basically” বলা।
Basically, basically, basically….
কিছুক্ষন পরে ঘরের ভেতর যেন basically র ঝড় বইতে শুরু করল।
বাক্যের প্রথমে basically, বাক্যের মাঝখানে basically, বাক্যের শেষে basically। শেষে এমন হলো যে আমি আর ভদ্রলোকের কথাই শুনছিলাম না, হয়তো একটি বাক্য শুরু করেছেন, এখনো basically বলেন নি, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে basically র জন্যে অপেক্ষা করছি।
সেই একটা গল্প ছিলনা, এক ভদ্রলোক অফিস থেকে ফিরে দুম দুম আওয়াজ করে তাঁর জুতো জোড়া খুলে মেঝেতে রাখতেন। আর তাঁর নীচের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক রোজ সন্ধ্যায় সেই দুই বার জুতো পড়ার আওয়াজ শুনে বিরক্ত হয়ে একদিন ওপরে গিয়ে তাঁকে বললেন এটা কি হচ্ছে মশাই? আস্তে, আওয়াজ না করে, জুতো খুলে রাখতে পারেন না?
তো পরের দিন ভদ্রলোক তো যথারীতি প্রথম জুতোটা দুম করে খুলে রেখেছেন, তার পরেই তাঁর মনে পড়েছে এই রে, কাল নীচের ভদ্রলোক এসে বকুনী দিয়ে গেছেন। পরের জুতোটা তিনি তাই আস্তে করে খুব সন্তর্পনে মেঝেতে রাখলেন।
এদিকে নীচের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক তো প্রথম জুতোর আওয়াজ পেয়ে পরের জুতোর আওয়াজের জন্যে বসে আছেন।সেই দ্বিতীয় জুতোর আওয়াজ আর আসেনা। ভদ্রলোক দুই কান চেপে বসে আছেন কখন আবার সেই আওয়াজ হবে।বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে আওয়াজ আর আসেনা, তিনি আবার ওপরে উঠে গিয়ে দরজায় বেল দিলেন।
কি হলো মশাই, সেকেন্ড জুতোটা ফেলুন, কতক্ষণ ওয়েট করাবেন?
আমিও গল্পের ওই ভদ্রলোকের মত বসে আছি, কখন আবার ম্যাজিশিয়ান এর টূপির ভেতর থেকে খরগোস বা কাঠবিড়ালীর মতো একটা basically বেরিয়ে আসে। আর basically একটা বেরিয়ে এলেই একটা গভীর স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস নিচ্ছি।
একটি ছেলে মরুভূমির ওপর রচনা লিখতে গিয়ে লিখেছিল, “মরুভূমি তে শুধু বালি। এদিকে বালি, ওদিকে বালি। ডাইনে বালি, বাঁয়ে বালি। উত্তরে বালি, দক্ষিণে বালি, পূবে বালি, পশ্চিমে বালি। যেদিকে তাকাও শুধু বালি আর বালি।” এই ভাবেই চার পাতা লিখে গিয়েছিল সে।
জালালুদ্দিন বাবুর ওপর রচনা লিখতে দিলে আমিও ওইভাবেই লিখতাম।
এক সময় জালালুদ্দিন সাহেবের খেয়াল হলো যে তাঁর আর হাতে আর সময় নেই, অন্য একটা মিটিং এ যেতে হবে, তিনি আমাদের বললেন “আপনারা এবার আসুন তাহলে, basically…”
-
স্মৃতিশক্তি

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের “মনোজ দের অদ্ভুত বাড়ী” বই তে একটা দৃশ্য ছিল, যেখানে মনোজ দের গৃহশিক্ষক দুঃখ বাবু মনের দুঃখে আত্মহত্যা করবেন বলে গোয়াল থেকে এক দুর্দ্ধর্ষ গোরুর দড়ি খুলে নিয়েছেন। পিসীমা গোয়ালে গোবর নিতে গিয়ে ছাড়া গোরু তাঁকে তাড়া করে গুঁতিয়ে দেয়, তিনি গোবরে পড়ে আর উঠতে পারছেন না। এদিকে বাড়ীর ঝি কিরমিরিয়া কথায় কথায় কেঁদে ভাসায়, সে তারস্বরে চেঁচিয়ে কেঁদে যাচ্ছে, “ও মা আমার কি হবে গো, পিসীমা গোবরে পড়ে গেছে গো…”
চারিদিকে অনেক লোক জমে যাচ্ছে কিন্তু কেউ পিসীমা কে তোলার নাম করছেনা। ওই লোকেদের মধ্যে একজন ভুলোমন লোক বললো বাংলায় গোবর নিয়ে তিনটে কথা আছে, তার মধ্যে প্রথমটা কি যেন, কি যেন… দ্বিতীয় টা এই মুহুর্ত্তে আমার ঠিক মনে পড়ছেনা, আর তৃতীয়টা আমি একেবারেই ভুলে গেছি।
ওই লোকটির মত আমার স্মৃতিশক্তির অবস্থাও খুবই শোচনীয়। আজকাল সবই ভুলে যাচ্ছি, বিশেষ করে কারুর নাম মনে থাকেনা একেবারেই। সে এক মহা যন্ত্রনা।
কুয়েতে থাকাকালীন একবার শিব কুমার শর্মার সন্তুর শুনে এসে একজনকে সে কথা বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের পদবীটা আর মনেই এলনা। শিব কথাটা মনে এলেই মাথাটা ভুল পথে চলে যায়। শিবশংকর মিত্র, শিবপ্রসাদ সমাদ্দার, শিবলাল যাদব, শিবকুমার খান্না এইরকম সব নাম কোথা থেকে ভীড় করে আসে, কিন্তু শর্মার কোন পাত্তা নেই।
কবির ভাষায় “গোলেমালে ফাঁক তালে পালিয়েছি কেমন, শর্মা ওদিকে আর নন।”
শেষ পর্য্যন্ত “শিবজী” বলে পার পেলাম। ভদ্রলোক হয়তো ভাবলেন আমি ওনার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ, কিংবা classical music এর এক বিরাট বোদ্ধা। এক দিক দিয়ে ভালোই হল অবশ্য।
যখন মোবাইল ফোন ছিলনা তখন টেলিফোন নম্বর মনে রাখাও কিছু কম কষ্টকর ছিলনা। তবে নম্বর মনে রাখার জন্যে আমি একটা সাংকেতিক গাণিতিক পদ্ধতি অবলম্বন করতাম।
একবার ১৯৯০ সালে – ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার পরে আমি তখন UAE র আবুধাবী শহরে কাজ করি – আমার বন্ধু এবং সহকর্ম্মী অরবিন্দ ঘোষ অফিসের কাজে সেখান দুবাই যাচ্ছিলেন, তিনি আমাদের হার্ডওয়ার ম্যানেজার। ওনাকে Lift এ তুলে দিতে এসে আমি বললাম “দুবাই তে আমার ভাই উদয় আছে, ওকে কোন দরকার পড়লে একটা ফোন করতে পারেন।”
Lift এখুনি চলে আসবে, নম্বর লিখে দেবার সময় নেই, আমি অরবিন্দকে বললাম, “নম্বরটা মনে রাখা খুবই সহজ, ৫১২৭৯২। আপনি তো হার্ডওয়ার এর লোক, ৫১২ মনে রাখা আপনার কাছে কিছুই না, হাফ এ মেগাবাইট মনে রাখলেই হলো। আর তার পর ওই ৫১২ র তিনটে নম্বর পাঁচ এক আর দুই যোগ করলে আট (৫+১+২=৮)। ব্যাস, তার পর আটশো মাইনাস আট হলো ৮০০-৮ =৭৯২ !
মনে রাখা কি সহজ না?
Lift এর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে অরবিন্দ আমার দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি হেসেছিলেন। সেই হাসিটা আজও ভুলিনি।
তারপর কুয়েতে একদিন সালমিয়াতে আম্মান ভেলপুরী Shop এ মসালা দোসা আর পানি পুরী খাচ্ছি, পাশের টেবিলে একটি বাঙালী ছেলের সাথে আলাপ হলো। সে কুয়েতে নতুন এসেছে। তখনো তার family আসেনি। আমি তাকে বললাম একা feel করলে আমাদের বাড়িতে চলে এসো একটা ফোন করে। আমার ফোন নম্বর মনে রাখা খুব সহজ। এই দ্যাখোনা, পাঁচ আর দুইয়ে সাত, সাত দুগুনে চৌদ্দ…
কিছুদিন পরে শুনলাম ছেলেটি নাকি কুয়েত ছেড়ে চলে গেছে।
যে শহরে এই ধরনের সব পাগল থাকে, সেখানে বেশী দিন থাকা বিপজ্জনক, এই ভেবেই কি না কে জানে!
-
ফুটি সাই, আপা? ভাল ফুটি আসে…

কুয়েতে এসেছি প্রায় এক বছর হলো। এই মরুভূমির শহরে যে এত বাঙালী পরিবার বাস করে তা আসার আগে জানা ছিলোনা। তাছাড়া রাস্তায় ঘাটে দোকানে বাজারে বাংলাদেশী লোকেরাও বাংলায় কথা বলছে, শুনলেই বেশ মনটা ভাল হয়ে যায়।
এর মধ্যে অভীক (দাশগুপ্ত) আর তার বৌ পাপিয়ার সাথে আমাদের বেশ আলাপ আর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অভীক নিউ ইয়র্ক এর Citibank থেকে কুয়েতে কিছুদিনের জন্যে কুয়েতের Commercial Bank এ assignment নিয়ে এসেছে। USA তে থাকলেও ওরা দুজনেই originally কলকাতার, তার ওপর বেরিয়ে গেল যে পাপিয়া আর সিদ্ধার্থর স্ত্রী সুমিতা আশুতোষ কলেজে ক্লাসমেট ছিল, এবং দুজনে একসাথে গীতবিতানে গান শিখেছে।
আমাদের সান্ধ্য আড্ডায় প্রায়ই কলকাতার কথা উঠে আসে। কুয়েতে বসে লেক মার্কেট, রাসবিহারী এভিনিউ, দেশপ্রিয় পার্ক, ল্যান্সডাউন রোড এই সব নামগুলো শুনলেই গা টা’ কেমন শিরশির করে ওঠে…
তো যাই হোক, একদিন সুভদ্রা গেছে অভীকদের সাথে কুয়েত শহরে কর্ণফুলী স্টোর্সে। দোকান টা নতুন খুলেছে, সেখানে নাকি খুব ভালো বাংলাদেশী তরীতরকারী, ফলমূল আর মাছ পাওয়া যায়, ইদানীং অভীকরা ওখান থেকেই বাজার করে।
দোকানে গিয়ে সুভদ্রা এটা ওটা দেখছে এমন সময় দোকানদার একটি ছেলে সুভদ্রাকে বললো ফুটি সাই আপা? ভাল ফুটি আসে…
ফুটি?
ফুটি কথাটা শুনলে সুভদ্রার মনে যে ছবি ফুটে ওঠে তা হলো তরমুজ জাতীয় একটি রসালো ফলের। কিন্তু ফুটি কিনবার ইচ্ছে তখন সুভদ্রার একেবারেই নেই, সে এসেছে মাছ কিনতে।
সুভদ্রা বললো, ফুটি? না না, ফুটি চাইনা।
অভীক বরিশালের ছেলে, সে সুভদ্রাকে বলল তুমি যে ফুটি ভাবছো এ সে ফুটি নয়। এ হলো পুঁটি মাছ…
দোকানদার ছেলেটি খুব উৎসাহিত হয়ে সুভদ্রাকে বললো সরষে বাটা দিয়া ফাক কইরা দেখুন আপা, চমৎকার স্বাদ হইবো…
অভীক ছেলেটিকে বলেছিল কারে কি কন্, দ্যাকসেন না পাঁড় ঘটি, আমাগো বাঙালদের খাওন দাওন ঘটিরা কি বোঝবো, কয়েন?
-
কুমারেশ ও ট্যাক্সি ড্রাইভার

কুমারেশ আমার কুয়েতের বন্ধু, কয়েক বছর আগে দুরারোগ্য রোগে তার মৃত্যু হয়।
তাকে নিয়ে এই গল্পটা।
আমাদের বন্ধুদের কোন জমায়েতে কুমারেশ থাকলে এই গল্পটা তার কাছ থেকে আমরা বার বার শুনেছি। আর কুমারেশ এমন মজা করে বলতো যে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়তাম।
——————————————————
কুমারেশ কিছুদিন হল কুয়েতে এসেছে, আরবী ভাষাটা তার তখনো ভাল করে রপ্ত হয়নি। কিছু কিছু কথা কেবল শিখে রেখেছে, যেমন আমি আরবি জানিনা, মা আরিফ আরবী।
তো হয়েছে কি, একদিন কি একটা কাজে কুমারেশ কে Indian Embassy যেতে হবে। গাড়ি নেই, অতএব ট্যাক্সি নিতে হল। সে এক বিরাট ট্যাক্সি, GM এর Caprice Classic…ছয় সিলিন্ডার চার লিটার এর ভি ইঞ্জিন, কোন ঝাঁকানী নেই, কোন আওয়াজ নেই। বাইরে প্রচন্ড গরম, কিন্তু ভিতরে এয়ার কন্ডিশনিং এর ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া। আমাদের দেশের এম্বাসাডর গাড়ীর সাথে এই গাড়ীর কোন তুলনাই হয়না।
কুমারেশ জেনে নিয়েছে Indian Embassy আরবী তে হল সাফারা হিন্দী। ড্রাইভার কে সে কথা বলে সে Air conditioned গাড়ির পিছনের সীটের নরম গদিতে গা ডুবিয়ে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে।
আবু হালিফা থেকে ইস্তিকলাল স্ট্রীট দূর কম নয়, গাড়ী চলেছে, ড্রাইভার লোকটা বেশ গম্ভীর, তার মুখে কোন কথা নেই, কুমারেশও কিছু বলছেনা। আর তারা কথা বলবেই বা কি করে, ড্রাইভার ইংরেজী জানেনা, আর কুমারেশ আরবী জানেনা।
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কুমারেশ ভাবলো আরে এই লোকটা আমায় Indian Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে তো? তার বদলে ভুলভাল কোন জায়গায় নিয়ে গেলেই তো সর্ব্বনাশ!
কুমারেশ ট্যাক্সিচালক কে জিজ্ঞেস করবে “কি ভাই তুমি ঠিক Indian Embassy তেই যাচ্ছো তো?” কিন্তু tension এর জন্যে Embassy কথাটার আরবী যে সাফারা তা সে বেমালুম ভুলে গেছে। তার কেন জানিনা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে Embassy আরবী তে হল সাইয়ারা। ওকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায়না, স্বীকার করতেই হবে যে দুটো কথার মধ্যে বেশ মিল আছে।
এদিকে আরবীতে সাইয়ারা হলো গাড়ী।
কুমারেশ ট্যাক্সি চালক কে জিজ্ঞেস করলো, “আন্তা সাইয়ারা হিন্দী?”
সে লোকটা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “লা, সাইয়ারা আমরিকী।”
কুমারেশ ভাবল এই রে, যা ভেবেছি তাই। এই গাধাটা এত করে বলা সত্ত্বেও আমায় US Embassy তে নিয়ে যাচ্ছে!
সে তখন বেশ রেগে গিয়ে বলল “লা লা, সাইয়ারা হিন্দী।”
লোকটা এইবার ভীষণ রেগে গেল। এত বড় অপমান? আমার এই সাধের Caprice Classic কে ব্যাটা বলে কিনা Indian গাড়ী?
এই রকম বেশ কিছুক্ষন চলল।
কুমারেশ বলে সাইয়ারা হিন্দী আর ট্যাক্সিচালক বলে লা সাইয়ারা আমরিকী।
শেষ পর্য্যন্ত রেগেমেগে “ট্যাক্সি থেকে বেরোও” বলে কুমারেশ কে রাস্তার মাঝখানে নামিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। এত অপমান তার সহ্য হয়নি।
————————————
২০০২ সালে কুয়েতে আমরা রবীন্দ্রনাথের শেষরক্ষা নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলাম । সেই নাটকে দাপুটে ডাক্তার শিবচরণের ভূমিকায় দারুণ অভিনয় করেছিল কুমারেশ। তার লম্বা চওড়া চেহারা, পরণে ধুতি আর কালো কোট, হাতে একটা ছাতা, গলায় স্টেথোস্কোপ, চরিত্রের সাথে তাকে দিব্বি মানিয়ে গিয়েছিল।
এই সাথে সেই নাটকের দুটি ছবি।
——————————
প্রথমটি ছেলে গদাই এর সাথে বাগবাজারের কাদম্বিনী চৌধুরীর বাড়ির সামনে।
শিবচরণঃ বাপু হে, মেডিকাল কালেজ টা কোন দিকে একটু দেখিয়ে দাও তো।
গদাইঃ (কি সর্ব্বনাশ, এ যে বাবা!)।
দ্বিতীয়টি শিবচরনের ছেলে গদাই ও বন্ধু নিবারণের মেয়ে ইন্দুমতীর বিয়ের অনুষ্ঠানে ।
শিবচরণঃ লুচিটা যেন কিছু কম পড়বে মনে হচ্ছে নিবারণ!
নিবারণঃ তাহলে কি হবে শিবু?
শিবচরণঃ ভয় নেই। আমি সব বন্দোবস্ত করছি! ওরে কে কোথায় আছিস?
————————
কুমারেশের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি।

-
ওয়েন সিরি?

কুয়েতে পাসপোর্টে তিনটে নাম ছিল বাধ্যতামূলক। আরবদের রীতি অনুযায়ী প্রথম নাম হলো নিজের, দ্বিতীয় নাম বাবার, আর তৃতীয় নাম পরিবারের ও হতে পারে গ্রামের বা জন্মস্থানের ও হতে পারে, কিছু একটা হলেই হলো।
মোটমাট তিনটে নাম থাকতেই হবে।
আমাদের বন্ধু ধ্রুব মুখার্জী র পাসপোর্টে নাম ছিল SHRI DHRUBA MUKHERJEE.
সুতরাং কুয়েতে officially তাঁর নাম হয়ে গেল শ্রী। সিভিল আই ডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি সব সরকারী কাগজপত্রে আরবী ভাষায় তাঁর সেই প্রথম নামটাই লেখা থাকতো, এবং সেই নামের পরে নামের বাকি দু’টো অংশ ধ্রুব আর মুখার্জ্জি।], যেগুলো তেমন ধর্ত্তব্যের মধ্যে নয়।
প্রথমে এ ব্যাপারটা ধ্রুব ঠিক বুঝতে পারেন নি।
কিন্তু এই নিয়ে তাঁর একবার একটা “বিশ্রী” অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
একবার জাবরিয়াতে ট্র্যাফিক ডিপার্টমেন্টের অফিসে তিনি তাঁর driving license renew করতে গেছেন। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, ধ্রুব বসে আছেন। কাগজপত্র সব দেওয়া হয়ে গেছে, এখন তাঁর নাম ডাকার অপেক্ষা।
কিন্তু তাঁর নাম আর ডাকেনা। ধ্রুব বসে আছেন তো আছেন ই। ইতিমধ্যে হলঘর প্রায় খালি হয়ে আসছে, যাদের নাম ডাকা হচ্ছে তারা কাউন্টারে গিয়ে তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে চলে যাচ্ছে।
নানা নাম ডাকা হচ্ছে, তার মধ্যে বেশ ব্যগ্র ভাবে ডাকা একটা নাম শোনা যাচ্ছে বার বার – “সিরি” – , কিন্তু ধ্রুব জানেন না যে তাঁকেই ডাকা হচ্ছে, তাই তিনি চুপ করে ধৈর্য্য ধরে লক্ষ্মী ছেলের মতো বসে আছেন।
কিন্তু এত দেরী হচ্ছে কেন? ধ্রুব মনে মনে একটু বিরক্ত আর অধৈর্য্য হয়ে পড়ছেন।
যে লোকটি তাঁর নাম ডাকছে, তারও ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থা। বেশ রাগী গলায় সে ডাকছে ওই অদ্ভুত নাম ধরে।
ওয়েন সিরি? ওয়েন সিরি?
আরবী ভাষায় ওয়েন মানে হলো কোথায়।
শেষে হল ফাঁকা হয়ে গেল, কেউ নেই, ধ্রুব একা বসে আছেন। ধ্রুব কাউন্টারে খোঁজ করতে যেতেই লোকটা রাগে ফেটে পড়লো।
আন্তা সিরি? (তুমি শ্রী? )
এতক্ষণে ধ্রুব বুঝতে পেরেছেন তাঁর ভুলটা কোথায় হয়েছে।
তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে লোকটার একটানা অশ্রাব্য গালাগালি শুনতে হলো তাঁকে! একবিন্দু আরবী না জানলেও লোকটি যে কি বলছে তা বোঝা তাঁর পক্ষে খুব একটা কঠিন নয়।
বাংলায় তার গূঢ়ার্থ হচ্ছেঃ
ফাজলামী করার আর জায়গা পাওনি? আমার সাথে ইয়ার্কি হচ্ছে? এতক্ষণ ধরে তোমার নাম ডাকছি, কথা কানেই যাচ্ছেনা? বলি কানের মাথাটা কি খেয়েছো নাকি?
-
আরবদের দেশে এক ভৌমিক

আমার এক IBM এর সহকর্ম্মী বন্ধু প্রবীর কুমার সেনগুপ্ত আর আমি একসাথে কুয়েতে আসি। প্রবীরকে সবাই আমরা পিকে বলে ডাকতাম, ওটাই ওর নাম হয়ে গেছে, আমাদের সবার কাছে ও হলো universal পিকে।
কুয়েতে আসার পর প্রথম ঝামেলা হলো নাম নিয়ে। আরবী ভাষায় প বলে কোন শব্দ নেই! আশ্চর্য্য ব্যাপার। এত মহান একটা ভাষা, এত লোকে এই ভাষায় কথা বলে, অথচ প নেই? পিকে কে সবাই বিকে বলে ডাকতে শুরু করলো। আরবদের নিয়ে এক মুস্কিল হলো যে তারা কিছুতেই ভুল স্বীকার করতে চায়না, পিকে যত বলে “আরে, বিকে নয়, আমায় পিকে বলে ডাকো”, তারা বলে “আমরা তো বিকে ই বলছি”।
এই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পিকে এক বছরের মধ্যেই কুয়েত ছেড়ে দেশে ফিরে গেল।
এদিকে আমার ও ঝঞ্ঝাট কম নয়। প এর সাথে সাথে আরবী তে ভ ও নেই। তিন রকমের শ আছে, চার রকমের হ, কিন্তু প ও নেই, ভ ও নেই।
কোন মানে হয়?
আমার নাম ভৌমিক থেকে হয়ে গেল বোমিক। Driving License, Civil id, ইত্যাদি সব দরকারী সরকারী document এ আমি হয়ে গেলাম বোমিক। Birthday card এ আমায় বন্ধুরা ভালোবেসে লেখে, “Happy Birthday, Bombom!”
এসব কি হচ্ছে টা কি?
এদিকে আবার কিছু উচ্চারণ বিশারদ লোক আছে, যাদের উচ্চারণ (শিব্রামের ভাষায় উশ্চারণ) নিয়ে প্রচন্ড মাথাব্যথা, যেন উচ্চারণ ঠিক না হলে তাদের রাত্রে ঘুম হয়না। তারা অনেক চেষ্টা, অনেক কসরত, অনেক পরিশ্রম করে আমার নামটা উচ্চারণ করে “বোহোমিক”।
তার পর “কি, এবার ঠিক হলো তো” ধরণের একটা দেঁতো হাসি হাসে, যা দেখে আমার গা জ্বলে যায়।
আমি ওদের বোঝাই আরে না না, বোহোমিক নয়, ভৌমিক! বোহো নয়, ভৌ, ভৌ! দু তিন বার এরকম ভৌ ভৌ করার পর একটু লজ্জাই করে, আমি বানান করে বোঝাই। B, H, O,W, বুঝেছো? Baby, Honey, Oscar, William…
কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা।
কিছুদিন পরে সেই উচ্চারণ বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা হলে তিনি আবার বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলেন, “কি খবর, কেমন আছো বোহোমিক?”

-
ডঃ বীরেন বসু
ছোটবেলায় যে কোন কারণেই হোক আমার মাঝে মাঝেই অসুখ হতো। জ্বর, পেটব্যথা, কাশি, এই সব। বোধহয় immunity কম ছিল, তাই ।
অসুখ হলে স্কুলে যেতে হতোনা, সেটা ওই বয়সে ভালোই লাগত অবশ্য, কিন্তু সারাদিন বাড়িতে ঘরে শুয়ে থাকাও বেশ কষ্টকর। । মা সকাল দশটায় অফিস চলে যেতেন, তার পর সন্ধ্যায় মা না ফেরা পর্য্যন্ত সারাদিন আমি জ্যেঠিমা আর কাকীমাদের হেফাজতে। মাথা ধুইয়ে দেওয়া, থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দেখা, ওষুধ খাওয়ানো, এসব তো ছিলই, তাছাড়া সংসারের নানা কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও দিনের মধ্যে মাঝে মাঝেই তাঁরা আমার শয্যার পাশে বসে খানিকক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে যেতেন । অসুখের দিনগুলোর স্মৃতির সাথে তাঁদের সেই স্নেহস্পর্শের স্মৃতি অবধারিত মিশে আছে।
আর মনে পড়ে আমাদের গৃহচিকিৎসক ডঃ বীরেন বসুর কথা।
আজকাল অসুখ হলে সবাই চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে যায়। কেননা সেখানে স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখানো ছাড়াও অনেক সুবিধে, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে সেখানে নানা যন্ত্রপাতি আছে, তাছাড়া নার্সরা ও নানা কাজে সাহায্য করে। আজকাল কোন রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলে রিসেপশনে রোগী এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের ভীড়ের বহর দেখলে ভির্মি খেতে হয়। কিন্তু ভীড় থাকলেও বিশেষ করে শক্ত অসুখ হলে হাসপাতাল যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
আর সেরকম শক্ত অসুখ না হলে আমরা আজকাল যাই ডাক্তারদের চেম্বারে। সেখানেও বেশ ভীড়, বহু রোগী। বিশেষ করে কোন নামী ডাক্তার হলে ভীড় আরও বেশী।
এই অভিজ্ঞতা কমবেশী আমাদের সকলের।
আমাদের ছোটবেলায় বাড়ীতে কারুর অসুখ হলে গৃহচিকিৎসক আসার (home visit) যে চল ছিল তা আজকাল প্রায় উঠেই গেছে।
আমাদের গৃহচিকিৎসক ছিলেন ডঃ বীরেন বসু।
উজ্জ্বলা সিনেমার উল্টোদিকে ওনার চেম্বার ছিল। তার সাথে ছিল একটা Pharmacy যার নাম ছিল ক্যালকাটা মেডিকাল হল। আজ সেই উজ্জ্বলা সিনেমাও নেই, ক্যালকাটা মেডিকাল হলও নেই , সেখানে এখন বীরেন বাবুর ছোট ছেলে শিবাজীর চেম্বার। শিবাজী এখন কলকাতায় একজন প্রথম সারির Urologist, তার চেম্বারে আমিও দুই একবার গেছি। বেশ রাত পর্য্যন্ত সেখানে বহু রোগীর ভীড়।
বীরেনবাবুর চেম্বার আমাদের বাড়ী থেকে বেশী দূরে না হলেও আমার মনে পড়ে যে আমাদের ছোটদের অসুখ বিসুখ হলে বীরেনবাবু আমাদের বাড়ীতে এসেই দেখতেন। অসুখ হলে ওনাকে দেখাতে ওনার চেম্বারে কখনো গিয়েছি বলে মনে পড়েনা।
বীরেনবাবু থাকতেনও আমাদের বাড়ীর পিছনেই, ওঁর বাড়ীতে বা চেম্বারে গিয়ে একটা খবর দিলেই উনি চেম্বার থেকে বাড়ী ফেরার পথে অথবা বাড়ী থেকে চেম্বারে যাবার পথে সময় করে ঠিক একবার আমাদের বাড়ীতে চলে আসতেন।
বীরেন বাবুর ডাক্তার হিসেবে পাড়ায় খুব নাম ডাক ছিল। তিনি প্রিয়দর্শন মানুষ ছিলেন, সুন্দর হেসে কথা বলতেন, চমৎকার ব্যবহার ছিল। ডাক্তারদের Home visit করার সময় Bedside manners জানা খুব দরকার, সেই দিক দিয়ে বীরেন বাবু ছিলেন একজন আদর্শ গৃহচিকিৎসক। একদিকে হাসিখুসী অন্যদিকে রাশভারী, বীরেনবাবুর ব্যক্তিত্ব ছিল খুব আকর্ষনীয়। উনি এলেই বাড়ীতে একটা বেশ সোরগোল পড়ে যেতো।
একটা বড় চামড়ার ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকে উনি jযখন আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলতেন “কি গো, আবার কি অসুখ বাধিয়ে বসলে?” তখন মনে হতো ওনাকে দেখেই আমার অসুখ অর্দ্ধেক সেরে গেল।
ডাক্তারী ছাড়াও বীরেন বাবুর একটা সামাজিক আর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, কংগ্রেসের টিকিটে তিনি ভোটে জিতে আমাদের ওয়ার্ড থেকে কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হয়েছিলেন একবার। সেটা ছিল ওনার ব্যক্তিত্বের আর একটা দিক। তিনি তাঁর ওয়ার্ডে নানা জনহিতকর সামাজিক কাজের সাথে জড়িত থাকতেন।
আমাদের ছোটবেলায় Antibiotic এর প্রচলন হয়নি। Mass produced ট্যাবলেট এর ব্যবহারও তখন সে ভাবে শুরু হয়নি। সেই সময় ডাক্তারেরা নানা ওষুধ মিশিয়ে একটা মিক্সচার prescribe করতেন, যা ছিল একজন রোগীর জন্যেই তৈরী, ইংরেজীতে যাকে বলে customised and tailored…
বীরেনবাবু তাঁর প্যাডে মিক্সচারের প্রেসক্রিপশন লিখে দিতেন, আমরা সেই প্রেসক্রিপশন নিয়ে Pharmacy তে যেতাম। সেখানে কম্পাউন্ডার বাবু সেই প্রেসক্রিপশন এ অনেকক্ষণ ধরে ভুরু কুঁচকে চোখ বোলাতেন, যেন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পড়ছেন। তার পর বলতেন, “আধ ঘন্টা পরে ঘুরে এসো খোকা, তৈরী করতে সময় লাগবে!”
শিবাজীর কাছে গেলে অথবা কালীঘাট পোস্টাপিসের পাশে ওই রাস্তা টা দিয়ে এখনো যখন হেঁটে যাই, তখন সেই ক্যালকাটা মেডিকাল হলে গিয়ে মিক্সচার আনার কথা মনে পড়ে। একটা বোতলে লাল রঙ এর ওষুধ, বোতলের গায়ে কাগজ কেটে ডোজের মাপ দেওয়া থাকতো।
আজকাল আরও অনেক কিছুর সাথে মিক্সচার ব্যাপারটাও উঠে গেছে।
-
অনুগ্রহ নারায়ন ঠাকুর
১
পাটনায় রান্নার লোকদের বাবাজী নামে ডাকা হতো, কিন্তু মনোহরপুকুরে রান্নার লোকদের সবাই ডাকতো ঠাকুর নামে।
আমার ছোটবেলায় মনোহরপুকুরে ঠাকুর ছিল একজন বিহারী লোক, তার নাম অনুগ্রহ নারায়ণ ঝা। তার দেশ বিহারের ছাপরা জেলায়, ছিপছিপে সুদর্শন চেহারা, ফর্সা, বড় বড় চোখ, নাকের নীচে মস্ত গোঁফ আর মাথায় একটা মস্ত টিকি। যখন ছোট ছিলাম তখন সুযোগ পেলে ঠাকুরের টিকি ধরে টান দিয়ে খুব মজা পেতাম। আমায় খুব ছোট বয়স থেকে দেখার ফলে আমার প্রতি তার একটা বিশেষ স্নেহের ভাব ছিল, তাই টিকি ধরে টান মারলেও সে রাগ করতোনা, প্রশ্রয়ের হাসি হাসতো।
আমাদের পারিবারিক এ্যালবামে ঠাকুরের সাথে মনোহরপুকুরের ছাতে তোলা আমার অনেক ছোটবেলার ছবি এখনো রাখা আছে। পুরনো হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর স্মৃতির মতো সেই ছবি গুলোও এখন বিবর্ণ।
অনুগ্রহ নারায়ণ আমাদের বাড়িতে বোধ হয় দশ বছরের ও বেশী কাজ করেছিল। ক্রমশঃ ধর্মভীরু আর বিশ্বাসী এই লোকটি আমাদের পরিবারের অংশই হয়ে যায়।
একবার মনে পড়ে ঠাকুর আমাদের সব ভাইবোনদের নিয়ে রাসবিহারী এভিনিউতে জলযোগের লাল দই খাওয়াতে নিয়ে যায়। সেই দোকানে দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের একটা খুব বড় অয়েল পেন্টিং টাঙ্গানো ছিল, আর সাথে লেখা ছিল “জলযোগের পয়োধি খাইয়া বড় তৃপ্তি পাইলাম!”
পয়োধি মানে কি লাল দই? এই প্রশ্নটা সেই ছোটবেলাতেই মনে আসে। আর মনে পড়ে ঠাকুরের পিছন পিছন এক বিকেলবেলা আমরা ভাই বোনেরা সবাই দল বেঁধে নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য্য লেন দিয়ে নতুন পার্ক ছাড়িয়ে বিপিন পাল রোড দিয়ে হেঁটে চলেছি।
২
ন’কাকার সাথে কিছু একটা বাদানুবাদ বা তর্কে জড়িয়ে পড়ে একদিনের মধ্যে আমাদের পরিবারের সাথে এতদিনের সম্পর্ক এক কথায় শেষ করে ঠাকুর দেশে ফিরে যায়। তার এই প্রখর আত্মমর্য্যাদাবোধের কথা ভাবলে এখনো বেশ অবাক লাগে।
অনুগ্রহ নারায়ণের ভাইয়ের নাম অনুরোধ নারায়ণ, দাদার জায়গায় সে পরে আমাদের বাড়ীতে কাজ করতে আসে কিছুদিনের জন্যে। সেও বেশ ফর্সা সুপুরুষ লোক ছিল, মাথাভর্ত্তি কালো চুল, হাতে উল্কি, বেশ শক্তসমর্থ চেহারা, কানে মাকড়ি পরতো, তারও মাথায় টিকি। নিয়ম করে রোজ সন্ধ্যায় সে তুলসীদাসের রামায়ণ পড়তো মনে আছে।
অনুগ্রহ, অনুরোধ, কি সব নাম!
এই সব নাম দেখে মনে হয় ওদের বেশ শিক্ষিত পরিবার ছিল। ওদের আর কোন ভাই ছিল নাকি? কে জানে, থাকলে তাদের নাম নিশ্চয় অনু দিয়ে শুরু – অনুমান,অনুরাগ, অনুনয়, অনুকূল, কিংবা অনুভব এই সব হবে!
আমাদের বাড়ির কাজ ছেড়ে চলে যাবার কয়েক বছরের মধ্যে অনুগ্রহনারায়ণের ক্যান্সার হয়। চিকিৎসার জন্যে কলকাতায় এসে সে আমাদের বাড়িতে কিছুদিনে জন্যে থেকেছিল। আশ্রয় দেবার সাথে সাথে বাবা কাকারা তার চিকিৎসাতে সাহায্য ও করে থাকবেন।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পথে মনোহরপুকুরে কুঠুরী র মতো একটা ছোট ঘর ছিল, আমরা বলতাম ঠাকুরের ঘর, সেই ঘরে মাথা নীচু করে কোন মতে ঢুকে শুয়ে পড়তে হবে, কেননা বসলেও মাথা দেয়ালে ঠেকে যেত।
সেই ঘরে চুপ করে শুয়ে থাকতো অনুগ্রহনারায়ণ ঠাকুর, মারণ রোগ তখন তার শরীরে বাসা বেঁধেছে, তার চেহারা শুকিয়ে প্রায় কঙ্কালের মতো, সারা মুখে ক্লান্তি, হতাশা আর জীবন শেষ হয়ে যাবার যন্ত্রণাবোধ।
সেই সিঁড়ির ঘরের পাশ দিয়ে ওঠা নামা করার সময় আমার চোখাচোখি হতো তার সাথে, আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান কিন্তু পরিচিত একটা হাসি হাসতো ঠাকুর, তার সেই হাসিটা এখনো মনে পড়ে।
-
সীতাদিদি

১
সীতা মনোহরপুকুরে কাজে এসেছিল চৈতীর বিয়ের এক মাস পর। মা কে জিজ্ঞেস করে জানলাম। তার মানে চল্লিশ বছর হয়ে গেল।
ক্যানিং লাইনে লক্ষ্মীকান্তপুরে সীতাদের গ্রাম। সেই ১৯৭২ সালে দুই মেয়ে কে নিয়ে সীতার জীবন সেখানে বেশ কষ্টের ছিল, কেননা তার বরের কোন কাজ বা উপার্জ্জন ছিলনা। ওর এক গ্রাম সম্পর্কে বোন অমলা মনোহরপুকুরে আমাদের বাড়ীতে ঠিকে কাজ করত, সেই সীতা কে আমাদের বাড়ীতে প্রথম নিয়ে আসে।
অমলা কে মনে আছে, সে “র” বলতে পারতোনা। বোধহয় ওদের গ্রামে কেউই “র” বলেনা, সীতাও না। তাই তার নাম রমলা না অমলা এই নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে সে বলতো, “না না অমলা নয় গো, আমি অমলা~”
তো এই অমলা একদিন সীতাকে গিয়ে বললো, “তোকে আর ঘরে বইসে থাকতি হবেনাকো। আমার সাথে চল্ দিনি, বওমাকে (বড়মা, মানে জ্যেঠিমা, মনোহরপুকুরের সর্ব্বময়ী কর্ত্রী) বইলে একেচি। ওই বাড়িতে তোর কাজ হইয়ে যাবে।”
সেই যে সীতা এল আমাদের বাড়ীতে কাজের লোক হয়ে, কবে যে সে ধীরে ধীরে পরিবারের একজন হয়ে গেল, আমরা জানতে পারলামনা।
১৯৭৬ সালে সীতার বড় মেয়ে খুব অল্পবয়েসে দুর্ঘটনায় মারা যায়। পুপুরাণী র জন্মের পর (১৯৭৭) আমরা ১৯৮০ সালে Ironside Road এ shift করার আগে তিন চার বছর মনোহরপুকুরে ছিলাম। সেই সময় ছোট্ট পুপুকে প্রায় নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসত সীতা, আগলে রাখত সব সময়। বিকেল বেলা হলে “চল্ সীতাদিদি, দুধ আনতে যাই” বলে পাড়ায় এক গোয়ালার কাছে সীতাদিদির হাত ধরে দুধ আনতে যেত পুপু, কিংবা সন্ধ্যায় “চল্ সীতাদিদি, উটি বেলতে যাই” বলে ছাদে রান্নাঘরে গিয়ে আটা আর বেলনা নিয়ে খেলা করতো। পুপু তখন সবাই কেই “তুই” বলে ডাকতো, তাই সীতাদিদিও “তুই”।
বেশ ছিল সেই দিনগুলো।
পুপুর প্রতি সীতার বাৎসল্য আর স্নেহের ভাব টা এখনও খুব গভীর। পুপু এলেই সে তার কাছে এসে গায়ে মাথায় হাত বোলায়, “আয় সোনামণি, তোর চুল টা বেঁইধে দিই” বলে একটা চিরুণী নিয়ে তার পাশে এসে বসে।

২
জ্যেঠুকে বড়বাবা বলে ডাকতো সীতা। তাঁর জীবনের শেষের কয়েকটা বছরে প্রাণ দিয়ে তাঁকে সেবা করেছে সে। জ্যেঠুর মৃত্যুর পর মনোহরপুকুরের বাড়ী বিক্রী হয়ে গেলে সীতা মার কাছে Ironside Road এ চলে আসে। এখন মার দেখাশোনার ভার তার হাতেই।
আত্মীয়স্বজন কেউ Ironside Road এর বাড়ীতে এলে সীতার খুব আনন্দ হয়। তাদের সবার আদর আপ্যায়ন করার ভার মা তার ওপরেই ছেড়ে দেন আজকাল। সে আমাদের বিশাল পরিবারের সবাই কে চেনে, নিজের লোকের মতোই সবার খোঁজখবর নেয়। আমি তো সীতার আতিথ্যের বহর দেখে বেশ অস্বস্তি তে পড়ে যাই মাঝে মাঝে। দরজা দিয়ে ঢুকেছি কি ঢুকিনি, সীতা শুরু করে দেয়। দাদাবাবু, চা করি? সিঙ্গাড়া নিয়ে আসব? নিমকি খাবে? কাল বানিয়েছি তোমার জন্যে। একটা রসগোল্লা দিই?
মাকে নিয়ে অসুস্থ ছোটকাকা বা মৃত্যুশয্যায় শায়িত জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে গেলে অবধারিত সীতাকে ও নিয়ে যেতে যাবে আমাদের সাথে। না নিয়ে গেলে তার মন খারাপ হয়। এতদিন থেকে দেখেছে তাদের, এক সাথে এতদিন থেকেছে, তাই এখন তাদের শেষ দেখা দেখতে সে যাবেনা তা কি করে হয়?
সীতার বয়েস এখন ষাট ছাড়িয়েছে। চল্লিশ বছর ধরে বাড়ীর কাজে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে সে। এখন এই বয়েসে বেশী পরিশ্রম করার সামর্থ্য তার আর নেই। তার ওপরে বেশ কয়েক বছর তার diabetes হয়েছে, নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হয়। চোখেও কম দেখছে। সীতা কি এবার তার গ্রামে ফিরে গিয়ে ছোট মেয়ে, জামাই আর নাতি দের সাথে জীবনের বাকি দিনগুলো শান্তি তে কাটাবে? তার মাইনে টা আমি তাকে pension হিসেবেই দেবো বলে রেখেছি। চল্লিশ বছর নিষ্ঠা আর সততার সাথে কাজ করার পর এটুকু তো তার rightful due!
কিন্তু মুশকিল হলো সীতা আর তার গ্রামে ফিরতে চায়না। সেখানে পাকা বাড়ি নেই, বাড়িতে ঠান্ডা জল নেই, বোধহয় আলো পাখাও নেই। এতগুলো বছর শহরে কাটিয়ে তার অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। তাছাড়া যখন তার আরও বয়েস বাড়বে, শরীর আরও খারাপ হবে, তখন গ্রামে চিকিৎসা হবে কিনা, তার মেয়ে জামাই আর নাতিরা তাকে ভালোবাসে খুব, ফোন করে প্রায়ই, কিন্তু ওদের কাছে ফিরে গেলে তার প্রতি তাদের ব্যবহার কেমন হবে সে বিষয় ও তার সন্দেহ আছে।
তাছাড়া সে এখন আমাদের পরিবারের অংশ বলেই নিজেকে ভাবে, আমাদের ছেড়ে সে থাকবেই বা কি করে? আমরাই কি তাকে চলে যেতে বলতে পারবো কোন দিন?
————————-
পরিশিষ্ট
২০১৪ সাল থেকে সীতার আর কাজ করারা ক্ষমতা ছিলনা। ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হবার পরে তার শরীর ক্রমশঃ দুর্ব্বল হতে থাকে, চোখেও সে ভাল দেখতে পেতোনা। তখন তার মেয়ে সন্ধ্যা আর জামাই শ্রীমন্ত তাকে তাদের গ্রামে নিয়ে চলে যায়। আমি সীতাকে তার চিকিৎসার জন্যে নিয়মিত পেনশন এর টাকা পাঠাতাম। সীতার জামাই শ্রীমন্ত আমাদের বাড়ীতে এসে টাকা নিয়ে যেত, এবং প্রত্যেকবার আমাদের জন্যে তাদের বাগানের তরকারী আর পুকুরের মাছ দিয়ে যেতো।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর ২৫ শে সীতার মৃত্যু হয়। সন্ধ্যা আর শ্রীমন্ত খুব নিয়ম মেনে তার পারলৌকিক কাজ করেছিল।
সীতার পরলোকগত আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
